লাপিস লাজুলি – ২১
॥ একুশ ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
কতক্ষণ ধরে বাইক ছোটাচ্ছে খেয়াল নেই রোশনির। বিছে-মানুষের দল রণে ভঙ্গ দিয়েছে অনেক আগেই। তবু সে থামেনি। গতির মধ্যে একটা মাদকতা আছে। সেই নেশার টানেই যেন অনির্দেশ্যের দিকে ছুটে চলেছে সে। কোথায় যাবে, কী হবে কিছুই আর ভাবতে ইচ্ছে করছে না। স্নায়ুগুলো কেমন যেন স্থবির হয়ে গেছে। তবু থামতে হল রোশনিকে। ডার্ট বাইকটা তেল রিজার্ভে পড়ে যাওয়ার সিগন্যাল দিতে শুরু করল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রোশনি। এই অদ্ভুত, ভয়ানক রূপকথার দেশে এই বাইকটা আর বন্দুকটা তার দুইমাত্র সম্বল। তার একটাও কিছুক্ষণে দেহ রাখবে। বোঝা হয়ে উঠবে। তার পরে? আর ভাবতে ইচ্ছে করল না রোশনির। সে ঠিক করল, যতক্ষণ না তেল পুরোপুরি ফুরিয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ চালিয়ে যাবে বাইকটা তার পরে যা হবে দেখা যাবে। যদি কোনও ভাবে এখান থেকে বেরোতে না পারে বন্দুকটা তো আছে। ওতে কয়েকটা গুলিও আছে। সোজা নিজের কপালে ঠেকিয়ে ট্রিগার টেনে দেবে। এখানকার বকচ্ছপ প্রাণীগুলোর হাতে বা ওই ভয়ানক ঘাস বা অ্যাসিড-জলে প্রাণ দেবে না কিছুতেই।
সামনে তাকাল রোশনি। কিছু দূরেই একটা সবুজ ঘাসে ছাওয়া টিলা। তার পাশ দিয়েই নদীটা ডান দিকে বেঁকে গিয়ে দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে গিয়েছে। ডান দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। আবার বাইক ছোটাল রোশনি আর ডান দিকে বাঁক নিতেই সে থমকে গেল। এতক্ষণ ধরে যে জায়গাগুলো সে পার করে এল, এই জায়গার চরিত্র তার চেয়ে একেবারেই আলাদা। এতক্ষণ ধরে দেখা ছবির বইয়ের মতো নয় বরং অনেকটা তার চেনা পৃথিবীর মতো। ভেলভেটের মতো সবুজ ঘাস নয়, বরং কোথাও ঘাস, কোথাও মাটি। ঘাসগুলোও অত ঝকঝকে নয়, স্বাভাবিক। নদীর জলটাও অমন কাকচক্ষু নয়, একটু ঘোলাটে। পথের ধারে অযত্নে বেড়ে ওঠা বুনো ফুলের ঝোপ। তার ওপরে প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে আর সবচেয়ে বড়ো কথা নদীর ধারে গাছের ছায়ায় একটা ছোট্ট কুটির। সামনেটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দাওয়ায় শুকোচ্ছে কাপড়। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এখানে মানুষ থাকে। এক লহমায় মনটা ভালো হয়ে গেল রোশনির কিন্তু পরক্ষণেই চোখে ভেসে উঠল, স্বচ্ছ অ্যাসিডে বিছে-মানুষের গলে মিশে যাওয়ার দৃশ্যটা। কানে বেজে উঠল তার হাহাকার। দ্রুত গাছের আড়ালে বাইকটা লুকিয়ে নিজেও লুকিয়ে পড়ল সে। জায়গাটাই যখন এমন ফালতু তখন এই কুটিরে মানুষ থাকে এটা নিয়ে এতটা নিশ্চিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। এখুনি হয়তো দেখা যাবে কুটির থেকে কোনও এক ভয়াবহ প্রাণী আর মানুষের একটা বকচ্ছপ বেরিয়ে এল! কিন্তু না, রোশনিকে অবাক করে কুটিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা মানুষ! আরও নির্দিষ্ট করে বললে এক জন বৃদ্ধা মানুষ।
