লাপিস লাজুলি – ২৭
॥ সাতাশ ॥
মার্চ, বর্তমান কাল
কোল্ড ড্রিংকসের গেলাসে চুমুক দিয়ে দীপক পাল বললেন, ‘একটা ব্যাপার কিন্তু এখনও আমার কাছে পরিষ্কার না স্যার।’
আড্ডা জমেছে শ্রীরঞ্জনী বাড়ির বারান্দায়। আজ অনেক লোক। অপালা, সঞ্জয়, পল্লব, রোশনি ফিরে এসেছে। তারা তো আছেই। রয়েছেন দীপক পাল, অমিয়। দিল্লি থেকে এসেছেন সমীরণ। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন সহদেব মাহাতোকে আর মালদা থেকে এসেছেন রঘু ঠাকুর। আইসিস চিফকে গ্রেফতার করার জন্য সহদেবের প্রোমোশন হয়েছে। তারিকের কাগজটাও দারুণ কাজে লেগেছে। সেখানে সে লিখে গেছে, আবু বকর, ফারুক সহ আরও রিক্রুটারদের নাম। বিশদে লিখে গেছে, কী ভাবে ব্রেনওয়াশ করা হয় তাদের মতো ছেলেদের। তার লেখার সূত্র ধরেই ভারত থেকে আরও চার জন রিক্রুটার গ্রেফতার হয়েছে। আইসিসের গোটা সিস্টেমটাই ভেঙে পড়েছে। আগামী পাঁচ-সাত বছরের জন্য এখন নিশ্চিন্ত। মধ্যপ্রাচ্যের সবক’টি দেশ অভিনন্দন জানিয়েছে ভারত সরকারকে। সেই আনন্দে সমীরণ আজ সকলকে ভোজ খাইয়েছেন। পল্লব ভেবেছিল, ভাদুড়িমশায় তাকে খুব বকবেন। কিন্তু তিনি একেবারেই বকাবকি করেননি। বরং মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিয়েছেন। আসলে পল্লব আর রোশনিকে নিয়ে ভাদুড়িমশায় এতটাই চিন্তায় ছিলেন যে তাদের ফিরে পেয়ে তাদের অবাধ্যতার কথা ভুলে গেছেন। খাওয়া-দাওয়ার পর আড্ডা বসেছে। সবাই সবার অভিজ্ঞতার কথা বলেছে এবং বাকিরা চোখ গোল-গোল করে শুনেছে। শুধু রোশনি কিছু বলেনি। সকলের আড়ালে ভাদুড়িমশায় তাঁকে ডেকে বলেছেন, ‘তোমার কথা আমি পরে আলাদা করে শুনব। তোমায় আমি এক দিন ডাকব। আসবে তো?’
আসবে না মানে? অবশ্যই আসবে। এই মানুষটা ডাকলে না এসে পারা যায়! রোশনিকেও তো জানতে হবে সে কোন রূপকথার দেশে গিয়ে পড়েছিল? কেনই বা পড়েছিল? গোটা ঘটনাটার সঙ্গে তার এই হারিয়ে যাওয়ার তো কোনও যোগাযোগ নেই! তা হলে? উত নাপিশতিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ কোন কাজে আসবে তার? এগুলো একমাত্র ভাদুড়ি স্যারই বলতে পারবেন।
বেচারা রোশনি! সে জানে না তার নিয়তি তাকে পাঠিয়েছিল উত নাপিশতিমের দেশে। না চাইতেও সে হয়ে উঠছে মৃত্যুঞ্জয়ী। তিন-তিন বার সাক্ষাৎ মৃত্যু খুব কাছে এসেও তাকে ছুঁতে পারবে না। ইতিমধ্যে মৃত্যু এক বার কাছে এসে ফিরেও গেছে। বালিয়াড়ির ওপর থেকে সে যখন সামনের দিকে ঝাঁপ দিয়েছিল জঙ্গিদের ছোড়া গুলি বেরিয়ে গেছিল তার মাথার ঠিক আধ ইঞ্চি ওপর দিয়ে। রোশনি ভেবেছিল, ঠিক সময় মতো ঝাঁপ দিয়েছিল সে। আসলে তা নয়, যদি খুব সূক্ষ্ম জিনিস কেউ দেখতে পেত সে দেখত, রোশনির দিকে ছুটে আসা গুলিটাকে কেউ যেন নিপুণ হাতে একটু ওপরে তুলে দিয়েছিল। আরও দু’বার সুযোগ আছে মৃত্যুকে জয় করার। তার অজান্তেই সে হয়ে উঠেছে, তিতাস উদ্ধারের অন্যতম হাতিয়ার। আসলে সবটাই পূর্বনির্ধারিত।
ঘটনার ক্লাইম্যাক্সটা বলছিল অমিয়। তার বলা শেষ হতেই দীপক পাল তাঁর সংশয়ের কথা বলে উঠলেন। ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘কোন ব্যাপারটা দীপক?’
