ধুন্ধু জাগানোর বৃত্তান্ত
বৃহদ্রথ-এর পতনের পর সেই মূর্তিকে ফেলা হয়েছিল পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল বহু দূরে। আরিকামেডুর বন্দর হয়ে বারবারিকমের বন্দর ছুঁয়ে সেই সূদুর দেশে গিয়ে পৌঁছেছিল।
যে রক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সে মূর্তিটিকে গিয়ে এক অন্ধকার গহ্বরে ফেলে দিয়ে আসে, ওরা কেউ জানতেই পারেনি। ওদের ও পূর্ণজন্ম হয়েছিল হয়তো, কিন্তু বহু বহু কাল দূরে কালান্তক সেই গহ্বর থেকে ধুন্ধুর ডাক ওদের কানে পৌঁছাতে পারেনি। তাই ওদের কোনো উপলব্ধিও হয়নি।
বারেবারে ডাক দিচ্ছিল ধুন্ধুকে। অন্ধক চেষ্টা করছিল অবস্থান। কিন্তু পারেনি। একদিন হঠাৎ করেই আবিষ্কার করে, সেখানকার এক পুরোহিত এর হাত দিয়ে। ওই অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস, উপাচার অন্যরকম। কিন্তু যে পেয়েছিল তার হাতে পাপ-লোভের ছোঁয়া ছিল। স্পর্শে মূর্তির প্রথম পরতের মায়া জাগরুক হয়। শক্তি আবিষ্কার করার পর অন্ধক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। আগেই বলেছি অন্ধক মনে গমন করতে পারে। সেই পুরোহিতের মনকে অন্ধক গ্রাস করে। সেজন্য অন্ধকের নাম ছিল নিচল। সেই পুরোহিত কর্তৃক এক গোপন সংঘের প্রতিষ্ঠা করায় অন্ধক। তাদের সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের সমান্তরাল ঈশ্বর সৃষ্টি করায়। ওদের সৃষ্টিকর্তা মাওরি হল সৃজনের দেবতা আর এই নতুন মূর্তি কাগরকুতে( রণদামামা) করতে হল ধ্বংসের ঈশ্বর।
মানুষ দেখল, যে এই দেবতার তুষ্টিতে যুদ্ধ জয় লাভ হয়। প্রাচীন দেবতা মাওরির আধারকে নষ্ট করে। এই দেবতার আধার প্রতিষ্ঠা করলেন যুদ্ধে জয়লাভ সুনিশ্চিত।
এরপর এই দেবতার উত্থান ঘটতে থাকে। বহু জন্মে এই দেবতার পূজার উপাচার আমি দিয়েছি। যে পুরোহিত বা বোঙা এই দেবতাকে স্পর্শ করেছে। সেই স্পর্শে আমি নিজের চেতনায় স্পর্শ পেয়েছি। এমনই ছিল আমার জাদু সৃষ্টি। কেউ স্পর্শ করলেই আমি বুঝতে পারতাম আসলে স্পর্শে এবং কিছু উপাচারে ধুন্দুর প্রাথমিক মায়া উন্মুক্ত হয়। তা দিয়েই আমি ইঙ্গিত পেতাম তারপর সেই ব্যক্তির চেতনা গমন করে আমি তার মনের মধ্যে প্রবেশ করতাম দেবতার উপাচার দ্বারা এ দেবতাকে জাগানোর চেষ্টা করে গেছি। আসলে এদের কাছে এ শক্তি দেবতাই। এরা ধ্বংসের দেবতা হিসেবে পুজো করছে। আর আমি আমার স্মৃতি দিয়ে এদের সাথে সংযোগ করে, এদের মন নিয়ন্ত্রণ করে বলি হত্যা ইত্যাদি উপাচারের জাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু আমার কাছে আমারই তৈরি এক শক্তি। আমারই দেওয়া তৈরি শক্তির আধার। ভাগ্যের পরিহাসে আমার শক্তির আধার আমারই থেকে দূরে বহু দূরে।