দাওয়ায় দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা চারপাশটা একটু দেখলেন। শুকোতে দেওয়া কাপড়টা তুলে কুটিরের দাওয়ায় রাখলেন তার পরে একটা কাঠের বালতি মতো পাত্র নিয়ে নদীর পাড়ে উবু হয়ে বসে জল তুললেন। রোশনি অবাক হয়ে দেখল, এই জল আসলেই জল। বালতিটা কুটিরের বাইরে রেখে বৃদ্ধা কুটিরের ভেতরে ঢোকা মাত্র রোশনি গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। সে নিশ্চিত হয়ে গেছে, এই কুটিরে যারা থাকে তারাই এই রূপকথার দেশ থেকে বাইরে বেরোনোর রাস্তা বলতে পারবে। প্রথমে সে ভালো করে বলবে, অনুরোধ করবে। না শুনলে বল প্রয়োগ করবে। বন্দুকটা হাতে নিয়ে সে পা বাড়াল কুটিরের উদ্দেশে।
যতটা উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল দাওয়ায় উঠে ততটাই নিরুৎসাহ হয়ে পড়ল রোশনি। চলে তো এল কিন্তু কী বলে ডাকবে ওই বৃদ্ধাকে? কোন ভাষায় কথা বলেন ওই বৃদ্ধা? মধ্যপ্রাচ্যে আসার পর যাদের সঙ্গেই মোলাকাত হয়েছে তারা হয় আরবি নয়তো কুর্দ বলে। সে ভাষার এক বর্ণও বোঝে না রোশনি। তা হলে? একটু চুপ থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল রোশনি, দরকার হলে ইশারায় বোঝাবে। যা আছে কপালে! যে তিনটে ভাষা সে জানে সেগুলো মিলিয়ে মিশিয়েই জোরে হাঁক দিল, ‘হেল্লো… হেল্লো… ক্যান ইউ হিয়ার মি? শুনছেন? আপ শুন রহে হো না? হেল্লো…’
বেশিক্ষণ ডাকতে হল না। ভেতর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন সেই বৃদ্ধা আর তার পিছু পিছু এক বৃদ্ধ। রোশনিকে দেখেই তাঁরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। একদম পাথরের মূর্তির মতো। নির্জীব, নির্বাক, চলচ্ছক্তিহীন। শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন রোশনির দিকে। কাউকে কোনও দিন এত অবাক হতে দেখেনি রোশনি। পৃথিবীর সমস্ত বিস্ময় এসে যেন জড়ো হয়েছে তাঁদের দু’জনের দৃষ্টিতে। এ ভাবেই অনেকটা সময় কেটে গেল, তার পরে ধীরে ধীরে নড়ে উঠল বৃদ্ধের ঠোঁট। ঠিক যেমন ভাবে ভাদুড়ি স্যারের গলা মাথার ভেতরে বেজে উঠেছিল, সে ভাবেই রোশনির মাথার মধ্যে অনুরণিত হল বৃদ্ধের কণ্ঠ। কণ্ঠ বলা ভুল, বার্তা। দুর্বোধ্য ভাষায় বিড়বিড় করে বৃদ্ধ যা বলছেন তা রোশনির নিজের বুদ্ধিগ্রাহ্য ভাষায় অনূদিত হয়ে যাচ্ছে মাথার ভেতরে। বৃদ্ধ বলছেন, ‘তুমি কি মানুষ?’
রোশনি মাথা নাড়ল। বৃদ্ধ বললেন, ‘তুমি পৃথিবী থেকে এসেছ?’
