লাপিস লাজুলি – ১৬
॥ ষোলো ॥
ফেব্রুয়ারি, ১২৬৫ খ্রিস্টাব্দ
কক্ষের ঠিক বাইরেটায় মাথা নীচু করে বসেছিল সুলতানচুক। গত তিরিশ ঘণ্টা ধরে সে এ ভাবেই বসে আছে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, বাহ্যবোধ সব হারিয়ে ফেলেছে সে। বোকা তেমুর, বাইজু নয়ান এমনকী সম্রাজ্ঞী দোকুজ খাতুনও তাকে বহু বার কক্ষের ভেতরে ডেকেছে কিন্তু সে যায়নি। হালাকু খাঁ-কে সে এই অবস্থায় দেখতে পারবে না। আজ চার দিন হল হালাকু শয্যা ছেড়ে উঠছেন না। যত রকমের চিকিৎসা বিদ্যা প্রয়োগ করা সম্ভব সব করা হয়েছে কিন্তু হালাকুর অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। আজও নতুন এক চিকিৎসককে ধরে নিয়ে এসেছে তেমুর। ইনি খুবই নামকরা। মৃতপ্রায় মানুষ বাঁচিয়ে দেওয়ায় এঁর হাতযশ সর্বজনবিদিত। কক্ষের ভেতরে তিনিই এখন পরীক্ষা করছেন হালাকুকে। কিন্তু সুলতানচুক বুঝতে পারছে, লাভ হবে না। শরীরের ক্ষত তাও সেরে যায় কিন্তু মনের ক্ষত সারানো অসম্ভব।
অনেক দিন আগে থেকেই মন ভাঙতে শুরু হয়েছিল হালাকুর। প্রথম ধাক্কা খেলেন মোংকে খাঁ মারা যাওয়াতে। দাদাকে খুব ভালোবাসতেন তিনি এর পরের ধাক্কা এল পরবর্তী সম্রাট নির্বাচনের সময়। মোংকের পরে হালাকুই ছিলেন সিংহাসনের প্রকৃত দাবিদার। তিনি পারস্যের হাসাসিনদের দমন করেছেন। বাগদাদ জয় করে আব্বাসীয় খিলাফৎ শেষ করে দিয়েছেন। দামেস্ক জয় করেছেন। মোঙ্গোল সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করেছেন মধ্যপ্রাচ্যে। অথচ সম্রাট নির্বাচিত হলেন কুবলাই খাঁ! কী যুক্তি দেওয়া হল? হালাকু নাকি বর্বর! বাগদাদে যে ভাবে মানুষ মেরেছেন তা নাকি সমর্থনযোগ্য নয়! তাঁর আড়ালে তাঁকে ডাকা হচ্ছিল ‘বাগদাদের কসাই’ বলে! এ সবই কানে এসেছিল হালাকুর। কষ্ট পেয়েছিলেন কিন্তু হার মানার মানুষ তো নন। সুলতানচুককে বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে পর করে দিল। মানুষ না মেরে কি যুদ্ধ হয়? মানুষ ওরা মারেনি? শুধু আমি হলাম কসাই? ঠিক আছে, আমিও লড়ে যাব। দেবী ইনান্নার দণ্ড আমার কাছে আছে। শুধু ওটাকে ব্যবহার করতে পারার অপেক্ষা। তার পরে আমাকে কে আটকায় আমিও দেখতে চাই।’
মনপ্রাণ এক করে তন্ত্রচর্চা করছিলেন। দীক্ষা নিয়েছিলেন এক বেদুইনের কাছে। বার বার বলতেন, ‘আর কত দিন? আর কত দিন?’
বেদুইন বলেছিল, ‘সময় লাগবে। এ ছেলেখেলা নয়।’
কিন্তু সময় পেলেন না হালাকু। তার আগেই বিরকাই খাঁ যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল আর এই প্রথম বার কোনও যুদ্ধে হেরে গেলেন তিনি। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হল। কারা সোঙ্কোরের তলোয়ারের আঘাতে কাঁধে চোট পেয়েছিলেন। সেই একই জায়গায় আবার চোট পেলেন। পুঁজ জমতে শুরু করল সেখানে আর অবিশ্বাসের পুঁজ মাথায়। সুলতানচুক, বাইজু নয়ান আর বোকা তেমুরকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করলেন। তাঁর মনে হতে লাগল, বিরকাই খাঁ-র সঙ্গে যুদ্ধে এরা তিন জন যথেষ্ট লড়াই করেনি। তেমুর আর নয়ান হালাকু ওপরে ক্ষিপ্ত হলেও সুলতানচুক হতে পারেনি। হালাকু আর সে প্রায় সমবয়সি। ছেলেবেলায় দু’জনে একসঙ্গে অসিচালনা শিখেছে। ঘোড়ায় চড়া শিখেছে। যে দিন থেকে হালাকু যুদ্ধ করতে বেরিয়েছেন সে দিন থেকে সুলতানচুক তাঁর সঙ্গী। সে বুঝতে পারত, এই অবিশ্বাসের জন্য দায়ী ওই দেলবে বেগ নামের ছোকরাটা। ভুঁইফোড়টাকে কেন যে হালাকু এত প্রশ্রয় দিতেন আকাশের দেবতা টেংগ্রিই জানেন। আচমকাই যেন উড়ে এসে একেবারে জুড়ে বসল। শিকারে গিয়ে এক বার সিংহের মুখে পড়ে গেছিলেন হালাকু। তখন এই দেলবে ছুটে এসে তাঁকে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। সে তো যুদ্ধক্ষেত্রে কত বার তারাও হালাকুকে বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে। কই তখন তো এত প্রেম দেখেনি! বিপদে পড়লে সঙ্গীরা একে অপরকে বাঁচাবে এটাই তো নিয়ম। এটাকে এত মহৎ করে দেখার কী আছে কে জানে! সুলতানচুক বলেছিল, ‘খাঁ, এই ছেলেটাকে আমার সন্দেহজনক লাগে।’
দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন হালাকু। সুলতানচুক বুঝে গেছিল, হালাকুর ভীমরতি ধরেছে। নয়তো দু’দিনের ছোকরার কথায় এত বছরের বয়স্যদের ভুল বোঝার কথা নয়। আর এই অন্ধবিশ্বাসই কাল হল। সাধনার একেবারে শেষ স্তরে ছিলেন হালাকু। বেদুইন বলেছিল, আর এক দিন পরেই বিশেষ আচার পালনের মাধ্যমে তিনি দেবীর দণ্ড ব্যবহারের অধিকারী হয়ে উঠবেন। কিন্তু তার আগেই সর্বনাশটা হয়ে গেল। দেবী ইনান্নার দণ্ড চুরি করে পালিয়ে গেল ছেলেটা। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সেই যে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন হালাকু, আজ চার দিন হয়ে গেল জ্ঞান ফেরেনি।
পায়ের আওয়াজে মুখ তুলে তাকাল সুলতানচুক। চিকিৎসককে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে তেমুর। দু’জনেরই মুখ কালো হয়ে আছে। সবই বুঝতে পারল সুলতানচুক তবু উঠে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বুঝলেন? ‘ মাথা নেড়ে চিকিৎসক বললেন, ‘আর সময় নেই। আপনারা খাঁ-র অন্ত্যেষ্টির আয়োজন করতে শুরু করুন।’
চিকিৎসক চলে গেলেন। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল তেমুর আর সুলতানচুক। তেমুরের চোখে জল। আজ শেষবেলায় এসে অভিমান আর নেই। অভিমান এমনিতে শক্ত ধাতু কিন্তু দুটো জিনিসে সহজে গলে যায়। আদর আর শোক। গলে যাওয়া অভিমানকে বলে অশ্রু।
সুলতানচুক এসে তেমুরের কাঁধে হাত রাখল আর তখনই ভেতর থেকে ছুটে বাইরে এল বাইজু নয়ান, ‘শিগগির এসো। খাঁ-র জ্ঞান ফিরছে।’
ঝড়ের মতো ভেতরে ঢুকে এল ওরা। দেখল, খাঁ-র মুখের ওপরে ঝুঁকে আছেন সম্রাজ্ঞী দোকুজ খাতুন। তিনি ডাকছেন, ‘খাঁ, শুনতে পাচ্ছ?’
অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। প্রথমে ধীরে ধীরে চোখ মেলে চাইলেন হালাকু খাঁ। ঘোলাটে দৃষ্টি কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে এল। তার পরে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শয্যার ওপর উঠে বসলেন তিনি। অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘আমি ঠিক আছি। সুলচুক, নয়ান আর তেমুর ছাড়া বাকিরা বাইরে যাও।’
যারা ছিল সকলেই বেরিয়ে গেল বাইরে। দোকুজ খাতুন একটু ইতস্তত করছিলেন। খাঁ বললেন, ‘তুমিও যাও। আমি একটু পরেই আবার সবাইকে ডেকে নেব। এখন আমার ওদের সঙ্গে খুব জরুরি ক’টা কথা আছে।’
ঘর ফাঁকা হতেই খাঁ তাঁর গুরু সেই বেদুইনকে ডাকতে বললেন। তেমুর ছুটে বেরিয়ে গেল তাঁকে নিয়ে আসতে। বেদুইনকে নিয়ে তেমুর ফিরতেই খাঁ বললেন, ‘কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিয়ে সবাই আমার কাছে এসে বোসো।’
চার জন ঘিরে বসল হালাকু খাঁ-কে। হালাকুকে দেখে বোঝার উপায় নেই চার দিন ধরে তিনি অচেতন ছিলেন। উত্তেজনায় আর প্রাণশক্তিতে ফুটছেন তিনি। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। এই যে আচমকা সুস্থ বোধ করছি এটাই তার প্রমাণ। নিভে যাওয়ার আগে প্রদীপ দপ করে জ্বলে ওঠে। না, এখন কেউ কাঁদবে না। মন দিয়ে আমার কথাগুলো শোনো। প্রথমেই আমি ক্ষমা চাইব সুলচুক, তেমুর আর নয়ানের কাছে। তোমাদের অবিশ্বাস করা আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল। আর এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আমাকে জীবন দিয়ে করতে হবে। কিন্তু আমার সাধ মেটেনি। আশা পূরণ হয়নি। তাই এখনকার মতো চলে গেলেও আমি আবার ফিরে আসতে চাই। গুরুর কাছে শুনেছি, বিশেষ এক তন্ত্র প্রয়োগে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। আমার মৃত্যুর পরে তোমরা সেই প্রক্রিয়ারই আয়োজন করবে। আমার শেষ ইচ্ছেটা আমি আজ তোমাদের চার জনের সামনে প্রকাশ করে যাব। এ জন্মে তো হল না কিন্তু এমন ব্যবস্থা করবে যাতে পরজন্মে আমার এই ইচ্ছে পূরণ হয়। কাছে এসো। আমার শেষ ইচ্ছে হল…’
হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছাটির কথা শুনে চার জনেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। সুলতানচুক আজ আবারও প্রমাণ পেল, সাধারণ মানুষের মাপে হালাকু খাঁ-কে আঁটানো যায় না। হালাকু খাঁ-র বিশালতা সাধারণের আয়ত্তের অতীত। ইচ্ছাটি প্রতিশোধমূলক। কিন্তু প্রতিশোধ যে এমন ব্যাপক, সুদূরপ্রসারী ও চিরস্থায়ী হতে পারে তা সুলতানচুকের ভাবনার বাইরে। খাঁ আবার বললেন, ‘আমার সমাধিতে লিখে রেখে যেয়ো আমার শেষ ইচ্ছে। পরজন্মে তো আমার কিছু মনে থাকবে না, ওই লেখা দেখে আমার যেন সব মনে পড়ে যায়। আমি যেন আমার ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারি। আর আমি জানি আমার এই ইচ্ছে পূরণ এমনি এমনি সম্ভব নয়। তার জন্য লাগবে দেবী ইনান্নার দণ্ড। এমন ব্যবস্থা কোরো যেন পরজন্মে আবার আমি ওই মহাশক্তিধর আয়ুধটি হাতে পাই। এত দিনে আমি বুঝেছি, তন্ত্র সব পারে। অসাধ্যকে অনায়াসসাধ্য করে তোলা তার বাঁ-হাতের কাজ। যাই হোক, এ বার সবাইকে ডেকে দাও। তোমরা ভালো থেকো। বিদায় গুরুদেব। বিদায় বন্ধুরা।’
কথা শেষ করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন হালাকু খাঁ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর বুকের ওঠা-নামা বন্ধ হয়ে গেল। অপূর্ণ এক ইচ্ছা নিয়ে বিদায় নিলেন মহাবীর হালাকু খাঁ। বাগদাদের কসাই হালাকু খাঁ।
প্রাথমিক অন্ত্যেষ্টিপ্রক্রিয়া মিটতে কিছুক্ষণ লাগল। কয়েক ঘণ্টা পরে ১১ জনের একটা ছোটো দল হালাকু খাঁ-র মৃতদেহ নিয়ে প্রাসাদ থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। সঙ্গে ঘোড়ায় টানা চারটি গাড়ি। অপেক্ষাকৃত ছোটো সুদৃশ্য একটি গাড়িতে রয়েছে হালাকু খাঁ-র মৃতদেহ। একটি গাড়িতে বারুদ এবং ক্ষেপণাস্ত্র। অন্য দু’টি বড়ো ঢাকা গাড়িতে কী রয়েছে তা সুলতানচুক, বোকা তেমুর, বাইজু নয়ান আর বেদুইন ছাড়া কেউ জানে না। এমনকী সম্রাজ্ঞীও জানেন না। তিনি অবশ্য জায়গাও পাননি এই দলে। হালাকুর অন্তিম ইচ্ছা বহনকারী চার জন ছাড়া এই দলে আছে চার জন ঘোড়ার গাড়ি চালক, মাত্র দু’জন বিশ্বস্ত মোঙ্গোল সৈন্য আর জেনারেল জুয়ো কান।
যারিনেহ নদীর ধার দিয়ে দলটি এগিয়ে চলল পূর্ব আজারবাইজানের দিকে। তাদের গন্তব্য উর্মিয়া হ্রদ। কুন্দ-ই-শাহান্দ আর মিশুদাঘি পাহাড়ের মাঝে মাঝে কয়েকটি ছোটো ছোটো গ্রাম। বুরাচালু, কিবচাঘ, তেইমুরলু, বাহরামাবাদ, কামিচি। তার পরে এক বিস্তীর্ণ জনমানবহীন উপত্যকা। সেই উপত্যকার মাঝেই উর্মিয়া হ্রদ।
একটা গোটা দিন পরে হ্রদের পাড়ে এসে পৌঁছোল দলটা। আসার পথে বুরাচালু গ্রাম থেকে তিনটে নৌকা সংগ্রহ করেছে তারা। ঘোড়ার গাড়িতে থাকা মানুষ প্রমাণ বড়ো বড়ো বাক্সগুলো ধরাধরি করে নৌকায় তুলে ফেলা হল। নৌকা ভেসে পড়ল হ্রদের জলে। হ্রদের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা দ্বীপে এসে নোঙর ফেলল নৌকাগুলো। কিছু পাথুরে ঢিবি আর গাছগাছালি ছাড়া কিছুই নেই এই দ্বীপে। এই দ্বীপেই যে সমাধি হবে সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল সুলতানচুকরা। হালাকুর মৃত্যুর ঠিক পরে পরেই একটা গোপন বৈঠকে বসেছিল শেষ ইচ্ছা বহনকারী চার জনের মধ্যে। সুলতানচুক বেদুইনকে প্রশ্ন করেছিল, ‘খাঁ যা বলে গেলেন সেটা সম্ভব?’
