প্রথম পাতার পর। যুদ্ধের কথা
মায়া ও কায়া মাটির উপরে আঁক কেটে পরিস্থিতিটা বোঝাতে শুরু করলো।
এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থান করছে ধুন্ধুর গড়। এই গিরিবর্ত্ম ও দুর্গ এমনই যে তাকে সহজে ভেদ করা যায় না। এই বিশেষ পায়ন দ্বারা প্রস্তুত তীর ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলি দুর্গের অবরোধ ভেদ করলে ধুন্ধু বাধ্য হবে আপনাদের সামনে খোলা প্রাঙ্গণে মুখোমুখি হতে।
তবে আপনারা গিরিবর্ত্ম পেরিয়ে ওই বনে গেলে সমূহ বিপদ। এক সংকীর্ণ গিরিপথ আর দুই পাতালের গর্তময় অচেনা অরণ্য। আপনারা কিছু বোঝার আগেই নিঃশেষিত হবেন।
ধুন্ধুকে আপনাদের সম্মুখে আনতে গেলে তাকে উত্ত্যক্ত করতে হবে। কয়েকটি পদ্ধতি আমি আপনাদেরকে বলে দিতে চাই। তাদের মধ্যে প্রথমটি হল রাতে আক্রমণ। রাতে যখন সৈনিকরা বিশ্রাম নেয় তখন আপনার বিশেষভাবে তৈরি বাহিনী ঝড়ের বেগে আক্রমণ করবে। বাহিনী হবে ছোট, অশ্বারোহীও দ্রুত গতিসম্পন্ন এবং তারা খাটো অস্ত্র বহন করবে। চিন্তা করবেন না সেই বাহিনীর শিক্ষা আমরাই দেব। কীভাবে আক্রমণ করতে হয় তাও আমরা জানাবো। শিবিরের বহির্দেশের জম্ভাসুরেরা বামান্ধ অর্থাৎ বাম দিকে দেখে না। তাই আক্রমণ বামদিক ঘেঁষে হবে।
দ্বিতীয় অবরোধের অসুরেরা মাটি কামড়ে থাকে। তাদের বের করা বা ব্যূহ ভাঙানো শক্ত। ওরা সচরাচর প্রচণ্ড জেদী হয় কিন্তু সবারই কিছু দোষ থাকে। ওদেরও আছে মহিষের ন্যায় স্বভাব। আছে ওরা লাল রং দেখতে পায় না।
তাই ওদের আক্রমণের আগের লাল কাপড়ে নিজেদেরকে ডেকে নিতে হবে মানে বিষয়টা এমন হবে, রাতের আঁধারে প্রথমে কালো অঙ্গ বস্ত্রে আক্রমণ চালানো হবে। প্রথম ভাগের ভেদ করে শিবিরগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে যখন দ্বিতীয়ভাগে আক্রমণ হবে তখন কালো বস্ত্রগুলি ঝটতি খুলে ফেলা হবে। অন্তর্বাস হিসাবে থাকবে লাল মলমলের কাপড়। সেই পরিধান করে আক্রমণ চালানো হবে। লাল কাপড় দেখলে ওরা নিজেদেরকে স্থির রাখতে পারবে না। ব্যূহ ভঙ্গ করবে খুব সহজেই তাদের আক্রমণ করা যাবে।
এরপর তৃতীয় যে অবরোধ রয়েছে সেই অবরোধ অপেক্ষাকৃত দুর্বল। তাদের প্রচুর সেনানী মনুষ্য, যারা নিজেদেরকে অসুরের দলে ভিড়িয়েছেন। এদেরকে ইক্ষ্বাকু সেনারা সহজেই বধ করতে পারবেন। এইভাবে বেশ কয়েক দিন টানা যদি রাত্রিতে আক্রমণ করা হয় তাহলে ধুন্ধু ধৈর্য হারাবে। তখন সরাসরি যুদ্ধে নামতে চাইবে যদি তাতেও নামতে না চায় সে ক্ষেত্রেও আর একটি পন্থা আছে। সেটা আঁধার ঘনালে প্রকাশ করব। আপাতত আমার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পরখ করে দেখুন। এগুলিতে এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো আছে। আমি জানি আপনাদের সাথে অপরাসায়নবিদ আছেন, তাকে দিয়ে দেখে নিতে পারেন। এই বিশেষ রাসায়নিক কেবলমাত্র আমরাই তৈরি করেছি অথচ আমাদের অপমান করে ওরা। তাই ওদের রাসায়নিক নষ্ট করে, এগুলি নিয়ে এসেছি। কদর নেই তো, আমরা নেই।
ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যখন প্রক্ষিপ্ত হবে তখন এগুলো আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ। কিন্তু এই লৌহ গোলক যখনই পর্বতের গাত্রে সাথে ঘর্ষণ হবে তখন সেই ঘর্ষণের দরুন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হবে। সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সাহায্যে এই রাসায়নিক খুব সহজেই ধরে যাবে এবং সেই প্রজ্বলিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সব গিয়ে আঘাত করবে অবরোধের গাত্রে। অবরোধ ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না। অবরোধ ধ্বংস হলেই অরণ্যের মাঝে উন্মুক্ত নিজের শিবিকা স্থাপন করতে বাধ্য হবেন ধুন্ধু। আমরা দুর্গের প্রাকারের ভেতরে আমরা খোলা প্রাঙ্গণে শিবিরের মধ্যে বসবাস করি। আমাদের ঘরবাড়ি নেই। যেই মুহূর্তে দুর্গের অবরোধ ভাঙতে শুরু করবে। নিজের বাহিনীকে নিয়ে শক্তিশালী ব্যূহ করে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হবে এবং তারপরে যদি বোঝে দিনের আলো কমে আসছে তাহলে অরণ্যের গভীরে হারিয়ে যাবে।
তখন হবে আমাদের রাতের আক্রমণ। প্রথম ও দ্বিতীয় অবরোধে রোজ আক্রমণ করে ব্যতিব্যস্ত করে গিরিবর্ত পার করিয়ে এপারে আনব।
কুবলায়শ্বের ঈঙ্গিত পাওয়া মাত্র বৃহৎ ক্ষেপণযন্ত্রগুলিকে হস্তীযূথ দ্বারা করে সামনে নিয়ে আসা হল। তারপর এদের নিয়ে আসা সেই রাসায়নিক মাখিয়ে দেয়া হল ক্ষেপণাস্ত্রগুলিতে। সত্যিই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ছোঁড়ার সময় আপাত নিরীহ কিন্তু যখন গিরিগাত্র স্পর্শ করছে সেই মুহূর্তেই সেগুলো জ্বলে উঠছে। জ্বলে উঠেই সামনে থাকা দুর্গের প্রাকারে আঘাত করছে। সবেগ, সপাট এক একটি আঘাতে কেঁপে কেঁপে উঠছে দুর্গ প্রাকার মায় এখানকার মাটি অবধি।
এত দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে যদি অগ্নিসংযোগ করে পাঠানো হত তাহলে এই অগ্নি অত দূর অবধি গিয়ে পৌঁছাতো না। তার আগেই নিভে যেত কিন্তু এই রাসায়নিক মেশানোর ফলে অগ্রিম প্রজ্বলিত হচ্ছে না একেবারেই গিরিপথের মুখে দপ করে জ্বলে ওঠে, তারপর গিয়ে পড়ছে শত্রুর দুর্গ প্রাকারে ফলে খুব সহজেই এই আক্রমণে ছত্রখান হয়ে গেল শত্রুবাহিনী।