আমার বহু জন্ম কেটে গেছে সেই প্রত্যাশায়। অবশেষে তারে আমি তার স্থান স্থির করতে পারি যখন কাগরকুতে বা ধ্বংস দেবতা হিসেবে তার উত্থান ঘটে। এ সময় সংঘর্ষের ভীষণতা দ্বারা আমি স্থান নিশ্চয় করতে পারি। আরও আরও পূর্বে হয়তো এর উত্থান ঘটেছিল সেগুলো এখন আর মনে পড়ে না। সপ্তবিংশতি সহস্র জন্মের কথা সঠিক কে-ই বা মনে রাখতে পারে।
পৃথিবীর বহু দেশে এর পূজা হচ্ছে। আমি বুঝতে পারতাম কিন্তু সমস্ত মূর্তির মধ্যে আসল মূর্তিটাকে আমি খুঁজে পাইনি। বহু বছর ধরে বহু দেখেছি গোপনে সেই সেই তিন মাথাওয়ালা মূর্তির পূজা হতে কিন্তু সেই তিন মাথাওয়ালা মূর্তির মধ্যে আসল মূর্তিটি কোনটি সেটি আর খুঁজে পাইনি। আমার মনে হয় এসব-ই দেবতাদের সৃষ্ট। দেবতারাই এই মূর্তিগুলি তৈরি করে ছড়িয়ে দিয়েছিল আমাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। আমি পাইনি, শুধু খুঁজেই গেছি। কত দেশে কত নামে তার পুজো হচ্ছে অথচ আসল মূর্তিটি কে আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওই যে নানারকম শয়তানের নাম দিয়ে একই রকম ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি আর পূজা পদ্ধতি। কেউ আসমোদাসকে তুষ্ট করে শক্তি পাচ্ছে। কেউ আবার আশা বশিষ্ট। সবই সেই তিন মাথাওয়ালা মূর্তি। বিভিন্ন জন্মে ছুটে গেছি কিন্তু গিয়ে হতাশ হয়েছি। কেউ সেই মূর্তি নয়। সব বিভ্রান্তি।
যেমন বিঘ্ন গণেশের বিসমুথ। এও যেন তেমন।
এ জন্মে আমার লগ্ন, গ্রহ-নক্ষত্রের অদ্ভুত ত্র্যহযোগ সম্ভব হয়েছিল। পুনরুদ্ধার হতে আমার সময় লেগেছিল ঠিকই কিন্তু যেদিন আমি প্রথম এই মূর্তিকে দেখি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, তারপর স্বপ্ন আর ঝর্নার মতো কলকলিয়ে মনে পড়ল সব। বুঝলাম এই জন্মের জন্যই অপেক্ষা করেছি আমি।
ইথিওপিয়ার সামান্য পুরোহিতের এত স্পর্ধা যে এই মূর্তিকে অবমাননা করছিল। ঠিক সেই মুনি, ঋষিদের মতো। পাপ, খারাপ, দোষ এর অবতারণা। আমি তাকে হত্যা করেছি। তারপর দিনের পর দিন ঘুরেছি। সুদূর মনোমাতোপায় গেছি। খুঁজে গেছি প্রতিটা চিহ্ন। সেরকমই ঘুরতে ঘুরতে দ্বিতীয় পর্বের ডাক পাই। আমার অর্থের অভাব ঘুচে গেছে তদ্দিনে।
টাকার কোনো অভাব নেই। আফ্রিকা থেকে বোম্বেতে নামার পরও ঠিক জুটিয়ে গিয়েছিল সুযোগ। ঝানু আইন ব্যবসায়ী ওয়াভালেংকর কীভাবে যে ওর চক্রে পড়েছিল তা ভাবলে নিজেরই অবিশ্বাস্য লাগে! মূর্তি যে জাগ্রত ও তখনই বুঝেছিল। না হলে জাম্বেসীর সেই স্টিমারে কেনই বা দত্তা ওয়াভালেংকরের টাকা ভর্তি থলেটা পড়ল। আর কেনই বা সে-ই ফিরিয়ে দিল, বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। সে তখন জাম্বেসি নদীর তীরে এসে পাকাপোক্ত ঘাঁটি গেড়েছে মনোমাতোপা-র গল্পের খোঁজে প্রায় সব সরাইখানাগুলোতেই ঢুঁ মারে। গ্রামে যায়। সেখানকার