নকশা-কাটা কবজ – ৪
৪
কবরস্থানের মৌলভি সাহেব বসে বাস তার বাড়ির পাশের ছোট খেত থেকে আগাছা তুলছেন। ছাগল এবং গরুর উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য জায়গাটা বাঁশের কঞ্চি, গাছগাছালি দিয়ে ঘেরাও করার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। ছাগল কিংবা গরুর বাছুর নিয়মিতভাবে তার খেতের গাছগাছালি খেয়ে যাচ্ছে।
মৌলভি সাহেব আগাছা পরিষ্কার করে যখন তার বেগুন গাছে পানি দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন তখন দেখলেন তার ঘরের বারান্দায় দীর্ঘদেহী একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মৌলভি সাহেবের দৃষ্টিশক্তি কমে এসেছে, ভুরু কুঁচকে দেখার চেষ্টা করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, “কেডা?”
“হুজুর, আমি মতি।”
“কোন মতি?”
“ওই যে ওইদিন নাসির মুন্সীর কবর দেওয়ার সময় গরম কবর খুঁড়ে ফেলেছিলাম—”
মৌলভি সাহেব সাথে সাথে মতিকে চিনলেন। মাথা নেড়ে বললেন, “কামটা তুমি ঠিক করো নাই। অনেক বিপদের একটা কাম করছিলা— অনেক বড় বিপদ।”
মতি বলল, “হুজুর, আমি কবরের ভিতরে কী দেখছিলাম সেইটা কাউরে না বলতে বলেছেন। আমি কাউরে বলি নাই।”
মৌলভি সাহেব মাথা নাড়লেন, বললেন, “হ্যাঁ। খবরদার কাউরে বলবা না—”
মতি একটু এগিয়ে এসে বলল, “কিন্তু আপনার সাথে সেইটা বলতে তো দোষ নাই।”
“আমার সাথে কী বলবা?”
মতি একটু এগিয়ে আসে, “মনে করেন যেইটা দেখছি সেইটা কী যদি একটু বুঝিয়ে দিতেন। বিষয়টা না বোঝা পর্যন্ত মনের ভিতর খচমচ খচমচ করে।”
“আল্লাহ্র দুনিয়ায় অনেক কিছু থাকে। যেইগুলা আমাদের জানার কথা, বোঝার কথা সেইগুলা আমাদের চোখের সামনে থাকে। যেইগুলা আমাদের চোখের আড়ালে থাকে সেইগুলা দেখার কথা না। সেইটা দেখার চেষ্টা করলে বিপদ হয়।”
মতি বলল, “তবুও হুজুর যদি একটু বুঝায়ে দিতেন। বড়ো জানবার ইচ্ছা করে। আমি মনে করেন যেটা দেখার কথা না সেইটা যখন দেইখাই ফেলছি—”
মৌলভি সাহেব একটা নিশ্বাস ফেললেন, বললেন, “তুমি খাড়াও, আমি আমার গাছগুলাতে একটু পানি দিয়া আসি।”
মতি ব্যস্ত হয়ে বলল, “আপনি বসেন হুজুর, আমি পানি দিয়া দেই। আপনার কষ্ট করার দরকার নাই—”
মৌলভি সাহেব ছোট বালতিতে করে যতক্ষণ পানি টেনে আনতেন, মতি তার অর্ধেক থেকে কম সময়ে পানি তুলে এনে তার বেগুন খেতে পানি দিয়ে দিলো।
মৌলভি সাহেব তখন তার বারান্দায় একটা বেঞ্চে বসে সামনে গোরস্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মতি তার খেতের বেগুন এবং অন্য সবজির খেতে পানি দিয়ে মৌলভি সাহেবের পায়ের কাছে এসে বসল। গামছা দিয়ে নিজেকে বাতাস করতে করতে “ বলল, “হুজুর বলেন, এইখানে ব্যাপারটা কী?”
মৌলভি সাহেব তখন মতিকে একটি বিচিত্র ঘটনার কথা বললেন।
.
