নকশা-কাটা কবজ – ৬
৬
মতি ঘর থেকে বের হওয়ার আগে আবার দেখে নিল সবকিছু ঠিক আছে কি না। একটা কোদাল, একটা ধারালো দা, একটা টর্চলাইট, টর্চ লাইটের নূতন ব্যাটারি। রাত গভীর হওয়া পযন্ত অপেক্ষা করে সে বের হয়েছে। গ্রামে মানুষজন বেশি রাত জাগে না। আজকাল ইলেকট্রিসিটি আসার কারণে যাদের বাড়ি টেলিভিশন আছে তারা একটু রাত করে ঘুমায়। তার পরেও মাঝরাতের পর কেউ জেগে থাকে না। মতি সাবধানে বের হলো, সে চায় না কেউ তাকে দেখে ফেলুক। পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে কী বলবে সেটাও ঠিক করে রেখেছে, বাজারের পুরানো মাছ বাজারটা ভেঙে ফেলায় কাজ হচ্ছে, সেখানে যাচ্ছে। তাহলে কেউ আর সন্দেহ করবে না—এ রকম কাজ অনেক সময়েই রাতবিরেতে করতে হয়।
মতি অমাবস্যা-পূর্ণিমার হিসেব রাখে না, তবে গ্রামে থাকলে নিজের অজান্তেই আকাশের চাঁদ কখন উঠে কখন ডুবে যায় সেটা নজরে পড়ে। কৃষ্ণপক্ষ যাচ্ছে তাই চাঁদ উঠবে অনেক রাতে। এর আগে আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু তারাগুলি জ্বলজ্বল করছে। কার কাছে সে জানি শুনেছিল আকাশের তারা নাকি লক্ষ লক্ষ মাইল দূরে—তার বিশ্বাস হয় না!
গ্রামের রাস্তা দিয়ে সে নিঃশব্দে হেঁটে যেতে থাকল। দুই-একটা বাড়িতে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে শুরু করেছিল কিন্তু গ্রামের কুকুর তাকে চিনে তাই তার পিছু পিছু কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে গেছে।
লোকালয় পার হবার পর মতি একটু জংলা জায়গায় এলো। আগে এখানে বিশাল জঙ্গল ছিল, মানুষজন দিনদুপুরেই এদিক দিয়ে যেতে ভয় পেত। এখন জঙ্গল পাতলা হয়ে গেছে, মানুষজন ঘরবাড়িও বানাতে শুরু করেছে। জংলা জায়গার পর একটা পুকুর, তারপর কবরস্থান।
কবরস্থানের এক কোনায় মৌলভি সাহেবের বাড়ি। বাড়িটা অন্ধকার, মৌলভি সাহেব নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে গেছেন। গোরস্থানের একটা ভাঙা গেট আছে, মতি সাবধানে সেটা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। পায়ের তলায় শুকনো পাতার খচমচ একটু শব্দ হলো। গোরস্থানের ভেতর ইতস্তত গাছ, সেই গাছগুলোর পাতা বাতাসে নড়ে একধরনের শিরশির শব্দ হচ্ছে। গাছে গাছে ঝিঁঝিঁ পোকাও কর্কশ শব্দ করে ডেকে যাচ্ছে।
মতি সাবধানে গোরস্থানের কোনায় লিচু গাছটার দিকে এগিয়ে যায়। কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ ধুপ ধুপ শুব্দ শুনতে পেল। এখন সে জানে শব্দটা কেন আসছে। কবরের নিচ থেকে লপ সিয়াং নামের এক সাধুর লাশ একটা পুরানো কাঠের বাক্স থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। কবরের নিচে গুটিশুটি মেরে বসে থাকা একজন শীর্ণ মানুষকে মতির মতো দীর্ঘদেহী বিশাল মানুষের ভয় পাওয়ার কিছু নাই, কিন্তু তারপরেও মতির বুকটা একটু কেঁপে উঠল।
মতি জায়গাটা খুঁজে বের করল। নাসির মুন্সীকে কবর দেওয়ার জন্য প্রথমে এই জায়গাটতে তারা কবর খুঁড়েছিল। তারপর মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। ওপরের জায়গাটাতে ঘাস নেই, গাছগাছালি নেই। জায়গাটা খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হলো না, দুটো বাঁশ আড়াআড়িভাবে এখনো রাখা আছে। কিন্তু তারপরেও মতি তার নূতন ব্যাটারি লাগানো টর্চলাইট দিয়ে জায়গাটা দ্রুত একবার দেখে নিল। সে এখন এখানে কোনো আলো জ্বালিয়ে কারো নজরে পড়তে চায় না।
