লাপিস লাজুলি – ১৭
॥ সতেরো ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
ডার্ট বাইকটা থামিয়ে পেছনে ফিরতেই অবাক হয়ে গেল রোশনি। গত কয়েক দিনে তার ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে তাতে খুব সাধারণ কিছুতে সে আর অবাক হবে না। কিন্তু সে যা দেখল সেটাকে সাধারণ বলা যায় না। ব্যাপারটা অসাধারণ এবং অস্বাভাবিক। সবুজ পাহাড় দুটোর মাঝখান দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ার পরে কিছুটা গিয়েই সে বাইক থামিয়ে পেছনে তাকিয়েছে কিন্তু পাহাড় দুটোকে আর দেখতে পাচ্ছে না। যত দূরে চোখ যায় শুধু সবুজ উপত্যকা। সে তো এতটা রাস্তাও আসেনি যে পাহাড় দুটো তার দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাবে! পাহাড় দুটো কি তবে স্রেফ উবে গেল!
ঠান্ডা মাথায় একটু চিন্তা করতেই রোশনির গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। তখন প্রাণ বাঁচানোর তাগিদটাই এত বেশি করে ছিল যে মস্তিষ্ক অন্য কোনও চিন্তা করতে পারছিল না। নয়তো মরুভূমির মাঝে আচমকা গজিয়ে ওঠা দুটো সবুজ পাহাড় যে হয় অবাস্তব নয় অলৌকিক তখনই তার মাথায় আসত।
ভালো করে চারপাশটা দেখল রোশনি। পেছনে দিগন্তলীন সবুজ উপত্যকা। তার মাঝে মাঝে কিছু অদ্ভুতদর্শন গাছ। আকারে সেগুলো বিশাল। বটগাছের থেকেও বড়ো কিন্তু পাতাগুলোর সঙ্গে বটপাতার কোনও মিল নেই। লম্বা ডাঁটির দু’পাশে তেঁতুল পাতার মতো ঝিরিঝিরি পাতা আর সেগুলো এমন ঘন হয়ে নুয়ে পড়েছে যে দূর থেকে দেখে মনে হয় কারও মাথার করোটিটা তুলে গাছের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে আর তাতে উপচে পড়া চুল। সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে উপত্যকা মিশেছে এক নদীতে। তাতে কাকচক্ষু জল। নদীর পাড়ে ওই একই রকম গাছ। বাতাসে একটা হিম ভাব। নদীর দিক থেকে মাঝে মাঝেই একটা দমকা হাওয়া আসছে, তাতে আরও বেশি করে শীত করে উঠছে। চার দিকে উজ্জ্বল আলো কিন্তু আকাশে তাকিয়ে আলোর উৎসটা খুঁজে পেল না রোশনি। ঘড়ি, মোবাইল কিছুই সঙ্গে নেই ফলে সময় বোঝারও কোনও উপায় নেই। তবে ঘড়ি না থাকলেও সাধারণ অভিজ্ঞতা দিয়েই মানুষ সকাল, দুপুর, বিকেলের প্রভেদ করতে পারে। কিন্তু আলোটা এমনই বিভ্রম তৈরি করছে যে এখানে সেটাও করা যাচ্ছে না। রোশনির মনে হল, সে অন্য কোনও এক দুনিয়ায় চলে এসেছে আর মনে হওয়াটা যে ভুল নয় তক্ষুনি প্রমাণ পেল। মাথার ওপর ঝটপট শব্দ শুনে ওপরে তাকাতেই স্তম্ভিত হয়ে গেল সে। বিশালাকার ওটা কী উড়ে যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে? ওটা কি পাখি? না না, পাখি হবে কী করে? পাখির কী ও-রকম সিংহের মতো লেজ থাকে? নাকি ওটা কোনও পশু? কিন্তু তা হলে উড়ছে কী করে? মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেল রোশনির। তার চোখের সামনেই অদ্ভুত প্রাণীটা গিয়ে বসল অদ্ভুত সেই গাছের নীচে। রোশনি অবাক হয়ে দেখল, বিশাল প্রাণীটা না পাখি, না পশু। এ সেই ছোটোবেলায় পড়া সুকুমার রায়ের বকচ্ছপ টাইপের একটা জন্তু। সিংহ আর ঈগলের ককটেল। আকারে একটা পূর্ণবয়স্ক হাতির চেয়েও বড়ো। প্রাণীটার সারা গায়ে খেলে বেড়াচ্ছে অসংখ্য বিদ্যুৎশিখা। কী নাম হবে এর? সিংহীগল!
