লাপিস লাজুলি – ১০
॥ দশ॥
ফেব্রুয়ারি, ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ
রোদ ঝলমলে আকাশ। খুব সুন্দর একটা হাওয়া দিচ্ছে। সদ্য যুবতী মেয়ের চোখে যেমন কিশোরী বেলার আভাটাই বেশি থাকে, যৌবনের আঁচ থাকে কম, এ বাতাসও তেমনই। শীতের আমেজ আছে, কামড় নেই। টাইগ্রিসের জলে মন্দ-মন্দ ঢেউ উঠছে। সেই ঢেউ এসে ভেঙে যাচ্ছে মোঙ্গোল শিবির লাগোয়া তটভূমিতে। আকাশে গোল হয়ে চক্কর কাটছে একদল বক জাতীয় পাখি। মাঝে মাঝে ছোঁ মেরে নেমে এসে মাছ মুখে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে তারা। দৃষ্টিসীমার মধ্যেই নিশ্চিন্তে টহল দিচ্ছে মোঙ্গোলদের পাহারাদার নৌকো। দূর থেকে রবাবের মন ভোলানো সুর ভেসে আসছে। সব মিলিয়ে একটা দারুণ সকাল। বনভোজন করার মতো আদর্শ দিন। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে মোঙ্গোল শিবিরের ভেতরের চাপা উত্তেজনাটা টের পাওয়া যাবে না।
তাঁবুর ভেতরে থমথমে মুখে বসে আছেন হালাকু খাঁ। অন্যান্য দিনে গোটা দিন ধরে দুই থেকে তিন জালা মদ্যপান করেন তিনি। আজ সবে সকাল কিন্তু তার মধ্যেই দু’টি জালা শেষ হয়ে গেছে। সুলচুক বুঝতে পারছে, ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত অশান্ত হয়ে রয়েছেন খাঁ। অবশ্য অস্থির হওয়ার মতোই বিষয় গত রাতে চোর ঢুকেছিল খাঁ-র তাঁবুর ভেতরে। হইচই পড়ে যাওয়াতে সে খাঁ-র শয্যার নীচে লুকিয়ে পড়েছিল। চোরটা আহত ছিল। শয্যার নীচে অনেকটা রক্ত পড়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, সকলের অগোচরে তাঁবুর পেছন দিক থেকে বেরিয়ে টাইগ্রিসের জলে নেমে গেছিল সে। তাঁবুর বাইরে থেকে নদী অবধিও রক্তের দাগ আছে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, কিছু খোয়া যায়নি। খাঁ-র তাঁবু খুব ভালো করে পরীক্ষা করা হয়েছে। অনেক দামি দামি জিনিস ছিল তাঁবুর ভেতরে কিন্তু যেখানকার জিনিস সেখানেই আছে। চোর কিচ্ছুতে হাত দেয়নি। আর এখানেই খটকাটা লাগছে হালাকু খাঁ-র।
যে ঢুকেছিল ভেতরে তবে কি তার চুরি করাটা আসল উদ্দেশ্য ছিল না? সে কি তবে কোনও গুপ্ত ঘাতক! গুপ্ত ঘাতক পাঠালে একমাত্র খলিফাই পাঠাতে পারেন। কিন্তু খলিফার প্রতিটি পদক্ষেপের খবর তো তিনি অনেক আগেই পেয়ে যান। উজির ইবন আলকামি তাঁর লোক। খলিফা তো সন্ধি করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। খিলাফতের পাঞ্জা অবধি ভেট হিসেবে পাঠিয়েছেন। তিনি এই বোকামো করবেন না। তবে কে তাঁকে মারতে চাইছে? সাধারণ বাগদাদবাসীর তো এত সাহস হবে না যে মোঙ্গোল শিবিরে গুপ্ত ঘাতক পাঠাবে! তবে কি তাঁর অগোচরে ঘনিয়ে উঠছে অন্য কোনও শক্তি? তাঁর দলের লোকেরাই বিশ্বাসঘাতকতা করছে না তো?
চমকে উঠলেন হালাকু খাঁ। ক্ষমতা বড়ো অদ্ভুত জিনিস। ক্ষমতা পাওয়ার জন্য বাবা ছেলেকে, ছেলে বাবাকে খুন করে দেয়। এই রহস্য সমাধান না করা অবধি শান্তি পাচ্ছেন না তিনি। পরবর্তী কোনও সিদ্ধান্তও নিতে পারছেন না। এমন সময় বাইজু নয়ান এসে খবর দিল, ‘উজির ইবন আলকামি দেখা করতে এসেছেন।’
উৎসাহিত হলেন হালাকু। এই লোকটার কাছ থেকে কিছু খবর পাওয়া যেতে পারে। বললেন, ‘এখুনি ভেতরে পাঠাও ওকে।’
বাইজু নয়ান বেরিয়ে যাওয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই খুব উত্তেজিত হয়ে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে এল ইবন আলকামি। খাঁ-কে রীতিমাফিক সম্মান প্ৰদৰ্শন করেই বলে উঠল, ‘আপনার বিরুদ্ধে কারা চক্রান্ত করছে আমি জানি খাঁ। ছোটো ছোটো চোখ দুটো আরও ছোটো হয়ে গেল হালাকুর। বললেন, ‘কারা?’
