লাপিস লাজুলি – ১৮
॥ আঠেরো ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
কাগজটা হাতে নিয়ে বসে আছেন ভাদুড়িমশায় কিন্তু মন দিতে পারছেন না। গিয়াসুদ্দিন আল তুসির সূত্র। অপালা ছবি তুলে পাঠিয়েছে। বলেছে, ‘আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করছি। তুমিও একটু দেখো দাদু।’
মনটা ভালো নেই ভাদুড়িমশায়ের। রোশনির সঙ্গে তো যোগাযোগ করতে পারছেনই না, অতি কষ্টে পল্লবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন আজ ভোররাতের দিকে। পল্লব কাঁদছিল। ওরা খুব মেরেছে পল্লবকে। উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই তার। সমীরণ বার বার বলেছিলেন, ‘ও কোথায় আছে একবার শুধু জেনে নিন স্যার, তার পরে যে করে হোক আমি ওকে বার করে আনব।’
কিন্তু পল্লব কিছু বলতে পারেনি। প্রথমত জঙ্গিদের লোকাল ডায়লেক্ট সে বোঝে না, আর ওরা যতটুকু ইংরেজিতে কথা বলে সেখানে ক্যাম্পটা কোথায় সেটা উল্লেখ করে না। কাঁদতে কাঁদতে পল্লব বলছিল, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার। আপনার কথা না শুনে আমি ভুল করেছি। তিতাসকে উদ্ধারে কোনও সাহায্য তো করতে পারলামই না, উলটে আপনার বোঝা হয়ে গেলাম। ওরা আমার এক বন্ধুকে মেরে ফেলেছে। বাকি যারা সঙ্গে ছিল তাদের সঙ্গে কী করেছে আমি জানি না। আমি শুধু পড়ে আছি একটা তাঁবুর মধ্যে। আমি আর বাঁচব না স্যার। আপনি তিতাসকে ফিরিয়ে আনবেন কথা দিন।’
চোখে জল এসে গেছিল ভাদুড়িমশায়ের। তিতাসের প্রতি পল্লবের ভালোবাসার গভীরতা অনুভব করে তলতলে হয়ে গিয়েছিল তাঁর মনটাও। নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ না তুমি ক্যাম্পের অবস্থান জানতে পারছ ততক্ষণ অবধি আমরা তোমায় কোনও সাহায্য করতে পারব না পল্লব। তবে আমার পরামর্শ, তুমি আপাতত ওদের সঙ্গে সহযোগিতা করো। ওরা তোমায় যা বলছে, তা যদি তোমার এথিকস বিরুদ্ধ হয়, তাও করো। কারণ তোমার বেঁচে থাকাটা দরকার। তিতাসকে ফিরিয়ে আনার জন্য তোমার বেঁচে থাকাটা দরকার। বুঝতে পেরেছ? আর কোনও হঠকারিতা করবে না তুমি। আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগে থাকব। ভয় নেই পল্লব। কিচ্ছু হবে না তোমার।’
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। সমীরণ বলেছিলেন, ‘স্যার আপনি একটু ঘুমিয়ে নিন।
চেষ্টা করেছিলেন ঘুমোনোর। কিন্তু ঘুম আসেনি। কিছুক্ষণ বিছানায় ছটফট করে উঠে পড়েছেন ভাদুড়িমশায়। মুখে-চোখে জল দিয়ে এসে বসেছেন লাইব্রেরি ঘরের জানলাটার পাশে। এই জানলা দিয়ে বাগানটা দেখা যায়। যখন বারাসাতের এই জমিটা কিনেছিলেন তখনই কয়েকটা আম, কাঁঠাল, কৃষ্ণচূড়া, ছাতিমের চারা বসিয়েছিল স্ত্রী নিবেদিতা। নিবেদিতা আজ নেই কিন্তু তার লাগানো গাছ আর গাছের ছায়া রয়ে গিয়েছে। আজ এই অস্থির সময়ে বার বার নিবেদিতার কথা মনে পড়ছে। গুরু রামদাস ঠাকুরের পরে ওই একটা মানুষ ছিল, যার কাছে আশ্রয় পেতেন ভাদুড়িমশায়। রামদাস ঠাকুর চলে যাওয়ার পরে তো নিবেদিতার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কত কঠিন সময়ে নিবেদিতার কোলে শুয়ে পড়েছেন। প্রশ্ন করেছেন, ‘এ বার কী করব নিবেদিতা?’
মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভরসা দিয়েছে নিবেদিতা। হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে ভালোবাসায়। আজ যেন আবারও সেই ভালোবাসাটুকুর অভাব বোধ করলেন ভাদুড়িমশায়। তাঁর চারপাশে কি মানুষ কম? মোটেই না। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে। ভালোবাসে। কিন্তু সেই আশ্চর্য রঙিন প্রজাপতির মতো, সকালবেলার নরম রোদের মতো, হেমন্তের সন্ধ্যার হিম হিম কুয়াশার মতো, শীতের নির্মেঘ আকাশে চাঁদের আলোর মতো, বন্যার সর্বগ্রাসী জলস্রোতের মতো ভালোবাসাটা আর নেই। ভালোবাসার হাজার রকমফের। কিন্তু তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ নর-নারীর প্রেমজ ভালোবাসা। তার মতো উদ্দাম আবার তার মতো গভীর আর কিচ্ছু হয় না। আর নর-নারীর প্রেম যখন প্রতিদিনের ছোটো ছোটো চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে যায়, শরীরের টানকে অতিক্রম করে চিরকালীন হয়ে যায় তখন তাকে বলে লীলা। লীলা সবাই করতে পারে না। শ্রী শ্রী চৈতন্যচরিতামৃতে বলা আছে, লীলা সাধারণ মানুষের কম্ম নয়। প্রেম লীলার পর্যায়ে উপনীত হতে চাইলে তাকে তিনটে শর্ত পালন করতে হয়। অনায়াস, অকারণ আর অপূর্ব। যে প্রেম এই তিন শর্ত পালন করে সেই প্রেমই লীলা। যেমন রাধা আর কৃষ্ণের প্রেম।
এই বুড়ো বয়সে এসে ভাবলে একটু লজ্জা করে ঠিকই কিন্তু তাঁর মনে হত তাঁর আর নিবেদিতার প্রেমটা লীলার থেকে কম কিছু ছিল না। একটা সময় তো ভেবেছিলেন বিয়েই করবেন না। রামদাস ঠাকুরের নাম প্রচার করেই জীবন কাটিয়ে দেবেন। ঠাকুরকে বলেছিলেন সে কথা। শুনেই হাঁ-হাঁ করে উঠেছিলেন ঠাকুর, ‘খবরদার না নীরেন। ওইসব পাগলামি বুদ্ধি একদম মাথায় আনবি না। সন্ন্যিসির জীবন তোর জন্য নয়। তোরে সংসারে থাকতে হবে বাপ। অনেক দায়দায়িত্ব নিতি হবে। তুই হলি অবধূত। যে সংসারে থেকেও বৈরাগী। অবশ্য তোরে যে-সে মেয়ের সঙ্গে বে দিলি হবে না। তোরে সবাই বুজতে পারবে না। তোর জন্য মেয়ে আমি খুঁজে দোব ঠিক।’
সত্যি কথা বলতে পরোক্ষে তাঁর বিয়ের ঘটকালি করেছিলেন রামদাস ঠাকুরই। ঘটনাটা ঘটার পরে ভাদুড়িমশায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি ইচ্ছে করেই আমায় ওখানে পাঠিয়েছিলেন তাই না?’
