নকশা-কাটা কবজ – ৫
৫
রাজু ফুটপাথে বিছিয়ে রাখা বইগুলো ভালো করে দেখার জন্য উবু হয়ে বসল। পুরান ঢাকার ফুটপাথে যারা পুরানো বই বিক্রি করে রাজু তাদের নিয়মিত খদ্দের। এবারের বইগুলো বেশি পুরানো, ভেতরের পৃষ্ঠাগুলো জীর্ণ। বেশির ভাগ বই বাঁধাই করা। আগে একটা সময় ছিল যখন বইকে সংরক্ষণ করতে হলেই সেগুলোকে বাঁধাই করতে হতো। কিছু কিছু বাঁধাই বেশ ভালো, প্রায় একশ বছর পরেও বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো ধরে রেখেছে। বেশ কিছু বইয়ের বাঁধন খুলে এসেছে, পুরাতন পৃষ্ঠাগুলো ঝুরঝুর করে খুলে পড়ছে।
রাজু বাঁধানো বইগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ করে থেমে গেল। এর মাঝে একটা হচ্ছে নোট বই, ভেতরে হাতের লেখা। নোট বইটা পুরানো, পৃষ্ঠাগুলো লালচে হয়ে গেছে। কিনারার দিকে লেখাগুলো অস্পষ্ট। হাতের লেখা সুন্দর—গোটা গোটা অক্ষর। রাজু চোখের কাছে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করল, “…পিশাচ অতীব ক্রুদ্ধ। তাহাকে বশীভূত করা দুঃসাধ্য। প্রাণ সংহারের সমূহ আশঙ্কা বলবৎ। মাদ-মাংস ব্যতিরেকে অন্য অন্ন গ্রহণে অনিচ্ছা…”
ভাষা যথেষ্ট জটিল, একটু পরে পরে নানা রকম মন্ত্র এবং নকশা। দেখে মনে হয় কোনো একজন মানুষ প্রেত সাধনা করে একটি পিশাচকে বশ করার চেষ্টা করছে। প্রতিদিন সেটি করতে তার কী সমস্যা হচ্ছে সেটি লিখে রাখছে। ভাষাটা একটু কটমটে, কিন্তু সব মিলিয়ে বিষয়টা যথেষ্ট চমকপ্রদ। যেহেতু মন্ত্রগুলো দেওয়া আছে, মনে হচ্ছে রাজু ইচ্ছে করলে নিজেও একটা পিশাচকে বশ করার চেষ্টা করতে পারে!
রাজু দোকানিকে জিজ্ঞেস করল, “মামা, বইটার দাম কত?”
দোকানি বইটা হাতে নিল, খুলে ভিতরে দেখে জিজ্ঞেস করল, “এইটা নিবেন? এইটা তো বই না, খাতা।”
“হ্যাঁ”, রাজু মাথা নাড়ল, “এইটাই নিব।”
দোকানি একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “অন্য একটা বই কিনলে এইটা ফ্রি!”
কাজেই রাজুকে অন্য একটা বই কিনতে হলো। যে বইটা কিনল তার নাম ‘জন্মান্তর রহস্য’। লেখকের নাম ‘তান্ত্রিক সিয়াং সি ওঝা’। আজকে এখানে যে বইগুলো এনেছে সেগুলো মোটামুটি এক জায়গা থেকে এনেছে এবং বইগুলোর প্রায় সবগুলোই অলৌকিক শাস্ত্রের বই। আজ থেকে আশি-নব্বই বছর আগে পুরো দেশ যখন কুসংস্কারে ডুবে ছিল তখন নিশ্চয়ই এই বইগুলোর যথেষ্ট কাটতি ছিল।
.
