কে প্রথম কাছে এসেছি – ৩
॥ তিন॥
মনটাকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছিল না নীরেন। ঠাকুরের দুই শিষ্য কিন্তু বেশ খোশমেজাজেই ছিলেন। তাঁরা প্রবেশের বাবা এবং বাড়ির অন্যান্যদের বলছিলেন, ‘ঠাকুর যখন গেছেন আর চিন্তা নেই। সব সমস্যার সমাধান হবে।’
কিন্তু যত সময় যাচ্ছিল নীরেনের চিন্তা বাড়ছিল, তার সঙ্গে মাথার ভেতরে পোকার কামড়ের মতো কুটকুট করছিল ফাদারের ঘরের মেঝেতে দেখা মুছে দেওয়া দাগটা আর ওই আয়নার ভাঙা টুকরোটা। কী যেন একটা মনে পড়ি- পড়ি করেও পড়ছিল না আর তাতেই আরও বেড়ে যাচ্ছিল অস্বস্তিটা। শেষমেশ প্রবেশের ঘরে ঢুকে এল। বলল, ‘ফাদারের ঘরে আয়রন চেস্টের মধ্যে যে দলিলপত্রগুলো ছিল আমাকে দেখাবে?’
প্রবেশ বিছানায় বসেছিল। উঠে আলমারির মধ্যে থেকে একটা বক্স ফাইল বার করে দিল, ‘সব এর মধ্যেই আছে।’
নীরেন ফাইল থেকে কাগজগুলো বার করে বিছানার ওপরে ছড়িয়ে বসল। উলটেপালটে দেখতে লাগল। প্রবেশ ঠিকই বলেছিল, বেশির ভাগই অকাজের কাগজ। সেই ১৮৬১ সালে গির্জা যখন তৈরি হয়েছিল সেই সময় থেকে এই অবধি নানা অফিসিয়াল চিঠি, দলিল, আয়-ব্যয়ের হিসেব, রেজিস্টার খাতা, কত জনের ধর্মান্তরণ হল, ক’ জন জন্মাল, কে কে মারা গেল তার বিশদ নথি এই সবই। নীরেন তাও সবই মন দিয়ে দেখছিল। প্রবেশ একটা চেয়ার টেনে বসেছিল তারই কাছে। সে হঠাৎ বলল, ‘এগুলো দেখতে চাইলে কেন বলো তো? কী সন্দেহ করছ তুমি?’
নীরেন বলল, ‘জানো তো প্রবেশ, আমার মন বলছে এই অপদেবতাকে আহ্বান করার জন্য কোনও বিশেষ তন্ত্রাচার করা হয়েছে। মারা যাওয়ার আগে ফাদারই সেটা করে গেছেন বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু সেটা কী কিছুতেই ধরতে পারছি না। কী যেন একটা আমার পেটে আসছে মুখে আসছে না। তাই এই পুরোনো কাগজপত্রগুলো দেখতে চাইছিলাম। যদি এর মধ্যে কোনও সূত্র পাই। বইপত্র তো তুমি আর ভূপেনই দেখেছ। সন্দেহজনক কিছু থাকলে তো তোমরাই বলতে তাই না?’
প্রবেশ বলল, ‘নাহ, বইপত্রের মধ্যে সন্দেহজনক আমি কিছু খুঁজে পাইনি। কিছু বুকমার্ক ছিল বিভিন্ন বইয়ের বিভিন্ন পাতায় গোঁজা। সেগুলোও আমার কাছে আছে। দেখতে চাইলে দেখাতে পারি। আর ওই আলমারি দুটোয় ফাদারের সব বই আছে, সেগুলোও দেখতে পারো।’
‘না, লাভ নেই,’ নীরেন হতাশ হয়ে মাথা নেড়ে ফের ওই কাগজগুলোই দেখতে শুরু করল। দেখতে-দেখতে একটা মোটা দলিলের মধ্যে থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ পেল নীরেন। ডায়েরির ছেঁড়া পাতা। ডায়েরির সাল ১৯২৬। ডিসেম্বর মাসের শেষ তিন দিনের পাতা ছিঁড়ে সুতো দিয়ে বেঁধে একটা বইয়ের ক্যাটালগ বানানো হয়েছে। নীচে ফাদারের সই। নীরেন অবাক হল, ডায়েরি থাকতে তার পাতা ছিঁড়ে ক্যাটালগ বানিয়েছিলেন কেন ফাদার?