উত্তরে শুধু ফিক ফিক করে হেসেছিলেন ঠাকুর।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভাদুড়িমশায়। মন অশান্ত থাকলেই পুরোনো কথা মনে পড়ে। পল্লবের কান্নাটা আসলে তাঁকে খুব দুর্বল করে ফেলেছে। মাথাটা এক বার ঝাড়া দিলেন তিনি। নাহ, এখন এ সব ভাবলে হবে না। অপালা যে কাজটা দিয়েছে সেটা করতে হবে। দেখা যাক ওদের কোনও সাহায্য করতে পারেন কি না। এত দ্রুত যে দেবীর দণ্ড সম্পর্কে এত বড়ো একটা সূত্র পাওয়া যাবে এ তিনিও ভাবেননি। এটা তো যথেষ্ট ইতিবাচক একটা সংকেত। বিপদের মধ্যে থেকেই বিপত্তারণ উঁকি দেবেন। শুধু লেগে-পড়ে থাকতে হবে। তা হলেই অলৌকিক হবে। কাগজটায় মন দিলেন তিনি। তিনি আরবি অল্পবিস্তর জানেন তাও অপালা অনুবাদ করে লিখে পাঠিয়েছে।
‘একদম ওপরে লেখা আছে হালাকু খাঁ। তার পরে এক-এক করে হালাকু খাঁ সম্পর্কে ন’টা শব্দ। প্রথমে ‘হিরচুন’ অর্থাৎ লোভী। দু’নম্বরে ‘গোনাহগার ‘ অর্থাৎ পাপী। তিন নম্বরে ‘ঘেইউর’ অর্থাৎ ঈর্ষাকাতর। চার নম্বরে ‘মুতাতিশুন লিলদিমা’ অর্থাৎ রক্তপিপাসু। পাঁচ নম্বরে ‘আশয়তানু’ অর্থাৎ শয়তান। ছয় নম্বরে আবার ‘ঘেইউর’। সাতে ‘আলকুইয়ামা’ অর্থাৎ সর্বনাশা। আটে ‘তামসিক’ অর্থাৎ তামসিক আর নয়ে ‘মুমিত’ অর্থাৎ মারাত্মক।’
বেশ কয়েক বার লেখাটা পড়লেন ভাদুড়িমশায়। তাকি আল তুসির বক্তব্য অনুযায়ী সমস্ত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে তিনি নিশ্চিত যে এর থেকেই পাওয়া যাবে পরের সূত্র। এটা অবশ্যই একটা কোড ল্যাঙ্গুয়েজ, সাংকেতিক ভাষা, কিন্তু কোন পথে গেলে সংকেতের মাথাটা ধরা যাবে? একটা ছিদ্র দরকার যেখান দিয়ে ঢুকতে হবে সংকেতের অন্দরে। নাহ, এ ভাবে হবে না। কাগজ, কলম নিয়ে বসতে হবে।
হালাকু খাঁ শব্দটা ছাড়া আরও ন’টা শব্দ আছে। ভাদুড়িমশায় সেগুলো ক্রমানুযায়ী লিখে ফেললেন একটা কাগজে। প্রত্যেকটায় নম্বর বসালেন:
১) ‘হিরচুন’ অর্থাৎ লোভী।
২) ‘গোনাহগার’ অর্থাৎ পাপী।
৩) ‘ঘেইউর’ অর্থাৎ ঈর্ষাকাতর।
৪) ‘মুতাতিশুন লিলদিমা’ অর্থাৎ রক্তপিপাসু।
৫) ‘আশয়তানু’ অর্থাৎ শয়তান।
৬) ‘ঘেইউর’ অর্থাৎ ঈর্ষাকাতর।
৭) ‘আলকুইয়ামা’ অর্থাৎ সর্বনাশা।
৮) ‘তামসিক’ অর্থাৎ তামসিক।
৯) ‘মুমিত’ অর্থাৎ মারাত্মক।
বেশ কয়েক বার শব্দগুলোকে এদিক-ওদিক, ওপর-নীচ করলেন কিন্তু তাতেও কোনও লাভ হল না। কিছুই বোঝা গেল না। নাহ! এমন হুড়োহুড়ি করে হবে না। গিয়াসুদ্দিন বার বার লিখে গেছেন, এই সংকেত উদ্ধারের একমাত্র চাবিকাঠি ‘বুদ্ধিমত্তা’।