আবার মাথা নাড়ল রোশনি। ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলেন বৃদ্ধ একদম সামনে এসে দাঁড়ালেন। এতটাই কাছে যে তাঁর নিশ্বাসের উষ্ণতা টের পাচ্ছে রোশনি। কিন্তু এ বার আর সে ভয় পেল না। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলল, এখানে কোনও বিপদ নেই। কয়েক মুহূর্ত রোশনির চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ তার পরে স্পর্শ করলেন রোশনির হাত। রোশনির সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। কারেন্টে শক রোশনি ছোটো বেলায় বেশ কয়েক বার খেয়েছে কিন্তু এই অনুভূতি তেমনটা নয়। এ যেন বিশাল বিপুলায়তন এক চুম্বক তুলনায় অতিক্ষুদ্র এক চুম্বককে আকর্ষণ করছে। সেই টান এমন অমোঘ এক আত্মীয়তার যা খুব সহজেই নুনজলে গুলে ফেলে আস্ত হৃদয়। আচমকাই রোশনির চোখে জল এসে গেল। খুব নরম স্বরে বৃদ্ধ বললেন, ‘কেঁদো না মা।’
দুর্বোধ্য ভাষায় বৃদ্ধাকে কিছু একটা নির্দেশ দিলেন বৃদ্ধ। বৃদ্ধা দ্রুত গিয়ে কুটিরের ভেতর থেকে খেজুর পাতায় বোনা চাটাই এনে বিছিয়ে দিলেন দাওয়ায়। রোশনির হাত ধরে বৃদ্ধ নিয়ে গেলেন সে দিকে, ‘এসো। বোসো।’ রোশনি বসল। বৃদ্ধ বসলেন তার সামনে। বৃদ্ধা এগিয়ে দিলেন তামার গেলাসে সুশীতল জল আর কাঠের বাটিতে কয়েকটা খেজুর। খুব খিদে পেয়েছিল রোশনির। তেষ্টাও পেয়েছিল তেমন জোরে। সবক’টা খেজুর খেয়ে এক নিশ্বাসে জলটা শেষ করে সে বলল, ‘ধন্যবাদ।’
দু’জনেই স্মিত হাসলেন। এবার ঠোঁট নড়ল বৃদ্ধার। রোশনি শুনতে পেল তিনি বলছেন, ‘আর একটু জল খাবে?’
রোশনি এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে, ভাষা আলাদা হলেও ভাব প্রকাশে সমস্যা নেই। মনে মনে কিছু ভাবলেই এই বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা সেটা শুনতে পাচ্ছেন। ওঁদের কথাও বুঝতে পারছে সে। এখানে কথা বলার দরকার নেই। মনে মনে ভাবলেই চলে। সে মাথা নাড়ল, ‘নাহ। আর না।’
‘বেশ,’ এবার বৃদ্ধাও বসে পড়লেন রোশনির পাশে। বৃদ্ধ বললেন, ‘তোমার নাম কী মা?’
‘রোশনি।’
‘কী ভাবে এখানে এলে তুমি?’
আইসিস জঙ্গিদের তাড়া খাওয়া থেকে শুরু করে সবটা খুলে বলল রোশনি। গাছের আড়ালে লুকিয়ে রাখা বাইকটাও আঙুল দিয়ে দেখাল সে। শুনতে শুনতে আবার অবাক হয়ে গেলেন দু’জনে। বাইকটা নিয়ে বেশ কৌতূহল প্রকাশ করলেন বৃদ্ধ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দুনিয়াটা কত বদলে গেছে তাই না? সেই গিলগামেশ এসেছিল, তার পরে এই রোশনি। কত বছর হল বলো তো?’
রোশনি ভাবল, এঁরাও তার মতো কোনও ভাবে এখানে এসে পড়েছিল তার পরে এখানেই থেকে গেছে। মাঝে গিলগামেশ বলে কেউ একটা এসেছিল। কিন্তু সে কোথায়? তাকে তো দেখতে পাচ্ছে না। তবে কি সে এখান থেকে বাইরে যেতে পেরেছে? গিলগামেশ যদি যেতে পারে সেও পারবে। কিন্তু এঁরা কেন বলছেন দুনিয়া অনেক বদলে গেছে? কত দিন আগে এসেছিল লোকটা? বিশ বছর? তিরিশ বছর?
কর গুনছিলেন বৃদ্ধা। বৃদ্ধ তাড়া দিলেন, ‘কী গো বলো কত বছর হল?’
