লাপিস লাজুলি – ৮
॥ আট ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
আরব সাগরের নীল জল কেটে এগিয়ে চলেছে স্বর্ণ গোদাবরী। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। এখন আর তেমন তেজ নেই তার। পড়ন্ত সূর্যের আলো এসে পড়েছে কেবিনে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে পল্লব হিসেব করছিল। রোশনি এসে দাঁড়াল কেবিনের দরজায়, ‘ও পল্লবদা। বাইরে আসুন না। এসে দেখুন কী অপূর্ব লাগছে!’
জাহাজে ওঠার পরেই অভয় ছিত্রে ওদের দু’জনকেই দুটো করে ওষুধ গিলিয়ে বলেছিল, ‘খেয়ে নিন। সি-সিকনেস অ্যাভয়েড করতে পারবেন। নয়তো একটু পর থেকেই বমি আর মাথাঘোরা শুরু হবে। কিচ্ছু এনজয় করতে পারবেন না।’
লক্ষ্মী ছেলের মতো দু’জনেই ওষুধ খেয়ে নিয়েছিল। পল্লব বমিকে খুব ভয় পায়। বমি হলেই তার মনে হয় পেটের ভেতরের প্রত্যঙ্গগুলো এক-এক করে মুখ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসবে। ঠাকুর ঠাকুর করে বমিটা হচ্ছে না, কিন্তু মাথাটা ভালোই ঘুরছে। সেই জন্যই শুয়ে ছিল বিছানায়। রোশনি কিন্তু বেশ চাঙ্গা আছে। দিব্যি টইটই করছে। এতক্ষণে সে গোটা জাহাজটা দু’-তিনবার ঘুরে নিয়েছে। একটা করে চক্কর লাগাচ্ছে আর পল্লবকে এসে নতুন নতুন ইনফরমেশন দিচ্ছে। যেমন প্রথম বার ঘুরে এসে বলল, ‘পল্লবদা জানেন, এই জাহাজটা মোট দু’লাখ তিরিশ হাজার টন মাল নিয়ে যাচ্ছে?’
এটা পল্লবের জানার কথাও নয়। তাই সে নেতিবাচক মাথা নেড়েছিল এবং চমৎকৃত হওয়ার ভান করেছিল। পরের বার ঘুরে এসে রোশনি বলল, ‘পল্লবদা, ক্যাপ্টেন বললেন, আমাদের রুট হচ্ছে আরব সাগর থেকে গালফ অব ওমান, সেখান থেকে পার্সিয়ান গালফ হয়ে ইরাক। জাহাজটা প্রতি ঘণ্টায় কুড়ি নট বেগে চলছে। এই গতিতেই যাবে বাকি রাস্তাটা। ভারী জাহাজ তো, এর বেশি স্পিড তুলতে পারবে না।’
এই তথ্যটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল, তাই এটা শোনার পর থেকেই পল্লব হিসেব করতে শুরু করেছিল। এক নট মানে এক নটিক্যাল মাইল। সমুদ্রে দূরত্ব মাপার একক এই নটিক্যাল মাইল। এক নটিক্যাল মাইল মানে দু’ কিলোমিটারের একটু কম। ওই ১.৮ কিলোমিটারের মতো। মুম্বই থেকে ইরাকের দূরত্ব ১৩০০ নটিক্যাল মাইল। সেই হিসেবে ঘণ্টায় ২০ নট বেগে চললে ইরাক পৌঁছোতে সময় লাগার কথা ৬৫ ঘণ্টা। তিন দিনেরও কম। কিন্তু অভয় ছিত্রে বলেছে, ইরাক পৌঁছোতে পাঁচ দিন লাগবে। শুয়ে শুয়ে এইসব সাত-পাঁচ ভাবছিল পল্লব। এমন সময় তৃতীয় বারের মতো চক্কর দিয়ে দরজায় এসে দাঁড়াল রোশনি আর ডাক দিল, ‘ও পল্লবদা। বাইরে আসুন না। এসে দেখুন কী অপূর্ব লাগছে!’
পল্লব বলল, ‘মাথাটা তো ঘুরছে।’
রোশনি ব্লল, ‘যত শুয়ে থাকবেন তত বেশি ঘুরবে। প্রথমে তো আমারও মাথা ঘুরছিল কিন্তু সমুদ্রের হাওয়ায় আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। আসুন আসুন।’
পল্লবকে প্রায় টেনে তুলল বিছানা থেকে। কেবিনটা দোতলায়। সিঁড়ির মুখেই ওদের দেখা হয়ে গেল অভয় ছিত্রের সঙ্গে। অভয় বলল, ‘এই তো পল্লব স্যার। এখন ফিট লাগছে?’
মাথার ভেতরে সর্বক্ষণ একটা দুলুনি আছে। তবু ইতিবাচক মাথা নাড়ল পল্লব। অভয় বলল, ‘আমি আপনাদের কাছেই যাচ্ছিলাম। ক্যাপ্টেন আপনাদের ডাকতে বললেন। চলুন, একসঙ্গে চা খাব।’
জীবনের মতো সারপ্রাইজ বোধ হয় আর কেউ দিতে পারে না। পল্লব ভাবছিল, গতকাল দুপুরে সে রোশনির বাড়িতে বসে চা খাচ্ছিল আর এখন সে চা খেতে চলেছে স্বর্ণ গোদাবরীর ডেকে। গতকাল দুপুর থেকে জীবনটা কেমন ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলেছে। পল্লব বরাবরই একটু ধীরে চলা মানুষ। কোনও কিছুতেই হুড়োহুড়ি তার না-পসন্দ। কিন্তু জীবন এ বার তার পছন্দের মুখে মুতে দিয়েছে।
মিত্তল সাহেবের পিএ সত্যপ্রকাশ ওদের দু’জনকে একটা হোটেলে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তখন রাত বারোটা। ডিনার প্যাক করে দিয়েছিলেন। সারাদিন ঠিক করে খাওয়া হয়নি। দু’জনেরই খুব খিদে পেয়ে গেছিল। হাতে-মুখে জল দিয়ে সবে প্লেটে বিরিয়ানি বেড়েছে তখনই দরজায় টোকা। এঁটো হাতেই দরজা খুলেছিল পল্লব। দরজায় দাঁড়ানো রোগা মতো ছেলেটা হাতজোড় করে মারাঠি মেশানো হিন্দিতে বলেছিল, ‘নমস্তে পল্লব স্যার। আমার নাম অভয় ছিত্রে। কমিশনার সাহেব আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি আপনাদের গাইড।’
পল্লবকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ভেতরে ঢুকে এসেছিল ছেলেটা। ঘরের ভেতরে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে বলেছিল, ‘আপনারা খেয়ে নিন আমি ওয়েট করছি। খাওয়া হলে আমরা বেরোব।’
অবাক হয়ে পল্লব বলেছিল, ‘এখন বেরোব? কোথায়?’
