লাপিস লাজুলি – ২৩
॥ তেইশ ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
উত নাপিশতিম বললেন, ‘নদীর পাড় বরাবর উত্তর দিকে গেলেই আবার তুমি সেই সবুজ পাহাড় দুটোকে দেখতে পাবে। ওখান থেকে বেরোলে যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে গিয়ে পড়বে।’
যতটুকু তেল আছে মন বলছে, এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু তার পরে? ওই বিশাল মরুভূমির কোন দিকে জনপদ সে তো রোশনি জানে না। আর জানলেও পায়ে হেঁটে পৌঁছোবে কী করে সেখানে? নাহ, এখন এ সব ভেবে লাভ নেই। আগে এখান থেকে বেরোনো দরকার। তার পরে যা আছে কপালে। বৃদ্ধ রাজা আর রানিকে বিদায় জানিয়ে রোশনি বাইক ছুটিয়ে দিল উত্তর দিকে।
রোশনির গমনপথের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ রানি বললেন, ‘কী করে পারল মেয়েটা? গিলগামেশ তো পারেনি।’
মৃদু হেসে বৃদ্ধ রাজা বললেন, ‘দুটো কারণে পারল। প্রথমত গিলগামেশ এসেছিল বন্ধুর প্রাণ ফিরিয়ে আনবে বলে আর এই মেয়েটা এখান থেকে বেরোতে চাইছিল ভালোবাসার মানুষের প্রাণ বাঁচাবে বলে। বন্ধুত্ব আর প্রেমের চেহারাটা অনেকটা একই রকম কিন্তু প্রেমের মধ্যে যে জ্যোতি আছে, যে উজ্জ্বলতা আছে তা বন্ধুত্বে নেই। এ ছাড়াও গিলগামেশের মধ্যে অমরত্ব লাভের একটা সূক্ষ্ম বাসনা ছিল। কিন্তু এই মেয়েটা অমরত্ব চায়নি। ও কিছুই জানত না এ ব্যাপারে। অমরত্ব অদ্ভুত জিনিস রানি। যে চায়, সে পায় না। আর দ্বিতীয় কারণ ওর ওই যন্ত্রটা। যেটায় চড়ে ও চলে গেল।’
অবাক হয়ে তাকালেন বৃদ্ধ রানি।
‘বুঝলে না তো,’ উত নাপিশতিম বললেন, ‘গিলগামেশ এসেছিল পায়ে হেঁটে, ভেলায় চড়ে। পথশ্রমে খুব ক্লান্ত ছিল সে। কিন্তু এই অদ্ভুত যন্ত্রটা মেয়েটার পরিশ্রম লাঘব করেছে। তাই ও ঘুমের সঙ্গে লড়াই করে যেতে পেরেছে। মানুষ যে যন্ত্রসভ্যতাকে এই জায়গায় নিয়ে চলে গেছে সেটাই তো সবচেয়ে বড়ো অলৌকিক। তাই জন্যই ছয় দিন, ছয় রাত জেগে থাকার মতো অলৌকিক ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেলেছে মেয়েটা।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘তা হলে কি মেয়েটা অমর হয়ে গেল?’
