লাপিস লাজুলি – ৬
॥ ছয় ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
সরকার যখন কোনও কিছুর দায়িত্ব নেয় তখন ব্যবস্থাপনা ভালো হতে বাধ্য। সেটা সঞ্জয় আর অপালা ওরফে রহমত আলি আর খাদিজা বেগম দিব্যি টের পাচ্ছিল। ট্রাভেল এজেন্সির পক্ষ থেকে দু’জন ওদের সঙ্গেই যাচ্ছে। সমীরণ বসাকের লোকেরা বলে দিয়েছে কি না কে জানে, এরা ওদের দু’জনকে যেন একটু বেশিই খাতির করছে।
প্লেন উড়াল দিয়েছে তাও চল্লিশ মিনিট হয়ে গেল। আকাশে ভাসার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই রাতের খাবার দিয়ে দিয়েছিলেন বিমান সেবিকারা। দিল্লি থেকে বাগদাদ প্রায় সাত ঘণ্টার ফ্লাইট। কম্বলটা গায়ের ওপর চাপিয়ে বাবু হয়ে বসল অপালা। বলল, ‘সঞ্জয়, আমি একটু ঘুমোই।’
সকাল থেকে দৌড়োদৌড়ি চলছে। তার ওপরে পেটে খাবার পড়েছে। ঘুম সঞ্জয়েরও পাচ্ছে কিন্তু সঞ্জয় জানে শত চেষ্টাতেও তার ঘুম আসবে না। বহু বার চেষ্টা করে দেখেছে সে কিন্তু চলন্ত কিছুতে তার ঘুম আসে না। সিনেমা দেখা যেতে পারে। প্রত্যেক যাত্রীকে একটা করে ট্যাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিনেমা দেখতেও ইচ্ছে করছে না। মনটা ভার হয়ে রয়েছে। পল্লব এমনিতেই একটু খ্যাপা। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আবেগপ্রবণ। স্যার ওকে যেতে দিলেই পারতেন। ছেলেটা এখন কী করছে কে জানে! বড়ো অপরাধবোধ হল সঞ্জয়ের। সে ভাবে দেখতে গেলে সেই তো এই সব কিছুর জন্য দায়ী। অবশ্য লোকনাথ চক্রবর্তী যে তার মামা এতেও তো তার কোনও হাত নেই। নিয়তি অদ্ভুত এক খেলা খেলছে তাদের সবার সঙ্গে। তবে ভেতরে-ভেতরে চাপা একটা উত্তেজনাও হচ্ছে। এমন একটা বস্তুর সন্ধানে তারা যাচ্ছে যেটা পাঁচ হাজার বছর ধরে অধরা। ভাবলে মনে হয় আলেয়ার পেছনে দৌড়। কিন্তু সঞ্জয়ের মন বলছে দেবী ইনান্নার দণ্ড তারা খুঁজে পাবে। বিজ্ঞানের ছাত্র হলে কী হবে ছোটোবেলা থেকেই অলৌকিক ব্যাপার-স্যাপার এমন ভাবে তার জীবনে জড়িয়ে আছে, সে বিশ্বাস করে, যখন যেটা ঘটার সেটা ঘটবেই। আর কোনও ঘটনা ঘটার আগে পারিপার্শ্বিক আবহ সেটার ইঙ্গিত দিতে শুরু করে। লোকনাথের ফিরে আসা, তিতাসের অন্তর্ধান, তাদের বাগদাদ যাত্রা সবটা মিলিয়েই সাফল্যের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
‘কী হল? ঘুমোওনি?’
অপালার প্রশ্নে সঞ্জয়ের চিন্তার জালটা ছিঁড়ে গেল। বলল, ‘নাহ। তুমি ঘুমোলে না কেন?’
‘ঘুম আসছে না।’
‘আমারও।’
‘এখনও পাঁচ ঘণ্টার ওপর ট্রাভেল। ঘুমোতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তিতাসের কথা ছেড়েই দাও। পল্লব আর মিতুলের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। এমন হুড়োহুড়ি হল, আসার আগে মিতুলের সঙ্গে দেখাটুকুও করা হল না।’
‘তিতাস যে অমিয়র সঙ্গে ইচ্ছাকৃত কিছু করেনি সেটা মিতুলকে বলা হয়েছে? ও জানে তিতাস পজেসড ছিল?’
‘জানে। দাদু ওর সঙ্গে দেখা করেছিল। তিতাস যে মিসিং সেটাও বলেছে।’
‘ও কী বলেছে? স্যার কিছু বলেছেন তোমায়?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপালা বলল, ‘তিতাসের হারিয়ে যাওয়ার কথা শুনে ও কাঁদছিল। দাদুকে বলেছে, ওকে ফিরিয়ে এনে দাও। তিতাসের ওপরে ওর আর কোনও রাগ নেই।’
‘আর অমিয়র ওপরে?’
সঞ্জয়ের চোখে চোখ রেখে তাকাল অপালা। বলল, ‘তুমি মিতুলের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখো তো। অমিয় তো পজেসড ছিল না।’
অমিয়র জন্য বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠল সঞ্জয়ের। অমিয়কে সে আজ থেকে চেনে না। তিতাস যদি তখন ভূতগ্রস্ত না হতো অমিয় নিশ্চয়ই সামলে নিতে পারত নিজেকে। কিন্তু এ কথা কি কেউ কোনও দিন বুঝবে? মিতুল কি কোনও দিন ক্ষমা করবে তাকে? আর কোনও দিন কি ঠিক হবে অমিয় আর মিতুলের সম্পর্ক? সে বলল, ‘ছাড়ো। খুব ডিস্টার্বিং এই ব্যাপারটা। তুমি বরং একটা কাজ করো অপালা।’
‘কী?’