বেদুইন বলেছিল, ‘সম্ভব। কিন্তু তার জন্য আমাকে এক কঠিন আচার পালন করতে হবে।’
বাইজু নয়ান বলেছিল, ‘কবে আবার জন্মাবেন হালাকু খাঁ? আমরা দেখে যেতে পারব?’
নয়ানের অর্বাচীনতায় হেসে ফেলেছিল বৃদ্ধ বেদুইন। বলেছিল, ‘পরজন্ম একটা দৈব বিষয়। নশ্বর দেহ থেকে আত্মা মুক্তি পাওয়ার পরে সে কিছু বছর তার পরিজনদের আশপাশেই ঘুরে বেড়ায়। যত দিন প্রিয়জনদের মধ্যে শোকের প্রাবল্য থাকে তত দিন আত্মা তাদের সঙ্গেই থাকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শোক স্তিমিত হয়ে আসে। মৃত ব্যক্তির অনুপস্থিতি আর প্রতিদিনের কাজে প্রভাব ফেলে না। তখন পূর্বজন্মের ফল অনুযায়ী আত্মা স্বর্গে বা নরকে যায়। আর কিছু আত্মার পরজন্ম হয়। তার মধ্যে বেশিরভাগ আত্মাই যখন নতুন দেহতে যায় তখন পূর্বজন্মের কিছুই তার মনে থাকে না। দশ কোটিতে একটি মাত্র আত্মা সেই শক্তি প্রাপ্ত হয় যাতে তার মধ্যে পূর্বজন্মের কিছু স্মৃতি থেকে যায়। এদের বলে জাতিস্মর। এ বার কোন কোন আত্মার পরজন্ম হবে এবং তার মধ্যে কোনগুলো জাতিস্মর হবে সেটা সম্পূর্ণ দৈবী নির্বাচন। তা হলে বুঝতে পারছ আমার কাজটা কতটা কঠিন? প্রথমেই খাঁ-র আত্মাকে এই দৈবী নির্বাচনের আওতার বাইরে আনতে হবে। জোর করে তাঁর পরিজনদের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনে বন্দি করতে হবে। যত দিন না উপযুক্ত নতুন দেহটি এই পৃথিবীতে আসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে তত দিন বন্দি রাখতে হবে। আত্মা চাইবে মুক্তি পেতে কিন্তু তাকে মুক্তি পেতে দিলে চলবে না। তাকে পাহারা দিতে হবে আর ঠিক সময়ে মুক্তি দিতে হবে যাতে আত্মাটি নতুন দেহে প্রবেশ করতে পারে। হালাকু খাঁ-র মৃত্যুর সময়ে গ্রহ-নক্ষত্রের যে অবস্থান ছিল ঠিক সেই গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানে যে জাতক পৃথিবীতে আসবে একমাত্র সেই এই আত্মার আধার হবে। হালাকু খাঁ-র ফিরে আসতে সময় লাগবে।’
‘কত সময়,’ প্রশ্ন করেছিল বোকা তেমুর।
ম্লান হেসে বেদুইন বলেছিল, ‘আমি ইতিমধ্যেই হিসেব করে নিয়েছি। খাঁ-র মৃত্যুকালীন গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের হুবহু পুনরাবৃত্তি হবে সাতশো বছর পরে ৮ ফেব্রুয়ারি। আর এই সাতশো বছর ধরে খাঁ-র আত্মাকে পাহারা দেওয়ার জন্য আরও সাতটা আত্মার দরকার পড়বে।’
অবাক হয়ে সুলতানচুক বলেছিল, ‘সেটা কোথায় পাব?’
শীতল গলায় বেদুইন বলেছিল, ‘নরবলি দিতে হবে।’
প্রথমেই একটা বড়ো বাক্স থেকে সাতটি অপরূপা সুন্দরী মেয়েকে বার করে মাটিতে শুইয়ে দেওয়া হল। কড়া মাদকের প্রভাবে তারা অচেতন। এর পরে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ভেঙে ফেলা হল একটা পাথুরে ঢিবির কিছুটা অংশ। এই জন্যই জেনারেল জুয়ো কানকে নিয়ে আসা হয়েছিল। অবশেষে শুরু হল আসল আচার।
সবাইকে অনেকটা দূরে একটা গুহার মধ্যে পাঠিয়ে দিল বেদুইন। বলে দিল, সে না ডাকা অবধি কেউ যেন বাইরে না আসে। কিন্তু কৌতূহল দমন করতে পারল না সুলতানচুক। গুহা থেকে মাথা বার করে দেখল, মাটিতে নরকরোটি দিয়ে বৃত্ত রচনা করে তার মধ্যে আগুন জ্বেলে দিল বেদুইন। বিচিত্র উচ্চারণে মন্ত্র পড়তে পড়তে সে নাচতে শুরু করল আগুনকে ঘিরে। অদ্ভুত সেই মন্ত্রের সুর, আরও অদ্ভুত তার নৃত্যভঙ্গি। ধীরে ধীরে ঘন মেঘে ঢেকে গেল আকাশ। উতল হয়ে উঠল হ্রদের জল। আশ্চর্যরকম শীতল হয়ে উঠল বাতাস। হিমের