লাপিস লাজুলি – ১৪
॥ চোদ্দো ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
চোখের ওপরে হাত রেখে কাবিল বুড়ো দেখল, ধাওয়া করে যাওয়া বাইক আর গাড়িগুলো ফিরে আসছে। তার মুখে একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল আবার প্রমাণ হয়ে গেল, মরুভূমির রহস্য তার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। সে জানত, এরা ওই সামনের বাইকওয়ালাকে ধরতে পারবে না। বাইকওয়ালা মৃত্যুপুরীতে ঢুকে গেছে। এ বার সে ফিরে আসতে পারবে কি না কাবিল বুড়ো জানে না। অবশ্য এক জন ছাড়া আজ অবধি ওখান থেকে কেউ ফিরে আসতে পারেনি। যে ফিরে এসেছিল সে এলেবেলে কেউ ছিল না। তার নাম ছিল গিলগামেশ। রাজা গিলগামেশ।
জামায় টান পড়তে ভাবনার জালটা ছিঁড়ে গেল কাবিল বুড়োর। নাতি মাহরুফ বলল, ‘বাপিরা, ওরা ওকে ধরতে পারল না তাই না?’
কাবিল বুড়ো বলল, ‘ধরবে কী করে? বাইকওয়ালা তো উত নাপিশতিমের দেশে চলে গেছে।’
‘উত নাপিশতিম? সে কে বাপিরা? এর কথা তো তুমি আমাকে বলোনি। বলো, এক্ষুনি বলো।’
মাহরুফ গল্প শোনার পোকা। কাবিল বুড়ো বুঝল, আজ আর তার ছাড়ান নেই। গল্প না শোনালেই মাহরুফ কাঁদবে। নাতিটার মুখের দিকে তাকিয়ে দুনিয়ার সব দুঃখ ভুলে যেতে পারে কাবিল বুড়ো। সে বলল, ‘আয় আমার কোলের কাছে বোস। বলছি।’
খেজুর গাছের ছায়ায় দাদুর কোল ঘেঁষে বসে পড়ে মাফরুফ। কাবিল বুড়ো গল্প বলতে শুরু করে, ‘সে অনেক কাল আগের কথা। মানুষের সভ্যতা তখন কয়েকশো বছর পার করে দিয়েছে। মানে সভ্যতা বেশ সাবালক হয়েছে। এমন সময় দেখা গেল, চার দিকে লোকসংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। খাদ্য, বস্ত্র, পানীয় সব কিছুর টানাটানি শুরু হয়েছে আর তার সঙ্গে শুরু হয়েছে নানা রকমের পাপ কাজ। মানুষ খুব বদমায়েশ হয়ে গেছে। তারা দেবতাদের কথা শুনছে না। নানা অনৈতিক কাজ করে বেড়াচ্ছে। এ সব দেখে দেবতারা খুব রেগে গেলেন। একদিন দেবতাদের রাজা আনু, পৃথিবীর দেবতা এনলিল আর জলের দেবতা এনকির সঙ্গে দেখা করলেন। তাঁরা ঠিক করলেন, মানুষদের এবার শিক্ষা দেওয়া দরকার। সভ্যতা ধ্বংস করে আবার নতুন করে সব শুরু করতে হবে। আর শুধু মানুষই নয়, এত দিন ধরে তাঁরা পৃথিবীতে যা যা তৈরি করেছেন অর্থাৎ পশুপাখি, গাছপালা সবই ধ্বংস করে দেবেন। তা কী ভাবে ধ্বংস করা হবে? ঠিক হল, মহাপ্রলয় ঘটানো হবে। খুব গোপনে প্রস্তুতি চলতে লাগল। দেবতারা খুব সাবধান হয়ে রইলেন যাতে এ কথা মানুষের কান পর্যন্ত না পৌঁছোয়। কিন্তু ওই যে সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকে। কথাটা মানুষের কান অবধি পৌঁছে গেল আর কে পৌঁছে দিল জানিস?’
‘কে?’
‘জলের দেবতা এনকি।’
‘দেবতাই বলে দিল?’
‘হ্যাঁ। কারণ মহাপ্রলয়ের প্রস্তুতি নিতে নিতে তাঁর মনে হল, কাজটা ঠিক হচ্ছে না। এত কষ্ট করে এই জগৎসংসার তৈরি করলেন সেটা এক মুহূর্তে নষ্ট করে দেবেন? সৃষ্টির প্রতি যে সৃষ্টিকর্তার খুব মায়া বাপ। তাই তিনি গেলেন তখনকার রাজা উত নাপিশতিমের কাছে। গিয়ে বললেন, প্রলয় আসছে। তৈরি হও। নতুন করে মানুষের সভ্যতা স্থাপন করতে হবে। এই শুনে উত নাপিশতিম এক বিশাল নৌকা বানালেন। তাতে তুলে দিলেন নানা পশুপাখি, গাছগাছালির চারা, নানা শিল্পকর্ম, তার পরে নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে উঠে বসলেন তাতে আর নৌকা ভাসিয়ে দিলেন।’
‘আর মহাপ্রলয়?’
