ভগ্নাংশের সমর্থনে: দাঙ্গা নিয়ে কী লেখা যায়? – জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে
১
এটা গবেষণা প্রবন্ধ নয়। হিংসার ইতিহাস লিখতে গিয়ে, বিশেষ করে ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক হানাহানির ইতিহাস লিখতে গিয়ে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, এ তারই একটা প্রাথমিক বিবরণ। আধুনিক ভারতের ইতিহাস নিয়ে লেখাপত্র পড়লে মনে হয়, এখানে হিংসার ঘটনা যেন নেহাতই একটা ব্যতিক্রম। একটা কিছুর অভাবও বটে। ব্যতিক্রম এই অর্থে যে ভারতের ইতিহাসের মূল যে ধারা, তাতে যেন হিংসাত্মক ঘটনার কোনও ভূমিকা নেই। তা যেন অনেক দূরের কিছু বিচ্ছিন্ন। ভারতের ‘আসল’ ইতিহাসে যেন ওসব ঘটনা পাওয়া যাবে না। কারণ ওগুলো ইতিহাসের বিকার।১ আর অভাব, কারণ ঐতিহাসিক উপাদান ঘেঁটে হিংসার মুহূর্তটিকে পুনর্বার গড়ে নিয়ে ভাষায় উপস্থিত করার ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদ্যার একটা মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে—শুধু ভারতবর্ষের ইতিহাসের কথাই বলছি না, এ-সমস্যা সব ইতিহাসের বেলাতেই আছে। হিংসার ইতিহাস লিখতে গেলেই তাই লিখতে হয় শুধু পটভূমির কথা, পরিপ্রক্ষিতের কথা—হিংসাকে ঘিরে থাকে আর যেসব জিনিস, তাদের কথা। হিংসা নিয়ে কিছুই লেখা হয় না। হিংসার নিজস্ব রূপরেখা যেন আগে থেকেই আমাদের জানা, তা নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের যেন কোনও প্রয়োজন নেই।
নিম্নলিখিত বিবরণটি উপস্থিত করতে গিয়ে অনেক জায়গাতেই আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলেছি, সমাজবিজ্ঞান বা ইতিহাস-রচনার ক্ষেত্রে যা হয়তো খুব একটা স্বাভাবিক নয়। বিবরণের শেষদিকের অংশটা অনেকটাই ১৯৮৯-এর ভাগলপুরের দাঙ্গা নিয়ে লেখা। দিল্লির পিপল্স ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেটিক রাইট্স (পি. ইউ. ডি. আর.) প্রেরিত দশ সদস্যের এক তদন্তকারী দলের সদস্য হিসাবে ভাগলপুরের দাঙ্গাগ্রস্ত এলাকায় ঘোরার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমি ওই অংশে প্রচুর ব্যবহার করেছি। এরকম ‘ব্যক্তিগত’ বিচার বা অনুভূতির অংশবিশেষকে সমাজবিজ্ঞানের আলোচনসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা অবশ্য ইদানীং কালে অনেকটা চালু হয়েছে। কিন্তু বিশেষ করে নারীবাদী রচনায় এর উল্লেখযোগ্য প্রয়োগ সত্ত্বেও ইতিহাস-রচনায় লেখকের ব্যক্তিসত্তার এ-জাতীয় অনুপ্রবেশ নিয়ে অনেকের মতো আমারও বেশ খানিকটা অস্বস্তি রয়ে গেছে।
অস্বস্তির আরও একটা কারণ এই যে ভারতের সাম্প্রতিক সামাজিক-রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে-সব লেখা, তা নিয়ে আমার আলোচনা হয়তো কিছুটা অসঙ্গত এবং অনুদার মনে হতে পারে। বিশেষ করে যেখানে এই লেখকেরা অনেকেই সামাজিক ও রাজনৈতিক অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে সক্রিয় হয়েছেন। এ-প্রসঙ্গে আমার বলে নেওয়া কর্তব্য যে আসগর আলি এঞ্জিনিয়ারের মতো ব্যক্তি বা পিপল্স ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস এবং পিপল্স ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেটিক রাইট্স-এর মতো সংগঠন দাঙ্গার বিষয়ে অনুসন্ধানে পথপ্রদর্শকের কাজ না করলে আমার পক্ষে এই লেখায় হাত দেওয়া সম্ভব বা প্রয়োজন হত না।২ তাঁদের লেখা নিয়ে আমার সমালোচনা হয়তো নেহাতই পণ্ডিতি কুটকচাল বলে মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, এর কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই। আমি কিন্তু বিশ্বাস করি যে অ্যাকাডেমিক চিন্তাভাবনা আর রাজনৈতিক কাজকর্মের মধ্যে একটা আদানপ্রদান সম্ভব। খুব সামান্য হলেও এই লেখার বক্তব্য হয়তো আজকের রাজনৈতিক বিতর্ককে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
এই রচনার বিষয় সাম্প্রদায়িক হানাহানি নিয়ে ঐতিহাসিক লেখাপত্র। এই সব লেখাপত্রের কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয়তাবাদ, জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনা, ভাষা, আবেগ, অলঙ্কার। সম্প্রতিকালে, বিশেষ করে গত বিশ বছরে, এই ভাষায় একটা উগ্র স্বর যুক্ত হয়েছে। এই সময়ে ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতা যতই কেন্দ্রীভূত হয়েছে, ততই সেই রাষ্ট্র জাতীয়তার নামে আসলে এক নতুন-বড়লোক বিলাসদ্রব্যলোভী শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী আর তাদের সহযোগী গ্রামীণ ধনী কৃষক শ্রেণীর পক্ষে খোলাখুলি ওকালতি করেছে। এই ক্ষুদ্রস্বার্থের উচ্চাশা চরিতার্থ করতে ভারতীয় রাষ্ট্র সবরকম বিরোধিতাকেই ‘জাতীয়তা-বিরোধী’ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে, সে বিরোধিতা শ্রমিক শ্রেণীরই হোক, গ্রামের দরিদ্রদেরই হোক অথবা কোনও আঞ্চলিক আন্দোলনের পক্ষ থেকেই তা আসুক।
ভারতীয় সমাজের ভগ্নাংশগুলিকে তথাকথিত জাতীয় সংস্কৃতির মূলধারায় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য এই ভাবে প্রবল চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ভগ্নাংশ কখনও সংখ্যালঘু ধর্মীয় কিংবা জাতি-উপজাতি গোষ্ঠী, আবার কখনও সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণী, কখনো নারী আন্দোলনের কর্মী—যারাই কোনও না কোনও অর্থে সংখ্যালঘু সংস্কৃতি বা আচার ব্যবহারের প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, তাদের সকলেরই বিরোধিতা ‘জাতীয়তা-বিরোধী’ বলে রাষ্ট্রের দমননীতির কবলে পড়তে পারে। অন্যদিকে জাতীয় সংস্কৃতির মূল ধারা বলতে কিন্তু সবসময়ই তুলে ধরা হয়েছে হিন্দু ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অত্যাধুনিক বিলাসদ্রব্যভোগী চেহারাটি। এই মূলধারা আসলে সমাজের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশের জীবনযাত্রা ধ্যানধারণার প্রতিফলন। অথচ তাকেই ঢাক পিটিয়ে জাহির করা হয়েছে জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে। ‘বিবিধের মাঝে মিলন’ আজকের এই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের শ্লোগান নয়। বরং শাসক শ্রেণী ছাড়া অন্য যে-কোনও সংখ্যালঘুর পরিচয়—যা ভিন্ন, ক্ষুদ্র, আঞ্চলিক, স্থানীয় বস্তুত, সবরকমের প্রভেদই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপজ্জনক, বিজাতীয়।
ভারতের রাজনীতি নিয়ে লিখতে গেলে রাষ্ট্রচালিত এই সাংস্কৃতিক সমীকরণের চেষ্টাটাকে সামনে আনা দরকার। সেই সঙ্গে সামনে আনা দরকার জাতীয়তাবাদ নিয়ে গভীর সামাজিক বিরোধের প্রক্রিয়াটিকে। ভগ্নাংশের সমর্থনে কথা বলার একটা উদ্দেশ্য এই অগভীর সমীকরণ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, জাতীয়তার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় সমাজের আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপরেখা নির্মাণে অগ্রসর হওয়া।
এ-কথা বলতে চাইছি না যে ‘সংখ্যালঘু’—যেসব সংখ্যালঘুর কথা ওপরে বললাম—তাদের প্রতিরোধ সবক্ষেত্রেই, এমনকি বহুলাংশে সচেতনভাবে এই উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় সমাজ নিয়ে যে-ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী বা রাজনৈতিক কর্মী একটু বিস্তৃতভাবে ভাবার চেষ্টা করেন, তিনিই নিশ্চয় একমত হবেন যে আজ আমাদের দেশে যা ঘটে চলেছে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই প্রক্রিয়ায় ধরা পড়ে। ইতিহাস লেখা নিয়েও এখানে বিরোধ আছে। জাতীয়তাবাদের যে সংকীর্ণ সংস্করণের কথা ওপরে বললাম, তা শুধু বিশ্বরাজনীতির সাম্প্রতিক হাওয়াবদল থেকেই যে জোর পাচ্ছে, কিংবা শুধু প্রাচীন ভারতের গৌরব নিয়ে আস্ফালন করাতেই যে তা সীমাবদ্ধ , এমন মোটেই নয়। অত্যন্ত আধুনিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ এক জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনার ধারাও ভারতবর্ষের তথাকথিত স্বাভাবিক ঐক্য এবং শাশ্বত জাতীয়তার এই ধারণাকে পরিপুষ্ট করেছে।
শুধু তাই নয়, ইতিহাস-রচনার এই ধারা রাষ্ট্রকে—যে রাষ্ট্র আজকের ভারতবর্ষে উপস্থিত, সেই বিশেষ রাষ্ট্রকেই—উন্নীত করেছে ইতিহাসের অন্তিম লক্ষ্যে। তাই দেখি, ভারতের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইতিহাস’ বিষয়টা প্রায় সবসময়ই শেষ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে এসে, যেন স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের ইতিহাসের সার্থক পরিসমাপ্তি। তাছাড়া যেসব নিখুঁত দ্বিপদ বিভাজনগুলি আমরা সবাই ব্যবহার করি, তাও আমরা পেয়েছি এই ইতিহাস থেকেই—ধর্মনিরপেক্ষ/ সাম্প্রদায়িক/ জাতীয়/ আঞ্চলিক, প্রগতিশীল/প্রতিক্রিয়াশীল। ঐতিহাসিকরা এই বিভাজনগুলির যথার্থতা নিয়ে অতি সম্প্রতিকালেই প্রথম প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।৩
বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী এবং উদারপন্থী ঐতিহাসিকদের বেশ কয়েক দশকের শক্তিশালী ও বিদগ্ধ লেখাপত্র সত্ত্বেও ভারতীয় ইতিহাস-রচনার এই ‘কেন্দ্রীয়’ দৃষ্টিকোণই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত দৃষ্টিকোণ থেকে গেছে। আর সরকারি দপ্তর এবং আদালতের নথিপত্রের মহাফেজখানাই রয়ে গেছে তার সর্বপ্রধান প্রাথমিক তথ্যসূত্র। যে ধারণাগুলি আমাদের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের লক্ষ্যবস্তু—যেমন, ভারত, পাকিস্তান অথবা অন্ধ্রপ্রদেশ, অযোধ্যা অথবা হিন্দু বা মুসলিম সম্প্রদায় অথবা জাতীয়তা, জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা—এগুলি যে সবই সাময়িক এবং পরিবর্তনসাপেক্ষ, তা কিন্তু এই ইতিহাস রচনার ধারায় মোটেই স্বীকৃত নয়।
‘ভারত’ নামক একটি সাময়িক এবং বিশেষ সমষ্টির উপর স্বাভাবিক ও শাশ্বত ঐক্যের মহিমা আরোপ করার ফলে এবং সরকারি মহাফেজকে ইতিহাসের তথ্যের প্রাথমিক আকর বলে মেনে নিয়ে ঐতিহাসিকেরা কিন্তু প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিকেই স্বীকার করে নিয়েছেন। এটা বিশেষ করে ঘটেছে আধুনিক ভারতের ইতিহাসের বেলায়। ভারতের ঐক্য এবং সেই ঐক্যবদ্ধ ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামই যেহেতু এই ইতিহাসের মূল উপজীব্য, উনিশ শতকের গোড়া থেকেই এর কাহিনী তাই পর্যবসিত হয়েছে ভারতীয় জাতি-রাষ্ট্রের জীবনকাহিনীতে। একই কারণে এই ইতিহাসে দেশভাগের কাহিনী, আর সেইসঙ্গে ১৯৪৬-৪৭ সালের হিন্দু-মুসলিম এবং মুসলিম-শিখ দাঙ্গার কাহিনী, এক রকম প্রায় এড়িয়েই যাওয়া হয়েছে।
