লাপিস লাজুলি – ৯
॥ নয় ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
চারটে দিন শুয়ে-বসে কেটে গেল। বাগদাদ পৌঁছোনোর পরেই সমীরণ বসাকের ফোন এসেছিল অপালার কাছে। সমীরণ জানিয়েছিলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত সঞ্জয় আর অপালার আসল ভিসা তৈরি করে ওদের কাছে পাঠানো হচ্ছে ততক্ষণ অবধি ওদের হোটেলেই থাকতে হবে। বাইরে বেরোনো চলবে না। খুব বেশি হলে হোটেলের সামনে যে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আর যে ক্যাফেটা আছে সেটায় যাওয়া যেতে পারে। তাও দু’জন একসঙ্গে নয়।
ভাদুড়ি মশায়ের সঙ্গেও কথা হয়েছে। অপালা রোজই দিনে দু’বার করে ফোন করে দাদুর খোঁজ নেয়। মশায় বলেছেন, ভিসা এলে ওদের প্রথম কাজ হবে ইরাক মিউজিয়মের ডিরেক্টর জেনারেল রিচার্ড বেক-এর সঙ্গে দেখা করা। কিন্তু ভিসাটা আসবে কবে?
বিকেল হতেই খেপে উঠল অপালা। বাইরে খুব মেঘ করেছে। অদ্ভুত সুন্দর একটা হাওয়া দিচ্ছে। চারদিকে বেশ একটা ছুটির মেজাজ। হোটেলের সামনের রাস্তাটায় লোকজনের ভিড়। ক্যাফেটাতেও লোকজন ঢুকছে, বেরোচ্ছে। ব্যালকনি থেকে এ সব দেখে অপালার তার কেটে গেল। বলল, ‘আজ আমি কিছুতেই ঘরে থাকব না। রেডি হও সঞ্জয়।’
সঞ্জয় বলল, ‘রেডি হব মানে?’
‘রেডি হবে মানে রেডি হবে। আমরা দু’জন মিলে ক্যাফেটায় যাব। রাস্তায় হাঁটব। ঘরে থেকে থেকে আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’
অপালা এমনিতে শান্ত মানুষ। কিন্তু এক বার তার কাটলে তখন তাকে কিছুতেই সামলানো যায় না। তাও সঞ্জয় একটা ক্ষীণ চেষ্টা করল, ‘জিয়ারতের নাম করে এসে দু’জন মিলে ক্যাফেতে ঢুকে খেলে কেমন একটা দেখতে লাগবে না? কারও যদি সন্দেহ হয়? আর দুটো দিন দাঁড়িয়ে যাও না প্লিজ। ভিসা এসে গেলেই তো আমরা বুক ফুলিয়ে ঘুরতে পারব।’
‘সেটা যখন আমরা গোটা ইরাক চষে বেড়াব তখন দরকার হবে। ট্রাস্ট মি, এই সামনের রাস্তায় যদি আমরা হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াই কেউ আমাদের সন্দেহ করবে না। তুমি দেখো না কত কাপল বেরিয়ে পড়েছে। আমার আর ভালো লাগছে না সঞ্জয়। এভাবে দিনের পর দিন ঘরে বন্দি থাকা যায়! তার ওপরে পল্লব ফোন ধরছে না। দাদু, অমিয় বা পালদা কারও ফোনই ধরেনি। একটু আগেও করলাম, সুইচড অফ বলছে। ও কি আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইছে না? ও কি বুঝতে পারছে না যে ওকে না নিয়ে আসায় আমাদের কোনও ভূমিকা নেই। দাদুর ডিসিশন এটা। ও দাদুর ওপর রাগ করুক। আমাদের ফোন ধরবে না কেন বলো তো? গোটা ব্যাপারটাই আমার খুব ফ্রাস্টেটিং লাগছে।’
সঞ্জয় আর কথা বাড়াল না। বলল, ‘চলো। ফিরে এসে আমি আবার ওকে ফোন করব। যদি না ধরে তা হলে অমিয়র সঙ্গে কথা বলতে হবে। ওর বাড়িতে খোঁজ নিতে বলব।’
জামাকাপড় বদলাতে বাথরুমে ঢুকে গেল অপালা। ব্যালকনির দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে হোটেলের উলটো দিকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনেটায় দাঁড়িয়ে থাকা কেকের গাড়িটার দিকে নজর পড়ল সঞ্জয়ের। গত তিন দিন ধরে ধরে গাড়িটা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে। সকাল থেকে রাত অবধি গরম-গরম কেক বেক করে দিচ্ছে। গতকাল রাতে বেরিয়ে সে কেক নিয়েও এসেছিল। খুবই ভালো খেতে। গাড়িটার সামনে এখন বেশ ভিড়। কেক বেক হওয়ার গন্ধে ম-ম করছে চারপাশ। ওদের ড্রাই ফ্রুটস কেকটা খুবই সুস্বাদু। সঞ্জয় ঠিক করল, নেমে একটা কেক খাবে।
মানুষ বড়ো অসহায়। সে তার ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। সঞ্জয় জানে না, ওই কেকের গাড়িটার মধ্যেই বসে রয়েছে ঘাতক। অপেক্ষা করছে তার আর অপালার জন্যই।
ঘাতকের নাম ওমর হাসান। ২৭ বছর বয়স। আইসিসের অন্যতম সেরা অ্যাসাসিন। মিলিটারি কমান্ডার। আইসিস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদি স্বয়ং তাকে পুরস্কৃত করেছিল। সিরিয়ার রাক্কায় বাড়ি। বাবা ইঞ্জিনিয়ার। ২০১৪ সালে নেহাতই কিশোর বয়সে ওমর আইসিসে যোগ দিয়েছিল। ওমরের পরিবার সর্বান্তকরণে এই তীব্র মৌলবাদের বিরোধিতা করত। তাই আইসিসের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে ওমর বাবাকে খুন করেছিল এবং দলের অন্য সদস্যদের দিয়ে মা আর বোনকে ধর্ষণ করিয়েছিল। আইসিসের অন্দরে ওমরের ডাকনাম ‘নিপল হান্টার’। মেয়েদের ধর্ষণ করার পরে সে তাদের স্তনবৃত্ত কেটে চিউয়িং গামের মতো চিবিয়ে খেয়ে ফেলত। আইসিসের পতনের পর ওমর ইরানে পালিয়ে গেছিল। আমেরিকান সৈন্য তাকে ধরতে পারেনি। এখনও সে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’।