প্রথম ও দ্বিতীয় অবরোধ একেবারেই ভেঙে পড়ল। খোলা প্রাঙ্গণের মধ্যে উন্মুক্ত হল বাহিনী। আরও কিছুক্ষণ আক্রমণ চালানোর ইচ্ছে ছিল কিন্তু তারা এতই দ্রুতগতিসম্পন্ন। নিমিষে হারিয়ে গেল পুরো বাহিনীটা, কেবল অল্প কিছু সৈনিক ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এত সুবিশাল সৈন্যবাহিনী কিভাবে যে বনের মধ্যে হারিয়ে গেল তা বোঝাই গেল না।
চিন্তায় পড়লেন কুবলায়শ্ব এবং বিশেণ, এইভাবে যদি এরা হারিয়ে যেতে থাকে নিমিষের মধ্যে। তাহলে আমরা কিভাবে রাতের আক্রমণটা করব। উত্ত্যক্ত তো দূর আমার এখান থেকে যে কয়টি সৈনিক যাবে তারা সবাই প্রাণ রেখে আসবে।
মুচকি হাসলো মায়া, ”আমি বলেছিলাম না এই অঞ্চলের বিশেষত্ব আপনারা কিছুই জানেন না। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করুন। এখন শুধু আপনার সেনাদের প্রশিক্ষণ দেব। কীভাবে দ্রুত গতিতে আক্রমণ করবে, কিভাবে গিরিবর্ত্ম পেরিয়ে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে আসতে হবে। আজকের আক্রমণ সৈনিক দিয়ে হবে না, অন্যকিছু দিয়ে হবে অপেক্ষা করুন।”
খানিক পরেই যত সন্ধ্যা নামতে লাগল। এক অদ্ভুত ধরনের পতঙ্গের দল উঠতে শুরু করল। ঝাঁকে ঝাঁকে, লক্ষে নিযুতে সেই প্রত্যঙ্গ উড়ে বেড়াচ্ছে। আকাশের চাঁদকেও বুঝি ঢেকে দিলে সেই পতঙ্গের দল। এইবার কথা বলল মায়া, এই পতঙ্গরাই আমাদেরকে দ্বিতীয় দফার আক্রমণ পন্থা দেবে। পাহাড়ের গায়ের একটি কোটরের দিকে ইঙ্গিত করল মায়া। সেখানে লক্ষ লক্ষ পতঙ্গরা চুপটি করে বসে আছে ওড়ার অপেক্ষায়। এটাই সম্ভবত ওদের বাসস্থান। পতঙ্গদের ক্ষুদ্রপাখার একটানা কিচকিচ শব্দ হচ্ছে।
এই পতঙ্গরাই আপনাদের হয়ে দ্বিতীয় দফার আক্রমণ করে দেবে। বলতে বলতে একটি নীলবর্ণের রাসায়নিক পূর্ণ পাত্র, তাদের কোটরে উপুড় করে দিলে কায়া। তাদের মধ্যে এক দারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হল। এই রাসায়নিক এমনই অস্থিরতা সৃষ্টি করবে যে দূর দূর অবধি তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। কয়েক ক্রোশ পথ পাড়ি দেবে এক রাতের মধ্যে। দ্বিতীয়তঃ এই রাসায়নিক দাহ্য।
এখন আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে একটি বৃহৎ অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত করতে হবে।
—’মানে!’ বিস্মিত ও শিহরিত হলেন কুবলায়শ্ব, ‘এত অনর্থক মৃত্যু!’
বৃহত্তর স্বার্থের জন্য এটুকু তো করতেই হবে। তাছাড়া এই পোকাগুলি মারা গেলে কোনো ক্ষতি হবে না। এরা প্রতিদিন লক্ষে লক্ষে নিযুতে নিযুতে জন্মায়।
—”বেশ তাই হবে। যা বলা হচ্ছে তা তুমি শোনো কুবলয়াশ্ব। নৃ-কুল তোমার উপরে নির্ভরশীল। মর্ত্যলোকে সমস্ত জীবসমাজ তোমার উপরে নির্ভরশীল। তুমি ইক্ষ্বাকু কুলতিলক। ঈশ্বরের প্রতিনিধি। ঈশ্বরকে অমান্য করতে পারো না।” মাথাটা নিচু করে নিলেন কুবলায়শ্ব। এই মুহূর্তে বশিষ্ঠকে অমান্য করার ক্ষমতা তার কেন সমস্ত মর্ত্যধামে সম্ভবত কারুর নেই। আবার কথা শুরু করল মায়া।
অগ্নির প্রতি পতঙ্গদের একটি স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে। তাই এরা অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে দিয়েই যাবে। আর অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় এদের গায়ে আগুন ধরে যাবে। ওদের প্রাণশক্তি দারুণ। সেই অবস্থায় এরা গিরিবর্ত পেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করবে। দাবানল বাধবে। বাধ্য হবে অসুররা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে এবং ওই খোলা প্রাঙ্গণে তাদের ব্যূহ রচনা করতে। এরপর থেকে খোলা প্রাঙ্গণে শিবির রচনা করবে আর বনের গভীরে অবস্থান করবে না। তখনই আমরা রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে উত্তপ্ত করব।
সাতদিন পর
একটানা সাত দিন ধরে দিনে যুদ্ধের পাশাপাশি রাতে ঝটতি আক্রমণ চালিয়ে গেছে কুবলায়শ্বের বাহিনী। অবশেষে চলে এসেছে এপারে। এই কয়দিনে তার বাহিনীর শক্তি অর্ধেক হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিনে একটি সেনা সমাবেশ করেছিলেন গিরিবর্ত্মের কাছে। তার লক্ষ্য ছিল গিরিবর্ত্ম-এর কাছাকাছি সেনা সমাবেশ করে ওদেরকে তাতিয়ে দেওয়া। অসুররা স্বভাব খর মেজাজী ফলে তাদেরকে তাতিয়ে দিলে, তারা গিরিবর্ত্ম দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইবে। যে কয়জনই বেরিয়ে আসবেন তাদেরকে ঝটতি আক্রমণে নিহত করে ফেলা হবে। কিন্তু ফল হল উলটো বারংবার সেখানে দাঁড়িয়ে রণহুঙ্কার ও রণদামামা বাজানোর পরেও কেউ বেরিয়ে গেল না। তখন আরেকটু এগিয়ে যেতেই ঘটল আক্রমণ।
কায়া বারবার বলেছিল, যে অসুরদের আক্রমণের ক্ষেত্রে একদম প্রবেশমুখের সম্মুখে যেন সমাবেশ না করা হয় কিন্তু আক্রমণ না পেয়ে খানিকটা সাহসী হয়ে এগিয়ে গিয়েছিল সেই দলের সেনাপতি। তখনই পর্বত থেকে ঝুপ ঝুপ করে লাফিয়ে পড়তে লাগল অসুর সৈন্যরা। মুহূর্তের মধ্যে দ্বিশত সৈনিক ভূমি নিল। অবশিষ্ট যারা ছিল তারাও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। এক দারুণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হল।
আশ্চর্যের কথা হল পর্বতের মধ্যে এই সৈনিকরা কোথায় ছিল এতক্ষণ! এদের কাউকেই তো এতক্ষণ দেখা যায়নি। কীভাবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই গিরিবর্ত্ম পার হয়ে এত কাছাকাছি চলে এল!
