পারিজাত মন্দির পথে
কুশেদের কথা
চার দিন হয়ে গেল তারা হাঁটছে। কোথায় গিয়ে যে তারা মিলিত হবে, কে জানে? মন্দিরের সঠিক পথনির্দেশ রক্ষসন্ধি জানেননা। অনুমান করতে পারেন মাত্র। আসলে এসবই সাবধানতা, কোনো রক্ষসন্ধি যদি পথের নির্দেশ সমেত ধরা পড়ে যান তাহলে বিপদের সম্ভাবনা সমূহ। জ্ঞানী ব্যক্তির পক্ষে তাদেরকে চিনে নেওয়া খুবই সহজ। কারণ তাদের হাতে আঁকা আছে যক্ষের দংশন চিহ্ন, তারা সেই চিহ্ন বংশ পরম্পরায় আজীবন বয়ে নিয়ে চলে।
এই পথের দিশা যে কিভাবে পাবে তাও বুঝতে পারছে না। যতটুকু মনে পড়ছে গুরু বশিষ্ঠ যা বলেছিলেন তাতে করে পথের দিশা পারিজাত রক্ষকদেরই দেওয়া উচিত।
সেদিন সন্ধ্যায় ওদের গৃহে বসে ঠাকুমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল কুশ। মা হারা কুশকে ঠাকুমাই বড় করেছে। ওকে ছাড়তে, ওর সত্যিটা মেনে নিতে তাঁর বড় কষ্ট হচ্ছিল। ঠাকুমার কোলে মাথা রেখে আস্তে আস্তে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎই দমকা হাওয়ায় উড়ে হাওয়ায় ভেসে আসে এক স্বর্গীয় সৌরভ। এমন অপূর্ব গন্ধ সে আগে পায়নি। রক্ষসন্ধি ঘরের ভিতর থেকে ধ্যান ভেঙে উঠে এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন এ আর কিছু নয় এ নিশ্চয়ই পারিজাত ফুলের সৌরভ। হতে পারে এই পারিজাত ফুলের সৌরভ দিয়েই তাদেরকে ইঙ্গিত দিচ্ছেন পারিজাত রক্ষকরা। তাদেরকে পথদিশা দিচ্ছেন।
তারপর থেকে পারিজাত ফুলের গন্ধ নিতে নিতে তারা এত দূরে এসেছে। মাঝে মাঝেই কখনো সন্ধ্যার দিকে, কখনো দুপুরের দিকে তারাই পারিজাত ফুলের গন্ধ পায়। সেই গন্ধ অনুসরণ করে তারা পথ চলে।
এই দ্বিপ্রহরে গাছের তলায় বসে বসে একে একে সবই মনে পড়ছে কুশের। আর যতই মনে করছে ততই যন্ত্রণা, কষ্ট আর রাগ একই সাথে খেলা করে যাচ্ছে মনের ভেতর। একবার তার ঠাকুমার কথা মনে পড়ে তো একবার কুবলয়াশ্ব জন্মের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কীভাবে তার সন্তানদেরকে হত্যা করেছিল। মনে পড়ে কীভাবে তার প্রজাদেরকে একটু একটু করে করে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিত। তাদের গৃহের দীপ, নৈবেদ্য বন্ধ করে দেবতাদের বিপাকে ফেলতো। আর অন্ধক তো সাক্ষাৎ পাপ। মানুষের মনকে বিষিয়ে, ভালো-মন্দ, দ্বিধাদ্বন্দ্বের ধন্দ তৈরি করে দখল নিত মনের। ধুন্ধুকে সামনে রাখত। ধুন্ধুকে অপ্রতিরোধ্য তৈরি করেছিল সেই। একশ্রেণির মানুষ ঈশ্বর ভুলে তাকেই, তার সেই কদর্য মূর্তিটাকেই ঈশ্বর ভেবে নিয়েছিল। ছিঃ ছিঃ, নিজের অজান্তেই মুঠো শক্ত হল তরবারির বাঁটের ওপর। না অনুশীলন না করলে এই অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবেনা। যোদ্ধা জীবনের নিয়মানুবর্তিতা যে কতখানি প্রয়োজন তা আজকে এসে অস্থিমজ্জায় অনুভব করছে। এই জন্মে একেবারেই কাঁচামাটির পাত্রা হয়ে জন্মেছিল তাই এতটা যন্ত্রণা। স্মৃতি পুনরুদ্ধার হয়েছে। সেই সাথে তার পুরনো কৌশল কিছুটা হলেও সে ফিরে পেয়েছে ঠিকই কিন্তু সেদিন সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে সে বুঝেছে তার মধ্যে এখন যে পরিমাণ ক্ষমতা আছে তা দিয়ে আর যাই হোক আবার ‘ধুন্ধুমার’ হওয়া যাবে না।