বেশিরভাগ ভারতীয় উকিল, মক্কেলদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলে। ওদেশের ধনী ব্যবসায়ীদের কাছে ভারতীয়রা যারা আইন পাশ দিয়েছে, তাদের দারুণ চাহিদা। গুজরাটী, মারাঠিদের বিশেষ করে দারুণ চাহিদা। কীভাবে হোটেল, সরাই-এর এত পয়সা জুটতো জানেনা, কিন্তু পয়সা জুটে যেত। খুন ও খারাপী করতে হচ্ছিল চুপিসাড়ে কিন্তু মূর্তির চাওয়া বলেই মেনে নিচ্ছিল একে। ধরাও পড়েনি তো। ক্রমশই বুঝেছি যে মূর্তির জট খুলছে। আশেপাশের ফার্মের উপজাতি চাষীদের সাথে তামাক টামাক খাইয়ে খবর আদায়ের চেষ্টা করত।
দেবতার সম্বন্ধে তথ্য আদায়ের চেষ্টায় সেদিন ও জাম্বেসীর টেটে বন্দর হয়ে সোফালা যাচ্ছিল। সোফালার নীচেই প্রাচীন মেসানগাজী অঞ্চল। স্টিমার মাঝ নদীতে আচমকাই হইহই।
এক ভারতীয় দেশীয় ভাষাতে চিৎকার শুরু করে দিয়েছেন। সে বাঙালি হলেও নিজের দেশের বাকি ভাষাগুলো অন্তত বোঝাই যায়, যে এ ভাষাটা আর যাইহোক দিশি। বিশেষ করে কলিকাতায় আর তারপর দক্ষিণ আফ্রিকাতে কাটালে তো পারবেই। ওই অঞ্চলে তখন ভাগ্যান্বেষী ভারতীয় প্রচুর। যাইহোক উৎসুক হয়ে ভদ্রলোকের কাছে যেতেই, ব্যাপারখানা মালুম হয়েছিল। তার পকেট এ টাকার থলে ছিল। ভদ্রলোক কোনো এক ব্যবসায়ীর কাছে কাছ থেকে আদায় করে আনছিলেন। এখন সেটা উধাও হয়েছে। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি হল কিছুতেই মেলে না। এখানকার কালো মানুষদের তিনি চেনেন এরা আর যাই করুক চুরি-চামারি করে না তাই মন বলছিল যে হয় জলে পড়েছে না হলে এমন কোথাও পড়েছে সেটা চোখের আড়ালে। শেষমেশ ভদ্রলোককে ঠান্ডা করিয়ে বসিয়ে, কোথায় কোথায় হেঁটেছেন, কীভাবে গিয়েছেন, কোথায় কতক্ষণ বসেছেন, দাঁড়িয়েছেন সে সব হিসেব করে খোঁজ করতে করতে দু-চারটে মালের স্তুপের পিছন থেকে থলে খানা বেরোলো। ভদ্রলোক ওই দিক দিয়ে রেলিং এর দিকে ঝুঁকে থুতু ফেলতে গিয়েছিলেন তখনই পড়ে গেছে আলগা হয়ে।
সেই যে বন্ধুত্ব হয়েছিল। তারপর তারা দীর্ঘদিন ধরে একসাথে ছিল প্রায় তিন বছর। একসঙ্গে থেকেছে অথচ বুঝতে দেয়নি যে মূর্তি আছে। যখন বোম্বেতে ফিরে আসা হল তখন ওয়াভালেংকর প্রথম ওর বাড়িতে নিয়ে গেল। এটা এক দিক দিয়ে ভালোই হল না হলে ওকে হোটেলে থাকতে হত। সেইসময়ে পয়সাকড়ি উপার্জনও বিশেষ হয়নি, এতদিন জাহাজে আসা। দেবতার ভোগ চড়ানো যায়নি। দেবতাও ভোগের জন্য ব্যকুল ছিলেন। ওয়াভালেংকর সে সুযোগটা করে দিল।
আলুয়ারি গণ্ডগ্রাম। মহারাষ্ট্রের সমুদ্রতীরবর্তী গ্রামগুলো তবুও জমজমাট কিন্তু এই ভিতরের দিকে গ্রামগুলো একেবারেই একটেরে। একে দেখলে ব্রিটিশ রাজত্বের কোনো অঞ্চল বলে মনে হয় না, তাদের বাদাবনও এত নির্জন নয়।
