অন্ধকের পরিকল্পনা
উপরের ঘরে ধ্যানে মগ্ন মোহন রায়চৌধুরী উরফ অন্ধক। শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করতে হবে। শক্তি বিকিরণ শুরু করেছে ধুন্ধু। মূর্তি কাটিয়ে খুব শীঘ্রই বেরিয়ে আসবে সে। তার আগে পারিজাত বৃক্ষ নির্মূল করতে হবে। করিৎ ও মরিৎ এলে তিনজনের শক্তি কেন্দ্রীভূত করে পাতালের গভীর হতে তাদের সেনাদের ডাকা যেতে পারে। পারিজাত রক্ষক বা এই যোদ্ধাদের বাধতে গেলে সেই সব শক্তির বড় প্রয়োজন। মায়ার সাথে মায়ারই লড়াই হয়। সেই ব্যবস্থা করতে হবে আগে। পারিজাত ও পঞ্চবাণের অস্তিত্ব নির্মূল না হওয়া অবধি ধুন্ধুকে জাগানোর চেষ্টা করা যাবে না।
এই গ্রামে তার ক্ষেত্র প্রস্তুত। ঘরে ঘরে বীজ বপন করেছে। কদিন বাদেই জন্মাবে তারা। এই গ্রামের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে আলাদা আলাদা করে বিষ প্রবেশ করিয়েছে। সেই বিষের ক্রিয়া শুরু হলে এরা নিজেদের মধ্যে হানাহানি শুরু করবে। সে ইন্ধন জুগিয়ে যাবে যাতে সমস্ত পুরুষরা মারা যায়। পুরুষশূন্য এ গ্রামে জন্মাবে তার সন্তানরা। ঘরে ঘরে প্রতিষ্ঠা হবে মূর্তির। সৈনিক হবে তার।
তারপর আস্তে আস্তে আরও অভ্যুত্থান। জাত-পাত, দ্বন্দ্ব, হিংসার বিষ ছড়াবে তারা। সন্তান, তার সেনানীরা। মানুষের মন গ্রাস করবে। ধুন্ধুর মায়ায় মারী হবে, যুদ্ধ হবে, ভূমিকম্প হবে। অসহায় মানুষের ঈশ্বর হতে ভরসা উঠবে। তারা প্রতিষ্ঠা পাবে। সব ধ্বংস করে এক নতুন পৃথিবী হবে। সেটা মনুর নয় অন্ধকের। ধুন্ধু হবে মূর্তি সেই-ই শক্তি।
ওই তো আসছে করিৎ ও মরিৎ। আনন্দে কামকেলির ইচ্ছা জাগছে আবার।
ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বের এই প্রান্তিক গ্রামটির কথা কেউ জানে না। গোটা গ্রামটা দিনের বেলাতেও এতই শান্ত যেন ঘুমিয়ে থাকে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নিটোল গ্রাম। অল্পসংখ্যক এ কিছু মানুষ থাকেন এই গ্রামে। নারী অতি সামান্য, পুরুষের আধিক্য বেশি। তারাও সারাদিন নিজেদের মতো ঘরের মধ্যে পঠনপাঠন, হস্ত শিল্প, সংসার পালন ইত্যাদি কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন। বাইরে বাইর হতে খুব একটা দেখা যায় না। অল্প ফসলের জোগান হয় তাই দিয়েই তারা চালিয়ে নেন। স্ব-আবাদি ফসল, পাহাড়ি নদীর মাছ এতেই তাদের জীবন নির্ধারণ হয়ে যায়। নিভৃত নির্জন গ্রামে সরকার বাহাদুরের লোকজনের ও সেরকম আসা দরকার পড়েনা। কোনো ব্যবসায়ীও এই গ্রামে আসেন না কারণ দু-একবার তারা এসে দেখেছে গ্রামের মানুষের মধ্যে বিকিকিনির কোনো রকম ইচ্ছাই নেই। এরকম নির্লিপ্ত মানুষের কাছে ব্যবসায়ীদের এসে কোনো শান্তি হয় না। তারা গ্রামে ঢুকতে কখনো কাউকে বাধা দেয়নি কিন্তু নিজেরা অসম্ভব নিলিপ্ত প্রকৃতির। তাই আস্তে আস্তে গ্রামটাকে সবাই দূরে থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু যতটা শান্ত ভাবা হয় ততটা শান্ত না। নিয়মিত শস্ত্রাভ্যাস করে গ্রামের প্রতিটি মানুষ। এই গ্রামে প্রত্যেকটি মানুষ নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখে এক শান্ত ছদ্মবেশের আড়ালে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই প্রক্রিয়াটি পালন করে। তাই অযথা ঝামেলায় জড়িয়ে, মানুষকে বাধা দিয়ে তাদের কৌতূহলের উদ্রেক করতে চায় না। একেবারেই সাধারণ একটি গ্রাম হিসেবে নিজেদেরকে মানুষের আকর্ষণের বাইরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। সুদীর্ঘ সময় কঠিন অনুশাসন এবং সংযমের দ্বারাই সক্ষম হয়েছে।
