লাপিস লাজুলি – ১৩
॥ তেরো ॥
ফেব্রুয়ারি, ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ
আল রুসাফা কবরস্থানে একটা বড়ো রাবার গাছের গুঁড়িতে বাঁধা হয়েছে গিয়াসুদ্দিন, আবদুল আর মনসুরকে। মনসুরের কপালে গভীর ক্ষত। গাল, গলা বেয়ে গড়িয়ে নেমেছে রক্ত। ভিজিয়ে দিয়েছে গায়ের জামা। পাশেই একটা ডুমুর গাছের নীচে বসিয়ে রাখা হয়েছে মনসুরের মা আর বোনকে। তারা থরথর করে কাঁপছে। সবাইকে গোল করে ঘিরে আছে অন্তত পঞ্চাশ জন মোঙ্গোল সেনা। একটু দূরেই হালাকু খাঁ তার অনুচরদের সঙ্গে নীচু গলায় কী যেন বলছেন। তাদের মধ্যে ইবন আলকামিও আছে। মনসুর বিড়বিড় করে একটা কথাই বলে চলেছে, ‘আমাকে ক্ষমা করুন আলমুহাল্লিম। আমার কিছু করার ছিল না। কিচ্ছু করার ছিল না।’
চোখে জল এল গিয়াসুদ্দিনের। মনসুর তাঁর সন্তানসম। তিনি বুঝতে পারছেন, অপরাধবোধে ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছে মনসুরের ভেতরটা। ইচ্ছে করল, মনসুরের মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘জানি রে মনসুর। তোর কিছু করার ছিল না। কষ্ট পাস না বাবা। আমরা তোকে ভুল বুঝিনি।’
কিন্তু উপায় নেই। দুটো হাতই বাঁধা।
সত্যিই কিছু করার ছিল না মনসুরের। মা আর বোনকে সঙ্গে নিয়ে আর যাই হোক লড়াই করা যায় না। তবু বিশ্বাসঘাতক আলকামিটাকে দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি সে। গিয়াসুদ্দিন প্রথম থেকেই এই লোকটাকে সন্দেহ করতেন। বলতেন, ‘আলকামি শেয়ালের মতো ধূর্ত। কুকুরের ভেক ধরে আছে কিন্তু আসলে ও শেয়াল আর শেয়াল কোনও দিন পোষ মানে না। ওকে বিশ্বাস করার দাম দিতে হবে খলিফাকে।’
আচমকা লাফিয়ে উঠে ঘোড়ার ওপর থেকে টেনে আলকামিকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল মনসুর। তখনই তার কপালে তলোয়ারের বাঁট বসিয়ে দিয়েছিল একটা মোঙ্গোল। হালাকু খাঁ বসেছিলেন ঘোড়ার ওপরেই। তাঁর এক অনুচর এসে মনসুরের গলায় পা চাপিয়ে দিয়েছিল। ততক্ষণে মা আর বোনকে তলোয়ারের ডগায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে অন্য দু’জন। মনসুর চিৎকার করে উঠেছিল, ‘আমার মা আর বোনের গায়ে হাত দেবে না। খবরদার।’
যে মনসুরের গলায় পা চাপিয়ে দিয়েছিল তাকে উদ্দেশ্য করে হালাকু খাঁ বলেছিলেন, ‘সুলচুক, ওকে বলে দাও আমরা ওর মা, বোনের কোনও ক্ষতি করব না। কিন্তু তার বিনিময়ে ওকে বলতে হবে গিয়াসুদ্দিন আল তুসি আর আবদুল রহমান কোথায় লুকিয়ে আছে।’
গলায় পায়ের চাপ বাড়িয়েছিল সুলচুক নামের মোঙ্গোলটা, ‘বল। কোথায় আছে গিয়াসুদ্দিন আর আবদুল। বল।’
দম আটকে আসছিল। তবু চিৎকার করে মনসুর বলেছিল, ‘বলব না। কিছুতেই বলব না।’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হালাকু খাঁ বলেছিলেন, ‘বেশ। ওকে কিছু বলতে হবে না। সুলচুক, ওকে বেঁধে ফেলো। চোখের পাতা দুটো আটকে দাও ভুরুর সঙ্গে। যাতে চোখ বন্ধ করতে না পারে। তার পরে ওর সামনে তোমরা একে একে ওর মা আর বোনকে ধর্ষণ করো। এই রাস্তার ওপরেই করো। যারা বেঁচে আছে তারা দেখুক হালাকু খাঁ-র বিরুদ্ধাচরণ করলে কী শাস্তি হয়।’
কথাটা শুনেই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল আলকামির চোখ মুখ। বলেছিল, ‘খাঁ, আমি ওই বাচ্চা মেয়েটাকে চাই। এই বয়সেই কেমন ডাগর হয়ে উঠেছে দেখুন। আমি আগে যাব?’
