লাপিস লাজুলি – ১১
॥ এগারো ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
রাত আড়াইটে। হোটেলের নীচে কালো রঙের একটা বেশ বড়সড় এসইউভি দাঁড়িয়ে। তারিক, ফারুক, জুনেইদ আর সইদুল চার জন এসে দাঁড়াল গাড়িটার সামনে। দু’টো লোক নেমে এল গাড়ি থেকে। এক জন ওদের সামনে একটা বেতের ঝুড়ি বাড়িয়ে দিল। আবু বকর আগেই বলে দিয়েছিল, ঘড়ি, পার্স, ফোন সব জমা দিতে হবে। তাই করল ওরা। অন্য জন কালো কাপড় দিয়ে ওদের চার জনের চোখ বেঁধে দিল। ওরা উঠে পড়ল গাড়িতে। কিছুক্ষণ পরে তারিক বুঝতে পারল, গাড়িটা চলতে শুরু করেছে।
অবশেষে এসেছে তাজকিয়া। যার-তার কাছ থেকে নয়, একেবারে মিলিটারি কমান্ডার ওমর হাসানের কাছ থেকে। আবু বকর তো প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে ফোন করেছিল, ‘তোমাদের লাইফ সেট হয়ে গেল। এক বার যদি ওমর হাসানের নেকনজরে পড়ে যাও আর চিন্তা নেই।’
বিলাসবহুল গাড়ি। আরামদায়ক এসি চলছে ভেতরে। সিটে শরীরটা এলিয়ে দিল তারিক। অবশেষে স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। অবশেষে তারা পা রাখতে চলেছে পবিত্র ভূমিতে। খিলাফতের অংশ হতে চলেছে। কিন্তু তানজিন নূর? সে কোথায়? যেখানে যাচ্ছে সেখানে গেলে কি দেখা হবে তানজিনের সঙ্গে? তানজিনের কথা ভেবে গলার কাছটা কেমন টনটন করে উঠল তারিকের।
কতক্ষণ গাড়ি চলেছে হিসেব রাখতে পারেনি তারিক। চোখে ঘুম নেমেছিল। ঘুম ভাঙল ফারুকের ঠেলায়, ‘ওঠ। এসে গেছি।’
পট্টি খুলতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল তারিকের। অনেকক্ষণ অন্ধকারে থাকার পরে আলোয় এলে যা হয় আর কী। চোখটা সয়ে যেতে তারিক দেখল, সকাল হয়ে গেছে। ঝলমল করছে চারদিক। তাদের পায়ের নীচে বালি। তাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ি দুটো চলে গেল। এখন যত দূর চোখ যায় ধু-ধু করছে মরুভূমি। বালির সমুদ্র। শুধু মাঝখানে বেশ অনেকটা জায়গা টিন, প্লাস্টিকের শিট, পুরোনো ভাঙা গাড়ি, বস্তা, কাঁটাতার এই সব দিয়ে ঘেরা। মরুভূমির উজ্জ্বল মুখে যেন একটা ব্রণ। তারিক আন্দাজ করল, এটা আইসিসের কোনও একটা গোপন ক্যাম্প। ভেতরে কী আছে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, তবে দুটো টাওয়ার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাতে স্নাইপার রাইফেল হাতে পাহারা দিচ্ছে দু’জন। ওরা সবে ভাবতে শুরু করেছে, এ বার কী হবে, এমন সময় ভেতর থেকে একটা হুড খোলা জিপ বেরিয়ে এল। জিপটা এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। ড্রাইভার ইশারা করল, ‘উঠে পড়ো।’
ওদের চার জনকে চাপিয়ে নিয়ে জিপটা ফের রওনা দিল ক্যাম্পের উদ্দেশে।
‘আল্লা হু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে ওদের স্বাগত জানাল এক দল জিহাদি। তাদের সবার হাতে বন্দুক। এই প্রথম এত কাছ থেকে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দেখল তারিক। বন্দুকের কালো ধাতব নলগুলো কেমন যেন শিরশিরানি জাগাচ্ছিল তার শরীরে। জাগাচ্ছিল উত্তেজনা। জিপ থেকে নামতে একটা লোক এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল ওদের দিকে। ইংরেজিতে বলল, ‘আইসিস ফেজ টু-তে তোমাদের স্বাগত। আমিই আবু বকর। তোমাদের রিক্রুটার। এসো আমার সঙ্গে।’
আবু বকরের মুখটা প্রথম বার দেখল তারিক। এর আগে যত বারই ভিডিয়ো কলে কথা হয়েছে আবু মুখ ঢেকে ছিল। আবু সুশ্রী। বয়স পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। ওদেরকে নিয়ে আবু চলে এল একটা টানা ছাউনিতে। ছাউনির মধ্যে পার্টিশন দিয়ে পরপর ঘর বানানো হয়েছে। একটা ঘরে ওদের থাকার ব্যবস্থা হল। সামান্য জলযোগের পর আবু বলল, ‘এটা ট্রেনিং ক্যাম্প। আপাতত কিছু দিন তোমাদের এখানেই থাকতে হবে।’
তারিক জানতে চাইল, ‘এটা কোন জায়গা?’
‘জাজিরা ক্যান্টন, সিরিয়া। যারা আইসিসে যোগ দিতে আসে তারা প্রথমে এখানেই আসে। এটা একটা ছোটো ক্যাম্প। প্রথমে এখানেই তোমাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে। তাতে যদি পাশ করে যাও তা হলে তোমাদের নিয়ে যাওয়া হবে হুদুদ সেন্টারে। ওটাই আসল জায়গা। ওখানেই তোমাদের নাম রেজিস্ট্রেশন হবে, কে কোন কাজে ভালো যাচাই করে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে। সেন্টার এখান থেকে মাইল খানেক উত্তরে। কাল থেকে শুরু তোমাদের একজামিনেশন। আজকের দিনটা আরাম করে নাও।’
সইদুল বলল, ‘কী পরীক্ষা হবে?’