আচমকাই ডেকে উঠল প্রাণীটা। রণভেরির মতো গম্ভীর অথচ সুরেলা সেই ডাক। রোশনি জানে, সিংহের ডাককে বলে গর্জন আর পাখির ডাককে বলে কূজন। সে দুটোকে মেলালে যে শব্দের উৎপত্তি হয় তাকে কী বলে? পল্লবদা থাকলে নির্ঘাত বলত, ‘কর্জন’।
এর মধ্যেও পল্লবের কথা মনে পড়ে গেল! চোখে জল এসে গেল রোশনির। পল্লবকে ওই নরক থেকে বার করবে বলেই না প্রাণের বাজি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু এ কোথায় চলে এল সে? এখান থেকে বেরোবে কেমন করে? আদৌ বেরোতে পারবে তো? নাকি এখানেই এমন কোনও অদ্ভুত প্রাণীর হাতে বেঘোরে মরবে!
মরতে রোশনি ভয় পায় না। তার জীবনে বেঁচে থাকার মতো এত দিন কী-ই বা ছিল? মা চলে যাওয়ার পরে সে টিকে ছিল শুধু জেদের বশে। তবে হ্যাঁ, পল্লব আসার পরে জীবনের একটা মানে খুঁজে পেয়েছিল সে। পল্লবকে সে পাবে না জানে। তাদের দু’জনের মাঝে দুস্তর পারাবার। তবু পাব না জেনেও ভালোবেসে যাওয়ার মধ্যে একটা উদযাপন আছে। একটা দুর্দান্ত বেঁচে থাকা আছে। মরে গেলে তার একমাত্র আফশোস থেকে যাবে সে পল্লবকে বাঁচাতে পারল না!
এই সব ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়েছিল রোশনি। সামনে তাকাতে দেখল এর মধ্যেই কোথা থেকে প্রাণীটার তিনটে ছানা বেরিয়ে এসেছে। তারা নেচে নেচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রোশনি যদিও ওদের থেকে বেশ অনেকটাই দূরে আছে তবে এতটাও দূরে নয় যে তাকে ওরা দেখতে পাবে না। কিন্তু রোশনির উপস্থিতিকে ওরা পাত্তাই দিচ্ছে না।
কী করবে বুঝতে পারছে না রোশনি। বাইকের স্টার্ট বন্ধ করে দিয়েছে অনেকক্ষণ। নতুন করে ইঞ্জিনটা চালু করার সাহস পাচ্ছে না। যদি খেপে গিয়ে বকচ্ছপগুলো তেড়ে আসে! তার কাছে অস্ত্র বলতে একটা পিস্তল। ছোটোবেলায় এনসিসি-তে শেখা বন্দুক চালানো বিদ্যে আইসিস জঙ্গিদের ওপরে কাজে লাগলেও এই বিশাল সিংহীগলের ওপরে কোনও কাজ করবে না বলেই তার ধারণা। সন্তর্পণে বাইক থেকে নেমে বাইকটার আড়ালেই উবু হয়ে বসে পড়ল রোশনি। এরা চলে না যাওয়া অবধি সামনের দিকে এগোনো ঠিক হবে না। এমন সময় তীব্র চিৎকার করে উঠল প্রাণীগুলো। চমকে উঠে রোশনি দেখল, কোত্থেকে বিশাল এক সাপ এসে হাজির হয়েছে।
