লাপিস লাজুলি – ১৯
॥ উনিশ ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
‘আমি আর পারছি না। তুমি কেন বদলে গেলে ফারুক ভাই? আমি যে তোমাকে আর চিনতে পারছি না। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
তাঁবুর ভেতরে একটা ক্যাম্পখাটের ওপরে ফারুকের কোলে মাথা গুঁজে ফুলে ফুলে কাঁদছে তারিক। পাশের একটা ক্যাম্পখাটে বসে রয়েছে সইদুল আর জুনেইদ। দু’জনেরই মুখ গম্ভীর। দু’জনেই তারিকের ওপরে অসম্ভব বিরক্ত। এত নরম মন নিয়ে ওর এখানে আসাই উচিত হয়নি। ওদের চিন্তা, তারিকের এইসব ধাষ্টামোর জন্য ওদের না ফিরে যেতে হয়। তা হলে এত দিনের এত পরিশ্রম সব জলে চলে যাবে। তবে আশার কথা একটাই, ফারুকের একটা জায়গা তৈরি হয়েছে এর মধ্যেই। ফারুক বুদ্ধিমান। তাই শুরু থেকেই ঘটনার রাশ নিজের হাতে তুলে নিয়ে ক্যাম্পের হেড কমান্ডার আরিব মাজিদের চোখে ভালো হয়ে গেছে। প্রমাণ করে দিয়েছে সে বাঘের বাচ্চা। সাচ্চা জিহাদি। এই সব ঘটনার পরে ওরা দুজন তাই ফারুককে গিয়েই ধরেছিল। বলেছিল, ‘ফারুক ভাই, আমাদের তারিকের থেকে আলাদা করে দাও। ওর সঙ্গে থাকলে আমরাও বদনাম হয়ে যাব। আমাদেরও এরা ভীতু, ডরপোক ভাববে। এমনিতেই শুনেছি, আগের আইসিসে ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ থেকে আসা জিহাদিদের তেমন খাতির ছিল না। এই তারিকের মতো ছেলেরা থাকলে নতুন আইসিসেও সেম সিচুয়েশন হবে। আমরা আর ওর সঙ্গে থাকব না।’
ফারুক একটু অবাক হয়ে বলেছিল, ‘তোরা না ছোটোবেলার বন্ধু! ‘ জুনেইদ বলেছিল, ‘কোনটা আগে ফারুক ভাই? জিহাদ না বন্ধুত্ব?’
সইদুল বলেছিল, ‘অনেক কষ্টে এত দূর এসেছি। এখন বন্ধুত্ব মারাতে গিয়ে ফিরে যেতে পারব না। আর ফিরে যাবই-বা কোথায়? যাই হোক, তোমার সঙ্গে তো ওদের বেশ একটা কানেকশন হয়ে গেছে দেখছি। তুমি কমান্ডার মাজিদকে বলো, আমরা কিন্তু তারিকের মতো নই। আমরা সিরিয়াস।’
ফারুক বলেছিল, ‘আমি কথা বলেছি কমান্ডার মাজিদের সঙ্গে। তোদের কোনও চিন্তা নেই। আর তারিকও ঠিক হয়ে যাবে। হাতের পাঁচটা আঙুল কি সমান? এখানে এলে অনেকেরই প্রথম প্রথম অসুবিধে হয়। পরে ঠিক হয়ে যায়। চাপ নিস না। আমি তারিককে বোঝাব। ও একটু বেশি ইমোশনাল তোরা যা আমি আসছি।’
ফারুক এসে পাশে বসে মাথায় হাত রাখতেই তারিক কেঁদে ফেলেছিল। সেই কান্না এখনও চলছে। সইদুল মনে মনে বলল, ‘মাগি একটা
ফারুক নির্বিকার। তারিকের কান্নার বেগটা থামতে দিল। তার পরে বলল, ‘আমি কিচ্ছু বদলাইনি তারিক। যা ছিলাম তাই আছি। কিন্তু আমি যদি তখন ওই ডেয়ারডেভিল ভাবটা না দেখাতাম ওরা তো তোকে মেরে ফেলত। ওঠ। চোখ মোেছ। মন শক্ত কর। কত কষ্ট করে, কত অপেক্ষার পরে আমরা পবিত্র ভূমিতে পৌঁছেছি বল তো? এখন যদি তুই এমন করিস তা হলে ওরা আমাদের দলে নেবে? আমরা চার জন একসঙ্গে কত স্বপ্ন দেখেছি। খিলাফৎ প্রতিষ্ঠা করতে হবে নতুন করে। সেই মহাযুদ্ধের অংশীদার হওয়ার জন্যই তো এত কাণ্ড। এখন পিছিয়ে এলে চলবে?’