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন হালাকু। হায়েনার মতো হাসতে হাসতে বোনের দিকে এগোচ্ছিল নরকের পিশাচটা। মায়ের হাত চেপে ধরে রাস্তার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল অন্য একটা মোঙ্গোল। মা চিৎকার করছিল, ‘আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দাও। আমার ছেলেটাকে মেরো না তোমরা। ওরা খুব ছোটো। দোহাই তোমাদের। তোমরা আমার সঙ্গে যা ইচ্ছে করো কিন্তু ওদের ছেড়ে দাও। দয়া করো।’
মায়ের হাহাকারে মন গলেনি ওদের। আলকামি এসে বোনের চুলের মুঠি ধরে ফেলে দিয়েছিল মাটিতে। ব্যথায় ককিয়ে উঠেছিল দশ বছরের বাচ্চা মেয়েটা। আর থাকতে পারেনি মনসুর। অসহায়তা, ঘেন্না, যন্ত্রণা, কান্না সবটা গিলে নিয়ে বলেছিল, ‘ওদের ছেড়ে দাও। আমি বলছি। আমি বলছি।’
হাত তুলে অনুচরদের বিরত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন হালাকু। বোনকে ছেড়ে এগিয়ে এসে মনসুরের মুখে এক লাথি বসিয়ে দিয়েছিল আলকামি। গরগর করে বলেছিল, ‘অপদার্থ একটা। তোদের মতো ছেলেদের জন্য বাগদাদের বদনাম হয়। একটুও মনের জোর নেই। আর একটু পরে বললেই তো আমার কাজটা মিটে যেত। ভীতু কোথাকার।’
মনসুর জানে, বলে দিলেও যে ওরা মা আর বোনকে রেয়াত করবে তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু আল্লা তো এটুকু জানবেন, সে তার মা আর বোনকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। আল্লা অন্তর্যামী। তিনি এটাও জানবেন, সে যা করেছে নিরুপায় হয়েই করেছে।
গিয়াসুদ্দিন শুনতে পেলেন মনসুর এখনও বলে চলেছে, ‘আমাকে ক্ষমা করুন আলমুহাল্লিম। আমার কিছু করার ছিল না। কিচ্ছু করার ছিল না।
মনসুরের চিত্তবিকারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ওর সঙ্গে কথা বলা দরকার। কষ্ট করে ঘাড় ঘুরিয়ে মনসুরকে ডাকতে যাবেন তার আগেই দেখলেন হালাকু খাঁ ঘোড়া থেকে নেমে পড়েছেন। এ দিকেই এগিয়ে আসছেন। চোয়াল শক্ত হল গিয়াসুদ্দিনের। যাই হয়ে যাক, ওরা যদি চোখের সামনে আবদুল আর মনসুরকে খুনও করে, তাও তিনি মুখ খুলবেন না। আবদুলকেও এটা বলে দেওয়া দরকার। অস্ফুটে বললেন, ‘আবদুল শুনতে পাচ্ছ?’
আবদুলও অস্ফুটে সাড়া দিলেন, ‘বলুন।’
‘কান খুলে একটা কথা শুনে নাও। ওরা যদি তোমার সামনে আমাকে বা মনসুরকে প্রবল যন্ত্রণা দিতে দিতে মেরেও ফেলে তাও মুখ খুলবে না। দেবী ইনান্নার দণ্ড এই পাষণ্ডের হাতে কিছুতেই পড়তে দেওয়া যাবে না। বুঝেছ?’
