লাপিস লাজুলি – ১২
॥ বারো ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
অবশেষে আট দিন পরে আজ আসল ভিসা এসে পৌঁছেছে। পল্লবকে নিয়ে প্রবল দুশ্চিন্তার মাঝেও নিজের কাজটা ভোলেননি সমীরণ। ঠিক ভিসা পাঠিয়ে দিয়েছেন। পল্লবের ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে বিশদে কথা হয়েছে অপালার। সমীরণের আশঙ্কাই ঠিক। জাওয়াসামিরা আইসিস-দের খাবার পাঠানোর জন্যই জাহাজ লুঠ করেছিল। পল্লব আর রোশনি কোনও একটি আইসিস ক্যাম্পে আটকে পড়েছে। কিন্তু সেটা কোথায় এখনও জানা যায়নি। ভাদুড়িমশায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অনবরত।
পল্লবের খবরটা শোনার পর থেকেই প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিল সঞ্জয়। ভাদুড়ি মশায় নিজে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। মশায় বলেছেন, ‘আমি তো গোড়াতেই তোমাদের বলেছিলাম এই পথের পদে পদে বিপদ। কিন্তু আমার গুরু বলতেন, ‘বিপদ যখন খুব বেশি করে ঘনিয়ে ওঠে তখন তার মধ্যে থেকেই উঁকি দেন বিপত্তারণ।’ বিপদ যখন হয়েছে তার থেকে ত্রাণও হবে। আমার অনুমান, পল্লব আর রোশনি দু’জনেই এখনও বেঁচে আছে আর তোমরা জানো আমার অনুমান অভ্রান্ত। আমি বুঝতে পারছি সঞ্জয়, তোমার ঠিক কতটা মন খারাপ। কিন্তু আমাদের তো থেমে গেলে চলবে না বাবা। গীতায় কী বলেছে জানো? চক্রবৎ পরিবর্তন্তে সুখানি চ দুঃখানি চ। সুখ আর দুঃখ একটা সাইক্লিক্যাল অর্ডারে চলে। আজ তুমি দুঃখ পাচ্ছ, তোমার দুঃসময় যাচ্ছে মানে সুখের দিন সমাগত। তবে বাবা, ‘এসো, সুসংবাদ এসো’ বলে হাপিত্যেশ করে বসে থাকলে কোনও লাভ হয় না। সুসংবাদ যাতে আসে তার চেষ্টা করে যেতে হয় অবিরত। আমরা সবাই খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আর সেই জন্যই আমার মন বলছে আমাদের সব ভালো হবে। পল্লবদের ফিরে তো পাবই তার সঙ্গে খুঁজে পাব দেবী ইনান্নার দণ্ড। তিতাসকেও আমরা উদ্ধার করতে পারব। তোমরা যে কাজে গেছ সেই কাজে লেগে-পড়ে থাকো। লেগে-পড়ে থাকলেই অলৌকিক হবে।’
ভাদুড়িমশায়ের পেপটকে কাজ দিয়েছে। সকাল হতেই সঞ্জয় আর অপালা বেরিয়ে পড়েছে ইরাক মিউজিয়মের উদ্দেশে। ব্যাবিলন রোটানার সামনে গুলি চলার ঘটনার কারণ যদিও এখনও জানা যায়নি তবু সমীরণ ইরাকের ইন্ডিয়ান এমব্যাসির অনুমতি নিয়ে ওদের সঙ্গে একজন সশস্ত্র প্রহরী দিয়েছেন। গাড়িটাও এসেছে এমব্যাসি থেকে। ওরা দু’জন এই মুহূর্তে এমব্যাসির ডেলিগেট। মিউজিয়মের ডিরেক্টর জেনারেল রিচার্ড বেকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হয়েছে আগে থেকেই। ভাদুড়িমশায় নিজেও কথা বলেছেন বেক সাহেবের সঙ্গে। বেক সাহেব আর্কিওলজির জগতে খুব নামকরা লোক। একটা দীর্ঘ সময় কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তখনই কোচবিহার থেকে উদ্ধার হওয়া একটা দুর্গা মূর্তির সময়কাল নির্ণয় প্রসঙ্গে ভাদুড়িমশায়ের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছিল। মশায় আর্কিওলজির লোক নন কিন্তু ভারতীয় দেব-দেবীর বিবর্তনে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য সেই সময় সকলের সংশয় নিরসন করেছিল। সেই থেকেই বেক সাহেব ভাদুড়িমশায়ের গুণগ্রাহী। তিতাসের ওপরে লোকনাথ কোন তন্ত্র প্রয়োগ করেছে বুঝতে পারার পর সেই রাতে ভাদুড়িমশায় প্রথম ফোনটা করেছিলেন বেক সাহেবকে। দ্বিতীয়টা সমীরণকে। কারণ বেক সাহেব বলেছিলেন, ‘দেবী ইনান্নাকে নিয়ে যাবতীয় যা গবেষণা এবং মিথ তার সর্বোত্তম ব্যাখ্যা দিতে পারবেন এক জনই আর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ইরাকে আসতে হবে।’
