লাপিস লাজুলি – ২৫
॥ পঁচিশ॥
মার্চ, বর্তমান কাল
শীত শেষ। বসন্ত এসে গেছে। কিন্তু চলে যেতে বললেই কি আর চলে যাওয়া যায়? তাই বাতাসে অক্ষম অধিকারবোধ ফলিয়ে যাচ্ছে শীত। এমনিতে বেশ উপভোগ্য আবহাওয়া কিন্তু মাঝে মাঝেই কোত্থেকে একটা হাওয়ার ঝাপটা আসছে আর ছুরির ফলার মতো চামড়ায় গেঁথে যাচ্ছে। সদ্য স্নান সেরে উঠেছেন বলে আরও আশকারা পাচ্ছে শীত। আরও একটা ব্যাপার আশকারা দিচ্ছে শীতকে। সেটা হল বয়স। গত ফাল্গুনে ছিয়ানব্বই পার করেছেন রঘুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। এলাকার লোক তাঁকে রঘু ঠাকুর বলেই চেনে। কিন্তু এখনও প্রতিদিন ব্রাহ্ম মুহূর্তে স্নান সেরে মন্দিরের দরজা খোলেন। আগে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কিছুই গায়ে লাগত না। কিন্তু বছর পাঁচেক হল লক্ষ করছেন, শীত এলে কষ্ট হয়। রোজ রোজ এই ভোরে স্নান করা নিয়ে ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনিরা রাগারাগি করে কিন্তু রঘু ঠাকুর পাত্তা দেন না। এগারো বছর বয়সে উপনয়ন হয়েছিল, তার পর থেকে গত পঁচাশি বছর ধরে রোজ ভোরবেলা স্নান করে মায়ের পুজো দিয়ে দিন শুরু করেন তিনি। মা-ও সহায়, বড়ো রোগব্যাধি কোনও দিনই হয়নি। এক দিনও ফাঁক পড়েনি মায়ের পুজোয়।
গত পনেরো বছর ধরে তিনিই এই মন্দিরের পূজারি, তিনিই একমাত্র ভক্ত। কারণ এই মন্দিরে কেউ আসে না। এই মন্দিরকে লোকে ভয় পায়। তিনি এই মন্দিরে পুজো করেন বলে তাঁকেও ভয় পায়। লোকে বলে, এই মন্দির অভিশপ্ত। রঘু ঠাকুর বহু বার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, মা সর্বমঙ্গলময়ী। তিনি কাউকে অভিশাপ দিতে চান না। মানুষের কর্মফল অভিশাপ বয়ে আনে। এই মন্দিরের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। কিন্তু লোকে শুনলে তো! হয় ভয় নয় ভক্তি, এতেই মরল মানুষ! তলিয়ে ভাবে না এরা।
বহু পুরোনো এই মন্দির। মন্দিরের বয়স প্রায় সাড়ে সাতশো বছর। লক্ষ্মণ সেনের সভা আলো করা মহাজ্ঞানী হলায়ুধের ছাত্র পঞ্চানন শর্মা ১২৭১ খ্রিস্টাব্দে এই দুর্গা মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের ভেতরে দেবী মূর্তির বেদির নীচে সেই পাথরের ফলক কালের নিয়মে অস্পষ্ট হয়ে এলেও আজও পাঠযোগ্য। রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া সাড়ে সাতশো বছর ধরে টিকে থাকা কোনও ইমারতের পক্ষেই সম্ভব নয়। ব্রহ্মস্থানের জমিদারেরা এই মন্দিরকে জাগ্রত বলেই মানতেন এবং এর সংস্কারও করেছেন বারবার। সাড়ে সাতশো বছর আগে এই ইমারতের চেহারা কেমন ছিল আজ আর তা বোঝার উপায় নেই কিন্তু পাথরের দেবীমূর্তি আজও অটুট। তিন ফুট উচ্চতার দেবীমূর্তিটি অপূর্ব শিল্পকর্মের নিদর্শন। এখানে দেবী অষ্টভুজা।
বহু বছর অবধি এই মন্দির জাগ্রত বলেই পরিচিত ছিল। বাবার কাছে শুনেছেন, আশ্বিনে ধুমধাম করে পুজোও হতো। কিন্তু মানুষের লোভই কাল হল। বেদির নীচের পাথরের ফলকে প্রতিষ্ঠা কাল এবং প্রতিষ্ঠাতার নাম ছাড়াও অদ্ভুত এক সাবধান বাণী খোদিত আছে। সেটা হল, ‘মন্দিরের সামনের পুষ্করিণীর গভীরে প্রোথিত আছে এক দৈবী বস্তু। অনধিকারী সেটিকে স্পর্শ করলে মৃত্যু অনিবার্য।
