কে প্রথম কাছে এসেছি – ৪
॥ চার॥
প্রবেশের ঘরে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল প্রবেশ আর ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে নীরেন বলে যাচ্ছিল, ‘অনেকগুলো খটকা আমার একসঙ্গে লেগেছিল ঠাকুর কিন্তু আমি কোনও দিশা পাচ্ছিলাম না। তবে সে দিন প্রবেশের মায়ের গায়ে লাল পশমের চাদর আর বইয়ের আলমারিতে ভিনসেন্ট ক্যারলের লেখা আলপাইন ফোকলোর দেখে আমি দুয়ে দুয়ে চার করে ফেলি। আলপাইন উপত্যকার কুখ্যাত অপদেবতা টাটজেলোয়ামকে চিনে ফেলি। যদি খুব ভুল না হই, ভিনসেন্ট ক্যারল ফাদার চার্লস ক্যারলের পূর্বপুরুষ। পরবর্তী কালে ব্রিটেনের নাগরিকত্ব নিলেও ফাদারের ছোটোবেলাটা তো কেটেছে আল্পস পর্বতের উপত্যকায়। সেখানকার উপকথা, লোকগাথায় ফাদারের প্রচণ্ড ইন্টারেস্ট ছিল। ফাদারের পুরোনো বইপত্রের মধ্যে প্রবেশ একটা ডায়েরি খুঁজে পায়। আমার স্থির বিশ্বাস সেই ডায়েরিতে লেখা আছে আলপাইন উপত্যকার লোকগাথায় ছড়িয়ে থাকা নানা দেব, দেবী, অপদেবতার, অপদেবীর পূজাপদ্ধতি এবং তাদের জাগিয়ে তোলার নানা তান্ত্রিক আচার। তার মধ্যে টাটজেলোয়ামকে জাগিয়ে তোলার পদ্ধতিও লেখা ছিল। আপনি তো তাকে দেখেছেন ঠাকুর। বেড়ালের মুখ আর সাপের দেহ। তাই তার কামড়ে শরীরে ঢোকে হেমোটক্সিন। এই টাটজেলোয়ার্সকে জাগাতেই ক্র্যাম্পাসের পুজো করেছিল প্রবেশ।’
ঠাকুর বললেন, ‘কী কঠিন কঠিন নাম বলচিস নীরেন। কম্পাস আবার কী?’
‘কম্পাস না ঠাকুর। ক্র্যাম্পাস। ক্র্যাম্পাস হল আলপাইন উপকথার শয়তান। সমস্ত অপদেবতাদের রক্ষক। ক্র্যাম্পাসের অনুমতি না পেলে টাটজেলোয়ামকে জাগানো যায় না। ৫ ডিসেম্বর ক্র্যাম্পাসের আরাধনার দিন। ৫ তারিখ রাতে প্রবেশ গির্জায় যায়। ফাদারের ঘরে ক্র্যাম্পাসের আরাধনা করে। সেজন্যই মেঝেতে উলটো ক্রস এঁকেছিল সে। যদিও মুছে দিয়েছিল কিন্তু দাগ থেকে গেছিল। ক্র্যাম্পাসের আরাধনায় আয়নাও লাগে। কোনও ভাবে একটা আয়না ভেঙে গেছিল আর কাচের একটা টুকরো চলে গেছিল তক্তপোশের নীচে। ঘটনাচক্রে সেটাও আমার চোখে পড়ে যায়। আর চোখে পড়ে যায় যিশুখ্রিস্টের মূর্তির আঙুলে আটকে থাকা লাল পশম। শয়তানের আরাধনা করতে হবে বলে ভগবানের মূর্তিটাকে ওই লাল চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল প্রবেশ। চাদর খুলে নেওয়ার সময় মূর্তির আঙুলে চাদরের একটা কোনা আটকে গেছিল। কী ঠিক বলছি তো প্রবেশ?’
মাটির দিকে তাকিয়েই মাথা নাড়ল প্রবেশ। নীরেন বলল, ‘ডায়েরিটা তোমার কাছেই আছে তো?’
