কে প্রথম কাছে এসেছি – ২
॥ দুই ॥
ভূপেনের কথাগুলো যে এ ভাবে সত্যি হয়ে যাবে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি নীরেন। পরের চার দিনে পাঁচ জন লোক মারা পড়ল লেবংয়ে। গ্রামের মুখিয়া কিরণ ছেত্রী, তার ছেলে সোনম এবং কিরণের তিন সহযোগী নামগেল তামাং, পাসাং তামাং আর গগন লিম্বু। প্রত্যেকেই কোনও-না-কোনও কাজে জঙ্গলে গিয়ে বেড়ালের কামড় খেল কিন্তু মৃত্যু হল হেমোটক্সিনে। সেই খিঁচুনি, সেই চোখ-কান-নাক দিয়ে রক্তপাত। তীব্র আতঙ্কে জড়োসড়ো হয়ে পড়ল গোটা গ্রামটাই। ভূপেনের মতো তারাও বিশ্বাস করতে শুরু করল, ফাদারের প্রেতাত্মা প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে।
কিরণ ছেত্রী মারা যেতেই গ্রামে নানা ধরনের গুনিন আর ওঝার আনাগোনা শুরু হয়েছিল। এসেছিলেন এক লামাও। তাঁরা নানা পুজোআচ্চা, যাগযজ্ঞ, ফাদারের কবর প্রদক্ষিণ ইত্যাদি নানা কাণ্ড করে গ্রাম বন্ধন করে দিয়ে গেলেন বটে কিন্তু মৃত্যু অব্যাহত রইল। কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে পালাতে শুরু করল। কিন্তু সকলের তো আর পালিয়ে যাওয়ার উপায় নেই আর জঙ্গলে না ঢুকলে এখানকার জীবন স্তব্ধ হয়ে যাবে। প্রধান জ্বালানিই তো জঙ্গলের কাঠ। আগুন না জ্বললে এই শীতে মানুষ বাঁচবে কেমন করে? রান্নাই বা হবে কী ভাবে? তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্থির করার জন্য গ্রামের লোকেরা একজোট হল প্রবেশদের বাড়ির সামনেটায়। প্রবেশের বাবা বললেন, ‘আমি এক জনকে চিনি। তিনি মহাযোগী। আমার বিশ্বাস, একমাত্র তিনিই আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবেন। কলকাতায় আমার এক বন্ধুর বাড়িতে আমি তাঁকে দেখেছিলাম। তিনি ওই পরিবারের গুরুদেব। রামদাস চট্টোপাধ্যায়। লোকে রামদাস ঠাকুর বলে। আগে তাঁর কথা মাথায় আসেনি।’
কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করল, আদৌ কাজ হবে তো? আবার কেউ কেউ বলল, সব রকম চেষ্টাই তো করা হল, এটাও দেখা যাক। প্রবেশের বাবা বললেন, ‘আমার সঙ্গে তো সরাসরি পরিচয় নেই। বন্ধু মারফত তাঁকে খবর দিতে হবে। এবার ডাকলেও তিনি আসবেন কি না, তা তো জানি না। সব মিলিয়ে হপ্তাখানেক অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। তত দিন কেউ পারতপক্ষে জঙ্গলে যেয়ো না। কঠিন সময়। সবাইকে মিলেমিশে থাকতে হবে। যার বাড়িতে বেশি কাঠ জমানো আছে সে অন্যকে সাহায্য করো।’
সৌগত আর তপনকে ধরে রাখা গেল না। শ্রাদ্ধ হওয়ার আগেই তারা ফিরে গেল কলকাতা। নীরেন কিন্তু রয়ে গেল। প্রবেশ বলল, ‘তুমিও ফিরে গেলে পারতে।’
নীরেন বলল, ‘তোমাদের এই বিপদের মধ্যে ফেলে যেতে ইচ্ছে করছে না। তোমার বাবা যাঁর কথা বললেন, তাঁকে দেখারও একটা কৌতূহল হচ্ছে। আমি আর ক’টা দিন থেকে গেলে তোমার আপত্তি নেই তো?’