‘মনের জোরের পরীক্ষা। গায়ের জোরের পরীক্ষা। কতটা কষ্ট সহ্য করতে পারো তার পরীক্ষা। দুনিয়ার সবচেয়ে খতরনাক সেনাবাহিনীতে নাম লেখাতে এসেছ, পরীক্ষা হবে না,’ হাসল আবু।
পরীক্ষা শব্দটাই ভয়ের। পরীক্ষার নাম শুনে ভয় পায় না এমন মানুষ নেই। সন্দিগ্ধ গলায় জুনেইদ বলল, ‘আচ্ছা, বাই চান্স যদি পরীক্ষায় পাশ না করতে পারি। তা হলে?’
আবু আবারও হাসল। বলল, ‘পরীক্ষায় ফেল করলে আর সেনাবাহিনীতে নাম লেখানো হল না। তখন সেনার খিদমত খাটতে হবে। তবে ফিরে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। এক বার এখানে চলে এলে আর ফিরে যাওয়া যায় না। কেন ভয় পাচ্ছ নাকি?
চোয়াল শক্ত করে তারিক বলল, ‘কীসের ভয়? ভয় পেলে এত দূরে আসতাম না। আর এসেছি যখন পরীক্ষায় পাশ করবই। আমাদের কাছে আর কোনও অপশন নেই।’
‘এই তো, শের কা বাচ্চা,’ পিঠ চাপড়ে দিল আবু। বলল, ‘তবে তোমরা খুব ভালো দিনে এসেছ। কমান্ডার ওমর হাসান আজ এখানে আসছেন। মাঝে মাঝে উনি নতুন রিক্রুটদের সঙ্গে দেখা করেন। তোমাদের লাক ভালো থাকলে তোমাদের সঙ্গেও দেখা করবেন। দেখবে ওয়ারিয়র কাকে বলে।’
চোখ চকচক করে উঠল তারিকের। বলল, ‘ওমর হাসান তো আগের বারের যুদ্ধেও ছিলেন তাই না? ইন্টারনেটে ওঁর সম্পর্কে একটু-আধটু পড়েছি কিন্তু ওঁকে কেমন দেখতে জানি না। ওঁর কোনও ছবি পাইনি। উনি তো এখনও ইন্টারন্যাশনাল ইনটেলিজেন্সের কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড!’
‘ঠিক। কমান্ডার হাসানের মাথার দাম টেন মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ওঁকে কেউ ধরতে পারবে না। ওঁকে ধরা যায় না। যাক গে, তোমরা রেস্ট নাও। আমি আসি। আমাকে বাগদাদ ফিরতে হবে। ওই দু’জন ইন্ডিয়ান এজেন্ট একটুর জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে। ওদের জন্য নতুন ব্যবস্থা করতে হবে। এই ক্যাম্পের দায়িত্বে আছেন কমান্ডার আরিব মাজিদ। এর পর থেকে উনি তোমাদের গাইড করবেন।’
আবু বেরিয়ে যাচ্ছিল ঘর থেকে। তারিক পিছু ডাকল, ‘আবু ভাই।’
আবু ঘুরে তাকাতে তার কাছে উঠে এল তারিক। একটু ইতস্তত করে বলল, ‘তোমার কাছে চেরি ব্লসম মানে তানজিন নূরের কোনও খবর আছে? ও আমাকে বলেছিল ও-ও সিরিয়া আসছে।’
তারিকের কাঁধে হাত রেখে আবু বলল, ‘চিন্তা কোরো না। ঠিক সময় মতো তানজিন তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবে।’
মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল তারিকের। আল্লাই জানেন আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে তানজিনের জন্য। কবে আসবে সেই ‘ঠিক সময়’? জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। এই জানলা দিয়ে দূরে ক্যাম্পের প্রবেশ পথটা দেখা যায়। তারিক দেখতে পেল, বিরাট দুটো কন্টেনার নিয়ে বিশাল দু’টো লরি ঢুকল ভেতরে। যদিও ফেব্রুয়ারি মাস তবু তীব্র রোদ। গরম হাওয়া আসছে জানলা দিয়ে। প্লাস্টিকের পর্দা নামিয়ে জানলাটা বন্ধ করে দিল তারিক। সে দেখতে পেল না আরও একটা এসইউভি এসে ঢুকল ক্যাম্পের ভেতরে।
এসইউভি-টা এসে দাঁড়াতেই ক্যাম্পের সবার মধ্যে একটা চাঞ্চল্য শুরু হল। সবার আগে ছুটে এসে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়াল আরিব মাজিদ আর আবু বকর। তাদের পেছনে সার বেঁধে দাঁড়াল বাকি সদস্যরা। গাড়ি থেকে নেমে এল ওমর হাসান। আল্লা হু আকবর ধ্বনি দিয়ে তাকে স্বাগত জানানো হল। আরিব মাজিদকে উদ্দেশ্য করে ওমর বলল, ‘দুটো কন্টেনার ভরতি চাল আর আটা আছে। জাওয়াসামিদের উপহার। এখান থেকে বাকি ক্যাম্পগুলোতে ডিস্ট্রিবিউট করো আর সেকেন্ড কন্টেনারটায় কয়েকটা ইন্ডিয়ান আছে। জাহাজে ধরা পড়েছিল। ওদের বার করো। বেঁচে আছে কি না দেখো।’
