লাপিস লাজুলি – ২৪
॥ চব্বিশ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
বড়োজোর মিনিট দশেক, তার মধ্যেই অপালা চেঁচিয়ে উঠল, ‘পেয়েছি। পেয়েছি। সঞ্জয়, তোমার অনুমান অভ্রান্ত।’
স্তম্ভের নীচের দিকটায় খোঁজ চালাচ্ছিল অপালা। তাকি সাহেব আর সঞ্জয় দুজনেই কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এল তার কাছে। অপালা আঙুল দিয়ে একটা পাথরের ট্যাবলেটের দিকে দেখাল। সেটার ওপর জোরালো আলো ফেললেন তাকি সাহেব। সঞ্জয় দেখল, পাথরের ওপরে কিউনিফর্ম লিপিতে যা লেখা ছিল সময়ের প্রভাবে তা প্রায় ক্ষয়ে গেছে। তার ওপরে নতুন করে আরবিতে কিছু খোদাই করা হয়েছে। সে বলল, ‘কী লেখা আছে এখানে?’
তাকি সাহেব বলার আগেই অপালা বলে উঠল, ‘ল্যাটিটিউড আর লঙ্গিটিউড। ২৫.০১ ডিগ্রি নর্থ, ৮৮.১৪ ডিগ্রি ইস্ট। তার সঙ্গে আরও অদ্ভুত একটা জিনিস লেখা আছে।’
‘কী?’
লেখা আছে, ‘জয় জয় দেবী দুর্গা, দুর্গতিনাশিনী, সিংহবাহিনী। ব্রহ্মস্থান।’
‘মানে?’
‘মানে যা শুনছ তাই।’
‘গিয়াসুদ্দিন মা দুর্গার কথা লিখে গেছেন?’
‘তাই তো দেখছি সঞ্জয়। আচ্ছা শিগগির মোবাইলে চেক করো তো কো-অর্ডিনেটটা।’
মোবাইল ফোন দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল সঞ্জয়। বলল, ‘অপালা, এটা মালদার কাছাকাছি কোনও একটা জায়গা।’
এবার অপালার চমকানোর পালা, ‘কী বলছ তুমি?’
‘এই দেখো না,’ মোবাইল ফোন বাড়িয়ে দিল সঞ্জয়।
অপালা দেখল, জায়গাটা সত্যিই মালদহের কাছাকাছি, তার নিজের রাজ্যে, পশ্চিমবঙ্গে। সে অস্ফুটে বলে উঠল, ‘হে ভগবান! দেবী ইনান্নার দণ্ড ওয়েস্ট বেঙ্গলে!’
‘তোমরা নিজেদের মধ্যে যা বলছ সেটা ইংরেজিতে বললে ভালো হয়,’ গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন তাকি সাহেব।
যারপরনাই লজ্জিত হল অপালা আর সঞ্জয়। উত্তেজনায় এতক্ষণ ধরে ওরা মাতৃভাষায় বকবক করে গেছে। অপালা ইংরেজিতে বলল, ‘দুঃখিত স্যার, কিন্তু যা বুঝলাম গিয়াসুদ্দিন দেবী ইনান্নার দণ্ড লুকিয়ে রেখেছেন আমার নিজের দেশে, ইন্ডিয়ায়। আরও নির্দিষ্ট করে বললে আমার নিজের রাজ্যে, ওয়েস্ট বেঙ্গলে। জায়গাটার নাম মালদহ। কো-অর্ডিনেট তাই বলছে।’
‘আর ওই দেবী দুর্গার ব্যাপারটা?’
অপালা বলল, ‘এটা খুব সিম্পল স্যার। গিয়াসুদ্দিনের দিনলিপি অনুযায়ী উনি ভারতে গেছেন বা জিনিসটা পাঠিয়েছেন ১২৬৫-র পরে। দেবী ইনান্না যেহেতু সিংহবাহিনী, তাই গিয়াসুদ্দিন দেবীর দণ্ড গচ্ছিত রাখছেন এমন এক দেবীর কাছে যিনিও সিংহবাহিনী। মালদায় গিয়ে আমাদের দ্বাদশ-ত্ৰয়োদশ শতকে তৈরি দুর্গা মন্দিরের খোঁজ করতে হবে। আমার বিশ্বাস এমন পুরোনো মন্দির এক-আধটাই এখনও টিকে আছে। আর ব্রহ্মস্থান কথাটার দুটো অর্থ হতে পারে। হয় গিয়াসুদ্দিন মন্দিরের স্থানমাহাত্ম্য বোঝাতে শব্দটা ব্যবহার করেছেন, নয়তো ব্রহ্মস্থান নামের কোনও জায়গায় ওই মন্দির। আমার ধারণা দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাই ঠিক। সে ক্ষেত্রে গিয়াসুদ্দিন আমাদের খাটনি কমিয়ে দিয়েছেন। ইশ, দাদুকে যদি ফোন করে জানাতে পারতাম খবরটা। কিন্তু দাদু তো ঘুমোচ্ছে।’
কথাটা শেষ করতে না করতেই অপালার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই আনন্দে নেচে উঠল অপালার মনটা। দাদু ফোন করেছেন হোয়াটসঅ্যাপে। কিন্তু পরমুহূর্তেই আশঙ্কার মেঘ ঘনাল তার মনে। এখন তো দেশে রাত প্রায় তিনটে। এত রাতে দাদু ফোন করছে কেন? ফোন ধরে চিন্তিত কণ্ঠে সে বলতে গেল, ‘দাদু তুমি…’
‘কোথায় তোমরা,’ অপালার কথা শেষ করতে না দিয়ে প্রায় ধমকেই উঠলেন ভাদুড়িমশায়। তাঁর গলায় উদ্বেগ ঝরে পড়ছে।
একটু ঘাবড়ে গিয়ে অপালা বলল, ‘কী হয়েছে দাদু? এনিথিং রং?’
‘পালটা প্রশ্ন না করে উত্তর দাও, কোথায় তোমরা?’