এ বার চোখ তুলে তাকাল প্রবেশ। তার চোখে জল। বলল, ‘আছে। তুমি যে সবটা বুঝে যাবে আমি ভাবিনি। আমি এখন বুঝতে পারি, ভুল করেছি কিন্তু এ ছাড়া জঙ্গলটা বাঁচাতে পারতাম না। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কাকাকে বুঝিয়েছিলাম, ঝগড়াও করেছিলাম কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। তার ওপরে ফাদারের আত্মহত্যা আমার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। যারা যারা ফাদারের মৃত্যুর জন্য দায়ী তাদের নামে আমি আহুতি দিয়েছিলাম ক্র্যাম্পাসের কাছে। ভেবেছিলাম, ওদের মারলেই সব সমস্যার সমাধান হবে কিন্তু ব্যাপারটা যে আমার কন্ট্রোলে আর নেই সেটা বুঝলাম যখন অন্য দু’জন মারা গেল। আমি বুঝতে পারছিলাম, শয়তান তার নিজের মর্জি মতো চলতে শুরু করেছে কিন্তু ততক্ষণে সবটা হাতের বাইরে বেরিয়ে গেছে। এদিকে কাউকে বলতেও পারছিলাম না এর জন্য আমিই দায়ী। বরং যাতে কেউ আমাকে সন্দেহ না করে তাই জঙ্গলে হোটেল বানানোর ফরে কথা বলছিলাম। তুমি আমায় ধরে ফেলে আসলে আমায় উদ্ধার করলে নীরেন। আমাকে তোমরা যা শাস্তি দেবে আমি মাথা পেতে নেব। কিন্তু এ বার এই দানবকে আটকাও। নয়তো সবটা শেষ হয়ে যাবে।’
নীরেন বলল, ‘ওই ডায়েরিতে টাটজেলোয়ার্সকে আটকানোর কথা কিছু লেখা নেই?’
মাথা নাড়ল প্রবেশ, ‘না। আমি তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছি।’
সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নীরবতা ভেঙে প্রবেশই বলে উঠল, ‘আমি বাইরে আছি। পালাব না। যা শাস্তি দেওয়ার আমাকে দিয়ো। তবে তোমাকে বাঁচানোর সময় ঠাকুরের অলৌকিক তো আমি নিজে চোখেই দেখেছি। উনি চাইলে লেবংকে বাঁচাতে পারবেন। আর একটা কথা, আমার কাকা, কিরণ ছেত্রী আর ওর লোকেদের মৃত্যুর জন্য আমার কোনও অনুতাপ নেই। ওরা ফাদারকে মেরেছিল। আমি ওদের মেরেছি। বেশ করেছি।’
দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে প্রবেশ বাইরে বেরিয়ে গেল। নীরেন ঠাকুরের দিকে তাকাল। ঠাকুর চিন্তামগ্ন হয়ে আছেন। সে ডাকল, ‘ঠাকুর?’
ঘুরে তাকালেন ঠাকুর, ‘এ তো ভারি বিপদ হল রে নীরেন। তোর এই বন্ধু আবেগের বশে তো বিরাট গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেচে। এখন এই বেড়ালমুখো হতচ্চাড়া সাপটারে তাড়াই ক্যামনে? এসবের নামই তো আমি জন্মে শুনিনি। তা হ্যাঁ রে নীরেন, তুই এত কথা জানলি কেমন করে?
নীরেন বলল, ‘আমার তো নানা দেশের উপকথা, তন্ত্র এসব পড়তে ভালো লাগে। আমার খুব আফসোস হচ্ছে ঠাকুর, যদি আগেই ব্যাপারটা ধরতে পারতাম তা হলে হয়তো আপনি আরও দু’তিনটে প্রাণ বাঁচাতে পারতেন।
‘তুই নিশ্চিত আমি এই বেড়ালমুখো সাপটারে তাড়াতে পারব?’
ঠাকুরের পায়ের কাছে বসে পড়ল নীরেন, ‘আপনি কী ভাবে আমাকে ফিরিয়ে এনেছেন আমি শুনেছি। আপনি পারবেন না তো কে পারবে?’
‘কিন্তু এরে তাড়ানোর উপায় পদ্ধতিও তো বিদেশি হবে। সে সব আমি জানব কী করে?’
‘একটা কথা আমার মনে হচ্ছে। বলব?’
‘বল বল। তুই ভুল কিচু বলবি না আমি জানি।’
নীরেন যেন নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল। তার পরে বলল, ‘দেখুন ঠাকুর, শুধু তাড়ালে হবে না। টাটজেলোয়ামটাকে মারতে হবে। বেড়াল আর সাপকে একসঙ্গে কবজা করতে পারে কোন প্রাণী? কুকুর? তাই না?’
‘সে ঠিক, কিন্তু যত তালেবর কুকুরই হোক সে ওর সঙ্গে লড়ে পারবে না। ও যে অন্য জগৎ থেকে এসেচে।’
‘সেই জন্যই তো অলৌকিক প্রাণীকে মারতে অলৌকিক কুকুরই লাগবে। অন্য জগতের কুকুর।
‘খোলসা করে বল।’
‘ঠাকুর, গ্রিক পুরাণে একটা কুকুরের উল্লেখ আছে যার নাম সারবেরাস। তার তিনটে মাথা। সে নরকের দরজা পাহারা দেয়। আমাদের পুরাণে এই কুকুরটার কোনও নাম নেই ঠিকই কিন্তু নরকের দরজায় সে দাঁড়িয়ে থাকে। থাকতেই হবে। পুরাণগুলো আসলে একই গল্প বলে। স্থানভেদে নাম বদলে বদলে যায় মাত্র। ওই কুকুরটাকেই লাগবে ঠাকুর। ওকে ডেকে এনে আবার ফেরত পাঠাতে হবে। পারবেন না?’