মৃদু হেসে বৃদ্ধ বললেন, ‘তা কি হয়? দেবতারা চান না মানুষ অমর হোক তাই অমর হওয়ার পথে মানুষ নানা ভুল করে ফেলে। দেবতারা ভুল করান। এই মেয়েটাও ভুল করেছে। প্রথমত: আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করেছে। তাতে ওর পাপ হয়েছে। দ্বিতীয়ত: মেয়েটা আসলে আমার সঙ্গে ছল করেছে। ও আমার গল্পটা মন দিয়ে শোনেইনি। বেশির ভাগ সময়টাই ওই ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গে স্বপ্নকল্প রচনা করেছে। সেই জন্যই অবশ্য অতক্ষণ জেগে থাকতে পেরেছে। তবে কিছুটা হলেও তো ও আমার গল্প শুনেছে আর ছয় দিন, ছয় রাত জেগে থেকেছে, তার পুরস্কার ও পাবে। তিন তিন বার সাক্ষাৎ মৃত্যু এসেও ওকে ছুঁতে পারবে না। বলতে পারো, অমর না হলেও ও মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে উঠেছে।’
‘হুম,’ মাথা নাড়লেন বৃদ্ধা, ‘তবে যাই বলো মানুষের সঙ্গ কিন্তু এখনও ভালো লাগে তাই না? মেয়েটা এসেছিল, থাকল। মনটা ভালো হয়ে গেল। আবার কবে কে আসবে কে জানে!’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধ রাজা বললেন, ‘আবার হয়তো সাড়ে চার হাজার বছর অপেক্ষা করতে হবে। চলো রানি, এই অনন্ত অপেক্ষাই আমাদের ভবিতব্য। চলো প্রার্থনায় বসতে হবে।’
সেই চিরগোধূলির দেশে কুটিরের ভেতরে ঢুকে গেলেন আশীর্বাদধন্য অথচ অভিশপ্ত দু’টি মানুষ।
***
কানের পাশ দিয়ে হু-হু করে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া কিন্তু সেই শব্দ ছাপিয়ে কানে আসছে যান্ত্রিক শব্দ। মোটরবাইকের মিটার ক্রমাগত জানান দিচ্ছে, তেল আর নেই বললেই চলে। আর একটু পরেই ফুরিয়ে যাবে যন্ত্রের প্রাণশক্তি। বন্ধ হয়ে যাবে যন্ত্রটা। কিন্তু কত দূর আর জোড়া সবুজ পাহাড়! কিন্তু যে মুহূর্তে রোশনির মনে আশঙ্কা জন্মাল হয়তো তাকে ভুল পথে চালনা করা হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন তার চোখের সামনে মাটি ফুঁড়ে উদয় হল সবুজ পাহাড় দুটো। মুক্তি! আহ! মুক্তির স্বাদ যে এমন সর্বগ্রাসী এ অভিজ্ঞতা রোশনির আগে ছিল না। সে এগিয়ে চলল সামনের দিকে কিন্তু লক্ষ করল না মাটিতে ফাটল ধরছে। পাহাড়ের কাছে পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই মাটি ফাটার বিকট শব্দ কানে এল রোশনির। ঘাড় না ঘুরিয়েও সে বুঝতে পারল, বিছে-মানুষের দল তার পিছু নিয়েছে। সঙ্গীর মৃত্যুর প্রতিশোধ তারা এবার নিয়েই ছাড়বে। শরীরের সব শক্তি দিয়ে বাইকের অ্যাকসিলারেটর ঘুরিয়ে দিল রোশনি। গতি বাড়াল বিছে-মানুষেরাও। তিরের মতো জোড়া পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এক ডাইমেনশন থেকে আর এক ডাইমেনশনে এসে পড়ল রোশনি। এসে পড়ল গভীর রাতের চাঁদের আলোয় ধোয়া মরুভূমির মাঝে আর গতির ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে রোশনির দুনিয়ায় এসে পড়ল আট দশটা বিছে-মানুষও। বাকিরা শেষ মুহূর্তে গতিরোধ করতে পারায় রয়ে গেল মৃত্যুপুরীতেই। রোশনির চোখের সামনেই ধীরে ধীরে কুয়াশায় মিলিয়ে গেল পাহাড় দুটো। পড়ে রইল দিগন্তলীন মরুভূমি।
রোশনির সামনে এখন সেই বালিয়াড়ি। যার ও পারে আইসিস জঙ্গিদের ক্যাম্প আর পেছনে বিছে-মানুষেরা। দু’দিকেই মৃত্যু। কোন দিকে যাবে ঠিক করতে পারল না রোশনি। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে আর বিছে-মানুষেরা জান্তব শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসতে লাগল তার দিকে।
* * *
গভীর রাত। তাঁবুর ভেতর পাশাপাশি শুয়ে আছে সইদুল, জুনেইদ আর তারিক। সইদুল আর জুনেইদ ঘুমোচ্ছে কিন্তু তারিকের চোখে আজ ঘুম নেই। তিন দিন ধরে তারিক আজকের রাতটার জন্য অপেক্ষা করছে। এই জাজিরা ক্যাম্প থেকে বারো কিলোমিটার দূরে মরুভূমির মধ্যেই আর একটা ক্যাম্প আছে। সেখানেই মূল ট্রেনিংটা হয়। আজ সেখানে আইসিসের থার্ড ইন কমান্ড দারিয়ুস মহম্মদের একটা ওয়ার্কশপ আছে। এই ক্যাম্পের বেশির ভাগ লোক আজ সেখানেই গেছে। সন্ধে হতে না হতেই জিপ হাঁকিয়ে তারা বেরিয়ে গেছে। ফারুকও গেছে তাদের সঙ্গে। ক্যাম্প আজ অন্য দিনের তুলনায় ফাঁকা অরক্ষিত। পালিয়ে যাওয়ার এমন সুযোগ আর আসবে না।