রাজু বইগুলো খুব গুরুত্ব দিয়ে কিংবা আগ্রহ নিয়ে পড়বে ভাবেনি, কিন্তু সে রাত জেগে পড়ল। ভেতরে বিশ্বাসযোগ্য কিছু নেই, কিছু অদ্ভুত মন্ত্ৰ চোখ বন্ধ করে আওড়ে গেলেই বিচিত্র কিছু ঘটে যাবে রাজু সেটা বিশ্বাস করে না। কিন্তু একটার পর একটা পড়ে যাবার পর নিজের ভেতর বিচিত্র একধরনের অনুভূতি হয়। তবে নোট বইটা খুবই চমকপ্রদ। একজন মানুষ একটা পিশাচকে বশ করার জন্য প্রেত সাধনা করে যাচ্ছে এবং অভিজ্ঞতাটি তার নোট বইয়ে লিখে রাখছে, সেটি পড়া যথেষ্ট বিচিত্র একটি অভিজ্ঞতা।
নোট বই পড়ে রাজু অনেক কিছু শিখল, পিশাচদের নানা শ্রেণি আছে। তাদের মাঝে সবচেয়ে ক্ষমতাবানটির নাম শিটান। রাজুর ধারণা শিটান শব্দটা শয়তান শব্দ থেকে এসেছে। শিটানের অনেক চেলা-চামুন্ডা আছে, তারা পৃথিবীর নানা জায়গায় থাকে। মানুষের সাথে তাদের একধরনের অলিখিত বিরোধ। পিশাচের জগৎ আর মানুষের জগৎ আলাদা, একে অন্যের জগৎ সহজে দেখতে পায় না। তবে মানুষ নানা রকম সাধনা করে পিশাচের জগতে ঢুকতে শিখেছে। পিশাচদের নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে! বিষয়গুলোর বিন্দুমাত্র বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই কিন্তু রাজু পড়ে যথেষ্ট মজা পেয়েছে। বই পড়ে এবং নোট বইটা দেখে সে যখন শেষ পর্যন্ত শুতে গিয়েছে তখন গভীর রাত। রাজু বেশ অবাক হলো যখন সে দেখল এত রাত্রে বাথরুমে যেতে তার কেমন জানি ভয় ভয় করছে।
.
ভোরবেলা রাজু ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠল। সকালে একটা ক্লাস থাকে। মনে হচ্ছে আজকে ক্লাসটা সে আর ধরতে পারবে না। সত্যি সত্যি সে অনেক তাড়াহুড়া করে গিয়েও ক্লাসটা ধরতে পারল না। ক্লাসরুমের কাছাকাছি একটা বারান্দায় বসে বসে সে গভীর মনোযোগ দিয়ে দূরের রাস্তা দিয়ে মানুষের চলাচল দেখতে লাগল।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর ছেলেমেয়েরা বের হয়ে আসে, তাকে বারান্দায় উদাসভাবে বসে থাকতে দেখে দুইজন তার সাথে একটু কথা বলল। রাজু এ রকম সময় মিলিয়াকে দেখল। সেদিন শাফকাতকে সাইকোপ্যাথ ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে মিলিয়া তার থেকে একটু দূরে দূরে আছে। রাজু ভাবল আজকেও নিশ্চয়ই তাকে না দেখার ভান করে হেঁটে যাবে। মিলিয়ার জন্য ব্যাপারটাকে সহজ করার জন্য সে তখন খুবই মনোযোগ দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।”
মিলিয়া অবশ্য চলে গেল না, তার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার? আঁতেল সাহেবের হাতে আজকে কোনো জ্ঞানের বই নাই?”
রাজু হাসি হাসি মুখ করে বলল, “কাল সারারাত জেগে একটা বই পড়ে বইয়ের ওপর কেমন জানি এলার্জির মতো হয়ে গেছে।”
“কী বই পড়েছিস? রোমান্টিক নভেল?”
“না না। রোমান্সটা আমার ঠিক আসে না।”
“তাহলে?”
“প্রেতচর্চার ওপর বই। কেমন করে পিশাচ বশ করার সাধনা করতে হয় এইসব হাবিজাবি।”
মিলিয়া চোখ বড় বড় করল, “পিশাচ বশ করা? কেমন করে পিশাচ বশ করে?”
“যথেষ্ট কঠিন। আমার প্যাঁচ লেগে গেছে। শ্মশানে যেতে হয়—কিছু নোংরামি করতে হয়। তোর শখ থাকলে বল, তোকে বইটা দিতে পারি।”
“না। আমার কোনো শখ নাই।”
রাজু হাসি হাসি মুখ করে বলল, “তবে অনেক কিছু শিখেছি।”
“কী শিখেছিস?”
“আমাদের যে রকম জগৎ আছে ঠিক সে রকম পিশাচদের একটা জগৎ আছে। একেবারে আলাদা জগৎ। তারা তাদের জগতে থাকে, আমরা আমাদের জগতে থাকি।”
“তাদের জগৎটা দেখা যায় না?”