উত্তর দিয়েছিল কায়া। অসুরদের এই সমুখ বাহিনীর নাম পিপীলিকা বাহিনী। মুহূর্তে পর্বত আরোহণ করতে পারে এরা। পিপীলিকার মতো স্বচ্ছন্দ ও দ্রুত গতি। অনায়াস আরোহণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত এরা। এদেরকে লুকিয়ে রাখে এদেরকে বিশেষ ধরনের পোশাক বিবিধ রঙের স্ফটিকচূর্ণের পোশাক পরানো হয় এদের। এও অন্ধকের উদ্ভাবন। রঙের সমাবেশ সূর্যের আলোর প্রতিফলন সম্পূর্ণরূপে ঢেকে রাখে। গিরিবর্ত্ম থেকে মুহূর্তে লাফিয়ে পড়ছে আপনার সৈনিকদের উপর। ওদের এই গোপন সাফল্যের কারণ হল ওরা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে দড়ি দিয়ে গ্রন্থিত থাকে ফলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে না।
—’বিহিতের উপায় কী?’ জিজ্ঞাসা করেছিলেন কুবলয়াশ্ব।
কায়া বলেছিল, না এর উপায় নেই। দ্বিতীয় পরিকল্পনা এখনো করবার সময় হয়নি। চোখের সামনেই নিজের প্রায় চারশত তাজা সেনাকে শেষ হয়ে যেতে দেখলে ইক্ষ্বাকুশ্রেষ্ঠ।
ভাগ্য ভালো ছিল সেদিন হঠাৎ করেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়। এরকম ঘন মেঘ দেখাই যায়না প্রায়। এটা হয়তো গুরু বশিষ্ঠের আবাহন এর ফল, হয়তো নয়। কিন্তু সে সত্যাসত্য থাক। হঠাৎই মেঘ করে যাওয়ায় তাদের পোশাক ক্রমশ গোচর হচ্ছিল। ফলে তখনকার মতো যুদ্ধবিরতি নিয়ে সেই বাহিনী পিছু হটে গেল। না হলে সেদিন আরও যে কত সৈনিক মারা যেত তার ইয়ত্তা নেই। তবে রাত্রে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে কিছু অসুর সৈন্যকে মারতে পেরেছিল সেদিন ইক্ষ্বাকু বংশের সৈন্যরা।
দ্বিতীয় দিনে এল সর্প বাহিনী। এই সর্প বাহিনী অন্ধকের বিশেষ পরিকল্পনা। এই বাহিনীতে সপ্ত পাতালের তিন সেরা নাগ বাহিনী তাদের বিষ মিশিয়ে ছিলেন। এরা দেবতা অসুরের সাথে সমান তালে চলত। তিন শ্রেষ্ঠ নাগ বংশের বিষে এদের শরগুলোকে পায়ন করা হয়েছিল। এমনই বিষাক্ত সেটির সে শর যে মানুষের শরীরে বিদ্ধ করা মাত্র মানুষের শরীর নীল হয়ে যেত। সেই বাহিনীর সম্মুখে কেবল ঢাল পরিবৃত হয়ে নিজেদের অবরোধ রক্ষা করা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই করতে পারেনি ইক্ষ্বাকু সৈন্যবাহিনী। রাতের ঝটিকা আক্রমণে যতটুকু ধ্বসাতে পেরেছিল অসুরদের মনোবল ততটুকুই। এরপর থেকেই আস্তে আস্তে পরিবর্তন হতে থাকে।
তৃতীয় দিনে গিরিবর্ত এর মধ্যে থেকে তার পোষা মহিষের দলকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই মহিষগুলো বিশেষ রাসায়নিক খাদ্য গ্রহণ করে। উচ্চতায় একেকটি পূর্ণাবয়ব ঘোড়ার সমান। আড়ে তিন হস্ত প্রমাণ। উষীম ঘাসের ফল থেকে প্রাপ্ত উত্তেজক কুমাসুরা পানীয় দিলে প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে শত্রুপক্ষের শিবির তছনছ করে দেবার ক্ষমতা রাখে। মহিষের সর্বত্র এমনকি মাথাও বর্মাবৃত। শিং লোহা দিয়ে বাঁধানো। খুরের সাথে বাধা আছে ধারালো ফলা। এবং সর্বোপরি মহিষগুলোর পিঠের দুপাশে বাধা আছে ভারী লৌহখন্ডের ওজন। সবশুদ্ধ গিয়ে যখন খোলা প্রাঙ্গণে শত্রু শিবিরে আঘাত হানে। তখন ঢাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ কিছুই নয়। সেই আঘাতের জোরে ছিটকে যায় আচ্ছা আচ্ছা ষণ্ডা জোয়ান আর গন্ডারচর্মাবৃত ঢালের অবরোধ।
কিন্তু সে যতই শক্তিশালী হোক সেই মহিষের দলকে বধ করল উঘনি ও তার নারী বাহিনী। বশিষ্ঠ-এর অনুশীলন ও স্বয়ং দেবসেনাপতির কাছে করা অস্ত্র শিক্ষা দারুণ কাজ দিল। তার মহিলা বাহিনী তাদের লঘু শরীরের সাহায্য নিয়ে আলতো করে খুব সহজেই মহিষের উদরের তলায় ঢুকে যেত। কেবলমাত্র ওটুকুই তাদের বর্মের বাইরে ছিল।
আর তারপরে আঁকুশির মতো ছুরিকা ফাঁসিয়ে বেরিয়ে আসত বাইরে। সেই ছুরিকার বাঁটে বাঁধা থাকত রজ্জু। ত্বরিত বেগে শিলাখণ্ডে বেঁধে দিত। মহিষেরা গতি থামাতো না, বিদীর্ণ হয়ে যেত উদর। দেখতে দেখতে ত্রিশত মহিষের মৃতদেহকে উঁচু হয়ে উঠল স্থান।
চতুর্থ দিন রাত্রে ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। তখন প্রায় মধ্যরাত শিবিরের সবাই একটু চোখ লাগিয়ে ফেলেছে। অসুরদের অবস্থান সম্পর্কে ও মোটামুটি নিশ্চিন্ত। হঠাৎ করে এসে আক্রমণ তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এমন সময় আকাশের সাঁই সাঁই করে সাড়া জাগল। ঝপঝপ করে এসে পড়তে লাগল শর ইক্ষ্বাকু শিবিরের মাঝে। প্রত্যেকটি শরের সঙ্গে বাঁধা একখণ্ড করে মাংসের টুকরো। যেমন এল তেমন সাথে সাথে বন্ধও হয়ে গেল। সবাই অবাক হয়ে ভাবে এমন দূরপাল্লার শরে খামখা মাংসের টুকরো বেঁধানোর কারণ কি? দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরেও যখন আর আক্রমণ এল না, সবাই গেল নিশ্চিন্ত বিশ্রামে। আর ঠিক সেইসময় ঠিক সেইসময় সম্মিলিত চিৎকারে সচকিত হয়ে উঠল শিবির।