তার হাত ধরে প্রবেশ বলল, ‘ছি ছি! কী বলছ ভাই? আমার তো ফিরে যাওয়ার উপায় নেই এখন। তুমি থাকলে মনে জোর পাব।’
রামদাস ঠাকুরকে দেখার ইচ্ছে তো ছিলই কিন্তু নীরেন আসলে থেকে গেল অন্য একটা কারণে। ছোটোবেলা থেকেই অলৌকিকের প্রতি নীরেনের অসীম কৌতূহল। আশ্চর্য এক ঘটনায় ভাইয়ের বসন্ত রোগ সেরে যাওয়ার পর থেকেই (দ্রষ্টব্য: ছোটোগল্প – দৈবী। নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র, ২য় খণ্ড) নীরেনের মনে অজানা এই জগৎকে জানার এক দুর্বার ইচ্ছে জন্মায়। তখন থেকেই সে ভারত তো বটেই, পৃথিবীর নানা দেশের ভূত, প্রেত, দেব, দেবী, তন্ত্র, মন্ত্র ইত্যাদি নিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করে। বিভিন্ন দেশের লোকগাথা তার মুখস্থ। বন্ধুরা জানে না, কিন্তু মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই নীরেন এই নানা ধরনের ‘অকাল্ট’ বা গুপ্তবিদ্যা চর্চায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেছে। তাই প্রেত বা আত্মা নিয়ে তার যেটুকু বোঝাপড়া তাতে তার মনে হচ্ছিল, এ-কাজ ফাদারের প্রেতাত্মার নয়। হ্যাঁ, প্রেতযোনি প্রাপ্ত হলে আত্মা কিছুটা হিংস্র আচরণ করে বটে কিন্তু ফাদার যে ধরনের মানুষ ছিলেন, তাঁর প্রেতাত্মা এই ভাবে প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে একের পরে এক মানুষকে মেরে ফেলছে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর যদি ধরেও নেওয়া হয় যে ফাদারের প্রেতাত্মাই এই মৃত্যুগুলোর জন্য দায়ী তা হলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হতে পারত বা খুব ভয় পেয়ে কেউ মারা যেতে পারত। কিন্তু তা তো হয়নি। প্রতি বারই এমন বেড়ালের কামড় আর সাপের বিষ আসছে কোথা থেকে? প্রেতাত্মা ভয় দেখায়। সে তো আর এমন কামড়ে দেয় না। নীরেনের মন বলছিল, এর পেছনে অন্য কোনও রহস্য আছে। সেই রহস্য সমাধানের তাগিদটাই নীরেনকে লেবংয়ে আটকে দিল। ভাগ্যিস দিল, নয়তো যে রামদাস ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হতো না আর নীরেনও কোনও দিন ভাদুড়িমশায় হয়ে উঠতে পারত না।
***
একটা রবিবারের সকালে রামদাস ঠাকুর লেবংয়ে এলেন। দিনটা সারা জীবনের জন্য স্মরণীয় হয়ে রইল নীরেনের কাছে। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৬৩।
ঠাকুর আসছেন বলে আগের দিন থেকেই একটা সাজো-সাজো রব পড়ে গেছিল প্রবেশদের বাড়িতে। খবর এসেছিল, ঠাকুর শিলিগুড়িতে এক শিষ্যের বাড়িতে এসে পৌঁছেছেন। আগামীকাল ভোরেই লেবংয়ের উদ্দেশে রওনা দেবেন। প্রবেশের বাবা ঠাকুরকে আনতে চলে গেছিলেন শিলিগুড়ি। যদিও বাড়ির সকলেই এখনও শোকবিহ্বল তবু তার মধ্যেও ঠাকুরকে আপ্যায়ন করার যথাসাধ্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা। সবাই আসলে আশায় বুক বাঁধছিল। কারণ ইতিমধ্যে আরও দু’জন একই ভাবে মারা পড়েছে, আর আশ্চর্যের বিষয় এই দু’জনের সঙ্গে ফাদারের কোনও বিরোধ ছিল না। এই দু’জনই কনভারটেড খ্রিস্টান এবং শেষ দিন অবধি তারা ফাদারের পক্ষেই কথা বলে গেছিল। তারা নিশ্চিন্ত ছিল, ফাদারের প্রেতাত্মা তাদের কোনও ক্ষতি করবে না। সেই বিশ্বাস থেকেই তারা জঙ্গলে ঢুকেছিল কাঠ কুড়োতে এবং বেড়ালের কামড় খেয়েছিল। গ্রামের লোকেরা বুঝতে পারছিল, এই মুহূর্তে কেউই নিরাপদ নয়। যদিও এখনও অবধি যা কিছু ঘটেছে জঙ্গলের মধ্যেই ঘটেছে কিন্তু এবার যে দুর্ঘটনা জঙ্গলের বাইরে ঘটবে না, তারই বা কী নিশ্চয়তা আছে? তাই ডুবন্ত মানুষ যে ভাবে কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরে, সেভাবেই গ্রামের লোকেরা প্রবেশের বাবার মুখে শোনা রামদাস ঠাকুরের বিভূতিকে অবলম্বন করে এই ভয়াবহ বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। আর যত সময় গড়াচ্ছিল, নীরেনের ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছিল, ফাদারের প্রেতাত্মা নয় এই সমস্ত মৃত্যুর পেছনে রয়েছে কোনও রহস্যময় অপদেবতার উপস্থিতি। কিন্তু হাজার ভেবেও কোনও দিশা পাচ্ছিল না সে।