যাঁরা বই পড়েন তাঁরা নিয়মিত ক্যাটালগ নবীকরণ করতে থাকেন। ফাদারও করেছেন। নতুন বই কবে এসেছে তার তারিখ দেওয়া আছে। সেখানে ৫১ সালের উল্লেখও যেমন আছে, ৬২ সালেরও উল্লেখ আছে। তারিখ দেখে বোঝা যায় খুব ঘন ঘন, মাসে অন্তত এক বার নতুন বই আনাতেন ফাদার কিন্তু ডায়েরির পাতা কেন ছিঁড়তে গেলেন? তবে কি ওই ডায়েরিটা ঘন ঘন বার করতে চাননি ফাদার? ডায়েরিটায় কি খুব ব্যক্তিগত কিছু লেখা ছিল? না কি এমন কিছু ছিল যার জন্য ফাদার নিজেই ওটা বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাইতেন না? হঠাৎ করেই নীরেনের মনে হল, ফাদার কি ডায়েরিটাকে ভয় পেতেন? সে প্রবেশকে বলল, ‘ফাদারের ডায়েরিটা আছে তোমার কাছে?’
প্রবেশ যেন এক মুহূর্তের জন্য থতোমতো খেয়ে গেল। তার পরেই বলল, ‘ডায়েরি? কই কোনও ডায়েরি তো আমি পাইনি।’
নীরেন অবাক হল, ‘ডায়েরি পাওনি? কিন্তু ছেঁড়া পাতা আছে যখন ডায়েরিটাও তো থাকার কথা।’
প্রবেশ যেন একটু কাঠ হয়েই বলল, ‘না গো। কাগজপত্র যা আছে এখানে আর বই ওই আলমারি দুটোতে। দেখেই নাও তুমি। আমি একটু ঘুরে আসছি।’
প্রবেশ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে আর প্রবেশের আচরণের এই আচমকা পরিবর্তনে একটা সন্দেহ মাথাচাড়া দিল নীরেনের মনে। সে উঠে বই রাখার প্রথম আলমারিটা খুলে ফেলল। তখনই দুটো ঘটনা একসঙ্গে ঘটল। নীরেন আলমারির ওপরের তাকে একটা মোটা বই দেখতে পেল যেটার নাম ‘আলপাইন ফোকলোর বাই ভিনসেন্ট ক্যারল’ আর প্রবেশের মা ঘরে ঢুকে বললেন, ‘বেটা, একটু চা খাবে?’
নীরেন তাঁর দিকে ঘুরল আর বজ্রাহতের মতো চমকে উঠল। প্রবেশের মায়ের গায়ে একটা লাল রঙের পশমের চাদর। চাদরটার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল নীরেন আর একটু-একটু করে তার কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে যেতে লাগল। নীরেনের অবস্থা দেখে প্রবেশের মা বললেন, ‘কী হয়েছে বেটা? শরীর খারাপ করছে?’
কোনও মতে মাথা নেড়ে নীরেন বলল, ‘প্রবেশ মাঝে মাঝে আপনার এই চাদরটা গায়ে দেয় তাই না?’