ফারুকের নরম স্বরে একটু ধাতস্থ হল তারিক। বলল, ‘আমি তো খিলাফতের জন্য জীবন দিতে চাই ফারুক ভাই কিন্তু এসব কী? অকারণে মানুষ মারতে হবে…’
কথা শেষ হওয়ার আগেই জুনেইদ খর গলায় বলল, ‘তুই কি ন্যাকা না কি? অকারণ মানে? যারা খিলাফতের বিরুদ্ধে তারাই আমাদের শত্রু। যুদ্ধ কি ফুল দিয়ে হবে? আর কাফেররা আমাদের সঙ্গে কী করেছে? তোকে কি সব নতুন করে বলতে হবে? ওরা আমাদের মারেনি? আমাদের মারছে না? আমরা কি ওদের পুজো করব?’
মাথা নীচু করল তারিক। সত্যিই এখানে তার বলার কিছু নেই। এখানের এই সব ঘটনাপ্রবাহের আগে অবধি তো সে উৎসাহে ফুটছিলই। কিন্তু যখন তাকে ধর্ষণ বা খুন করতে বলা হল তখনই মাথাটা আউলে গেল। যত সময় যাচ্ছে তারিক বুঝতে পারছে গত তিন বছর ধরে সে যে প্রস্তুতি নিয়েছে তাতে ফাঁক থেকে গেছে। সইদুল, জুনেইদ বা ফারুক কাফেরদের যতটা ঘেন্না করতে পারছে সে ততটা পারছে না। তিন বছরের ট্রেনিং তার মধ্যে সে ভাবে বুনে দিতে পারেনি ঘৃণার বীজ। ফারুক যেন তার মনের কথা পড়ে ফেলল। বলল, ‘কী ভাবছিস এত? ভাবছিস তোর ট্রেনিং ঠিক মতো হয়নি?’ তারিকের চোখে আবার জল এল। বলল, ‘আমি পারব না ফারুক ভাই। আমি তোমাদের ঝুলিয়ে দিলাম। আমি মনের থেকে সায় পাচ্ছি না। মনে জোর পাচ্ছি না।’
তারিকের পিঠে এক চাপড় মারল ফারুক, ‘চুপ কর। তুই নিজেকে জানিস না বলে এই কথা বলছিস। তোর মতো মনের জোর আমাদের কারও নেই। এখানে আসার আগে আম্মির পার্লারে কে আগুন দিয়েছিল? আমরা? উঁহু। তুই দিয়েছিলি তারিক। শরিয়ত মানেনি বলে তুই নিজের আম্মিকেও ছাড়িসনি। তুই তো কমান্ডার ওমর হাসানের যোগ্য উত্তরসূরি।’
আইসিসের বিরোধিতা করেছিল বলে কমান্ডার হাসান মা আর বোনকে রেপ করিয়েছিল। নিজে দাঁড়িয়ে দেখেছিল। তুই-ও তো…’
‘থামো ফারুক ভাই,’ গর্জে উঠল তারিক, ‘আম্মির সঙ্গে ঝামেলা করা, পার্লারে আগুন দেওয়া আর রেপ এক জিনিস নয়। ওখানেই তো আমার তারটা কেটে গেছে। খিলাফৎ গঠনের সঙ্গে রেপের কী সম্পর্ক? আমার আম্মি আর বোনকে কেউ রেপ করতে আসুক না। আমি কুচিয়ে কেটে ফেলব না? সে কাফের না আমার নিজের ধর্ম আমি এসব দেখব না। কমরেড হাসান এই জঘন্য নোংরা কাজটা করেছিলেন বলে পাপের শাস্তি পেলেন। মেয়েদের অপমান করা তো, একটা মেয়েই গুঁজে দিয়ে গেছে। এসব আল্লার নির্দেশ ফারুক ভাই।’
চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল ফারুকের। মুহূর্তেই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। সে হেসে বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। মাথা ঠান্ডা কর। আমি বললে হয়তো তুই বিশ্বাস করবি না। তাই তোর জন্য একটা জিনিস নিয়ে এসেছি। এই দেখ।’
রোল করা একগোছা কাগজ বাড়িয়ে দিল ফারুক। তারিক বলল, ‘কী এগুলো?’
