লাপিস লাজুলি – ৭
॥ সাত ॥
ফেব্রুয়ারি, ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ
টিমটিম করে প্রদীপ জ্বলছে। মৃতপ্রায় আলো আরও বেশি করে অন্ধকার ঘনিয়ে তুলেছে বিশাল কক্ষটায়। একটু পরেই প্রদীপ নিভে যাবে। কিন্তু সে দিকে খেয়াল নেই গিয়াসুদ্দিনের। তিনি পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন। আবদুল রহমান যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন সেটাও বুঝতে পারেননি। আবদুল দেখলেন, টেবিলের ওপর গ্রিক ভাষায় লেখা একটা পাণ্ডুলিপি খোলা। লেখকের নাম পিথাগোরাস। গিয়াসুদ্দিনের কাছেই এই গ্রিক গণিতজ্ঞের নাম শুনেছেন আবদুল রহমান। ইদানীং গিয়াসুদ্দিন পিথাগোরাসে মজেছেন। তাঁর একের পর এক বই আরবিতে অনুবাদ করছেন। নীচু গলায় আবদুল ডাকলেন, ‘আলমুহাল্লিম।’
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন গিয়াসুদ্দিন। বললেন, ‘বোসো আবদুল।’
তার পরে আবার প্রস্তরবৎ হয়ে গেলেন।
আবদুল জানেন, নষ্ট করার মতো সময় তাঁদের হাতে নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বললেন, ‘আপনার সঙ্গে জরুরি একটা আলোচনা ছিল। পাঞ্জাটার ব্যাপারে।’
‘ও ব্যাপারে আর কী আলোচনা থাকতে পারে,’ হতাশ গলায় বললেন গিয়াসুদ্দিন।
এ বার গিয়াসুদ্দিনের ঠিক সামনের আসনটায় বসলেন আবদুল। চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘আমার বাবা যে অন্যায় করেছেন আমি তার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। পাঞ্জাটা আমি ফিরিয়ে আনব। আজই।
চমকে সোজা হয়ে বসলেন গিয়াসুদ্দিন। তড়বড় করে বলে উঠলেন, ‘পাঞ্জাটা ফিরিয়ে আনবে মানে? কী ভাবে? তুমি কি ভাবছ তুমি গিয়ে হালাকু খাঁ-র কাছে পাঞ্জাটা চাইবে আর সে তোমাকে দিয়ে দেবে? কী বলে চাইবে? বলবে, খলিফা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। তাঁর মনে হয়েছে খিলাফতের পাঞ্জা ভেট হিসেবে পাঠানো উচিত হয়নি। আচ্ছা মেনে নিলাম গিয়ে তুমি এই কথা বলবে। কিন্তু যাবে কী করে? হালাকু খাঁ-র শিবিরে ঢুকতে তোমাকে তো আগে অনুমতি চাইতে হবে। দূত পাঠাতে হবে বা পত্র দিতে হবে। সেটা নিশ্চয়ই আগামীকাল সকালের আগে সম্ভব নয়। তা হলে কোন হিসেবে বললে আজই তুমি পাঞ্জা ফেরত নিয়ে আসবে? তুমি কি আমার সঙ্গে মশকরা করছ নাকি শোকে তোমার চিত্তচাঞ্চল্য হয়েছে?’
রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন গিয়াসুদ্দিন। আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। আবদুল রহমান ততোধিক শান্ত। মানুষ উত্তেজিত থাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেলে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। আবদুল রহমানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘আপনার কি আমাকে অর্বাচীন বলে মনে হয়?’
‘কিন্তু তুমি তো অর্বাচীনের মতোই কথা বলছ আবদুল। তুমি যে বললে আজই পাঞ্জা ফেরত নিয়ে আসবে, এর চেয়ে বড়ো আশাপ্রদ কথা আমি আমার জীবদ্দশায় শুনিনি। কিন্তু…’
‘পাঞ্জাটা চুরি করা হবে আলমুহাল্লিম’, কথা কেটে বললেন আবদুল রহমান এক মুহূর্ত বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন গিয়াসুদ্দিন। তার পরে ধপ করে আসনে বসে পড়লেন। অস্ফুটে বললেন, ‘এ হয় না। হালাকু খাঁ-র শিবিরে ঢুকে তার তাঁবু থেকে তুমি পাঞ্জা চুরি করে আনবে! এ যে সতর্ক বাঘের মুখে হাত ঢুকিয়ে শিকার ছিনিয়ে আনার চেয়েও কঠিন।’
‘হ্যাঁ আলমুহাল্লিম, কাজটা কঠিন। দুঃসাধ্য। কিন্তু অসম্ভব বা অসাধ্য নয়। আমি খবর পেয়েছি, কয়েক দিন আগে হালাকু খাঁ-র শিবিরে চুরি হয়েছে। সে কথা মোঙ্গোলরা গোপন করে গেছে।’
‘চুরি! হালাকু খাঁ-র শিবিরে! কী চুরি হয়েছে?’