অনেক দিন পর্যন্ত মানুষ এই সাবধান বাণীকে বিশ্বাস করেছে এবং কৌতূহল দেখায়নি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে সময় যত এগোল দেবদ্বিজে মানুষের ভক্তি যেন ক্রমশ কমতে লাগল। পুকুরের নীচে কী পোঁতা আছে তাই নিয়ে ফিসফাস শুরু হল। বার বার করে লোকে ডুব দিতে শুরু করল পুকুরে এবং একের পরে এক মৃতদেহ ভেসে উঠতে শুরু করল। একটা করে মৃতদেহ ভেসে উঠত আর আগামী পাঁচ বছরের জন্য লোকে চুপ করে থাকত। তার পরে আবার শুরু হতো কৌতূহল প্রদর্শন এবং অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু। এই করে করে লোক আসা কমতে শুরু হয়েছিল গত পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরেই। ভয়টায় সিলমোহর পড়ল পনেরো বছর আগে।
পঞ্চায়েত প্রধান হল সীমন্ত বিশ্বাস। সে ঠাকুর-দেবতা মানে না। বলল, জলে নামলেই যখন লোক মরে তখন জলে কেউ নামবে না। পুকুরের সব জল তুলে নেওয়া হবে। তার পরে দেখা হবে কী আছে জলের তলায়। রঘু ঠাকুর বহু বার তাকে বারণ করলেন। সে কর্ণপাত করল না। বড়ো বড়ো সাত-আটটা পাম্প বসানো হল পুকুরের চার ধারে। মালদা টাউন থেকে এল বিরাট এক যন্ত্র। যেটা না কি কাদার মধ্যেও সাবলীল ভাবে চলাফেরা করতে পারে। দলে দলে লোক ভিড় করল পুকুরের চারপাশে। পাম্প চলতে শুরু করল। কিন্তু টানা ছ’ ঘণ্টা পাম্প চলার পরেও জলস্তর এতটুকুও নামল না। আশপাশের ঘরে জল ঢুকে গেল কিন্তু পুকুরের জল যে-কে সেই। লোকের মনে আবার নতুন করে ভয় সঞ্চারিত হতে লাগল আর সীমন্তর মনে জেদ। রঘু ঠাকুর সীমন্তর হাত চেপে ধরলেন, ‘ফিরে যা সীমন্ত। এখনও বুঝতে পারছিস না এটা দৈবী সংকেত? সাবধান বাণী? এই মন্দিরে স্বয়ং মা বিরাজ করেন। নয়তো সাড়ে সাতশো বছর ধরে টিকে থাকা কি সম্ভব? তুই বল না?’
নিয়তি কেন বধ্যতে। কথা শুনল না সীমন্ত। জলে ডুবুরি নামাতে চাইল। ভয়ে যখন কেউ নামল না, তখন সীমন্ত নিজেই নেমে পড়ল জলে। কিন্তু ওই যে নামল আর উঠল না। তবে এ বার আর দেহ ভেসে ওঠার অপেক্ষা করতে হল না। সীমন্তকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল তারই শোওয়ার ঘরের বিছানায়। জলে ডোবা মানুষ যেমন ফুলে ওঠে ঠিক সেই চেহারা। চোখ দুটো বিস্ফারিত। লোকে বুঝতে পারল, মরার আগে খুব ভয় পেয়েছিল সীমন্ত।
সেই ঘটনার পর থেকেই মন্দিরে লোক আসা বন্ধ হয়ে গেল। পরিত্যক্ত হয়ে গেল মন্দিরটা। আজ পনেরো বছর ধরে রঘু ঠাকুর একাই সকালে এসে মন্দিরের দরজা খোলেন, মায়ের ঘুম ভাঙান, পুজো দেন। তার পরে ফিরে যান।
আজকাল বড়ো চিন্তা হয় রঘু ঠাকুরের। তাঁর পরে এ মন্দিরের ভার কে নেবে, কে রক্ষণাবেক্ষণ করবে সেই নিয়ে চিন্তা। এ মন্দিরে পুরোহিতদের খুব গুরুত্ব। স্বয়ং পঞ্চানন শর্মার পুঁথি প্রতি পঞ্চাশ বছর অন্তর অনুলিখন করেন তাঁরা। ইতিহাসকে ধরে রাখা যেমন পবিত্র দায়িত্ব, একই সঙ্গে গূঢ় কথাকে গোপন রাখাও দায়িত্ব। পঞ্চাননের সেই পুঁথিতে মন্দির নির্মাণের ইতিবৃত্তের পাশাপাশি দৈবী বস্তুটির ব্যাপারেও লেখা আছে আর সেটা জানার অধিকার আছে একমাত্র পুরোহিতদের। পূর্ববর্তী পুরোহিত পরবর্তীকে নির্বাচন করেন এবং তাঁর হাতে তুলে দিয়ে যান গোপনীয়তা রক্ষার এই গুরুদায়িত্ব। যেমন তাঁর বাবা নির্বাচন করেছিলেন তাঁকে। বাবাকে নির্বাচন করেছিলেন বাবার গুরুদেব। তাঁরা এই ব্রহ্মস্থানের আদি বাসিন্দা নন। বাবার গুরুদেবের ডাকে বাবা এখানে এসে ঘর বেঁধেছিলেন। রঘুনাথ অবশ্য গুরুমন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিলেন অন্য এক যোগীপুরুষের কাছে। তাঁর নাম রামদাস চট্টোপাধ্যায়। সবাই রামদাস ঠাকুর বলে ডাকত তাঁকে। পঞ্চাননের পুঁথির এই গোপন কথা কাউকে বলার নিয়ম নেই। নিজের স্ত্রীকেও না। কিন্তু রামদাস ঠাকুরকে বলেছিলেন তিনি। ঠাকুরের কাছে সব কথা বলে ফেলতে ইচ্ছে করত। সব শুনে ঠাকুর একটু চুপ করে থেকে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেছিলেন, ‘সবই দৈবী মায়া রে রঘু। নয়তো এত বছর ধরে ও মন্দির এ ভাবে লোকের চোখের আড়ালে থাকত না। যাক গে, যা গভীরে আচে গভীরেই থাক।’
