শক্তির জাগরণ
এক
সেই ছেলেটা। কুশ
নিতাইচরণের ছেলেটা বাউন্ডুলে ধরনের। মা মরা অবোধ বালক সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। বাবা সকালবেলায় জমিতে চলে যায়। সম্পত্তি খারাপ নয় নিতাই-এর। সাতবিঘা জমি সাথে প্রচুর ডাঙা বাড়ি। সারাদিন পরে ছেলের কথা ভাবার মতো তার সময় হয় না। সংসার সচ্ছল। বাড়িতে বুড়িমা আর একখানা সর্বক্ষণের চাকর।
অনেকেই নিতাইকে বিয়ে করতে বলেছিল কিন্তু নিতাই বিয়ে করতে রাজি নয় কারণ ছেলে নিয়ে কিছু সমস্যা আছে সে সমস্যাগুলির লোকচক্ষুর আড়ালে যত থাকে ততই ভালো। আসলে তার ছেলে ঠিক সুস্থ নয়। মাঝে মাঝে মাঝরাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। গাছপালার জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। এর ওর ছাগলের, গরুর বাঁটে মুখ লাগিয়ে দুধ খায়। জমির সবজি তুলে পাখির বাসায় ঢুকিয়ে দিয়ে আসে। গ্রামের মানুষজন এসব দেখেছে, তবে মা-হারা ছেলে বলে সেভাবে কিছু বলে না। কিন্তু নিতাই জানে তার ছেলে আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক নয়।
বিশেষ করে সেদিনের কথা মনে করলে তার ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। সে রাতে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিল, মানে ওই যেদিন তাদের জমিদারবাবু ফিরে আসেন। মাসখানেক মাসদেড়েক ধরে ছেলেটা রাত্রে বড্ড অস্থির করছিল বলে, নিতাইর মা কাপড়ের পাড় কেটে সেই পাড়ে নিজের হাতে বেঁধে আরেক অংশ নাতির হাতে বেঁধে নিয়ে শুতেন। যাতে রাতে উঠলেও সহজে বুঝতে পারেন। কিন্তু সে ছেলে কখন যে কাপড় খুলে নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এসেছে জানতেই পারেননি। মাঝরাতে ঝড়ো হাওয়ার দাপট শুনে নিতাই বাইরে বেরিয়েছিল। বাইরে বেরিয়ে দেখে সদর দরজা হাট করে খোলা। আর সেই জন্যেই এত হাওয়ার আওয়াজ আসছে। এই প্রচণ্ড দুর্যোগে লম্ফ হ্যারিকেন জ্বালা সম্ভব না। তাই একা হাতেই লাঠিগাছাখানা নিয়ে বেরিয়ে যায় নিতাই। যাচ্ছে তো যাচ্ছে, ছেলের আর দেখা মেলে না। কতদূরে গেল এইটুকু সময়ের মধ্যে! অবশ্য ছেলে কোন দিকে এগিয়েছে এগিয়েছে তাও জানে না তবু তার মন বলছিল তার ছেলে বাম দিক ঘেঁষে শ্মশানের দিকে এগিয়েছে। শ্মশান এ গ্রামে নেই। গ্রামের সীমানার বাইরে ক্রোশটাক গেলে তবেই।
শ্মশানের কাছাকাছি এসে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে তার। তার ছেলে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। আর চারপাশ থেকে অদ্ভুত সড়সড় করে আওয়াজ আসছে। অবশ্য এসব দেখতেই পেতনা যদি না মুহুর্মুহু বজ্রপাত আর বিদ্যুতের ঝলকানি হত। আর তারপরেই তাকে চমকে দিয়ে সেই আওয়াজ এর উৎসগুলো পরিষ্কার হল। চারপাশ থেকে এসে বনবিড়াল, শৃগাল, ভাম ইত্যাদি এসে তার ছেলে পাশে জড়ো হচ্ছে। একটা চিতাও মনে হল। গাছের ডাল থেকে আলগা হয়ে ঝপঝপ করে পাতার মতো ঝরে পড়ছে সর্পের দল। গ্রীবা বাঁকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে স্থির হচ্ছে তার ছেলের চারপাশে। নবগ্রহের মতো বেড় দিয়ে ঘিরে নিচ্ছে তারা কুশকে। যেন এক বৃহৎ পদ্ম। প্রথম পাপড়িতে সর্প। দ্বিতীয় পাপড়িতে শৃগাল। তৃতীয়তে ব্যাঘ্র। চতুর্থে বন্য বরাহ। প্রচণ্ড ভয়ে জড়বৎ হয়ে গেল নিতাই। তবুও সর্বশক্তি জোগাড় করে শেষবারের মতো চেষ্টা করল এগিয়ে যাবার। আর ঠিক তখনই বাজ পড়ল। সর্বনাশ! বজ্রের আঁকাবাঁকা শিরা এসে ছুঁয়েছে বৃত্তের সেই কেন্দ্রবিন্দুতে। তার ছেলে যে ওখানেই, এগিয়ে যেতে গিয়েই কিছুতে হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল নিতাই। আর মনে নেই।
ওদিকে আরেকজন তখন এই একই দৃশ্য দেখছিল। তবে সেই ব্যক্তি এতটা অবাক হয়নি। তার হিসেব করাই ছিল। অন্ধকারে আলোর প্রকাশ ঘটবেই নাহলে অন্ধকার থেকে মানুষের মুক্তি হবে কি করে। যেদিন রাবণের কুণ্ডলী নিয়ে সে জন্মেছিল এই যোদ্ধার জন্মও নির্দিষ্ট হয়ে গেছিল।
তিনি এখনো পরিষ্কার মনে করতে পারেন সেই দিনটা, সেদিন তিনি প্রথম এই গ্রামে আসেন আগে পাশের গ্রাম থেকেও এই গ্রামে কখনোই আসেননি। এ গ্রামখানা যেন অভিশপ্ত। ভক্তি হয়না আসতে। কেমন রুগ্ন, পাপদগ্ধ পরিবেশ। তার ওপর সেই তুলালগ্নের অসুর জাতকের জন্ম। তার জন্ম আরও দূষিত করেছে ওই পরিবেশ। এরপর জমিদারের ক্রমবর্ধমান হিংসা। তার গৃহত্যাগ। বংশের সর্বনাশ….সবই খবর পেয়েছেন। ওই গ্রামে যাবার ইচ্ছা হয়নি তার। তুনি জানতেন অনাহত যখন জন্ম নিয়েছে কোনো পরা শক্তি আসবেই। তাছাড়া ”চক্রসিদ্ধান্তিকা” মিথ্যা হতে পারে না। হয়ওনি, বছর আষ্টেক পূর্বের ঘটনা সেদিন এক বিশেষ সাড়া জেগেছিল আকাশে।
মাঝরাতেই সেদিন কালিকা ভট্টাচার্য নদীতে নেমেছিলেন, চৈত্রের পূর্ণিমা বড় শুভ। স্নান সেরে পূজায় বসবেন এইরকমই ইচ্ছা ছিল। নদীতে প্রথম ডুব দিয়ে তিলাঙ্গুরীয় স্তব করতে যাবেন কি, আচমকা উল্কাপাত। আদ্রার উত্তর হইতে তিনটি উল্কা অপর প্রান্তের গ্রামের জঙ্গলে পড়ে মিলিয়ে গেল। তার পূর্বে খানিকক্ষণ নীলচে আলোয় ছেয়ে রইল আকাশ। মুহূর্তের জন্যও আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হল কালপুরুষের মাথায় একটি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা একবারে হীরার মতো ঝকমকিয়ে উঠল।
মৃগশিরা নক্ষত্রের প্রবেশ লগ্নে এমনধারা উল্কাপাত সচরাচর হয় না, সেদিন সেই উল্কাপাত দেখে তিনি প্রথম ওই গ্রামে পা রাখেন। তার মন বলছিল যে এমন কিছু জন্ম নিয়েছে যার হিসেব বহুকাল আগে থেকেই করা ছিল। ওই গ্রামে তামসিক এর আধিক্যের পাশে এক শুভর ক্ষীণ উপস্থিতি তিনি বরাবরই টের পেয়েছেন, কেউ যেন আসবে। তবে কি সেই-ই এল।
তারপর বহু দিন কেটে গেছে তিনিও কালের নিয়মে সবকিছু ভুলে গেছেন। মন্দিরের সাধারণ সাঁইদার হয়ে রয়ে গেছেন। যে আসবে বা যে এসেছে এখানেই তার অবস্থান। শুধুমাত্র তাকে তাকে আড়াল করে রাখার জন্য তাকে সমস্ত রকম প্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, তাঁকে থাকতে হবে। সঠিক সময়ে সেইই হাতে তুলে নেবে অস্ত্র।
* * *
সেদিন সকালে অন্যদিনের মতো স্নান করে এসে মন্দিরে আসছিলেন। মন্দির মানে শ্মশানের পাশে একচালা মন্দির। প্রথমে মায়ের প্রাত্যহিক কর্মটা করেন তবে তার এই পুজো অর্চনা কেউই দেখতে পারেনা। সে নিয়ম নেই কারণ তিনি আদতে প্রকৃতি মায়ের পুজো করেন। মন্ত্র তন্ত্র তার জানা নেই তিনি আদি প্রকৃতির স্তব করে তাঁকে স্মরণ করে আত্মশক্তিকে শাণিত করেন আর এই শাণিত করণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে তিনি পূজা চড়ান।
নদী থেকে মন্দির অল্পই প্রতিনিধি মন্থর পায়ে পাখির কলকাকলি শুনতে শুনতে নদীর পথে আসছিলেন। হঠাৎ করেই তার যেন মনে হল পাখির কলকাকলি বহুগুণে বেড়ে গেছে। পাখিরা যেন প্রচণ্ড আনন্দের সাথে নৃত্য করতে লেগেছে। তাদের কলকাকলিতে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। এই সময় রোদ ওঠে না একটা আবছা অন্ধকার থাকে অথচ আজ যেন একটা নরম আলো পুরো চরাচর ঘিরে নিয়েছে। ফুলের মধুর আঘ্রাণে চতুর্দিক আমোদিত। যদিও দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে তিনি প্রকৃতির সূক্ষ্মতা খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি সুক্ষতার কথা চিন্তা করছিলেন না অথচ তিনি পাখিদের ভাষা, মৌমাছিদের গুঞ্জন বুঝতে পারছিলেন। ফুলের মধুর আঘ্রাণ সোজা এসে তার নাকে ঝাপটা মারছিল। কি যেন এক প্রচণ্ড ধনাত্মক শক্তি বয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি জুড়ে। তার মন বলছিল এক প্রচণ্ড ধনাত্মক শক্তির আধার কাছেই কোথাও আছে। দ্রুত পায়ে মন্দিরের দিকে এসেছিলেন আর এসেই তিনি দেখেছিলেন ছেলেটিকে। ধুতি পরা আদুল গায়ে মন্দিরের চাতালে বসে আছে বালকটি কত হবে বছর ছয়েকের বালক। এত ভোরে সে এল কী করে? কাদের বাড়ির ছেলে? কিছু প্রশ্ন করার অবকাশ হয়নি। সে নিজেই তার প্রকাশ জানা দিচ্ছে।
সেই বালককে ঘিরে মৌমাছির দল পাখ-পাখালির দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন ভারী আমোদ পেয়েছে তারা। মুহূর্তে মনে হল আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চতুর্দিক তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক পরম শান্তি বিন্দুতে অবস্থান করছেন তিনি। পরমুহূর্তেই তিনি নিজেকে সামলান এই যদি হয়। তাহলে তার এখন অনেক কাজ এ কে সুরক্ষিত করতে হবে। পুরানো দিনের কথা মনে আসছিল বারেবারে। বংশপরম্পরায় এই পণের কথা শুনে আসছে তারা। আবার ডুবে গেল কালিকা ভট্টাচার্য্য।
রক্ষসন্ধিদের কথা ও পণ
জন্মের পরে শিশুটা দেখেছিল তার জ্যেষ্ঠভ্রাতার পর্বতপ্রমাণ ক্ষুধা। মুহূর্তের দেরী হলে তার দাদা চিৎকার করে গৃহ মাথায় তুলতো। তাদের বাবা আশ্রম-এর ঋষিপ্রধান।
যাগ, যজ্ঞ, মন্ত্রপাঠ, অন্যান্য শ্রমের কাজ বাবা ও তাঁর শিষ্যরা করেন। তিনি অর্থাৎ কশ্যপমুনিই এই আশ্রমের গুরু। মা গুরুপত্নী। ফলে তাঁর দায়িত্ব ও কম নয়। নিত্যকর্মের পরে মায়ের সময় হয় কই, দাদাকে একদম সময় ধরে খেতে দেওয়ার কিন্তু তাইতেই তার দাদা এমনই চিৎকার শুরু করত যে আশেপাশের গাছপালা থেকে পাখ-পাখালি পর্যন্ত উঠে যেত। সেই দিনটা স্পষ্ট মনে করতে পারে অর্থাৎ সে এমনভাবে শুনে এসেছে বা তাদের রক্ষদের পরম্পরায় এমনভাবে শোনানো হয়েছে যে সেই ঘটনাগুলো তারা যেন চোখের উপরে ভেসে থাকতে দেখে। সে চতুর্বিংশতিতম শস্ত্ররক্ষ।
সেদিন জেষ্ঠের প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে। এদিকে মাতা আশ্রম মার্জনা, বাগান পরিচর্যা প্রভৃতির তদারক সেরে সবেই এসে বসে পাক করার একটুখানি সুযোগ পেয়েছেন। আর সে পাকের আয়োজনও বৃহৎ। আশ্রমের এতজন আশ্রমিক একসাথে খাদ্য গ্রহণ করে ফলে এক হতে হতেও সময় লাগে কিন্তু যেমনটা বলেছিলাম জ্যেষ্ঠভ্রাতা যক্ষ ক্ষুধা সহ্য করতে পারতেন না প্রচণ্ড চিৎকারে চতুর্দিক আলোড়িত করে তুলতেন। তার চিৎকারে বাধ্য হয়েই মাতা এসে তাকে থামাতে যান। রক্ষ তখন অনেকটাই ছোট, সবে বোধ এসেছে। সহসাই সে দেখতে পায় যে তার ভাইয়ের চেহারায় পরিবর্তন ঘটছে। কিছু বুঝে ওঠার প্রকাণ্ড মুখব্যাদান করে আপন মা-কেই কামড়ে দিতে উদ্যত হয় সে ছেলে। এমতাবস্থায় সাধারণ বিচার-বুদ্ধি লোপ পাওয়া উচিত কিন্তু তার তা হয়নি। সে আপন হাতটিই ভ্রাতার মুখে প্রবেশ করিয়ে দেয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় তার শরীর নীল হয়ে যায়। মায়ের প্রচণ্ড চিৎকারে পিতা এবং অন্যান্য আশ্রমিকরা ছুটে আসেন। তার পিতা তার জ্যেষ্ঠ সন্তানের এরূপ আচরণের জন্য যারপরনাই ক্রদ্ধ হন। তিনি তার এই পৈশাচিক কাজের জন্য তাকে ”যক্ষ” বলে আখ্যায়িত করেন এবং মাতাকে নিজের জীবনের পরোয়া না করে রক্ষা করার জন্য তার নাম রাখা হয় ”রক্ষ”। (বায়ুপুরান—৬৯)
পরবর্তীকালে অনেকেই বলে থাকে তারা ব্রহ্মাকে স্বীকার না করার জন্য তাদের পুত্ররা রাক্ষস নামে পরিচিত কিন্তু যাইহোক এটাই সত্যি যে তারা রক্ষ। মাতাকে রক্ষা করার পর থেকে এই সেই সেদিন থেকেই তারা জগৎ রক্ষা, ভারসাম্যের কাজ করে আসছে। সেই ভার তাদেরকে অর্পণ করা হয়েছে। তারা রক্ষ সন্ধি। যোদ্ধাদের খুঁজে তাদের পূর্বজন্মের উপলব্ধি দেওয়া, কর্মের উপলব্ধি দেওয়া। প্রকাশের পূর্বাবধি আড়াল করাটাই তাদের কর্ম।
এরপরে এল সেই সময় সবাই যখন অসুরদের দলে। ক্রমশ ভারি হল অসুর বাহিনী। তলাতল, পাতাল, বিতল ইত্যাদি সপ্তপাতালের সবাই যখন অসুরের মায়া আর জাদুর কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিচ্ছিল তারা কিন্তু স্থির ছিল। তারা জানত তাদের কাজ ভারসাম্য রক্ষা এবং এই কাজটাই তাদেরকে আজীবনকাল করে যেতে হবে। তাই তারা এই অসুরকুলের শত্রু।