দাদুর এই গলা চেনে অপালা। খুব বিচলিত না হলে দাদু তো এমন করে কথা বলে না। সে বলল, ‘আমরা পালমাইরার ইনান্না মন্দিরে। দেবীর দণ্ড কোথায় আছে…’
‘তুমি আর সঞ্জয় এই মুহূর্তে ওই মন্দির থেকে বেরিয়ে এসো। তোমাদের সঙ্গে যে লোকটা আছে যত দ্রুত পারো ওর থেকে নিরাপদ দূরত্বে চলে যাও।’
অবাক হয়ে তাকি সাহেবের দিকে তাকাল অপালা। বলল, ‘কেন দাদু?’
‘লোকটা শুনতে পাচ্ছে না তো? ও যেন কোনও রকম সন্দেহ না করে।’
‘না না। বলো।’
‘লোকটা নিজের যে পরিচয় দিয়েছে সেটা মিথ্যে। ওর আসল নাম হুদুদ বেগ। ইরাকের বাসিন্দা হলেও ওর অরিজিন মঙ্গোলিয়া। পরে কোর্টে গিয়ে ও নিজের নাম বদলে করেছে তাকি আল তুসি। কোর্টের সেই ডকুমেন্ট সমীরণ জোগাড় করেছে। আর তার থেকেও বড়ো কথা, লোকটা আর পাঁচ জনের মতো স্বাভাবিক নয়। ও জাতিস্মর। ওর চোখ দেখেই আমি শিউরে উঠেছি। ওই চোখে কয়েক শতাব্দীর ঘৃণা জমে আছে দিদিভাই। কোনও খারাপ মতলবে ও দেবীর দণ্ড খুঁজে বেড়াচ্ছে। তোমরা ওকে আর সাহায্য কোরো না আর এখুনি …’
কথা শেষ করতে পারলেন না ভাদুড়িমশায়, তার আগেই অপালার হাত থেকে ফোন খসে গেল। কারণ ততক্ষণে সঞ্জয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা তাকি আল তুসি ওরফে হুদুদ বেগের হাতে উঠে এসেছে একটা রিভলবার আর সেটা তিনি তাক করেছেন সঞ্জয়ের মাথায়।
পরের ঘটনাটা খুব দ্রুত ঘটল। তাকি সাহেব একটা শিস দিতেই চার জন বিশাল চেহারার লোক মন্দিরের ভেতরে ঢুকে পড়ল আর সঞ্জয়, অপালার ফোন কেড়ে নিয়ে ওই তিন নম্বর থামটার সঙ্গেই ওদের বেঁধে ফেলল। লোকগুলো একটা ফোল্ডিং চেয়ার এনে পেতে দিল ঠিক ওদের সামনেটায়। চেয়ারটায় জুত করে বসে তাকি সাহেব লোকগুলোকে বললেন, ‘তোমরা এবার বাইরে ওয়েট করো। সময় মতো ডেকে নেব।’
বাধ্য ছাত্রের মতো দশাসই লোকগুলো বেরিয়ে গেল মন্দিরের বাইরে। এতক্ষণে সঞ্জয় আর অপালার চোখে চোখ রাখলেন তাকি সাহেব। বললেন, ‘অপালা, তোমার দাদু বোধ হয় আমার পরিচয় জেনে গেছেন তাই না?’
অবাক হয়ে অপালার দিকে তাকাল সঞ্জয়। অপালা বলল, ‘সঞ্জয়, এই লোকটা মিথ্যেবাদী, জোচ্চোর। ও মোটেই গিয়াসুদ্দিন আল তুসির বংশধর নয়। নাম ভাঁড়িয়ে আমাদের বোকা বানিয়েছে। আমাদের দিয়ে দেবীর দণ্ড খুঁজিয়ে নিয়েছে ওর অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। ওর আসল নাম হুদুদ বেগ।’
হেসে উঠলেন হুদুদ বেগ, ‘তোমার দাদুর তো দুর্দান্ত নেটওয়ার্ক। যা এত বছরে কেউ বার করতে পারল না, এই ক’দিনে উনি বার করে ফেললেন? উনি আর কী বললেন আমার সম্পর্কে?
অপালা কোনও উত্তর দিল না। তার বড়ো অসহায় লাগছে এখন। সঞ্জয়ের কথাটা না শুনলেই পারত। কেন এল এই রাতে? তা হলেই তো দাদু ওদের সাবধান করে দিতেন। মাঝখান থেকে এই জালি লোকটা দেবীর দণ্ডের হদিশ পেয়ে গেল। হুদুদ বেগ বললেন, ‘তুমি উত্তর দিতে চাইছ না তাই তো? দিয়ো না। তবে একটু আগে একটা কথা বললে না, আমার অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। একদম ঠিক বলেছ। উদ্দেশ্য আছে বলেই তো আজ আটত্রিশ বছর ধরে আমি ইনান্নার দণ্ডের সন্ধানে পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছি। কিন্তু দুঃখের কথা কী জানো, এগুলো আমি কাউকে বলতে পারি না। এতগুলো বছর ধরে এই সব কথা আমি গোপন রেখেছি। কিন্তু আমারও তো কাউকে বলতে ইচ্ছে করে বলো। গোপন কথার যে কী ওজন, যে গোপন করে সে জানে। আজ দেবীর দণ্ড প্রায় আমার হাতে চলে এসেছে আর সেটা এসেছে তোমাদের জন্যই। আজ থেকে সাতশো ষাট বছর আগের এক ভবিষ্যৎবাণী বলেছিল, এক দিন তোমরা এসে দেবীর দণ্ড উদ্ধার করবে। সেটাই সত্যি হল।’
‘লোকটা এখনও মিথ্যে বলে চলেছে অপালা,’ চাপা গলায় বলল সঞ্জয়।
অপালা বলল, ‘না সঞ্জয় লোকটা এখন সত্যি কথাই বলছে। দাদু আমায় বলেছে, লোকটা জাতিস্মর। চেহারায় বছর ষাট-পঁয়ষট্টি হলেও ওর মনের বয়স অনেক।’
হাঁ হয়ে গেল সঞ্জয়। ওদের নিজেদের মধ্যে কথা বলতে দেখে হুদুদ বেগ হাসলেন। বললেন, ‘তোমার খুব কৌতূহল হচ্ছে না অপালা? ব্যাপারটা কী হল জানতে ইচ্ছে করছে তাই তো?’