বুদ্ধিমত্তা জিনিসটা কিছুটা ঈশ্বরপ্রদত্ত আর বেশিরভাগটাই আয়াসসাধ্য। নিয়মিত অভ্যাসে মানুষ তার বুদ্ধিতে শান দিতে পারে। আরও ধারাল করে তুলতে পারে ঈশ্বরপ্রদত্ত শক্তিকে। ভাদুড়িমশায় নিজেও তো বিশ্বাস করেন, ‘এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো অলৌকিক হল মানুষের বুদ্ধিমত্তা, ইনটেলিজেন্স।’ এই একটি ক্ষমতা দিয়েই ঈশ্বর মানুষকে বাকি প্রাণীজগতের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছেন। বুদ্ধিমত্তা দিয়েই মানুষ একের পরে এক অলৌকিক ঘটিয়েছে এবং সভ্যতাকে এক বিন্দু থেকে উন্নততর আর এক বিন্দুতে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আগুনকে বেঁধে ফেলেছে, চাকা আবিষ্কার করেছে, ফসল ফলাতে শিখেছে। প্রকৃতির বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রহস্যকে ভেদ করেছে। তার মন্ত্রগুপ্তিকে আপন করেছে। ভাদুড়িমশায় মনে করেন, গ্যালিলিও থেকে শুরু করে আইনস্টাইন, জগদীশ বোস অবধি প্রত্যেকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকে এক-এক জন মহাতান্ত্রিক। মন্ত্রের প্রায়োগিক দিক যদি তন্ত্র হয় তা হলে এই প্রকৃতির অন্তরে লুকিয়ে থাকা গূঢ় গোপন মন্ত্রগুলোকে তো তাঁরাই মানুষের উন্নতিকল্পে প্ৰয়োগ করেছেন। আর শুধু বিজ্ঞানীরাই নন, ভাদুড়িমশায় মনে করেন, এক জন প্রকৃত শিল্পীও আসলে এক জন তান্ত্রিক। সেখানেও প্রকৃতির খেলা। ঈশ্বর মানুষের মধ্যে দিয়েছেন নয়টি ‘ভাব’। রতি, শোক, হাস, ক্রোধ, উৎসাহ, ভয়, জুগুপ্সা, বিস্ময় ও শম। আর প্রকৃতির মধ্যে ছড়িয়ে রেখেছেন তার নানা উদ্দীপক। পণ্ডিতেরা যাকে বলেন ‘বিভাব’। মানুষের মনে এমন আরও অজস্র ভাব রয়েছে। এগুলোই মানব অনুভূতির আদিমন্ত্র। শিল্পী এই মন্ত্রগুলোকেই নিজের অন্তরে ধারণ করে তার পরে সর্বজনের অনুভববেদ্য করে সঞ্চারিত করে তার শিল্পে। তখন রস নিষ্পন্ন হয়। রতি হয় শৃঙ্গার রস, শোক হয় করুণ রস, হাস হয় হাস্য, তার পরে রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত আর শান্ত রস। মন্ত্রের প্রয়োগ সংঘটিত হয় কাব্যে, উপন্যাসে, নাটকে, চিত্রে, নৃত্যে, গীতে, বাদ্যে। সেই শিল্প যে আস্বাদন করে তার অন্তরে বেজে ওঠে অনুভূতিমালার মূর্ছনা। সৃষ্টি হয় নতুন নতুন দর্শন, নতুন নতুন বোধ। তন্ত্র শব্দটি তো ‘তন্’ ধাতু নিষ্পন্ন যার অর্থ বিস্তার। সূক্ষ্ম অনুভূতিকে বিস্তারিত করেন শিল্পী। সেই হিসেবে রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ বা সলিল চৌধুরীও মহাতান্ত্ৰিক।