তাদের একটা মস্ত সমস্যা হল সেই কামড়ানোর দাগ তারা আজীবন হাতে বহন করে চলেছে। একের পর এক জন্ম হয়েছে কিন্তু প্রত্যেকেই সেই চিহ্ন বহন করে চলেছে। এই চিহ্ন দিয়ে সহজে তাদেরকে চিনতে পারা যায়, হত্যা করা যায়। কত রক্ষক যে প্রাণ দিয়েছে এই ভাবে তার ইয়ত্তা নেই। ঋষিপুত্র হয়েও যক্ষ দুই পিশাচ কন্যাদের বিবাহ করেন এবং তাদের সন্তানরা পরবর্তীকালে বড় হয়ে ধুন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করে চলেছে। এমনিতেই সেদিন থেকে তাদের চির শত্রুতে পরিণত হয়েছে তারই আপন ভ্রাতা যক্ষ। এখন ভ্রাতষ্পুত্ররা তাকে পেলে সাদরে গ্রহণ করবে অস্ত্রের শানিত ফলায়। (বায়ুপুরাণ-৫৩)
সেইজন্য তাদের পিতা তার নিজের প্রারব্ধ নয়টি জ্ঞানকে তাদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে, সন্ধি রক্ষ তৈরি করেছিলেন। (প্রথম রসের ৯ সন্তানের কথা জানা যায়) তারা বিভিন্ন রক্ষকদের সাথে যোগ স্থাপন। অন্ধকার-আলোর সমতা রক্ষার জন্য নিজেদের এই প্রজ্ঞাকে ব্যবহার করে থাকেন। প্রতিটি জ্ঞানের একটি আধার আছে। আগেই বলেছি যে আধার বায়বীয়। সেই আধারের সাথে একমাত্র তারাই যোগাযোগ করতে পারে। এই আধার অপরাপর কারোর হাতে পড়লেই সমূহ সর্বনাশ। এই নয়টি প্রজ্ঞা অনুযায়ী শ্রেণীবিভাগ গুলি হল- মনঃরক্ষ/মনঃসন্ধি, দেহরক্ষ, সূক্ষ/অনুরক্ষ, অপরাবিদ্যারক্ষ, আমি রক্ষ সন্ধি বা যোগরক্ষ, আকর্ষণ ও বিকর্ষণরক্ষ, আদিরক্ষ, গতিরক্ষ, মনুষ্যরক্ষ, সমাজরক্ষ।
আমরা এই ভাবেই ঘুরে ঘুরে নয় দিকে নয় সমতা রক্ষা করে যাচ্ছি। যেমন দ্বিসহস্র বছর পূর্বে মানুষের মনের গভীরে প্রবেশ করে তার সমস্ত কিছুকে যেকোনো মুহূর্তে পড়ে নিতে পেরেই আটকে দিয়েছিলাম সেই মহা অনর্থ। পিতার ধ্যানের সবচাইতে বড় রত্নটি পিতা মনকে দিয়ে গেছেন।
যাই হোক ধুন্ধুর শুরুর কথা বলা যাক। পিতা মধু ও তাতশ্রী কৈটভের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মধুপুত্র অরোরুহ প্রতিনিয়ত মুনি-ঋষিও দেবতাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলেন। আশ্রমের ভোগ নষ্ট করে, মানুষের উপরে অত্যাচার করে তিনি বারংবার দেবতাদেরকে আঘাত দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। দীর্ঘ পাঁচ হাজার বছর প্রচণ্ড যুদ্ধের পর পুরঞ্জয় ইন্দ্রের সাহায্য নিয়ে হত্যা করেন।
বৃহদ্বশ্বের সাথে অরোরাহর যুদ্ধে সব চাইতে বড় ভূমিকা পালন করেন তদানীন্তন বশিষ্ঠ। এই বশিষ্ঠ এমনই একজন পুরুষ যিনি সমস্ত দেবতাকে আবাহন করতে পারতেন। স্বর্গে যাবার অধিকার ছিল তাঁর। বশিষ্ঠ-এর আবাহনে পুরঞ্জয় ইন্দ্র নেমে আসেন এবং তাঁর সেই অমোঘ বজ্রবানের আঘাতে দিয়ে তিনি কুরদু নদীর বাঁধ ভেঙে অরোরুহ’র বিশাল বাহিনী কে প্লাবিত করেন। মর্তে ঋষি উতঙ্কের আশ্রমের সীমানার পর থেকে সবই প্লাবিত হয়। আসলে তিনি চেয়েছিলেন সপ্ত পাতালের নাগ, পিশাচ, যক্ষ, প্রেতদিগেও একটা শিক্ষা দিতে। তার কারণ তারাও ততদিনে অরোরুহ’র দেখানো পাপ, কাম, ক্রোধ, লোভের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। আলোর চেয়ে অন্ধকারের প্রতি তারা বেশি আকৃষ্ট। তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন পরবর্তীকালে কোনো শক্তিশালি ছত্রের ছায়া পেলে এরা মুহূর্তে বিদ্রোহী হয়ে উঠবে এবং একযোগে মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে। মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করা মানে দেবতার আসনও অনেকখানি টলমল হয়ে পড়বে। এর পর বেশ কিছু বছর সবকিছু খুব ভালো কাটে তদনীন্তন রক্ষরা যা নথিবদ্ধ করে গেছেন তাতে করে প্রায় ২০০ বছর সবকিছু খুব শান্তিতে কাটে।
এরপরে একদিন হঠাৎই মহাযজ্ঞের সময় হবির্বর্ষ ঋষির আশ্রম এ আক্রমণ হয়। আশ্রমের সম্পত্তি নষ্ট করা হয়, যজ্ঞকুণ্ড, বেদি ধ্বংস করা হয়। যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতাদের ভোগ পাঠানো নিয়ম ছিল। সেই ভোগ আনয়নের নিমিত্ত যে দেব প্রতিনিধিরা এসেছিলেন, তাদেরকে হত্যা করা হয়। কয়েকজন হতভাগ্য আশ্রমিকের প্রাণ যায়। অবশিষ্টদের নিয়ে ঋষি হবির্বর্ষ বনের গভীরে পলায়ন করেন। খোঁজ শুরু হয়। কে করল এই ভীষণ কাণ্ড? কিছুই পাওয়া যায় না। সপ্তপাতালের অন্যান্যরাও তো প্রায় অর্ধমৃত। তাহলে কে?
এরপর আক্রমণ বিতনু নগরে। উজ্জীবক সেই স্থানের রাজা। সেই রাজত্বে হঠাৎই শুরু হল কীটের অত্যাচার। সে কীট সর্বভুক। ফসল কাটে। বৃক্ষের কাণ্ড ছেদন করে। গবাদীপশুর খুরের ভেতর কর্তন করে মাথায় গিয়ে ওঠে। শেষে মানুষের চর্ম ছেদন শুরু হল। একটা নগর দেখতে দেখতে কীটদংষ্ট্র হয়ে গেল। মানুষ নেই, পশু নেই, পাখ-পাখালী নেই। শুধু কীট। আকাশ ঘন হয়ে থাকে কীটের গুঞ্জনে।
এইবার দিকে দিকে খবর। কোথাও কীট। কোথাও সর্প। কোথাও পিশাচের উৎপাত। এই সমস্ত ঘাতকগুলোর চরিত্রও ছিল অদ্ভুত। সর্পের চরিত্র বিলতের ন্যায় অথচ কার্লীয়-এর ন্যায় ভীষণ বিষ। কীট দেখতে অতি-সাধারণ কিন্তু তার পদ দুখানি যেন চক্রের ন্যায় ধারালো। যেন প্রজাতির সহিত প্রজাতির মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। হরিদ্রা বর্ণের সর্প থাকে কদলী বনে শুকিয়ে। এমন সর্প কেউই দেখেনি। বুঝতেও পারে না। যা হবার তাই হয়। এমন অবস্থা যজ্ঞের মূল উপাচার কদলী আর পাওয়াই যায় না।
শেষমেশ সদম্ভে যুদ্ধ ঘোষণা করে সামনে এল ধুন্ধু। সাথে দুই সহজর করিৎ ও মরিৎ। গুরু অন্ধক। আর তাদের দুই সহচর মায়া ও কায়া। মায়া ও কায়াই এইসব দুরূহ কার্যগুলি সম্পাদনা করে।
ধুন্ধু মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে ঈশ্বরের থেকে বিশ্বাস তুলে নিচ্ছিলেন। পাপবোধ, অন্যায়বোধ হঠিয়ে তাদের পরিণত করছিলেন অসুরে।
ধুন্ধু সেখানে নিজের তৈরি ওই মূর্তিকে প্রতিষ্ঠা করেন। এই মূর্তিকে কদর্য রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, মানুষের মনে ভীতি প্রদর্শনের জন্য। ভয়ের কাছে মানুষকে আত্মসমর্পণ করানোর জন্য। আসলে মূর্তির মূল ছিল ধুন্ধু নিজেই। দুইপাশে ধুন্ধুর দুইসহচর, করিৎ ও মরিৎ। মূর্তিটিকে দেখানো হয় দেবতা রূপে। অন্ধকারের দেবতা যাকে পূজলে ষড়রিপুর সমস্ত চাওয়া চরিতার্থ হবে। দেবতার প্রভাব খর্ব হবে তার পরিবর্তে একজন নতুন দেবতার উত্থান হবে। সে দেবতা হবে অন্ধকারের দেবতা এই ছিল চিন্তা অর্থাৎ অসুররা নিজেদেরকে সমান্তরাল দেবতারূপে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
এই ষড়যন্ত্রের মূল রূপকার ছিলেন অন্ধক। অরোরুহর মৃত্যুর পর সবার অলক্ষ্যে আস্তে আস্তে ধুন্ধুকে করে তৈরি করেছে এই অন্ধক। অন্ধকের পূর্বাশ্রম অত্যন্ত কালিমালিপ্ত। ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও ক্ষমতা লিপ্সায় সে নিজেকে অসুরে পরিণত করেছিল। আশ্রয়প্রাপ্ত তার সমস্ত জ্ঞান জ্যোতির্বিজ্ঞান, শাস্ত্র, তন্ত্র সবকিছুকে একত্রিত করে সে এক নতুন শক্তির উদ্ভাবন করেছিল সে শক্তির নাম যাদু ও মায়া। এই দুই শক্তি দিয়ে সে অসুরদেরকে আরও আরও শক্তিশালী করে তুলছিল। আসলে অন্ধক পূর্বজন্মে যখন নৈঋত ছিল তখন দেবতাদের সাথে তার সংঘাত বাধে। তার পিতা আশ্রমিকদের সম্মুখে তাকে বেত্রাঘাত করেন। এই অপমান ভোলেনি তাই নিজেকে ঈশ্বররূপে প্রতিষ্ঠা করার বাসনা তার মধ্যে চেপে বসেছিল।
তারপর সেদিনের সেই দুর্দান্ত লড়াই। লড়াই শেষে অন্ধক আত্মহত্যা এবং তারপর বহু জন্ম ধরে বারে বারে অন্ধকের ফিরে ফিরে আসা। শেষে বৃহদ্রথের সময়ে তারা সেই মূর্তিকে কে তারা লুকিয়ে ফেলতে সক্ষম হন এবং বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে একই কর্মকে এদিক ওদিক করে কয়েকটি নতুন অন্ধকারকে মূর্তির চেহারা দিয়ে তৈরি করে আসল শক্তিকে আড়াল করে রাখেন। এই সব বিভ্রান্তি এতদিন অন্ধককে আসল মূর্তি অবধি পৌঁছে দেয়নি। বারেবারে ফিরে এসেছে। কিন্তু এবারে পেয়েছে সে নিশ্চিত পেয়েছে। এই মূর্তি উপাসনায় কিছু ঋণাত্মক শক্তিও জন্মায়। নাহলে আড়াল হবে কি করে। কিছু ভালো করতে গেলে কিছু খারাপও দিতে হয়। এভাবেই আসমোদাস, আশা বশিষ্ঠের অবতারণা। এইসব ভাবতে ভাবতে আপন খেয়ালে বুঁদ হয়ে গেছিলেন। সহসা ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল তার আসন। বুঝলেন তিনি আঘাত আসছে। আর দেরি নয় তৈরি হতে হবে।
পরদিন সকাল—
সকাল সকাল বাইরে যাবার জন্য খিড়কির দরজা খুলে ভিনগাঁয়ের সাঁইদার ঠাকুরকে দেখে বেশ খানিকটা অবাক হয়েছিল নিতাইচরণ। সাঁইদার ঠাকুর তাঁর বাড়ির পিছন দিকে একটা লাঠি হাতে করে বিড়বিড় করে প্রদক্ষিণ করছিলেন। এভাবে বাড়ির পিছনে সাঁইদার ঠাকুরের কি কাজ থাকতে পারে, তা তার মাথায় ঢোকেনি। তাই প্রথমটায় বিস্ময়ের স্বরটুকুও বাইরে আসতে পারেনি। তার সাথে চোখাচোখি হতেই সাঁইদার তার হাত ধরে ঘরের ভিতরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।
তখনো বিস্ময়ের ঘোর কাটছিলনা তার। কীসের কারণের কী হচ্ছে! আর কেনইবা হচ্ছে! সে কিছুই বুঝছে না। এদিকে একের পর এক বিস্ময় তাকে অবাক করে যাচ্ছে। সে পরিষ্কার দেখেছে সাঁইদার ঠাকুর যেখান থেকে প্রদক্ষিণ করে গেছে সেই জায়গা জুড়ে এক অদ্ভুত গুল্মলতা জন্মেছে। ভিজে মাটিতে তার পদচিহ্নের ওপর সেগুলি বেড়ে উঠেছে। মুহূর্তের মধ্যেই চারকড়া সমান উঁচু হয়ে উঠছে তারা। শাখাপ্রশাখা জড়িয়ে পাতায় লতায় গুল্মেরা নিজেদের জড়িয়ে বেড়ির আকার নিচ্ছে। ফুটে ওঠা হলদে-গোলাপ ফুল থেকে কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে। আর সাথেসাথেই পরিবেশটা কেমন জানি বদলে যাচ্ছে। একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতায় ছেয়ে যাচ্ছে পরিবেশ। একটা দুটো করে পাখি ডেকে উঠছে। খিড়কিপুকুরের শানের ভাঙা ফোকরের তক্ষকটা ডেকে উঠল।
বাবাঠাকুর নিজেই নিতাই-এর হাত ধরে নিয়ে ঘরের মধ্যে এনে বসালেন। সাধুবাবার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে তিনি এই ঘর দুয়ার সবই চেনেন। কোন ঘরে তার মা শুয়ে আছে। ছেলে শুয়ে আছে, দেখা গেলো তাও তিনি জানেন। আস্তে করে দরজাটা ভেজিয়ে বাবাঠাকুর তার ঘরের মেঝেতে এসে বসলেন। এতটাই অবাক হয়েছিল নিতাইচরণ, যে কথা বলতে পর্যন্ত ভুলে গেছিল। এতগুলি অদ্ভুত ঘটনা একের পর এক তার সাথে ঘটে চলেছে যে এই ঘটনার কী ব্যাখ্যা দেবে, সে জানেনা! তার হাতটা মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে কথা শুরু করলেন বাবাঠাকুর।
‘জল খাবে নিতাই?’ এ প্রশ্নটা না করলেও চলতো ততক্ষণে ঘরের কোণ থেকে নিজে হাতে পেতলের জগটা তুলে নিয়েছে নিতাই। ঢকঢক করে জল খেয়ে ঘরের মধ্যেই হাতে জল নিয়ে চোখেমুখে ঝাপটা দিল।
দেখো, এখন আমি যা বলব তা তুমি ভালোভাবে শুনবে। আগে বল তুমি গতরাতে কিছু শুনেছিলে কিনা বা গত কয়েকদিন ধরে তুমি কিছু অনুভব করতে পারছো কিনা?
খানিকটা দোনামোনা করেই নিতাই বলে যে, গত কয়েকদিন ধরেই কিছু অস্বস্তি সে অনুভব করতে পারছে। যেমন তার বাড়ির আশেপাশে যে কুকুরগুলি খাওয়ার জন্য বসে থাকত তারা হঠাৎ করে যেন উধাও হয়ে গেছে। তাদের আর দেখা পাওয়া যায়না। বাড়ির পিছনে বাঁশ ঝাড়টা, ওখানে বেশ কিছু পাখির বাসা ছিল তারা সকাল-সন্ধে কিচিরমিচির করে তাদের অস্তিত্ব জানান দিত। এমনকি অতি প্রহরে টকটক করে তারা প্রহরও জানান দিত। কিন্তু তারা যেন চুপ মেরে গেছে। নিতাই-এর পুকুরটা বড় ও আশেপাশের দু-তিনটি পরিবারের ঘাট সরা ( বাসন মাজার পুকুর, যেখানে এঁটোকাঁটা খাদ্যদ্রব্য পড়ে। মাছেরা সেগুলি খায়) হওয়ার দরুন মাছের ঘাই পড়ে নিত্যদিন। বেশ বড় বড় মাছও আছে কিন্তু সম্প্রতি পুকুরে নেমে মাছের কোনো সাড়াশব্দ দেখতে পায়না নিতাই। পুকুরে নেমে একটু সাঁতরে যেতেই দেখেছিল পুকুরের রুইগুলো ভেসে উঠেছে। যেন বাতাসের অভাবে খাবি খাচ্ছে তারা অথচ দিব্যি দেখেছে কদিন আগেও ঘাটের পাশে নথ পরা রুই-কাতলা ঘুরে বেড়াতো।
—হুম বুঝেছি, আমি ঠিকই অনুধাবন করেছিলাম।
কারণ এটা নিতাই-এর ডায়লগ
কিন্তু বাবামশাই আপনি বুঝলেন কী করে!