ওয়াভালেংকরের বাড়িতে শুধু তার বৃদ্ধ অন্ধ ঠাকুরমা আর বোন। এদেরকে আত্মীয়-পরিজনের ভরসায় রেখে ওয়াভালেংকর গিয়েছিল অর্থ উপার্জনের আশায়। অবশেষে আশা পূর্ণ হয়েছে।
মোহনের ভাগ্যের দ্বিতীয় অংশটা খুলে গেল। ওয়াভালেংকরের বোন তার গ্রাসে পড়ল। ওয়াভালেংকরের সমস্ত আত্মীয়-পরিজন না করেছিল কিন্তু সব ওয়াভালেংকর না করে দিল। অবশ্য করবেই বা কি করে? ওর ভগ্নীতো তখন গর্ভবতী।
দিন যায় মাস যায় ওয়াভালেংকরের ভগ্নিকে একটু একটু করে গিলে ফেলেছিল তার নিয়তি। মূর্তির প্রথমবার জাগানো স্থান হিসেবে এই গ্রামকেই বেছে নিয়েছিল। মূর্তিকে এতদিন বহন করছে সে অথচ মূর্তিকে জাগানোর আসল শর্তই পূরণ করতে পারেনি। ‘বলি’ হয়তো অনেক দিয়েছে কিন্তু দেবতার বা গেদোল বা মহাভোগ ভ্রূণ-ই তো সে দিতে পারেনি। আফ্রিকান, ব্যাকট্রীয়া, হিব্রু, প্রাচীন সংস্কৃত যেখানেই ভোল বদলে এসেছেন ধুন্ধু থেকে আসীমা থেকে আসমোদাস সর্বত্রই তার মহাভোগ সাত মাসের ভ্রূণ।
‘ইফিদুতি’ মতে সাত মাসের পরে ভ্রূণ জীবন হয়। একটি আস্ত নিষ্পাপ, নিস্কলুষ, পরিশ্রুত প্রাণ। একটি প্রতিশ্রুতিবান মানবকা। আসীমদেব/আসমোডাই/আসমোদাসে-র এর চেয়ে ভালো ভোগ আর কিছু হয় না।
গর্ভোপনিষদ মতেও ভ্রূণের বয়স সাত মাস হলে তার মধ্যে প্রাণ প্রবেশ করে। এ হল সেই প্রাণ যে প্রাণ পূর্বজীবনের অসততা, অকর্মণ্যতা, অন্যায় বিশ্বাসঘাতকতা, হিংসা-রিরংসা, হত্যা, বড়দের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রভৃতি সাত প্রকার কৃতকর্মের জন্য শাস্তি ভোগ করে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। একটি পরিশ্রুত প্রাণ বা সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাই অসীম দাসের সবথেকে বড় ভোগ। যত ভালো মানুষ জন্মানো থেকে বিরত হবে। ততই ধন্দে ফেলে দ্বন্দ্ব করবেন তিনি।
আস্তে আস্তে মোহন ওয়াভালংকরের পরিবারটাকে তাদের গোষ্ঠী থেকে আলাদা করেছিল। আগেই বলেছি, গ্রামটা একদম সমুদ্রতীরবর্তী। গ্রামের তিনদিকে শুধুই আরব সাগর কয়েকটা নুলিয়া বস্তী আর ওয়াভালংকরদের পৈতৃক বাসস্থান। ওরা এখানকার প্রাচীন পরিবার কিন্তু প্রাচীন হলেও ওদের উন্মেষ এভাবে হয়নি। একতো একেবারে প্রান্তিক অবস্থান আর দ্বিতীয়তঃ এই অঞ্চলগুলো কঙ্কনের অনেক কাছাকাছি ছিল। সে সময় যখন পর্তুগীজদের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছিল ওরা নিজেদেরকে একেবারেই লুকিয়ে ফেলেছিল। তাই এই গ্রামে পাকা বাড়ি বলতে সে কোন আমলে সীতারামের তৈরি করা বিঠঠলের মন্দির।
আস্তে আস্তে নিজেকে গ্রামের মধ্যে অভিযোজিত করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু বিধিবাম, গ্রামের মধ্যে ওয়াভালংকরের জ্ঞাতিগুষ্টি আর কঘর ব্রাহ্মণ বই অন্যকিছু ছিল না। এরা ধর্মপ্রাণ সৈনিক, চাষা এদের মধ্যে একজন বিদেশিকে আপন করে নেবার প্রবণতা ছিল না। যদিও ওর উদ্দেশ্যও সৎ ছিল না। আর তারপর মন্দির দেখলেই ওর যেন কেমন একটা ভয় করত শরীরে। মন্দিরের আলো, ঘৃতপ্রদীপ, গুগগুলের গন্ধে দমবন্ধ হয়ে আসত।