রবিবার সকাল থেকেই একটা ঝলমলে রোদ উঠল। যেন দুর্ভোগ কেটে যাওয়ার একটা ইঙ্গিত দিতে শুরু করল লেবংয়ের আকাশ। দশটা নাগাদ একটা গাঢ় জলপাই রঙের ‘হিন্দুস্তান অ্যাম্বাস্যাডর মার্ক ২’ গাড়ি এসে দাঁড়াল প্রবেশদের বাড়ির সামনে। লোকজন ভিড় করে এল। প্রবেশের বাবা আর দু’জন শিষ্যকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলেন রামদাস ঠাকুর। ভিড়ের পেছন থেকে নীরেন মানুষটাকে দেখল। বছর পঞ্চান্ন বয়স। ছোটোখাটো চেহারা। মুখে অবিন্যস্ত কাঁচাপাকা গোঁফ দাড়ি দেখে আন্দাজ করা যায় যে মাথার চুলও কাঁচাপাকা। কিন্তু সেটা দেখার উপায় নেই। কারণ ইয়াব্বড়ো এক উলের টুপি আর মাফলার দিয়ে মাথা আর গলা আষ্টেপৃষ্ঠে ঢাকা। পরনে ধুতি আর ফুলহাতা সোয়েটার। হাতে দস্তানা। পায়ে মোজা আর পাম্প শু।
কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের খুবই সাদামাটা দেখতে কিন্তু তাদের উপস্থিতির মধ্যে এমন কিছু একটা ম্যাজিক থাকে যে এক বার দেখলে সারাজীবনে আর ভোলা যায় না। গাড়ি থেকে নেমেই রামদাস ঠাকুর অবাক হয়ে ভিড়টা দেখলেন। ভিড়ের উদ্দেশে হাতজোড় করে প্রণাম করে একটু হাসলেন আর ওই হাসি দেখেই স্তম্ভিত হয়ে গেল নীরেন। কোনও মানুষ যে এমন সুন্দর করে হাসতে পারে নীরেনের জানা ছিল না। তার মনে হল, ওই হাসির মধ্যে মিলেমিশে আছে শিশুর সারল্য আর প্রবল পরাক্রমীর অভয়বার্তা। নীরেন বুঝতে পারল, এই মানুষটার ম্যাজিক লুকিয়ে আছে মানুষটার হাসির মধ্যে।
রামদাস ঠাকুর প্রথম কথাটাই বললেন, ‘বাবা গো! কী ঠান্ডা এখানে। গাড়ির মধ্যে তো বুঝতেই পারিনি গো!’
ঠাকুরের এক শিষ্য বললেন, ‘গায়ে একটা আলোয়ান চাপা দেবেন?’
ঠাকুর বললেন, ‘আচে? তোমার কাচে আর আলোয়ান আচে? ওই দেখো, তোমায় আবার জিজ্ঞ্যেস করচি। তুমি তো গিন্নি লোক। দাও তবে আলোয়ান।’
‘গিন্নি লোক’ কথাটা প্রথম বার শুনল নীরেন। তার ভারি মজা লাগল ঠাকুরের কথা শুনে। গাড়ির ডিকি খুলে ব্যাগ থেকে মোটা একটা পশমের চাদর করে ভদ্রলোক খুব যত্ন করে ঠাকুরের গায়ে জড়িয়ে দিলেন। নীরেন বুঝতে পারল, শিষ্যরা খুব ভালোবাসে এই সরল মানুষটাকে। তবে মানুষটা যে ঠিক কতটা সরল, কতটা ছেলেমানুষ আর কতটা বিশাল নীরেন সেটা বুঝতে পারল কিছুক্ষণের মধ্যেই। অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল।
ভিড়টা তখন একটু পাতলা হয়েছে। ঠাকুরকে বসানো হয়েছে প্রবেশদের বাড়ির উঠোনে। গ্রামের দু’ চারজন মান্যগণ্য মানুষ আর প্রবেশের বাড়ির লোকেরাই আছেন। নীরেন ঠাকুরের কাছেই একটু পেছন দিক করে দাঁড়িয়েছিল। সে শুনতে পেল, ঠাকুর চাপা গলায় তাঁর এক শিষ্যকে বলছেন, ‘ওগো, এখন সবার সঙ্গে পরিচয় করাবে গো। ওদের বলে দাও না ওরা যেন পায়ে হাত না দেয়। আমার সুড়সুড়ি লাগে।’
নীরেন থ হয়ে গেল! এই ধরনের মানুষেরা তো পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম নিতেই অভ্যস্ত। নীরেন বেশির ভাগ সাধককেই দেখেছে যে তাঁরা প্রণাম নেবেন বলে পা বাড়িয়েই থাকেন। সেখানে সুড়সুড়ি লাগে বলে ইনি প্রণাম নেবেন না বলছেন! অদ্ভুত তো!
