কে প্রথম কাছে এসেছি – ১
॥ এক ॥
বাবা চলে গেছেন আজ তিন মাস হতে চলল। কথায় বলে, ‘টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার।’ সময় সব ক্ষত নিরাময় করে দেয়। কিন্তু এই ক্ষতের তো কোনও নিরাময় হচ্ছে না! বেদনার উপশম হচ্ছে না! বরং একটা একটা করে দিন যাচ্ছে আর বাবার অনুপস্থিতি আরও বেশি করে জাঁকিয়ে বসছে মাথার ভেতরে। নাছোড় এক শূন্যতা গিলে নিচ্ছে প্রাণরসটুকু। বড়ো অসার মনে হচ্ছে এই বেঁচে থাকা। এই দিনগত পাপক্ষয়। অথচ সে তো বাড়ির বড়ো ছেলে। মা আর ভাইয়ের দায়িত্ব তার কাঁধে। তার কি এমন মুষড়ে পড়া মানায়? মা অবধি তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। বলেছে, ‘যে যাওয়ার সে তো গেছেই। তুই যদি এমন মরা মানুষের মতো করিস, আমি ছোটোকে নিয়ে কই যাই বল দেখি? তোকে তো শক্ত হতে হবে। তোর এই দশা দেখে কিন্তু তোর বাবাও ভালো নেই নীরু।’
কতটা ব্যথা গিলে মা এই কথাগুলো বলেছে সেটা খুব ভালো বুঝতে পারছে নীরেন। কিন্তু মনের মধ্যে এতটুকু জোর সে পাচ্ছে না। আসলে তার চৈতন্যের অনেকটা জুড়ে ছিল তার বাবা। বাবার এই আকস্মিক মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে। যত চেষ্টা করছে শোক ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ানোর, তত বেশি জবুথবু হয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন কলেজ কামাই হচ্ছে।
সংস্কৃত কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে নীরেন। এই ইয়ারের পেপারগুলো বেশ কঠিন। এক দিন করে ক্লাস মিস হওয়া মানে বেশ খানিকটা করে পিছিয়ে যাওয়া। নীরেন বেশ বুঝতে পারছে, এ বার আর সে পাশ করতে পারবে না। অথচ বাবার চলে যাওয়ার পরে পাশ করে দ্রুত একটা চাকরি পাওয়া খুব দরকার। নয়তো তাদের সংসারটা ভেসে যাবে। কিন্তু কী যে এক অবসাদ গ্রাস করল তাকে! মনে হচ্ছে, এর থেকে আর মুক্তি নেই।
ঠিক এমনই একটা সময়ে একটা বিকেলবেলা নীরেনদের বাড়ি এসে হাজির হল তার কলেজের দুই বন্ধু। তপন আর সৌগত। নীরেন অনেকদিন কলেজে যাচ্ছে না দেখে চিন্তিত হয়ে তারাই বাড়ি খুঁজে এসে হাজির হয়েছে। নীরেনের মা তাদের হাত জড়িয়ে ধরলেন, ‘নীরুকে বাঁচাও বাবারা। এই ভাবে ওর তো মাথাটাই খারাপ হয়ে যাবে!’