রাজু হাসল, “মরে গেলে দেখবি!”
মিলিয়া বলল, “থাক বাবা আমার মরে যাওয়ার শখ নাই।”
“মাঝেমধ্যে এক জগতের প্রাণীর সাথে অন্য জগতের প্রাণীর ধাক্কাধাক্কি হয়।”
“সত্যি?”
রাজু মাথা নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ, যখন কেউ প্রেত সাধনা করে একটা পিশাচকে বশ করতে চায় তখন তাদের জগতে হাত দেওয়া হয়।”
“পিশাচরা মানুষ সাধনা করে মানুষদের বশ করে না?”
“করে নিশ্চয়ই! পৃথিবীর বদ মানুষেরা মনে হয় সেই রকম মানুষ।”
মিলিয়া একটু অন্যমনস্ক হয়ে তার নখের দিকে দিকে তাকিয়ে রইল। রাজু পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য বলল, “বইটা ইন্টারেস্টিং কিন্তু পুরো গাঁজাখুরি। একটা বিষয় পেলাম না যেটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করে টেস্ট করা যায়।”
“কী রকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা?”
‘যে রকম ধর, কীভাবে একটা পিশাচকে একটা টেস্ট টিউবের মাঝে ভরে অ্যাটমিক ডিসচার্জ করা যায়।”
মিলিয়া হাসল। রাজু বলল, “কী আজব একটা বই, যা ইচ্ছা তাই লিখে রেখেছে—কোনো প্রমাণ নাই।” রাজু একটু থেমে বলল, “পিশাচদের মনে হয় এলাকা ভাগ করা আছে। আমাদের এলাকার পিশাচ সর্দারের নাম কি জানিস?”
“কী?”
“জিগিরা।”
“জিগিরিা? জিগিরা সর্দার? ভালোই তো শোনায়।”
“মজার ব্যাপার কি জানিস?”
“কী”
“আমার বইয়ের লেখক অনুমান করছে জিগিরাকে কোনো মানুষ বন্দি করে রেখেছে! সেই জন্য বহু বছর তাকে দেখা যাচ্ছে না!”
‘পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বল সেই মানুষ যেন জিগিরাকে একটা টেস্ট টিউবে ভরে তোকে দিয়ে দেয়! তুই তাহলে অ্যাটমিক ডিসচার্জ করতে পারবি।”
রাজু হাসল।
মিলিয়া আবার অন্যমনস্ক হয়ে গেল। একটু পরে গলার স্বর পাল্টে বলল, “রাজু তোকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করি?”
“কর।”
“তুই কি সত্যি মনে করিস শাফকাত সাইকোপ্যাথ?”
শাফকাত মানুষটাকে রাজুর খুব বেশি পছন্দ হয়নি। তার ভেতরে সাইকোপ্যাথের একটা লক্ষণ আছে বলে তার মনে হয়েছে কিন্তু সে সত্যি সাইকোপ্যাথ এটা কখনোই দাবি করতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কী, মিলিয়ার সামনে বসে তার ভবিষ্যৎ স্বামী সম্পর্কে এ রকম ভয়ানক একটা কথা বলা তার মোটেও উচিত হয়নি। সেদিন এ রকম একটা কথা বলার পর থেকে তার ভেতরে একটা অপরাধবোধ জমা হয়ে আছে। আজকে মিলিয়া বিষয়টা নিজ থেকে তোলার পর রাজু শেষ পর্যন্ত তার অপরাধবোধ থেকে নিজেকে খানিকটা রক্ষা করার সুযোগ পেল।
রাজু মিলিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “ছিঃ ছিঃ মিলিয়া! তুই কেমন করে মনে করতে পারলি ব্যাপারটা সিরিয়াস! পুরো ব্যাপারটা তামাশা!”
“কিন্তু—”
“শাফকাত যদি সাইকোপ্যাথ হয় তাহলে আমিও সাইকোপ্যাথ! আমি ওই পাজলটার সমাধান করেছিলাম।”
কথাটা সত্যি নয় কিন্তু মিলিয়াকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য একটু মিথ্যা কথা বলা যেতেই পারে। রাজু দেখল মিলিয়ার মুখটা একটু সহজ হলো। বিষয়টা নিশ্চয়ই তাকে দুর্ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল।
রাজু জিজ্ঞেস করল, “তোদের বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে?”