ঠাকুরের ওই শিষ্য সমবেত লোকজনের উদ্দেশে বলে দিলেন, ঠাকুর পায়ে হাত দেওয়া পছন্দ করেন না। প্রবেশের বাবা এক এক করে সবার সঙ্গে ঠাকুরের পরিচয় করাতে লাগলেন। সবাই হাতজোড় করে নমস্কার করছে, ঠাকুরও হাতজোড় করে প্রত্যুত্তর দিচ্ছেন। এই করতে করতে নীরেনের পালা এল। প্রবেশের বাবা নীরেনকে বললেন, ‘নীরেন পেছনে দাঁড়িয়ে কেন? সামনে এসো।’
নীরেন ঠাকুরের সামনে এসে দাঁড়াল। প্রবেশের বাবা বললেন, ‘ওর নাম নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। প্রবেশের বন্ধু। কলকাতা থেকে বেড়াতে এসে আটকে পড়েছে। আপনি আসছেন শুনে থেকে গেল।’
নীরেন হাতজোড় করে প্রণাম জানাল কিন্তু ঠাকুর কোনও প্রত্যুত্তর দিলেন না। দেবেন কী করে? নীরেন অবাক হয়ে দেখল, ঠাকুর তাকে দেখছেনই না। ঠাকুরের নজর তার পায়ের দিকে। এ বার শুধু নীরেন নয়, সমবেত সকলকে অবাক করে ঠাকুর বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ গো, তোমার মুজোটা কী সুন্দর গো! আমায় দেবে?’
এ কথায় ঠাকুরের সঙ্গে থাকা দুই শিষ্য যতটা না অপ্রস্তুতে পড়লেন তার চেয়েও বেশি অপ্রস্তুতে পড়ে গেল নীরেন নিজে। সব ছেড়ে ঠাকুর কি না তার মোজা দেখলেন! কেন কে জানে একই সঙ্গে নীরেনের একটু অভিমানও হল! ঠাকুর এক বারও তার মুখের দিকে তাকালেন না! অচেনা মানুষের প্রতি এমন অধিকার বোধ তো থাকার কথা নয়। তবু নীরেনের খুব মন খারাপ করে উঠল। ঠিক তখনই ঠাকুর নীরেনের চোখে চোখ রাখলেন। বললেন, ‘তোমার দিকে দেখিনি বলে রাগ হয়েচে? দেখিচি গো দেখিচি। গাড়ি থেকে নেমেই তোমায় দেখিচি। তুমি ভিড়ের পেছনপানে দাঁড়িয়ে চিলে। আড়ালে থাকলেই কি আর সুয্যের জ্যোতি ঢাকা যায় গো? তোমায় আমি নীরেন বলে ডাকি?’
ওই ক’টা কথা। নীরেনের বুকের মধ্যে কে যেন চন্দন ধূপ জ্বালিয়ে দিল। সমস্ত জমানো বেদনায় আদরহাত বুলিয়ে দিল পরম যত্নে। ক্ষতয় মায়ামলমের প্রলেপ দিল। আটকাতে চেয়েও নিজেকে আটকাতে পারল না নীরেন। হু হু করে কেঁদে ফেলল সে। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল ঠাকুরের পায়ের কাছে। নীরেনের চোখে জল দেখে তখন ঠাকুরের চোখেও জল। দু’হাত বাড়িয়ে নীরেনকে বুকে জড়িয়ে নিলেন তিনি। ঠাকুরের বুকে ঠিক যেন মায়ের আঁচলের গন্ধ। নীরেনের মাথায় হাত বুলিয়ে ঠাকুর বললেন, ‘বাবা কি চিরকাল থাকে পাগল? মানুষ বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা তার স্মৃতি। সে সব আগলে রেখো।’
ঠাকুরের স্পর্শে নীরেনের এত দিনের যন্ত্রণার উপশম হচ্ছিল আর সে অনুভব করছিল, সমুদ্রের মতো বিশাল এক মানুষের সান্নিধ্যে এসে পড়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীরেন নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল ঠিকই কিন্তু ঠাকুর মোজার কথা ভুললেন না। আবার বললেন, ‘তোমার কি আর মুজো নেই? ওইটে আমায় দিলে খুব সমস্যা?’