‘উটের পা। ঝলসানো। হালাকু খাঁ-র তাঁবুর বাইরে মজলিশ বসেছিল। সেখানেই ঝলসানো হচ্ছিল একটা বাচ্চা উট। কিছুটা খাওয়ার পরে উটটাকে সেখানেই ফেলে রেখে ভেতরে ঢুকে যায় হালাকু এবং তার অনুচরেরা। সেই আধখাওয়া ঝলসানো উটেরই একটা পা খোয়া গেছিল সে রাতে। উটের পা মহার্ঘ কোনও বস্তু নয় কিন্তু হালাকু খাঁ-র শিবির থেকে চুরি হয়েছে মানে সেখানে প্রবেশ করা যায়। তাদের রক্ষণ দুর্ভেদ্য হলেও অভেদ্য নয়।’
গিয়াসুদ্দিন বুদ্ধিমান মানুষ। বুঝতে পারলেন আবদুল রহমান মিথ্যে কথা বলছেন না আর তার থেকেও বড়ো কথা, এর মধ্যে গূঢ় রহস্যের গন্ধ রয়েছে। চোখ সরু করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘মোঙ্গোল শিবিরের এত ভেতরের কথা তুমি কী করে জানলে?’
‘কিছুক্ষণ আগে সেই তস্কর স্বয়ং আমাকে একথা বলেছে’, নিরুত্তাপ গলায় বললেন আবদুল রহমান।
উত্তেজনায় থরথর করে কেঁপে উঠলেন প্রৌঢ়, ‘কে সেই চোর?’
‘ভেতরে এসো,’ বলে হাঁক দিলেন আবদুল রহমান আর নতমস্তকে কক্ষে প্রবেশ করল যে কিশোরটি তাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন গিয়াসুদ্দিন। মনসুর। হালাকু খাঁ-র হাতে নিহত কিপচাক যোদ্ধা কারা সোঙ্কোর-এর ছেলে।
উনিশ বছর বয়সে ইউরেশিয়ান স্তেপ থেকে আরও অনেক কিপচাক যোদ্ধার সঙ্গে কারা সোঙ্কোর বাগদাদে এসেছিল। তার পরে আর ফিরে যায়নি। বাগদাদকে ভালোবেসে থেকে গেছিল আর ক্রমে হয়ে উঠেছিল খলিফার সেনাবাহিনীর অন্যতম স্তম্ভ। গিয়াসুদ্দিন অত্যন্ত স্নেহ করতেন তাকে। ছেলে হওয়ার পরে নামকরণের জন্য গিয়াসুদ্দিনের কাছেই এসেছিল কারা। বায়তুল হিকমাহ-র প্রতিষ্ঠাতা খলিফা আল মনসুরের নামে তিনি সদ্যোজাতের নাম রেখেছিলেন। সেই সদ্যোজাত আজ সতেরো বছরের কিশোর। ওই তো মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে কক্ষের প্রবেশপথে।
ছোট থেকেই মনসুর অত্যন্ত বুদ্ধিমান। যুদ্ধের কলাকৌশল শেখার পাশাপাশি পড়াশোনাতেও তার প্রবল আগ্রহ। বাবার মৃত্যুর আগে অবধি প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে সে বায়তুল হিকমাহ-এর বিদ্যালয়টিতে আসত। এমনিতে সে খুবই চটপটে আর আবদুল রহমানের সঙ্গে তার ভারি ভাব। আবদুল এই কিশোরটিকে নিজের ভাইয়ের মতোই ভালোবাসেন। মনসুর ও নানা কিছু আবদার করে বড়ো দাদাটির কাছে, কিন্তু এখন গিয়াসুদ্দিনের সামনে সে রীতিমতো আড়ষ্ঠ হয়ে আছে। এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন গিয়াসুদ্দিন। আবদুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ও নিজে থেকে তোমাকে এ কথা বলল?’
আবদুল বললেন, ‘হ্যাঁ আলমুহাল্লিম। আমি নিজের কক্ষের বাইরে পায়চারি করছিলাম। দুশ্চিন্তায় সুস্থির হয়ে বসতে পারছিলাম না। তখনই ও এল আর বলল, আল’আখ আল’আকবরো, আমাকে একটা ছোট নৌকার ব্যবস্থা করে দেবে? আমি বললাম, সে দেব কিন্তু নৌকা নিয়ে কী করবে? তখনই ও আমাকে সব বলল।’
‘বুঝলাম’, মনসুরকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে গিয়াসুদ্দিন বললেন, ‘তুই মোঙ্গোলদের শিবিরে ঢুকেছিলি?’
নীচু গলায় মনসুর বলল, ‘হ্যাঁ আলমুহাল্লিম।’
‘কেন? কী হল চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? উত্তর দে।’
‘বলো মনসুর। চুপ করে থেকো না। আলমুহাল্লিমের সবটা জানা দরকার। আমায় যা বলেছ সব খুলে বলো। উনি তোমাকে বকবেন না,’ আশ্বাস দিলেন আবদুল রহমান।
এতক্ষণে মাথা তুলল মনসুর আর তার চোখ দুটো দেখে থমকে গেলেন গিয়াসুদ্দিন। কথায় বলে, চোখ হচ্ছে মনের আয়না। মানুষের মনের মধ্যে কী চলছে তা প্রতিফলিত হয় তার চোখে। গিয়াসুদ্দিন স্পষ্ট দেখতে পেলেন মনসুরের মনের মধ্যে প্রতিহিংসার বিস্ফোরণ ঘটছে। সেই বিধ্বংসী আগুনের আঁচ অনুভব করতে পারলেন তিনি। মনসুর বলল, ‘আমি হালাকু খাঁ-কে খুন করতে গেছিলাম আলমুহাল্লিম। আমার বাবা ওকে আহত করে অর্ধেক কাজ করে গেছেন। বাবার অসমাপ্ত কাজটা আমি শেষ করতে গেছিলাম।’
‘হুম,’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন গিয়াসুদ্দিন। তার পরে বললেন, ‘কী ভাবে ঢুকলি তুই সেখানে?’