রিচার্ড বেকের বয়স ষাট থেকে সত্তরের মাঝখানে। লম্বা দোহারা চেহারা। মাথার চুল সব সাদা। পরিষ্কার করে দাড়ি-গোঁফ কামানো। চোখে রিমলেস চশমা। বাগদাদের বিখ্যাত ব্রেকফাস্ট ডিশ ‘মুখাল্লামাহ’ আর ইরাকি চা সহযোগে উষ্ণ অভ্যর্থনা করলেন বেক সাহেব। অপালার কাছ থেকে ভাদুড়িমশায়ের খবরাখবর নিলেন। তার পরে বললেন, ‘তোমরা দেবী ইনান্নার ব্যাপারে জানতে চাও সে আমি শুনেছি। কিন্তু প্রাচীন মেসোপটেমিয়া নিয়ে আমার জ্ঞান খুব বেশি নয়। বাকি গবেষকেরা যা জানেন আমিও তাই জানি। এই ব্যাপারে যিনি মাস্টার আমি তাঁর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। তাকি আল তুসি। আমাদের মিউজিয়মের কিউরেটর। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ব্যাপারে উনি একটি চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া আর তার থেকেও বড়ো কথা হি ইজ আ মিথ কালেক্টর। ওঁর নিজের গবেষণা মেসোপটেমিয়ান মিথ নিয়েই। দশটা বাজতে পাঁচ তো? ভদ্রলোক আর পাঁচ মিনিটে চলে আসবেন। ভেরি মাচ পাংচুয়াল।’
বলতে বলতেই দরজায় টকটক শব্দ হল। বেক সাহেব বললেন, ‘প্লিজ কাম ইন।’
দরজা খুলে মুখ বাড়ালেন ছিমছাম চেহারার এক প্রৌঢ়। পরনে কালো স্যুট। মাথায় ‘শেহমাগ’, এক ধরনের স্কার্ফ। সযত্নে লালিত লম্বা সাদা দাড়ি। চোখে ভারী পাওয়ারের চশমা। ঘাড় নুইয়ে বললেন, ‘গুড মর্নিং স্যার।’
বেক সাহেব উঠে দাঁড়ালেন, ‘ভেরি গুড মর্নিং স্যার’, সঞ্জয়দের বললেন, ‘ইনিই তাকি আল তুসি।’
সঞ্জয়রা উঠে দাঁড়িয়ে সুপ্রভাত জানাল। প্রত্যুত্তরে তিনিও অভিবাদন জানালেন ঘাড় নুইয়ে। বেক সাহেব বললেন, ‘এদের কথাই বলছিলাম আপনাকে। ওরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়।’
একটু অবাক হয়েই সঞ্জয় আর অপালাকে দেখলেন প্রৌঢ়। তারপরে হেসে চোস্ত ইংরেজিতে বললেন, ‘দে আর ভেরি ইয়াং। এত কমবয়সি কারও মেসোপটেমিয়া নিয়ে আগ্রহ থাকতে পারে আমি ভাবতে পারিনি। এসো এসো। স্যার, আমি ওদের আমার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি?’
‘শিওর,’ ঘাড় নাড়লেন বেক সাহেব।
ইরাক মিউজিয়ামের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং-এর লম্বা করিডোর ধরে তাকি আল তুসির পিছু পিছু ওঁর চেম্বারে এসে ঢুকল অপালা আর সঞ্জয়। বিরাট বড়ো চেম্বার। এক প্রান্তে বিশাল এক টেবিল। অন্য প্রান্তে সোফা, সেন্টার টেবিল। ঘরের দু’দিকের তাকেই থরে থরে বই। দেওয়ালে টাঙানো প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ম্যাপ। সোফায় বসে তাকি সাহেব বললেন, ‘বোসো। বলো কী জানতে চাও।’
অপালা ভাদুড়িমশায়কে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আমরা কোথা থেকে খোঁজ শুরু করব দাদু?’