দীপক পাল বললেন, ‘আপনি তো সহদেব স্যারকে মন্দিরে যেতে বারণ করে এসেছিলেন। তা হলে তিনি এলেন কখন? কেনই-বা এলেন?’
পল্লব বলল, ‘এটা বুঝলেন না পালদা? স্যার নিশ্চয়ই মনে মনে ডেকে নিয়েছিলেন। তাই না?’
ভাদুড়িমশায় ঘাড় নাড়লেন। অপালা বলল, ‘না এ ভাবে ছাড়া-ছাড়া ভাবে বললে হবে না। আমি দাদুর মুখ থেকেই শুনতে চাই।’
মশায় বললেন, ‘শুনলে তো দিদিভাই। অমিয় তো বলল।’
অপালা বলল, ‘হ্যাঁ অমিয় ঘটনাটা বলল। কিন্তু তুমি যে এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটা ঘটালে, কী করে ঘটালে তার ব্যাখ্যাটা তো পেলাম না। শুনতে যতটা সহজ লাগল আমি তো হাড়ে-হাড়ে জানি ব্যাপারটা ততটা সহজ ছিল না। তুমিই বলেছ, দেবীর দণ্ড যার হাতে থাকবে এবং সে যদি সেটা ব্যবহারের অধিকারী হয় তা হলে সে হবে দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ। সেই মুহূর্তে হুদুদ বেগও ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ। তার ওপরে তো কোনও তন্ত্র কাজ করার কথা নয়। তা হলে? কী করে পারলে তুমি? পল্লব তো এই গল্পটা লিখবে কোনও-না-কোনও দিন। তখন তো পাঠক বলবে, শেষবেলায় আর একটু অ্যাকশন ডিমান্ড করছিল। কত কাণ্ড হল আর শেষে কিনা দড়ির ফাঁস দিয়ে ইনান্নার দণ্ড কেড়ে নেওয়া হল? বলো, পাঠক বলবে না?’
ভাদুড়ি মশায় স্মিত হাসলেন। অপালা আবার বলল, ‘হাসলে হবে না দাদু। কেড়ে নেওয়াটুকু হিমশৈলের চূড়া, তার তলদেশের ব্যাখ্যাটা দাও প্লিজ।’ আধশোয়া অবস্থা থেকে ইজিচেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন ভাদুড়িমশায়। বাকিরাও তাঁর দেখাদেখি অ্যাটেনশন হয়ে বসল। মশায় বললেন, ‘দেখো দিদিভাই, মন্দিরের কাছে পৌঁছেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম হুদুদ বেগ দেবীর দণ্ড হাতে পেয়ে গেছে এবং সেটিকে জাগিয়ে তুলেছে। বিপুল এক শক্তি যে শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছে তার সুস্পষ্ট আভাস পাচ্ছিলাম প্রকৃতির মধ্যেই। সেই মুহূর্তে আমি এও বুঝতে পেরে গেছিলাম যে আমার কোনও শক্তিই হুদুদ বেগের ওপরে কাজ করবে না। কোনও মন্ত্র, কোনও তন্ত্র কাজ করবে না। কিন্তু দেবীর দণ্ড তো ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিতেই হবে। নয়তো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। তা হলে উপায় কী? উপায় একটাই, কৌশল। একমাত্র কৌশল করেই ওকে আটকাতে হবে। আমার মন বলল, আমি পারব। আর ঈশ্বরও তাই চান। নয়তো দণ্ড হাতে পেয়েও আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য হুদুদ বেগ থেকে যাবে কেন? তোমাদের ভাষায় ওর এই ‘মুভ’টাই আমাকে প্রত্যয়ী করে তুলল। আমি বুঝতে পারলাম, অবচেতনে