লাপিস লাজুলি – ২২
॥ বাইশ ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
ছ’দিন হয়ে গেছে কিন্তু এখনও সংকেতটা উদ্ধার করা যায়নি। সঞ্জয়কে দেখতে পাগলের মতো লাগছে। চুল উশকোখুশকো। গালে দাড়ি। চোখ লাল। কাগজ পেন ছেড়ে সে হোটেল রুমের দেওয়ালে অবধি নানা রকমের আঁক কষেছে। হোটেল অথরিটি জানিয়ে দিয়েছে, এর জন্য বেশ মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাকি সাহেব তাতেও রাজি। যত দিন যাচ্ছে তাকি সাহেবের অস্থিরতা তত বাড়ছে। ভদ্রলোকের অসহায়তাটা বুঝতে পারছে অপালা। সে তো নিজেও একই রকম অসহায় বোধ করছে। দলের এক জন প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও তারা কোনও সাহায্য করতে পারছে না। ভাদুড়িমশায়কেও সূত্রটা পাঠানো হয়েছে কিন্তু তিনিও বলেছেন, ‘এ আমার সাধ্যের বাইরে।’
অমিয় আর সমীরণও চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁরাও কিছু উদ্ধার করে উঠতে পারেননি।
এত কাছে এসেও কি তবে অধরা থেকে যাবে দেবীর দণ্ড? এক একটা সময় তো রীতিমতো হতাশ লাগছে। তবে তার থেকেও বেশি মায়া লাগছে সঞ্জয়ের জন্য। যত সময় গড়াচ্ছে সঞ্জয় তত খিটখিটে হয়ে উঠছে। মাঝে তিন দিন তো এমন জ্বর হল বিছানা থেকে মাথা তুলতে পারছিল না। গত দু’দিন একটু ভালো আছে। হোটেলের রেস্তরাঁ থেকে সঞ্জয়ের জন্য একটা কাস্টার্ড নিয়ে এসে অপালা দেখল, সঞ্জয় মাটিতে উবু হয়ে বসে আছে। সামনে একগাদা কাগজ ছড়ানো। অপালা ডাকল, ‘ওঠো। রাত দশটা বাজে। ডিনার তো করলে না। এটুকু খেয়ে নাও।’
উঠতে চাইছিল না সঞ্জয়। তার হাত ধরে টেনে এনে বিছানায় বসাল অপালা। একটু কাস্টার্ড চামচে কেটে বলল, ‘হাঁ করো।’
বাধ্য ছেলের মতো গোটা কাস্টার্ডটা খেয়ে নিল সঞ্জয়। প্রায় এক বোতল জল খেয়ে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুখ মুছে বলল, ‘তুমি শুয়ে পড়ো। আমি আর একটু জাগব।’
মাথায় হাত বুলিয়ে অপালা বলল, ‘না। তুমিও শুয়ে পড়বে।’
রেগে গেল সঞ্জয়, ‘শুয়ে পড়ব? মাঝের চারটে নম্বর ‘ফিবোনাচি সিরিজ’, তাও কমপ্লিট নয়, এ ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝতে পারিনি, এখন শুয়ে পড়ব?’
‘দাদু কী বলেছেন ভুলে গেলে? তুমি প্রচণ্ড বেশি রকম একসাইটেড হয়ে আছ। এই অবস্থায় তোমার মাথা কাজ করবে না। এত চাপ নিয়ো না প্লিজ। আজ রেস্ট নাও। কাল সকালে ঠান্ডা মাথায় ভাবো। ঠিক সলভ করে ফেলবে। এসো। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিই। দু’দিনও হয়নি জ্বর ছেড়েছে। এখন রাত জাগলে জ্বরটা কিন্তু ফিরে আসতে পারে। তখন কিন্তু আরও ফ্রাস্টেটেড হয়ে যাবে।’
সঞ্জয়কে আর কথা বাড়াতে না দিয়ে টেনে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল অপালা। এখানে রাতের দিকে বেশ শীত লাগে। গায়ে একটা চাদর চাপা দিয়ে দিল। এতটাই ক্লান্ত ছিল সঞ্জয়, অপালা চুলে বিলি কাটতে-না-কাটতেই ঘুমে তলিয়ে গেল।
ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখল সঞ্জয়। পল্লব আর সে মরুভূমির মাঝখানে একটা জিপে বসে আছে। জিপের গায়ে আবার জংলি লতা গজিয়েছে। জিপটাকে চিনতে পারল সঞ্জয়। এ তো প্রেসিডেন্সি কলেজের জিওলজি ডিপার্টমেন্টের সেই জিপটা। যেটা মেইন বিল্ডিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। বহু দিন না চলে চলে জিপটার চাকা মাটিতে বসে গেছিল। জিপের গা বেয়ে গজিয়েছিল বুনো লতা আর বোগেনভিলিয়া। এই জিপে উঠতে গিয়েই অমিয় এক বার বোলতার কামড় খেয়েছিল। সেই নিয়ে কী হাসাহাসি! সেই জিপটার মধ্যে বসেই গল্প করছে সে আর পল্লব। পল্লব বলছে, ‘বৈষ্ণব পদাবলির ওপরে এমন একটা বই লিখব যেটা রিকশাওলাও পড়ে বুঝতে পারবে।’
সঞ্জয় বলছে, ‘বৈষ্ণব পদাবলি রিকশাওলার কী কাজে লাগবে?’