বহু বছর আগে—মৌলভি সাহেব তখন ছোট একটি শিশু এবং তার বাবা গ্রামের একমাত্র মসজিদের ইমাম। তখন একদিন তাদের গ্রামের শ্মশানের পাশে ভাঙা ঘরে কোথা থেকে এক সাধু এসে হাজির হলো। আগের জমিদারের ছোট ছেলে সান্নিপাতিক জ্বরে মারা যাওয়ার পর এই শ্মশানে তাকে দাহ করা হয়েছিল। সে জন্যই কি না কে জানে, জমিদার শ্মশানের পাশে নদীর তীরে একটা ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝেই সেই ঘরে কোনো সাধু-সন্ন্যাসী থাকত, কিছুদিন থেকে আবার অন্য কোথাও চলে যেত। তাই এই ঘরে নূতন একজন সাধু থাকছে খবরটিকে কেউই গুরুত্ব দিলো না।
কিন্তু সাধু আসার কয়েক দিনের ভিতরেই গ্রামের মানুষের খুবই বিচিত্ৰ অভিজ্ঞতা হতে শুরু করল। দিনের বেলা গ্রামের কুকুরগুলি দূর থেকে শ্মশান ঘরের দিকে মুখ করে ডাকাডাকি করত, কিন্তু সন্ধ্যে হতেই সেগুলো ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে কুঁই কুঁই শব্দ করে মানুষের ঘরের ভেতর ঢুকে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করত। গ্রামের বনে-জঙ্গলে, ঘরের আশেপাশে যেসব গাছপালা থাকে সন্ধ্যে হতেই সেখানে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুরু হয়ে যেত হঠাৎ করে সেগুলোর ডাকাডাকি বন্ধ হয়ে গেল। ঝড় নেই বৃষ্টি নেই একদিন একটা শ্যাওড়া গাছের বড় ডাল ভেঙে পড়ে গেল। রাতের বেলা গ্রামে কেমন যেন ছমছমে আবহাওয়া, রাতে মানুষজন ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়। ছোট বাচ্চারা গভীর রাতে চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। হঠাৎ করে কারো গোয়ালঘরের গরু গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে যায়। এক-দুইজন মানুষ রাতে ঘর থেকে বের হয়ে দেখে ছায়া ছায়া প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে, গভীর রাতে কান্নার শব্দের মতো শব্দ শোনা যায়। মানুষজন প্ৰথম দিকে সহ্য করেছে কিন্তু যখন হঠাৎ করে সুস্থ-সবল একজন মানুষ গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে দা দিয়ে কুপিয়ে নিজের বউকে মেরে ফেলল তখন সবাই খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।
মৌলভি সাহেবের বাবা মসজিদের ইমাম, সবাই তার কাছে এসেছে কোনো একটা কিছু করার জন্য, তিনি বইপত্র-কেতাব ঘেঁটে দোয়া-দরুদ পড়ে গ্রামকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজ হয় না। একদিন দুপুরবেলা কয়েকজন মিলে গেল শ্মশানে সেই সাধুর সাথে দেখা করতে। সেখানে গিয়ে দেখেন সাধু একটা মালসায় আগুন জ্বালিয়ে বসে আছে, দেখে বোঝা যায় না জেগে আছে না ঘুমিয়ে আছে। সাধুর চুল লালচে, ছোট ছোট চোখ, দেখে বিদেশি মনে হয়। ঘরের ভেতর বিকট দুর্গন্ধ। ইমাম সাহেব তাকে জাগানোর চেষ্টা করলেন, অনেক ডাকাডাকি করার পর চোখ খুলল, ইমাম সাহেব তখন তাকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বললেন, উত্তরে সে দাঁত বের করে একটা ভয়ংকর হাসি দিলো।
ইমাম সাহেব অন্যদের নিয়ে ফিরে এলেন। গ্রামের মানুষ ঠিক করল সাধুকে পিটিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দিবে, এই মানুষ গ্রামে আসার পর থেকেই গ্রামের এই অবস্থা।
.