দলে দলে বুনো শৃগাল আর পশুর দল ছুটে আসছে ওদের শিবিরের দিকে। প্রায় দ্বিসহস্র পশু ও শৃগালের বাহিনী আছে ধুন্দুর। হায়নাগুলিকে সাতদিন অভুক্ত রাখা হয়েছিল অন্ধকের বুদ্ধিতে। আজকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাদের শিবির তছনছ করার জন্য। সেই জন্যই আগে থেকে মাংস গাঁথা তির তাদের শিবিরে পাঠানো হয়েছে। প্রাণীগুলোর ঘ্রাণ শক্তিকে বিশেষ যাদুবিদ্যার দ্বারা উন্নত করেছেন অন্ধক। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই প্রাণীগুলো এসে ঝাঁপিয়ে পরল শিবিরের উপর। প্রথমটা হতচকিত হয়ে গেল তিরন্দাজ ও অস্ত্রধারী বাহিনী। শেষে হাল ধরলে সেনাপতি বিশেণ। তার অস্ত্র গদা। বিশেষ কয়েকজন ভারী চেহারার জনকে নিয়ে ত্বরিতে গঠন করল ব্যূহ। তাদের মুদগরের আঘাতে সামনের পশুবাহিনীটা ছিটকে যেতেই। পিছনের পশুগুলো বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে চিৎকার করতে লাগল। আর সেই সুযোগে শিবিরের চারপাশে রাসায়নিক ছড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলে কায়া। সেই আগুনের এমন কটু গন্ধ যে তাতে মাংসের গন্ধ চাপা পড়ে গেল। সেই সাথে আগুনের ভয়ে সেই হিংস্র জানোয়ারগুলো এদিকে আসতে ভয় পেল। সে রাত সেভাবেই কেটে গেল, সামান্য ক্ষয়ক্ষতির উপর থেকেই গেল।
পঞ্চমদিনে, দেখা গেল সেনারা যুদ্ধ করতে করতে অস্ত্র ত্যাগ করছে। সেদিকে তাকিয়ে দেখা গেল, যেদিকে সৈন্যরা অরণ্যের কাছাকাছি ছিল তাদেরকে অরণ্যের অভ্যন্তর থেকে কিছু নারী আহ্বান করছে। অসুর এবং সৈন্য দুজনেই সেই নারীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অরণ্যের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। তারপরেই আর্তচিৎকার।
সেই নারীরা অদ্ভুত কামিনী। তাদের শরীর থেকে অদ্ভুত মাদকতার সৌরভ।
ব্যাপার খানা বুঝতে পেরেছিলেন বশিষ্ঠ। আহ্বান করলেন মনঃসন্ধিকে। ধ্যানে বসলেন তিনি। একটু একটু করে কাঁপতে লাগল শরীর। তারপর হঠাৎই সেই নারীর যেমন এসেছিল তেমনি হারিয়ে গেল মনঃসন্ধি জানালেন পুরো বিষয়টা। অন্ধক মন চালনা শুরু করেছিল, এই লাস্যময়ী নারীরা আসলে যক্ষ ও যক্ষিণী। কিন্তু ইক্ষ্বাকু সৈন্যরা দেখেছে যে এরা নারী। অসুরেরা ঠিকই বুঝতে পারছে, আসলে সম্মোহনী চালাচ্ছিল অন্ধক। সৈন্য শিবিরে নারী নিষিদ্ধ, যুদ্ধের সৈনিক দীর্ঘকাল পরিবারের থেকে দূরে থাকে ফলে সৈন্যরা খুব সহজেই এই ফাঁদে পা দিচ্ছে। তাদের মন দুর্বল হয়ে পড়ছে। তারপর তাদের বনে টেনে নিয়ে যক্ষ ও অসুর মিলে তাদের হত্যা করছে। উপায় না দেখে মনঃসন্ধি আকাশ আচ্ছন্ন করে সূর্যাস্তের ভ্রম সৃষ্টি করলেন। শিঙা বাজিয়ে যুদ্ধ বিরতি দিলেন কুবলয়াশ্ব।
ষষ্ঠদিন, এই দিন সবাই সম্মোহিত হয়ে পড়ল। সম্মুখের সৈন্যবাহিনীতে প্রজারা দেখল তাদের পিতামাতা, পরিবার, পরিজন। প্রত্যেকেই সম্মুখের অসুর সৈন্যদের মাঝখানে তাদের পিতা, মাতা ভাইকে দেখতে লাগল। হাত থেকে খসে পড়ল অস্ত্র। এদিন মনঃসন্ধি তৈরি হয়েইছিলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কিভাবে এদেরকে সম্মোহন করা হচ্ছে। তিনি সোজাসুজি অন্ধকের সঙ্গে যুদ্ধে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধের পর পরাজিত হল অন্ধক। অন্ধকের কাঁধ ঝুলে পড়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেল সম্মুখ সমরে। সম্মোহন কাটার পর সেদিন সবথেকে বেশি অসুর মারা গিয়েছিল।
সপ্তম দিনে গিরিবর্ত্ম পার করে সদলবলে খোলা প্রাঙ্গণে চলে এলেন রাজা ধুন্ধু। এই প্রথম দেখা গেলো ধুন্ধুকে। একদম অভ্যন্তরে একটি বৃষে আরোহণ করেছেন তিনি। সাথে স্বর্ণশিকলি দিয়ে বাঁধা পোষা সেই পশু ও শৃগাল।
তার এক পাশে একটি বেত্রবতী ঘোটকির পিঠে এক ক্ষীণ কায়া পুরুষ, এর নাম মরিৎ। এর সম্বন্ধে অনেক কথাই বলা যায়। কেউ বলে একই সঙ্গে নারী ও পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে। ক্ষীণকায় হওয়ার দরুন বিদ্যুৎ গতিতে চলাফেরা করতে পারে সামনে-পিছনে, ডায়ে-বাঁয়ে। মুহূর্তের মধ্যে অস্ত্র চালনা করতে পারে। তার বুকের বর্মে একটি নীলগাইয়ের চিত্র খোদাই-করা। অপর পাশে হাতে কন্টক নিয়ে দাঁড়িয়ে একজন প্রকাণ্ড পুরুষ। এত লম্বা মানুষ হয় তা না দেখলে ভাবা যেত না। তার চেহারা দেখে মনে হয় সে মাটিতে দাঁড়িয়ে হাতির পিঠে বসা মাহুতকে নামিয়ে আনতে পারবে। আরেকটি জিনিস লক্ষ্য করলাম একটি অদ্ভুত প্রাণী আছে। খাঁচায় বদ্ধ প্রাণটির চেহারা সিংহের মতো। তার ডানা আছে এবং তার সামনের দুটি পদ পাখির ন্যায়। শুনেছি অন্ধক অপরাবিদ্যা ও জাদু দিয়ে একে নির্মাণ করেছে। এর নাম ‘টিমেরা’।
এই ভয়ংকর মিশ্র প্রাণীটিকে তিনটি মানুষের মাস দিয়ে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করা হয়। গ্রহণের দিন একটি পূর্ণ বয়স্ক হস্তিকে খাদ্য হিসেবে পরিবেশন করতে হয়। তবেই এর শক্তি বাড়ে। প্রাণীটিকে দেখেই সৈন্যবাহিনীতে সাড়া জেগে গেল। যাওয়ারই কথা এমন ভয়ংকর প্রাণী ইতিপূর্বে আর দেখা যায়নি।
*****
অন্ধকের বাহিনী আর তার সুবিন্যাস্ত ব্যূহ বদেখে বোঝাই যাচ্ছিল যে আমাদের এ লড়াই কতটা কঠিন। তাই আমাদের পন্থার আসল রূপটি প্রকাশ করা হল। এতদিন এর কথা কেবল আমরা তিনজন, বশিষ্ঠ, নয় রক্ষ এবং দুই অসুর জেনেছে। আর জেনেছে শ্রমিকরা। এতদিন ধরে অরন্যের গভীরের সবথেকে বড় ছয়টি বৃক্ষকে ছেদন করে, কর্তন করে প্রস্তুত করা হয়েছে সুবিশাল তিনটি ক্ষেপণ যন্ত্র। আকারে তারা মণ্ডপের সমান। যন্ত্রগুলি কিন্তু দূরপাল্লার নয়। তাদের ধ্বংসাত্মক শক্তি অসীম। অসুর বাহিনীর শেষ সৈন্যটি গিরিবর্ত্ম পার করে এসে ব্যূহে অংশগ্রহণ করা মাত্র সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দিয়ে আক্রমণ করা শুরু হল। সে ক্ষেপণাস্ত্র কিন্তু অসুরদের আক্রমণ করল না। অসুর বাহিনীকে পেরিয়ে গিয়ে গিরিবর্ত্মের মুখ পাথর ফেলে বন্ধ করে দিল। গিরিবর্ত্মকে ধ্বসিয়ে দিয়ে তাদের পিছু হটবার পথ বন্ধ করে দিল। এবারে আসল যুদ্ধ। সামনে ধুধু প্রান্তর আর দুদিকে গভীর অরণ্যে। এ অরণ্যে তারা পূর্বে প্রবেশ করেনি। এই অরণ্য আমাদের জন্য। তাই অরণ্যকে আমরা সাজিয়েছি আমাদের মতো করেই।