সৌগত ভরসা দিল, ‘আপনি চিন্তা করবেন না মাসিমা। আমরা দেখছি।’
নীরেনকে ধরেবেঁধে ওরা বাড়ি থেকে টেনে বাইরে নিয়ে এল। বলল, ‘চল, বেড়াতে যাব।’
নীরেন ঘাড় গোঁজ করে বলল, ‘আমি যাব না। আমাকে জ্বালাস না।’
কথাটা শুনেই আবার তাকে টেনে বাড়িতে নিয়ে এল ওরা। সোজা মায়ের সামনে এনে বলল, ‘মাসিমা, নীরেনকে নিয়ে বেড়াতে যেতে চাইছি। ও যেতে চাইছে না। বেড়াতে গেলে তো মনটা ভালো হতো। আপনি কিছু বলুন।’
মা কোনও রকম এদিক ওদিক না করে সোজা দিব্যি দিয়ে বসল, ‘তোকে যেতেই হবে। আমার দিব্যি।’
মায়ের দিব্যি বলে কথা। দিব্যির জোরে আর বন্ধুদের ষড়যন্ত্রে সান্ধ্যকালীন বেড়াতে যাওয়াটা পর্যবসিত হল একেবারে দার্জিলিং যাত্রায়। ঠিক দার্জিলিং শহরে নয়, সেখান থেকে কিছুটা নীচে লেবং নামে একটা গ্রামে।
সৌগত মেসে থাকে। তার রুমমেট প্রবেশ ছেত্রীর বাড়ি ওই লেবংয়ে। প্রবেশ অনেকবার যেতে বলেছিল কিন্তু যাওয়া হচ্ছিল না। শেষমেশ দু’দিন পরে বাক্স প্যাঁটরা বেঁধে ওরা রওনা দিল লেবং-এর উদ্দেশে।
***
লেবং পৌঁছোতে প্রায় বিকেল হয়ে এল। ডিসেম্বর মাস। দিন ছোটো। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য ঢলে পড়বে পশ্চিমে। বেশ ঠান্ডা। উলের টুপি দিয়ে ভালো করে কান-মাথা ঢেকে নিল সকলে।
প্রবেশ দু’দিন আগেই বাড়ি চলে এসেছিল। সে ওদের নিতে এসেছিল দার্জিলিংয়ে। লেবং দার্জিলিং শহর থেকে প্রায় হাজার ফুট নীচে। ব্রিটিশরা দেখেছিল, দার্জিলিংয়ের চেয়ে ঠান্ডা এখানে কম। তাই এখানেই তারা প্রথম চা বাগান তৈরি করেছিল। তৈরি করেছিল রেসকোর্স।
চা বাগান আর পাইন বনে ঘেরা আশ্চর্য সুন্দর এই উপত্যকা লেবং। ওরা প্রবেশের থেকেই শুনছিল, গ্রামে এখন মেরে-কেটে পাঁচ-ছ’শো লোকের বাস। হিন্দু আর বৌদ্ধই বেশি। তবে কয়েক ঘর খ্রিস্টানও আছে। মূলত চা বাগান আর জঙ্গলের কাঠ দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করে গ্রামের মানুষ। কেউ কেউ দার্জিলিংয়ে চাকরি করতে যায় বটে তবে সংখ্যায় তারা নগণ্য। এখনও ইলেকট্রিক এসে পৌঁছোয়নি এই গ্রামে। লণ্ঠন, কুপি আর টর্চ ভরসা। তাই সন্ধের মধ্যেই কাজকর্ম সেরে শুয়ে পড়ে সবাই আর দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার আগে। তপন বলল, ‘আমি কিন্তু সন্ধে হতেই খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারব না। এখনই বলে দিলাম।’
প্রবেশ হেসে বলল, ‘না রে ভাই, আমরা তো আড্ডা মারব। আমার কাকাও রাত জেগে কাজ করে।’
সৌগত বলল, ‘কী করেন তোর কাকা?’
‘কাকা কন্ট্রাক্টর। কলকাতার এক বিজনেসম্যানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে লেবংয়ে একটা হোটেল বানাতে চাইছে। ওদের সন্ধের পরেও মিটিং হয়। কাকা তো বলেছে, আর দু’ বছরের মধ্যে ইলেকট্রিক এনে দেবে। ভোল পালটে দেবে লেবংয়ের।’
লেবংয়ে পৌঁছেই সবুজের সমারোহ দেখে মনের ভারটা যেন একটু কমে গেছিল নীরেনের। এই কথাটায় মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল। তার মনে হল, ভোল পালটে দিলে তো লেবং আর লেবং থাকবে না। যত দিন শহরের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে থাকতে পারবে, তত দিনই তার প্রাণ থাকবে। কিন্তু সে কথা শুনবে কে? সবাই উন্নয়ন চায়। আর উন্নয়নের প্রথম বলি যে জঙ্গল, এ কথা কে না জানে!