ভাদুড়ি মশায় বলেছিলেন, ‘এর উত্তর সঠিক ভাবে আমার কাছেও নেই। কে যে আমাদের দিশা দেখাতে পারবে আমি জানি না। তবে আমি যেহেতু অ্যাকাডেমিকসের লোক আমার ভরসাও তাঁদের ওপর। মিস্টার বেক যাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলবেন তাঁকে তোমাদের উদ্দেশ্য খুলে বলবে।’
অপালা অবাক হয়েছিল, ‘বলে দেব যে আমরা দেবীর দণ্ড খুঁজতে এসেছি?’
‘হ্যাঁ বলে দেবে। কী এসে যাবে বললে?’
‘না, ব্যাপারটা কনফিডেন্সিয়াল তো!’
স্মিত হেসেছিলেন ভাদুড়িমশায়, ‘পাঁচ হাজার বছর ধরে যে জিনিস খুঁজে পাওয়া যায়নি তার চেয়ে বড়ো কনফিডেন্সিয়াল আর কী আছে দিদিভাই? আগে তো সন্ধানের অভিমুখ ঠিক করতে হবে। ইনান্না আর ইনান্নার দণ্ড বিষয়ক যা যা তথ্য পাচ্ছ আগে সংগ্রহ করে ফেলো। তার পরে সেই তথ্যের বিটুইন দ্য লাইনসে খোঁজ করতে থাকো। সেখান থেকেই মিথকে ডিকোড করতে হবে। তোমরা কী ভাবে খুঁজছ সেটা অবশ্যই কাউকে বলবে না। কিন্তু কী খুঁজতে চাইছ সেটা নির্দিষ্ট করে না বললে আসল তথ্যের মধ্যে যে অনেক বেনোজল ঢুকে পড়বে।’
তাকি সাহেবের চোখে চোখ রেখে অপালা বলল, ‘স্যার, আমরা দেবী ইনান্নার দণ্ড খুঁজতে এসেছি।’
কয়েক মুহূর্ত ওদের দিকে অপলকে তাকিয়ে রইলেন তাকি সাহেব তার পরে হো-হো করে হেসে উঠলেন, ‘ইন্ডিয়া থেকে এত দূরে এসেছ দেবী ইনান্নার মিথিক্যাল দণ্ড খুঁজতে? লোকে এক-দেড়শো বছর আগেই হাল ছেড়ে দিয়েছে। নতুন নতুন মেসোপটেমিয়ার ইতিহাস পড়ছ বুঝি?’
পল্লবের মতে, মেয়েদের ঝাঁট সহজদাহ্য। ছেলেদের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি জ্বলে। ঝাঁট একটি অপশব্দ। তাই ভদ্র ভাবে বললে, মেয়ে মাত্রই অতিমাত্রায় সংবেদনশীল। কথা ওরা মাটিতে পড়তে দেয় না। তার আগেই জন্টি রোডসের মতো ঝাঁপিয়ে লুফে নিয়ে গায়ে মেখে ফেলে। অপালাও এর বাইরে নয়। তাই ‘নতুন নতুন ইতিহাস পড়ছ’ কথাটা সে গায়ে মেখে নিল। কয়েক সেকেন্ড গুম হয়ে থেকে দুম করে বলল, ‘তা হলে তো স্যার যখন এল ডোরাডো বা আলেকজান্দ্রিয়ার কথা পড়েছিলাম সেগুলোও আমাদের খুঁজতে যাওয়ার কথা ছিল। তাই না? আমরা কিন্তু যাইনি স্যার।’
অপালার শেষটা ধরতে পারলেন প্রৌঢ়। মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। সঞ্জয় ভাবল, এ বার একটা ঝামেলা লাগবে। আলোচনাটা শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই অপালা বলে উঠল, ‘আমার ঔদ্ধত্য মাফ করবেন স্যার। আসলে আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি। আমাদের এই খোঁজটা অ্যাকাডেমিক নয়। খুব পার্সোনাল।’
অবাক হলেন তাকি সাহেব, ‘পার্সোনাল?’
‘ইয়েস স্যার।’
‘কী রকম জানতে পারি?’
একটু ইতস্তত করে অপালা বলল, ‘স্যার, আপনি অলৌকিকে বিশ্বাস করেন?’
উলটে প্রশ্ন করলেন প্রৌঢ়, ‘কেন?’