এই ছকের ভেতর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস একটা গৌণ কাহিনী। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নাটকের সুবিশাল প্রেক্ষাপটে হিন্দু ‘রাজনীতি’, ‘মুসলিম’ রাজনীতি এবং হিন্দু-মুসলিম সংঘাত নেহাতই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা হিসেবে রূপায়িত হয়েছে। সেখানেও আবার আসল কর্ণধার সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা, যারা কলকাঠি নেড়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত জিইয়ে রাখত। সেই রকম দেশভাগের ইতিহাসও লেখা হয়েছে শুধুই ‘সাম্প্রদায়িকতা’-র ইতিহাস হিসেবে। বলা বাহুল্য, দেশভাগের ইতিহাস কোনও মহৎ সংগ্রামের ইতিহাস নয়। কিন্তু আমাদের লেখাপত্রে তা এমনকী অনির্দিষ্ট, খাপছাড়া, দিশাহীন সংগ্রামের চেহারা নিয়েও হাজির হয় না। তাতে কোনও আত্মত্যাগ বা ক্ষতির কাহিনী নেই, নেই কোনও নতুন পরিচয় কিংবা নতুন সংঘবদ্ধতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, নেই লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল হতভাগ্যের মনে নতুন আকাঙ্ক্ষা, নতুন সংকল্পের উন্মোচন। এ-সব ইতিহাসে শুধুই দেশভাগের ‘সূত্র’ বা ‘কারণ’ খোঁজার রিপোর্ট—কোন কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে, রাজনীতির কোন কোন ভুল চালে কিংবা কোন অপ্রতিরোধ্য সামাজিক-রাজনৈতিক চাপে ওই শোচনীয় ঘটনাটি ঘটল, তারই খতিয়ান। অথচ দেশভাগ নামে মর্মান্তিক ট্রাজেডি ঘটা সত্ত্বেও ভারত-ইতিহাসের মূল পথরেখাটি কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অপরিবর্তিত থেকে গেল। দেশভাগের ফলে দুটি, পরে তিনটি, জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। অথচ ইতিহাসের লেখা পড়লে মনে হয় ভারতবর্ষ যেন চিরদিনই তার একান্ত স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের জোরে সেই ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, অহিংসা সহনশীল পথে অগ্রসর হয়ে চলেছে।
ঔপনিবেশিক ভারত সম্পর্কে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরের উপযোগী বইগুলির মধ্যে যেটি সম্ভবত শ্রেষ্ঠ, সেই বিপন চন্দ্রের মর্ডান ইন্ডিয়া থেকে এর চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যাবে।
১৫ অগাস্ট ১৯৪৭ ভারতবর্ষ তার মুক্তির প্রথম দিনটির আনন্দ উপভোগ করল। অসংখ্য দেশভক্তের আত্মত্যাগ, শহিদের আত্মবিসর্জন আজ সার্থক হল।…কিন্তু তাও আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বেদনা আর দুঃখ।…স্বাধীনতার সেই মুহূর্তটিতেই ভারত আর পাকিস্তানে বয়ে চলেছিল সাম্প্রদায়িক মত্ততার প্রবাহ, অবর্ণনীয় বীভৎসতায় শেষ হয়ে যাচ্ছিল হাজার হাজার মানুষের জীবন। (পৃ. ৩০৫-৬)
প্রবল শক্তিশালী এক মহৎ সংগ্রাম যেন বিপথগামী হয়ে গেল। তাই ‘বেদনা আর দুঃখ’।
জাতীয় সাফল্যের চরম মুহূর্তের এই যে ট্রাজেডি, গান্ধীজির নিঃসঙ্গ মূর্তিটাই তার প্রতীক। সেই গান্ধীজি যিনি ভারতবর্ষের মানুষকে শুনিয়েছিলেন অহিংসা, সততা, ভালবাসা, সাহস আর পৌরুষের বাণী।…বাকি দেশে যখন উৎসব, গান্ধীজি তখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন হিংসায় বিষিয়ে যাওয়া বাংলায়। অর্থহীন সাম্প্রদায়িক হানাহানির শিকার হয়ে তখনও যারা স্বাধীনতার মূল্য চুকিয়ে যাচ্ছিল, তিনি চেষ্টা করেছিলেন তাদের কিছুটা সান্ত্বনা দেওয়ার। (পৃ. ৩০৬)
মহৎ সংগ্রামটিকে কারা বিপথগামী করল, এখানে অবশ্য তা বলা হয়নি। কিন্তু বই-এর অন্য জায়গা থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে এটা হিন্দু আর মুসলিম সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিক আর বলা বাহুল্য ব্রিটিশদের কাজ। (পৃ. ২৯৬-৭ এবং অন্যত্র) এর ফলেই ঘটল অর্থহীন হানাহানি আর ‘স্বাধীনতার মূল্য’ হিসেবে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু। কিন্তু একটা কথা এড়িয়ে যাওয়া হল এখানে। কারা দিল মূল্য? কাদের স্বাধীনতার জন্য? এই প্রশ্ন না করে বিপন চন্দ্রের পাঠ্যপুস্তকে বলা হচ্ছে জানুয়ারি ১৯৪৮-এ গান্ধীর মৃত্যুর কথা। ‘ঐক্যের সংগ্রামে শহিদ’ হলেন গান্ধীজি। আর জনগণ ‘নিজেদের সামর্থ্য আর মনোবলের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে সমাজে ন্যায় আর কল্যাণ প্রতিষ্ঠার কাজে উদ্যোগী হল।’ (পৃ. ৩০৬-৭)।
এখানে ‘গান্ধী’ আর ‘জনগণ’ হয়ে গিয়েছে জাতির অন্তরাত্মার প্রতীক। ‘গান্ধী’ আর ‘জনগণ’ একে অপরের বিকল্প। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনে গান্ধীই জনগণের প্রতীক। আবার গান্ধী যখন আর নেই, তখন জনগণই যেন তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ ঘাড়ে তুলে নিল। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু ইত্যাদি বাধা উপেক্ষা করে তারা ‘ন্যায় আর কল্যাণ’ প্রতিষ্ঠার কাজে নেমে পড়ল।
সুমিত সরকারের পাঠ্যপুস্তকটি৫ আরও উন্নত, স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শ্রেণীর উদ্দেশ্য লেখা, তার বিশ্লেষণেও সমালোচনার সুর অনেক বেশি। কিন্তু ভারতীয় জনগণের ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ পথে অগ্রগতি নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত এক। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮-এর জানুয়ারি পর্যন্ত ‘মহাত্মার জীবনের শ্রেষ্ঠ পর্ব’ নিয়ে সুমিত সরকারের বর্ণনা মর্মস্পর্শী। উত্তর ভারতের সর্বত্র যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঝড় বয়ে চলেছে, গান্ধী প্রায় একা হাতে চেষ্টা করেছিলেন সে উন্মত্ততা প্রশমন করতে। তবুও সুমিত সরকারের মন্তব্য, এই ‘বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা’ ব্যর্থ হতে বাধ্য। ‘অবশ্য এমন কথা বলা যায়’, তিনি বলছেন, ‘যে সাম্রাজ্যবাদ আর তার ভারতীয় সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ জঙ্গি গণআন্দোলনই একমাত্র যথার্থ বিকল্প পথ।’ [পৃ. ৪৩৮] এ-পথ যে তখনও খোলা ছিল, তাই নিয়ে তিনি নিঃসংশয়।
দাঙ্গার বিপর্যয় সত্ত্বেও ১৯৪৬-৪৭-এর শীতেও কিন্তু এই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়নি। অগাস্ট দাঙ্গার পাঁচ মাস পরে ফরাসি বিমান বাহিনীর দমদম বিমানবন্দর ব্যবহার করার বিরুদ্ধে কলকাতার ছাত্ররা ২১ জানুয়ারি ১৯৪৭-এ ‘ভিয়েতনাম থেকে হাত ওঠাও’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় নামে। একই দিনে শুরু হয় কম্যুনিস্ট নেতৃত্বে ট্রামকর্মীদের ধর্মঘট যা বামপন্থীদের ভেতরকার সব দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে ৮৫ দিন পর সফল হয়। [পৃ. ৪৩৮-৩৯]
এখানে সুমিত সরকার ১৯৪৭-এর জানুয়ারির ‘ধর্মঘটের ঢেউ’-এর কথা বলেছেন, যা তখন কলকাতা, কানপুর, করাচি, কোয়েম্বাটোর ইত্যাদি শহরের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার পরেই তাঁর সিদ্ধান্ত: ‘কিন্তু এই ধর্মঘটগুলো সবই ছিল কেবল অর্থনীতির দাবিতে সীমাবদ্ধ। যথেষ্ট প্রভাবশালী এবং দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব ছিল প্রকট।’ [পৃ. ৪৩৯]
ঔপনিবেশিক ভারতের এবং ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসের দুটি শ্রেষ্ঠ পাঠ্যবই থেকে উদ্ধৃতি দিলাম এখানে। দুটি বই-ই মার্কসীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে লেখা। দেশভাগ এবং স্বাধীনতার ইতিহাস রচনায় জাতীয়তাবাদী আদিকল্পটি কতটা আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে, এই উদ্ধৃতি থেকে সেটাই আরও স্পষ্ট করে দেখানো গেল। ইতিহাস-লেখার এই ধারা বৃহত্তর এক জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার অংশ যা সিনেমা, সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যের মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। উত্তর ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই হয়তো দেশভাগ। ব্রিটেনের কাছে যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কিংবা ফ্রান্স বা জাপানের কাছে যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আমাদের কাছে দেশভাগের অভিজ্ঞতা ঠিক তেমনই ভয়াবহ এবং যুগান্তকারী। অথচ পশ্চিম ইউরোপে এবং জাপানে প্রথম আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মারকচিহ্ন সর্বত্র রয়েছে। ভারতবর্ষে দেশভাগের কোনও স্মারকচিহ্ন প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। হয়তো এটা তেমন আশ্চর্যের কিছু নয়। কিন্তু বিস্মরণ শুধু এতেই সীমিত নয়।৬
ইতিহাসের মতো সাহিত্য বা চলচ্চিত্রেও ভারতীয় শিল্পীরা স্বাধীনতা সংগ্রামের জয়গান যত করেছেন, সে তুলনায় দেশভাগের বেদনা আদৌ মনে করিয়ে দেননি। অল্প কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। পঞ্জাবি, উর্দু আর হিন্দিতে ১৯৪৬-৪৭-এর দেশ ভাগ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে লেখাপত্র আছে ঠিকই। কিন্তু প্রথমদিকের ‘পার্টিশান সাহিত্য’—সাদাত হাসান মন্টো-র মর্মান্তিক গল্পগুলি যার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন—প্রায় সবই পঞ্জাবের দাঙ্গাবিধ্বস্ত কয়েকটি জেলায় সীমিত।৭ পরবর্তীকালে উত্তর ভারতে এ-বিষয়ে যা লেখা হয়েছে, তা ওই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী আলোচনার গণ্ডির ভেতরেই পড়ে, যেখানে দেশভাগ হল ইতিহাসের বিভ্রান্তি, অদ্ভুত এক ঘটনা, যার কোনও ব্যাখ্যা নেই। এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বোধহয় রাহী মাসুম রাজা-র আধা গাঁও (১৯৬৬)।
দেশভাগের পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কোনওভাবেই কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দেখা দেয়নি। সাম্প্রতিক একটা গবেষণায় বলা হয়েছে যে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ যেভাবে বাঙালি সাহিত্যিককে নাড়া দিয়েছিল, ১৯৪৭-এর দেশভাগ গোটা সমাজকে ওলটপালট করে দেওয়া সত্ত্বেও কিন্তু মোটেই ১৯৫০-এর দশক বা তার পরবর্তীকালের সাহিত্যে সেভাবে রেখাপাত করেনি।৮
সর্বস্বান্ত উদ্বাস্তুদের বেদনা, হতাশা, স্বপ্ন নিয়ে ঋত্বিক ঘটক একাধিক ছবি করেছেন— কোমল গান্ধার(১৯৫৯), মেঘে ঢাকা তারা(১৯৬০), সুবর্ণরেখা(১৯৬২)। কিন্তু ঋত্বিক নিতান্তই ব্যতিক্রম শিল্পী হিসেবে তাঁর আশ্চর্য ক্ষমতার জন্যই শুধু নয়—ছবির বিষয়ের দিক থেকেও বাংলা কিংবা হিন্দি-উর্দু ছবির বিশাল বাণিজ্যিক জগতে, এমনকী ফিলম্স ডিভিসনের সরকারি ডকুমেন্টারিতেও, দেশভাগের ইতিহাস কিংবা পরিণাম নিয়ে ঋত্বিকের মতো আর কেউই প্রায় কোনও নজর দেননি বললে চলে।
হিন্দি-উর্দু চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যে উদাহরণটি আলাদা করে উল্লেখ করা প্রয়োজন সেটি হল এম. এস. সথ্যু-র গরম হাওয়া। ১৯৭০-এর দশকে তৈরি এই আশ্চর্য ছবিটিতে নিপুণভাবে দেখানো হয়েছে সামগ্রিক মত্ততা, ছিন্নমূল মানুষের জীবনের অর্থটাই হারিয়ে যাওয়া, ‘অন্য কোথাও’ হয়তো সে-অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে এই ভেবে বিপন্ন শরণার্থীদের যাত্রা। আরও সম্প্রতিকালে দূরদর্শনে প্রচারিত তমস ধারাবাহিকটির বিশেষ তাৎপর্য এই যে বহু লোকের কাছে তা পৌঁছেছিল। কিন্তু ভীষ্ম কাহানির ১৯৭২ সালে প্রকাশিত উপন্যাসের এই চিত্ররূপটি আসলে পুরনো মোটাদাগের জাতীয়তাবাদী ছকেই ফিরে যায়—এখানে নির্দোষ, বিভ্রান্ত অথচ সাহসী জনগণকে আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়ে বিপথে চালিত করে কিছু রহস্যময় চক্রান্তকারী। দেশভাগ এখানে একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়। মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম চিন্তাভাবনার সেখানে কোনও ভূমিকাই নেই। আমরা আগেই দেখেছি, বিদগ্ধ ইতিহাস-রচনার যে জাতীয়তাবাদী ধারা, তাতেও এই একই কাহিনী বলা হয়ে এসেছে।