‘নদীতে ডুবসাঁতার দিয়ে। নদীর ধারেই তো শিবির।
‘সাঁতরেই যদি যাবি তা হলে নৌকা চাইছিলি কেন? আর গেলিই যখন হালাকুকে না মেরে ফিরে এলি কেন?’
‘অতটা পথ সাঁতরে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আলমুহাল্লিম। আমার ইন্দ্রিয়গুলো একটু শিথিল হয়ে পড়েছিল। একটু আওয়াজ করে ফেলেছিলাম। ওখানকার রক্ষীরা আমার উপস্থিতি টের পেয়ে গেছিল। তাই পালিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আমি আবার যাব আর হালাকুকে মেরে ফিরে আসব। এ বার যাতে আর ক্লান্ত না হই তাই নৌকা চাইছি। কিছুটা পথ নৌকায় গিয়ে বাকিটা সাঁতার দেব।’
‘আচ্ছা। কিন্তু উটের পা-টা নিয়ে এলি কেন?’
‘কারণ আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম, আমি চুরি করতেই ঢুকেছি। ওরা তো আমার উপস্থিতি টের পেয়েছিল আলমুহাল্লিম। যদি এসে দেখত কিছুই খোয়া যায়নি তা হলে নির্ঘাত সন্দেহ করত কোনও গুপ্ত ঘাতকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করে দিত। ওদের আমি সাবধান হতে দিতে চাই না।’
এইটুকু ছেলের এমন অদ্ভুত বিবেচনা! রণনীতিতে এতখানি পারদর্শিতা! কালে কালে এ ছেলে ওর বাবাকেও ছাপিয়ে যাবে। মনসুরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন গিয়াসুদ্দিন। বললেন, ‘আবদুল, আমার চোখের সামনে এমন একটা রত্ন আছে আর আমি দেখতে পাইনি! হ্যাঁ রে মনসুর, তোকে যদি একটা নৌকার ব্যবস্থা করে দিই তুই হালাকু খাঁ-র তাঁবু থেকে আমাকে একটা জিনিস এনে দিতে পারবি?’
‘পারব আলমুহাল্লিম,’ প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলল মনসুর।
‘বেশ। বেশ,’ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন গিয়াসুদ্দিন, ‘বলো আবদুল, এ বার তোমার কী পরিকল্পনা।
মনসুরকে বিশ্রাম নিতে পাঠিয়ে দিলেন আবদুল। জানিয়ে দিলেন, ঠিক সময় মতো তিনি মনসুরকে ডেকে পাঠাবেন। মনসুর চলে যেতে গিয়াসুদ্দিনকে বললেন, ‘আমার স্থির বিশ্বাস মনসুর পাঞ্জাটা নিয়ে আসতে পারবে কিন্তু এমনি এমনি পাঞ্জাটা নিয়ে এলে হবে না। পাঞ্জা চুরি গেছে বুঝলে হালাকু খাঁ এক মুহূর্ত দেরি না করে বাগদাদ আক্রমণ করবে। আমরা মহামূল্যবান জিনিসগুলো লুকোনোর সময় পাব না। হালাকু খাঁ-কে বুঝতে দিলে চলবে না যে পাঞ্জা চুরি হয়েছে। ওই পেটিকায় রেখে আসতে হবে অবিকল একই রকম দেখতে আর একটা পাঞ্জা।’
‘কোথায় পাব অবিকল একই দেখতে আর একটা পাঞ্জা? তুমি তো জানো আবদুল ওর আর কোনও জোড়া নেই,’ ক্লান্ত গলায় বললেন গিয়াসুদ্দিন।
‘আমাদের বানাতে হবে।’
‘কী পাগলের মতো বলছ আবদুল! ওই পাঞ্জাটা বানাতে আমার তিন বছর সময় লেগেছে। আর সেটা রাতারাতি বানানো হয়ে যাবে?’