কর গোনা শেষ করে বৃদ্ধা মুখ তুললেন। থেমে থেমে বললেন, ‘সাড়ে চার হাজারের বেশি বই তো কম নয়।’
ছিটকে সোজা হয়ে দাঁড়াল রোশনি, ‘কত? কত বললেন?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘সাড়ে চার হাজার বছরের বেশি। সে কি আজকের কথা!’ ভুল হয়েছে। এই শয়তানের রাজত্বে কাউকে বিশ্বাস করাই ভুল হয়েছে। এই বুড়ো-বুড়ি তাকে মিথ্যে কথা বলছে। তার বিরুদ্ধে কোনও একটা ষড়যন্ত্র করছে। আর যদি এরা সত্যি বলে থাকে তা হলে তো এরা আরও মারাত্মক। গিলগামেশ যদি সাড়ে চার হাজার বছর আগে এখানে এসে থাকে তা হলে
এদের বয়স কত? এরা মানুষ নয়। মানুষ হতে পারে না এরা। এরা হয় ভগবান নয় শয়তান। না, নিশ্চিত শয়তান। কয়েক সেকেন্ড দু’জনের দিকে তাকিয়ে রইল রোশনি তার পরে বন্দুক ধরল বৃদ্ধের কপালে।
ভয় পাওয়া তো দূরস্থান, দু’জনের কেউ চমকালও না। দু’জনের শরীরী ভাষাতেই অদ্ভুত একটা বৈরাগ্য আছে। নির্লিপ্তি আছে। বিস্ময়ের ভাবটা থিতিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাদের মধ্যে মূলত উদাসীনতাই লক্ষ করেছে রোশনি। আর একটা জিনিস লক্ষ করেছে, এরা দু’জনেই খুব ধীর। সামান্য তাড়াটুকুও যেন এদের নেই। অবশ্য পাঁচ হাজার বছর ধরে যদি এরা বেঁচে থাকে তা হলে তাড়া না থাকারই কথা। এদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই ‘সময়ের দাম নেই’। নিরুত্তাপ কণ্ঠে বৃদ্ধ বললেন, ‘কী এটা? কোনও অস্ত্র?’
কঠিন গলায় রোশনি বলল, ‘আমার সঙ্গে চালাকি করার চেষ্টা করবেন না। আপনাদের সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই। আমাকে বলে দিন এখান থেকে কী ভাবে বেরোব? আমি চলে যাচ্ছি।’
রোশনির কথার উত্তর না দিয়ে বৃদ্ধ বললেন, ‘এটা কোন ধাতু? তামা বা ব্রোঞ্জ তো নয়।’
রোশনি বলল, ‘যে ধাতুই হোক, এর একটা গুলি কিন্তু আপনার মাথাটা ছাতু করে দেবে। তাড়াতাড়ি বলুন, কী ভাবে বেরোব এখান থেকে?’
বৃদ্ধ একটু হাসলেন। সে হাসিতে অপার করুণা। বললেন, ‘তুমি আমায় মারতে পারবে না মা। আমার মৃত্যু নেই। দেব এনলিলের বরে আমরা দু’জনেই অমর। চাইলে তুমি অস্ত্রচালনা করে দেখতে পারো।’
এক জন অশীতিপর বৃদ্ধের ওপর গুলি চালিয়ে দেবে এতটাও কসাই রোশনি নয়। কিছুক্ষণ আগের বলপ্রয়োগ করার ভাবনাটা যে ভুল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল সে। জঙ্গি শিবিরে গুলি চালিয়েছে প্রাণের দায়ে। এখানেও প্রাণের দায় আছে কিন্তু অমোঘ আত্মীয়তার টানটাও বড্ড প্রকট। এ বারে সে অনুভব করছে, এই বৃদ্ধ মিথ্যে বলছেন না। এত বিশ্বাসের সঙ্গে মিথ্যে বলা যায় না। বন্দুক ফেলে দিয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল রোশনি। অস্ফুটে বলল, ‘আমায় মাফ করুন। আপনারা কারা আমি জানি না কিন্তু দয়া করে আমাকে এখান থেকে বেরোনোর রাস্তা বলে দিন।’
রোশনির পিঠে হাত রেখে বৃদ্ধ বললেন, ‘নিশ্চয়ই বলব। আমরা চাই না কেউ এখানে থেকে যাক। আমরা ছাড়া কোনও জীবিত মানুষের এখানে থাকার কথাও নয়। এ যে জীবন আর মৃত্যুর মাঝের এক টুকরো ধূসর জায়গা। আমরা অমর কিন্তু এই দীর্ঘ জীবন আসলে অভিশাপ। এত দিন ধরে বেঁচে থাকায় কোনও সুখ নেই। আনন্দ নেই।’
রোশনি বলল, ‘আপনারা কারা?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘আমি শুরুপ্পক নগরের রাজা উত নাপিশতিম আর ও আমার স্ত্রী। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে ভয়াবহ এক বন্যার সৃষ্টি করেছিলেন দেবতারা। মানুষের সভ্যতাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। তখন দেব এনকির নির্দেশে মানুষের সৃষ্টি করা বিজ্ঞান, শিল্প, কৃষি, ধাতুবিদ্যার নানা নিদর্শন, এক জোড়া করে সব পশুপাখি আর আমার কিছু লোকজন নিয়ে আমি নৌকা করে ভেসে পড়ি। ছয় দিন, ছয় রাত পরে বন্যার জল নামলে ডাঙা খুঁজে পাই। নতুন করে মানবসভ্যতার বীজ রোপণ করি। তাতেই দেব এনলিল খুশি হয়ে আমাকে আর ওকে অমরত্বের বর দেন। নতুন করে মানবসভ্যতা তৈরি করার পরে আমি আর ও এখানে চলে এসেছিলাম। তখন থেকেই আমাদের জীবনে অখণ্ড সময়, অপার শান্তি।’
অবাক হয়ে রোশনি ভাবল, ‘এ তো বাইবেলের নোয়ার গল্প। নোয়ার নৌকা। উত নাপিশতিম তবে সুমেরীয়দের নোয়া!