‘অ্যানাকন্ডা ২’ নামে একটা ইংরেজি সিনেমা দেখেছিল রোশনি। সেখানে এক ধরনের লাল অর্কিড খেয়ে বিশাল আকার ধারণ করেছিল সাপগুলো। এই সাপটা সেগুলোর চেয়েও বড়ো। তার চেয়েও বড়ো কথা সাপটার ফণা আছে। বিশাল সেই ফণা তুলে হিংস্র দাঁত বার করে সাপটা ধেয়ে যাচ্ছে আর সিংহীগল তাকে আঘাত করছে তার তীক্ষ্ণ নখর দিয়ে। রোশনি নিশ্চিত হল, সে কোনও এক রূপকথার রাজত্বে এসে পড়েছে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা হল, ঘটনাচক্রে এই দুই যুযুধান যদি একযোগে তাকে আক্রমণ করে তা হলে এখানেই সব শেষ। যতই আশ্চর্য হোক, যতই অলৌকিক ভাবে সে এই রূপকথার দেশে চলে আসুক, তাকে তো এখান থেকে বেরোতে হবে। তাই কালক্ষেপ না করে রোশনি বাইক ছুটিয়ে দিল পেছনের সবুজ উপত্যকার দিকে।
উপত্যকার ঢালুটা পার করতেই রোশনি দেখল এখানেও নদী। নদীটা কি তবে ঘুরে পেছনে চলে এসেছে? কিন্তু তা কী করে হয়? কত বড়ো নদীটা! রূপকথার রাজত্বের নাম-না-জানা এক নদীর ভৌগোলিক অবস্থান এবং গতিপথ নিয়ে ভাবতে গিয়ে রোশনি অনুভব করল, এই বার তার ভয় লাগতে শুরু করেছে। এ মৃত্যুভয় নয়। এই ভয়ের চরিত্র আলাদা। পল্লবকে চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলার ভয়।
যত সময় গড়াচ্ছে রোশনি বুঝতে পারছে সে বন্দি হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে একটা নামই মনে এল তার। ভাদুড়ি স্যার। একমাত্র তিনিই এই সংকটে ত্রাতা হতে পারেন। বাইক থেকে নেমে সে পদ্মাসনে বসে পড়ল ঘাসের ওপরে। বিক্ষিপ্ত মনটাকে সংহত করে ভাদুড়িমশায়ের কথা ভাবতে যেতেই জোর একটা ধাক্কা খেল। কেউ যেন চুলের মুঠি ধরে মাথাটা ঠুকে দিল নিরেট দেওয়ালে।
রোশনি জানতে পারল না ঠিক সেই সময় পল্লবকে না পেয়ে রোশনিকে ভাবতে গিয়ে একই রকম ধাক্কা খেলেন ভাদুড়িমশায়ও। তাঁকে চমকে উঠতে দেখে সমীরণ বললেন, ‘কী হল স্যার?’
চিন্তাক্লিষ্ট স্বরে ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘খুব আশ্চর্য একটা ব্যাপার হল সমীরণ। মানে খুবই আশ্চর্য!’
অবাক হলেন সমীরণ। ভাদুড়িস্যার ভূয়োদর্শী মানুষ। অনেক দেখেছেন তিনি। সহজে বিস্মিত বা বিচলিত কোনওটাই হন না। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি যুগপৎ বিস্মিত এবং বিচলিত। সমীরণকে প্রশ্ন করতে হল না। তার আগে ভাদুড়িমশায় নিজেই বললেন, ‘আমি পল্লবকে যোগাযোগ করতে পারছি না তার কারণ হয় পল্লব এখন আমার কথা ভাবছে না বা সে অচেতন। কিন্তু রোশনিকে যোগাযোগ করতে পারলাম না তার কারণ এ দুটোর কোনওটাই নয়। আমি সংকেত পাচ্ছি, রোশনি পূর্ণ চেতনায় আছে এবং আমার কথাই ভাবছে কিন্তু আমি তার মনের মধ্যে প্রবেশ করতে পারছি না। আমার অজানা কোনও এক বিপুল শক্তি আমাকে বাধা দিচ্ছে। আমার আর রোশনির মধ্যে দেওয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
‘কী বলছেন স্যার?’