দেশভাগের ইতিহাস চাপা থাকে কেন, সে-কারণ বের করাও খুব কঠিন নয়। হিন্দু-মুসলিম বিরোধ আজও বাস্তব ঘটনা। বিরোধের ইতিহাস বলতে গিয়ে পুরনো ক্ষত খুঁচিয়ে তোলার বিপদটা তাই অবহেলা করা হলে না। তার ওপর দেশভাগের চরিত্র নিয়ে আমাদের মধ্যে মতৈক্য নেই। একে কীভাবে উপস্থিত করব, কী করে এর দায়িত্ব নেব, তা অমরা জানি না। এই কারণেই জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে, সাংবাদিকতায় অথবা চলচ্চিত্রে দেশভাগ নিয়ে একটা সামগ্রিক বিস্মৃতি তৈরি হয়েছে। সচেতনভাবে হোক বা না-হোক, দেশভাগ একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবেই রূপায়িত হয়েছে। ১৯৪৭-এর ১৪ অগাই যেদিন পাকিস্তানের জন্ম হল—সেটি একটি অনটন, ‘ভুল’, যার জন্য দায়ী আমরা নই, অন্য কেউ।
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে আলোচনাও মোটামুটি একই ধারায় বয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে কিছু লেখাপত্র থেকে এর উদাহরণ দেব। এই আলোচনায় একটা বাড়তি সুবিধা হবে। সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে লেখার মধ্যে যে অনির্দিষ্টতা রয়েছে, তথ্য প্রমাণ নিয়ে যে-সব অনিশ্চয়তা সেখানে দেখা দেয়, পুরনো ঘটনার ইতিহাস যাঁরা লেখেন তাঁরা অনেক সময় মনে করেন যে তাঁদের কাজ সে-সব বিপদ থেকে মুক্ত। তা যে সত্যি নয়, সে-কথাটি এই আলোচনার মধ্যে নিয়ে দেখানো যাবে।
সম্প্রতিকালের দাঙ্গার ঘটনা, বিশেষ করে ১৯৮৯-এ ভাগলপুরের ঘটনা নিয়ে এই লেখার পাশাপাশি আমি দেখাতে চেষ্টা করব যে পঞ্চাশ কিংবা একশো বছর আগের ঘটনার সাক্ষ্য প্রমাণ আমরা যে-ভাবে ব্যবহার করে থাকি, একই ঘটনার ওপর একাধিক পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্যকে তুলনা করে তার মধ্যে থেকে একটা নিরপেক্ষ বিবরণ খাড়া করার চেষ্টা করি, সে পদ্ধতি আসলে কতটা গোলমেলে। সাম্প্রতিক ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণী কীভাবে সরকারি ‘সাক্ষ্যপ্রমাণে’ পরিণত হয়, সেই প্রক্রিয়াটাও আমরা খানিকটা দেখতে পাব।
২
সাম্প্রতিক কালের যে কোনও রচনাতে একের পর এক দাঙ্গাকে ১৯৪৭-এর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
‘চরম বীভৎস’ এই তকমাটা প্রত্যেকটার গায়েই সেঁটে দেওয়া হয়েছে। ১৯৮০-র দশকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের মাত্রার গভীরতা তাই সহজে অনুমের। ১৯৮৯ সালের ভাগলপুরের দাঙ্গা সমগোত্রীয় ভয়ঙ্কর সংঘাত। ১৯৮৯ সালে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে এবারকার সংঘর্ষ আরম্ভ হয়। লুঠতরাজ, আগুন লাগনো, খুন-জখম—সবই শহরে আরম্ভ হয়; এবং চারপাশের গ্রামাঞ্চলে কয়েকদিন ধরে বস্তুত বিনাবাধায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে সামরিক ও অসামরিক বাহিনী অবস্থা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু পরবর্তী অনেক দিন ধরে ভয় ও সন্ত্রাসে বহু লোক দিন গুনছিল।৯
‘দাঙ্গার’ মাত্রার পরিপ্রেক্ষিতে এবং তারই সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধাতে ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিলুপ্ত করাতে স্থানীয় শাসকদলের নষ্টামির শেষ ছিল না। ফলে এই ঘটনার ‘তথ্যপঞ্জী’ সাজানো মুশকিল। ঐতিহাসিকের চোখে যেগুলি গল্পের ‘নাটবল্টু’ হতে পারত, সেইগুলি খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে ওঠে। নিদেনপক্ষে এক হাজার লোক এই ঘটনায় খুন হয়েছিল। এঁদের মধ্যে বেশির ভাগই মুসলমান। কিন্তু হতাহতের সংখ্যা নিয়ে মতভেদের শেষ নেই।১০ ‘দাঙ্গার প্রথম দিনগুলিতে ভাগলপুর ও তার সন্নিহিত এলাকায় নানা জায়গায় বার বার ট্রেন থামানো হয়। এইসব ট্রেন থেকে মুসলমান যাত্রীদের টেনে নামিয়ে শেষ করে দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ ঠিকমতো জানে না যে এইভাবে কতজনকে মারা হয়। এমনকী হিন্দু সহযাত্রীরা এই রকম ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেও তাদের কামরা থেকে ঠিক কতজনকে টেনে নামানো হয়েছে, তার কোনও হিসাব দিতে পারে না। শহর ও গ্রামাঞ্চলে বড় বড় হামলায় বৃদ্ধ, শিশু বা মেয়েরা কেউই রেহাই পায়নি। নারী লুণ্ঠন ও ধর্ষণ যে ব্যাপক হারে হয়েছে এই কথাও অনেকে বলেছেন। কিন্তু বেঁচে থাকা হতভাগ্যরা কেউই ধর্ষণ সম্পর্কে কিছু বলতে চায়নি। ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে ভাগলপুরে প্রেরিত পি. ইউ. ডি. আর-এর একটি তদন্তকারী দল ধর্ষণ সম্পর্কিত যে পাঁচটি ঘটনার উল্লেখ করেছে, সেইগুলির সূত্র মুসলমান মহিলা সংবাদদাতাদের শোনা কথা মাত্র।
প্রশ্নাতীতভাবে এইটুকু বলা যায় যে ১৯৬৪ সালের ‘দাঙ্গা’ বা আরও অনেক পূর্বতন ‘দাঙ্গার’ লীলাক্ষেত্ৰ ভাগলপুরের মতো জেলাতেও হামলার এইরকম বিস্তৃতি ও হিংস্র রূপ নজিরহীন। ১৯৮৯ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে হিংসার ভয়ঙ্কর দিনগুলিতে প্রায় ৪০,০০০ মতো লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে তড়িঘড়ি করে বানিয়ে তোলা রিলিফ ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাপকভাবে সম্পত্তিহানি ও লুঠতরাজ চলতেই থাকে। সংখ্যালঘু মুসলমানরা এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে সংঘর্ষের তিন মাস পরেও তারা ঘরে ফিরতে গররাজি ছিলেন। ১৯৯০-এর জানুয়ারির শেষেও প্রায় দশ হাজার মানুষ ‘রিলিফ ক্যাম্পগুলিতে’ থাকছিলেন। তাছাড়াও ভাগলপুর জেলার মধ্যে ও বাইরে আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবদের ‘নিরাপদ’ আশ্রয়ে অনেক মানুষ বাস করছিলেন। এই সময়ে অনেক মুসলিম চাইছিলেন যে সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী তাদের গ্রামে ও মহল্লায় পাকাপাকিভাবে মোতায়েন থাকুক। তাঁদের কাছে নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য উপায় ছিল ওইরকম কোনও বাহিনী। এই জন্য কেউ কেউ সরকারের কাছ থেকে অস্ত্রও দাবি করছিলেন। গুজবের সীমা ছিল না, লুঠতরাজ ও হামলাও বিক্ষিপ্তভাবে ঘটছিল। মার্চ ১৯৯০ সালেও এরকম কথা শোনা যায়।
এই রকম একটা ঘটনার ইতিহাস আমরা কীভাবে লিখব? বহু প্রজন্ম ধরে, ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা যে সব সরকারি বর্ণনাকে অনেক বেশি ‘নির্ভরযোগ্য’ ও মূল্যবান সূত্র বলে মনে করেন, সেইসব বিবরণের অধিকাংশই ভাগলপুরের সরকারি দপ্তরগুলো থেকে বেপাত্তা হয়ে গেছে। ভাগলপুরে তদন্তকার্যে নিয়োজিত নানা স্বতন্ত্র অনুসন্ধানকারী দলগুলিও ঠিক একইভাবে সরকারি বিবরণ পেতে আগ্রহী ছিল কারণ তাহলে আশা থাকে যে নানা বিভ্রান্তিকর আখ্যানের মধ্যে থেকেও ‘একটা সামগ্রিক ছবি’ গড়ে তোলা যাবে।১১ কিন্তু এইরকম কেন্দ্রাভিমুখী বয়ান অধিকাংশই নষ্ট করে দেওয়া হয়। ‘দাঙ্গার’ প্রথম পর্যায়ে, চরম সংকটের দিনগুলির ক্ষেত্রে, এই নীতি আরও বেশি করে প্রযোজ্য হয়েছিল। দু-সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান চালানোর পরে ভাগলপুরের ধ্বংসলীলা ও তার ফলাফল সম্পর্কে ১১ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৯০-এর সানডে মেল-এ লেখা হয়েছে:
ওই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, বিশেষত যেগুলি জেলাশাসক (ডি. এম.) ও পুলিশ অধিকর্তার (এস. পি.) হেফাজতে ছিল, নিখোঁজ…
…সাক্ষ্য প্রমাণাদি থেকে এইরকম ধারণাই জোরদার হয়ে ওঠে যে (ডি. এম.) কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ-এ রক্ষিত লগবুকটি সম্ভবত নষ্ট করে দিয়েছেন, অথচ সেটাতে সেই ভয়ঙ্কর সপ্তাহে জরুরি সাহায্যের জন্য অসংখ্য আর্তি লিপিবদ্ধ ছিল। আশ্চর্যের কথা যে অফিসে রাখা নতুন লগবুকটিতে ওই সব ঘটনার কোনও উল্লেখই নেই…
…তদীনন্তন এস. পি. ইতিমধ্যেই কুখ্যাত হয়ে উঠেছেন এবং পরবর্তী বদলি অফিসারের কাজে লাগবার মতো কোনও সূত্রই রেখে যাননি…পাটনা হাইকোর্ট নোটিশ দিয়েছিল বলেই তাঁর নথিতে চান্দেরি হত্যাকাণ্ডের (গ্রামাঞ্চলের মর্মান্তিক ঘটনাগুলির অন্যতম) একটি মাত্র যৌথ প্রতিবেদন আছে। এমন কি ২৪ অক্টোবর (ভাগলপুর শহরে) তাতারপুর চৌকের ঘটনাটি পলতেয় আগুন ধরায় অথচ তার ওপর ডি, এম. বা এস. পি.-র যৌথ প্রতিবেদনটিরও কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি।
অবিশ্বাস্য শোনালেও এটাই সত্যি যে, ঘটনাবলি সম্পর্কে ডি. এম. এবং এস. পি.-র কোথাওই কোনও বিবৃতি বা এজাহার পাওয়া যায়নি।
নথি সরিয়ে ফেলা বা নষ্ট করার মতো ঘটনা অবশ্য নজিরবিহীন নয়। ১৯৩৭ সালের পরে ইংরেজ শাসকরা ব্যাপকভাবে এই ধরনের কাজ করেছিল। এ ব্যাপারেও সন্দেহ নেই যে এই রকমের অসংখ্য উদাহরণ স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের ভারতে পাওয়া যাবে। কিন্তু যেটা কমই দেখা গেছে তা হল এই রকম ঘটনা ঘটলে ‘তথ্য’ নষ্ট করার পাশাপাশি যেন সুসংগঠিত ভাবে, সরকারি ও বেসরকারি সব দিক থেকে নতুন প্রমাণপঞ্জী তৈরি করা। হিংসাত্মক ঘটনার প্রেক্ষিতে ‘প্রমাণ’ সংগ্রহ আবশ্যক হয়ে ওঠে; যে সব প্রক্রিয়া বা দ্বন্দ্ব লুকিয়ে থাকে, যেগুলিকে আমরা সাধারণত এড়িয়ে চলি, সেই সবগুলি খোলাখুলিভাবে সামনে আসে। আবার হিংসা ‘প্রমাণপঞ্জী’কে নষ্টও করে দেয়। বিশেষত নষ্ট করার পদ্ধতিটা এতটাই ব্যাপক যে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে ‘তথ্য’ হিসাবে সংগৃহীত ও গ্রাহ্য হবার কৃৎ-কৌশলটা যেন বানচাল হয়ে পড়ে। ভাগলপুরে পি. ইউ. ডি. আর.-এর কাজের প্রসঙ্গে বিষয়টা আলোচনা করা যেতে পারে।
দলটি নেহাৎ ছোট ছিল না। এবং আটদিনের সফরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তথ্য সংগ্রহের পেছনে সময় দেওয়া হয়েছিল। তবুও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। যে সব লোকেদের সঙ্গে আমরা ভাগলপুরে কথা বলেছি তাঁরা অধিকাংশই মুসলমান। ‘দাঙ্গার’ প্রথম ভুক্তভোগী তাঁরাই, তাঁরাই রিলিফ ক্যাম্পের বাসিন্দা। তাঁরা কথা বলছিলেন, হয়তো বলবার তাগিদও অনুভব করেছিলেন। যে সব এলাকার অবস্থা খারাপ ছিল, সেই সব অঞ্চলের হিন্দুরা সব সময় সরাসরি বিরোধিতা না করলেও আমাদের প্রসঙ্গে ঠাণ্ডা ও চুপচাপ ছিলেন। যে সব হিন্দুদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি তারা একটি ছোট গোষ্ঠী: কিছু মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী, রাষ্ট্রনৈতিক কর্মী, পেশাদার ও সরকারি কর্মচারী। ঘটনা সম্পর্কে কোনও না কোনও নির্দিষ্ট মতামত বা ‘তত্ত্বে’ এরা বিশ্বাসী ছিলেন।
আরও সমস্যা ছিল। ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কি কি প্রশ্ন কীভাবে করব? আমাদের প্রশ্নের ধরনগুলি এমন ছিল যে, তার মধ্যে যেন একটা বিশেষ উত্তরের প্রত্যাশা লুকিয়ে আছে। আর আমরা সেই ধরনের বিশেষ উত্তরই পেয়েছি, যা আমরা শুনতে চাইছিলাম। আমি এ বিষয়ে পরে আবার আলোচনা করব। কিন্তু কাজে নেমে প্রথম অসুবিধা হল, বর্বরতার শিকার মানুষগুলিকে কীভাবে প্রশ্ন করা যায়? হয়তো ‘দাঙ্গার’ কোনও পরিবারের কেবল বাবা ও ছেলে, অথবা মা ও ছোট ছোট চারটি শিশু বেঁচে গিয়েছিল। একজন ছিটকে পড়েছিল বা কোনওভাবে মাঠে লুকিয়ে পড়ে, সেখান থেকে তারা দেখেছে যে বয়স্ক ও যুবকদের, স্ত্রী ও পুরুষদের—যাকেই গ্রামের মুসলিম বসতিতে পাওয়া গেছে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এই রকম সন্ত্রাসের ভুক্তভোগী মানুষের কাছে তাঁরা কি দেখেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা শুনতে চাইব কীভাবে?