সেই দিন গভীর রাতে ইমাম সাহেবের দরজায় কে জানি শব্দ করল। ইমাম সাহেব তার কুপি বাতি হাতে নিয়ে দরজা খুললেন। দরজার সামনে কেউ নাই, কিন্তু একটু দূরে সাদা কাপড় পরে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে, মাথা চাদর দিয়ে ঢাকা, কুপির আলোতে চেহারা দেখা যায় না। ঠিক তখন বাতাসে কুপি বাতিটা নিভে গেল।
লম্বা মানুষটা বলল, “ইমাম সাহেব, তোমার সাথে কথা আছে।”
গলার স্বর মোটা এবং ভারী। কথাগুলো বিদেশি মানুষের মতো। ইমাম সাহেব বললেন, “আপনার পরিচয় জনাব।”
“আমার পরিচয় দিয়ে লাভ নাই। আমি এই এলাকার না। তুমি আমাকে চিনবা না।”
ইমাম সাহেব বললেন, “আপনি বসেন, আমি কুপিটা জ্বালাইয়া আনি।”
“না। কুপি জ্বালানোর দরকার নাই। অন্ধকারই ভালো।” ইমাম সাহেব খুব অবাক হলেন, তার বুকটা কেঁপে উঠল মানুষটা বলল, “আমি তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি। আমার হাতে বেশি সময় নাই। তুমি মন দিয়া শুনো।
“জি। বলেন জনাব।”
“তোমাদের অনেক বিপদ।”
ইমাম সাহেবের বুকটা আবার কেঁপে উঠল। ঠিক কোন বিপদের কথা বলছে খানিকটা অনুমান করতে পারলেও জিজ্ঞেস করলেন, “কিসের বিপদ জনাব?”
“শ্মশান ঘাটের সাধু লপ সিয়াং গত রাত্রে জিগিরাকে বশ করেছে।”
ইমাম সাহেব অনুমান করলেন শ্মশান ঘাটের সাধুর নাম লপ সিয়াং। যথেষ্ট বিচিত্র একটা নাম, তবে জিগিরাটা কী বুঝতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, “জিগিরাটি কী জনাব? তাকে বশ করে কেমন করে?”
“জিগিরা হচ্ছে পিশাচদের মাঝে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর। তারে আগে কেউ বশ করতে পারে নাই।”
“এখন কী হবে জনাব?”
“জিগিরাকে দিয়ে এখন লপ সিয়াং যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে। লপ সিয়াং মানুষ ভালো না—এখন অনেক বিপদ। তোমাদের বিপদ সবার আগে।”
“এখন আমরা কী করব জনাব?”
“চোখ-কান খোলা রাখো। জিগিরাকে বশে রাখা সোজা না। লপ সিয়াং নিজেও অনেক বিপদের মাঝে আছে। তার বন্ধন কী আমি জানি না। তারে যদি মেরে ফেলে তখন জিগিরা তার শরীরটারে ব্যবহার করবে।”
“শরীরকে কেমন করে ব্যবহার করে জনাব?”
“আমারে জিজ্ঞেস কোরো না।”
“জি আচ্ছা জনাব।”
লম্বা ছায়ামূর্তিটা একটু নড়ল, মনে হলো বাতাসে ভেসে সরে গেল একটুখানি। তারপর আবার তার গমগমে গলায় বলল, “লপ সিয়াংরে যদি মেরে ফেলে তাহলে তোমরা দেরি কোরো না।”
“তখন আমরা কী করব?”
“লপ সিয়াংরে বাক্সে ভরে মাটিতে পুঁতে ফেলবা। দেরি করবা না। দিনের আলো থাকতে থাকতে।”
“জি আচ্ছা।”
“কয়েকজন সাহসী মানুষরে নিয়ে যাবা। মনে রাখবা, দেহটা লপ সিয়াংয়ের কিন্তু তার ভিতরে জিগিরা।”
“জি আচ্ছা।”
“লপ সিয়াং লাশ, কিন্তু লাশ জিন্দা।”
ইমাম সাহেবের বুক কেঁপে উঠল। ছায়ামূর্তিটা গমগমে গলায় বলল, “ভয় পাবা না। আল্লাহ্ ওপর বিশ্বাস রাখবা।”
“জি আচ্ছা।”
“আমি একটা কবজ দিয়া যাব তোমারে। সেই কবজ কোনোদিন হাত দিয়ে ছোঁবা না।”
“কী দিয়ে ধরব হুজুর?”
“পরিষ্কার কাপড় দিয়া ধরবা। এই কবজ মানুষের ধরার ক্ষমতা নাই।”
‘ধরলে কী হবে হুজুর?”
“মানুষের সহ্য করার ক্ষমতা নাই।”
“কেন হুজুর?”
“তোমরা এমন মুলুকের দৃশ্য দেখবা যেই মুলুক তোমাদের দেখার কথা না।”
ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “এই কবজ কী করব হুজুর?”