সুচ ফোটাতে লাগল চামড়ায়। বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করল। সুলতানচুক অবাক হয়ে দেখল, বিদ্যুতের শিখাগুলির মধ্যে একটির রং আলাদা। কিছুটা উজ্জ্বল কমলা। মাঝে মাঝে সেটি ঝলসে উঠছে আবার পরক্ষণেই হারিয়ে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। বেদুইনের নজর যেন ওই শিখাটির দিকেই। সে একটি তামার কলস তুলে ধরল আকাশপানে। তার পরে দুর্বোধ্য ভাষায় চিৎকার করতে শুরু করল। যেন ওই শিখাটিকে ধমক দিয়ে ডাকছে। ধীরে ধীরে শিখাটির ছটফটানি কমে এল। আকাশের এক পাশে স্থির হল আর আচমকাই ধেয়ে এসে কলসের মধ্যে প্রবেশ করল। দ্রুত হাতে কলসের ঢাকনা বন্ধ করে দিল বেদুইন। কিছুক্ষণ পরে ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হয়ে এল। শান্ত হয়ে এল হ্রদের জল।
বেদুইনের ডাকে সবাই বেরিয়ে এল গুহার বাইরে। আগেই ভেঙে দেওয়া ঢিবির ভেতরে যে একটা বড়ো গর্ত তৈরি হয়েছিল সেখানে কলসটি স্থাপন করা হল। অন্য যে একটি বাক্স আনা হয়েছিল সেখান থেকে বার করা হল রাশি রাশি সোনার বাট। আকারে এগুলো মাথার বালিশের সমান। সেগুলোও রাখা হল ভেতরে তার পরে সাতটি অচেতন মেয়েকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছে একটি কাগজে লিখে আনা হয়েছিল। সেটি আর বেদুইনের কিছু নির্দেশ লেখা একটি কাগজ একসঙ্গে রাখা হল একটি স্বর্ণপেটিকার মধ্যে। অবশেষে বাইরে থেকে গর্তের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হল। হালাকু খাঁ-র মরদেহটি ভাসিয়ে দেওয়া হল উর্মিয়া হ্রদের জলে। বেদুইন বলল, ‘আমি মন্ত্র দিয়ে বন্ধন করে দিয়েছি খাঁ-র সমাধি। পরজন্মে হালাকু খাঁ স্বয়ং এই সমাধি উদ্ধার করবেন। তার আগে কেউ এই সমাধির সন্ধান পাবে না। আগামী সাতশো বছর ওই সাতটি মেয়ের আত্মা খাঁ-র আত্মাকে পাহারা দেবে। নির্দিষ্ট সময়ে খাঁ-র আত্মা মুক্তি পেয়ে নতুন দেহে প্রবেশ করবে।’
নৌকাগুলো ফের ভেসে পড়ল হ্রদের জলে। নৌকায় দাঁড়িয়ে সুলতানচুক দেখল, একটু আগে আলোয় ঝলমল করা দ্বীপটা কেমন এক অকাল কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে। সকলে ফিরে চলল ঘরের পানে, শুধু ভয়াবহ এক অন্তিম ইচ্ছে আঁকড়ে ধরে মুক্তির দিন গোনা শুরু করল হালাকু খাঁ-র আত্মা।
* * *
ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ (হালাকু খাঁ-র মৃত্যুর ৭২২ বছর পর)
ইরানে আসার পর থেকেই অস্বস্তিটা বেড়েছিল। মাথা যন্ত্রণাটা কিছুতেই ছাড়ছিল না। ছোটো থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া যে ছবিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেগুলো ঘন ঘন আসতে শুরু করেছিল। ঘুম আসছিল না আর এলেও নানারকম স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল।
অস্বস্তিটা মারাত্মক হয়ে উঠল উর্মিয়া হ্রদে এসে। মাথায় এমন যন্ত্রণা শুরু হল যে চোখ খুলে রাখতে পারছে না ছেলেটা। তার সঙ্গে অদ্ভুত একটা শিরশিরানি শুরু হয়েছে কাঁধের ক্ষতটায়। সে বুঝল, ঠিক জায়গাতেই এসেছে। সেই কবে থেকে এই জায়গাটাই তাকে নিশির মতো ডাকছে।
ছেলেটার জন্ম হয়েছিল ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৫। মায়ের কাছে শুনেছিল, জন্মের সময় তার কাঁধে বিরাট এক ক্ষত ছিল। ডাক্তাররা দেখে অবাক হয়ে বলেছিল, ‘ছেলেটা যেন যুদ্ধ করে এল! তলোয়ারের আঘাত ছাড়া এমন ক্ষত সচরাচর হয় না!’