কঠিন গলায় অপালা বলল, ‘দেখুন, আমাদের কাছে পরিচয় গোপন করলেও আপনি যে পণ্ডিত মানুষ সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। আমি আগেও বলেছি, দেবীর দণ্ড আমাদের কেন দরকার। কাজটা মিটলেই আপনি দেবীর দণ্ড নিয়ে নেবেন। মিটে গেল। আমাদের ছেড়ে দিন।’
‘তা আর হয় না অপালা। তোমার দাদুর অতিরিক্ত কৌতূহল তোমাদের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। আমার পরিচয় জেনে ফেলার পরে আর কী করে বাঁচিয়ে রাখি বলো তো তোমাদের? এই পরিচয়টার আড়ালেই যে আমার এত বছরের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছি। এই পরিচয় আমি এত সহজে পাবলিক করে দিতে পারব না। তোমাদের মারার পরে তোমার দাদু এবং আর যারা যারা এই পরিচয় জেনেছে তাদের সবাইকে আমায় মেরে ফেলতে হবে। আমার কিচ্ছু করার নেই।’
লোকটার নির্লিপ্তি দেখে ঘাবড়ে গেল সঞ্জয়। যে লোক এত অবলীলায় মেরে ফেলার কথা বলতে পারে সে ভয়ঙ্কর। কিন্তু তাকে অবাক করে হেসে ফেলল অপালা। অপালার হাসি দেখে ধক করে জ্বলে উঠল হুদুদ বেগের চোখ দুটো। সঞ্জয়ের বুক কেঁপে উঠল সেই দৃষ্টি দেখে। কঠিন গলায় হুদুদ বেগ বললেন, ‘হাসছ কেন? আমি হাসির কথা বললাম?’
হাসতে হাসতেই অপালা বলল, ‘দাদুকে মারবেন বললেন না, তাই হাসি পেল। শুনুন মিস্টার বেগ, আমার দাদুর সম্পর্কে আপনার কোনও ধারণাই নেই। উনি সাধক মানুষ। তন্ত্রসিদ্ধ পণ্ডিত। দাদু আমাকে এটাও বলেছেন যে আপনি এক জন জাতিস্মর। কয়েকশো বছরের পুরোনো স্মৃতি নিয়ে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। হতেই পারে আপনার উদ্দেশ্যটাও সেই মান্ধাতা আমলের।’
চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল হুদুদ বেগের, ‘তোমার দাদু এটাও বলেছেন?’
চোখে চোখ রেখে অপালা বলল, ‘ভুলটা আমারই। আপনার ছবিটা যদি একটু আগে পাঠাতাম তা হলে আজ আপনি না আমাদের বাঁধতে পারতেন, না দেবীর দণ্ডের সন্ধান পেতেন। দাদু আপনার ছবি দেখেই কথাটা বলে দিয়েছেন। আপনাকে সামনে থেকেও দেখার দরকার পড়েনি। বুঝতে পারছেন তো লোকটার ক্ষমতা? ফলে দাদুকে মারার আইডিয়াটা বাদ দিন। তবে আমরা নিরস্ত্র। আপনার বন্দি। আপনি আমাদের মেরে ফেলতেই পারেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আপনিও বাঁচবেন না মিস্টার বেগ। আমার দাদু অর্থাৎ শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ির ক্রোধ আপনাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। নরকে গিয়ে লুকোলে ও দাদু আপনাকে টেনে বার করে এনে শাস্তি দেবে।’
অপালার নার্ভ দেখে চমকে গেল সঞ্জয়। এই অবস্থাতেও ভয় পায়নি সে। অবশ্য হবে নাই-বা কেন, কার নাতনি দেখতে হবে তো! হুদুদ বেগ কেটে কেটে বললেন, ‘তুমি আমাকে থ্রেট দিচ্ছ?’
‘না, সাবধান করছি। এখনও সময় আছে, আমি আপনাকে অফার দিচ্ছি, আমাদের সঙ্গে ইন্ডিয়া চলুন। দেবীর দণ্ড খুঁজে বার করি। আমাদের কাজ মিটে গেলে ওই দণ্ড আপনি নিয়ে নেবেন।’
চোখ দুটো আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে হুদুদ বেগের। একটু হেসে বললেন, ‘তোমার মনে হয় এত কিছুর পরে তোমার দাদু বা তোমরা আমাকে আর দেবীর দণ্ড দেবে? দেবে না অপালা। অবশ্য তোমরা দিলে কি দিলে না তাতে কিছু এসে যায় না। দেবীর দণ্ডের ওপরে অধিকার একমাত্র আমার। সাতশো ষাট বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি।’
এবার আর সঞ্জয় চুপ করে থাকতে পারল না। কৌতূহলেই প্রশ্ন করল, ‘কে আপনি? কী আপনার পরিচয়?
