লাপিস লাজুলি – ২৬
॥ ছাব্বিশ॥
মার্চ, বর্তমান কাল
গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই ভাদুড়িমশায় বুঝতে পারলেন যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। প্রকৃতির ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে। হঠাৎ করেই বিপুল এক শক্তিপুঞ্জ শৃঙ্খল ভেঙে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। বাতাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পাওয়া যাচ্ছে তার উপস্থিতি। চারপাশটা কেমন যেন আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় থমথম করছে। তিনি বললেন, ‘যেটার ভয় পাচ্ছিলাম সেটাই হল। লোকটা আমাদের আগেই এসে গেছে।’
গাড়িগুলো এসে দাঁড়িয়েছে বিশাল পুকুরের ধারে। এর পরে আর গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত রাস্তা নেই। একটু দূরেই গাছপালার ফাঁকে দেখা যাচ্ছে দুর্গা মন্দিরের চূড়া। পুকুরের ধারে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো রঙের এসইউভি। গাড়িটায় উঁকি দিয়ে অমিয় বলল, ‘এখানে তো কেউ নেই স্যার।’
ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘আমাদের মন্দির অবধি যেতে হবে অমিয়। ভালোমন্দ যাই হোক, যবনিকা পতন ওই মন্দিরেই হবে।’
স্পেশাল অফিসার সহদেব মাহাতো তাঁর ফোনে সমীরণকে জানালেন, ‘রিচড স্যার। এখানে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সাসপেক্ট মন্দিরের ভেতরে আছে বলে মনে হচ্ছে। আমরা মন্দিরটা ঘিরে নিচ্ছি।’
চমকে উঠলেন সমীরণ আর একই সঙ্গে এই হুদুদ বেগ ওরফে মুস্তাফার কানেকশন দেখে শিহরিত হলেন। এইটুকু সময়ে লোকটা মধ্যপ্রাচ্য থেকে মালদায় পৌঁছে গেল! তাও আবার একদম ঠিক জায়গায়! কত বড়ো নেটওয়ার্ক এদের! ভারতের মাটিতে কতটা গভীর এদের শেকড়! বড়ো আফশোস হল তাঁর। সঞ্জয় বা অপালার জ্ঞান যদি আর একটু আগে ফিরত তা হলে এই সর্বনাশ হতো না। দিল্লিতে নিজের অফিসে বসে থাকলেও সমীরণের মন পড়ে আছে এখানেই। তিনি আসতে পারেননি পল্লব, রোশনি, সঞ্জয় আর অপালার জন্যই। ওদের দেশে ফেরানোর বন্দোবস্ত চলছে। হিসেব মতো পল্লব আর রোশনি আন্তর্জাতিক বন্দি। কিন্তু জাজিরা মরুভূমিতে আইসিস ক্যাম্পের সন্ধানের বিনিময়ে সিরিয়া গভর্নমেন্ট তাদের দেশে ফেরাতে রাজি হয়েছে। স্বর্ণ গোদাবরীর ক্রু-রাও আটকে ছিল আইসিস ক্যাম্পে। তাদেরও দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। তার হাজারটা প্রোটোকল সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ‘ফোনটা ভাদুড়ি স্যারকে দাও।’
সহদেব ব্লুটুথ অফ করে ফোনটা এগিয়ে দিলেন ভাদুড়িমশায়ের দিকে, ‘সমীরণ স্যার কথা বলবেন।’
তীরে এসেও তরী ডুবে গেছে। বড়ো ক্লান্ত লাগছে ভাদুড়িমশায়ের। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিলেন তিনি, ‘বলো সমীরণ।’
হতাশ গলায় সমীরণ বললেন, ‘লোকটা সত্যি এসে পড়েছে স্যার?’
‘এসে পড়েছে শুধু তাই নয়, যেটার জন্য এসেছে সেটা পেয়েও গেছে এবং ঘুমন্ত সেই শক্তিপুঞ্জকে জাগিয়েও তুলেছে।’
ভাদুড়িমশায়ের কাছ থেকে সমীরণ আগেই জেনেছেন এই মহাশক্তিধর আয়ুধের ক্ষমতা কতখানি এবং অপালার কাছ থেকে জেনেছেন এই হুদুদ বেগ লোকটা কত বড়ো উন্মাদ। আসন্ন ধ্বংসের আশঙ্কায় তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কাঁপা গলায় তিনি বললেন, ‘এ বার তবে কী হবে স্যার?’
