নকশা-কাটা কবজ – ১২
১২
ঘুম ভাঙার পর রাজু বালিশের নিচ থেকে তার ঘড়িটা বের করে সময় দেখল। আটটা তিরিশ। সকাল নয়টায় একটা ক্লাস আছে, যত চেষ্টাই করুক সেটা ধরতে পারবে না। পরের ক্লাসটা এগারোটার সময়। কাজেই তার হাতে যথেষ্ট সময়। তা ছাড়া কিছুদিন হলো ক্লাস না করে করে অভ্যাস হয়ে গেছে, খুব সহজেই আজকাল সে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস বাদ দিয়ে দিচ্ছে। দেখতে দেখতে তার জীবনটা কেমন যেন খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা সে বুঝতে পারছে কিন্তু সেটা নিয়েও তার খুব একটা মাথাব্যথা নেই।
রাজু বিছানায় শুয়ে শুয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করল কিন্তু আর ঘুম আসতে চাইল না। সে বিছানা থেকে উঠে বসে। মাথার কাছে টেবিলে একটা কাগজ বই দিয়ে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। রাজু কাগজটা টেনে এনে সেখানে চোখ বুলায়—আগের রাতে যে সমস্ত বিদেহী আত্মা তার সাথে যোগাযোগ করে নানা রকম অনুরোধ করে রেখেছে তার তালিকা। রাজু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার এই নূতন দায়িত্ব সে কেমন করে চালিয়ে যাবে? যদি উল্টোটা শুরু হয়ে—জীবিত মানুষেরা খবর পেয়ে যায় সে মৃত মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে তখন কী হবে? এই কবজটির দায়িত্ব সে সারা জীবন নিতে পারবে না। কোনো একটি সময়ে কবজটা ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু কোন জায়গাটি ঠিক জায়গা?
রাজু বাথরুম থেকে বের হয়ে তার ফ্রিজে উঁকি দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেন তার ফ্রিজে খাওয়ার উপযোগী কোনো খাবার থাকে না? কেন সে পাউরুটি ছাড়া আর কোনো খাবারের কথা জানে না? রাজু পাউরুটির প্যাকেট বের করে আনে। কপাল ভালো এখনও ফাঙ্গাস পড়েনি। এক স্লাইস বের করে সে মুখে দেয়। কোনো স্বাদ নেই, থাকার কথা না। শুকনো রুটিটা চিবিয়ে খেয়ে রাজু উঠে দাঁড়াল, রান্নাঘরে টি ব্যাগ আছে কি না জানে না, যদি থেকে থাকে তাহলে সে এক কাপ চা বানিয়ে খাবে। রাজু রান্নাঘরে যাবার আগে জানালা দিয়ে একবার বাইরে উঁকি দিলো। রাস্তার পাশে একটা গাড়ি পার্ক করে রাখা, সেখানে হেলান দিয়ে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে তার জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। রাজুর চোখাচোখি হতেই মানুষটি ঝট করে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
রাজুর বুকটা কেঁপে ওঠে। তার কাছে যে কবজটি আছে সেটা কি জানাজানি হয়ে গেছে? রাস্তার লোকটির সাথে চোখাচোখি হওয়ার বিষয়টা যে রাজু বুঝতে পেরেছে সেটি বুঝতে না দেওয়ার জন্য সে আরো কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে জানালা দিয়ে বাইরে ইতস্তত তাকিয়ে রইল। সরাসরি না তাকিয়ে চোখের কোনা দিয়ে মানুষটিকে লক্ষ করল। মানুষটি চলে যায়নি—রাস্তা পার হয়ে অন্যদিকে গিয়ে সে এখন দাঁড়িয়ে আছে। সেও নিশ্চয়ই এখন চোখের কোনা দিয়ে তাকে লক্ষ করছে।
রাজু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রান্নাঘরে গেল চা তৈরি করতে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সে আবার বাইরে তাকাল। মানুষটি এখনও দাঁড়িয়ে তার জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
রাজু চা তৈরি করে তার ডাইনিং টেবিলে বসে চায়ে চুমুক দেয়। অত্যন্ত বিস্বাদ চা, এর চাইতে শুধু গরম পানি খেলে মনে হয় ভালো লাগত। কিন্তু এই মুহূর্তে রাজু সেটি নিয়ে মাথা ঘামাল না। কবজটিকে সে রক্ষা করতে চায়। এখন সেটি সাথে নিয়ে সে বের হতে চায় না—তাহলে হয়তো তাকে ধরে নিয়ে তার কাছ থেকে ছিনতাই করে নেবে। কবজটা এখানেই লুকিয়ে রাখতে হবে—কিন্তু এমনভাবে লুকাতে হবে যেন কেউ খুঁজে না পায়। সেটি কি সম্ভব? রাজু ঘরের চারপাশে তাকায়—ইচ্ছে করলেই সে আরেকটু ভালো করে লুকাতে পারে কিন্তু যারা এই কাজে প্রফেশনাল, তারা নিশ্চয়ই খুব সহজে সেটা বের করে ফেলবে। রাজু চিন্তা করতে থাকে কোথায় কীভাবে কবজটা লুকাতে পারে।
ঠিক তখন দরজায় শব্দ হলো। রাজু চমকে ওঠে, তাহলে কি মানুষগুলো তার ঘরে চলে এসেছে? রাজু যতটুকু সম্ভব গলার স্বর স্বাভাবিক করে জিজ্ঞেস করল, “কে?”