‘হুম,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন আবদুল।
তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই গিয়াসুদ্দিনের সামনে এসে দাঁড়ালেন হালাকু খাঁ। একটু মেপে নিলেন গিয়াসুদ্দিনকে। বললেন, ‘আপনিই তা হলে সেই গিয়াসুদ্দিন!’
ধরা যখন পড়েই গিয়েছেন, মৃত্যু এলেও মুখ খুলবেন না বলে ঠিক করে নিয়েছেন তখন আর ভয় কীসের? বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিই সেই গিয়াসুদ্দিন আল তুসি। আর আপনি বোধ হয় চেঙ্গিজ খাঁ-র কুলাঙ্গার দৌহিত্র হালাকু খাঁ?’
শরীরের সমস্ত রক্ত হালাকু খাঁ-র মুখে এসে জমা হল। পাত্তা না দিয়ে গিয়াসুদ্দিন বললেন, ‘ওই পরভোজী কৃমিকীট আলকামিটা নিশ্চয়ই আপনাকে আমার ব্যাপারে সব বলেছে? ঠিকই ধরেছেন, খিলাফতের পাঞ্জা আপনার রক্তাক্ত হাতে শোভা পায় না বলে আমিই ওটা আপনার শিবির থেকে নিয়ে এসেছি।’
‘কোথায় সেটা,’ গর্জন করে উঠলেন হালাকু খাঁ।
ততোধিক শান্ত স্বরে গিয়াসুদ্দিন বললেন, ‘ওটা আর কোনও কাজে লাগবে না। তাই টাইগ্রিসের জলে ফেলে দিয়েছি।’
হালাকু খাঁ-র সংযমের বাঁধ ভেঙে গেল। প্রচণ্ড এক ঘুসি বসিয়ে দিলেন গিয়াসুদ্দিনের মুখে। ঠোঁট ফেটে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এল। গিয়াসুদ্দিনের কামিজের গলার কাছটা খামচে ধরে চিৎকার করে উঠলেন হালাকু, ‘কেন ফেলেছিস? কী ওটা? কোন কাজে লাগে ওটা? বল।’
হাসলেন গিয়াসুদ্দিন। তিনি বিদ্বান মানুষ। চট করে কাউকে অপমান করতে বাধে। কিন্তু হালাকু খাঁ যখন তুইতোকারি শুরু করেছে তাঁর আর বাধা কীসে? বললেন, ‘ওটা একটা চাবি। অনেক দুষ্প্রাপ্য পুঁথি আমি বায়তুল হিকমাহ-র একটা গোপন প্রকোষ্ঠে রেখে দিয়েছিলাম। ওটা ছিল সেই প্রকোষ্ঠের চাবি। কিন্তু গোটা গ্রন্থাগারটাই তো তুই জ্বালিয়ে দিয়েছিস। অবশ্য ওই পুঁথিগুলো পেলেও ওর মর্ম বুঝতিস না মূর্খ। শোন রে যুদ্ধবাজ, রক্তলোলুপ উন্মাদ তোর উপস্থিতিটাই আমার বিবমিষা জাগাচ্ছে। আমাদের তো তুই মেরে ফেলবি? তাড়াতাড়ি মেরে ফেলে চলে যা। দূর হয়ে যা এই পবিত্র গোরস্থান থেকে।’
হালাকু কিছু বলার আগেই আলকামি চেঁচিয়ে বলল, ‘খাঁ, একদম বিশ্বাস করবেন না এই বুড়োটাকে। চাবির কথাটা হয়তো ঠিক কিন্তু বাকিটা ও আপনাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। শুধু বই থাকলে ও মোটেই অত ঝুঁকি নিয়ে আপনার শিবির থেকে পাঞ্জাটা চুরি করাত না। নিশ্চয়ই ওখানে খুব দামি কিছু ছিল, মনে হয় কোনও গুপ্তধন আর ও সেটা বায়তুল হিকমাহ থেকে সরিয়ে ফেলেছে।’