স্থির চোখে কিছুক্ষণ নীরেনের দিকে তাকিয়ে রইলেন ঠাকুর। তার পরে বললেন, ‘তুই তো আমারে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিলি নীরেন।’
***
সন্ধের মুখে মুখে গোটা লেবং গ্রামের লোক ভেঙে পড়ল জঙ্গলের বাইরে। কাকের মুখে খবর ছড়িয়ে পড়েছে, রামদাস ঠাকুর আজ অপদেবতাকে নিকেশ করতে যাবেন। কিন্তু জঙ্গলের সীমানায় একটা নাটক চলছে।
বুদ্ধিটা নীরেনের। ঠাকুরের এক শিষ্য পুলিশের বড়ো কর্তা। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে বম্ব স্কোয়াডের দুটো পোশাক আনিয়েছিল নীরেন। তার মনে হয়েছিল, টাটজেলোয়ার্মের অতর্কিত আক্রমণ থেকে বাঁচতে এর চেয়ে ভালো রাস্তা আর কিছু নেই। বেড়াল কেন, বাঘের কামড়ও ওই পোশাকের মোটা আস্তরণ ভেদ করতে পারবে না। নীরেন জানে, অলৌকিক ওই দানবের সামনে এই পোশাক খুব বেশিক্ষণ রক্ষণ সামলাতে পারবে না কিন্তু একটু হলেও তো প্রস্তুত হওয়ার সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু ঠাকুর কিছুতেই ওই পোশাক পরতে চাইছেন না। খালি বলছেন, ‘ও গো, আমি দোম আটকে মরে যাব।’
শেষকালে কাছে গিয়ে নীরেন চাপা গলায় এক ধমক দিল, ‘আপনি বড়ো অবাধ্য। মুখোশের মধ্যে ফুটো-ফুটো নেই? ওই দিয়ে হাওয়া আসবে। কেন দম আটকাবে?’
নীরেনের ধমক খেয়ে ঠাকুর একটু দমে গেলেন, ‘ও আমার দোম আটকায় তো আমি কী করব?’
‘কিচ্ছু দম আটকাবে না। দম আটকালে আমি মুখোশ খুলে দেব। পরুন বলছি।’
ঠাকুর কাঁচুমাচু হয়ে নীচু গলায় বললেন, ‘তুই আমারে সবার সামনে ধমকাচ্চিস কেন? আমি তোর গুরুজন হই না?’
নীরেনও নীচু গলায় বলল, ‘আপনি জেদ করলে কী করব? আর আমি মোটেও ধমক দিইনি আপনাকে। আপনি খুব ভণিতা করেন। কথা না বাড়িয়ে পরুন। আসুন আমি পরিয়ে দিচ্ছি।’
ঠাকুরের দুই শিষ্যের এই কথোপকথন ভালো লাগছিল না। এমনিতেই গোড়া থেকে নীরেনের সঙ্গে ঠাকুরের সদ্ভাব তাঁদের ঈর্ষান্বিত করে তুলেছিল, তার ওপরে নীরেনকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার সময় ঠাকুরের আকুলতা তাঁদের মনে বিরক্তির জন্ম দিয়েছিল। তাঁদেরই একজন একটু রুক্ষ স্বরে বললেন, ‘মানছি ঠাকুর তোমাকে অত্যধিক স্নেহ করেন কিন্তু তাই বলে তুমি ঠাকুরের সঙ্গে এ ভাবে কথা বলবে? নিজের সীমা লঙ্ঘন কোরো না।
নীরেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সত্যিই একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে সে। কিন্তু সে যা বলছিল তা তো ঠাকুরের ভালোর জন্যই। যাই হোক, এ ভাবে বলাটা তার উচিত হয়নি। নীরেন সবে বলতে যাবে, ‘আমাকে ক্ষমা করুন,’ তার আগেই ঠাকুর ওই শিষ্যকে বলে উঠলেন, ‘আহা! তুমি আবার আমাদের মা-ব্যাটার মধ্যে ঢুকচ কেন বলো দিকি? সে নীরেন একটু রাগী মানুষ। তোমরা তো সারাক্ষণ আমারে তেল দাও। এক-আধটা মানুষ থাক যে বকাবকি করবে।’
ঠাকুরের এই আশ্চর্য ভালোবাসা নীরেনের বুকের মধ্যে বার বার এক পাগলাঝোরার উৎসমুখ খুলে দেয় আর অর্গলহীন হয়ে পড়ে নীরেনের চোখের জল। সবার সামনে কান্নাকাটি করা ঠিক না। নিজেকে কোনও মতে সামলে নিল সে। ঠাকুর বললেন, ‘আসলে কী বল তো নীরেন, এখেনে সবাই জানে আমি খুব তালেবর। তা আমি যদি ওই বস্তা গায়ে চাপিয়ে জঙ্গলে যাই ওরা কি আর তেমন ভরসা পাবে?’