মতি কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করে। মাত্র কয়দিন আগেই এই মাটি খোঁড়া হয়েছে তাই মাটি বেশ নরম। মতি বেশ দ্রুত মাটি খুঁড়ে ফেলতে পারে। ঠিক এখানেই আগে মতি মাটি খুঁড়েছে তাই কোন দিকে কতটুকু খুঁড়তে হবে সেটা সে ভালোভাবে জানে।
মতি মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে সে একসময় থামল এবং শুনতে পেল পাশ থেকে নিয়মিত বিরতিতে ধুপ ধুপ করে শব্দ হচ্ছে। কিছুক্ষণ শব্দ হওয়ার পর শব্দটা থেমে যায়, বেশ খানিকক্ষণ পর আবার শুরু হয়।
মতি মাটি খুঁড়ে বেশ গভীরে ঢুকে গেছে। এবারে সে তার ধারালো দা এবং নূতন ব্যাটারি লাগানো টর্চলাইটটা গর্তের ভেতর নিয়ে আসে। দরকারের সময় যেন দ্রুত ব্যবহার করতে পারে সে জন্য মতি তার গামছা দিয়ে টর্চলাইট আর দা’টা কোমরে বেঁধে নিল।
যখন ভেতরে নাড়াচাড়া করার মতো যথেষ্ট বড় একটা গর্ত খোঁড়া হয়েছে, তখন সে পাশে গর্ত করতে শুরু করে। মতি অবিশ্বাস্য সাহসী মানুষ। তার সাহস মোটামুটি নির্বুদ্ধিতার পর্যায়ে চলে গেছে, তারপরও সে একটু একটু আতঙ্ক অনুভব করবে। এর আগের বার গর্ত খুঁড়ে ভেতরে কী দেখবে সে জানত না, তাই তার ভয়টা ছিল বেশি। এবারে সেই ভয়টা নেই, সে জানে ভেতরে কী দেখবে। শীর্ণ দেহের উলঙ্গ মানুষটি নিয়ে তার কোনো কৌতূহল নেই। সে কাচের বয়ামে রাখা সেই কবজটি খুঁজে বের করে নিয়ে যেতে এসেছে। কবরস্থানের মৌলভি সাহেব কবজটির যে বর্ণনা দিয়েছেন সেই বর্ণনা সত্যি হলে, সেটা সে অনেক দামে বিক্রি করতে পারবে। বিক্রি করার আগে সে তাবিজটা মুঠির ভেতর চেপে ধরে রেখে পরকালটা এক নজর দেখতে চায়!
মতি এবার ডান পাশ খুঁড়তে শুরু করে। আগের বার দেখার জন্য সরু একটা গর্ত করেছিল। এবারে সে ভেতরে কাচের বয়ামে রাখা কবজটা খুঁজে বের করে সেটা নিয়ে আসবে। তাই অনেক বেশি জায়গা খুঁড়তে হবে, যেন তার পুরো শরীরটা ভেতরে ঢোকানো যায়।
এতক্ষণ নরম মাটি কেটেছে, এবারে মাটি শক্ত। মতি কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে কাটতে রীতিমতো ঘামতে থাতে।
প্রথমে একটা ছোট গর্ত হলো এবং ঝুরঝুর করে ওপর থেকে বেশ খানিকটা মাটি ভেঙে পড়ল। কাঠের বাক্সটা এতদিনে পচে নরম হয়ে আছে। ধাক্কা লাগলেই ভেঙে যাচ্ছে। মতি বেশ বড় একটা গর্ত করে ফেলল। মতি তখন তার কোমর থেকে টর্চলাইটটা খুলে সেটা জ্বালিয়ে ভেতরে তাকাল। ভেতরে টর্চের আলো পড়তেই সে একটা হুটোপুটির শব্দ শুনতে পেয়। মনে হয় ভেতরে ক্রুদ্ধ কোনো একটি পশু ছোটাছুটি করছে।
মতি এবারে ভেতরে উঁকি দিলো। সেই শীর্ণ উলঙ্গ মানুষটি বাক্সের এক কোনায় গুটিশুটি মেরে বসে আছে। দুই হাত দিয়ে সেটি নিজের চোখ আড়াল করে রেখেছে, নিশ্চয়ই টর্চের তীব্র আলোতে এর চোখ ধাঁধিয়ে যায়। প্রাণীটির শরীর থরথর করে কাঁপছে। মুখের ওপর থেকে হাত একটুখানি সরে যেতেই সে প্রাণীটির বীভৎস মুখটি দেখতে পেল, লাল জিভ ধারালো দাঁতের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। এই মানুষ কিংবা প্রাণীর মাথায় চুল নেই, দাড়ি-গোঁফ কিংবা ভুরু নেই। শরীরের চামড়া রক্তহীন ফ্যাকাশে বিবর্ণ এবং কুঁচকে হাড়ের সাথে লেপ্টে আছে।