“একটা কাচের বয়ামের ভিতর ভরে লপ সিয়াংয়ের লাশের সাথে মাটিতে পুঁতে ফেলবা। জিগিরা তাহলে কোনোদিন লপ সিয়াংয়ের লাশ নিয়া কোথাও যেতে পারব না। লাশ থেকে বেরও হতে পারবে না।”
“জি আচ্ছা।”
“লপ সিয়াংয়ের লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলার সময় কবজ কাছে কাছে রাখবা। দুই হাতের ভিতরে। বুঝেছো?”
“বুঝেছি জনাব।”
“তোমার পাঞ্জাবিটা ধরো, আমি কবজ দেই।”
ইমাম সাহেব পাঞ্জাবির দুই মাথা ধরলেন। মানুষটা বলল, “এখন চোখ বন্ধ করো। খবরদার চোখ খুলবা না।”
“জি আচ্ছা জনাব।”
ইমাম সাহেব চোখ বন্ধ করলেন। টের পেলেন একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে। ভারী একটা নিশ্বাসের শব্দ শুনলেন, তার সাথে শ্যাওলার মতো একধরনের গন্ধ। বুঝতে পারলেন মেলে ধরে রাখা পাঞ্জাবির মাঝে কিছু একটা রাখা হয়েছে। তিনি চোখ খুললেন। আবছা অন্ধকারে তার পাঞ্জাবির কোঁচায় কিছু একটা জ্বলজ্বল করছে। আবছা অন্ধকারেও সেটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটা নকশাকাটা কবজ। আর কোথাও কেউ নেই।
ইমাম সাহেবের হাত কাঁপতে লাগল। তিনি ভিতরে ঢুকে তার স্ত্রীকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। স্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, “কী হইছে?”
“একটা কাচের বয়াম ধুয়ে পরিষ্কার করে দাও।”
“কেন?”
“কোনো প্রশ্ন করবা না। যা বলি তাই করো।”
ইমাম সাহেবের স্ত্রী কোনো প্রশ্ন করলেন না। একটা বয়াম খালি করে ধুয়ে এনে দিলেন। ইমাম সাহেব কবজটা বয়ামের ভিতরে রেখে বয়ামটা বন্ধ করলেন।
অবাক হয়ে দেখলেন কবজটা জীবন্ত প্রাণীর মতো নড়ছে। তিনি নিজের বুকে হাত দিয়ে আয়াতুল কুরসি পড়তে লাগলেন।
.
দুই দিন পরে গ্রামের মানুষ ইমাম সাহেবকে খবর দিলো শ্মশান ঘাটের সাধু আগের রাতে মরে গেছে। কাছাকাছি যারা থাকে, তারা গভীর রাতে ভয়ংকর চিৎকার শুনেছে, সাধু যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছিল। রাতে কেউ যেতে সাহস করে নাই। ভোরবেলা গিয়ে দেখে সাধু মরে পড়ে আছে। চোখ খোলা, জিভ বের হয়ে আছে।
ইমাম সাহেব তক্ষুনি কাচের বয়ামে সেই কবজকে গামছা দিয়ে ঢেকে সাথে নিয়ে শ্মশান ঘাটে রওনা দিলেন। গ্রামে খবর দিলেন গায়ে জোর আছে বুকে সাহস আছে এই রকম কয়জন মানুষ নিয়ে আসতে।
ইমাম সাহেব যখন শ্মশান ঘরে ঢুকলেন তখন সেইখানে বিকট গন্ধ। লাশটার শরীরে কোনো কাপড় নাই, তিনি একটা চট দিয়ে সাধুর শরীর ঢেকে দিলেন। কাচের বয়ামটা মাথার কাছে রাখতেই লাশটা কেমন যেন ধড়ফড় করে উঠল, মনে হলো হাতটাও একবার নড়ে উঠল।
ইমাম সাহেব ভয় পেলেন না। গ্রামের মানুষ নিয়ে লাশটাকে একটা শক্ত গর্জন কাঠের বাক্সে ঢুকিয়ে সেটাকে গ্রামের শেষ মাথায় নিয়ে গেলেন, সেটা পতিত জায়গা, গরিব মানুষেরা সেখানে মাঝেমধ্যে কবর দেয়, তখনও কবরস্থান হিসেবে গড়ে উঠে নাই। এক কোনায় একটা ফাঁকা জায়গা দেখে সেখানে বাক্সে ভরা সাধুকে মাটির নিচে পুঁতে ফেললেন, লাশের পায়ের কাছে বয়ামটা রেখে সেটাকে মাটিচাপা দিলেন।
যখন সবাই চলে আসছে তখন মনে হলো কবরের ভেতরটা ধুপ ধুপ করে কেঁপে উঠল। লপ সিয়াংয়ের লাশ গর্জন কাঠের বাক্স থেকে বের হওয়ার জন্য সিন্দুকের কপাটে ধাক্কা দিচ্ছে।
কাহিনি শেষ করে মৌলভি সাহেব বললেন, “এখন বুঝেছো কেন এই কবর গরম?”