পল্লব মাথা চুলকোচ্ছে। হঠাৎ খুব রেগে গিয়ে বলল, ‘অ্যাকাডেমিকসটা একটা বদ্ধ জলা। এখানে শুধু ভোঁদড়ের চাষ হয়। থাকবই না এখানে।’
এমন সময় অমিয় এল। বলল, ‘সরে বোস।’
পল্লব আর সে সরে গিয়ে অমিয়কে বসতে দিল। বসতে বসতেই অমিয় বলল, ‘এখন যদি প্রতিম চলে আসে ও কোথায় বসবে? সিট তো তিনটে।’
পল্লব বলল, ‘ঠিকই তো। আচ্ছা সঞ্জয়, তুই তো এত জানিস, তিন নম্বরটার এত খাতির কেন বল দেখি? তিনটে ভুবন, তিনটে দেবতা, তিনটে নয়ন, তিনটে সত্যি, ম্যাকবেথের তিনটে উইচ এমনকী ট্রেনে-বাসে-গাড়িতে তিনটে করে সিট! কেসটা কী?’
সঞ্জয় বলল, ‘তিন সংখ্যাটাই তো খুব স্পেশাল। দুনিয়ার সব ধর্মে, সব সংস্কৃতিতেই তিনকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। আসলে তিনের মধ্যে একটা পূর্ণতার ধারণা রয়েছে। আদি, মধ্য আর অন্ত।’
পল্লব বলল, ‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু কেন?
সঞ্জয় বলল, ‘অন্য কনটেক্সটগুলো আমি অত ভালো জানি না কিন্তু গণিত শাস্ত্রে তিন সম্ভবত সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং নম্বর।’
‘কেন? বুঝিয়ে বল,’ বলল অমিয়।
একটু ভেবে নিয়ে সঞ্জয় বলল, ‘পিথাগোরাসের নাম শুনেছিস তো? গ্রিসের বিখ্যাত গণিতবিদ। তিন ছিল পিথাগোরাসের সবচেয়ে প্রিয় নম্বর। এক এক করে বলি, তিন হল প্রথম মৌলিক সংখ্যা যার নীচের সংখ্যাগুলোর যোগফল সে নিজে। মানে ১ + ২ ৩। এটা কিন্তু অন্যগুলোর ক্ষেত্রে হবে না। মানে ধর পরের মৌলিক সংখ্যা ৫। তার নীচের সংখ্যাগুলোর যোগফল কিন্তু ৫ নয়। ১ + ২ + ৩ + ৪ = ১০। তার পরে আরও একটা মজা আছে ৩ আর তার নীচের সংখ্যাগুলো যোগ করলে যা হয়, গুণ করলেও তাই হয়। ১ + ২ + ৩ ৬, আবার ১ × ২ × ৩ = ৬। এটাও কিন্তু অন্য কোনও সংখ্যার বেলায় হবে না।’
লাফিয়ে উঠল পল্লব, ‘হেবি ব্যাপার তো। আর কী কোয়ালিটি আছে তিনের?’