দ্রুত হাতে কন্টেনারের পেছনের একটা দরজা খুলে ১২ জনকে বার করে এনে শুইয়ে দেওয়া হল বালির ওপরে। আরিব পরীক্ষা করে বলল, ‘সবাই বেঁচে আছে।’
ওমর বলল, ‘জল।’
হোসপাইপে করে জল ছেটানো শুরু হল। শরীরে জলের স্পর্শ পেতেই উত্তেজিত হয়ে উঠল স্নায়ুগুলো। মস্তিষ্ক সংকেত পাঠাল, শরীরের বাইরে যতটা না জল দরকার তার চেয়ে বেশি দরকার ভেতরে। প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় হাঁ করল প্রত্যেকে। মরুভূমির চেয়েও খাঁ-খাঁ করতে থাকা বুকের ভেতরে জীবনের সঞ্চার হতে থাকল নতুন করে। চোখ মেলে তাকাল পল্লব। মাথার ওপরে সুনীল আকাশ। সামান্য ডান দিকে ফিরতে দেখল, রোশনি তার দিকে তাকিয়ে আছে। রোশনির হাতের ওপর ক্লান্ত হাত রাখল সে।
কন্টেনারের ভেতরে মাথার মধ্যে ভাদুড়িমশায়ের কণ্ঠস্বর পেয়ে চমকে উঠেছিল পল্লব। মনে মনে সেও উত্তর দিতে শুরু করেছিল। ভাদুড়িমশায় বলেছিলেন, ‘কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর আমার কথা চিন্তা করবে পল্লব। তুমি আমার কথা ভাবলে তবেই আমি তোমার কাছ পর্যন্ত পৌঁছোতে পারব। তোমরা কোথায় আছ জানতে পারলে তবেই তোমাদের উদ্ধার করা সম্ভব। ঈশ্বর মঙ্গলময়। তিনি তোমাদের কোনও ক্ষতি হতে দেবেন না।’
দূরে মিলিয়ে গেছিল মশায়ের গলা। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেই পল্লব বলেছিল, ‘আর ভয় নেই রোশনি। আর ভয় নেই অভয়। ভাদুড়ি স্যার আমাদের সঙ্গে আছেন। আমাদের কিচ্ছু হবে না। বিপদে পড়লেই ভাদুড়ি স্যারের কথা চিন্তা করবে রোশনি। মনে থাকবে?’
ঠিক তখনই কন্টেনার চালাচ্ছিল যারা তাদের দয়া হয়েছিল কি না কে জানে খুলে দিয়েছিল কন্টেনারের ওপরের ঢাকনার একটা অংশ। হু-হু করে ঢুকে এসেছিল টাটকা জীবনদায়ী বাতাস। আরও কিছুক্ষণ বেঁচে থাকার মতো রসদ।
শুয়ে থাকা অবস্থাতেই আশপাশে তাকিয়ে পল্লব বুঝতে পারল তাদেরকে এনে ফেলা হয়েছে একটা সামরিক ক্যাম্পের ভেতরে। কয়েকজন লোক তাদের দেখছে। তাদের হাতে বন্দুক। সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা দোহারা চেহারার সুন্দর দেখতে ছেলে। এর হাত খালি। গালে অল্প অল্প দাড়ি। ভুরুতে কাটা দাগ। বয়স তার চেয়েও কম। কিন্তু অদ্ভুত ভাবলেশহীন মরা মাছের মতো চাহনি। আরবিতে কী একটা বলল ছেলেটা আর বলা মাত্রই চার জন এসে চোখের পলকে তুলে ফেলল রোশনিকে। বাধা দেওয়ার অবকাশটুকুও পেল না সে। ওরা এমন ভাবে রোশনিকে ধরেছে যে সে ছটফটও করতে পারছে না।
দলের মধ্যে একমাত্র মেয়ে রোশনি। তার সঙ্গে যে এমন কিছু হতে পারে এ আশঙ্কা পল্লবের গোড়া থেকেই ছিল। চোখের সামনে যখন ঘটনাটা ঘটছে এক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেছিল সে। কিন্তু অন্ধ একটা রাগ তার স্থবিরতা কাটিয়ে দিল নিমেষে। অশক্ত শরীরেই লাফিয়ে উঠে সে ধেয়ে যেতে চাইল ওই চারটে লোকের দিকে। পল্লব বুঝতে পারেনি সে এখন রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেশাদার খুনিদের মাঝখানে। ফলে যা হওয়ার তাই হল। দু’পা যেতে না যেতেই একটা লোক নিপুণ হাতে বন্দুকের বাঁট বসিয়ে দিল তার মাথার পেছনে। কাটা কলাগাছের মতো মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল পল্লব। তীব্র যন্ত্রণায় আচ্ছন্ন হল চেতনা। অন্ধকার নেমে এল চোখের সামনে।