প্রবেশের মা হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ দেয় তো। এটা ওর খুব পছন্দের। কলকাতা থেকে বাড়ি এলেই এটা গায়ে দিয়ে বসে থাকে। এ অনেক পুরোনো র্যাপার বেটা। আমার মায়ের। কিন্তু এখনও নষ্ট হয়নি দেখো। খুব ভালো কোয়ালিটি। দার্জিলিং-এর ম্যাল থেকে কেনা।’
প্রবেশের মা চাদরের গুণাগুণ বর্ণনা করে যাচ্ছিলেন আর নীরেন বুঝতে পারছিল, ভয়ানক বিপদে পড়তে চলেছেন রামদাস ঠাকুর। ঠাকুর নিজের চারপাশে অবশ্যই স্থানবন্ধন করবেন এবং সেই বন্ধন ভেদ করে অশুভ কিছু তাঁর কাছে আসতে পারবে না, কিন্তু অপদেবতার আঘাত তো জঙ্গলের দিক থেকে আসবে না! আসবে অন্য দিক থেকে। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে। খুব বড়ো বিপদের মধ্যে রয়েছেন ঠাকুর। না জানি এতক্ষণে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে গেছে কি না! প্রবেশের মাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নীরেন দৌড়োতে শুরু করল জঙ্গলের দিকে।
ঠাকুর যে দিকে গেছিলেন জঙ্গল ভেদ করে সে দিকেই দৌড়োতে থাকল নীরেন। তাড়াহুড়োয় একটা টর্চও সে সঙ্গে নিয়ে আসেনি। জঙ্গলের মধ্যে নিঃসীম, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। দু’ পা এগোতে-না-এগোতেই বারে বারে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল সে। ডালপালার খোঁচায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল হাত-পায়ের চামড়া। কিন্তু সে থামছিল না। আসলে ঠাকুরের বিপদ আশঙ্কা করে তার স্বাভাবিক চিত্তবৃত্তি কাজ করছিল না। নয়তো এইভাবে অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে আসা যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে সে বোধ তার থাকত। অপদেবতা যে তাকেও আঘাত করতে পারে এ ভয় তার থাকত। কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার পরে যে স্নেহচ্ছায়া তার তীব্র বেদনার উপশম ঘটিয়েছিল সেই ছায়াটা কোনও ভাবে হারাতে চাইছিল না সে। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন। কিছুটা যেতেই দূরে মশালের আলো দেখতে পেল নীরেন। উঠতে উঠতে, পড়তে পড়তে ওই আলো লক্ষ্য করে ছুটে গেল সে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই জঙ্গলের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা একটা জায়গায় এসে পৌঁছোল। দেখতে পেল, মশাল দুটো মাটিতে পোঁতা। কাঠকুটো দিয়ে আরও খানিকটা আগুন করেছেন ঠাকুর। সেই আগুনের সামনে উবু হয়ে বসে মাটিতে কী যেন করছেন তিনি। ঠাকুর ঠিক আছেন দেখে নীরেন কিছুটা আশ্বস্ত হল। ঠাকুরও নীরেনের উপস্থিতি টের পেয়েছেন। চমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, ‘নীরেন তুই? তোকে তো আমি আসতে মানা করেচিলাম। তাও তুই কেন এলি?’
হাঁপাতে হাঁপাতে নীরেন বলল, ‘ঠাকুর, আমি এই অপদেবতাকে চিনে ফেলেছি।’
‘বাঁধনের বাইরে থাকিস না। শিগগির ভেতরে আয়। আলোর কাচে আয় তুই। আমার কাচে আয়।’
ঠাকুরের দিকে এগোতে এগোতেই নীরেন বলল, ‘আপনাকে সাবধান করতেই আমি ছুটে এলাম। বিপদ জঙ্গলের দিক থেকে আসবে না। আসবে মাটির নীচ থেকে। এই অপদেবতার বাস মাটির নীচে। আচমকা গর্ত থেকে উঠে কামড়ে দিয়েই আবার ঢুকে গেছে গর্তের মধ্যে। তাই সবার মনে হয়েছে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। আপনি ভালো করে দেখেছেন তো? যতটা জায়গা বাঁধন দিয়েছেন তার মধ্যে গর্ত নেই…’
কথাটা শেষ করতে পারল না নীরেন। তার আগেই ঠাকুরের ঠিক দু’হাত পেছনে মাটি থেকে সড়াৎ করে ঠেলে উঠল অপদেবতাটি। আগুনের লালচে আলোয় নীরেন দেখল, তার সন্দেহ একদম মিলে গেছে। এটা একটা ‘টাটজেলোয়াম’! বেড়াল আর সাপের এক আশ্চর্য বকচ্ছপ মূর্তি! বিশাল এক সাপের ফণার জায়গায় কেউ যেন নিপুণ হাতে একটা বেড়ালের সামনের দুই পা সমেত আধখানা দেহ বসিয়ে দিয়েছে! অদ্ভুত এই অপদেবতাকে দেখে ঠাকুরও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। সেই সুযোগেই ফ্যাঁস করে বিশ্রী একটা আওয়াজ করে টাটজেলোয়ামটা কামড় বসাতে গেল ঠাকুরের গায়ে। ততক্ষণে বিরাট এক লাফ মেরে নীরেন পৌঁছে গেছে ঠাকুরের সামনে। হ্যাঁচকা এক টানে ঠাকুরকে কামড়ের আওতা থেকে সরিয়ে দিল সে কিন্তু টাল সামলাতে না পেরে নিজে একেবারে উলটে পড়ে গেল। তার অরক্ষিত পায়ের ওপরে প্রচণ্ড এক কামড় বসিয়ে দিয়ে ঝুপ করে গর্তের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল ইউরোপ মহাদেশের আল্পস পর্বতের উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা উপকথার সেই ঘাতক অপদেবতা।
ঠাকুর হাহাকার করে উঠলেন, ‘এ তুই কী করলি নীরেন?’