সেখানে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল ছিল না। যখন ঘুম ভাঙল তখন সেই গাছ তলাতেই রক্ষ সন্ধি ধুনি জ্বালিয়েছে। শ্মশানের সাঁইদার সাধকের বেশেই ঘুরে বেড়াতেন। ধুনি তার সাথে সব সময় থাকে। আজ আর গন্ধ পায়নি পারিজাত ফুলের তাই আপাতত এখানেই রাত্রি বাস। একটানা পথ চলায় শরীরও ক্লান্ত। পার্শ্ববর্তী দীঘিটাতে হাত-মুখ ধুতে গিয়েই বিষয়টা টের পেল। তাদের আমগাছ থেকে বেশ কিছুটা দূরে আরেকটি গাছের তলায় অন্ধকারে কেউ নাড়াচাড়া করছে।
নিমেষে সজাগ হয়ে গেল কুশের ইন্দ্রিয়গুলি। খড়মটা খুলে রেখে তরবারির বাঁটে হাত রাখল। আর ঠিক তখনি তার কাঁধে হাত রাখলেন কালিকা ভট্টাচার্য। তরবারির ফলা উজ্জ্বল। অতি সহজেই তার ঝলক দূর থেকেও দৃশ্যমান হবে। সচেতন করে দেবে শত্রুকে। তাই তরবারি নেওয়া যাবে না। বদলে তার আঠাকাণ্ডের কালো লাঠিখানা তুলে দিলেন কুশের হাতে। সেখানা বাগিয়ে ধরে এগিয়ে চলল দুজনে। আগে কুশ পিছনে প্রায় তার পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে রক্ষসন্ধি। হাতে খাপবদ্ধ কিরিচ, যদি অন্য কোনো দিক থেকে আক্রমণ আসে তাহলে সেটা কে প্রতিহত করা যাতে যায় তাই এই ব্যবস্থা।
সেই গাছ তলায় দুজন নরনারী এলিয়ে বসে আছে। সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছে। মশকের দরুন ঘুমের ঘোরেই হাত পা চালাচ্ছে। সেই নড়াচড়াই দেখেছিল ওরা। ভালোভাবে নিরীক্ষণ করে নিয়ে, ধাক্কা দিতে যাওয়ার আগেই পুরুষটি সজাগ হয়ে উঠলো। ঝটতি কোমর থেকে তরবারি বের করে চেপে ধরল ঝুঁকে আসা কুশের গলায়। কুশের লাঠিও প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় বেঁকে গেল পুরুষটির মাথা লক্ষ্য করে। লাঠিটি গুপ্ত অস্ত্র বলে জানা ছিলনা তার, আলগোছে চাপ পড়ে তার আধ হাত ফলাটিও বেরিয়ে এসেছে।
উল্টোদিকে, তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠল নারীটি। তার হাতে একখানি সরু ধাতব দণ্ড উঠে এসেছে। কুশকে আঘাত করার আগেই অন্ধকার থেকে রক্ষ সন্ধির কিরিচ ধরা হাত তার কণ্ঠ স্পর্শ করল। এমতাবস্থায় তারা কতক্ষণ থাকতে বলা যায়না হঠাৎই আকাশের একটা অগ্নি রেখা দেখা গেল। যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। সেই অগ্নিশিখা এঁকেবেঁকে তীরের মতো মিলিয়ে গেল। তারপর একটি পাঁচকোণা মন্দিরের অবয়ব ফুটে উঠল। যেন একখানা মন্দির আকাশে ভাসছে। মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল সেটা। পুরো আকাশ ভরে উঠল অদ্ভুত আলোকচ্ছটায়, যেন সহস্র রামধনু আকাশের বুকে খেলা করে যাচ্ছে। সে দৃশ্য দেখে হাতের অস্ত্র সরিয়ে প্রণাম করলেন রক্ষ সন্ধি। তাঁর সময়ের, অবস্থানের কথা ভুলে গেছেন। অবশ্য অগ্নিদেবের এই প্রকাশ সবাইকে স্থবির করে দেয়। উপস্থিত সবার হাতেই অস্ত্র ততক্ষণে শিথিল হয়ে খসে পড়েছে।
***
পরস্পরকে চিনে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগেনি। একযোগে সবাই অগ্নিদেবকে প্রণাম করতেই সবার পরিচয়টা সবার সামনে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।
অগ্নিদেবের প্রকাশে ভব’র কপালের লাল জড়ুল জ্বলজ্বল করে উঠেছিল। যেমন বিশেণের ছিল। কুশের চারিপাশে একটা অদ্ভুত জ্যোতির্বলয় তৈরি হয়েছিল। সেগুলি তাদেরকে চিহ্নিত করে দিয়েছিল। আর রক্ষ সন্ধির অবয়ব আলোয় দৃশ্যমান হতেই তার হাতের সেই দাগটি তাকে ছিনিয়ে দিয়েছিল।