ও আমাকে ওর সমকক্ষ ভাবতে শুরু করেছে। ও যে হালাকু খাঁ-র পুনর্জন্ম, ওকে সামনে থেকে না দেখেই আমি বলে দিয়েছিলাম, সেইটাই আসলে ওকে অবাক করেছিল। ও আমাকে দেখাতে চাইছিল যে দেখো, তুমি আমাকে আটকাতে পারলে না। ওর এই অহংই ওর কাল হল। আমি সেই অহংটাতেই খোঁচা দিলাম। প্রথম থেকেই ওকে অপমান করতে শুরু করলাম। বারে বারে বুঝিয়ে দিতে লাগলাম তুমি কেউ নও। কিচ্ছু নও। আমি তোমার থেকে অনেক শক্তিশালী। ঠিক তখনই রঘুনাথ দাদা দুর্গামন্ত্র গেয়ে উঠলেন। অমিয় আর দীপক জয় মা বলে চিৎকার করে উঠল আর আমাদের ওই সম্মিলিত বিশ্বাসের জোর ফাটল ধরিয়ে দিল ওর প্রত্যয়ে। এক লহমার জন্য হলেও ও ভাবল, আমি ঠিক বলছি। হয়তো সত্যিই শক্তি হারিয়েছে দেবীর দণ্ড। সেটা পরখ করতেই ও নরকের দরজা খুলতে উদ্যত হল। আমি ঠিক এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিলাম। কারণ ওই প্রক্রিয়াতে চূড়ান্ত মনঃসংযোগের দরকার হয়। তখন সাধকের সমস্ত শক্তি ওখানে ঘনীভূত হয়। সাধকের স্থানজ্ঞান, কালজ্ঞান লোপ পায়। কিছুক্ষণের জন্য পারিপার্শ্বিকের ওপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। সেই জন্যই তখন সহচরদের ওপর থেকে হুদুদ বেগের মায়া কেটে গিয়েছিল। ওরা সিংহ থেকে মানুষে পরিণত হয়েছিল। সবাইকে শুনিয়ে সহদেবকে কড়া কথা বললেও আমি তার মনে মনে বলেছিলাম, আমার ওপর রাগ কোরো না। তোমাকে আমার লাগবে। ঠিক সময়ে তোমাকে আমি ডেকে নেব। মনে মনে কথা বলতে হয়েছিল কারণ গর্ভগৃহে বসেও হুদুদ বেগ আমার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপরে নজর রাখছিল। কিন্তু আমার মন সে পড়তে পারেনি। ওইটুকু আমার সাধনা। আমার গুরুর কৃপা। এই মন পড়তে না পারার ব্যাপারটাই ওকে ভেতরে-ভেতরে একটু দুর্বল করে তুলেছিল। যাই হোক, যেখানে ছিলাম, হুদুদ বেগ নরকের দরজা খুলতে গিয়ে যেই না ব্যস্ত হয়ে পড়ল আমি রঘুনাথ দাদা আর সহদেবকে সংকেত দিলাম। রঘুনাথ দাদা দুর্গাস্তব করতে শুরু করলেন। হুদুদ বেগের মনঃসংযোগ ব্যাহত হল, ওর বেশি সময় লাগতে শুরু করল আর সেই মুহূর্তে সহদেব এল বেড়ালের মতো নিঃশব্দে। খুবই সোজা এবং খুবই তুচ্ছ একটি পদ্ধতিতে দেবীর দণ্ড ছিনিয়ে নিল। বিরাট, বিপুল শক্তির এই একটিই দুর্বলতা। সে ভাবে আঘাত আসবে বিপুল, বিরাট আকার নিয়েই। এই ভাবেই তো যুগে যুগে, দেশে দেশে বিপ্লব সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষুদ্র মানুষের অসন্তোষকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না আর সেই স্ফুলিঙ্গই একদিন দাবানলের জন্ম দেয়। হুদুদ বেগ ভাবতেই পারেনি এমনটাও হতে পারে। ব্যস এটুকুই। পেলে ব্যাখ্যা? এ বার পল্লবের পাঠকেরা খুশি হবে তো?’