কয়েক বছর লুকিয়ে থাকার পরে আবার ডাক এল। নতুন করে শক্তি সংগ্রহ করছে আইসিস। নতুন এক নেতার নেতৃত্বে আবার একজোট হচ্ছে দুনিয়া জুড়ে শরিয়া আইন কায়েম করতে চাওয়া মুসলমানেরা। খুব গোপনে শুরু হচ্ছে যুদ্ধের প্রস্তুতি। আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে স্লিপার সেলগুলো, রিক্রুটাররা। সারা দুনিয়া থেকে যুবক-যুবতীরা আসতে শুরু করেছে সিরিয়ায়। গোপন ক্যাম্পে চলছে তাদের ট্রেনিং। আসছে কোটি কোটি ডলারের বিদেশি ফান্ড। এ বারের আইসিস হবে আগের বারের চেয়েও শক্তিশালী। ওমর কানাঘুসোয় শুনেছে এ বারের নেতা, অর্থাৎ খলিফা নাকি আবু বকর আল বাগদাদির চেয়েও মারাত্মক। ভয়াবহ। আবু বকর আল বাগদাদি নিজেকে ‘খলিফা ইব্রাহিম’ বলতেন। নতুন খলিফার নাম ‘মুস্তাফা’। কিন্তু মজার বিষয় হল, এই খলিফাকে কেউ দেখেনি। নতুন আইসিসের অন্দরে যথেষ্টই জান- পহেচান আছে ওমরের। থার্ড ইন কমান্ড দারিয়ুস মহম্মদ নিজে ওমরের সঙ্গে মিটিং করেছে। কিন্তু দারিয়ুসও নতুন খলিফাকে দেখেনি। ঠিক আছে, খলিফাকে না দেখতে পেলেই বা কী এসে যায়? আসল কাজ হল খিলাফতের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। খলিফার মুখ না, আদেশটাই আসল।
এই তো যেমন সিরিয়ার জাজিরায় মরুভূমির মধ্যে এক গোপন ডেরায় সে নতুন ছেলেদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল, তার কাছে খবর এল বাগদাদ যেতে হবে। ইন্ডিয়া থেকে দু’জন গুপ্তচর বাগদাদ এসে পৌঁছেছে। তারা আইসিসের ওপরে নজরদারি করতেই এসেছে। এই দু’জনকে খতম করতে হবে। এ ধরনের ছোটোখাটো কাজ ওমরের করার কথা না। কিন্তু নির্দেশ আছে, একদম ‘ক্লিন অপারেশন’ করতে হবে। কারণ বাগদাদে ইরাকি সেনাবাহিনী খুব তৎপর। তা ছাড়া এই ইন্ডিয়া দেশটা খুব একটা সুবিধের না। যদি কোনও ভাবে জানাজানি হয় এই হত্যাকাণ্ডে আইসিস জড়িত, তা হলে সমস্যা হতে পারে। এ বার পুরোপুরি তৈরি হওয়ার আগে বাইরের দুনিয়াকে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে চায় না আইসিস। তারা চায়, আইসিস শেষ হয়ে গেছে ভেবে গোটা দুনিয়া যেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে তেমনই ঘুমোক।
নির্দেশ আছে, দু’জন এজেন্টকে খতম করার পরে যত দ্রুত সম্ভব বাগদাদ থেকে বেরিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে আসতে হবে। তাই জন্যই এই কেকের গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেখতে মালবাহী গাড়ি মনে হলেও গাড়ির ইঞ্জিনটা খুব শক্তিশালী। ঘণ্টায় একশো কিলোমিটার গতিবেগ তুলতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। তিন দিন আগে ব্যাবিলন রোটানার সামনে এসে দাড়িয়েছে গাড়িটা। তখন থেকে কোমরে সাইলেন্সার লাগানো বন্দুক গুঁজে অপেক্ষা করে চলেছে ওমর। কেক বিক্রি করছে আর নজর রাখছে হোটেলের দিকে। এর মধ্যে বেশ কয়েক বার কখনো ছেলেটাকে, কখনো মেয়েটাকে বেরোতে দেখেছে সে। ছেলেটা তো তার কাছ থেকে কেক কিনেও নিয়ে গেছে। মারতে চাইলে মেরেই দিতে পারত কিন্তু আলাদা আলাদা করে মারার হুকুম নেই। একসঙ্গে মারতে হবে দু’জনকে আর মেরেই পালাতে হবে ঘটনাস্থল থেকে।
এই পালানো ব্যাপারটাই ওমরের না পসন্দ। আগের বার যখন তারা একের পর এক শহর দখল করছিল কেমন বুক ফুলিয়ে ঢুকছিল শহরগুলোয়। আইসিস আসছে খবর পেয়েই বেশিরভাগ লোক পালিয়েছিল। তার পরেও কিছু লোক বাধা দিতে এসেছিল। এ ধরনের লোক চিরকালই থাকে। যেমন ছিল তার বাবা। এরা অকালে মরে। কিছু করার নেই। বাধা দিতে আসা পুরুষদের তারা ঝাঁঝরা করে দিচ্ছিল গুলিতে আর ঘর থেকে টেনে বার করে আনছিল মেয়েদের। সেনাবাহিনীর মনোরঞ্জনের জন্য অনেক মেয়ে দরকার হয়। মারতে মারতে মেয়েগুলোকে তোলা হচ্ছিল ট্রাকে। যারা বেশি ছটফট করছিল তাদের তখনই গুলি করে বা কুপিয়ে মেরে দেওয়া হচ্ছিল। একটা মেয়ের কথা আজও মনে আছে ওমরের। কত বয়েস হবে কুড়ি-একুশ। তখনকার ওমরের থেকে একটুই বড়ো। বাঘের মতো লড়ছিল মেয়েটা। তিন জন মিলে টেনেও তাকে ট্রাকে তুলতে পারছিল না। আঁচড়ে-কামড়ে একাকার করে দিচ্ছিল। মেয়েমানুষের এত তেজ ভালো লাগে না ওমরের। সোজা এগিয়ে গিয়ে সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিয়েছিল মেয়েটার গালে। রাস্তায় উলটে পড়েছিল মেয়েটা। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরোচ্ছিল। কিন্তু ওই অবস্থাতেই ঘুরে তাকিয়েছিল ওমরের দিকে। চাহনিটা আজও মনে আছে ওমরের। অমন জ্বলজ্বলে চোখ সে আজ অবধি কারও দেখেনি। চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছিল। ধীরে ধীরে মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল মেয়েটা তার পরে সবাইকে হতবাক করে আচমকা টেনে এক থাপ্পড় কষিয়েছিল ওমরকে। মেয়েটা লম্বা-চওড়া ছিল। ওমর রোগা-পাতলা। চড় খেয়ে মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল ওমরের। পড়তে-পড়তে কোনও মতে একটা ট্রাকের ডালা ধরে নিজেকে সামলে নিয়েছিল ঠিকই কিন্তু ডালার সঙ্গে ঘষা খেয়ে গভীর ভাবে কেটে গেছিল বাঁ-দিকের ভুরুর ওপরটা।