‘দেবী ইনান্নার ব্যাপারে আমাকে একটু বলো তো। তাঁকে নিয়ে এত কাণ্ড কিন্তু তাঁর ব্যাপারে তো আমি বিশেষ কিছুই জানি না। ওই যেটুকু শুনেছি স্যারের মুখ থেকে। আমারও জানা হবে। তোমারও মাইন্ড ডাইভার্ট হবে।’
‘এইটা একটা কাজের কথা বলেছ,’ নড়েচড়ে বসল অপালা, ‘ইউ শুভ নো অ্যাবাউট হার। আমার মতে দ্য মোস্ট মিস্টিরিয়াস অ্যান্ড ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার ইন মেসোপটেমিয়ান মাইথোলজি।’
‘বলো, শুনি,’ কম্বলটা ভালো করে গায়ে টেনে জুত করে বসল সঞ্জয়। অপালা বলতে শুরু করল, ‘দেখো আমি জানি শুধু ইনফরমেশন ইজ বোরিং। আর আমি তোমাকে অ্যানসিয়েন্ট হিস্ট্রি পড়াতেও বসিনি। ও সব তুমি নিজেই পড়ে নিতে পারবে। আমি তোমাকে বই সাজেস্ট করব। আমি এখন ছোটো করে ইনান্নার মিথগুলো তোমাকে বলব। তবে তার আগে বলো মেসোপটেমিয়া ব্যাপারটা নিয়ে তোমার কোনও ধারণা আছে?’
‘ওই ছোটোবেলায় ভূগোলে পড়েছি, টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় এই সুমেরীয় সিভিলাইজেশন গড়ে উঠেছিল খ্রিস্টের জন্মের আনুমানিক চার-সাড়ে হাজার বছর আগে। খুব উন্নত সিভিলাইজেশন। আমাদের সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক। ব্যস।’
‘বুঝেছি। দেখো এটা আমাদের বেশির ভাগের মিসকনসেপশন যে সুমের আর মেসোপটেমিয়া এক। তা কিন্তু নয়। সুমেরীয়রা একটা জনগোষ্ঠী যারা মেসোপটেমিয়ায় নিজেদের সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু এ ছাড়াও মেসোপটেমিয়ায় আরও নানা জনগোষ্ঠীর বাস ছিল। যেমন ধরো আক্কাদীয়, আসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, ক্যাসাইট, অসুর, এলমাইট এইসব। তবে এদের মধ্যে শিল্প, সংস্কৃতির বিচারে অগ্রগণ্য ওই সুমেরীয়রাই। তাই তাদের কথাটাই বেশি উঠে আসে। মজার ব্যাপার কি জানো সুমেরীয়রা কিন্তু মেসোপটেমিয়ার আদি বাসিন্দা নয়। কোনও কোনও ঐতিহাসিক মনে করেন এরা এসেছিল ভারত থেকে।’
‘কী? ভারত থেকে?’
‘হ্যাঁ। তবে অন্য মতও আছে। যাই হোক, আসল কথায় আসি। ইনান্নাকে বুঝতে গেলে তোমাকে আগে সুমেরদের দেবতাদের সিস্টেমটা বুঝতে হবে। তখন তো নগর রাষ্ট্র ছিল আর প্রত্যেক নগরের আলাদা আলাদা অধিষ্ঠাত্রী দেবতা ছিল।’
‘মানে কলকাতা যদি রাষ্ট্র হয় মেয়র হবেন কলকাতার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা?’
‘রাইট। এই তো তুমি অনেকটা বুঝে ফেলেছ। বাচ্চা কা দিমাগ তো বহোত সাফ হ্যায়,’ আলতো করে সঞ্জয়ের গাল টিপে দিল অপালা আর লজ্জায়
লাল হয়ে গেল সঞ্জয়।
এমনিতে অপালা খুবই রাশভারী ধরনের মেয়ে। প্রখর ব্যক্তিত্ব। কথা কম বলে কিন্তু মাঝে মাঝে আচমকাই তার মধ্যে থেকে একটি চপল কিশোরী বেরিয়ে আসে আর সঞ্জয়কে একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। সঞ্জয়ের অবস্থা দেখে অপালা বলল, ‘হ্যাঁ গো, তুমি কি আমার ভাসুর? সারাক্ষণ এত লজ্জা পাও কেন?’
এটা কোনও প্রশ্ন হল! আরও কাহিল হয়ে পড়ল সঞ্জয়। আমতা-আমতা করে বলল, ‘না মানে লজ্জা কেন পাব? অনেক লোকজন না আশপাশে। তাই একটু…
‘কেন ফালতু কথা বলছ? সবাই তো ঘুমোচ্ছে। আর যদিও-বা কেউ দেখে আমি আমার প্রেমিকের গাল টিপেছি, তাতে কার কী?’
রহস্যময়ী অপালা। মেয়েবন্ধু চিরকালই বড়ো কম সঞ্জয়ের। অন্তর্মুখী স্বভাবের ছেলে সে। কোনও দিনই মন খুলে মেয়েদের সঙ্গে মিশতে পারেনি। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালীন বন্ধুত্ব হয়েছিল শুধু তিতাসের সঙ্গেই। তিতাস তার সহজ ব্যবহারে অনায়াসেই সঞ্জয়ের মনে বন্ধুত্বের পাকা জায়গা করে নিয়েছিল। বাকিরা তো ছিল শুধুমাত্র সহপাঠিনী। তার পরে তো সুপ্রতিমের মৃত্যু। নিজেকে এতটাই গুটিয়ে নিয়েছিল যে দিল্লিতে পড়ার সময় মেয়ে তো দূরের কথা একটিও ছেলে বন্ধু হয়নি। ছিল শুধু পল্লব। তাই অপালার সঙ্গে প্রেম হওয়াটাকে আজও ঠিক হজম করতে পারে না সঞ্জয়। ঝকঝকে সুন্দরী অপালা। গৌরী, দীর্ঘাঙ্গী, ঈর্ষণীয় অঙ্গসৌষ্ঠবের অধিকারিণী। সে তুলনায় সঞ্জয় তো নিতান্তই সাদামাটা। ইতিমধ্যেই তার সামনের দিকের চুল পাতলা হতে শুরু করেছে। অপালার চাপল্যকে সে একটু ভয়ই পায়। হারিয়ে ফেলার ভয়। গলা ঝেড়ে সে বলল, ‘আহ! তার পরে বলো না। নগর রাষ্ট্র নিয়ে কথা হচ্ছিল।’
‘হুম। বলছি। তার আগে অন্য একটা কথা বলি?’
‘না বললে কি তুমি শুনবে? বলো।’
ডাগর চোখ দু’টি মেলে সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে অপালা বলল, ‘কথায় বলে, লজ্জা নারীর ভূষণ। কিন্তু তোমাকে ভালোবাসার পরে আমি বুঝেছি, আদরের সময় লজ্জা পেলে ছেলেদেরও ভারি সুন্দর দেখায়।’
প্লেনের ভেতরে হালকা একটা নীল আলো। বিনবিন করে এসি চলছে। হঠাৎ করেই গায়ে কাঁটা দিল সঞ্জয়ের। সে শক্ত করে চেপে ধরল অপালার হাত। একটু সময় দিল অপালা। তার পরে বলল, ‘হ্যাঁ যেখানে ছিলাম। এই প্রাচীন নগর রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দেবতা ছিল। যেমন উরুকের দেবতা আনু, এরিদুর এনকি, নিপ্পুরের এনলিল। তবে দেবতাদের প্রধান ছিলেন আনু। ইনি অনেকটা আমাদের ব্রহ্মার মতো। আদি দেব। এঁরই মেয়ে হলেন ইনান্না। উরুক শহরে আনুর পাশাপাশি ইনান্নার মন্দিরও ছিল।’
‘এখন এই উরুকের কী অবস্থা?’
‘উরুকের বর্তমান নাম ওয়ারকা। আর্কিওলজিক্যাল সাইট। বাগদাদ থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা মতো সময় লাগে।’
‘আচ্ছা। তার পরে বলো।’
‘হ্যাঁ, তো আনুর মেয়ে হলেন ইনান্না। আক্কাদীয়রা এই দেবীকে ইশতার নামে পুজো করত। ইনান্না হলেন প্রেম, উর্বরতা আর যৌনতার দেবী। খুব জাহাঁবাজ মেয়েমানুষ। নিজের শর্তে চলেন। কাউকে তেমন পাত্তা-টাত্তা দেন না। সূর্যদেব উতু তাঁর যমজ ভাই। তা এই উতু ইনান্নার প্রেমে পড়ে গেলেন।’
‘ভাই-বোনের প্রেমে পড়ে গেল,’ আঁতকে উঠল সঞ্জয়।
‘জাজ করছ? ইনসেস্টে তোমার আপত্তি আছে?
সঞ্জয় পাতি মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে। প্রেম কোনও বয়স, জাতি, ধর্ম, সম্পর্কের বেড়াজাল মানে না এসব সে বইতে পড়েছে বটে। কিছুটা মানেও। তবে তার সংস্কার এখনও কিছু বিষয়ে পিছুটান দেয়। অপালার মতো সে সত্যিকারের উদারমনস্ক নয়। কিন্তু এখন এ নিয়ে কথা বলতে গেলে আলোচনাটা অন্য দিকে ঘুরে যাবে। তাই নেতিবাচক মাথা নাড়ল।
অপালা কনভিন্সড হল না। অপালা চট করে কনভিন্সড হয়ও না। বলল, ‘আমাদের যম আর যমীও কিন্তু ভাই-বোন। তাঁদের প্রেম ছিল। আচ্ছা যদি দুটো অ্যাডাল্ট মানুষ প্রেম করে তোমার সমস্যা কোথায়?’
অপালার সঙ্গে তর্কে পারা যাবে না সঞ্জয় জানে। বলল, ‘ওই দেখো আমার সমস্যা কোথায় বলেছি? আর যদি-বা থাকেও ইনান্না আর উতু তো আমার কথা শুনবেন না। ওরা তো প্রেম করেই ফেলেছেন। তাই না?’
‘না প্রেম করেননি। ইনান্না উতুকে পাত্তা দেননি।’
‘ও, আচ্ছা’, ইনান্নার বিবেচনায় মনে মনে খুশিই হল সঞ্জয়। তবে সেটা প্রকাশ না করে বলল, ‘তার পরে?’