“হবে হবে করছে। এখনও পুরোপুরি ঠিক হয়নি!”
“আমাদের দাওয়াত দিবি না?”
“খুব ছোট অনুষ্ঠান হবে কিন্তু দুশ্চিন্তা করিস না, তোদের দাওয়াত দিবো।”
রাজু মিলিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কেন তার একটু মন খারাপ হলো সে বুঝতে পারল না।
* * *
দুই দিন পর রাজু ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখল তাদের ক্লাসের ছেলেমেয়েদের মাঝে মৃদু উত্তেজনা। একজনের হাতে একটা বিয়ের কার্ড, সবাই সেটি আগ্রহ নিয়ে দেখছে। মিলিয়া ক্লাসের সবাইকে বিয়ের দাওয়াত দিয়েছে। দুই দিন পর বিয়ে। বিয়ের অনুষ্ঠান একটা ফাইভ স্টার হোটেলে। উৎসাহী একজন তখন তখনই কারা কারা যাবে তার তালিকা করে ফেলল, মিলিয়ার জন্য একটা গিফট নিতে হবে। বিয়ের পরপরই মিলিয়া যেহেতু আমেরিকায় চলে যাবে, তাই গিফটটা সে রকম হতে হবে। সহজেই ছোট কিন্তু প্রয়োজনীয়। কী গিফট নেওয়া যায় সেটা নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। সবাকে চাঁদা দিতে হবে, কত টাকা চাঁদা দিতে হবে, সেটা নিয়েও কথাবার্তা শুরু হলো, তখন একজন কার্ডটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে সবাইকে দেখাল, নিচে ছোট করে লেখা আছে, “েেলৗকিকতা বর্জনীয়, বর-বধূর জন্য শুভেচ্ছা কাম্য।”
কেউ প্রকাশ করল না কিন্তু সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল
রাজু সত্যি সত্যি বিয়েতে যাবে কি না বুঝতে পারল না। ফাইভ স্টার হোটেলে যখন বিয়ের অনুষ্ঠান হয় তখন সেখানে যে ধরনের মানুষেরা থাকে, তাদের মাঝে সে সব হিসেবে বেমানান। মিলিয়ার সাথে যে তার খুব ঘনিষ্ঠতা, সেটাও সত্যি নয়, ইদানীং প্রায় হঠাৎ করে একটুখানি ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেছে। সেটিও তার নিজের কারণে নয় মিলিয়ার খেয়ালিপনার জন্য। সে যদি না যায় তাহলে মিলিয়া আলাদা করে সেটা হয়তো লক্ষও করবে না।
.
তবে শেষ পর্যন্ত রাজু বিয়েতে হাজির হলো। নিজের পোশাক নিয়ে তার একটু সংশয় ছিল কিন্তু দেখা গেল সেটা আলাদা কোনো বিষয় হলো না— তাদের ক্লাসের ছেলেরা প্রায় সবাই তার মতো পোশাকে চলে এসেছে। এক-দুইজন একটা জ্যাকেট পরে এসেছে। তাদের মাঝে যে ছেলেটি একটি নির্বোধ ধরনের, সে একটি বিদঘুটে টাই লাগিয়ে এসেছে। তবে মেয়েদের কথা আলাদা, তারা সবাই সেজে ফুলপরি হয়ে এসেছে। একটি ছেলে সাজলে তাকে কেমন জানি আহাম্মকের মতো দেখায় কিন্তু মেয়েরা সাজলে তাদের দেখতে খুব ভালো লাগে। পশুপাখির মাঝে ব্যাপারটা পুরোপুরি উল্টো। সেখানে নারী প্রজাতি খুবই সাদামাটা, পুরুষ প্রজাতি সংয়ের মতো!