গ্রামটির গৃহ সন্নিবেশ বৃত্তাকার। চারদিকে চিংসুরার কন্টকগুল্মের অল্পউঁচু বেড়া দিয়ে ঘেরা। এই বৃত্তাকার গৃহ সন্নিবেশের উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম প্রান্তে চারটি কুঁড়ে আছে। অন্যান্য গৃহগুলির মতো একই রকম। চারজন বৃদ্ধ মানুষ বাস করেন ওই চারটি কুঁড়েতে। এই বৃদ্ধরাই গ্রামের মাথা। গ্রামের মানুষের আচার-ব্যবহার, বিধি-নিষেধ, রীতিনীতি সবকিছু তাঁদের দ্বারাই নির্ধারিত হয়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তারা তাদের মৌনী ভঙ্গ করেন না বিগত কয়েক হাজার বছরে প্রায় কয়েক সহস্র বৃদ্ধ চক্রাকারে এই গ্রামের মাথা হয়েছেন। কিন্তু কথা বলেছেন অতি সামান্য। এমনও দেখা গেছে একজন বৃদ্ধ গ্রামের মাথা হয়েছেন ও তৎপরবর্তীতে ত্রিশ বছর আয়ুষ্কাল অতিবাহিত করেছেন অথচ একটিও কথা বলেননি। ওঁদেরকে বাহির হতে ও গ্রামের লোকজন খুব একটা দেখে না। ঘরের ভেতর থেকেই ওঁরা নির্দেশ দেন। মাটিতে আঁক কেটে নির্দেশ বোঝান। এই প্রথম তাদের জরুরি সমাবেশ আহ্বান করা হয়েছে।
চারজন এই উপস্থিত রয়েছেন সেই ঘরটাতে। ঘরের একটু বর্ণনা দেয়া দরকার। যে চারটি ঘরের কথা বলা হল ওই চারটি ঘরের তলা থেকে সুড়ঙ্গ খনন করা আছে। চারদিক থেকে সুড়ঙ্গ কেটে চারটি সুড়ঙ্গ যে কেন্দ্র বিন্দুতে মিলিত হয়েছে সেখানেই ওই অর্ধবৃত্তের কেন্দ্র। সেখান থেকে ছড়িয়েছে প্রাঙ্গণ। অনেকটা অর্ধবৃত্তাকার বাটির আকৃতি।
এই প্রাঙ্গণ ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে। এর সুবিশাল প্রাঙ্গণে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে পরস্পরের মুখোমুখি কয়েকটি স্ফটিক দ্বারা। কয়েকটি বিশেষ গর্ত দ্বারা এই অংশে সূর্যালোক প্রবেশ করে এবং সেই সূর্যালোককে স্ফটিকে প্রতিফলিত করে পুরো প্রাঙ্গণকে আলোকিত করা হয়েছে।
চতুর্পাশে মোটা মোটা কাঠের গুড়ি, বাতা ও মাটি, পাথরের সাহায্যে দেওয়াল বানিয়ে তার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে, যাতে উপরের মাটি ধ্বসে পড়ে না যায়। এক কথায় বলতে গেলে এই গ্রামের উদরে প্রায় সম্পূর্ণ আর একটি গ্রাম বসবাস করছে। সেই বৃহৎ প্রাঙ্গণের মধ্যে ক্ষুদ্র প্রাঙ্গণ।
একদিকে অন্দরসজ্জা দেখলেই বুঝতে পারা যায়, যে এখানে অস্ত্রশিক্ষা করা হয়। খড়ের পুতুল, শরভ্যাসের খড়ের সজ্জা, দেওয়ালে থরে থরে সাজানো অস্ত্রের সম্ভার তাকেই আরও স্থির করে। আরেক দিকে একটি বেদী আকৃতির স্থান, সম্ভবত এখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা হয়। কারণ চারটি বেদী ও তার চারপাশে ছোট ছোট আসনগুলো অনেকটা মন্ত্রণালয়ের চেহারা দিচ্ছে। এখন সেই মন্ত্রণাকক্ষে চারজন বৃদ্ধ মানুষ এবং গ্রামের অন্য পুরুষেরা এসে জড়ো হয়েছেন। মহিলারা এবং শিশুরা যথারীতি উপরে কাজ করছে, খেলাধুলা করছে। দু’চারজন পুরুষ ক্ষেতেও রয়েছেন, কয়ে জন পশুচারণেও এ ব্যস্ত রয়েছেন। উপর থেকে দেখলে খুব স্বাভাবিক পরিবেশ। অথচ নীচে সবার অলক্ষ্যে সম্পূর্ণ অন্য আরেকটি পরিবেশ পরিবেশ, সাধারণের দৃষ্টিসীমার বাইরে।