আরিব মাজিদকে ডেকে ওমর বলল, ‘এদের কোনও কাজে লাগিয়ে দিও নয়তো মেরেও ফেলতে পারো। অ্যাজ ইউ উইশ।’
***
কী ধরনের পরীক্ষা নিতে পারে এরা সেই নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল তারিকরা। এমন সময় এক জন এসে আরবিতে বলল, ‘কমান্ডার হাসান তোমাদের ডেকেছেন।’
ভাগ্যিস ফারুক খুব ভালো আরবি জানে। নয়তো এদের ‘লোকাল ডায়লেক্ট’ বোঝা বাকিদের কম্ম ছিল না। কমান্ডার হাসান ডেকেছেন শুনেই লাফিয়ে উঠল তারিক। ইন্টারনেটে এই মানুষটার বীরত্বের কথা যত পড়েছে ততই চমকে উঠেছে। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া মানুষটার নামে অনেক কুৎসা করেছে কিন্তু সে সব কথা তারিক বিশ্বাস করে না। সে জানে, জিহাদিদের চরিত্রহনন করে বাকি দুনিয়ার সামনে তাদের রাক্ষস বা অসুর প্রমাণ করতে চাওয়া আসলে পশ্চিমি মিডিয়ার একটা বড়ো চক্রান্ত।
লোকটার পিছু পিছু ওরা ছাউনির অন্য প্রান্তে একটা বড়ো ঘরে এসে ঢুকল। তারিক দেখল, ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে একটা মেয়ে বসে আছে মেঝেতে। তার মাথা নীচু। উলটো দিকে চেয়ারে বসে আছে ভুরুতে কাটা দাগওয়ালা একটা কমবয়সি ছেলে আর একটা মাঝবয়সি লোক। তারিকরা ঘরে ঢুকতেও মেয়েটা মাথা তুলল না। শিকার আর শিকারির শরীরী ভাষা এক হয় না। হওয়ার কথাও না। মেয়েটাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সে শিকার হতে এসেছে আর যে দু’জন বসে আছে তারা অবশ্যই শিকারি। তারা এতটাই আত্মপ্রত্যয়ী যে ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা এবং সেখানেও কোনও পাহারা নেই। তারিক ভাবল, শিকার তো সব সময় শিকারির কবল থেকে মুক্তি চায়। মেয়েটা যদি পালানোর চেষ্টা করে! তার পরেই বুঝল, তার ভাবনাটা নেহাতই বালখিল্য। যে তাদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে তার কাছে অস্ত্র আছে। যারা বসে আছে তাদের কাছেও নিশ্চয়ই অস্ত্র আছে। আর মেয়েটা পালিয়ে যাবেই বা কোথায়? চার দিকে ধু-ধু মরুভূমি! শিকারিরা সেটা জানে তাই এতটা আত্মপ্রত্যয়ী। মেয়েটাকে বেঁধে অবধি রাখেনি। কেন কে জানে হঠাৎ করে মেয়েটার জন্য মায়া হল তারিকের।
যে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল সে আলাপ করিয়ে দিল। মাঝবয়সি লোকটাকে দেখিয়ে বলল, ‘কমান্ডার আরিব মাজিদ। এই ক্যাম্পের হেড,’ আর ভুরুতে কাটা দাগওয়ালাকে দেখিয়ে বলল, ‘কমান্ডার ওমর হাসান। কমান্ডার হাসান, এরা চার জনই ইন্ডিয়া থেকে এসেছে। এর নাম তারিক, এর নাম ফারুক, এ সইদুল আর এ জুনেইদ।’
বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল তারিক। এই কমবয়সি ছেলেটা ওমর হাসান! বিশ্বত্রাস ওমর হাসান! ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড ওমর হাসান! কত বয়স হবে! তার থেকে বড়ো জোর দুই-তিন বছরের বড়ো! ফারুকের থেকে নির্ঘাত ছোটো। শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এল তারিকের। বলল, ‘সালাম ওয়ালেকুম কমান্ডার।’
তার দেখাদেখি বাকি তিন জনও বলে উঠল। ওমর আর আরিব প্রত্যুত্তর দিল, ‘ওয়ালেকুম আসসালাম’, তারপর স্পষ্ট ইংরেজিতে ওমর বলল, ‘ওয়েলকাম। ডিরেক্ট ইন্ডিয়া থেকে এই প্রথম কেউ আমাদের কাছে এল। কিছু ইন্ডিয়ান আমাদের সঙ্গে আছে কিন্তু তারা সবাই প্রবাসী। আমি এখন তোমাদের একটা পরীক্ষা নেব। মনের জোরের পরীক্ষা। আমি জানি, কাল থেকে তোমাদের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আজ যখন একটা সুযোগ এসে গেছে আজই দেখা যাক। তোমরা রেডি তো?’