প্রবেশদের বাড়িটা গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে হলেও প্রবেশরা যে বাকি গ্রামবাসীদের তুলনায় বর্ধিষ্ণু সেটা বাড়ির চেহারা দেখেই বোঝা যায়। প্রবেশের ঠাকুরদা একটা সময় দীর্ঘ দিন শোভাবাজার রাজবাড়িতে সিকিউরিটি গার্ড ছিলেন। সেই সূত্রে প্রবেশের বাবা, কাকারও কলকাতায় যাতায়াত ছিল। ফলে প্রবেশদের বাড়ির বেশির ভাগ লোকই বাংলা বুঝতে তো পারেনই, ভাঙা ভাঙা বলতেও পারেন। প্রবেশের কলকাতার বন্ধু শুনে নীরেনদের খুব খাতির করলেন তাঁরা।
কাঠের বাড়ির দোতলার একটা ঘরে ওদের তিন বন্ধুর থাকার ব্যবস্থা হল। ঘরের জানলা খুলতেই চোখ জুড়িয়ে গেল নীরেনের। পাইন বনের ফাঁক দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে চা বাগান আর কাছেই ঝিরঝির করে বয়ে চলেছে ছোট্ট এক পাহাড়ি নদী। প্রবেশ বলল, ‘ওর নাম রুংডুং।’
কী সুন্দর নাম! শুনলেই মনে হয় কেউ রুনুঝুনু রুনুঝুনু নূপুর বাজাচ্ছে। নদীর চলনটাও ঠিক তেমনই। যেন নূপুর পায়ে চপলা কিশোরীর মতো ছুটে চলেছে আপন খেয়ালে।
বিকেল গড়িয়ে তখন একটু একটু করে সন্ধে নামছে উপত্যকায়। নদীর দিকেই বিভোর হয়ে তাকিয়েছিল নীরেন। এই আবছায়া অন্ধকার আর বহতা জল যেন তার মন থেকে শোকের ভাবটাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছিল। তখনই নীচ থেকে একটা হইচই-এর শব্দ কানে এল। নেমে এসে দেখল, উঠোনে প্রবেশের কাকা জীবেশ ছেত্রী একটা চেয়ারে বসে আছে আর তার হাতে ডেটল লাগিয়ে দিচ্ছে প্রবেশের কাকিমা। হাতে বেশ গভীর কামড়ের দাগ। প্রবেশের বাবা বলছেন, ‘একটু দেখেশুনে চলবি তো!’
ব্যাপারটা জানা গেল, দু’ তিন দিন পর থেকেই জঙ্গলের মধ্যে যেখানে হোটেল বানানো হবে সেখানকার গাছ কাটা শুরু হবে। তাই গাছে দাগ দেওয়ার কাজ চলছে। বিকেলের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে গেছিল কিন্তু প্রবেশের কাকা শেষবেলায় একবার চক্কর লাগিয়ে দেখছিলেন, সব কাজ ঠিক মতো হল কি না! তখনই ঝোপের মধ্যে থেকে একটা জংলি বেড়াল লাফিয়ে এসে হাতে কামড় দিয়ে পালিয়ে গেছে। প্রাথমিক ওষুধপত্র লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা হতে প্রবেশের বাবা বললেন, ‘বেড়ালের কামড়। কাল সকালেই কিন্তু দার্জিলিং গিয়ে ইঞ্জেকশন নিতে হবে।’
ঠাকুরদা বললেন, ‘বেড়াল না লেপার্ডের বাচ্চা? ঠিক দেখেছিস তো?’
কাকা বলল, ‘বেড়াল। বেড়াল। লেপার্ড চিনব না? আর ওই এলাকায় লেপার্ড নেই। সব আমরা খেদিয়ে দিয়েছি।’
‘আহা, চলে আসতেও তো পারে।’
‘না বাবা, লেপার্ড আসবে না। সারাক্ষণ ওখানে মানুষ ঘোরাফেরা করছে। লেপার্ড কখনো আসে না কি? কাল সকালে গিয়ে দেখতে হবে বেড়ালটা ওখানে ছানাপোনা দিয়েছে কি না! দিলে তাড়াতে হবে। এমন আচমকা লাফিয়ে এল, হাতটা সরানোর সুযোগ পেলাম না। উফ! খুব ব্যথা করছে।’