বাইরে থেকে একজন মহিলা উত্তর দিলো, “আমি।”
রাজু গলার স্বর চিনতে পারে। তাদের মেসের বোর্ডারদের রান্না করে দেওয়ার জন্য যে মহিলাটিকে রাখা হয়েছে সে এসেছে। রাজু বুক থেকে আতঙ্কের চাপা নিশ্বাসটি বের করে দিয়ে দরজা খুলল। মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী খবর খালা?”
এটি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন নয়—এই প্রশ্নের উত্তর কেউ আশা করে না। কিন্তু মহিলাটি বেশ সময় নিয়ে তার খবর জানাল, তার স্বামী অসুস্থ কিন্তু সে সন্দেহ করছে অসুস্থতার পুরো ব্যাপারটি ভান। তার স্বামী অলস প্রকৃতির মানুষ, তাই কাজে না যাওয়ার জন্য এগুলো তার একধরনের উছিলা! মহিলাটি এই তথ্য দিয়েই থেমে গেল না, তার স্বামীকে দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সে পুরো পুরুষ জাতির প্রতি একটা ঢালাও অসম্মানজনক মন্তব্য করে রান্নাঘরে ঢুকে হাঁড়ি-পাতিল টানাটানি করতে লাগল।
রাজু যে রকম ভেবেছিল ঠিক সেরকমভাবে মহিলাটি রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে বলল, “চাউল, ডাইল, তেল, মসলা কিছুই তো নাই। বাজার না করলে খাবা কী?”
রাজু বলল, “আমি একলা মানুষ। আপনি রাঁধবেনই কী আর আমি খাবই কী! এর চাইতে কয়দিন অপেক্ষা করেন। নূতন বোর্ডার আসুক তখন দেখা যাবে।”
“আর এ কয়দিন কী খাবা? কোথায় খাবা?
“কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”
মহিলা রাজুর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, তারপর রান্নাঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল এবং ঠিক তখন রাজুর চোখে পড়ল খালার হাতে একটা তাবিজ বাঁধা। তাবিজটি চারকোনা এবং যথেষ্ট নকশাকাটা। সাথে সাথে রাজুর মাথায় একটা চিন্তা খেলা করল। সে খালাকে ডেকে বলল, “খালা—আপনার হাতে এইটা কিসের তাবিজ?”
খালা তার তাবিজটির দিকে তাকাল, তারপর একটু বিব্রত ভঙ্গিতে হাসল, বলল, “এই তো রোগশোক, বালা-মসিবত তাড়ানোর তাবিজ।”
“আপনি এইটা কোথায় পেয়েছেন?”
“রাস্তা থেকে কিনেছি।
“কত দাম?”
খালা আবার বিব্রত ভঙ্গিতে হাসল, বলল, “দশ-বিশ টাকা হবে মনে হয়।”
“আপনি আমাকে এই তাবিজটা দিবেন? আপনাকে টাকা দেই আপনি আরেকটা কিনে নেবেন।”
যেকোনো হিসেবে এটা যথেষ্ট বিচিত্র একটি অনুরোধ তাই খালার একটু সময় লাগল পুরো বিষয়টা বুঝতে। বোঝার পর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমার তাবিজটা নিতে চাও? কেন? কী করবা?”