থমথমে মুখে অপালা বলল, ‘আমরা একটা অলৌকিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি স্যার। আমাদের এক বন্ধু তাতে ভীষণ ভাবে এফেক্টেড হয়েছে। তার ওপরে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার এক তন্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে। সে নরকে চলে গেছে। তাকে বাঁচাতে গেলে এই মেসোপটেমিয়ান তন্ত্রমতেই তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে আর মেসোপটেমিয়ান মিথ বলছে, নরকের দরজা দেবী ইনান্নার দণ্ড ছাড়া খোলা যায় না।’
একবিংশ শতাব্দীতে ইলেকট্রিকের আলো জ্বলা, এসি চলতে থাকা একটা ঘরে বসে কথাগুলো বলতে অপালারই কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ শুনলে তাকে পাগল বলবে। হেসে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু তারা জানে এটাই সত্যি। তবে তাকি সাহেব হাসলেন না। সোজা হয়ে বসলেন, ‘আর ইউ সিরিয়াস?’
‘ভেরি মাচ স্যার।’
‘এটা তো খুব প্রাচীন একটা তন্ত্র। যার ওপরে প্রয়োগ করা হয় সে নিজেকে দেবী ইনান্না ভাবতে শুরু করে এবং পাপের ঘড়া পূর্ণ হলে তার নরকগমন হয়। তাকে উদ্ধার করতে গেলে খুলতে হয় নরকের দরজা!’
অবাক হয়ে সঞ্জয় বলে বসল, ‘স্যার, আপনি জানেন!
হাতের ওপর মৃদু চাপ দিল অপালা, ‘আহ! কী হচ্ছে! উনি জানবেন না? হি ইজ দ্য মিথ কালেক্টর।’
মনে মনে জিভ কাটল সঞ্জয়। বলল, ‘ঠিকই তো। ঠিকই তো।’
কিন্তু ওদের এই কথোপকথনে মন নেই তাকি সাহেবের। তাঁর মুখে বিস্ময় লেগে আছে ঘামে লেপটে যাওয়া পাউডারের মতো। বললেন, ‘এই সব তন্ত্রের কথা তো সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়! ইন্ডিয়ায় বসে কেউ এই তন্ত্র প্রয়োগ করছে! আর তোমরা এত কিছু জানলে কোথা থেকে?’
অপালা বলল, ‘আমার দাদু বলেছেন। মিস্টার বেক ওঁকে চেনেন। বিভিন্ন দেশের তন্ত্রের ব্যাপারে উনি একজন অথরিটি। যাই হোক, স্যার, আপনার কাছে আমার আরনেস্ট রিকোয়েস্ট, প্লিজ হেল্প আস। যে করে হোক ওই দণ্ড আমাদের খুঁজে বার করতেই হবে কিন্তু আমরা জানি না কোথা থেকে খোঁজ শুরু করব!’
টেবিলের ওপর রাখা কাচের গ্লাস থেকে জল খেলেন তাকি সাহেব। বললেন, ‘আসলে আমিও তো এ ভাবে ভাবিনি কখনো। পাঁচ হাজার বছর ধরে যে জিনিস খুঁজে পাওয়া যায়নি সেটা যে সত্যি থাকতে পারে আমার মাথায় আসেনি। মানে এখনও আমি কনভিন্সড নই। প্রাচীনতম সভ্যতার প্রাচীনতম মিথ। কোথা থেকে ডিকোড করা শুরু করব? সত্যি জানি না। আমাকে একটু ভাবার সময় দাও। আমি মিস্টার বেককে বলব তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।
ওরা বুঝতে পারল, ভদ্রলোক এখন আর কথা বাড়াতে চাইছেন না। বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এল দু’জনে। গাড়ি ছুটল হোটেলের দিকে। তাকি সাহেবের সঙ্গে কী কথা হয়েছে অপালা সেটা ফোনে জানিয়ে দিল ভাদুড়িমশায়কে। সঞ্জয় ফোন করল সমীরণ বসাককে। পল্লবদের খবর নিতে। নতুন কোনও খবর পাওয়া গেল না।
এখন ওরা যে হোটেলে আছে সেখান থেকে মিউজিয়াম ঘণ্টা দেড়েকের রাস্তা। সিটে মাথা হেলিয়ে সঞ্জয় বলল, ‘কাজের কাজ তো কিছু হল না।’
অপালা বলল, ‘এত সহজে তো সেটা হওয়ারও নয়।’
‘সে জানি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তাকি সাহেব আমাদের খুব একটা সাহায্য করতে পারবেন না। শেষকালে দেখলে কেমন যেন মিইয়ে গেলেন?’