ওমর হাসানের সামনে পরীক্ষা দিতে হবে ভেবেই তারিকের রক্ত গরম হয়ে গেল। টগবগ করে সে ফুটতে লাগল ভেতরে ভেতরে। সবার আগে বলল, ‘ইয়েস কমান্ডার।’
ভাবলেশহীন মুখে ওমর বলল, ‘গ্রেট। তোমাকে দেখে সবচেয়ে এনথুজিয়াস্ট মনে হচ্ছে। তোমাকে দিয়েই শুরু হবে। ওই মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছ? মেয়েটা ইন্ডিয়ান। তোমার দেশের মানুষ। কিন্তু ও আমাদের বিপক্ষে। ওকে অনেক বার লং লিভ আইসিস বলতে বলা হয়েছে। ও বলেনি। তাই ওকে শাস্তি দিতে হবে। তোমরা চার জন এখন এক-এক করে ওকে ধর্ষণ করবে। তার পরে লটারিতে তোমাদের মধ্যে যার নাম উঠবে সে ওর গলা কাটবে। কী নাম যেন তোমার? তারিক। গো রেপ হার।’
স্তম্ভিত হয়ে গেল তারিক। একেবারে আগাপাশতলা ঘেঁটে গেল। যতই ধর্মের মিথ্যে আফিম খেয়ে মাথা মুড়িয়ে আইসিসে যোগ দিতে আসুক, যতই নিজেকে বিরাট এক জিহাদি ভাবুক, তারিক নিজেও জানে না এখনও তার মধ্যে মনুষ্যত্ব বেঁচে আছে। তার বুকের ভেতর এখনও সুজলা সুফলা একটুকরো বাংলা বেঁচে আছে। যেখানে তার শৈশব সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে পুষ্ট হয়েছে, সেখানে আর যাই থাক ভালোবাসার ঘাটতি হয়নি কখনো। চেনে না, জানে না, কোনও শত্রুতা নেই এমন একটা মেয়েকে ধর্ষণ করতে হবে! আর শত্রুতা থাকলেও বা… ধর্ষণ! তার তো একটা বোন আছে, মা আছে। তারিক ভেবেছিল, তাদের সঙ্গে তার ছাড়ানকাটান হয়ে গেছে কিন্তু এই মুহূর্তে সে বুঝতে পারল, মনে রাখা যত সোজা ভুলে যাওয়া তত সোজা নয়। তারিকের অন্তর থেকে যেন একটা প্রতিবাদ উঠে আসতে চাইল কিন্তু ওমর হাসানের ঠান্ডা গলা ভেসে এল তখনই, ‘এত কী ভাবছ? আরিব, যারা যারা হেজিটেট করবে শুট করে দাও। আইসিস দুর্বল মানুষদের জন্য না।’
বন্দুকের সেফটি ক্যাচ খুলল কেউ একটা। গলা শুকিয়ে এল তারিকের। বেঁচে থাকতে চাইলে মেয়েটাকে ধর্ষণ করতে হবে! এত ভয়াবহ পরীক্ষা দিতে হবে সে ভাবেনি। কিন্তু এগিয়ে গেলেই-বা ধর্ষণ সে করবে কী করে? জাগছে না। তার পৌরুষ কিছুতেই জাগছে না যে। পারবে না সে। কিছুতেই পারবে না। চোখে জল এসে গেল তার। তার মনে হতে লাগল, ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ওমর হাসান সম্পর্কে খুব ভুল কিছু বলেনি। আরিব মাজিদ এসে তার কপালে পিস্তল ঠেকাল, ‘তুই যাবি না আমি শুট করব?’
ঠিক তখনই রোশনির মাথার ভেতর একটা মহিলা কণ্ঠ ফিসফিস করে বলল, ‘তৈরি হও। ওরা এই মুহূর্তে অসতর্ক।’
রোশনি যখন কিছুতেই লং লিভ আইসিস বলল না তখন চড় মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল ভুরুতে কাটা দাগওয়ালা ছেলেটা। ততক্ষণে রোশনি জেনে গেছে ছেলেটার নাম ওমর হাসান, এদের নেতা। আরবিতে কিছু একটা নির্দেশ দিয়ে তার থেকে কিছুটা দূরে চেয়ার টেনে বসেছিল ওমর। তখনই রোশনি বুঝতে পেরেছিল তার সঙ্গে খারাপ কিছু হতে চলেছে। যে বার সরিৎ তাকে মারতে এসেছিল সে বারও এই এক অনুভূতি হয়েছিল। ওমর হাসানের চোখ দুটোও অনেকটা সরিতের মতো। ফর্মালিনে চোবানো লাশের মতো নিথর। খুনিদের চোখ বোধ হয় এমনই হয়। চোখ বুজে ভাদুড়িমশায়ের কথা চিন্তা করতে শুরু করেছিল সে। পল্লব বলে দিয়েছিল, বিপদ হলেই ভাদুড়িমশায়ের কথা ভাবতে। মানুষটাকে সে এক-আধবারই সামনে থেকে দেখেছে কিন্তু মানুষটার উপস্থিতি এতটাই উজ্জ্বল যে এক বার দেখলেও স্পষ্ট ভাবে মনে থাকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সাড়া পেয়েছিল, ‘শুনতে পাচ্ছ রোশনি? আমি নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। শুনতে পাচ্ছ?’
মনে মনে রোশনি বলেছিল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
‘মনটা একটা বিন্দুতে সংহত করার চেষ্টা করো। তোমার চোখ দিয়ে আমি দেখতে চাই কী হচ্ছে।’
সবটা দেখতে পাচ্ছেন ভাদুড়িমশায় আর তাঁর সঙ্গে দেখতে পাচ্ছেন সমীরণ বসাক এবং ব্রিগেডিয়ার ভূমিকা সিং। ভারতীয় স্থলবাহিনীর অন্যতম নির্ভরযোগ্য একজন সৈনিক।
পল্লবের সঙ্গে প্রথম বার যোগাযোগ হওয়া মাত্রই সমীরণ জিজ্ঞেস করেছিলেন ভাদুড়িমশায়কে, ‘স্যার, পল্লবের সঙ্গে আপনার সংযোগস্থাপন হলে ও কোথায় আছে আপনি তো দেখতে পাবেন?
‘পাব,’ গম্ভীর গলায় উত্তর দিয়েছিলেন ভাদুড়িমশায়।
‘আমাকে দেখাতে পারবেন স্যার?’