একমাত্র তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী মানুষই যথার্থ শিল্পী, বিজ্ঞানী কিংবা দার্শনিক হতে পারে। গিয়াসুদ্দিনও সেই অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। এই ক্ষমতাধর মানুষগুলো কৌতুকপ্রিয় হন। সাধারণের সাধারণ বুদ্ধিমত্তাকে তাঁরা ‘টিজ’ করতে ভালোবাসেন। শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাদুড়িমশায় অনুভব করলেন, গিয়াসুদ্দিন তাঁকেও টিজ করেছেন। যেন বলছেন, ‘ওহে নীরেন ভাদুড়ি, তুমি নাকি বিরাট পণ্ডিত! তোমার চোখের সামনে সমাধান বসে রয়েছে আর তুমি তাকে চিহ্নিত করতে পারছ না! দুয়ো। দুয়ো।’
কেমন একটা রোখ চেপে গেল ভাদুড়িমশায়ের। ছেলেমানুষি জেদ। গিয়াসুদ্দিনের এই সংকেত উদ্ধার করতেই হবে আর সেটা এখনই করতে হবে। যত নষ্টের গোড়া এই মনটা। কিছুতেই শান্ত থাকছে না। নানা চিন্তা এসে ভিড় করছে। চোখ বুজে কিছুক্ষণ বসে রইলেন তিনি। মনটাকে একটা বিন্দুতে সংহত করে ফের কাগজটা তুলে নিলেন হাতে।
১) ‘হিরচুন’ অর্থাৎ লোভী।
২) ‘গোনাহগার’ অর্থাৎ পাপী।
৩) ‘ঘেইউর’ অর্থাৎ ঈর্ষাকাতর।
৪) ‘মুতাতিশুন লিলদিমা’ অর্থাৎ রক্তপিপাসু
৫) ‘আশয়তানু’ অর্থাৎ শয়তান।
৬) ‘ঘেইউর’ অর্থাৎ ঈর্ষাকাতর।
৭) ‘আলকুইয়ামা’ অর্থাৎ সর্বনাশা।
৮) ‘তামসিক’ অর্থাৎ তামসিক।
৯) ‘মুমিত’ অর্থাৎ মারাত্মক।
হালাকু খাঁ সম্পর্কে নয়টি বিশেষণ। আরবি শব্দগুলোর প্রথম অক্ষর, শেষ অক্ষর, মাঝের অক্ষর এগুলো নিয়ে যাবতীয় পারমুটেশন-কম্বিনেশন অপালা আর সঞ্জয় আগেই করে ফেলেছে। সেই পথে কোনও দিশা পাওয়া যায়নি। অন্য কোনও পথ আছে। অন্য ভাবে ভাবতে হবে। আরবি শব্দগুলোর বাংলা অনুবাদগুলোকে বার বার পড়তে লাগলেন ভাদুড়ি মশায়। দেখা যাক, এখান থেকে কোনও রাস্তা বেরোয় কি না। আচমকাই একটা শব্দে তাঁর চোখ আটকে গেল আর ঠিক তখনই বেজে উঠল ফোন। ফোন ধরতেই উত্তেজিত গলায় অপালা বলল, ‘দাদু, মনে হচ্ছে একটা দিশা পেয়েছি। গোটা সিরিজটায় একটা অড শব্দ আছে।’
প্রশান্তিতে ভরে গেল ভাদুড়িমশায়ের মনটা। তাঁর এই নাতনিটিও অতীব বুদ্ধিমতী। তিনি হেসে বললেন, ‘তুমি ফোন করার ঠিক আগের মুহূর্তে আমিও সেটাকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। তামসিক তাই তো?’
‘রাইট রাইট। অপালার গলা কাঁপছে উত্তেজনায়, একমাত্র তামসিক শব্দটার অরিজিন আরবি নয়। সত্ত্ব, তমঃ, রজোঃ এগুলো পিওর সংস্কৃত শব্দ। তাই না?’
‘ঠিক। সব ক’টা আরবির মধ্যে ওই একটাই সংস্কৃত শব্দ আছে।’
‘দাদু, ফোন ধরে থাকো। একটা পসিবিলিটি আমার মাথায় উঁকি দিচ্ছে। লেটস সলভ ইট টুগেদার।’
‘বেশ। বলো।’
‘দাদু, আমার মনে হচ্ছে গিয়াসুদ্দিন আরবিতে লিখে আসলে কনফিউজ করতে চেয়েছেন। তিনি ভেবেছেন, সূত্র খুঁজে পেলেও সবাই আরবি শব্দগুলো নিয়েই মারামারি করে মরবে কিন্তু ওর থেকে কোনও রাস্তা পাওয়া যাবে না। উনি আসলে ইঙ্গিত করছেন শব্দগুলোর সংস্কৃত অর্থের দিকে।’
অবাক গলায় সঞ্জয় বলল, ‘গিয়াসুদ্দিন সংস্কৃতও জানতেন?’