‘এল তো। ঠিক সময়ে এল। ছয় দিন, ছয় রাত সেই তুফান চলল কিন্তু উত নাপিশতিমের নৌকা ডুবল না। অবশেষে একসময় প্রলয় থামল। নৌকার জানলা খুলে উত নাপিশতিম দেখলেন, সব ভেসে গেছে। যত দূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। এবার নৌকা ভেড়াতে হলে তো ডাঙা চাই। উত নাপিশতিম সঙ্গে নিয়ে আসা একটা চড়াই পাখিকে উড়িয়ে দিলেন। পাখিটা কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল। উত নাপিশতিম বুঝলেন, কাছাকাছি ডাঙা নেই। আরও কিছুটা পথ নৌকা চলল। তখন উত নাপিশতিম একটা কাককে উড়িয়ে দিলেন। কাকটা কিন্তু আর ফিরে এল না। উত নাপিশতিম বুঝলেন, কাকটা ডাঙার সন্ধান পেয়েছে। সেই দিকে নৌকা চালিয়ে দিলেন। অবশেষে পাওয়া গেল মাটির সন্ধান। সেখানেই নতুন বসতি গড়ে তুললেন উত নাপিশতিম। তার পরে দেবতাদের উদ্দেশ্যে পুজো দিলেন। পুজো দিলে তো দেবতাদের আসতেই হয়। আনু, এনলিল আর এনকি এসে উপস্থিত হলেন আর এসে এই কাণ্ড দেখে তাঁরা তো থ! এমন তো কথা ছিল না। খুব রেগে গেলেন উত নাপিশতিমের ওপরে। এনলিল তো আর একটু হলেই অভিশাপ দিয়ে ফেলছিলেন। এনকি তাঁকে নিরস্ত করে বললেন, উত নাপিশতিম তাঁর কথাতেই এ-কাজ করেছেন। সবটা শুনে, বুঝে শান্ত হলেন এনলিল আর এই অদম্য সাহসিকতার জন্য উত নাপিশতিম আর তাঁর স্ত্রীকে অমরত্বের বর দিলেন। একটা বয়স অবধি রাজত্ব করে উত নাপিশতিম তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ঘর বাঁধলেন মৃত্যুনদীর ধারে, মৃত্যুপুরীর দেশে। তিনি ওখানে বসে থাকেন গল্প বলার জন্য। মহাপ্রলয়ের সময় নৌকায় কী ভাবে দিন কাটিয়েছিলেন তার গল্প। সেই গল্প যদি কেউ না ঘুমিয়ে শেষ অবধি শুনতে পারে তা হলে সে অমর হয়ে যায়। আর যদি মাঝপথে ঘুমিয়ে পড়ে সে থেকে যায় মৃত্যুপুরীতেই।’
‘কেউ অমর হয়েছে বাপিরা?’
হাসল কাবিল বুড়ো। মাহরুফের গাল টিপে দিয়ে বলল, ‘তা কখনো হয়? মানুষের অমর হওয়ার নিয়ম নেই। তাই তো উত নাপিশতিমের গল্প কেউ শেষ অবধি শুনতে পারে না। মাঝপথে ঘুমিয়ে পড়ে। শুধু এক জন প্ৰায় শেষ অবধি শুনে ফেলেছিল।’
‘কে বাপিরা?’
‘রাজা গিলগামেশ। দাঁড়া তোকে পুরোটাই বলি। নয়তো তুই জ্বালাবি।’
খেজুরের শাঁসটা খাওয়া হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। গল্প শোনার নেশায় বীজটা ফেলা হয়নি। সেটাকেই চুষতে চুষতে এবার দাদুর কোলে শুয়ে পড়ল মাহরুফ। কাবিল বুড়ো বলতে শুরু করল, ‘তোকে তো আগেই দেবী ইনান্নার কথা বলেছি। তা উরুক নগরে দেবী ইনান্নার মন্দির তৈরি হওয়ার পরে দেবী ওখানে একটা হুলুপ্পু গাছের চারা লাগালেন। দেবীর খুব ইচ্ছে গাছটা বড়ো হলে ওই গাছের কাঠ দিয়ে সিংহাসন বানাবেন। তা মাঝে অনেক কাণ্ড হল। দেবী নরকে চলে গেছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসে স্বামী দুমুজিকে নরকে পাঠালেন।’
‘এই গল্পটা আমি জানি। এক গল্প আর কত বার শুনব?’
‘এক গল্প নয় রে বাবা। এ তার পরের গল্প। শোন না।’
‘আচ্ছা বলো।’
‘সব ঝামেলা মিটিয়ে দেবী নিজের মন্দিরে এসে দেখলেন, হুলুপ্পু গাছটা এখন অনেক বড়ো হয়েছে। গাছের কাঠ দিয়ে এবার সিংহাসন বানানোই যায়।’
‘আচ্ছা দাদু, হুলুপ্পু গাছটা কেমন দেখতে?’