মেয়েটার দু’হাত কেটে আলেপ্পোর রাস্তায় ফেলে তারা চল্লিশ জন মিলে তাকে ধর্ষণ করেছিল ঠিকই কিন্তু ভুরুর ওপরের ক্ষতটা আজও মিলিয়ে যায়নি। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে ওমর, অনেক ওষুধ লাগিয়েছে কিন্তু দাগটা কিছুতেই যাচ্ছে না। বোধ হয় এ জীবনে আর যাবেও না।
এ সব ভাবতে ভাবতেই ওমরের চোখ গেল হোটেলের দরজায় আর সবক’টা ইন্দ্ৰিয় সজাগ হয়ে উঠল। ওই তো ছেলেটা আর মেয়েটা। একসঙ্গে। এই মুহূর্তটার জন্যই তো সে তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছে। দ্রুত ইশারা করল সঙ্গীদের। এক জন ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়িটায় স্টার্ট দিল। অন্য জন ঘোষণা করে দিল, আজকের মতো বিক্রি বন্ধ। পেছনের ডালাটা বন্ধ করে দিল। কেক বিক্রির জন্য যে কাউন্টার করা হয়েছিল তার ফাঁক দিয়ে দু’জনের দিকে বন্দুক তাক করল ওমর। বন্দুকটা এমন ভাবে তাক করা আছে যে একমাত্র নীচ দিয়ে না দেখলে কারও নজরে পড়বে না। ওই তো ছেলেটা আর মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয়ে এগিয়ে আসছে। আর একটু, তার পরেই ওরা এসে পড়বে রেঞ্জের মধ্যে। আর বিশ কদম। পনেরো, দশ… বন্দুকের সেফটি ক্যাচটা খুলে নিল ওমর… পাঁচ… চার… তিন… ঠিক তখনই গন্ডগোল হয়ে গেল। একটু দূরে মায়ের হাত ধরে দাঁড়ানো একটা সাত-আট বছরের বাচ্চার চোখে পড়ে গেল বন্দুকসহ ওমর। বাচ্চাটা চিৎকার করে উঠল, ‘মাম্মা গান ‘
‘গান’ শব্দটা এমনিতেই ভয়ের কিন্তু কোনও কোনও অঞ্চলে এর অভিঘাত আরও বেশি। যে দেশের মানুষ সারাক্ষণ যুদ্ধ দেখছে তাদের কানে কোনও বাচ্চার গলা থেকে ভেসে আসা ‘গান’ শব্দটা শুধু আতঙ্কেরই জন্ম দেয় না, তাদের মনে যুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতিও বয়ে আনে নিমেষে। তাই এই চিৎকারটা হতেই চারপাশে একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। যে যে দিকে পারল দৌড়োতে শুরু করল। ছেলেটা আর মেয়েটাও দৌড়ে ঢুকে গেল হোটেলের মধ্যে। দাঁতে দাঁত চাপল ওমর। কোনও বাচ্চা যে নীচ থেকে দেখে ফেলতে পারে এটা তার মাথায় আসেনি। চাপা গলায় সে আরবিতে নির্দেশ দিল, ‘এহবাহবন। ইয়াজরি।’ যার অর্থ, ‘অ্যাবর্ট। রান।’
গাড়িটা চলতে শুরু করতেই পেছনের ডালাটা লাথি মেরে খুলে দিল ওমর আর মায়ের হাত ধরে ছুটতে থাকা ‘গান’ বলে চিৎকার করে ওঠা বাচ্চাটার মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দিল। মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল বাচ্চাটা। মা-টা ভাবল বুঝি হোঁচট খেয়েছে কিন্তু নীচু হয়ে তুলতে গিয়ে সে আবিষ্কার করল, তার বাচ্চাটা মরে গেছে!
***
তখনও খুব একটা ধাতস্থ হতে পারেনি অপালা আর সঞ্জয়, ফোন বেজে উঠল। সমীরণ বসাক ফোন করেছেন। ফোন ধরতেই সমীরণ উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, ‘তোমরা সেফ আছ তো? তোমাদের হোটেলের সামনেই গুলি চলেছে খবর পেলাম।’
অবাক হল সঞ্জয়। কত বড়ো নেটওয়ার্ক লোকটার! গুলি চলেছে দশ মিনিটও হয়নি তার মধ্যে ফোন এসে গেল! সে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আমরা ঠিক আছি। কিন্তু হঠাৎ গুলি চলল কেন স্যার?’
‘এখনও বোঝা যাচ্ছে না। লোকাল পুলিশ ইনভেস্টিগেট করছে। যাই হোক তোমরা বাইরে বেরিয়ো না। আজ রাত তিনটের সময় তোমাদের কাছে এক জন লোক যাবে। সে তোমাদের অন্য একটা হোটেলে নিয়ে যাবে। দরজায় নক হলে তোমরা বলবে, পানিপুরি লায়ে? মনে থাকবে কী বলবে?’
‘হ্যাঁ স্যার। কিন্তু পানিপুরি…’
‘এটা কোড। উত্তরে লোকটা যদি বলে নেহি, লেকিন চাট লায়া, তবেই দরজা খুলবে। যদি অন্য কিছু বলে বা কোনও উত্তর না পাও সোজা রিসেপশনে ফোন করবে। বুঝেছ?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘আর একটা কথা, কখনোই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কনভারসেশন করবে না। দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলবে। ক্লিয়ার?’
সঞ্জয়ের বুকটা কেঁপে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই অপালা বলে উঠল, ‘একটা কথা বলুন, আপনি আমাদের এত সাবধানতা নিতে বলছেন কেন? হোটেলই-বা চেঞ্জ করতে হবে কেন? কেউ কি আমাদেরও টার্গেট করতে পারে?’