—ও অভিক্ষেপণ বিদ্যা। এ বিদ্যার বিষয়ে কিছু আমি বলব না তবে তোমার বাড়ি তোমার জানার অধিকার আছে। বিশেষ কারণে তোমার গৃহের উপরে আমার নজর রাখতে হয়েছিল। আমাকে যে একজনকে রক্ষা করতে হত। তোমার ঘরে এক বিশেষ বন্ধন দেয়া হয়েছে। ভয়ংকর এক অনাহতের বাঁধন। তোমার ঘর কে জাগতিক নিয়ম, সৃষ্টির নিয়ম অর্থাৎ প্রকৃতির থেকে আলাদা করে, একা করে ফেলার চক্রান্ত এটা। এতে করে সেই শক্তির সহজেই তোমাদের উপরে আগ্রাসনের ও আক্রমণের সুবিধা হবে। আমি অভিক্ষেপণে তোমাদের ঘরের বেশ কিছু স্থানে জমাটবাঁধা অন্ধকার দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। কি হতে চলেছে তাই আজ স্থির থাকতে পারিনি ভোর হতেই ছুটে এসেছি।
—’কিন্তু কেন আমার বাড়িতেই! আমার ঘরের উপরেই আঘাতটা হবে! আমার কাছে এমন কি সম্পত্তি আছে যে এই সব হচ্ছে!’ নিঃশব্দে নিতাইচরনের হাতটা ধরে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজাটা সামান্য ফাঁক করলেন কালিকা ঠাকুর সেখানে তার ছেলে তক্তপোশের উপর অঘোরে ঘুমাচ্ছে। জানলা থেকে এক টুকরো সকালের রোদ পড়ে তার পুরো শরীরটাকে ঘিরে নিয়েছে যেন সমস্ত শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত আলোকচ্ছটা। সে আলোকচ্ছটার তেজ এমনই যে ঘরের কোণ অবধি দৃশ্যমান হয়। আশ্চর্য, কোনওদিন তো দেখেননি এ জিনিস। কে জানে বাবা এই ছেলে আর কি কি দেখাবে!
—’তোমার ঘরে এই সম্পদ আছে এই সম্পদের জন্যই সে ঘরে ঘরে ফিরে আসছে।’
—’কিন্তু…
—এক ভয়ংকর অনাহত শক্তি পৃথিবীতে প্রকাশ পেতে চায়। আবার অন্ধকার দিনের শুরু করতে চায় পৃথিবীতে কিন্তু বিধিমতে আলোর পাশেই থাকে অন্ধকার। সেই অনাহত, তামসিক শক্তির পাশেই থাকে বিশুদ্ধ পরাশক্তি।
কালের নিয়মে তামসিক শক্তির জন্ম হয়েছে। সে নিজের আধিপত্য বিস্তার ও করছে ধীরে কিন্তু সে জানে যত প্রচণ্ডই হোক। তার বিনাশকারী শক্তি কেউ জন্ম নিয়েছে। তাই সে এখন নিজেকে চিনতে চায়। কোনোভাবে তোমার সন্তানের লক্ষন তার নজর কেড়েছে। তাই সে সন্দিহান। এই সমস্ত বাঁধন, মায়া সৃষ্টি করছে কারণ আঘাত দিয়েই সে বুঝতে চায়। সে জানে আঘাত এলেই শক্তির প্রকাশ করবে আর তখন সে খুব সহজেই চিহ্নিত করে ফেলতে পারবে। যেমন কষ্টিপাথরে ঘষে সোনার বিচার হয় তেমন। তবে সেই তামসিক শক্তিও এখন দুর্বল তার আরেকটি আধার আত্মপ্রকাশ করবে খুব শীগগিরই। সেই আধারের প্রকাশের পরপরই হবে সেই আক্রমণ। তাই সে আটঘাট বেঁধেই পথে নামছে। ধরিত্রী আবার ডুবে যাবে আঁধারে খুলে যাবে দুই জগতের দরজা।
—’বাবা, তবে আপনি কে?’
এ কাহিনি বলতে গেলে আমাদেরকে বহু বছর পিছিয়ে যেতে হবে। সে সময় কালের হিসেব সঠিকভাবে বছরের মাপকাঠিতে দেওয়া সম্ভব না। হয়তো তোমার কাছে বিশ্বাসযোগ্যও হবে না। শুধু জেনে রাখ আমরা যে সময়ে রয়েছি সেটা বৈবস্বত মনুর সময়। ষষ্ঠ মনুর আমলে প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয়, সবকিছুকে আবার নতুন করে গড়ে তোলে এটা বৈবস্বত মন্বন্তর। এর আদিতে যে বংশগতির সূচনা হয়। তা হল ইক্ষ্বাকু বংশ। দাশরথি রাম এই বংশেরই।
—’মনু কে বাবাঠাকুর?’
—মনুকে একমুঠো সময় ধরে নাও। প্রতিটি মনু একেকটি সময়কাল। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে শেষ হয়ে যায় চলতে থাকা মনুর কাল। নতুন মনুর সময় আসে, এই হল মন্বন্তর। প্রতিটি মনুর শেষে সেই সময়ের সমস্ত নিদর্শ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। সচরাচর ভূমিকম্প বা বিধ্বংসী বন্যা শেষের দিনের কারণ হয়। কিন্তু এই যে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের পথে যাওয়ার পিছনে অনেকগুলো কারণের মধ্যে মূল কারণ হিসেবে যেটা দেখা যায় সেটা হল মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকা লোভ, কামনা এবং জনস্ফিতি। মানুষের মধ্যে সুকুমারবৃত্তিগুলো ক্রমশ হ্রাস পেতে পেতে লুপ্ত হয়ে যায়। সেখানে আসুরিক প্রবৃত্তিগুলো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
দুটি জিনিস হয়; এক মানুষ ক্রমাগত প্রকৃতিকে নিজের বাসস্থান ও সংস্থানের অছিলায় প্রকৃতিকে সংকুচিত করতে শুরু করে আর দুই মানুষ নিজের প্রকৃতি অর্থাৎ গৃহাভ্যন্তরে নারীর উপরে প্রচণ্ড অত্যাচার শুরু করে। দূষিত পরিবেশে তামসিক শক্তি দ্রুত প্রবেশ করতে পারে। ফলে খুব সহজেই ষড়রিপুর প্রভাব ক্রমশ গভীর হয়ে মানব মনের ভিতরে যে আরেকটি অন্ধ অবয়ব সৃষ্টি করে। এই অবয়বই মুখ্য চালক হলে এটাই হল অসুর। এবার কাহিনিতে আসি। যেখানে শুরু হচ্ছে সব।
পৌরাণিক কালে অর্থাৎ আমাদের এই বৈবস্বত মন্বন্তরের প্রথম সময়ে প্রচণ্ড শক্তি মানবমনকে বিষিয়ে দিচ্ছিল। ঋষি উতঙ্গ, হরিশ্বরশিখা, ঋষি হবিরবর্ধন এই সমস্ত বড় ঋষি-মুনিদের আশ্রম থেকে দেবতার নৈবেদ্য চড়ানো হত। দেবতাদের প্রতিনিধিরা সরাসরি এসে এখান থেকে ভোগ গ্রহণ করতেন। দেবতারা সেসময় স্বর্গ বা ভৌম স্বর্গে অবস্থান করতেন এবং জনমানসের বাইরে সেখানেই নিজেদের আটকে রেখেছিলেন— ‘ভৌমা হ্যেতে স্মৃতাঃ স্বর্গা ধমির্ণামালায়া মুনে।’
পূর্বে এই সমস্ত স্থানে দেবতা, যক্ষ, রক্ষ দৈত্য-দানব সবাই একসাথেই অবস্থান করতেন। কিন্তু রিপুতাড়িত পরিবর্তন আসার পর সবাইকে নীচে নামিয়ে দেয়। আর যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারেন তাই নৃপতিরা এই সমগ্র কিছুর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন এখানে থেকে। কারণ আমাদের এই মর্ত্যের আশপাশেই সে সময়ে অবস্থান করতো সপ্ত পাতাল। আর সেই সেই সপ্ত পাতালের অবস্থান করত অসুর ভূত-প্রেত নাগ রাক্ষস প্রভৃতি। এদের সর্বসময় একটাই প্রয়াস ছিল যে কোন প্রকারে মানুষদেরকে রিপু তাড়িত করে, অন্যায় করে তামসিক অর্থাৎ অন্ধকায়শক্তির প্রকাশ ঘটানো এবং সেই আঁধারে সমস্ত চরাচরকে ঢেকে দেওয়া। দেবতাদের ভোগ বন্ধ করা, পৃথিবীর পরিবেশ বিনষ্ট করা।
—’কিছু বলবেন মা?’ কথার মাঝে কখন যে নিতাইচরণের মা উঠে এসে অবাক চোখে এই কথোপকথন লক্ষ্য করছেন। তা নিতাই লক্ষ্য করেনি। সাধুর কথায় ঘাড় ঘোরালো। আর আর তখনই এক হাত জিভ কাটল। প্রায় একঘণ্টা হয়ে গেল তারা আলাপ করছে অথচ বাবাঠাকুর কে খাওয়ার কথা বলাই হয়নি। বাবাঠাকুর বুঝি মন পড়তে পারেন নিজেই বললেন।
মাকে বল আজ আমি তোমাদের গৃহের খাবার গ্রহণ করব আমি। মা নিজহাতে যা বানাবেন তাই খাব। কিছু ব্যবস্থা করতে হবে না মায়ের হাতেই আমি আহার নেব।
—’কিন্তু আপনি সাধক মানুষ!’
—সাধক…না আমি সাধক নয় নিতাইচরণ। আমি সঙ্ঘী, রক্ষ আমার জাতককুল। আমার সাধনা মন্ত্রতন্ত্র নয় প্রকৃতি। ধ্যান, জ্ঞান, শাস্ত্রের চেয়ে শস্ত্র এর মানুষ আমি। আমার কথা পরে হবে’খন। এখন বিষয়ে ফিরি….
কথায় ছেদ পড়ল আচমকা প্যাঁচার ডাকে। সকালবেলায় যে প্যাঁচা ডাকতে পারে সে বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না নিতাইচরণের। চমকে উঠেছিল। কঅঅ… শব্দে এবার আশপাশের থেকে অনেকগুলো প্যাঁচা এক যোগে ডেকে উঠল। কী যে হচ্ছে! একে বাবামশায় হেয়ালী করছে। তায় পেঁচার ডাক।
সিধে হয়ে বসল বাবাঠাকুর। তার হাত ঝোলার মধ্যে চলে গেছে অপরদিকে তার ছেলেটাও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। নিতাই ডাকতে গেল। কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। সদ্য ঘুম ভাঙা ঘোরের পরিবর্তে কেমন একটা গর্জন করছে যেন। ঘরের মধ্যে সাধুবাবাকে দেখে বিন্দুমাত্র অবাক হয়নি। যেন তার জানাই ছিল। কেমন মোহগ্রস্তের মতো হাত বাড়াল সাধু বাবার দিকে, সাধুবাবা ও ঝোলা থেকে দ্রব্যটা বের করে তার হাতে দিলেন।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে নিতাইচরণের মা আর যদু ঘরে ছুটে এসেছে। নিতাইচরণের মা’র ভয়ংকর অবস্থা। সারা শরীরে ছড়ে যাবার দাগ। পায়ের আঁচড়ের গভীর ক্ষত। দুজনের দ্রুত লয়ে শ্বাস পড়ছে। একটু সুস্থ হতে যা জানা গেল।
নিতাইচরণের মা বাসনকোসন নিয়ে ঘাটে নামতে গিয়েছিল, সহসা পুকুরে ভীষণ রকম তোলপাড় শুরু হয়। বয়স্ক মানুষ ভয় পেয়ে তড়িঘড়ি তড়িঘড়ি আছাড়ি-পিছাড়ি করে উঠে পড়তে চেয়েছিলেন। এতেই হয় আরও বিপত্তি। পা পিছলে সপাটে আছড়ে পড়েন। তখনই ঘাট থেকে প্রচণ্ড শঙ্খনাদের মতো আওয়াজ ওঠে। ভয়ংকর দর্শন কয়েকটি মাথা জলের উপর ভেসে ওঠে। তারা হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে বুড়ির পা। তার তখন বিহ্বল, হতচকিত অবস্থা। তিনি চিৎকার করতেও ভুলে গেছেন। এদিকে কাছেই গোয়ালে ভৃত্য যদু কাজ করছিল। ছটফটানির আওয়াজ পেয়ে সে তড়িঘড়ি চলে আসে। সেই কোনোমতে ঠাকুমাকে তুলে নিয়ে আসে। সে না থাকলে যে কি হত তা বলা যায় না।
”প্রথম আক্রমণ চলে এসেছে”, বিড়বিড় করে বললেন বাবাঠাকুর। কথাটা কুশের কানে গেল বোধহয়। একবার চোখাচোখি হল সাধুর সাথে। সেই দ্রব্যটি নিয়ে সোজা ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। নিতাই হাঁ হাঁ করে উঠল। সাধুবাবা নিতাইকে আটকালেন তিনি জানেন এবার থেকে যা হবে ঠিকই হবে। কুশ বাইরে যেতেই পরিবেশ যেন আমূল বদলে গেল।
প্রথম সংঘাত
পুকুর পাড়ে এসে কুশ প্রথম যেটা ছিল সেটা হল বাইরের প্রকৃতি আমূল বদলে গেছে। তার চারপাশের আকাশ উত্তল আকারে ঘন মেঘে ঢেকে গেছে। পুকুরের ওপার থেকে কোনও আওয়াজ আসছে না। পুরো প্রকৃতি থম মেরে গেছে হঠাৎ। তার থেকে সাত আট হাত দূরে ঘাসজমিতে সাড়া জাগালো। যেন ভীষণরকম হুলস্থুল জেগেছে। গেল বছর দুইটি ষাঁড়ের জোড় দেখেছিল অনেকটা সেরকম।
তারপর ঝোপ থেকে বেরিয়ে গেল প্রাণীটা। এমন প্রাণী আগে দেখেনি অথবা দেখেছে হয়তো সেদিন সেই যুদ্ধের প্রান্তরে। গোটা প্রাণীটার শরীর মিশমিশে কালো লোমে ঢাকা। মাঝে মাঝে পাংশুটে রং-এর ছোপ। প্রাণীটির শ্বাদন্ত বেরিয়ে এসেছে। সেই থেকে টপে পড়ছে লালা। মুখ থেকে একটা অদ্ভুত গর্জনের আওয়াজ আসছে। আশ্চর্য, একটু দূরেই মাঠে লোকজন চাষ দিচ্ছে, ফসল বুনছে অথচ কেউ কিছু শুনতে পাচ্ছে না!