মুখটা বিকৃত করে আলকামি বলল, ‘আবদুল রহমান। খলিফার মেজো ছেলে। আর তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে গিয়াসুদ্দিন আল তুসি। বাইত আল হিকমাহ-র প্রধান গ্রন্থাগারিক।’
অবাক হলেন হালাকু। বললেন, ‘খলিফার ছেলে অবধি মানা যায় কিন্তু এক জন সামান্য গ্রন্থাগারিক আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে! আশ্চর্য!’
‘আশ্চর্যের কিছু নেই খাঁ। এই গিয়াসুদ্দিন নামের লোকটা মহা ধুরন্ধর। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দিনার ব্যয় করায় গ্রন্থাগারের পেছনে। আপনিই বলুন না, লেখাপড়ার পেছনে কখনো এত খরচ হয়, না করা উচিত? দুনিয়ার নানা দেশ থেকে নানা গ্রন্থ আনিয়ে সে সব নাকি আরবিতে অনুবাদ করে! সব মিথ্যে কথা। আসলে নিজের পেট মোটা করছে। আর খলিফাকে বশ করে রেখেছে পুরো। খলিফা ওকে কিচ্ছু বলেন না। আসলে লোকটা তো পারস্যের। আপনি হাসাসিনদের জব্দ করেছেন বলে ওর খুব রাগ আপনার ওপর। আপনারা যখন হাসাসিনদের দমন করার জন্য বাগদাদের সাহায্য চেয়েছিলেন তখন এই লোকটাই তো খলিফাকে ভড়কেছিল। কিছুতেই সাহায্য করতে দেয়নি আপনাদের।’
শুনতে শুনতে যত বেশি করে ভুরু কুঁচকে যাচ্ছিল হালাকু খাঁ-র তত বেশি করে আনন্দ পাচ্ছিল আলকামি। তার প্রধান উদ্দেশ্য হালাকু খাঁ-কে তাতিয়ে দেওয়া। বোকা তেমুরের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ আছে। গতকাল সন্ধেতেই সে খবর পেয়েছিল, ভেট পেয়ে হালাকু খাঁ খুশি হয়েছেন। বাগদাদের সঙ্গে সন্ধি করার একটা ভাবনা তাঁর মাথাতে ঘুরছে। আসলে হালাকু অসুস্থ। যদি বাগদাদ তাঁর সব দাবি মেনে নেয় তা হলে এই মুহূর্তে যুদ্ধ করতে চাইছেন না। এটা শুনেই ঘাবড়ে গেছিল আলকামি। প্রথমে তার মনে হয়েছিল, সন্ধি হোক বা মোঙ্গোলরা বাগদাদ দখল করুক দুই ক্ষেত্রেই তার লাভ কিন্তু যত সময় গড়িয়েছে সে বুঝতে পেরেছে বাগদাদের সঙ্গে হালাকু খাঁ-র সন্ধি হয়ে গেলে তার আসলে কোনও লাভই নেই। সেই তো খলিফা মাথার ওপরে বসে থাকবেন। সব ক্ষেত্রেই খলিফার অনুমতি নিতে হবে। তার চেয়ে যদি হালাকু খাঁ বাগদাদ দখল করে খিলাফতের পতনের পরে সেই হবে বাগদাদের নতুন শাসক। অন্তত তার একটা সম্ভাবনা আছে। সে এত সাহায্য করেছে মোঙ্গোলদের। মোঙ্গোলরা এইটুকু প্রতিদান দেবে না? দরকারে সে দরাদরি করবে হালাকু খাঁ-র সঙ্গে। তার নিজের ভালোর জন্য খলিফার সরে যাওয়াটা খুব দরকার। সে ভেবেই রেখেছিল, আজ সকালে এসে খলিফার বিরুদ্ধে হালাকু খাঁ-র কানে বিষ ঢালবে। তার মধ্যেই খবর পেল গত রাতে মোঙ্গোল শিবিরে অবাঞ্ছিত লোক ঢুকেছিল। খবরটা পেয়ে তিন পাক নেচে নিয়েছিল সে। হালাকু খাঁ-কে উসকাতে আরও সুবিধে হবে। গলাটা ঝেড়ে সে বলল, ‘আরও একটা কথা আপনাকে বলতে চাই খাঁ। আমার একটা কূট সন্দেহ হচ্ছে।’
‘কী সন্দেহ?’