পুজো শেষ করে আজ আর বেরিয়ে এলেন না রঘু ঠাকুর। ভেতর থেকে গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ করে গোপন জায়গা থেকে পঞ্চাননের পুঁথি বার করে বসলেন। বাবার পরে তিনি এই পুঁথির অনুলিখন করেছিলেন, সেও আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর হতে চলল। আর কত দিন থাকবেন ঠিক নেই, তার আগে আরও এক বার লিখে যেতে হবে। ইতিহাসকে হারিয়ে ফেলা মহাপাপ। এত বার পড়েছেন যে এই পুঁথির প্রতিটি শব্দ তাঁর মুখস্থ। তবু পড়তে ভালো লাগে। যত বার পড়েন গিয়াসুদ্দিন আল তুসি নামের সেই মহামানবের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। সুদূর পারস্য থেকে ভারতে এসেছিলেন দৈবী বস্তুটি লুকিয়ে রাখতে। দশম শতাব্দী থেকেই পারসিকরা ভারতের গুজরাট উপকূলে বসতি স্থাপন করতে শুরু করেছিল। এ নিয়ে একটা জনশ্রুতিও আছে। পারসিকদের নেতা গুজরাটের রাজার কাছে বসতি স্থাপনের আবেদন জানালে রাজা কানায় কানায় পূর্ণ একটি দুধের পাত্র দেখিয়েছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, আমার রাজত্বে আর নতুন লোকেদের থাকতে দেওয়ার জায়গা নেই। তখন পারসিকদের নেতা সেই দুধে এক মুঠো চিনি ফেলে দিয়েছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, দুধে যে ভাবে চিনি মিশে যায় সে ভাবেই আমরা আপনাদের সংস্কৃতি এবং মানুষজনের সঙ্গে মিশে যাব। এর পরে আর গুজরাটের রাজা আপত্তি করেননি। পঞ্চানন লিখেছেন, গিয়াসুদ্দিনও প্রথমে গুজরাটেই এসেছিলেন। কিছু পরে তাঁর বাংলা ভ্রমণের ইচ্ছে হয়। তখনও আয়ুধটি কোথায় লুকোবেন তিনি ঠিক করেননি। ১২৭১ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসুদ্দিন বাংলায় আসেন। তখন বাংলায় বলবনী বংশের শাসন সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনী আর লখনৌতির শাসনকর্তা আমিন খান। লখনৌতি অর্থে গঙ্গানদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত লক্ষ্মণাবতী। বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে সেন বংশের পতন হলেও লক্ষ্মণ সেন স্থাননামে রয়ে গেছিলেন মানুষের মনে। বহু দিন অবধি। বাংলায় এসেই পঞ্চাননের সঙ্গে আলাপ হয় গিয়াসুদ্দিনের। দুই মহাজ্ঞানীর বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি। স্বপ্নাদেশ পেয়ে তখন ব্রহ্মস্থানে দুর্গা মন্দির বানাচ্ছেন পঞ্চানন। গিয়াসুদ্দিন সংস্কৃত পুঁথিতে আগেই দেবীর দুর্গার কথা পড়েছিলেন। এই প্রথম সামনে থেকে দেবীমূর্তি দেখলেন আর মুগ্ধ হলেন। বললেন, ‘দেবী ইনান্নার দণ্ড তবে এখানেই মা দুর্গার কাছে সুরক্ষিত থাক। এক সিংহবাহিনী আর এক সিংহবাহিনীর আয়ুধকে রক্ষা করুন।’
পঞ্চানন অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘এই দৈবী দণ্ডের অধিকারী আপনি। এই দণ্ডকে ব্যবহার করার কৌশলও আয়ত্ত করেছেন। আপনি খুব ভালো করে জানেন এই দণ্ড যার কাছে থাকবে এবং যে একে ব্যবহার করার কৌশল জানবে সে হবে সসাগরা পৃথিবীর অধিপতি। আপনার কাছে এই সমস্ত সুযোগ থাকার পরেও আপনি একে গোপন করে রাখতে চাইছেন? ব্যবহার করতে চাইছেন না?’