সে জন্মেছিল প্রবল জ্বর নিয়ে। টেম্পারেচর ছিল প্রায় ১০৭ ডিগ্রি। সবাই ভেবেছিল, বাচ্চাটা বাঁচবে না। কিন্তু এক দিন হঠাৎ করেই জ্বর নেমে গেল। কাঁধের ক্ষতটা শুকোতে শুরু করল। তবে যত বয়স বাড়ল ছেলেটা বুঝল, বাইরে থেকে ক্ষতটা শুকিয়ে এলেও ভেতরে ভেতরে সেটা খুব জ্যান্ত। সারাক্ষণ শিরশির করে। কী যেন একটা বলতে চায় তাকে।
আচমকা চোখের সামনে ভেসে ওঠা ছবিগুলোর প্রথমটা সে দেখেছিল তার পাঁচ বছরের জন্মদিনে। প্রথম বার। এক ঝলকের জন্য। সে দেখেছিল, হাতে অদ্ভুত দেখতে একটা লাঠি নিয়ে একটা লোক সিংহাসনে বসে আছে। লাঠিটার মাথায় একটা উজ্জ্বল নীল রঙের পাথর। কয়েক জন লোকটাকে ঘিরে আছে। সবাই তাকে খাঁ বলে ডাকছে।
প্রথম দিকে দু’মাসে এক বার, তিন মাসে এক বার এমন ভাবে ছবিটা ভেসে উঠত চোখের সামনে। তার পরে ব্যাপারটা বাড়তে শুরু করল। বাড়তে লাগল ছবির সংখ্যাও। নানা রকমের দৃশ্য। সিনেমার মতো। সব ছবিতেই ওই লোকটা। সে কখনো যুদ্ধ করছে, কখনো খাচ্ছে, কখনো ওই নীল পাথরটাকে আদর করছে। প্রথম-প্রথম ভয় লাগলেও পরে ব্যাপারটা ভালো লাগতে শুরু করেছিল। লোকটার নামও জানতে পেরেছিল সে, হালাকু খাঁ।
পড়ে ফেলেছিল হালাকু খাঁ-কে নিয়ে লেখা নানা বইপত্র, জার্নাল। যত পড়ত রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠত ছেলেটার। কেউ কোত্থাও লোকটার নামে একটাও ভালো কথা লেখেনি! এমনকী মোঙ্গোলদের ইতিহাসেও হালাকু খাঁ ঘৃণিত একটা নাম। এত করল লোকটা তাও কেউ দাম দিল না! ছেলেটা বড়ো একাত্ম বোধ করত লোকটার সঙ্গে। এই সব কিছু বা চোখের সামনে ছবি ভেসে ওঠার ব্যাপারটা কাউকে বলত না সে। এটা ছিল তার একান্ত ব্যক্তিগত।
বয়স যত বাড়ছিল ছেলেটা বুঝতে পারছিল, হালাকু খাঁ তার নিয়তি। লোকটা তাকে ডাকছে। আর এই ব্যাপারটা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন নতুন আরও কিছু ছবি দেখতে শুরু করেছিল সে। সে দেখতে পেত, হালাকু খাঁ মৃত্যুশয্যায়। দেখতে পেত, হালাকু খাঁ-র মরদেহ নিয়ে একটা দল নৌকা করে একটা বিশাল জলাশয়ের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। জলাশয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে পেলিক্যান, ফ্লেমিঙ্গোর দল। নৌকাগুলো এসে থামছে একটা জনমানবহীন দ্বীপে। সে বুঝতে পারত, তাকে ওই দ্বীপটায় যেতে হবে। কিন্তু কোথায় সেই জলাশয়? কোথায় সেই দ্বীপ? তবে এটুকু সে জানত, এক দিন-না-এক দিন সে ঠিক ওই জলাশয়ের সন্ধান পাবে। সন্ধান নিজে এসে ধরা দেবে তার কাছে। কারণ এত দিন ধরে দেখা ছবিগুলো আসলে তাকে একটা গল্প বলে, একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চায়।
জলাশয়টার খোঁজ পেয়েছিল সে একুশ বছরের জন্মদিনে। এক বন্ধু উপহার দিয়েছিল একটা বড়ো বাঁধানো ছবি। অবিকল চোখের সামনে ভেসে ওঠা ছবির মতো। বিশাল জলাশয়। দিগন্তে সূর্য ডুবছে। জলে ভাসছে ফ্লেমিঙ্গো আর পেলিক্যানের দল। নীচে লেখা, উর্মিয়া লেক, ইস্ট আজারবাইজান প্রভিন্স, ইরান।
তার পরে আরও একটা বছর সময় লেগে গেল টাকাপয়সা জোগাড় করে, ভিসা জোগাড় করে ইরানে আসতে। এত দিনে সে জেনে গেছে, এই উর্মিয়া হ্রদে অবস্থিত শাহি দ্বীপেই হালাকু খাঁ-র সমাধি। বহু বছর ধরে বহু অভিযাত্রী সেই সমাধি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু আজ অবধি কেউ খুঁজে পায়নি।
খুবই প্রত্যয়ের সঙ্গে একটা মোটর লাগানো নৌকায় চড়ে বসল সে। নৌকাটা সে তিন দিনের জন্য ভাড়া নিয়েছে। সে খোঁজ নিয়েছে, হালাকু খাঁ-র সমাধি খোঁজা অনেক দিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ওই দ্বীপে কোনও ট্যুরিস্টও যায় না। কারণ দ্বীপটায় দেখার মতো কিছু নেই আর সারাক্ষণ অদ্ভুত বিচ্ছিরি কুয়াশায় ঢাকা থাকে।