‘হ্যাঁ, সমীরণ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি বড়ো অদ্ভুত জায়গা। সেখানে পদে পদে হাজারও মিথ। মিথ আর মিথ্যের মধ্যে ফারাক শুধু এক সুতোর। ওই সুতোর নাম বিশ্বাস। আমার আন্দাজ, এই মুহূর্তে মানুষের অভিজ্ঞতার বাইরের কোনও এক ডাইমেনশনে রয়েছে রোশনি। কোনও অলৌকিক উপায়ে সেখানে পৌঁছে গিয়েছে সে। কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারবে তো? চাইলেও তো আমি কোনও সাহায্য করতে পারব না। রোশনির আর আমার মাঝের দেওয়াল ভাঙার সাধ্যি যে আমার নেই সে ওই এক ঠোক্কর খেয়েই আমি বুঝে গেছি।’
পল্লব বন্দি হয়ে আছে জঙ্গিদের ক্যাম্পে। রোশনি যাও-বা সেখান থেকে বেরোতে পারল কোনও এক অজানা জায়গায় আটকে পড়ল। এই দু’টি ছেলে-মেয়ের জন্য বড়ো চিন্তায় পড়ে গেলেন ভাদুড়িমশায়।
চিন্তায় পড়ে গেল রোশনিও। বেশ কয়েক বার চেষ্টা করেও সে ভাদুড়ি মশায়ের সঙ্গে কোনও রকম যোগাযোগ স্থাপন করে উঠতে পারল না। যত বারই ভাবতে যাচ্ছে ধাক্কা খাচ্ছে। তবে কি ভাদুড়ি স্যার এখন তার কথা ভাবছেন না, নাকি এই রূপকথার রাজত্ব থেকে মর-মানুষের পৃথিবীতে যোগাযোগ করা যায় না?
এই কথাটা ভাবতেই কেমন একটা অবসাদ গ্রাস করল রোশনিকে। মনে হল, তার আর কিছু করার নেই, কোথাও যাওয়ার নেই। এখানেই ঘাসের ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। যতক্ষণে ঘুম ভাঙবে ততক্ষণে এই ঘাসের গালিচা পুরোপুরি ঢেকে ফেলবে তাকে। সেও এই রূপকথার রাজত্বের অংশ হয়ে যাবে। শুধু পল্লবদা তার সঙ্গে থাকলে ভালো হত। দু’জনে বেশ এই ঘাসের সমাধিতে শুয়ে থাকত চিরকাল।
পল্লবের কথা মনে পড়তেই ঘোরটা কেটে গেল। অবাক হল রোশনি। হঠাৎ এসব মনে হল কেন তার? এগুলো তো তার নিজের ভাবনা নয়। কেউ যেন তার মাথার মধ্যে কথাগুলো বুনে দিচ্ছিল। তখনই একটা ব্যাপার নজরে পড়ায় আতঙ্কে তার হাড় হিম হয়ে গেল। পায়ের দিকে তাকিয়ে সে দেখল, ঘাসগুলো বড়ো হয়ে তার জুতোর কিছুটা ঢেকে ফেলেছে!