অভয় হেসে বলেছিল, ‘খেয়ে নিন না। যেতে যেতে সব বলছি।’
তখনও পল্লব বুঝতে পারেনি অবাক হওয়ার সবে শুরু।
হোটেলের বাইরেই একটা কালো স্করপিও দাঁড়িয়েছিল। সেটায় ওদের চাপিয়ে অভয় বলেছিল, ‘ওয়ান আওয়ার জার্নি। আপনারা একটু রেস্ট করে নিন। রাস্তা ভালো আছে। ড্রাইভারকে বলে দিয়েছি র্যাশ ড্রাইভ না করতে। আপনারা চাইলে একটু ঘুমিয়েও নিতে পারেন।’
রোশনি বলেছিল, ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন একটু ক্লিয়ার করে বললে ভালো হয়। বুঝতেই পারছেন আমাদের কাছে সবটাই ধোঁয়াশা। খুব কনফিউজড লাগছে।’
রাতের মুম্বইয়ের রাস্তা দিয়ে হু-হু করে চলছিল স্করপিওটা। ড্রাইভারের পাশের সিটে পা তুলে বসে ওদের দিকে ঘুরে বসে অভয় ছিত্রে বলেছিল, ‘আপনার কনফিউশন এক্ষুনি কাটিয়ে দিচ্ছি। আমরা ওয়াডালা স্টেশন যাচ্ছি ম্যাডাম। আপনাদের কাছে তো কাগজ নেই। এমনি-এমনি তো সিকিউরিটি পেরিয়ে পোর্টে ঢোকাতে পারব না। তাই এই ব্যবস্থা। ওয়াডালা থেকে পোর্ট অবধি রেল লাইন আছে। ওয়াডালায় মালগাড়িতে কন্টেনার লোড হয়। সেই কন্টেনার সোজা ঢুকে যায় পোর্টের ভেতরে। আপনাদের কন্টেনারে করে ভেতর অবধি নিয়ে যাব। এক বার ভেতরে ঢুকে যেতে পারলে আর চাপ নেই। সোজা জাহাজে তুলে দেব। আগেকার জমানা হলে এত লুকোছাপার দরকার পড়ত না। বুক ফুলিয়ে পোর্টে ঢুকে যেতাম। এখন এই পোর্ট ট্রাস্ট হেবি ঝামেলা শুরু করেছে। তার ওপর ইন্টারন্যাশনাল কেস তো। হুজ্জুতি বেশি। ওহ আগে কিছু সোনার দিন ছিল স্যার। তখন সব খুল্লমখুল্লা হতো। আমি নিজে কতবার জাহাজে চড়ে এ দেশ, ও দেশ ঘুরে এসেছি। প্রথম প্রথম তো লুকিয়ে যেতাম। জাহাজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে হতো। পরের দিকে চেনাশোনা হয়ে গেছিল। সিকিউরিটিতে অত চাপ হতো না। কোনও পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই আমি জাহাজে করে সাউথ আফ্রিকা এমনকী আর্জেন্টিনা অবধি ঘুরে এসেছি। হ্যাঁ, শহরের ভেতরে যেতে পারতাম না। ওই পোর্টের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করতাম। কিন্তু পাসপোর্ট ভিসা ছাড়া এটুকুই বা ক’জন পারে বলুন? সে হিসেবে আমি যথেষ্ট লাকি তাই না?’
হাঁ হয়ে গেছিল রোশনি আর পল্লব। ছেলেটা এমন ভাবে বলছিল যেন মুম্বই থেকে আর্জেন্টিনা যাওয়া রানিকুঠি থেকে অটো করে যাদবপুর যাওয়ার মতোই সোজা ব্যাপার। অভয় বলে যাচ্ছিল, ‘অবশ্য গণপতি বাপ্পার দয়ায় এখন আমার পাসপোর্ট আছে। যেখানে যেতে চাই বাপ্পা আমার ভিসাও করিয়ে দেন। এখন আমি বুক ফুলিয়েই বিদেশের মাটিতে শপিং করতে পারি। এই রুক রুক।’
ড্রাইভারকে গাড়ি দাঁড় করাতে বলেছিল অভয়। গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার ধারের দোকান থেকে কোল্ড ড্রিংকস এনে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘হুড়োহুড়ি করে আপনাদের গাড়িতে তুলে নিলাম। বিরিয়ানি খাওয়ার পরে একটু ঠান্ডা না খেলে চলে! আরাম করে খান।’
তার নির্দেশে গাড়ি ফের চলতে শুরু করেছিল। কোল্ড ড্রিংকসের বোতলে চুমুক দিয়ে পল্লব বলেছিল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ অভয়জি।’
হাতজোড় করে অভয় বলেছিল, ‘আমাকে জি বলবেন না স্যার। আর থ্যাঙ্ক ইউ তো দেবেনই না। আপনারা সমীরণ স্যারের লোক আছেন। মানে আমার ফ্যামিলি আছেন। আমাকে নাম ধরে ডাকবেন।’
বয়সে অভয় পল্লবের কাছাকাছিই হবে। তুমি বলায় আপত্তি নেই। পল্লব বলেছিল, ‘আচ্ছা বেশ। তা তুমি কী করো অভয়?’