কী হবে, সত্যি কথা বলতে ভাদুড়িমশায়ও জানেন না। এই দণ্ড যার হাতে থাকবে আর যদি সে এটা ব্যবহারের মন্ত্রগুপ্তি জানে, সে হবে দুনিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ। এই মুহূর্তে হুদুদ বেগ দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ। হাজার হাজার বছর ধরে মহাসিন্ধুর ওপারে দুই নদীর অববাহিকায় ঘুমিয়ে থাকা দৈবী এবং জাদুশক্তির এক বিশাল ভাণ্ডার এই মুহূর্তে তার অধীন। ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘জানি না সমীরণ। তবে তিতাসের প্রতি আর এই পৃথিবীর প্রতি আমার তো একটা দায় আছে। ওই দণ্ড ছাড়া তো তিতাসকে উদ্ধার করা যাবে না। দেখি। সবই গুরুকৃপা।’
সহদেবের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিলেন ভাদুড়িমশায়। ফের ব্লুটুথ অন করে সহদেব বললেন, ‘ইয়েস স্যার।’
সমীরণ বললেন, ‘এখন থেকে অপারেশনটা লিড করবেন ভাদুড়ি স্যার। ফলো হিজ অর্ডার। লোকটাকে আমাদের ধরতেই হবে। অ্যাট এনি কস্ট।’
সহদেবের ট্র্যাক রেকর্ড দুর্দান্ত। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের মূল চক্রীকে তিনিই ধরেছিলেন। এখনও অবধি তিনটে ব্লাস্ট তিনি ইন্টারসেপ্ট করে আটকে দিয়েছেন। অসমের একটা স্কুলের বাচ্চাদের যখন জঙ্গিরা পণবন্দি করেছিল তখন তাঁকেই উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গোপন অপারেশনের জন্য। জঙ্গিদের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চলাকালীন পেছন দিয়ে তিনি ঢুকে পড়েছিলেন স্কুলে এবং একা হাতে নিকেশ করেছিলেন সাত জন জঙ্গিকে। একটা বাচ্চার গায়েও আঁচ লাগতে দেননি। ডিপার্টমেন্টের চোখের মণি তিনি। নিজের কাজ নিয়ে অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানেন, তাঁরা এক জন হাইপ্রোফাইল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীকে ধরতে এসেছেন এবং এই কাজের জন্য অন্য কাউকে না বেছে তাঁকেই বাছা হয়েছে। আর এখন কি না তাঁকে এই বৃদ্ধের অর্ডার ফলো করতে হবে! ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সমীরণের কথাটা তাঁর মনঃপূত হল না।
বৃদ্ধ বা যুবায় সহদেবের আপত্তি নেই। আপত্তি স্পেশালাইজেশনের ব্যাপারে। গাড়িতে আসতে আসতে অমিয় এবং দীপক পালের কথাবার্তায় তিনি বুঝতে পেরেছেন এবং সমীরণও বলেছেন, এই নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি খুবই পণ্ডিত মানুষ এবং তন্ত্রের ব্যাপারে তাঁর অগাধ জ্ঞান। কিন্তু সহদেবের কাছে এই সব তন্ত্রমন্ত্র নেহাতই বুজরুকি। এখন যদি কোনও পুজোআচ্চা করার বিষয় হতো তিনি অবশ্যই এই বৃদ্ধের কথা শুনে চলতেন। দরকারে আমপল্লব, শিষওয়ালা ডাব বা কলাগাছ জোগাড় করে দিতেন। কিন্তু এক জন টেররিস্টকে কী ভাবে ধরতে হবে সেটা এক জন অধ্যাপকের থেকে তিনি শুনবেন না। একটু তফাতে এসে তিনি সমীরণকে বললেন, ‘সরি স্যার, কিন্তু মিস্টার ভাদুড়ি কী ভাবে লিড করবেন? ওঁর তো এই ধরনের অপারেশনের কোনও অভিজ্ঞতাই নেই।’
বিরক্ত হলেন সমীরণ কিন্তু নিজেকে সামলে নিলেন। যারা নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে আত্মপ্রত্যয়ী তারা হুকুম তামিল করার আগে প্রশ্ন করবেই। তিনি নিজেও তাই করেন। একটু ভেবে বললেন, ‘তুমি ঠিক বলছ সহদেব। কিন্তু এটা আর পাঁচটা অপারেশন নয়। ওই টেররিস্টের কাছে খুব পাওয়ারফুল একটা ম্যাজিক্যাল ওয়েপন আছে। সেটা তুমি বা তোমার টিম হ্যান্ডেল করতে পারবে না। ওই ওয়েপনটা ওর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া অবধি তুমি ভাদুড়ি স্যারের অর্ডার ফলো করো। তার পরে তুমি তোমার প্ল্যানমাফিক ওদের অ্যারেস্ট কোরো। কেমন? আমি কানেক্টেড আছি। কী হচ্ছে জানাতে থাকো।’
‘হুম,’ বলে ভাদুড়িমশায়ের কাছে এগিয়ে এলেন সহদেব। কিন্তু তাঁর ভুরুটা কুঁচকে রইল। তিনি বললেন, ‘আপনার অর্ডার মতো আমার টিম রিয়্যাক্ট করবে স্যার। বলুন আমাদের কী করতে হবে?’
ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘এখন তুমি তোমার টিম নিয়ে এখানেই অপেক্ষা করো। আমি, অমিয় আর দীপক মন্দিরে যাচ্ছি। যদি প্রয়োজন হয় অমিয় তোমাদের ইঙ্গিত দেবে।’
রীতিমতো উষ্মা ঝরে পড়ল সহদেবের গলায়, ‘আমরা স্পেশাল ফোর্স এখানে ওয়েট করব আর দু’জন নরমাল পুলিশ আর এক জন সিভিলিয়ান যাবে টেররিস্ট ধরতে? আর ইউ জোকিং?’