ধুনির আগুনের সামনে বসে আছে চারজন। জানে না বাকিদের পুনর্জন্ম হয়েছে কিনা কিংবা তারা হয়তো পারিজাত রক্ষকদের গ্রামেই অবস্থান করছেন। এখনো জানা যায়নি কিছুই। আপাতত এখানে বসেই রক্ষক সন্ধির কাছ থেকে পুরো বিষয়টা জেনে নিতে চাইছিল ভব আর সখি। অন্ধকের ফিরে আসা। তাদেরই পুনর্জন্ম তাদেরকে বেশ কৌতূহলী করছিল। নতুন করে কীভাবে ফিরে এলেন তিনি, সময় বলে অন্ধক বারে বারে ফিরে আসে এবং প্রত্যেকবার নিজের স্মৃতি নিয়েই ফিরে আসে। কিন্তু ঘুম থেকে জাগানোর ক্ষমতা তার এতো জন্মে কখনোই হইনি। কারণ সে অন্যান্য অন্ধকার বা তামসিক শক্তির আধারগুলোকে সেসময় জাগাতে পারে না। এইবারে প্রাকৃতিক নিয়মেই কেন জানি না সেই তামসিক শক্তিগুলো আপনা হতেই জেগে গেছে। ধুন্ধু নিজেই নিজের মায়ার গ্রন্থি খুলছে।
আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে আবার ফেরত পাঠানো হয়েছিল তার মূর্তির ভিতরেই। কুম্ভন যক্ষিণীর আড়ে একেই চেয়েছিলেন শেষ মৌর্য বৃহদ্রথ। তার এই বিভ্রান্তির জন্য বুঝতে আমাদের বেশ সময় লেগেছিল। সে সময় তাঁর এক পুরোহিত মর্মগুপ্ত ছিল অন্ধকের পুনর্জন্ম। মর্মগুপ্তের এই ছদ্মবেশ এবং তার কূটনীতির জন্য আমরা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। অথচ প্রকৃতি ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে সেই ভয়ানক শক্তির জাগরণ হচ্ছে।
যখন আমরা বুঝেছিলাম তখন প্রায় শেষ সময় উপস্থিত। নিজের স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করিয়ে সেই সন্তানকে দিয়ে বলি দিয়ে সবকিছুকে অপরিশুদ্ধ করে তাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল বৃহদ্রথ।
অশোধিত স্থানে দেবতার কৃপা হয় না। খুব সহজেই জেগে উঠে নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারত ধুন্ধু। অন্ধক এক দুর্ভেদ্য বলয় সৃষ্টি করেছিল। আমরা বারেবারে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিলাম। আমাদের মানসিক শক্তির ক্ষয় হচ্ছিল শেষমেষ এক প্রতিহার নিজেই সেই বলয়ের বাইরে বেরিয়ে এসে, আমাদের কাছে সবকিছু প্রকাশ করে দেয়। প্রধানা দাসীও মুখ খোলেন। এনারাও কিন্তু যোদ্ধা। এটাও যুদ্ধ। তব অন্যরকম যুদ্ধ। অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সব সময় অস্ত্রধারণ দ্বারাই হয় না। এভাবে এগিয়ে আসা যায়। মনের সাথে যুদ্ধ করে অন্ধকারকে নাশ করা যায়। ওই যুদ্ধে তোমাদের অপরাপর দুই যোদ্ধার পুনর্জন্ম হয়েছিল। তারা সেই জন্মে তাদের যুদ্ধটা ওইভাবেই করে গেছিল।
সেসময় অন্যান্য তামসিক শক্তি আধারগুলির জাগরণ হয়নি তাই তোমরা সবাই একসাথে জেগে ওঠোনি। প্রয়োজনও পড়েনি। আমরা প্রধান সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ’র মধ্যেই লক্ষণ পরিলক্ষিত করেছিলাম। গণনা করা হয়েছিল আমরা অতি সহজেই তাকে চিনে নিয়েছিলাম। যেমন কুশ এই জন্মে। যেভাবে সখীর বাবা সখী ও ভবকে। সখীর বাবা কোনো ব্রাহ্মণ ছিলেননা। ছদ্মবেশী গান্ধর্ব ছিলেন, সখী তথা উঘনিকে রক্ষা করা ও ভব তথা বিশেণের সাথে মিলিয়ে দেওয়া তার কর্ম তথা প্রায়শ্চিত্তযোগ ছিল। তিনি তাই করে গেছেন তবে ভব-র দেখা পাওয়াটা তিনি জানতেননা। প্রকৃতি তাই নিজেই প্রকাশ দিয়ে গেছে।
বৃহদ্রথ’র তিনপুরুষ পূর্ব হতে আমাদের গণনা বলছিল অন্ধকারের জন্ম হবে। সেই মতো তদানীন্তন রাজনের কাছে আমরা নয়জন নিজেদের ছদ্মবেশ ভেঙেছিলাম। (মহামতি অশোক)