বলেছিল বটে, সকালে গিয়ে দেখবে কিন্তু রাতটুকুও কাটাতে পারল না প্রবেশের কাকা। তার আগেই বীভৎস এক কাণ্ড হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে শুরু করল সে। প্রচণ্ড খিঁচুনি শুরু হল। সে এমন খিঁচুনি যে হাত, পা, মুখ সব বেঁকে যেতে লাগল। কান আর নাক দিয়ে রক্ত গড়াতে শুরু করল। প্রবেশের বাবা বললেন, ‘এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। গাড়ি ডাকো।’
গ্রামে একটাই গাড়ি। গ্রামের মুখিয়া কিরণ ছেত্রীর। প্রবেশ দৌড়োল গাড়ি ডাকতে। কিন্তু গাড়ি আসতে আসতেই সব শেষ। সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ল। স্তম্ভিত হয়ে গেল সৌগত আর তপনও। বেড়াতে এসে যে এমন ভয়ানক একটা কাণ্ড হবে কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি। শুধু ভুরু কুঁচকে জীবেশ ছেত্রীর মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে রইল নীরেন। বাবার মৃত্যুশোক তাকে এমন অভিভূত করে রেখেছে যে অন্য কোনও মৃত্যু তাকে আর উদ্বেল করে না। সে শুধু ভাবতে লাগল, বেড়ালের কামড়ে এ মৃত্যু হতে পারে না। শরীরে তীব্র বিষক্রিয়া হলে তবেই এমন উপসর্গ দেখা দেয়। তবে যেমন— তেমন বিষ নয়, হেমোটক্সিন। যে বিষ কামড়ের সময় ঢেলে দেয় বোড়া জাতীয় সাপেরা।
গ্রামের ছেলে নীরেন। নানা রকমের সাপ এবং তাদের কামড় সম্পর্কে সে অবহিত। তার মনে হল, বেড়াল কামড়ানোর আগে বা পরে কোনও এক সময় প্রবেশের কাকাকে কোনও বোড়া জাতীয় সাপ কামড়েছিল। বেড়াল কামড়ানোর অভিঘাতে সেটা সে বুঝতে পারেনি। অথবা যে বেড়ালটা তাকে কামড়েছে সেটা সাপের কামড় খেয়েছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে তো বিষের অভিঘাত এত তীব্র হওয়ার কথা নয়! সে তার সন্দেহের কথা বলল প্রবেশের বাবাকে। আশপাশের কয়েক জন গ্রামবাসীও জমে গেছিল। সকলেই নীরেনের কথায় সায় দিল। বলল, ‘লক্ষণ দেখে তো সাপের কামড়ই মনে হচ্ছে। কিন্তু এই শীতে সাপ আসবে কোথা থেকে?’
সেটাও তো একটা বড়ো প্রশ্ন। এটা তো সাপেদের শীতঘুমের সময়। তা হলে? জীবেশের সারা দেহ তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। কিন্তু কোথাও কোনও সাপের কামড়ের চিহ্ন পাওয়া গেল না! অদ্ভুত এক রহস্য হয়ে রইল প্রবেশের কাকার মৃত্যুটা।
* * *
সৎকার হতে হতে পরের দিন দুপুর হয়ে গেল। তপন বলল, ‘চল, কালকের ট্রেনেই আমরা পালাই। এখানে থাকতে ভালো লাগছে না মোটে।’
সৌগতও সায় দিল তার কথায়, ‘সেই ভালো। কামড়াল বেড়াল অথচ শরীরে ঢুকল সাপের বিষ! আমার না কেমন একটা ভয়-ভয় করছে। কাল সকালেই বেরিয়ে পড়ি চল।’
নীরেন বলল, ‘সে হয় না। সৎকারে থাকলাম যখন শ্রাদ্ধ অবধি থাকতে হবে।’
তপন বলল, ‘ওরে বাবা! ছেত্রী তো হিন্দু, তেরো দিনের ব্যাপার। অত দিন থাকতে হবে!’