কৌতূহল সইদুল আর জুনেইদের চোখেও। ফারুক বলল, ‘এটা আইসিসের ম্যাগাজিন। নাম ‘দাবিক’। ২০১৫ সালে প্রথম বেরিয়েছিল।’
সইদুল অবাক হয়ে বলল, ‘এটা তো আমরা কোনও দিন দেখিনি। তুমি আগে যে সব মেটিরিয়াল দিয়েছিলে তার মধ্যেও তো ছিল না।’
ফারুক বলল, ‘থাকবে কী করে? যারা আইসিসে জয়েন করে যায় এটা শুধু তাদের জন্য। বাইরের কারও দেখার নিয়ম নেই। মারাত্মক কনফিডেন্সিয়াল। আমি কমান্ডার মাজিদকে অনেক বলে-কয়ে রিকোয়েস্ট করে ফোটোকপি নিয়ে এসেছি। তাও একটাই কপি করতে দিয়েছে। এটা আবার ফেরত দিয়ে দিতে হবে। আমি তো বুঝতেই পেরেছি তারিকের কোথায় প্রবলেম হচ্ছে ও ওই রেপ ব্যাপারটায় আটকে গেছে। শোন তারিক, এই বিশাল যুদ্ধে পুরুষ, নারী সবার আলাদা আলাদা ভূমিকা আছে। পুরুষ যেমন ময়দানে লড়াই করবে তেমনই তাকে সুখ দেবে নারীরা। ইসলামিক স্টেটের কমিটি অব রিসার্চ অ্যান্ড ফতোয়াজ মেয়েদের জন্য অনেক নিয়ম, অনুশাসন তৈরি করেছিল। কমিটির মাথায় কে ছিলেন জানিস? বর্তমান খলিফা আবু জাফর মুস্তাফা। খলিফা কি ভুল বলতে পারেন? ওই ফতোয়ায় স্পষ্ট বলা ছিল, কুমারী মেয়েরা জিহাদিদের সঙ্গে সহবাস করে নিজেদের শুদ্ধ করতে পারবে। জিহাদিরা যৌন ক্রীতদাসী রাখতে পারবে। কাফের মেয়েদের যৌনদাসী করায় পাপ তো নেই, বরং পুণ্য আছে। আরে মেয়েদের বাজার বসত রে রাক্কা আর মসুলে। এক এক জন জিহাদি তিন জন করে যৌনদাসী রাখতে পারত। সে এক সোনার দিন ছিল। আমরা তো সেই দিন ফিরিয়ে আনারই স্বপ্ন দেখছি না কি? বিশ্বাস না হয় তুই ম্যাগাজিনটা পড়। এখানে তো আর মিথ্যে কথা লিখবে না। তুই আজকের দিনটা পড়, কাল তোর সঙ্গে কথা বলব। এটা পড়লেই তোর সব কনফিউশন কেটে যাবে। আমি একটু ঘুরে আসছি।’
ফারুক বেরিয়ে গেল। কাগজগুলো হাতে নিয়ে পাথরের মতো বসে রইল তারিক। মেয়েদের পর্দা করা উচিত সেও মানে। পুরুষ আর নারীর অধিকার আলাদা সেখানেও কোনও সমস্যা নেই কিন্তু এই যৌনদাসী, ধর্ষণ এখানেই সে বার বার আটকে যাচ্ছে। আম্মির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। বোনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে আর মনে পড়ে যাচ্ছে ‘চেরি ব্লসম’ তানজিন নূরের কথা। তানজিনও তো খিলাফত গঠনে অংশ নিতে চাইছে। সে তো একটা মেয়ে, তাকে যদি এই লোকগুলো সম্মান না দেয়! যদি কোনও দিন তানজিন এদের বিরোধিতা করে তা হলে এরা কি তানজিনকেও ধর্ষণ করে শাস্তি দেবে! না না, এসব যৌনদাসী, মেয়েদের বাজার এসব ভাবলেই তার গা গুলিয়ে উঠছে। এখন তো তার মনে হচ্ছে, এগুলো সব জোর করে বানানো। ইসলাম আসলে এই সবের কোনও কিছুই অনুমোদন করে না। ইসলাম আসলে সমানাধিকারে মোড়া এক সুন্দর পৃথিবী চায়। কোনও এক গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে এই লোকগুলো ইসলামকে কলঙ্কিত করছে। আম্মির কথাগুলোই ঠিক। খলিফার কথাগুলো ভুল।
তারিকদের তাঁবু থেকে বেরিয়ে ফারুক সোজা এসে ঢুকল আরিব মাজিদের তাঁবুতে। মাজিদ একটা বন্দুক পরিষ্কার করছিল। ফারুককে দেখে বন্দুক নামিয়ে বলল, ‘এসো। কী বুঝলে?’