নীরেন একটু ভাবল। তার পরে বলল, ‘ওরা সবাই অলৌকিকের আশায় এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু অলৌকিকের সঙ্গে যুক্তি, বুদ্ধি, লজিকের কোনও বিরোধ নেই ঠাকুর। আপনি এখন যে কাজটা করতে যাচ্ছেন সেটা কতটা ব্যাপক সে সম্পর্কে আমার আবছা-আবছা ধারণা আছে। এ বার জঙ্গলে ঢোকার পরেই যদি টাটজেলোয়ামটা আমাদের আক্রমণ করে বা কামড়ে দেয় আমরা মূল কাজটা থেকে বিচ্যুত হব না কি? তাই এটুকু সাবধানতা। এতে আপনার বিভূতি এতটুকু কমে না। আমার বিশ্বাস আপনার বিভূতি এত খেলো নয়।’
একদমে কথাগুলো বলে ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে রইল নীরেন। ঠাকুরও গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইলেন নীরেনের দিকে। ধীরে ধীরে তাঁর মুখে হাসি ফুটল। বললেন, ‘নিজের বুদ্ধির ওপরে তোর খুব আস্থা না রে?’
হাতজোড় করে নীরেন বলল, ‘ওটুকুই তো আমার সম্বল। আমার যে আপনার মতো শক্তি নেই।’
ঠাকুর বললেন, ‘বুদ্ধিই তো মানুষের সবচেয়ে বড়ো শক্তি রে। আজ যে অপদেবতারে মারতে যাচ্চি, এইটুকুই-বা এলাম কীসের জোরে? তোর বুদ্ধির জোরে। বেশ আমি পরব তোর ওই বস্তা। পরিয়ে দে আমারে।’
নীরেন হাঁফ ছাড়ল। বাবা রে, ঠাকুরকে কিছু বোঝানো ঝকমারি। অবশেষে বম্ব স্কোয়াডের পোশাক গায়ে দিয়ে নীরেনের হাত ধরে ঠাকুর ঢুকে গেলেন জঙ্গলের মধ্যে।
জঙ্গলের ভেতরে তখন আঁধার ঘনিয়ে উঠেছে। দু’জনের দু’হাতে দুটো মশাল। সেই আলো অন্ধকারকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারছে না। ঠোক্কর খেতে খেতে প্রায় আন্দাজেই আগের দিনের জায়গাটায় এসে পৌঁছোল দু’জনে। নীরেনের আশঙ্কা সত্যি হল না। পথে কোনও বিপদ হল না। নীরেন সঙ্গে করে আরও কিছু মশাল নিয়ে এসেছিল। ঠাকুরের কথামতো সেগুলো মাটিতে পুঁতে একটা বৃত্ত তৈরি করল। এ বার আর ঠাকুর নীরেনের কথা শুনলেন না। বম্ব স্কোয়াডের পোশাক খুলে ফেললেন। বললেন, ‘এ সব ধরাচুড়ো পরে আমি মন বসাতে পারব না রে নীরেন।’
নীরেনও আর আপত্তি করল না, তবে নিজের পোশাকটা পরেই রইল সে। ঠাকুর নিজের ঝোলা থেকে কিছু সরঞ্জাম বার করে আনলেন। তার মধ্যে একটা মুখ ঢাকা ছোটো ঘটি আর কিছু চন্দন কাঠের টুকরো ছাড়া বাকিগুলোকে চিনতে পারল না নীরেন। মশালের বৃত্তের চারপাশে ঘটি থেকে জল ছেটাতে শুরু করলেন ঠাকুর। সঙ্গে অস্ফুট মন্ত্রোচ্চারণ।
ঠাকুরের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল নীরেন। হাসিখুশি মানুষটা ধীরে ধীরে যেন বদলে যাচ্ছিল এক কঠোর কঠিন যোদ্ধায়। জল ছেটানো শেষ করে নীরেনের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন তিনি। ঠাকুরের চাহনি দেখে এই প্রথম বার একটু যেন ঘাবড়ে গেল নীরেন। মানুষের চোখ অন্ধকারে এমন জ্বলজ্বল করে না কি! মশালের আগুন জংলা হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠছে আর সেই আলো ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে ঠাকুরের মুখের ওপরে, গায়ের ওপরে। সেই ভাঙা ভাঙা আলোয় নীরেন দেখল, এই রামদাস ঠাকুর তার অচেনা। অচেনা এক গম্ভীর গলায় ঠাকুর বলে উঠলেন, ‘এখন থেকে যতক্ষণ না আমি বলচি তুই আমার পেচনে দাঁড়িয়ে থাকবি। যাই হয়ে যাক যদি দেখিস কেউ আমারে মেরেও ফেলচে তুই নড়বি না। যে জায়গাটায় বাঁধন দিয়েচি তার বাইরে বেরোবি না। তুই অনেক বার অনুরোধ করেচিলি বলে আমি তোরে নিয়ে এসেচি কিন্তু আমার অবাধ্য হলে তার ফল ভালো হবে না। কী বললাম মনে থাকবে? আমি না বলা অবধি তুই বাইরে যাবি না। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি। বুঝেচিস? মাথায় ঢুকেচে?’
বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নাড়ল নীরেন। এই রামদাস ঠাকুর অন্য মানুষ। এই রামদাস ঠাকুরের সঙ্গে তর্ক করা যায় না। ঘটি থেকে কিছুটা জল মাটিতে ছিটিয়ে ঠাকুর সেখানে বসে পড়লেন। নীরেন গিয়ে দাঁড়াল ঠাকুরের পেছনে ঝোলা থেকে একটা তামার তৈরি ছোটো যজ্ঞপাত্র বার করলেন ঠাকুর। তার ওপরে চন্দন কাঠের টুকরোগুলো রেখে আগুন ধরিয়ে দিলেন। সামান্য ক’টা কাঠ কিন্তু এত তীব্র উজ্জ্বল আগুন আগে কখনো দেখেনি নীরেন। তার চোখ বন্ধ হয়ে এল। ঠাকুর মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন। নীরেনের মনে হল, গম্ভীর অথচ সুরেলা সেই মন্ত্র যেন কাউকে ডাকছে। খুব আকুল হয়ে ডাকছে। সেই ডাকে শিহরণ জাগছে অন্ধকার জঙ্গলের প্রাচীন সব গাছের পাতায়-পাতায়, শেকড়ে-শেকড়ে। এমনিতেই বেশ ঠান্ডা ছিল কিন্তু কোথা থেকে যেন একটা বরফশীতল হাওয়া বইতে শুরু করল। হি-হি করে কাঁপতে লাগল নীরেন। যজ্ঞপাত্রের আগুনটা কমতে কমতে একেবারে নিভু-নিভু হয়ে এল। আকাশে যে একফালি চাঁদ ছিল তাকে ঢেকে দিল ঘন কালো মেঘ আর ঠিক এমন সময় একটা চাপা অথচ ক্রুদ্ধ গর্জন শুনতে পেল নীরেন। বিস্ফারিত চোখে সে দেখল মশালের বৃত্তের বাইরে কিছুটা দূরে একটা অন্ধকারের পিণ্ড জন্ম নিচ্ছে। সেটাই গর্জন করছে। একটু-একটু করে আকারে বড়ো হচ্ছে সেটা আর গর্জনের তীব্রতা বাড়ছে। একসময় স্পন্দন থামল। অন্ধকারের পিণ্ডটা নীরেনদের দিকে ফিরল। সাহসী বলে বন্ধুমহলে নীরেনের বেশ নামডাক আছে কিন্তু আজ এই অন্ধকারে, বরফশীতল জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে নীরেনের অন্তরাত্মা অবধি শিউরে উঠল। মেরুদণ্ড বেয়ে আরশোলার মতো কিলবিল করতে লাগল একটা অব্যক্ত ভয়। মশালের আবছা আলোয় অন্ধকারের পিণ্ডটার স্বরূপ বুঝতে পারছে সে। ওই তো তিন জোড়া সবুজ চোখ, তাতে সঞ্চিত হয়ে আছে অনাদিকালের ক্রোধ। ওই তো তিনটে মুখে ঝকঝকে শদন্তের সারি। তার থেকে ঝরে পড়ছে লালা। নাহ লালা নয়, নরকের জিঘাংসা। ‘সারবেরাস’! গ্রিক পুরাণে বর্ণিত নরকের দ্বাররক্ষী কুকুর। নীরেনের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ঠাকুরের মধ্যে কোনও কিন্তু হেলদোল নেই। পাথরের মতো চোখ বুজে বসে আছেন তিনি। কুকুরটা ওই ঘাতক সবুজ চোখে কিছুক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে রইল তার পরেই প্রবল এক গর্জন করে ছুটে গেল পাশের একটা ঝোপের দিকে।