থমকে গেছিলেন ভাদুড়িমশায়। এত দূর থেকে পল্লবের সঙ্গে সংযোগস্থাপন করাই অতি কঠিন কাজ। তার পরে সেটা অন্য কাউকে দেখানো আরও কঠিন। একসঙ্গে অনেকের মনের মধ্যে ঢুকতে হবে। তবে অসম্ভব বলে কিছু হয় না। গুরুকৃপায় এখন তাঁর মনোবল তুঙ্গে। কিন্তু এতটাও জীবনীশক্তি কি তাঁর আছে? অবশ্য এখন তো নিজের কথা ভাবার সময় নয়। তাঁর যা হয় হোক। পল্লবদের ফিরিয়ে আনতে হবে। বলেছিলেন, ‘পারব।’
লাফিয়ে উঠেছিলেন সমীরণ। বলেছিলেন, ‘তা হলে আমি আরও এক জনকে ডেকে পাঠাচ্ছি। ভূমিকা সিং। ব্রিগেডিয়ার। ক্লোজড জোন কমব্যাট স্পেশালিস্ট। অদ্ভুত ক্ষমতা মেয়েটার। শুধু মুখে মুখে ইন্সট্রাকশন দিয়ে লেম্যানকে দিয়ে যুদ্ধ করিয়ে নিতে পারে। যদি প্রয়োজন পড়ে ভূমিকা ওদের গাইড করতে পারবে। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে ওদের ওখান থেকে বার করতে গেলে আমাদের ভূমিকার হেল্প লাগবে। ডাকব স্যার?’
মৃদু হেসে ঘাড় নেড়েছিলেন ভাদুড়িমশায়, ‘ডাকো।’
সমীরণের অগোচরে চেনা হাসপাতালে ফোন করে একটা অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড় করিয়ে রাখতে বলেছিলেন তাঁর বাড়ির বাইরে। তিনি জানেন, যদি ওদের দু’জনকে নিয়ে পল্লবের মাথার মধ্যে ঢুকতে হয় তা হলে নিশ্চিত ভাবে তিনি অসুস্থ হবেন। গুরুতর অসুস্থ।
সমীরণের ডাকে ভূমিকা এসে উপস্থিত হয়েছিলেন কিন্তু কিছুতেই পল্লবের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। অতঃপর রোশনির কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন ভাদুড়িমশায়। সংশয় ছিল, রোশনি কি তাঁর কথা ভাববে? রোশনি ভেবেছে এবং এই মুহূর্তে সে কতটা বিপদে আছে তার চোখ দিয়েই দেখতে পাচ্ছেন ভাদুড়িমশায়সহ বাকি দু’জন। রক্তাম্বর পরে আসনে বসে দু’পাশে দু’জনের হাত ধরে আছেন তিনি। ভূমিকার উপস্থিতি যে এতটা কাজে লেগে যাবে সমীরণ নিজেও ভাবতে পারেননি। হয়তো এই মুহূর্তে মারপিট করা রোশনির জন্য ঘাতক হতে পারে কিন্তু যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বাঁচতে গেলে রোশনিকে লড়তেই হবে।
আরিব মাজিদ চিৎকার করছে, ‘গো রেপ হার বাস্টার্ড। নয়তো আমি তোকে সত্যি খুন করে ফেলব।’
মাথার ভেতরে রোশনি আবার শুনতে পেল ভূমিকার কণ্ঠ, ‘দিস ইজ দ্য টাইম। তোমাকে এখান থেকে পালাতেই হবে রোশনি। তুমি পালালে তবেই পল্লবদের বাঁচাতে পারবে। জাস্ট ফলো মাই ইন্সট্রাকশনস। দ্রুত ওঠো। যে লোকটা বন্দুক ধরে আছে ওর হাতে লাথি মারো। কুইক।’
এর পরে যেটা হল সেটার জন্য ঘরের কেউ প্রস্তুত ছিল না। রোশনি আচমকা লাফিয়ে উঠে একটা লাথি মারল আরিব মাজিদের হাতে। বন্দুকটা তার হাত থেকে ছিটকে যেতেই রোশনি নিজের কনুইটা বসিয়ে দিল তার পাঁজরে। ‘উফ’, শব্দ করে উবু হয়ে বসে পড়ল আরিব। বাকিদের বিস্ময় ভাবটা কাটার আগেই ভূমিকার নির্দেশমতো রোশনি একটা ঘুসি বসিয়ে দিল তারিকদের ডেকে নিয়ে আসা লোকটার গলায়। ঘুরে পড়ে গেল লোকটা। মাটিতে এক পাক গড়িয়ে রোশনি পৌঁছে গেল আরিব মাজিদের হাত থেকে ছিটকে যাওয়া বন্দুকটার কাছে আর সেটা তুলেই গুলি চালিয়ে দিল ওমর হাসানের বুক লক্ষ্য করে। পুরো ঘটনাটা ঘটল দুই থেকে তিন সেকেন্ডের মধ্যে। মেয়েটা বন্দুক তুলেছে দেখেই বসে পড়ার চেষ্টা করল ওমর হাসান কিন্তু ততক্ষণে গুলি চালিয়ে দিয়েছে রোশনি। বসে পড়তে যাচ্ছিল বলেই গুলিটা বুকে না লেগে লাগল সোজা ওমরের ডান দিকের ভুরুর ওপরে।
খোলা দরজা দিয়ে ছুটতে শুরু করল রোশনি। নিথর হয়ে পড়ে রইল কমান্ডার ওমর হাসান। একটা মেয়ে তার বাঁ-দিকের ভুরুটা খারাপ করে দিয়েছিল। আজ অন্য একটা মেয়ে তার ডান দিকের ভুরুটাও খারাপ করে দিল। সে কিচ্ছু করতে পারল না! মৃত্যুর আগের মুহূর্তে তার ভাবলেশহীন চোখের মণিতে ভিড় করে এল অসহায়তা। আফশোস।