একটু থেমে সমীরণ বললেন, ‘দেখো অপালা, গুলি কেন চলেছে আমি বলতে পারব না। কিন্তু আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, তোমাদের ওখানে রাখাটা ঠিক হবে না। কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে তোমরা ওখানে সেফ না। সময়টা ভালো যাচ্ছে না হে।’
সমীরণের বলার মধ্যে অদ্ভুত একটা অসহায়তা টের পেল ওরা দু’জন। সঞ্জয় বলল, ‘এ কথা বললেন কেন স্যার? কী হয়েছে?’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমীরণ বললেন, ‘জানি না তোমাদের বলা উচিত হবে কি না, কিন্তু না বলেও আমি থাকতে পারছি না। আজ দুপুর বেলা পার্সিয়ান গালফে একটা ইন্ডিয়ান কার্গো শিপ হাইজ্যাক করে জ্বালিয়ে দিয়েছে জাওয়াসামি পাইরেটসরা। জাহাজটায় পল্লব আর রোশনি বলে একটি মেয়ে ছিল। ওরা ইরাক আসছিল।’
কিছুক্ষণের জন্য স্থবির হয়ে গেল সঞ্জয় আর অপালা। একসঙ্গে নানা কথা ভিড় করে এল মাথায়। এই জন্যই তা হলে পল্লব ফোন ধরছিল না! পল্লব ইরাক আসছিল! ও জাহাজে উঠল কেমন করে! কিন্তু এগুলোর একটাও না বলে দু’জনে একটাই প্রশ্ন করে উঠল। প্রিয়জনের জন্য উদ্বেগ ওদের দিয়ে এই কথাটাই বলিয়ে নিল, ‘পল্লব বেঁচে আছে তো স্যার?’
দু’সেকেন্ডের জন্য চুপ করে গেলেন সমীরণ। ওই দু’সেকেন্ডই ওদের কাছে মনে হল অনন্তকাল। ছটফট করে উঠল সঞ্জয়, ‘কী হল স্যার? চুপ করে গেলেন কেন? বলুন না, পল্লব বেঁচে আছে তো? ও কোথায়?’
‘জানি না।’
‘জানেন না মানে,’ চমকে উঠল অপালা।
‘জাহাজটা মাঝসমুদ্রে জ্বলছিল। উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছে জাহাজের মধ্যে কারও বডি খুঁজে পায়নি। ওই জাহাজে পল্লব আর রোশনি ছাড়াও আরও ১৪ জন লোক ছিল। কারও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি এখনও অবধি। কাউকে পণবন্দি করার কথা ঘোষণাও করেনি জাওয়াসামিরা। ওরা স্রেফ জাহাজটা লুঠ করেছে। এবার ওই ১৬ জনকে ওরা কোথাও আটকে রেখেছে নাকি মেরে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে সত্যিই আমি জানি না।’
চোখে জল এসে গেল সঞ্জয়ের। ধরা গলায় সে বলল, ‘এ বার তা হলে কী হবে স্যার?’
‘ভাদুড়ি স্যারের শরণ নেওয়া ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই। আমি অলরেডি কলকাতায়। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যারের বাড়ি পৌঁছে যাব। পারলে এই বিপদ থেকে একমাত্র স্যারই উদ্ধার করতে পারবেন।’
‘কী কথা হল প্লিজ আমাদের জানাবেন স্যার। আমরা খুব চিন্তায় আছি,’ কাতর গলায় বলল সঞ্জয়।
‘নিশ্চয়ই জানাব। এখন রাখি আর যা বললাম মনে রেখো।’
ফোন রেখে দিলেন সমীরণ বসাক আর এতক্ষণে অপালাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সঞ্জয়। সান্ত্বনা দেওয়ার মতো শক্তি অপালারও নেই। তার চোখেও জল।
***
ভাদুড়িমশায়ের লাইব্রেরি ঘরে মাথা নীচু করে বসে আছেন সমীরণ আর ভাদুড়িমশায় তীব্র ভাবে তিরস্কার করছেন তাঁকে, ‘এই সব কিছুর জন্য দায়ী তুমি। যদি প্রয়োজন হতো আমিই পল্লবকে ইরাক যেতে বলতাম। আমরা একটা অসম লড়াইয়ে নেমেছি সমীরণ আর সেখানে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোদ্ধাকেই হারিয়ে বসে আছি। হ্যাঁ, তিতাসকে উদ্ধার করতে গেলে ইনান্নার দণ্ডের পরে যাকে সবচেয়ে বেশি করে দরকার সেই মানুষটা হল পল্লব। আর সেই জন্যই আমি ওকে কোনও রকম বিপদের মধ্যে পাঠাতে চাইনি। আর তুমি কি না আমার সঙ্গে কোনও রকম আলোচনা না করে…. না না না, আমি ভাবতে পারছি না। পল্লবই যদি না থাকে তা হলে ইনান্নার দণ্ড খুঁজে পেয়েও কোনও লাভ হবে না। তোমার মতো বিচক্ষণ মানুষের কাছে এই ছেলেমানুষি আমি আশা করিনি।’
দু’হাতে কপালের রগ ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভাদুড়িমশায়। এতক্ষণে সাহস করে সমীরণ বলে উঠলেন, ‘স্যার আমার মন বলছে পল্লব বেঁচে আছে।’
তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকালেন ভাদুড়িমশায়। সেই দৃষ্টির সামনে গুটিয়ে এতটুকু হয়ে গেলেন সমীরণ। মশায় বললেন, ‘তোমার মনে হওয়াতে এখন আর কিছু এসে যায় না। যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। চলে যাও এখান থেকে। তোমায় দেখলেই আমার বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছে। তোমার কাছে সাহায্য চাওয়াই আমার ভুল হয়েছিল। তোমার বোকামির জন্য ছেলে-মেয়ে দুটো এত বড়ো বিপদে পড়ল।’
আমতা-আমতা করে সমীরণ বললেন, ‘স্যার, আপনি যত খুশি বকুন। মারুন। কিন্তু আমার কথাটা একবার শুনুন প্লিজ। আমার মন না, আমার ক্যালকুলেশন বলছে, পল্লব বেঁচে আছে। আর সিদ্ধান্তটায় এসেছি এতক্ষণ অবধি পাওয়া সব তথ্য বিবেচনা করেই। আমার ভুল হয়েছে আমি মানছি। আমার ওপর আপনার ক্ষিপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার ডিডাকশনকে তো আপনি গুরুত্ব দেবেন তাই না? পল্লবের খোঁজ পাওয়াটাই এখন আমাদের প্রায়োরিটি, বলুন?’