মতি বেশিক্ষণ সেটির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। মৌলভি সাহেব বলেছেন এটি লপ সিয়াং নামের একজন সাধুর শরীর। শরীরটি বহু আগে মারা গেছে। এই মৃতদেহটিতে জিগিরা নামের একটি অপদেবতা আশ্রয় নিয়েছে, যেটি মৃতদেহ থেকে বের হয়ে আর মুক্ত হতে পারছে না।
মতির অবশ্য এত কিছু জানার আগ্রহ নেই, সে কবরের ভেতর থেকে কবজটা উদ্ধার করতে এসেছে। সে টর্চলাইট ফেলে মতি একটা কাচের বয়াম খুঁজতে থাকে। সত্তর-আশি বছর আগের একটা কবরে সে খুব সহজে কাচের বয়ামটি খুঁজে পাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু তার কপাল খুব ভালো সে কবরের এক কোনায় হঠাৎ করে বয়ামটির চকচকে ঢাকনাটি দেখতে পেল। ঢাকনার নিচে বয়ামটি মাটির ভেতর চাপা পড়ে আছে।
এই গর্তটি কত বড় করলে সে তার শরীরের ওপরের অংশ ভেতরে ঢুকিয়ে হাত বাড়িয়ে বয়ামটি হাত দিয়ে তুলে নিতে পারবে মতি সেটা মনে মনে হিসাব করে নেয়। তারপর টর্চলাইটটি নিভিয়ে দিয়ে আবার কোমরে ঝুলিয়ে নিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে থাকে। মাটি কাটতে কাটতে সে যখন মাঝে মাঝে থেমে যায় তখন ভেতর থেকে আবার ধুপ ধুপ শব্দ শুনতে পায়। এবারে শুধু ধুপ ধুপ শব্দ নয়, তার সাথে সাথে সে হিংস্র কোনো জন্তুর গোঙানির মতো শব্দও আসতে থাকে। মতি জোর করে তার ভেতর থেকে সব আতঙ্ক দূর করে দেয়—তার কবজটি দরকার। সারা জীবন টাকা-পয়সার কষ্ট করেছে, এই কবজটি বিক্রি করে সে তার টাকা-পয়সার অভাব মিটিয়ে ফেলবে।
গর্তটা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। দূর থেকে কেউ দেখে ফেলবে ভেবে সে টর্চলাইট জ্বালাচ্ছে না, আন্দাজে কাজ করে যাচ্ছে। যখন তার মনে হলো সে তার শরীরটা মোটামুটি ঢোকাতে পারবে তখন কোদালটা নামিয়ে রেখে সে আবার টর্চলাইট জ্বালাল। ভেতরের প্রাণীটা আবার অব্যক্ত একধরনে শব্দ করে এক কোনায় গুটিশুটি হয়ে সরে যায়।
মতি এবার কবজটি বের করার জন্য প্রস্তুত হলো, এক হাতে টর্চলাইট ধরে রেখে সে শরীরটা ভেতরে ঢোকায়। গর্তটা আরেকটু বড় হলে ভালো হতো, কিন্তু মতি সেটা নিয়ে মাথা ঘামাল না, ধাক্কা দিয়ে তার শরীরটা ভিতরে ঢুকিয়ে নিল। তারপর হাত বাড়িয়ে সে বয়ামটা ধরে। দীর্ঘদিন এখানে থাকার কারণে বয়ামটা প্রায় পুরোই মাটির নিচে গেঁথে গেছে। মতি বয়ামটা কয়েকবার সামনে-পিছনে ঠেলে একটু জায়গা করে নিল, তারপর টান দিয়ে সেটাকে বের করে আনে। বয়ামের ভেতরে টর্চলাইটের আলো ফেলে দেখল, সত্যি সেখানে বিচিত্র একটি কবজ। মতির মুখে হাসি ফুটে উঠল। বয়ামটি হাতে নিয়ে সে আবার ধাক্কাধাক্কি করে নিজের শরীরটা বের করে আনে।
কবরের ভেতর বড় একটা গর্ত। গর্তটা আলাদাভাবে ভরাট করতে অনেক সময় নেবে। মতি তাই ঠিক করল সে বাইরে গিয়ে মাটি ফেলে পুরো কবরটাই বুজিয়ে দেবে। মতি প্রথমে তার কোদালটা বাইরে ছুড়ে দিলো, টর্চলাইটটা কোমরে বেঁধে নিল, তারপর বয়ামটা এক হাতে ধরে রেখে বের হয়ে আসে।
বয়ামটাকে সে সাবধানে একটু দূরে রেখে কবরের ভেতর মাটি ফেলতে শুরু করে। মৌলভি সাহেব বলেছিলেন কবজটিকে সবসময় কাছাকাছি রাখতে হয় কিন্তু কিছুক্ষণ একটু দূরে নিরাপদ জায়গায় রাখলে কী আর হবে?