রাজার পাপে রাজ্য নষ্ট হয় ঠিকই কিন্তু ধ্বংসের সলতেয় আগুন লাগায় এই আলকামির মতো কিছু বিশ্বাসঘাতক। ঘেন্নায় রি-রি করে উঠল গিয়াসুদ্দিনের সারা শরীর। আর একইসঙ্গে চিন্তাও শুরু হল। আলকামি হালাকু খাঁ-কে উসকাচ্ছে। দুশ্চিন্তার শেকড়টা মাথার মধ্যে ভালো করে জাঁকিয়ে বসার আগেই আলকামি এমন একটা কথা বলে বসল ভয়ে শিউরে উঠলেন গিয়াসুদ্দিন। আলকামি বলল, ‘খাঁ, আমার মন বলছে বুড়ো যা লুকোনোর এই কবরখানাতেই লুকিয়েছে। কথাটা কেন বলছি বুঝুন। আমরা যখন এলাম ওরা কবরখানা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। যদি ওরা লুকিয়ে থাকতেই আসে তা হলে বেরোচ্ছিল কেন? আসলে যেখানে গুপ্তধন রেখেছে সেখান থেকে সরে যেতে চাইছিল। আমাদের ভাগ্য ভালো যে ঠিক সময় পৌঁছোতে পেরেছি। আর কিছু লুকোনোর জন্য কবরখানা তো সবচেয়ে ভালো জায়গা। বুড়ো জানত, আপনারা আর যেখানেই খুঁজুন সমাধিগুলো খুঁড়ে দেখবেন না। আমার মন বলছে, এই কবরখানা ওলটপালট করে খুঁজলে আমরা গুপ্তধন পাবই পাব।’
প্রশংসার চোখে আলকামির দিকে তাকালেন হালাকু, ‘তোমার তো বেশ বুদ্ধি আছে আলকামি।’
গদগদ হয়ে আলকামি বলল, ‘খাঁ, খলিফা তো একটা জঘন্য লোক ছিল। ইন্দ্রিয়সুখ ছাড়া কিচ্ছু বুঝত না। এত বড়ো খিলাফত তো বকলমে আমিই চালাতাম। আপনি হুকুম দিলে সমাধিগুলো খোঁড়াই?’
‘নীচ, পাষণ্ড, মৃত মাংসভোজী শকুন! এখানে মহান খলিফাদের সমাধি মুসলমান হয়ে তুই তাঁদের সমাধি খুঁড়তে বলছিস বিদেশিদের! তোর নরকেও ঠাঁই হবে না। প্রাচীন অভিশাপে পোকামাকড়ের মতো মরবি,’ গর্জে উঠলেন গিয়াসুদ্দিন। চিৎকার করতে গিয়ে তাঁর গলা ধরে এল।
হো-হো করে হেসে উঠল আলকামি, ‘দেখলেন খাঁ? কবর খোঁড়ার কথা উঠতেই বুড়ো কেমন ছটফটিয়ে উঠল! এ বার আর সন্দেহ নয়, আমি নিশ্চিত এই গোরস্থানেই কোনও একটা সমাধির নীচে গুপ্তধন লুকিয়েছে এরা।
প্রচুর গাছ জায়গাটায়। বেশির ভাগই প্রাচীন সব মহাবৃক্ষ। তাদের গায়ে সহস্র বছরের শ্যাওলা। আলো ঢোকে না তেমন। দিনের বেলাতেও কেমন একটা ঘুম-ঘুম ভাব। কোথাও কোনও শব্দ নেই। মাঝে মাঝে শুধু একটা নাম না-জানা পাখি ডাকছে। নদীর দিক থেকে একটা জোলো হাওয়া বয়ে আসছে ক্রমাগত। অনেক ডালপালা পেরিয়ে আসতে হচ্ছে বলে হাওয়ার গায়েও পাতার গন্ধ। সে হাওয়া যেন ফিসফিস করে বলছে, ‘ইতিহাস এখানে ঘুমোচ্ছে। তাকে জাগিয়ো না। জাগিয়ো না তাকে।
হালাকু খাঁ-র কেমন যেন একটা অস্বস্তি হল। কাঁধের ক্ষতটা টাটিয়ে উঠল আচমকাই। মনে হল, এই প্রাচীন সমাধিতে যারা শুয়ে আছে তাদের জাগানো ঠিক না। তারা জেগে উঠলে অনর্থ হতে পারে তবু গিয়াসুদ্দিন কী লুকিয়েছেন সেটা জানার কৌতূহল সামলাতে পারলেন না। বললেন, ‘কবরগুলো খোঁড়ো।’
* * *