সমীরণকে একটু মাপলেন ভাদুড়িমশায়। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বলো, শুনি। কী তোমার ডিডাকশন।’
এতক্ষণে আশার আলো দেখলেন সমীরণ। গলা ঝেড়ে বলতে শুরু করলেন, ‘স্যার আমি গাড়িতে আসতে আসতে আরও বেশ কিছু ইনফরমেশন পেয়েছি। ইরানের এমব্যাসির সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে। ইনটেলিজেন্সও টানা খবর পাঠিয়ে চলেছে। যত দূর আন্দাজ করছি ইরানের কোনও মিলিট্যান্ট ফোর্স এটার মধ্যে ইনভলভড। ইরান গভর্নমেন্টের কেউ ইনভলভড থাকলেও আমি খুব একটা আশ্চর্য হব না। যদিও কেউ সেটা স্বীকার করবে না। যাই হোক, এই যে জাওয়াসামি জলদস্যু এদের অরিজিন কিন্তু ইরানেই। মজার ব্যাপার দেখুন, এরা কিন্তু কাউকে পণবন্দি করেনি। স্রেফ লুঠ করার জন্যই অ্যাটাক করেছিল। জাহাজটায় দু’লাখ টনের ওপর মাল ছিল। আগুন লাগানোর আগে ওরা জাহাজটা খালি করেছে। মাঝসমুদ্রে তো আনলোড করা যায় না। আমার অঙ্ক বলছে এটার জন্য ওরা ইরানের ‘বন্দর আব্বাস’ ব্যবহার করেছে। খুব গোপন সূত্রের খবর আইসিস আবার শক্তি সংগ্রহ করছে।’
‘কী,’ চমকে উঠলেন ভাদুড়িমশায়।
‘হ্যাঁ স্যার। যদিও এটার কোনও কনফারমেশন এখনও অবধি নেই কিন্তু এই জাহাজ লুঠের ধরন দেখে আমার মনে হচ্ছে খবরটা সত্যি।’
‘কী ভাবে?’
‘জাহাজটায় মূলত খাদ্যশস্য ছিল। ইরাক যাচ্ছিল। জাওয়াসামি পাইরেটসরা পার্সিয়ান গালফে তেল ভরতি জাহাজ ছেড়ে খামোখা একটা খাদ্যশস্য ভরতি জাহাজ লুঠ করবে কেন? তার মানে কারও খাবার দরকার আর সেটা সরকারি ভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই জন্যই লুঠ। আর খাবার কখন মজুত করার দরকার পড়ে আপনি তো জানেন স্যার। যুদ্ধের সময়। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবার যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনাচ্ছে বলেই আমার বিশ্বাস।’
‘তুমি বলতে চাইছ এই জাওয়াসামিরা খাবার লুঠ করে আইসিস জঙ্গিদের দিচ্ছে?’
‘আমি নিশ্চিত নই স্যার কিন্তু পাজলের টুকরোগুলো জুড়লে তাই দাঁড়াচ্ছে। আমার অঙ্ক বলছে, জাওয়াসামিদের সঙ্গে আইসিসের যোগাযোগ আছে। হয়তো আইসিস ওদের এই স্বপ্ন দেখিয়েছে যে খিলাফতের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে পার্সিয়ান গালফে ওদের একাধিপত্য চলবে। তা ছাড়া আইসিসরা সুন্নি জিহাদি। জাওয়াসামিরাও সুন্নি। ওদের বেরাদরি তো থাকবেই।’
‘বুঝলাম, কিন্তু পল্লবরা বেঁচে আছে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোেচ্ছ কী করে? ‘স্বর্ণ গোদাবরীতে যে ১৬ জন ছিল তাদের গড় বয়স ৩৪। ক্যাপ্টেন ছাড়া সকলেরই বয়স ৫০-এর নীচে। যুদ্ধ লাগলে শুধু তো সৈন্য দরকার হয় না স্যার, সৈন্যদের খিদমত খাটার জন্য লোকও দরকার হয়। আমার হিসেব বলে, খাদ্যশস্য ভরতি কন্টেনারের সঙ্গে সঙ্গে পল্লবদেরও পাঠানো হচ্ছে মসুলে। ওরা সড়কপথে যাচ্ছে।’
মনে মনে সমীরণের তারিফ করলেন ভাদুড়িমশায়। উজ্জ্বল ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি বরাবরই তিনি দুর্বল। এতক্ষণ যে রাগটা ছিল সমীরণের প্রতি সেটা ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়ে এল। ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘তা তুমি এখন আমাকে কী করতে বলছ?’