নীরেন কুণ্ঠিত হয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ঠাকুরের এক শিষ্য বলে উঠলেন, ‘আপনার ওই লাল রংটা পছন্দ তো? আজই দার্জিলিং থেকে আনিয়ে দেওয়া যাবে।’
ঠাকুর বললেন, ‘রং শুধু না, ওই ডিজাইনটাও পচন্দ। ঠিক এমনটাই কি আর পাবে গো?’
এ বার আর নীরেন চুপ করে থাকতে পারল না। বলল, ‘ঠাকুর, আমার মোজা আপনি পায়ে দেবেন? তা কখনো হয়?’
ঠাকুর তুমি থেকে তুইতে উঠে এলেন। নীরেনের হাত ধরে বললেন, ‘পা বলে ছোটো করিসনি নীরেন। পা না থাকলি মানুষ অচল। তোরে দেখেই আমি চিনেচি। তুই আমার পা হবি নীরেন। পা হবি। আমি যে দিন থাকব না সে দিনও তুই আমারে বয়ে নিয়ে যাবি। তাই তো তোর মুজো পরতে চাইচি। দে, নিজে হাতে আমায় পরিয়ে দে।’
চেয়ারে বসে ঠাকুর পা দুটো বাড়িয়ে দিলেন। কোলের ওপরে রেখে নিজে হাতে সে পায়ে মোজা পরিয়ে দিতে দিতে আর এক বার কাঁদল নীরেন। বুঝতে পারল, নিয়তি তাকে সারাজীবনের মতো জড়িয়ে দিল রামদাস ঠাকুরের সঙ্গে
***
প্রবেশ আর নীরেনের মুখ থেকেই সবটা শুনলেন ঠাকুর। লেবংয়ের গির্জা আর ফাদার চার্লস ক্যারলের আত্মহত্যার ব্যাপারটাও বাদ দিল না নীরেন। বলতে বলতে লক্ষ করল, প্রবেশের মুখে অপরাধবোধের ছায়া। প্রবেশ বলল, ‘এত কিছু তুমি কী করে জানলে? ভূপেন বলল?’
নীরেন ঘাড় নাড়ল। প্রবেশ বলল, ‘আমার ওপরে যে ও খুব রেগে আছে সেটাও আশা করি বলেছে?’
‘হুম।’
‘ভূপেন আমাকে ভুল বুঝছে কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। আমার ফ্যামিলি চাইছিল হোটেল হোক। আমি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু শেষ অবধি ফ্যামিলির এগেন্সটে যেতে পারলাম না।’
প্রবেশের পিঠে সান্ত্বনার হাত রাখল নীরেন। তার পরে ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এটা যে ফাদার ক্যারলের প্রেতাত্মার কাজ নয় সে আমার গোড়া থেকেই মনে হচ্ছিল। পরের দু’জন কনভারটেড খ্রিস্টানের মৃত্যু তো আমার তত্ত্বেই সিলমোহর দিল। তাই না?’
ঠাকুর বললেন, ‘তুই ঠিকই বলচিস নীরেন। যে মানুষ অমন করে ভালোবাসতি জানে সে কখনো কারও ক্ষতি করে না। মরার পরেও না। তবু এক বার গির্জায় যাওয়া যাবেখনে। কিন্তু বেড়ালের কামড় আর সাপের বিষের ব্যাপারটা আমি বুজচি না। এমনধারা কথা তো আমি জন্মে শুনিনি। আচ্চা একটা কথা বল, জঙ্গলে কেউ সাপ দেখেনি তাই না?’