প্রাচীন এক সমাধির নীচ থেকে উদ্ধার হয়েছে একটা লম্বাটে কাঠের বাক্স। তার মধ্যে রয়েছে একটা অপূর্ব সুন্দর গালিচা। কোনও এক অজানা ধাতুতে তৈরি একটা জালিদার জামা। জামাটা এতই সূক্ষ্ম যে একটা কৌটোর মধ্যে রাখা ছিল। একটা স্ফটিকের গোলক। একটা তলোয়ার। অন্য একটা কৌটোয় কিছু শুকনো শেকড়বাকড়। একটা আবলুস কাঠের খেলনা ঘোড়া আর কিছু মাটির ফলক। প্রত্যেকটা জিনিসই কেমন যেন অদ্ভুত। যেন প্রত্যেকটা জিনিসের মধ্যেই একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু আরও একটা জিনিস আছে যেটা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক। কাপড়ে মোড়া ছিল জিনিসটা। তামার তৈরি একটা সুদৃশ্য দণ্ড। দণ্ডের মাথায় বসানো একটা অত্যুজ্জ্বল নীলকান্ত মণি। এমন অদ্ভুত উজ্জ্বল রত্ন আগে কখনও দেখেননি হালাকু খাঁ। নীলকান্ত মণিটা যেন জ্যান্ত। তার মধ্যে যেন একটা স্পন্দন রয়েছে। মণিটা স্পর্শ করা যাচ্ছে না। মণির কাছাকাছি হাত নিয়ে গেলেই অদৃশ্য সুচের মতো কী যেন হাতে বিঁধছে।
হালাকু অনেকবার গিয়াসুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করেছেন, এগুলো কী? বিশেষ করে দণ্ডটার বিশেষত্ব কী? গিয়াসুদ্দিন স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, মনসুর বাচ্চা ছেলে তাই তাকে দিয়ে তাঁদের হদিশ বলিয়ে নেওয়া গেছে কিন্তু কোনও ভাবেই তাঁর মুখ খোলানো যাবে না। তিনি বলবেন না এগুলো কী এবং কোন কাজে লাগে।
আলকামি বলেছিল, ‘একটা একটা করে নখ উপড়ে নিলে ও বাধ্য হবে মুখ খুলতে। নয়তো ওর চোখের সামনে বাকিদের জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিন খাঁ। ও বলবে না ওর ঘাড় বলবে।’
তাকে নিরস্ত করেছিলেন হালাকু। বলে উঠেছিলেন, ‘তুমি রাজ্য শাসন করেছ আলকামি। কোনও দিন যুদ্ধ করোনি। গিয়াসুদ্দিন এক জন প্রকৃত যোদ্ধা। প্রকৃত দেশপ্রেমিক। ও ঠিকই বলছে, কোনও অবস্থাতেই ও আমাদের কিছু বলবে না। ঠিক আছে, দুনিয়ায় ওই একমাত্র পণ্ডিত এমন তো নয়। আমি অন্য কারও কাছ থেকে জেনে নেব। তবে হ্যাঁ, গিয়াসুদ্দিনের এই জেদ আমার ভালো লেগেছে। আমি ওকে তলোয়ার দিয়ে খুঁচিয়ে মারব না। ওকে এমন মৃত্যু উপহার দেব যে মৃত্যুর আগের মুহূর্ত অবধি ও যেন মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে।’
এখন সেই ব্যবস্থাই চলছে। মাটিতে পাশাপাশি তিনটে গভীর গর্ত করে হাত-পা বেঁধে গিয়াসুদ্দিন, আবদুল আর মনসুরকে গলা অবধি পুঁতে দেওয়া হয়েছে। বাকি দেহটা মাটির নীচে। মাথাটা ওপরে।