সঞ্জয় বলতে গেল কিন্তু তার আগেই দেখল, অপালা গিয়াসুদ্দিনের সূত্র লেখা কাগজটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে আর প্রেসিডেন্সি কলেজের বদলে সে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিস্তীর্ণ মরুভূমির মাঝখানে। সেখানে বালির ওপর ফুটে উঠেছে দুটো সংখ্যা, ৩ আর ৪। ধীরে ধীরে ৩ মুছে গিয়ে শুধু জেগে রইল ৪। ক্রমশ সেটা বড়ো হতে লাগল।’
স্বপ্নটা ভেঙে গেল। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল সঞ্জয়। অপালা ঘুমোচ্ছিল। এক ধাক্কায় তাকে তুলে দিয়ে বলল, ‘সমাধান করে ফেলেছি। উত্তরটা তিন।’
কয়েক সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইল অপালা তার পরে বাঘিনির মতো সঞ্জয়ের ঠোঁট কামড়ে ধরল। ধাক্কা মেরে ফের শুইয়ে দিয়ে চেপে বসল তার ওপরে। কয়েক মূহূর্তের মধ্যে জেগে উঠল সঞ্জয়ও। ওপরে থেকেই তাকে নিজের ভেতরে নিয়ে নিল অপালা। সব ভুলে আদিম প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেল দুই নর-নারী।
কিছুক্ষণ পরে ধাতস্থ হয়ে সঞ্জয় বলল, ‘এটা কী হল?’
জামা পরতে-পরতে অপালা বলল, ‘তিতাস হারিয়ে যাওয়ার পরে এত দিনে এই প্রথম বার হল। টেনশনও তো রিলিজ করতে হয় না কি? নাও এবার বলো কী সমাধান করেছ।’
নিজেকে গুছিয়ে নিতে একটু সময় লাগল সঞ্জয়ের। তার পরে বলল, ‘উত্তরটা চোখের সামনেই ছিল কিন্তু দেখতে পাচ্ছিলাম না। উত্তরটা হল, তিন। হালাকু খাঁ সম্পর্কে গিয়াসুদ্দিন ন’টা বিশেষণ লিখেছিলেন। পালমাইরার ইশতার মন্দিরে ন’টা থাম। আমার মন বলছে, মন্দিরের তিন নম্বর থামটায় কিছু একটা আছে। ওখানেই দেবীর দণ্ডের হদিশ লুকিয়ে রেখেছেন গিয়াসুদ্দিন। তাকি সাহেবের কাছে চলো।’
অপালা বলল, ‘যাব। তার আগে আমাকে বোঝাও কী করে সংকেতটা ভাঙলে?’
‘তোমাকে আর তাকি সাহেবকে একসঙ্গে বোঝাই?’
‘অবভিয়াসলি না’, খর গলায় বলল অপালা, ‘আমার প্রেমিক দ্য গ্রেট গিয়াসুদ্দিন আল তুসির সংকেত উদ্ধার করেছে আর সেটা আমি তাকি সাহেবের সঙ্গে বসে শুনব? নেভার। আমি আগে একা শুনব। দরকারে তাকি সাহেবকে আবার বলবে। কেন? দু’বার বলতে তোমার কষ্ট হবে?’
অপালার চোখ দেখে সঞ্জয়ের অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল। ‘প্রেমিকা বা বউকে যে পুরুষ ভয় পায় না সে পুরুষই নয়।’ পল্লবের এই সূত্র মেনে সঞ্জয় বিছানায় বসেই হাত বাড়িয়ে একটা কাগজ আর কলম টেনে নিয়ে খসখস করে গিয়াসুদ্দিনের সূত্রটা লিখে ফেলল।
‘*, 8, ৬
৬, ১০, ১৫
২, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫
৫, ৭, ১১, ১৭’
তার পরে কোনও ভণিতা না করে সোজা বিষয়টায় ঢুকে গেল, ‘এই গোটা সিরিজটায় আমাকে সবচেয়ে ঝামেলায় ফেলেছিল এই ৪ সংখ্যাটা আর সিরিজের তিন নম্বর ধাপের সিকোয়েন্সটা, ‘২, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫’। ৪ নিয়ে পরে বলছি। তার আগে সিকোয়েন্সটা নিয়ে বলি। সিকোয়েন্সটা দেখে আমি বুঝতে পারছিলাম, এটা একটা আধখ্যাচড়া ফিবোনাচি সিরিজ। ফিবোনাচি সিরিজ কাকে বলে জানো তো?’
‘না।’
‘ওকে। ফিবোনাচির আসল নাম লিওনার্দো বোনাচি। ইতালির মানুষ ১২০২ সালে তাঁর বিখ্যাত বই ‘লাইবার অ্যাবাচি’-তে তিনি এই সিরিজের উল্লেখ করেন। এটা এমন একটা সিরিজ যেখানে প্রতিটি উপাদান তার পূর্ববর্তী দুটো উপাদানের যোগফল। যেমন ০ + ১ = ১, ১ + ২ = ৩, ২ + ৩ = ৫, ৩ + ৫ = ৮, ৫ + ৮ = ১৩, ৮ + ১৩ = ২১, ১৩ + ২১ = ৩৪। বুঝলে?’