তবুও ‘অনুসন্ধানকারীরা’ প্রশ্ন করতে বাধ্য। কোনও কোনও সময় দাঙ্গার ভুক্তভোগীরা অথবা বেঁচে ফিরে আসা মানুষেরা বা আশেপাশে দাড়িয়ে থাকা লোকেরা, জিজ্ঞাসা করার আগেই কথা বলতে শুরু করতেন। কারণ তাদের হয়তো এর মধ্যেই অনেকবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছে; অথবা তাঁরা তাঁদের দুর্ভোগের প্রকাশ্য বিবরণ দেবার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন। কিন্তু এই বিবরণগুলিও ছকে বাঁধা। মনে হত বিবৃতিগুলো প্রথাসিদ্ধ, ‘মুসলিম’, ‘যাদব’ বা ‘হিন্দু’, যে কোনও গোটা একটি গোষ্ঠীর তরফে তুলে ধরা একটি সমষ্টিগত স্মৃতি বা প্রতিবেদন। ক্ষতিগ্রস্ত মহল্লা বা গ্রামের কোনও একটি প্রধান জায়গায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হত, অনেক লোক সেখানে জড়ো হত এবং ‘বয়স্ক’ ও ‘শিক্ষিত’ ব্যক্তিরা আমাদের স্থানীয় ঘটনাবলীর বিবরণ দিতেন। সেটা নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হত। এটাই ছিল সাধারণ পদ্ধতি।
এমন কী যে সব ক্ষেত্রে মেয়েরা, তরুণরা অথবা এমন কি শিশুরা আলাদাভাবে কথা বলেছে এবং তাদের বিভিন্ন বিবৃতিতে গুরুত্ব ও ঝোঁকের তারতম্য ধরা পড়েছে, সেই সব বিবরণও যৌথ বয়ানের অঙ্গে পরিণত হয়েছে। ঘটনার সাধারণ রূপরেখা যেন প্রত্যেকের কাছে একইরকম ছিল, তাদের আগ্রহগুলিও ছিল এক জাতীয়। নিজেদের গোষ্ঠীর দুর্ভোগের কাহিনী, নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের সমস্যা, দুর্দিনে বন্ধুদের চিনে নেবার তাগিদ, বিশেষত এই প্রসঙ্গে নানা ধর্মীয় সংগঠন এবং জায়গা বিশেষে, বামপন্থীদের প্রভাব সাপেক্ষে, বামপন্থী সংগঠন ও কর্মীদের কথা, বার বার শোনা গেছে।
হিংসাত্মক ঘটনা শুরু হবার তিন মাস পরে পি. ইউ. ডি. আর.-এর দলটি ভাগলপুরে গিয়েছিল। এটা খুবই সম্ভব যে সমষ্টিগত বিবরণগুলি এই সময়ের মধ্যে প্রথানুগ হয়ে পড়েছিল। আমি অবশ্য নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, বিবৃত ঘটনা ঘটার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই স্মৃতি একটি গতে বাঁধা হয়ে যায়। এর পেছনে কাজ করেছে স্থানীয় গোষ্ঠীর জীবনচর্চা, অতীত সংঘর্ষের ইতিহাস এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক। অবশ্য আর একটি উপাদানও সক্রিয় ছিল। এই জাতীয় প্রকাশ্য বয়ানের অন্যতর উদ্দেশ্য, রাষ্ট্র ও তার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করা।
এই জাতীয় ব্যাপক হিংস্র কার্যকলাপ সমাজে সুবিধাভোগী শ্রেণী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজমান বিভাজনকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। আবার এর ফলে গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে সংহত হয়; সন্দেহভাজন সমূহগুলি ‘সাধারণের’ অংশে পরিণত হয়। গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত গ্রামের মানুষ, সদ্য তৈরি রিলিফ ক্যাম্পগুলির অজানা লোক, এমন কী ডাক্তার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মতো উচ্চবর্গের ব্যক্তিরা অর্থাৎ খবর নেবার সব রকমের লোকেরা কোনও না কোনও সমূহের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েন। ভুক্তভোগীদের চোখে, ‘তদন্তকারী’ একজন ‘প্রভাবশালী ব্যক্তি’, তার কাছে ত্রাণ, অনুগ্রহ বা বিচারের জন্য আবেদন জানানো যায়।
ফলে, ভাগলপুরের লোকেদের সঙ্গে আমাদের কথোপকথন অন্য খাতে বয়। সম্পত্তিহানি, আঘাত ও মৃত্যুর খুঁটিনাটি বর্ণনায় বেশি সময় যায় অথচ এইগুলি আমাদের তদন্তের প্রধান উপজীব্য বলে মনে করা হয়নি। আমাদের বার বার আগ বাড়িয়ে অনুরোধ করা হয়েছে স্বচক্ষে দেখে আসতে কীভাবে একটি বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে, বাড়ির সব বাসিন্দাদের নামগুলি লিখে নিতে বলা হয়েছে। আমাদের বলা হয়েছে এফ. আই. আর. নথিবদ্ধ করতে কারণ পুলিশ সেইগুলি লিপিবদ্ধ করেনি বা করতে চায়নি। তাদের আশা এই যে আমরা এইগুলো নথিভুক্ত করতে সাহায্য করব। বেশ কিছু সাক্ষী জানিয়েছেন, ‘আমরা সব সময় ভয়ে দিন কাটাচ্ছি। কেউ সাক্ষ্য নিতে আসার আগেই হয়তো খুন হয়ে যেতে পারি।’ কোনও কোনও জায়গায় আবার এই রকম ছোট্ট জবাব শোনা গেছে, ‘আমরা কিছু জানি না, আমরা এখানে ছিলাম না।’
প্রায়শই আমরা যে বিবরণী সংগ্রহ করেছি সেইগুলি যেন আগেভাগে কোনও কিছুকে বাতিল করার জন্য সাজানো কাহিনী। কোনও না কোনও বিশেষ ‘তত্ত্ব’ বা ঘটনার কোনও কোনও ব্যাখ্যাকে নাকচ করার জন্য যেন এই বিবৃতিগুলিকে বানিয়ে তোলা হয়েছিল। ‘হিন্দুদের’ বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তারা ভাগলপুর শহরে সশস্ত্র মিছিল বের করেছিল এবং অত্যন্ত প্ররোচনামূলক কৌশল অবলম্বন করেছিল। ২৪ অক্টেবরে হিংসার সূচনা এর থেকেই হয়। অথচ তাঁদের মতে, মিছিলটি অন্যান্য সাধারণ ধর্মীয় শোভাযাত্রার মতোই ছিল এবং মিছিল যাবার পথে অসংখ্য মহিলা ও শিশু বাজনা বাজিয়ে ধর্মীয় সংগীত গাইতে গাইতে যোগ দিয়েছিল। ২৪ অক্টোবরের অনেক আগে থেকে একটা ‘দাঙ্গা’ বাঁধাবার প্রস্তুতি ‘মুসলিমরা’ নিচ্ছিল, এইরকম একটা অভিযোগ স্থানীয় ‘প্রশাসন’ ও অন্যান্যরা করে থাকে। অথচ গোটা জেলা জুড়ে মুসলিমরা প্রায় একবাক্যে বলেছে যে তাদের সঙ্গে হিন্দুদের কখনও কোনও বিবাদ ছিল না, দাঙ্গা হবার কোনও আশঙ্কা দেখা দেয়নি। জেলায় হিন্দু এবং মুসলিমদের মধ্যে বরাবর সম্প্রীতি ছিল। এমনকি ‘১৯৪৭-৪৮’ সালেও যখন সারা উত্তর ভারত জ্বলছিল, তখন ভাগলপুরে বড় জোর নামমাত্র ঝামেলা হয়েছিল।
এমন কি যে সব ক্ষেত্রে গোষ্ঠী বা সমষ্টির কাছে আশু আত্মরক্ষা করা সমস্যা ছিল না, সেইসব ক্ষেত্রেও কোনও একটা আদর্শ বা মূল্যবোধ বাঁচানোর তাগিদ অনুভূত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ নগরবাসী পেশাদার বা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নিজেদের বা শহর অঞ্চলের সুনাম বজায় রাখার তাগিদ বা ভবিষ্যতে হিন্দু ও মুসলিমদের মিলে মিশে বসবাস করার সম্ভাবনা জিইয়ে রাখার ইচ্ছার কথা বলা যেতে পারে। এর ফলে ‘গতস্য শোচনা নাস্তি’-র মতো চিন্তাকে অনেকে সঠিক মনে করেছিলেন। হয়তো সংঘর্ষের দায় ‘বহিরাগতদের’ উপর চাপিয়ে দেবার সোচ্চার চেষ্টার পেছনে এইরকম কোনও ভাবনা কাজ করে থাকবে। দায়ী বহিরাগত অনেক ধরনের হতে পারে, কোথাও বা পাটনার বা দিল্লির রাজনৈতিক নেতা, কোথাও বা ‘সমাজ বিরোধীদের দল’ বা মেরুদণ্ডহীন দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন। ‘দাঙ্গা’ বাঁধানোর পেছনে সমাজবিরোধীদের উশ্কানি ও ভূমিকার তত্ত্ব বেশ চালু। এইটে বলা হয়েছে যে ভাগলপুর শহরের উত্তরে ও জেলার পশ্চিম থেকে পুবে প্রবাহিত গঙ্গা নদীর ওপার থেকে দলে দলে ‘অপরাধপ্রবণ জাতেরা’ শহরে ও ‘দাঙ্গা’ অধ্যুষিত অঞ্চলে ঢুকে পড়ে। ঔপনিবেশিক আমলে এইসব জাতদের গায়ে ‘অপরাধীর’ তকমা সেঁটে দেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিক সময়েও আবার এরাই ভাগলপুরে আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে থাকে। তাই ১৯৮৯ সালে ‘সমাজবিরোধীরা’ এইসব ‘বহিরাগতদের’ খুশিমতো ব্যবহার করে সংঘর্ষ শুরু করে দেয়।
এই ধরনের ঘটনার ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের অসুবিধা একটি মাত্র দিক। কীভাবে এই অভিজ্ঞতাকে লিপিবদ্ধ করতে হবে, সেটাও কম সমস্যাসঙ্কুল নয়, একথা আগে একবার বলা হয়েছে। লিখতে বসলে রোমাঞ্চকর বর্ণনা লেখার ঝোঁক চলে আসে। অতি নাটকীয় হয়ে যাবার স্বাভাবিক সম্ভাবনা থেকে যায়। ফলে এই ধরনের সংঘর্ষ ও তার ফলাফলকে অস্বাভাবিক, কোনও না কোনও বিকৃতি বলে মনে করার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা কার্যকর হয়ে ওঠে। অপরপক্ষে আরেকটি বিপদের আশঙ্কা থাকে। কেতাবি আলোচনার তাপে অত্যন্ত জঘন্য বিচ্যুতিও স্বাভাবিক ভদ্রতার রূপ পেতে পারে এবং যথারীতি বৈশিষ্ট্যবিহীন হয়ে ওঠে। এটাও দেখানো যায়, কী করে কেতাবি আলোচনা হিংসার ক্ষণগুলোকে ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘বিকৃতির’ উদাহরণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে।
ভারতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আলোচনায় ‘হিন্দুদের’ অত্যাচারের বিবৃতির পাশাপাশি ‘মুসলিম’ বা ‘শিখদের’ অত্যাচারের বর্ণনাও রাখা হয়; ভারসাম্য রাখাটা যে জরুরি। আমাদের ভাগলপুর যাত্রার কয়েক সপ্তাহ পরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত বহু মুসলিম ধর্মীয় স্থানগুলির সঙ্গে কতকগুলি হিন্দু মন্দিরকেও পুনর্গঠিত করা হবে। ভাগলপুরের সংঘর্ষ প্রসঙ্গে মার্চ ১৯৯০ সালে জাতীয় দূরদর্শনে প্রদর্শিত ও নলিনী সিং-এর মতো উদ্যোগী ও স্বাধীনচেতা পরিচালককৃত তথ্যচিত্রটিতে জামালপুরের পাশাপাশি লোগাঁই গ্রামটিকে একসঙ্গে দেখানো হয়। প্রথমটি ‘দাঙ্গায়’ আক্রান্ত হিন্দুগ্রাম, দ্বিতীয়টিতে মুসলিমদের জঘন্যভাবে হত্যা করা হয়। বোঝানো হয় যে, আক্রমণের তীব্রতা ও হতাহতের সংখ্যা যেন দুটি ক্ষেত্রে সমগোত্রীয়। অথচ বিশ্বস্ততম সূত্র অনুযায়ী, জামালপুরে সাতজন মারা যায় ও ৭০টি বাড়িতে আংশিকভাবে আগুন ধরানো হয় ও লুঠ করা হয়। আর লোগাঁইতে ১১৫ জন নিহত হন এবং গোটা মুসলিম বস্তি লুঠ করে, পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।১২
‘দুই পক্ষকেই’ তুলে ধরা, দুই পক্ষের কার্যকলাপকে লিপিবদ্ধ করার আপাত উদারনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে প্রায়শই তাল মিলিয়ে চলে ‘বহিরাগত’ শক্তি ও ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ খুঁজে বার করার জন্য সমাজবিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা। এই জাতীয় অস্বাভাবিক হিংস্র কার্যকলাপের নেপথ্যে তাদেরকেই খোঁজা হয়। ভাগলপুরের ক্ষেত্রেও সাংবাদিক ও অন্যান্য তদন্তকারী দলেরা দায়ী করেছেন ‘সমাজ বিরোধী’, স্থানীয় প্রশাসন, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও অন্যান্য জঙ্গি হিন্দু সংগঠনগুলির বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারকে। ১৯ নভেম্বরের একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দেখেছি,
সেখানে মানুষেরা একসঙ্গে চিরকাল থেকেছেন ও থাকছেন, একে অপরের সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন—সে আহার বিহারের ব্যাপারই হোক, মেয়ের বিয়েই হোক কিংবা নির্বাচনের রাজনীতিই হোক। এটা কি করে সম্ভব যে তাঁরা রাতারাতি একে অপরের শত্রু হয়ে দাঁড়াবেন? বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভুমি বিতর্কে তাঁদের কিই বা এসে যায়? কিন্তু সুযোগ বুঝে দুই সম্প্রদায়ের বদমাইসরা খুব তাড়াতাড়ি এই সব লোকেদের মনে পাগলামির বিষাক্ত বীজ বুনে দিতে পেরেছিল।