গিয়াসুদ্দিনের সামনে এসে দুই পা ফাঁক করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন হালাকু খাঁ। বললেন, ‘তোমার জেদ তোমার দুই সহচরের মৃত্যুর কারণ হবে। আমি এখানে পাহারা বসিয়ে যাব যাতে কেউ তোমাদের উদ্ধার করতে না পারে। একটা দিন যেতে-না-যেতেই তোমরা খিদে, তেষ্টায় অবসন্ন হয়ে পড়বে। মুখ দিয়ে শব্দ করার শক্তি থাকবে না। তখনই এসে হাজির হবে কীটপতঙ্গরা। নাক দিয়ে, কান দিয়ে ওরা ভেতরে ঢুকে খেতে শুরু করবে তোমাদের চোখ, ঠোঁট, মগজ। তার একটু পরে আসবে বন্য শেয়ালের দল আর সব শেষে আকাশ থেকে নেমে আসবে শকুনেরা। তারা ঠুকরে ঠুকরে খাবে তোমাদের ঘিলু।’
গিয়াসুদ্দিন কোনও উত্তর দিলেন না। হালাকু খাঁ পেছন ফিরলেন। সুলচুককে বললেন, ‘এখানে রক্ষী বসাও। ওই মহিলা আর ওর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে চলো।’
আগের বার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। আলকামি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এগিয়ে এসে বলল, ‘খাঁ, ওই বাচ্চা মেয়েটাকে আমি…’
‘আহ আলকামি,’ তাকে থামিয়ে দিয়ে হালাকু বললেন, ‘তোমার নজর বড্ড ছোটো। তুমি এত বড়ো বিশ্বাসঘাতক, তোমাকে এত ছোটো উপহার দিলে চলে?’
আনন্দে গলে গেল আলকামি। হাত কচলে বলল, ‘বলুন খাঁ, আমাকে কী উপহার দিতে চান? আপনি যা দেবেন আমি মাথা পেতে নেব।’
গমগমে গলায় হালাকু খাঁ বললেন, ‘মৃত্যুদণ্ড। তোমার মতো বিশ্বাসঘাতকের যোগ্য উপহার একমাত্র মৃত্যুদণ্ড।’
আলকামি কিছু বলার আগেই চার জন মোঙ্গোল এসে তাকে চেপে ধরল। বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছিল আলকামি। বোকা তেমুর এসে তার হাঁ মুখে একটা কাপড়ের টুকরো গুঁজে দিল। গলা কাটার সময় হালাকু চ্যাঁচামেচি পছন্দ করেন না। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে বাঁশ পাতার মতো কাঁপতে লাগল আলকামি। প্রস্রাব করে ফেলল পরনের কাপড়ে। এতক্ষণে সে বুঝতে পারল, ‘হালাকু খাঁ-কে বাগদাদে ঢুকিয়ে সে কত বড়ো ভুল করে ফেলেছে।’
হালাকু হাত বাড়ালেন। বাইজু নয়ান তার হাতে একটা ভারী তলোয়ার ধরিয়ে দিল। হালাকু বললেন, ‘যে এক বার বিশ্বাসঘাতকতা করে সে, বার বার করে। আজ যদি তোমাকে আমি আমার দলে জায়গা দিই কাল তুমি আমার পিঠে ছুরি মারবেই। বিশ্বাসঘাতকতা একটা রোগ আর এই রোগ ভয়ানক ছোঁয়াচে। বিশ্বাসঘাতকের কোনও ক্ষমা নেই।’
হালাকুর ইশারায় চার-পাঁচ জন মিলে আলকামিকে মাটিতে শুইয়ে চেপে ধরল। তার আর ছটফট করারও অবকাশ রইল না। এক জন চুলের মুঠি ধরে টেনে গলাটাকে আলগা করে দিল। এক কোপে হালাকু তার ধড় থেকে মুন্ডুটা আলাদা করে দিলেন। গলা কাটা দেহটা ধড়ফড় করতে লাগল আচমকা খসে যাওয়া টিকটিকির ল্যাজের মতো। কাটা মুণ্ডুটায় এক লাথি মারলেন হালাকু। মাথাটা গড়াতে গড়াতে এসে গিয়াসুদ্দিনের সামনেই স্থির হল। গিয়াসুদ্দিনের মনে হল, আলকামির খোলা চোখে ভিড় করে এসেছে রাজ্যের অপরাধবোধ।