‘সে এক বিশাল গাছ। বিশাল তার কাণ্ড। অনেক দূর অবধি ছড়ানো তার শেকড়। আর মানুষের উলোঝুলো চুলের মতো তার ঝিরিঝিরি পাতা। তা সেই গাছেই বাসা বেঁধেছে আনজু পাখি আর এক মহাসর্প।’
‘আনজু পাখি কী পাখি দাদু?’
‘পৌরাণিক পাখি। সিংহের মতো মাথাওয়ালা এক ঈগল। আনজু পাখি চাইলেই আকাশ থেকে ঝড়, বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ ডেকে আনতে পারে। খুব পবিত্র পাখি। যাক গে, তার পর শোন না কী হল। দেবী আনজু পাখিকে অনুরোধ করলেন অন্য জায়গায় গিয়ে বাসা বাঁধতে। আনজু পাখি উড়ে গেল কিন্তু মহাসর্প তো কারও কথা শোনার বান্দা নয়। সে বিশাল হাঁ করে দেবীর দিকে তেড়ে এল। দেবী দেখলেন বিপদ। এই সাপকে না তাড়ালে তো গাছ কাটা যাবে না। কিন্তু এই ভয়ানক সাপ তাড়াবে কে? আছে, একজন আছে। রাজা গিলগামেশ। চারদিকে তাঁর জয়জয়কার। মহা শক্তিধর। ইনান্না গিলগামেশকে সাপ তাড়ানোর দায়িত্ব দিলেন। গিলগামেশ এসে নিমেষের মধ্যে সাপের ল্যাজ ধরে দিলেন এক আছাড়। সাপ তখন পালাবার পথ পায় না।’
‘বাপ রে! এত শক্তি গিলগামেশের?’
‘হুম। নয়তো কী আর তাঁকে নিয়ে কাব্য লেখা হত রে?’
‘তার পরে কী হল বাপিরা?’
‘আর বলিস না। গিলগামেশের বীরত্ব দেখে দেবীর তাঁকে ভালো লেগে গেল। তিনি গিলগামেশকে বিয়ে করতে চাইলেন। কিন্তু গিলগামেশ রাজি হলেন না। বললেন, তুমি তোমার আগের স্বামী দুমুজির সঙ্গে কী করেছ সবাই জানে। তোমায় বিয়ে করব না। ব্যস, দেবী রেগে আগুন। দেবীকে মুখের ওপর প্রত্যাখ্যান করে সামান্য মানুষ! এত সাহস! রেগে গিয়ে স্বর্গ থেকে বিশাল এক ষাঁড় এনে তিনি লেলিয়ে দিলেন গিলগামেশের দিকে। কিন্তু গিলগামেশও কম যান না। তাঁর এক প্রাণের বন্ধু ছিল, এনকিদু। তিনি আর এনকিদু মিলে ষাঁড়টাকে মেরে ফেললেন আর শুধু মেরে ফেললেন তাই নয়, ষাঁড়ের একটা পা ছুড়ে মারলেন ইনান্নার মুখে।’
খিলখিল করে হেসে উঠল মাহরুফ। হাসতে হাসতেই বলল, ‘তার পরে?’
‘তার পরেই তো আসল গল্প রে। ইনান্না এনকিদুকে মেরে ফেললেন।’
বালকের একটু আগের সারল্যমাখা হাসি মুহূর্তে পরিণত হল ব্যথাতুর বিস্ময়ে। মাহরুফ বলল, ‘মেরে ফেলল?’
ঘাড় নাড়ল কাবিল বুড়ো, ‘হ্যাঁ রে। মেরে ফেলল আর মৃত্যুর পরে এনকিদু চলে গেলেন পাতালে। নরকে। আর তখনই গিলগামেশ এক কঠিন শপথ নিলেন। ঠিক করলেন, পাতাল থেকে বন্ধু এনকিদুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন। কিন্তু পাতাল থেকে বন্ধুকে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনতে গেলে আগে তাঁকে অমর হতে হবে। অতএব গিলগামেশ চললেন উত নাপিশতিমের সন্ধানে। মৃত্যুপুরীতে পৌঁছে বিছে মানুষের সঙ্গে লড়াই করে পৌঁছোলেন মৃত্যুনদীর ধারে।’
‘বিছে মানুষ কী দাদু?’
‘ও এক রকমের রাক্ষস। দেহটা মানুষের মতো কিন্তু হাতের বদলে বড়ো বড়ো দাঁড়া আর পেছনে ল্যাজের জায়গায় এত্ত বড়ো হুল। মৃত্যুপুরীতেই থাকে।’
‘বাবা গো,’ দাদুর গা ঘেঁষে বসল মাহরুফ, ‘ওরা কখনো বাইরে আসে না তো বাপিরা?’