রাজু ইচ্ছে করে একটু দেরি করে এসেছে ততক্ষণে তাদের ক্লাসের প্রায় সবাই এসে গেছে। বর-কনে বসার জন্য একটা সুন্দর মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে কিন্তু সেটি ফাঁকা। রাজু খুব বেশি বিয়ের অনুষ্ঠান দেখেনি, যে কয়টি দেখেছে সেগুলো নেহায়েতই মধ্যবিত্তের বিয়ে, সেই অনুষ্ঠানের সাথে নিশ্চয়ই এটি তুলনা করা যাবে না।
কম বয়সি ছেলেমেয়েরা দৌড়াদৌড়ি করছে, বয়স্ক মানুষেরা বসে-দাঁড়িয়ে কথা বলছে। কয়েকজন মানুষ ক্যামেরা নিয়ে ক্রমাগত ছবি তুলে যাচ্ছে। তাদের ক্লাসের মেয়েরা ক্লান্তিহীনভাবে ছবি তোলার জন্য পোজ দিয়ে যাচ্ছে। রাজু চোখের কোনা দিয়ে মিলিয়াকে খুঁজছিল, হঠাৎ করে পেয়ে গেল। মধ্যবিত্তের বিয়েতে মেয়েদের নূতন বউ হিসেবে মাথা নিচু করে বসে থাকতে হয়। এখানে মিলিয়া মোটেই নূতন বউ হিসেবে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে নেই—সে সবার মাঝে হাঁটাহাঁটি করে বেড়াচ্ছে। তাদের ক্লাসের মেয়েরা তাকে ঘিরে রেখেছে। রাজু কাছে গিয়ে কিছু বলবে কি না বুঝতে পারল না। শেষ পর্যন্ত দূরেই থাকা সিদ্ধান্ত নিল।
একটু পর “বর এসেছে” “বর এসেছে” এ রকম একটা রব উঠল তখন বাচ্চাদের সাথে সাথে তাদের ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে গেট আটকানোর জন্য ছুটে গেল। জায়গাটা একটু ফাঁকা হওয়ায় রাজু বসার একটা ভালো জায়গা পেয়ে গেল, একটু কোনার দিকে এবং যেখান থেকে স্টেজটা ভালো দেখা যায়। সেখান থেকে সে মিলিয়াকে লক্ষ করতে থাকে, সে এখন মনে হয় নিজেদের আত্মীয়স্বজনের সাথে কথা বলছে, দেখে মনে কিছু একটা নিয়ে তর্ক হচ্ছে। হঠাৎ করে রাজুর সাথে মিলিয়ার চোখাচোখি হয়ে গেল তখন মিলিয়া তর্ক বন্ধ করে তার দিকে হেঁটে আসতে থাকে। রাজুও উঠে দাঁড়িয়ে তাড়াতাড়ি মিলিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। মিলিয়া হাসি হাসি মুখে বলল, “কী হলো? তুই গেট ধরতে গেলি না?”
“যারা গেছে তারা যথেষ্ট এক্সপার্ট! আমার না গেলেও ক্ষতি হবে বলে মনে হচ্ছে না।”
রাজু একটু অবাক হয়ে মিলিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই প্রথম তার সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে তার একটু সমস্যা হচ্ছে। বিয়ের সাজের জন্য তার চেহারা অন্য রকম হয়ে গেছে। তাকে দেখে প্রথম বার একজন অপরিচিত মেয়ের মতো মনে হচ্ছে। একজন পরিচিত মানুষের চেহারা হঠাৎ অপরিচিত মানুষের মতো মনে হয় তখন তার সাথে কথা বলতে জড়তা হয় কে জানত!
মিলিয়া বলল, “বিয়েতে আসার জন্য থ্যাংকু।”
“কেন? আসব না কেন?”
“তুই আঁতেল মানুষ। তোর কাছে কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক মনে হয় কে বলবে?”
“যত বড় আঁতেলই হোক খাওয়া-দাওয়া কখনো বেঠিক না!”
মিলিয়া হাসার ভান করল। রাজু জিজ্ঞেস করল, “তুই আমেরিকা কবে যাবি?”
মিলিয়ার মুখে বিষণ্নতার একটা ছায়া উঁকি দিয়ে যায়। ঘাড় নেড়ে বলল, “খুব তাড়াতাড়ি। দুই-এক দিনের ভিতরে।”
“এত তাড়াতাড়ি?”
“শাফকাত বলেছে বিয়ের পর হাজব্যান্ড-ওয়াইফ আলাদা থাকা ঠিক না!”
“মনে হয় ঠিকই বলেছে।” রাজু আলাপ করার আর কিছু না পেয়ে নিরাপদ আলাপে মন দিলো, “আর তোর লেখাপড়া?”
“ওখানে কোনো ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন নিয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে নেব।”
“গুড!”