মনসুরের হাহাকারে কর্ণপাত না করে তার মা আর বোনকে নিয়ে মোঙ্গোল বাহিনী চলে গেল। মাটির ওপরে চারটে মাথা জেগে রইল আল রুসাফার গোরস্থানে। নিদারুণ বর্তমান আর ভয়াবহ এক আসন্ন ভবিষ্যতের কথা ভেবে চোখ বুজে এল গিয়াসুদ্দিন, আবদুল আর মনসুরের। শুধু তাকিয়ে রইল ইবন আলকামি। চাইলেও সে আর কোনও দিন চোখ বুজতে পারবে না।
***
জ্ঞান ফিরতেই মাথার ভেতরে তীব্র একটা যন্ত্রণা অনুভব করলেন গিয়াসুদ্দিন। চোখের পাতা দুটো পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। অতি কষ্টে সে দুটোকে টেনে খুললেন তিনি। চারদিকে ঝমঝমে অন্ধকার। ঝিঁঝি ডাকছে প্রচণ্ড জোরে। কোনও কোনও গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। চাঁদের আলো ভালোবাসেন তিনি। কিন্তু এমন ফ্যাকাসে চাঁদের আলো আগে কখনো দেখেননি গিয়াসুদ্দিন। অবশ্য মৃত্যু শিয়রে এসে দাঁড়ালে সব কিছুকেই বুঝি এমন ফ্যাকাসে, নিষ্প্রাণ লাগে। হালাকু খাঁ ঠিক বলেছিল, একটা দিন কাটতে-না-কাটতে খিদে-তেষ্টায় প্রাণটা কণ্ঠার কাছে এসে যাবে। ঘাড় নাড়ানোর বা মুখ দিয়ে শব্দ করার শক্তিটুকু অবশিষ্ট থাকবে না। তখনই আসবে কীটপতঙ্গের দল।
ওরা আসছে। দলে দলে আসছে। আলকামির মাথাটায় আর আলাদা করে চোখ-মুখ বোঝার উপায় নেই। লাল পিঁপড়ের দল এমন ভাবে ওটাকে ছেঁকে ধরেছে যে দূর থেকে দেখলে ওটাকে একটা লাল রঙের বল মনে হবে। আলকামিকে ছেড়ে এবার ওদের নজর পড়েছে বাকি তিন জনের দিকে। সার বেঁধে ওরা এগিয়ে আসছে। কষ্ট করে দু’বার ডাকলেন মনসুর আর আবদুলকে। কেউ সাড়া দিল না। দু’জনেই অচেতন হয়ে আছে। পিঁপড়েগুলো একেবারে কাছে চলে এসেছে। থুতনি দিয়ে সামনের দিকে থাকা পিঁপড়েগুলোকে পিষে দেওয়ার চেষ্টা করলেন গিয়াসুদ্দিন। দু’একটা পিঁপড়ে মরল কিন্তু লাভ হল না। গতিপথ বদলে ওরা একটু পাশে চলে গেল। ঘাড়ের দিক থেকে উঠতে শুরু করল। অন্ধকার না থাকলে গিয়াসুদ্দিন দেখতে পেতেন কয়েকটা অদ্ভুতদর্শন পোকাও চলে এসেছে।
কানের লতিতে একটা পিঁপড়ে কামড়ে দিল। ওরা কানের মধ্যে দিয়ে ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছে। এতক্ষণ ধরে চলতে থাকা একটা যন্ত্রণার স্রোতের মধ্যে যেন আর একটা যন্ত্রণার ধারা এসে মিশতে শুরু করল। বড়ো অসহায় লাগল গিয়াসুদ্দিনের। শেষকালে এই ভাবে মরতে হচ্ছে! শরীরে যে সামান্য শক্তিটুকু অবশিষ্ট ছিল এক জায়গায় করে চিৎকার করে উঠলেন তিনি। সেই চিৎকারের প্রত্যুত্তর দিতে কি না কে জানে ডেকে উঠল এক পাল শেয়াল। জান্তব সেই কোলাহলে চেতনা ফিরে এল আবদুল আর মনসুরের। তিন জন একসঙ্গেই দেখলেন, গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে জোড়া জোড়া উজ্জ্বল সবজেটে বিন্দু।