ভালো করে তাকালে বুঝতে পারা যায় তাদের পুকুরপাড়টার পিছন থেকে একটা অদৃশ্য ঘেরাটোপে সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি পাখি সেখানে ধাক্কা খেয়ে উড়তে উড়তে চলে যাচ্ছে গা বরাবর সমান্তরালে। যেন একটা স্বচ্ছ আবরণ। দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়। বুঝতে পারল কুশ কিছু করার নেই। কেউ জানে না কি হচ্ছে। ওর গৃহ এবং তার সন্নিবিষ্ট অঞ্চল বন্ধন করা হয়েছে। হাতের কিরিচখানা শক্ত করে ধরে তৈরি হল। প্রাণীটা লাফ দিল। তার তলপেটটা মাথা ছুঁয়ে চলে গেল তার সাথেই মনে হল এক ঝলক আগুনের হল্কা কপাল ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল।
তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল। কপালে প্রাণীটার পিছনের পায়ের নখ ছুলে দিয়ে গেছে। প্রাণী পিছনদিকে পড়ে আবার ঘুরে লাফানোর জন্য তৈরি হচ্ছে। আর অপেক্ষা করা যাবে না, কিরিচটা বাতাসে একবার বুলিয়ে তৈরি হল।
এই সময় পিছনে আরেকটি সাড়া জাগল। বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল হঠাৎ করেই ঘাসজমিতে দুটি কুচকুচে সাপের উদয় হয়েছে। তাদের গায়ের রং মায় গলা, পেট অবধি কুচকুচে কালো। এক নারকীয় চেহারা। তীব্র বেগে সরসর করে ছুটে আসছে ওর দিকে আঘাতের জন্য। অসহায়-এর মতো কিরিচটা আরেকবার বুলিয়ে নিল। রক্ষদের গুপ্ত কিরিচ তো এরকম হওয়ার কথা না! একদিক সেই প্রাণীটা লাফ মেরেছে, অন্যদিকে সাপটাও ছোবল মারতে উদ্যত। ঠিক এই সময়ে কিরিচটা তৃতীয়বার ঘোরাতেই প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল তার দুদিকের দুটি ফলা।
ফলাটা খুলে দিতেই তার পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল। প্রচণ্ড শব্দে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চালাতে লাগল। তার শিক্ষা ও অনুশীলন একটু একটু করে মনে আসছে। অর্ধবৃত্তাকারে দক্ষিণে ঘুরিয়ে শঙ্খের মুখ নীচু অর্থাৎ সুরক্ষা। দক্ষিণে ঘুরিয়ে জমে উল্লম্ব পাতন-আক্রমণ। ঘুরে ঘুরে বনবন করে চালাতে লাগল সেই দ্বিফলা কিরীচ।
প্রাণীটা লাফ মেরেছে। আলগোছে দেহটাকে নীচে চালিত করল কুশ। উপরে শূন্যে ভাসমান সেই ভয়ংকর দর্শন জীব। ঝুঁকে পড়ে উপরের ফলা দিয়ে মাথার ওপরেই প্রাণীটাকে গেঁথে নিল। তারপর গড়িয়ে গিয়ে সশব্দে ঝেড়ে নিল ফলা। যেন কিছুইনা। তারপর অপর ফলাটি খুলে নিয়ে নির্ভুল লক্ষ্যে ছুঁড়ে দিল সেই সাপটার দিকে। থরথর করে কেঁপে ফলাটা গেথে নিল সাপটাকে। নিজেই নিজের দ্রুততায় অবাক হল। কিন্তু ততক্ষণে আরও কয়েকটি শব্দ উঠে এসেছে। সে জানে কি করতে হবে ডান হাত থেকে বাম হাত বনবন করে ঘুরতে লাগল দ্বিফলা কিরীচটা। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে সর্পের বাহিনী। যখন উঠে দাঁড়ালো সারা শরীর রক্তাক্ত, ক্লান্ত। এ যাত্রায় সামাল দিয়ে দিয়েছে।
এই প্রথম নিতাইএর মনে হল এতক্ষণ ঘরের পরিবেশে একটা চাপ ছিল। সেই চাপটা যেন কেটে গেছে। বাইরে দিনের আলোয় ঝকঝক করলেও তার ঘরে যেন রোদ ঢুকছিল না এতক্ষণ। এই প্রথম তার ঘরে রোদ ঢুকল আর সেই সাথেই একটা মৃদু বাতাস বয়ে গেল ঘরে।
খানিক পরে সবাই সুস্থ হতে আলোচনায় বসলো কুশ, সাধুবাবা আর নিতাই চরণ। সাধুবাবাই প্রথম মৌনী ভঙ্গ করলেন। উনি এইখানে এসে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন মানে এটুকু ধারণা ওনার হয়েছে যে এখানেই সেই শক্তির আধার লুকানো আছে অতএব দ্বিতীয় আঘাতটা আসবেই। তাই দ্বিতীয় আঘাতের আগে আমাদের তৈরি হওয়া প্রয়োজন।
এইবার কথা বললে কুশ। আমার সেই পঞ্চ সেনানী কোথায়? তাদের কীভাবে খুঁজে বের করা হবে? তাদের জন্ম হয়েছে কিনা তাও আমি জানিনা?
এইবার ঠাকুরের পায়ে পড়লে নিতাই চরণ, ”বেশ বুঝছি আপনারাও কোনো সাধারণ কেউ নয় কিন্তু এই অধম বাবাকে আপনারা অন্তত এইটুকু বলুন, যে ঘটনা কি? এই সন্তানকে আগলে রাখার ক্ষমতা আমার না থাকুক, সত্যটুকু জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন না দয়া করে।”
সস্নেহে নিতাই-এর কাঁধ ধরে তুললেন সাধুবাবা আরে আমি তো সবই তো বলতাম তোমায়। আচমকা আক্রমণ এ হকচকিয়ে গেলাম কেবল এই যা।
একঘটি জল খেয়ে সুস্থ হয়ে বসলেন তিনজন। কালিকা ঠাকুর অভয় দিয়ে বলেন আপনি যান মা, কাজ সারুন। আর ভয়ের কোনো কারণ নেই।
একটু গলা পরিষ্কার করে শুরু করলেন কালিকা ঠাকুর,
‘অররু বা অরোরুহ হল মধুর পুত্র। মধু’র দুর্ধর্ষ প্রকৃতির কথা আমরা সবাই জানি। দেবতাদের বিশেষ শির পীড়ার কারণ হয়েছিল। প্রজাপতি সামগ্রিক কল্যাণের জন্য ধ্যানে বা পরিকল্পনায় বসেছিলেন। আর এখানেই ছিল তাদের আপত্তি। এই সময়টা ভৌমস্বর্গ বা তোমাদের স্বর্গ সে সময়ে গঠিত হয়নি, সবার সর্বত্র যাতায়াত ছিল মানে একদম প্রথম যুগের কথা। তখন সমস্ত দেবতারা পারস্পরিক বিন্দুতে অবস্থান করতেন, এই ধরো যেমনটা আমরা জানি ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর ত্রিবিন্দু।
সে সময় নারায়ণ বিষ্ণু ক্লান্ত শরীরে সমুদ্রের বুকে বিশ্রাম করছিলেন। নারায়ণের দক্ষিণহস্তে পদ্মের মৃণাল পরিমাণ দূরত্বে বসে সেসময় ব্রহ্মা ধ্যান করছিলেন। বলা যায় নিমগ্ন ছিলেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়, পৃথিবীকে আরও সুসংহত করার জন্য। কিন্তু তার মনোযোগে বারংবার ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল মধুকৈটভ। এরা হল যথাক্রমে মিষ্ট ও কটুভাষী। কানের কাছে উচ্চৈঃস্বরে নানারকম কটু কথা বলে, আলাপন করে এরা তাঁর চিন্তার পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল শেষমেষ বিরক্ত হয়ে বিষ্ণুকে জাগাতে বাধ্য হন। দীর্ঘ যুদ্ধের পর বিষ্ণু তাদেরকে আপন জঙ্ঘার ওপর ফেলে হত্যা করেন।’
দেখো এর কারণ একমাত্র তিনিই জানতেন। আমি সামান্য জীব। নিজের মতো ভাবতে পারি কেবল, হতে পারে সে সেময় তিনি যেখানে ছিলেন, তা অর্ণব। চতুর্দিক জলমগ্ন। তাই হয়তো।
নিতাইচরণ একবার মাথায় হাত ঠেকালে। কিন্তু তার ব্যাটা তেমনই নির্লিপ্ত। যেন এসব কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারছেনা। আবার বলা শুরু করল কালিকা ভট্টাচার্য, ‘কিন্তু এখান থেকেই বৃহৎ সংগ্রামের সূচনা হয়ে গেল। টানা হয়ে গেল এক বিচ্যুতি রেখা।’
মধুর পুত্র অররু পিতার সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হয়েছিল। তাকে এখন যে কোনো প্রকারে পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে। সে করল বিভিন্ন আশ্রমগুলোতে আক্রমণ করা শুরু করল, উদ্দেশ্য একটাই আশ্রম এর সূত্র ধরেই দেবতার কাছে ভোগ যায়। সেই ভোগের রাস্তা বন্ধ করা। অসুরেরা ততদিনে নীচে নেমে এসেছে, উপরে খাবার পৌঁছাতে দেবেনা। তাদের কাছে নিয়মিত খাদ্যকে বন্ধ করা অর্থই হবির বর্ধন আত্মা উদ্ভিদের আশ্রমের দারুণ আক্রমণ শুরু করল এছাড়া মানুষটা দেবতাদের ভক্তি করে দেবতাদের নৈবেদ্য দেয় এই জিনিসটা পছন্দ হল না সে মানুষের পিছনে পড়ে গেল অসুরদের মূল শক্তি ছিল তাদের তারা নানারকম বিবৃতিতে বলিয়ান হচ্ছিল।
দেবতাদের নৈবেদ্য বন্ধ হয়ে গেল দেবতারা প্রায় অভুক্ত। ভৌমস্বর্গ বসবাসযোগ্য বটে কিন্তু ঊষর পার্বত্য অঞ্চল। উৎপাদন বা তার চিন্তা কেউই কখনো করেননি। এবার নীচের আশ্রমগুলোতে জোগান বন্ধ করে দেয়া, আর দুর্গের অবরোধ একই ব্যাপার। শুধু তাই না অসুরেরা মায়া বিদ্যা আবার জাদুবিদ্যায় ক্রমশই বলিয়ান হয়ে উঠছিল। নানাধরনের জাদুবিদ্যা এবং সামরিক শক্তির উপরে তারা ক্রমশই নিজেদের আধিপত্য কায়েম করেছিল। নীচে নেমে যাবার ফলে রসাতল, তলাতল, বিতল, পাতাল এর রাক্ষস, সর্প, ভূত-প্রেত, পিশাচ প্রভৃতিরা তাদের আধিপত্য স্বীকার করে নিয়েছিল। ফলে অসুরেরা ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে বারংবার আক্রমণে পর্যুদস্ত করে দিচ্ছিল দেবতাদের। কয়েক শত বছরের মধ্যে অবস্থা ক্রমশ সঙ্গীন হয়ে পড়ল।
অরোরুহ’কে বধ করার কোনো উপায় নেই। তার দুর্গ দুর্ভেদ্য। সেই ময় দানবের আমল থেকেই দুর্গ ব্যাপারে তারা অনেক এগিয়ে ছিল। আসলে তারা তো প্রাকৃতিক কারণে দুর্ভেদ্যতা পায়নি। তাই নিজেরাই নিজেদেরকে শোধন করছিল, শক্তিশালী করছিল। আবার একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন অবাক নিতাইচরণ। এবার চঞ্চল হল কুশ।
‘আপনি যা বলছেন সেটা ওনার বোঝার সামর্থ্য হবে না। উনি কেন এসময়ে দাঁড়িয়ে কেউ-ই এ সমস্ত জিনিস বুঝতে পারবেন না। তার উপর আপনি এত নাম নিয়ে বললে, উনি কিভাবে বুঝবেন তার থেকে সহজ করে ওনাকে বুঝিয়ে দিন কারণ উনি না বুঝলে অযথাই আমার গৃহত্যাগে বাধা দেবেন। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই সেই মন্দিরে যেতে হবে। সেখানে আমাদের অস্ত্র লুকানো আছে। তার চিহ্ন প্রকাশ পেয়েছে কি তাও জানিনা। তবে আজকের আক্রমণ বলছে আত্মপ্রকাশের সময় হয়ে গেছে।’ এতদূর বলে থামল কুশ।
অবাক চোখে তাকাল ছেলের দিকে তাকাল নিতাইচরণ। মা মরা ছেলেটা খ্যাপা ধরনের কিন্তু এমন ধারা গুছিয়ে কথা বলতে পারে তা সে ভাবতেও পারে না। নিজের মধ্যেই কেমন যেন সম্ভ্রম হল আর একবার ছেলের দিকে তাকিয়েই নিজের অজান্তে কপালে আঙুল ঠেকিয়ে নিল।
বাবার কপালে আঙুলটা ঠেকাল কুশ। সব ছবির মতো দেখবেন তিনি। তারপর আচ্ছন্নও হয়ে থাকবে দু-তিনদিন। এর মধ্যেই গৃহ ছাড়তে হবে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল অজান্তে।
অন্যদিকে ওই সময়
দ্বিতীয় ও তৃতীয় শক্তি। ভব-সখী—
একা হাতে রুইতে রুইতে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছিল ভব। বউটা সদ্য পোয়াতি হয়েছে, তাকে আর রুইতে আনা যায় না। নাহলে দুজনে একসাথে কাজ করে বিঘে সাত মাত্র জমি আছে।
ভব’র বউ সখী তার জন্য পান্তাভাত নিয়ে এসে দেখে ভব দিব্যি আলের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথার ওপর দুটো ছাগলছানা কোত্থেকে এসে, তাকে রোদের আড়াল করে রেখেছে। এই নিয়ে তিনবার দেখল বউ। জন্তুজানোয়ার তার স্বামীর কথা শোনে।
একদিন ভব মাঠ থেকে ফিরে খিদেয় কাতর। এদিকে তখন ভর সন্ধেবেলা বউ বাড়িতে সন্ধে বাতি না দিয়ে, তুলসী তলায় প্রদীপ না দিয়ে খাবার জোগাড় তো করবে না। তাই ভব ডাকল না।
খানিকপর খাবার জোগাড় করে বাইরে এসে অবাক হয় তার স্ত্রী। গাভীর বাঁটে মুখ দিয়ে দুধ পান করছে ভব। খানিক আগে দুধ দুইয়ে বাছুরটিকে পানের জন্য ছেড়ে গেছিল। এইসময় বাছুরের দুগ্ধপানে ব্যাঘাত ঘটালে, পেছন পায়ের চাঁট অবধারিত। অথচ ভবকে কিছুই বললে না।
সেই বাছুর এবং ভব একই সাথে গরুর বাঁটে দুধ দিয়ে দুগ্ধ পান করছে অথচ কি নিশ্চিন্তে তাদেরকে স্তন্যপান করিয়ে যাচ্ছে, যেন দুজনেই তার আপন সন্তান। দৃশ্য দেখে চমকায়নি ভব’র স্ত্রী, তাহলে তার বাবা যা বলতো তা মিথ্যা নয়। ভবকে জানোয়াররা বুঝতে পারে।
তার স্পষ্ট মনে আছে সেদিনটা। সে সময়ে এইসব গ্রামে জানোয়ারের দারুণ উপদ্রব হয়েছে। হামেশাই বাঘ চলে আসে আর সেই বুড়ো বাঘ ছিল এক চোখ কানা। তার হিংস্রতার কথা গ্রামে গ্রামে রটে আছে। গোটা গ্রাম সন্ধের পর ঘরের ভেতর সেঁধিয়ে যায়। কিন্তু পেটের দায় বড় দায়। সখীদেরও তাই। সখীর বাবা দরিদ্র ব্রাহ্মণ। তিন গ্রামে যজমানি করে সংসার চালান। সখী বেশি বয়সের একমাত্র সন্তান। সেই সময় বাবার শরীরটা একটু খারাপ ছিল বলে মেয়ে হয়েও বাবার সাথে বাবার যজমানদের বাড়িতে যেতে হত। বৃদ্ধ মানুষটা একা যজমানির সামান্য চাল-কলাটুকু বয়ে আনতে পারতেন না। সেদিন ফেরার সময় খানিক সন্ধে হয়ে যায়। উলিপুরের পথে দু’দিকে ঝোপঝাড় ঘন হয়ে আছে। আগে ডাকাতের গড় ছিল। এখন পরিত্যক্ত। তাই এমনধারা হতশ্রী দশা। হঠাৎ করেই বামদিকের ঝোপ থেকে মৃদু আলোড়নের আওয়াজ আসে। ঘাড় ঘোরাতেই তারা মুখোমুখি হয় সে বিভীষিকার। এখনো পরিষ্কার মনে পড়ে সেই ভয়ংকর ল্যাজা আছড়ানো আর লাফ দেওয়ার আগের সেই ভীষণ মুখভঙ্গি। সেদিন কিন্তু জানোয়ারটা লাফ দিতে গিয়েও লাফ দেয়নি দিলে আজকের আর ব্যাখ্যা দিতে বসতে হত না। আর তার একমাত্র কারণ এই ভব। সেদিন তার শিশুমন বোঝেনি কিন্তু আজ সে আস্তে আস্তে বুঝেছে সেদিন তাদেরকে বেঁচে যাওয়ার প্রধান কারণ ভব।
বাঘটা যখন লাফ দেওয়ার জন্য উদ্যত ঠিক সেই সময়ে ঝোপের আড়াল থেকে একটি শিশু বেরিয়ে আসে। নোংরা একখানা ধুতি কোনোমতে পেঁচিয়ে পড়া। মাথায় খাবলা খাবলা জটা পড়ে আছে। ছেলেটি বাঘের মুখোমুখি দাঁড়ালে। তার ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে তাদেরকে আড়াল করলে। অবস্থা দেখলে এই বিপদের মধ্যে হাসি পেয়ে যাওয়ারই কথা, একটা ছোট্ট ছেলে তারই বয়সি একটি মেয়ে ও একজন বৃদ্ধকে আড়াল করছে হিংস্র বাঘের হাত থেকে কিন্তু কি অদ্ভুত সে আড়াল করে দাঁড়াতেই বাঘটা মুখ ঘুরিয়ে পিছনে চলে গেল। শুধু তাই না তার আওয়াজে কেমন যেন ভয় পাওয়ার ডাক।