ফারুক বলল, ‘কমান্ডার, তারিকের চোখ মুখ দেখে যা বুঝলাম ম্যাগাজিন পড়িয়ে লাভ হবে না। চেরি ব্লসমকে লাগবে। ওর যা মেন্টাল কন্ডিশন চেরি ব্লসম ছাড়া ওকে কেউ ধরে রাখতে পারবে না।’
মাজিদ বলল, ‘কেন একটা ছেলের জন্য এত হাঙ্গামা করছ বলো তো? মেরে দাও না।’
ফারুক বলল, ‘মেরে ফেললে তো হয়েই গেল। দেখো, যত দিন না খলিফা মুস্তাফা নির্দেশ দিচ্ছেন তত দিন তো আইসিস আত্মপ্রকাশ করবে না। আর সামনে না এলে প্রপার রিক্রুটমেন্ট হবে না। অনেক কষ্টে, অনেক বুঝে রিক্রুট করাতে হচ্ছে। যুদ্ধটা তো শুধু বন্দুক নিয়ে হয় না কমান্ডার। বন্দুকের যুদ্ধ আর কতটুকু? আসল যুদ্ধ তো অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের ব্রেনওয়াশ করা। তারিক ইন্টারনেটটা দুর্দান্ত বোঝে। ডার্ক ওয়েব ওর নখদর্পণে। ওদের মতো ছেলেদের আমাদের লাগবে কমান্ডার। হি ক্যান বি আওয়ার অ্যাসেট। ওকে মেরো না।’
আরিব একটু ভেবে বলল, ‘দেখো, যা ভাল বোঝো করো। বাকিদের তো কাজে লাগিয়ে দিয়েছি কিন্তু ওই মোটা ইন্ডিয়ানটার কী হবে? ও কি আদৌ কোনও কাজে লাগবে? না লাগলে মেরে ফেলতে বলো।’
‘না না। আঁতকে উঠল ফারুক, কাজে লাগবে কমান্ডার। আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি। ওর ডিটেইলস চেক করেছি। ও বাঙালি। রাইটার। খলিফা মুস্তাফার একটা ভাষণ শুনেছিলাম ইন্টারনাল ওয়ার্কশপে। তোমার মনে আছে কি না জানি না। সেখানে খলিফা বলেছিলেন, ‘সাহিত্যের জোর সবচেয়ে বেশি। প্রোপাগান্ডাকে সাহিত্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে, তবেই মানুষ সেটা সহজে বিশ্বাস করবে। আইসিসের প্রোপাগান্ডা আছে, সাহিত্য নেই। জিহাদিদের বীরগাথা নিয়ে ফিকশন লিখতে হবে। নতুন সাহিত্য তৈরি করতে হবে। তবেই বছরের পর বছর আইসিস টিকে থাকবে।’ একদম খাঁটি কথা কমান্ডার। দেখো না, মহাভারতের যুদ্ধ সেই কবে হয়েছে কিন্তু সেটা নিয়ে সাহিত্য লেখা হয়েছে বলেই না এখনও লোকের মাথায় গেঁথে আছে। পাণ্ডবদের জাস্টিফাই করা হয়েছে বলে জনমানসে পাণ্ডবরা ভালো আর কৌরবরা খারাপ। একমাত্র সাহিত্যই পারে কোনও কাজের প্রপার জাস্টিফিকেশন দিতে। আমরা যা করছি সাহিত্যের পাতায় সেটারও জাস্টিফিকেশন লাগবে। ওই লোকটা আমাদের জন্য লিখবে। আইসিস যে কত ভালো তাই নিয়ে দারুণ-দারুণ গল্প লিখবে। ওকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। আর এমন লোক আমাদের আরও লাগবে। পরের কনফারেন্সে যদি ডাক পাই আমি খলিফার কাছে প্রস্তাব দেব, আইটি সেলের পাশাপাশি আমাদের একটা লিটারারি সেল বানানো উচিত। যেখানে দুনিয়ার বেস্ট সাহিত্যিকেরা থাকবে। তারা আমাদের নিয়ে গল্প, উপন্যাস, কবিতা লিখবে।’
আরিব মাজিদ প্রশংসার চোখে ফারুকের দিকে তাকাল। বলল, ‘আমার দেখা বেস্ট রিক্রুটার তুমি। আবু বকর না।’
ফারুক মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল আরিবকে। তার পরে বলল, ‘আমার একটা আর্জি আছে কমান্ডার। আমাকে একবার খলিফা মুস্তাফার সঙ্গে দেখা করাবে?’