তর্ক থেকে গল্পে নজর ঘোরাতে হবে অপালার।
নজর ঘুরল। অপালা বলল, ‘ইনান্নার অন্য দু’জন প্রেমিক ছিলেন।’
সঞ্জয় বলতে যাচ্ছিল, দু’জন? বলল না। গিলে নিয়ে বলল, ‘বাহ বেশ কালারফুল ক্যারেক্টার তো।’
ইনান্নাকে নিয়ে অপালা একটু বেশিই উচ্ছ্বসিত। বলল, ‘দাঁড়াও। সবে তো শুরু। তা দু’জন প্রেমিকের এক জনের নাম এনকিমদু। সে চাষি। আর এক জনের নাম দুমুজি। এ পশুপালক। চাষি আর পশুপালক শুনে নাক সিঁটকিও না যেন। সে যুগে এগুলো হোয়াইট কলারড জব ছিল। আর এনকিম তো পরে চাষবাসের দেবতাও হয়েছিলেন। যাই হোক, তা এই দুই প্রেমিককে নিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন ইনান্না। কাকে ছেড়ে কাকে রাখেন? উতু তো বোনকে চেনেন। বুঝলেন, বিয়ে দিয়ে এ মেয়েকে থিতু করতে হবে। নয়তো সবাইকে জ্বালিয়ে খাবে এই মেয়ে। বোনকে জিজ্ঞেস করলেন, কাকে বিয়ে করতে চাস? সাফ জবাব দিলেন ইনান্না, যে বেশি ভালোবাসবে, তাকে। ভালো কথা, কিন্তু এই বেশি ভালোবাসার বিচারটা হবে কীসের নিরিখে? উতু জানতেন, দেবী হলেও ইনান্নার দামি গিফটের প্রতি দুর্বলতা আছে। সেটাকেই হাতিয়ার করলেন। এনকিমদুকে খুব একটা পছন্দ করতেন না উতু। তার তুলনায় দুমুজি বেটার অপশন। দুমুজিকে গিয়ে বললেন ইনান্নাকে ভালো ভালো উপহার দিতে। দুমুজি তাই করতে লাগলেন। এনকিমদু বুঝতে পারছিলেন দামি উপহার দিয়ে দুমুজি ইনান্নার মন জয় করে ফেলছেন। কিন্তু পশুপালক দুমুজির তুলনায় কৃষক এনকিমদু গরিব। রোজ নিত্যনতুন দামি উপহার দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর নেই। অতএব তিনি পিছু হটলেন। দুমুজির সঙ্গে ইনান্নার বিয়ে হয়ে গেল আর এখান থেকেই নতুন গন্ডগোল শুরু হল।’
‘গন্ডগোল?’
‘ইয়েস মাই বয়। এরপর থেকেই ইনান্না হয়ে উঠবেন ডেঞ্জারাস অ্যান্ড মোর মিস্টিরিয়াস।’
‘দাঁড়াও, দাঁড়াও,’ অপালাকে থামিয়ে দিল সঞ্জয়।
‘কী হল?’
‘আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দাও। ওয়াশরুম থেকে এসে শুনছি বাকিটা। খুব জমে উঠেছে। মন দিয়ে শুনতে হবে।’
‘ওকে,’ কাঁধ ঝাঁকাল অপালা।
সিট ছেড়ে উঠে প্লেনের ল্যাভেটরির দিকে এগোল সঞ্জয়। এয়ারবাসটা বেশ বড়ো। দু’দিকের রো-তেই তিনটে করে সিট থাকা সত্ত্বেও মাঝের প্যাসেজটা বেশ চওড়া। বেশিরভাগ যাত্রীই ঘুমোচ্ছে। দু’একজন শুধু উসখুস করছে। সঞ্জয় বুঝল, এদের অবস্থাও তার মতো। চলন্ত কিছুতে ঘুমোতে পারে না। তিনটে করে সিট দেখতে দেখতে পল্লবের কথা মনে পড়ে গেল তার। পল্লব এক বার তাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘আচ্ছা ভাই, তিন নম্বরটার এত খাতির কেন বল দেখি? তিনটে ভুবন, তিনটে দেবতা, তিনটে নয়ন, তিনটে সত্যি, ম্যাকবেথের তিনটে উইচ এমনকী ট্রেনে-বাসে-গাড়িতে তিনটে করে সিট! কেসটা কী?’