সহদেবের চোখে চোখ রাখলেন ভাদুড়িমশায়। এই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি সহ্য করার মতো ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই আছে। সহদেবও গুটিয়ে গেলেন। গম্ভীর স্বরে ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘তোমার সঙ্গে আমার রসিকতার সম্পর্ক নয়। তাই জোক করার প্রশ্নই নেই। আশা করি সমীরণ তোমাকে বলেছে হুদুদ বেগ কোনও সাধারণ সন্ত্রাসী নয়। আমার নির্দেশ না পাওয়া অবধি তুমি বা তোমার দলের কেউ অস্ত্র হাতে মন্দিরের ধারে-কাছেও যাবে না। চলো অমিয়। দীপক এসো।’
কথাটা শেষ করেও কয়েক মুহূর্ত সহদেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি তার পরে পা চালালেন মন্দিরের দিকে। ভুরুটা কুঁচকেই সেদিকে তাকিয়ে রইলেন সহদেব।
যেতে যেতেই দীপক পাল প্রশ্ন করলেন, ‘একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না স্যার। এই লোকটা যদি দেবীর দণ্ড পেয়েই যায় তা হলে এখনও এখানে আছে কেন? ওর তো চলে যাওয়া উচিত ছিল।’
অমিয় বলল, ‘ঠিক। আমিও এটা ভাবছিলাম।’
থমকে দাঁড়ালেন ভাদুড়িমশায়। বললেন, ‘আমার জন্য।’
হাঁ হয়ে গেল অমিয় আর দীপক পাল দুজনেই। দীপক পাল বললেন, ‘আপনার জন্য!’
‘হ্যাঁ দীপক। আমারই জন্য অপেক্ষা করছে হুদুদ বেগ। এটা শুধু আমার অনুমান নয়, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।’
বলেই ফের চলতে শুরু করলেন ভাদুড়িমশায়। আর কিছু জিজ্ঞেস করার অবকাশ পেল না অমিয় বা দীপক পাল, তার আগেই ওরা এসে পড়ল মন্দির চত্বরে আর যা দেখল তাতে স্তব্ধ হয়ে গেল।
মন্দিরের চাতালে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। অসহায় পিতা যে ভাবে অসুস্থ সন্তানকে বুকে আগলে রাখেন, ঠিক সেই ভাবে দু’হাতে জড়িয়ে রেখেছেন একটি পাথরের দুর্গামূর্তি। মূর্তির তলদেশ ভেঙে গিয়েছে। পাথরের টুকরো বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে আছে গর্ভগৃহের বাইরের চাতালটায়। মনে হচ্ছে, কেউ যেন প্রচণ্ড আক্রোশে মূর্তিটাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে বাইরে আর এই বৃদ্ধ সেই মূর্তি বুকে জড়িয়ে আকুল হয়ে বলছেন, ‘মা রে, তোর লাগেনি তো মা?’
ওদের পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ তুলে চাইলেন বৃদ্ধ। তাঁর দু’চোখে জল। ভাদুড়িমশায় বলে উঠলেন, ‘রঘুনাথ দাদা, আমি নীরেন। ঠাকুরের আশ্রমে দেখা হয়েছিল আমাদের। চিনতে পারছ?’
টালুমালু চাহনিতে ভাদুড়িমশায়কে দেখার চেষ্টা করতে করতেই স্মৃতি হাতড়াতে লাগলেন রঘুনাথ। এক সময় উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর চোখ। অস্ফুটে বললেন, ‘নীরেন? নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি? ঠাকুরের প্রিয় শিষ্য নীরেন?’
মাথা নাড়লেন ভাদুড়িমশায় আর তৎক্ষণাৎ হাহাকার করে উঠলেন রঘুনাথ, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে নীরেন। একটা অসুর ঢুকে পড়েছে এখানে। ও অসীম ক্ষমতাধর। জলের তলা থেকে তুলে এনেছে দৈবী শক্তি। মায়ের মূর্তি ছুড়ে ফেলে দিয়েছে বাইরে। সব শেষ হয়ে যাবে, সব।’
রাগে মাথার শিরা দপদপ করে উঠল ভাদুড়িমশায়ের। চোয়াল শক্ত করে বললেন, ‘কোথায় সে?’
