পুস্কর ভাউ-এর তথ্য
ওয়াভালংকরদের কথা
”রানিমা গড়িকিরে-র যুদ্ধে আমরা পরাজিত হয়েছি। শাহুজি মহারাজ দুরন্ত গতিতে এগিয়ে আসছেন। গড়িকির, ভীমা সব জায়গাতেই আমরা পরাস্ত হয়েছি। দাসের ঔদ্ধত্য মার্জনা করবেন কিন্তু আমার মনে হয় আপনি একবার গিয়ে সামনে দাঁড়ান, যতই হোক শাহুজি রাজে উদ্ধত অবিনীত নন। ৺রাজারাম রাজে তাঁর আপন তাতশ্রী। আপনাকে তিনি মায়ের মতোই দেখেন, তাই একবার সাক্ষ্যাতে কথা বলতে অনুরোধ করব। পুরো বিষয়টি একটি ভুল বোঝাবুঝি মাত্র। এটাকে দ্বন্দ্ব-এ উন্নীত করতে গিয়ে সমূহ মারাঠা জাতির সর্বনাশ ডেকে আনবেন না।”
এই কথোপকথন হয়েছিল ছত্রপতি মহারাজ শিবাজির পুত্র রাজারামের পুত্রবধূ তারাবাঈ ও তার দরবারের বিশিষ্ট সেনাপতি মুকুতে ওয়াভালংকরের মধ্যে। কিন্তু এর ফল হয় উলটো, রানিমা প্রচণ্ড তিরস্কার করেন তাদের। এরপর মালওয়া, ঘুর্মদে পরাস্ত হবার পর সমস্ত ক্রোধ গিয়ে পড়ে ওয়াভালংকরদের উপর। তাঁর মনে হয় যে তাঁর সর্দাররাই দোষী। সাতারা যাবার কালে, বাবা হাম্বির রাও মোহিতের তিন পুরুষের বিশ্বস্ত ওয়াভালংকর সরদারদের তিনি দরবার থেকে বহিষ্কৃত করেন। এমনকি তাদেরকে কোলাপুরের পুরানো বাসস্থানে থাকতেও দেন না। যে প্রাচীন বাসস্থান ছেড়ে কোলাপুর দরবারের বসতি করেছেন সেখানেই ফিরে এল তারা। সাথে করে নিয়ে এল রাপ্তি ক্ষেত্র থেকে তুলে আনা তাদের বিঠঠল নাথের মূর্তি। সেই মূর্তিই এখানে স্থাপনা পেয়েছেন আর এই সেই মন্দির। বছর বছর ধরে তাদের পুজো পেয়ে আসছে। তাদের সুরক্ষা তিনি দিয়ে আসছেন, এতটা শুনে আমি বেশ আশাহত হয়েছিলাম, ভেবেছিলাম যেখানে দেবতাকে জাগাতে পারব। কিন্তু এ স্থানের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করার সাধ্য আমার নেই। আমার কেন কারোরই নেই। স্বয়ং বিঠঠল এখানে জাগরুক। বিঠঠল খোদ বিষ্ণু, তাঁর যেখানে অধিষ্ঠান সেখানে অন্ধকারের প্রবেশ অসম্ভব।
* * *
এমত অবস্থায় প্রায় দুই তিন বছর কেটে গেল। হাল একপ্রকার ছেড়ে দিয়েছিল, প্রথম সন্তান জন্মে গেছে। দারুণ চাপ সংসারের, দত্তা শহর থেকে ওকালতি করে, টাকা পাঠায়। ও এখানে চাষবাস করে, জমি জিরেত করে। এখানে গ্রামে দত্তার পরিবার, ওর পরিবার দুই-ই ওর উপর নির্ভরশীল। মোহন ভাবছিল আর বুঝি কিছু হবে না। সন্তান স্নেহ আর সংসারে তাকে দুর্বল করে দিয়েছিল অনেকটা। এমনই সময় এক রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখালো, একটা উল্কাপিণ্ড বিষম বেগে আকাশের বাম দিক ডান দিকে এসে মিলিয়ে গেল এবং মিলিয়ে যাওয়া মাত্রই সেদিকের গাছপালার মাথাগুলি দাউদাউ আগুনে জ্বলে উঠল। তারপর সারারাত জুড়ে শুধু আকাশে লালচে লেলিহান শিখা। ভোরের দিকে আবার একটা স্বপ্ন দেখেছিল, এখানে ওখানে আকাশ পরিষ্কার। পরিবর্তে আকাশ জুড়ে শকুনের মেলা, তারা চক্রাকারে ঘুরছে আর আস্তে আস্তে নেমে আসছে। ঘুমটা ভেঙে গেল। মুখে রোদ এসে পড়েছে। ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল।