‘হুম। আমারও তাই মনে হচ্ছে। লেটস সি,’ অপালার গলাতেও ক্লান্তি। দু’জনেই চুপ করে বসে রইল। সামনে যখন নিঃসীম শূন্যতা থাকে, দূরদূরান্তেও আশার আলো দেখা যায় না তখন চুপ করে যাওয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। সঞ্জয় যত বেশি করে মনটাকে অন্য দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করতে লাগল তত বেশি করে পল্লবের চিন্তা মাথায় ভিড় করে এল। এক সময় আর থাকতে না পেরে বলল, ‘এ ভাবে চুপ করে থাকলে খুব অস্বস্তি হচ্ছে। কথা বলো অপালা।’
অপালা অবাক, ‘কী কথা বলব?’
একটু ভেবে সঞ্জয় বলল, ‘দেবী ইনান্নার গল্পটা তো অর্ধেক বলেছিলে। ওটা শেষ করো।’
‘এখন?’
‘হ্যাঁ, দু’জনেরই মনটা ডাইভার্ট করা দরকার। সময়টাও কেটে যাবে। ‘হুম। কোথায় শেষ করেছিলাম তোমার মনে আছে?’
‘আছে। দুমুজির সঙ্গে ইনান্নার বিয়ে হল আর তার পরেই গন্ডগোল শুরু হল। কী গন্ডগোল হল বলো এ বার।’
গল্প বলার সুযোগ পেয়ে অপালার মনের মেঘটাও যেন কাটছে। সিটের ওপরে পা তুলে বসে সঞ্জয়ের দিকে ঘুরে সে বলল, ‘রাইট। দেখো ইনান্নাকে নিয়ে নানা মিথ সে তোমাকে আগেও বলেছি। বেশ কিছু জায়গায় ক্রোনোলজির গন্ডগোল আছে। সেগুলোকে আমি নিজের মতো করে সাজিয়ে বলছি। তা দুমুজির সঙ্গে বিয়ের পরে ভালোবাসার ব্যাপারটা মোটামুটি সর্টেড হল।’
‘মোটামুটি কেন,’ প্রশ্ন করল সঞ্জয়।
‘আরে বাবা সুমেরীয় ভাষায় ইনান্না মানে স্বর্গের রানি। ইনান্না যৌনতার দেবী। তিনি কি আলুনি নাকি যে চিরকাল এক পুরুষে আসক্ত থাকবেন?’
সঞ্জয়ের আজন্মলালিত পৌরুষের সংস্কার একটা ধাক্কা খেল। একটু-একটু ভয়ও লাগল আচমকা। নীচু গলায় বলল, ‘এক পুরুষে আসক্ত থাকাটাকে আলুনি মনে করো?’
সঞ্জয়ের মনের কথাটা পড়ে ফেলল অপালা। দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটের কোণে, ‘কাম অন সঞ্জয়। প্রেম আর সেক্স দুটো আলাদা এনটিটি। এটা জানো তো?’
‘জানি। কিন্তু…’
‘মানতে পারো না তাই তো,’ কথা কেটে প্রশ্ন করল অপালা।
‘হুম। আমি এত মডার্ন নই।’
‘জানি। আর তোমার আমাকে নিয়ে এত চিন্তার কিছু নেই। আমি যা যা বিশ্বাস করি সব যে নিজের জীবনে অ্যাপ্লাই করি এমন নয়। বুঝেছ?’
অপালা তার মনের কথা পড়ে ফেলেছে। আবার লজ্জা পেয়ে গেল সঞ্জয়। প্রতিবাদের সুরে বলল, ‘আমি মোটেই ব্যাপারটা ও ভাবে…’
তাকে থামিয়ে দিয়ে অপালা বলল, ‘তুমি হাঁ করলে আমি হাওড়া বুঝি হ্যাঁ? আমাকে বেশি বোঝাতে এসো না। গল্পটা কি কন্টিনিউ করব?’