‘যাবে আলমুহাল্লিম। বানানো যাবে। আপনার সময় লেগেছে পাঞ্জার ভেতরের অতি সূক্ষ্ম কলকবজাগুলি বানাতে। বিজ্ঞান আর জাদুবিদ্যার মিশেল ঘটাতে সময় লেগেছে। কিন্তু সে সব যদি কিছুই না থাকে, যদি একটা সাধারণ পাঞ্জাই হয় তা হলেও কি সেটা দ্রুত বানিয়ে ফেলা যাবে না? আপনার কাছে তো পাঞ্জার বহিরঙ্গের নকশাটাও আছে। আপনি আমাকে সেটা দিন। আমি একজন স্বর্ণকার, একজন কর্মকার আর দু’জন ভাস্করকে বসিয়ে রেখে এসেছি। ওরা প্রত্যেকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে দিকপাল। ওরা পাঞ্জার নকশার জন্য অপেক্ষা করছে।’
গিয়াসুদ্দিন গোছানো মানুষ। এত বিশাল পাঠাগারে কোথায় কোন বই আছে তাঁর নখদর্পণে। নকশাটা খুঁজে পেতে তাঁর বেশি সময় লাগল না। কোমরবন্ধে নকশার কাগজটা গুঁজে পাঠাগারের বাইরে বেরিয়ে এলেন আবদুল রহমান। ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন উত্তরমুখো। তখনই অন্ধকার থেকে সন্তর্পণে বেরিয়ে এল আর এক অশ্বারোহী। পাগড়ির কাপড় দিয়ে ভালো করে ঢেকে নিল মুখ। একটু অপেক্ষা করে আবদুল রহমান যে পথে গেলেন সেই পথেই ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
***
সদ্য তৈরি হওয়া ধাতব বস্তুর মধ্যেও যেন একটা কোমলতা থাকে। হাত দিয়ে সেটাই অনুভব করছিলেন গিয়াসুদ্দিন। বাগদাদের শিল্পীদের কাজের তরিকাই আলাদা। এত অল্প সময়ে অবিকল এক রকম দেখতে আর একটা পাঞ্জা বানিয়ে দিয়েছে। বলে না দিলে গিয়াসুদ্দিনও বুঝতে পারতেন না এটা নকল। উত্তেজনায় ছটফট করছেন তিনি। কিছুক্ষণ আগেই জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আবদুল রহমান তাঁর বাঁচার ইচ্ছে বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবনীশক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। বললেন, ‘মনসুরকে ডাকো আবদুল।’
মনসুর উপস্থিত হতেই কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলেন গিয়াসুদ্দিন। বললেন, ‘এই নকল পাঞ্জাটা রেখে হালাকু খাঁ-র কাছে যে আসল পাঞ্জাটা আছে সেটা নিয়ে চলে আসবি। ব্যস এইটুকু কাজ। পারবি তো?’
‘পারব আলমুহাল্লিম। কিন্তু হালাকু খাঁ…’
‘খবরদার না,’ মনসুরের কথা কেটে গর্জে উঠলেন গিয়াসুদ্দিন, ‘হালাকু খাঁ-কে মারতে চাইলে অন্য দিন মারবি। আজ নয়। আজ শুধু পাঞ্জাটা ফেরত নিয়ে আয়।’
‘যদি সুযোগ পায়, তাও কিছু করবে না,’ থাকতে না পেরে বলে উঠলেন আবদুল রহমান।
‘না করবে না। পাঞ্জাটা হাতে পাওয়ার পরে আমার একটা গোটা দিন দরকার। হালাকু খাঁ মরে গেছে দেখে যদি ওর অন্য সেনাপতিরা যুদ্ধ শুরু করে দেয়? যদি বাগদাদে ঢুকে আসে? সবার আগে তো বায়তুল হিকমাহ-তে আঘাত হানবে। না না আবদুল এই জিনিসগুলো নিয়ে আমি কোনও ঝুঁকি নিতে পারব না। আল্লাহর রহমতে আবার ওই পাঞ্জা ফেরত পাওয়ার সুযোগ এসেছে। এর মধ্যে আমি কোনও অশান্তি চাই না। মনসুর, যা বললাম মাথায় থাকে যেন। পাঞ্জা বদল করবি আর চলে আসবি। বুঝেছিস?’
মাথা নাড়ল মনসুর। গিয়াসুদ্দিনের পা ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে। তার পিছু পিছু গেলেন আবদুল রহমান।
গুপ্ত পথে দুজনে এসে দাঁড়ালেন নগরীর উত্তর প্রান্তে। মনসুর বয়ে নিয়ে এসেছে একটা ছোট গোল মতো নৌকা। এমনিতে বাগদাদ নগরীকে চার দিক থেকেই অবরোধ করে আছে মোঙ্গোলরা। তবে হালাকু খাঁ রয়েছে পশ্চিম দিকে। নগরীর প্রবেশপথের কাছে। উত্তর প্রান্তে নগর প্রাকারের গা ঘেঁষে বয়ে চলেছে টাইগ্রিস। স্বাভাবিক ভাবে এ দিকে তাই মোঙ্গোল নজরদারি তুলনামূলক কম। টাইগ্রিসের জলরাশিই নগর থেকে বেরোনোর পথ বন্ধ করে দিয়েছে। দূরে নদীবক্ষে আলো দেখা যাচ্ছিল। মোঙ্গোল রণতরী। পাহারা দিচ্ছে। আবদুল বললেন, ‘নৌকা করে গেলে ধরা পড়ে যাবে না তো?’ মনসুর মাথা নাড়ল, ‘আমার ছোটো নৌকা। ওদের চোখে পড়বে না। তা ছাড়া এ দিকে পাহারাটা কম। যেখান থেকে বেশি পাহারা সেখানে গিয়ে তো নৌকা ছেড়ে দেব। সাঁতার দেব।’