***
বোড়া জাতীয় সাপের বিষের ভেষজ এক প্রতিষেধক ঠাকুর সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছিলেন। দ্রুত সেই বস্তুটা নীরেনকে খাইয়ে দিলেন তিনি। ক্ষতস্থানে চেপে চেপে লাগিয়ে দিলেন অন্য কী একটা সবুজ রঙের অর্ধতরল। ঝোলা থেকে কাপড় বার করে শক্ত করে বেঁধে দিলেন জায়গাটা। বললেন, ‘ভয় নেই তোর। কিচ্ছু হবে না। তুই হাঁটতে পারবি তো?’
খুব কষ্ট হচ্ছিল নীরেনের। তবু দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল, ‘পারব।’ ঠাকুর বললেন, ‘চল তবে। তোরে শুইয়ে দিতে হবে। আর এক বার ওষুধ দিতে হবে। নয়তো তুই বিষের সঙ্গে যুঝতে পারবি না। ভয় নেই। কোনও ভয় নেই। চল আমার সঙ্গে।’
এক হাতে মশাল আর অন্য হাতে নীরেনের হাত ধরে ঠাকুর এগোতে লাগলেন গ্রামের দিকে। মৃদু বকাবকি করতে লাগলেন নীরেনকে, ‘ও আমারে কামড়াত, কামড়াত। আমি তো ওষুধ খেয়ে বসেচিলাম। ও আমার কোনও ক্ষতি করতে পারত না। কিন্তু কেন এলি বল দিকি! না না, ভয় নেই তোর। আমি ওষুধ দিয়েছি না, কিচ্ছু হবে না।’
ওই ব্যথার মধ্যেও নীরেনের মনে হল, ঠাকুর তাকে ভয় পেতে বারণ করলেও নিজেই ভয় পাচ্ছেন। তাই বারংবার ভয় নেই, কিচ্ছু হবে না বলে সম্ভবত নিজেকেই সাহস দিচ্ছেন।
নীরেন ঠিকই বুঝেছিল। সত্যিই ভয় পাচ্ছিলেন রামদাস ঠাকুর। তিনি ভাবছিলেন, বিষের এই প্রতিষেধক বানানো হয়েছে মরমানুষ পৃথিবীতে পাওয়া যায় এমন নানা রকমের উপাদান দিয়ে। এই পৃথিবীর কোনও বিষের সাধ্য নেই একে অগ্রাহ্য করে। কিন্তু অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা এক অপদেবতার বিষের সঙ্গে এই প্রতিষেধক কি লড়াই করতে পারবে? বিশেষ করে নীরেনের মতো সাধারণ এক যুবকের দেহে অলৌকিক বিষের বিরুদ্ধে আদৌ কাজ করবে তো তাঁর লৌকিক প্রতিষেধক? এ তো তিনি নিজের জন্য বানিয়েছিলেন। তিনি কামড় খেলে ভয় ছিল না। তিনি যোগীপুরুষ। তীব্র হলাহলের বিরুদ্ধে তাঁর শরীর এবং মন যে ভাবে লড়াই করবে নীরেনের শরীর বা মন কোনওটাই তা পারবে না। তা হলে?
ঠাকুরের আশঙ্কাই সত্যি হল। একটু-একটু করে জীবনীশক্তি ক্ষয় হতে লাগল নীরেনের এবং জঙ্গলের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে অচেতন হয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
ঠাকুরের চিৎকারে লোকজন ছুটে এল। নীরেনকে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল বিছানায়। প্রবেশের বাবা উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন, ‘ওকে কি হাসপাতালে নিয়ে যাব? কিন্তু এই রাতে…’
ঠাকুর বললেন, ‘হাসপাতালে নিয়ে লাভ হবে না। আমি ওষুধ দিয়েচি। কাজ করার হলে ওতেই করবে। একটু উষ্ণ গরম জল দেবে গো? ওরে আর একবার ওষুধ দিতি হবে।
নীরেন তখন আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তার মাথাটা কোলে নিয়ে বসলেন ঠাকুর। ঠোঁট ফাঁক করে একটু-একটু করে ওষুধ মেশানো গরম জল খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাভ হল না। কষ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। এমন সময় খিঁচুনি শুরু হল। হাত, পা, মুখ বেঁকে যেতে লাগল। ঠাকুর বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন নীরেনের দিকে। তিনি বুঝতে পারছিলেন, নীরেন চলে যাচ্ছে। তাঁর সামনে দিয়ে নীরেনকে নিয়ে চলে যাচ্ছে যমদূত!