তার প্রতি অপালার প্রেমটা মায়ের হাতে বোনা সোয়েটারের মতো জাপটে বসল সঞ্জয়ের গায়ে। সেই ওমটা উপভোগ করতে করতে মাথা নাড়ল সঞ্জয়, ‘করো করো। আর ইন্টারাপ্ট করব না।’
অপালা বলল, ‘গুড। তা ভালোবাসার ব্যাপারটা সর্টেড হওয়ার পরে ইনান্নার মনে হল তিনি দেবরাজ আনুর মেয়ে কিন্তু তাঁর তেমন খাতির নেই। চললেন উরুক নগরে। আনুর অধিষ্ঠান যেখানে। আনুকে গিয়ে বললেন, তাঁরও একটা মন্দির চাই। আনু তো মেয়ের খামখেয়ালিপনার ব্যাপারে অবহিত। তাঁর খুব একটা ইচ্ছে ছিল না কিন্তু ইনান্না এমন কান্নাকাটি করলেন পিতৃহৃদয় গলে গেল। মেয়ের আবদার ফেলা কি আর মুখের কথা? কতকটা বাধ্য হয়েই অনুমতি দিলেন আনু। উরুক নগরেই তাঁর মন্দিরের পাশে ইনান্নার মন্দির তৈরি হল। দারুণ সুন্দর বাগান তৈরি হল। সেই বাগানে ‘হুলুপ্পু’ গাছের চারা লাগালেন ইনান্না। তাঁর ইচ্ছে, গাছ যখন বড়ো হবে তখন সেই গাছের কাঠ দিয়ে একটা দারুণ সিংহাসন আর একটা খাট বানাবেন। কিন্তু গাছ বড়ো হতে তো দেরি আছে। তত দিন? ইনান্না তো থিতু হতে জানেন না। কেওস ছাড়া থাকতে পারেন না। অতএব নতুন খেয়াল চাপল মাথায়।’
‘কী খেয়াল?’
দেবরাজ আনুর মেয়ে হলেও, বাবার মন্দিরের পাশে মন্দির তৈরি হলেও এখনও তিনি প্রধান দেবতাদের মধ্যে পড়েন না। তিনি এখনও সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন। তাঁর ইচ্ছে হল ফার্স্ট ক্লাসে উঠতে হবে আর তার জন্য দরকার একটা জিনিস।’
‘কী?’
‘মে।’
‘হোয়াট?’
মে। মে। হড়বড় কোরো না। বুঝিয়ে বলছি। এই যে বিশাল জগৎ সেটা তো আর হাওয়ায় চলে না। সেটা সুষ্ঠু ভাবে চালানোর জন্য নানা ধরনের স্কিল লাগে। এই যে নানারকম স্কিল এগুলো এক-একজন প্রধান দেবতার অধিকারে ছিল। এই স্কিলগুলোকেই সুমেরীয় ভাষায় বলা হত মে। যেমন কারও কাছে ছিল শিল্পের মে, কারও কাছে লেখাপড়ার মে, কারও কাছে কৃষিকাজের মে, কারও কাছে কামার-কুমোরের মে, কারও কাছে চিকিৎসার মে। বুঝেছ?’
‘হুম। মানে এখন যেমন এক-একজন মন্ত্রীর আন্ডারে এক-একটা ডিপার্টমেন্ট?’
‘রাইট। আর সমস্ত মে-র কেন্দ্রীয় অধিকার ছিল আনুর কাছে। যেমন মুখ্যমন্ত্রী। কে কোন দফতর পাবে তিনিই ঠিক করেন। তা ইনান্না আনুকে বললেন তাঁরও একটা মে চাই। এ বার আর আনু রাজি হলেন না। বললেন, সবাইকে মে দেওয়া যায় না। মে ব্যবহার করতে গেলে সবার আগে কম্পোজড হতে হয়। সেটা তো ইনান্নার ধাতেই নেই। তাই বিগ নো।’
‘ইনান্না নিশ্চয়ই কিছু একটা কাণ্ড ঘটালেন?’
‘এই তো তুমি দেবীকে বুঝতে শুরু করেছ। একদমই তাই। কিছু দিন তিনি চুপচাপ রইলেন আর সুযোগ খুঁজতে লাগলেন। এ দিকে আনুর বয়স হচ্ছিল বলে তিনি রিটায়ার করবেন ঠিক করলেন আর মে-র কেন্দ্রীয় দায়িত্ব তুলে দিলেন জলের দেবতা এনকির কাছে। ব্যস, প্ল্যান সাজিয়ে ফেললেন ইনান্না। এনকির সঙ্গে দেখা করে মদ খেতে বসলেন।’
‘কী! দেবী মদ খেতে বসলেন?’