গ্রামের প্রায় সমস্ত মানুষ বাইরে এসে জড়ো হয়েছে। বাইরে খোলা চত্বরে এসে দাঁড়িয়ে সবাই ডান দিকে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। সেখানে রাশি রাশি শকুনের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে ঠিক যেমন স্বপ্নে দেখেছিল। বিষম ভয় পেয়েছে বোঝাই যাচ্ছে, আঙুল দেখিয়ে ওপরের দিকে আলোচনা করছে। যোদ্ধার জাত এরা, শকুনের লক্ষণ ভালোই বোঝে।
সে দিকে একবার তাকিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে লাঠিগাছা আর কিরিচটা নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। দেখতে হবে ঘটনাটা কি, নিশ্চয়ই এটা দেবতার দেয়া কোনো ইঙ্গিত। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ, হাতে কিছু থাকা ভালো।
* * *
তক্কে তক্কে ছিল মোহন জানত যে কিছু না কিছু ভুলভ্রান্তি হবেই আর সেই ভুল ভ্রান্তি দিয়েই এই পরিবারের থেকে, এই পুরো গোষ্ঠীর থেকে ওকে আলাদা হয়ে দূরে সরে যেতে হবে চিহ্নিত স্থানে। ওই স্থানেই তার দেবতাকে জাগাতে পারবে। নির্দিষ্ট স্থান থেকে পৌঁছানোর আগে থেকেই পচা গন্ধটা নাকে ঝাপটা মারছিল আর সেইসাথে কাকের দলের কর্কশ চিৎকার। দিগন্ত জোড়া নারকেল গাছের অবরোধের থেকে বেরিয়ে আসতেই দৃশ্যমান হল সবকিছু। এরকম দৃশ্য কখনো কেউ দেখেছে কিনা সন্দেহ! রাশি রাশি সামুদ্রিক জীব কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ডাঙায় উঠে পড়েছে তিমি, কামট থেকে শুরু করে চকরা মাছ, হলদে সাপ সব। যেন প্রবল জলোচ্ছ্বাস সমুদ্রের খোল থেকে তাদের ডাঙায় তুলে দিয়েছে। পচে ফুলে উঠেছে সাগরের প্রাণীগুলো আর তাদেরকে ঘিরে এই শকুনের উল্লাস, কাকের চিৎকারে কান পাতা দায়।
সেখানেই শুরু করলাম আবাহন। প্রাথমিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করল মূর্তিটিকে। এরপর চড়াতে হবে বলি। প্রথমে আপন সন্তানের তারপর এই গোটা গ্রামটার।
বউটার মনটাকে একটু একটু করে বিষিয়ে দিচ্ছিলাম। শেষটায় এমন দাঁড়াল ওয়াভালংকরের পরিবার পুরো গোষ্ঠী থেকে আলাদা হয়ে গেল। একটু একটু করে গ্রাস করে নিলাম ওদের মন। নিয়ে সে তুলল ওর এই নতুন আবাসে। পুরো পরিবার তখন ওর হাতের মুঠোয়।
সে রাত্রে ব্যবস্থা করাই ছিল একদিকে দত্তা ওয়াভালংকরের ভগ্নি মানে আমার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠেছিল। অন্যদিকে পাশের ঘরে রাতের অন্ধকারে বাঁশ দিয়ে দু’পায়ে চেপে ধরেছিলাম দত্তা ওয়াভালংকরের গলা।
পরেরদিন হেরাল্ডে একটি ছোট্ট খবর বেরিয়েছিল ”ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের একটি গোটা গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কোঙ্কণ অঞ্চলে।”
* * *
হুম, সেদিনের যুদ্ধের কথা আমাদের কিছু মনে নেই। যুদ্ধে কীভাবে পরাজয় হয়েছিল, কীভাবে আমাদের মৃত্যু হয়েছিল সেই ঘটনাগুলো কিছুই মনে নেই কিন্তু হিসেব মতো তা একমাত্র আপনারই মনে থাকার কথা আর যদি যোদ্ধাদের পুনর্জাগরণ হয়ে থাকে। তাহলে সেক্ষেত্রে রক্ষরা সাবধান হয়ে গেছে। তাই যাত্রার পূর্বে একবার পুরো বিষয়টা শুনে নিতে চাই। হয়তো কাল প্রভাতেই আমাদের যাত্রা শুরু হবে তার আগে একবার জেনে নিতে চাই।