যুদ্ধের অন্তিম পর্যায়
আমাদের লক্ষ্য ছিল অন্ধকের বাহিনীকে বিশৃংখল করে দেওয়া। কারণ তার বাহিনীর এতটাই শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল তাকে ভাঙতে না পারলে, একদম কেন্দ্রে অবস্থিত ধুন্ধুকে হত্যা করা প্রায় অসম্ভব। তাদের ব্যূহরচিত হয়েছে একেবারেই নিরেট একটি আয়তের মতো। সেই আয়তের মাঝে ধুন্ধু ও পার্শ্বচরদিগকে চিনতেই পারা যায় না পোশাকের রং সবার এক। ফলে রক্ষী পরিবৃত ধুন্ধু আর তার বাকি সেনানীদের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। শোনা যায় ঘোটক বাহিনীর আক্রমণ, শরের আক্রমণ, রণহস্তীর আক্রমণ কোনো কিছুতেই এই বাহিনীকে ভাঙতে পারা যায় না।
বিপরীত দিকে যখন অসুরদের প্রচণ্ড বজ্রনির্ঘোষ-এর মতো রণহুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। তখন ইক্ষ্বাকুদের বাহিনীর ব্যূহ তুলনায় অনেক অনেক হালকা। রচিত-ই হয়েছে আলগাভাবে। তাকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বা বিশৃঙ্খলও বলা যায়। কেন্দ্রের অবস্থান করছে সেই সেরা পাঁচ যোদ্ধা অর্থাৎ কুবলয়াশ্ব নিজে, উঘনি, বিশেণ ও অন্যান্য দুই যোদ্ধা। তাদেরকে বেষ্টন করে এক সারি যোদ্ধা। এইভাবে তিনটি পরতে তিন সারি যোদ্ধা। তাদের চারদিকে সূর্যকিরণের রশ্মিচ্ছটার ন্যায় লম্বা আটটি দাড়ায় বাকি সৈন্যদের সমাবেশ।
শঙ্খ বাজিয়ে প্রথম আক্রমণ করল ইক্ষ্বাকু বাহিনী। দুরন্ত বেগে দুটি দাড়া থেকে অশ্বারোহী সৈন্যরা হয়ে ছুটে গেল অসুর বাহিনীকে আঘাত করার জন্য। সে এক অনন্ত মুহূর্ত। আশেপাশের পরিবেশ যেন থম মেরে অপেক্ষা করছে এক দারুণ সংঘর্ষের। অসুরেরা তাদের লৌহের বিশাল ঢালগুলিকে সামনে নিয়ে প্রাচীরের ন্যায় অবরোধ সৃষ্টি করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অশ্বরা আছড়ে পড়বে সেই প্রাচীরের উপর কিন্তু তা হলনা খানিক দূর থেকে হঠাৎ করেই ফিরে আসতে লাগল অশ্ব বাহিনী। তারা ব্যূহে ফিরে এলে আরও দুইটি দাড়া থেকে অনুরূপ প্রক্রিয়া করা হল। তারাও একই ভাবে প্রত্যাবর্তন করল। তারপর আরও দুইটি দাড়া থেকে একইরকম প্রত্যাবর্তন। সূর্য তখন মাথার উপরে উঠে গেছে অসুর বাহিনীর ধৈর্য ভেঙে গেল। তারা নিজেরাই ভেঙে বিক্ষিপ্তভাবে ছুটে আসতে লাগল ইক্ষ্বাকু বাহিনীর দিকে। এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল ইক্ষ্বাকু বাহিনী। দাড়াগুলো চারটি করে দাড়ার সৈনিকরা যুথবদ্ধ হয়ে গেল। মাঝের বৃত্তগুলো ভেঙে গেল, বক্র অর্ধচন্দ্রের আকার নিল বাহিনীর সেনা। অসুরদের মাথায় তখন রক্ত চড়ে গেছে। যুদ্ধনীতি একটাই রাজা বা মূল রণনায়ককে হত্যা করে যুদ্ধ শেষ করো। তারা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে এই অর্ধচন্দ্রাকৃতি ব্যূহের মাঝে রাজা কুবলায়শ্ব ও তার দুই পার্শ্বচর এবং এই চন্দ্রের দুই প্রান্তে বাকি দুই জন। সবাইকে তারা হত্যা করবে এবং যুদ্ধ শেষ করবে।
এদিকে ব্যূহ ভেদ করার দরুন উন্মুক্ত হয়ে গেছিল মাঝের ধুন্ধু ও তার ছোট্ট পার্শ্বচরবাহিনী। যে মুহূর্তে অসুরদের সমস্ত ব্যূহ সেই অর্ধচন্দ্রে আঘাত হানতে উদ্যত হল সেই মুহূর্তেই অর্ধচন্দ্র অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সচল হয়ে একটি পূর্ণ বৃত্তের আকার নিল। এখন সেই বৃত্তের অভ্যন্তরে অসুরের বাহিনী। বৃত্তের বাইরে সুবিশাল ইক্ষ্বাকু সেনা। ভিতরে সংঘর্ষ কি হয়েছিল বলা যায় না কিন্তু সেই অসুরের একজন প্রাণ নিয়ে আসতে পারেনি। এরপর দেখা গেল এক সম্পূর্ণ অন্য পরিবেশ সৃষ্টি হল। সেই বাহিনীর মাঝখান থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল দশজনের একটি সেনাদল যেন একটি লৌহখণ্ডকে রজ্জু বেঁধে বৃত্তাকার ঘোরাতে ঘোরাতে লৌহখণ্ডটি কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে ছিটকে বেরিয়ে গেছে।
দশ জনের বাহিনীতে অবশ্যই ভাবে ছিল সেই পাঁচজন ও বাকি পাঁচজন সেরা যোদ্ধা। বাহিনীর বাম পাশে ছিল উঘনি। সহসা তার মনে হল তার আশেপাশে যেন এক দারুণ ঝড় উঠেছে এবং তার সাথে সাথেই তার পাশের দুই যোদ্ধা নিমেষে ধরণী নিল। সে বুঝতে পারছে কি হতে চলেছে। বাহিনীর আরেকটু বামে সরে এল। নিজেকে পৃথক করে নিল। ঘোড়ার গলায় চাপ দিয়ে স্থির হতেই দেখতে পেল সেই কালান্তককে, মরিৎ। দ্রুতগতি মরিৎ হাওয়ায় যেন ভর করে তার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাতে ভীষণ পলকা এক তরবারি, এত পলকা যে তার মনে হল বাতাসের ধূলিকণাকেও দ্বিখণ্ডিত করে দেবে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই উঘনির শিরস্ত্রাণ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। তাহার তরবারির আঘাত হতে কোনোমতে প্রাণ রক্ষা করে মাটিতে গড়িয়ে গেল উঘনি। তারপর শুরু হল ভীষণ সংগ্রাম।
অন্যদিকে বিশেণের মুখোমুখি হয়েছে করিৎ। সে একজন ভীষণ দর্শন পুরুষ। তকে ঠিক কি বলা যায় বলা মুশকিল। এমন মানুষ দেখা যায় না। তার হাত পায়ের চাপে এ মাটি কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না বিশেণ, আঘাত করবে কী….