গিয়াসুদ্দিন হেসে বলেছিলেন, ‘আমার হাতে কলমই শোভা পায়। অন্য কিছু নয়। আর ক্ষমতা বড়ো খারাপ জিনিস, সে তো আপনিও জানেন। ক্ষমতা আর তার অপব্যবহার হাত ধরাধরি করে আসে। তার চেয়ে এই ভালো।’
মন্দিরের সামনেই এক বিশাল পুষ্করিণী খোঁড়া হল। পুকুরের মাঝখানে পাথরের আধার তৈরি করে তার মধ্যে রাখা হল দেবী ইনান্নার দণ্ড। তার পরে পঞ্চানন শর্মা যজ্ঞ করলেন। সাত দিন, সাত রাত ধরে চলল সেই মহাযজ্ঞ। মহাজাগতিক এক বন্ধন রচিত হল ওই পাথরের আধার ঘিরে। যজ্ঞ শেষ করে পঞ্চানন গিয়াসুদ্দিনকে বলেছিলেন, ‘কোনও দৈবক্ষমতাধর মহাযোগী ছাড়া এই বন্ধন কাটানোর শক্তি কারও হবে না। আর অমন মহাযোগী কোটিকে গুটিক জন্মায়। অতএব আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। দেবীর দণ্ড এখানে সুরক্ষিত থাকবে।’
পড়তে পড়তে রঘু ঠাকুর সিদ্ধান্ত নিলেন, আগামীকাল থেকেই অনুলিখনে হাত দেবেন। ঠিক তখনই মন্দিরের দরজায় করাঘাতের শব্দ হল। চমকে উঠলেন তিনি। এত সকালে কে এল মন্দিরে? তার থেকেও বড়ো কথা এত বছর পরে কে এল? দ্রুত হাতে পঞ্চাননের পুঁথি গোপন জায়গায় রেখে দরজা খুললেন রঘু ঠাকুর আর অবাক হয়ে দেখলেন দরজার ও পারে কয়েক জন বিদেশি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দলপতি সৌম্য চেহারার এক প্রৌঢ়। গালে সাদা দাড়ি। তিনি হেসে ইংরেজিতে বললেন, ‘সুপ্রভাত। আমার নাম হুদুদ বেগ। আমি সুদূর সিরিয়া থেকে সোজা আপনার কাছে এসেছি। আপনি ইংরেজি বোঝেন তো? নয়তো আমি ট্রান্সলেটর ব্যবহার করব।’
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রঘু ঠাকুর ইংরেজিতেই বললেন, ‘আগে জুতো খুলে আসুন। দেবস্থানে কেউ জুতো পায়ে ওঠে না।’
নিজেদের জুতো পরা পায়ের দিকে একবার দেখলেন হুদুদ বেগ, তার পরে ওখানে দাঁড়িয়েই প্রশ্ন করলেন, ‘আমি যা খবর পেয়েছি, এই মন্দিরে তো কেউ আসে না। তাই না?’
লোকটার ঔদ্ধত্য দেখে বিরক্ত হলেন রঘু ঠাকুর। তবু সৌজন্যবশত উত্তর দিলেন, ‘না কেউ আসে না।’
‘শেষ দু’-তিন দিনেও কেউ আসেনি?’
‘না আসেনি। এ বার হয় আপনারা জুতো খুলুন অথবা নীচে নেমে দাঁড়ান।’ শেষ দু’-তিন দিনেও কেউ আসেনি শুনে নিশ্চিন্ত হলেন হুদুদ বেগ। এ কথা স্থানীয় সোর্স আগেই জানিয়েছিল, তবু মন্দিরের পুরোহিতের থেকে আরও এক বার যাচাই করে নিলেন। আসলে মনের মধ্যে প্রচণ্ড অস্থিরতা নিয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। সে রাতে পালমাইরার ইশতার মন্দির থেকে বেরিয়ে আসার কিছুক্ষণ পর থেকেই অস্বস্তি শুরু হয়েছিল। কথা ছিল, ছেলে-মেয়ে দুটোকে বালিচাপা দিয়ে দেওয়ার পরে অনুচরেরা তাঁকে জানাবে। কিন্তু দু’ ঘণ্টা কেটে গেলেও কারও ফোন আসেনি। তখনই খবর পেয়েছিলেন, ইন্ডিয়ান এমব্যাসির লোকেরা আর সিরিয়ান আর্মি মন্দিরে ঢুকেছে। আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল মনটা। দেবীর দণ্ড কোথায় আছে ছেলে-মেয়ে দুটোও জানে। অন্য কেউ সেখানে পৌঁছোনোর আগে তাঁকে পৌঁছোতে হবে। যদিও অঙ্কের হিসেব বলেছিল, ভৌগোলিক দূরত্বে তিনি অনেকটাই পিছিয়ে আছেন। কিন্তু ভরসা দিয়েছিল ভবিষ্যৎবাণী। তাতে লেখা আছে, দেবীর দণ্ড তাঁর হাতে আসবে এবং এক মহাসাধকের হাতে নরকের দ্বার খুলবে। তিনিই তো সেই মহাসাধক। ভবিষ্যৎবাণী মিথ্যে হওয়ার নয়। তাই পর পর দুটো কাজ করেছিলেন। এক, দুনিয়া জুড়ে ছড়ানো নেটওয়ার্ককে বলে দিয়েছিলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলাতে অবস্থিত সাতশো বছরেরও পুরোনো দুর্গা মন্দিরের খোঁজ দিতে হবে। দুই, ইন্ডিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন।