একটা বিশ্বাসযোগ্য উত্তর না দিলে হবে না তাই রাজু মুখ গম্ভীর করে বলল, “আমাদের ইউনিভার্সিটি থেকে তাবিজের উপর গবেষণা হচ্ছে। সেই জন্য আমি তাবিজ খুঁজে বেড়াচ্ছি। সব তাবিজ দেখি গোল— ঢোলের মতো। আপনারটা চারকোনা—”
খালা তার তাবিজটা দেখল, তারপর রাজুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি তাবিজের দোকানে গেলে অনেক রকম তাবিজ কিনবার পারবা—”
“আমি সময় পাব না খালা। তোমারে টাকা দেই তুমি আরেকটা কিনে নিও।”
খালা তার তাবিজটা হাতছাড়া করতে চাচ্ছিল না কিন্তু রাজু তাকে বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজি করিয়ে ফেলল।
খালা চলে যাবার পর রাজুর আবার জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। মানুষটা এখনও যায় নাই। সে এখন গাড়ির ভেতর ড্রাইভিং সিটে বসে তার জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। রাজুর সাথে চোখাচোখি হওয়া মাত্রই আবার ঝট করে চোখ সরিয়ে নিল।
রাজু তখন খালার তাবিজটা নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল। শেলফে বইয়ের পেছনে রাখা জেলির বয়ামটা বের করে সেখান থেকে কবজটা ঢেলে তার পড়ার টেবিলের ওপর রেখে বয়ামটা খালি করে নেয়। খালার তাবিজটা সেখানে রেখে বয়ামের মুখটা ভালো করে বন্ধ করে শেলফে বইয়ের পেছনে রাখল। যে কেউ একটু খুঁজলেই এখন এটা পেয়ে যাবে, ইচ্ছে করলে তখন এটা নিয়েও যেতে পারবে।
রাজু এখন আসল কবজটা কোথায় লুকিয়ে রাখবে সেটা চিন্তা করতে থাকে। এই অ্যাপার্টমেন্টে লুকানোর জায়গা বিশেষ নেই—কাজেই একটু বুদ্ধি করে লুকাতে হবে। এমন জায়গায় লুকাতে হবে যেখানে কেউ খুঁজবে না। রাজু তার নিজের রুম, ডাইনিং রুম এবং কিচেনটা ঘুরে ঘুরে দেখল। শেষ পর্যন্ত কিচেনের গ্যাসের চুলার কাছে রাখা ম্যাচের বাক্সটা তার পছন্দ হলো। ভেতর থেকে ম্যাচের কাঠিগুলো বের করে সেখানে সাবধানে কবজটা রেখে তারপর ওপরে ম্যাচের কাঠিগুলো রেখে দেয়।
এখন ম্যাচ বাক্সটা খুললেও কেউ কবজটা দেখবে না। কাঠিগুলো বের করলে তখন কবজটা দেখা যাবে। ম্যাচ ব্যবহার করতে হলে সবাই একটি কাঠি বের করে নেয়, কখনোই সবগুলো কাঠি একসাথে বের করে না। রাজু তখন চুলার পাশে ড্রয়ার খুলে সেখানে রাখা চামচ-চাকুর সাথে ম্যাচ বাক্সটাও রেখে দিলো। কেউ এখন এটাকে আর সন্দেহজনক কিছু মনে করবে না। এই অ্যাপার্টমেন্টে যদি কেউ আসে তাহলে তার খালার রোগশোক, বালা-মুসিবতের তাবিজটা নিয়ে যাওয়ার কথা। রহস্যময় করজটা খুঁজে পাওয়ার কথা না
রাজু এরপর ঘর থেকে বের হলো। সিঁড়ি দিয়ে নেমে সে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে। চোখের কোনা দিয়ে সে দেখল গাড়ির ভেতর থেকে মানুষটি বের হয়ে তার পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করেছে। রাজু কী করবে ঠিক বুঝতে পারল না তাই সে শান্তভাবে হাঁটতে থাকে। দিনের বেলা, চারপাশে মানুষজন, এখানে কেউ তার ভয়ানক কিছু করার চেষ্টা করবে বলে মনে হয় না।
রাজু হঠাৎ টের পেল পিছনের মানুষটি দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে, রাজুর শরীরটা উত্তেজনায় টানটান হয়ে যায়—তাকে কি ধরে ফেলবে? তাকে কি ধস্তাধস্তি করতে হবে? ছুটতে হবে?