আরিব হেসে ফেলল, ‘আমারও তো এই একই আর্জি ফারুক। থার্ড ইন কমান্ড দারিয়ুস মহম্মদের কাছে কত বার বলেছি, এক বার দেখা করিয়ে দাও, কিন্তু দারিয়ুসও নাকি খলিফাকে দেখেনি। আর সেকেন্ড ইন কমান্ড আবু রামি অবধি পৌঁছোনো মুশকিল। তবে আমার ধারণা তিনিও খলিফাকে দেখেননি। কানাঘুসোয় শুনেছি, খলিফা নাকি ভয়ংকর একটা অস্ত্র বানাচ্ছেন। যেটা রেডি হলে তিনি আত্মপ্রকাশ করবেন। তখনই আইসিস ফেজ ২-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হবে।’
ফারুক মাথা নাড়ল, ‘হুম। ঠিক আছে, যদি কখনো সুযোগ আসে আমাকে জানিয়ো। যাই আমি, তারিকের একটা ব্যবস্থা করি। বাই দ্য ওয়ে ওই ইন্ডিয়ান মেয়েটার কোনও খোঁজ পাওয়া গেল?’
আরিব মাথা নাড়ল, ‘এখনও না। মেয়েটা যেন স্রেফ ভ্যানিশ হয়ে গেছে। আমার ধারণা ও কোনও বালিয়াড়ির আড়ালে লুকিয়ে আছে। আমাদের লোক ওকে খুঁজছে। আজ নয়তো কাল ও ধরা পড়বেই আর নয়তো মারা পড়বে। মরুভূমিতে লুকিয়ে থাকা সোজা না।’
***
সইদুল আর জুনেইদকে তাঁবু থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁবুতে তারিক একা। রাত প্রায় দশটা। চারদিকটা নিঝুম হয়ে আছে। খাবার পড়ে আছে এক পাশে, সেটা ছুঁয়েও দেখেনি তারিক। দাবিক ম্যাগাজিনের ফোটোকপি করা পাতাগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। কয়েকটা পাতা পড়ার পরে আর ইচ্ছা হয়নি। তারিক বুঝতে পারছে, সে ফেঁসে গেছে। এখানে তার মন বসবে না কিন্তু ফিরে যাওয়ারও কোনও উপায় নেই। ভালো মুখে বললে এরা যেতে দেবে না। সোজা মেরে দেবে। একমাত্র উপায় পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু পালিয়ে যাবেটা কোথায়? চারপাশে ধু-ধু মরুভূমি। আর যদিও-বা কষ্টকল্পনায় ধরে নেওয়া গেল, সে এই মরুভূমি পেরিয়ে জনপদে চলে আসবে কিন্তু তার পরে? সারাটা জীবন পচে মরতে হবে বিদেশের জেলখানায়। দেশে ফিরলেও তো জেল। মোট কথা তার জীবনটা শেষ হয়ে এসেছে। উফ! কী ভয়ানক!