‘মোটামুটি।’
‘এটা অঙ্কের একটা খুব সেলিব্রেটেড সিরিজ। কেন সেলিব্রেটেড সে জটিলতায় আর যাচ্ছি না। কিন্তু মুশকিল হল, গিয়াসুদ্দিনের সূত্রে এই সিরিজে চারটে সংখ্যা মিসিং। ০, ১, ৩ আর ৫। আমি বাকি সিকোয়েন্সগুলোর সঙ্গে ৩-এর যোগাযোগ খুঁজে পাচ্ছিলাম। প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল হারানো সংখ্যাটা ৩, কিন্তু ওই ৪ আমাকে ঘেঁটে দিচ্ছিল বার বার।’
‘এক মিনিট দাঁড়াও, তুমি বললে ১২০২ সালে ফিবোনাচি প্রথম এই সিরিজের কথা বললেন। আমি ভাবছি, গিয়াসুদ্দিন ১২৬৫-র পরে এই সংকেত তৈরি করছেন। তত দিনে কি ফিবোনাচি সিরিজ তিনি জেনে গিয়েছেন?
‘এখানেই গিয়াসুদ্দিনের শ্রেষ্ঠত্ব অপালা। ফিবোনাচি না জানলেও তিনি ‘পিঙ্গলসূত্র’ নিশ্চিত জানতেন।’
‘পিঙ্গলসূত্র?’
‘হ্যাঁ, আচার্য পিঙ্গল। প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ ও কবি। অনেকে মনে করেন এই পিঙ্গল বৈয়াকরণ পাণিনি-র ভাই। খ্রিস্টের জন্মের তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শতকের মধ্যে তিনি সংস্কৃত ছন্দের ওপর একটি বই লিখেছিলেন যেটার আর এক নাম ‘পিঙ্গলসূত্র’। পরে হলায়ুধ-এর টীকা লেখেন। সেই বইতে কিন্তু পক্ষান্তরে এই ফিবোনাচি সিরিজের উল্লেখ করেছিলেন পিঙ্গল। ফলে গিয়াসুদ্দিনের লাইবার অ্যাবাচি পড়া না থাকলেও পিঙ্গলসূত্র পড়া ছিল এটা নিশ্চিত।’
‘কী অদ্ভুত মেধা তাই না সঞ্জয়,’ অপালার কণ্ঠ দ্রব হয়ে এল শ্রদ্ধায়।
সঞ্জয় বলল, ‘সত্যিই তাই। এতগুলো ভাষা তার সঙ্গে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, দর্শন আর কী কী জানত লোকটা কে জানে!’
অপালা বলল, ‘যাই হোক, এবার ৪ নিয়ে বলো।’
‘বলছি। তার আগে ৩ আর ৫-এর মধ্যে বাকি সিকোয়েন্সগুলো ৩ কেন নির্দেশ করছে সেটা আগে বলে নিই?’
‘বলো।’
‘সিরিজের দ্বিতীয় ধাপের সিকোয়েন্সটা দেখি এ বার। ৬, ১০, ১৫। এই তিনটেই ট্রায়াঙ্গুলার নাম্বার। অর্থাৎ এই প্রত্যেকটা সংখ্যাকে বিন্দুতে সাজালে ত্রিভুজ বানানো সম্ভব,’ সঞ্জয় এঁকে ফেলল,
৬ দিয়ে ত্রিভুজ।
১০ দিয়ে ত্রিভুজ।
বলল, ‘এই ভাবেই ৩ দিয়ে সবচেয়ে ছোটো ত্রিভুজ বানানো সম্ভব। আর ৩ একমাত্র মৌলিক সংখ্যা যেটা ট্রায়াঙ্গুলার নাম্বার। ৬, ১০ বা ১৫ কোনওটাই মৌলিক সংখ্যা নয়। এর পরে শেষ সিকোয়েন্সটাই আসি। ৫, ৭, ১১, ১৭। এরা প্রত্যেকে প্রাইম নাম্বার মানে মৌলিক সংখ্যা। ৫ আর ৭ হল টুইন প্রাইম, দুইয়ের গ্যাপ। ৭ আর ১১ কাজিন প্রাইম, চারের গ্যাপ। ১১ আর ১৭ সেক্সি প্রাইম, ছয়ের গ্যাপ।
‘কী প্রাইম?’