‘আমার মনে হচ্ছে গিয়াসুদ্দিন আর আবদুলের মাথার ওপর খলিফার হাত আছে। খলিফা যতই আপনার সামনে ভালো সাজুন না কেন, আমার মন বলছে তিনিও আপনার ক্ষতি চান। নয়তো ওদের এত সাহস হতো না আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। আমি কাল নিজে দেখেছি গিয়াসুদ্দিনের সঙ্গে কথা বলার পরে আবদুল ঘোড়া নিয়ে বেরিয়েছিল। আমি আড়াল থেকে ওকে অনুসরণ করেছিলাম। ও একটা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছিল। আমি নিশ্চিত ও আপনাকে খুন করার জন্য গুপ্ত ঘাতককে বরাত দিতে গেছিল। আর আপনিই বলুন না এত বড়ো একটা কাণ্ড খলিফার অগোচরে হতে পারে?’
‘আমি যত দূর জানি খলিফা তো তোমাকে সব জানিয়ে করেন। তা হলে?’
আলকামি বুঝল, ব্যাপারটা অন্য দিকে চলে যেতে পারে। হালাকু খাঁ-র গলায় সন্দেহের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মুখটা করুণ করে, গলায় যথাসম্ভব বেদনা এনে বলল, ‘সেদিন আর নেই খাঁ। গতকালই তো গিয়াসুদ্দিন খলিফার কক্ষে গেছিলেন। আমাকে কক্ষ থেকে বার করে দিয়ে দুজনে অনেকক্ষণ শলাপরামর্শ করলেন। তার কিছুক্ষণ পরেই তো আবদুল ঘোড়া নিয়ে বেরোল।’
চুপ করে রইলেন হালাকু খাঁ। একটা হিসেব এখনও মিলছে না। গুপ্ত ঘাতকই যদি আসবে সে কিছু করল না কেন? আর রক্ত এল কোথা থেকে? সে কি আহত হয়ে তাঁবুতে ঢুকেছিল? তা হলে তাঁবুর প্রবেশপথে রক্ত নেই কেন? রক্তের পরিমাণ দেখে বোঝা যাচ্ছে শয্যার নীচেই প্রথম রক্তপাত হয়েছে।
উঠে দাঁড়ালেন হালাকু খাঁ। পায়চারি করা শুরু করলেন। যতক্ষণ না এই হিসেব মিলবে ততক্ষণ কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। বাগদাদ সন্ধি করার জন্য পা বাড়িয়ে আছে। এই অবস্থায় কোনও কারণ ছাড়া শুধু অনুমানের
ওপরে ভিত্তি করে আক্রমণ করা মূর্খামি হবে। শুধু বাগদাদই তো নয়, এর পরে তাঁকে কায়রো যেতে হবে। সেখানে যুদ্ধ করতে হবে বলেই মনে হচ্ছে। কারণ বাগদাদ দখলের খবর ইতিমধ্যেই ওখানে পৌঁছে যাওয়ার কথা। মোঙ্গোল আক্রমণের আশঙ্কা করে নিশ্চয়ই কায়রো প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই এখানে যদি যুদ্ধ ছাড়াই কাজ হাসিল হয় তা হলে সেটাই করা উচিত।
ভাবতে ভাবতে খিলাফতের পাঞ্জাটা হাতে তুলে নিলেন তিনি। অদ্ভুত সুন্দর এই পাঞ্জাটা। কাল থেকে যত বার দেখছেন মন ভরে যাচ্ছে। কী যেন একটা রহস্য আছে পাঞ্জাটার মধ্যে। এ জীবনে অনেক উপহার পেয়েছেন তিনি কিন্তু এত সুন্দর উপহার আর একটাও পাননি। ঠিক করেছেন, পাঞ্জার নীচের দিকে খিলাফতের ছাপ দেওয়া জায়গাটাকে সরিয়ে নিজের চিহ্ন বসিয়ে নেবেন। এটিকে নিজস্ব পাঞ্জা হিসেবে ব্যবহার করবেন। আলকামির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যাই করে থাকুন, শুধুমাত্র এই পাঞ্জাটা উপহার দেওয়ার জন্যই আমি খলিফার সব দোষ মাফ করে দিতে পারি।’
অবাক হয়ে গেল আলকামি। অস্ফুটে বলল, ‘অ্যাঁ? না মানে খলিফা আপনার বিরুদ্ধে…