‘বেশ। এগোও তবে। পরম করুণাময় আল্লাহ তোমায় রক্ষা করুন।’
জলে নৌকা নামিয়ে তাতে চড়ে বসল মনসুর। এ বার লগিতে চাপ দিলেই স্রোতের টানে নৌকা তরতর করে ছুটে যাবে। নৌকাটা একটু ঠেলে দেওয়া দরকার। ঠেলতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে নৌকাটা ধরে নিলেন আবদুল রহমান। কোমরবন্ধ থেকে একটা ছুরি বার করে নৌকার ওপর রেখে দিলেন। বললেন, ‘ছোটো কিন্তু খুব কাজের জিনিস।’
বিস্মিত চোখে তাঁর দিকে তাকাল মনসুর। গলা নীচু করে আবদুল বললেন, ‘আলমুহাল্লিমের কথায় অত গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই। পাঞ্জাটা বদল করার পরে সুযোগ পেলে হালাকু খাঁ-কে খুন করে এসো। আমি তোমার পথ চেয়ে থাকব।’
হাসি ফুটল মনসুরের মুখে। লগিতে চাপ দিল সে। এ দিক থেকে জোর ঠেলা দিলেন আবদুল রহমান। নৌকাটা হারিয়ে গেল টাইগ্রিসের ওপরে জমাট বেঁধে থাকা অন্ধকারে।
***
ফেব্রুয়ারি মাস। বেশ শীত। নদী থেকে হাওয়া এলে তো হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। একটু মদ না খেলে আর চলছে না। চারদিকটা ভালো করে দেখে নিয়ে বর্মের ভেতর থেকে একটা চামড়ার থলে বার করে আনল জুলুক নয়ান। দুপুর বেলাই জানতে পেরেছিল, হালাকু খাঁ-র তাঁবুর বাইরে রাত পাহারার ভার আজ তার ওপরে। তখনই আড়াল করে একটু মদ সরিয়ে রেখেছিল সে।
আশপাশে কেউ নেই। সবাই উটের চামড়ার কম্বলের ভেতরে ঢুকে কষে ঘুম দিচ্ছে। বাকি যা পাহারা আছে দূরে দূরে। কেউ তাকে দেখতে পাবে না। তবু সাবধানের মার নেই। জ্বলতে থাকা একটা মশাল মাটিতে ঘষে নিভিয়ে দিতেই জায়গাটা আরও অন্ধকার হয়ে গেল। এ বার একটা উঁচু মতো জায়গায় জুত করে বসল জুলুক। সবে মদটা গলায় ঢালতে যাবে তখনই কে যেন পেছন থেকে তার হাত চেপে ধরল। হৃৎপিণ্ডটা একেবারে গলার কাছে আটকে গেল তার! কেউ তো ছিল না ধারেকাছে! তবে কে এল! স্বয়ং খাঁ বেরিয়ে এসেছেন তাঁবু থেকে? মাথা ঘুরিয়ে দেখার সাহস অবধি হল না জুলুকের। ভয় জড়ানো গলায় বলল, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে খাঁ। পাহারা দেওয়ার সময় মদ খাওয়া আমার উচিত হয়নি। না মানে আমি মদ খাইনি। খেতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু সেটাও উচিত হয়নি। আসলে নদী থেকে হাওয়া দিচ্ছে তো। বড়ো শীত করছিল। আমি আকাশের দেবতা টেংগ্রি-র দিব্যি গেলে বলছি, আর কোনও দিন পাহারা দেওয়ার সময়… না না জীবনে আর কোনও দিন আমি মদ ছোঁব না।’
যে শক্ত করে হাত ধরেছিল সে গম্ভীর কণ্ঠে হুম জাতীয় একটা আওয়াজ করল তার পরে জুলুকের হাত থেকে চামড়ার থলেটা কেড়ে নিল। জুলুক বুঝতে পারল, পদশব্দটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে যাওয়া অবধি দম ধরে বসে রইল সে। অবশেষে বড়ো করে একটা শ্বাস ফেলল। ওহ! আর একটু হলেই মাথাটা কাটা পড়ত! কী ভাগ্যিস খাঁ-র আজ মেজাজ ভালো ছিল। তাকে প্রাণভিক্ষা দিয়ে গেলেন। কৃতজ্ঞতায় অন্তরটা নুয়ে এল তার আর ঠিক তখনই মনে পড়ল, খাঁ-র তাঁবু তো তার সামনের দিকে। তা হলে খাঁ পেছন দিকে গেলেন কোথায়? এক মুহূৰ্ত থম মেরে বসে রইল সে তার পরে লাফ দিয়ে উঠে পেছন দিকে দৌড় দিল।
হাসির দমকে কেঁপে উঠছিল তোগো বেগ-এর বিশাল শরীরটা। শব্দ করে হাসলে এক রকম কিন্তু শব্দ না করে হাসলে শরীরে খুব ঝাঁকুনি হয়। আজ মোক্ষম বোকা বানানো গেছে জুলুক নয়ানকে। ব্যাটা ভয়ের চোটে মদের থলেটাই দিয়ে দিয়েছে। জুলুক কিছু টের পাওয়ার আগেই মদটা খেয়ে থলেটা হাপিস করে দেওয়া দরকার কিন্তু এই হতচ্ছাড়া হাসি কিছুতেই থামছে না। এটাই তোগোর সমস্যা। একবার হাসতে শুরু করলে আর থামতে পারে না। যত সে হাসি থামানোর চেষ্টা করে তত বেশি করে হাসির কারণটা মনে পড়ে যায়। তাও শব্দ করে হাসলে এক রকম কিন্তু এই শব্দহীন হাসিটা আরও সাংঘাতিক। পেট ব্যথা হয়ে যায় তবু থামে না। আজও হাসি থামানোর প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল তোগো বেগ। এক সময় থাকতে না পেরে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে শুরু করল।