বিছানায় উঠে বসল তারিক আর তখনই একজন জঙ্গি ঘরে ঢুকে তার দিকে একটা মোবাইল ফোন বাড়িয়ে দিল। ইংরেজিতে বলল, ‘মেসেজ চেক করো।’
খুব অবাক হল তারিক। তাদের ফোন তো সেই হোটেল থেকে বেরোনোর সময়ই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তা হলে? হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে সে দেখল, এটা একটা অন্য ফোন। কিছু বলার আগেই যে এসেছিল সে চলে গেল। তখনই ‘টিং’ শব্দ করে বেজে উঠল ফোনটা। একটা মেসেজ ভেসে উঠল ফোনের স্ক্রিনে আর সেটা দেখেই তারিকের এতক্ষণের যন্ত্রণার উপশম হয়ে গেল এক নিমেষে। মেসেজে রোমান হরফে বাংলায় লেখা, ‘তারিক, আমি তানজিন।’
ডার্ক ওয়েবে একটা সাইটে ‘চেরি ব্লসম’ নামের প্রোফাইলটা ছিল। সেখান থেকেই মেসেজ করছে তানজিন। রাত দশটা নাগাদ কথা শুরু হয়েছিল। এখন রাত দুটো। তারিকের মনের যাবতীয় মেঘ কাটিয়ে দিয়েছে তানজিন নূর। নূর মানে তো আলো, নূর মানে তো স্বর্গের দীপ্তি। সেই আশ্চর্য জ্যোতিতেই তারিকের অন্তর এখন উদ্ভাসিত। তানজিন তাকে বুঝিয়েছে, মেয়েদের প্রতি আইসিসের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারও অনেক বক্তব্য আছে। হতে পারে এ বিষয়ে তাদের দুজনের আর আইসিসের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা কিন্তু তাই বলে তো আইসিসের বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। তারা দু’জনেই তো নতুন খিলাফতের স্বপ্ন দেখছে, যেখানে সুখেশান্তিতে থাকবে দুনিয়ার তাবৎ মুসলমানেরা। যেখানে কেউ তাদের সংখ্যালঘু বলে আলাদা করে দেবে না। আর এই স্বর্গরাজ্য তো এমনি-এমনি তৈরি হবে না। তার জন্য যুদ্ধ করতে হবে। এই মুহূর্তে খিলাফৎ প্রতিষ্ঠা জরুরি। এক বার খিলাফৎ প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে অবশ্যই তার নিয়মনীতি নিয়ে আলোচনা করা যাবে। নতুন নীতি প্রণয়ন করা যাবে। খলিফা মুস্তাফা উদার। তিনি নতুনদের কথা মন দিয়ে শোনেন। এক বার খিলাফৎ প্রতিষ্ঠা হলে তাঁকে চিঠি দেবে দু’জনে। তার আগে অবধি তারিককে মন শক্ত করতে হবে। আসল উদ্দেশ্যে ফোকাস করতে হবে।
তানজিন লিখল, ‘মাথাটা ঠান্ডা হয়েছে?’
তারিক লিখল, ‘তুমি আমার কাছে ছিলে না বলেই তো সব গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছিল।’
‘আর যাব না তোমায় ছেড়ে।’
‘সত্যি?’
‘তিন সত্যি। আর একটা কথা বলতে চাই তোমায়।’
‘কী?’
‘আমায় বিয়ে করবে তারিক?’