স্যারের রাগটা যে কমেছে সেটা সমীরণও বুঝতে পারলেন। বললেন, ‘আমি তো আমার ডিডাকশনটুকু বললাম স্যার কিন্তু এটা ঠিক না ভুল সেটা তো শুধু আপনিই বলতে পারবেন। বলে দিন না স্যার পল্লব, রোশনি এরা কী অবস্থায় আছে! কেমন আছে বা কোথায় আছে? আপনি তো মানুষের মনের মধ্যে ঢুকতে পারেন। প্রিয়ংবদার মনের মধ্যে ঢুকে আপনিই তো আমার সব সংশয় কাটিয়ে দিয়েছিলেন। প্লিজ স্যার কোনও ভাবে পল্লব বা রোশনির মনের মধ্যে ঢুকুন এক বার। এক বার জেনে নিন ওরা কোথায় আছে। খবর পাওয়া মাত্র আমি সর্বশক্তি দিয়ে ওদের উদ্ধার করার চেষ্টা করব। আমি জানি স্যার আপনি চাইলেই এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন।’
এমন কিছু একটা প্রস্তাব যে আসতে চলেছে সেটা অনেকক্ষণ থেকেই বুঝতে পারছিলেন ভাদুড়িমশায়। পল্লবের অবস্থা জানার জন্য তিনি নিজেও মনে মনে অত্যন্ত উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন। কিন্তু হাজার হাজার মাইল ভৌগোলিক দূরত্বে থাকা পল্লবের সঙ্গে তিনি কি পারবেন সংযোগস্থাপন করতে? এ অতি কঠিন সাধন পদ্ধতি। তার চেয়েও বড়ো কথা এর মধ্যে অনেকগুলো কিন্তু আছে। পল্লব যদি বেঁচে না থাকে বা অচেতন থাকে তা হলে সংযোগ স্থাপিত হবে না কিছুতেই। আর যদি বেঁচে থাকে তবে তিনি যে সময় পল্লবের কথা চিন্তা করবেন, পল্লবও যদি তাঁর কথা চিন্তা করে তবেই সংযোগ স্থাপিত হবে। সাধনার ফলাফল অনেকাংশেই নির্ভর করে সাধকের আধারের ওপরে। ভৌগোলিক দূরত্ব এ ক্ষেত্রে এক বিরাট বড়ো ভূমিকা পালন করে। কলকাতায় বসে আমেরিকার কারও ওপরে তন্ত্র প্রয়োগ করলে কোনও লাভই হবে না। কোনও দিন এত দূরে থাকা কারও সঙ্গে মানসিক সংযোগ স্থাপনের কথা ভাবেননি ভাদুড়িমশায়। ভাবার দরকারও পড়েনি। সত্যি বলতে তিনি নিজেও নিশ্চিত নন তাঁর মধ্যে এতটা শক্তি আছে কি না। তবে চেষ্টা তো করতেই হবে। যতই ভুল বুঝুক, পল্লব তাঁর বড়ো কাছের।
জলে তিনটে বেলপাতা ফেলে কিছুক্ষণ ইষ্টমন্ত্র জপ করে স্নান সেরে নিলেন ভাদুড়িমশায়। রক্তাম্বর পরিধান করে আসনে এসে বসলেন। ঘর অন্ধকার। সামনে জ্বলছে শুধু একটি মাত্র প্রদীপ। মনটাকে একটা বিন্দুতে সংহত করা দরকার সবার আগে। কিন্তু মনটাই যে বড্ড উচাটন হয়ে আছে। পল্লবের কথা মনে পড়েই বারবার বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে মনটা। চোখ বুজে গুরুর কথা স্মরণ করলেন ভাদুড়িমশায়। জীবনে যখনই কোনও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন গুরুর শরণ নিয়েছেন। ওই এক অদ্ভুত মানুষ। সদাহাস্যময় মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। রামদাস ঠাকুর যেন বলে উঠলেন, ‘চিন্তা কীসের নীরেন? বলেচি না বিপদ যখন খুব বেশি করে ঘনিয়ে ওঠে তার মধ্যে থেকেই উঁকি দেন বিপত্তারণ। লড়াইটা কঠিন আমিও জানি কিন্তু তুইও কি আমার এলেবেলে রে? তুই আমার নীরেন। আমার সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য। তোরে তো আমি আমার সবটুকু দিয়েচি। মনটাকে পাকড়ে ধর হাতের মুঠোয়। মন সবচেয়ে বেয়াড়া জিনিস। ওরে পাকড়ে ধরা শক্ত। কিন্তু তুই পারবি। এই তো আমি। এই তো। জানি অনেক অনেক দূরে আচে ছেলেটা কিন্তু লেগে-পড়ে থাকলে অলৌকিক হয়। লেগে-পড়ে থাক নীরেন। লেগে-পড়ে থাক। অলৌকিক হবেই।’
ঠাকুর যেন হাত রাখলেন কাঁধে। শীতল স্পর্শে শরীর জুড়িয়ে গেল। চন্দনের গন্ধে যেন ভরে গেল ঘর। অবশেষে ঘন অন্ধকারের মধ্যে এলোমেলো- ভাবে ছুটে বেড়ানো দ্যুতিময় মনবিন্দুটিকে চিহ্নিত করে তার দিকে ধাবিত হলেন ভাদুড়িমশায়।
* * *
কতক্ষণ ধরে যে গাড়িটা চলছে হিসেব গুলিয়ে গেছে পল্লবের। ঘড়ি, ফোন, পার্স যা ছিল কন্টেনারে তোলার আগে সবই কেড়ে নিয়েছে জাওয়াসামিরা। প্রথমে কিছুক্ষণ সময়ের হিসেব রাখার চেষ্টা করেছিল ওরা সকলেই কিন্তু তার পরে হাল ছেড়ে দিয়েছে। যত সময় গড়াচ্ছে কন্টেনারের ভেতরটা গরম হয়ে উঠছে। লোহার কন্টেনার। রোদ খেয়ে খেয়ে তেতে উঠছে ক্রমশ। একটা মাঝারি সাইজের লিফটের মধ্যে যতটা জায়গা থাকে তার মধ্যেই গাদাগাদি করে ওদের ১২ জনকে তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে বসা তো দূরের কথা, সুস্থভাবে দাঁড়িয়েও থাকতে পারছে না কেউ। অসহ্য যন্ত্রণায় হাঁটু আর পায়ের পাতা ছিঁড়ে আসছে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অনেকেই মলমূত্র ত্যাগ করে ফেলেছে। তীব্র ভ্যাপসা দুর্গন্ধে নিশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ। এতটাই তেষ্টা পেয়েছে যে খিদের অনুভূতিটা আর মালুম হচ্ছে না। শারীরিক কষ্ট তো আছেই তবে তার থেকেও বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে অনিশ্চয়তার আতঙ্ক। ওরা কেউ বুঝতেই পারছে না ওরা কোথায় যাচ্ছে? ওদের নিয়ে ঠিক কী করা হবে? শুরুতে অনেকে কান্নাকাটি করছিল। দুম দুম করে ধাক্কা মারছিল কন্টেনারে। কিন্তু এখন আর কাঁদার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। সকলেই অদ্ভুত রকমের অবসন্ন হয়ে আছে। সবাই সবার ওপরে শরীর ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকলেই যেন মনে মনে আসন্ন মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে। এক-একটা মুহূর্তকে মনে হচ্ছে অনন্তকাল। পল্লব ভাবছিল, নরকযন্ত্রণা কি একেই বলে? না কি সেটা এর চেয়েও ভয়াবহ কিছু? তিতাস তো না কি নরকে আছে। সেও কি তবে এতটাই যন্ত্রণা পাচ্ছে? সে যন্ত্রণা পেলে যদি তিতাসের কষ্ট লাঘব হয় তবে তার এই যাতনায় খেদ নেই। সে তো নিজেই এই পথে এসেছে। কিন্তু রোশনি? তার জন্য রোশনিও আজ এই সবের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে। তার তো এই কষ্ট পাওয়ার কথা ছিল না।