নীরেন বলল, ‘না, অপঘাতে মৃত্যুর তিন দিনে শ্রাদ্ধ। তবে এদের অন্য কোনও নিয়ম আছে কি না জানতে হবে।’
জানা গেল, এদের নিয়ম একটু আলাদা। তিন দিন নয়, কাজ হবে সাত দিনে। সৌগত বলল, ‘নীরেন ঠিকই বলছে। এখন প্রবেশকে ছেড়ে চলে যাওয়াটা ভালো দেখায় না। একটা সপ্তাহ চেপেচুপে কাটিয়ে দিলেই হবে। তবে হ্যাঁ, আমি বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছি না।’
নীরেন বলল, ‘অত ভয় করে কী বাঁচা যায়? তোরা ঘরে থাকলে থাক। এসেছি যখন আমি আশপাশটা ঘুরে দেখব।’
দুপুর গড়াতে নীরেন প্রবেশকে গিয়ে বলল, ‘ভাই, আমি একটু ঘুরে আসছি। ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছে না।’
প্রবেশ বলল, ‘সত্যিই তো, কেমন বিপদে পড়লে বলো দেখি। ঠিক আছে তুমি ঘুরে এসো। তবে একা যেয়ো না। আমার বন্ধু ভূপেনকে ডেকে দিচ্ছি। ওর সঙ্গে যাও। আমার তো এখন বেরোনো চলবে না, না হলে…’
কথা কেটে নীরেন বলল, ‘কাউকে লাগবে না ভাই। আমি এই আশপাশটা দেখেই চলে আসব।’
প্রবেশ শুনল না। ভূপেন বলে ছেলেটিকে ডেকে রীতিমতো জোর করেই গছিয়ে দিল নীরেনের সঙ্গে। ছেলেটিকে আগের দিন সৎকারের সময়ও দেখেছে নীরেন। চুপ করে এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
ভূপেন কম কথা বলে কিন্তু কথাবার্তায় বুদ্ধিমত্তার ছাপ স্পষ্ট। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীরেনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ভূপেন বলছিল, ওর পুরো নাম ভূপেন মাইকেল তামাং। দার্জিলিংয়ের সেন্ট জোসেফ কলেজে পড়ে। ওরা কনভারটেড খ্রিস্টান। ওদের পূর্বপুরুষ বৌদ্ধ ছিল। ১৮৬০ সালের দিকে যখন লেবংয়ে চা বাগান তৈরি হল তখনই বিহার, ছোটোনাগপুর ইত্যাদি নানা জায়গা থেকে প্রচুর কুলি ধরে আনা হল। মূলতঃ তাদেরই ধর্মান্তরিত করার জন্য তৈরি হল চার্চ। সে সময় পাহাড়ের কিছু মানুষও ধর্মান্তরিত হয়েছিল। শুনতে শুনতে অবাক হয়ে নীরেন বলল, ‘এখানে গির্জাও আছে!’
ভূপেন বলল, ‘দেখবে?’
‘হ্যাঁ।’
রুংডুং নদীর ধার দিয়ে মিনিট কুড়ি হাঁটার পরে ওরা এসে হাজির হল একটা ছোটোমতো টিলার সামনে। টিলার মাটি কেটে বোল্ডার ফেলে ফেলে ধাপ তৈরি করা হয়েছে। গোটা পঞ্চাশেক ধাপ ওঠার পরেই পাইন গাছে ঢাকা সমতল জমি। তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট গির্জাটা। ইমারতটার বয়স হয়েছে বোঝা যায়। রং জ্বলা দেওয়ালে শ্যাওলার বাসা। গেটে তালা দেওয়া দেখে অবাক হয়ে গেল নীরেন। বলল, ‘তালা কেন? এটা বুঝি বন্ধ?’
এক ঝলকের জন্য যেন কঠিন হয়ে উঠল ভূপেনের মুখটা। পরক্ষণেই সেই ভাবটা চাপা দিয়ে ভূপেন বলল, ‘বন্ধ ছিল না। তবে এ বার বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘কেন?’
‘চা বাগানে আর আগের মতো রমরমা নেই। ব্যাবসা একটু একটু করে কমছে। দুটো চা বাগান তো ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। কুলিরা কাজের খোঁজে অন্য জায়গায় চলে গেছে। মেইনলি ওই দুটো বাগানের কুলিরাই এই চার্চে আসত। ওরা চলে যেতে চার্চে লোক আসা একদম কমে গেছিল। আমরা যারা লেবংয়ের কনভারটেড খ্রিস্টান তারাই আসা-যাওয়া করতাম, কিন্তু সে আর ক’জন! তবে চার্চটাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ফাদার ক্যারল। ফাদার আর নেই, তাই চার্চটাও এ বার বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘নেই মানে? উনি কি চলে গেছেন?’
‘না। সুইসাইড করেছেন।’
ভূপেনের কথাটা শুনে চমকে উঠল নীরেন, ‘সে কী! কেন?’