‘শোনো সঞ্জয়, প্রাচীন দুনিয়াটা আজকের থেকে অনেক বেশি আধুনিক ছিল। তখন কেউ কথায় কথায় মেয়েদের জাজ করত না,’ খ্যাঁক করে উঠল অপালা, ‘সময় যত গড়িয়েছে মানুষ শুধু বাইরেই স্মার্ট হয়েছে। আসল স্মার্টনেসটা থাকে চেতনায়। চেতনার উন্নতি তো দূর, অবনতি হয়েছে। যাই হোক যেটা বলছিলাম শোনো, মদ খাইয়ে এনকিকে একেবারে পেড়ে ফেললেন ইনান্না। একে পেটে মদ পড়েছে তার ওপরে সামনে অমন আগুনের খাপরার মতো মেয়েমানুষ, এনকি একেবারে কল্পতরু হয়ে গেলেন। এক-এক করে ইনান্নাকে সবক’টা মে দিয়ে দিলেন।’
‘বলো কী!’
‘ইয়েস মাই বয়। পুরুষেরা চিরকালই কাছাখোলা। আপ্তবাক্য আছে জানো না? পুরুষ দেহে একসঙ্গে দু’জায়গায় রক্ত থাকে না?’
‘মানে?’
‘রক্তজালিকা দিয়ে তৈরি একটা অরগ্যানে ব্লাড ফ্লো বেশি হলে ব্রেনটা খালি হয়ে যায়। যাক গে, এনকির থেকে সবক’টা মে নিয়ে ইনান্না পালিয়ে গেলেন পাতালে। নরকে। বোন এরেশকিগাল-এর কাছে। দুনিয়া জুড়ে হাহাকার পড়ে গেল। সব কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল। আর এই সব কিছুর সঙ্গে মোরালিটি মানে নীতিজ্ঞানের মে-ও তো ছিল। দুনিয়ার সবাই নীতিহীন হয়ে পড়ল। যা-তা হতে লাগল। দেবতাদের মাথায় হাত পড়ে গেল।’
‘তার পরে?’
‘দেবতারা গিয়ে আনুর কাছে ইনান্নার নামে কমপ্লেন করলেন। লজ্জায় মাথা কাটা গেল আনুর। খুব রেগে গিয়ে তিনি এরেশকিগালকে নির্দেশ দিলেন, এক্ষুনি ইনান্নাকে ফেরত পাঠাও। কিন্তু ফেরত পাঠাও বললেই তো আর হল না। নরক গমন সোজা কিন্তু সেখান থেকে বেরোনো সোজা কথা নয়। কেউ যদি নরক থেকে ফিরে আসতে চায় তা হলে মর্ত্যলোক বা স্বর্গলোক থেকে কাউকে একটা যেতে হবে তার বিনিময়ে। একের বদলে এক। এ দিকে ইনান্নারও আর ভালো লাগছিল না নরকে। সেখানে তো মর্ত্য বা স্বর্গের মতো মজা নেই। সারাক্ষণ ডিপ্রেসিং অন্ধকার। তাই তিনি এরেশকিগালকে কথা দিলেন ওপরে উঠে এসে একজনকে নীচে পাঠিয়ে দেবেন। আর কাকে পাঠালেন জানো?’
‘কাকে?’
‘বাড়ি ফিরে ইনান্না দেখলেন তাঁর অনুপস্থিতিতে স্বামী দুমুজি অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করছেন। ব্যস তার কেটে গেল। দুমুজিকে পাঠিয়ে দিলেন নরকে।’
‘হোয়াট দ্য…!’
‘হুম। ইনান্না এ-রকমই। দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল উওম্যান ইন মেসোপটেমিয়ান মিথ। সব মেয়ের ভেতরেই একটা দেবী ইনান্না থাকে। বেশি ঘাঁটিয়েছ কী মরেছ!’
‘আমাকে কি কখনো ঘাঁটাতে দেখেছ?’
‘তুমি তো লক্ষ্মী ছেলে,’ সঞ্জয়ের গাল টিপে দিল অপালা। গল্প বলতে বলতে মনটা হালকা হয়েছে তার।
সঞ্জয় দেখল, ড্রাইভার আড়চোখে তাদের দেখছে। দ্রুত বলে উঠল, ‘ইনান্নার গল্প কি এখানেই শেষ?’