রাজু শুনল, পিছন থেকে মানুষটি বলছে, “এই যে ভাই শুনছেন!” ….. রাজু দাঁড়াল এবং পিছনে তাকাল। ঘরের জানালা থেকে যে মানুষটির সাথে একাধিকবার চোখাচোখি হয়েছে, সে হেঁটে তার কাছে দাঁড়াল। রাজু টের পেল রাস্তা ধরে গাড়িটাও এসে তার পাশে থেমেছে। গাড়ির ভেতর ড্রাইভার ছাড়াও আরও একজন মানুষ। রাজু নিজের ভিতর একটা ভয়ের কাঁপুনি অনুভব করে। কেননা
রাজু মানুষটার দিকে তাকাল, বলল, “আমাকে বলছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কী ব্যাপার?”
“আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?”
রাজু বলল, “বলেন। পারলে
“আপনি এখন কোথায় যাচ্ছেন?”
“ইউনিভার্সিটি।”
“আপনাকে ইউনিভার্সিটি পৌঁছে দেই? তাহলে গাড়িতে বসে কথা বলতে পারব।”
প্রস্তাবটি যথেষ্ট নিরীহ প্রস্তাব, এটাকে মেনে না নেওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু নেহায়েত বাধ্য না হলে রাজু এই অপরিচিত সন্দেহজনক মানুষের গাড়িতে উঠতে চায় না। রাজু বলল, “থ্যাংক ইউ। কিন্তু আমাকে ইউনিভার্সিটি নামাতে হবে না, কী বলতে চান এখানেই বলে ফেলেন।”
মানুষটি একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, “আমি একটু নিরিবিলি কথা বলতে চাই।” তারপর তার কনুইটা ধরে বলল, “গাড়িতে ঢুকে যান। আপনার জন্যে ভালো, আমাদের জন্যও ভালো।”
রাজু কনুইয়ে কঠিন চাপ অনুভব করল। সে কি এখন ঝটকা মেরে নিজেকে মুক্ত করে নেওয়ার চেষ্টা করবে? চিৎকার করে কথাবার্তা বলে মানুষজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করবে? তার অবশ্য কোনোটাই করার সুযোগ হলো না, হঠাৎ করে গাড়ির পিছনের দরজা খুলে গেল এবং একজন ভেতর থেকে তার ঘাড় ধরে টান দিলো এবং বাইরের এই মানুষটি থেকে ঠেলে তাকে ভিতরে ঢুকিয়ে দিলো, সাথে সাথেই গাড়িটি ছেড়ে দিলো। রাজু মাঝখানে বসেছে এবং তার দুই পাশে দুইজন।
কিছুই হয়নি এ রকম ভান করে রাজু জিজ্ঞেস করল, “আপনারা কী করতে চান?”
“কবজটা কোথায়?”
রাজু কি ভান করবে যে মানুষগুলো কোন কবজের কথা বলছে সে সেটা জানে না? কিন্তু মনে হলো সেটা করা ঠিক হবে না। তাই জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মানুষটি জিজ্ঞেস করল, “এই ব্যাগের ভিতর কি আছে?”
রাজু মাথা নাড়ল, “না, নাই।”
মানুষটা তার কথা বিশ্বাস করল না। ব্যাগটা খুলে ভেতরে ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগল। তার বইপত্র, খাতা ব্যাগের বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। অন্য জন জিজ্ঞেস করল, “কবজটা কোথায়?”
রাজু বলল, “আপনারা কারা? পুলিশের লোক?”
“না, আমরা পুলিশের লোক না।”
“তাহলে?”
“খামখা এগুলো জানতে চেয়ো না। কবজটা দাও, আমরা তোমাকে ছেড়ে দেবো।”
রাজু একটা নিশ্বাস ফেলল, একজন নির্বোধ মানুষের মতো ভান করে বলল, “দেখেন, এই কবজের জন্য একজন মানুষ মারা গেছে। কাজেই এটা এখন পুলিশের তদন্তের বিষয়। কবজটা আমার পুলিশকে ফেরত দিতে হবে।”
রাজু একটা কর্কশ শব্দ শুনল, দেখল তার বাম পাশে বসে থাকা মানুষটার হাতে একটা ছোরা, সেটার কোনো এক জায়গায় চাপ দেওয়ার পর ছোরাটার ফলাটি আস্তে আস্তে খুলে বের হয়ে আসছে। মানুষটা বলল, “দ্যাখ ছেমড়া, আর একটু ঢং করবি তো ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দেবো। আমার এখন তোর সাথে কথা বলার সময় নাই। কবজটা কোথায় বল।”
রাজু বলল, “বাসায়।”
“বাসায় কোনখানে?”