প্রথমবার যেদিন বিবাহের পর নববরবধূ মন্দিরে গিয়েছিল সেদিন মন্দির চাতালেই খামোখা ধুতির খুঁটে পা জড়িয়ে আছাড় খেয়েছিল। হাতের বুড়ো আঙুলটা ফেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়েছিল। পুরোহিত একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল সেদিন ওর দিকে। কেমন যেন কুঁকড়ে গিয়েছিল।
এরপর আস্তে আস্তে যেন চারপাশটা কেমন গুটিয়ে আসছিল। যতবারই দেবতাকে জাগানোর চেষ্টা করেছে ততোবারই দেখেছে কোনো না কোনো বিপদ হয়েছে। হঠাৎ করেই গলায় সাদা দাগ ওয়ালা শঙ্খচিল এর আনাগোনা বেড়ে গেছে। বিঠঠল নাথের মন্দির চূড়ায় তারা অতন্দ্র প্রহরীর মতো বসে থাকে। যে মৃষক গৃধ্রকুলের (গৃধ্ররাজ জটায়ুকে বিরোধিতা করে পাতক এরা, এরা তাই রসাতলের গভীরে পর্যবসিত) সে আবাহন সে করেছিল, তারা এই শঙ্খচিল-এর ব্যূহভেদ করে আসতে পারেনি।
প্রচণ্ড চেষ্টা করেও তিন রাত সে কোনো সদ্যোজাত বাছুর বা ছাগশাবক কে তুলে আনতে পারেনি। ভেবেছিল এই রক্ত দিয়ে মূর্তিকে জাগাবে, মূর্তিকে একবার জাগিয়ে তুলতে পারলে দেবতা নিজের ভোগে আহরণের ইঙ্গিত নিজেই দেবেন। একরাতে সেই কুৎসিত হায়নার দল কে আবাহন করেছিল কিন্তু সেই ডাক তাদের কান অবধি পৌঁছায়নি। শুধু দূরে বনাঞ্চলে ব্যাঘ্রের ক্রুদ্ধ গর্জন জেগে ছিল সারা রাত।
সারা গ্রামের লোক বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। এই জঙ্গলে বাঘ আছে এটা কেউ কোনোদিন শোনেনি। পুরুষের পর পুরুষ ধরে তারা এখানে বাস করে আসছে তাছাড়া এখানে ফিরে ইস্তক মূর্তি বা ধুন্ধু অভুক্ত। তাহলে আজকে বাঘ কোথা থেকে এল! সবাই ভয়ে কুঁকড়ে গেছিল কিন্তু কিছুই হয়নি। ভোর হতেই সব শান্ত হয়ে গেছিল আর তারপর হপ্তা যেতেই মানুষের মন থেকে এসব মিলিয়ে গেছিল। সে জানে সে রাতে হায়নার দলকে আটকে রেখেছিল ওই ব্যাঘ্র। এই গ্রামে এমনকিছু পবিত্র হয়েছে যার জন্য এখানে দেবতাকে জাগানো সম্ভবপর নয়।
পুষ্কর ওয়াভালেংকর এই গ্রামের সব থেকে বৃদ্ধ লোক। এই বিদ্বেষী, সন্দেহবাতিক ওয়াভালংকরদের মধ্যে কেবল পুষ্কর ভাউ-র সাথে আমার বনিবনা চলত। ভদ্রলোক তামাক খেতে ভারি পছন্দ করতেন আর এখানের মধ্যে কেবল আমিই শহরে যেতাম। দত্তার ওকালতি ব্যবসার খোঁজ খবর, এদিক ওদিক জানার জন্য। অবশ্য সেটাও গোটা একদিনের পথ, যেদিন যেতাম সেদিন ফিরতে পারতাম না। ভোরে রওনা হলে লোহাপুরে পৌঁছাতে রাতের আঁধার নেমে যেত। শহর থেকে ভালো তামাক আনতাম আমার খানকয়েক বিলিতি পাইপ ছিল। সেই পাইপে তামাক ভরে বুড়োকে দিয়ে, অনেক কিছুই জানা যেত।