পল্লবকে বলবে বলে তিন নম্বরটা নিয়ে পড়াশোনা করেছিল সঞ্জয়। কিন্তু তার পরে পরেই সুপ্রতিমের ঘটনাটা ঘটে যায়। চার থেকে ওরাও তিন হয়ে যায়। আর কখনো এ প্রসঙ্গ ওঠেনি, সঞ্জয়ও বলতে পারেনি তিনের ক্যারিশমা। একটু অন্যমনস্ক হয়েই ল্যাভেটরির সামনে এসে দাঁড়াল সে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। উলটো দিকেই আর একটা ল্যাভেটরি। সেটাও বন্ধ। ল্যাভেটরির দরজায় নক করা অভদ্রতা। অপেক্ষা করতে লাগল সঞ্জয়। নকল দাড়ি পরে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। মাঝে মাঝেই গলা আর কানের কাছটা চুলকোচ্ছে। অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎই হাসি পেয়ে গেল সঞ্জয়ের। জায়গা বিশেষে মানুষের আচরণ কত বদলে যায়। এটা যদি হাওড়া স্টেশনের সুলভ শৌচাগার হতো! ঘটনাচক্রে বার দুয়েক সঞ্জয়কে ওই শৌচাগার ব্যবহার করতে হয়েছিল। সেখানে কেউ কারও সঙ্গে ভদ্রতা করে না। এক জন ঢুকতে না ঢুকতেই লাইনে দাঁড়ানো পরের জন দরজা ধাক্কাতে শুরু করে। ভেতর থেকে ভেসে আসে কাঁচা খিস্তি। সঞ্জয় ভাবছিল, ওই লোকগুলো যদি এই প্লেনে উঠে পড়ে তা হলে কি তারা ল্যাভেটরির সামনে অপেক্ষা করবে নাকি দরজা পেটাবে? এমন সময় একটা ল্যাভেটরির দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই ছেলেটি, যে এয়ারপোর্টে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছিল। চোখাচোখি হতেই সঞ্জয় সৌজন্যের হাসি হাসল কিন্তু ছেলেটা যেন খুব চমকে গেল সঞ্জয়কে দেখে। দ্রুত পা চালাল প্যাসেজ ধরে। যেন এড়িয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু যেতে যেতে দু’বার ঘাড় ঘুরিয়ে সঞ্জয়কে দেখল। অবাক হয়ে গেল সঞ্জয়। ছেলেটা এমন অদ্ভুত ভাবে কেন দেখল তাকে? কী জানি! ভাবতে ভাবতেই ল্যাভেটরির ভেতরে ঢুকল সে আর আয়নার দিকে চোখ পড়তেই শিউরে উঠল। এতক্ষণে তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল ছেলেটার অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ। তার নকল দাড়ির একটা পাশ একটু খুলে গেছে!
ঘাবড়ে গেল সঞ্জয়। দ্রুত হাতে চেপে ঠিক করল দাড়িটা। খুব রাগ হল নিজের ওপরে। এতটুকু সাবধানতা নিতে পারল না! সেই এক জন দেখে ফেলল! এক জন দেখে ফেলা মানেই একশো জন জেনে যাওয়া। ছেলেটা যদি এয়ারপোর্টে নেমে জানিয়ে দেয় এটা সঞ্জয়ের ছদ্মবেশ! বাগদাদের পুলিশ যদি আটক করে! ভারত সরকার কি কোনও দায়িত্ব নেবে? নেবে না। সবটা মুহূর্তে শেষ হয়ে যাবে। টেনশনে বমি পেতে লাগল সঞ্জয়ের। কোনও মতে বাথরুম সেরেই সে বেরিয়ে এল। এখুনি বিষয়টা অপালাকে জানাতে হবে। না চাইতেও ছেলেটার সিটের দিকে চোখ চলে গেল সঞ্জয়ের। ছেলেটাও তার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন, সে কখন ফিরবে তারই অপেক্ষা করছে। চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল ছেলেটা। ভয়টা আরও বেশি করে জাপটে ধরতে লাগল সঞ্জয়কে। রীতিমতো পা কাঁপছে। কোনও মতে সিটে পৌঁছে সে দেখল, অপালা ঘুমিয়ে পড়েছে।
***
‘ইতিহাসের তো কোনও চেহারা হয় না। সে এক বহমান সত্য। প্রতিটি বর্তমানকে অন্তরে ধারণ করে আগামীর দিকে এগিয়ে চলে সে। তবু কোথাও কোথাও এসে ইতিহাস যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। নিজস্ব এক মূর্তি ধারণ করে। তখন তাকে চোখে দেখা যায়, কানে শোনা যায়, হাত দিয়ে ধরাও যায়।’
প্রথম বার কোনারকের সূর্য মন্দির দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছিল অপালা। তখন তার ক্লাস নাইন। কেমন একটা গা শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছিল। পাশে এসে বসেছিলেন দাদু। কাঁধে হাত রেখে এই কথাগুলো বলেছিলেন। আজ এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে পা দিয়ে আবারও সেই কথাগুলো মনে পড়ে গেল অপালার।
বাগদাদ!
খলিফা হারুন অল রশিদের বাগদাদ নগরী! আরব্য রজনীর বাগদাদ নগরী! সভ্যতার পিলসুজ বাগদাদ নগরী!
ইরাকি ড্রাইভার ট্যাক্সির দরজা খুলে বলল, ‘ওয়েলকাম টু বাগদাদ।’
ড্রাইভারকে ধন্যবাদ জানিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসল ওরা। ট্যাক্সি ছুটল মূল বাগদাদ শহরের দিকে। এতক্ষণে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সঞ্জয়।
ঘুম থেকে অপালাকে ঠেলে তুলে ঘটনাটা বলেছিল সে। একটু চুপ করে থেকে অপালা সোজা উঠে গেছিল ট্রাভেল এজেন্সির দু’জনের কাছে। কিছুক্ষণ কথা বলার পরে ফিরে এসে বলেছিল, ‘চিন্তা কোরো না। প্লেন থেকে নামার পরে ওরা আমাদের আলাদা করে আগেই এয়ারপোর্ট থেকে বার করে দেবে। বাইরে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকবে। আমরা সোজা হোটেলে চলে যাব। প্লেন থেকে নামার পরে এই ছেলেটার সঙ্গে তোমার আর দেখা হওয়ার চান্স নেই আর এখন ও প্লেনের মধ্যে কাউকে কিছু বলবে না। ওর যদি হুজ্জতি করারই হতো এতক্ষণে করে ফেলত। সো ডোন্ট ওরি। আপাতত ঘুমাও।’
অপালার মাথা অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা। সে আবারও চোখ বুজেছিল। কিন্তু বাকিটা রাস্তা সঞ্জয়ের ঘুম আসেনি। এয়ারপোর্ট থেকে বেরোনো অবধি তার মনে হচ্ছিল, কেউ তার ওপরে নজর রাখছে। এতক্ষণে একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। অবশেষে ছেলেটার চোখের আড়াল হওয়া গেছে।
জানলা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়েছিল অপালা। হঠাৎ বলল, ‘বাগদাদ নগরী কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জানো?