কিন্তু সিরিয়া থেকে ভারত তো কম দূরে নয়। তার ওপরে নানারকম আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আছে। তাই সবার আগে তাঁর অসংখ্য নকল পাসপোর্ট আর নকল পরিচয়পত্রগুলোর মধ্যে থেকে বেছে নিয়ে রাতারাতি হয়ে উঠেছিলেন তুরস্কের নাগরিক। পৃথিবীর সব দেশে যাওয়ার ভিসা তাঁর করানোই থাকে এবং নিয়মিত নানা পরিচয়ে সেগুলোর নবীকরণ হতে থাকে। ফলে বিদেশ যাত্রা তাঁর জন্য কঠিন কিছু নয়। চার জন অতি বিশ্বস্ত অনুচরকে নিয়ে চলে এসেছিলেন তুরস্ক। কিন্তু তার পরেও আকাশপথে তুরস্ক থেকে দিল্লি, দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে সড়কপথে মালদা পৌঁছোতে তিন দিন লেগে গেছে। সোর্স খবর জোগাড় করেই রেখেছিল, মালদা টাউন থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট গ্রাম বড়মস্তান। আসল নাম ব্রহ্মস্থান। লোকের মুখে মুখে মস্তানিতে দড় হয়ে উঠেছে। এই জেলার সবচেয়ে পুরোনো দুর্গা মন্দির সেখানেই। সোর্স আরও খবর দিয়েছিল, মন্দিরটা নিয়ে নানা রকম জনশ্রুতি আছে। মন্দিরের সামনে একটা পুকুর আছে, তার নীচে না কি দানো থাকে। জলে নামলেই মৃত্যু। বহু দিন ধরেই তাই ও মন্দিরে কেউ যায় না। মন্দিরটাকে পরিত্যক্তই বলা চলে। শুধু এক বৃদ্ধ পুরোহিত এখনও রোজ পুজো করেন এবং শেষ এক সপ্তাহে নতুন কেউ এই মন্দিরে আসেনি। সব শুনে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন হুদুদ বেগ। একদম ঠিক জায়গাতেই এসেছেন তিনি। তড়িঘড়ি রওনা দিয়েছিলেন মন্দিরের উদ্দেশে।
বৃদ্ধের চোখে চোখ রাখলেন হুদুদ বেগ ওরফে মুস্তাফা। বললেন, ‘শুধু জুতোই নয়, একটু পরে আমাকে জামাকাপড়ও খুলতে হবে। কারণ আমি ডুবুরির পোশাক পরব। জলের নীচে যে বস্তুটা এত বছর ধরে লুকিয়ে রাখা আছে আমি ওটা নিতে এসেছি। ওটা আমার।’
বাধা দেওয়ার অবকাশও পেলেন না রঘু ঠাকুর। তার আগেই সবল চেহারার বিদেশিরা তাঁর হাত ধরে মন্দিরের চাতালে বসিয়ে দিল। হুদুদ বেগ বললেন, ‘আপনি বৃদ্ধ মানুষ। আপনার ওপরে বল প্রয়োগ করতে চাই না।’
এক জন বড়ো একটা কালো ব্যাগ এগিয়ে দিল হুদুদ বেগের দিকে। সেটা নিয়ে তিনি মন্দিরের ভেতরে ঢুকে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এলেন ডুবুরির পোশাক পরে। পুকুরের ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। রঘু ঠাকুর চিৎকার করে বললেন, ‘এই ভুল কোরো না বিদেশি। এর আগে যারাই ওই দৈবী বস্তুর জন্য জলে ডুব দিয়েছে, তারাই মরেছে।
উত্তর দিলেন না হুদুদ বেগ। একদৃষ্টে জলের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। এই জলের নীচেই রয়েছে তাঁর অভীষ্ট। মনে মনে গিয়াসুদ্দিন আল তুসিকে একটা কুৎসিত গালাগাল দিলেন। এই লোকটার জন্যই আজ সাড়ে সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে, এক জন্ম থেকে আর এক জন্মে ঘুরে চলেছেন। কোথায় ইরান, ইরাক, সিরিয়া আর কোথায় এই মালদহের গ্রাম! এত দূর অবধি লোকটা এসেছে ইনান্নার দণ্ড লুকিয়ে রাখতে! কিন্তু শেষ অবধি পারল না। এটাই দুনিয়ার নিয়ম, যার জিনিস তার কাছেই যায়। জলে ঝাঁপ দিলেন তিনি। বহু বছর পরে জলের মধ্যে অন্য কিছুর উপস্থিতি টের পেয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল মাছেরা।