একটু চুপ করে থেকে হুদুদ বেগ বললেন, ‘তোমরা আমার এত বছরের অপেক্ষা সার্থক করিয়েছ, তোমরা সত্যিটা জানা ডিজার্ভ করো। আর আমিও তোমাদের বলে একটু হালকা হতে পারব। তোমার দাদু ঠিক বলেছেন, আমি সত্যিই জাতিস্মর। হালাকু খাঁ-র নাম শুনেছ তো? নিশ্চয়ই শুনেছ। আমি হালাকু খাঁ-র পুনর্জন্ম। তাঁর শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে আমি আবার এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছি। আমি স্বয়ং হালাকু খাঁ।’
হুদুদ বেগের গলাটা গমগম করে উঠল মন্দিরের বিশাল ঘরটায়। দুটো ইলেকট্রিক মশাল নিভে গিয়ে অন্ধকারটা আর একটু এগিয়ে এল ওদের দিকে আর একসঙ্গে অপালা আর সঞ্জয়ের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। স্মৃতিচারণের মতো করে হুদুদ বেগ বলে যেতে লাগল, ‘ছোটোবেলা থেকে আমি নানা রকমের ভিশন দেখতাম। তার পরে আমার বাইশ বছর বয়সে আমার নিয়তি আমায় টেনে নিয়ে গেল উর্মিয়া লেকে, শাহি আইল্যান্ডে। আমি খুঁজে বার করলাম হালাকু খাঁ-র সমাধি। সেখানে কী পেলাম জানো? তাল তাল সোনা আর দুটো কাগজ। একটা কাগজে লেখা ভবিষ্যৎবাণী আর একটা কাগজে হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছে। আর সেই শেষ ইচ্ছেটা দেবীর দণ্ড ছাড়া পূরণ করা পুরোপুরি সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎবাণীতে লেখা ছিল, আমার ষাট বছর বয়সে দেবীর দণ্ড আমার হাতে আসবে কিন্তু তত দিন কি বসে থাকব? আমি বসে থাকিনি। গত আটত্রিশ বছর ধরে হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছেকে একটু-একটু করে বাস্তবায়িত করার দিকে এগিয়েছি। কিছুটা সফলতাও এসেছে। এ বার দেবীর দণ্ড হাতে এলেই তার ষোলোকলা পূর্ণ হবে।’
অদ্ভুত এই কথাগুলো শুনতে শুনতেই অপালার বুকটা কেঁপে উঠছিল। বাগদাদের কসাই হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছে! সে নিশ্চয়ই ভয়াবহ কিছু। শুকনো গলায় সে জিজ্ঞেস করল, ‘কী সেই শেষ ইচ্ছে?’
একটু হেসে হুদুদ বেগ বললেন, ‘বলব, বলব। সব বলব আজ। হালাকু খাঁ-র মৃত্যু কী ভাবে হয়েছিল জানো? বিশ্বাসঘাতকতায়। কারা করেছিল বিশ্বাসঘাতকতা? মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানেরা। ওদের নেতা ছিল গিয়াসুদ্দিন আল তুসি। খুব যন্ত্রণা পেয়ে মারা গিয়েছিলেন হালাকু আর মৃত্যুর ঠিক আগে বিশ্বস্ত কয়েক জন অনুচরকে বলে গিয়েছিলেন তাঁর শেষ ইচ্ছের কথা। সেই ইচ্ছে কাগজে লিখে সংরক্ষণ করা হয়েছিল তাঁর সমাধিতে। সাতশো বাইশ বছর ধরে ওই ইচ্ছে অপেক্ষা করে ছিল আমার জন্য।’
এইটুকু বলে থামলেন হুদুদ বেগ। মন্দিরের ভেতরে অস্বস্তিকর দমচাপা নীরবতা। পাথরের ঠান্ডা মেঝে থেকে শীতলতা যেন একটু-একটু করে ঢুকে যাচ্ছে শরীরের ভেতরে। অপালার মনে হল, অতীতের কবর থেকে উঠে আসা সেই শেষ ইচ্ছে শুনবে বলে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে এই প্রাচীন মন্দিরটাও। অপালার চোখে চোখ রেখে হুদুদ বেগ বলে উঠলেন, ‘হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছে ছিল, বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নেওয়া। যে ধর্মের মানুষদের জন্য তাঁকে মরতে হয়েছিল সেই ইসলাম ধর্মের ভেতরে ঢুকে তাকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেওয়া। বিশ্বাসঘাতকতার জবাব বিশ্বাসঘাতকতা। হালাকু খাঁ চেয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের এমন অবস্থা করতে হবে যাতে সারা দুনিয়ার লোক ওদের ঘেন্না করে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সঞ্জয় আর অপালা। লোকটা কী বলল ভালো করে বুঝতে পারেনি তারা। এটা কেমন ধরনের শেষ ইচ্ছে? ওদের মনের কথা যেন পড়তে পারলেন হুদুদ বেগ। করুণার হাসি হেসে বললেন, ‘বুঝতে পারোনি তাই না? আর একটু বলি, তা হলেই বুঝতে পারবে। আসলে প্রথমটায় আমিও বুঝতে পারিনি কী ভাবে এই ইচ্ছে পূরণ করব? তার পরে ধীরে ধীরে একটা প্ল্যান করলাম। ইসলামের ভেতরে ঢুকতে গেলে সবার আগে মুসলমান হতে হবে। নাম বদলে ফেললাম। ধর্মপ্রাণ গিয়াসুদ্দিন ছিল আমার সবচেয়ে বড়ো শত্রু। তাই প্রতিশোধ নিতে এসে আমি হয়ে উঠলাম তারই বংশধর। একটু-একটু করে পুরোনো পরিচয় মুছে ফেলে তাকি আল তুসি হয়ে উঠলাম। তার পরে পড়াশোনা করতে শুরু করলাম। বিপুল পড়াশোনা। নয়তো মানুষকে কথা শোনানো যায় না। সব ধর্মগ্রন্থ গুলে খেয়ে ফেললাম। তখনই নিয়তি আমাকে আলাপ করিয়ে দিল তরুণ আবু বকর আল বাগদাদির সঙ্গে। বাগদাদিকে চেনো তো? আইসিস সুপ্রিমো, সেই বাগদাদি। বাগদাদি ছিল আমার বন্ধু।’
‘কী বলছেন আপনি,’ শিউরে উঠল অপালা।