‘উঁহু,’ ঘাড় নাড়ল সঞ্জয়।
ঘুরে বসল অপালা। বলল, ‘এইটথ সেঞ্চুরিতে খলিফা আবু জাফর আল মনসুর বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। আর তখন থেকে আব্বাসীয় খিলাফতের পতন অবধি বাগদাদ ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজধানী।’
‘আব্বাসীয় খিলাফতের পতন! সেটা কত সাল?’
‘১২৫৮। ১৩ ফেব্রুয়ারি। মোঙ্গোল সেনাপতি হালাকু খাঁ বাগদাদ দখল করেছিল আর ধ্বংস করে দিয়েছিল। সব ছারখার করে দিয়েছিল ওরা। অধিকাংশ স্থাপত্য গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। হাতের কাছে যাদের পেয়েছিল খুন করেছিল। মেয়েদের আর বাচ্চাদেরও ছাড়েনি। মোটামুটি যা হিসেব পাওয়া যায় সব মিলিয়ে প্রায় আট লাখ মানুষ খুন করেছিল হালাকু খাঁ-র সেনারা।’
চমকে উঠল সঞ্জয়, ‘কী বলছ? আট লক্ষ? সেই সময় পৃথিবীর জনসংখ্যা কত ছিল? না মানে তোমার কোনও আন্দাজ আছে?
‘আন্দাজ কেন? আমি জানি। ৪০-৪৫ কোটি ম্যাক্সিমাম।’
সঞ্জয় হাঁ করে তাকিয়ে রইল অপালার মুখের দিকে। অপালা বলল, ‘তা হলে বুঝতে পারছ হত্যালীলার ভয়াবহতা?
মাথা নাড়ল সঞ্জয়। অপালা বলল, ‘হালাকু খাঁ-কে বলা হয় বাগদাদের কসাই। বুচার অব বাগদাদ। তবে মানুষ মারা, স্থাপত্য ধ্বংস করা এসব তো আছেই, হালাকু খাঁ সবচেয়ে বড়ো ক্ষতিটা করেছিল বায়তুল হিকমাহ ধ্বংস করে।’
‘কী হিকমাহ?’
‘বাইত আল হিকমাহ, সোজা করে বায়তুল হিকমাহ। ইংরেজি তরজমায় দ্য হাউজ অফ উইজডম। বাংলা করলে জ্ঞানগৃহ। বাগদাদের পৃথিবী বিখ্যাত লাইব্রেরি। যেখানে এসে জমা হয়েছিল সারা দুনিয়ার জ্ঞান। লাইব্রেরিটা পুড়িয়ে দিয়েছিল হালাকু খাঁ। বেশিরভাগ বই, পাণ্ডুলিপি, গবেষণাপত্র পুড়েই শেষ হয়ে গেছিল। আর যেগুলো পোড়েনি সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়েছিল টাইগ্রিস নদীতে। কী কথিত আছে জানো?’
‘কী?’
‘এত বই ফেলা হয়েছিল যে টাইগ্রিসের জল কালো হয়ে গেছিল!’ চুপ করে রইল সঞ্জয়। অপালাও চুপ করে গেল। কিছু কিছু কথার পরে নীরব থাকাই শ্রেয়।
বেশ দ্রুত গতিতেই গাড়ি চলছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা। ট্রাভেল এজেন্ট ওদের বলে দিয়েছিল, বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে মূল শহর মোটামুটি বাইশ কিলোমিটার। রাস্তা ফাঁকা থাকলে চল্লিশ মিনিট মতো লাগবে। ওরা যে হোটেলে গিয়ে উঠবে তার নাম ‘ব্যাবিলন রোটানা’। সেটা আবার মূল শহর থেকে একটু দূরে। সব মিলিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে ঘণ্টা খানেকের ড্রাইভ।
দু’জনেই চুপ করে বসেছিল। হঠাৎ চোখে পড়ল সার সার ভাঙা বাড়ি। কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার দু’পাশে। সর্বাঙ্গে বোমার আঘাত। মিসাইলের ক্ষত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সঞ্জয়। অপালা বলল, ‘কী ভাবছ?’
সঞ্জয় বলল, ‘ভাবছি, এই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বড়ো অভাগা। ইরাক, ইরান, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন কোথাও কোনও শান্তি নেই।’
‘নেই-ই তো। চর্যাপদে একটা লাইন আছে, অপণা মাঁসে হরিণা বৈরি। মানে জানো তো?’