‘আজ্ঞে তেমন কিছু না।’
‘তেমন কিছু না মানে? কিছু তো করো। তোমার ওপর সমীরণ স্যার আমাদের চোরাপথে জাহাজে তুলে দেওয়ার ভার দিয়েছেন মানে তুমি তো যে-সে লোক নও। সত্যি করে বলো।’
মাটিতে প্রায় মিশে গিয়ে অভয় ছিত্রে বলেছিল, ‘সত্যি বলছি স্যার। আমি আগে করতাম। এখন আর তেমন কিছুই করি না। বাপ্পার দয়ায় আমার তিনটে কার্গো শিপ আছে। ওই থেকেই সংসার চলে যায়।’
ভাগ্যিস তখন কোল্ড ড্রিংক খাচ্ছিল না পল্লব। নয়তো নির্ঘাৎ বিষম খেত। এই ছেলেটার তিনটে জাহাজ আছে! তিনটে জাহাজ আছে এই ছেলেটার! তিন তিনটে জাহাজ! নিজেকে প্রথম বার সত্যিকারের আদার ব্যাপারি মনে হচ্ছিল পল্লবের। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সিটে মাথা এলিয়ে দিয়েছিল সে। অভয় শশব্যস্ত হয়ে উঠেছিল, ‘কিছু হয়েছে স্যার?’
পল্লব বলেছিল, ‘হয়েছে না হচ্ছে।’
‘কী হচ্ছে?’
‘হিংসে। তোমায়।’
হো-হো করে হেসে পল্লবের হাত জড়িয়ে ধরেছিল অভয় ছিত্রে, ‘আপনি তো খুব দিলখোলা লোক স্যার। আপনাকে আমি ভালোবেসে ফেললাম।’ রাত তখন দেড়টার কিছু বেশি। কিন্তু ওয়াডালা স্টেশনে চূড়ান্ত ব্যস্ততা। বড়ো বড়ো ক্রেন মালগাড়িতে কন্টেনার লোড করছে। প্রচুর লোক ছোটাছুটি করছে। অভয় ছিত্রে যে সত্যিই যে-সে লোক নয় সেটা আরও এক বার বুঝতে পেরেছিল পল্লবরা। গাড়ি থেকে নামতেই অভয়ের পেছনে সেঁটে গেল চার জন দেহরক্ষী। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চারপাশে অন্তত দেড়শো লোক জমা হয়ে গেল। সকলেই অভয়কে অভিবাদন জানাতে ব্যস্ত। সকলকে সরিয়ে কোনও মতে ওদের দু’জনকে নিয়ে একটা মালগাড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল অভয়। মালগাড়িটা তখন ছাড়ব-ছাড়ব করছে। ওদের দু’জনকে সে তুলে দিয়েছিল একটা কন্টেনারে। নিজেও উঠে বসেছিল। অভয়ের এক সঙ্গী একটা ব্যাকপ্যাক ধরিয়ে দিয়েছিল তার হাতে। কন্টেনারে ঠাসা প্যাকিং বাক্স। তার মধ্যেই ওদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অভয় বলেছিল, ‘একটু কষ্ট হবে বসতে কিন্তু এ ছাড়া আর উপায় নেই। ঘণ্টা দেড়েক লাগবে পোর্টে ঢুকতে। গল্প করতে করতে চলে যাব।’
অভয়ের যে এ ভাবে কষ্ট করে যাওয়ার দরকার নেই সেটা দিব্যি বুঝতে পারছিল পল্লব আর রোশনি। ওদের রীতিমতো অস্বস্তিই হচ্ছিল অভয় ওদের সঙ্গে এ ভাবে যাচ্ছে দেখে। রোশনি বলেছিল, ‘তুমি তোমার মতো এসো। আমাদের রিসিভ করে নিয়ো তা হলেই হবে।’
‘তা কখনও হয়? আপনারা আমার গেস্ট। চলুন চলুন। আমাকে নিয়ে ভাববেন না। আমার এ সব অভ্যেস আছে।’
জাঁকিয়ে বসেছিল অভয়। গুড়গুড় করতে করতে মালগাড়ি চলতে শুরু করেছিল আর পল্লবের প্রশ্নে অভয় তার গল্প বলা শুরু করেছিল, ‘স্যার আমার বাড়ি রায়গড় ডিস্ট্রিক্টের মাথেরানে। খুব সুন্দর জায়গা। হিল স্টেশন। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার একটা পার্ট। সি লেভেল থেকে আড়াই হাজার ফিট ওপরে। মাথেরান মানে কী বলুন তো স্যার? ফোরহেড অব দ্য ফরেস্ট। জঙ্গলের কপাল। সুন্দর নাম না? যাই হোক, আমার বাবা, ঠাকুরদা সবাই টিচার। খুব লেখাপড়ার চল আমার বাড়িতে। সবাই আমার বাবাকে খুব রেসপেক্ট করে। কিন্তু ছোটো থেকেই আমার লেখাপড়া করতে ভালো লাগত না। আমি খুব ডেয়ারডেভিল টাইপের ছেলে বুঝেছেন তো স্যার? জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম। তা এক দিন বাইরের লোক এসে জঙ্গলে গাছ কাটছিল। হোটেল বানাতে এসেছিল ওরা। ওদের সঙ্গে আমার ঝগড়া লেগে গেল। ঝগড়া থেকে হাতাহাতি। আমি তো মেরে পালিয়ে এলাম। আমি জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম। ওরা কি আমায় ধরতে পারে! কিন্তু ওদের নেটওয়ার্ক হেবি স্ট্রং ছিল। পুলিশে খবর দিয়ে দিল। পুলিশ এল আমাদের বাড়ি। আমি তখন আন্ডারএজ বলে আমায় অ্যারেস্ট করল না। কিন্তু ওই বাইরের বিজনেসম্যান সবার সামনে বাবাকে থাপ্পড় মারল। পুলিশ কিচ্ছু বলল না। বাবা খুব কাঁদল লুকিয়ে লুকিয়ে। সেই দিন আমি বুঝলাম, লেখাপড়া করে যে সম্মান পাওয়া যায় সেই সম্মানের সুগন্ধ আছে কিন্তু জোশ নেই। ওই সম্মানটা