এই জলে মানুষ নামে না, জল প্রায় কাচের মতোই স্বচ্ছ। দিনের বেলায় দেখতে এতটুকুও অসুবিধে হচ্ছে না। তার ওপরে হেড গিয়ারে লাগানো জোরালো আলো তো আছেই। বেশ কিছুটা দূর থেকেই পাথরের আধারটা দেখতে পেলেন হুদুদ বেগ। চারপাশে বিরাট আকারের মাছেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিজাতীয় কিছুর উপস্থিতি টের পেয়েই নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল তারা। তলদেশের মাটিতে পা রাখলেন হুদুদ বেগ। কোমর সমান উঁচু একটা পাথরের চৌবাচ্চা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কয়েক শতাব্দী ধরে জলের তলায় থাকলেও পাথরের গায়ে এতটুকু শ্যাওলা নেই। বুক ঢিবঢিব করতে লাগল হুদুদ বেগের। তাঁর মন বলছে, ওখানেই আছে ইনান্নার দণ্ড। ধীরে ধীরে সেই চৌবাচ্চার দিকে এগোতে শুরু করলেন তিনি আর কয়েক পা যেতে না যেতেই বুঝতে পারলেন, চৌবাচ্চা অবধি পৌঁছোনো সহজ হবে না।
প্রস্তুতি অবশ্য তখনই নিয়ে রেখেছিলেন, যখনই শুনেছিলেন জনশ্রুতির কথাটা। মিথ নিয়ে কারবার তাঁর। জনশ্রুতিকে অবহেলা করার মতো মূর্খ তিনি নন। সোর্স বলেছিল, জলের নীচে দানো আছে। তিনি অনুভব করলেন, দানো নয়, আসলে যা আছে তা হল অতি কঠিন এক সুরক্ষাবলয়। প্রাচীন কোনও এক তন্ত্র প্রয়োগ করে এই সুরক্ষাবলয় রচনা করা হয়েছে। অবশ্য এমন কিছু যে হবে সেটা তিনি গোড়া থেকেই জানতেন। এমন মারাত্মক অস্ত্রকে গিয়াসুদ্দিন কিছুতেই অসুরক্ষিত অবস্থায় রাখবেন না। এই সব মাথায় রেখেই তো তাঁর এত বছরের তন্ত্রসাধনা। মনটাকে একটা বিন্দুতে সংহত করলেন তিনি। অস্ফুটে উচ্চারণ করতে শুরু করলেন বিজাতীয় এক মন্ত্ৰ ধীরে ধীরে তাঁর শরীরের চারপাশেও এক সুরক্ষাবলয় রচিত হল। এ বার তিনি নিরাপদ। দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চললেন। অবশেষে চৌবাচ্চার মধ্যে উঁকি দিলেন তিনি আর দিতেই নিশ্চিত হয়ে গেলেন, ইনান্নার দণ্ড এখানেই আছে। ভেতরে পাথরের স্ল্যাব দিয়ে ঢাকা আরও একটা ছোটো মাপের চৌবাচ্চা। তার মধ্যে কী আছে বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে না বটে কিন্তু পাথরের মধ্যে যেটুকু ফাঁক আছে তার মধ্যে দিয়েই বিচ্ছুরিত হচ্ছে অত্যুজ্জ্বল নীল আলো। সেই আলো চোখে ঘোর লাগিয়ে দেয়। আগল খুলে দেয় বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা অবদমিত ইচ্ছেদের। হুদুদ বেগের ইচ্ছে করল সে দিকে তাকিয়ে থেকেই জীবনটা কাটিয়ে দেন কিন্তু শাসন করলেন নিজেকে। হাতে বেশি সময় নেই। যে কোনও সময় শত্রুপক্ষ চলে আসতে পারে। এখনও যে আসেনি এটাই আশ্চর্যের! হিসেব মতো ছেলে-মেয়ে দুটোর তো সব বলে দেওয়ার কথা। কাউকে না বলুক মিস্টার ভাদুড়ি নামের ওই লোকটাকে তো বলবেই ওরা। কিন্তু সে সবের তো কোনও উচ্চবাচ্য নেই। এক মুহূর্তের জন্য হুদুদ বেগের মনে হল, এটা কি তবে কোনও ফাঁদ?