আবার সেই কঠিন ভাবটা ফিরে এল ভূপেনের মুখে। থেমে থেমে সে বলল, ‘লেবংয়ের কিছু লোক ওঁকে সুইসাইড করতে বাধ্য করেছে।’
ভূপেনের হাত ধরে নীরেন বলল, ‘আমাকে বলা যাবে ব্যাপারটা কী? আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে।’
ভূপেন বলল, ‘চলো। ভেতরে গিয়ে বসি। বলছি।’
পাঁচিল টপকে দু’জনে চলে এল গির্জার ভেতরটায়। গেট থেকে গির্জা অবধি মোরাম বিছানো রাস্তা। দু’দিকে ফুলের বাগান। বাগানটা দেখলে বোঝা যায় কিছু দিন আগে অবধিও গাছগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা হত। এখন আর তাদের আদরযত্ন করার কেউ নেই। বড়ো বড়ো গাছে ছায়াচ্ছন্ন হয়ে আছে জায়গাটা। গির্জার বারান্দার ওপরে এসে বসল দু’জনে। নীরেনের ঠান্ডা লাগছিল। র্যাপারটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল সে। ভূপেন বলতে শুরু করল, ‘বাবার কাছে শুনেছি, তিরিশ বছর আগে ১৯৩২-৩৩ সাল নাগাদ ফাদার চার্লস ক্যারল লেবংয়ে আসেন। আজকে লেবংয়ের যেটুকু উন্নতি দেখছ সেটা ওই ফাদার ক্যারলের জন্যই। লেবংয়ের ছেলে-মেয়েরা যে আজ দার্জিলিং বা কলকাতার কলেজে পড়তে যেতে পারছে তার পেছনেও ফাদার ক্যারল। চলে যাওয়ার আগে অবধি রোজ সকালে ফাদার এখানকার ছেলে-মেয়েদের বিনে পয়সায় পড়িয়েছেন। আমি আর প্রবেশও ফাদারের কাছে পড়েছি। ফাদার খুব ভালোবাসতেন আমাদের দুই বন্ধুকে। নিজে হাতে চা বানিয়ে খাওয়াতেন।
‘ফাদার খুব জ্ঞানী মানুষ ছিলেন জানো তো। ওঁর কাছেই শুনেছি, পরে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিলেও ফাদারের জন্ম কিন্তু ফ্রান্সের এক ছোট্ট গ্রামে। আল্পস পর্বতের উপত্যকায় ওঁদের গ্রাম। অনেকটা আমাদের লেবংয়ের মতো। উনি বলতেন, লেবংয়ের সঙ্গে নিজের জন্মভূমির মিল খুঁজে পান। তাই হয়তো এত ভালোবেসে ফেলেছিলেন আমাদের গ্রামটাকে। কিন্তু আমরা ওঁর ভালোবাসার দাম দিতে পারলাম না।
‘গন্ডগোলের সূত্রপাত হয় বছর পাঁচেক আগে। আমাদের গ্রামের মুখিয়া কিরণ ছেত্রী আর প্রবেশের কাকা কলকাতার এক বিজনেসম্যানের সঙ্গে এখানে একটা হোটেল বানানোর প্ল্যান করে। সরকার থেকে তিন একর জমি লিজ নেবে ঠিক করে ওরা। সেইমতো দরখাস্তও করে। কিন্তু ফাদার জানতে পারেন, জমিটা ওরা এমন জায়গায় নিতে চাইছে যেখানে হোটেল বানাতে গেলে কয়েক হাজার গাছ কাটা পড়বে। ফাদার ওদের বলেন, এই জায়গাটার বদলে বন্ধ চা বাগানের কিছুটা জমি নিতে। কিন্তু সে জমি কিনতে টাকা লাগবে, তাই ওরা রাজি হয় না। ওরা জেদ ধরে জঙ্গলের মধ্যেই হোটেল বানাবে। ফাদার তখন গভর্নমেন্টকে চিঠি লেখেন যে জঙ্গলের মধ্যে হোটেল হলে লেবংয়ের বায়ো ডাইভারসিটি নষ্ট হবে। হোটেল তৈরির কাজ তখনকার মতো বন্ধ যায়। কিন্তু তখন থেকেই কিরণ ছেত্রী, জীবেশ ছেত্রী আর ওদের সাঙ্গোপাঙ্গরা ফাদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ওরা গ্রামের লোকজনের কানে বিষ ঢালতে থাকে যে ফাদার এলাকার উন্নয়ন চান না। হোটেল হলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। হোটেল হতে না দিয়ে ফাদার প্রকারান্তরে গ্রামের মানুষের পেটে লাথি মারছেন ইত্যাদি। ফাদারের সঙ্গে গ্রামের মানুষের দূরত্ব তৈরি হয়। ফাদার দুঃখ পেয়েছিলেন কিন্তু কিছু বলেননি। উনি শুধু বলতেন, আমি যা করছি লেবংয়ের মঙ্গলের জন্য করছি। তা তুমিই বলো, ফাদার তো আর হোটেল বানাতে বারণ করেননি। শুধু অন্য জায়গায় বানাতে বলেছিলেন।