অপালা হাসল, ‘আলবাত খুশি হবে দাদু।’
সমীরণ বললেন, ‘তবে তাদের একটা আফশোস কিন্তু থেকেই যাবে। তারা বলতে পারে, এমন অলৌকিক একটা অস্ত্র হুদুদ বেগের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে স্যার যদি কিছু অলৌকিক উপায় অবলম্বন করতেন ভাল হতো। এ তো বড্ড সেরিব্রাল হয়ে গেল।’
‘কে বলল অলৌকিক হয়নি? অলৌকিক হয়েছে স্যার।’
‘কী ভাবে?’
‘ওই সেরিব্রাল মুভটাই তো অলৌকিক। ওই কঠিন সময়ে শুধুমাত্র মাথা ঠান্ডা রেখে হুদুদ বেগকে ভুল পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করাটাই তো আশ্চর্য এবং অলৌকিক। অলৌকিক এক নার্ভের লড়াই। যেখানে তন্ত্র, মন্ত্র কিচ্ছু কাজ করে না, সেখানে কাজ করে একমাত্র বুদ্ধিমত্তা। মানুষের এই বুদ্ধির বিকাশটাই তো সবচেয়ে অলৌকিক। দাদুই তো বলেন, এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো অলৌকিক হল মানুষের বুদ্ধিমত্তা, ইনটেলিজেন্স।
মিটিমিটি হাসতে লাগলেন ভাদুড়িমশায়। এতগুলো বুদ্ধিমান মানুষের মাঝে বসে থাকতে তাঁর ভালো লাগছে। আরাম লাগছে।
বিকেলের দিকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন সমীরণ, সহদেব আর রঘু ঠাকুর। ওরা যেতে বাকিরা এসে বসল লাইব্রেরি ঘরে। দেবীর দণ্ড রাখা আছে এই লাইব্রেরি ঘরেরই একটা আলমারিতে। সে দিকে তাকিয়ে পল্লব বলল, ‘স্যার, দণ্ড তো পাওয়া গেল। এ বার? কী ভাবে ফিরিয়ে আনবেন তিতাসকে?’
ঠিক এইখানটায় এসেই বার বার আটকে যাচ্ছেন ভাদুড়িমশায়। তিতাসকে ফিরিয়ে আনার জন্যই এত কিছু কিন্তু তিতাসকে ফেরাতে গেলে যে পল্লবকে হারাতে হবে। সেটা কী ভাবে সহ্য করবেন তিনি? কিন্তু আর কোনও রাস্তাও খুঁজে পাচ্ছেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করার জন্য আমাকে একটু সময় দাও। একটু ভেবে নিতে দাও। নরকের দরজা খুলে হয়তো ফেলতে পারব কিন্তু তার পরে? তিতাসকে কী ভাবে পাব? কী ভাবেই বা ফিরিয়ে আনব তার জন্য আমাকে একটু পড়াশোনাও করতে হবে। দেখে নিতে হবে মেসোপটেমিয়ান তন্ত্রের প্রক্রিয়াগুলো। আমি জানি পল্লব তুমি কতটা অস্থির হয়ে আছ। দুটো দিন দাও। তার বেশি সময় আমি নেব না।’
ভাদুড়িমশায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ল পল্লব, ‘এ ভাবে বলবেন না স্যার। আমি লজ্জিত আমি আপনাকে দোষারোপ করেছিলাম। তখন আসলে আমার মাথার ঠিক ছিল না। কিন্তু আমি জানি, পারলে আপনিই পারবেন তিতাসকে উদ্ধার করে আনতে। দু’দিন কেন, আপনার যত দিন সময় লাগে আপনি নিন। এত দিন অপেক্ষা করছি, আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে পারব।’
পল্লবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন ভাদুড়ি মশায়। না চাইতেও গলার কাছটা টনটন করে উঠল রোশনির। মনে হল, পল্লব কি কোনও দিন তার জন্যেও এমন আকুল হয়ে অপেক্ষা করবে? কেউ এমন ভাবে অপেক্ষা করে আছে জানলে তো হারিয়ে গিয়েও সুখ।
এক এক করে লাইব্রেরি ঘর থেকে বেরিয়ে এল ওরা। ভাদুড়ি মশায় একা বসে রইলেন তাঁর প্রিয় ইজি চেয়ারটায়। ভাবতে লাগলেন, কী অদ্ভুত জিনিস এই ঘৃণা! ঘৃণা থেকে যে প্রতিশোধের সৃষ্টি হয় এক জন্মে তার শেষ হয় না। প্রজন্মান্তরে বাহিত হয় সেই অন্ধকার। এই ঘৃণা থেকে আরোগ্যের উপায় কী? মুক্তির উপায় কী?