মাটি দিয়ে মোটামুটি ভরাট করার পর হঠাৎ চারপাশে হালকা আলো ছড়িয়ে পড়ল, চাঁদ উঠেছে। মতি আকাশের দিকে তাকায়। চাঁদটা বাঁশঝাড়ের ওপর উঠে আসায় হঠৎ চারপাশে এই আলো ছড়িয়ে পড়েছে।
মতি কাজ শেষ করার জন্য কোদালটা দিয়ে মাটি তুলে সামনে তাকাতেই তার শরীরটা হঠাৎ হিম হয়ে গেল—কবরের মাটি নড়ছে। প্রথমে একটা শীর্ণ হাত বের হয়ে আসে, তারপর মাথার একটা অংশ! মাটি খামচে ধরে সেই প্রাণীটি তার দুই হাত এবং মাথাটা বের করে। চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখতে পেল সেটি তার ধারালো দাঁত বের করে হাসল, তারপর মুখ দিয়ে একটা শব্দ করল, “উ-ম-ম-ম…”
মতি এক মুহূর্তের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে যায়, তারপর কোদালটি দুই হাতে শক্ত করে ধরে। প্রাণীটি তার জিভ বের করে ঠোঁট চেটে নেয়, তারপর টেনে টেনে বলে, “খিদা—অ-নে-ক খিদা—”
তারপর কিছু বোঝার আগেই প্রাণীটি বিদ্যুৎগতিতে কবর থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে মতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মতি কিছু বোঝার আগেই সে তার ঘাড়ে তীব্র একটা যন্ত্রণা অনুভব করে। ভয়াবহ এটা দুর্গন্ধে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। মতি টের পেল প্রাণীটি তার গলায় রক্তের ধমনিতে দাঁত বসিয়ে রক্ত শুষে নিচ্ছে।
মতি হাত দিয়ে ধরে প্রাণীটাকে তার শরীর থেকে ছুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। দেহটি হিম শীতল, পচা মাংসের মতো। যেখানেই মতি হাত দিয়ে ধরার চেষ্টা করে সেই জায়গাটি থেকে পচা মাংস খুলে আসে। সে একটা পচা-গলা মৃতদেহের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু এই মৃতদেহটির ভেতরে আছে এক অমানুষিক শক্তি, অশরীরী শক্তি জিগিরা।
প্রাণীটি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “পারবি না, তুই পারবি না…আমি জিগিরা…আমি কতদিন থেকে না খেয়ে আছি…”
মতি তার হাতের কোদালটা নিয়ে ঘুরিয়ে প্রাণীটাকে আঘাত করার চেষ্টা করল, সেটি কাচের বয়ামটির সাথে লাগল, সাথে সাথে বয়ামটি উড়ে গিয়ে একটা ঝোপের ভেতর গিয়ে পড়ে। মতি কোমর থেকে তার দা’টি খুলে নেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু প্রাণীটি তাকে ছাড়ে না। তার নাক, চোখ, মুখের সাথে লেপটে থেকে সেটি তার গলার রগ থেকে রক্ত শুষে নিতে নিতে পরিতৃপ্ত গলায় টেনে টেন বলে, “মজা… মজা… মজা…কতদিন কিছু খাই না…”
মতি হঠাৎ করে টলে ওঠে। তার মাথা ঘুরছে, সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না, প্রাণীটাকে নিয়ে সে নিচে পড়ে যায়। তার গায়ে আর শক্তি নাই, সে প্রাণীটাকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করল, পারল না। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করল, পারল না।
প্রাণীটা মুখ তুলে একবার মতির দিকে তাকাল তারপর তার চটচটে শীতল লকলকে জিভ দিয়ে তার মুখ চাটতে থাকে। মতির রক্তহীন ফ্যাকাশে দেহটির ভেতরে তার শক্তিশালী হৃৎপিণ্ডটি বৃথাই শরীরের ভেতর রক্ত সঞ্চালন করার চেষ্টা করে একসময় থেমে যায়। মতি জানতেও পারে না প্রায় সত্তর বছর থেকে ক্ষুধার্ত অশরীরী প্রাণী একটি মৃতদেহে ভর করে শুধু তার রক্ত খেয়েই পরিতৃপ্ত হয়নি, তার শরীরের ভেতরেও খুবলে খুবলে খেতে শুরু করেছে।
.