চোখ সওয়া অন্ধকারে, মশালের কাঁপতে থাকা আলোয় অলৌকিক এক লড়াইয়ের সাক্ষী হল নীরেন। কুকুরটা ছুটে যেতেই ঝোপের মধ্যে থেকে মাথা তুলল টাটজেলোয়াম। চকিতে কামড় বসাতে গেল কিন্তু তার আগেই বিশাল থাবার আঘাতে ছিটকে পড়ল দূরে। একলাফে সেখানে পৌঁছে কামড় বসানোর আগেই কুকুরটাকে পাকে পাকে জড়িয়ে নিল বিশাল সাপটা। দু’জনের ক্রুদ্ধ জান্তব গর্জনে ফালা ফালা হয়ে গেল রাতের নিস্তব্ধতা। ভয় পেয়ে ডেকে উঠল অসংখ্য পাখি। তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ তালা ধরিয়ে দিল কানে। যেন স্থবির হয়ে গেল নীরেন। গোটা জঙ্গলটাও যেন স্তম্ভিত হয়ে এই মহাযুদ্ধ দেখতে থাকল। সময়ের হিসেব গুলিয়ে গেল নীরেনের। তার মনে হল, অনন্তকাল ধরে এই যুদ্ধ চলছে অচিন জগতের অলৌকিক দুই মহারথীর মধ্যে।
তবে এক সময় যুদ্ধ শেষ হল। ছিন্নভিন্ন হয়ে টাটজেলোয়ামটা পড়ে রইল মাটিতে আর কুকুরটা হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল। তার গায়েও প্রচুর ক্ষত। মরার আগে কামড় দিতে ভোলেনি টাটজেলোয়াম। ধীরে ধীরে টাটজেলোয়ার্মের ছিন্নভিন্ন দেহটা মিলিয়ে গেল। মৃত্যুর পরে আর অন্য জগতে টিকে থাকার মতো জোর রইল না তার।
ঠাকুর এখনও বসে আছেন একইভাবে। নীরেনের মনে হল, টাটজেলোয়ার্মের বিষ কি শেষ অবধি সামলাতে পারবে নরকের কুকুর? তার আশঙ্কা সত্যি করে কুকুরটা এবারে ধুঁকতে শুরু করল। এক সময় সামনের পা দুটো ছড়িয়ে তিনটে মাথা এলিয়ে দিল। বুজে এল তিন জোড়া সবুজ চোখ
নীরেনের মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছোটোবেলা থেকে কত গল্প পড়েছে এই সারবেরাসের। এই মৃত্যুটা সে মেনে নিতে পারছিল না কিছুতেই। রক্ষকের মৃত্যু কেই-বা মেনে নিতে পারে! নীরেন ডাকল, ‘ঠাকুর, কুকুরটা যে মরে যাচ্ছে। ওকে কোনও ভাবে বাঁচানো যায় না?’
ঠাকুর উত্তর দিলেন না। ও দিকে শুয়ে-শুয়েই কেঁদে উঠল কুকুরটা। নীরেন বুঝতে পারল খুব কষ্ট পাচ্ছে সে। নীরেন এমনিতেই কুকুর ভালোবাসে। হলই বা নরকের কুকুর। কুকুর তো। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে জানে, ঠাকুরের ঝোলার মধ্যে বিষের প্রতিষেধক আছে। হাত ঢুকিয়ে কৌটোটা বার করে আনল আর তার পরে ঠাকুরের সাবধান বাণী বেমালুম ভুলে গিয়ে পা রাখল মন্ত্রপূত জল ছেটানো বৃত্তের বাইরে।
পায়ে-পায়ে কুকুরটার কাছে চলে এল নীরেন। বিশাল লোমশ চেহারা। সাধারণ কুকুরের চাইতে অন্তত তিনগুণ বড়ো। কিন্তু এখন কেমন অসহায় লাগছে এত বড় জীবটাকে। একটু ঝুঁকে পড়ে ভালো করে দেখতে চাইল নীরেন। ঠিক তখনই একসঙ্গে খুলে গেল তিন জোড়া সবুজ চোখ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তীব্র গর্জন করে উঠে দাঁড়াল কুকুরটা আর সেকেন্ডের ভগ্নাংশে কামড়ে ধরল নীরেনের গলার কাছটা। সেই ধাক্কায় নীরেন পড়ে গেল মাটিতে। প্রচণ্ড আক্রোশে কুকুরটা ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল পোশাকের আবরণটা। প্রচণ্ড ভয়ে নীরেন চিৎকার করে উঠল, ‘ঠাকুর, বাঁচান!’