ঘণ্টা দুয়েক লাগল দ্বীপটায় পৌঁছোতে। শাহি দ্বীপ যে তাকে স্বাগত জানাচ্ছে সেটা বেশ খানিকটা দূর থেকেই আন্দাজ পেয়েছিল ছেলেটা। কারণ কোথাও কোনও কুয়াশা নেই। সকালের রোদে ঝলমল করছে দ্বীপটা। দ্বীপের মাটিতে পা দিয়েই অদ্ভুত একটা কাণ্ড হল। এতক্ষণ ধরে যে তীব্র মাথা যন্ত্রণা ছিল সেটা নিমেষে গায়েব হয়ে গেল। একটা ছটফটে ফূর্তির ভাব ছড়িয়ে পড়ল মন জুড়ে। বহু দিন প্রবাস যাপনের পরে ঘরে ফিরলে যেমন আনন্দ হয় তেমন একটা উচ্ছ্বাস জাপটে ধরল তাকে। তখনই ধূসর রঙের বড়ো একটা কাক এসে বসল গাছের ডালে। কা-কা করে কয়েক বার ডাকল। তার পরে উড়ে গিয়ে কিছু দূরে আর একটা গাছের ডালে বসল। ছেলেটার মাথার মধ্যে অদৃশ্য কেউ একটা বলে উঠল, ‘ওর সঙ্গে যাও। ও তোমাকে পথ দেখাচ্ছে।’
কাকটার পিছু পিছু চলতে শুরু করল সে। গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে, ছোটো ছোটো পাথুরে ঢিবি পেরিয়ে কাকটা উড়ে চলল। এ ভাবে কিছুক্ষণ হাঁটার পরে ছেলেটা এসে দাঁড়াল একটা বেশ বড়ো ঢিবির সামনে। কাকটা উড়ে গিয়ে ঢিবিটার মাথায় বসল। বসেই রইল। ছেলেটা বুঝল, এই সেই জায়গা। যার জন্য তার এই ২২ বছরের প্রতীক্ষা। আসলে তখনও সে জানত না, এই প্রতীক্ষা আসলে সাত শতাব্দী প্রাচীন।
বড়ো বড়ো গাছ চার পাশে। হাঁটু সমান ঘাসে ঢেকে আছে চার পাশ। বোঝা যায়, বহু বছর এখানে মানুষের পা পড়েনি। ঢিবির সামনের দিকটা মসৃণ নয়। ভাঙা ভাঙা। দেখে মনে হয়, অনেক কাল আগে এখানে পাথর ভাঙা হয়েছিল। কৃত্রিম ফাটল তৈরি করা হয়েছিল। পরে ভাঙাচোরা পাথর জুড়ে জুড়ে ফাটল বন্ধ করা হয়েছে। নির্নিমেষে ঢিবিটার দিকে তাকিয়ে রইল সে, কী আছে এই ঢিবির মধ্যে? এই পাথুরে প্রাচীরের অন্তরালে? যা তাকে টেনে নিয়ে এল এখানে? এই কি তবে হালাকু খাঁ-র সমাধি? মাথার মধ্যে সেই অদৃশ্য কণ্ঠ বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, এই সেই সমাধি যা সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। ঢিবির নীচের বড়ো পাথরটা সরিয়ে ফেলো।’
এই বার থমকে গেল সে। এমন কিছু করতে হতে পারে সে তো ভাবেনি। পাথর সরানোর কোনও সরঞ্জাম তো নেই তার কাছে। হতাশ হয়ে গেল। কিন্তু উপায় কী? ফিরে গিয়ে আগামী কাল আবার আসবে মনস্থির করে সবে দু’পা এগিয়েছে আবার অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। আচমকাই কেঁপে উঠল দ্বীপের মাটি। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল সে। নিজেকে সামলাতে সামলাতেই হুড়মুড় করে একটা শব্দ পেয়ে পেছনে তাকাতে অবাক হয়ে দেখল, জমাট বেঁধে থাকা পাথরগুলো খুলে ছড়িয়ে পড়েছে আর ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা প্রশস্ত গর্ত। আলো পেয়ে নড়েচড়ে উঠছে তাতে জমাট বেঁধে থাকা বহু বছরের অন্ধকার। তার মধ্যে থেকে উঠে আসছে অতৃপ্ত এক শীতলতা।
সে বুঝল, নিয়তি চায় সে ওই শীতলতায় অবগাহন করুক। সেই জন্যই এত বছর কেউ এই সমাধি খুঁজে পায়নি। নেহাত ঢিবি জড় বস্তু, চলাফেরা করতে পারে না, নয়তো তাকে টেনে আনত না, নিজেই চলে যেত তার কাছে।
উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে সে পা বাড়াল আলো-আঁধারিতে ঘেরা ইতিহাসের দিকে। অলৌকিকের দিকে।
* * *
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
চোখ বুজলেই আজও সেই দিনটা দেখতে পান মুস্তাফা। কবেকার কথা! তখন তাঁর মাত্র বাইশ বছর বয়স। তার পরে টাইগ্রিস দিয়ে কত জল গড়িয়েছে। আইসিসের উত্থান হয়েছে। পতন হয়েছে। আবার নতুন করে আইসিস মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। নতুন ঘটনা পলি ফেলেছে পুরোনো ঘটনায়। কত গুরুত্বপূর্ণ কথা আজ ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু সেই দিনের স্মৃতি আজও অমলিন, উজ্জ্বলতম। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত দিনটা তিনি ভুলতে পারবেন না। গভীর রাতে রবাব শুনতে শুনতে আজ আবারও চোখ বুজলেন তিনি।
সেই প্রশস্ত গর্তটার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন থরে থরে সাজানো সোনার বাট, কাত হয়ে পড়ে থাকা ঢাকনা খোলা একটা তামার কলসী, সোনা দিয়ে তৈরি একটা ছোটো বাক্স আর সাতটা নরকঙ্কাল।