রোশনি বুঝতে পারল, এখানে বেশিক্ষণ বসে থাকলে তার একটু আগের ভাবনাটাই সত্যি হয়ে যাবে। এই ঘাসগুলো জ্যান্ত। এদের মধ্যে একটা স্পন্দন আছে। একটা নীরব অথচ সর্বনাশা বুভুক্ষা আছে। এরা মনের দখল নিতে পারে। অবসাদ বুনে দিতে পারে বুকের ভেতরে। যদি না পল্লব এসে পড়ত তার মাথার মধ্যে তা হলে হয়তো ধীরে ধীরে তার সবটা ঢেকে নিত এই কোমল রাক্ষসের দল। ভালোবাসা তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এক লাফে উঠে দাঁড়াল সে। জুতো থেকে টেনে টেনে ছিঁড়ল ঘাসগুলো। জায়গাটা ভালো নয়। যে করে হোক এখান থেকে তাকে বেরোতেই হবে। ফিরতেই হবে পল্লবের কাছে। ভালোবাসার কাছে। জীবনের কাছে।
নদীর দিকেই বাইক ছোটাল রোশনি। সে খেয়াল করল না একটু দূরে মাটি থেকে বেরিয়ে থাকা একটা কাঁকড়া বিছের হুলসমেত লেজ আবার সড়াৎ করে মাটির ভেতরে ঢুকে গেল। হুলটা একটা প্রমাণ সাইজের মোচার মতো বড়ো আর লেজটা একটা পূর্ণবয়স্ক পুরুষের কবজির চেয়েও মোটা।
আবারও নদীর পাড়ে এসে বাইক থামাল রোশনি। সামনে নদীর এতটাই বিস্তার যে ও পারে কী আছে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। উলটোনো বাটির মতো আকাশ নেমে এসেছে নদীর ওপরে। দু’দিকেই যত দূরে চোখ যায় সবুজ উপত্যকা আর কিছুটা গিয়ে তার ভাঁজে হারিয়ে গেছে নদী। রোশনি জানে, এই সবুজ প্রান্তর দেখতে যতই নিরীহ এবং চোখ জুড়োনো হোক না কেন আসলে নিঃশব্দ ঘাতক। এই ঘাসে বেশিক্ষণ থাকলেই মাথায় ভিড় করে আসবে মৃত্যুচিন্তা। তার পরে ঘাসগুলো একটু একটু করে জড়িয়ে নিতে শুরু করবে তাকে। কিন্তু ঘাসের ওপরে ছাড়া তো পা রাখারও জায়গা নেই। তার চেয়ে কি নদী পেরোনোর কথা ভাববে? কিন্তু সেটাই বা কী করে সম্ভব?
হঠাৎই রোশনির চোখ পড়ল নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অদ্ভুত গাছগুলোর দিকে আর বিদ্যুচ্চমকের মতো একটা ভাবনা উঁকি দিল মাথায়। বাইক থেকে নেমে সে এগিয়ে গেল একটা গাছের দিকে। গাছের নীচে ছড়িয়ে আছে প্রচুর শুকনো পাতা। ডাঁটিগুলো দড়ির মতোই শক্ত আর লম্বা। মোটা কাণ্ডের থেকে অসংখ্য ডাল বেরিয়েছে। তার মধ্যে বেশিরভাগই শুকনো আর নাগালের মধ্যে। সতেজ ডালগুলো তুলনামূলক ওপরের দিকে। একটা শুকনো ডাল ধরে জোরে টান দিতেই সেটা খসে এল।
আনন্দে লাফিয়ে উঠল রোশনি। এই তো পেয়েছে সে নদী পেরোনোর উপায়। এই ডাল আর পাতা দিয়েই ভেলা বেঁধে নদীতে ভেসে পড়বে সে। এমনিতেও তো বেরোনোর কোনও রাস্তা পাচ্ছে না, তার চেয়ে দেখাই যাক না নদীর স্রোত তাকে কোথায় নিয়ে যায়। লাফিয়ে লাফিয়ে গাছের শুকনো ডালগুলো ভাঙতে শুরু করল সে। ঠিক তখনই তার পেছনে কিছুটা দূরে মাটি ফুঁড়ে উঠে এল সেই কাঁকড়াবিছের হুল। হুলটা একটু-একটু দুলতে শুরু করল তার পরে আচমকাই প্রচণ্ড একটা শব্দ করে মাটি ফেটে গেল। লম্বা একটা চিড় ধরল মাটিতে। সেই শব্দে চমকে পেছন ফিরল রোশনি আর যা দেখল, আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল।