‘সেক্সি প্রাইম,’ হেসে বলল সঞ্জয়, ‘লাতিন শব্দ সেক্স মানে সিক্স। সেখান থেকে সেক্সি। তো এই সিরিজে ৫-এর আগের টুইন প্রাইম নম্বর ৩। সেইটা এই সিরিজে মিসিং। এর পরে আসি প্রথম সিকোয়েন্সে। *, ৪, ৬। ৬ কিন্তু সেই ৩-কেই ইঙ্গিত করছে। ৩-এর আগের দুটো সংখ্যার সঙ্গে ৩ যোগ বা গুণ যাই করো না কেন ফলাফল ৬। এটাই তিনের ম্যাজিক। এই প্রপার্টিটা ৩ ছাড়া অন্য কারও নেই। কিন্তু এত কিছুর পরেও বাদ সাধছিল ৪। ৩ আর ৪-এর কী সম্পর্ক আমি কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না। অবশেষে স্বপ্ন দেখলাম। ৩ আর ৪ মিলেমিশে গিয়ে জেগে রইল ৪। আমিও উত্তর খুঁজে পেলাম। ৩ হল কোনও সংখ্যার বর্গের আগে বসা একমাত্র মৌলিক সংখ্যা। ২-এর বর্গ ৪। ৪-এর আগে ৩। আর কোনও সংখ্যার বর্গের আগে মৌলিক সংখ্যা বসে না। ৩ থেকে দেখি। ৩-এর বর্গ ৯। ৯-এর আগে ৮ মৌলিক সংখ্যা নয়। তেমনই ৪-এর বর্গ ১৬, ৫-এর বর্গ ২৫, ৬-এর বর্গ ৩৬, ৭-এর বর্গ ৪৯। এদের আগে বসা সংখ্যাগুলো যথাক্রমে ১৫, ২৪, ৩৫, ৪৮ কোনওটাই মৌলিক সংখ্যা নয়। গিয়াসুদ্দিন আসলে ৪ আর ৬-কে এক সিরিজে বসিয়ে আমাকে ঘেঁটে দিয়েছিলেন।’
‘বুঝলাম। কিন্তু ফিবোনাচি সিরিজটা যদি ২ থেকেই শুরু ধরি ৩ আর ৫ উহ্য রাখলেন কেন? সব সিরিজে তো একটা করে সংখ্যা মিসিং। তা হলে?’
‘ওটাও ভেবেছি। আর আসলে ৫৫-তে দুটো ৫ আছে তো, তাই ইচ্ছে করেই হয়তো ৫ রাখেননি। আরও রাখেননি কনফিউজ করে দেওয়ার জন্য। যেটায় তিনি খুব ভালো করেই সফল হয়েছিলেন।’
‘আমি যেটা বুঝলাম গিয়াসুদ্দিন এই তিন সংখ্যাটা নিয়ে অবসেসড ছিলেন।’
‘হওয়ারই কথা। তুমিই তো বলেছিলে উনি গ্রিক থেকে পিথাগোরাস আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন। তিন তো পিথাগোরাসেরও প্রিয় সংখ্যা ছিল। ছোটোবেলায় পড়েছ পাইয়ের মান ২২/৭ সে তো তিনের খুব কাছাকাছি। আমি হদ্দ বোকা যে এই ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল। নয়তো তিনের কান ধরতে এত সময় লাগত না।’
সঞ্জয়ের বলা শেষ। দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। দুজনেই যেন মনে মনে প্রণাম জানাতে লাগল মহাজ্ঞানী গিয়াসুদ্দিনকে। অবশেষে নীরবতা ভেঙে সঞ্জয়ই বলে উঠল, ‘চলো, এবার তাকি সাহেবের কাছে যাওয়া যাক। উনিও খুব টেনশনে আছেন।’
অপালা বলল, ‘যাচ্ছি তার আগে এই কাগজটার ছবি দাদুকে পাঠিয়ে দিই। এখন এখানে সাড়ে এগারোটা মানে দেশে রাত দুটো। দাদু ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে থাকলে ফোন করতাম। হোয়াটসঅ্যাপ করে রাখি, দাদু ভোরে উঠে দেখে নেবে।’
সঞ্জয়ের আঁক কষা কাগজটা আর আগের দিন তাকি সাহেবের সঙ্গে তোলা সেলফিটা ভাদুড়িমশায়কে হোয়াটসঅ্যাপ করে দিল অপালা। এই ছবিটা পাঠাব-পাঠাব করেও পাঠানো হয়নি। লিখল, ‘দাদু আমরা পেরেছি। ধাঁধার উত্তর ৩।’
এক বার টোকা মারতেই দরজা খুলে দিলেন তাকি সাহেব আর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দু’জনের উজ্জ্বল মুখ দেখে নিমেষে ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিলেন। টান মেরে দু’জনকে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে বললেন, ‘পেয়েছ?’
