নকশা-কাটা কবজ – ৭
৭
ঘরের চারকোনায় চারটা মোমবাতি, এ ছাড়া আর কোনো আলো নেই। ঘরটা বেশ বড়, তাই ছোট চারটি মোমবাতি পুরো ঘরের অন্ধকার দূর করতে পারছে না, শুধু অন্ধকারটিকে একটা আবছা অন্ধকারে পাল্টে দিয়েছে। ঘরের মাঝখানে একটা চতুষ্কোণ কফিন, কফিনটা ঘিরে মেঝেতে সাতজন মানুষ বসে আছে। মানুষগুলোর পরনে আলখাল্লা, বড় হুড মুখ ঢেকে রেখেছে তাই দেখে বোঝার উপায় নেই তাদের ভেতরে কে পুরুষ কে নারী। কফিনে পায়ের কাছে যে বসে আছে সে এই সাতজন মানুষের নেতা—অন্যরা তার নির্দেশ মেনে চলছে।
মানুষটি নিচু গলায় বলল, “বহু বছর পর আজ আমরা একটি বিশেষ ঘটনা উদযাপনের জন্য এখানে মিলিত হয়েছি। দিনটি আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
“আমার প্রিয় সহকর্মী, প্রিয় সহযোদ্ধা, প্রিয় বন্ধুরা, আমরা দীর্ঘদিন থেকে আমাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী মানব এবং মানবীরা পৃথিবীর একটা বিশাল পরাশক্তির বিরুদ্ধে গোপনে সংগ্রাম করে যাচ্ছি। সুদূর অতীতে আমাদের পূর্বপুরুষদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। পৃথিবীর অনেক জায়গায় এই নৃশংসতা আপাতদৃষ্টিতে বন্ধ হলেও আমাদের মতাদর্শের বিরুদ্ধ অন্যায় এবং অযৌক্তিকভাবে নিষ্পেশন শেষ হয় নাই। আমরা প্রকাশ্যে আমাদের মতাদর্শ প্রচার করতে পারি না। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর অন্ধকার জগতের শক্তি মহামান্য শিতানের প্রতি আনুগত্যের কথা আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যদেরও জানাতে পারি না।”
বাকি ছয়জন সমস্বরে বলল, “পারি না। পারি না।”
“মহামান্য শিতানের একান্ত বিশ্বাসযোগ্য ঘনিষ্ঠজন মহামান্য জিগিরা দীর্ঘ সত্তর বছর চোখের আড়ালে ছিলেন। মানুষের কোনো এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে তাকে কোনো এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মানবদেহে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। আমাদের অপরিসীম সৌভাগ্য তিনি মুক্তি পেয়েছেন।”
অন্যরা বলল, “মুক্তি পেয়েছেন। মুক্তি পেয়েছেন।”
“আমরা জিগিরার উপাসনা করি। আমরা তার আনুগত্য গ্রহণ করেছি। আমরা আজ তার দর্শন লাভের জন্য এখানে জমায়েত হয়েছি। আমরা তাকে আহ্বান করব, তিনি আমাদের মাঝে উপস্থিত হবেন। তোমরা সবাই কি মহামান্য জিগিরার সান্নিধ্য লাভের জন্য প্রস্তুত?”
অন্যরা বলল, “প্রস্তুত। আমরা প্রস্তুত।”
“তাহলে এসো আমরা তাকে আহ্বান করি। আমরা তার দর্শন লাভ করে কৃতার্থ হই।”
“কৃতার্থ হই। কৃতার্থ হই।”
কালো আলখাল্লা পরা মানুষটি তার দুই পাশে রাখা দুটি মালসার জ্বলন্ত কয়লায় কিছু সাদা পাউডার ছেড়ে দিতেই মালসা থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে থাকে। একটি তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে ঘর ভরে যায়। বসে থাকা অন্য মানুষগুলোর সামনে নানা রকম বাদ্যযন্ত্র, তারা সেখানে আঘাত করে এবং সারা ঘরটি একধরনের আদিম উন্মাদনায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। মানুষগুলো মাথা দুলিয়ে চিৎকার করতে থাকে, “আয় আয় আয় রে! আয় আয় আয় রে! আয় আয় আয় রে!”