গোরস্থানের প্রবেশপথে তাঁবুতে বসে মদ্যপান করছিল তিন জন মোঙ্গোল সেনা। কেউ যাতে গিয়াসুদ্দিনদের সাহায্য করতে না পারে তার জন্য এই ব্যবস্থা। গিয়াসুদ্দিনের চিৎকার আর শেয়ালের ডাক তাদের কানেও এসে পৌঁছোল। খুব হাসতে লাগল তারা, নিশ্চয়ই শেয়ালের দল কামড়ে ধরেছে। এমন সময় বিশাল এক ছায়ামূর্তি ঢুকে এল তাঁবুর মধ্যে আর কেউ কিছু বোঝার আগেই হাতের ভারী কুঠার দিয়ে তিন মোঙ্গোলকে কুপিয়ে দিল।
গিয়াসুদ্দিনদের গর্ত থেকে তুলে তিন মোঙ্গোলকে সেখানে পুঁততে প্রায় ভোর হয়ে এল। অচেতন গিয়াসুদ্দিনদের কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে নৌকার পাটাতনে শুইয়ে দিল সেই বিশালদেহী। তার পরে নৌকা ভাসিয়ে দিল পারস্যের উদ্দেশে।
সবে একটা শেয়াল মনসুরের মাথায় কামড় বসাতে যাবে তখনই দেবদূতের মতো এসে উপস্থিত হয়েছিল ওই বিশাল ছায়ামূর্তি। পালিয়েছিল শেয়ালের দল। ছায়ামূর্তি বলেছিল, ‘ভয় নেই। আমি তোমাদের বন্ধু।
কথাটা শুনে নিশ্চিন্তে জ্ঞান হারিয়েছিলেন তিন জন।
চোখ খুলে গিয়াসুদ্দিন দেখলেন, নৌকা মাঝনদীতে। আবদুল আর মনসুর তাঁর পাশেই ঘুমোচ্ছে। নৌকা বাইছে এক বিশালদেহী মোঙ্গোল। ঝলমলে রোদ্দুর আর সুবাতাসে কেটে যাচ্ছে দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। অবাক হয়ে তিনি বিশালদেহীকে বললেন, ‘কে তুমি? কেন নতুন জীবন দিলে আমাদের?’
বিশালদেহী বলল, ‘অনেক দিন থেকেই ভাবছিলাম হালাকু খাঁ-র দলে আর থাকব না। কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারছিলাম না। তার পরে দু’দিন আগে একটা বাচ্চা মেয়ে আর তার মাকে বন্দি করেছিল হালাকু খাঁ। পরে জানতে পারি, ওরা ওই ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চা ছেলেটার মা আর বোন। আমার এক বন্ধু তাদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে বলে সেই বন্ধুকে খুন করেছে হালাকুর অনুচরেরা। তাই ওদের তিন জনকে আমি মেরে দিলাম আর এত দিন ধরে যা পাপ করেছি তোমাদের বাঁচিয়ে সেই পাপ ধোয়ার চেষ্টা করলাম।’ ঘুমন্ত মনসুরের দিকে তাকিয়ে চোখে জল এল গিয়াসুদ্দিনের। বললেন, ‘ওর মা আর বোন পালাতে পেরেছে?’
বিশালদেহী বলল, ‘পেরেছে।’
গিয়াসুদ্দিন বললেন, ‘তোমার বন্ধুর নাম বলো। ওর জন্য আমি আল্লার কাছে দোয়া করব।’
‘ও তো শুধু আমার বন্ধু ছিল না। আমার ভাই ছিল। ওর নাম জুলুক নয়ান।’
‘আর তুমি?’
‘আমার নাম তোগো বেগ।’