আমরা যতক্ষণে কোনো ব্যবস্থা নিতাম ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। বৃহদ্রথ একেবারেই অকর্মণ্য এবং উদ্যমহীন পুরুষ ছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে হারিয়ে তিনি তাঁর রাজত্বের উন্নতির জন্য, তার প্রজা সুরক্ষার জন্য কিছুই করেননি। যখন যুদ্ধ সমাগত তখন নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে, তিনি অন্ধকের শরণাপন্ন হলেন। অবশ্য কারণ আরেকটা ছিল; তাঁর বিলাস-ব্যসনে বিপুল ব্যয় ভার বহন করতে করতে রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছিল। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল সেনাবাহিনীর খরচ বহন করবার মতো অর্থ তার কাছে ছিলনা। বিশ্বস্ত ও স্থায়ী সেনাবাহিনী একরকম বিনা বেতনে তাকে শ্রম ও সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন। শুধুমাত্র বংশগত সেবা ও বিশ্বাসের কারণে তারা তাকে ছেড়ে যেতে পারেনি। অপরদিকে যে সমস্ত বেতনভুক যুদ্ধশ্রমিক ও সৈনিক ছিলেন তারা ক্রমশই তাকে ছেড়ে যাচ্ছিলেন এককথায় সর্বত্রই এক বিশৃঙ্খল অবস্থা। মর্মগুপ্ত উরফ অন্ধক এই সুযোগই চেয়েছিল। আস্তে আস্তে করে তার মনের দখল করে নিল এবং তাকে সামনে খাড়া করে জাগাতে চাইল সেই মূর্তিকে।
রাজাকে বলা হল গোমুখী যক্ষ বা কুম্ভন যক্ষের পূজা দেওয়া হবে। তাকে বোঝানো হয়েছিল এই মন্দিরের গর্ভে বহুকাল ধরে দেবতাদের অর্থ সঞ্চিত আছে। এই যক্ষই তার দ্বাররক্ষক। এই যক্ষকে খুশি করলে সে সেই ধনভাণ্ডারের দ্বার সে খুলে দেবে। রাজা অসীম ধনৈশ্বর্যের মালিক হবেন। শুধু তাই না তার আগামী প্রজন্মও সুরক্ষিত হবে। এই যক্ষ রাজার বংশবদ হয়ে থাকবেন। সেই মতে গ্রহনের চারদিন পূর্বে তাঁকে মন্দিরের প্রাঙ্গণে শিবির স্থাপন করতে বলা হল। যদিও এর প্রস্তুতি চলছিল দীর্ঘ এক বছর যাবৎ। প্রতিবেশী দেশের নিয়ত সম্বন্ধে রাজাকে সন্দিহান করে দিয়ে, তার মনের মধ্যে যুগপৎ বিষ ও ভয় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। যদিও সেসবই সত্যি। কিন্তু এর পশ্চাতে কারণ ছিল তামসিক। মর্মগুপ্তের প্রতি রাজা নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
মর্মগুপ্ত পুরো প্রক্রিয়াটা করেন গোপনে প্রথমেই তিনি দুটি ১১ বছরের সদ্য রজঃস্বলা নারীকে বলি দেন। তারপর রজঃ এবং রক্ত দিয়ে অপবিত্র করে দেন সেই ঘর এবং রাজার গৃহ মন্দির ফলে আমরা কোনোভাবেই অভিক্ষেপণ দ্বারা সে ঘরে প্রবেশ করতে পারছিলাম না। এবার যক্ষের কাছে একটি সন্তানের বলির তোড়জোড় করেন। সবচাইতে ভালো হয় সে সন্তান যদি রাজরক্তের এবং সদ্যোজাত হয়। আরও ভালো হয় যদি রাজমহিষীর ঔরসে সন্তান হয়। এইভাবে আস্তে আস্তে সমস্ত পরিবেশটাকে অশোধিত করে দিতে চেয়েছিল অন্ধক। অশোধিত স্থানে দেবতার কৃপা বর্ষিত হয় না। রাজা বঞ্চিত হতেন দেবানুগ্রহ থেকে। অন্ধকের সহায়তায় ধুন্ধু আবার জেগে উঠত।
ধুন্ধু পুরোপুরি মূর্তি থেকে বেরোতে পারেনি। তার ক্ষমতার প্রকাশের প্রহর হয় আলাদা। একবার জাগিয়ে তুললে, রাতের এক নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট লগ্নে বেরিয়ে আসতে পারত। যেমন পুষ্যার গ্রহণ অমাবস্যার যদি চতুর্দোষে হয়, তাহলে এসময় তামসিক শক্তি ভারী হয়। তখন বেরিয়ে আসতে পারে। যেমন এখন আসছে, গ্রামের একজন মানুষ দেখে ফেলেছিলেন। তার কপালেও মৃত্যুই শেষ পরিণতি হয়। ধুন্ধু কিছু সময়ের মতো এসে রাজমহিষীর সাথে মিলিত হতেন। তারপর বীজ বপন হলে সেই ফল বা সন্তান বলি দিয়ে ধুন্ধুর সমস্ত ক্ষমতার পুনরুদ্ধার করতে হত। অন্ধক যে জাদুর চর্চা করত সেই জাদুতে তাই-ই বলা আছে। এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না তার কারণ এই জিনিসগুলোতে সব সময়ই চেপে দেওয়া হয়েছে। তবে আসল কথা যেটা বলা হয়েছে সেটা হল অশুদ্ধি। অশুদ্ধি মনের অন্ধকার। সব সময় আলোর বিপরীতে একটা অন্ধকার শক্তি থাকে। এসব সেক অন্ধকারকে জাগিয়ে তোলা। তাই তো ধুন্ধুর প্রকাশ কখনো আসীমাদেবা কখনো আসমোদাস। অর্থাৎ সীমাহীন, কাম, ক্রোধ, মোহ। মানুষের সাথে মানুষের দ্বন্দ্ব। নৈতিক অবনমন। কামনা, লোভ আর ক্রোধ সর্বাধিক শক্তিশালী অস্ত্র অবনমনের। এবং এর শেষ নেই। তাই ধুন্ধুরও শেষ হয় না আমরা ধুন্ধুকে বধ করতে পারি না। শুধু সেই মূর্তিতেই ফেরত পাঠাই বারেবারে।
একবার সখীর দিকে দেখে নিলেন। এইসব কথায় খানিক অস্বস্তি বোধ করছে। তাই তিনি বললেন, ”তুমি বরং আমাদের আহারের ভার নও মা।” সখি যেন এই সম্মতির অপেক্ষা করছিল। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে নিজেদের ঝুলি থেকে তন্ডুল বের করে পাকের ব্যবস্থা করতে লাগল। এখন আর আগুন জ্বালালে ভয় নেই, তারা চারজন আছে। সহজেই কেউ তাদেরকে আক্রমণ করতে পারবে না। দূরে পাক দিতে দিতে গলা চড়িয়ে বললে, ”ঠাকুর আমাদের কিন্তু সেই যুদ্ধের কথা কিছুই মনে নেই। যুদ্ধের কথা, আমাদের পূর্বজন্মের ইতিহাস কিন্তু আপনাকে বলতে হবে।” রক্ষসন্ধি কালিকা ভটচাজ মৃদু হেসে সম্মতি দিলেন।
আবার ডুবে গেলেন কাহিনীতে, দীর্ঘ অধিবেশনের পর তদানীন্তন রক্ষসন্ধি’র দ্বারা আমরা দৃষ্টিক্ষেপণ শুরু করলাম। যোগাযোগ ও সম্পর্ক রক্ষার ভার রক্ষসন্ধিই নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বিসহস্র বছর পূর্বের তদানিন্তন রক্ষসন্ধি তখন বৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁর তখন শক্তি সঞ্চারণার শেষ অবস্থা। যোগ্য উত্তরাধিকারি বেছে নিয়ে একটু একটু করে তাঁর শক্তি সঞ্চারণের কার্য চালিয়ে যাচ্ছেন। তাই তাঁর সীমিত শক্তিতে সেই মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ সম্ভব হল না। আমাদের গ্রন্থও বলছে তিনি বারবার দৃষ্টিক্ষেপণ করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। দৃষ্টির সূক্ষ্মতা দ্বারা সেখানে প্রবেশ করা যাচ্ছিল না। তখন আমরা বাধ্য হয়েই আমাদের নয় প্রজ্ঞার সেরা প্রজ্ঞা মনস্তত্ত্ব অর্থাৎ মনঃসন্ধিকে আহ্বান করি। আমরা সুযোগ খুঁজতে থাকি, অন্ধকার মনে এ প্রবেশ করার। এক দুর্বল সময়ে যখন স্নানরতা রমণী দেখে যখন উত্তেজনায় তার চিত্তবৈকল্য উপস্থিত। সেই সময় এক তার মনের মধ্যে মনঃসন্ধি প্রবেশ করেন এবং তার মনের দুয়ার দিয়ে সেই মন্দিরের প্রবেশের পথ পাই। আমরা তখনই আমরা বুঝতে পারি কি গভীর ষড়যন্ত্র সেখানে রচনা করা হয়েছে।
যে মন্দিরকে কুম্ভন যক্ষের মন্দির বলে বোঝানো হয়েছে। তা আসলে এক কারাগার। এই কারাগারের গর্ভেই নিম্মজিত করা হয়েছে সেই মূর্তি। যুদ্ধের পর ধুন্ধুকে জীবন্ত এই মূর্তির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছিল বা বলা যায় ধুন্ধুর চেতনাকে এই মূর্তির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছিল। ধুন্ধুর সত্তা চিরঞ্জীবী। এই মূর্তির মধ্যে আজীবন বন্ধ থাকে আর ছটফট করে কেউ তাকে মুক্ত করবে। বেশ কয়েক