‘হুম। হরিণের শত্রু তার নিজের মাংস।’
‘এখানেও তাই। এদের সম্পদই এদের আসল শত্রু। খনিজ তেল। এই তেল নিয়েই তো যত অশান্তির শুরু। প্রথম বিশ্বের দেশগুলো বার বার এদের ব্যবহার করেছে। কখনো বন্ধু বানিয়েছে নিজেদের স্বার্থে আবার কাজ মিটে গেলে শত্রু বলে দাগিয়ে দিতে এক মুহূর্ত সময় নেয়নি। শুধু তো হালাকু খাঁ নয় সঞ্জয়, আমেরিকাও অনেক বড়ো ক্ষতি করে দিয়েছে ইরাকের। বাগদাদের। এই এখন যেমন ইজরায়েলকে সাপোর্ট করে গাজাকে শেষ করে দিচ্ছে। সাদ্দাম হোসেন লোকটা ভালো ছিল না কিন্তু তাকে শেষ করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন করেছে আমেরিকা-ব্রিটেনের যৌথ বাহিনী। একের পর এক মিউজিয়াম ধ্বংস করে দিয়েছে। ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে সাদ্দামের বাগদাদের পতন হয়। কত মানুষ মারা গেছিল জানো? আন্দাজ?’
‘নাহ। আন্দাজ নেই।’
‘সাত থেকে আট লাখ।’
‘কী? হালাকু খাঁ-ও তো আট লাখ লোক মেরেছিল!’
‘ঠিক। জর্জ বুশ আর হালাকু খাঁ রীতিমতো পাল্লা দিয়েছিল মানুষ খুনে। আর একটা অদ্ভুত কথা শুনবে? ২০ জানুয়ারি ১২৫৮ হালাকু খাঁ-র সেনাবাহিনী বাগদাদের পশ্চিম দিক অবরোধ করে। চার দিন পরে অর্থাৎ ২৪ জানুয়ারি তারা যুদ্ধ শুরু করে। ১৩ ফেব্রুয়ারি খলিফা আল মুস্তাসিনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাগদাদের পতন হয়। সময় লেগেছিল ২১ দিন। আর ২০০৩ সালের ৯ এপ্রিল মার্কিন যৌথ বাহিনীর হাতে সাদ্দামের বাগদাদের পতন হয়। যুদ্ধ ঘোষণা থেকে পতন, সময় লেগেছিল, অপালা এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, ‘২১ দিন!’
***
লাগেজ সংগ্রহ করার পরে এয়ারপোর্টের মধ্যেই একটা জায়গায় সব জিয়ারত যাত্রীদের দাঁড় করিয়ে ট্রাভেল এজেন্ট বলল, ‘আপনাদের নিয়ে আমরা প্রথমে হোটেলে উঠব। আজকের দিনটা বিশ্রাম। আজ আপনারা বাগদাদ শহর আর আশপাশের মসজিদগুলো ঘুরে দেখতে পারেন। আগামীকাল সকালে আমরা রওনা দেব পবিত্র কারবালার উদ্দেশে। কারবালা বাগদাদের দক্ষিণ পশ্চিমে, ১০০ কিলোমিটার দূরে। যেতে আমাদের ঘণ্টা তিনেক সময় লাগবে। এয়ারপোর্টের বাইরে আমাদের বাস আছে। আপনারা আমাদের সঙ্গে আসুন আর এক এক করে বাসে উঠে পড়ুন।’
তারিকরা কী বলবে আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। ফারুক এগিয়ে গিয়ে ট্রাভেল এজেন্টকে বলল, ‘আমরা চার জন একটু আলাদা থাকতে চাই। কাল সকালে আমরা আপনাদের সঙ্গে মিট করে নেব।’
একটু থমকে এজেন্ট বলল, ‘আলাদা থাকতে চান কেন?’
এই উত্তরটাও আগে থেকে তৈরি করা ছিল। ফারুক বলল, ‘আসলে আজকের দিনটাও আমরা নষ্ট করতে চাই না। আমরা এখনই শরিফ আবদুল কাদির গিলানির দরগায় যেতে চাই। তো ফিরে নতুন করে চেক ইন করা সমস্যার হতে পারে। তাই যদি আলাদা একটা হোটেলে উঠি একটু নিজেদের মতো থাকতে পারব। আপনাদেরও বিরক্ত করার দরকার পড়বে না।’
‘আচ্ছা। সে ক্ষেত্রে কিন্তু আপনাদের হোটেল ফেয়ার আমরা বেয়ার করব না।’
‘না না তার দরকার হবে না। আমরাই পে করে দেব।’
‘ওকে ফাইন। আপনারা আসুন তা হলে। কাল দেখা হচ্ছে। বাই।’
‘বাই।’
ট্রাভেল এজেন্টকে হাত নেড়ে ওরা চার জন বেরিয়ে এল এয়ারপোর্টের বাইরে। একটা ট্যাক্সিতে উঠে বসল। ফারুক ট্যাক্সিওলাকে বলল, ‘আপনি বাগদাদের দিকে চলতে থাকুন। কোন হোটেলে উঠব আপনাকে জানাচ্ছি।’
ট্যাক্সি চলতে শুরু করল। এতক্ষণে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল তারিক। কাল রাতে ওই লোকটাকে দেখামাত্র তারিক বুঝেছিল, লোকটা আর ওর সঙ্গের মেয়েটা হয় গুপ্তচর নয় গোয়েন্দা। ছদ্মবেশে প্লেনে উঠেছে। ভয় পেয়েছিল সে। তারা চার জন যে আইসিসে যোগ দিতে যাচ্ছে এটা কোনও ভাবে জানতে পেরে যায়নি তো ওরা? সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি সে। বাকিরা চিন্তায় পড়ে যাবে ভেবে কাউকে কিছু বলতেও পারেনি। কিন্তু এয়ারপোর্টে নামার পরে দু’জনকে আর দেখতে পায়নি তারিক। তবু এতক্ষণ তার মনে হচ্ছিল কেউ তাদের ওপরে নজর রাখছে। অবশেষে ট্যাক্সির সিটে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হল সে।