সামনের বৃদ্ধটি প্রথম কথা বলে উঠলেন, ‘গুরু বশিষ্ঠ এবং ইন্দ্রদেবের নির্দেশ অনুসারে আমরা এখানে পারিজাত রক্ষক হয়ে অবস্থান করছি। সামনের গভীর বনানীর মধ্যে পাঁচটি পারিজাত বৃক্ষ অবস্থান করছে। পারিজাত বৃক্ষকে এমন ছদ্মবেশ হয়েছে যে সাধারণ চন্দন বৃক্ষের সাথে তার কোনো ভেদ নেই। কেউ বুঝতেও পারবে না। পারিজাতে যে ফুল ধরে, যে ফল হয় তা সাধারণ মানুষের কাছে অদৃশ্য করে রাখলেও তেমন শক্তির কাছে খুব সহজেই ধরা পড়ে যাবে। এছাড়াও আমাদের কাজ হল ভারসাম্য ও সমতা চতুর্দিকে বজায় রেখে চলা।
কোথাও সামান্য ত্রুটি চোখে পড়লেই সেটা জানানো। নয়জন রক্ষসন্ধি নয়জ্ঞান নিয়ে নয়দিকে ছড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষার কাজ করে চলেছেন আর একদিকে খোদ আমরা। সময়ে একে অপরকে সাহায্য করা প্রয়োজনে। পরস্পরের সাথে অস্ত্র ধরতে হবে। আপনাদেরকে জানানো হয়নি আমাদের মধ্যে ভারুক আর ফিরে আসবে না।
উপস্থিত জনতার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। এবার দ্বিতীয় বৃদ্ধ হাত তোলেন। জনতার গুঞ্জন থেমে যায়। কিছুকাল পূর্বে আমরা গণনায় দেখতে পাই যে, ‘অসুরদের একে একে পুনর্জন্ম পুনর্জাগরণ হচ্ছে। এর আগেও এমন হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষরা তাদের গ্রন্থে লিখেছেন কিন্তু সে সময়ে অন্ধক ফিরে এলেও সেরকম শক্তিশালী হতে পারেননি। কিন্তু এবার তার জন্ম লগ্ন গ্রহ নক্ষত্র তাকে এমন একটি বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন যে সে এক কথায় অপ্রতিরোধ্য। ধুন্ধুকে সে ফিরিয়ে আনবে। শুধু তাই নয় গণনায় আমরা এও দেখতে পেয়েছি ধুন্ধুর শক্তিশালী অসুর সহচর দ্বয়ের পুনর্জাগরণ হচ্ছে। তাই ভারুককে গোপনে পাঠানো হয়েছিল রক্ষসন্ধির কাছে। কিন্তু এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আগেই পথিমধ্যেই তার মৃত্যু হয়। অন্ধকের সাথে তার সংঘর্ষ হয়েছিল সেই সংঘর্ষে সে মারা যায়। তাই আমাদের সবাইকে সাবধান হতে হবে আমাদের মিলন মন্দির কে জাগ্রত করতে হবে, যাতে মিলন মন্দিরের চ্ছটা সেই যোদ্ধাদের উপলব্ধি গোচর হয়।
আবার গুঞ্জন শুরু হয়, ‘তবে কি যোদ্ধারা…..’
—’হ্যাঁ যোদ্ধাদের পুনর্জন্ম হয়েছে। তাদের উপলব্ধির পুনর্জাগরণ হয়েছে। রক্ষ সন্ধি মূল যোদ্ধাকে খুঁজে পেয়েছেন, এতটুকু আমরা জানতে পেরেছি। বাকি যোদ্ধারা মিলিত হলেই তারা মন্দিরে আসবেন সেখানেই আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনা নির্ধারিত হবে।’
মিলন মন্দিরকে জাগ্রত করে আমাদেরকে বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। মনে রেখো আজ থেকে তিন দিন পরে আমরা যজ্ঞে বসব। সবার মনাহুতি দেয়া মাত্রই ঈশান কোণে, কয়েক মুহূর্তের জন্য সেই পথদিশাটি ফুটে উঠবে। অগ্নিদেবের শরে সে নির্দেশ থাকবে। ওঁরা সেই মানচিত্র লক্ষ্য করেই এখানে আসবেন কিন্তু এই পথনির্দেশ ফুটে ওঠা মানেই আমরা প্রকাশ হয়ে যাওয়া। যোদ্ধা, রক্ষসন্ধি, অসুর সবাই ইহা পড়তে পারবেন। তাই আমাদেরকে সাবধানে থাকতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে। আক্রমণ যেকোনো মুহূর্তে হতে পারে। আমরা বিগত সহস্র বছরে এই প্রথম নিজেদেরকে ছদ্মবেশের বাইরে বের করছি।