তখনই গর্ভগৃহের ভেতর থেকে ভেসে এল হুদুদ বেগের গলা। লুকোচুরি খেলার সময় টুকি দেওয়ার মতো করে ইংরেজিতে বলল সে, ‘মিস্টার ভাদুড়ি, আমি এখানে।’
গর্ভগৃহের দরজাটা এতক্ষণ বন্ধ ছিল। এ বার নিজে থেকেই ধীরে ধীরে খুলে গেল। বাইরে যতটা আলো ভেতরে তত আলো নেই। কিন্তু তাতেই যা দেখা গেল দু’পা পিছিয়ে এল অমিয় আর দীপক পাল। ভেতরে এক প্রৌঢ়। প্রৌঢ়ের চেহারা অতি সাধারণ কিন্তু অসাধারণত্ব বা ভয়াবহতা যাই বলা হোক না কেন সেটা তৈরি করছে তার পারিপার্শ্বিক। ডুবুরির পোশাক পরা লোকটা বসে আছে সেই পাথরের বেদির ওপরে, যে বেদিতে একটু আগে অবধি দুর্গামূর্তি ছিল। তার হাতে দেবী ইনান্নার মিথিক্যাল দণ্ড। যে দণ্ড নিয়ে এত কাণ্ড সেটাকেও মন দিয়ে দেখতে পারল না ওরা কারণ লোকটার দু’পাশে বসে আছে বিশাল চেহারার চারটে সিংহ। তাদের পিঙ্গল কেশর মাটি ছুঁয়ে আছে। নতুন মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে মৃদু গর্জন করে উঠল তারা।
ভাদুড়িমশায়ের উপস্থিতি আশ্চর্য এক নিশ্চিন্তির জন্ম দেয়। মনে হয় সব ঝড়ঝাপটা একাই সামলে নেবে এই বটগাছের মতো মানুষটা। সেই সে বার গেনু যখন সঞ্জয়কে মারতে এসেছিল তখনও তার সামনে দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ভাদুড়িমশায়। অমিয়র স্পষ্ট মনে আছে, সে দিন ও তার তেমন ভয় লাগেনি। কিন্তু আজ এই লোকটাকে দেখে তার ভয় লাগল। ভয়ের একটা মাকড়সা যেন জাল বুনতে শুরু করল তার সমস্ত চৈতন্য ঘিরে আর সেই ভয়ের মাকড়সা তার অসহায় পতঙ্গের মতো স্নায়ুগুলোকে কামড়ে ধরল যখন রঘু ঠাকুর বলে উঠলেন, ‘ওই লোকটা মায়া করতে জানে নীরেন। ওর সঙ্গে আরও চারটে লোক ছিল, তাদেরই ও সিংহ বানিয়ে রেখেছে।
ভয়টা ছায়া ফেলল অমিয়র মুখে। সেটা দেখতে পেয়ে হুদুদ বেগ হাসল। অমিয়র দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভয় লাগছে? ভয় পেয়ো না। ভয় পেয়ো না। আমি না বললে ওরা তোমায় কিচ্ছু করবে না। ওরা আমার খুব অনুগত।’
তার পরে ভাদুড়িমশায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিস্টার ভাদুড়ি, তোমার ছবি আমি অপালার কাছে দেখেছি। তোমরা তিন জন এলে যে? তোমার সঙ্গে ইন্ডিয়ান আর্মির যে লোকগুলো এসেছে তাদের আনলে না?’
চমকে উঠল অমিয়। চাপা গলায় বলল, ‘লোকটা এটাও জেনে ফেলেছে!’ অমিয়র প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ভাদুড়িমশায় হুদুদ বেগের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘দেবীর দণ্ড যার হাতে থাকে সে সর্বজ্ঞ। তাকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। তুমি তো জানো আমি ওদের এখানে আসতে বারণ করেছি। আমি জানি, ওই সামান্য ক’টা বন্দুক তোমার কিছুই করতে পারবে না।’
‘হুম। তুমি বুদ্ধিমান। আমি কিন্তু তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।’
ভাদুড়িমশায়ের কণ্ঠ থেকে বিনয় অন্তর্হিত হল। গম্ভীর স্বরে তিনি বললেন, ‘আমি জানি।’
একটু যেন অবাক হল হুদুদ বেগ। গর্ভগৃহ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে ভাদুড়িমশায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তুমি জানো?’
এ বার ভাদুড়িমশায় হাসলেন, ‘না জানার কী আছে? তোমার এত বছর ধরে সযত্ন-লালিত গোপন পরিচয় যখন আবিষ্কার করতে পেরেছি তখন এটা আর এমন কী ব্যাপার? দেবী ইনান্নার দণ্ড হাতে পাওয়া মাত্রই তুমি অমিত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছ এবং জানতে পেরেছ আমি এখানেই আসছি। দেখো, সত্যি কথা বলতে তো দণ্ডটা তুমি উদ্ধার করোনি। করেছে অপালা, করেছে সঞ্জয় এবং কিছুটা করেছি আমি। তা যারা তোমার এত বছরের অপূর্ণ ইচ্ছে পূরণ করে দিল তাদের সামনে থেকে দেখতে তো সাধ হবেই। অপালা আর সঞ্জয়কে আশা করি আগেই ধন্যবাদ জানিয়েছ। এখন কি আমাকে ধন্যবাদ দিতে চাও?’