রিক্রুটার আবু বকর আগেই বলে দিয়েছিল, এয়ারপোর্টে নেমে তাদের একটা নতুন সিম কার্ড নিতে হবে। সেই সিম থেকে একটা বিশেষ নম্বরে মিসড কল দিলে আবু বকর বলে দেবে কোন হোটেলে উঠতে হবে। প্রথমে কিছু দিন বাগদাদেই থাকতে হবে যতক্ষণ না তাজকিয়া আসছে। তাজকিয়া এসে গেলেই তারা রওনা দেবে পবিত্র ভূমির উদ্দেশে। মিসড কল দিতেই ফোন এল। আবু বকর বলল, ‘হোটেল ব্যাবিলন রোটানা।
হোটেলটা বেশ ভালো। থ্রি স্টার। এত বড়ো হোটেলে আগে কোনও দিন থাকেনি তারিক। অবশ্য বেড়াতে গেছেই বা কত বার! ছোটোবেলায় আম্মি-আব্বার সঙ্গে দিঘা, পুরী, দার্জিলিং। বড়ো হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে এক বার পুরুলিয়া। এক বার বকখালি। কোনও বারই তেমন জুতের হোটেলে থাকা হয়নি। মাথেরানে গিয়ে তারা তো ছিল একটা মাদ্রাসায়।
এই হোটেলে থাকার খরচ আবু বকরই দিচ্ছে। ওদের জন্য দুটো ঘর নেওয়া হয়েছে। দোতলায়। ১০৩ আর ১০৪। তারিক আর সইদুল ১০৩-এ। ফারুক আর জুনেইদ অন্যটায়। ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে দাঁড়ালে সামনের রাস্তা দেখা যায়। সইদুল স্নানে ঢুকেছে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সকাল বেলার বাগদাদের ব্যস্ততা দেখছিল তারিক। ভাবছিল, জীবন মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়! সে কোনও দিন ভেবেছিল ঘর ছেড়ে এত দূরে আসবে! আর শুধু আসবে তাই নয়, আর কোনও দিন ঘরে ফিরবে না! বোনের জন্য আবারও মনটা খারাপ হল তারিকের। এতক্ষণে নিশ্চয়ই তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গেছে। আম্মির দোকানটা কি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে না কি মাঝপথে জল দিয়ে আগুন নিভিয়েছে লোকজন? পুড়ে যাওয়া দোকানটা দেখে কি আম্মি বুঝবে যে সে চিরকালের মতো ঘর ছেড়েছে? না কি ভাববে রাগ করে গেছে, দু’দিন গেলে ফিরে আসবে? ওরা কি তারিকের ওপরে রাগ করবে না কি কষ্ট পাবে? থানায় ডায়েরি করবে ওরা?
রাস্তার দিকে তাকিয়ে এই সবই সাত-পাঁচ ভাবছিল তারিক। এমন সময় রাস্তার উলটো দিকের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে বেরিয়ে এল গতকাল রাতে প্লেনে দেখা হওয়া লোকটা। তার হাতে একটা বড়ো প্যাকেট। দ্রুত পা চালিয়ে রাস্তা পার হয়ে সে ঢুকে পড়ল হোটেলের মধ্যে। টেনশনে হাত-পা কাঁপতে লাগল তারিকের। সে নিশ্চিত হয়ে গেল, এই লোকটা আর ওর সঙ্গিনী ওদের চার জনের পিছু নিয়েছে। দিল্লি থেকে ফলো করছে। যে কোনও মুহূর্তে ওদের ধরিয়ে দেবে ইরাকি পুলিশের হাতে। কোনও মতে ঘরে ঢুকে ধপ করে বিছানার ওপরে বসে পড়ল তারিক। এত কষ্ট করে বাগদাদ অবধি চলে এল তারা আর এত কাছে কিনা এসে প্ল্যান ভেস্তে যাবে! নাহ, এই কথাটা আর নিজের মধ্যে রাখা যাবে না। বাকিদেরও জানাতে হবে। সইদুলকে আসতে বলে পাশের ঘরের দরজায় নক করল তারিক।
নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার পরে ওরা ঠিক করল আবু বকরের দেওয়া নম্বরে সবটা জানাতে হবে। বিদেশে এসে নিজের বুদ্ধিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। যথারীতি মিসড কল দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোন এল। আবু বকর মন দিয়ে সবটা শুনল। একটু চুপ থেকে বলল, ‘আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাজকিয়ার বন্দোবস্ত করছি। কাল তোমাদের অন্য একটা হোটেলে নিয়ে চলে যাব।’
‘আর লোকটা? ওর সঙ্গের মেয়েটা? আবার যদি আমাদের ফলো করে,’ উদ্বিগ্ন গলায় বলল তারিক।
আবু বকর হাসল, ‘চিন্তা কোরো না। ওরা আর কোনও দিন কাউকে ফলো করবে না। দে উইল বি ডেড।’