দ্রুত মানুষের মন বিষাক্ত করার বিশেষ কাজটি কিন্তু কোনও সমস্যা রূপে বিবেচিত হল না, তার তাৎপর্য নিয়ে কোনও আলোচনা থাকল না। বরং আমাদের বলা হল, ‘ভাগলপুরের দাঙ্গা ততটা সাম্প্রদায়িক মনোভাবের ফল নয়, বরং বদমাইসদের সৃষ্ট একটি দুর্বিপাক।’১৩
প্রাক-স্বাধীনতা আমলের জাতীয়তাবাদী বিবরণগুলির ধরতাই এই সব কাহিনীগুলোতে শোনা যায়। ‘জনগণ’ আদতে ধর্মনিরপেক্ষ। ওই একই সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে লক্ষ করা যায়,
রাইফেল, বন্দুক, টাঙ্গি, কাটারি ও বর্শা দ্বারা সশস্ত্র বদমাইসদের দল শক্তিশালী (রাজনৈতিক) নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট। জনগণ কিই-বা করতে পারত? শান্তি ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষরা বসবাস করতে চেয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত বদমাইসরা তাদের মনে বিষ ছড়াতে সক্ষম হয়।
আপাতদৃষ্টিতে অন্যরকম মনে হলেও, ‘বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া’র ধাঁচে হিংসার বিশেষণও এই জাতীয় ব্যাখ্যা থেকে খুব একটা কিছু আলাদা নয়। সেই বিশ্লেষণে বিশ্বহিন্দু পরিষদ বা বদমাইসদের কার্যকলাপ বা স্থানীয় প্রশাসকদের কর্তব্যে অবহেলা ততটা গুরুত্ব পায় না। সেই বিশ্লেষণে আলোচিত হয় অন্য নানা বিষয়: রাজনীতি কীভাবে ‘অপরাধদুষ্ট’ হচ্ছে, প্রশাসনসহ ভারতীয় জনজীবনের সাম্প্রদায়িক হবার প্রবণতা, অথবা ‘পিছিয়ে পড়া জাতগুলোর উত্থান’, নতুন ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর অভ্যুদয়, ইউনিয়নবাজি, শ্রমিক অসন্তোষ ইত্যাদির মতো নানা দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ধারা। ভাগলপুরের দাঙ্গা প্রসঙ্গে পি. ইউ. ডি. আর,-এর সতর্ক ও বিস্তৃত প্রতিবেদনের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। হিংসার সূত্রপাতের পারিপার্শ্বিক জটিলতা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনের বিস্তৃত অথচ কিছুটা বিভ্রান্তিকর বয়ান হল,
দাঙ্গার দায় বদমাইসদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সাধারণ একটি সরলীকরণ। আমরা মনে করি যে বদমাইস, পুলিশ, প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, প্রভুত্বকামী উচ্চবর্গ ও অর্থনীতির সম্পর্কের যোগফলকে দায়ী করাটা অনেক বেশি সঠিক। একটি বিশেষ ক্ষণে এই উপাদানগুলির একটি বা সব কটিই এমনকি কিছু কিছু স্থানীয় সাধারণ মানুষও দাঙ্গার অনুঘটক রূপে কাজ করে থাকে।১৪
প্রায়শ দীর্ঘস্থায়ী জটিল ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বক্তব্যগুলিতে সাধারণ মানুষ ও তার দায়দায়িত্বের কথা বাদ পড়ে যায়। সেইগুলি পর্যবসিত হয় আলোচ্য জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অপরিহার্য এবং অপরিবর্তনীয় (ধর্মনিরপেক্ষ) চরিত্র সম্পর্কিত মন্তব্য সমূহে। ‘অর্থনৈতিক মাত্রাই’ এইসব ক্ষেত্রে সবকিছুর মূলসূত্র হিসাবে প্রাধান্য পায়। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের কারণ বিশ্লেষণে অগ্রণী গবেষক আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ারের রচনার দুটি উদ্ধৃতি বিষয়টিকে আরও প্রাঞ্জল করতে সাহায্য করবে,
জব্বলপুর ১৯৬১: একটি হিন্দু মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে মুসলিম যুবকের বিয়ে করাটা আপাত কারণ ছিল। এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংস্কারগুলো জোরদার হলেও প্রকৃত কারণ অন্যত্র নিহিত ছিল। মুসলিম যুবকটি স্থানীয় একজন বিশেষ সম্পন্ন বিড়ি ব্যবসায়ীর ছেলে এবং ব্যবসায়ীটি ধীরে ধীরে স্থানীয় বিড়ি শিল্পের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করছিলেন। এই উন্নতির দরুন তাঁর প্রতিযোগীদের তাঁর উপর বিদ্বেষ ছিল। এই বিষয় খুব তাৎপর্যপূর্ণ যে, ওই দাঙ্গায় মুসলিম মালিকানার অধীন বিড়ি শিল্পগুলি বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভিওয়াণ্ডি ১৯৭০: বিদ্যুৎচালিত তাঁত শিল্পের বর্ধিষ্ণু কেন্দ্র হল (ভিওয়াণ্ডি)। বেশ কিছু মুসলিম পরিবার কিছু তাঁতের মালিক এবং বাদ বাকিরা এই শিল্পে তাঁতি হিসাবে নিয়োজিত।…আবার, বম্বে-আগ্রা জাতীয় সড়কের উপর অবস্থিত বলে চলাচলকারী ট্রাকগুলি থেকে বড় পরিমাণ রাজস্ব আদায় হিসাবে ভিওয়াণ্ডিতে সংগৃহীত হয়। এই পৌরসভার উপার্জনের অঙ্ক তাই বেশ বলার মতো। ফলে স্থানীয় পৌর রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পৌরসভায় নিয়ন্ত্রণ রাখবার জন্য বিভিন্ন দল ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগে আছে। তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত বর্ধিষ্ণু মুসলিমদের একটি গোষ্ঠী রাজনৈতিক উচ্চাশা পোষণ করতে থাকে এবং কায়েমী নেতৃত্বের প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে। এলাকায় সাম্প্রদায়িক অসন্তাষ বেড়ে যায়।১৫
এই গোত্রের কিছু কিছু কট্টর ব্যাখায়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসকে জমি ও মুনাফার লড়াইয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলেছে। ভাগলপুরে ‘সাম্প্রদায়িকতার অর্থনীতি’ প্রসঙ্গে একজন সাংবাদিক মন্তব্য করেছেন:
আমাদের সভ্য সমাজের কুৎসিত রূপের প্রকাশ হিসাবে ভাগলপুরের দাঙ্গাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাটা অতি সরলীকরণ হবে। বরং আমাদের নজর দিতে হবে অন্য দিকেও—যেমন ধ্বসে যাওয়া অর্থনীতি, মুমূর্ষু শিল্প, অথবা এই ঘটনার ইন্ধনস্বরূপ এলাকার ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক কৃষি কাঠামো।
আরও দেখুন:
[আগ্নেয়াস্ত্রের] ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে কোনও স্থান নেই। মুনাফা একমাত্র বিবেচ্য। সাম্প্রদায়িক অসন্তাষকে জিইয়ে রাখার জন্য তাদের কায়েমী স্বার্থ আছে।…জিইয়ে রাখার অপর স্বার্থ হল রিলিফ ক্যাম্প পরিচালনা থেকে সংগৃহীত মুনাফা।১৬
এটা মনে করার কোনও যৌক্তিকতা নেই যে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দ্বন্দ্বগুলি গুরুত্বহীন। কিন্তু আমাদের সমসাময়িক ইতিহাসে সংকীর্ণ বস্তুময় স্বার্থের বাইরেও অতিরিক্ত অনেক কিছু রয়েছে। অথচ সমাজবিজ্ঞানের বেশ কিছু পরিশীলিত রচনাতেও নরনারীর জীবনগুলিকে বস্তুস্বার্থের ক্রীড়নকরূপে এখনও দেখানো হয়। কোনও কোনও সময় এদের নিজস্ব জীবন বৃহত্তর নৈর্ব্যক্তিক অর্থনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের অঙ্কে পর্যবসিত হয়। সেইগুলির উপর ব্যক্তিমানুষের কোনও নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করা হয় না। এই নিবন্ধের আপত্তির মূল ঝোঁক এইখানেই। এইটা বলা হচ্ছে যে ‘আসল’ লড়াইটা যেখানে হচ্ছে বলে মনে হয়—বস্তুত লড়াইয়ের ক্ষেত্র সেটা নয়। জোর পড়ে না ইতিবৃত্তের অংশে অথবা ইজ্জতের ধারণায়, ধর্মের মৌলিক ভূমিকা স্বীকৃতি পায় না, অবহেলিত হয় বিশেষ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতীকগুলির প্রতি জনগণের আসক্তি। বরং গুরুত্ব দেওয়া হয় তাৎক্ষণিক বস্তু স্বার্থগুলির উপর। এই স্তরের বিরোধের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি জায়গা জুড়ে থাকে উচ্চবর্গ। পি. ইউ. ডি. আর.-এর রিপোর্ট থেকে উল্লেখ করা যেতে পারে। ‘বর্তমান দাঙ্গা থেকে গ্রামের উচ্চবর্গের স্থায়ী ও প্রধান লাভ হল জমি।’ আবার গ্রামের হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে টিঁকে থাকা অসন্তোষ প্রসঙ্গে বলা হয়,
এই অবস্থা সৃষ্টির কারণ হল সম্পত্তি, বিশেষত ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া লোকেদের পরিত্যক্ত জমি। জবরদখল করতে বা সস্তায় কিনে নিতে ইচ্ছুক লোকেরা ক্রমাগত হুমকি দিতে থাকে। (কেবল কি তারাই হুমকি দেয়?)
বাহুল্য হলেও এই কথা আবার বলা উচিত যে, সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টির পেছনে জমি বা সম্পত্তির ভূমিকার গুরুত্বকে অস্বীকার করা কিন্তু আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য নয়। শুধু এইটুকু বলা যে ওইসব উপাদানগুলির উপর গুরুত্ব দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও বোধের জায়গাগুলো হারিয়ে যায়, এক কথায়, তাদের সক্রিয়তাকে উপেক্ষা করা হয়।
জনগণের সক্রিয়তা সম্পর্কিত একটি বিশেষ দিককে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। ‘দাঙ্গা’ প্রসঙ্গে আমাদের বহু আলোচনায় ‘জন’সমষ্টি নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। অর্থনৈতিক স্বার্থ, জমির লড়াই, বাজার দখলের খেলা এবং উচ্চবর্গের কলকাঠি নাড়া—এই সবই ঘটনাকে বেগবান করে তোলে। ‘জনগণ’ যেন আবার ইতিহাসের বাইরে থেকে যায়। এইভাবে বোধহয় তাদের আদিম ‘শুদ্ধতা’ রক্ষা করা হয়। আধুনিক ভারতের সাম্প্রদায়িক হিংসার উপরে অধিকাংশ সাম্প্রতিক লেখার বক্তব্য প্রাক-স্বাধীনতা যুগের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের অভিমতের অনুসারী মাত্র। সেখানে এই কথা বলতে চাওয়া হয় যে ১৯৮৯-এর ভাগলপুরের সংঘর্ষের তুল্য ঘটনাগুলি ভারতীয় ইতিহাসের প্রবাহে স্বাভাবিক নয়। সেইগুলি ব্যতিক্রমী, কতকগুলি অস্বাভাবিক সঙ্কটের ফল। এমন একটা ভান করা হয় যে, ১৯৮০-র দশকে দেখা এই ঘটনাসমূহের সংখ্যা যতই বাড়ুক না কেন ও মাত্রা যাই হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তা জনগণের আদত ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ কোনও মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় না;১৮ ফলে আমাদের সযত্নে লালিত জাতীয় ঐতিহ্যগুলি— ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, ‘অহিংসা’ এবং ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’—অটুট থাকে।
৩
আমার কাছে এই ইতিহাস গ্রহণীয় নয়। তার কারণ শুধু এই নয় যে এই রকম ইতিহাসচর্চায় সবকিছু একটি ছাঁচে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে বা জাতীয়তাবাদের এক ঘেয়ে ধারাপাতের আবৃত্তি হয়। এই ইতিহাসচর্চাকে বর্জন করার অন্য কারণও আছে।
স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই ধরনের ইতিহাসচর্চায় ‘সাম্প্রদায়িকতা’ এবং ‘সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ’ কোনও এক নির্ভেজাল মৌলে পর্যবসিত হয়। মৌলের গুণাবলী অপরিবর্তনীয় ও সহজবোধ্য। যা বদলায় তা হল শুধু প্রসঙ্গ। এই অংশে এই রকম ইতিহাস-চর্চার অসম্পূর্ণতার দিকগুলি আলোচনা করব।