মৌলভি সাহেব ফজরের আজানের আগেই জেগে ওঠেন। আজকে তার আরও আগে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল—মনের ভেতর কেমন জানি অশুভ একটা ভাবনা। তিনি দরুদ শরিফ পড়তে পড়তে দরজা খুলে বের হলেন। ভোররাতে মৌলভি সাহেব কবরস্থানে হেঁটে হেঁটে প্রত্যেকটা কবরে শায়িত মানুষের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করেন। আজকেও সেভাবে দোয়া করতে করতে আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছেন। লিচু গাছটার কাছাকাছি এসে তিনি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। মনে হলো সেখানে মাটি খোঁড়া হয়েছে এবং তার কাছে একটি দেহ পড়ে আছে। মৃতদেহ।
মৌলভি সাহেব কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে কাছে গেলেন। মৃতদেহটি ক্ষতবিক্ষত, আবছা অন্ধকারে ভালো করে দেখা যায় না। তারপরেও তিনি মতিকে চিনতে পারলেন। একটি মৃদু শব্দ করে তিনি ফিসফিস করে বললেন, “হে পরওয়ারদিগার। তুমি মাফ করে দিও।“
* * *
সুপারভাইজার পকেট থেকে একটা বোতল বের করে কম বয়সি ছেলেটার হাতে দিলো। বলল, “নে। সাথে রাখ।”
“এটা কী?
“বাংলা।”
ছেলেটা অবাক হলো, “বাংলা মানে কী?”
“বাংলা মদ।”
“আমি মদ খাই না।”
সুপারভাইজার তার ময়লা দাঁত বের করে হাসল। বলল, “আজ রাতে খাবি। সমস্যা কী?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল, “না। আমি মদ খাই না।”
“যারা রাতে মর্গে ডিউটি দেয় তাদের খেতে হয়।”
“কেন?”
সুপারভাইজার ঘরের কোনায় সারি সারি বাক্স দেখিয়ে বলল, “ওইগুলার ভিতর কী?”
“লাশ।”
“হ্যাঁ। রাত্রেবেলা একটা-দুইটা লাশ জিন্দা হয়, বাক্সের ভিতরে শব্দ করে। চিৎকার করে।”
ছেলেটা বিস্ফারিত চোখে বলল, “চিৎকার করে?”
“হ্যাঁ।”
“কে—কেন?”
“কবে কেডা।” সুপারভাইজার গাল চুলকে বলল, “লাশের ট্রে খুলে ভিতরে দেখার চেষ্টা করিস না।”
“কেন?”
“আমি একদিন খুলেছিলাম। লাশ তোর দিকে তাকায়া হাসে, উঠে বসার চেষ্টা করে, তোরে ধরার চেষ্টা করে।”
“ইয়া মাবুদ!”
“বেশি ভয় লাগলে এক ঢোঁক খাবি। ভয় কমব।”
সুপারভাইজার টেবিলের ওপরে বোতলটা ঠক করে রেখে বলল, “খালি এই মর্গে না, সব জায়গায় এক অবস্থা। মনে হয় কিছু একটা হইছে।”
“কী হইছে?”
“কোনো পিশাচ মনে হয় ছাড়া পাইছে।”
কম বয়সি ছেলেটা শুকনো মুখে বলল, “অফিসে জানাইছেন?”
“জানায়া লাভ কী? কে বিশ্বাস করবে? লাভের মাঝে ডিউটির সময় নেশা করছস বলে চাকরি চলে যাবে।”
সুপারভাইজার চাবির গোছা কম বয়সি ছেলেটার হাতে দিয়ে চলে গেল।
ঘণ্টাখানেক পর ছেলেটি শুনতে পেল লাশের একটা ট্রে ঝনঝন করে শব্দ করছে। ভেতর থেকে গোঙানোর মতো শব্দ হচ্ছে।
ছেলেটির শরীর হিম হয়ে যায়। সে বাংলা মদের বোতলটা শক্ত করে ধরে, সে জীবনে মদ খায় নাই, আজকে মনে হয় খেতে হবে।