সেদিন সেই মুহূর্তে তার বাবা সেই ছেলেটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ছিলেন। শিশু আদৌ কিছু বুঝেছিল কিনা ভগবান জানে কারণ সে ততক্ষণে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে হাঁটা দিয়েছে। বাবা-ই তাকে জোর করে ডেকে নিয়ে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। প্রথমদিকে কোনো কথাই বলত না চুপচাপ দাওয়ায় বসে থাকত আর তার বাবা খেতে দিলে সে খাবার খেতে। এরকম প্রায় বছর দুয়েক চলেছিল। গ্রামের লোক ভাবতেই লেগেছিল যে এই ছেলেটি কথা বলতে আদৌ জানে না, এ বোবা অথবা এর কোনো শারীরিক সমস্যা আছে।
মানুষের ভুল ভাঙল সেদিন যেদিন মোড়লের ছেলেকে লতায় কাটলো। মোড়লের ছেলে দুর্দান্ত প্রকৃতির ছিল বাচ্চা। মোড়লের ছেলে তাই স্বাভাবিকভাবেই এবাড়ি-ওবাড়ি, এর মাঠ, ওর উঠোন দৌড়ে বেড়াতো।
দুর্ঘটনার সময়টা ছিল ভরা বর্ষাকাল। এইসময় লতার উপদ্রব প্রচণ্ড কিন্তু সেছেলে কি আর শোনে! যথারীতি মাঠে-ঘাটে ঝোপে ঝাড়ে যথারীতি দৌড়ে বেড়াতো। ঘটনাটা ঘটার সময় কেউ জানতেও পারেনি। গ্রামের বাইরের বুড়ো আম গাছটার তলায় ছেলেটা পড়েছিল। যখন সবাই দেখেছে, ততক্ষণে মুখ থেকে গ্যাজলা উঠতে শুরু করে দিয়েছে। বিষের তীব্রতায় হাতের আঙুলের ডগা গুলি অবধি নীল হয়ে গেছে। মোড়ল গিন্নির কান্নাকাটি, মোড়লের হাহাকার এক প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলা অবস্থা। এই সময়ে কোথা হতে এসে উপস্থিত হয় ভব। ভব’কে কেউ খেয়ালই করেনি। কিন্তু এই প্রথম ভব কথা বলে উঠল। অবশ্য সেটাকে ঠিক কথা বলা যায় না একটা আওয়াজ। অনেকটা মাঝ রাতে ঘুম থেকে তুলে প্রসব করানোর জন্য যেরকম শিস দেয়া হয় সেরকম আওয়াজ ‘শি-শি’ করে আওয়াজ দেয়ার পর একখানি প্রকাণ্ড করেত এসে সেখানে উপস্থিত হয়। তার সাথে ভব’র চোখাচোখি হতেই সেই সর্প ফনা নামিয়ে দিলে মোড়লব্যাটার ক্ষতের ওপর। তারপর মোড়লের ছেলে সুস্থ হয়ে যাওয়া ছিল কয়েকটি ঘণ্টার তফাত মাত্র।
এরপর থেকে ভালো কথা বলতে শুরু করে ভব। কথার মধ্যে খুব একটা বেশি কিছু থাকত না। খিদে পেয়েছে, ঘুম পাচ্ছে—
এই ধরনের অনুভূতিগুলি প্রকাশ করত মাত্র। তার বাবা বারেবারে বলত এ ছেলে সাধারণ কেউ নয় এর কপালে যে লাল জরুল দেখা যাচ্ছে এর নিখাদ রাজ তিলক।
তারপর আস্তে আস্তে গ্রামের সমস্যাগুলি মেটানো। গ্রামের একজন মানুষ হয়ে যাওয়া। তার বাবার গত হাওয়া। ভব’র সাথে তার বিয়ে, এইগুলি গ্রামের লোকজন প্রচণ্ড ভালোবাসতে শুরু করে। এমন সহজ-সরল ছেলেকে ভালো না বেসে পারা যায় না। তা ছাড়া গ্রামের আপদে-বিপদে সে সবসময় ছিল। তবে তারপর তার বাবাকে খুব একটা জজমানি করে কাটাতে হয়নি। এই গ্রামের মধ্যেই কয়েক ঘর যজমানি আর তার সাথে মোড়লের দেয়া কয়েক বিঘা জমিতে চাষ দিয়ে কাটিয়ে দিত। ভবই দেখত চাষবাস।
তার সেই বাসর রাতের কথাগুলো মনে করলে এখনও চমকে ওঠে। স্বামী যেদিন তার সাথে প্রথম মিলিত হল তার মনে হয়েছিল সমস্ত ঘর যেন এক অদ্ভুত ফুলের গন্ধে ভরে গেছে। মিলনের কালে অদ্ভুত কিছু ভাসাভাসা দৃশ্য ভেসে আসছিল যেন, গাছপালা, জঙ্গল তার দুজন কিন্তু খানিকটা অন্যরকম। এই নিয়ে ভবকে প্রশ্ন করেছিল সে, উত্তর পায়নি যথারীতি। আজও মিলন কালে তার মনে হয় তার ঘরের আশেপাশে পেয়েছে যেন এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তার গোটা ঘর জুড়ে ফুলের গন্ধ। ভব আর সে এক অন্য পরিবেশ।
এইসব কথার মধ্যে কখন ভব ঘুম থেকে উঠে পড়েছে তার খেয়াল হয়নি। উঠেই মাটি শুঁকতে লেগেছে। এরকমটা তো কোনোদিন করে না কখনো। অবাক হয়ে ওকে কিছু বলার আগেই মুখে হাত চেপে ধরল।
অবাক হয়ে দেখল সখী ভীষণ দর্শন দুটি শাঁখামুটি আল বেয়ে আসছে তাদের দিকে। তবে ভয় পায় না কারণ জানে এই সমস্ত জানোয়ার ভবর আশেপাশে এসে চুপটি করে যায়। সেও মানে তার স্বামীর কিছু ক্ষমতা আছে। কিন্তু আজ ব্যতিক্রম হল। সামনের সাপটি ফনা তুলে ছুটে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফোঁস করে ছোবল চালালো। আর ঠিক সেই সময়ই ভবর কপালের লাল জরুলটা দপ করে জ্বলে উঠল। ভয়ে, বিস্ময় লক্ষ্য করল শূন্যে ঝোলানো কিছুর আঘাতে যেন সেই সাপের মুখটা থেঁতলে গেছে। ছিটকে প্রায় তিন হাত দূরে গিয়ে পড়ল সেই সাপটা। আরেকটি সাপ তখনও খানিক দূরে দাঁড়িয়ে ফুঁসছে সে প্রচণ্ড আক্রোশে।
ওখানে বসেই অনেক কিছু মনে হতে লাগল ভব’র। তার মাথার মধ্যে ভূকম্পন হচ্ছে যেন। কেমন যেন একটা চকচকে আয়নার মধ্যে দিয়ে নিজেকে দেখছে।
মুহূর্তের মধ্যে যেন কোন দরজা খুলে গেছে। এমন কিছু দেখছে, দেখার কথা কখনোই ভাবেনি। আবার অবাকও হচ্ছে না একটা হালকা চেনা চেনা ভাব সুতোর মতো ঝোলানো।
এ যেন এক অতি প্রাচীন সময়, আশেপাশের গাছপালা, বাড়িঘরের সাথে এই সময়ের বাড়িঘরের মিল পাওয়া যায় না। খুব কাছ থেকে কোথাও প্রচণ্ড গর্জনের আওয়াজ আসছে। সেটা কীসের ভেবে এদিক ওদিক তাকাতেই সখীর মতো একটি মেয়ে তাকে বলে গেল এটা সমুদ্রের গর্জন। মেয়েটির দিকে তাকিয়েই লজ্জায় লাল হয়ে গেল ভব! কি পরেছে এ! একহাত খানেক সোনালী বস্ত্রখণ্ড দিয়ে বুকের কাছটা বাঁধা। নীচেও তথৈবচ! এই ধরনের পোশাক আশাক পরে নাকি কেউ! এদিকে গায়ে হাতে গয়নার বাহার কত? সস্তা নাকি এদিকে গয়না? তাহলে সখীর জন্য একখানা নিতে হবে। কিন্তু তার ট্যাঁকে দু’খানা কড়ি ছিল। সেটা কই? এদিক-ওদিক একটু এগিয়ে যেতে গিয়ে, সামনে যেটা পেল সেটা হল সুবিশাল পর্বতমালা অবশ্য এটাকে যে পর্বত বলে সেটা তাকে অনুমানই বুঝতে হল। কারণ এই পাহাড়-পর্বত সে নামেই শুনেছে। আগে সে কখনোই দেখেনি পল্লীগ্রামে পর্বত কথাটি শুনলেই যে বিশালত্বের ছায়া আরোপ করা হয় তা থেকেই সে বুঝতে পারল এখানাই হল পর্বত। এ সে কোথায় এসে পড়ল। সে কি ঘুমাচ্ছে! কেমন তালগোল পাকাচ্ছে সব। পর্বতের গায়ে সারি সারি বাড়ি, মাঝে ফাঁকা জমিতে এইটা বাজার বুঝি। লোকজন মাছির মতো ভনভন করছে। অবাক বিস্ময়ে এটা ওটা দেখতে দেখতে এগিয়ে চলে ভব।
আচমকাই গুরুগুরু শব্দে বাজ পড়ে যেন। কর্ণকুহর ফাটিয়ে দেওয়ার মতো কিছু একটা আওয়াজ আসছে সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে। আওয়াজের উৎস খুঁজে উপর দিকে তাকাতেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। উপরে পর্বত থেকে একখণ্ড পাথরের চাঁই খসে আসছে প্রচণ্ড শব্দে মাটি কাঁপিয়ে! সেই সাথে অসংখ্য বিন্দু বিন্দু কিছু যেন নেমে আসছে তাদের দিকে মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেছে। তারা দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছে। মেয়েরা চিৎকার করছে। সব মিলেমিশে এক প্রচণ্ড নৈরাজ্যের সৃষ্টি হল মুহূর্তে।
প্রথমতঃ কয়েক মুহূর্ত হতচকিত এর মতো ওপরের দিকেই তাকিয়ে রইল, যেটা বুঝতে পারল সেটা যে তাকে এখান থেকে পালাতে হবে কিন্তু পালানোর অবস্থা পেরিয়ে গেছে ততক্ষণে। সেই পাথরের চাঁই অনেকখানি কাছাকাছি চলে এসেছে এবং তার সঙ্গে একটা নতুন জিনিস লক্ষ্য করতে পারছে। ওই বিন্দু বিন্দু বস্তুগুলো এখন পরিষ্কার হয়েছে। ওইগুলো আর কিছুই নয় সর্প এবং বড় বড় ফড়িংয়ের আকৃতি পোকা। সর্বনাশ এরা কোথা থেকে এসেছে। সেকি তবে আটকে গেল স্বপ্ন! নিজের হাতে চিমটি কাটতে গেল। এই দুঃসময়েও ব্যথা তার বড় লাগল, অর্থাৎ সে বাস্তবে। কিভাবে এল! কী করবে সেসব চিন্তা তার মাথায় ঢুকল না। তার এখন একটাই চিন্তা তাই যদি হয় তাহলে সখি আশেপাশে কি আছে তাকে এখন সখীকে বাঁচাতে হবে।
আশেপাশে মুখ ঘুরিয়ে সখীকে খুঁজতে যেতেই কানের পাশ থেকে বাতাসের শব্দ পেল। কানে চার কড়া নীচ থেকে সাঁই করে দুগাছি চুল কেটে নিয়ে বেরিয়ে গেছে তীরটা। একি! এটাতো সখি-ই! কিন্তু হাতে তীর-ধনুক দেখা যাচ্ছে। তাহলে কি ও-ই ছুঁড়েছিল তীরটা। এইটুকু অবকাশেই আর একটা তীর ছুটে গেল তার নাকের ডগা ছুঁয়ে। একটা কিম্ভূত আকারের পতঙ্গকে সপাটে গেঁথে ফেলল মাটির উপর। হতভম্বের মতো বসে রইল ভব। তার চারপাশ থেকে ছুটে আসছে কখনো তীর, কখনো পাথর, কখনো ছোট ছোট লোষ্ট্র বলের মতো বস্তু। কখনো-সখনো একটা পাথর যে তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে না কিংবা দু-একটা তীর যে তার হাতের মাংস ছুলে বেরিয়ে যাচ্ছে না তা নয় কিন্তু সে বুঝতেই পারছেনা কী হতে চলেছে!
সে দেখতে পাচ্ছে সখি দিব্যি লড়াই করছে। ওপরের সেই পাথরটা গড়িয়ে মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই সেই পাথরের গায়ে লেগে থাকা সাপের দল এবং তার আশেপাশে উড়তে থাকা কিম্ভূতকিমাকার পোকার দল গ্রামে আক্রমণ চালিয়েছে। গ্রামের মানুষ তার প্রতিহত করছে প্রাণপণে। সখি সম্ভবত এদের এমনই একজন যোদ্ধা। এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে একখানা সাপ সামনে চলে এসেছে সে বুঝতেই পারেনি যখন হুঁশ ফিরল তখন ফোঁস শব্দে ভীষণ ফনা তুলে তার দিকে এগিয়ে এসেছে সাপটা।
প্রচণ্ড ভয়ে পিছিয়ে আসতে যেতেই তার আগে পরে সমস্ত কিছু মনে পড়ল, সে উখণ্ডের গিরিবর্ত্মে হাতে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দগদগ করছে ক্ষত, ক্ষতমুখগুলো বিষে নীলচে হয়ে এসেছে। কিন্তু না তাকে পারতেই হবে। তার দলের পঞ্চবিংশতি বাছাই করা সেরা বন্ধু মারা পড়েছে। বামদিকের প্রস্তরটি তার সহধর্মিণীর উসনির। ধুন্ধুর সর্পকামিনীর দল তাদের সবাইকে শেষ করে দিয়েছে। চোখ বুজে মাথা ঝাঁকিয়ে একবার পিতৃপুরুষকে স্মরণ করেই ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই অন্ধকারে। আজ তার মরণপণ….. এটা মনে হওয়ার সাথে সাথেই ছিল প্রতিবর্ত্য ক্রিয়ায় পাশ থেকে ভারী পাথর দুটো তুলে নিয়ে ঘটাং করে চেপে ধরল সাপটার মাথা। দুটো পাথরের মাঝে পিষ্ট হয়ে গেল সাপের মাথাটা। উঠে দাঁড়াল ভব উরফ বিশেণ তার সব মনে পড়ে গেছে। কোথায় তার ‘গজকুম্ভ’…..
কীগো কীগো… সখির ধাক্কায় হুঁশ ফিরল ভব’র। এইতো সে মাঠের উপর তার নিজের জমির সদ্য কাটা আলের উপরেই বসে আছে। একটু দূরে এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছে সেই সাপটা। যেটা ওকে কামড়াতে এসেছিল, তারপর….. তার সব মনে পড়ে গেছে। এবারে খুঁজতে হবে। তাদের সময় হয়ে গেছে সে। সম্ভবত আবার আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে কিন্তু সে যতদূর বুঝতে পারছে সখির এখনো অবধি কিছুই মনে পড়ছে না। সেক্ষেত্রে তাকে মনে করাতে হবে। কিন্তু তার আগে মন্দিরে যেতে হবে। কীভাবে তারা সেই পুরনো মন্দিরে ফিরে যাবে। সেই মন্দিরের পথ আর মনে আছে তাই! তার গলায় একটা মাদুলি ছিল সে যখন ছেলেবেলায় সখির বাবার সাথে ঘুরত পরিষ্কার মনে করতে পারে তার গলায় একটা মাদুলি ছিল। এই জন্মের শুরুটা ধোঁয়াশা। কিছু মনে নেই। ওই মাদুলি সম্বল। সেটা কি তোরঙ্গে রাখা আছে সেটাকে খুঁজে বের করতে হবে একমাত্র ওই মাদুলি পারে।
ওই একই সময়। শয়তানের দুশ্চিন্তা
অন্ধকার কক্ষের মধ্যে অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন সেই ভদ্রলোক। তার শরীরের অঙ্গ বস্ত্র খুলে মাটিতে লুটাচ্ছে। ক্রুদ্ধ পদচারণায় ঘরের মাটি ও কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই প্রথমবার তিনি আঘাত করলেন আর প্রথম আঘাত-ই ব্যর্থ হয়েছে। তার মানে সেই শক্তি প্রকাশ পেয়েছে কিন্তু সেই শক্তি প্রকাশ পেয়েও নিজের উপলব্ধি তো নিজে থেকে হওয়ার কথা না তাকে জাগানো দরকার। জাগালো কে? রক্ষসন্ধি! আগে তার রক্ষসন্ধিকে খোঁজা উচিত ছিল।
ধুন্ধুকে ওরা এত দূরে সরিয়ে দিয়েছিল! সেদিন সেই যুদ্ধের পরে এত বছর লেগে গেল ওর পুনর্জন্ম হতে। তারপরে তাকে খুঁজতে এতগুলো বছর, এই হতচ্ছাড়া পরিবারে কিছু না জেনেই দিনের পর দিন অত্যাচার সহ্য করেছে। শরীরের রক্ত খেয়েছে, চাবুক খেয়েছে। ধুন্ধুর মূর্তি না দেখলে ও জানতেই পারতোনা ওর জন্মের কারণ। আজকে যখন পেল তখন সেই মূর্তির প্রাণ আনতে এত সময় লেগে গেল। শুধু বলি দিয়ে নিজের জাদুকে জাগাচ্ছে কেবল। ধুন্ধু না জাগলে আবার, আবার হার ওদের।
ওই তিনজনের রক্তের চাই। যাদের জন্য তার এই দুরবস্থা তাদের বলি না হলে ধুন্ধু জাগবেনা কিন্তু কীভাবে?
তিনি ঘরে ঘরে কামনার তরঙ্গ বইয়েছেন। পুঁতেছেন তাঁর বীজ। তাদের ভবিষ্যৎ সৈনিক। অসুর আবার ফিরবে। তার বাকি সাথীরা বা কোথায় কীভাবে পাবো। ভেবেছিলাম আফ্রিকা দেশেরই কোথাও তাদের লুকিয়ে রাখা আছে কিন্তু না। তবে কোথায় তারা কোনো ইঙ্গিত নেই….