আবার মরুভূমির প্রাচীন প্রবাদ মনে পড়ে যায় কাবিল বুড়োর। ‘জীবনকে ছুঁতে পারলে জীবনের পিছু পিছুই এ দুনিয়ায় এসে পড়ে মৃত্যুপুরীর বাসিন্দারা।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল, ‘না। আসে না। এই দুনিয়ার আলো হাওয়ায় ওরা বেশিক্ষণ বাঁচতে পারে না। কিন্তু এক বার যদি এসে পড়ে সর্বনাশ! সব ছারখার করে দেয় ওরা।
‘ও বাপিরা, এই গল্পটা ভালো লাগছে না। গিলগামেশের গল্পটা বলো না।’
‘সেই ভালো। ওদের কথা যত কম বলা যায়। তার পরে মৃত্যুনদী পার হয়ে গিলগামেশ পৌঁছোলেন উত নাপিশতিমের বাড়ি। গল্প শোনা শুরু করলেন কিন্তু ততক্ষণে গিলগামেশ তো পথশ্রমে ক্লান্ত। শেষে এসে আর চোখের পাতা খুলে রাখতে পারলেন না। ঘুমিয়ে পড়লেন। ব্যস, অমর হওয়া হল না।’
‘হল না?’
‘নাহ। কিন্তু উনি যত দূর গেছিলেন আর তো কেউ যেতে পারেনি তাই অমরত্ব না দিলেও খুশি হয়ে উত নাপিশতিম তাঁকে অন্য বর দিলেন। তাঁর যৌবন বেড়ে গেল অনেক অনেক বছর। ফিরে এসে সুখে রাজত্ব করতে লাগলেন গিলগামেশ।’
এক চুলের জন্য লোকটা অমরত্ব পেল না বলে খুব আফশোস করতে লাগল মাহরুফ আর কাবিল বুড়ো ভাবতে লাগল, ‘ওই বাইকওয়ালার কী হল!
***
চাপা গলায় ফারুক ধমকে উঠল, ‘তোর যখন এত ভয় তখন তোর এখানে আসা উচিত হয়নি।’
মাথা নীচু করে বসে আছে তারিক। ফারুক বলে চলেছে, ‘তুই যদি তখন নাটক না করতিস তা হলে আজ এই কাণ্ডটা ঘটতই না। আমাদের চোখে সামনে দিয়ে একটা মেয়েমানুষ আমাদের কমান্ডারকে মেরে চলে গেল! আরও দু’জনকে মেয়েটা মেরেছে জানিস? আমি যদি না থাকতাম না, আজ তোকে ওরা মেরে ফেলত।’
কথাটা সত্যি। কমান্ডার হাসানের নিথর দেহের সঙ্গে তারিক, সইদুল আর জুনেইদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ওই ঘরেই দাঁড়িয়ে ছিল। বাকিদের সঙ্গে ফারুক ছুটে বেরিয়ে গেছিল বাইরে। বাইরে থেকে গুলির আওয়াজ আসছিল। ভেসে আসছিল অনেকের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর। তার পরেই অনেকগুলো ইঞ্জিন একসঙ্গে গর্জে উঠেছিল। ওরা বুঝতে পারছিল না বাইরে কী চলছে। তখনই কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে এসেছিল আরিব মাজিদ। এসেই এক লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল তারিককে। কোমরের খাপ থেকে বার করেছিল একটা ধারালো খাঁজকাটা ছোরা। জামার কলার ধরে তারিককে টেনে দাঁড় করিয়ে তাঁবুর খুঁটিতে ঠেসে ধরেছিল আর ছোরাটা বসিয়ে দিতে গেছিল বুকে। আতঙ্কে সাড় ছিল না তারিকের শরীরে। ছিল না বাধা দেওয়ার মতো শক্তি। তারিক ধরেই নিয়েছিল সে মরে গেছে কিন্তু ছোরাটা বসিয়ে দেওয়ার আগের মুহূর্তে আরিব মাজিদের হাত ধরে নিয়েছিল ফারুক। মাটিতে হাঁটু ভেঙে বসে হাতজোড় করে অনেক অনুনয়-বিনয় করেছিল। অবশেষে শান্ত হয়েছিল মাজিদ। তার নির্দেশে বাকিরা কমান্ডার হাসানের দেহটা নিয়ে চলে গেছিল। ধপ করে মাটিতে বসে পড়েছিল তারিক। এখনও সেই ভাবেই বসে আছে।
ফারুক আবার চিৎকার করে উঠল, ‘মেয়েটা কি আমাদের ধর্মের ছিল না কি যে তোর এত দরদ? যে আইসিসের বিপক্ষে সেই আমাদের শত্রু। তুই শালা নিজেই একটা মেয়েছেলে। সামান্য রেপ করতে গিয়ে কেঁদে ককিয়ে মরে যাচ্ছিস।’
এতক্ষণে চোখ তুলে তাকাল তারিক। বলল, ‘ফারুক ভাই, ইসলামে কোথায় বলা আছে বিধর্মীকে রেপ করতে হবে?’
‘আমাকে ইসলাম শেখাস না তারিক,’ গর্জে উঠল ফারুক, ‘তুই যুদ্ধ করতে এসেছিস আর এখানে সিনিয়রের অর্ডারই শেষ কথা। তুই জানিস কমান্ডার হাসান নিজের মা আর বোনকে রেপ করার অর্ডার দিয়েছিলেন!’