‘থামো থামো’, কথা কেটেই বলে উঠলেন হালাকু, ‘তোমার ধান্দা আমি জানি আলকামি। খলিফা যদি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে থাকেন সেটা নতুন কোনও কথা না। এটাই হওয়া উচিত। তুমি নতুন কোনও খবর এনে আমাকে উদ্ধার করে দাওনি। কে চায় তার নিজের দেশ অন্যের হাতে তুলে দিতে? পাকে পড়ে আজ খলিফা সন্ধি করতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে অবধি তিনি আমাকে ঘেন্না করবেন। তাঁর জায়গায় আমি থাকলে আমিও তাই করতাম। দেশকে ভালোবাসে এমন কেউই বিদেশি শাসককে নেকনজরে দেখে না। অবশ্য তোমার মতো বিশ্বাসঘাতকদের কথা আলাদা। তুমি যতই আমাকে উসকানোর চেষ্টা করো, লাভ হবে না। আমি চেঙ্গিজ খাঁ-র দৌহিত্র। যুদ্ধ করি বলে রাজনীতি বুঝি না ভেবো না। আমার একটা হিসেব মিলছে না। সেই হিসেব যতক্ষণ না মিলবে আমি কোনও ভাবেই যুদ্ধ করব না।’
বড়ো বেকুব বনে গেল আলকামি। অপমানে তার কান লাল হয়ে উঠল হালাকু যে আচমকা এমন ঘুরে যাবেন সে ভাবতে পারেনি। কিন্তু এই অপমানের জবাব দেওয়ার মতো ক্ষমতা তার নেই। অগত্যা দাঁত বার করে হাসতে হল।
আলকামির অবস্থাটা বুঝতে পারছিল সুলচুক। বহু দিন ধরে সে হালাকুর সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভয়ানক, পাশবিক, নৃশংস, দুর্দান্ত, সাহসী এই বিশেষণগুলো হালাকুর চরিত্রের সঙ্গে অবশ্যই যায় কিন্তু আরও একটা বিশেষণ খুব ভালো যায় সেটা হল খামখেয়ালি। কোনও একটা জিনিস মাথায় ঢুকলে সেটা সহজে বেরোয় না। পাঞ্জাটা উপহার পাওয়ার পর থেকে খলিফার ওপরে বেশ সদয় হয়ে রয়েছেন হালাকু। তা ছাড়া ক্ষতটা এখনও পুরো সারেনি। তাই এই মুহূর্তে যুদ্ধ করতেও চাইছেন না তিনি। তবে সুলচুক জানে, যুদ্ধ তিনি করবেনই। যতই এই মুহূর্তে যুদ্ধবিমুখ হোন না কেন সুস্থ হওয়া মাত্রই রক্তদর্শনের জন্য ছটফট করবেন হালাকু। নিরামিষ সন্ধিস্থাপনে আর যার মন ভরুক হালাকু খাঁ-র মন ভরবে না। আলকামি এত কথা জানে না। তার জানার কথাও নয়। যুদ্ধ হবে না শুনে সে খুবই মুষড়ে পড়েছে। তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেবে বলে ঠিক করল সুলচুক। বলল, ‘খাঁ, এখন তা হলে আমরা বরং যাই? পরে আসব।’
পাঞ্জাটার দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড় নাড়লেন হালাকু আলকামিকে সঙ্গে যেতে ইশারা করল সুলচুক। বাধ্য হয়েই আলকামি উঠে দাঁড়াল। ঘাড় নুইয়ে বিদায় জানাল হালাকুকে। হালাকু ফিরেও তাকালেন না। মুখ চুন করে তাঁবুর প্রস্থানপথের দিকে এগোতে লাগল আলকামি আর তখনই হালাকুর বিস্মিত কণ্ঠ কানে এল, ‘এ কী!’
সুলচুক আর আলকামি দু’জনেই ঘুরে তাকাল। দেখল, বিস্ফারিত চোখে হালাকু তাকিয়ে আছেন পাঞ্জাটার দিকে। ধীরে ধীরে বিস্ময় পরিবর্তিত হল ক্রোধে। রাগে সারা শরীর কাঁপতে লাগল তাঁর। তিনি গর্জন করে উঠলেন, ‘এত বড়ো সাহস!’
হালাকুর এই চেহারা চেনে সুলচুক। ছুটে গেল তাঁর কাছে, ‘কী হয়েছে খাঁ?’
উত্তর না দিয়ে রক্তচক্ষে আলকামির দিকে তাকালেন হালাকু। আলকামির বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। সে কিছু বোঝার আগেই হালাকু শক্ত করে তার হাতটা চেপে ধরলেন। ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেলল সে, ‘আমি কিছু করিনি। আমি কিছু…’
‘চোপ,’ এক ধমকে তাকে থামিয়ে দিয়ে হালাকু বললেন, ‘এই পাঞ্জাটা কি খলিফার খুব প্রিয়?’