ওইদিন দ্বিপ্রহর। সখীর স্মৃতি উদ্ধার
বশিষ্ঠ বলেছিলেন যে ওদের যখন পুনর্জন্ম হবে তখন একজন পুনর্জন্মের স্মৃতি পাওয়া আর একজনকে খুঁজে নিতে পারবে। যে জন্মে ওদের জাতিস্মরসত্তার পুনর্জাগরণ হবে, সেই জন্মেই ওরা একে অপরকে নিজেদের নিয়তির মাধ্যমে ঠিকই খুঁজে পাবে।
বশিষ্ঠ বলেছিলেন, সঙ্গী বিষয়ে নিশ্চিত হলে। তার কপালে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও কণ্ঠদেশে অপর একটি হস্তের মধ্যমা সংযোগ করে যদি নিজের মনকে অভিক্ষিপ্ত করা যায় অপর সঙ্গীর মনে। তাহলে তার আত্মার জাতিস্মরসত্তার জাগরুক হবে।
কিন্তু খুব সাবধান যদি না সে সেই নির্ধারিত ব্যক্তি হয়। তাহলে কিন্তু এই অভিক্ষেপণ এর ফলে মনের উপরে প্রচণ্ড জোর পড়বে। সেই অচেনা মনের দরজায় বারবার আঘাত লেগে মানসিক শক্তি ক্ষয় হবে। সে ক্ষেত্রে যোদ্ধা নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে, আবার তার পুনর্জীবিত স্মৃতিকে হারিয়ে ফেলার সমূহ সম্ভাবনা রয়ে যাবে। অনেক ভেবেচিন্তে ঝুঁকিটা নিল ভব।
সেদিন মাঠে আর থাকেনি। একইসাথে ঘরে এল দুজনে। দুপুরে খাওয়া সেরে কথা পাড়ল ভব। তুমি আমায় বিশ্বাস করো? সখি নিজের স্বামীর মুখে এমন প্রশ্নের কী উত্তর দেবে ভেবে পেলনা তাই প্রশ্রয়ের মুচকি হাসি দিল। মাঝে মাঝে ভেবে পায়না লোকটা এমনধারা কেন? তারপর সকালে আজকে যা কাণ্ড ঘটল…. যাই হোক তার প্রশ্রয় পেয়ে উঠোনে সদর দরজাটায় আগল দিয়ে ঘরের ভিতরে সখিকে টেনে নিয়ে এসে বসল ভব। তারপরে পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তার কপাল কণ্ঠদেশে হাত রাখল।
সখি প্রথমটা মনে হল তার ঘরের জানলা দরজাগুলোর বন্ধ কপাট খুলে গেছে। আলো এসে ঘরদোর ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর সেই আলোর স্পর্শে তার শরীরটা যেন প্রচণ্ড হালকা হয়ে যাচ্ছে। এত হালকা যে আস্তে আস্তে করে ভাসতে ভাসতে ওপরে উঠে যাচ্ছে। পাখির মতো ওপর থেকে সবকিছু সে দেখতে পাচ্ছে। নীচে তাদের সেই ধানক্ষেত, তাদের আলোর উপরে একটা কাকতাড়ুয়া বসানো আছে সেটাকে ছোট্ট ফোঁটার মতো দেখতে পাচ্ছে। সে উড়ে চলেছে মোড়লদের পাকা দালান-কোঠা পেরিয়ে এসে চলেছে তো চলেছে হঠাৎ করে মনে হল কোনো কিছুতে যেন সে ধাক্কা খেল। এটা তো একটা দরজার চৌকাঠ। কী প্রকাণ্ড দরজা! আড়ে বহরে কুড়ি হাত তো হবেই। সে সামনে যেতেই দরজাখানা প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। সামনে উন্মুক্ত হল এক অদ্ভুত পৃথিবী।
পাহাড়, গাছপালা, ফুল-ফলের মনোরম পরিবেশে মনোযোগ দেবার আগেই, একখানা বিষম সোরগোল কানে এল তার। একটু এগিয়ে গিয়ে যেটা বুঝল এটা উপত্যকা। আর এখানে যুদ্ধ বেধেছে। মানুষজন রীতিমতো রণসজ্জায় সজ্জিত। কিন্তু কীসের সাথে লড়াই হচ্ছে। পাহাড়ের গা বেয়ে রাশি রাশি পিঁপড়ে আর কীটের দল নেমে আসছে। আকারে হাতের তালুর মতো বড় আর কুৎসিত। মানুষগুলির খাবার দাবার, গোলাঘরের ছাওয়া অবধি কালো করে ঢেকে নিচ্ছে। তালগোল পাকিয়ে সুতোর গুটলির মতো মাটিতে গড়িয়ে আসছে গ্রন্থি। মাটিতে পড়েই গ্রন্থিগুলো খুলে যাচ্ছে। সর্বনাশ! এগুলো তো সাপ! কিলবিলিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। যাকে পারছে তাকেই ছোবল মারছে।
হঠাৎই প্রচণ্ড আওয়াজ শুরু হল। মানুষের মধ্যে আরও হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। পর্বত, মাটি কাঁপিয়ে কিছু আসছে যেন। এবার দৃশ্যমান হল, একদল সৈন্য। কালো কুচকুচে পোশাকে আপাদমস্তক ঢেকে বেরিয়ে আসছে। আজ গ্রহণের দিন, এখনই গ্রহণ লাগবে। সব অন্ধকার হয়ে যাবে, এদের কালো পোশাক তো আর দেখাই যাবে না! প্রমাদ গুনল সখী। হঠাৎ করেই একজন তার হাত ধরে একজনকে টানতে শুরু করল। লোকটার হাতে একটা তরবারি, রাজবেশ।
একে সে চেনে এই লোকটা এই গ্রামের, ওর প্রতিবেশী। সখীর আর কিছু মনে পড়ছে না। সে কোন গ্রামে ছিল, এটা কোন গ্রাম। সেসব তার মনে আসছে না। এখন একটাই কথা মনে আসছে, যে সে উঘনি। তাদের গ্রামে অসুরদের আক্রমণ হয়েছে। তাকে যুদ্ধ করতে হবে। তার হাতে তীর-ধনুক আছে। অতএব… শর যোজনা করল সখী। সামনে একটা বৃহৎ সর্প এগিয়ে আসছে ছোবল মারার জন্য। সেই মুহূর্তে পিছন থেকে একটা ”কিরিকিরি” আওয়াজে ঘাড়ের রোঁয়া দাঁড়িয়ে গেল। সর্বনাশ পিছনেই কোন কীট উড়ে এসেছে। মুহূর্তে দংশন করবে আর তারপরেই…. সাঁই করে একটা ধাতব আওয়াজ আর তারপর সবুজাভ রক্তশুদ্ধ কীটের মাথাটা তার ডান পাশের ঘাসজমিতে গিয়ে পড়ল। সামনের নিশানা ভুলে অবাক চোখে ঘাড় ঘোরাল।
একজন মানুষ। মাথার লম্বা চুলে জট পড়েছে, চোখ দুটো ঈষৎ পিঙ্গল। অবলীলায় দুই হাতে তরবারি ঘুরিয়ে যাচ্ছে আর উড়ে আসা কীটের দল চারদিকে ছিটকে যাচ্ছে। যেন কোন চক্র। এই মানুষটাকে তো দেখিনি! এই লোকটা কে ও কেন লড়াই করছে! চোখ পড়তেই মুখ টিপে মৃদু হাসল মানুষটা। নিজের অজান্তে নিজের ভেতরেই একটু কেঁপে উঠল উঘনি উরফ সখি। অজান্তেই তার ছিলা আলগা হয়ে ছুটে গেল তীর। গেঁথে ফেলল সাপটাকে। আশ্চর্য সেও তীর ছুঁড়তে জানে! নিজের কৃতিত্বে নিজেই অবাক হল সখি।
উলটোদিকে প্রচণ্ড হাততালির শব্দ শুনে পিছনে ঘুরল। ঠিক চারিহাত প্রমাণ পিছনে একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। অবশ্য দাঁড়িয়ে আছেন বলা ভুল, তাঁর হাতের লাঠিগাছা ঘুরিয়ে অবলীলায় তার দিকে আক্রমণোদ্যত কীটগুলোকে ছিটকে দিচ্ছেন। পিঁপড়ের দল উঠে আসতে চাইলে এসেই, মাটিতে লাঠি দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছেন এমন যে পিঁপড়ের দল ওঠার আগেই আবার ভয়ে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। মানুষটার শ্মশ্রুগুম্ফাচ্ছাদিত চেহারা দেখলে বেশ ভক্তি হয়। সহসাই একটি কীট তাঁর লাঠির ঘা এড়িয়ে একদম সামনে চলে এল। উঘনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হাতে তার তীর-ধনুক আছে কিন্তু এই কীটকে মারতে গেলে, এই লোকটির কোনো ক্ষতি হতে পারে। মারাও যেতে পারে। কিন্তু কীভাবে? আর সে কিছু না করলে কীটের দংশনে এমনিতেই মারা যাবে। এইসব চিন্তাভাবনার মধ্যেই হঠাৎ করেই সে দেখল একটি কিরীচ এসে কীটকে নিয়ে পাশের গাছের কাণ্ডে সমূলে বিদ্ধ হয়ে গেল। কিরীচের গতি অনুসরণ করে যোদ্ধার দিকে তাকিয়েই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল উঘনি। এ কী দেখছে সে! রাজা কুবলায়শ্ব! আলোয় তাঁর কূর্মচর্মের বর্মের আঁশ জ্বলজ্বল করছে। বর্মের উপরে সোনা দিয়ে আঁকা সূর্যের ছবি, ইক্ষ্বাকু বংশের রাজাচিহ্ন জ্বলজ্বল করে যেন বুঝিয়ে দিতে চাইছে আর চিন্তা নেই, রাজা এসেছেন তাদের উদ্ধারের জন্য।
এরপর যুদ্ধর বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি খুব অল্পসময়ের মধ্যেই ছত্রখান হয়ে গেছিল অসুরদের আক্রমণকারী বাহিনী। তাদেরকে নিঃশেষ করে রাজা সেদিন তাদের গ্রামেই শিবিকা স্থাপন করলেন। তখনই পুরো বিষয়টি জানতে পেরেছিল ওরা।
অগ্নিকুণ্ডের সামনে বসে পুরো ঘটনা সেই বৃদ্ধ মানুষটা। সেই বৃদ্ধ মানুষটি হলেন বশিষ্ঠ। সেই বশিষ্ঠ, যাদের প্রথম জনের হাত ধরে ইক্ষাকু বংশের পত্তনের সূচনা হয়েছে। প্রথম বশিষ্ঠ নিজের ধর্ম তত্ত্ব জ্ঞান দিয়ে মানুষকে সুরক্ষিত করেছেন। মানুষ এবং দেবতার মধ্যে গ্রন্থি মজবুত করে রেখেছেন। তারপর থেকে বশিষ্ঠ পদ স্থায়ী জ্যোতিষ্ক। সেরার সেরা মানুষটিই বশিষ্ঠ পদ অর্জন করেন।
বয়োবৃদ্ধ মানুষটা নিজের মুখেই পুরো বিষয়টি বলেছিলেন। রাজা এই ভয়ংকর অসুরের সাথে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন। তার জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হয়েছে এই লড়াই করতে করতে। একইসাথে দেবতা ও মানুষের প্রতিনিধি তিনি। তাঁকে সুরক্ষিত করতে হয়, চাহিদার জোগান অটুট রাখতে। মানুষকে সুরক্ষিত করতে তিনি অসুরের সাথে লড়াই করে যাচ্ছেন। পৃথিবীর আশেপাশে সপ্তপাতালকে অসুরেরা নিজেদের মুঠোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। প্রতিমুহূর্তে নিশ্বাস ফেলছে ঘাড়ের উপর। মাঝেমাঝেই সংঘাত হয়। মানুষকে শেষ করার মাধ্যমে আঘাত দিতে চায় দেবতাকে।
এই কয়েক বছরে রাজা অনেক হারিয়েছেন। শত পুত্র গেছে। পুত্রশোকে পত্নীরা গেছে। তার যৌবন হারিয়েছে কিন্তু মধ্যবয়সে এসেও রাজা এখনো হাল ছাড়েননি। তিনি লড়াই করতে জানেন।
দেবতা, বশিষ্ঠ ও রাজার আলোচনায় অবশেষে একটি পন্থা বেরিয়েছে। সেই পন্থাকে সফলকাম করার জন্য পাঁচজন যোদ্ধার প্রয়োজন। তাদের মধ্যে একজন রাজা নিজেই হবেন। আর বাকি চারজনের খোঁজেই এই গ্রামে আসা। সে অর্থাৎ উঘনি বাদে বাকি তিনজনকে রাজা নিজেই খুঁজে নিয়েছেন।
ধুন্ধুর মূল শক্তি হল অন্ধক। অন্ধক এক ব্রাহ্মণ সন্তান। পূর্ব জীবনে প্রাপ্ত সমস্ত জ্ঞানকে অন্ধকারে বদলে গিয়েছে। বলা হয় জ্ঞানী যখন তার সেই জ্ঞানকে অস্ত্র করে তখন তার থেকে ভয়ানক অস্ত্র আর কিছুই হয়না। অন্ধকের ক্ষেত্রেও তাই। ধুন্ধুর শক্তি আর সাহসকে সামনে খাড়া করে পিছনে মূল চালিকাশক্তি হতে চায় অন্ধক। স্বর্গ ও মর্ত্য জুড়ে যেমন দেবতাদের আধিপত্য আছে। ঠিক তেমনি সে একটা নতুন অন্ধকার স্বর্গ তৈরি করতে চায়। সেখানকার অধিপতি হতে চায়। তার এই প্রক্রিয়াকে যদি না বাধা না দেওয়া যায় তাহলে কিন্তু সারা পৃথিবীতে অন্ধকার নেমে আসবে। সমস্ত জগৎও সপ্তপাতালের সাথে অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
অতিসম্প্রতি এও শোনা যাচ্ছে অন্ধকের প্ররোচনায় ধুন্ধু একটি মূর্তি তৈরি করেছে। কুবলয়াশ্ব দুর্বল হলেই সেই মুহূর্তেই ওই মূর্তিকে তাদের স্বর্গের দেবতার মূর্তি হিসেবে পূজিত হবে। বলা হচ্ছে,ওই দেবতা নাকি আদিম দেবতা। আমাদের দেবতারও প্রাচীন। আমাদের দেবতাদের মতো নিজেকে সংযত করা নয় বরং কামনা-বাসনা সবকিছুকে উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। মানুষ যা চায় তাই পাবে। এমতি প্রচারে মানুষেরও পদস্খলন হতে খুব একটা সময় লাগবে না। আর তাহলে সেই যুদ্ধে দেবতাদের পরাজয় নিশ্চিত। তখন দেবতাদের পরিবর্তে তার মূর্তি ঘরে ঘরে মানুষের দ্বারা পূজিত হবে। সেই মূল পুরোহিত হিসাবে অধিষ্ঠান পাবে অন্ধক, আর রক্ষক হিসেবে অধিষ্ঠান পাবে ধুন্ধু।
সে মূর্তি আমি দেখেছি, এত বীভৎস থেকে দেখলেই ভয় লেগে যায়। বর্তমান বিষ্ণু নিজে আমায় স্মরণ করেছিলেন।
রাজা কুবলয়াশ্ব জীবনের সবটুকু হারিয়েছেন। রাজা হয়েও তিনি জীবনে একটি দিনের জন্য সুখ পাননি। প্রজাকল্যাণ করতেও ব্যর্থ হয়েছেন কারণ তাঁর রাজত্বের বারংবার অসুররা আক্রমণ করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে তার প্রজাদের। রোজ তাকে মৃত্যুর হাহাকার শুনতে হয়েছে তাই তিনিও বদ্ধপরিকর জীবনে একটি বার এই কাজটি তিনি করে যাবেন। তারপর মৃত্যু আসে আসুক। ধুন্ধুকে অন্তত তিনি নির্মূল করে যাবেন। এটাই তার শত পুত্রের প্রতি, তার উৎপীড়িত, নিহত প্রজাকুলের প্রতি সঠিক শ্রদ্ধা জানানো হবে। তার স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য করা হবে, রাজা হিসেবে —পিতা হিসাবে তার কর্তব্য পালন করা হবে।
অনুশীলন ও শিক্ষা। স্মৃতির সম্পূর্ণ উদ্ধার
তোমার কি আর কিছু মনে পড়ছে সখি? চোখের দিকে তাকিয়ে ভব বেশ বুঝতে পারছিল যে সখি’র সবকিছু মনে পড়তে শুরু করে দিয়েছে। আস্তে আস্তে নিজের কপালের উপর থেকে হাতটা নামিয়ে দিল সখি। তার এখন সব মনে পড়েছে, তার পূর্বাপর জন্মের কথা। তাদের ইতিহাস। সবকিছু। সে উঘনি আর তার সামনে যে বসে আছে সে ভব নয় সে হল বিশেণ। তাদের সম্পর্ক জন্ম-জন্মান্তরের। বহুযুগ ধরে তারা এমনিভাবেই একে অপরের সাথে মিশে আছে। হয়তো মাঝে তাদের পুনর্জন্ম হয়েছে তারা পরস্পরকে চেনেনি কিংবা চিনেছে। এটুকু জানে এই জন্মে তারা একে অপরের পরিপূরক। আস্তে আস্তে কপাল ও কণ্ঠদেশ থেকে হাতটা নামিয়ে উঘনি বলতে শুরু করল। আমরা যে অঞ্চলে বাস করতাম সেই অঞ্চলগুলি ছিল মর্ত ও পাতাল এর একদম প্রান্তস্থিত অঞ্চল। কয়েকজন ঋষির আশ্রম ছিল, আমরা সেই আশ্রমে যেতাম। আশ্রমিকদের জন্য ফলমূল, শস্যাদি পৌঁছে দিতাম। দেবতাদের উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদনের নিমিত্ত পশুপালন করতাম আলাদা করে। তাদের রক্ষার দায় ও আমাদের গ্রামের উপরেই ন্যস্ত ছিল। অসুররা সেই ঋষির আশ্রমকে আক্রমণের লক্ষ্য করে।