জন্মে অন্ধক নানারূপে একটু একটু করে মূর্তির উপরে মন্দির তৈরি করেছিল। এই মন্দির বহু প্রাচীন, অন্ধকের মন্দির তৈরি করা ছিল মূর্তিকে আড়াল করে রাখা। অন্ধকের হৃত সত্তার প্রায় প্রতি জন্মেই পুনরুদ্ধার হয় এবং এটাই ছিল অন্ধকের অভিশাপ। তার সত্তার পুনরুদ্ধার হবে কিন্তু তার বাকি আধাররা জাগ্রত না হলে। কেবলমাত্র এক বিশেষ লগ্নে অন্ধকের জন্ম হলে তবেই সে পারবে। যেমন এবারে যে গ্রহাবস্থানে জন্মেছে। তাতে বিশ্বের একজন পুরুষই জন্মেছে এবং তিনি অজেয়, অজর ছিলেন। তিনি রাবণ।
যাই হোক, অন্ধক মূর্তিটিকে সবার অগোচরে আড়াল করে রাখার জন্য একে মন্দিরে বাহ্যিক পরিবর্তন করেছিল। এতে হয়তো দেবতারা ভুলে যাবেন কিন্তু তারা কিছুই ভোলেন না। পৃথিবীর সমতা রক্ষার জন্য আমরা নয়জন রক্ষ ব্যপ্ত থাকি। আমরাই ঈশ্বরের চোখ।
একজন অসুরের মনই বিকৃত। মন্দিরগাত্র তার প্রমাণ দিচ্ছিল। আকৃতি মন্দিরের মতো কিন্তু তার দেওয়ালে রাত্রে নর-নারীর মৈথুন, অত্যাচার চিত্রকলা। মন্দিরের গভীরে, গর্তের মধ্যে প্রোথিত আছে সেই তিন মাথাওয়ালা মূর্তি। একটি মাথা গাভীর, একটি মাথা মানুষের এবং অপর মাথাটি একটি হিংস্র জীবের। সিংহাসীন। কিন্তু সেই সিংহের ডানা আছে। পায়ের থাবা পক্ষীর মতো। সেই মূর্তির দেখেই আমরা নিশ্চিত হই। মূর্তির থেকে অল্পদূরে মাটিতে একটি সদ্যজাত শিশু রাখা। শিশুর ক্রন্দনে চতুর্দিক পরিপূর্ণ। ক্রমাগত ক্রন্দনের পর যখন বুঝে যায় তার ক্রন্দন শোনার মতো কেউ নেই তখন সে থেমে যাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ পরে দ্বিগুণ জোরে ক্রন্দন শুরু করে। দৃশ্য দেখে আমাদের শরীর রি রি করে উঠল। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম। পুষ্যমিত্র শুঙ্গকে তার পূর্ব ইতিহাস স্মরণ করানো হল। অভিক্ষেপণ দ্বারা দাসীকে দর্শিয়ে তার রাজার অবস্থা সম্বন্ধে তাকে অবহিত করানো হল। তার পরেরটা ইতিহাসের পাতায় নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু চাপা পড়ে আছে অনেক কিছু।
সবাই জানে রাজা বৃহদ্রথ যখন মন্দিরের দ্বারোদঘাটনের জন্য যাচ্ছেন, তখন রাজাকে হত্যা করেন তারই প্রধান সেনাপতি। বৌদ্ধ ধর্মের উপর ব্রাহ্মণদের ক্রোধবশতঃ এই ঘটনা। কিন্তু আসলটা কেউ জানল না। সেইদিন রাজা মন্দির খুলতে তো যাচ্ছিলেন বটে কিন্তু সে মন্দির কোন দেবতার মন্দির? কোনো দেবতার মন্দিরে কোনোদিন স্নান সেরে গাত্রে প্রসাব ছড়িয়ে নিজেকে অশুদ্ধ করে যেতে হয় না।
এরপর সেই মূর্তিকে সেখান থেকে আমরা গোপনে তুলে আনি। সে সময়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা সমুদ্রপথে এ দেশে ব্যবসা করতে আসছিলেন। এমনই একজন ব্যবসায়ী হাতির দাঁতের ব্যবসা করতেন। তাকে দিয়ে সমুদ্র পার করে বহুদূরে রেখে আসা হয়। কিন্তু এমনই তার তীক্ষ্নতা যে বরাবরিকম (বর্তমান করাচী)-র বন্দর থেকে নিয়ে যাওয়ার আগে সেখানে মহামারী জাগিয়ে তুলে প্রভূত মানুষের প্রাণ নেয়।
তারপর দীর্ঘ সময় আমাদেরকে আর চিন্তা করতে হয়নি। মাঝে মাঝে মৃদু ভূকম্পন, আলগোছে কিছু চিহ্ন মনে করিয়ে দিচ্ছিল সে নিজেকে জাগ্রত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তা এতই মৃদু যে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম। সে ক্ষমতা হারিয়ে দুর্বল হয়ে গেছে। অথবা বহু দূরে থাকার জন্য তার পক্ষে আমাদের কাছে আসার ক্ষমতা হচ্ছে না।