এই তিন দিন ধরে একটা ব্যাগে চুপি চুপি জলের বোতল জমিয়েছে সে। আসলে তিন দিন আগেই কথায়-কথায় সে জানতে পেরেছে ওয়ার্কশপটার কথা। জানতে পেরেছে, এখান থেকে সবচেয়ে কাছের জনপদ কামিশলি, পশ্চিম দিকে ৩০ কিলোমিটার দূরে। তারিক হিসেব করে নিয়েছে ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার করে গেলে ছ’ঘণ্টায় সে কামিশলি পৌঁছে যাবে। রাতে হাঁটতে কষ্টও হবে না। এখন রাত বারোটা। বেরিয়ে পড়ার জন্য এটাই ঠিক সময়। শব্দ না করে উঠে বসল তারিক। তাঁবুগুলোর পেছন দিকে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা তার পরে পুরোনো গাড়ি, টিন, বস্তা এসব দিয়ে বানানো পাঁচিল। ওপরে কাঁটাতার। এমনিতেই পেছন দিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কম থাকে কারণ সে দিকে পুরোটাই মরুভূমি। সে দিক দিয়ে বহিঃশত্রুর আক্রমণের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আজ তো পেছনটা একেবারেই ফাঁকা। শুতে আসার আগেই বাইরেটায় একটা চক্কর দিয়ে এসেছে তারিক। শুধু সার্চ লাইটটা গোল গোল করে ঘুরছে। বেরোনোর সময় ওটাকে এড়িয়ে বেরোতে হবে। তবে একা বেরবে না তারিক, আর একজনকে সঙ্গে নিয়ে বেরোবে। এই লোকটাও তার মতোই আটকে পড়েছে এখানে।
নিঃশব্দে জলের বোতল ভরা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এল তারিক। পা টিপে টিপে চার দিকে চোখ রেখে দ্রুত চলে এল অভীষ্ট তাঁবুটার সামনে। পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখল, লোকটা পাশ ফিরে শুয়ে আছে। নীচু গলায় ডাকল, ‘হেল্লো?’
ধড়মড় করে উঠে বসল পল্লব। অবাক হয়ে দেখল, তাঁবুর ভেতরে আধো অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। পল্লব কিছু বলার আগেই সে ফিসফিস করে ভাঙা ইংরেজিতে বলে উঠল, ‘ভয় নেই। ভয় নেই। আমি। আমি। সে দিন আমি কাঁদছিলাম, আপনি….’
কথাটা শেষ করল না ছায়ামূর্তি কিন্তু এবারে তাকে চিনতে পারল পল্লব। মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথাটা। তখন সদ্য সদ্য মার খেয়ে তাঁবুর মেঝেতে কুঁকড়ে পড়ে আছে সে। একাই আছে। বাকিদের জঙ্গিরা কোথায় নিয়ে গেছে কে জানে! হঠাৎই তাঁবুর পেছন দিক থেকে ভেসে এসেছিল চাপা কান্নার আওয়াজ। কোনও মতে উঠে জানলার কাপড়টা তুলে পল্লব দেখেছিল ছেলেটাকে। কান্নার দমক সামলাতে গিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিল ছেলেটার শরীর। ছেলেটা চেষ্টা করছিল শব্দ না করতে কিন্তু কান্নাও তো বন্যার মতোই। যতই বাঁধ দাও না কেন, কিছু জল বেরিয়ে আসবেই। সেটাই হচ্ছিল। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় হেঁচকি তুলতে শুরু করল ছেলেটা। এতক্ষণে ছেলেটাকে চিনতে পেরেছিল পল্লব। সকালে এই ছেলেটার হাতেই বন্দুক ধরিয়ে গুলি চালাতে বলা হয়েছিল। তখনও ছেলেটার হাত কাঁপছিল। পল্লব বুঝতে পেরেছিল, এই ছেলেটা স্বেচ্ছায় আসেনি বা স্বেচ্ছায় এলেও এখন আর এই ক্যাম্পে থাকতে চাইছে না। খুব মায়া হয়েছিল পল্লবের। কষ্ট করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে গিয়েছিল তাঁবুর পেছন দিকটায়। জলের বোতল বাড়িয়ে বলেছিল, ‘ওয়াটার।’
চোখ তুলে পল্লবকেও যেন চিনতে পেরেছিল ছেলেটা। হাত বাড়িয়ে বোতলটা নিয়ে ঢক ঢক করে অনেকটা জল খেয়ে নিয়েছিল। তার পরে ‘ধন্যবাদ,’ বলেই দ্রুত চলে গিয়েছিল সেখান থেকে। অবাক হয়ে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল পল্লব। ছেলেটা বাঙালি!