রাগে গরগর করতে করতে ছুটে আসছিল জুলুক নয়ান। এ নির্ঘাত তোগো বেগের কাজ। এসব ফাত্রা বুদ্ধি ওই হাতির বাচ্চার মাথাতেই আসা সম্ভব। তোগো তার প্রিয় বন্ধু। কিন্তু তোগো যদি মদটা খেয়ে ফেলে তা হলে আজ তাকে মেরেই ফেলবে সে। মদের আগে কেউ না। কিন্তু তোগোর এই অবস্থা দেখে সে থমকে গেল। তোগো একটা জলহস্তীর বাচ্চার মতো গড়াগড়ি খাচ্ছে আর মুখ দিয়ে কুকুরের বাচ্চার মতো কেঁউ কেঁউ শব্দ করছে। প্রচণ্ড হাস্যকর ব্যাপারটা। হাসি চেপে রাখা মুশকিল। জুলুকও হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতে চোখে জল এসে গেল তার। মাটিতে বসে পড়ল ধপ করে। চামড়ার থলেটা পড়ে রইল এক পাশে। আর এই হাসাহাসির মধ্যে ওরা কেউ লক্ষ করল না নদী থেকে একটা ছায়ামূর্তি উঠে এসে সন্তর্পণে ঢুকে গেল হালাকু খাঁ-র তাঁবুর মধ্যে।
মানুষের মধ্যে যে একটা পশু আছে সেটা অনেকক্ষণ অন্ধকারে থাকলে বোঝা যায়। পশুরা অন্ধকারে দেখতে পায়। মানুষ পায় না। তার কারণ মানুষ আলোয় থাকে। আলোয় থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু বেশ খানিকক্ষণ অন্ধকারে থাকলে মানুষের মধ্যে পশু ভাবটা জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে চোখ সয়ে আসে। তখন অন্ধকারেও দিব্যি দেখা যায়। মনসুরও তাঁবুর ভেতরটা ভালো মতোই দেখতে পারছিল। বেশ বড়ো তাঁবু। অনেকটা জায়গা নিয়ে ছড়ানো। হবে নাই বা কেন? মোঙ্গোল সেনাপতি হালাকু খাঁ-এর তাঁবু বলে কথা। তাঁবুটার দুটো ভাগ। সামনের দিকে বসার জায়গা করা আছে। মাঝে একটা পর্দা দেওয়া পর্দা সরিয়ে উঁকি মারল মনসুর। বিশাল একটা শয্যা। তার ঠিক মাঝখানে চিত হয়ে ঘুমোচ্ছে হালাকু খাঁ। গায়ে উটের চামড়ার মোটা কম্বল। মৃদু মৃদু নাক ডাকছে লোকটা। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল মনসুরের। শক্ত করে চেপে ধরল কোমরবন্ধে গোঁজা ছুরির বাঁটটা। এই লোকটাই বাবাকে খুন করেছে। মনে হল, এই মুহূর্তে ছুরিটা গেঁথে দেয় লোকটার হৃৎপিণ্ডে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলাল সে। লোকটাকে মারবে তো সে বটেই। পিতৃহন্তাকে হত্যাই যদি করতে না পারে তো সে কেমন সন্তান! কিন্তু তার আগে খিলাফতের পাঞ্জাটা বদলে দিতে হবে। কেন এই বদল তা মনসুর জানে না কিন্তু এটুকু বুঝতে পারছে কাজটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নয়তো আলমুহাল্লিম নিজে তাকে এই দায়িত্ব দিতেন না। মনসুর ঠিক করল, আগে তাঁবুর ভেতরের অংশটাই খুঁজে দেখবে। আবদুল রহমান বলছিলেন, পাঞ্জাটা পেয়ে ভারি খুশি হয়েছিল হালাকু। যে উপহার পেয়ে মানুষ খুশি হয় সেটা সে নিজের কাছে রাখতে পছন্দ করে। এই যুক্তিতে পাঞ্জাটা তাঁবুর ভেতরের অংশেই থাকার কথা। পর্দা সরিয়ে মনসুর তাঁবুর ভেতরের অংশটায় ঢুকে পড়ল।
বড়ো বা অচেনা কোনও জায়গায় ছোটো কোনও জিনিস খোঁজার একটা বিশেষ কায়দা আছে। কায়দাটা বাবা শিখিয়েছিল মনসুরকে। বাবা বলত, ‘কথায় বলে, খড়ের গাদায় সুচ খোঁজা কঠিন ব্যাপার। কিন্তু খুঁজতে জানলে খড়ের গাদা থেকেও সুচ খুঁজে বার করা যায়। প্রথমেই মনে মনে বড়ো জায়গাটাকে ছোট ছোট ক্ষেত্রফলে ভেঙে নিতে হয়। তার পরে ওই ছোটো ছোটো জায়গাগুলো ধরে ধরে এগোতে হয়। আর লাগে মনঃসংযোগ।’
সেই ভাবেই খুঁজতে শুরু করল মনসুর আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে আবিষ্কার করল, পাঞ্জাটা রয়েছে হালাকু খাঁ-র শয্যায়। তার ঠিক মাথার পাশে।
এত সহজে জিনিসটা খুঁজে পেয়ে যাবে মনসুর ভাবেনি। ভাগ্য আজ তার সহায়। বেড়ালের মতো লঘু পায়ে সে পৌঁছে গেল হালাকুর শয্যার পাশে। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল তার পর নিপুণ হাতে বদলে দিল পাঞ্জাটা।