আগে বলা হলেও যে কথার পুনরুক্তি করতে চাই তা হল যে ঐতিহাসিক বা রাষ্ট্রনীতি বিশারদ বা সমাজতান্ত্রিক হিসাবে আমরা যে সব নিটোল পূর্ণাঙ্গ বয়ান তৈরি করি ও ভবিষ্যতেও করে যেতে থাকব, তার নির্দিষ্ট একটি প্রবণতা আছে। সেই বয়ানের উপজীব্য হল ‘প্রসঙ্গ’ বিশ্লেষণ মাত্র অথবা উপর্যুক্ত সংঘর্ষগুলির সংঘটক হিসাবে ইতিহাসের বৃহত্তম শক্তির ব্যাখ্যা। এইরকম বিশ্লেষণের একটা সুবিধা বা ফল এই যে আমরা যন্ত্রণাকে তুলে ধরার সমস্যা এড়িয়ে যাই। এ যেন একটি অনাময় ইতিকথা যেটা পড়তে আমরা অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এই ইতিবৃত্তে হিংসা, দুর্দশা ও অতীতের রেখে যাওয়া অনেক ক্ষতচিহ্ন চাপা পড়ে যায়।
কিন্তু এটা খুবই জরুরি যে হিংসার প্রকাশের মুহূর্তগুলি যেন বেশি বেশি করে ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের নজর কাড়ে এবং তাদের রচনায় সেগুলি যেন নতুন করে উপস্থাপিত হয়। নিদেনপক্ষে এর সমর্থনে দুটি কারণ দেখানো যেতে পারে। প্রথমত, হিংসা ও দুর্দশার মুহূর্তগুলিতে আমাদের বর্তমান অবস্থার কথা অনেক বিশদভাবে ধরা পড়ে।১৯ দ্বিতীয়ত, নানা গুরুত্বপূর্ণ অর্থে হিংসার অভিজ্ঞতা আমাদের ‘ঐতিহ্যের’ গড়ে ওঠার উপাদান, সেই অভিজ্ঞতায় আমাদের কৌমের বোধ, গোষ্ঠীচেতনা ও তার ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে ইতিহাস, যে ইতিবৃত্ত লোকমুখে গড়ে ওঠে, সেখানে হিংসার অভিজ্ঞতা কোনও না কোনওভাবে দাগ কেটে যায়। সেইভাবে বানিয়ে তোলা হয় বর্বর বা সাধু চরিত্রগুলি, তকমা দেওয়া হয় ‘হিন্দু’, ‘মুসলিম’ বা ‘শিখ’। এইসবের পরিণতিও প্রায়শই ভয়ঙ্কর আকার নেয়। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে কীভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের আত্ম-প্রতিকৃতি গড়ে তোলে এবং তাদের প্রতিপক্ষদের চিহ্নিত করে, তার বিশদ বিশ্লেষণে যাব না। সাম্প্রতিককালকে হিন্দুয়ানির প্রচারপত্র থেকে ‘হিন্দু’ বা ‘মুসলিম’ প্রতিকৃতি গঠনের কয়েকটি সূত্রমাত্র নির্দেশ করে আমরা বিষয়টির গুরুত্ব বোঝবার চেষ্টা করব।
কয়েক বছর ধরে জঙ্গি হিন্দুয়ানি ও তার প্রচারের মাত্রা সম্পর্কে অনেকেই বলেছেন। স্পষ্টত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সবচেয়ে বেশি ধুয়ো তুলেছে; ১৯৮০-র দশকে ক্রমবর্ধমান হিন্দু-মুসলিম সংঘাতগুলির সঙ্গে এই রকম প্রচারের যোগও বেশ পরিষ্কার। কিন্তু যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে খেয়াল করা হয়নি তা হল বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো সংগঠনগুলির দাবি, তাদের তোলা বিদ্বেষের জিগির এবং তার থেকে উদ্ভূত ‘দাঙ্গার’ ফুলকি জনসাধারণের মনকে শুধু একটা মুহূর্তের জন্য বিষিয়ে তোলে না। বরং ঠিক তার উলটোটাই ঘটে। আমাদের ইতিহাস, দেশে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির’ নিজেদের সম্বল, অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির সুবিধাবাদী নীতি এবং বার বার সাম্প্রদায়িক হিংসার বিস্ফোরণ ইত্যাদির প্রেক্ষিতে অন্য গোষ্ঠী বা গোষ্ঠীদের সম্পর্কে ‘দুষ্টু’, ‘বিপজ্জনক’, ‘ভয়ানক’ ইত্যাদি চরিত্রায়ন লোকগ্রাহ্য হচ্ছে, এমন কি লোকমান্য অন্ধ বিশ্বাসের রূপ নিচ্ছে।
কেবল লোকগ্রাহ্য হবার ক্ষেত্রবিচারে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে অনুষ্ঠিত নৃশংস ক্রিয়াকলাপগুলির ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। পুরুষ, মহিলা, শিশু নির্বিশেষে সব মুসলিমকে শেষ করতে হবে—এই জিগির ভাগলপুরের বিভিন্ন জায়গায় কার্যকর করা হয়েছিল। সাধারণভাবে ‘দাঙ্গা’ প্রশমিত হবার আড়াই সপ্তাহ পরেও হিন্দু টেম্পো চালক-সহ ১৮ জন মুসলিম যাত্রীকে গ্রামাঞ্চলের একটি প্রধান সড়কে থামিয়ে খুন করা হয়। পরে তাদের দেহ ক্ষেতে পুঁতে রেখে রসুন গাছের বীজ বুনে দেওয়া হয়। মহিলাদের স্তন কেটে ফেলা হয়, বাচ্চাদের বর্শায় গেঁথে মারা, সেইসব গাঁথা বাচ্চাদের দেহ বাতাসে আন্দোলিত করে হাস্যোল্লাসে মত্ত হওয়ার মতো ঘটনার কথাও শোনা গেছে।২০
আমার মনে হয় যে, এইসব উন্মত্ততা ও অবিশ্বাস্য বর্বরতার পেছনে একটি বিশ্বাস কাজ করেছে। ভুক্তভোগীরা সবাই যেন এক একটি ভয়ঙ্কর দানব বিশেষ। কেউ হয়তো এখন জেগে আছে, কেউ হয়তো ভবিষ্যতে চাগিয়ে উঠবে। ‘আমাদের’ প্রতি ‘তারা’ সমতুল্য বা তার চেয়েও জঘন্য ব্যবহার করেছে বা সামান্য সুযোগ পেলেই ‘তারা’ সেইরকম আচরণ করতে পারে। বহু ক্ষেত্রেই ‘আমাদের’ বর্বর ব্যবহারকে ‘বদলা’ হিসাবে মনে করা হয়েছিল। বিশ্বাস ছিল এই যে আদি বীভৎস ঘটনাগুলো যেন ‘গতকাল ঘটেছে’ বা ‘সেদিন হয়েছে’, ‘শহরে’ বা ‘পাশের জেলায়’ বা আরও দূরে কোথাও সংঘটিত হবার খবর পাওয়া গেছে। ভাগলপুরে গ্রামের দিকে যে গুজবের জন্য হিন্দুরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল, তা হল ভাগলপুর শহরের একাংশে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে মুসলিম মালিকদের বোর্ডিংনিবাসী সমস্ত হিন্দু ছাত্রদের ‘দাঙ্গার’ প্রথম দুদিনেই সাবাড় করা হয়েছে।২১ এইসব হিন্দু ছাত্রদের অধিকাংশই ভাগলপুরের গ্রাম থেকে পড়তে এসেছিল। অন্যান্য ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে, অতীতে ‘তারা’ ‘আমাদের’ উপর সাধারণত যেসব অত্যাচার করেছে, এইবারের দাঙ্গায় সেইসব কুকীর্তির প্রতিহিংসা নেওয়া হল। এখানে যা প্রাসঙ্গিক তা হল এই যে আমাদের কাছে যা কিছু উন্মত্ত হিন্দু প্রলাপ, সেই সবকিছুই ব্যাপক মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য।
এই ধরনের বিশ্বাসের একটা ভদ্ররূপ হল: ‘ভারতের মুসলিমরা পাকিস্তানি’। প্রমাণস্বরূপ বলা হয়, ভারত-পাকিস্তানের যে কোনও ক্রিকেট ম্যাচে ওদের ব্যবহার লক্ষ কর। এর থেকে যুক্তি খাড়া হয় যে স্থানীয় মুসলিমরা একটার পর একটা পাকিস্তান বানাবে—ভাগলপুরে, মোরাদাবাদ, তামিলনাড়ুর মীনাক্ষীপুরমে। এইভাবে আমরা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়াই যেখানে মুসলিমকে মনে হয় ধাতুগতভাবে হিংস্র, ধর্মোন্মাদ ও অবাধ্য।
আক্রমণ, ধর্মান্তরীকরণ, সীমাহীন রিরংসা, এই সমস্ত দিয়ে নাকি ইসলাম প্রসারের ইতিহাস বিধৃত করা যায়। হিন্দুয়ানির ঐতিহাসিক ও প্রচারকদের অভিমত সেটাই। ‘যেখানে মুসলিম গোষ্ঠীরা বাস করে, সেখানেই ইসলামের নামে হত্যার তাণ্ডবলীলা অবশ্যম্ভাবী।’ ‘প্রত্যেক মুসলিমের ধর্মীয় কর্তব্য’ হল ‘অমুসলিম রমণীদের অপহরণ করে তাদের ধর্মে দীক্ষিত করা’। হালে যেসব এলাকায় সংঘাত হয়েছে, সেইসব জায়গাতে জঙ্গি হিন্দু সংগঠনগুলি নানা প্রচারপুস্তিকা ও প্রচারপত্র বিলি করেছিল। এইগুলিতে ‘হিন্দু’ দম্পতির সঙ্গে দুইটি সন্তানের ছবি ছিল, সঙ্গে ছিল শ্লোগান ‘হম দো, হমারা দো’। ঠিক তার পাশেই ছাপা হয়েছিল একটি ‘মুসলিম’ পরিবারের চিত্র। একজন পুরুষের চারটি স্ত্রী এবং অসংখ্য সন্তান, সঙ্গে যুৎসই শ্লোগান, ‘হম পাঁচ, হমারে পচ্চিশ’। এর ফলে তৈরি হল ‘মুসলিমদের’ প্রসঙ্গে লোকগ্রাহ্য একটি নতুন ‘সাধারণ’ চেতনা। অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো এই ক্ষেত্রেও বিবাহ ও যৌনাচার সম্বন্ধে কেবলমাত্র মুসলমান পুরুষদের বিকৃতির কথাই বলা হয়। তাদের বদমেজাজ সম্পর্কে কিছু ধারণাও চালু করে দেওয়া গেল।
মুসলমানদের সম্পর্কে হালের হিন্দুয়ানির প্রচারের সুরটি একটি প্রচারপত্রের মাধ্যমে ধরা যেতে পারে। ১৯৮৯-এর শেষ দিকে অথবা ১৯৯০-এর গোড়ায় এই প্রচারপত্রটি ভাগলপুরে বিলি করা হয়েছিল। এর শিরোনাম ছিল ‘হিন্দু ভাইরা ভাবো ও সাবধান হও’।২২ প্রচারপত্রের প্রশ্ন ছিল,
১। এটা কি সত্য নয়। মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে আর হিন্দু জনসংখ্যা কমছে?
২। এটা কি ঠিক নয় যে, মুসলিমরা পুরোপুরি প্রস্তুত ও সংগঠিত, এবং হিন্দুরা পুরেপুরি অসংগঠিত, ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় আছে?
৩। এটা কি সত্য নয় যে মুসলিমদের অস্ত্রের যোগান অফুরন্ত আর হিন্দুরা পুরোপুরি নিরস্ত্র…
৫। এটা কি যথার্থ নয় যে গত ৪০ বছরে কংগ্রেস মাত্র ৩০ শতাংশ ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে; বা অন্যভাবে বললে যেদিন মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ হয়ে যাবে, সেদিন তারা ক্ষমতা পাবে?
৬। এটা কি সঠিক নয় যে ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ হয়ে যাবে: অন্যভাবে বললে ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে মুসলিমরা সহজেই দেশের শাসক হয়ে যাবে?
৭। এটা কি সত্য নয়, যেই তারা ক্ষমতা পাবে, অমনি পাকিস্তানের মতো (এখানকার) হিন্দুদের তারা ঝাড়েবংশে উজাড় করে দেবে?
৮। এটা কি সত্য নয় যে হিন্দুদের নির্মূল করার সময় তারা ভেবে দেখবে না কেই বা লোকদলের, কেই বা সোস্যালিস্ট ও কেই বা কংগ্রেসের পুরুষ বা মহিলা সদস্য এবং কোন হিন্দু ‘উচুঁজাত’ বা ‘পিছিয়ে পড়া’ বর্গের লোক, কেই বা হরিজন?
৯। এটা কি যথার্থ নয় যে, যে সব লোক হাল আমলের রাজনৈতিক দুর্নীতি থেকে কালো টাকা আয় করছে ও সম্পদ বাড়াচ্ছে, মুসলিম শাসনে সেইসব লোকদেরও জীবন ও সম্পত্তি ধ্বংস হবে?…
১১। এটা কি সত্য নয় যে পাকিস্তান ছেড়ে দেবার পরে যে ভূখণ্ড রয়ে গেছে, তা স্পষ্টতই হিন্দুদের?…
১৩। এটা কি ঠিক নয়্ যে কাশ্মীরে জমি কিনতে, স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হিন্দুদের মানা আছে অথচ কাশ্মীরি মুসলিমরা অবাধে দেশের যে কোনও অংশে জমি কিনতে পারে।…
১৬। এটা কি সত্য নয় যে খ্রিস্টানদের ‘হোমল্যান্ড’ বা নিজেদের দেশ আছে, মুসলিমদের ‘হোমল্যান্ড’ বা নিজের দেশ আছে, সেখানে তারা সর্বতো নিরাপদ বোধ করে অথচ হিন্দুরা তাদের দেশ রাখতে পারেনি কারণ ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকাতলে সেটা একটা ‘ধর্মশালা’ হয়ে গেছে?
১৭। এটা কি সত্য নয় যে হিন্দুরা ক্ষমতাসীন থাকলে মুসলিমরা নিরাপদে বাস করতে পারে কিন্তু যখনই মুসলিমরা ক্ষমতায় আসবে, হিন্দুদের জীবন বিপন্ন হবে অর্থাৎ তাদের নির্মূল করে ফেলা হবে?
১৮। এটা কি ঠিক নয় যে দল নির্বিশেষে লোকসভার মুসলিম সদস্যরা মুসলিমদের উন্নতির জন্য দিবারাত্র চেষ্টা করে কিন্তু দিল্লিতে এমন কোনও হিন্দু জনপ্রতিনিধি নেই যে নিজের সুবিধা ব্যতিরেকে হিন্দুদের স্বার্থের জন্য আত্মনিয়োগ করেছে?…
২২। এটা কি সত্য নয় যে, যে সব মুসলিম রমণীদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে তাদের ভরণ-পোষণ সরকারি ওয়াকফ কমিটি থেকে করা হয় এবং সরকারি কোষাগার থেকেই খরচার যোগান হয়? এর অর্থ কি এই নয় যে মুসলিমদের আনন্দ উপভোগ ও লালসা চরিতার্থ করার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়কে অতিরিক্ত করের বোঝা বহন করতে হচ্ছে?