‘অবাক হচ্ছ? সাতশো বছর ধরে জমে থাকা প্রতিশোধের আগুন অপালা। সে তো ভয়াবহই হবে তাই না? পচন তো আমাকে ইসলামের ভেতরেই ধরাতে হবে। অবশ্য এই মুসলমানদের মাথা খাওয়া না খুব সোজা। কাফেররা সব সর্বনাশের মূলে এটা ওদের মাথায় খুব সহজে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। আমি সেটাই করলাম। বাগদাদিকে সামনে রেখে গড়ে তুললাম আইসিস। তবে বিশ্বাস করো, আমি চাইনি আইসিস আত্মপ্রকাশ করুক। বাগদাদিকে বলেছিলাম, আর দশটা বছর দাঁড়িয়ে যাও। ও শুনল না। তার আগেই রাক্কা আর মসুলে ফোর্স নামিয়ে দিল। অবশ্য ওর দোষ দিই না। আমি সাতশো বছর ধরে অপেক্ষা করছি বলে আমার কাছে দশ বছর সামান্য সময় কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে দশ বছর অনেকটা। তবে সবটাই নিয়তি। বাগদাদি মসুল লাইব্রেরিতে আগুন না দিলে আমি তো গিয়াসুদ্দিনের ডায়েরি পেতাম না, প্রথম সূত্রটাও পেতাম না। প্রথম সূত্রটা আমি অনেক আগেই উদ্ধার করে ফেলেছিলাম, তাই পালমাইরা ধ্বংস করলেও আমি ইনান্না মন্দিরটা বাঁচিয়ে নিতে পেরেছিলাম। ওটা তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য দিয়েছিলাম। তবে এটা আমি মানি, তোমরা বা তোমার দাদু আমার থেকে অনেক বেশি ইন্টেলিজেন্ট। যে সূত্র উদ্ধার করতে আমার পনেরো দিন লেগেছিল সেটা তোমরা দেড় দিনে সলভ করে দিলে। কিন্তু এটা সত্যি যে পরের সূত্রটা আমি উদ্ধার করতে পারিনি, আর বিশ্বাস করে কাউকে দিতেও পারিনি। প্রথমে তোমাদেরও বিশ্বাস করিনি, তাই ভাগিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তার পরেই মিস্টার বেকের থেকে জানতে পারলাম, তোমরা এসেছ ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে, যেখানে গঙ্গা নদী বয়ে চলেছে। আমি বুঝে গেলাম তোমরাই সেই দু’জন। ভবিষ্যৎবাণীতে লেখা ছিল যে, নদ-নদীর দেশ থেকে দু’জন আসবে যারা আমায় দেবীর দণ্ড খুঁজে দেবে আর আমার ষাট বছর বয়সেই দেবীর দণ্ড আমার হাতে আসবে। তোমরাও এলে আর এই ফেব্রুয়ারিতেই আমার ষাট বছর পূর্ণ হল। সব মিলে যাচ্ছিল। তাই তোমাদের মারতে যে লোক পাঠিয়েছিলাম তাদের ফিরে আসতে বললাম।’
বিদ্যুচ্চমকের মতো অপালার মনে পড়ে গেল, ইরাক মিউজিয়াম থেকে হোটেলে ফেরার পথে একটা কালো গাড়ি ওদের ফলো করতে করতে আচমকা অন্য রাস্তায় ঢুকে গেছিল। কাঁপা গলায় অপালা বলল, ‘দেবীর দণ্ড নিয়ে আপনি কী করবেন?’
হুদুদ বেগের মুখে ফুটে উঠল অদ্ভুত শীতল একটা হাসি। হাসিটা চোখের কোণে ঝুলিয়ে রেখেই তিনি বললেন, ‘দেবীর দণ্ড এই দুনিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। ওই দণ্ড যার কাছে থাকবে আর যে ওই দণ্ড ব্যবহার করতে জানবে সে পৃথিবীর সমস্ত পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর সামগ্রিক শক্তির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হবে। পঁচিশ বছর ধরে আমি তন্ত্রচর্চা করেছি। দেবীর দণ্ড ব্যবহার করার অধিকারী হয়ে উঠেছি। ওই দণ্ড হাতে পেলে ‘আইসিস ফেজ টু’ আত্মপ্রকাশ করবে। আমি অবশ্য সামনে আসব না। আমি পেছনে থাকতেই ভালোবাসি। আমি পরবর্তী খলিফা। আবু জাফর মুস্তাফা। মুসলমানেরা আমাকে আল্লার পয়গম্বর ভাববে আর আমি গোটা দুনিয়ার সামনে ওদের ঘৃণার পাত্র করে তুলব। এমনিতেই ওরা চারিদিকে যা নাশকতা করে রেখেছে তাতে মানুষ ওদের ভয় পায়, ওরা আগে থেকেই আমার কাজ সহজ করে রেখেছে, এর পরে আইসিস ফেজ টু যখন দুনিয়া জুড়ে ধ্বংসলীলা চালাবে তখন মাটিতে মিশে যাবে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের প্রাইড। ওদের খুব গর্ব ছিল না ওরা শিক্ষিত, ওরা সভ্যতার পিলসুজ, ওদের সেই গর্বের ওপরে সবাই থুতু দেবে আর আমি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করব। আমাকে বোকা বানিয়েছিল না ওরা, সারাজীবন ধরে শুধু না, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঘেন্না ওরা বয়ে বেড়াবে। ওদের দেখলেই লোকে বলবে, টেররিস্ট। দেবীর দণ্ড হাতে পেলেই আমি এক এক করে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ইমারতগুলো ধ্বংস করে দেব। তার দায় নেবে আইসিস। পৃথিবীর সবক’টা জনবহুল বাজার আমি উড়িয়ে দেব। দায় নেবে আইসিস। রাসায়নিক হামলা চালাব, শিশুরা বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মাবে। দায় নেবে আইসিস। যা যা খারাপ হবে সব কিছুর দায় নেবে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানেরা। ইতিমধ্যেই সারা পৃথিবী জুড়ে মুসলমানদের কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের মনে ওদের বিরুদ্ধে ঘেন্নার বীজ বুনে রেখেছে। আমি সেই ঘেন্নার গোড়ায় পরিকল্পিত সার-জল দেব। সারা দুনিয়া আরও বেশি করে শত্রু ভাববে মুসলমানদের। একের পরে এক দাঙ্গা হবে আর তাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে একটা গোটা ধর্ম। একটা গোটা জাতি। এই ভাবে পূর্ণতা পাবে হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছে অ্যান্ড দিস ইজ মাই প্ল্যান। কী মনে হচ্ছে তোমাদের আমার প্ল্যানটা ভালো না?’