তার পর থেকে আর দেখতে পায়নি ছেলেটাকে। কিন্তু ছেলেটা এত রাতে তার তাঁবুতে কী করছে? কিন্তু সে প্রশ্ন না করে পল্লব বলল, ‘ভাই, আমিও বাঙালি। আমার নাম পল্লব।’
এক মুহূর্ত চুপ থেকে ছেলেটা বলল, ‘তা হলে আর ইংরেজি বলার ঝামেলা রইল না। আমার নাম তারিক। উঠুন দাদা। আমরা এখান থেকে পালাব।’
চমকে উঠল পল্লব, ‘মানে?’
চাপা গলায় ছেলেটা বলল, ‘আমি সব খবর নিয়ে নিয়েছি। এখান থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে জনবসতি আছে। রাতে হাঁটার সুবিধে আর আজ এখানে তেমন সিকিউরিটি নেই। আমি বেরোচ্ছি। যেতে চাইলে চলুন। সেই রাতে আপনি আমায় জল দিয়েছিলেন। আপনাকে হেল্প না করলে আল্লা আমায় ক্ষমা করবেন না। এমনিতেই অনেক পাপ করে ফেলেছি। কী করবেন? চটপট বলুন।’
ঘটনার অভিঘাতে একটু থমকে গেছিল পল্লব। কিন্তু দ্রুত সেই জড়তা ঝেড়ে ফেলে বলল, ‘চলো ভাই।’
পা টিপে টিপে দু’জনে চলে এল তাঁবুর পেছন দিকটায়। কেউ কোত্থাও নেই। শুধু কিছুক্ষণ অন্তর সার্চ লাইটের গোল আলো ঘুরে ঘুরে চলে যাচ্ছে। তারিক বলল, ‘ওই আলোটা বাঁচিয়ে আমাদের পাঁচিল অবধি যেতে হবে। আমি হিসেব করে দেখেছি, আলোটা পুরো ঘুরে আসতে চল্লিশ সেকেন্ড সময় লাগে। তার মধ্যে আপনাকে পাঁচিল টপকাতে হবে। পারবেন তো?’
মুখটা শুকিয়ে গেল পল্লবের। সে চিরকালের আনফিট। পাঁচিলে তার বরাবরের অনীহা। পাঁচিল টপকাতে পারত না বলে স্কুল কেটে সিনেমা দেখতে যাওয়া হয়নি কত বার। পাঁচিল টপকাতে পারত না বলে কত রাত হস্টেলে ঢুকতে পারেনি সে। আর আজ এই কাঁটাতার দেওয়া পাঁচিল টপকাতে হবে চল্লিশ সেকেন্ডে! অসম্ভব। সে বলল, ‘আমি পারব না ভাই।’
‘পারবেন না?’ তারিকের গলায় অধৈর্য।
চোখে জল এসে গেল পল্লবের। মুক্তির এত কাছে এসেও পিছিয়ে যেতে হচ্ছে! নিজের ওপরে খুব রাগ হল তার। একটু ফিট থাকলে আজ সেও বেরিয়ে পড়তে পারত এই খারাপ জায়গাটা থেকে। সে বলল, ‘না ভাই। আমি পারব না। তুমি চলে যাও।’
পল্লবের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল তারিক। তার পরে বলল, ‘পারবেন। আমি আপনাকে হেল্প করব। দুজন মিলে যখন বেরিয়েছি দু’জনেই যাব। একা যাব না। চলুন দাদা। চলুন, চলুন,’ পল্লবকে প্রায় ঠেলে মাটিতে বসিয়ে দিল তারিক, ‘আমায় ফলো করুন।’
হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে শুরু করল দু’জনে আর এক সময় সার্চ লাইটের আলো বাঁচিয়ে পৌঁছেও গেল পাঁচিলটার কাছে। একটা গাড়ির আড়ালে লুকোল ওরা। তারিক বলল, ‘আপনি আগে উঠুন। আমি হেল্প করছি। আলোটা সরলেই আমরা স্টার্ট করব। ওকে? বড়ো করে একটা দম নিয়ে নিন। আপনি পারবেন।’