‘ইয়ে মানে না তো খাঁ। খলিফা খুব একটা ব্যবহার করতেন না এটা। সরকারি কাগজে ছাপ দিতে হলে আমিই ব্যবহার করতাম। আর গিয়াসুদ্দিন বায়তুল হিকমাহ-র বইপত্রে-এর ছাপ দিত। ওই বানিয়ে দিয়েছিল পাঞ্জাটা। মাঝে মাঝে নিয়ে যেত আবার ফেরত দিয়ে যেত। বাকি সময়টা খলিফার কক্ষেই পড়ে থাকত এটা। কেন খাঁ?’
কুঁচকে থাকা ভুরু সোজা হয়ে এল হালাকুর। সুলচুকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গত রাতে সত্যিই চোর ঢুকেছিল আমার তাঁবুতে। সে কেন আহত হয়েছিল তার উত্তর এখনও আমার কাছে নেই কিন্তু সে কী চুরি করতে এসেছিল এখন আমি বুঝে গেছি। সে এসেছিল খিলাফতের পাঞ্জাটা চুরি করতে। এখন আমার হাতে যে পাঞ্জাটা আছে আর গতকাল যেটা উপহার পেয়েছিলাম, দুটো এক নয়।’
‘কিন্তু এটাও তো অবিকল এক রকম দেখতে’, অবাক হয়ে বলল সুলচুক। ‘হ্যাঁ, আর সেইজন্যই তো এতক্ষণ আমি বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলাম যখন পাঞ্জার হাতলটা ভালো করে দেখলাম। গতকালের পাঞ্জাটার হাতলের পেছনে আমি ছুরি দিয়ে আমার নামের আদ্যাক্ষর খোদাই করে রেখেছিলাম। এই দেখো, এটায় কোনও দাগ নেই। একেবারে মসৃণ।’
আলকামি নিশ্চিত, পাঞ্জাটা চুরি করিয়েছে গিয়াসুদ্দিনই। কিন্তু কেন? খিলাফতের পাঞ্জা দিয়ে সে কী করবে? সেই তো এই পাঞ্জা বানিয়ে দিয়েছিল। কেন বার বার পাঞ্জাটা নিয়ে যেত নিজের কাছে? পাঞ্জাটা হালাকু খাঁ-কে দেওয়া হয়েছে শুনে অত ভেঙে পড়েছিল কেন? কেন অত রেগে গেছিল? কী রহস্য আছে ওই পাঞ্জার মধ্যে? সে বলতে গেল, ‘খাঁ…’
হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন হালাকু। সুলতানচুকের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘যারা নিজেদের দেওয়া উপহার আবার চুরি করে নিয়ে যায় তারা নীচ, শঠ, প্রবঞ্চক। তাদের কোনও ক্ষমা নেই। রাজার পাপে রাজ্য নষ্ট। খলিফার চৌর্যবৃত্তির ফল পাবে বাগদাদবাসী। আমি বাগদাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। ধ্বংস করে দাও বাগদাদ।’
আনন্দে নেচে উঠল আলকামির মনটা।
***
বড়ো বড়ো রাবার গাছ আর ডুমুর গাছ ঘিরে আছে জায়গাটাকে। মাঝে মাঝে কয়েকটা বেদানা গাছও চোখে পড়ছে। ফলের ভারে নুয়ে আছে বেদানা গাছগুলো। লাল টুকটুকে অজস্র বেদানা ঝুলছে। কিন্তু এখানে গাছ থেকে ফল পাড়ার কেউ নেই। এখানে সবাই সব কিছু ফেলে যেতে আসে। নিয়ে যেতে আসে না কিছুই। এটা কবরস্থান। আল রুসাফা-র কবরস্থান। এখানেই খলিফা এবং তাঁর পরিবারের লোকেদের সমাধি দেওয়া হয়। সকাল বেলাতেও ছায়াচ্ছন্ন হয়ে আছে জায়গাটা। পাখি ডাকছে ক্রমাগত। জনমানবহীন। এমন সময় একটা একটা বড়ো খিলানের পেছন থেকে বেরিয়ে এল দু’জন মানুষ। এক জন প্রৌঢ়, এক জন যুবক। গিয়াসুদ্দিন আর আবদুল। এই শীতের সকালেও তাদের সর্বাঙ্গে ঘাম। হাতে কোদাল, গাঁইতি জাতীয় মাটি কোপানোর যন্ত্র। হাতে, পায়ে আর পরনের কাপড়ে লেগে আছে মাটি।
অল্প অল্প হাঁপাচ্ছেন গিয়াসুদ্দিন। একটা বড়ো ডুমুর গাছের তলায় বসে পড়লেন তিনি। বললেন, ‘আবদুল, এই মাটি কাটার জিনিসগুলোও লুকিয়ে ফেলো।’
মাথা নাড়ল আবদুল। গিয়াসুদ্দিন বললেন, ‘জিনিসগুলো যে আল রুসাফার কবরখানায় লুকোনো হল আমরা দু’জন ছাড়া আর কে জানে?’