ওদিকে ধুন্ধুর সামনে পড়ে কুবলাশ্বও একই অবস্থা। ধুন্ধু ডাইনে-বাঁয়ে আগে-পিছে সমানতালে গমন করতে পারেন সেই সঙ্গে একই সাথে দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় দু-হাতে ভল্ল ও মুদগর চালাতে পারেন।
ধন্ধুকে একেবারে সামনাসামনি পেয়ে প্রথমটায় কুবলায়শ্ব একেবারে হতচকিত হয়ে পড়েছিল। তার সমস্ত রাগ ক্রোধ তাকে বলছিল তাকে তার হাতের ভল্লটা দিয়ে গেঁথে ফেলতে, পরমুহূর্তেই তার নিজের মন তাকে সামলালো।
এদিকে ধুন্ধু তার সাথে এক চমৎকার খেলা খেলে চলেছে। বারে বারে তার সামনে এসে তাকে উত্ত্যক্ত করছে। শেষমেষ নিজেকে আর আটকাতে পারলেন না ইক্ষ্বাকু কুলতিলক। নিজের হাতের ভল্ল উঁচু করলেন গেঁথে ফেলার জন্য আর ঠিক তখনই চোখের নিমেষে উধাও হয়ে গেল ধুন্ধু। ধন্দের অপর নাম। যতক্ষণে সামনে তিনি ভল্ল উঁচু করে ধরেছেন ততক্ষণে তার পিছনে এসে কাঁধের উপর আড়াআড়ি ক্ষত তৈরি করেছে ধুন্ধুর তরবারি। এইভাবে ডাইনে বামে আগে পিছে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে তাকে পর্যুদস্ত করে ফেলল ধুন্ধু। তারপর মায়া তো আছেই। এক পর্যায়ে মনে হল কুবলয়াশ্বের, তার মধ্যম সন্তানরা মাটির ভিতর থেকে ডাকছে। কখনো মনে হল ডানদিকের অরণ্য থেকে তার স্ত্রী তার নাম করে ডাকছেন। আর এই মুহূর্তের জন্য মনঃসংযোগ নষ্ট হলেই আঘাত হানে ধুন্ধু। শেষপর্যন্ত বশিষ্ঠ বাধ্য হয়েই কুবলায়শ্বের মনের বাঁধন খুলে ফেললেন। এইরূপ আহত মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে ধুন্ধু সম্ভব নয়। কুবলয়ের মস্তিষ্কে প্রবেশ করলেন তিনি। অধিকার নিলেন তাঁর মস্তিষ্ক প্রকোষ্ঠের। মস্তিষ্ক প্রকোষ্ঠ সুরক্ষিত হতেই কেটে গেল কুয়াশা। সবকিছু আবার দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। এই তো সেই রণভূমি আর ধুন্ধু ঢুকে আজ তাকে হত্যা করতে হবে এটাই সত্য, এটাই সার।
অন্যদিকে অন্ধক দেখল বশিষ্ঠ ধ্যানে বসেছেন। তিনি এখন প্রায় মৃত। তার সূক্ষ্ম দেহ তার শরীর ছেড়েছে। এই অবস্থায় তাকে যদি আঘাত করা যায় তাহলে দুটো বিষয় হবে। হয় অতি দ্রুত তার মস্তিষ্ক তার শরীরে ফিরে আসতে চাইবে। সেক্ষেত্রে কুবলয় আবার দুর্বল হবে। আর যদি তার শরীরকে বিনষ্ট করা যায় তাহলে তার দেহের মৃত্যু ঘটবে। অবশিষ্ট জীবন বায়বীয় ও দুর্বল হয়ে রয়ে যাবে বশিষ্ঠ।
আশেপাশে যারা আছে তারাও এখন অসুরদের নিয়ে ব্যস্ত। লঘু পায়ে এগিয়ে চললেন অন্ধক তখন বিষয়টি প্রথম লক্ষ্য করল উঘনি। সে তখন মরিৎ-এর ফাঁদে পড়েছে। তাকে দেখা যায় না বাতাসের বেগে সে আশেপাশে শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষমেষ বাধ্য হয়েই স্মরণ করল সেই বিশেষ অস্ত্রকে। এ অস্ত্র আর কিছুই নয় লোহার শিকল মাত্র। কিন্তু সে শিকলে ইন্দ্রদেব বজ্র প্রবেশ করিয়ে একে এমন শক্তিধর করে তুলেছেন, সে যে লৌহ হয়েও লৌহকে আকর্ষণ করতে পারে। দ্রুতগতি মরিৎ যতই হোক মরিৎ-এর লৌহবর্মকে এইটা আকর্ষণ করবে। এই শিকলে একবার বেঁধে ফেলতে পারলে নিস্তার নেই। কিন্তু শিকল ব্যবহারের অসুবিধা আছে আশেপাশে বাকিদের অস্ত্র, লৌহবর্ম আকর্ষণ করবে অতএব তাকে দূরে যেতে হবে। আর দূরে গেলে গুরুদেবকে একা রেখে যাওয়া হবে কিন্তু আর চিন্তার অবকাশ ছিল না। ততক্ষণে মরিৎ-এর লৌহ গোলকের আরেক ধাক্কা পেল তার উদরের নিম্নভাগে। শেষে খানিকটা দূরে গিয়ে অরণ্যের দিকে এসে আবাহন করল সেই চৌম্বক।
অন্ধক একবার পিছন ফিরে তাকালেন বুঝলেন মরিৎ-এর মৃত্যু সুনিশ্চিত। তারপর এগিয়ে গেলেন বশিষ্ঠ-এর দিকে। ওদিকে করিৎকে প্রায় পেড়ে এনে ফেলেছেন বিশেণ। প্রথম থেকেই নিজের শরীর ও মনকে খুব সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন তিনি। ফলে করিৎ-এর কোনো মায়া তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি উপরন্তু নিজের লঘু শরীরের সুবিধার জন্য তাকে উপুর্যুপরি আঘাত এনে ব্যস্ত ও রক্তাক্ত করে তুলেছেন তিনি।
****
তিনটি পরস্পর আওয়াজে সচকিত হলেন অন্ধক। একই সাথে বশিষ্ঠ ও নিজের শরীরে ফিরে এসে চোখ খুললেন।
সশব্দে করিৎ-এর আর্তনাদ। শরাহত হরিণের ন্যায় মরিৎ-এর আর্তনাদ আর ভীষণতম পঞ্চবাণ অর্থাৎ পঞ্চশরের আবাহন।
এই পঞ্চবাণ হল বিশ্বাস, মমত্ববোধ, সততা, জ্ঞান ও ভক্তি। পারিজাতের তৈরি এই পঞ্চবাণ, পাঁচটি বোধে মায়া ও মোহ কাটে। ষড়রিপুর প্রলোভন ছিন্ন করে।