এক লহমায় নিজের মা আর বোনের কথা মনে পড়ে গেল তারিকের। মায়ের সঙ্গে তার মোটে বনে না। মাকে সে ঘেন্না করে। তাই বলে মা আর বোনকে…! পুরো কথাটা ভাবতেও বিবমিষা জাগল তার। মনে মনে সে বলল, ‘বেশ হয়েছে কমান্ডার হাসান মরেছে। নিজের পাপের সাজা পেয়েছে,
মুখে বলে উঠল, ‘আমাকে মেরে ফেলো তোমরা কিন্তু আমি কাউকে রেপ করতে পারব না।’
একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে রইল ফারুক। বলল, ‘বেশ। রেপ করতে না পারিস কাফেরদের মারতে তোর হাত কাঁপবে না তো?’
গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল তারিক, ‘না। কাঁপবে না। এমন কিছু বলো যেটা গুনাহ না, আমি এক কথায় করে দেব।’
‘বেশ। চল তোর পরীক্ষা হবে।’
টানতে টানতে তারিককে বাইরে নিয়ে এল ফারুক। পেছন পেছন এল সইদুল আর জুনেইদ। ফারুক বলল, ‘এখানেই দাঁড়া। আমি আসছি।’
***
জ্ঞান ফিরে আসতেই তীব্র বেদনা বোধকে অগ্রাহ্য করে পল্লবের মনে ভিড় করে এল দুশ্চিন্তা। ধড়মড় করে উঠতে গিয়ে খেয়াল করল, একটা তাঁবুর ভেতরে সে অভয়ের কোলে শুয়ে আছে। চেপে ধরে শুইয়ে দিল অভয়, ‘না না। শুয়ে থাকুন স্যার। উঠবেন না।’
পল্লব প্রথম কথাটাই বলল, ‘রোশনি?’
একগাল হেসে অভয় বলল, ‘শুয়ে-শুয়েই শুনুন। একটা ভালো খবর আছে। রোশনি ম্যাডাম পালিয়েছে।’
‘কী,’ লাফ দিয়ে উঠে বসল পল্লব, ‘কী বলছ তুমি অভয়?’
‘ঠিকই বলছি স্যার। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে পালিয়েছে। আর শুধু পালিয়েছে তাই নয়, গোটাতিনেক হারামিকে গুলি মেরে পালিয়েছে। শালারা শহিদ হয়ে জন্নতে যেতে যায় তো? একেবারে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছে।’
আনন্দে পল্লবের চোখে জল এসে গেল। চোখের জল মুছিয়ে দিল অভয়। বাকিরা জড়োসড়ো হয়ে হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে আছে তাঁবুর এক পাশে। তাদের আড়াল করে অভয় বলল, ‘আপনিও ম্যাডামকে ভালোবাসেন তাই না?’
পল্লব বলল, ‘জানি না।’
‘জানি না বললে হবে? যে ভাবে ম্যাডামকে বাঁচাতে ছুটে যাচ্ছিলেন, ভালো না বাসলে ওই রিস্ক নেওয়া যায় না। আপনাকে দেখতে নাদুস টাইপ হলে কী হবে আপনিও বাঘের বাচ্চা আছেন।’
উত্তর দিল না পল্লব। সে জানে, অভয় যতই তাকে বাঘের বাচ্চা বলুক সে আসলে ভীতু মানুষ। তার জন্মছকে লেখা আছে, ‘জাতকের ভীতিভাব থাকবে।’
বরাবর ঝামেলায় ভয় পেয়েছে সে। কলেজে পড়ার সময় তৎকালীন শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের এক নেতা তার ওপর চড়াও হয়েছিল। তার অপরাধ সে শাসক দলের সমর্থক ছিল না। সেই প্রথম বার মার খেয়েছিল পল্লব। সেই দিনের স্মৃতিটা আজও দগদগে হয়ে আছে। থরথর করে পা কাঁপছিল। তলপেটের মধ্যে কী যেন একটা পাক দিচ্ছিল ক্রমাগত। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিল গলাটা। তার পর থেকে যত বারই ভয় পেয়েছে ঠিক এই ব্যাপারগুলোই হয়েছে। পল্লব এতেই অভ্যস্ত তবু কখনো কখনো বুকের মধ্যে অসীম সাহস জন্ম নেয় আচমকাই। সে বার যখন দেবী পর্ণশবরীর সামনে নাটক করেছিল এই সাহসটা অনুভব করেছিল। আজও যখন রোশনিকে বাঁচাতে ছুটে গেল তখনও একই অনুভূতি। আসল কথাটা হল, সব সময় যে মানুষ ভালোবাসা থেকেই কাউকে বাঁচাতে ছোটে তা নয়, যূথবদ্ধতা মানুষের জিনে আছে আর দল বেঁধে থাকার প্রথম শর্তই হল একে অপরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া।
কথাটা বলতেই অভয় হেসে ফেলল। ভুরু কুঁচকে পল্লব বলল, ‘হাসলে কেন?’