বড্ড অপরাধবোধ হল পল্লবের। তাদের এই ১২ জনের দলে রোশনি একমাত্র মেয়ে। ফলে তাকে নিয়ে ভয়টা আরও বেশি। যদিও জাওয়াসামি দস্যুরা রোশনি মেয়ে বলে তাকে আলাদা করে কোনও খাতির বা অসভ্যতা করেনি কিন্তু তাদের যেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যদি শেষ অবধি তারা বেঁচে থাকে, সেখানে গিয়ে রোশনি নিরাপদ থাকবে তো? পল্লবের মন বলছে, থাকবে না। কথায় বলে, মর্নিং শোজ দ্য ডে। যে ভাবে দিনটা শুরু হয়েছে দিনের শেষে রোশনি নিরাপদ থাকতে পারে না। কিন্তু রোশনির নিরাপত্তার অভাব হলে কী করবে পল্লব? যদি চারটে ছেলে এসে তার সামনে থেকে রোশনিকে টেনে নিয়ে চলে যায় সে তো আটকাতে পারবে না। সে তো চিরকাল পড়াশোনা করেছে, লেখালিখি করেছে। কোনও দিন মারপিট করেনি। তার গায়ে শক্তিও নেই তেমন। খুব কান্না পেল পল্লবের আর ঠিক তখনই তার ঘাড়ের ওপরে থুতনিটা রাখল রোশনি। রোশনির গরম নিশ্বাস এসে পড়ল তার গলায়। ফিসফিস করে রোশনি বলল, ‘আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না পল্লবদা। আমি ঠিক আছি।’
এই গাদাগাদির মধ্যেও রোশনিকে যতটা সম্ভব নিজের কাছে রেখেছে পল্লব। অভয়ও যতটা সম্ভব স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার চেষ্টা করছে তাকে। রোশনি আছে পল্লবের ঠিক পেছনে। সে আরও অনেকটা ঘেঁষে এল পল্লবের কাছে। বলল, ‘আমি স্বেচ্ছায় আপনার সঙ্গে এসেছি পল্লবদা। বিপদে পড়তে পারি জেনেই এসেছি। আমার অবস্থার কথা ভেবে নিজেকে প্লিজ দোষ দেবেন না।’
অবাক হয়ে গেল পল্লব। বলল, ‘তুমি কি মনের কথা পড়তে পারো?’
রোশনি বলল, ‘আপনাকে এত গভীর ভাবে ছুঁয়ে আছি যে। খুব বেশি করে ছুঁয়ে থাকলে মনের কথা পড়া যায়। আমাদের সঙ্গে কী হতে চলেছে আমরা তো কেউ জানি না। যে ভাবে বাতাস কমে আসছে ভেতরে, যে ভাবে গলা শুকিয়ে আসছে কিছুক্ষণ পরে আমরা বেঁচে নাও থাকতে পারি। কিন্তু মরে যাওয়ার আগে আমি আপনাকে একটা কথা জানিয়ে দিতে চাই।’
‘কী কথা?’
‘আমি আপনাকে ভালোবাসি পল্লবদা।’
ভালোবাসা শব্দটাই বোধ হয় এ রকম। মৃত্যুহিম শীতলতার মধ্যেও যেন জীবনের উত্তাপ বয়ে আনে। যেন ঊষর মরুভূমির বুকেও জাগিয়ে তোলে সবুজের সমারোহ। অফিস ফেরত হা-ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মানুষের সামনে যেন আচমকা খুলে দেয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেট্রো রেলের দরজা। ভালোবাসা সোজা জিনিস নয়। ভা-এ ভাবনা, ল-এ লালসা, বা-এ বাসনা আর সা-এ সাধনা। এই চারে মিলে জন্ম নেয় ভালোবাসা। এই শব্দ উচ্চারণের মুহূর্তে পৃথিবীতে দৈব যোগের সৃষ্টি হয়। মঙ্গলশঙ্খ বেজে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য পল্লবের মন থেকেও সব ভয়, সব দুশ্চিন্তা কেটে গেল।
পল্লব জানত, কোনও না কোনও দিন রোশনি তাকে এই কথাটা বলবে। কিন্তু সেটা যে এখনই হতে চলেছে এটা সে আঁচ করতে পারেনি। সে শক্ত করে রোশনির হাতটা চেপে ধরল। কিন্তু এমন কিছু কথা থাকে যার কোনও উত্তর হয় না বা উত্তর থাকলেও তা দেওয়া অত সহজ নয়। পল্লব তাই চুপ করে রইল।
পল্লবকে চুপ থাকতে দেখে রোশনি বলে উঠল, ‘আপনি যদি আমায় ভালো না বাসেন তাতেও কিছু এসে যায় না। আমি যে আপনার সান্নিধ্য পেয়েছি, আপনার সাহচর্য পেয়েছি এই আমার কাছে অনেক। আপনি না থাকলে সে রাত্তিরে তো আমি মরেই যেতাম। আপনি বেল বাজিয়েছিলেন বলেই না গেনু নামের ছেলেটা অসতর্ক হয়েছিল। তাতেই আমি বেঁচে গেলাম। আপনি আমায় নতুন জীবন দিয়েছিলেন সে দিন। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে আপনার মুখটা দেখে আমি খুব শান্তি পেয়েছিলাম। সে দিন থেকেই আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আপনি আমার প্রিয় লেখক ছিলেন। এখন আমার প্রিয়তম হয়ে উঠেছেন। মরে যাওয়ার আগে আমি কিন্তু আপনাকে একটা চুমু খেতে চাই। খুব সাপটে ধরে একটা চুমু খাব। না করবেন না, কেমন? মৃত্যুপথযাত্রীর এই আবদারটুকু রেখেছেন বলে তিতাস নিশ্চয়ই আপনাকে ভুল বুঝবে না। তাই না?’
পল্লবের বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখা সম্ভব নয় এই চাপাচাপিতে। যদি সম্ভব হতো পল্লব রোশনির চোখের দিকে তাকাত। এই ভয়াবহতার মধ্যেও যে ভালোবাসার কথা বলতে পারে সে তো যে সে কেউ নয়! কোথা থেকে এই শক্তি পায় রোশনি!