না স্যার ইটারনাল না। ক্ষমতাবান যদি মনে করে সম্মান দেবে, দেবে। যদি মনে করে দেবে না, দেবে না। মোদ্দা কথায় শিক্ষিত মানুষের সম্মান পাওয়াটা ক্ষমতাবানের ইচ্ছের ওপরে ডিপেন্ডেন্ট। আসল সম্মান পেতে গেলে পাওয়ারফুল হতে হয়। এবার বলুন, পাওয়ার কাদের থাকে? পলিটিশিয়ানদের আর ডনদের। দাউদ ভাইয়ের কথা ভাবুন। আমি ঠিক করলাম আমাকে ডন হতে হবে। ফিল্মস্টার বলুন বা গ্যাংস্টার, ছোটো জায়গায় বসে হওয়া যায় না। তার জন্য মুম্বই আসতে হয়। আমিও বাড়ি থেকে পালিয়ে মুম্বই চলে এলাম। তখন আমার পনেরো বছর বয়স। মাস্টার বাড়ির ছেলে তো, একটু রিসার্চ করে নিয়েছিলাম। দেখলাম, ডন হওয়ার সবচেয়ে সহজ জায়গা পোর্ট এরিয়া। কমপিটিশন বেশি কিন্তু দাঁও মারতে পারলে বড়ো দাঁও মারা যায়। আজ থেকে বিশ বছর আগের কথা বলছি। তখন মুম্বই পোর্টের বেতাজ বাদশা ছিল ইমরান আলি। ইমরান ভাইকে নজরানা না দিয়ে ইন্ডিয়া থেকে কোনও মাল বাইরে যেত না। কোনও মাল বাইরে থেকে ইন্ডিয়ায় আসত না। ইমরান ভাইয়ের টিমে সব সময় নতুন নতুন ছেলে রিক্রুট করা হতো। তা আমিও টিমে ঢুকে গেলাম। ভালো কাজ করতে করতে বাই দ্য টাইম আমি ইমরান আলির ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। ঘনিষ্ঠ বললে কম বলা হয়। একদম রাইট হ্যান্ড হয়ে গেলাম। এই ভাবে বছর সাত-আট কেটে গেল। ইমরান ভাই পলিটিকসের দিকে ঝুঁকছিল। ইমেজ ক্লিন করা দরকার বলে আমাকে এগিয়ে দিচ্ছিল বিজনেসের দিকে। আমিও পাওয়ারফুল হতে লাগলাম। পলিটিক্যাল লিডাররা ইমরান ভাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও পাত্তা দিতে শুরু করল। কী ভাবছেন? এর পর আমি ইমরান ভাইকে মেরে তখতে বসে গেলাম? না স্যার, যদি তাই হতো এই স্টোরি আমি আপনাদের শোনাতাম না। এর পরেই আসল ঘটনা ঘটল। বন্দর থানার ওসি হয়ে আসলেন সুমিত ছাবরা আর এসেই আমাদের সবার পেছনে হাম্পু দিয়ে দিলেন। সরি ম্যাডাম পারডন মাই ল্যাঙ্গোয়েজ কিন্তু ঘটনাই তাই। একদম পেছনে হাম্পু। রাতারাতি আমাদের বিজনেস তিন ভাগের এক ভাগ হয়ে গেল। এত দিন যে সব ওসি ছিল সবাই আমাদের কেনা ছিল। কিন্তু ছাবরা সাহেব অন্য জিনিস। ডিল করতে গেলে সোজা লক আপ। এ বার বিজনেস ডাউন হলে তো শুধু আমাদের চাপ না, পলিটিক্যাল লিডারদেরও চাপ। আমাদের বিজনেসের টাকাতেই তো ওদের যত পার্টির র্যালি আর ফূর্তি। পুরো পোর্ট এরিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ড আর মুম্বইয়ের তাবড় তাবড় পলিটিক্যাল লিডাররা একজোট হয়ে ঠিক করল, সুমিত ছাবরাকে সরিয়ে দিতে হবে। ট্রান্সফার না স্যার। তদ্দিনে ছাবরা সাহেব আমাদের যা লস করিয়ে দিয়েছেন ওঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে না দিলে আমাদের শান্তি নেই। এর মধ্যে পুলিশের বড়ো মাথারাও ছিল। আর একজিকিউশনের দায়িত্বে ছিলাম আমি। ফুলপ্রুফ প্ল্যান তৈরি হল, পোর্ট এরিয়ায় নকল দাঙ্গা লাগানো হবে। আমরা জানতাম, দাঙ্গার খবর পেলে ছাবরা সাহেব নিজে অ্যাকশনে নেমে পড়বেন। কারণ ছাবরা সাহেব এইসব কম্যুনাল আনরেস্টে হেবি খচে যেতেন। ধরে ধরে জেলে পুরতেন। তা যাই হোক, একটা সানডে সকালে আমরা নকল একটা দাঙ্গা লাগিয়ে দিলাম। আগে থেকেই বেশিরভাগ পুলিশকে অন্য কাজে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অল্প কয়েক জন পুলিশকে নিয়ে ছাবরা সাহেব ময়দানে নেমে পড়লেন। আমরা কায়দা করে ছাবরা সাহেবকে বাকিদের থেকে আলাদা করে দিলাম। একটা ছেলেকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করলাম। সেই ছেলেটাকে তাড়া করতে করতে ছাবরা সাহেব তখন একটা গলিতে ঢুকে পড়েছেন, হঠাৎ খেয়াল করলেন চারদিক থেকে মব ওঁকে ঘিরে ধরেছে। সবার হাতে তরোয়াল, ভোজালি, রড। ততক্ষণে সাহেব বুঝতে পেরেছেন ওঁর দিন শেষ। বুঝতে পেরেছেন ওঁকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। হাত থেকে রিভলভার ফেলে দিলেন। একটা বাড়ির রকে বসে পড়লেন চুপ করে।’
এই অবধি বলে থেমেছিল অভয়। জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কেমন লাগছে আমার স্টোরিটা?’