যদি এইগুলি সঠিক হয় তাহলে হিন্দুভাইদের এক্ষুনি সজাগ হতে হবে সময় থাকতে থাকতে জেগে উঠতে হবে। সম্পদ, শরীর, সবকিছু উৎসর্গ করার বিনিময়ে হিন্দু জনগণ ও জাতিকে রক্ষা করার শপথ নিন এবং দেশকে হিন্দু রাষ্ট্ররূপে ঘোষণা করার প্রতিজ্ঞা করুন।
এই সমস্ত থেকে অবশ্যই ‘মুসলিম’ সম্পর্কে আতঙ্ক তৈরি হয়, দাবি ওঠে তাকে নিরস্ত্র করবার। তার ভোটাধিকার কেড়ে নাও, তার সংস্কৃতি হরণ করো; ‘আমাদের’ নাম নাও, ‘আমাদের’ ভাষা নাও, ‘আমাদের’ পোষাক নাও। এই দাবিই উচ্চকিত হয়ে ওঠে যে যদি মুসলিমরা এই দেশে থাকতে চায়, তাহলে ‘আমাদের’ মতো করে থাকতে হবে। আমরা কারা? এটা কখনওই পরিষ্কার করে বলা হয় না, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে যেন আদৌ সেটাতে কিছু এসে যায় না।
‘হিন্দুস্তান মেঁ রহনা হ্যায়,
তো হমসে মিলকর রহনা হোগা।’
‘হিন্দুস্তান মেঁ রহনা হ্যায়,
তো বন্দে মাতরম্ কহনা হোগা।’
এর সঙ্গে সঙ্গে অন্য এক বিপরীত যুক্তিও সময় সময় শোনা যায়। ‘আমরা’ অবশ্যই মুসলিমদের মতো সংখ্যালঘুদের প্রতি ন্যায়পরায়ণ হব, কারণ তারা তো বেশিরভাগই ধর্মান্তরিত স্থানীয় বাসিন্দা। ‘তাদের শিরায় তো হিন্দু রক্তই বইছে।’২৩ কিন্তু মূল ধুয়াটা রয়েই যায়: ‘আমাদের মতো করে থাকো’ নতুবা ভবিষ্যৎ রক্তাক্ত; কোতল হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। ‘বাবর কি সন্তান, যাও পাকিস্তান ইয়া কবরিস্তান’। এই জিগিরকে ভাগলপুর ও অন্যান্য কিছু অঞ্চলের পুলিশ ও স্থানীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর বড় অংশ আক্ষরিক অর্থে মেনে নিয়েছিল।
‘মুসলিম’-এর দুশ্চরিত্রায়নের বিপ্রতীপে তুলে ধরা হয়েছে হিন্দুর এক ‘প্রতিকৃতি’। প্রাক-স্বাধীনতা যুগ থেকে হাল আমল পর্যন্ত বিজ্ঞাপিত ছবির তুলনায় এই প্রতিকৃতিটি কিছুটা আলাদা। এই জঙ্গি হিন্দুয়ানির প্রচারে সেই অহিংস, শান্তিপ্রিয়, সহনশীল ‘হিন্দুর’ চরিত্র ততটা জোর পায় না। আবার আশ্চর্যের কথা, সেটাকে একেবারে বাতিলও করা হয় না। বরং এখন বলা হয় যে ‘হিন্দুরা’ কীভাবে অনেক বেশি সময় ধরে সহনশীল থেকে গেছে, এখনও তারা ‘বড় বেশি নিস্তেজ’। কিন্তু সময়ের দাবি হল সাহস দেখানো, সহ্য করা নয়। ন্যায্য পাওনা নিয়ে হিন্দুদের এখনই দাবি তোলা উচিত। শেষ অবধি সেই দাবি উঠছেও। যদি ‘খ্রিস্টানরা’ একটা জাতি হতে পারে এবং ‘মুসলিমদের’ একটা জাতি থাকতে পারে, তবে হিন্দুরাও কেন একটা জাতি নয়? যে ভুখণ্ডে তারা সংখ্যাগুরু ও হাজার বছর ধরে বাস করেছে, সেই এলাকা কেন তাদের নিজেদের দেশ হবে না, সেখানে কেন তাদের নিজেদের রাষ্ট্র থাকবে না? বহু দিন ধরে ‘সহনশীলতা’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ অজুহাতে ‘হিন্দু’দের অনেক কিছু ছাড়তে হয়েছে। তাদের আর ভয় দেখানো চলবে না, তাদের আর কোনও কিছু ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কয়েক বছর ধরেই তো দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশের অন্যান্য শহরে জোর কদমে দেওয়াল-লিখন চলছে ‘গর্ব সে কহো হম হিন্দু হ্যায়’ এবং ‘হিন্দু জাগা, দেশ জগেগা’।
বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, তথা প্রতিকৃতি বা আত্মপ্রতিকৃতি অনড় বা অপরিবর্তনীয় নয়। উনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে আর্য সমাজ সমেত অন্যান্য হিন্দু সংগঠনগুলির শুদ্ধি আন্দোলনের ইতিহাস এই বিষয়কে পরিষ্কার করে তোলে। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত History of the Arya Samaj গ্রন্থে লালা লাজপত রায় বলেছিলেন ‘আর্য সমাজ হল একটা বৈদিক চার্চ। অতএব হিন্দু সংগঠনরূপে হিন্দু ধর্মের খোঁয়াড় থেকে বেরিয়ে যাওয়া যে কোনও ভ্রাম্যমান শাবককে ফিরিয়ে আনা এবং যে কাউকে হিন্দু ধর্মে পুনর্দীক্ষিত করা তার কর্তব্য।২৪ হিন্দুধর্মের উপর খ্রিস্টান মিশনারিদের আক্রমণ ও উনবিংশ শতকে নিচু জাতের এবং কিছুটা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তরীকরণের চেষ্টার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিক্রিয়া রূপে শুদ্ধি আন্দোলনের জন্ম হয়। লালা লাজপত রায়ের ভাষাতেই আর্য সমাজ গড়ে ওঠার পেছনে খ্রিস্টানদের প্রভাব লক্ষণীয়। ‘চার্চের’ তুলনা বা মেষ পালক কর্তৃক ‘ভ্রাম্যমান’ মেষ শাবকদের ফিরিয়ে আনার উপমাটি প্রণিধানযোগ্য।
লাজপত রায় এটা লক্ষ করেছিলেন যে ‘শুদ্ধির’ বাচ্যার্থ হল ‘পরিশোধন’ মাত্র। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ পদে ও বিংশ শতকের গোড়ায় জঙ্গি হিন্দুয়ানি শব্দটির অর্থ বদলে দিয়েছিল। নানা ধরনের ক্রিয়াকলাপের প্রতি শব্দটি প্রযুক্ত হতে লাগল। (ক) ‘বিদেশী’ ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা; (খ) যারা দূর অতীতে অথবা কিছু দিন আগে ‘বিদেশী’ ধর্ম গ্রহণ করেছিল তাদের পুনর্বার ধর্মান্তরিত করা; (গ) নতুন করে পুনরুদ্ধারে ব্রতী হওয়া অর্থাৎ অন্ত্যজদের জাতে তুলে পুরোপুরি হিন্দু করা।২৫
ঔপনিবেশিক ভারতের শেষ পর্যায়ে শাসনতন্ত্রের হিসাবনিকাশের সংখ্যায়নের সঙ্গে হিন্দু সমাজের এই জাতীয় নবতর সংজ্ঞা নিরূপণ অথবা হিন্দু আচারের গ্রাহ্য রূপ নির্ধারণ ও ধর্মান্তরের মতো খ্রিস্টীয় ‘কৌশল’ গ্রহণের চেষ্টা কোনও না কোনওভাবে সম্পৃক্ত।২৬ বিভিন্ন স্তরে গোষ্ঠীচেতনা দ্রুত দানা বেঁধে উঠেছিল, যেমন হিন্দু, মুসলিম, শিখ, আহির, পাটিদার, নাদার, বিহারি, উড়িয়া বা তেলগু। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নতুন মাত্রা পাচ্ছিল। এমতাবস্থায় জঙ্গি হিন্দু নেতা ও সংগঠনরা হিন্দুদের নানা ‘বিকৃত’ ধর্মীয় আচার ও ধারণা পরিত্যাগ করতে ডাক দিলেন। জাতপাতের বিভেদ, একসঙ্গে পঙ্ক্তিভোজন ও সমুদ্রযাত্রা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা, শুচিবাই-এর ‘অদ্ভুত’ ধারণা এবং তার ফলে ধর্মান্তর করবার বিধি নিষেধ ইত্যাদি ‘বোকাটে’, ‘জাতীয়তাবিরোধী’ চিন্তার জন্যই, বলপূর্বক ধর্মান্তরিত লক্ষ লক্ষ হিন্দু আজ পর্যন্ত মুসলিম হয়ে বাস করছে।২৭ ১৯২০ সাল নাগাদ আর্যসমাজীরা ও আরও গোঁড়া হিন্দু নেতার দেবলস্মৃতি করলেন। আরবদের সিন্ধুজয়ের একশ বছর বাদে লেখা এই স্মৃতিগ্রন্থে জোর করে ইসলামে দীক্ষিত হিন্দুদের হিন্দুধর্ম ফিরিয়ে আনার বিস্তৃত বিধি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৩০ সালে একইভাবে খুঁজে পাওয়া গেল অথর্ববেদ ও ব্রাহ্মণের কথিত ‘ব্রাত্যস্তাত্র’ আচার, যার ফলে আর্য সমাজ চ্যুত বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের পুনগ্রহণের বন্দোবস্ত করা যায়।২৮ নতুন এক ঐতিহ্যের পক্ষে শাস্ত্রীয় নির্দেশ সংগৃহীত করা হল।
হিন্দু সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকৃতি ও ‘ঐতিহ্য’ নির্মাণের রীতিসমূহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। এই কথাও বলা প্রয়োজন যে সত্তর বছর ধরে নানা পরিবর্তন ও অভিযোজন সত্ত্বেও কতকগুলি ভিন্ন ঘটনাকে ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার’ সরলীকৃত আখ্যায় ভূষিত করা হচ্ছে। খুব কম সময়ের ব্যবধানে ও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের চরিত্র ও পদ্ধতিগুলি যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা অনুধাবনযোগ্য। এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে ‘দাঙ্গার’ এমন কোনও অপরিবর্তনীয় মৌল রূপ নেই, যার চারপাশের প্রসঙ্গগুলিই শুধু বদলে যায়।
১৯৮০-এর দশকের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ নানা নতুন রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যকার সংঘর্ষ পূর্বতন দাঙ্গার পরিচিত রূপের মধ্যে আর আবদ্ধ নেই; যেমন রাস্তায় দুই দলের মুখোমুখি মারামারি অথবা অলিগলিতে চোরাগোপ্তা খুন। সম্প্রতি ১৯৮৯-এর ভাগলপুর, ১৯৮৭-এর মীরাট, ১৯৮৪-তে শিখ বিরোধী ‘দাঙ্গা’, ১৯৮৩-তে শ্রীলঙ্কার তামিল বিরোধী ‘দাঙ্গা’, ১৯৮০-তে মোরাদাবাদে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ইত্যাদি হিংসার নানা ভয়ংকর নিদর্শনগুলি যেন সুসংগঠিত গোষ্ঠী নির্যাতন, আম কোতলের পরিকল্পনা।২৯ এই সব ক্ষেত্রে শয়ে, হাজারে এমন কি দশ হাজার লোকের জমায়েত ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন ও পূর্বচিহ্নিত ‘অপর’ সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, সম্পত্তি ও জীবনের উপর আঘাত হেনেছে।
ভাগলপুরে মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির এক স্থানীয় নেতা বলছিলেন যে এখন কোথাও দু-একটা খুন হলে সেটাকে ‘দাঙ্গা’ বলে গণ্য করা হয় না।৩০ আজকের ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার’ চেহারাটা হয়েছে অন্যরকম, তার চিহ্নগুলো হল: ‘শত্রুকে’ ঝাড়েবংশে শেষ করার উদ্দেশ্যে ছেলে, বুড়ো, অন্ধ, পঙ্গু, মেয়ে, বাচ্চা সবাইকে খতম করা, ক্ষেতের শস্য, সম্পত্তি, যন্ত্রপাতি সমেত ধনেপ্রাণে সবকিছু ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা। এই ক্রিয়াকাণ্ডে পুলিশ নির্লজ্জভাবে অংশ নেয়, সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় চলাচলকারী ট্রেন ও বাসের যাত্রীদের হত্যাও দাঙ্গার নৈমিত্তিক ঘটনা।
১৯৪৭ সালে প্রথম রেলযাত্রীদের সদলে খুন করা হয়েছিল। তখন বলা হয় যে দেশ সবেমাত্র ভাগ হয়েছে, দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, গুছিয়ে নিতে তাদের কিছুটা সময় লাগবে। সৈন্যবাহিনী ও পুলিশও দুইভাগে বিভক্ত। ফলে বিভ্রান্তি হবেই, মারাত্মক অপরাধ ও হিংসা প্রায় অবশ্যম্ভাবী। ১৯৮৪ সালে যখন একই ঘটনা ঘটল তখন বলা হল যে, একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বনেত্রীকে খুন করা হয়েছে, মহীরূহ উপড়ে গেলে উথাল-পাথাল হওয়া বিচিত্র নয়, অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াটাই তো স্বাভাবিক। অবস্থা এখন এইরকম যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে লোককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারলে কোনও রকম ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতির কৈফিয়ৎ খাড়া করাও যেন অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। সংবাদপত্রগুলি কখনও কখনও বিনা মন্তব্যে ভেতরের পতায় এই জাতীয় খবর ছাপায়।
হিংসাকে ঘিরে এই জাতীয় আলোচনা ‘ঘটনাগুলিকে’ অসাধারণ বলে চিহ্নিত করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একেবারে সাধারণের পর্যায়ে নামিয়ে আনে, নজরে পড়ার অযোগ্য, নিতান্ত তুচ্ছ বিষয় বলে সরিয়ে রাখে। এই প্রসঙ্গে আমি ভাগলপুর থেকে তুলে আনা এক ‘খণ্ড’ বয়ানের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এই ‘খণ্ড’ বয়ানটি হিংসার প্রেক্ষিতকে কিছুটা বদলে দেয়, আজকের দিনের ‘সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের’ ভিন্ন অর্থ তুলে ধরে। শুধু আর-এক ধরনের ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ’ হিসাবে এই খণ্ড বা ভগ্নাংশটিকে পেশ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। বরঞ্চ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের বিশেষ অভিজ্ঞতায় ও উপলব্ধিতে বিধৃত অন্য এক বিষয়ীর নিজস্ব অবস্থানগত বোধের প্রকাশ হিসেবে খণ্ডটিকে বিচার করা যেতে পারে। এতে আমাদের নিজেদের বিষয়গত অবস্থান ও উপলব্ধির মাপকাঠিও পরিষ্কার হতে পারে। এ ছাড়া আমাদের ইতিহাসচর্চায় সর্বজ্ঞ হবার প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতাও বোধের এই প্রকাশে ধরা পড়ে।