যতক্ষণে অন্ধক এগিয়ে আসছেন ততক্ষণে পাঁচটি শর ধুন্ধুর শরীরকে বিঁধে ফেলেছে একই সাথে পঞ্চযোদ্ধা এক হয়েছেন। ধুন্ধুর শরীরে শেষ আঘাতের চিহ্নটা যখন এঁকে দিচ্ছে উঘনির তরবারি তখনই হঠাৎ করেই চতুর্দিক কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। নিজের শেষ মায়া বা ধন্ধটি চালালেন অন্ধক। আর তার মাঝেই অদৃশ্য করে দিলেন ধুন্ধুর নশ্বর দেহ।
ধুন্ধুর দেহ আর পাওয়া যায়নি। সেই দেহের হদিশ একমাত্র জানতেন যে মানুষটা। সেই অন্ধক আত্মহত্যা করলেন। নিজে নিজেকে ব্রহ্মহত্যার অভিশাপে জর্জরিত করলেন। যাতে বারে বারে তিনি মর্ত্যে ফিরে আসতে পারেন এবং অন্যকে জাগানোর চেষ্টা করতে পারেন। সবাই এটাই জানত যে তাকে তিনি সেই মূর্তির মধ্যে বন্দী করে দিয়ে গেছেন আর ধুন্ধুর দেহ চিরতরে তিনি হারিয়ে দিয়েছেন। যতদিন না ধুন্ধুর দেহের সৎকার হবে ততদিন তিনি ফিরে আসবেন। তাই বশিষ্ঠ দেবতাদের কাছে যুদ্ধজয়ের বর চেয়ে নিয়েছিলেন চিরঞ্জিবী হবার বর যাতে প্রতিবারে সেই যোদ্ধারাও ফিরে আসতে পারে এবং ধুন্ধুকে আবার ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে যতদিন না সেই দেহ আবিষ্কৃত হয়। অর্থাৎ পুনর্জন্মের আশীর্বাদ। সেই থেকে এই ক্রিয়া চলছে। কুবলয়াশ্ব পরিচিতি পেলেন ‘ধুন্ধুমার’ নামে।
বর্তমান সময়ের সকাল, ১৯৪৫, নভেম্বর ২৭
কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভীষণ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল বারবারিকম বা বর্তমান করাচীর সমুদ্র বন্দর। সমুদ্রতট অন্যান্য অঞ্চল প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে নিয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তছনছ হয়ে গেল প্রকৃতি। মুহূর্তে মারা গেল কয়েক হাজার মানুষ। ভারতবর্ষের ইতিহাসে ভয়ংকরতম ভূমিকম্প ইহা। কম্পনের তীব্রতায় কেঁপে উঠে তাসের বাড়ির মতো ঝরে পড়ল বাড়িঘর। সেই কম্পনের ধাক্কা এসে লাগল শেষ রাতে ঘুমিয়ে পড়া চারজন মানুষের মনের প্রকোষ্ঠে। সেইসাথে জমিদার বাড়ি ছেড়ে রওনা হয়ে গেল সেই দুই আগন্তুক ও জমিদার। প্রজারা জানলেন জমিদার বিশেষ কারণে গ্রাম ছেড়েছেন। তার কয়েকদিন পরেই সামান্য এক জমি-জমা সংক্রান্ত বিষয়ে এক প্রচণ্ড দাঙ্গায় গ্রামের মানুষ একে অপরকে ক্ষতবিক্ষত করল। এতদিন যে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি বাস করে এসেছে তারাই আজকে হঠাৎ পরস্পরের প্রতি রক্তপিপাসু হয়ে উঠল। যাবার আগে অন্ধক আরেকবার শোধ নিল বারবারিকমের উপর।
পরদিন সকালে,
ভোর থেকেই মুখটা থমথমে হয়েছে সবার। সবথেকে বেশি রক্ষ সন্ধি আর উঘনির। উঘনি গর্ভবতী এমত অবস্থায় লড়াই করা অসম্ভব আর অসুরেরা এগিয়ে গেছে দুর্দান্ত গতিতে। এক্ষেত্রে পথ একটাই খোলা সেই সুড়ঙ্গের দ্বার খুলতে হবে সেক্ষেত্রে সুড়ঙ্গ দ্বারে পাহারা দিতে হবে দুই যোদ্ধাকে। তাদের মৃত্যু সুনিশ্চিত। তারা আটকাবে অসুরদের। তারপর পরবর্তী জন্মের অপেক্ষা। যদি সেই জন্মে ধরা যায় ধুন্ধুকে।
পারিজাত মন্দির,
পারিজাত মন্দিরের মানুষজনের কাছে যে খবর পৌঁছেছিল তা ক্রমশ এই হতাশা ব্যঞ্জক হয়ে উঠছিল। আশপাশের গ্রামগুলোতে সেখানে নাকি ভীষণ রকম কীট ও সর্পের আক্রমণ শুরু হয়েছে। গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই না পারিজাত মন্দিরের মানুষ যেন আজকাল প্রচণ্ড ভূকম্পন টের পান। তাদের আশেপাশের মাটির গভীরে কিছু বেয়ে চলার সড়সড় কম্পন অনুভব করেন। বুঝতে পারেন ভীষণ দুর্যোগ আসছে। এর মধ্যেই একদিন পারিজাত বৃক্ষ উপরে বজ্রপাত হয়েছে। গাছের কাণ্ড গুলি শুকিয়ে গেছে অর্থাৎ অস্ত্র তৈরির সময় এসেছে। নতুন পারিজাত বৃক্ষ তৈরি হবে। পুরাতন পারিজাত বৃক্ষের কাণ্ড দিয়ে তারা গোপনে অস্ত্র তৈরি করেই চলেছেন। মনে মনে প্রার্থনা করছেন অস্ত্র তৈরি করা তৈরি করা অবধি কোনো আক্রমণ না আসে কারণ যে অবস্থা তাতে করে তারা ভালোমতোই জানেন যে অসুরেরা পূর্ণশক্তিতে এগিয়ে আসছে। এমত অবস্থায় দুজন যোদ্ধার পুনর্জন্ম হয়নি তাও তারা জানেন।
রক্ষ সন্ধির সাথে নিয়মিত মনঃযোগাযোগ চলছে। ঈঙ্গিত অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। উঘনি গর্ভবতী, তার পক্ষে লড়াই কতটা দেয়া সম্ভব!