রোশনি আর পল্লব দু’জনেই একসঙ্গে বলে উঠেছিল, ‘থামলে কেন? বলো তার পরে কী হল?’
‘বলছি। আসলে এই স্টোরিটা খুব পার্সোনাল। খুব কম লোক জানে। আপনাদের বলতে ইচ্ছে হল। কাউকে বলবেন না প্লিজ। যাই হোক, ছাবরা সাহেব তো বসে পড়লেন। ততক্ষণে ইমরান ভাইও আমাদের জয়েন করে ফেলেছে। আমি বন্দুক বার করে সাহেবকে শুট করতে গেলাম। ইমরান ভাই আমায় থামাল। বলল, ইঁদুর ফাঁদে পড়েছে। গুলি করে মেরে দিলে তো মজাই নষ্ট। আজ আমরা ছাবরা সাহেবকে নিয়ে একটু খেলব। এই বলে আমাদের টিমের এক মেম্বার জহিরকে বলল, যা জহির সাহেবকে ল্যাংটো করে দে।’
‘কী,’ চমকে উঠেছিল রোশনি।
অভয় বলেছিল, ‘এই আপনি যে ভাবে চমকে উঠলেন, আমিও সে দিন এ ভাবেই চমকে উঠেছিলাম। কী জানেন তো, এখানেই গন্ডগোলটা হয়ে গেল। জহির এক নম্বরের ফালতু ছেলে। রেপিস্ট। ও যখন টেনে টেনে সাহেবের জামাকাপড় ছিঁড়ছিল আমার না কেমন তার কেটে গেল। আমার না আমার বাবার কান্নাভেজা মুখটা মনে পড়ে গেল। এক দিন একটা আনপড় লোক ঠিক এই ভাবে আমার অত শিক্ষিত বাবাকে সবার সামনে অপমান করেছিল। ছাবরা সাহেবও তো একটা লিটারেট লোক বলুন? নয়তো পোর্ট এলাকার ইনচার্জ হতে পারে! সে দিন আমার পাওয়ার ছিল না। আমি বাবার অপমান আটকাতে পারিনি। কিন্তু আজ? আজ তো আমি পাওয়ারফুল। আমি গিয়ে জহিরকে টেনে এক চড় মারলাম। তার পরে ছাবরা সাহেবকে বললাম, স্যার আমার সঙ্গে আসুন। কেউ আপনাকে কিছু করবে না। বুঝতেই পারছেন এটা ইমরান ভাই আর তার লোকজনের ভালো লাগার কথা নয়। লাগলও না। ওরা আমাকেও মারতে এল। তখন আমি ইমরান ভাইসমেত চার জনকে শুট করে ছাবরা সাহেবকে নিয়ে পালিয়ে গেলাম।’
‘মাই গুডনেস,’ রোশনি বলে উঠেছিল, ‘তার পরে?’
‘তার পরে ছাবরা সাহেবকে নিয়ে থানায় গেলাম আর সাহেব আমায় অ্যারেস্ট করে নিলেন। অবশ্য অ্যারেস্ট না করলে ওরা আমাকে মেরে দিত। সেই সময় আমার লাইফে এন্ট্রি নিলেন সমীরণ স্যার। এই ঘটনার পর একটা হালচাল পড়ে গেছিল তো। অফিসারদের পটাপট ট্রান্সফার হচ্ছিল। মুম্বইয়ের নতুন ডিএম হয়ে এলেন সমীরণ বসাক আর এসিপি হয়ে এলেন অশোক মিত্তল সাহেব। মিত্তল সাহেব আর ছাবরা সাহেব মিলে প্রথমেই ইমরান আলির দলের লোকজনকে পটাপট এনকাউন্টার করে দিলেন। তার পরে একদিন সমীরণ স্যার আমার সঙ্গে দেখা করলেন। আমি তখন জেলে। আন্ডার ট্রায়াল। বললেন, তুমি একজন সরকারি কর্মীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছ। বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা রেখে একটা মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছ। তোমার আগের সব অপরাধ মাফ করলাম। তোমায় ফেক দাঙ্গা লাগানোর কেস দেওয়া হয়েছে। কোনও মার্ডার চার্জ দেওয়া হয়নি। তুমি বেল পেয়ে যাবে। কিন্তু হিসেব মতো তুমি তোমার দলের লোকেদের সঙ্গে বেইমানি করেছ। তা ছাড়া আরও অনেক বিগ শট তোমার ওপরে রেগে আছে। তুমি অনেকের হিট লিস্টে আছ। এমনি-এমনি বাইরে বেরোলে দু’দিনে খুন হয়ে যাবে। ইউ হ্যাভ টু বি রিচ। আমির আদমি বননা পড়েগা। বিগ শট বননা পড়েগা। বড়োলোকেদের গায়ে কেউ চট করে হাত দিতে সাহস পায় না। মিত্তল চারটে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আইডেনটিফাই করেছে। যেখানে প্রচুর কালো টাকা আছে। তোমাদেরই তোলাবাজি আর স্মাগলিং থেকে আসা টাকা। টাকাগুলো তোমায় দিয়ে দিচ্ছি। আগামী তিনটে রবিবার ডকে তিনটে সিজড কার্গো শিপ নিলাম হবে। জাহাজ তিনটে তুমি কিনে নাও। কিনে নিলাম আর এই ভাবে আমি তিনটে জাহাজের মালিক হয়ে গেলাম। বিগ শট হয়ে গেলাম।’
হাঁ করে অভয়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিল দুজনে! রোশনি অস্ফুটে বলেছিল, ‘এ যে রূপকথা!’