এতদিন আমরা অসহায় তাদের আক্রমণের লক্ষ্য ছিলাম না কিন্তু ওরা ঋষিদের আক্রমণ করতে গিয়ে সেখানে কর্মরত অবস্থায় আমাদের কয়েকজন নারীকে দেখে ফেলে। আমাদের গ্রামের নারীরা তখন সেখানে যজ্ঞের নিমিত্ত দুগ্ধ, শর্করা ও ফল দিতে গিয়েছিল। কয়েকজনকে অপহরণ করে, তাদের উপর অত্যাচার চালায় এবং এরপর থেকেই আমাদের গ্রামের উপরে আক্রমণ চলতে থাকে। আমরা বাঁচার জন্য বনের আরও গভীরে চলে যাই। এক পর্যায়ে অসুরদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব ও প্রলোভন আসতে থাকে আমাদের গ্রামের প্রধানের কাছে। বলা হয় আমাদের গ্রামের কয়েকজন নারীকে অসুরদের হাতে তুলে দিলে তার পরিবর্তে তারা আমাদের গ্রাম ও গ্রামের মানুষদের রেহাই দেবে। বলাইবাহুল্য প্রধান এই ঘৃণ্য প্রস্তাবে রাজি হননি এর ফলস্বরূপ একের পর এক আক্রমণ আসতেই থাকে। ক্রমাগত আক্রমণে আমরা পর্যুদস্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। কখনো অসুরদের পোষ্য পশুবাহিনী আক্রমণ করে। কখনো পাতাল হতে রাক্ষুসে পিঁপড়েদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় আমাদের আক্রমণের জন্য। কখনো ভয়ংকর কীটপতঙ্গের দলকে আমাদের ফসল কেটে, বিষাক্ত দংশন ক্ষত তৈরি করে আমাদের জনজীবন বিপর্যস্ত করে।
এদিকে আমরা যার কাছে সাহায্য চাইতাম সেই নৃপতিরও ক্ষমতা, বল নিঃশেষিত প্রায়। আমরা শুনতে পেয়েছিলাম তাঁর শতপুত্র মারা গেছে ধুন্ধুর সঙ্গে যুগ-যুগান্তরব্যাপী সংঘর্ষে। তার স্ত্রী সেই পুত্র শোক সহ্য করতে না পেরে, উন্মাদ হয়ে সমুদ্রগর্ভে ঝাঁপ দিয়ে ইহজাগতিক দায় সেরেছেন।
আমরা ক্রমশই হতোদ্যম হয়ে পড়ছিলাম যে আমাদের মুক্তির কোনো উপায় নেই। এমতাবস্থায় আবার একদিন আক্রমণ ঘটে এবং সেই আক্রমণের দৃশ্যই এতক্ষণ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। সেখানেই আমি প্রথম তোমাকে দেখি। রাজার সেনাপতি হয়ে আমাদেরকে উদ্ধারিতে এসেছিলে। তার আগে তোমরা ছদ্মবেশে আমাদের গ্রামেই ছিলে পথিক হয়ে। সাথে মহাগুরু বশিষ্ঠ এবং খোদ রাজা কুবলয়াশ্ব। তার সেনানীরা সেদিনের মতো অসুরদের প্রতিহত করেছিল। কিন্তু বাঁচতে হলে একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চাই। সেই ব্যবস্থা করতেই সেদিন রাজা এসেছিলেন।
তার পরে শুনেছিলাম সেই পরিকল্পনা। একটু একটু করে নিজের সৈন্যবাহিনী তৈরি করছেন। তৈরি করেছেন এক দুর্মর বাহিনী। যারা যেকোনো মূল্যে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকবে। সর্বাগ্রে রাজা নিজেই।
আমার স্বভাবসুলভ ক্ষিপ্রতা ও প্রত্যুৎপন্নতা এর জন্য আমিও নির্বাচিত হলাম। এর একমাস পর আমি গৃহ ছাড়ি। গুরু বশিষ্ঠ এর সাথে আমরা চলে আসি সেই অনুশীলন পর্বতে। পর্বতের শিখরে অবস্থিত সেই অনুশীলনাগারে পৌঁছানোই রীতিমতো একটা অনুশীলন। সাত রাত, সাত দিন টানা হেঁটে, চড়ে অনুশীলনাগারে পৌঁছাই। সেখানে তোমরা আগে থেকেই অনুশীলনে রত।
একজন প্রচণ্ড জ্যোতির্ময় পুরুষ একটি খর্বকায় ভল্ল নিয়ে আমাদেরকে অনুশীলন দিতেন।
—’উনি দেবসেনাপতি কার্তিক। দেবতারা মানুষের উপর প্রতিরক্ষার দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন। কিন্তু মানুষের দ্বারা অসুরদের প্রতিহত করা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ছে দেখে তিনি নিজেই আমাদের অনুশীলন দিতে প্রস্তুত হয়েছিলেন।’ ধরিয়ে দিল ভব উরফ বিশেণ।
এরপর আরেকটি অংশ ছিল। সেটা আমার ঠিক মনে পড়ছে না। একটি কক্ষে আমাদের শরীরে কিছু পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল। তার সাথে কিছু অনুপান আমরা নিয়মিত সেবন করতাম।
সূক্ষ্মতা বা অণুজীববিদ্যা ধারণ করতেন যে রক্ষক, উহা সেই রক্ষের কর্মশাল ছিল। সেখানে আমাদের শারীরিক গঠনের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। যাতে করে সাধারণ আঘাতগুলিকে আমরা অতি সহজেই সহ্য করতে পারি। আমাদের রক্তক্ষরণ অনেকের থেকেই অনেক কম হয়। মনে করে দেখো আমাদের কিছু হত না। বিষের প্রতি একটা স্বাভাবিক প্রতিরোধ আমাদের শরীরের মধ্যেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন। রক্তে মেশা বিষ বা লালা রসে মেশা বিষ আমরা দুই এর ক্ষেত্রেই আমরা রোধক ছিলাম।
এরপর এল মনঃসন্ধির প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণ দ্বারা আমাদের মস্তিষ্ককে সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত করেছিলেন, যাতে করে বাইরে থেকে কোনো চালিকা-শক্তিই আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে না পারে। আমরা প্রভাবিত না হয়ে পড়ি কিংবা বিচলিত না হয়ে পড়ি যেকোনো পরিস্থিতিতেই নিজেদেরকে স্থির রাখতে পারি। তার সাথে সম্মোহন রোধ করতে পারি।
এরপর আমাদের চলল পদার্থ পরিচয়ের প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল বিভিন্ন অস্ত্রের ব্যবহারের জন্য। সময়ে অস্ত্র না পেলে কিভাবে আশেপাশে থাকা যেকোনো বস্তুকেই অস্ত্রে পরিণত করা যায় তার শিক্ষা, যেমন আমায় পারদর্শী করা হল শিকলের। এই শিকল লৌহের তৈরি। যে লৌহ অপরাপর লৌহকে আকর্ষণে সক্ষম। এছাড়াও আরও বিভিন্ন রকমের অস্ত্র ছিল। সেই অস্ত্র এবং তার সেই পদার্থগুলির পরিচয় থাকলে। আমরা সহজেই শত্রুকে বধ করতে পারতাম। যেমন হেন্তাল লাঠি। এই হেন্তাল যষ্টির সর্পকুল প্রচণ্ড ডরায় ফলে সর্প বাহিনীর সামনে ধনুক বা তরবারির চাইতে এই হেন্তাল যষ্টি নিয়ে দাঁড়ালেই সেখানে দুর্বল হয়ে পড়ত। লবণ দেওয়া জৌওকার মতো গুটিয়ে যেত।
তারপরে আমাদের শেখানো হল শব্দ নকল করা। অর্থাৎ শব্দ নকল করে ইঙ্গিত পাঠানো। পরস্পরকে নির্দেশ করা। এছাড়াও শব্দের দ্বারা বিভিন্ন পশুপক্ষীকে আহ্বান করা শেখানো হল। যেমন একটি নির্দিষ্ট শব্দ তরঙ্গের দ্বারা হস্তিবাহিনী আকর্ষণ করা যেত, বার্তা দেওয়া যেত। আর একটি শব্দের দ্বারা গরুড় অর্থাৎ চিলের বাহিনীকে আহ্বান করা যেত যুদ্ধক্ষেত্রে। মানুষের পক্ষে যা সম্ভব ছিল না তা এরা করত। সব শিক্ষায় আমাদের পাঁচজনকে দেয়া হল। পাঁচজন অর্থাৎ রাজা কুবলয়াশ্ব, সেনাপতি বিশেণ, সুশেন, বিষ্ণুসেন ও আমি উঘনি।
কারণ আমাদের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনাকে বাস্তব করতে গেলে আমাদের সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা বাঞ্ছনীয় ছিল। আর সেই পরিকল্পনা মাফিক পূর্ণশক্তিতে আক্রমন করে তবে এই দুর্ধর্ষ হারানো সম্ভব ছিল।
এইসব চিন্তাভাবনার মাঝে এই সহসা ওদের ঘর কেঁপে উঠল। যেন মনে হল কেউ যেন ওদের ঘরখানি ধরে ঝাঁকাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ কেটে যেতে লাগল সখি’র স্বপ্নের চেহারাগুলো। চোখের সামনে থেকে সবকিছু যেন একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে তার সামনের দৃশ্যপট। যুদ্ধের প্রাঙ্গণ।
চতুর্দিকে মৃতদেহের স্তূপ। গুরু বশিষ্ঠ বলছেন তাদের আবার পুনর্জন্ম হবে। তারা আবার ফিরে আসবে। যেদিন ধুন্ধু ফিরে আসবে তারা দুজনে মিলে খোঁজ করছে আধমরা রক্তাক্ত ধুন্ধুকে। গুরু বশিষ্ঠের সামনে আনা হয়েছে অন্ধককে। সেই জানে ধুন্ধু কোথায়। গুরু বশিষ্ঠ ও মনঃসন্ধি অন্ধকের মনে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে।
সহসাই অট্টহাস্য করে উঠল অন্ধক। পারবে না তোমরা কিছু পারবে না। তোমাদের যে উত্তরের প্রয়োজন সে উত্তর আমি দিয়ে দিচ্ছি। আবার ফিরে আসবে ধুন্ধুর প্রাণ। ওর ইচ্ছামৃত্যু বর ছিল। ব্রহ্মা দেবের বর পেয়েছিল। সেই অবশিষ্ট প্রাণকে আমি ভরে দিয়েছি আমাদের মূর্তির মধ্যে। একটি বীভৎস মূর্তির দিকে হাত তুলে দেখালো অন্ধক। এই মূর্তি যতবার জাগ্রত হবে ততবার ফিরে আসবে, তার সঙ্গে পুনর্জন্ম হবে। ওর মৃতদেহ না পেলে ওর সত্তাকে ফিরত পাঠাতে পারবে না। ও যে ষড়রিপু। আমারও আমি ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আসব। মানুষের লোভ ওকে ফিরিয়ে আনবে। তোমাদের ঈশ্বরের আসন কেড়ে নেব। ওর মৃতদেহ পাবে না। ওর ওর মৃতদেহের ঠিকানা আমার মস্তিষ্কের মধ্যে লুক্কায়িত আছে। আমার মস্তিষ্কে প্রবেশের ক্ষমতা তোমার নেই বশিষ্ঠ। তুমি ভুলে যাও না তোমার গুরু অর্থাৎ আমার পিতার সেরা ছাত্র ছিলাম আমি। আমার মস্তিষ্কে তুমি প্রবেশ করতে পারবে এত ক্ষমতা তোমার নেই। যুদ্ধে তুমি পেরেছিলে কিন্তু সেটা যুদ্ধ ছিল, সেখানে আমার মস্তিষ্ক ছড়ানো ছিল চতুর্দিকে। কিন্তু এখন তুমি পারবে না তার আগেই…. বলে একটি ছুরি বের করে নিজের বক্ষে আমূল বসিয়ে দিল অন্ধক। আর্তনাদ করে উঠলেন গুরু বশিষ্ঠ। সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে চিত্রপট। তারপরে হঠাৎ দেখা গেল একটি মন্দির। মন্দিরকে ঘিরে পঞ্চভুজের আকারে পাঁচটি বৃক্ষ। বৃক্ষগুলি দেখেই ওরা চিনতে পারল। পুরোপুরি ভেঙে গেল দৃশ্যপট। উঠে পড়ল। বিশেণ আমাদের কিন্তু যেতে হবে। মনে হচ্ছে এ পারিজাত বৃক্ষ রক্ষকরা আমাদেরকে বার্তা দিয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি বার্তা পাইনি তোমার মাদুলিতে কিছু লেখা আছে। বিশেণ ততক্ষণে মাদুলি পরে নিয়েছে তারা মাদুলিতে উত্তর-পূর্ব দিকে ইঙ্গিত দেয়া আছে। জানিনা হয়তো সেখানেই পারিজাত মন্দিরের রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর বাকি যোদ্ধাদের ও..
অন্যদিকে আরেক জাগরণ। শয়তানের অন্য সাথীরা
—’অতুল, বিকাশ তোমাকে কিছু বলার আছে? নিজেদের স্বপক্ষে কোন যুক্তি, কোনও কথা….’
—’দাঁড়ান মজুমদারদা ঘরের অপর আগন্তুক কথা বলে ওঠেন। আমার মনে হয় না কোন যুক্তিতে ওরা নিজেদের অপরাধ খণ্ডাতে পারে বলে। যদি আপনি অনুমতি দেন, আমি দুটো কথা বলতে চাই।’
—’হ্যাঁ, স্বচ্ছন্দে।’
‘তো অতুল, বিকাশ একটা কথা বল, আদালত চত্বরে বোমা ফেলার কারণটা কি?’
প্রথম কথা বলল বিকাশ। দাঁতে দাঁত চেপে ঘষে ঘষে বলল, ‘কারণ একটাই আমাদেরকে এটা বোঝাতে হবে যে বিপ্লবীরা সতীর্থ কালিকিঙ্কর বোসের মৃত্যুকে এই ভাবে চলে যেতে দেবে না। ফাঁসি আদেশের উল্টোপিঠে গোটা বাংলার বিপ্লবীরা গর্জে উঠবে একসাথে।’
এবার অতনু বলে উঠল, ‘তার সাথে এও জানা হবে যে ফাঁসী, মৃত্যু কোনও ভয় দিয়েই বিপ্লবীদের মনোভাবকে আটকে রাখা যাবে না। তাদেরকে রুখে দেয়া যাবেনা। ‘বন্দেমাতরম’।
—”হুম। সেই মর্মে তোমাদের কিছু ইস্তাহারও দেওয়া হয়েছিল। সেই ইস্তাহারগুলি তোমরা বোমা ফেলার সাথে সাথে বিলি করবে এবং সেই ইস্তাহারে এই কথাগুলি লেখা থাকবে। এ কথাগুলি জনগণ এবং ব্রিটিশ সরকারের কান অব্দি পৌঁছাবে তাইতো। হ্যাঁ তাহলে তোমাদের বোমে সাধারণ মানুষ মরে কি করে?”
—’আমরা বুঝতে পারিনি এই যে ঘটনাটা কিভাবে ঘটে গেছে। এটা দুর্ঘটনা মাত্র।’
এবারে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে উত্তেজিত চিৎকার করে উঠলেন প্রশ্নকর্তা ভদ্রলোক, ‘মিথ্যা কথা একেবারেই মিথ্যা কথা!’ আমার দু’চার জন সেসময় ওখানে উপস্থিত ছিল। না, তারা তোমাদের উপর নজর রাখার জন্য ওখানে ছিল না। বরং কোনো বিপদ হলে তোমাদের যাতে সাবধানে এসকর্ট করে বের করে আনা যায় সেই জন্য। তারা পরিষ্কার দেখেছে তোমরা সাধারণ জনগণের দিকে তাক করে বোমা মেরেছিলে। তাদেরকে মারতে চেয়েই বোমা মেরেছ। এর কোনো উত্তর জানা আছে তোমাদের?