‘যাই হোক, এর মধ্যে লাস্ট ইয়ার যেটা হয় ওরা ঘুষস দিয়ে আবার পারমিট জোগাড় করে ফেলে। তখন ফাদার একেবারে রুখে দাঁড়ান। বলেন, জঙ্গল কাটতে গেলে আগে আমাকে মারতে হবে। সেই নিয়ে বিরাট গন্ডগোল হয়। এই জীবেশ আর কিরণ তখন ফাদারকে থ্রেট দেয়, লেবং থেকে তাড়িয়ে দেবে। ফাদার ওদের কথায় পাত্তা দেননি। ওটাই ভুল হয়েছিল।
এরই তিন-চার মাস পরে কিরণ ছেত্রীর বাড়িতে বড়ো চুরি হয় আর কিরণ থানায় গিয়ে ফাদারের নামে ডায়েরি করে। চার্চের পেছন দিকে মাটির তলা থেকে চুরির মাল উদ্ধার হয়। পুলিশ ফাদারকে ধরে নিয়ে যায়। ফাদারের ছ’মাসের জেল হয়। আশা করি বুঝতে পারছ পুরোটাই ষড়যন্ত্র?
‘জেল থেকে বেরিয়ে চার্চে ফিরতে গেলে কিরণরা ফাদারকে ঘাড়ধাক্কা দেয়। বলে, কোনও চোরকে এখানে থাকতে দেবে না। ফাদার অনুরোধ করেন, অন্তত একদিনের জন্য ওঁকে চার্চে থাকতে দেওয়া হোক। ওঁর কিছু জিনিসপত্র আছে সেগুলো নিয়ে উনি বরাবরের মতো লেবং ছেড়ে চলে যাবেন। শেষমেশ ওরা রাজি হয়।
‘ফাদার এই অপমানটা নিতে পারেননি। চার্চের ভেতরেই সুইসাইড করেন। আসলে লেবংকে ভালোবাসতেন তো। বেঁচে থাকলে তো ওরা থাকতে দিত না, তাই মরে গিয়ে ফাদার রয়ে গেলেন।’
ভূপেন বলা শেষ করল আর তখনই শনশন করে হাওয়া বয়ে এল দূর পাহাড়ের দিক থেকে। নেমে এল অঝোর বৃষ্টি। যেন ফাদার চার্লস ক্যারলের অপমানে কান্নায় ভেঙে পড়ল লেবং উপত্যকা।
বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ওরা ঢুকে এল গির্জার ভেতরে। নীরেন দেখল, গির্জাটা খুবই সাদামাটা। লম্বা হলঘরের এক প্রান্তে কাঠের প্ল্যাটফর্ম যাকে বলে ‘পুলপিট’, তার ওপরে প্রভু যিশুর মূর্তি। সামনে দুটো মোমদানি। প্ল্যাটফর্ম যেখানে শেষ হয়েছে তার থেকে ফুট দশেক দূরত্ব রেখে বসার জায়গা। সারি দিয়ে সাজানো কিছু কাঠের টেবিল আর চেয়ার। সবকিছুর ওপরেই ধুলো পড়েছে। জুতো খুলে কাঠের প্ল্যাটফর্মে উঠে নীরেন যিশুর মূর্তিকে প্রণাম করল। ভূপেন বলল, ‘ফাদার চলে যাওয়ার পরে এই প্রথম বোধ হয় আমরাই ভেতরে ঢুকলাম।’
নেমে এসে নীরেন বলল, ‘ফাদার কি এই ঘরেই আত্মহত্যা করেছিলেন?’
ভূপেন বলল, ‘না। গির্জার পেছনে একটা ঘরে ফাদার থাকতেন। সেই ঘরে। কিরণ ছেত্রীরা তো ফাদারকে একদিন থাকার অনুমতি দিয়েছিল। পরের দিন ওরাই ফাদারকে বার করতে এসে দেখেছিল ফাদার গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলছেন। সুইসাইড নোটে ফাদার লিখে গিয়েছিলেন, ‘ঈশ্বর তোমাদের চৈতন্য দিন। ভালো থেকো লেবং…’
‘আমাকে নিয়ে যাবে ঘরটায়?’