আমি এই ভাদ্রে ২২৮ বৎসর আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছি। আমাদের রক্ষ আয়ুষ্কালে ইহা প্রাক-যৌবন অবস্থা। বার্ধক্য আর কয়েক দশকের অপেক্ষা। হিমালয়ের গুহায় আমি সাধনায় ব্যাপৃত ছিলাম। ভেবেছিলাম আমার এই জীবনে আর কোনো ঘটনা ঘটবে না কিন্তু সে জন্মালো।
অন্ধক যেদিন জন্ম নেয় সেদিন গ্রহ-নক্ষত্রের এমন বিন্যাস হয়েছিল যে আমি সেই সুদূর কণখলে বসেও কেঁপে উঠেছিলাম। সেদিনই আমার আশ্রম ত্যাগ করে আমি এখানে চলে আসি। আমাদের গ্রন্থ বলছিল, তার জন্ম হয়েছে আর এই জন্মে সে সমস্ত বিপরীত শক্তিগুলোকে জাগ্রত করতে পারবে। সে যুবাবয়সে গৃহত্যাগ করে আমি নিশ্চিত ছিলাম সে আবার ফিরে আসবে কারণ তার রেখা তাই-ই বলছিল। শুধু তাই নয় আমাদের ‘চক্রসিদ্ধান্তিকা’ তাই ইঙ্গিত করছিল। হলও তাই সে ফিরে এল, এবং এল স্মৃতির পুনরুদ্ধার করে। বিদর্ভের এক গ্রামে নরবলি হল। আমরা বুঝতে পারিনি। পরে ঈঙ্গিত পেয়ে বুঝি, যে এবারের আধার ভয়ানক শক্তিশালী, নিঃশব্দে কাজ সারে, গোচর হয় না। কুশের ওপরও আক্রমণ হয়েছিল। কুশ পেরেছে আটকাতে, তা ঈশ্বরের কৃপা।’
—’ঠাকুর খাবেন আসুন খাবার তৈরি।’ কথার মধ্যেই কখন সখী এসেছে।
—’বেশ, তবে খাবার পরে আমরা যুদ্ধের কথা আলোচনা করব।’
অন্যদিকে জমিদার গৃহ
জমিদার বাড়িতে তিনজন লোক একসাথে খেতে বসেছে। তার মধ্যে একজনকে আমরা আগে থেকেই চিনি শুরু থেকেই তাকে দেখছি। অপর দুজন আমাদের সদ্য পরিচিত আগন্তুক। কয়েকদিন আগেই এদের খুন করতে দেখা গিয়েছিল এক অজানা জায়গায়, অনুশীলন সমিতির সদস্যদের।
হঠাৎ করেই বিকেলবেলা এই দুজন আগন্তুক জমিদার বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। এদেরকে দেখে বাড়ির মহিলারা অন্দরের বাইরে আসেন নি। আসলে দুজনকে দেখে সত্যিই ভক্তি হয় না। একজনের শমনের ন্যায় উৎকট চেহারা। অন্যজনের মহিলাদের ন্যায় মিহি। ক্ষীণকায়। কথায় মেয়েলি ভাব। চাকরবাকর-র পর্যন্ত তাদের সামনে যেতেই খুব একটা সাহস করছেন না। এইসব দেখে জমিদার মশায় নিজেই নির্দেশ দিয়েছিলেন। ”চাকরদের বলা হল খাওয়া-দাওয়া রেখে তারা বিশ্রাম নিতে পারে। তাদের খেতে রাত হবে। এরা তার পূর্বজীবনের পরিচিত বন্ধু। তাদের সাথে কিছু সময় কাটিয়ে তার পরেই তারা খাওয়া-দাওয়া করবেন।” তারাও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, এদের দৃষ্টির সামনে বড় অস্বস্তিতে পড়ছিল। এমন শ্যেন দৃষ্টি মানুষের হয় বলে তাদের জানা ছিল না।
এদিকে জমিদার অন্য কথা ভাবছিল, এদের স্বভাব সম্বন্ধে তিনি পরিচিত হয়েছেন ক’দিন আগেই। এদের নররক্ত লোলুপতা সেখানে দর্শন করেছেন। এদের সাথে যত নির্জনে আলাপ করা যায় ততই ভালো। ভাবতেই পারেননি কখনো এত তাড়াতাড়ি এদের দেখা পাবেন। স্ফটিককে পুনরায় কার্যক্রম করা যাবে সেটা ভাবতেই পারা যায়নি। সে রাতে যখন অগ্নিদেব ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। তখনই তার আরেকটি মায়া প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। অবশ্য বিষয়টা এমনই একটি ধনাত্মক আধার খুললে তার বিপরীতে আরেকটি ঋণাত্মক আধার খুলে যায়। তাই হয়েছিল। সেদিন তিনি অন্যদিনের মতো আসনে বসে ছিলেন। এগিয়ে রাখছিলেন পরবর্তী প্রক্রিয়া। ধুন্ধুকে জাগানোর দিন এগিয়ে আসছে। ধুন্ধুকে জাগাতে গেলে আগে দুটি একাদশ বর্ষীয়া সদ্য রজঃস্বলা নারীর বলি চাই। চাই গণবলি। যেমন একটা মহারাষ্ট্রের সেই সমুদ্র তটে দিয়ে এসেছেন। আফ্রিকার পুরোহিত/ বোঙারা দিয়ে এসেছে। যতবলি তত শক্তি। সেদিন আংশিক গ্রহণ ছিল। হিসেব মতো মুহূর্তের জন্য ধুন্ধু জেগে উঠত। দূরের গাছটায় টিঁয়ার ঝাঁক বসে। ওদের বলিই স্থির করেছিলেন আজ। কিন্তু সহসাই জেগে ওঠে ভূকম্প এবং তার সাথে সাথেই মূর্তিতে চিড় ধরে।