আমরা দেশোদ্ধারের কাজে নেমেছি। আমরা যদি নিজের দেশবাসীকে এইভাবে হত্যা করি তাদের দেশ উদ্ধার হবে না উপরন্তু দেশবাসীর আমাদের উপর থেকে বিশ্বাস চলে যাবে। এই অনুশীলন সমিতির অপূরণীয় ক্ষতি করেছ তোমরা। সবচেয়ে বড়কথা নিরীহ মানুষদেরকে হত্যার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছে?
—’আমরা বুঝতে পারিনি আমাদের থেকে ভুল হয়ে গেছে। মুহূর্তের ভুলে…….’
”তোমাদের কিছু হয়নি। তোমরা হত্যালীলা চালানোর জন্যই এসেছো। এই ঘটনার পর ভালোভাবে তোমাদের অতীত নিয়ে খোঁজখবর করেছি এবং তাতে যা পেয়েছি তা যথেষ্ট সন্দেহজনক। তোমাদের পূর্ব ইতিহাস জেনে আমরা রীতিমতো ভয় পেয়েছি। সে সময় ডাকাবুকো ভলেন্টিয়ারের প্রয়োজন বলে নিয়েছিলাম।
মজুমদারদা আমি দুঃখিত, আপনার থেকে বড় ভুল হয়ে গেছে। এরা বড় খুনি। আপনি মানুষ চেনেননি।” বললেন সেই ভদ্রলোক।
এখন অনুশীলন সমিতির সবার ইচ্ছা একটাই এদেরকে শাস্তি দেয়া হোক। শুধু বহিষ্কার নয় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এটাই একমাত্র উপায় দলের ভাবমূর্তিকে স্বচ্ছ রাখার জন্য।
কানাই মজুমদার নীরবে ঘাড় নাড়লেন।
”বেশ, সবার আগে তোমরা তোমাদের অস্ত্র টেবিলের উপরে সমর্থন করো। তারপর তোমাদেরকে সাজা দেয়া হবে।”
কোমর থেকে পিস্তল দুটো বের করল অতুল আর বিকাশ। লজ্জায় অপমানে তাদের মাথা ঝুলে গেছে। সেই দেখে উপস্থিত সবারই মনে হয়তো মুহূর্তের জন্য একটু অনুগ্রহের বাষ্প জমে থাকবে। একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সবাই। আর সেইটুকু সুযোগেই প্রথম আঘাত হানল বিকাশ। জ্বলতে থাকা একমাত্র হ্যারিকেনটাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাল। দুবার খাবি খেয়ে নিভে গেল সেটা। তারপর শুরু হল এলোপাথাড়ি গুলি বৃষ্টি। উপস্থিত যারা ছিল তারা কেউ বুঝতে পারল না কি ঘটে চলেছে। পাঁচ মিনিটের মাথায় যখন টর্চ জ্বালল অতুল তখন সে আর বিকাশ ছাড়া ঘরের সবাই হয়ে রক্তাপ্লুত হয়ে পড়ে আছে। সারা ঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। উপস্থিত সাতজনের, চারজনই মারা গেছে। মজুমদারদা ছটফট করছিলেন একটু অক্সিজেনের জন্য। গুলিটা ফুসফুস ফুটো করে দিয়েছে।
এগিয়ে এসে মজুমদারের গলায় পা তুলে দিল অতুল। তারপর পকেট হাতড়ে বের করে নিল দেশলাইবাক্সটা। মিনিট দুই পরে দাউদাউ জ্বলে উঠল হোগলাচরের ভূতের বাড়িটা। নিভৃত, নির্জন অনুশীলন সমিতির গোপন ডেরায় গুলির আওয়াজ পুলিশের কাছে পৌঁছায়নি। সাধারণ গ্রামবাসী ছুটে এসেছিল অনেক অনেক পরে তখন কিছুই অবশিষ্ট নেই।
অতুল আর বিকাশ একই মায়ের দুই ভাই কিনা তা ওরা জানে না। কারণ চেহারায় মিল নেই তবে মনের মিল ষোলো আনা। যখন থেকে জ্ঞান হয়েছে এক বুড়োর কাছে ওরা থাকত। বুড়োটা ওদেরকে দিয়ে ক্ষেত-খামারে খাটাত। মন্দিরের বাইরে থেকে বসিয়ে রেখে ওদেরকে দিয়ে ভিক্ষা নেওয়া থেকে শুরু করে যতরকম কায়িকশ্রমের কাজ হয় সব করাতো। ওরা ছিল বুড়োর রোজগারের উপায়।
রাতের রান্নাটাও ওরাই করত। একদিন বুড়োর ভাতে আস্ত পিঁপড়ে পড়েছিল। বেদম মার জুটলো। দারুণ রাগ হল। দুজনে মিলে বুড়োকে বেঁধে পাথর দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে খুন করে মাঠের পাঁকে পুঁতে দিয়ে পালিয়ে এল। তবে খুনটা যে কেবল রাগের মাথায় করেছিল এমন বলা যায় না ওরা প্রতি রাত্রে কিছু অদ্ভুত স্বপ্ন দেখত।
প্রথম প্রথম বিকাশের মনে হত সে একাই দেখছে। তারপর একদিন মাঝরাতে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে উঠে বসে দেখে অতুলও উঠে বসেছে। জিজ্ঞাসা করতে, অতুল বর্ণনা দিয়েছিল। সেই একই স্বপ্ন। একই ছাঁছে একটু ওলট-পালট।
”একটা বিশাল বড় ক্ষেত্র। সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধ হচ্ছে। মানুষের চিৎকার করছে মানুষজনের হাহাকার আর্তচিৎকারে ভরে আছে পুরো জায়গাটা। আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর উড়ে এসে বিদ্ধ করছে তার আশেপাশের মানুষজনকে। সে দাঁড়িয়ে আছে একটা প্রকাণ্ড তার গদা হাতে। গদার আঘাতে ছিটকে পড়ছে তাকে আক্রমণ করতে আসা মানুষরা। মানুষ তার কাছে আসতে পারছে না। গদা দিয়ে পিষে মারছে তাদের। সে দেখছে মানুষকে মেরে সে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি উপলব্ধি করছে। এইভাবে পিষে পিষে মানুষ মারতে তার খুব ভালো লাগছে। এরপর স্বপ্নটা ভেঙে গিয়ে আরেকটা বুদবুদের মতো হালকা হালকা স্বপ্ন আসে। একের পর এক দৃশ্য ভেসে যায়। একটা অন্ধকার গুহা, সেখানে এরকম কিছু মানুষকে তারা বন্দি করে এনেছে। তাদের উপরে নানা ধরনের প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। অদ্ভুত দর্শন প্রক্রিয়ার ছবি দেওয়াল জুড়ে। বড় বড় ল্যাজাওলা প্রাণী, বিশালকার মনুষ্য সমান। তাদের সাথে সেই বন্দি মানুষের সঙ্গম করানো হচ্ছে। গুহা ভরে যাচ্ছে সেই সঙ্গমজাত শিশুদের জন্মচিৎকারে। আকাশের বজ্রকে বন্দি করে নিজের হাতের মুঠোয় এনে সেই দিয়ে তাদের উপরে চালানো হচ্ছে মায়া। একবার লাল হয়ে যাচ্ছে গুহার বাইরের আকাশ, পরবর্তীতে আকাশ শ্যাওলা রঙে ভরে যাচ্ছে।
ইঁদুররা উঠে আসছে মাটির তলা থেকে, মানুষের ক্ষেত-খামার সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে। ফসলের গোলা, গুদামঘর সবকিছু শেষ করে দিচ্ছে। মানুষ চিৎকার করছে, হাহাকার করছে, কাঁদছে। তখনই মাটির তলা থেকে উঠে আসা কিছু রাক্ষুসে পিঁপড়ের দল। রাক্ষুসে পিঁপড়েগুলো মানুষগুলোকে কামড়ে কামড়ে খেতে থাকে। মানুষ ঘরের দরজা বন্ধ করতে চায় কিন্তু পারে না। তার আগেই সে রাক্ষসের দল তাদেরকে শেষ করে দেয়। ও বুঝতে পারে, এতক্ষণ যা দেখছিল তা পাতাল। মাটির তলা থেকে উঠে এসেছে এই সব প্রাণীদের দল। তাহলে সেই অন্ধকার গুহা বলে যারা ভেবেছিল সেটা আর কিছু নয় সেটাও পাতাল। কিছু মনে পড়ে…..
একটা অদ্ভুত দর্শন মূর্তি। একজন বলশালী লোক সেই মূর্তির মধ্যে পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আর তার পাশে আরও একজন কেউ। যাকে দেখা যায়না কেমন কালচে ঝলসানো চেহারা।
আদেশ দিচ্ছে, জয় করাতে হবে। সেই মূর্তিটাকে সবাইকে দিয়ে পুজো করাতে হবে। ওটাকেই স্থায়ী করতে হবে। তারপর হঠাৎ করেই যুদ্ধ বাধে। আক্রমণ হয় প্রচণ্ড। ভীষণ বিরোধ। আবার সেই যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানেও সবাইকে হারিয়ে দিচ্ছিল। সেখানে এবার একজন মানুষ আসেন। সমস্ত মানুষকে আড়াল করেন। তার হাতে বেতের সাধারণ একটি ধনুক। টংকার মারেন, পালিয়ে যায় পিপড়ে, ইঁদুর, কীটের দল। চিলের দল টংকার শুনে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের অনুগত কীটের দলের ওপর। মানুষটা ধনুকে তীর জোতে। তীব্র আলোকচ্ছটা বেরিয়ে আসে, সেই আলো সহ্য করতে পারে না। তারপর আর কিছু মনে আসে না। তবে কী সে মারা গেছিল। এখানে ঘুমটা ভেঙে যায়। প্রচণ্ড ঘামে ভিজে উঠে আসে আর তারপরেই মানুষ খুন করতে প্রচণ্ড ইচ্ছা জাগে। এই একই স্বপ্ন দেখতো এভাবেই মানুষকে খুন করার এক অদ্ভুত ইচ্ছে জাগতো।”
দুজনে মিলে গ্রামে শহরে অনেক মানুষ খুন করেছে। সে সময় কেউ কোনো খোঁজখবর রাখতে না। নিভৃতে পথচারীদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাদের মুখ চেপে ধরে একটু একটু করে শ্বাসরোধ করে মেরেছে। ছোট বাচ্চাদেরকে মা দোলায় শুইয়ে পুকুরঘাটে গেছে। তাদেরকে তুলে এনেছে। এরকম অনেক অনেক হত্যা করেছে। মারতে ওদের ভালো ভালো লাগে। কিন্তু শেষবার বিপদে পড়ে গেল সেই সাহেবটিকে যখন ওরা মারলো। ওরা ভাবতে পারিনি যে সাহেবটাকে মারার পরে এত বেশি শোরগোল পড়ে যাবে।
সে রাতে খড়মপুরের ক্লাব থেকে ফেরার সময় এক ব্রিটিশ পরিবার রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ছিল, মেরামতের জন্য। ওরা তিনদিন ধরে ওই রাস্তার ধারেই এক ভিখারির ছেড়ে যাওয়া গুমটিতে ডেরা বেঁধেছিল।
এই ভিখারিটিকে ও কদিন আগে ওরাই মেরেছে। তারপর ওই ভিখারির পাতার কুটিতেই ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল। গ্রামের দেহাতি মানুষদের এ নিয়ে এত মাথা ঘামাতোনা আর তা ছাড়া বাঙড়ের পাঁকে পোঁতা খণ্ড খণ্ড লাশটা খুঁজেই পাওয়া যায়নি।
তো যাই হোক সে ব্রিটিশ পরিবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি মেরামতের ব্যবস্থা করছিল। একদিকের চাকা গর্তে পড়ে একটু গাড়িটা বসে গেছিল। প্রাণপণে বাইরে থেকে ঠেলে চালক আর দেহরক্ষী যখন গাড়িটাকে তোলার ব্যবস্থা করছিল। তখন অন্য দিকে দুইজোড়া চোখ লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল গাড়ির সেই চারজন মানুষের দিকে।
বাকিটা ছিল সময় অপেক্ষা। ওরা দেখেছে মানুষ মারার সময় আসুরিক শক্তি ভর করে ওদের ওপর। অদ্ভুত, যেন যোদ্ধার ক্ষিপ্রতা! গুলি চালিয়ে ছিল সাহেবের রক্ষী, সাহেব নিজে গুলি চালালেন কিন্তু কি অনায়াসে কাটিয়ে গেল ওরা! নিজেরাই মাঝেমধ্যে চমকে যায়। তবে গুলি, গাড়ির বারংবার ভোঁ-তে সচকিত হয়ে যায় গ্রামবাসী। ফলে দেহ গুলির ব্যবস্থা করতে পারার আগেই তারা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এই ঘটনায় সাড়া পড়ে যায় গোটা শহরে। যে বা যারা এই মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদেরকে ধরার জন্য হুলিয়া জারি হয়ে যায়। তারা কতকটা চিহ্নিতও হয়ে যায়। তাদেরকে বহুলোক চেনে, গত কয়েকদিন যাবৎ দেখেছে। ভিখারির বেপাত্তা হওয়া এবার খটকা জাগায়।
বাধ্য হয়ে ওরা পালিয়ে আসে। কানাই মজুমদারের চরেরা ওদের খুঁজে নেয়। ওরা একটা নতুন গল্প শোনায় অনুশীলন সমিতির লোকজনকে। এদিকে যে ব্রিটিশ ভদ্রলোক খুন হয়েছিলেন তিনি ছিলেন একজন অত্যাচারী পুলিশ সুপার। বিপ্লবীরাও বহুদিন তাকে মারার চেষ্টা করছিল।
বিকাশ, অতুল নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া অত্যাচারের মিথ্যা গল্প বানায়, বুদ্ধি করে দুয়ে দুয়ে চার করে দেয়। খুব সহজেই অনুশীলন সমিতিতে ভলিন্টিয়ার হয়ে চলে আসে। আসল কথা হল ছদ্মবেশের প্রয়োজন ছিল। এরপর বেশ চলছিল কয়েকমাস। কিন্তু সেদিন বোমা হাতে পাওয়ার পর মানুষ মারার লোভটা আবার জাগ্রত হয়ে ওঠে। রাত্রিবেলা আবার স্বপ্ন দেখে এবং তারপর এই।
তবে সেদিন রাত্রিবেলা যে স্বপ্নটা দেখিয়েছিল স্বপ্নটা অন্যদিনের মতো নয়। সব মনে পড়েছিল। কী কারণে, কীসের জন্য ওদের জন্ম। ওদের এই জন্মের কারণ কী? সমস্তটাই মনে পড়েছিল সেদিন। যুদ্ধক্ষেত্রে ওদের সাথে যে অন্যায় হয়েছিল সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই ওদের জন্ম। আবার প্রতিষ্ঠা করতে হবে সেই তমসাকে। এই দেশেরই কোন এক প্রান্তে জন্ম হয়েছে অন্ধকের। সেই ঈঙ্গিত স্পষ্ট। অন্ধক’কে খুঁজে বার করতে হবে। শুরু করতে হবে পরিকল্পনা। অসুরগুরুর নির্দেশ অনুযায়ী অন্ধকেরই এই মূর্তিটিকে খুঁজে পাওয়ার কথা। সেই মূর্তির মধ্যেই ধুন্ধুকে আটকে দিয়েছিল দেবতারা চিরতরে। রাজা ধুন্ধুকে উন্মুক্ত করতে হবে। ছাড়াতে হবে মায়ার জট। মায়া, জাদুর জট ছাড়িয়ে বুদ্ধু ফিরে এলেই আবার চরাচর ছেয়ে যাবে সেই অন্ধকারে। তারপর নষ্ট করতে হবে সেই পারিজাত বৃক্ষ। তাহলে অস্ত্রের সম্ভাবনাও চিরতরে নির্মূল হয়ে যাবে। দেবতার দিন শেষ হবে, শুরু হবে অসুরের দিন। অসুরের দিন মানে-ই রাত।
তাই যদি হয় তাহলে তো ওদের জন্ম হয়ে গেছে কারণ নিদর্শ তাই বলছে। আকাশের দক্ষিণ কোণে বরাবর আড়াআড়ি বজ্রপাত এবং সেই বজ্রপাতের কারণে তিনটি বৃক্ষে একইসাথে আগুন ধরে যাওয়া সাধারণের কাছে বিস্ময়। কিন্তু তারা জানে এ ধুন্ধুর শক্তি, মায়া ক্রমশ গ্রন্থিমুক্ত হাওয়ার নিদর্শ। চিন্তা একটাও তাই যদি হয় তাহলে রক্ষসন্ধির কাছেও এই বার্তা পৌঁছে গেছে এবং রক্ষসন্ধির কাছে যদি খবর পৌঁছে গিয়ে থাকে তাহলে সেই যোদ্ধারাও জাগরুক হয়ে গেছে। অন্তত রক্ষসন্ধি, পারিজাত রক্ষকরা আপ্রাণ চেষ্টা করবে তাদেরকে আটকানোর। সেই যোদ্ধাদের জাগরুক করবার। যা করবার তাড়াতাড়ি করতে হবে। অন্ধককে খুঁজতে হবে।