বৃদ্ধ বললেন, ‘সাড়ে চার হাজার বছর আগে গিলগামেশ এসেছিল। তার পরে তুমি এলে। এর মাঝে আর কেউ আসেনি। আমি তোমাকেও এখান থেকে বেরোনোর রাস্তা বলে দেব তবে তার আগে তোমাকে আমার গল্প শুনতে হবে।’
আশার আলো জ্বলে উঠল রোশনির মুখে, ‘গল্প শুনলেই বেরোনোর রাস্তা বলে দেবেন?’
‘দেব। আমরা মিথ্যে বলি না। কিন্তু একটা শর্ত আছে মা।’
ভুরু কুঁচকে গেল রোশনির, ‘কী শর্ত?’
‘গল্পটা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া চলবে না।’
‘ঘুমোব কেন?’
‘কারণ আমার গল্পটা বেশ লম্বা আর মোটেই খুব একটা উত্তেজনাপূর্ণ নয়। ওই ছয় দিন, ছয় রাত ধরে আমরা যে নৌকা চালিয়েছিলাম তার গল্প। সেই যাত্রাপথের বিবরণ।’
‘বুঝেছি। আপনি শুরু করুন।’
বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন বৃদ্ধ। বৃদ্ধা ঘরের ভেতর থেকে রুটি বানানোর সরঞ্জাম বার করে দাওয়াতেই রুটি বানাতে বসে গেলেন। রোশনি ভাবল, গল্প শোনা হয়ে গেলে খাওয়া-দাওয়া হবে। কিন্তু বৃদ্ধের মুচকি হাসির অর্থটা সে ধরতে পারল না।
বৃদ্ধ গল্প বলা শুরু করলেন। শুরুপ্পক নগরে কী ভাবে রাজ্য শাসন করতেন সেই দিয়ে গল্প শুরু হয়েছে। গল্প বলার ধরনটা খুব একঘেয়ে আর বলেই চলেছেন তিনি। এত বোরিং কথক জীবনে দেখেনি রোশনি। ওদের কলেজে একজন অধ্যাপক ছিলেন এসকেডি, তাঁকে ওরা ‘বোরিংসম্রাট’ আখ্যা দিয়েছিল। ওরা মজা করে বলত, যারা অ্যাকিউট ইনসমনিয়ায় ভুগছে তারা যদি এসকেডি-র ক্লাসে আসে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। রোশনি ভাবল, ওর বন্ধুরা কেউ এই বৃদ্ধের গল্প শোনেনি। ইনি এসকেডি-র চেয়েও ভয়াবহ। এই জন্যই শুরুতে ঘুম পাওয়ায় ব্যাপারটা বলে দিয়েছিলেন বৃদ্ধ। যদিও ঘুম পায়নি কিন্তু একটানা বসে থেকে রোশনির কোমর ধরে গেল। এখানে তো ছাতা সময়ের হিসেবটাও বোঝা যায় না। উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে সে আবার বসল। বলল, ‘আচ্ছা, কতক্ষণ লাগবে এই গল্পটা শেষ হতে?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘বাইরের পৃথিবীর হিসেবে ছয় দিন, ছয় রাত।’
শিউরে উঠল রোশনি। সে টের পেল, ভয় নামের অনুভূতিটা আবার আরশোলার মতো তার পিঠ বাইছে। সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে সেই অস্বস্তি। কাঁপা গলায় সে বলল, ‘ছ’দিন? ওহ মাই গড! ছ’দিন একটানা জেগে থাকব কী করে? আচ্ছা যদি আমি ঘুমিয়ে পড়ি কী হবে?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘বলছি। তার আগে ওই রুটিটা দেখো।’
রোশনি দেখল, বৃদ্ধা একটা ফুলকো গোল রুটি বানিয়ে একটা তামার পাত্রে রাখলেন। বৃদ্ধ বললেন, ‘ওই রুটিটা হল গিয়ে তোমার চেতনা। যেই তোমার ঘুম পাবে ওমনি রুটিটার গায়ে ছাতা পড়তে শুরু করবে। ফলে তুমি আমাদের বলতে পারবে না যে তুমি ঘুমোওনি বা তোমার ঘুম পায়নি।’ অস্থির হয়ে রোশনি বলল, ‘বুঝেছি। আপনারা আটঘাট বেঁধে নেমেছেন। এবার বলুন ঘুমিয়ে পড়লে কী হবে?’