উত্তেজনায় কাঁপছে প্রৌঢ়ের গলা। সঞ্জয় বলল, ‘পেয়েছি স্যার। উত্তরটা তিন। খুব যদি ভুল না হই তা হলে মন্দিরের তিন নম্বর থামের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপের হদিশ দেওয়া আছে।’
দমাস করে টেবিলের ওপর একটা ঘুসি মারলেন তাকি সাহেব। চিৎকার করে বললেন, ‘আমি জানতাম তোমরা পারবে। আমি ভুল লোককে দায়িত্ব দিইনি। পাঁচ হাজার বছর ধরে যে জিনিস মানুষের অধরা আজ তার খুব কাছে চলে এসেছি আমরা। সেটা শুধু তোমাদের জন্য। আহ! আমার এত দিনের স্বপ্ন!’
দু’হাতে মুখ ঢেকে চেয়ারে বসে পড়লেন তাকি সাহেব। একটু পরে ধাতস্থ হতেই সঞ্জয় উৎসাহী গলায় বলল, ‘কী ভাবে সংকেতের উত্তর বার করলাম দেখবেন স্যার?’
মাথা নাড়লেন তাকি সাহেব, ‘সে আর দেখার দরকার নেই। তোমার বিবেচনার ওপর আমার আস্থা আছে।’
কথাটা শুনে সঞ্জয় একটু মিইয়ে গেল। মিইয়ে যাওয়ারই কথা। এত বড়ো একটা কাজ করেছে সে, তার তো ইচ্ছে করবেই তাকি সাহেবের মতো বিদগ্ধ মানুষকে নিজের কেরামতিটা দেখায়। কিন্তু তার পরেই তাকি সাহেব যে কথাটা বললেন তাতে সঞ্জয় আর অপালা দু’জনেই চমকে উঠল। প্রৌঢ় বললেন, ‘চলো। আমাদের বেরোতে হবে।’
অপালা বলল, ‘এখন!’
তাকি সাহেব বললেন, ‘হ্যাঁ এখনই।’
অপালা বলল, ‘এত বছর অপেক্ষা করেছেন স্যার, রাতটুকু অপেক্ষা করলে হয় না? কাল ভোর-ভোর বেরিয়ে যাব।’
স্নেহের হাসি ফুটল প্রৌঢ়ের মুখে। অপালার হাতটা ধরে বললেন, ‘এত বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি বলেই তো তর সইছে না মা। ওই মন্দিরে বেশি ট্যুরিস্ট আসে না মানে যে কাল সকালে কেউ আসবে না তার তো গ্যারান্টি নেই তাই না? তার থেকে এখন অনেক নিশ্চিন্তে আমরা কাজ করতে পারব। আমার তো স্পেশাল পারমিশন করানো আছে। আমাদের কেউ আটকাবে না। ইলেকট্রিক মশাল আছে। অন্ধকারে কাজ করতেও অসুবিধে হবে না। তবে তোমাদের আমি জোর করব না। তোমরা চাইলে বিশ্রাম নিতে পারো। সকালে এসে আমাকে জয়েন কোরো।’
অপালা সঞ্জয়ের দিকে তাকাল। সঞ্জয় বুঝল, অপালার চিন্তা তার শরীর নিয়ে। সে বলল, ‘আমি একদম ফিট। স্যার ঠিক বলেছেন। চলো বেরিয়ে পড়ি।’
চল্লিশ মিনিট পরে ওদের জিপ এসে থামল ইনান্না মন্দিরের সামনে। আগের দিন হেঁটে এলেও আজ গেট থেকেই গাড়িটা ভেতরে আনার অনুমতি নিয়ে নিয়েছেন তাকি সাহেব। গাড়ি থেকে নেমে মন্দিরটার দিকে তাকাতেই আবার আগের দিনের মতো গা ছমছম করে উঠল সঞ্জয়ের। বড়ো বড়ো দুটো আলোর স্ট্যান্ড তাক করা আছে মন্দিরটার দিকে। সে আলোয় ঝলমল করছে মন্দিরটা তবু দিনের আলো আর কৃত্রিম আলোর মধ্যে তফাত আছে। দিনের আলোর মধ্যে যে প্রাণ আছে সেটা অনেক বেশি অন্ধকার দূর করে কিন্তু কৃত্রিম আলো যত তেজিই হোক না কেন তার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। সঞ্জয় অনুভব করল, ওই ‘লিমিটেশন’-টার ফাঁক গলেই অন্ধকার যেন ইমারতটার ভেতরে ঢুকে এসেছে আর কোনায় কোনায় ঘাপটি মেরে বসে আছে পোষা সিংহের মতো। যেন প্রভুর শিসের অপেক্ষা। তার পরেই ঝাঁপিয়ে পড়বে অনধিকার প্রবেশকারীর ঘাড়ে।