‘হুম। নরক গমনের গল্পটা এখানেই মোটামুটি শেষ। তবে এর পরে আরও একটা ইন্টারেস্টিং কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন দেবীসাহেবা। রাজা ‘গিলগামেশ’কে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এমন ঝামেলায় ফেলেছিলেন গিলগামেশকে যে অমরত্বের জন্য তাঁকে যেতে হয়েছিল ‘উত নাপিশতিম’-এর কাছে।’
‘বাবা! কী খটোমটো সব নাম। গিলগামেশ মানে কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা মহাকাব্য ‘এপিক অব গিলগামেশ’-এর রাজা?’
‘রাইট।’
‘কিন্তু উত নাপিশতিম! সে কে?’
‘বলব পরে। এখন বললে আর মাথায় রাখতে পারবে না। আর কতক্ষণ গো?’
ঘড়ি দেখে সঞ্জয় বলল, ‘আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তো পৌঁছে যাওয়ার কথা। হোটেলে কি লাঞ্চ বলে দেব?’
‘নাহ, পেট ভরতি। আজ দুপুরে কিছু খাব না। একটু ঘুমোব। খুব ক্লান্ত লাগছে।’
অপালার হাতের ওপরে হাত রাখল সঞ্জয়। আচমকাই একটা অদ্ভুত প্রশ্ন জাগল তার মনে। বলল, ‘আচ্ছা অপালা একটা কথা বলো। স্যারের কথা অনুসারে তিতাস এখন দেবী ইনান্না। তাই তার নরকগমন হয়েছে। তা হলে কি তিতাসকে নরক থেকে ফিরিয়ে আনতে কাউকে একটা ওখানে যেতে হবে? ইনান্নার বদলে নরকে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী দুমুজি। তা হলে এ ক্ষেত্রে কে? পল্লব!’
চমকে উঠল অপালা। এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না কিন্তু অজানা এক আশঙ্কায় দু’জনেরই হাড় হিম হয়ে গেল আর তখনই পেছনের গলি থেকে বেরিয়ে একটা কালো গাড়ি ওদের পিছু নিল। গাড়িটায় এক জন ড্রাইভার। এক জন সওয়ারি। সওয়ারির হাতে একটা অত্যাধুনিক লাইট মেশিনগান। সেকেন্ডে কুড়ি রাউন্ড গুলি চালাতে সক্ষম। কম রেঞ্জে একাধিক লোককে মারতে অসম্ভব কার্যকরী। তার ওপরে নির্দেশ আছে, র-এর এজেন্ট দু’জন গাড়ি থেকে নামা মাত্রই গুলিবৃষ্টি করতে হবে। তাতে যদি আর কেউ মরে তো মরবে।
বন্দুকটায় একবার হাত বুলিয়ে নিল ঘাতক। আর মিনিট তিনেকের মধ্যে সামনের গাড়িটা হোটেলের কাছে পৌঁছে যাবে। স্নায়ুগুলোকে টান টান করে নিল সে। তখনই তার কাছে একটা ফোন এল। ফোনের ওপার থেকে একটা কণ্ঠ নির্দেশ দিল, ‘এখুনি জাজিরা ক্যাম্পে যাও। কমান্ডার ওমর হাসান শহিদ হয়েছেন।’
চমকে উঠল ঘাতক, ‘কী?’
‘ইয়েস। যা বললাম করো।’
‘আর অপারেশনটা?’
‘অ্যাবৰ্ট।’
পেছনের কালো গাড়িটার ওপরে সন্দেহ জাগল গার্ডের। সঞ্জয় আর অপালার উদ্দেশ্যে সে বলল, ‘কেউ আমাদের ফলো করছে।’
চমকে পেছনে তাকাল দু’জনে আর তখনই গাড়িটা বাঁ-দিকের একটা গলিতে ঢুকে গেল। নিশ্চিন্ত হল গার্ড। অস্বস্তির হাসি হেসে বলল, আমি একটু বেশিই ভেবে ফেলেছিলাম।’
‘সরি।
অপালাদের গাড়িটা এসে দাঁড়াল হোটেলের সামনে। গার্ডকে বিদায় জানিয়ে রিসেপশনে আসতেই রিসেপশনিস্ট সঞ্জয় আর অপালাকে বলল, ‘তাকি আল তুসি বলে একজন ফোন করেছিলেন। আপনাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইছিলেন। কখন দেব?’
এক বার চোখাচোখি হল দু’জনের। অপালা বলল, ‘এসাপ। উনি যদি এক্ষুনি আসতে পারেন তো এক্ষুনি।’