থেমে থেমে বৃদ্ধ বললেন, ‘রুটিটায় পোকা লেগে যাবে আর তুমি কোনও দিন তোমার পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারবে না। আমাদের সঙ্গেই তোমায় থেকে যেতে হবে অনন্তকাল।’
পিঠ বাইতে বাইতে ভয়টা এবার রোশনির ঘাড় কামড়ে ধরল। এত ভয় সে জীবনে কোনও দিন পায়নি। গেনু নামের ছেলেটা যখন তাকে মারতে এসেছিল বা জঙ্গিরা যখন তাকে ধর্ষণ করার কথা বলছিল তখনও না। এমনকী বিছে-মানুষের মুখোমুখি হয়েও না। রোশনি বুঝতে পারল, সে একটা মাকড়সার জালের ঠিক মাঝখানে আটকে পড়েছে। যত বেরোনোর চেষ্টা করছে ততই জড়িয়ে যাচ্ছে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ। কাঁপা গলায় সে বলল, ‘জল।’
রোশনির প্রতিক্রিয়ায় কোনও হেলদোল হল না বৃদ্ধের। জলের গেলাস এগিয়ে দিয়ে তিনি ফের তাঁর সেই একঘেয়ে গল্প বলতে শুরু করলেন। ঘুম নামের অদৃশ্য এক লোমশ ভল্লুক ঘুরে বেড়াতে শুরু করল রোশনির চারপাশে। তার নিশ্বাসের শব্দ পেতে লাগল রোশনি। কিছুক্ষণ পাথরের মতো বসে রইল সে তার পরে আচমকাই ঠিক করে নিল, যাই হয়ে যাক সে ঘুমোবে না। সে কথা দিয়ে এসেছে, পল্লবকে ওই নরক থেকে বার করবে। তাকে ঘুমোলে চলবে না। উত নাপিশতিম জানেন না, জীবন আর মৃত্যুর মাঝে ধূসর জগতে রোশনি এই প্রথম বার আসছে না। একটা সময় সে জীবত হয়েই কাটিয়েছে। বাবার অপমানে রোজ মরে যেতে ইচ্ছে করত আর মায়ের মুখ চেয়ে বেঁচে থাকতে হতো। মায়ের মৃত্যুর পরে তো জীবনটা মরুভূমির চেয়েও শুকনো হয়ে গেছিল। সেই রুক্ষতায় অভ্যস্তও হয়ে গেছিল সে। মাঝখান থেকে আষাঢ় মাসের প্রথম দিনের ভারী ব্যাপক বৃষ্টির মতো পল্লব তার জীবনে এসে পড়ল। এসে পড়ল বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল হয়ে। মরুভূমিতে জলাভূমির সৃষ্টি হল। তাতে জন্ম নিল প্রাণ। ধীরে ধীরে তৈরি হল আস্ত একটা বাস্তুতন্ত্র। ভালোবাসার খেলনাবাড়ি। হলই বা খেলনা তবু বাড়ি তো! মানুষ তো সারাজীবন ধরে নিজের একটা বাড়ি বানাতে চায়। পল্লব জানে না, কোনও এক দিন, এক দিনের জন্যও সে রোশনির কাছে এসে থাকতে পারে এই আশায় রোশনি তার দুই কামরার ফ্ল্যাটটাকে বাড়ি বানিয়ে তুলেছে। পল্লবের জন্য কিনে রেখেছে নতুন ব্রাশ। ঘরে পরার হাওয়াই চটি। দুটো নতুন বারমুডা। দুটো টি-শার্ট। পল্লবের পছন্দের পারফিউম। বাথরুমের শাওয়ারটা খারাপ হয়ে গেছিল। রোশনির অসুবিধে হতো না বালতিতে চান করতে। কিন্তু শাওয়ারটা ঠিক করিয়েছে সে। বাথরুমে বসিয়েছে নতুন গিজার। লাগিয়েছে আয়না। আয়নার সঙ্গে একটা তাকও আছে। সেখানে রেখে দিয়েছে শেভিং জেল, রেজর আর আফটার