অপালা বলল, ‘সঞ্জয়, লোকটা গ্রিক থেকে পিথাগোরাস অনুবাদ করেছিল আরবিতে। লোকটা বহু ভাষাবিদ ছিল।’
‘ঠিক। গিয়াসুদ্দিন মহাপণ্ডিত,’ বললেন ভাদুড়িমশায়, ‘আরও একটা জিনিস লক্ষ করো তোমরা, তামসিক আট নম্বর বিশেষণ। আর আট কিন্তু হালাকুর মৃত্যুদিনও।’
‘তাই তো! এটা তো আমাদের চোখে পড়েনি। গিয়াসুদ্দিন এখানেও একটা হিন্ট দিয়ে গিয়েছেন। লেটস ডু ওয়ান থিং দাদু। সংস্কৃত শব্দগুলো আমরা ক্রোনোলজিক্যালি লিখে নিই।’
‘চলো।’
দ্রুত লিখে ফেললেন ভাদুড়িমশায়। ব্যাপারটা দাঁড়াল এ-রকম:
১) লোভী।
২) পাপী।
৩) ঈর্ষাকাতর।
৪) রক্তপিপাসু।
৫) শয়তান।
৬) ঈর্ষাকাতর।
৭) সর্বনাশা।
৮) তামসিক।
৯) মারাত্মক।
অপালা বলল, ‘দাদু আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে আমরা সমাধানের খুব কাছে এসে পড়েছি। ট্রাস্ট মি দাদু এটা পাওয়ার পর থেকে আমি আর সঞ্জয় দু’চোখের পাতা এক করিনি। আই অ্যাম সুপার একসাইটেড।’
ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘সেই জন্যই তুমি সমাধানের কাছে এসে পড়েছ। তিতাসের হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে আমরা সবাই বিষয়টা নিয়ে লেগে-পড়ে ছিলাম। তাই আমাদের সঙ্গে অলৌকিক হচ্ছে। যে আয়ুধ পাঁচ হাজার বছর ধরে অধরা আমরা মাত্র কয়েক দিনে তার খুব কাছে চলে এসেছি। আর একটা কথা জানবে দিদিভাই, তুমি আর সঞ্জয় যে পরিশ্রমটা করেছ তার ফল পাচ্ছি আমরা সবাই। শনিদেব হচ্ছেন কর্ম আর কর্মফলের দেবতা। তিনি কঠোর বিচারক। পরিশ্রমীকে তিনি বিমুখ করেন না।’
সঞ্জয় বলল, ‘স্যার একদম বেসিক থেকে শুরু করছি। শব্দের আদ্যাক্ষরগুলোকে পরপর সাজাচ্ছি।’
ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘বেশ। আমিও লিখছি।’
১) লোভী… লো
২) পাপী… পা
৩) ঈর্ষাকাতর… ঈ
৪) রক্তপিপাসু… র
৫) শয়তান… শ
৬) ঈর্ষাকাতর… ঈ
৭) সর্বনাশা… স
৮) তামসিক… তা
৯) মারাত্মক… মা
পাশাপাশি লিখলে দাঁড়াচ্ছে, ‘লো পা ঈ র শ ঈ স তা মা।’
অপালা বলল, ‘এটা বেসিক পাজল। প্রথমে এটাকেই পারমুটেশন -কম্বিনেশন করে দেখতে হবে। সঞ্জয় করে ফেলো।’
সঞ্জয় বলল, ‘দাঁড়াও দাঁড়াও। অত সোজা নাকি? ন’টা অক্ষর। এই দিয়ে কতগুলো কম্বিনেশন হতে পারে আইডিয়া আছে? তিন লক্ষেরও বেশি। এ ভাবে হবে না। একটা না একটা প্যাটার্ন তো থাকবে। সেটা ক্র্যাক করতে হবে।’
ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘আমার মাথায় একটা সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। বলব? ‘ ‘বলো, বলো,’ অপালা চেঁচিয়ে উঠল।
‘দেখো, আট হালাকুর মৃত্যুদিন। সেটা দিয়ে গিয়াসুদ্দিন একটা নিৰ্দেশ দিয়েছেন। এবার পরের নির্দেশটা কি জন্মমাস হতে পারে? ফেব্রুয়ারি মানে দুই? দুই নম্বর অক্ষরটা শুরুতে বসিয়ে দেখবে?
‘চলো চলো। আমরা করছি। তুমিও করো।’
আবার নতুন করে পুরোটা লিখলেন ভাদুড়িমশায়। দুই নম্বর অক্ষর ‘পা’-কে তুলে এনে শুরুতে বসালেন। তাতে ব্যাপারটা দাঁড়াল এরকম: ‘পা লো ঈ র শ ঈ স তা মা।’
আর লেখা শেষ হতে না হতেই অপালা চিৎকার করে উঠল,
‘দাদু আই গেট ইট। পেয়েছি, পেয়েছি। আমরা ক্র্যাক করে ফেলেছি। দাদু, ছয়, সাত আর আট নম্বর লেটার দেখো। দীর্ঘ ঈ, দন্ত্য স আর তা। চতুর্থ লেটার র। ঈসতার। (ইশতার) দেবী ইনান্নার পরবর্তী কালের নাম। আক্কাদিয়ানরা ইনান্নাকে এই নামেই ডাকত। তা হলে বাকি পাঁচটা লেটার কী কী পড়ে রইল আমাদের হাতে? ১) পা, ২) লো, ৩) ঈ, ৫) শ, ৯) মা। পা লো ঈ শ মা। যাহ! এটা আবার কী বলতে চাইল?’