নীরেন বলল, ‘না ঠাকুর। প্রত্যেক বারই বেড়ালের কামড়ের খবর পেয়েই আমি সেখানে ছুটেছিলাম। যারা কামড় খেয়েছিল মারা যাওয়ার আগে তাদের সবার সঙ্গেই আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সবাই বলেছে, বেড়ালটা গাছের আড়াল বা ঝোপঝাড়ের মধ্যে থেকে আচমকা লাফিয়ে উঠে কামড়ে দিয়েছে। তার পরেই সেটাকে আর দেখা যায়নি।’
প্রবেশ বলল, ‘গগন লিম্বু খুব সাহসী ছেলে। কামড় খাওয়ার পরে ও বেড়ালটাকে খুঁজেছিল। যে দিক দিয়ে বেড়ালটার পালিয়ে যাওয়ার কথা সে দিকে ঝোপঝাড় ভেঙে কিছুটা এগিয়েও গেছিল কিন্তু কিচ্ছু পায়নি। মানে পালাতে হলে বেড়ালটাকে তো ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়েই পালাতে হবে। তাতে ঝোপঝাড়ে তার কোনও-না-কোনও চিহ্ন থাকবে। কিন্তু সেটাও ছিল না। গগন অনেকদিন ডুয়ার্সের জঙ্গলে গাইডের কাজ করেছে। জঙ্গল ও খুব ভালো চেনে। মারা যাওয়ার আগে ও বার বার বলছিল, বেড়ালটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছিল।’
নীরেন বলল, ‘এখানেই আমার খটকা লাগছে ঠাকুর।’
ঠাকুর বললেন, ‘কেমন খটকা?’
‘আমি ধরে নিচ্ছি এটা কোনও অপদেবতার কাজ। কিন্তু মৃতের শরীরে দাঁতের দাগ যখন স্পষ্ট তখন সেই অপদেবতার পার্থিব উপস্থিতি থাকতেই হবে। সে আর যাই হোক বায়ুভূতে মিলিয়ে যেতে পারে না। আমার সামান্য যুক্তিবুদ্ধি তো তাই বলে। মানে ধরুন, যারা মানুষকে কামড়ায় যেমন ভ্যাম্পায়ার বা ওয়্যারউলফ জাতীয় যে সব অপদেবতার উল্লেখ বিদেশি লোকগাথায় পাওয়া যায় বা আমাদের দেশীয় পিশাচ তাদের তো একটা চেহারা আছে। আমি বডিমাসের কথা বলছি। এ ক্ষেত্রেও আমার বিশ্বাস বিষাক্ত বেড়ালটা ওই জঙ্গলের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে। কিচ্ছু হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। কিন্তু সেটার লুকিয়ে পড়ার এমন কোনও একটা কায়দা আছে যেটা কেউ ধরতে পারছে না।’
‘তোর যুক্তিতে কোনও ফাঁক নেই রে নীরেন। কিন্তু এ কোন অপদেবতা সেটাই যদি চেনা না যায় তারে বাঁধি কেমন করে বল দিকি? সময় নষ্ট করে লাভ নেই বুজলি? আমারে একবার ওই গির্জেয় নিয়ে চল দিকি। কেন জানি না আমার মন বলচে, ওই গির্জায় কোনও সূত্র আচে। আর যদি কিচু নাও পাওয়া যায় অন্তত ফাদারের আত্মার একটা গতি করে দিয়ে আসি। আহা রে! মানুষটা বড়ো ভালো চিলেন গো।’
ঠাকুর গির্জায় যাবেন শুনে গ্রামের অনেকেই যেতে চেয়েছিল কিন্তু ঠাকুর সবাইকে বারণ করে দিলেন। এমনকী যে দু’জন শিষ্য তাঁকে নিয়ে এসেছিল তাঁদেরও। বললেন, ‘শুধু নীরেন, ভূপেন আর প্রবেশ যাবে আমার সঙ্গে। ওরা কমবয়সি ছেলেপুলে। ওদের সঙ্গে থাকলি আনন্দ হয় গো।’
ঠাকুরকে নিয়ে ওরা গির্জায় এল। এ বারে চাবি নিয়ে এসেছিল প্রবেশ। গেট খুলে ভেতরে ঢোকা হল। প্রার্থনা কক্ষটা ঘুরে দেখে ঠাকুর প্রবেশকে বললেন, ‘চলো গো, এবারে পেচন দিকটা দেখি।’
নীরেন বলল, ‘প্রবেশ তুমি ঠাকুরকে নিয়ে যাও। আমি আসছি।’
ওঁরা যেতেই নীরেন চলে এল পুলপিটের কাছে। জুতো খুলে উঠে দাঁড়াল প্ল্যাটফর্মের ওপরে। বড়ো সুন্দর যিশুখ্রিস্টের মূর্তিটা। বড়ো মায়াকাড়া চোখ দুটো। দু’হাত ছড়িয়ে রেখেছেন দু’দিকে। মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে নীরেন বলল, ‘প্রভু, রক্ষা করো। এই বিপদ থেকে উদ্ধারের পথ দেখাও।’
প্রণাম সেরে নেমে আসতে যাবে তখনই মূর্তির ডান হাতের আঙুলে নীরেনের চোখ আটকে গেল। তর্জনী আর মধ্যমার মাঝে লাল রঙের চুলের মতো কী যেন জড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে মূর্তির আঙুল থেকে জিনিসটা ছাড়িয়ে নিয়ে ভালো করে দেখল, লাল রঙের পশমের সুতো! অবাক হল সে। মূর্তির আঙুলে লাল পশম এল কোথা থেকে! খুব বেশি ভাবার সময় অবশ্য পেল না। তার আগেই ঠাকুরের ডাক ভেসে এল বাইরে থেকে, ‘কই গেলি নীরেন? ও নীরেন?’