গর্তের মধ্যে প্রবেশ করা মাত্র হিমশীতল এক নীরবতা তাঁকে গ্রাস করেছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংরক্ষিত অতৃপ্ত বাসনা হাহাকারের মতো আছড়ে পড়েছিল তাঁর চেতনা জুড়ে। তাঁর চৈতন্যের মধ্যে যেন এক বিস্ফোরণ হয়েছিল। দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি তিনি। পড়ে গিয়েছিলেন আর চোখের সামনে ভেসে উঠতে শুরু করেছিল একের পরে এক দৃশ্য। এত বছর ধরে ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে যে ঘটনাগুলো দেখতেন সে দিন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেছিল সবটা। সব মনে পড়ে গেছিল। এমনকী মৃত্যুকালীন অসহায়তা, ক্রোধ আর অন্তিম ইচ্ছেটাও। বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর এত দিনের পরিচয় মিথ্যে। তিনি আসলে হালাকু খাঁ। ফিরে এসেছেন প্রতিশোধ নিতে।
ছোটো বাক্সটার মধ্যে দুটো কাগজ ছিল। প্রথম কাগজটা খুলে মেলে ধরেছিলেন চোখের সামনে। তাতে লেখা ছিল,
‘মহামহিম, আপনাকে স্বাগত। অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করতে হালাকু খাঁ-র আত্মা নতুন দেহ ধারণ করবে। তিনি আবার জন্ম নেবেন এই দুনিয়ায়। আমি সেই ব্যবস্থাই করে যাচ্ছি।
‘একমাত্র তিনিই এই সমাধি খুঁজে পাবেন। তিনি আসার আগে অবধি আত্মারা এই সমাধি পাহারা দেবে এবং তাঁকে এই সমাধি অবধি পৌঁছে দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর থাকবে। আমি সেই ব্যবস্থাই করে যাচ্ছি।
‘নতুন হালাকু খাঁ-র জন্ম হবে আজ থেকে সাতশো বছর পর। তাঁর বাইশ বছর বয়সে তিনি এই সমাধিতে আসবেন এবং জীবনের অর্থ খুঁজে পাবেন। হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রয়োজন হবে দেবী ইনান্নার দণ্ড। খাঁ যা করতে চাইছেন তা ওই মহাশক্তিধর আয়ুধ ছাড়া সম্ভব নয়। নতুন হালাকু খাঁ তাঁর ষাট বছর বয়সের জন্মমাসে দেবীর দণ্ডের সন্ধান পাবেন। আমি সেই ব্যবস্থাই করে যাচ্ছি।
‘সারাজীবন ধরে গ্রহ-নক্ষত্রেরা একটু-একটু করে তাঁকে তাঁর অভীষ্টের দিকে এগিয়ে দেবে। তিনি নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন করবেন। হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছার সারবত্তা ও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবেন। আমি সেই ব্যবস্থাই করে যাচ্ছি।
‘নদ-নদীর দেশ থেকে দু’জন মানুষ আসবে। তারা সাহায্য করবে দেবীর দণ্ড খুঁজে পেতে আবার তারাই সবচেয়ে বড়ো বাধা হবে। এক মহাসাধকের হাতে নরকের দরজা খুলবে। এই ব্যবস্থা আমি করে যাচ্ছি না। এ আমি গণনায় দেখছি। এ পূর্বনির্ধারিত।’
৯ ফেব্রুয়ারি, ১২৬৫
শাহি দ্বীপ, উর্মিয়া হ্রদ।’
আজ তিনি বোঝেন সমাধিতে পাওয়া ওই লেখার প্রতিটা কথা সত্যি। সত্যিই সে দিনের পর থেকে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছেন। লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছেন। একটু-একটু করে অভীষ্টের দিকে এগিয়ে গেছেন। যত দিন গেছে হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছার গুরুত্ব এবং ব্যাপকতা বুঝতে পেরেছেন। সেই মতো অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। পাগলের মতো খুঁজে বেড়িয়েছেন দেবী ইনান্নার দণ্ড। তার ফলও পেয়েছেন। নয়তো গিয়াসুদ্দিনের ডায়েরি তাঁর হাতে আসবে কেন? সবটাই পূর্বনির্ধারিত। তাই এটাও বিশ্বাস করেন খুব শিগগির দেবী ইনান্নার দণ্ড তাঁর হাতে আসবে এবং যে ইচ্ছা পূরণের জন্য তিনি সাতশো বছর পরে আবার জন্ম নিয়েছেন সেটা সম্পন্ন হবে। ইচ্ছাটির কথা আবার মনে করেন মুস্তাফা। তাঁর রক্ত গরম হয়ে ওঠে। আহ! প্ৰতিশোধ যদি নিতে হয় তো এমন। যার ফল ভোগ করবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ঘৃণা প্রবাহিত হবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।
এবার শুধু দেবী ইনান্নার দণ্ডের সন্ধান পাওয়ার অপেক্ষা।