‘মনসুর। ওকে নিয়ে চিন্তা নেই। ও কাউকে বলবে না।’
‘সবটাই নিয়তি। এত সূক্ষ্ম ভাবে মনসুর পাঞ্জাটা নিয়ে এল কিন্তু শেষরক্ষা হল না। হালাকু খাঁ পাঞ্জার হাতলে নামের আদ্যক্ষর খোদাই করে রাখল। হায় আল্লাহ,’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন গিয়াসুদ্দিন।
মনসুর যে কাজটা খুব সূক্ষ্ম ভাবে করতে পারেনি সে কথা আর তাঁকে বললেন না আবদুল। গিয়াসুদ্দিন বললেন, ‘আশা করি ওরা কবর খুঁড়ে দেখবে না। যদি বেঁচে থাকি তা হলে পরে এসে এ সব আবার তুলে নিয়ে যাব। বড়ো আফশোস হচ্ছে আবদুল। আমার হাতে রয়েছে এ দুনিয়ার অন্যতম শক্তিশালী আয়ুধ। দেবী ইনান্নার দণ্ড। অথচ ওটি ব্যবহার করার কৌশল আমার জানা নেই। অনেক পড়েছি আমি কিন্তু তন্ত্রচর্চা করিনি কোনও দিন। ইশ! যদি জানতাম কী ভাবে জাগিয়ে তোলা যায় দেবীর দণ্ড, তা হলে বাগদাদকে বাঁচাতে পারতাম। খুব শিগগির ওরা বাগদাদ আক্রমণ করবে। পাঞ্জা দুটো যে এক নয় সেটা বুঝতে হালাকু খাঁ-র বেশিক্ষণ লাগবে না। মন শক্ত করো আবদুল। খুব শিগগির তোমার, আমার সাধের বাগদাদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে চলেছে।’
আবদুলের চোখ ছলছল করে উঠল। উঠে দাঁড়ালেন গিয়াসুদ্দিন। আবদুলের পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘অপরাধবোধ হচ্ছে? মনে হচ্ছে পাঞ্জাটা চুরি না করালে বাগদাদ বেঁচে যেত?’
ইতিবাচক মাথা নাড়লেন আবদুল।
‘বাঁচত না আবদুল। হালাকু খাঁ-র প্রতিটি গতিবিধির ওপর আমি এত দিন ধরে নজর রাখছি। মনুষ্য চরিত্র যতটুকু বুঝি তাতে আমি নিশ্চিত আজ নয়তো কাল হালাকু বাগদাদ আক্রমণ করতই করত। যে শাসন করতে চায় সে সন্ধি করে। শাসকের মানসিকতা ওর নেই। ও যতই দাবি করুক না কেন ও রাজবংশের সন্তান, চেঙ্গিজ খাঁ-র দৌহিত্র, রাজ্যশাসন ওর রক্তে, ও আসলে একটা রক্তপিপাসু যুদ্ধবাজ উন্মাদ। ও বেরিয়েছে মোঙ্গোল সাম্রাজ্যকে ছড়িয়ে দিতে। যতক্ষণ না বাগদাদের ঐতিহ্যকে তছনছ করবে ও শান্তি পাবে না। আমরা বরং পাঞ্জাটা চুরি করে একটা কাজের কাজ করলাম যে দেবী ইনান্নার দণ্ড লুকিয়ে ফেলতে পারলাম। আল রুসাফায় কবরের নীচে যা যা লুকোনো রইল, হালাকুর হাতে পড়লে গোটা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা থাকত। মনে করো বাগদাদকে বলি দিয়ে তুমি বাকি দুনিয়াকে রক্ষা করেছ। তোমার, আমার সামনে এখন একটাই কাজ। যে করে হোক আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকলে তবেই না প্রত্যাঘাত করতে পারব।’
গিয়াসুদ্দিনের কথা শেষ হতে পারল না তার আগেই দূর থেকে ভেসে এল মোঙ্গোল রণভেরির শব্দ। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল গিয়াসুদ্দিনের। ফিসফিস করে তিনি বললেন, ‘ওই আসছে। ওরা আসছে।’