মন শক্ত করে পল্লব ঘাড় নাড়ল। আলোটা সরতেই তারিক আলতো একটা ঠেলা দিল তাকে। তার পক্ষে যতটা সম্ভব দ্রুত উঠতে শুরু করল পল্লব। পেছন থেকে তাকে ধরে রয়েছে তারিক। পাঁচিলটা সাত-আট ফুট উঁচু তো বটেই। কিন্তু তারিকের সাহায্যে অনেকটাই উঠে এল সে। ও পারের মরুভূমি এখন দৃশ্যমান। এবারের কাজটাই কঠিন। পাঁচিলের ওপরে সরু জায়গায় পা রেখে কাঁটাতারের বেড়াটা টপকে লাফ দিয়ে ওপারের বালিতে পড়তে হবে। চেষ্টা করল পল্লব কিন্তু পারল না। শেষ মুহূর্তে কাঁটাতারে পা আটকে টাল হারিয়ে ফেলল আর দমাস করে আছড়ে পড়ল একটা গাড়ির ওপরে। নিঝুম মরুভূমিতে সেই শব্দটাই কামানের গোলার মতো অভিঘাত হানল। যতটা না ব্যথা লাগল তার চেয়েও বেশি অপরাধবোধে কাহিল হয়ে গেল পল্লব। সে বুঝতে পারল, তার অক্ষমতার জন্য বেচারা তারিকের আর পালানো হল না।
সেই আওয়াজে ততক্ষণে জাগতে শুরু করেছে ক্যাম্প। মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সার্চ লাইটের আলো শব্দের উৎস সন্ধানে এদিক- ওদিক ঘুরতে শুরু করেছে। পল্লবের হাত ধরে এক টান মারল তারিক, ‘উঠুন। আবার উঠুন। ফাস্ট।’
কী যে এক প্রণোদনা কাজ করল মনের মধ্যে পল্লব নিজেও জানে না। শুধু তার মনে হতে লাগল, তার জন্য এই বাচ্চা ছেলেটাও ধরা পড়ে যাবে। ছেলেটাকে ধরা পড়তে দিলে চলবে না। প্রাণপণে পাঁচিল বেয়ে আবার উঠল সে আর এবার কাঁটাতারকে এড়ানোর চেষ্টা না করে তার ওপর দিয়েই গড়িয়ে গেল ও পারে। বালিতে পড়তে-পড়তে পল্লব অনুভব করল তার বুক আর হাত থেকে উঠে আসা কিছুটা মাংস লেগে রইল কাঁটাতারে। যন্ত্রণাটা হজম করতে-না-করতেই একটা গুলির শব্দ হল আর তারিক লাফ দিয়ে পড়ল তার ঠিক পেছনে। দৌড়োনোর প্রস্তুতি নিয়ে নিল পল্লব। না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘কোন দিকে?’
তারিক কোনও উত্তর দিল না। ঘাড় ঘুরিয়ে পল্লব দেখল, তারিক উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। তার কাঁধে এত্ত বড়ো একটা ক্ষত আর সেখান থেকে ভলকে ভলকে উঠে আসছে কালো রঙের তরল। পল্লব জানে, চাঁদের আলোয় রক্তের রং কালোই দেখায়। কিন্তু অনেক সময় চোখের সামনে কিছু দেখেও মানুষ বিশ্বাস করে উঠতে পারে না। আসলে কিছু কিছু ঘটনার অভিঘাত এমন হয় যে মানুষ সেটা বিশ্বাস করতে চায় না। পল্লবেরও তাই হল। সেও বিশ্বাস করতে চাইল না যে তারিকের গুলি লেগেছে। ছুটে গিয়ে তারিকের দেহটা আঁকড়ে ধরে ডাকতে থাকল, ‘তারিক। তারিক। কথা বলো তারিক। আমাদের পালাতে হবে এখান থেকে। তুমিই তো পালাতে চেয়েছিলে। এ ভাবে বালির ওপর পড়ে থাকলে হবে না ভাই। ওঠো, ওঠো।’