সিরিয়ান ডেজার্টের বুক চিরে হু-হু করে ছুটে চলেছে একটা ডার্ট বাইক। সোজা চলছে না বাইকটা। এঁকেবেঁকে চলছে। বাইকের পেছনে বেশ খানিকটা দূরে ধাওয়া করে আসছে আরও ছ’-সাতটা ডার্ট বাইক আর তিনটে এসইউভি। এসইউভিগুলোর জানলা থেকে অর্ধেকটা করে শরীর বার করে রয়েছে বন্দুকধারীরা। তারা নিশানা করার চেষ্টা করছে ছুটে চলা একলা বাইকটাকে। এমনিতেই রেঞ্জ থেকে খানিকটা দূরে আছে বাইকটা তার ওপরে এমন এঁকেবেঁকে চলছে যে কিছুতেই নিশানা করা যাচ্ছে না। তাও গুলি চালাল দু’জন। দুম দুম করে শব্দ হল। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখল রোশনি তার পরে সর্বশক্তি দিয়ে বাইকের অ্যাকসিলারেটরের কান মুচড়ে ধরল।
ঘরটা থেকে ছুটে বাইরে আসতেই রোশনি বুঝতে পেরেছিল, ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কী ভাবে অত দূর থেকে ভাদুড়িমশায় এবং ভূমিকা সিং তার মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন এ তার বোধবুদ্ধির বাইরে। কিন্তু সে এটা বুঝতে পারছিল সংযোগস্থাপনের জন্য তার দিক থেকেও মনকে সংহত করা দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা সম্ভব নয়। ফলে যা করার তাকেই করতে হবে। তার একার পক্ষে এখান থেকে পল্লব এবং বাকিদের উদ্ধার করা অসম্ভব। বরং সে যদি কোনও জনপদে গিয়ে পৌঁছোতে পারে তা হলে সাহায্য পাওয়া যাবে। ততক্ষণ অবধি এরা পল্লবদের বাঁচিয়ে রাখবে কি না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই কিন্তু সে যদি এখন বলিউডি সুপারস্টারের কায়দায় পল্লবদের উদ্ধার করতে যায় তা হলে সে সহ পল্লবরা সবাই যে এক্ষুনি মরবে এটা নিশ্চিত। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রোশনি, এখান থেকে বেরোতে হবে। সৌভাগ্যের বিষয় তার হাতে একটা পিস্তল আছে। যদিও এদের অত্যাধুনিক বন্দুকগুলোর সামনে এটা খেলনারই সামিল তবু আগ্নেয়াস্ত্র তো। স্কুলে বহু দিন সে স্কাউটের ক্যাপ্টেন ছিল। টার্গেট কাছাকাছি থাকলে জায়গা মতো নিশানা করে গুলি চালিয়ে দিতে পারবে। মনে মনে সে বলেছিল, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন পল্লবদা। আপনাকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু আমার ঈশ্বর জানেন, নিজের প্রাণের জন্য না, আপনার প্রাণ বাঁচাতেই আমি যা করার করছি।’
রোশনি ছুটে এসেছিল ছাউনির বাইরে। একটা আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছিল। সামনেই বাইরে বেরোনোর রাস্তা। তখনও কেউ দেখেনি তাকে। আড়াল থেকেই দেখতে পেয়েছিল একটা ছেলে একটা ডার্ট বাইক নিয়ে ঢুকল। বাইক স্ট্যান্ড করে ইগনিশন পয়েন্ট থেকে চাবি খুলে নেওয়ার আগেই সে গুলি চালিয়েছিল ছেলেটার কাঁধ লক্ষ্য করে। আর্তনাদ করে পড়ে গেছিল ছেলেটা। সচকিত হয়েছিল ক্যাম্পের লোকজন। ততক্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে আরিব মাজিদ আর তার সঙ্গী। দু’জনেই দুর্বোধ্য আরবিতে চিৎকার করতে করতে ছুটে আসছে। আরবি না বুঝলেও রোশনি এটুকু বুঝেছিল, তাকে ধরার কথাই বলছে ওরা। রোশনি দেখেছিল, সামনেই তার দিকে বন্দুক তুলছে দু’জন।
খুব বিপদের সময় কিছু মানুষের মাথা আশ্চর্য রকম ঠান্ডা হয়ে যায়। রোশনি তাদের একজন। নয়তো সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সিদ্ধান্ত নিয়ে সরিৎকে সে ইলেকট্রিক শক দিতে পারত না। সামনের দু’জনকে বন্দুক তুলতে দেখেও রোশনি ঘাবড়াল না বা কোনও তাড়াহুড়ো করল না। বাইকটার আড়ালেই নীচু হয়ে বসে পড়ে গুলি চালাল কাছের টাওয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে লক্ষ্য করে। লোকটা পড়ে গেল। সামনের দু’জন রোশনির এই মাস্টার মুভটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তারা চমকে গেল আর এই সুযোগে রোশনি এবার তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাল।
লোক দুটো পড়ে যেতেই আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বাইকে চেপে বসেছিল রোশনি আর হু-হু করে বাইক ছুটিয়েছিল। বেরিয়ে এসেছিল ক্যাম্পের বাইরে। ততক্ষণে পেছন থেকে গুলিবৃষ্টি শুরু হয়েছে। বোধ হয় ঈশ্বরও রোশনির এই আশ্চর্য সাহসিকতাকে কুর্নিশ করেছিলেন তাই এখনও অবধি একটাও গুলি তাকে স্পর্শ করেনি।