তাদের মাথার হুড খসে পড়ে এবং নারীদের চুল ছড়িয়ে পড়ে। তারা দুই হাত ওপরে তুলে জিগিরাকে ডাকতে থাকে। দলটির নেতা কফিনটির ঢাকনা খুলে দেয়। কফিনের ভেতর একটি মৃতদেহ, মৃতদেহটির দুই হাত বুকের ওপরে রাখা।
পুরো দলটি এবারে উঠে দাঁড়ায়, বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বাজাতে তারা মৃতদেহটি ঘিরে ঘুরতে ঘুরতে ডাকতে থাকে, “জিগিরা জিগিরা জিগিরা—”
হঠাৎ করে মৃতদেহটি নড়ে ওঠে। তার চোখ দুটো খুলে যায় এবং কফিনের ভেতর মৃতদেহটি ধীরে ধীরে উঠে বসে।
দলটির নেতা চিৎকার করে বলে, “মহামান্য জিগিরা এসেছেন। তার জন্য রাখা মরদেহে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। সবাই নতজানু হয়ে জিগিরাকে অভিবাদন করো।”
সাথে সাথে সবাই যে যেখানে আছে সেখান থেকে মাটিতে মাথা রেখে দুই হাত সামনে রেখে নত হলো। দলটির নেতা মাথা নিচু করে বলল, “প্রভু আপনাকে স্বাগতম স্বাগতম। আপনার অনুগত নশ্বর মানুষের থেকে আপনাকে অভিবাদন। আমরা আমাদের আত্মা আপনার কাছে সমর্পণ করছি। আপনি গ্রহণ করুন।”
সবাই সমস্বরে বলল, “গ্রহণ করুন। গ্রহণ করুন।’“
মৃতদেহটি ধীরে ধীরে দাঁড়ানো চেষ্টা করে, কিন্তু দাঁড়াতে পারে না, টলতে থাকে। মৃতদেহের কণ্ঠ থেকে একধরনের অশরীরী শব্দ ভেসে আসে, “কেন? কেন আমাকে ডেকেছিস?”
দলনেতা বলল, “আমরা আপনার অনুগ্রহ চাই প্রভু জিগিরা। আমরা আপনার অনুগ্রহ পেয়ে ধন্য হতে চাই।”
সবাই সমস্বরে প্রতিধ্বনি করল, “ধন্য হতে চাই। ধন্য হতে চাই।” দলনেতা একই সুরে বলতে থাকে, “আমরা আপনার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার স্পর্শ পেতে চাই। আমরা আপনার শক্তির অংশ পেতে চাই।”
“অংশ পেতে চাই। অংশ পেতে চাই।”
মৃতদেহের কণ্ঠস্বর হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে। কুৎসিত অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে, হিংস্র গলায় বলে, “আমি যখন বৎসরের পর বৎসর অন্ধকার কবরে আটকা পড়ে ছিলাম তখন তোরা কোথায় ছিলি? কোথায়?”
দলনেতা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। মাথা নিচু করে বলে, “ক্ষমা করুন প্রভু। ক্ষমা করুন।”
সবাই মাথা নিচু করে বলে, “ক্ষমা করুন। ক্ষমা করুন।”
মৃতদেহের কণ্ঠস্বরে জিগিরার কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, “তুচ্ছ মানুষের এত বড় ধৃষ্টতা? আমাকে শবদেহে আটক করে কবরের অন্ধকারে নিমজ্জিত করে? তারা কোথা থেকে এত দুঃসাহস পেয়েছে জানিস? জানিস?”
“আমরা জানি না প্রভু। আমরা জানি না।”
অন্য সবাই বলল, “জানি না। জানি না।”
“তাদের কাছে ছিল মিসরীয় জাদুকরের কবজ। সেই কবজের বন্ধন থেকে আমি মুক্ত হয়েছি কিন্তু সেই কবজ এখনও এই পৃথিবীতে আছে। সেই কবজ ধ্বংস না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। তোরা যদি আমার শক্তির ভাগিদার হতে চাস—সেই কবজ আমার সামনে এনে ধ্বংস কর। গলিয়ে-পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দে।”
“আমরা আপনার আদেশ মাথা পেতে নিলাম প্রভু। আমরা সেই কবজ ধ্বংস করব।”
অন্যরা প্রতিধ্বনি করল, “ধ্বংস করব। ধ্বংস করব।”
জিগিরা হিংস্র গলায় বলল, “সেই কবজ কোথায় আছে খুঁজে বের কর। কার কাছে আছে খুঁজে বের কর। যতক্ষণ সেটি খুঁজে বের করতে না পারিস আমার হাত থেকে তোদের মুক্তি নাই।”
“বুঝতে পেরেছি প্রভু। আপনার কাছে আমরা একটু সময় চাই প্রভু। একটু সময় চাই।”
অন্যরা প্রতিধ্বনি করল, “সময় চাই। সময় চাই।”
দলনেতা মাথা নিচু করে বলল, “হে প্রভু, আপনি আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন, আমরা সে জন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। প্রভু আমরা আপনার সেবা করার জন্য একটু পানীয় আর একটু আহার্য রেখেছি প্রভু। আপনি সেগুলো গ্রহণ করে আমাদের কৃতার্থ করুন।”