পল্লবের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে অভয় ঝিমোচ্ছিল। সে তার মারাঠি মেশানো হিন্দিতে বলে উঠল, ‘আমি কিছু কিছু বাংলা ওয়ার্ড বুঝি। ম্যাডাম আপনাকে প্রপোজ করলেন তাই না স্যার? এমন ভাবে যে প্রপোজ হতে পারে কেউ জিন্দেগিতে ভাববে না। আপনারা বাঙালিরা খুব ইন্টারেস্টিং।’
রোশনির কথা শুনে এতক্ষণের মৃত্যুচিন্তা যেন অনেকটাই ফ্যাকাসে হয়ে এসেছে। পল্লবের মনে হল অভয়কে বলে, ‘বাঙালি এক দিন সত্যিই ইন্টারেস্টিং ছিল। কিন্তু আজকের বাঙালি মোটেই ইন্টারেস্টিং কিছু নয়। বরং অনুকরণপ্রিয়, অলস, ইতিহাসবোধহীন, বাতেলা সর্বস্ব, আমোদগেঁড়ে, ছিদ্রান্বেষী, অগভীর, স্বার্থপর, চাটুকার, ভীতু, জাত্যভিমানহীন, হ্যাংলা এবং সর্বোপরি হারামি।’
কিন্তু বাইরের লোকের কাছে ঘরের নিন্দে করতে তার বাধল। সে বলল, ‘সব বাঙালি ইন্টারেস্টিং কি না জানি না তবে যদি বেঁচে থাকি সত্যিকারের ইন্টারেস্টিং এক জন বাঙালির সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দেব অভয়। আমাদের সব্বার প্রিয় এক জন মানুষ। ভাদুড়ি স্যার। দেখবে ইন্টারেস্টিং কাকে…’
কথাটা শেষ করতে পারল না পল্লব তার আগেই তার মাথার ভেতরে একটা সূক্ষ্ম আলোড়ন শুরু হল। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই বহু দূর থেকে যেন মহাসিন্ধুর ও’পার থেকে ভাদুড়িমশায় তাকে ডেকে উঠলেন, ‘পল্লব… পল্লব আমি নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি… আমার কথা শুনতে পাচ্ছ তুমি? শুনতে পাচ্ছ?’
***
রাত ঘন হচ্ছে ক্রমশ। রাস্তাঘাট যত ফাঁকা হতে শুরু করে তত বেশি করে রাত ঘনাতে থাকে। রাতের সঙ্গে কোলাহলের সম্পর্কটা ব্যস্তানুপাতিক। মানুষ, পশু, পাখি সবার ঘুমের জন্য রাতটাই বরাদ্দ করেছেন ঈশ্বর। কিন্তু গত পনেরো বছর ধরে রাতে ঘুমোন না তিনি। রাতটাই তাঁর সংগঠন গোছানোর সময়। দিনের বেলায় তিনি অন্য কাজ করেন। তাঁর নাম আবু জাফর মুস্তাফা। দুনিয়ার সমস্ত নিপীড়িত মুসলমান মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন যে খিলাফতের স্বপ্ন দেখছে তিনি তার খলিফা। নতুন আইসিস সুপ্রিমো।
কেউ তাঁকে দেখেনি। দেখার দরকারও নেই। খলিফার মুখ না, আদেশটাই আসল। অবশ্য একজন দেখেছিল। তার নাম আবু বকর আল বাগদাদি। পূর্বতন আইসিস সুপ্রিমো। বাগদাদি তাঁরই বন্ধু। তিনি বরাবরের কিং মেকার। কিন্তু বাগদাদি চলে যাওয়ার পরে নতুন করে আইসিস-কে ঢেলে সাজাতে তাঁকেই ময়দানে নামতে হয়েছে। রাজা সাজতে হয়েছে। রাজা সাজার অনেক হ্যাপা। সিংহাসন আর কাঁটার মুকুট হাত ধরাধরি করে আসে। কিন্তু উপায় নেই, অনেক বড়ো এক দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগে। তখন রবাব শোনেন তিনি।
আজও জানলার দিকে তাকিয়ে রবাব শুনতে শুনতে উদাস হয়ে গেলেন খলিফা মুস্তাফা। অভীষ্টকে পাওয়ার জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে কে জানে! তবে তাঁর স্থির বিশ্বাস সময় আসছে। সে দিন আর খুব দূরে নয়। নয়তো হালাকু খাঁ-র সমাধি থেকে পাওয়া ভবিষ্যৎবাণী মিথ্যে হয়ে যাবে।
পৃথিবীর মানুষের কাছে আজও হালাকু খাঁ-র সমাধি অনাবিষ্কৃত। ইতিহাস বইতে লেখা হয়, ‘১২৬৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি হালাকু খাঁ-র মৃত্যু হয়। তাঁকে সমাধি দেওয়া হয় ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রভিন্সের উর্মিয়া হ্রদে অবস্থিত শাহি দ্বীপে। সেই সমাধি খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
ইতিহাস সব কথা জানে না। সেই সমাধি তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রাচীন সেই সমাধির মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁর আত্মদর্শন হয়েছিল নতুন করে। খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের লক্ষ্য। রক্তের মধ্যে বয়ে চলা উত্তরাধিকার অশরীরী কণ্ঠ হয়ে তাঁর কানে কানে বলেছিল, ‘হালাকু খাঁ ফিরে এসেছেন। তুমিই হালাকু খাঁ। পূরণ করতে হবে খাঁ-র শেষ ইচ্ছে। আর এই ইচ্ছে পূরণের জন্য দরকার দেবী ইনান্নার দণ্ড। দেবীর দণ্ড যার কাছে থাকবে সে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ। যাও খুঁজে বার করো দেবীর দণ্ড।’
আজ আবারও খুলে বসলেন সমাধিতে পাওয়া বিবর্ণ কাগজটি যাতে স্পষ্ট করে লেখা আছে ভবিষ্যৎবাণী। এই তো লেখা আছে, হালাকু খাঁ ফিরে আসবেন আর তাঁর ষাট বছর বয়সের জন্মমাসেই তিনি দেবী ইনান্নার দণ্ডের সন্ধান পাবেন।
এটাই তো তাঁর জন্মমাস। ফেব্রুয়ারি। এ বারই ষাটে পা দিলেন তিনি। তাঁর জন্ম ৮ ফেব্রুয়ারি, যে দিন মারা গিয়েছিলেন হালাকু খাঁ।
ভবিষ্যৎবাণীতে আরও লেখা আছে, নদ-নদীর দেশ থেকে দু’জন মানুষ আসবে যারা এই দণ্ড উদ্ধারের পুরোধা হবে।
ছটফট করে উঠলেন খলিফা মুস্তাফা, কারা এই দু’জন? তাদের চিহ্নিত করবেন কী করে?