আলোচ্য এই ভগ্নাংশটি ভাগলরপুরের কলেজের এক শিক্ষকের লেখা একটি কাব্য সংকলন।৩১ শিক্ষক নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী অধ্যুষিত, হিন্দু-মুসলিম একটি মিশ্র এলাকার বাসিন্দা। খুব বড় রকমের হত্যাকাণ্ড এখানে হয়নি। কিন্তু এলাকাটি বারবার আক্রান্ত হয়েছে। ফলে অঞ্চলটি চিরতরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ক্ষতবিক্ষত থেকে যাবে। সংঘর্ষ হবার প্রথম পাঁচদিনের মধ্যে মনাশির আশিক হরগাঁভি বেশির ভাগ কবিতা লিখেছিলেন। এই কবিতাগুলিতে সেই সময়ে ভাগলপুরের অনেক বাসিন্দাদের আতঙ্ক ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতির আভাস পাওয়া যায়। কবিতায় আছে অন্ধকারের কথা, দীর্ঘ নিশিযাপনের অভিজ্ঞতা এবং সেই সব দিন ও রাতের কাহিনী, যাদের আবর্তন যেন নিরর্থক ও অন্তহীন। কবিতায় ধরা পড়েছে সময়ের উন্মত্ত বিফল আর্তনাদ, শোনা গেছে লুটেরাদের চিৎকার। অট্টহাসির তলায় ডুবে গেছে সাহায্য পাবার আকুল আর্তি।
| জান লেভা হঁসি | প্রাণ হিম করে দেওয়া হাসি |
| ভয়ানক কহ্কহে | ভয়ানক অট্টরোল |
| বচাও কি আঁওয়াজে | (আমাদের) বাঁচাবার আর্তিগুলি |
| ফাঁসে রহ গঁয়ে। | দাঙ্গাবাজদের মধ্যে হারিয়ে গেল। |
মাঠভর্তি পড়ে থাকা লাশের চিত্রকল্প আছে, লাশগুলিকে গোনাও অসম্ভব।
| এক…তিন…সত্তর | এক-তিন-সত্তর |
| সই-দোসও-ঢাইসও | শ-দুশ-আড়াইশ |
| যহ গিনতি পার নহী লগেগী | এই গুনতি আর শেষ হবার নয় |
| ইনহে গিনানে সে পহলে হী | কারণ শেষ হবার আগেই |
| তুম আ জাতে হো | তুমি আবার আসবে |
| বম্ আউর গোলি লেকর | বোমা আর গুলি নিয়ে |
| গিনতি কি তাদাদ বঢ়ানে | গুনতির সংখ্যা বাড়াতে; |
| লম্হে কি রূপহলী তসবীর, | কেউ এসে দেখুক |
| কোই দেখে আকর। | কি রূপালি এই মুহূর্ত। |
‘জেগে ওঠার’ রূপকল্প থাকে, অন্ধকারের অবসানের পর আলোর আভাস পাবার প্রতীক্ষা থাকে। কিন্তু তারই সঙ্গে থাকে ভয়াবহ আতঙ্ক, লুটেরাদের ফিরে আসার আশঙ্কা।
| দাঙ্গই ফির আয়েঙ্গে | দাঙ্গাবাজরা আবার আসবে |
| অ্যায়সা হ্যায় ইন্তেজার। | তারই জন্য অপেক্ষা। |
এই কাব্য সংকলনে অনেক ধর্ষণের কথা আছে। একটা সম্প্রদায়ের অবমাননার রূপকও হতে পারে, অথবা কোনও সত্য ঘটনার আক্ষরিক বর্ণনাও হওয়া সম্ভব।
| মর গয়ে বেটে মেরে | আমার ছেলেরা মরেছে |
| বিবি মেরী | বৌটাও |
| ঔর য়হ বেটি জিসে তুম সাধ | আর পাশে বসে থাকা এই মেয়েটি |
| মেরে কনখিঁয়ো সে দেখতে হো | যাকে তুমি চোখের কোণ দিয়ে দেখছ |
| বেশুমার হাঁথোনে লুটা হ্যায় ইসে। | কত শত হাত একে লুটেছে। |
এইরকম কাব্যাংশের মতো অসংখ্য টুকরো পংক্তি আছে যার উদ্দিষ্ট প্রতিবেশি বা বন্ধু বা সেই সব লোক যারা একদিন পড়শি বা মিত্র ছিল। পড়শিরা আজ খুনেতে রূপান্তরিত, চেনা অচেনা মানুষেরা একে অপরের থেকে দূরে পালাচ্ছে, লোকে বা ‘আমরা সবাই’ আরশিতে মুখ দেখতে পচ্ছি, না জানি কি দেখব। কবিতাগুলিতে শোনা আবেদন আর অভিযোগ, আঁকা হয় নিঃসীম শূন্যতার ছবি।
কুছ ভী নহী রহা গয়া হ্যায় কহী
(কোথাও কিছু অবশিষ্ট নেই)
আদমী বহুৎ হী বওনা হো চুকা হ্যায়
আপনী লম্বাই কা ঝুঠা এহসাস ভী
বাকী নহি বচা
(মানুষ বামনের মত খর্ব হয়ে গেছে,
নিজের উচ্চতা সম্পর্কে মিছে বিশ্বাসও
আর শেষ অবধি রইল না)
হম বেহদ খোখলে হো গয়ে হ্যায়।
(আমরা একেবারে ফোঁপরা হয়ে গেছি)
আধে আধুরে লোক
(অর্ধেক অসমাপ্ত মানুষ)
আমাদের নিজেদের, প্রিয়-জনদের ও বন্ধুদের খুঁজে বার করার ব্যাকুলতা থেকে যায়:
| খুদ অপনে আপকো ঢুণ্ডতে হুয়ে | নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে |
| অর তুম উস্ কিনারে পর খড়ে হো | তুমি এখন সেই কিনারায় দাঁড়িয়ে |
| জাঁহা সে কোই নহী লৌটতা | যেখান থেকে কেউ ফেরে না |
| কোই নহী লৌটতা দোস্ত | কেউ ফেরে না বন্ধু |
| অব তুম্ভী নেহি লৌট পাওগে | এখন তুমিও ফিরতে পারবে না |
| য়াদ কি সির্ফ এক শর্ত রহে জায়েগী | স্মৃতির একটি মাত্র শর্ত থেকে যাবে |
| কে জব ভি কঁহী | যখনি কোথাও |
| ফসাদ হোগা | দাঙ্গা হবে |
| তুম্ বহুৎ ইয়াদ আওগে। | খুব মনে পড়বে তোমার কথা। |
এই ভগ্নাংশটি ১৯৮৯-এর ভাগলপুরের ‘দাঙ্গার’ কথা নানাভাবে তুলে ধরে আর মনে করিয়ে দেয় যে এর ইতিহাস রচনায় আমরা কতটাই অপারগ।
৪
উনিশ শতক থেকে প্রচলিত ইতিহাসবিদ্যার পদ্ধতিতে রাষ্ট্র গঠন বা জাতীয় রাষ্ট্র গোছের কোনও কেন্দ্রের বিকাশ হত দিগদর্শী। ‘পূর্ণাঙ্গ’ সাধারণ ইতিবৃত্ত নিমার্ণে প্রাথমিক আকর-এর জায়গা পেত সরকারি মহাফেজখানা। আধুনিক ভারতীয় ইতিহাস রচনায় ক্ষেত্রে এই প্রতিকল্পের ক্ষমতা সহজে ধরা যায়।
এই পদ্ধতিকে অনায়াসে বাতিল করা যায় না। কারণ মানব সমাজ গঠিত হবার প্রধান নীতি রূপে রাষ্ট্র ও জাতিসমূহকে আমরা মেনে নিয়েছি। তদুপরি, ঐতিহাসিকদের উপজীব্য বিষয় হল যুগ, এলাকা, সামাজিক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক বিন্যাস। এই সবই কোনও না কোনও একক বা নিটোল ছাঁচে দানা বাঁধে। কিন্তু ঐতিহাসিক বা ইতিহাসের প্রক্রিয়ায় এবং ঐতিহাসিকদের রচনায় যে নির্মিতির কাজ চলে, সেই নির্মিতির পদ্ধতি মনে রাখা আবশ্যক। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের বস্তু হিসাবে এই এককগুলির আপতিক ও দ্বন্দ্বসঙ্কুল চরিত্র—এর প্রতি নিঃসন্দেহে নজর দেওয়া উচিত।
আমার বক্তব্য হল, আপাতভাবে দৃঢ়-সংবদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গীন দেখালেও সরকারি সূত্র সমূহ আদতে ইতিহাসের একটি ভগ্নাংশই আমাদের কাছে হাজির করে। তার বাইরে আরও অনেক কিছু থাকে যাকে ঐতিহাসিকরা ‘ভগ্নাংশ’ বলে অভিহিত করেন; যেমন, কোনও এক তাঁতির দিনলিপি, অজানা কবির লেখা কাব্য সংকলন। এইগুলির সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে সেকালে নিন্দিত সেইসব ভারতীয় সাহিত্য যেমন সৃষ্টি সংক্রান্ত নানা অতিকথা, মহিলাদের গান, বংশচরিত বা স্থানীয় কিংবদন্তী। রাষ্ট্রভিত্তিক ইতিহাস রচনার বিরোধী প্রকল্পে এদের গুরুত্ব তাপরিসীম। এরা অন্য সব ইতিহাস ভাবতে শেখায়। এদের মাধ্যমে সেই সমস্ত লড়াইগুলোকে চেনা যায় যার ভিতর দিয়ে কিছু একক নির্মিত হয় এবং অন্যরা ভেঙে গুড়িয়ে যায়।
আমাদের বিশ্লেষণের এককগুলির সাপেক্ষতা স্বীকার করলে, আমাদের ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব সম্পর্কে আত্মগরিমাও অনপেক্ষ থাকবে না। ‘সামগ্রিক’ ও ‘নিরপেক্ষ’ জ্ঞানের দাপট আজকের ইতিহাস রচনায় আগেকার মতো নেই। কিন্তু সর্বাতিশয়ী কোনও এক ‘বহস’ নির্মাণ করার প্রলোভন বড় জোরদার। আজও আমরা ‘পূর্ণাঙ্গ’ বয়ানের জন্য ব্যাকুল যে বয়ানে দরকারি কোনও কিছুই বাদ যাবে না।
ইতিহাস চর্চার প্রয়োজনীয় ও স্বাভাবিক অঙ্গরূপে এই আকুতি থাকা বিচিত্র নয়। এর সঙ্গে সঙ্গে আমরা যেন আমাদের বয়ানের সাপেক্ষতা মেনে নিই, বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে বয়ানগুলির নিজস্ব ঐতিহাসিকত্ব ও স্থান নির্দেশ করি। তাহলে দেখানো যাবে জ্ঞানাঙ্গনে ঐ বয়ানগুলি কোন কোন সম্পর্ক ও ক্ষমতার সুবাদে বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে, অন্যগুলি বাদ পড়ে গেছে। বর্তমান ভারতে জোড়বিহীন জাতীয়তাবাদের সর্বাতিশয়ী যে রূপকে আমাদের মতো বহু সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক মেনে নিয়েছেন, তা আদৌ যথাযথ নয়।
বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাসী, প্রভুত্বকামী জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চাকে বার বার প্রশ্ন করা উচিত। কারণ এই ধরনের লেখায় ‘জাতীয়’ ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ইত্যাদি বর্গগুলি একপেশে অর্থে ব্যবহৃত হয়। অধিকন্তু, এই রচনাসমূহে সমস্ত ভারত, এমনকি দক্ষিণ এশিয়াকে, দিল্লি থেকে দেখা হয়। আলোচনায় তথাকথিত সাধারণের মধ্যে বিশেষ হারিয়ে যায়, বৃহৎ ক্ষুদ্রকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, ‘মূলস্রোতে’ই নজর কাড়ে, ‘প্রান্তিক’ একপাশে পড়ে থাকে।
যে পি. ইউ. ডি. আর. দলের আমি সদস্য ছিলাম, ঘটনাক্রমে ১৯৯০-এর ২৬ জানুয়ারির প্রজাতন্ত্র দিবসে দলটি ভাগলপুরে ছিল। ২৫ তারিখ সন্ধায় দূরদর্শনের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ভারতীয় সংবিধানের অংশবিশেষের পাঠ কানে এল ‘আমরা, ভারতের জনগণ দৃঢ় সংকল্প যে ভারত একটি স্বাধীন সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র রূপে গঠিত হবে ও প্রত্যেকটি নাগরিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ন্যায়বিচার-এর অধিকার পাবে: চিন্তা, মত, বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা (প্রাপ্য)’…লেখায় বোঝানো মুশকিল সেই মুহূর্তে দিল্লি যে কতটা দূর, সেটাকে কীভাবে আমরা বুঝতে পারলাম।
ঠিক তার একদিন আগেই আমরা দেখেছি, কোনও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অনেক এলাকার পুরুষ, মহিলা ও বাচ্চারা পোঁটলাপুটলি নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছেন। ভয় যদি ২৬ জানুয়ারি কিছু ঘটে? জোর গুজব ছিল, জাতীয় উৎসবের দিনে চির বিশ্বাসঘাতক মুসলিমরা তাদের ধর্মস্থানে কালো পতাকা ওড়াবে ও আরেকটি দাঙ্গা বাঁধবে। মুসলিম গ্রামবাসীদের সঙ্গে শহরের বাসিন্দাদের উত্তপ্ত বাদানুবাদ আমরা শুনেছি। একদল বলছিল যে এইরকম পালিয়ে আসা গুজব ও বিপদকে বাড়িয়ে তুলবে; অপরদল পাল্টা অভিযোগ তুলছিল যে আত্মসন্তুষ্টিতে ভোগাটা বোকামি, ‘আগে তো এইরকমই ঘটেছিল।’
একটা ত্রাণশিবিরে আমাদের এফ. আই. আর. ও সাক্ষ্যপ্রমাণাদি লিখে নেবার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। পুলিশের এই কাজ করার কথা। কিন্তু তারাই তো অপরাধী। বহুক্ষেত্রে তারা তখনও তাদের পদ নিশ্চিন্তে দখল করে আছে। সেই সময় ‘ন্যায়বিচার’ ও ‘স্বাধীনতার’ মতো শব্দগুলি উচ্চারণ করতে গিয়ে যেন গলায় আটকে যায়।
দিল্লির যে ব্যবধানের কথা আমি বলছি সেটা কেবল ভৌগোলিক দূরত্বে নিহিত নেই। আমি নিঃসন্দেহ যে কোটা এবং জয়পুরে, মেহম, মীরাটের মালিয়ানাতে, দিল্লির পাশে যমুনার অপর পারের তিলকনগরে, এমন কি খোদ পুরোনো দিল্লির অনেক বাসিন্দাও দিল্লির সঙ্গে এইরকম দূরত্ব অনুভব করেছিলেন, সেই সব জায়গাতেও ‘ন্যায়বিচার’ ও ‘স্বাধীনতার’ মতো শব্দগুলি বেশ বোকা বোকা শুনিয়েছিল। দিল্লির সঙ্গে এই ব্যবধানের কথাও যেন আমাদের লেখা ইতিহাসে ধরা পড়ে।
অনুবাদ: পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও গৌতম ভদ্র