বন্যার জলের মতো, পঙ্গপালের মতো, নরকের কীটের মতো বাগদাদে ঢুকে পড়ল মোঙ্গোল সেনা। খলিফার সেনাবাহিনী প্রতিরোধ করার অবকাশই পেল না। একের পরে এক তোরণ ভাঙতে লাগল মোঙ্গোল বাহিনী। চোখের সামনে যাকে পেল হত্যা করল। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেউ বাদ গেল না। রক্তে ভেসে গেল বাগদাদের প্রশস্ত রাস্তাগুলো। একের পরে এক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করতে করতে আর লুঠ করতে করতে তারা এগোতে লাগল খলিফার প্রাসাদের দিকে। তাদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে লাগলেন হালাকু খাঁ। মোঙ্গোলরা আসছে খবর পেয়েই পরিবার নিয়ে খলিফা আল মুস্তাসিন লুকিয়ে পড়েছিলেন প্রাসাদের গুপ্ত কক্ষে। সেই রাস্তা চিনিয়ে দিল বিশ্বাসঘাতক ইবন আলকামি। খলিফার বাকি বয়স্যরা আগেই খুন হয়েছিল। এ বার খলিফার চোখের সামনে একে একে হত্যা করা হল তাঁর পরিবারের সদস্যদের। সেই দেখে হাসতে লাগল আলকামি। দু’হাতে মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়লেন খলিফা। হালাকু বললেন, ‘খলিফা, আপনি সম্মাননীয় মানুষ। আপনাকে আমি বাকিদের মতো করে মারব না। আপনার মৃত্যু হোক অভাবনীয়। আপনাকে আমি এমন মৃত্যু উপহার দেব যা আগে কেউ কখনো দেখেনি।’
খলিফার প্রিয় একটি বহুমূল্য পারস্য-গালিচা দিয়ে প্রথমে তাঁকে মুড়ে ফেলা হল। পালকের চেয়েও হালকা অথচ মজবুত গোলাপি রেশমের দড়ি দিয়ে বাঁধা হল আষ্টেপৃষ্ঠে। টানতে টানতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল তাঁরই সাধের পক্ষীশালায়। যেমন ভাবে শেকল দিয়ে পাখির খাঁচা ঝোলানো হয় ঠিক সেই ভাবে গালিচায় মোড়ানো খলিফাকে সোনার শেকলে বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হল দক্ষিণ আমেরিকার দুটো রঙিন কাকাতুয়ার খাঁচার মাঝখানে। যেমন ভাবে পাখিদের দানা দেওয়া হয় সেই ভাবে তাঁর সামনে দুটি বড়ো পাত্র রাখা হল। একটিতে রাখা হল স্বর্ণমুদ্রা, অন্যটিতে সুগন্ধি আতর। তাঁর পায়ের কাছে বেঁধে রাখা হল তাঁরই হারেমের দশটি সুন্দরী মেয়েকে। বিলাসী খলিফা যা যা পছন্দ করতেন মৃত্যুর সময় তিনি যাতে সব কিছু হাতের কাছে পান তার ব্যবস্থা করে রাখলেন হালাকু। শুধু হাত দুটো খুলে রাখলেন না, এই যা। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আলকামি বুঝতে পারল, হালাকু খাঁ শুধু যুদ্ধবাজই নয়, এক জন নিপুণ হত্যাশিল্পী। মানুষ খুন করার এমন অভিনব পন্থা শুধু শয়তানের মাথাতেই আসা সম্ভব।
দু’দিন পর থেকেই খাবার-জল না পেয়ে ছটফট করতে শুরু করল পাঁচ হাজার পাখি। তাদের চিৎকারে ঢাকা পড়ে গেল খলিফা আল মুস্তাসিন সহ দশটি মানুষের মৃত্যুকালীন আর্তনাদ। পতন হল প্রায় পাঁচশো বছরের আব্বাসীয় খিলাফতের।
প্রাসাদ দখল করার পরে হালাকু হুকুম করলেন, ‘আমার গিয়াসুদ্দিনকে চাই। যেখান থেকে পারো ওকে খুঁজে আনো।’
মোঙ্গোল বাহিনী ছুটে চলল বায়তুল হিকমাহ-র দিকে। শুধু হুকুম দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না হালাকু, নিজেও ছুটলেন সেখানে। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও গিয়াসুদ্দিনকে পাওয়া গেল না। খাঁ-খাঁ করছে বায়তুল হিকমাহ। একটিও মানুষ নেই। গিয়াসুদ্দিনের নির্দেশে আগেই তাঁর ছাত্ররা প্রত্যেকে কিছু কিছু করে গুরুত্বপূর্ণ কিতাব নিয়ে লুকিয়ে পড়েছে নগরের আনাচেকানাচে। হালাকুর সবটা রাগ গিয়ে পড়ল থরে থরে সাজিয়ে রাখা বইগুলোর ওপরে। গর্জন করে উঠলেন, ‘সব ফেলে দাও টাইগ্রিসের জলে। জ্বালিয়ে দাও সব।’