মাটির মধ্যে থেকে উঠে আসছে মানুষের মতো কিছু একটা। কিন্তু সে যে মানুষ নয় এটা নিশ্চিত। পতঙ্গের চোখের মতো দুটো কুতকুতে চোখ আর মুখের জায়গায় বাঁকানো শুঁড়। কনুই অবধি হাত দুটো মানুষের মতোই কিন্তু তারপর কাঁকড়া বিছের দাঁড়া। পা দুটোও মানুষের মতোই কিন্তু কোমর থেকে কাঁকড়া বিছের মতো লেজ বেরিয়েছে। লেজের মাথায় বিষকুম্ভ ঘাতক হুল। সারা শরীর কাঁকড়াবিছের মতো শক্ত কালো খোলসে ঢাকা। আকারে- আয়তনে রোশনির প্রায় দেড়গুণ।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোশনি ভাবল, এখানে সবই বকচ্ছপ। কিন্তু আর কিছু ভাবার সময় পেল না সে। বিজাতীয় একটা হুংকার দিয়ে বিছে-মানুষ লাফিয়ে এল রোশনির দিকে আর হাতের দাঁড়া চালিয়ে দিল তার মাথা লক্ষ্য করে। রিফ্লেক্সটা বরাবরই ভালো রোশনির, তাই শেষ মুহূর্তে মাথাটা সরিয়ে নিতে পারল। বিছে-মানুষের দাঁড়া সশব্দে গেঁথে গেল গাছের গায়ে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে মৃত্যু অবধারিত। নদীর দিকে ছুট দিতে গেল রোশনি কিন্তু তার আগেই বিছে-মানুষের লেজের আঘাতে ছিটকে পড়ল মাটিতে। ততক্ষণে গাছ থেকে দাঁড়া ছাড়িয়ে নিয়েছে বিছে-মানুষ। সে ধেয়ে এল রোশনির দিকে। দাঁড়া গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করল রোশনির গলায়। আবার ছোটোবেলায় শেখা এনসিসি-র বিদ্যে চলকে উঠল রোশনির রক্তে। জোড়া পায়ে সে একটা লাথি বসিয়ে দিল বিছে-মানুষের পেটে তার পরে এক পাক ঘুরে উঠে দাঁড়িয়ে আবার নদীর দিকে দৌড়ে গেল। বাইকটা বেশ দূরে, তার চেয়ে এই মুহূর্তে নদীতে ঝাঁপ দেওয়াই যুক্তিসংগত। যদিও সে জানে না বিছে-মানুষ সাঁতার জানে কি না তবু তার মনে হল একমাত্র নদীর ওই কাকচক্ষু জলই তাকে বাঁচাতে পারে।
প্রাণপণে ছুটতে লাগল রোশনি। ওই তো আর কয়েক কদম দূরেই নদী। কিন্তু এ বারও শেষরক্ষা হল না। পায়ে লেজ জড়িয়ে তাকে আবার ফেলে দিল বিছে-মানুষ এবং এক লাফে রোশনিকে টপকে নদীর দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল। কুতকুতে চোখ দুটোয় ঝিকিয়ে উঠছে জিঘাংসা। বিজাতীয় গর্জন করে সে যেন রোশনিকে বুঝিয়ে দিতে চাইল, এ দিক দিয়ে পালানোর রাস্তা বন্ধ।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল রোশনি। সে আর বিছে-মানুষ এখন মুখোমুখি। বিছে-মানুষের ঠিক পেছনেই বয়ে চলেছে স্বচ্ছতোয়া নদী। নদীর জলে তার অল্প অল্প দুলতে থাকা লেজ আর হুলের ছায়া পড়ছে। হাতের দাঁড়া দুটো ঘষে নিল বিছে-মানুষ। তার শরীরী ভাষায় এখন জ্বলজ্বল করছে প্রত্যয়। যেন সে জানে অসম এই লড়াইয়ে সেই জিতবে। আবারও একটা গর্জন করে রোশনির দিকে এক পা এগিয়ে এল সে। রোশনি এ বার আর একটুও নড়ল না। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে একটুও চোখের পাতা না কাঁপিয়ে আচমকাই কোমর থেকে পিস্তলটা বার করে বিছে-মানুষের মুখে গুলি চালিয়ে দিল!