অভয় বলেছিল, ‘আমায় জাহাজ কিনিয়ে বিগ শট বানিয়ে দিয়েছেন বলে আমি যে সমীরণ স্যারকে ভালোবাসি তা কিন্তু নয় ম্যাডাম। সমীরণ স্যার আমার এর চেয়েও অনেক বড়ো একটা উপকার করেছিলেন। গ্যাংস্টার হয়ে আমি অনেক টাকা করেছিলাম ঠিকই কিন্তু বাবা আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমার দেওয়া কোনও গিফট নিতেন না। মাকেও কিছু ইউজ করতে দিতেন না। অনেস্ট মানুষ তো। ওই দুঃখটা বুকের মধ্যে ছিল বলেই বোধ হয় গণপতি বাপ্পা সে দিন আমায় সুবুদ্ধি দিয়েছিলেন। ছাবরা স্যারকে মারতে দিইনি ওদের। তা যাই হোক, সমীরণ স্যার আমার রিকোয়েস্টে বাবার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। বাবাকে বলেছিলেন, স্যার, আপনার ছেলে কুপথে চলে গিয়েছিল কিন্তু মানুষ হিসেবে ও ইমানদার। এখন সৎ পথে বিজনেস করছে। ওকে ক্ষমা করে দিন। ফাইনালি বাবা আমাকে ক্ষমা করেছিলেন। তো এত বড়ো উপকারটা যে করেছে তাকে মাথায় করে রাখব না বলুন তো?’
কী বলবে বুঝতে না পেরে অভয়ের ব্যাগটায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়েছিল পল্লব আর শুয়েই ফের উঠে পড়েছিল। ব্যাগটার মধ্যে যেন ইঁট রয়েছে। বলেছিল, ‘কী আছে অভয় ব্যাগে? এত শক্ত!’
মুচকি হেসে অভয় বলেছিল, ‘সোনা। গোল্ড বার। স্যার, আমি এখনও টুকটাক স্মাগলিং করি। পুরোনো অভ্যেস তো। পুরোপুরি ছাড়তে পারিনি। আপনাদের সঙ্গে ইরাক যাচ্ছিই যখন একটু সোনা নিয়ে যাই। ওখানে আমার লোক আছে। ওরা সেল করে দেবে। গোল্ডের চাহিদা সব জায়গায় সেম।’ বিস্মিত হতে হতে পল্লব তখন রীতিমতো ক্লান্ত। তবু বলেছিল, ‘পুলিশ জানে? সমীরণ স্যার জানেন?’
‘ওঁরা এত কিছু জানেন আর এইটুকু জানবেন না? নিশ্চয়ই জানেন। তবে এই নিয়ে আমরা কখনো ডিসকাস করি না। আমি পুলিশের অনেক কাজ করে দিই। এই তো কিছু দিন আগে মাথেরানেই কয়েকটা জিহাদিকে ধরিয়ে দিয়েছি। ওদের সঙ্গে আইসিসের কানেকশন ছিল। তাই পুলিশ আমাকে এইটুকু লিবার্টি দেয়। স্যার, আপনারা অনেস্ট মানুষ, আমার বাবার মতো, আপনারা বুঝবেন না, তবে সিস্টেমটা কিন্তু এ ভাবেই চলছে। আপনাকে বুঝে নিতে হবে কোথায় ছাড় দিতে হবে আর কোথায় টাইট করে চেপে ধরতে হবে। জাজ করলেন না তো?’
এ বার পল্লব হাত চেপে ধরেছিল অভয়ের। বলেছিল, ‘অভয়, তুমি ও দিলখোলা মানুষ। আমিও তোমাকে ভালোবেসে ফেললাম।’
কথা বলতে বলতে কখন যে সময় কেটে গেছিল ওরা বুঝতেই পারেনি। পোর্টের ভেতর মালগাড়িটা এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। অভয় ওদের কন্টেনার থেকে নামিয়ে এনেছিল, ‘আর ভয় নেই স্যার। এ বার আমার এলাকা।’
তখন ভোর সাড়ে চারটে। যত দূর চোখ যায় কুয়াশায় ঢেকে রয়েছে। তবু তার মধ্যেও মুম্বই বন্দরের বিশালতাটা আন্দাজ করতে পেরেছিল পল্লব আর রোশনি দু’জনেই। ওদের নিয়ে জাহাজের দিকে এগিয়ে গেছিল অভয়। সকাল সাড়ে সাতটায় তিন বার ভোঁ বাজিয়ে ইরাকের উম কাসর বন্দরের উদ্দেশে ভেসে পড়েছিল স্বর্ণ গোদাবরী।
এখন বিকেল সাড়ে চারটে। প্রায় ন’ঘণ্টা সমুদ্রযাত্রা হয়ে গেল ওদের। জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়াতেই শরীর, মনের সব জড়তা কেটে গেল পল্লবের। যত দূর চোখ যায় শুধু ঘন নীল জল। দূরে পশ্চিম দিগন্তে হলদে হয়ে এসেছে আকাশ। তাতে এক পশলা কমলা রঙের ছোঁয়া লেগেছে। নিষ্প্রভ সূর্য একটা সরলরেখায় ছড়িয়ে রয়েছে জলের ওপর। সেখানে জলের রং-ও হলদে কমলা। ঢেউয়ের মাথায় চেপে সেই রং ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছে ওদের জাহাজের দিকে। অদ্ভুত একটা হাওয়া দিচ্ছে। তাতে জলের গন্ধ। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে সি গাল। বিশাল ডানার অ্যালবাট্রস। আরও কত কত পাখি। পল্লব তাদের নাম জানে না।
পল্লব এর আগে এক বারই সমুদ্রে ভেসেছে। আন্দামান গিয়ে এক দ্বীপ থেকে আর এক দ্বীপে যাওয়ার সময়। কিন্তু ক্রুজের ভেতর বসে সমুদ্রের এই বিশালতার কোনও ধারণাই পাওয়া সম্ভব না। সঞ্জয় এক বার তাকে বলেছিল, ‘আমরা কথায় কথায় বলি ইনফিনিটি। কিন্তু ইনফিনিটি সম্পর্কে আমাদের কোনও ধারণা নেই। অসীম শব্দটার কোনও অনুভব বা কোনও দৃষ্টান্ত নেই আমাদের কাছে।’