ওই প্রবল ঝটাপটির মধ্যেও নীরেন দেখতে পেল, তার চিৎকারে ঠাকুরের কোনও ভাবান্তর হল না। নীরেন ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল নিজেকে ছাড়ানোর কিন্তু যত চেষ্টা করতে লাগল তত বেশি করে দাঁত বসে যেতে লাগল। গলার কাছে প্রচণ্ড এক চাপ অনুভব করল নীরেন। সে বুঝতে পারছে একটু একটু করে ছিঁড়ে যাচ্ছে বম্ব স্কোয়াডের শক্ত পোশাক। অলৌকিক শদন্তের কাছে হার মানছে লৌকিক আবরণ। আর একটু পরেই তীক্ষ্ণ দাঁত বসে যাবে তার গলায়। হাত দিয়ে আবারও আটকানোর চেষ্টা করল নীরেন কিন্তু অন্য একটা মুখ দিয়ে তার হাত কামড়ে ধরল কুকুরটা। চোয়ালের চাপে যেন হাড়গুলো অবধি আর্তনাদ করে উঠল। নীরেন বুঝতে পারল সে মরে যাচ্ছে। কিন্তু যন্ত্ৰণা আর মৃত্যুভয়কে অগ্রাহ্য করে তার চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে উঠল তীব্র অভিমানে। ঠাকুর এখনও একই ভাবে বসে আছেন যে! নীরেন মরে যাচ্ছে তবু ঠাকুর এলেন না! হাল ছেড়ে দিয়ে সে নিজেকে সঁপে দিল নরকের কুকুরের কাছে। মৃত্যুর কাছে। চোখ বুজে ফেলল সে আর তখনই তার কানে ভেসে এল শিসের শব্দ। অদ্ভুত সুরেলা শিস! কে এমন শিস দিচ্ছে! ফের সচকিত হয়ে উঠল নীরেনের ইন্দ্রিয়গুলো। সে অনুভব করল, গলা এবং হাতের ওপরে দাঁতের চাপ কমে যাচ্ছে। কুকুরটা তাকে ছেড়ে দিল আচমকাই।
নীরেন ভাবল, ঠাকুর শিস দিচ্ছেন। মাটিতে পড়ে থেকেই ঠাকুরের দিকে তাকাল সে। কিন্তু না! ঠাকুর তো সেই একই ভাবে বসে আছেন পাথরের মতো! তবে? এ কার শিস? কার শিসে এই ঘাতক কুকুরটা তাকে ছেড়ে দিল। কষ্ট করে এ বারে উলটো দিকে তাকাল নীরেন আর দেখল বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক ছায়ামূর্তি। এই অন্ধকারে তার হিলহিলে অবয়বটুকুই বোঝা যাচ্ছে মাত্র কিন্তু চোখ-মুখ কিছুই স্পষ্ট নয়। তবে এই ছায়ামূর্তি সাধারণ নয়। উচ্চতায় সাধারণ মানুষের প্রায় দ্বিগুণ। তার হাতে একটা লম্বা লাঠি আর সারা শরীর জুড়ে এক আশ্চর্য আভা। সে আভা আলো নয়। অন্ধকারই যেন জ্যোতিঃপুঞ্জ হয়ে ঘিরে রয়েছে তাকে। সেই অলৌকিক অবয়বই শিস দিচ্ছে। নীরেন দেখল, নিতান্ত অনিচ্ছায় কুকুরটা ফিরে গেল তাকে ছেড়ে। গিয়ে সুদীর্ঘ সেই অবয়বের পায়ে মাথা ঘষতে লাগল। হাতের লাঠিটা দিয়ে কুকুরটার গায়ে একটা জোর বাড়ি মারল সেই ছায়ামূর্তি। যেন অন্যায়ের শাস্তি দিল সে। কুকুরটা কেঁউ কেঁউ করে কেঁদে উঠল। এ বার সেই ছায়ামূর্তি হাঁটা লাগাল গভীর জঙ্গলের দিকে। কুকুরটাও চলল তার পিছু পিছু। একটু পরেই গাছের আড়ালে হারিয়ে গেল নরকের কুকুর এবং নীরেনের জীবনদায়ী সেই ছায়ামূর্তি। জ্ঞান হারানোর আগের মুহূর্তে নীরেন অনুভব করল, ঠাকুর তার মাথাটা কোলে তুলে নিয়েছেন। সে অস্ফুটে বলল, ‘ও কে ঠাকুর? কে আমায় বাঁচিয়ে দিয়ে গেল?’
***
ট্রেন ছুটে চলেছে কলকাতার দিকে। একটা ফার্স্টক্লাস কামরায় ঠাকুর আর নীরেন বসে আছে মুখোমুখি। লেবংয়ের মানুষ এত উপহার দিয়েছে সেগুলো রাখার জায়গা হচ্ছে না। তারা অকুণ্ঠ ধন্যবাদ দিয়েছে ঠাকুরকে। নীরেনকে। ঠাকুর অবশ্য বারে বারে বলেছেন, ‘আমি না। তোমরা সব নীরেনের বুদ্ধির জোরে বেঁচে গেলে গো। এ ব্যাটার মাথা খুব চলে।’
প্রবেশ আর ভূপেন এসেছিল ট্রেনে তুলতে। ট্রেন ছাড়ার আগে অবধি ওরা ছিল। নেমে যাওয়ার আগে প্রবেশ বলেছিল, ‘আমাকে কোনও শাস্তি দিলেন না?’