“কেন? গুড কেন?”
“সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা দিতে হবে না!”
রাজুর অবশ্য আর কষ্ট করে আলাপ চালিয়ে যেতে হলো না, হঠাৎ করে সেজেগুজে থাকা একটা মেয়ে মিলিয়ার কাছে এসে বলল, “আপু চল চল আন্টি ডাকছে—তাড়াতাড়ি।”
মিলিয়া রাজুর দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে রাজু। যাই।”
রাজু মাথা নাড়ল তারপর তার জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল।
বেশ খানিকক্ষণ সময় কেটে যায়। বোঝাই যাচ্ছে শাফকাতকে গেটে আটকে রেখে টাকা আদায় করতে যথেষ্ট সমস্যা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত একটা আনন্দধ্বনি শোনা গেল এবং প্রায় সাথে সাথে শাফকাতকে হেঁটে আসতে দেখা গেল। রাজু ভেবেছিল শাফকাত বিয়ের পোশাক রংচংয়ে আচকান আর পাগড়ি পরে আসবে কিন্তু দেখা গেল সে স্যুট-টাই পরে এসেছে। মানুষটির রুচি অসাধারণ! তাকে দেখতে একজন রাজপুত্রের মতো দেখাচ্ছে। যারা আগে কখনো শাফকাতকে দেখেনি, বিশেষ করে কম বয়সি মেয়েদের চোখে-মুখে একটা বিস্ময়ের ছাপ পড়ল, নিজের অজান্তেই তাদের মুখ দিয়ে একধরনের শব্দ বের হয়ে এলো।
বয়স্ক মানুষেরা একটু এগিয়ে এসে শাফকাতকে মঞ্চে নিয়ে গেল, কমবয়সি বেশ কয়েজন ছেলেমেয়ে সেখানে তাকে ঘিরে রইল। কয়েকজন তরুণী মিলে মিলিয়াকেও মঞ্চে নিয়ে যায়। সিংহাসনের মতো দেখতে একটা সোফায় দুজনকে পাশাপাশি বসিয়ে দেয়া হলো। ক্যামেরাম্যানরা এসে তাদের ছবি নিতে থাকে।
“কী অসাধারণ কাপল! দেখেছিস?”
গলার স্বর শুনে রাজু মাথা ঘুরে তাকায়। তাদের ক্লাসের নির্বোধ ধরনের ছেলেটি—যে আজকে অত্যন্ত বেমানান একটা টাই পরে এসেছে, সে তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ছেলেটি আরেকটা বিস্ময়ের শব্দ করে বলল, “শালার চেহারাটা দেখেছিস? যেই রকম চেহারা সেই রকম মালদার। আমেরিকায় শালার নিজের বাড়ি আর দুইটা গাড়ি।”
রাজু একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই কেমন করে জানিস?”
“জিজ্ঞেস করেছিলাম।”
“কখন জিজ্ঞেস করলি?”
“এই তো হেঁটে ভিতরে ঢোকার সময়।”
রাজু নির্বোধ ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইল, নির্বোধ হয়ে জন্ম নেওয়ার মাঝে নিশ্চয়ই একধরনের আনন্দ আছে।
মঞ্চ থেকে একধরনের আনন্দধ্বনি শোনা গেল। রাজু সেদিকে তাকাল, মিলিয়া আর শাফকাত পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেরই হাসি হাসি মুখ। শাফকাত মাথা ঘুরিয়ে দেখছে, হঠাৎ করে রাজুর সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। শাফকাত এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকে, মুখে একধরনের বিচিত্র হাসি ফুটে উঠল, তারপর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল, যেন দুইজন কত দিনের বন্ধু, যেন দুইজন মিলে কিছু একটা ষড়যন্ত্র করেছে, যার কথা তারা দুইজন ছাড়া আর কেউ জানে না!
রাজু মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা মিলিয়ার দিকে তাকাল, হঠাৎ করে মনে হলো মিলিয়ার খুব বিপদ! ভয়ানক একটি বিপদ। মনে হলো রাজু চিৎকার করে বলল, “পালা, মিলিয়া পালা। এই ভয়ানক দানবের হাত থেকে পালা।”
রাজু অবশ্য কিছুই করল না। এক দৃষ্টে হাসি হাসি মুখে দুইজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