আজ জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে অসীম না হলেও তার কাছাকাছি একটা কিছুর ধারণা পাচ্ছিল পল্লব। এই অবিশ্রান্ত সীমাহীন জলরাশিপুঞ্জের বিশালতা যেন তার চেতনার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল। তিতাসকে হারানোর বেদনায় তার মনের গহনে যে ঝড় উঠে রয়েছে তাকে যেন শুষে নিচ্ছিল এই মহাজলধি। পল্লবের চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
***
দেখতে দেখতে তিনটে দিন কেটে গেল জাহাজে। জাহাজের ক্যাপ্টেন বাঙালি। ভবানীপুরে বাড়ি। নাম সৃজন মিত্র। যেমন বিশাল দশাসই চেহারা। তেমন বাজখাঁই গলার আওয়াজ। বছর পঞ্চাশেক বয়স। অভয় ক্যাপ্টেনকে পল্লব আর রোশনির ব্যাপারে সবই বলেছে। ওদের সঙ্গে ভদ্রলোকের খুব জমে উঠেছে। ক্যাপ্টেন রান্না করতে ভালোবাসেন। এই ক’দিন ধরে উনিই নানারকম রান্না করে খাওয়াচ্ছেন।
আজও ডিনার শেষে ডেকে এসে দাঁড়িয়েছিল ওরা চার জন। পল্লব, রোশনি, অভয় আর ক্যাপ্টেন। এ জাহাজে ওরা চার জন ছাড়া লোক রয়েছে আরও ১৪ জন। তারা কেউ নাবিক, কেউ মেট, কেউ ইঞ্জিনিয়ার আর ছ’জন সশস্ত্র রক্ষী। ক্যাপ্টেন বললেন, ‘আমরা এখন পারস্য উপসাগরে। আগামীকাল দুপুর একটা নাগাদ আমরা উম কাসরে নোঙর ফেলব। আমাদের একদিকে এখন ইরান। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার আর বাহরিন। ইরানের গা ঘেঁষে চলছি। এই রুটটা খুব সেফ। তেল যায় তো। প্রচুর পেট্রলিং হয় সারাক্ষণ। আগে একসময় এই রুটে জলদস্যুদের উপদ্রব ছিল। জাওয়াসামি বলে একটা ট্রাইব খুব জ্বালাতন করত। নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরির গোড়ার দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই পার্সিয়ান গালফে জলদস্যু দমন করে। অবশ্য একটা বিরুদ্ধ মতও আছে।’
রোশনি বলল, ‘সেটা কী স্যার?’
কেউ কেউ বলে, ‘পার্সিয়ান গালফ বরাবরই শান্ত। এখানে কোনও দিনই কারও উপদ্রব ছিল না। আসলে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারতের যে বাণিজ্য হতো সেটা ছিল ট্যাক্স ফ্রি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গা জ্বলছিল। তাই একটা কন্সপিরেসি করে জাওয়াসামিদের ঘাড়ে দোষ দিয়ে-টিয়ে ওরা এই পারস্য উপসাগরের ট্রেডটা নিজেদের কবজায় নিয়েছিল।’
পল্লব বলল, ‘আপনার কোন মতটা ঠিক মনে হয়?’
ক্যাপ্টেন বললেন, ‘ঠিক-ভুল জানি না, তবে আমি ব্রিটিশদের বিশ্বাস করি না। পরের ধনে পোদ্দারি করা ওদের স্বভাব। নিজেদের স্বার্থে ওরা সব করতে পারে।’
রোশনি হেসে বলল, ‘স্যার, আপনার তো খুব রাগ দেখছি ব্রিটিশদের ওপর!’
‘রাগ হবে না? দুশো বছর ধরে দেশটাকে ছিবড়ে করে দিয়েছে শয়তানগুলো। আমি তো আমার মতো করে যত বার সুযোগ পেয়েছি ব্রিটিশদের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছি।’
কথাটা শুনে খুবই কৌতূহল হল পল্লবের। বলল, ‘কী রকম? কী রকম?’
ক্যাপ্টেন বললেন, ‘এই যেমন ধরো আমি ইউকে-তে পড়াশোনা করেছি। ওদের দেওয়া স্কলারশিপে ওদের শেখানো বিদ্যে আত্মস্থ করেছি। তার পরে ওরা আমায় ও দেশে চাকরি দিতে চেয়েছিল। আমি নিইনি। দেশে ফিরে এসেছিলাম। তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ওদের আমি ইউজ করেছি তাই না? তার পরে ধরো আমি যে কোম্পানিতে চাকরি করছিলাম আচমকাই সেটার ফিফটি ওয়ান পার্সেন্ট শেয়ার কিনে নিল একটা ব্রিটিশ জাহাজ কোম্পানি। আমি চাকরি ছাড়ব বুঝতে পেরে ওরা আমার স্যালারি দ্বিগুণ করে দিল। এই সময়ই মিস্টার বসাক আমাকে অভয়ের কথা বললেন। ওরা আমার ভরসায় একটা নতুন জাহাজ নামাবে ভাবছিল। আমি অভয়ের কাছে চলে এলাম। অভয়ের কোম্পানিটা সাজিয়ে দিলাম। ওদের পথে বসিয়ে দিলাম। তা হলে প্রতিশোধ নেওয়া হল কি না বলো?’
ক্যাপ্টেনের কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। অভয় বলল, ‘ক্যাপ্টেন সাহেব না থাকলে আমি কোনও দিনই আমার কোম্পানিটা দাঁড় করাতে পারতাম না। আমি সাহেবকে বললাম, স্যার আপনি আমার কোম্পানির সিইও হয়ে যান। আমার পার্টনার হয়ে যান। স্যার শুনলেন না।’
অভয়ের পিঠে একটা চাপড় মেরে ক্যাপ্টেন বললেন, ‘ও সব আমার জন্য নয় অভয়। আমার জন্ম হয়েছিল জাহাজে।’
পল্লব বলল, ‘জাহাজে!’