গলা নামিয়ে অভয় বলল, ‘দেখলাম! কী সুন্দর করে নিজেকে কনভিন্স করলেন। আপনারা শিক্ষিত লোকেরা ভালোবাসাকে স্বীকার করতে এত ভয় পান কেন বলুন তো?’
উত্তর দিল না পল্লব। এই অবস্থায় অভয়ের মনে এত দার্শনিক কথা কোথা থেকে আসছে কে জানে! সত্যি বলতে তার ভয় করছে। খুব ভয় করছে। মনঃসংযোগ করতে হবে। স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। একমাত্র ওই মানুষটাই এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবেন। মাথার পেছনে হাত রেখে শুয়ে পড়ল পল্লব। সবে ভাদুড়িমশায়ের কথা চিন্তা করতে যাবে এমন সময় এক দল জঙ্গি ঘরে ঢুকে এল। তাদের মধ্যে এক জন বন্দুক উঁচিয়ে বলল, ‘সবাই বাইরে এসো। এক্ষুনি।’
আবার সেই পেট গোলানো অনুভূতিটা ফিরে এল। বাইরে ডাকছে কেন এরা? এরা কি ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করাবে? রোশনি ওদের লোককে মেরেছে বলে কি ওরা বদলা নেবে? মারণযজ্ঞের ভিডিয়ো ছড়িয়ে দেবে ইন্টারনেটে? আইসিসের এই হত্যালীলা তো আগে দেখেছে পল্লব। এ বার কি তবে সেটারই শিকার হতে হবে?
বন্দুকের ডগায় ওদের তাঁবু থেকে বার করে মাঝের ফাঁকা চত্বরটায় নিয়ে এল জঙ্গিরা। পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিল। সেখানে আরও অনেক লোক। সবার চোখে-মুখে একটা কৌতুক। পল্লব বুঝতে পারল, এ বার এখানে একটা সার্কাস হবে আর তারা সেই সার্কাসের ক্লাউন।
বন্দিরা সার দিয়ে দাঁড়াতে তারিকের হাতে একটা বন্দুক ধরিয়ে দিল ফারুক। বলল, ‘যা, যেমন বললাম কর। প্রমাণ দে তুই আইসিসে চান্স পাওয়ার যোগ্য।’
কী করতে হবে ফারুক আগেই বলে দিয়েছিল। আরিব মাজিদের অনুমতি নিয়ে সে এই ব্যবস্থা করেছে। ইন্ডিয়ার একটা জাহাজ লুঠ করা হয়েছে। সেই জাহাজে যারা ছিল তাদের এখানে বন্দি করে রাখা হয়েছে। সেই বন্দিদের লাইন দিয়ে দাঁড় করানো হবে। এক এক জনের কাছে গিয়ে প্যান্ট খুলে দেখতে হবে সে মুসলমান কি না। আর যদি মুসলমান না হয় তৎক্ষণাৎ গুলি করতে হবে।
বন্দুকটা হাতে নিয়েই তারিক বুঝল তার হাত কাঁপছে। যতটা বুক চিতিয়ে বলেছিল, কাফেরদের মারতে তার হাত কাঁপবে না, এখন আর সেই সাহসটা নেই। তবু মন শক্ত করে এগিয়ে গেল সে। আগের পরীক্ষায় ফেল করেছে। এটায় কিছুতেই ফেল করা যাবে না। সারি দিয়ে লোকগুলো দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখেই মৃত্যুভয়। প্রথম লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল তারিক। পেছন থেকে আরিব মাজিদ চিৎকার করে ইংরেজিতে বলল, ‘প্যান্ট খোলো।’
পল্লবের কান্না পেয়ে গেল। ক্রমানুযায়ী সারির দু’নম্বরে দাঁড়িয়ে আছে অভয়। তিন নম্বরে সে। এরা তো মেরেই ফেলবে। তা হলে এই অপমানটা করছে কেন? কিন্তু এর কোনও উত্তর নেই। যার হাতে ক্ষমতা থাকে সে দুর্বলকে এ ভাবেই পীড়ন করে। এটাই দুনিয়ার নিয়ম।
প্রথম জনের নাম রাহুল সিং। সে বিহারের ছেলে। হাতজোড় করে বলতে গেল, ‘প্লিজ ডোন্ট…
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আবার চিৎকার ভেসে এল, ‘প্যান্ট খোলো।’
ছোটো থেকে নানা ধরনের প্রবাদ-প্রবচন শুনতে শুনতে মানুষ বড়ো হয়। এমনিতে প্রবাদগুলো বইয়ের পাতায় থাকে বা কথোপকথনে উঠে আসে। তার বেশি কিছু না। কিন্তু কিছু কিছু সময় এই সব প্রবাদের মানেগুলো বড্ড স্পষ্ট করে বোঝা যায়। এই মুহূর্তে পল্লব ওই প্রবাদটাকে অনুভব করতে
পারছিল, ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।’