সাথে সাথেই তিনি ছুটে বেরিয়ে এসেছিলেন বাইরে। গোটা গ্রাম কেউই তো বোঝেনি। অথচ এতক্ষণ হইহই পড়ার কথা। তবে কি! আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গিয়েছিলেন, এক আগুনের প্রজ্জ্বলিত রেখা এঁকেবেঁকে আকাশের বুক বিদীর্ণ করে দিচ্ছে। সেই আলোর রেখার আঁকাবাঁকা রেখাজালে ফুটে উঠেছে মন্দিরের অবয়ব। উত্তর-পূর্ব কোণে এক বিশেষ দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। যে মানচিত্র ফুটে উঠেছে সে মানচিত্র সহজেই পড়া যায়। মানচিত্রের পাঁচটি বিন্দু যে পঞ্চ পারিজাত তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বিপরীত শক্তির আধারদের তিনি কীভাবে খুঁজে পাবেন। একা এই শক্তির মুখোমুখি হবার সামর্থ্য তার নেই। ইতঃপূর্বে তার দুটি সংঘর্ষ হয়েছে। প্রথমটি হয়েছে এক পারিজাত রক্ষকের সাথে। সে পারিজাতের রক্ষক প্রাণ দিয়েছে তবুও বলে যায়নি পথদিশা। এখন পথদিশা তিনি পেয়ে গেছেন কিন্তু শক্তি নেই। যার সাথে তার দ্বিতীয় সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই সংঘর্ষের ফল হয়েছিল মারাত্মক। অনেকখানি ক্ষয় হয়েছিল তার মানসিক শক্তি। আসনে বসে তিনি হিংসা ও ক্রোধকে চালনা করেছিলেন যথাক্রমে একটি হিংস্র মহিষ এবং অন্যটি একটি সর্পের আকারে। কিন্তু দুটিকেই সে বোধ করেছে। তার মানসিক শক্তি অনেক নষ্ট হয়েছে, এই চালনায়। তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। ঠিক তখনই মনে পড়ল সেই পুরনো প্রক্রিয়াটি করার।
সোজা উঠে গেছিলেন আসন ছেড়ে, আসন বন্ধ করেননি। আসন বন্ধ না করলে তামাসিক শক্তি খানিকটা হলেও জাগরুক থাকে। এমনিতেই অগ্নিদেবের জাগরণ আজকের গ্রহণের তমসাকে ব্যর্থ করেছে। তবুও যদি কিছু করা যায়। সোজা চলে গিয়েছিলেন ছোট বউয়ের ঘরে। ছোট বউ এখন তার সাথে নিয়মিত মিলিত হয়। তার উপোসী যৌবনকে তিনি নিজের লালসা চরিতার্থ করার কাজে লাগিয়েছেন। অবশ্য প্রায় গোটা গ্রামের নারী তার লালসা ভোগ শিকার হয়েছে। তাদের মনকে খেয়ে ফেলেছেন জমিদার, সে অন্য কথা।
ছোট বউ এখন রজস্বলা এই অবস্থায় তার সাথে মিলিত হওয়া পাপ কিন্তু তিনি সেটাই করলেন। তারপর সেই বীর্য মিশ্রিত রক্তকে বহন করে নিয়ে এলেন। নদীতীরে একখণ্ড স্বচ্ছ পাথর কুড়িয়ে তাকে রাঙিয়ে শুরু করলেন সেই অশুদ্ধি উপাচার। সেই পাথরের টুকরো হয়ে উঠল তাঁর স্ফটিক আয়না। সেই স্ফটিক আয়নায় খানিক চেষ্টাতেই ধরা পড়ে গেল অতুল আর বিকাশ। পূর্ব জন্মে এরাই ছিল করিৎ ও মরিৎ নামের দুই দুর্ধর্ষ অসুর সেনাপতি। ধুন্ধুর পাশে এদেরকেই গাই এবং হিংস্র পশু হিসেবে ঠাঁই দেয়া হয়েছে।
চুপচাপ ভাবছিলেন মোহন উরফ অন্ধক। প্রথম মৌনি ভঙ্গ করল করিৎ অর্থাৎ বিকাশ। আপনার কাহিনী একটু বলুন। জানতে ইচ্ছা করছে আপনি কীভাবে নিজের পুনর্জন্ম পেলেন। আমরা তো হঠাৎ স্বপ্নে দেখে নিজেদেরকে ফিরে পেলাম। তারপর আপনি ইঙ্গিত দিলেন। আমাদের আপনি কীভাবে চিনলেন, কীভাবে জানলেন আমাদের।