“শেলফে। বইয়ের পিছনে।”
“যদি সেখানে পাওয়া না যায়, তোর ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দেবো।”
রাজু কোনো কথা বলল না।
মানুষটি গলা উঁচিয়ে ড্রাইভারকে বলল, “গাড়ি থামা।”
ড্রাইভার গাড়ি থামাল। যে মানুষটি ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দেওয়ার কথা বলেছে, সে গাড়ি থেকে নামল। কয়েক মিনিট পর আবার গাড়িতে উঠে বসল। বলল, “গাড়ি স্টার্ট দে।”
গাড়িটা আবার ছেড়ে দিল। শহরের ভিতর গাড়িটা ইতস্তত যেতে থাকে। রাজু বলল, “কবজটা কোথায় আছে আমি বলেছি। এখন আমাকে ছেড়ে দেন।”
কেউ তার কথার উত্তর দিলো না।
ঘণ্টাখানেক পর শেষ পর্যন্ত গাড়িটা ইউনিভার্সিটির কাছে থামল। মানুষটা বলল, “গাড়ি থেকে নেমে সোজা সামনে হেঁটে যাবি। পিছনে তাকাবি না।”
রাজু তার ব্যাকপেকটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামার জন্য রেডি হলো। মানুষটা বলল, “কাউকে কিছু বলবি তো লাশ ফেলে দিব। বুঝেছিস?”
“বুঝেছি।”
বাম পাশের মানুষটা গাড়ি থেকে দরজা খুলে দিলো। রাজু গাড়ি থেকে নেমে সামনে হেঁটে গেল। প্রচণ্ড অপমান আর ক্রোধে তার কান লাল হয়ে ওঠে। ইচ্ছে করছিল ঘুরে গিয়ে মানুষটার কলার ধরে তার মুখে একটা ঘুসি দিয়ে নিচে ফেলে দিয়ে বলে, “লাশ ফেলে দিবি? কে কার লাশ ফেলে দেয় দেখ একবার চোখ খুলে—”
কিন্তু সে কিছুই করল না, সারা জীবনেই কারো গায়ে সে কখনো হাত তুলে দেখেনি।
***
রাজু তাদের বিল্ডিংয়ে আসে, প্রথম ক্লাসটা মিস হয়ে গেছে। দ্বিতীয় ক্লাসটা মাত্র শুরু হয়েছে। রাজু পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে গেল। ক্লাস রুমগুলো ভালো, পিছন দিয়ে ঢোকা যায় আবার ইচ্ছে করলে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ না করে বেরও হয়ে যাওয়া যায়।
পাশের ছেলেটি মাথা ঘুরিয়ে রাজুকে দেখল। সামনে স্যার গভীর মনোযোগ দিয়ে বোর্ডে লিখছেন। শোনা যায় গত বিশ বছর ধরে এই স্যার হুবহু এই কথাগুলো হুবহু এইভাবে বোর্ডে লিখে আসছেন। পাশের ছেলেটি গলা নামিয়ে বলল, “শুনেছিস?”
“কী?”
“মিলিয়ার হাজব্যান্ড মিলিয়ার ডেডবডি নিয়ে আসছে। দেশে লাশ কবর দিবে।”
ডেডবডি আর লাশ শব্দ দুইটা রাজুর কানে খট করে লাগল। একটা মানুষ যখন মানুষ না থেকে ডেডবডি কিংবা লাশ হয়ে যায় তখন সেটা এত অস্বাভাবিক শোনায় যে মেনে নেওয়া কঠিন। তবে মিলিয়ার ডেডবডি নিয়ে শাফকাত দেশে আসছে সেটি হচ্ছে সবচেয়ে বিচিত্র খবর। এই দানবটাকে কি খুন করে ফেলা যায় না? খুন?
রাজু একটা নিশ্বাস ফেলল। কী আশ্চর্য, সে আজকাল মানুষকে খুন করে ফেলার মতো চিন্তা করতে পারে?