অন্যরা সমস্বরে বলল, “কৃতার্থ করুন। কৃতার্থ করুন।”
মৃতদেহে ভর করা জাগিরা অট্টহাসি করে উঠল, সেই ভয়ংকর অট্টহাসিতে সারা ঘর প্রকম্পিত হয়। মৃতদেহের কণ্ঠস্বরে জিগিরা বলল, “আমি সত্তর বছরের অভুক্ত পিশাচ জিগিরা। আর তোদের এই তুচ্ছ পানীয় খেয়ে আমার তৃপ্তি হবে? নির্বোধ আহাম্মকের দল।” জিগিরা কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করতে থাকে।
দলপতি ভয়ে কেঁপে উঠে মাথা নিচু করল। কাঁপা গলায় বলল, “আমাদের ভুল হয়েছে প্রভু। ভুল হয়েছে।”
অন্য সবাই একই সাথে হাত জোড় করে মাথা নিচু করল, বলল, “ভুল হয়েছে প্রভু। ভুল হয়েছে।”
তোদেরকে আমি এক চন্দ্রমাস সময় দিলাম। পরের অমাবস্যায় এখানে কবজ নিয়ে হাজির হবি। আর আমার খাওয়ার জন্য আমি জীবিত
মানুষ চাই। জীবিত মানুষের রক্ত চাই। জীবিত মানুষ।”
“আমরা বুঝতে পেরেছি জনাব। জীবিত মানুষের রক্ত।”
“জীবিত মানুষের রক্ত। জীবিত মানুষের রক্ত।”
“আমি যাচ্ছি। তোরা যদি ডাকিস আমি আবার আসব। কিন্তু যেন মনে থাকে, কবজটি খুঁজে বের করে আমাকে ডাকবি। যে কবজ আমাকে সত্তর বছর অন্ধকার ঘরে আটকে রেখেছে আমি সেই কবজটি ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে এই পৃথিবীটা আমার জন্য নিরাপদ করতে চাই।”
“আমরা কবজ সংগ্রহ করে আপনাকে ডাকব মহামান্য জিগিরা।”
অন্যরা প্রতিধ্বনি করল, “মহামান্য জিগিরা। মহামান্য জিগিরা।”
“আমি যাচ্ছি।” মৃতদেহটির কণ্ঠ থেকে শব্দ বের হয়, “আমি যাচ্ছি। আমি যাচ্ছি।” কথাগুলো আস্তে আস্তে অস্পষ্ট হতে হতে একসময় থেমে যায় এবং মৃতদেহটি কফিনের ভেতর আছড়ে পড়ে।
আলখাল্লা পরা সাতজন মানুষ তারপরও বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকে। তারপর একজন একজন করে মাথা ওপরে তোলে। তারা কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে থাকে। ফিসফিস করে এসে অন্যের সাথে কথা বলে। তারপর একজন একটু গলা উঁচু স্বরে বলে, “আমরা কি এখন বাতি জ্বালাতে পারি?”
দলপতি বলল, “হ্যাঁ জ্বালাও। আর কেউ একজন কফিনটি ঢেকে দাও।’
একজন কফিনটি ঢেকে দিলো। অন্য আরেকজন ঘরের আলো জ্বেলে দেয়। তীব্র আলোতে ঘরটি আলোকিত হয়ে যায়। অন্ধকারে বসে থাকার পর তীব্র আলোতে সবারই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আলোতে অভ্যস্ত হওয়ার পর তারা একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। নিজেদের কালো আলখাল্লা খুলে রাখল। নারী সদস্যরা নিজেদের অবিন্যস্ত পোশাক ঠিক করে। একজন দলপতিকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি জিগিরার জন্য রাখা অ্যালকোহল খেতে পারি?”
“হ্যাঁ, খেতে পারো। কিন্তু মদ খেয়ে মাতাল হওয়ার আগে শবদেহটি কোল্ড স্টোরে রাখো। পরের পর্বে নূতন মৃতদেহ জোগাড় করতে না পারলে আবার এটি ব্যবহার করতে হবে।”
মানুষগুলো লাশ সরানোর জন্য উঠে দাঁড়ায়। দলপতি কঠিন গলায় বলল, “তোমরা নিজেরই সব শুনেছো।”
কয়েকজন মাথা নাড়ল। দলপতি বলল, “কাজেই সবাই বুঝতে পারছো আমাদের কী করতে হবে।”
মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ বলল, “হ্যাঁ, আমরা বুঝতে পারছি।”
“কাজেই সবার আগে আমাদের কবজটি উদ্ধার করতে হবে।”
“এখন কোথায় আছে আমরা কি সেটি জানি?”
“না জানি না। সম্ভবত সেই গোরস্থানের কোনো এক জায়গায় পড়ে আছে। আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।”
“আমরা বের করে নেব।”
দলপতি কঠোর গলায় বলল, “মনে রেখো, এটি আমাদের জন্য একটি অভূতপূর্ব সুযোগ। জিগিরার শক্তির একটুখানিও যদি আমরা পেতে পারি, তাহলে এই পৃথিবীর সব ক্ষমতা আমাদের হাতে চলে আসবে।”
“আমরা জানি লিডার।”
“আর মনে রেখো। আমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে কেউ যেন কিছু না জানে।”
“জানবে না লিডার। কেউ জানবে না।”