অন্ধকারের সঙ্গে সঞ্জয়ের আবাল্য পরিচিতি। সঞ্জয় জানে, অন্ধকার আসলে অর্ধতরল পদার্থ। তার চরিত্র অনেকটা আঠালো চটচটে পিচের মতো। দিনের আলোয় অন্ধকার জমাট বাঁধতে পারে না। তখন তারা গুঁড়ো গুঁড়ো রেণু হয়ে উড়ে বেড়ায়। তাই ছায়াও ফিকে লাগে দিনের আলোয়। কিন্তু দিনের আলো নিভলেই ওরা একজোট হয়। একটু একটু করে জমাট বাঁধতে শুরু করে। সব অন্ধকার আবার এক রকমের নয়। শ্মশানের অন্ধকার আর দীর্ঘকাল ধরে মনুষ্যবর্জিত পোড়ো বাড়ির অন্ধকারে তফাত আছে। তফাত আছে আচমকা লোডশেডিং-এর অন্ধকার আর মন্দিরের গর্ভগৃহের অন্ধকারে। কিছু অন্ধকারের মধ্যে মায়া থাকে। তার মধ্যে ভেজাল হয়ে মিশে থাকে দিনের আলোর প্রাণ, মানুষ-পশুপাখির নিশ্বাসের প্রাণ। আর কিছু অন্ধকার একেবারে নির্ভেজাল। সেই অন্ধকারেরই ঘাতক হয়ে ওঠার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আর যেখানে অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যায় ইতিহাসের ভার সেখানের অন্ধকার এড়িয়ে চলাই ভালো। অপালা এগোতে যেতেই তার হাত টেনে ধরল সঞ্জয়। অবাক হয়ে তাকাল অপালা। চোখের ইশারায় জানতে চাইল, ‘কী হল?’
বলতে গিয়েও কথাটা গিলে নিল সঞ্জয়। তাকি সাহেব ততক্ষণে মন্দিরের সিঁড়ির কাছে চলে গেছেন। ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি ডাক দিয়েছেন, ‘কাম অন। ‘কিছু না। চলো’, বলে অপালার হাত ধরে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল সঞ্জয়।
আজও আগের দিনের মতো ভেতরে ঢোকার আগে জুতো খুলে নিল দু’জনেই। তাকি সাহেব ততক্ষণে ভেতরে ঢুকে ইলেকট্রিক মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছেন। ব্যাগ ভরতি করে ইলেকট্রিক মশাল নিয়ে এসেছেন তিনি। এগুলো মূলত ম্যাগনেশিয়ামের তার পুড়িয়ে আলো তৈরি করে। এক-একটা মশাল পনেরো মিনিট ধরে জ্বলে। আট-দশটা মশাল জ্বালিয়ে এ দিক-ও দিক মেঝেতে ছুড়ে দিলেন তাকি সাহেব। বললেন, ‘দেখেছ কেমন আলো হচ্ছে? এই আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাব আমরা। তা ছাড়া হেলমেটের টর্চ তো আছেই।’
হাসি পেল সঞ্জয়ের। এই প্রাচীন অন্ধকার দূর করতে পারে শুধু সূর্যের আলো। এ ছাড়া আর যে কোনও আলোই এই অন্ধকার আরও বেশি ঘনিয়ে তোলা ছাড়া কিচ্ছু করতে পারে না। তাকি সাহেব বুঝতে পারছেন না, আলো দেখে শুধুমাত্র পিছু হটেছে অন্ধকার। আলোর বৃত্তের বাইরে এখন ওরা দলবেঁধে ফুঁসছে, অতিকায় বাইসনের মতো। সঞ্জয়ের আবারও মনে হল, এই অন্ধকারকে ঘাঁটানো ঠিক হল না। কিন্তু কী আর করা যাবে! যত তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বেরোনো যায় ততই মঙ্গল। অপালা আর তাকি সাহেবের পিছু পিছু সেও এগিয়ে গেল তিন নম্বর স্তম্ভটার দিকে।