শ্রীরঞ্জনী বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে পল্লব বলল, ‘চলো রোশনি। বেরোতে হবে। চল সঞ্জয়।’
সঞ্জয় আজ পল্লবের বাড়ি যাবে। রোশনিকে গলফ ক্লাব রোডে নামিয়ে ওরা যাবে বাঁশদ্রোণী। কাল সকাল থেকে রোজকার কাজ শুরু করতে হবে। অপালার গবেষণার কাজ আছে। সঞ্জয়কে পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করতে হবে। অফিসে যেতে হবে রোশনিকে। অনেক দিন সে অফিস যায়নি। লিখতে হবে পল্লবকে। একটা সিরিজের চিত্রনাট্য অর্ধেক লেখা হয়ে পড়ে আছে। প্রযোজক তাড়া দিচ্ছেন। আর যেতে হবে বনগাঁ। তারিকের আম্মিকে বলতে হবে, ‘আপনার ছেলেটা বড়ো ভালোমানুষ ছিল।’
তিতাস নেই বলে জীবনের গতি স্লথ হয়েছে বটে কিন্তু থেমে তো থাকবে না। জীবন কারও জন্য থেমে থাকে না। অমিয়ও জানে সে কথা। রোজের কাজ তো সেও দিব্যি করে চলেছে। কিন্তু মনে মনে জানে, সে আসলে একটা ভাঙা মানুষ। মিতুল আর তার সঙ্গে কথা বলে না। মিতুল কি আর কোনও দিন কথা বলবে? কোনও দিন ক্ষমা করবে তাকে? মিতুল কি আদৌ বুঝবে সে রাতে অমিয়র কিছু করার ছিল না!
সন্ধে হয়েছে। পল্লবের গাড়িটা ভাদুড়িমশায়ের বাড়ির গেট পেরিয়ে বড়ো রাস্তায় পড়ল। কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাঘাট ভেজা। তাতে প্রতিফলিত হতে লাগল ব্যাকলাইটের লাল আলো। গাড়িটা যতক্ষণ না চোখের আড়াল হয় দাঁড়িয়ে রইল অপালা। তার পরে গেট লাগিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। অমিয় আর দীপক পালও চলে গেছেন অনেকক্ষণ। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ছায়াময় হয়ে রইল শ্রীরঞ্জনী বাড়ির গেটের বোগেনভিলিয়ার ঝাড়। তখনই খোঁড়াতে-খোঁড়াতে গেটের সোজাসুজি রাস্তার উলটো পাড়ে এসে দাঁড়াল একটা লোক। একদৃষ্টে সে তাকিয়ে রইল গেটের নাম ফলকটার দিকে। সেখানে লেখা আছে, শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। বুকের কাছে হাতজড়ো করে সে অস্ফুটে বলল, ‘পেন্নাম গুরুদেব। আপনার শিষ্য লোকনাথ চক্কোতি হাজির। দণ্ডটা যে আপনি খুঁজে বার করবেন এ আমি জানতাম। অনেক দিন ধরে আপনার ওপরে নজর রেখে বসেছিলাম। অবশেষে পাওয়া গেল দণ্ডটা। অপরাধ নেবেন না গুরুদেব, ওইটে আমার লাগবে। চাইলে তো আপনি দেবেন না। তাই চুরি করতে হবে। নরকে যেতে হবে আমায়। তেরোটার মধ্যে আর একটা মাত্র বাচ্চারে মারা বাকি। তারে জ্যান্ত উপহার দিতে হবে নরকের পাহারাদারদের। তবেই তো তারা আমার আর্জি শুনবে। মরে যাওয়া একটা মানুষরে আমি বাঁচিয়ে তুলতে পারব। ওইটেই তো আমার সাধনা। এই বারে আমার সিদ্ধি হবে। কৃপা করবেন গুরুদেব আপনার শিষ্য যেন কৃতকার্য হয়। সবই গুরুকৃপা। সবই গুরুকৃপা।’
(মধ্যপর্ব সমাপ্ত)