‘ইয়েস মাই বয়। বাবা আন্দামানে চাকরি করত। মা বাবা দু’জনেরই ইচ্ছে ছিল ছেলের জন্ম হবে কলকাতায়। সেই প্ল্যান করে কলকাতায় আসছিল দু’জন। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে আকাশপথ অতটাও সচল ছিল না। জলপথই ব্যবহার হতো বেশি। কিন্তু সমুদ্রে ঝড় এল। জাহাজটা দিক ভুল করে অন্য একটা দ্বীপের চড়ায় আটকে গেল। সেখানে সাত দিন আটকে রইল। রেসকিউ টিম গিয়ে যতক্ষণে উদ্ধার করল ততক্ষণে মায়ের প্রসববেদনা উঠে গেছে। ব্যাস, আমার জন্ম হল মাঝসমুদ্রে। তখন থেকেই আমার কপালে লেখা আছে আমি নাবিক হব। সেইলর। অফিস ওয়ার্ক আমার জন্য না। আমি সমুদ্রে জন্মেছি, সমুদ্রেই মরব।’
কথাটা শেষ হওয়া মাত্র জল-হাওয়ার শব্দ ছাপিয়ে শিসের মতো একটা শব্দ কানে এল আর ক্যাপ্টেন সাহেবের অত বড়ো শরীরটা ধড়াস করে আছড়ে পড়ল ডেকের ওপরে। ওরা অবাক হয়ে দেখল, ক্যাপ্টেন সাহেবের কপালের ঠিক মাঝখানে দু’টাকার কয়েনের সাইজের একটা গর্ত। সেখান থেকে রক্তের একটা সরু ধারা নেমেছে। ওদের বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই আবার একটা শিসের শব্দ হল আর ওদের থেকে কয়েক হাত দূরে থাকা একজন গার্ড একই ভাবে উলটে পড়ল ডেকের ওপরে। এক ধাক্কায় পল্লব আর রোশনিকে ডেকে ওপরে ফেলে দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ল অভয়। ফিসফিস করে বলল, ‘আমাদের ওপর অ্যাটাক হয়েছে। শিগগির কেবিনের দিকে চলুন। ফাস্ট। না না উঠবেন না। এ ভাবে বুকে হেঁটে চলুন। ফাস্ট ফাস্ট।’
বেশি দূর যেতে পারল না ওরা তার আগেই জাহাজের গা বেয়ে উঠে ডেকের ওপরে লাফিয়ে নামল মুখ ঢাকা কয়েকজন লোক। তাদের হাতে অত্যাধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্র। চিৎকার করে বলল, ‘ডোন্ট মুভ।’
দশ মিনিটের মধ্যে স্বর্ণ গোদাবরীর দখল নিল ১৬ জন জলদস্যু। চারটে ছোটো ভেসেলে করে ওরা এসেছে। এমন নিঃশব্দে এসেছে কেউ টের পায়নি। তার থেকেও বড়ো কথা এই এলাকায় যে জলদস্যুর আক্রমণ হতে পারে কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। তা হলে হয়তো জাহাজ দখলটা এত সহজে হতো না। ক্যাপ্টেনসহ তিন জন সশস্ত্র রক্ষীকে ওরা আগেই মেরে ফেলেছিল। পালাতে গিয়ে মারা পড়ল আরও দু’জন ক্রু। বাকিরা সবাই আত্মসমর্পণ করল। দ্রুত সবার হাত-পা বেঁধে ডেকের ওপরেই শুইয়ে দিল ওরা। এক জন ছোটোখাটো কিন্তু শক্তপোক্ত চেহারার লোক ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারও মুখ ঢাকা। ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘আমার নাম ফারসাদ আল কাসিমি। আমরা জাওয়াসামি পাইরেটস। সবাই ভাবে জাওয়াসামিরা হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যে হারিয়ে যাইনি তোমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছ। আমরা আবার একত্রিত হয়েছি। তোমাদের এই জাহাজ দিয়েই আমরা কাজ শুরু করলাম। তোমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করো কারণ প্রত্যাবর্তনের পরে জাওয়াসামিদের প্রথম টার্গেট তোমরাই। আমাদের কথা শুনে চললে প্রত্যেকেই প্রাণে বেঁচে যাবে। আর নয়তো…’
পল্লবের পাশে শুয়ে অভয় ফিসফিস করে বলল, ‘ভদ্রলোক হয়ে যাওয়ার পর থেকে আর আর্মস ক্যারি করি না। এটাই সবচেয়ে বড়ো ভুল হয়ে গেল।’
পরের কয়েক ঘণ্টায় স্বর্ণ গোদাবরী একটা বন্দরে গিয়ে ভিড়ল। বড়ো বড়ো ক্রেন এসে কন্টেনারগুলো নামাতে শুরু করল জাহাজ থেকে। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ সমস্ত কন্টেনার নামানো হয়ে গেল। শেষ কন্টেনারটা নামানোর আগে পল্লবদের সবাইকে গাদাগাদি করে সেটার মধ্যে ভরে দেওয়া হল। শেষ কন্টেনারটা নেমে যেতেই জাহাজটাকে সেই বন্দর থেকে অনেকটা দূরে নিয়ে আসা হল। তার পরে সেটায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল।
মাঝসমুদ্রে দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল অভয় ছিত্রের সাধের জাহাজ স্বর্ণ গোদাবরী। সেই আগুনকে পেছনে রেখে একটা স্পিড বোটের ওপর বসে একটা ভিডিয়ো বানাল ফারসাদ আল কাসিমি। গোটা দুনিয়ার উদ্দেশে সে বার্তা দিল, ‘উই আর জাওয়াসামিজ। আমরা আবার ফিরে এসেছি। এ বার থেকে পার্সিয়ান গালফে আমাদের হুকুমত চলবে। সবাই তৈরি থাকুন। আল্লা হু আকবর।’
যতক্ষণে সমীরণ বসাক এই আগুন এবং ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কাসিমির ভিডিয়োটা দেখলেন ততক্ষণে পল্লব, রোশনি, অভয় এবং আরও ন’জনসহ কন্টেনারটা একটা বিশাল ট্রাকে চেপে বসেছে আর সেটা চলতে শুরু করেছে। পল্লব আর রোশনি আন্দাজ করতে পারছিল এর পর যেটা হতে চলেছে সেটা মোটেই ভালো হবে না। কিন্তু ওরা আন্দাজ করতে পারল না এর পর ওদের যা হবে তাকে বলে নরকদর্শন।