অতি কষ্টে চোখ মেলে তাকাল তারিক। থেমে-থেমে বলল, ‘আমার আর যাওয়া হবে না দাদা।’
বুকের ভেতর থেকে কান্নার একটা দমক ঠেলে উঠতে চাইল। কোনও মতে সেটাকে সামলে পল্লব বলল, ‘তোমায় ফেলে রেখে আমি কী ভাবে যাব ভাই? তোমার তো খুব মনের জোর। ওঠো প্লিজ।’
‘একটু জল দিন।’
তারিকের ব্যাগের মধ্যেই জলের বোতল ছিল। দ্রুত বোতলের ঢাকনা খুলে তার মুখের কাছে জলের বোতল ধরল পল্লব। মাথাটা তুলে নিল নিজের হাঁটুর ওপরে। তারিক আপ্রাণ চেষ্টা করল কিন্তু খুব বেশি জল খেতে পারল না। বেশিরভাগটাই গড়িয়ে পড়ল কষ বেয়ে। তবু যেটুকু জল ভেতরে গেল তাতেই যেন একটু হলেও প্রাণের সঞ্চার হল তার নিভতে বসা চোখের তারায়। পল্লব বলল, ‘তুমি উঠে না দাঁড়ালে আমি যে কোনও দিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। আমার জন্য আজ তোমার এই অবস্থা হল।’
ম্লান হেসে তারিক বলল, ‘এটা আমার নিয়তি দাদা। আল্লাহ আমাকে শাস্তি দিয়েছেন। আম্মির সাধের দোকান আমি জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। এ তার শাস্তি। আমি ভুল পথে চলে গেছিলাম। পরের জন্ম যদি থাকে আমি ভুল শুধরে নেব। একটা কাজ করবেন দাদা?’
‘বলো ভাই।’
‘আমার বাড়ি বনগাঁর দীনেশপল্লিতে। সাজগোজ নামে একটা পার্লার ছিল আম্মির। যাকে বলবেন সেই দেখিয়ে দেবে। একটি বার যাবেন সেখানে? আম্মিকে গিয়ে বলবেন, আমি সরি বলেছি? বলবেন তো দাদা?’
‘বলব ভাই। নিশ্চয়ই বলব।’
‘আমার বোনটা খুব ছোটো। ওকে বলবেন, আমি ওকে খুব ভালোবাসি। আর আব্বুকে বলবেন, আব্বু যেন বলে দেয় আমাদের ফ্যামিলিতে তারিক বলে কেউ কোনও দিন ছিল না। আমার জন্য ওদের খুব অসম্মান হয়েছে। আমার জন্য পাড়ার লোক আমার আব্বু, আম্মি, বোনকেও টেররিস্ট বলবে। পাড়ার লোকেদের একটু বোঝাবেন আম্মি আর আব্বুর কোনও দোষ ছিল না। ওরা ভালোমানুষ। ওরা এ সবের কিচ্ছু জানত না। আমি খারাপ ছেলে। খুব খারাপ। আর বলবেন, পারলে ওরা যেন আমাকে ক্ষমা করে দেয়।’
তারিকের কাঁধের ক্ষতটা চেপে ধরে আছে পল্লব। চোখের জলটাও মুছতে পারছে না। তারিক আবার বলে উঠল, ‘দাদা, আমার প্যান্টের ডান পকেটে একটা কাগজ আছে। ওটা পুলিশকে দেবেন। যে পাপ আমি করেছি, ওতে তার প্রায়শ্চিত্ত আছে।’
পল্লব হাত বাড়িয়ে তারিকের প্যান্টের পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা ডায়েরির পাতা বার করে আনল। বলল, ‘এইটা?’