কত দূরে জনপদ, বাইকে কতটা তেল আছে এ সব না ভেবে রোশনি প্রাণপণে নাক বরাবর এগিয়ে চলছিল। তার মন বলছিল, উপায় হবে। সে বাঁচবে। পল্লবকেও বাঁচাতে পারবে। সে টের পেয়েছিল তার পেছনে ফেউ লেগে গেছে। যে করে হোক ওদের বন্দুকের রেঞ্জের বাইরে থাকতে হবে। তীব্র রোদ চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছে, চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে বালিতে প্রতিফলিত আলো, গরম হাওয়ায় উড়ে আসা গুঁড়ো গুঁড়ো বালি কেটে বসে যাচ্ছে গায়ে, মুখে। ভালো করে চোখ খুলে রাখতে পারছে না রোশনি। পেছনে ধেয়ে আসছে কালান্তক যমেরা। কানফাটানো শব্দে ওরা গুলি চালাচ্ছে ক্রমাগত। রোশনির মাথায় ঘুরছে একটাই কথা, ‘বাঁচতে হবে। যে করে হোক বাঁচতেই হবে।’
***
উট চরাতে বেরিয়েছিল সাতবুড়োর এক বুড়ো কাবিল। সঙ্গে তার নাতি মাহরুফ। কাবিল বুড়ো আজ সত্তর বছর ধরে এই সিরিয়া মরুভূমির র্যাঞ্চে ভেড়া আর উট চরাচ্ছে। দশ বছর বয়সে বিক্রি হয়ে এই র্যাঞ্চে এসেছিল, তখন থেকে এখানেই আছে। তার ছেলে, নাতি সবাই বংশানুক্রমে মালিকের সম্পত্তি। তারাও উট আর ভেড়া চরায়। প্রথম প্রথম পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করত কাবিলের কিন্তু কখন যে সে নিজেই এই মরুভূমির একটা অংশ হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। এই মরুভূমির প্রত্যেকটা বালির দানা তার চেনা। বাতাস শুঁকে সে বলে দিতে পারে আর কতক্ষণ পরে ঝড় উঠবে। মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া অশরীরীদের ফিসফিসানি শুনতে পায় সে। একমাত্র সেই জানে কত রহস্য লুকিয়ে আছে এই মরুভূমির পেটের ভেতরে। বালি পাহাড়ের ছায়ায় ঝিম ধরে বসে এই সবই ভাবছিল কাবিল বুড়ো। মাহরুফ ডাকল, ‘বাপিরা, ওই দেখো।’
চোখের ওপর হাতের আড়াল করে কাবিল বুড়ো দেখল, অনেক দূরে একটা বাইক ছুটে চলেছে পশ্চিমের বালি পাহাড়টার দিকে আর তাকে ধাওয়া করে আসছে আরও কয়েকটা বাইক আর গাড়ি। চমকে উঠে দাঁড়াল সে। জীবন-মৃত্যুর এই খেলায় বাঁচতে গিয়ে সামনের বাইক আরোহী যে মৃত্যুপুরীর দিকেই এগিয়ে চলেছে। কাবিল বুড়ো জানে, এই মরুভূমিতে মিথ বলে কিছু নেই, সব সত্যি। মরুভূমির প্রাচীন প্রবাদ আছে, ‘মাথার ওপরে সূর্য নিয়ে আর ঘাড়ের ওপরে মৃত্যু নিয়ে কেউ যদি প্রাণে বেঁচে ওই বালি পাহাড় টপকাতে পারে তা হলে সে জোড়া পাহাড় দেখতে পাবে। একমাত্র সেই দেখতে পাবে। আর কেউ পাবে না।’
জোড়া পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এক সুন্দর পথ চলে গেছে সত্যিকারের মৃত্যুপুরীর দিকে। যেখানে একবার গেলে কেউ ফেরে না। কেউ ফেরেনি। তবে এটাও প্রবাদ আছে, ‘যদি কেউ ফিরে আসে সে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়।’
ওই মৃত্যুপুরীর শেষে নদীর ধারে কুটির বেঁধে থাকেন মজবুড়ো ‘উত নাপিশতিম’। তিনি গল্প বলেন। লয়ের গল্প। সৃষ্টির গল্প।
সামনেই একটা ছোটো বালির পাহাড় দেখতে পাচ্ছে রোশনি। পাশ কাটিয়ে যেতে সময় লাগবে। রোশনি সোজা বাইক তুলে দিল পাহাড়ের মাথায়। ডার্ট বাইকগুলোর এই সুবিধে। অসম্ভব শক্তিশালী ইঞ্জিন। পাহাড়ের মাথায় উঠতেই অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখতে পেল সে। মরুভূমির মধ্যে হঠাৎ করে যেন দু’টো পাহাড় গজিয়ে উঠেছে। বালির পাহাড় নয়। রীতিমতো সবুজ পাহাড়। পাহাড় দু’টোর মাঝখান দিয়ে একটা সুন্দর রাস্তা চলে গেছে ভেতরের দিকে। ভারি আশ্চর্য হল রোশনি। মরুভূমির মাঝখানে এমন সবুজ পাহাড় এল কোথা থেকে? যেখান থেকেই আসুক ভাবার সময় নেই। কেন বলতে পারবে না রোশনির মনে হল ওই জোড়া পাহাড়ের মাঝের রাস্তাটাই তাকে বাঁচাতে পারে। ঢাল বেয়ে নেমে সে বাইক ছুটিয়ে দিল সুন্দর রাস্তাটার দিকে।
কিছুক্ষণ পরে আইসিস জঙ্গিদের বাইক আর এসইউভিগুলো বালির পাহাড় টপকে এসে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সামনে যত দূর চোখ যায় নিঃসীম অনন্ত মরুভূমি আর তার মাঝখানে মেয়েটার কোনও চিহ্ন নেই। সে যেন স্রেফ উবে গিয়েছে কর্পূরের মতো। মন্ত্রবলে।