ঠাকুর বলেছিলেন, ‘তোমার অনুতাপ হয়েচে ওই তোমার শাস্তি গো। তবে আর কখনো এ সব কোরো না। তন্ত্র সোজা জিনিস না। না জেনে হাত দিলে হাত পুড়বেই। আর তুমি চিন্তা কোরো না, আমার শিষ্যরা সব তালেবর লোক। ওদের আমি বলে দিয়েচি, এ জঙ্গল যেন কেউ না কাটে ওরা তার ব্যবস্থা করবে।’
নীরেনকে জড়িয়ে ধরে প্রবেশ বলেছিল, ‘তোমার কথা আমি কোনও দিন ভুলব না। কলকাতায় ফিরেই দেখা করব তোমার সঙ্গে।’
ওরা নেমে গেছিল। নেমে যাওয়ার আগে প্রবেশ নীরেনের হাতে দিয়ে গেছিল ফাদার ক্যারলের ডায়েরিটা। বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন ছেড়েছিল। বেশ অনেকক্ষণ ধরে ট্রেন চলছে। এখন ওরা মালদার কিছু আগে। ঠাকুর জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। ডাক দিলেন, ‘ও নীরেন, দেখ কত বকপাখি।’
নীরেন ঘুরেও তাকাল না। সে ঠাকুরের ওপরে প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে রয়েছে। পঞ্চাশ বার জিজ্ঞেস করেছে, ‘সেদিন রাতে ওটা কে ছিল,’ ঠাকুর উত্তর দেননি। ঠাকুর জানলা থেকে চোখ সরিয়ে নীরেনের দিকে তাকালেন, ‘বকপাখি দেখবি না?’
‘আপনি দেখুন। বক আমার দুচক্ষের বিষ।’
হো-হো করে হেসে উঠে নীরেনকে জড়িয়ে ধরে প্রায় তার কোলে উঠে এলেন ঠাকুর, ‘রাগ করেচে, আমার খোকা রাগ করেচে।’
‘ছাড়ুন তো আমায়। আপনাকে আমার অসহ্য লাগে,’ ঠাকুরকে ছাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল নীরেন।
ঠাকুর আরও চেপে ধরলেন নীরেনকে, ‘আচ্চা, আর রাগ করিস না। কী করলে তোর রাগ কমবে বল।’
‘তা হলে আপনি বলুন, সে রাতে কে আমায় বাঁচিয়েছিল?’
নীরেনকে ছেড়ে একটু সরে বসলেন ঠাকুর। বললেন, ‘জানতেই হবে?’
‘হ্যাঁ, জানতেই হবে।’
‘তুই তো এত জানিস, এত পড়ালেখা করেচিস, তবু তাঁরে চিনলি না?’
‘কেন রহস্য করছেন ঠাকুর? বলুন না। একবার মনে হয়েছিল ফাদার ক্যারলের আত্মা। কিন্তু পরে ভেবে দেখেছি তা নয়। নরকের কুকুরকে বশ করা ফাদার ক্যারলের কম্ম নয়। ওই ছায়ামূর্তি অন্য কেউ।’
‘ঠিক বলেচিস,’ সোজা হয়ে বসলেন ঠাকুর। বললেন, ‘শোন নীরেন, নরক থেকে যদি কেউ আসে সে কখনো খালি হাতে ফেরে না। এটাই নরকের নিয়ম। নরকের কুকুর তাই তোর ওপরে মায়া করেচিল। তোরে টেনে বের করে এনেছিল বাঁধনের বাইরে। তুই দেখেচিলি কি না জানি না, আমি কিন্তু একইভাবে বসেচিলাম। আসলে আমি আন্দাজ করেচিলাম তুই ভুল করবি। তোর মন এখনও অত শক্ত না যে তুই নরকের জীবের মায়া কাটাতে পারবি। তাই আমি মনপ্রাণ দিয়ে তাঁকে ডাকচিলাম। আমাদের ভাগ্য ভালো আমার ডাকে তিনি সাড়া দিলেন। অমন সড়ালে কুকুরকে তিনি ছাড়া আর কে বশ করবে? কুকুর যে তাঁর বাহন।’
স্তম্ভিত হয়ে গেল নীরেন, ‘তবে কি তিনি….?’
‘কালভৈরব।’
ঠাকুরের গলা গমগম করে উঠল ট্রেনের কামরার মধ্যে। ঠাকুর দুই হাত জড়ো করে কপালে ঠেকালেন। নীরেনও হাতজোড় করে কপালে ঠেকাল। অদ্ভুত এক অনুভুতি হচ্ছে তার মনের মধ্যে। স্বয়ং কালভৈরব তাঁকে রক্ষা করলেন! ঠাকুরের ডাকে তিনি আবির্ভূত হলেন! এতটাও ভাগ্য সে করেছিল!
সিট ছেড়ে ঠাকুরের পায়ের কাছে বসে পড়ল নীরেন। পা দুটো বুকের মধ্যে নিয়ে বলল, ‘আমায় দীক্ষা দেবেন? আমি শিখতে চাই।’
নীরেনের মাথাটা ধরে তার কপালে একটা চুমু খেয়ে ঠাকুর বললেন, ‘শেখাতে পারি, তবে তোরে কথা দিতে হবে, আমায় ছেড়ে তুই কক্ষনো যাবি না।’
এমন ভাবে কেউ থাকার কথা বলে? এ ভাবে থেকে যেতে বললে কান্না পাবে না? চোখ মুছতে মুছতে নীরেন বলল, ‘কোথায় আর যাব? আপনাকে ভালোবাসি যে।’