তারিক আর সাড়া দিল না। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তারিকের চোখ থেকে চোখ সরিয়েছিল পল্লব আর সেই ফাঁকেই তারিক পাড়ি দিয়েছে চিরঘুমের দেশে। তারিকের নিষ্প্রাণ দেহটার ওপরেই কান্নায় ভেঙে পড়ল পল্লব।
নিজেকে তারিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী করতে-করতেই ক্যাম্পের ভেতরে গাড়ির ইঞ্জিন চালু হওয়ার শব্দ পেল সে। সে বুঝতে পারল, ওরা আসছে তার জন্যই। একটু পরে সেও এই ভাবে পড়ে থাকবে বালিতে মুখ গুঁজে! তিতাসের সঙ্গে আর দেখা হবে না! রোশনির সঙ্গেও দেখা হবে না! তার চেয়েও বড়ো কথা তারিক একটা দায়িত্ব দিয়ে গেছে। সেটা পালন করতেই হবে। তার জন্য বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকার তাগিদ অপরাধবোধের অবসাদ কাটিয়ে দিল। তারিকের চোখের পাতা দু’টো বন্ধ করে দিয়ে উঠে দাঁড়াল পল্লব। তার পরে ছুটতে শুরু করল। কিন্তু লাভ কিছু হল না। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
তিন-চার মিনিটের মধ্যেই একটা জিপ আর আর দশটা ডার্ট বাইক ঘিরে ধরল তাকে। বালিয়াড়ির ঠিক নীচে। দু’হাত মাথার ওপরে তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল পল্লব। সব আশা শেষ। এ বার তাকে ক্ষমা করবে না এরা। জিপ থেকে নেমে আসা একটা লোক হাতে একটা বড়ো ছোরা নিয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে। দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু একটা বলল সে। ভাষাটা না বুঝলেও লোকটার শরীরী ভঙ্গিমা পড়তে পারল পল্লব। লোকটা তাকে মৃত্যুর আগের মুহূর্তের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। এতক্ষণ পা দুটো খুব কাঁপছিল। এবার আর সে দুটোয় সাড় পাচ্ছে না। পল্লবের মনে হল, তার পা দুটো যেন একটু একটু করে নেমে যাচ্ছে বালির গভীরে। তলপেটটা অসম্ভব ফাঁকা লাগছে। মাথাটা ভার। সামনে কী হচ্ছে স্পষ্ট দেখতেও পাচ্ছে না সে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার স্নায়ুগুলো কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তাও শরীরের সব শক্তি এক জায়গায় এনে চিৎকার করে বলল, ‘প্লিজ… স্পেয়ার মি। প্লিইইইজ।’
পল্লবের কথায় পাত্তা না দিয়ে লোকটা বাঁ-হাতে তার কলার চেপে ধরল। ডান হাতটা তুলল ছোরাটা গেঁথে দেবে বলে আর ঠিক তখনই অদ্ভুত একটা কাণ্ড হল। বালিয়াড়ির ওপরে উঠে এসেই থেমে গেল একটা ডার্ট বাইক। বাইক আরোহী দৌড়ে নামতে শুরু করল বালিয়াড়ির ঢাল বেয়ে আর তার পিছু পিছু বিজাতীয় শব্দ করে যারা ধেয়ে এল তাদের দেখে শিউরে উঠল ঘাতক জঙ্গিরাও। পল্লবকে ছেড়ে ধেয়ে আসা বিজাতীয় জীবগুলোর দিকে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করল তারা।
বালিয়াড়ির ও পার থেকেই প্রথমে গাড়ির শব্দ, তার পরে পল্লবের গলা শুনতে পেয়েছিল রোশনি। তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। ঈশ্বর সহায়, যতটুকু তেল ছিল তাতে বালিয়াড়ির চড়াই ভাঙতে সক্ষম হয়েছে তার বাইক আর বালিয়াড়ির ওপরে উঠেই দেহ রেখেছে। ঢাল বরাবর নামতে নামতেই রোশনি আন্দাজ করেছিল, জঙ্গিরা বিছে-মানুষদের দেখে ঘাবড়ে গিয়ে গুলি চালাবে। তাই গুলি চলার আগেই শরীরটা সামনের দিকে ছুড়ে দিল সে। বুক দিয়ে পড়ল বালির ওপরে আর তার মাথার ঠিক ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের গুলিতে ছিটকে পড়ল সামনের দিকে থাকা দু’তিনটে বিছে-মানুষ। এটাই চেয়েছিল রোশনি। বিছে মানুষদের প্রতিশোধস্পৃহা সম্পর্কে তার যথেষ্ট ধারণা আছে। সে জানে, বিছেমানুষ আর জঙ্গিদের এই যুদ্ধে বিছে-মানুষরাই জয়ী হবে। তার পরে জঙ্গিদেরই একটা বাইক নিয়ে পল্লবকে চাপিয়ে আবার সে দৌড়োবে কোনও অনির্দেশ্যের দিকে। আর যাই হোক বিছে-মানুষেরা ডার্ট বাইকের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। শুধু ওদের হাত থেকে তাকে আর পল্লবকে বেঁচে থাকতে হবে। শুয়ে শুয়েই চিৎকার সে করল, ‘পল্লবদা, জিপের পেছনে লুকিয়ে পড়ুন।’