***
লাইব্রেরি ঘরে অস্থির হয়ে ছটফট করছেন ভাদুড়িমশায়। সমীরণ বলেছিলেন, ‘কাল সকালের মধ্যে ডিটেইলস দিয়ে দেব স্যার। আসলে লোক দিয়ে কাজটা করাতে হচ্ছে তো। ওরা টাইম নিচ্ছে।’
‘না না। কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করতে পারব না সমীরণ। আজ যত রাতই হোক তুমি আমাকে খবর দেবে। আমি জেগে থাকব তোমার ফোনের অপেক্ষায়।’
তিন দিন আগে পল্লবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন তিনি আজও বিকেলে চেষ্টা করেছেন কিন্তু রোশনির সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। পল্লব জানিয়েছিল, সে এখন আগের চেয়ে ভালো আছে। জঙ্গিরা আর মারধর করছে না বরং ভালো ব্যবহার করছে। আশ্বস্ত হয়েছিলেন ভাদুড়িমশায়। বলেছিলেন, ‘তোমার এখন একটাই কাজ পল্লব। ওদের সঙ্গে সহযোগিতা করা আর কৌশলে ক্যাম্পের লোকেশন জেনে নেওয়া। ক্যাম্পের লোকেশন জানতে পারা মাত্রই আমায় মনে করবে। আমি রোজ প্রতি ছয় ঘণ্টা অন্তর তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব।’
আজও রাতে এক বার যোগাযোগ হয়েছিল পল্লবের সঙ্গে কিন্তু ক্যাম্পের লোকেশন সে বলতে পারেনি। তখনই সমীরণকে ফোন করে তাড়া দিয়েছেন তিনি। পল্লব সুস্থ আছে জানবার পরেই তিন দিন আগে তিনি সমীরণকে একটা কাজের দায়িত্ব দিয়ে দিল্লি ফিরে যেতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘কাজটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।’
সমীরণ অনেকটাই এগিয়েছেন কিন্তু এখনও নিশ্চিত প্রমাণ হাতে পাননি।
ওই প্রমাণটা দরকার। ওটার ওপরে অনেক কিছু নির্ভর করছে। ঘড়ি দেখলেন ভাদুড়িমশায়, রাত প্রায় তিনটে। এমন সময় ফোন বেজে উঠল। সমীরণ ফোন করেছেন। দ্রুত হাতে ফোন ধরলেন ভাদুড়িমশায়। উলটো দিক থেকে সমীরণের কথা শুনে তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সমীরণ বললেন, ‘আপনাকে কয়েকটা ডকুমেন্ট হোয়াটসঅ্যাপ করেছি দেখুন।’
ফোন রেখে ডকুমেন্টসগুলো দেখতে দেখতে ভুরু কুঁচকে যাচ্ছিল ভাদুড়িমশায়ের। তাঁর সন্দেহ ঠিক। তখনই তাঁর চোখ পড়ল অপালার মেসেজগুলোয়। রাত দুটোয় মেসেজ করেছে অপালা। মানে সিরিয়ায় তখন সাড়ে এগারোটা। অস্থিরতায় নোটিফিকেশনের ছোট্ট শব্দ কান এড়িয়ে গেছে। মেসেজগুলো খুললেন ভাদুড়িমশায়। অপালা লিখেছে, ‘দাদু আমরা পেরেছি। ধাঁধার উত্তর ৩।’
তার পরে একটা কাগজে ধাঁধার সমাধান আর একটা ছবি। ছবিতে অপালা আর সঞ্জয়ের সঙ্গে একজন প্রৌঢ়। নীচে লেখা ‘উইথ তাকি আল তুসি, সাকসেসর অব দ্য গ্রেট গিয়াসুদ্দিন।’
বুকটা কেঁপে উঠল ভাদুড়িমশায়ের। ধীরে ধীরে ছবিটা বড়ো করলেন তিনি আর আতঙ্কে পাথর হয়ে গেলেন। তাঁর সন্দেহ যে এমন ভয়ানক আকার নেবে তা তিনি কল্পনাও করেননি। তিনি বুঝতে পারলেন, খুব বড়ো বিপদ আসতে চলেছে। খুব বড়ো বিপদ।’