শেভ লোশন। পল্লব যদিও দাড়ি রাখে কিন্তু রোশনির কাছে এসে দাড়ি কামাতে চাইতেও তো পারে। তখন? বালিশগুলোয় নতুন তুলো ভরেছে রোশনি। শিমুল তুলো। শিমুল তুলো ব্যাপারটাই ভারি রোম্যান্টিক। যেন তুলোর নরম আর শিমুল ফুলের উজ্জ্বল লাল রং মিলেমিশে যায়। সে রক্তিম পেলবতায় মাথা রেখেও সুখ। রোশনির খুব ইচ্ছে করে পল্লবের কোলে মাথা রেখে শুতে। লজ্জায় চমকে ওঠে সে। না না, সে কিছুতেই বেশিক্ষণ পল্লবদার কোলে শুয়ে থাকতে পারবে না। তার ভেতরের রাক্ষুসিটা জেগে উঠবে। পল্লবদাকে গিলে নেবে সবটা তার পর গেঁথে নেবে নিজের মধ্যে। গলিত লাভায় পুড়ে খাক হয়ে যাবে ভেতরটা। আহ! কী আকাঙ্ক্ষিত এই দহন। রোশনি কোনও দিন এ কথা মুখ ফুটে পল্লবকে বলতে পারবে না। কিন্তু ভাবতে তো পারবে। বাস্তবে হলই বা পল্লব অন্য কারও কিন্তু তার মনের গহনে, তার স্বপ্নকল্পনায় পল্লব পুরোপুরি তার। যাই হয়ে যাক, পল্লবকে দেওয়া কথা রাখতেই হবে। এই মৃত্যুপুরী থেকে বাইরে বেরোতেই হবে। দাঁতে দাঁত চেপে সোজা হয়ে বসল রোশনি। বুড়ো তাকে ছয় দিন, ছয় রাত ধরে বোরিং নৌকাযাত্রার গল্প শোনাবে তো? শোনাতে থাক। সে ডুব দেবে নিজের কল্পনায়। সে এই মুহূর্ত থেকে মনে মনে পল্লবের সঙ্গে আন্দামানে রওনা দেবে। যাত্রাপথের প্রতিটা মিনিট মনে মনে ভাববে। সেও দেখবে কেমন করে ঘুম আসে!
বৃদ্ধ বলে চললেন। রোশনির কানে ঢুকল না সে সব। সে ভাবতে শুরু করল একদম গোড়া থেকে। যেন তার বাড়ির দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল। দরজা খুলেই সে দেখল, ট্রলি ব্যাগ হাতে পল্লব দাঁড়িয়ে আছে। পল্লব বলল, ‘রেডি?’
সে মাথা নাড়ল। তার পরে দরজায় তালা দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল নীচে। উঠে পড়ল ট্যাক্সিতে। বাইপাস ধরে ট্যাক্সি ছুটল এয়ারপোর্টের দিকে।
***
ছয় দিন, ছয় রাত পরে উত নাপিশতিম যখন তাঁর গল্প বলা শেষ করলেন, রোশনি তখন সবে হ্যাভলকে তিন দিন কাটিয়ে নীল আইল্যান্ডে পৌঁছেছে। পল্লব তার হাত ধরে তাকে ক্রুজ থেকে নামাচ্ছে। নীলের নিবিড় নীল জলরাশি তাদের স্বাগত জানাচ্ছে।
বিপুল বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন উত নাপিশতিম আর তাঁর স্ত্রী। গিলগামেশও যা পারেনি এই মেয়েটি পেরেছে। অসাধ্যসাধন করেছে। ছয় দিন, ছয় রাত ধরে একটানা জেগে থেকেছে। ঘুমকে ধারেকাছে আসতে দেয়নি। কী করে পারল মেয়েটি? মেয়েটির মনের গহনে ডুব দিলেন মহাবৃদ্ধ আর দিতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ভালোবাসার এমন বিশুদ্ধতম প্রকাশ তিনি গত পাঁচ হাজার বছরে দেখেননি।