রোশনি! রোশনি এখানে! বিধ্বস্ত পল্লবের শরীরে মনে যেন নতুন উদ্যম ফিরে এল। তার দিকে কেউ খেয়াল করছে না এখন। নীচু হয়ে বসে সে এগোতে শুরু করল জিপটার দিকে। ততক্ষণে নতুন এবং তুলনায় শক্তিশালী শত্রুদের চিহ্নিত করে ফেলেছে বিছে-মানুষের দল। গুলির আঘাতে দলের বেশিরভাগই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও দু’টি বিছে-মানুষ এসে পড়ল জঙ্গিদের মাঝখানে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চিরে ফালা ফালা করে ফেলল চোদ্দোটা আইসিস জঙ্গিকে। এ বার তাদের চোখ পড়ল পল্লবের দিকে। কিন্তু পল্লবের দিকে এগোনোর আগেই তার বন্দুকে অবশিষ্ট গুলিগুলো রোশনি এক এক করে গেঁথে দিল দুই বিছে-মানুষের গায়ে। বালির ওপরে মুখ থুবড়ে পড়ল বিশাল দেহ দুটো। কিছুক্ষণ মাত্র, তার পরে এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হল পল্লব আর রোশনি। এ দিক-ও দিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা বিছে-মানুষদের দেহগুলোয় একটা সূক্ষ্ম কম্পন দেখা দিল আর ধীরে ধীরে দেহগুলো ভেঙেচুরে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে গেল বালির মধ্যে। ওই তীব্র চন্দ্রালোকে বিশাল মরুভূমিতে রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন কয়েকটা মৃতদেহের মাঝে দাঁড়িয়ে রইল দু’টি জীবিত মানুষ। দু’জনে অপলকে তাকিয়ে রইল দু’জনের দিকে। সে দৃষ্টিতে একসঙ্গে মিশে আছে প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস, অপ্রাপ্তির বেদনা।
* * *
আজকাল আর ঘুম আসে না কাবিল বুড়োর। মালিক একটা পুরোনো বাইনোকুলার দিয়েছে তাকে। উট বা ভেড়া দলছুট হয়ে গেলে খুঁজে দেখার জন্য। সেটাই চোখে এঁটে বসে থাকে রাতের বেলা। হাওয়ায়-হাওয়ায় কেমন করে বালির দানা এক পাশ থেকে অন্য পাশে সরে যায়, কেমন করে সরীসৃপ লুকিয়ে পড়ে বালির গর্তে এইসব বসে বসে দেখে সে। কান পেতে শোনে মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ানো অশরীরী আত্মাদের নিশ্বাসের শব্দ। দিনের বেলায় অনেক দূর অবধি স্পষ্ট দেখা যায় কিন্তু রাতে এই বাইনোকুলারটা ভরসা। আজও সে চোখে বাইনোকুলার এঁটে বসেছিল। সবটাই দেখেছে সে। মেয়েটা ফিরে এসেছে মৃত্যুপুরী থেকে। মরুভূমির মিথকে সত্যি করে দিয়েছে। ওর জন্যই আজ বেঁচে গেল ছেলেটা। সে বুঝতে পারল, ছেলেটা আর মেয়েটা এবার ওই জঙ্গিদের ঘাঁটি থেকে পালাতে চাইবে কিন্তু মরুভূমি সোজা জিনিস নয়। ওরা যে ভাবেই যাওয়ার চেষ্টা করুক না কেন পথ হারাবে আর আবার ধরা পরে যাবে। মরুভূমিতে যারা ক্যাম্প করে আছে তারা ভালো লোক নয় কাবিল বুড়ো জানে। সে দেখল, জিপ নিয়ে ছেলে-মেয়ে দুটো উত্তর দিকে যাচ্ছে। উঁহু, ও দিকে নয়। ও দিকে নয়। তার মনে হল, ছেলে-মেয়ে দুটোকে সাহায্য করা দরকার। সবচেয়ে তেজি উটটাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে।
* * *
তখন একটু-একটু করে সকাল হচ্ছে। কাবিল বুড়ো আঙুল তুলল সামনের দিকে। উটের পিঠ থেকে রোশনি আর পল্লব দেখতে পেল, দূরে আবছায়া ইমারতের সারি। লোকালয়। জনপদ। কাবিল বুড়ো তার অস্পষ্ট উচ্চারণে বলল, ‘কামিশলি।’
পল্লবের চোখ দুটো আচমকাই ঝাপসা হয়ে গেল। মুক্তির আনন্দে না কি তারিকের দুঃখে, ঠিক বুঝতে পারল না সে।