না ফাঁদ নয়। হুদুদ বেগ যদি জানতেন ভাদুড়িমশায়ের পৌঁছোতে এখনও ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে তা হলে তিনি আর অকারণ চিন্তায় কালাতিপাত করতেন না। তবে প্রবল দুশ্চিন্তায় স্থির হয়ে বসতে পারছেন না ভাদুড়িমশায়। তাঁর ছটফটানিটা স্পষ্ট বুঝতে পারছে অমিয়। নয়তো তাঁর মতো স্থিতধী মানুষ কিছুতেই জোরে গাড়ি চালাতে বলতেন না।
হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে পাঁচটা গাড়ি। প্রথম গাড়িটা পাইলট। রাস্তা ফাঁকা করতে করতে এগিয়ে চলেছে। দ্বিতীয় গাড়িতে রয়েছেন ভাদুড়িমশায়, অমিয়, দীপক পাল এবং অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়্যাডের স্পেশাল অফিসার সহদেব মাহাতো। গাড়ি চালাচ্ছে অমিয়। পেছনের তিনটে গাড়িতে রয়েছে কুড়ি জন বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত আধাসেনা। সহদেব মাহাতোর সঙ্গে ফোনে রয়েছেন সমীরণ বসাক স্বয়ং।
সমীরণের উদ্যোগেই চার দিন আগে ভারতীয় দূতাবাসের কর্মীরা এবং সিরিয়ান আর্মি পালমাইরা থেকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করেছিল সঞ্জয় আর অপালাকে। সঞ্জয়রা কী অবস্থায় আছে সে কথা ভাদুড়িমশায়-ই জানিয়েছিলেন সমীরণকে। ইতিমধ্যে পল্লব এবং রোশনির সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ হয়েছে। তাদেরও সিরিয়ার কামিশলি থেকে উদ্ধার করেছেন সমীরণ। কিন্তু মুশকিলটা হয়েছে অন্য জায়গায়। সঞ্জয় আর অপালার জ্ঞান ফিরেছে গত কাল গভীর রাতে, টানা তিন দিন অজ্ঞান থাকার পরে। জ্ঞান ফেরার পরেই অপালা ভাদুড়িমশায়কে সেই ভয়ংকর দুঃসংবাদটা দিয়েছে। লোকটা হালাকু খাঁ-র পুনর্জন্ম। সে জানে, দেবী ইনান্নার দণ্ড কোথায় আছে আর এতক্ষণে হয়তো সেটা সে পেয়েও গিয়েছে।
মালদা জেলার সাড়ে সাতশো বছরের পুরোনো দুর্গা মন্দিরের খোঁজ পেতে ভাদুড়িমশায়ের বেশিক্ষণ লাগেনি। অপালার কথা শুনতে শুনতেই মনে পড়ে গেছিল, অনেক বছর আগে ঠাকুর একবার বলেছিলেন, ‘মালদায় ব্রহ্মস্থান নামে এক গ্রামে বহু প্রাচীন এক দুর্গা মন্দির আছে। তার বয়েস সাতশো বছরেরও বেশি। পারলে কখনো যাস নীরেন। ওখানে আমারই এক শিষ্য পুজো করে। রঘুনাথ। খুব জাগ্রত দেবস্থান।’
পরের বছরই এক শীতকালে ঠাকুরের আশ্রমে দেখা হয়ে গেছিল রঘুনাথের সঙ্গে। ঠাকুর আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। রঘুনাথ বয়সে ভাদুড়ি মশায়ের চেয়ে বেশ খানিকটা বড়ো। বলেছিলেন, ‘ভাই নীরেন, ঠাকুরের মুখে তোমার নাম খুব শুনেছি। এসো আমাদের গ্রামে। মা খুব জাগ্রত। তোমার ভালো লাগবে।’
ভাদুড়িমশায় বলেছিলেন, ‘যাব দাদা। নিশ্চয়ই যাব।’
ভেবেছিলেন যাবেন কিন্তু আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। রঘুনাথের সঙ্গেও আর দেখা হয়নি। আসলে কোনও অতি জাগ্রত দেবস্থানে চাইলেই যাওয়া যায় না। দেবস্থান ডাক দিলে তবেই মানুষ সেখানে যেতে পারে। এত দিনে তবে ব্রহ্মস্থানের মা দুর্গা তাঁকে ডেকেছেন! হিসেব মতো রঘুনাথের এখন একশোর কাছাকাছি বয়স হওয়ার কথা! রঘুনাথ কি আজও বেঁচে আছেন?
নিজে দিল্লি থেকে আসতে না পারলেও অপালার সঙ্গে কথা হওয়ার ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন সমীরণ। গভীর রাতেই গাড়িগুলো রওনা দিয়েছিল মালদার উদ্দেশে। হুদুদ বেগ ওরফে মুস্তাফার আসল পরিচয় জানার পরে সমীরণ স্বাভাবিক ভাবেই ইন্টেলিজেন্সকে জানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাদুড়িমশায় বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘এখানে দুটো সম্ভাবনা রয়েছে। এক, আইসিস চিফ আমাদের আগে দেবীর দণ্ড পাবে। দুই, ওর আগে আমরা দেবীর দণ্ড পাব। দুই ক্ষেত্রেই বেশি লোক জানানোয় সমস্যা আছে। প্রথমটা যদি হয়, তা হলে তো সব শেষ বলে ধরে নিতে হবে। তখন যত বেশি লোক ওকে বাধা দিতে যাবে তত বেশি মৃত্যু। আর দ্বিতীয়টা যদি হয়, যদি আমরা দেবীর দণ্ড আগে পেয়ে যাই, আইন অনুসারে ওটা আমার ভারত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। কিন্তু সেটা তো এই মুহূর্তে আমি করতে পারব না। তাই যদি দেবীর দণ্ড আমরা আগে পেয়ে যাই তার পরে তুমি ইনটেলিজেন্সকে জানিয়ো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ো। যদিও আমার বিশ্বাস ওই লোকটাকে কবজা করতে লৌকিকের থেকে অলৌকিকের ওপরেই তোমাকে জোর দিতে হবে। কারণ ও তো আর যে কেউ নয়। স্বয়ং কবর ফুঁড়ে উঠে আসা অতৃপ্ত ইতিহাস।
ভাদুড়িমশায়ের কথা মেনে নিয়েছিলেন সমীরণ কিন্তু তার পরেও কুড়ি জন আধাসেনা সঙ্গে দিয়ে দিয়েছেন। একেবারে অরক্ষিত অবস্থায় যাওয়া ঠিক না। ভাদুড়িমশায়ও আর আপত্তি করেননি। আসলে অপালার কথা শোনার পর থেকেই তাঁর মনে কু ডাকছে। সমীরণ যতই আশ্বাস দিন না কেন সিরিয়া থেকে এত তাড়াতাড়ি কারও পক্ষে মালদা আসা সম্ভব নয়, ভাদুড়ি মশায়ের মন বলছে, বিপদ ঘনিয়ে উঠছে। তিনি জানেন, তাঁর অনুমান কখনো ভুল হয় না। তাই ব্রহ্মস্থানের যত কাছে এগিয়ে আসছেন তাঁর ছটফটানি বাড়ছে। তিনি অমিয়কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কতক্ষণ?’