উত্তরটার জন্য প্রস্তুত ছিল না হুদুদ বেগ। এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সে আর তার এই থমকে যাওয়াটুকুই অমিয়র মনের ভেতরে জমতে থাকা ভয়ের অন্ধকারটা কাটিয়ে দিল এক নিমেষে। সে অনুভব করল, খুব শিগগির দুই মহা শক্তিধর মানুষের মধ্যে যুদ্ধ লাগতে চলেছে। অলৌকিক এক যুদ্ধ আর এই যুদ্ধে তাকে ভাদুড়িমশায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে।
হাতের দণ্ডটা ভাদুড়িমশায়ের দিকে তাক করে হুদুদ বেগ বলল, ‘তোমার ঔদ্ধত্য দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি।’
অবাক হলেন রঘুনাথও। রামদাস ঠাকুরের কাছে শুনেছিলেন, এই নীরেন ছেলেটি নাকি আশ্চর্য রকমের সাহসী আর অদ্ভুত তার মনের জোর। আজ প্রমাণ পেলেন এবং শুধু তাই নয়, অনুভব করলেন, তাঁর সাহসটাও যেন ফিরে আসছে। লোকটাকে শুরুতে যতটা ভয় পেয়েছিলেন এখন আর ততটাও ভয় লাগছে না। সাহস বা ভয় দুটোই সংক্রামক।
কঠিন স্বরে ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘ঔদ্ধত্য দেখে নয় হুদুদ বেগ। তুমি অবাক হয়েছ আমি তোমাকে ভয় পাইনি বলে। আর শুধু আমি কেন? অমিয়, দীপক বা রঘুনাথ দাদা কেউ তোমাকে ভয় পাচ্ছে না। কারণ তোমার হাতের দণ্ড শক্তি হারিয়েছে। তুমি যতটা ভাবছ এখন আর ততটাও কাজ করবে না ওই নীলকান্তমণি। কেন জানো? কারণ এটা দেবস্থান। এখানে নিত্যপুজো হয়। মা দুর্গার আশীর্বাদ বর্ষিত হয় এখানে।’
হেসে উঠল হুদুদ বেগ, ‘তোমাদের ওই দেবীকে তো আমি ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। আমি যেখানে থাকি সেখানে আর কোনও দেব দেবীর থাকার দরকার পড়ে না। আমি নিজেই ঈশ্বর।’
‘তুমি মূর্খ। তাই তোমার এত আস্ফালন,’ গর্জন করে উঠলেন ভাদুড়িমশায়, ‘দেবীকে তাঁর আসনচ্যুত করে তুমি পাপ করেছ। মহাপাপ। তোমার পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে আর তার ফল ভুগবে তুমি। আসলে এটাই তোমার নিয়তি। দেবী দুর্গা কে জানো? তাঁর আর এক নাম উমা। তিনি আমাদের ঘরের মেয়ে। তোমার নিয়তি তোমায় দিয়ে আমাদের মেয়েকে অপমান করিয়েছে। আর ঘরের মেয়ের অপমানে আমরা তো চুপ করে থাকব না। তোমাকে শাস্তি দেব হুদুদ বেগ। শুধু শাস্তিই নয়, যে অপমান তুমি আমাদের মেয়েকে করেছ তার তিন গুণ অপমান তোমায় ফিরিয়ে দেব। গুনে গুনে তোমাকে সাতটি চড় মারব।’
অপমানে মুখটা লাল হয়ে উঠল হুদুদ বেগের। চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, ‘তাই? তুমি আমাকে শাস্তি দেবে?’
ততোধিক কর্কশ স্বরে ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘হ্যাঁ দেব তো। আর শুধু তাই নয়, যে ভাবে গিয়াসুদ্দিন আল তুসি সাড়ে সাতশো বছর আগে তোমার স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়েছিলেন, সেই ভাবে আমিও তোমার স্বপ্নে জল ঢেলে দেব। তোমায় বুঝিয়ে দেব, তুমি একটি উন্মাদ ছাড়া কিচ্ছু নও। ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই প্রাপ্য নয় তোমার।’
আচমকাই চোখ জ্বলে উঠল হুদুদ বেগের। ভাদুড়িমশায়ের দিকে তাকিয়েই সে মৃদু শিস দিল আর সেই শিস শুনে আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াল চারটে সিংহ। লঘু পায়ে তারা বেরিয়ে এল মন্দিরের চাতালে। আবারও একটা অস্বস্তি কাজ করতে লাগল অমিয় আর দীপক পালের মধ্যে। ভয় আর ভয়হীনতার মধ্যে একটা দাবা খেলা চলছে প্রতি মুহূর্তে। ভাদুড়িমশায় বারে বারে ভয়ের সামনে একটা সাহসের প্রাচীর তুলে দিচ্ছেন আর হুদুদ বেগ নতুন নতুন কৌশলে ভয়ের সৈন্যদের নিয়ে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। প্রবল অভিঘাতে কেঁপে কেঁপে উঠছে প্রাচীরটা কিন্তু ধ্বসে পড়ছে না। হুদুদ বেগ বলল, ‘এই বার তুমি ভয় পাবে ভাদুড়ি।’