প্রথম কাজটা নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছে। এ বার আসল কাজ। কোমরবন্ধ থেকে ছোট ছুরিটা বার করে আনল মনসুর। হালাকু খাঁ নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। লোকটার মুখ আর গলা পুরোটাই উন্মুক্ত হয়ে রয়েছে। ছুরিটা চোয়ালের হাড়ের নীচ দিয়ে কোনাকুনি ঢুকিয়ে দিলে একটা শব্দ করারও সময় পাবে না লোকটা। ঘুমের মধ্যেই মরে যাবে। হাসি পেল মনসুরের। প্রবল প্রতাপান্বিত মোঙ্গোল সেনাপতির এমন দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু হবে! আসলে একেই বলে, বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো। মোঙ্গোলরা ভাবতেই পারে না যে তাদের শিবিরেও গুপ্ত ঘাতক ঢুকতে পারে! নদীর দিকে পাহারার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আত্মপ্রত্যয় ভালো জিনিস কিন্তু অতিরিক্ত আত্মপ্রত্যয় পতনের কারণ। আজ যেটা হালাকু খাঁ-র সঙ্গে হতে চলেছে। বাঁ-পায়ের ওপর শরীরের ভর দিয়ে দাঁড়াল মনসুর। ডান হাতের আঙুলে একবার ঘুরিয়ে নিল ছোটো ছুরিটা ভালো হয়েছে আবদুল রহমান এই অস্ত্রটা দিয়ে দিয়েছিলেন। এই সব পরিস্থিতিতে বড়ো তলোয়ারের চেয়ে ছোটো ছুরি অনেক বেশি কার্যকরী। মনে মনে বাবাকে স্মরণ করল মনসুর। বাবার মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। সব সময় হাসিমুখ। কে বলবে লোকটা অমন ধুন্ধুমার যোদ্ধা! নিজে হাতে করে মনসুরকে অস্ত্রচালনা শিখিয়েছিল বাবা। মনসুরের জন্য তার মাপের একটা তলোয়ার বানিয়ে দিয়েছিল। তলোয়ারটা মনসুরের হাতে তুলে দেওয়ার আগে বলেছিল, ‘অস্ত্র হাতে নিলে মানুষের দায়িত্ব বেড়ে যায়। প্রতিজ্ঞা করো, কোনও দিন কোনও নিরস্ত্র আর ঘুমন্ত মানুষের ওপর অস্ত্রচালনা করবে না।’
ছোট্ট তলোয়ারে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিল ছোট্ট মনসুর।
ভেতর থেকে কে যেন চাবুক মারল মনসুরকে। হে ঈশ্বর! ঠিক এই সময় এই কথাটাই মনে পড়তে হল! এক পা পিছিয়ে এল মনসুর।
ও দিকে তখন হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে জুলুক নয়ান আর তোগো বেগ। অনেক কষ্টে দু’জনেরই হাসি থেমেছে। হাসতে হাসতে দু’জনেই মদ খাওয়ার কথা ভুলে গেছে। বড়ো একটা শ্বাস ছেড়ে তোগো বলল, ‘এ বার বাড়ি ফিরতে হবে রে জুলুক। আর ভালো লাগে না।’
জুলুক আরও বড়ো একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘সত্যি রে বড়োভাই। সেই কবে বেরিয়েছি। কত দিন বউটার মুখ দেখিনি। কিন্তু এখনই তো শেষ না। বাগদাদ দখল হলে আবার কায়রোর পথে যেতে হবে।’
তোগো বলল, ‘সেই! সৈনিকের জীবন কুত্তার জীবন। একটা কথা বলব কাউকে বলবি না তো ছোটোভাই?’
‘না রে বড়োভাই। আকাশের দেবতা টেংগ্রির দিব্যি কাউকে বলব না।’
‘আমার না এই বাগদাদ জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে। মনে হয় এখানে থেকে যেতে পারলে বেশ হত।’
‘আমারও রে বড়োভাই। সাহস করে বলতে পারিনি কিন্তু খুব ইচ্ছে করছিল বউকে নিয়ে এসে এখানে যদি ঘর বাঁধতে পারতাম! কিন্তু যা ভাবগতিক দেখছি খাঁ এই বাগদাদের সঙ্গে সন্ধি করবে না।’
মুখ দিয়ে ফুস করে একটা শব্দ করল তোগো। বলল, ‘খাঁ আর সন্ধি! জিন্দেগিতে না। এই সুন্দর নগরটাকে ছারখার না করা অবধি খাঁ শান্ত হবে না। তোকে আজ একটা কথা বলছি ছোটোভাই, আকাশের দেবতা কিন্তু সব দেখছেন। এত পাপ ধর্মে সইবে না। সে বার চোখের সামনে অতগুলো লোককে গোলা মেরে উড়িয়ে দিল! এত মানুষের চোখের জল, এত অভিশাপ সব কি বিফলে যাবে নাকি! আমরাও কুকুরের মতো মরব। খাঁ-ও কুকুরের মতো মরবে। মিলিয়ে নিস আমার কথা।’
কথা শেষ হতে না হতেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল জুলুক। তোগো বেগের ভারী শরীর। সেও হাঁচোড়পাচোড় করে উঠে দাঁড়াল, ‘কী হল ছোটোভাই?’