শুনতে-শুনতে হাত-পা অসাড় হয়ে আসছিল অপালা আর সঞ্জয়ের। এ কোন ঐতিহাসিক প্রতিশোধের সাক্ষী হচ্ছে ওরা! এমন নির্মম প্রতিশোধ মানুষ ভাবতে পারে! অবশ্য হালাকু তো মানুষ নয়, হালাকু কসাই! এর সঙ্গে কথা বলে কোনও লাভ হবে না। তবু সঞ্জয় চুপ থাকতে পারল না। বলল, ‘কবে কে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তার দায় বাকিরা কেন নেবে? কেন শাস্তি দেবেন বাকিদের? আর আপনার এই যে ধ্বংসের প্ল্যান তাতে তো শুধু মুসলমানেরা না, অন্য ধর্মের মানুষও মরবে। হিন্দু মরবে, খ্রিস্টান মরবে, বৌদ্ধ মরবে সবাই মরবে। তারা তো আপনার শত্রু নয়।’
আবারও সেই কুটিল হাসি ফুটে উঠল হুদুদ বেগ ওরফে মুস্তাফার মুখে বললেন, ‘দুনিয়াটা তো ইভলভ করছে না কি? সাতশো ষাট বছর আগেকার হালাকু খাঁ-র শেষ ইচ্ছেও তাই ইভলভ করেছে। সত্যি বলতে আমার টার্গেট এখন আর শুধু মুসলমানেরা নয়। আমার টার্গেট এই গোটা দুনিয়াটাই। এই ছোটো ছোটো দেশ, রাষ্ট্রব্যবস্থা এ সব আমার একদম ভালো লাগে না। এই গোটা দুনিয়াকে এক জন সম্রাটের শাসনের আওতায় আনতে হবে। সারা দুনিয়ায় একটাই নিয়ম চলবে। এই ডাইভারসিটি দেখলেই আমার বিরক্ত লাগে। বৈচিত্র্য জিনিসটাই খারাপ। বৈচিত্র্য আছে বলেই না নানা মুনির নানা মত। আমি সব রকমের বৈচিত্র্যকে শেষ করে দিতে চাই। কিন্তু আমি বললেই তো আর লোকে মানবে না। বলবে, আমরা হ্যান করেছি, ত্যান করেছি। সে সব কি ভুল? তাই যাতে ও সব বক দেখাতে না পারে তাই সবার আগে পুরোনো সভ্যতাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে হবে। হালাকু খাঁ যেমন করে বাইত আল হিকমাহ জ্বালিয়ে দিয়েছিল তেমন করে গোটা দুনিয়াটাই জ্বালিয়ে দিতে হবে। তার পরে ওই ছাই থেকে নতুন সভ্যতা গড়ে তুলতে হবে। মুসলমানদের দিয়ে শুরু করছি ঠিকই, কিন্তু এক এক করে সব ধর্ম শেষ করে দেব আমি। নতুন এক ধর্ম তৈরি করব যেখানে আল্লা বলো, গড বলো, ঈশ্বর বলো সব হব আমি। আমি
স্তব্ধ হয়ে গেল অপালা আর সঞ্জয়। এ কোন রক্তপিপাসু উন্মাদের কবলে পড়েছে তারা! দেবীর দণ্ড এর হাতে পড়লে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু একে আটকানোর উপায় কী? তাদের তো হাত-পা বাঁধা। কান্না পেয়ে গেল অপালার। হুদুদ বেগ ওরফে মুস্তাফা বললেন, ‘এ বার বলো, এত কিছু শুনে ফেলার পরেও কি তোমাদের বেঁচে থাকা উচিত? উচিত নয়। তবে হ্যাঁ, আবারও তোমাদের ধন্যবাদ। দেবীর দণ্ড খুঁজে দেওয়ার জন্য আর আমার
কথা শোনার জন্য। এ সব শোনার জন্যেও তো যোগ্যতা লাগে, আর তোমরা আমার দেখা যোগ্যতম। তাই কষ্টের মৃত্যু দেব না তোমাদের। জাস্ট কপালে একটা করে গুলি। যন্ত্রণা অনুভব করার আগেই তোমরা মারা যাবে। তবে আমি এ সবের মধ্যে থাকব না। আমি চলে যাওয়ার পরে আমার লোকেরা তোমাদের মেরে মরুভূমিতে বালি চাপা দিয়ে দেবে। বিদায় বন্ধুরা, এ বার আমার গন্তব্য ইন্ডিয়া। দেবীর দণ্ড এবার আমি নিজেই খুঁজে নেব। বাই।’
‘ও হ্যাঁ, আর একটা কথা,’ যেতে গিয়েও ঘুরে তাকালেন মুস্তাফা, ‘পালমাইরার আর্কিওলজিস্ট খালেদ আল আসাদকে আমিই মারতে বলেছিলাম। বুড়ো জানত কোথায় সোনা আছে। আমাকে বলল না। ওই সোনাগুলো পেলে কত অস্ত্র কিনতে পারতাম বলো তো? যাই হোক। এখন আর আমার কোনও অস্ত্র লাগবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র এখন আমার হাতে। বাই এগেইন।’
মন্দির থেকে বেরিয়ে গেলেন মুস্তাফা ওরফে হুদুদ বেগ। পাথরের মতো বসে রইল অপালা আর সঞ্জয়। এতক্ষণ ধরে তারা যেটা শুনল সেটা হজম করা খুব সোজা ব্যাপার নয়। পৃথিবীর আসন্ন ভবিষ্যতের কথা ভেবে হাড় হিম হয়ে গেল দু’জনেরই। তাকি আল তুসি লোকটা যে ফ্ৰড এটা বুঝতে বড্ড দেরি হয়ে গেল! বড্ড বেশি দেরি। অথচ লোকটার বলা গল্পের মধ্যেই কিন্তু অনেক অসংগতি ছিল। যেটা এখন চোখে পড়ছে, আগে পড়েনি। সবচেয়ে বড়ো অসংগতি তো ওই মসুল লাইব্রেরি থেকে গিয়াসুদ্দিনের ডায়েরি খুঁজে পাওয়ার গল্পটাই। ২০১৫ সালে আইসিস মসুল লাইব্রেরি পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং তার পরেও অন্তত দু’বছর আইসিস এলাকার দখল নিয়ে রেখেছিল। তা হলে লাইব্রেরিতে ঢুকেছিল কী করে লোকটা! নিজের ওপরেই রাগ হল অপালার। তখনই মন্দিরের ভেতরে ঢুকে এল সেই বিশালদেহী চার জন। আরও দুটো ইলেকট্রিক মশাল নিভে গেল। অন্ধকারটা ঝাঁপিয়ে এগিয়ে এল আরও খানিকটা। বড়ো অসহায় বোধ করল অপালা, এই ভাবে মরে যেতে হবে! ইশ দাদু যদি কাছে থাকত….