মৃদু হাসলেন ভাদুড়িমশায়, ‘মানুষ কখন ভয় পায় জানো? যখন তার কিছু হারানোর থাকে। আমি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। আমার আর হারানোর কিছু নেই।’
‘আছে আছে, হারানোর আছে ভাদুড়ি। জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি মানুষের কিছু না কিছু হারানোর থাকে। তুমি কি ভাবলে? তোমায় আমি সিংহ দিয়ে খাইয়ে দেব? না না, এত মোটা দাগের কাজ আমি করব না। আসলে আমি তোমাকে মারব না। কারণ সত্যি তোমার চোখে মৃত্যুভয় নেই। যার মৃত্যুভয় নেই, তাকে মেরে মজাও নেই। তোমার জন্য দরকার নতুন রকমের শাস্তি। মানুষকে নতুন নতুন শাস্তি দিতে আমার ভালো লাগে। খলিফা আল মুস্তাসিনকেও দিয়েছিলাম।’
এক মুহূর্ত চুপ থেকে ভাদুড়ি মশায় বললেন, ‘তুমি নিজেকে যতটা সৃষ্টিশীল ভাবো, ততটাও তুমি নও। তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ অনুমানযোগ্য। কী আর নতুন শাস্তি দেবে তুমি? হয় আমার সঙ্গে যে দু’জন আছে আমার চোখের সামনেই তাদের সিংহ দিয়ে খাইয়ে দেবে আর নয়তো দেবীর দণ্ডের সাহায্যে নরকের দরজা খুলে আমাকে তার মধ্যে প্রবেশ করতে বাধ্য করবে। তার পরে দরজা বন্ধ করে দেবে। জীবন্ত অবস্থায় নরকযন্ত্রণা ভোগ করার শাস্তি দেবে আমাকে। তাই তো? কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানো হুদুদ বেগ? এখানে তোমার জাদু পূর্ণমাত্রায় কাজ করবে না। দেবীর দণ্ড ইতিমধ্যেই কিছুটা হলেও শক্তিহীন হয়েছে। তুমি চাইলেও নরকের দরজা খুলতে পারবে না। এত চেষ্টা করেও যে তুমি আমার মনের মধ্যে ঢুকতে পারছ না এটাই তার প্রমাণ।’
ভাদুড়িমশায়ের শেষ কথাটায় যেন ভেতর থেকেই একটু নড়ে গেল হুদুদ বেগ। সত্যিই তো, অনেক চেষ্টা করেও সে ভাদুড়ি বলে এই লোকটার মনের মধ্যে ঢুকতে পারেনি। যত বার চেষ্টা করেছে বাধা পেয়েছে। তা হলে কি সত্যিই দেবীর দণ্ড পূর্ণমাত্রায় কাজ করছে না?
কিন্তু তাকে সামলে নেওয়ার অবকাশ না দিয়েই তার দিকে আঙুল তুলে মশায় বললেন, ‘ভাবছ তো দেবীর দণ্ড কাজ করছে না কেন? তার কারণ প্রথমত এটা অতি জাগ্রত দেবস্থান আর দ্বিতীয়ত আমার উপস্থিতি। আমি সারাজীবন আনখশির সৎ থেকেছি, কখনো গুরুবাক্য থেকে বিচ্যুত হইনি। আসুরিক শক্তি যদি তোমার থেকে থাকে তবে আমারও দৈবী শক্তি আছে। তুমি যেমন হালাকু খাঁ-র পুনর্জন্ম তেমনই আমিও রামদাস ঠাকুরের প্রিয় শিষ্য নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। তুমি যদি তন্ত্রের হ্রদ আত্মস্থ করে থাকো আমি সাত সমুদ্র আত্মস্থ করেছি। তুমি বিষধর সাপ হলে আমি সাপের মাথার মণি তুমি তান্ত্রিক হলে আমি মহাতান্ত্রিক। তুমি অসুর হলে আমি স্বয়ং অসুরদলনী মা দুর্গার আশীর্বাদধন্য।’
ভাদুড়িমশায়ের কণ্ঠ গমগম করতে লাগল মন্দির জুড়ে। তীব্র আত্মপ্রত্যয় যেন ছড়িয়ে পড়ল আলোয়-আলোয়, বাতাসে-বাতাসে। দেবীমূর্তি বুকে জড়িয়ে রঘু ঠাকুর উদাত্ত গলায় গেয়ে উঠলেন, ‘রুদ্রচণ্ডে প্রচণ্ডাসি প্রচণ্ডবলশালিনী। রক্ষ মাং সর্ব্বতো দেবী বিশ্বেশ্বরী নমোহস্তুতে।’
অমিয় আর দীপক পাল একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘জয় মা। জয় মা।’ অপার্থিব এক মুহূর্তের জন্ম হল যেন ব্রহ্মস্থানের প্রাচীন দুর্গা মন্দিরে। বুকটা কেঁপে উঠল হুদুদ বেগের। সে চিৎকার করে উঠল, ‘থামো। থামো বলছি।’
হেসে উঠলেন ভাদুড়িমশায়। বললেন, ‘এ বার তুমি ভয় পেলে তাই না হুদুদ বেগ?’