নীরেনের কিন্তু আর কোনও কষ্ট হচ্ছিল না। সমস্ত ব্যথা, বেদনার বোধ হারিয়ে অদ্ভুত একটা ফুরফুরে আনন্দ হচ্ছিল। সে যেন ভেসে ভেসে যাচ্ছিল। মাথার ভেতরে এক একটা দৃশ্যের জন্ম হচ্ছিল আর একটু পরেই সেটা মুছে গিয়ে জন্ম নিচ্ছিল নতুন দৃশ্য। নীরেন মাকে দেখতে পাচ্ছিল। ভাইকে দেখতে পাচ্ছিল। দেখতে পাচ্ছিল তাদের ময়মনসিংহের বাড়ি, দিগন্তলীন ধানখেত, আকাশে টিয়া পাখির ঝাঁক। দেখতে পাচ্ছিল সংস্কৃত কলেজের ক্লাসরুম, কলেজ স্ট্রিট, জলসায় গান গাইছেন হেমন্তবাবু। দেখতে পাচ্ছিল তার মাথায় হাত রেখেছেন রামদাস ঠাকুর। আচমকাই এই সমস্ত দৃশ্যপট একেবারে মুছে গেল তার সামনে থেকে। চার দিকে তখন শুধুই ঘোর অন্ধকার। নীরেন ভয় পেল। কয়েক মুহূর্ত। তার পরেই আবার আলো দেখা গেল। নীরেন দেখল, সে তাদের ময়মনসিংহের বাড়ির মন্দিরের সামনেটায় দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরে আরতি হচ্ছে। আরতি করছেন বাবা। নীরেনের চোখে জল এল। কত দিন পরে বাবাকে দেখল সে। সে অস্ফুটে ডাকল, ‘বাবা!’
আরতির পঞ্চপ্রদীপ হাতে নিয়েই ঘুরে তাকালেন তিনি আর নীরেনকে দেখেই চমকে উঠলেন, ‘কী সব্বোনাশ! এখানে কেন এসেছিস তুই?’
নীরেন তখন দরদর করে কাঁদছে। বলল, ‘তোমাকে ছাড়া যে কিছু ভালো লাগে না বাবা।’
এ দিকে ঠাকুর দেখলেন, খিঁচুনিটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল আর নীরেনের নাক দিয়ে গড়িয়ে পড়ল কাঁচা রক্ত। তিনি বসেছিলেন নীরেনের মাথাটা কোলে নিয়ে। বাকিরা অসহায় হয়ে খাটের আশপাশে দাঁড়িয়েছিল। সবাইকে চমকে দিয়ে অদ্ভুত এক কাণ্ড করলেন ঠাকুর। কোল থেকে নীরেনের মাথাটা ফেলে দিয়ে এক লাফে নীরেনের পায়ের দিকে চলে এসে দু’হাতে দুই গোড়ালির ওপরের জায়গাটা চেপে ধরে হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘যাওয়াচ্চি তোরে!’
ও দিকে তখন সবে মন্দিরের চৌকাঠ পেরোতে যাচ্ছিল নীরেন, কে যেন তার পা দুটো মাটিতেই গেঁথে দিল। কত চেষ্টা করছে সে বাবার কাছে যাওয়ার কিন্তু পা নাড়াতেই পারছে না। কাঁদতে কাঁদতেই নীরেন বলে উঠল, ‘বাবা, আমি যে তোমার কাছে যেতে পারছি না। আমায় নিয়ে যাও বাবা। তুমি ছাড়া আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না। কিচ্ছুতে মন বসে না। আমি তোমার কাছে যাব।’
নীরেন দেখল, বাবার চোখেও জল। চোখ মুছে বাবা ধমক দিলেন, ‘খবরদার আসবি না এখানে। এ ভালো জায়গা না। তুই ফিরে যা নীরেন। ফিরে যা। তোর মা তোর পথ চেয়ে বসে আছে। তুই না থাকলে তোর মাকে কে দেখবে? যা তুই। যা। তোকে ডাকছে তুই শুনতে পাচ্ছিস না?’