মাত্র কয়েক ঘণ্টার পরিচয় কিন্তু তার মধ্যেই ঠাকুর যেন তাকে চোখে হারাচ্ছেন। মনে হচ্ছে কত জন্মের পরিচয়। সবাইকে তুমি করে বললেও তাকে বলছেন তুই করে। বড়ো ভালো লাগছে নীরেনের। সুতোটা পকেটে ঢুকিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে এল। প্রবেশ ওঁদের নিয়ে এল ফাদারের ঘরে। আগের দিন আকাশে মেঘ ছিল আর সন্ধে হয়ে এসেছিল বলে ঘরের ভেতরটা ভালো করে দেখতে পায়নি নীরেন। আজ দেখল, ঘরে তক্তপোশ আর আলমারি ছাড়াও একটা ছোটো সিন্দুক রয়েছে। সিন্দুক বলা ভুল, ছোটো মাপের আয়রন চেস্ট। মেঝেতে রাখা বলে আগের দিন আরও চোখে পড়েনি। নীরেন গিয়ে ডালা ধরে টান দিতেই খুলে গেল সেটা। ভেতরটা একেবারে ফাঁকা। নীরেন বলল, ‘এটার মধ্যে কী ছিল?’
ভূপেন বলল, ‘গির্জার সব পুরোনো দলিলপত্র। রেজিস্টার খাতা এইসব।’
প্রবেশ বলল, ‘ওগুলো আমার কাছে আছে। আমরা সবই নিয়ে গেছিলাম। তুমি চাইলে দেখতে পারো।’
ঠাকুর বললেন, ‘ঠিকই বলেচিলি নীরেন, এখানে কিছু পেলাম না। কাল এসে মানুষটার পিণ্ডদান করে যাব। আজ ফিরি।’
‘চলুন’, বলে ভূপেন আর প্রবেশ ঠাকুরকে নিয়ে বেরোল। নীরেনও বেরোতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল, তক্তপোশের নীচে কী যেন একটা চকচক করছে। উবু হয়ে হাত বাড়িয়ে জিনিসটাকে বাইরে নিয়ে এসে দেখল, এক টুকরো কাচ। পেছনে পারা লাগানো। আয়নার কাচ। নীরেন ভাবল, ফাদারেরই আয়না হবে। জিনিসপত্র বার করার সময় কোনও ভাবে ভেঙে গেছিল। কাচের টুকরোটা রেখে উঠতে যাবে তখনই আবার চোখ আটকে গেল মেঝেতে। নেহাত উবু হয়ে বসেছিল তাই চোখে পড়ল। মেঝেতে কিছু লেখা বা আঁকা হয়েছিল লাল রং দিয়ে। সম্ভবত ক্রস জাতীয় কিছু। কিন্তু সেটা ঘষে ঘষে মুছে দেওয়া হয়েছে আর সেটা হয়েছে খুব সম্প্রতি। নয়তো এই পরিত্যক্ত ঘরে মেঝের দাগ ধুলোয় ঢাকা পড়ে যাওয়ার কথা। নীরেনের মনটা কু ডেকে উঠল আর ঠিক তখনই বাইরে উত্তেজিত গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। বাইরে বেরিয়ে এসে শুনল, আবার এক জনকে বেড়াল কামড়েছে। এবার একটা বাচ্চা ছেলে। বল হারিয়ে গেছিল বলে সে জঙ্গলে ঢুকেছিল বল আনতে। গ্রামের লোক এসেছে ঠাকুরকে নিয়ে যেতে।
যত দ্রুত সম্ভব ছুটে এল ওরা কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। বাচ্চা মানুষটা তীব্র হেমোটক্সিনের সঙ্গে যুঝতে পারেনি বেশিক্ষণ। মাথাটা কোলে নিয়ে তার মা বিলাপ করছে। নীরেন ভাবত, বাবা চলে যাওয়ার পরে আর কোনও মৃত্যুই তাকে নাড়া দেবে না। কিন্তু এই মৃত্যুটা দিল। খুব বেশি করে নাড়া দিল। ঠাকুরের হাত ধরে সে বলল, ‘এটা চলতে পারে না। এর একটা বিহিত করুন ঠাকুর।’