রাহুল সিং বুঝতে পারছে তাকে এক্ষুনি মেরে ফেলা হবে তবু সে প্যান্টের বোতামে হাত দিল। কোন আশা থেকে এতগুলো অপরিচিত, অসংবেদনশীল মানুষের সামনে কেউ নগ্ন হয়? বেঁচে থাকার জন্য কতটা তীব্র আকাক্ষা থাকে মানুষের মনে! মৃত্যুভয় হারিয়ে দেয় তীব্রতম অপমান বোধকেও। কাঁদতে কাঁদতে প্যান্ট খুলে ফেলল রাহুল সিং। তার যৌনাঙ্গ উন্মুক্ত হল দিনের আলোয়। জঙ্গিরা চিৎকার করে উঠল, ‘কাফের, কাফের।’
ফারুক বলল, ‘তারিক ফায়ার।’
তারিকের মাথার মধ্যে ভেসে উঠতে থাকল সেই ভিডিয়োগুলো, যেগুলো সে এত দিন ধরে দেখেছে। সারা দুনিয়া জুড়ে কী ভাবে মুসলমানদের ওপরে অত্যাচার করেছে কাফেররা। আজ জবাব দেওয়ার দিন। কিন্তু বন্দুকটা এত ভারী লাগছে কেন? এর আগে এক বারই সত্যিকারের বন্দুক চালিয়েছিল সে। মাথেরানে যে সেমিনারটায় গেছিল সেখানে এক দিন তাদের বন্দুক চালানো শেখানো হয়েছিল। তা ছাড়া তার কাছে বন্দুক মানে মেলায় বেলুন ফাটানো বন্দুক। তাই কি অসুবিধে হচ্ছে? নাহ, বন্দুক ভারী হালকার ব্যাপার নয়। ভারী হয়ে আছে মনটা। বুকের ভেতরটা ক্রমশ ভারী হয়ে যাচ্ছে। সাড় চলে যাচ্ছে হাত-পা থেকে। কাফেরদের ওপরে তো খুব রাগ তারিকের কিন্তু আজ এই কাফেরটাকে মারতে এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন? সে কি লোকটা নিজের দেশের বলে? না কি ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে বলে? আম্মি কোরান পড়ে শোনাত আর বলত, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম। দুনিয়ার সব ধর্মই শান্তির কথা বলে। বেঁধে বেঁধে থাকতে বলে। কিন্তু কিছু লোক নিজেদের স্বার্থের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। ধর্মের গায়ে লাগিয়ে দেয় হিংসার কালি।’
আজ এই সময় এই কথাগুলোই মনে পড়ছে কেন? তবে কি তার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি? সে যে নতুন খিলাফতের অংশ হতে চেয়েছিল সেটা মিথ্যে? সে কি সাচ্চা মুসলমান নয়? না কি আম্মির মনের মতো সাচ্চা মুসলমান হয়েছে বলেই এত দ্বিধা? এত দ্বন্দ্ব?
ভাবনার ঘোর কেটে গেল ফারুকের চিৎকারে, ‘তারিক ফায়ার।’
বড়ো ক্লান্ত লাগছে তারিকের। মনে হচ্ছে মাথাটা ছিঁড়ে যাবে। সে বুঝতে পারছে সামনের লোকটাকে না মারলে ফারুকই তাকে মেরে ফেলবে। ভয় পেল সে। আর ভয় পেতে পেতে কাঁপা হাতে বন্দুকের ট্রিগার টেনে দিল। কান ফাটানো শব্দের সঙ্গে রাহুল সিং ছিটকে পড়ল দু’হাত দূরে। তারিকও ধপ করে বসে পড়ল বালির ওপরে।
গুলিটা ঠিক মতো লাগেনি। ধড়ফড় করছে রাহুল আর আর্তনাদ করছে। দু’জন জঙ্গি হাসতে হাসতে একসঙ্গে গুলি চালাল তার ওপরে। নিথর হয়ে গেল রাহুলের দেহটা। আরিব মাজিদ বলল, ‘দিস ইজ ফান। নেক্সট।’
তারিকের হাত থেকে বন্দুকটা নিয়ে নিল ফারুক। পিঠ চাপড়ে কানে কানে বলল, ‘গুড তারিক। তোর হবে। যা তুই। পরেরটাকে আমি মারব।’
তারিক উঠতে পারল না। রাহুলের মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে ওই ভাবেই বসে রইল। সে বুঝতে পারল, ফারুক যতই বলুক তার হবে, তার হবে না। কিছুতেই হবে না। মন বলছে, সে ভুল জায়গায় চলে এসেছে কিন্তু এখান থেকে আর ফেরার পথ নেই। আম্মি আর বোনের জন্য খুব মন কেমন করে উঠল তার। মনে মনে সে বলল, ‘সরি আম্মি।’
বন্দুকটা নাচাতে নাচাতে সারির দুই নম্বর অর্থাৎ অভয়ের সামনে এসে দাঁড়াল ফারুক। হিন্দিতে বলল, ‘তুই তো ইন্ডিয়ান? আমিও ইন্ডিয়ান।’
অভয় উত্তর দিল না। সোজা চোখে তাকিয়ে রইল ফারুকের চোখের দিকে। ফারুক কাঁধ নাচিয়ে বলল, ‘প্যান্ট খোল।’
তার মারাঠি মেশানো হিন্দিতে অভয় ছিত্রে বলল, ‘খুলব না।’
যারা যারা হিন্দি বুঝল অবাক হয়ে অভয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিব মাজিদ চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়াট ইজ হি সেয়িং?’