পেল। নীরেন শুনতে পেল। বহু দূর থেকে কে যেন মায়াভরা কণ্ঠে বলছে, ‘জীবনের দিকে ফের নীরেন। তুই বাঁচতে না চাইলে যে আমি তোরে ফেরাতে পারব না বাপ। একটু জীবনের দিকে তাকা। আমরা সবাই তোর পথ চেয়ে আচি যে। একটু চেষ্টা কর বাপ।’
আবার একটা ঝটকা লাগল নীরেনের। চোখের সামনেটা আবার অন্ধকার হয়ে গিয়ে ভেসে উঠল মায়ের মুখ। ভাইয়ের মুখ। রামদাস ঠাকুরের মুখ। বাবা চলে গেছেন ঠিকই কিন্তু রামদাস ঠাকুরের কাছে সে তো আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। তার চেয়েও বড়ো কথা, খুব বড়ো বিপদের ওপরে বসে রয়েছে গোটা লেবং গ্রামটাই। ওদের বাঁচাতে হবে। অপদেবতার রহস্য সে ভেদ করে ফেলেছে। সে কথা জানাতে হবে ঠাকুরকে। নীরেন চমকে দেখল, সে এক বিশাল অন্ধকার গহ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। বেখেয়ালে কখন যে এখানে চলে এসেছে। না না, ঠাকুরের কাছে যেতে হবে। পা বাড়াতে গেল নীরেন কিন্তু তখনই কে যেন পেছন থেকে তার চুলের মুঠি চেপে ধরল। এক টানে তাকে নিয়ে যেতে চাইল অন্ধকার গহ্বরের দিকে। সেই টানে নীরেন পড়েই যেত যদি না তার পা কেউ ধরে থাকত। আহ! কেউ একটা পা ধরে আছে। আর এ দিক থেকে চুল ধরে কেউ একটা টানছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে চুলগুলো উপড়ে নেবে। দম বন্ধ হয়ে আসছে যন্ত্রণায়। দু’দিকের টানের চোটে যেন শরীরটা দু’আধখানা হয়ে যাবে। না না না, নীরেন কিছুতেই অন্ধকার ওই গহ্বরের দিকে যাবে না। সে শরীরটাকে নিয়ে নীচের দিকে চাপ দিল। যে পা টেনে আছে তার কাছে যেতে চায় নীরেন আর ঠিক তখনই সে শুনতে পেল বহু দূর থেকে ভেসে আসছে একটু আগের সেই কণ্ঠস্বর, ‘আমি জানি তুই বাঁচতে চাইচিস। কিন্তু মরণের টান খুব শক্ত। তারে হারানো শক্ত। এক সময় মনে হবে আর পারব না। এ বার চলে যাওয়াই ভালো কিন্তু খবরদার নীরেন, হেরে যাস না। এক বার চলে গেলে আর আমি ফেরাতে পারব না। যে অবধি চলে গেচিস ফিরে আসা কঠিন কিন্তু লেগে পড়ে থাক নীরেন। লেগে পড়ে থাক। অলৌকিক হবেই।’
সত্যিই অলৌকিক হল। তার সাক্ষী হয়ে রইলেন ঠাকুরের দুই শিষ্য আর প্রবেশের পরিবারের লোকেরা। নাক, কান দিয়ে রক্তপাত হতে হতে একসময় নীরেনের নিশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এল। সবাই ভাবল এই শেষ। শুধু ঠাকুর তখনও নীরেনের পা দুটো প্রাণপণে টেনে রেখেছেন আর বলে চলেছেন, ‘আর একটু চেষ্টা কর নীরেন। আর একটু। লেগে পড়ে থাক। লেগে পড়ে থাক। অলৌকিক হবেই।’
অবশেষে যম আর মানুষের এই টানাটানিতে মানুষ জিতে গেল। নীরেনের শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল। তার পা দুটো ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন ঠাকুর। ডিসেম্বরের পাহাড়ের শীতেও দরদর করে ঘামছেন তিনি। অস্ফুটে বললেন, ‘পেরেচি। পেরেচি ওরে ফেরাতে।’
তার পরে অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।