সে ক্ষেত্রে উপায় একটাই সেই সুড়ঙ্গের দ্বার খুলে দেওয়া। এই সুড়ঙ্গের দ্বার খুলে দিয়ে পাঁচজন রক্ষক যাবেন সেই অস্ত্র তাদের হাতে পৌঁছে দিতে। যদি অনুমান সত্য হয় তাহলে সেই মূর্তি গ্রামে অবস্থান করছে। কারণ গোটা গ্রামে তাদের মানসিক শক্তি বারেবারে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। সেই মূর্তিকে যুদ্ধে যখন হারানো সম্ভব নয় বা ফেরত পাঠানো অসম্ভব। তখন এই পঞ্চশর দিয়ে আটকে রাখতে হবে অপেক্ষা করতে হবে আরেকটি পুনর্জন্মের।
বিভবসুড়ঙ্গ
এক এক আপাতকালীন বন্দোবস্ত। যোগ রক্ষের কাজ এই সুড়ঙ্গ রক্ষা। বিশেষ বিশেষ সময়ে ইহা উন্মোচিত হয়। প্রকৃতির মধ্যেই আছে এর দরজা। কিন্তু অদৃশ্য করা থাকে। এই সুড়ঙ্গ একটি বৃহৎ মৃণালের ন্যায়। বায়বীয়। প্রয়োজনে সংকোচন ও প্রসারণ সম্ভব। স্বচ্ছন্দে গমন করা যায় এর অভ্যন্তরে। যখন প্রয়োজন পড়ে কেবল একে তুলে নিয়ে ইপ্সিত ও গন্তব্যের মুখে বসিয়ে দেন রক্ষ।
যেমন এখন বসানো হয়েছে পারিজাত মন্দির ও সেই গ্রামের মধ্যে। কয়েকশত ক্রোশের এক মৃণাল। আসলে সময়দ্বার হল এই সুড়ঙ্গ। আলোক-বিজ্ঞান ও গতির অপূর্ব সমন্বয়। সেখানে সময়ে একক ও মান বড়। দশদিনের পথ পাড়ি দেওয়া যায় মুহূর্তে।
কয়েকমাস পরের এক সন্ধ্যা
তিন দিন পূর্বে দ্বার খোলা হয়েছিল সুড়ঙ্গের। সুড়ঙ্গ পথে বেয়ে নেমে এসেছিল পাঁচরক্ষক। সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ ও হাহাকার বুঝিয়ে দিচ্ছিলো যে পারিজাত গ্রামে আক্রমণ হয়েছে। দাঁতে দাঁত কামড়ে অস্ত্র চেপে লড়াই দিয়ে গেছে এই তিন দিন। আজকে আর সম্ভব নয়। কুশের সর্ব শরীর রক্তাক্ত। বাম পদখানা কনুই হতে বিচ্ছিন্ন। এক ভয়ানক তক্ষক তার বাম পদ খানা কেটে নিয়েছে। সেও ছাড়েনি সর্পের মাথাটি অল্প দূরেই লুটোচ্ছে। প্রাণ থাকতে একটি মক্ষীও…. অনেকক্ষণ ধরেই রক্ত বমন করে চলেছে সেই পাঁচ রক্ষক ও বিশেণ। কোন মাটি কামড়ে লড়াই দিয়ে চলেছে এখনও। উঘনি ও তাদেরকে ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। নিজের সন্তানকে কালীকা ঠাকুরের হাতে তুলে দিয়ে সেও তাদের সাথে লড়াই করছে। সন্তান প্রসব করা মায়ের শারীরিক শক্তি কতটুকু! তবুও সে যেন সাক্ষাৎ রণচণ্ডী। দুইটি সর্প বাহিনী ও অসুর বাহিনীর মূল স্রোতকে একাই সামলেছে।
সহসা সাড়া জাগল সুড়ঙ্গের গুহামুখে। তাদের সামনে প্রাচীরের মতো করে রাখা অসুরদের মৃতদেহ। এই মৃতদেহের স্তূপই তাদের অবরোধ। হঠাৎ করেই প্রচণ্ড আঘাত এসে মৃতদেহ প্রাচীর ছিটকে দিল। কেঁপে উঠল মাটি। এ প্রচণ্ড আঘাত সেই ভয়ংকর মিশ্র জানোয়ার ছাড়া আর কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। তার মানে শেষ আঘাত আসছে। এই উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে ড্রাগন নামক একটি জানোয়ারের কিংবদন্তী অতি প্রাচীন। কেউ বলে ‘ঢিমেরা’। শেষবার ঐরাবত তার বাম ডানা ছেঁটে তাকে ভূগর্ভের এক গহ্বরে বন্দী রেখেছিল। সেদিন যুদ্ধকালে ধুন্ধুকে বধ করার পাশাপাশি এই মিশ্র জানোয়ারটিকে বধ করা বড় সমস্যা ছিল।
তাই সেদিন বশিষ্ঠ আবাহন করেছিলেন ইন্দ্ররথ ”ঐরাবত”কে। সপ্ত শুঁড় ও চতুর্দন্তের এই ”ঐরাবত” এর নাম ”নাগমল্ল” কৌস্তভ রত্নের ভস্ম মেখে এর গাত্রবর্ণ শ্বেত। এই ভাম তার বর্মও বটে।
সেদিন সে ভীষণ সংগ্রামে ঐরাবতের দত্ত সেই ‘ঢিমেরা’ র পাখা বিদ্ধ করলে ভূমি নেয় ‘ঢিমেরা’। তখন বারংবার পদাঘাত করে তাকে ভূ-অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দেন। আজ তাকে মুক্ত করে এনেছে অন্ধক।
অন্ধক আর মরিৎ ও নিশ্চিত আসছে এর পিছনে। দাঁতে দাঁত চেপে শেষ লড়াইটা দেবার জন্য প্রস্তুত হল সবাই। আর ঠিক সেই সময় প্রচণ্ড ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল মাটি। না ভূমিকম্প নয় এটা বজ্রপাত, এক প্রচণ্ড বজ্রপাত। এই বজ্রপাত একাঘ্নি পঞ্চশরের আবাহনের বজ্রপাত। হাসি ফুটে উঠল পাঁচযোদ্ধার। তারা নিশ্চিন্ত তাদের যুদ্ধ বিফলে যায়নি। রক্ষসন্ধি পেরেছেন, তিনি পেরেছেন।
রসিকের কথা,
পাঁচটি শর গেঁথে মূর্তির জাগরণের পথ বন্ধ করার পর মুখ খুলেছিলেন রক্ষসন্ধি। রসিকের কাছে তাদের মুখ খুলতেই হত। রসিক এই বংশের এতদিন দেখভাল করে এসেছে। তার থেকে বড় কথা ছোট কুমারের স্ত্রীর গর্ভে অসুরের সন্তান। ওই সন্তানের মধ্যে কি লক্ষণ ফুটে উঠছে কে জানে তাই রসিককে সাবধান করে দিয়েছিলেন সবকিছু বলে। তারপর উঘনির ছেলেটাকে বুকে করে বেরিয়ে এসেছিলেন। একে বাঁচাতেই হবে, এর মধ্যে একই সাথে বিশেণ ও উঘনির রক্ত বইছে।