চোয়াল শক্ত করে ভাদুড়িমশায়ের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল হুদুদ বেগ। বলল, ‘তুমি কথার জাগলারি করছ তাই না বৃদ্ধ? ঠিক আছে, তোমার এই ঔদ্ধত্যের দাম তুমি আর তোমার এই দুই সহচর দেবে। আমি নরকের দরজা খুলব আর তোমরা তিন জন একে একে প্রবেশ করবে সেখানে। যদি না করো আমি এই মুহূর্তে এই গ্রামের সবাইকে হত্যা করব। দেখি, নরকের দরজা খোলে কি না! দেখি কে বেশি শক্তিশালী আমি না তুমি? না কি তোমার দেবী?’
কথাটা শেষ করেই হাতের দণ্ডটাকে সামনের দিকে তাক করে চোখ বুজল সে। শুরু করল অস্ফুট মন্ত্রোচ্চারণ। ঠিক তখনই মাথার ভেতর ভাদুড়িমশায়ের গলা শুনতে পেলেন রঘু ঠাকুর, ‘জোরে জোরে দুর্গামন্ত্র স্তব করো রঘুদাদা প্রাণ দিয়ে মাকে ডাকতে থাকো।’
একটু চমকে উঠে ভাদুড়িমশায়ের দিকে তাকালেন রঘু ঠাকুর। ইশারায় আশ্বস্ত হয়ে শুরু করলেন দুর্গাস্তব। দুই মন্ত্রের দুই সুর যেন একে অপরকে কেটে দিতে লাগল বারংবার। মনঃসংযোগ বিঘ্নিত হতে লাগল হুদুদ বেগের। মনটাকে সংহত করে মন্ত্রোচ্চারণের গতি বাড়াল সে। বাতাসের বুক চিরে বসে যেতে লাগল সেই শব্দ আর বেগ বাড়তে লাগল বাতাসের। অমিয় দেখল, রাশি রাশি মেঘ এসে ভিড় জমাল মন্দিরের আকাশে। কালো হয়ে এল চারপাশ আর তখনই তীব্র উজ্জ্বল হয়ে উঠল লাপিস লাজুলি। প্রচণ্ড এক স্পন্দন দেখা দিল সেই নীলাভ স্ফটিক খণ্ডে। আচমকাই সেখান থেকে নীল রঙের একটা বিদ্যুৎ ছুটে গিয়ে ফাটল ধরিয়ে দিল বাতাসের দেওয়ালে। লম্বা একটা চিড় দেখা দিল। একটু একটু করে বড়ো হতে শুরু করল সেটা আর তার মধ্যে থেকে উঁকি দিতে লাগল নিকষ কালো অন্ধকার। খুলে যাচ্ছে নরকের দরজা!
ভাদুড়িমশায় দেখলেন, ঘাম জমছে হুদুদ বেগের কপালে। সে প্রাণপণে নরকের দরজা খোলার চেষ্টা করে চলেছে। তার সমস্ত মনঃসংযোগ, সমস্ত শক্তি, সমস্ত সাধন এখন ওখানেই স্থির হয়ে আছে। অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল। ফাটলের আকার যত বাড়তে লাগল ধীরে ধীরে চারটি সিংহ রূপান্তরিত হল মানুষে। তাদের মধ্যে একটা ভ্যাবাচ্যাকা ভাব।
ঠিক এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিলেন ভাদুড়িমশায়। মনে মনে বললেন, ‘সহদেব, এই বার।’
ঠিক দু’সেকেন্ডের মধ্যে গাছের আড়াল থেকে একটা দড়ির ফাঁস উড়ে এসে হুদুদ বেগের হাতের দণ্ডটাকে কামড়ে ধরল। পর মুহূর্তেই এক হ্যাঁচকা টানে সেটা তার হাত থেকে উড়ে গিয়ে পড়ল দূরে। টাল সামলাতে না পেরে কাত হয়ে গেল সে আর নিমেষে মুছে গেল বাতাসের দেওয়ালে তৈরি হওয়া ফাটলটা। বিস্ফারিত চোখে সেটা দেখল হুদুদ বেগ কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতা সামলে কোনও প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগেই গুলির শব্দ শোনা গেল। হুদুদ বেগের চার সঙ্গী কপালে গুলি খেয়ে চিত হয়ে আছড়ে পড়ল মন্দিরের চাতালে আর আর্তনাদ করে হুদুদ বেগ হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সামনের দিকে। গুলি লেগেছে তার হাঁটুতে।
সহদেবের নেতৃত্বে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল আধাসেনার দল। তারা ঘিরে ধরল হুদুদ বেগকে। সহদেব বললেন, ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট মিস্টার বেগ উফ আইসিস চিফ খলিফা মুস্তাফা।’
যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতেই হুদুদ বেগ অনুভব করল, সত্যি সত্যি তার স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়েছে ভাদুড়ি বলে লোকটা। সাড়ে সাতশো বছরের অপেক্ষাকে এক লহমায় মিথ্যে করে দিয়েছে। লোকটা তাকে স্রেফ বোকা বানিয়ে দিয়েছে। রাগে, হতাশায়, নিষ্ফল আক্রোশে চিৎকার করে উঠল সে। তার চোখে জল এসে গেল।
মাটিতে পড়ে থাকা মহা আয়ুধটির সামনে এসে দাঁড়ালেন ভাদুড়িমশায়। মনে মনে প্রণাম জানালেন গুরু রামদাস ঠাকুরকে। গুরু বলতেন, ‘লেগে-পড়ে থাক নীরেন। লেগে-পড়ে থাক। অলৌকিক হবেই।’
সত্যিই অলৌকিক হয়েছে। হুদুদ বেগের হাত থেকে যে দেবীর দণ্ড কেড়ে নিতে পারবেন এ তিনিও ভাবেননি। এ বার তিতাস ফিরবে। তাকে ফেরানোর জন্যই তো এত কাণ্ড। মুগ্ধ চোখে তিনি তাকিয়ে রইলেন পৌরাণিক আয়ুধটির দিকে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে প্রস্তুত করলেন নিজেকে। যদিও দণ্ড এখন আবার ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছে তবু একে স্পর্শ করার আগে প্রণাম জানালেন দেবী ইনান্নার উদ্দেশে। তার পরে হাঁক দিয়ে বললেন, ‘রঘুনাথ দাদা, মায়ের পরার নতুন শাড়ি দাও একটা।’
রঘুনাথ শাড়ি নিয়ে এলেন। ভাদুড়িমশায় এক সিংহবাহিনীর পরিধেয়তে জড়িয়ে নিলেন আর এক সিংহবাহিনীর আয়ুধকে।
***
সকাল-সকাল গুলিগোলার শব্দ পেয়ে ভিড় করে এসেছে গ্রামের লোকেরা। তাদের সামাল দিচ্ছে স্থানীয় পুলিশ বাহিনী। ভাদুড়িমশায় সমীরণকে ফোনে জানিয়েছেন, ‘হুদুদ বেগকে নিয়ে এখন আর ভয় নেই। নরকের দরজা খোলা অতি কঠিন এক সাধন পদ্ধতি। এই ধরনের সাধনায় সাধকের সমস্ত শক্তি ওতেই নিয়োজিত হয় আর তন্ত্রের এমনই মজা যে এই ধরনের সাধনা সম্পূর্ণ না হলে সাধকের শক্তিক্ষয় হয় মারাত্মক রকমের। সে প্রায় শক্তিহীন হয়ে পড়ে। তাই হুদুদ বেগ এখন নির্বিষ সাপ ছাড়া আর কিছু নয়।’
ব্যথায় আচ্ছন্ন হুদুদ বেগকে তোলা হচ্ছে বিশেষ অ্যাম্বুল্যান্সে। কড়া পুলিশি প্রহরায় তাকে নিয়ে যাওয়া হবে মালদার সরকারি হাসপাতালে। সেখান থেকে দিল্লি। অ্যাম্বুল্যান্সের দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন ভাদুড়িমশায়। তাঁকে দেখে স্ট্রেচারের ওপরেই একটু উঠে বসল হুদুদ বেগ। দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করে বলল, ‘তোমাকে আমি মনে রাখব ভাদুড়ি।’
ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘তোমাকেও আমি মনে রাখব হুদুদ বেগ। লোকনাথের পরে তুমিই আমাকে সবচেয়ে বেশি বেগ দিয়েছ।’
‘আমি আবার ফিরে আসব।’
‘জানি। কিন্তু এটাও জানি সে বারও তোমার ইচ্ছে পূরণ হবে না। আমি হয়তো থাকব না কিন্তু অন্য কেউ থাকবে। যে তোমাকে বাধা দেবে। আসলে ব্যাপারটা তুমি-আমি না। এটা নিয়তি। প্রকৃতির ভারসাম্য, প্রকৃতি নিজেই রক্ষা করে। হালাকু খাঁ যেমন থাকে তাকে আটকানোর জন্য গিয়াসুদ্দিনরা ও থাকে। বিদায়।’
বন্ধ হয়ে গেল অ্যাম্বুল্যান্সের দরজা। স্ট্রেচারে শুয়ে শুয়েই হুদুদ বেগ ভাবল, ভবিষ্যৎবাণী তো পুরোপুরি মিলল না। সেখানে লেখা ছিল। ‘এক মহাসাধকের হাতে নরকের দরজা খুলবে। নরকের দরজা তো তার হাতে খোলেনি। তবে কে সেই মহাসাধক? ভাদুড়ি? না কি অন্য কেউ?
আর এ দিকে ভাদুড়ি মশায় ফিরে চললেন মন্দিরের দিকে। শঙ্খধ্বনি শোনা যাচ্ছে। নতুন করে দুর্গামূর্তি প্রতিষ্ঠা করছেন রঘু ঠাকুর। সেখানে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। মায়ের আবাহনে ছেলে আর মেয়ের আবাহনে বাপ না থাকলে চলে!