পাথরের মতো মুখ করে ঠাকুর দাঁড়িয়ে ছিলেন। নীরেনের স্পর্শে যেন তাঁর ঘুম ভাঙল। এগিয়ে গেলেন সদ্য সন্তানহারা মায়ের কাছে। মেয়েটির বয়স তিরিশের নীচেই। তার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘শক্ত হও মা গো তোমার সন্তানরে তো আমি ফিরিয়ে দিতি পারব না তবে কথা দিচ্চি, যে তোমার বাচ্চার এই অবস্থা করল তারে আমি রেয়াত করব না।’
ঠাকুরের মধ্যে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল নীরেন। ওই হাসিমাখা মুখ যে এত কঠিন হয়ে উঠতে পারে ভাবা যায় না। ভিড় থেকে সরে এসে ঠাকুর কয়েকজন মান্যগণ্য গ্রামবাসীকে ডেকে আনলেন নিজের কাছে। বললেন, ‘আমার কিচু জিনিসপত্র লাগবে। সেগুলো বলে দিচ্চি, ব্যবস্থা করো আর আজ সন্ধে হলে আমি জঙ্গলে ঢুকব। আজই আমি দেখতে চাই কোন অপদেবতার এত রোয়াব? আমি আচি তাও সে মানুষ মেরে চলেচে!’
নীরেন বুঝল, তাঁর উপস্থিতিতে এই শিশুমৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না ঠাকুর। তাঁর আঁতে লেগেছে। রামদাস ঠাকুর ঠিক কোন মার্গের সাধক তা নীরেন জানে না। অত কথা তার ঠাকুরের সঙ্গে হয়নি। তবে ঠাকুর যে মহাশক্তিধর সেটা সে তখনই বুঝেছিল, যখন না বলতেও শুধুমাত্র স্পর্শ করেই ঠাকুর তার বাবার মৃত্যুর ব্যাপারটা বলে দিয়েছিলেন। মনের কথা পড়তে পারা খুব কঠিন কাজ। খুব কতিপয় কিছু মহাযোগীরই এই ক্ষমতা থাকে। ঠাকুর তাঁদেরই একজন। অপদেবতারাও তাঁর যোগশক্তিকে ভয় পাবে কিন্তু নীরেনের অস্বস্তি হচ্ছিল অন্য কারণে। বারে বারেই তার মনে হচ্ছিল, এই অপদেবতার চরিত্রটাই তো অচেনা। ধোঁয়াশাময়। শত্রুর চলন না জানলে তার সঙ্গে লড়াই করা দুরূহ। যদি এই অপদেবতাটিকে চিহ্নিত করা যেত তা হলে এত ঘাবড়াত না নীরেন। তাই সে বলল, ‘কাল সবাই মিলে দিনের বেলা গেলে হয় না?’
‘না, যা করার আজই।’
‘বেশ। তবে আমিও আপনার সঙ্গে যাব।’
নীরেনের দিকে তাকিয়ে ঠাকুর একটাই কথা বললেন, ‘না।’
***
কারও কোনও কথাতেই কর্ণপাত করলেন না ঠাকুর। সন্ধে সাতটা নাগাদ দু’হাতে দুটো মশাল আর কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে ঢুকে গেলেন জঙ্গলের মধ্যে। মশালের আলোটা ছোটো হতে হতে হারিয়ে গেল প্রাচীন সব মহাবৃক্ষের আড়ালে। জঙ্গলের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল নীরেন। বাবা যে দিন হাসপাতালে যাচ্ছিলেন অ্যাম্বুল্যান্সে চড়ে, সে দিন তার ঠিক এমনই একটা অনুভূতি হয়েছিল।