প্রভুর আদেশ পেয়ে নতুন এক খেলায় মাতল মোঙ্গোল বাহিনী। তারা বই ফেলতে শুরু করল টাইগ্রিসের জলে। হাজার হাজার বই। কালি গুলে যেতে শুরু করল জলে। কালো হয়ে গেল টাইগ্রিসের জল। অবশেষে যখন ক্লান্ত হল মোঙ্গোলরা তখনও অসংখ্য বই বাকি। এ বার সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। ছোঁয়াচে রোগের মতো আগুন বইয়ের পাতা থেকে ছড়িয়ে পড়ল দেওয়ালে, ইমারতে। পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগল বাইত আল হিকমাহ। বাগদাদের জ্ঞানগৃহ। মানুষের সভ্যতার ইতিহাস।
আল রুসাফার গোরস্থানে দাঁড়িয়ে আকাশছোঁয়া সেই আগুন আর কালো ধোঁয়া দেখতে দেখতে স্থবির হয়ে গেলেন গিয়াসুদ্দিন। তাঁর এত বছরের অক্লান্ত সাধনা এক লহমায় ছাই করে দিল এক যুদ্ধবাজ উন্মাদ! যদিও এই বিপর্যয়ের জন্য তিনি মনে মনে প্রস্তুত ছিলেন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। কান্নায় ভেঙে পড়লেন গিয়াসুদ্দিন। সন্তান হারালেও বুঝি এত যন্ত্রণা হতো না।
* * *
মা আর বোনকে নিয়ে আস্তাবলের পেছনে একটা গর্তের মধ্যে লুকিয়ে ছিল মনসুর। গত রাতে ফিরেই সে গর্ত খুঁড়তে শুরু করেছিল। আবদুল রহমান বলে দিয়েছিলেন, মোঙ্গোলরা যে কোনও মুহূর্তে ঢুকে পড়তে পারে বাগদাদে লুকিয়ে থেকেই বুঝতে পারছিল বাইরে হুলস্থুল শুরু হয়েছে। মোঙ্গোলরা সব তছনছ করে দিচ্ছে। থেকে থেকে ভেসে আসছে মানুষের আর্তনাদ।
এতক্ষণে সব চুপচাপ হয়েছে। ধীরে ধীরে গর্তের ওপরে চাপিয়ে রাখা খড় সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল মনসুর। চারপাশের অবস্থা দেখে চোখ দুটো ভিজে এল তার। বাড়িটায় ওরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। রাস্তার পাশে সবক’টা বাড়িই জ্বলছে। এ দিক সে দিক ছড়িয়ে আছে মৃতদেহ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাজানো বাগান ছারখার করে দিয়ে চলে গেছে মোঙ্গোলরা।
মন খারাপ করার সময় নেই। দ্রুত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল মনসুর। এই মুহূর্তে ওদের পাহারা শিথিল। জয়ের নেশায় ওরা মত্ত। এই সুযোগে মা আর বোনকে নিয়ে চলে যেতে হবে পারস্যে। সে জানে না শেষ অবধি পারস্য অবধি পৌঁছোতে পারবে কি না কিন্তু চেষ্টা তো করতে হবে। বাগদাদে এখন কেউ নিরাপদ নয়। মা আর বোনকে পারস্যে রেখে সে আবার ফিরে আসবে। তার মন বলছে, গিয়াসুদ্দিন আর আবদুল বেঁচে আছেন। ওঁদের খুঁজে বার করবে। তার পরে প্রতিশোধ।
মা আর বোনকে সে বার করে নিয়ে এল গর্ত থেকে। দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরল দু’জনের হাত। দু’জনেই খুব কাঁদছে। তারা শেষ বারের মতো দেখে নিল বাড়িটা তার পরে রাস্তায় পা রাখল। ঠিক তখনই তাদের কানে এল ঘোড়ার খুরের শব্দ। এ বার আর লুকিয়ে পড়ার অবকাশ পেল না মনসুর তার আগেই তাদের ঘিরে ধরল দশ জন অশ্বারোহী।
একটা বিশাল কালো ঘোড়ায় সওয়ার হালাকু খাঁ স্বয়ং। ইবন আলকামি আঙুল দেখিয়ে চিনিয়ে দিল, ‘ওই যে মনসুর। ওই বলতে পারবে গিয়াসুদ্দিন আর আবদুল কোথায় আছে?’