দাদুর কথা ভাবার অপেক্ষামাত্র, অপালার মাথার ভেতরে বেজে উঠল ভাদুড়িমশায়ের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ, ‘দিদিভাই… দিদিভাই… শুনতে পাচ্ছ?
অপালা বুঝতে পারল, মহাসিন্ধুর ও’পারে বসে থাকা এক মহাসাধক এই বিপুল ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে তার মাথার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। মনে মনে সে বলে উঠল, ‘দাদু, এই তো আমি। আমাদের খুব বিপদ দাদু। খুব বিপদ।’
অপালার গলাটা পেয়ে নিশ্চিন্ত হলেন ভাদুড়িমশায়। এক বার যখন অপালার কাছে তিনি পৌঁছে গেছেন, তখন আর কোনও বিপদ ওদের স্পর্শ করতে পারবে না।
অপালার ফোনটা কেটে যাওয়ার পরেই তাঁর পক্ষে যতটা ছুটে যাওয়া সম্ভব ততটা ছুটে গিয়ে আসনে বসে পড়েছিলেন। প্রাণপণে চেষ্টা করছিলেন অপালার সংযোগস্থাপন করতে। অবশেষে পেরেছেন। তাকি আল তুসিকে নিয়ে তাঁর সন্দেহের জন্ম হয়েছিল হঠাৎ করেই। তাঁর মনে হয়েছিল, যে সংকেতের সমাধান তিনি এবং অপালারা দেড় দিনে করে ফেললেন সেটা তাকি আল তুসির মতো বিদগ্ধ মানুষ এত বছরেও সমাধান করতে পারেননি, এটার মধ্যে একটা অস্বাভাবিকত্ব আছে। তখনই তিনি তাকি আল তুসির অতীতের ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলেছিলেন সমীরণকে। ইরাকের এক জন বাসিন্দার অতীত খোঁজা এক জন ভারতীয় নাগরিকের পক্ষে খুব সহজ ছিল না, কিন্তু সমীরণের অবিশ্বাস্য ‘কানেকশন’ সেটাও করে ফেলেছে। তার পরে ওই ছবিটা তো ছিলই। ওই ছবির চোখ দেখেই ভাদুড়িমশায় বুঝতে পেরেছিলেন, অপালারা বিপদের সঙ্গে ঘর করছে। এখন সেই বিপদের চরিত্রটা অপালার চোখ দিয়ে নিজেই দেখতে পাচ্ছেন তিনি।
চারটে লোক দাঁড়িয়ে আছে অপালাদের সামনে। দু’জন বন্দুক বার করছে। সময় খুব অল্প। তার মধ্যেই যা করার করতে হবে। তবে একটাই সুবিধে এই মন্দির স্থানমাহাত্ম্যে ভাস্বর। দেবীর উজ্জ্বল উপস্থিতির উত্তাপ এত দূর থেকেও অনুভব করতে পারছেন ভাদুড়িমশায়। তিনি বললেন, ‘ছোটোবেলায় তোমায় ধ্যান করতে শিখিয়েছিলাম না? মনে আছে তো?’
অপালা বলল, ‘আছে দাদু।’
‘ব্যাস। মনকে একটা বিন্দুতে সংহত করো আর দেবী ইনান্নাকে ডাকো। আমার সঙ্গে বলো, ইযুজ্জু ইনান্না, ইযুজ্জু ইনান্না, ইযুজ্জু ইনান্না। মন দিয়ে, প্রাণ দিয়ে ডাকলে তিনি সাড়া দেন।’
মনে মনে বলতে শুরু করল অপালা। সঞ্জয় দেখল, অপালা যেন হঠাৎ করেই ধ্যানস্থ হয়ে গেছে। অপালার পরিবর্তন লক্ষ করল ঘাতকেরাও। হাসি ফুটে উঠল তাদের মুখে। নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে এক এক জন এক এক রকম আচরণ করে। এই মেয়েটা ঘাবড়ে গিয়ে পাথর হয়ে গেছে। বন্দুকের সেফটি ক্যাচ খুলে ফেলল দু’জন ঘাতক। বন্দুক তাক করল সঞ্জয় আর অপালার দিকে। এমন সময় নিভে গেল আর একটা ইলেকট্রিক মশাল। সঞ্জয় স্পষ্ট দেখতে পেল, অন্ধকারটা গুঁড়ি মেরে একদম ঘাতকদের কাছে চলে এসেছে। এই অন্ধকার চেনে সঞ্জয়। শিকারের ঘাড়ে লাফ দেওয়ার আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিজের মৃত্যুভয় অগ্রাহ্য করে আচমকা সে ঘাতকদের জন্য ভয় পেতে শুরু করল। ও দিকে অপালা ভাদুড়ি মশায়ের সঙ্গে একমনে বলে চলেছে, ‘ইযুজ্জু ইনান্না, ইযুজ্জু ইনান্না, ইযুজ্জু ইনান্না।’
ট্রিগারে হাত রাখল ঘাতক দুজন। অন্য দু’জন কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বলি দেখবে বলে। ঠিক এমন সময় অদ্ভুত বিজাতীয় একটা গন্ধ পেল সঞ্জয়। চিড়িয়াখানায় এই গন্ধটা পাওয়া যায়। তবে সঞ্জয় একা না, গন্ধটা ঘাতকেরাও পেয়েছে। তাদের মধ্যে একটা চঞ্চলতা দেখা গেল। অপালা আর সঞ্জয়কে ছেড়ে দু’জন পেছন দিকে ঘুরে গেল। বাকি দু’জনও দ্রুত বন্দুক বার করে ফেলল। অদ্ভুত ব্যাপার, গন্ধটা বাড়ছে কিন্তু কোথা থেকে আসছে বোঝা যাচ্ছে না। এক জন ঘাতক আর এক জনকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইলেকট্রিক মশাল আছে?’