এই পালটা আক্রমণ অপ্রত্যাশিত। গুলির ধাক্কা সামলাতে না পেরে আর্তনাদ করে উঠল বিছে-মানুষ। টাল সামলানোর চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। ঝপাস করে উলটে পড়ল নদীর জলে আর জলে পড়া মাত্রই গুলি খাওয়ার থেকেও চতুর্গুণ আর্তনাদ করে উঠল। চারপাশ কেঁপে উঠল সেই আওয়াজে। এই আওয়াজ চেনে রোশনি। ছোটোবেলায় তাদের পাশের বাড়ির টুম্পাদি গায়ে আগুন দিয়েছিল। গায়ে দাউদাউ আগুন নিয়ে সে ছুটে বেড়াচ্ছিল আর আর্তনাদ করছিল। অবিকল সেই আর্তনাদ। গুলি খাওয়ার আর্তনাদটা ছিল আহত হওয়ার, কিন্তু এই আর্তনাদ মৃত্যুকালীন যন্ত্রণার। স্তম্ভিত হয়ে রোশনি দেখল, নদীর কাকচক্ষু জলের মধ্যে ছটফট করছে বিছে-মানুষ আর অত্যন্ত দ্রুত তার শরীরটা গলে মিশে যাচ্ছে ওই জলেই। উঠে আসছে ঝাঁঝালো ধোঁয়া। রোশনি বুঝতে পারল, ওই মনোলোভা জল আসলে জল নয়, তীব্রতম অ্যাসিড। মানুষের দুনিয়া যে অ্যাসিডের খবর রাখে না।
বিছে-মানুষকে দেখে রোশনি যত না আতঙ্কিত হয়েছিল তার চেয়েও বেশি আতঙ্কিত হল এটা ভেবে যে আর একটু হলেই সে ওই অ্যাসিডের নদীতে ভেলা ভাসাতে যাচ্ছিল। বিছে-মানুষ তাকে মারতে এসেছিল ঠিকই কিন্তু আসলে সে তাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল।
কী ভয়াবহ এই রূপকথার রাজত্ব! যা ভয়ানক দেখতে তা তো ভয়ানকই কিন্তু যা দেখে মনে হয় সুন্দর, আশ্রয়দাত্রী তার আড়ালেও লুকিয়ে আছে কুৎসিত নিঃশব্দ ঘাতক। নদীর দিকে তাকিয়ে রইল রোশনি। একটু আগের ভয়াবহতার চিহ্নমাত্র নেই সেখানে। টলটল করছে অ্যাসিড যা জলের চেয়েও নির্মল। যা দেখলেই ডুব দিতে ইচ্ছে করে!
এ বার আর কান্না চেপে রাখতে পারল না রোশনি। দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরে চিৎকার করে উঠল সে আর কাঁদতে কাঁদতেই দেখতে পেল মাটি থেকে মাথা তুলছে একের পর এক কাঁকড়াবিছের লেজ, যাদের মাথায় বিষভর্তি হুল।
শান্তি করে কাঁদতেও দেবে না শুয়োরের বাচ্চাগুলো। মনে মনে গালাগালিটা দিয়েই রোশনি ছুটে গিয়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল বাইকে। ইঞ্জিনের গর্জন ছাপিয়ে তার কানে এল মাটি ফাটার আওয়াজ। নদীর ধার দিয়ে উপত্যকার দিকে বাইক ছোটাতে ছোটাতে সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, পেছনে ছুটে আসছে কালান্তক যমের মতো বিছেমানুষের দল। সংখ্যায় যারা অগুনতি।