ফোনের এ পার থেকে ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘দিদিভাই, দিদিভাই। শান্ত হও। তুমি অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েছ। আমি কিন্তু দেখতে পেয়ে গেছি।’
‘কী? দেখতে পেয়ে গেছ? বলো দাদু, প্লিজ বলো। আমি সত্যি আর একসাইটমেন্ট চেপে রাখতে পারছি না। মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে যাব।’
‘বলছি, বলছি,’ হাসলেন ভাদুড়িমশায়, আমরা একটা গণ্ডগোল করেছি। পাঁচ নম্বর শব্দ ‘আশয়তানু’-র অনুবাদ করেছি শয়তান। কিন্তু শয়তান তো সংস্কৃত শব্দ নয়। সংস্কৃতে শয়তানের প্রতিশব্দ কী হতে পারে? রাক্ষস হতে পারে তো?’
‘পারে।’
‘তা হলে শয়তানের বদলে রাক্ষসের ‘রা’ বসিয়ে দেখো পাঁচ নম্বরে। আমার মন বলছে তুমিও দেখতে পাবে।’
দ্রুত হাতে লিখল অপালা, ১) পা, ২) লো, ৩) ঈ, ৫) রা, ৯) মা। আর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কাগজটার দিকে। দাদু ঠিক বলেছে। এই তো অক্ষরগুলো নড়াচড়া করে তার চোখের মধ্যে দিয়ে মাথায় বসিয়ে দিচ্ছে একটা জায়গার নাম। ১ ২ ৯ ৩ ৫। পা লো মা ঈ রা। পালমাইরা! সিরিয়ায় অবস্থিত এক প্রাচীন শহর। মেসোপটেমিয়া অতীত গৌরবের সাক্ষ্য বহনকারী এক শহর। সে বলল, ‘তার মানে গিয়াসুদ্দিন পালমাইরার কোনও ইশতার মন্দিরের কথা বলছেন?’
থেমে থেমে ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে দিদি। সত্যি সত্যি প্রথম সূত্র ভেঙে দ্বিতীয় সূত্র অবধি পৌঁছে গেছি আমরা। তুমি এক্ষুনি তাকি সাহেবকে খবর দাও। আমি আপাতত রাখছি।’
ফোন রেখে দিলেন ভাদুড়িমশায়। এতক্ষণ মনের মধ্যে যে ভারটা ছিল সেটা অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। এত দ্রুত প্রথম সূত্রটার সমাধান করা যাবে তিনিও ভাবেননি। এগোচ্ছেন, তাঁরা একটু একটু করে তিতাসকে উদ্ধারের দিকে এগোচ্ছেন। তাঁর মন বলছে, পরের সূত্রটার সমাধানও হয়ে যাবে, শুধু মাঝে কাঁটার মতো আটকে আছে পল্লব আর রোশনি। যত দ্রুত সম্ভব ওদেরও খুঁজে বার করতে হবে। এই সব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ অন্য একটা বিষয় মাথায় আসতেই থমকে গেলেন ভাদুড়িমশায়। মস্তিষ্ক অদ্ভুত এক যন্ত্র। নানা তথ্যের মধ্যে কখন যেন সে বিসদৃশ তথ্যটিকে আলাদা করে ফেলে এবং অস্বস্তির কারণ তৈরি করে। এই মুহূর্তে ঠিক সেটাই হচ্ছে। ব্যাপারটা যত ভাবছেন তাঁর অস্বস্তি হচ্ছে। খুব খুব আবছা, প্রায় অদৃশ্য এবং অজানা কোনও এক বিপদের উপস্থিতি টের পাচ্ছে তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়।
ভুরুটা কুঁচকে গেল ভাদুড়িমশায়ের।