চোখ বড়বড় করে জুলুক বলল, ‘কুত্তার মরণ শুনে মনে পড়ল অনেকক্ষণ খাঁ-এর তাঁবুর সামনেটা ফাঁকা পড়ে আছে। আগের দিন চোর এসে উটের পা নিয়ে চলে গেছে। সেটা কেউ খেয়াল করেনি তুই আর আমি ছাড়া। ঈশ্বর না করুন যদি আজ ফের চোর আসে আর খাঁ-এর তাঁবু থেকে দামি কিছু চুরি করে নিয়ে যায়! সেটা কি লুকোতে পারব? খাঁ কুচিকুচি করে কেটে কুকুরকেই খাইয়ে দেবে। চল বড়োভাই। শিগগির চল।’
তোগো বেগ আর জুলুক নয়ান যখন দ্রুত পা চালাল হালাকু খাঁ-র তাঁবুর দিকে তখন তাঁবুর ভেতরে দ্বন্দ্বে জর্জরিত হচ্ছে মনসুর। প্রকৃত যোদ্ধা সে। ঘুমন্ত বা নিরস্ত্র মানুষের ওপরে অস্ত্রচালনা করা তার নীতিবিরুদ্ধ। কিন্তু মোঙ্গোলদের শিবিরে ঢুকে তাদের সেনাপতিকে সম্মুখ সমরে আহ্বান করা চূড়ান্ত মূর্খামি ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। তা ছাড়া হালাকু খাঁ অতিশয় বলশালী লোক। মনসুর সেখানে নেহাতই কিশোর। যুদ্ধ করতে সে ভয় পায় না কিন্তু হালাকু খাঁ জেগে গেলে আসল কাজটা পণ্ড হবে। সে আলমুহাল্লিম আর আবদুল রহমানকে কথা দিয়েছে সত্যিকারের পাঞ্জা নিয়ে ফিরে আসবে। তখন সেটা কতটা হবে তা নিয়ে রীতিমতো সংশয় আছে। একটু সময় নিয়ে মন শক্ত করল মনসুর। সে তো যুদ্ধ করতে আসেনি। এসেছে প্রতিশোধ নিতে। প্রতিশোধের সময় কেন সে যুদ্ধনীতি মনে রাখবে? হালাকু খাঁ না মরলে তার বাবার আত্মা শান্তি পাবে না। অতএব হালাকু খাঁ-কে মরতে হবে। নিজের ওপরে বিরক্তই হল মনসুর। নীতির কথা ভাবতে গিয়ে বেশ খানিকটা সময় সে নষ্ট করে ফেলেছে। এখানে প্রতিটা মুহূর্ত খুব দামি জীবনের মতো দামি। এক চুল এদিক থেকে ওদিক হলে জীবন চলে যেতে পারে। ফের হালাকু খাঁ-র শয্যার কাছে এগিয়ে গেল মনসুর। শরীরের ভর দিল বাঁ-পায়ের ওপরে। তীক্ষ্ণ চোখে মেপে নিল হালাকু খাঁ-র চোয়াল আর গলার সংযোগস্থলের হননবিন্দুটা। ডান হাতটা পিছিয়ে নিল অনেকটা যাতে বেশি ভরবেগ সঞ্চারিত হয় ছুরিকাগ্রে। একটু একটু দুলতে শুরু করল সে তৃতীয় দুলুনিতে সে ছুরিটা গেঁথে দেবে লক্ষ্যস্থলে। এক বার দুলে নিল মনসুর। দু’বার দুলে নিল মনসুর। মনসুর যখন তিন নম্বর বার দোলবার জন্য শরীরটা পেছন দিকে হেলিয়ে দিল ঠিক তখনই নদী থেকে একটা হাওয়া দিল। তাতে নড়ে উঠল তাঁবুর মূল দরজার কাপড়টা আর অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করতে না পেরে জুলুক নয়ান ভাবল, তাঁবুর দরজা ঠেলে চোর ঢুকছে ভেতরে। সে প্রাণপণে শিঙা ফুঁকে দিল। রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে বেজে উঠল সাবধানশব্দ। চকিতে শয্যার ওপর উঠে বসলেন হালাকু খাঁ আর সাপের চেয়েও দ্রুতবেগে বুকে ভর দিয়ে শয্যার নীচে লুকিয়ে পড়ল মনসুর। নিজের ওপরে রাগে, সময় নষ্ট করার অপরাধে ছুরি দিয়ে সে নিজের হাতটাই চিরে দিল।
তাঁবুর বাইরে তখন বিরাট কোলাহল শুরু হয়েছে। হালাকু খাঁ-ও বেরিয়ে গেছেন বাইরে। এবার আর সময় নষ্ট করল না মনসুর। শয্যার নীচ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁবুর একদম পেছন দিকে চলে এল। খানিকটা কসরত করে তাঁবুর তলার দিকে কাপড়ের নীচ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল সে। বুকে হেঁটে নদীর পাড় পর্যন্ত গিয়ে শরীরটা ভাসিয়ে দিল টাইগ্রিসের জলে। সে খেয়াল করল না হাত থেকে ঝরে পড়া রক্তের দাগ তার উপস্থিতির প্রমাণ হয়ে রয়ে গেল মোঙ্গোল শিবিরের মাটিতে।