‘কেন যেতে চাও সেখানে?’
‘যে মানুষ জঙ্গলের জন্য লড়াই করেছেন তিনি কোথায় থাকতেন দেখতে ইচ্ছে করছে। আমিও জঙ্গল ভালোবাসি।’
বৃষ্টি থামতে ভূপেন নীরেনকে নিয়ে এল ফাদারের ঘরের সামনে। ছোট্ট কাঠের ঘর। দরজাটা ভেজানো। সেই দরজা ঠেলে দু’জনে ঢুকে পড়ল ঘরে। এমনিতেই বিকেল হয়েছে। তার ওপরে আকাশে মেঘ। যেটুকু আলো আছে সেটুকু আর গাছের শামিয়ানা ভেদ করে ঘরের ভেতর অবধি পৌঁছোচ্ছে না। বেশ অন্ধকার ঘরের ভেতরটা। তার মধ্যেও নীরেন দেখল, ঘরে একটা মাত্র তক্তপোশ আর সারি সারি বইয়ের আলমারি ছাড়া আর কিছু নেই। তবে আলমারিগুলো ফাঁকা। নীরেন বলল, ‘বইগুলো কোথায় গেল?’
ভূপেন বলল, ‘জেল হওয়ার পরে ফাদার আমাকে আর প্রবেশকে বইগুলো নিয়ে যেতে বলেছিলেন। আমরা ভাগাভাগি করে নিয়ে গেছিলাম। আর তো ফেরত দেওয়া হল না। অবশ্য এক দিক থেকে ভালোই হল। ফাদার বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। ফাদারের ভালোবাসার জিনিস আমার কাছে রয়ে গেল।’
বলতে বলতে ভূপেনের চোখ চিকচিক করে উঠল। অন্ধকারেও সেটা দেখতে পেল নীরেন। বলল, ‘জঙ্গল কেটে হোটেল হচ্ছে বলে তোমার মন খারাপ তাই না?
মাথা নাড়ল ভূপেন। নীরেন বলল, ‘কিন্তু তোমার বন্ধু প্রবেশ তো চায় হোটেল হোক। ওর কথা শুনে তাই তো মনে হল।’
‘সে কেউ যদি গদ্দারি করে আমার কী করার আছে?’
‘গদ্দারি?’
‘তা নয়তো কী? ফাদার যত দিন বেঁচে ছিলেন প্রবেশও বলত জঙ্গল কাটা যাবে না। এই নিয়ে ওর কাকার সঙ্গে ওর ঝামেলাও হয়েছিল। কিন্তু ফাদার চলে যেতেই ভোল পালটে ফেলল। নেহাত ছোটোবেলার বন্ধু। নয়তো ওর সঙ্গে আমি রিলেশন রাখতাম না। তবে যতই যাই করুক, এ জঙ্গল ওরা কাটতে পারবে না। বেঁচে থাকতে আটকাতে পারেননি তো কী হয়েছে, মরে গিয়ে ফাদার ঠিক আটকে দেবেন।’
ভূপেনের শেষ কথাটায় চমকে উঠল নীরেন, ‘মানে?’
সেই কনকনে ঠান্ডায়, অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে ভূপেন এমন একটা কথা বলল যেটা শুনে নীরেনের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। ভূপেন বলল, ‘কামড়াল বেড়াল অথচ মানুষটা মরল সাপের বিষে, এটা কি কোনও সাধারণ ঘটনা বলে মনে হয়? আর ঘটনাটা ঠিক কখন ঘটল? গাছ কাটা শুরু হওয়ার দু’-তিন দিন আগে? মরল কে? জীবেশ ছেত্রী। যে কি না ফাদারের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমি তোমাকে বলছি, ফাদারের প্রেতাত্মা জেগে উঠেছে। এ বার প্রতিশোধের পালা। যারা যারা ওঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী এক এক করে সবাই মরবে। তুমি মিলিয়ে নিয়ো আমার কথা।’
নীরেন দেখল, অন্ধকারে ভূপেনের চোখ দুটো যেন জ্বলছে।