কয়েক সেকেন্ড হাঁ করে মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল তারিক। সে বুঝতে পারল, তার হাত-পা কাঁপছে। বুকের মধ্যে একটা আশ্চর্য উথালপাথাল। সারা শরীরের ওপর দিয়ে যেন অজস্র পিঁপড়ে হেঁটে যাচ্ছে। কোটি কোটি ছাতিম ফুল যেন একসঙ্গে ফুটেছে। তাঁবুর মধ্যে আর বসে থাকতে পারল সে। বাইরে বেরিয়ে এল।
আকাশ ভরা তারার মাঝে দিগন্তলীন বালিসমুদ্রের কোল ঘেঁষে অপূর্ব এক চাঁদ উঠেছে। চালধোয়া জলের মতো আলোয় থই থই করছে চারপাশ। সেই আলোয় পিঠ পেতে শুয়ে আছে প্রাচীন এক মরুভূমি। কোথাও কোনও শব্দ নেই। তারিকের মনে হল, এটাই একমাত্র সত্যি। মরুভূমির ওপরে পৃষ্ঠব্রণর মতো এই ক্যাম্পটা আসলে অলীক। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে ভালোবাসা ছাড়া আর অন্য কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই। অবশ হাতে সে টাইপ করল, ‘তুমি যা বলবে আমি করব তানজিন। তোমার জন্য আমি জাহান্নামেও যেতে রাজি।’
মেসেজটা পাঠিয়ে দিল সে আর কাছেই কোথাও টিং করে আবছা একটা শব্দ হল। ঠিক তখনই ক্যাম্পের সার্চলাইটের আলো এসে পড়ল তার মুখে। এক সেকেন্ডেরও কম স্থায়ী হল আলোটা কিন্তু তার মধ্যেই যা হওয়ার তা হয়ে গেল। এতক্ষণ যে স্বপ্নের বুদবুদের মধ্যে বাঁচছিল তারিক সেটা ফেটে গেল। তারিক বুঝল, মরুভূমির ওপর পৃষ্ঠব্রণর মতো এই ক্যাম্পটাই আসলে সত্যি। লক্ষ্মীপুজোর রাতের জ্যোৎস্নার মতো এই আলোটা ক্ষণস্থায়ী। বিভ্রম। আসলে ওই আবছা টিং শব্দটাই সন্দেহ নামের একটা পোকা হয়ে তাকে জোরে কামড়ে দিয়েছে। দ্রুত নিজের ফোনটা সাইলেন্ট করল সে। তার পরে লিখল, ‘কিন্তু বিয়েটা কী ভাবে হবে তানজিন? তুমি তো আমার কাছে নেই।
কান খাড়া করে সেন্ড বোতামে চাপ দিল। আবার সেই আবছা টিং শব্দ। তানজিন কি তবে এখানেই কোথাও আছে? যদি তাই হবে, দেখা দিচ্ছে না কেন? একের পরে এক মেসেজ করতে করতে সার সার তাঁবুর ছায়ায় নিজেকে লুকিয়ে ফেলে শব্দের উৎস সন্ধান করতে লাগল তারিক।
ওই তো ওই তাঁবুটা! পা টিপে টিপে তাঁবুটার একেবারে পেছনে চলে এল তারিক। নিশ্বাস অবধি বন্ধ করে রেখেছে সে। সে টাইপ করল, ‘আই লাভ ইউ তানজিন।
তার পরে চোখ রাখল তাঁবুর কাপড়ের ফাঁকে। সামান্য ফাঁক দিয়ে সে দেখতে পেল, তাঁবুর ভেতরে একটা ক্যাম্পখাটে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে ফারুক। তার পাশে মোবাইল ফোন। সেন্ড বোতামে চাপ দিল তারিক। টিং শব্দ করে জ্বলে উঠল ফারুকের মোবাইলের আলো। ফারুক টাইপ করতে শুরু করল। তারিকের মোবাইলের স্ক্রিনে লেখা ফুটে উঠল, ‘আই লাভ ইউ টু তারিক। আমি কোনও দিন তোমায় ছেড়ে যাব না। আমি এখন ইরাকে আছি। আমি শিগগির আসছি জাজিরা ক্যাম্পে। সেখানেই কাজি ডেকে আমাদের বিয়ে হবে।’
দম বন্ধ হয়ে এল তারিকের। তার মানে সেই প্রথম দিন থেকে তানজিন নূর সেজে ফারুকই তাকে মেসেজ করছে! নয়তো চেরি ব্লসমের এই আইডি তো ফারুকের জানার কথা নয়। ডার্ক ওয়েবে একটা মাত্র আইপি দিয়েই এটা ইউজ করা যায়। তার মানে ফারুক আসলে এদেরই লোক! তাই এদের সঙ্গে এত খাতির! তার মানে এই তিন বছর ধরে সে ক্রমাগত মিথ্যে বলে এসেছে! তার বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে! তাকে ভালোবাসার টোপ দিয়েছে! এত দিন ধরে ফারুক নামের এই জানোয়ারটাকে তানজিন ভেবে সে সুখস্বপ্ন দেখেছে! হাতের পাতায় টপ করে একফোঁটা জল পড়ল। চামড়াটা যেন পুড়ে গেল তারিকের। রাগ, অপমান, বঞ্চনা থেকে যে চোখের জলের জন্ম হয় তার উত্তাপ খুব বেশি। এই জলের বাষ্পে খুব বিষ। তারিক অনুভব করল, তার সারা শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিষটা।