“জি বুঝেছি।”
“বুঝেছো, কেন তোমারে বলেছি তুমি যে কাজটা করতে চেয়েছো সেইটা অনেক বিপদের কাজ?”
“জি বুঝেছি। আমি ভিতরে লপ সিয়াংরে দেখছি। ভিতরে বসে আছে।”
মৌলভি সাহেব কানে হাত দিলেন। বললেন, “বলবা না— কিছু বলবা না। আমি কিছু শুনবার চাই না। ইন্তেকালের আগে আমার বাপজান আমারে বলে গেছে আমি যেন এই কবরের কথা কাউরে না বলি, কারো কাছে না শুনি।”
মতি অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ল। বলল, “হুজুর, আপনেরে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“করো।”
“ওই কবজটা এখনও কি কবরের ভিতরে আছে?”
“নিশ্চয়ই আছে। কবজ না থাকলে জিগিরা ভিতরে আটকে থাকবে না। “হুজুর, আজ থেকে সত্তর-আশি বছর আগে জিগিরারে ভয় ছিল। এখন কি ভয় আছে? আমাদের গ্রামে পুরা ইলেকটিসিটি। ঘরে ঘরে টেলিভিশন, ফিরিজ।”
মৌলভি সাহেব মাথা ঘুরিয়ে মতির দিকে তাকালেন, বললেন, “তুমি কী বলবার চাও?”
“না, মানে এখন আর জিগিরার ভয় আছে? তারা কি এখন মানুষের ক্ষতি করতে পারবে?”
“সেটা আমি জানি না।”
মতি মাথা চুলকে বলল, “হুজুর, ওই কবজটা হাত দিয়ে ধরলে কী হতো?”
“আমার বাপজান বলছেন, মানুষের হাত দিয়ে ধরা নিষেধ।”
“কিন্তু ধরলে কী হবে?”
“মানুষ হাত দিয়ে ধরলে এমন একটা দৃশ্য দেখবে যেটা মানুষের দেখার কথা না।”
“সেইটা কী দৃশ্য?”
“আমাদের জীবিত মানুষের যেই রকম একটা দুনিয়া আছে ঠিক সেই রকম মরা মানুষের আরেকটা দুনিয়া আছে। মনে হয় সেই দুনিয়া দেখবে।”
মতি একটু হাসার চেষ্টা করল, বলল, “আমার সেইটা এক নজর দেখার শখ হুজুর।”
মৌলভি সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, “না, না—খবরদার-”
মতির মুখের হাসি আরো বিস্তৃত হলো, বলল, “কেন হুজুর, কী হবে?”
“বাপজান বলছিলেন, অনেক বড় বিপদ হবে। অনেক বড়—”
“কিন্তু হুজুর, শখের উপরে তো কোনো হাত নাই—”
মৌলভি সাহেব একধরনের আতঙ্ক নিয়ে মতির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই নির্বোধ মানুষটাকে সত্তর বছর আগের ঘটনাটা বলা ভুল হয়েছে।
অনেক বড় ভুল হয়েছে।
মৌলভি সাহেব অবশ্য বুঝতে পারলেন না, তিনি যত বড় ভুল করেছেন, প্রকৃত ভুলটি তার থেকে অনেক বড়। কারণ মতির যেটুকু আগ্রহ ভিন্ন জগৎ দেখার, তার চাইতে অনেক বেশি আগ্রহ কবজটি ভালো একটা জায়গায় মোটা টাকায় বিক্রি করে দেওয়ায়।