সে মাথা নাড়ল। দ্রুত পিঠের ব্যাগ খুলতে শুরু করল কিন্তু তার আগেই আচমকা নিভে গেল শেষ মশালটাও আর প্রাগৈতিহাসিক এক অন্ধকার গিলে নিল ওদের সব্বাইকে। তখনই চাপা গর্জনটা কানে এল সঞ্জয়ের। গর্জনটা আসছে বেদির পেছনের ওই ঘরটা থেকে। অন্ধকার এমনই এক ভাইরাস যা মানুষের হিতাহিত জ্ঞান নষ্ট করে দেয়। ঘাতকদেরও তাই হল। ওরা ওই অন্ধকারের দিকেই দমাদম গুলি ছুড়তে আরম্ভ করল। নিজেদের ছোড়া গুলিতেই দু’জন আহত হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তাদের আর্তনাদেই যেন অন্ধকারের চাদর কিছুটা ছিঁড়ে গেল আর সেই চোখ-সওয়া অন্ধকারে সঞ্জয় দেখতে পেল সিংহটাকে। এত বিশাল সিংহ কোনওদিন দেখেনি সঞ্জয়। এ যেন সেই ‘নার্নিয়া’-র সিংহটার চেয়েও বড়ো। অন্ধকারেও দেখা যাচ্ছে তার সুগঠিত পেশি, ঝাঁকড়া কেশর, পিঙ্গল চোখের মণি। সিংহটা কয়েক মুহূর্ত ঘাতকদের দেখল, তার পরেই বিশাল এক লাফে এসে পড়ল তাদের মাঝখানে। পালানোর সুযোগটাও পেল না চারটে লোক। তীব্র থাবার আঘাতে তাদের মাথার খুলি চুরমার হয়ে গেল নিমেষে। গরগর করতে করতে মৃতদেহগুলো বার কয়েক শুঁকল সেই পশুরাজ তার পর অনীহায় মুখ ফেরাল অন্য দিকে। দুর্ভাগ্যবশত সেই দিকেই রয়েছে অপালা আর সঞ্জয়। সিংহটা এসে দাঁড়াল ওদের ঠিক সামনে। এতটাই কাছে যে অন্ধকারেও সঞ্জয় দেখতে পেল তার রত্নখচিত কণ্ঠবন্ধনী। তখনই বেদির কাছ থেকে ভেসে এল হালকা শিসের শব্দ আর সেই শব্দ কানে যাওয়া মাত্র ভাদুড়িমশায়ের সঙ্গে অপালার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
অনেক দূরে বসেও ভাদুড়িমশায় অনুভব করলেন, তিনি আবির্ভূতা হয়েছেন। তাঁর উপস্থিতিতে অন্য কোনও শক্তি কাজ করবে না। করার কথাও নয়। হাতজোড় করলেন ভাদুড়িমশায়, ‘মা গো! রক্ষা করো মা। ওরা দু’জনেই বড়ো ভালোমানুষ। ওদের ওপরে তুমি কুপিতা হোয়ো না।’
সংযোগ ভেঙে যেতেই চোখ খুলল অপালা আর যা দেখল তাকে ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। দেখল সঞ্জয়ও। শিসের শব্দ শুনে পোষা কুকুরের মতো ছুটে গিয়ে বিশাল সিংহটা যাঁর পায়ে মাথা ঘষছে তাঁকে দেখল। অলৌকিক, অপার্থিব, অত্যাশ্চর্য এক জ্যোতিঃপুঞ্জের মধ্যে তাঁর প্রকাশ। তাঁর এক হাত ঘুরে বেড়াচ্ছে সিংহের কেশরে আর অন্য হাতে শোভা পাচ্ছে নীলাভ দ্যুতিময় এক রত্নশোভিত দণ্ড। ইনি মানুষ নন। এমন রূপ, এমন প্রভা, এমন দীপ্তি মানুষের কল্পনাতীত। এমন উচ্চকিত অথচ নীরব, স্থির অথচ চঞ্চল, শান্ত অথচ উদ্দাম, স্থানিক অথচ চরাচরব্যাপী, প্রেমপূর্ণ অথচ ভীতিপ্রদ উপস্থিতি মানুষের সাধ্যাতীত! পৃথিবীর সমস্ত বিপরীতার্থক অবস্থা একসঙ্গে স্থিত হয়েছে এই আধারে! কে এই অখণ্ডমণ্ডলাকার বিস্ময়? দেবী স্বয়ং প্রকট হয়েছেন? সাড়া দিয়েছেন আকুল আহ্বানে? কিন্তু একইসঙ্গে এত আলো আর এত অন্ধকারকে সহ্য করার ক্ষমতা ঈশ্বর মানুষকে দেননি তাই বাধ্য হয়েই চোখ বুজে ফেলল সঞ্জয় আর অপালা। তারা অনুভব করল, সেই অখণ্ডমণ্ডলাকার বিস্ময় এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। একইসঙ্গে অসহ্য গরম লাগছে, দরদর করে ঘামছে তারা কিন্তু মৃত্যুহিম এক শৈত্যে সে স্বেদবিন্দুও স্ফটিকদানায় পরিণত হচ্ছে নিমেষে! খুব আনন্দ হচ্ছে আবার একইসঙ্গে প্রাচীন এক যন্ত্রণার ভার যেন চেপে বসছে বুক জুড়ে! বড়ো সুখ, বড়ো কষ্ট! মনে হল অজ্ঞান হয়ে যাবে আর ঠিক তখনই তাদের মাথার ভেতরে গমগম করে উঠল এক আশ্চর্য কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর একাধারে সুরহীন কর্কশ ও অনির্বচনীয় সুরেলা! সেই কণ্ঠস্বরে যুদ্ধজয়ের উল্লাস আর প্রিয়জন বিয়োগের বেদনা! সেই কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ‘মঙ্গল হোক।’
জ্ঞান হারাল দু’জনেই।