ফারুক বলল, ‘প্যান্ট খুলবে না বলছে।’
চোখটা জ্বলে উঠল আরিবের। একটু আগে একটা মেয়ে তাদের কমান্ডার আর দু’জন সঙ্গীকে খুন করে পালিয়েছে। এখন এই লোকটা বলছে, প্যান্ট খুলবে না! কী হচ্ছে এ সব? খলিফা মুস্তাফা বলেছেন, ‘এই যুদ্ধে তাদের পক্ষে সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র ভয়। এই দুনিয়া যত দিন তাদের ভয় পাবে তত দিনই তারা জিতবে। যে দিন থেকে মানুষ আর এই অত্যাচারকে ভয় পাবে না সে দিন থেকে শুরু হবে হেরে যাওয়া।’
এই লোকটা ভয় পাচ্ছে না কেন? তবে কি তারা হেরে যাচ্ছে? তাদের পতন আসন্ন? এটা হতে পারে না। ফারুকের পাশে এসে দাঁড়াল সে। গম্ভীর গলায় বলল, ‘প্যান্ট খোলো।’
ফারুকের দিকে তাকিয়ে অভয় হিন্দিতে বলল, ‘আমার ইংলিশ অত ভালো না। আমি যা বলছি এই হুব্বা মালটাকে তুই বুঝিয়ে দে। শোন বাবু, ছোটোবেলায় আমার বাবা-মা আমার প্রাইভেট পার্ট দেখেছে আর বড়ো হওয়ার পরে দেখেছে আমার প্রেমিকারা। ওদের ছাড়া আমি কাউকে আমার প্রাইভেট পার্ট দেখাই না।’
দাঁতে দাঁত চেপে ফারুক বলল, ‘তুই ভাবতে পারছিস না তোর সঙ্গে কী হতে চলেছে। প্যান্ট খোল বলছি।’
‘বললাম তো খুলব না। শোন বাবু, আমি বলে দিচ্ছি, আমার নাম অভয় ছিত্রে। আমি পিওর হিন্দু। তোদের ভাষায় কাফের। প্যান্ট খুলে তো এটাই দেখতিস, আমার সাইজ তো দেখতিস না। তাও আমি বলে দিচ্ছি, আমারটা তোদের সবার থেকে বড়ো। দেখলে তোদের বহুত ইনিসিকিয়োরিটি হবে। নে এবার মেরে ফেল আমায়।’
অনেক দিন পর্যন্ত তেনজিং নোরগের ছবিটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত পল্লব। ভাবত, এই লোকটা এভারেস্টে উঠেছে! আমি তো কোনও দিন পারব না। আজ সেই অনুভূতিটা হচ্ছে। সাহস বলে যদি কোনও শৃঙ্গ থেকে থাকে, তবে তার চূড়ায় উঠে জয়পতাকা তুলে দিয়েছে এই অভয় ছিত্রে নামের লোকটা। আত্মসম্মান বলে যদি কোনও দুর্গ থেকে থাকে, তবে তার সামনে অলঙ্ঘ্য প্রাচীর তুলে দিয়েছে। অভয় হয়তো একটু পরেই মরে যাবে কিন্তু সে জিতে গেছে। মৃত্যুকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে সে বাকিদের বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে। পল্লব যদি বেঁচে থাকে, যত দিন সে বাঁচবে পাহাড়ের মতো ভারী এই মৃত্যু নিয়ে অভয় ছিত্রে তার বুকের মধ্যে রয়ে যাবে। সব মরণ নয় সমান।
এর পরে যা হওয়ার তাই হল। দশ-বারো জন মিলে অভয়কে মারতে শুরু করল। কিন্তু সাহসও সংক্রামক। পল্লব ছুটে গেল বাধা দিতে। ওরা পল্লবকেও মারতে শুরু করল। দু’ চারটে ঘুসি, লাথি খেয়েই পল্লব পড়ে গেল। এমনিতেই মাথা ফাটা ছিল। দৃষ্টি ঝাপসা হতে শুরু করল। ওরা এলোপাথাড়ি কোপাতে লাগল অভয়কে। রক্তে ভিজে গেল বালি। জ্ঞান হারানোর আগে ঝাপসা চোখে পল্লব দেখল, মৃত্যুর আগের মুহূর্ত অবধি অভয় দু’হাতে তার প্যান্ট আঁকড়ে ছিল।
ভদ্রলোকের এক কথা। প্রাইভেট পার্ট অভয় ছিত্রে প্রেমিকা ছাড়া কাউকে দেখায় না।