গুগল ম্যাপের দিকে তাকিয়ে অমিয় উত্তর দিল, ‘আর বড়োজোড় আধ ঘণ্টা স্যার।’
চোখ বুজে গাড়ির সিটে হেলান দিলেন ভাদুড়িমশায়। মনে মনে গুরুর নাম জপ করতে লাগলেন। আর ঠিক তখনই ভেতরের চৌবাচ্চার পাথরের ঢাকনাটা সরিয়ে ফেললেন হুদুদ বেগ। কালান্তরের স্মৃতি গ্রাস করল তাঁকে। তাঁর কত সাধের জিনিস! অবশেষে এক জন্ম থেকে আর এক জন্মে ছুটে বেড়ানো সার্থক হল। মনে পড়ে গেল সেই দিনটার কথা, যে দিন প্রথম দেখেছিলেন দণ্ডটাকে। তামার তৈরি একটা সুদৃশ্য দণ্ড। দণ্ডের মাথায় বসানো একটা অত্যুজ্জ্বল নীলকান্ত মণি, যার আর এক নাম লাপিস লাজুলি। নীলকান্ত মণিটা যেন জ্যান্ত। তার মধ্যে যেন একটা স্পন্দন রয়েছে। মণিটা স্পর্শ করা যাচ্ছে না। মণির কাছাকাছি হাত নিয়ে গেলেই অদৃশ্য সূচের মতো কী যেন হাতে বিঁধছে। আজও কয়েক মুহূর্ত মণিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তার পরে দণ্ডটাকে হাতে তুলে নিলেন। শুরু করলেন অস্ফুট মন্ত্রোচ্চারণ। জাগাতে হবে এই মহা আয়ুধকে। মন্ত্রের গতি বাড়তে জলের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হল। দমকা হাওয়ায় এলোমেলো হল চার দিক। আকাশ ছেয়ে এল
ঘন কালো মেঘে। এক সময় হুদুদ বেগ অনুভব করলেন, হাজার হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা শক্তিপুঞ্জ জাগছে। তাঁর শরীরের মধ্যে অদ্ভুত এক শিহরন হল। যেন বুকের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা কোনও আগ্নেয়গিরি আড়ামোড়া ভেঙে উঠে বসল। যেন বহু কাল ধরে আটকে থাকা জলরাশি ছিদ্র খুঁজে পেল বাঁধের গায়ে। যেন মাঝসমুদ্রে জন্ম নিল টাইফুনশিশু।
হুদুদ বেগ পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিলেন লাপিস লাজুলির গায়ে। আজ আর মণিটাকে স্পর্শ করতে অসুবিধে হল না। দেবী ইনান্নার লাপিস লাজুলি তাঁকে স্পর্শ করার অনুমতি দিচ্ছে। এই অনুমতি পাওয়ার জন্যই তো তাঁর এত দিনের অপেক্ষা। গত জন্মে এই অনুমতি লাভের একেবারে দোরগোড়া থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল গিয়াসুদ্দিনের বিশ্বাসঘাতকতায়। কিন্তু এ বার তিনি পেরেছেন। এ বার দৈবী নির্বাচনেই তিনি এই দণ্ড ব্যবহারের অধিকারী। সাড়ে সাতশো বছর সময় লেগে গেল ঠিকই কিন্তু ওই যে ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, ‘বেটার লেট দ্যান নেভার।’ দণ্ডটাকে ডান হাতে ধরে ওপরের দিকে ভেসে উঠতে শুরু করলেন হুদুদ বেগ ওরফে মুস্তাফা ওরফে হালাকু খাঁ।
বিস্ফারিত চোখে রঘু ঠাকুর দেখলেন বিদেশি লোকটা জল থেকে উঠে আসছে! তার হাতে অদ্ভুত এক দণ্ড যার শিরোপরে জ্বলজ্বল করছে অত্যুজ্জ্বল নীলাভ স্ফটিকখণ্ড। সাড়ে সাতশো বছর পরে এই পুকুরের জল থেকে কেউ উঠে এল, জীবন্ত!
