লাপিস লাজুলি – ১
॥ এক ॥
ফেব্রুয়ারি, ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ
শীতের বিকেল। টাইগ্রিস নদীর জল হলুদ হয়ে গেছে। নদীর জল হলুদ হওয়া মানেই সন্ধে আসছে গুটিগুটি পায়ে। তাঁবুর প্রবেশপথ উন্মুক্ত। সেখান থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে টাইগ্রিস। নদীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন হালাকু খাঁ। জোলো হাওয়া কাঁপন ধরাচ্ছে হাড়ে কিন্তু তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই হালাকুর। জ্ঞান হওয়া ইস্তক যুদ্ধ করছেন তিনি। যুদ্ধ তো শুধু মানুষের সঙ্গে হয় না, এক জন সৈনিককে যুদ্ধ করতে হয় প্রকৃতির সঙ্গেও।
নভেম্বর মাসে রওনা দিয়েছিলেন বাগদাদের উদ্দেশে। এটা ফেব্রুয়ারি। চার মাস কেটে গেছে পথে পথেই। কখনও মধ্যদিনের মরুভূমির তীব্র দাহ, কখনও শেষ রাতে গিরিকন্দরের তুষারপাত। ক্ষতবিক্ষত করেছে বার বার তাও ভালো বর্ষার মুখোমুখি হতে হয়নি। সে আরও যন্ত্রণার।
শারীরিক কষ্টকে কোনও দিনই আমল দেন না হালাকু। কিন্তু এই আঘাতটা বেশ গভীর। শীতে সাধারণত ক্ষত দ্রুত শুকোয় কিন্তু এ বার কিছুতেই সারছে না। আর এই ঝামেলায় মদ খাওয়ায় রাশ টানতে হয়েছে। সেটাই সবচেয়ে বেশি বিরক্তির কারণ। সারাদিনে তিন জালা মদ্যপান করতেন হালাকু। সেটা এই শেষ পনেরো দিনে দুই জালায় এসে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসক একেবারেই মদ্যপান না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ক্রুদ্ধ হালাকু চিকিৎসকের একটি কান কেটে নিয়েছেন। আরও একটি কান কাটতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই চিকিৎসক বলেছেন, ‘দিনে এক জালা কমিয়ে দিলেই চলবে।’
সেটা শুরুতে বললেই হতো। খামোখা এক কান কাটা গেল বৃদ্ধের।
একটু কাত হতেই ক্ষতস্থানটা ফের টাটিয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল হালাকুর। নামটা মনে পড়লেই রাগে কপালের রগ দুটো টনটন করে ওঠে। কারা সোঙ্কোর। বাগদাদের এক সেনাপ্রধান। লোকটা কিপচাক। ইউরেশিয়ান স্তেপের বাসিন্দা। নীল চোখ, সোনালি চুল। বংশানুক্রমে যুদ্ধব্যবসায়ী। বহু দূর থেকে এসে বাগদাদের খলিফার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিল। উদ্ধত, দুর্বিনীত, গোঁয়ার। হালাকুর প্রিয়পাত্র সুলতানচুক, যাকে হালাকু সুলচুক বলে ডাকেন, প্রথমে এই কারাকেই পত্র দিয়েছিল। সুলচুক লিখেছিল,
‘কারা সোঙ্কোর, তুমি আর আমি একই জাতের মানুষ। যুদ্ধ আমাদের পেশা। এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে দৌড়ে বেড়িয়েছি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। শত্রুর তির আমাদের রক্তাক্ত করেছে, পথশ্রম করেছে ক্লান্ত। অবশেষে আমি আশ্রয় পেয়েছি সম্রাটের চরণকমলে। তিনি আমার দায়িত্ব নিয়েছেন। আমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন। আমি তোমায় পরামর্শ দিচ্ছি, প্রাণের মায়া করো আর সম্রাটের কাছে আত্মসমর্পণ করো। তোমার আত্মসমর্পণ তোমার সন্তানদের দীর্ঘজীবী করুক।’
মোঙ্গোল সম্রাট মোংকে খাঁ-র তরফে সেনাপতি হালাকু খাঁ-র নির্দেশে এই পত্র প্রেরিত হয়েছিল। উত্তরে সরাসরি হালাকুকে আক্রমণ করে কারা সোঙ্কোর লিখেছিল,
‘সুলতানচুক, তোমার হালাকু খাঁকে বলে দাও, বাগদাদ আক্রমণ করে সে বিরাট বড়ো ভুল করেছে। এত দিনে সে যা যা ক্ষতি করেছে, তার জন্য যদি ভুল স্বীকার করে আর সেনাবাহিনী নিয়ে হামাদানে ফিরে যায় তা হলে আমি খলিফার কাছে অনুরোধ করতে পারি যাতে তিনি হালাকুকে ক্ষমা করেন।’
সুলচুক চিঠিটা নিয়ে এসেছিল হালাকুর কাছে। চিঠিটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন হালাকু। প্রথম যখন মোংকে খাঁ-র তরফ থেকে বাগদাদের খলিফা আল মুস্তাসিনকে চিঠি দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছিল, খলিফা বলেছিলেন, ‘বাগদাদের গায়ে হাত পড়লে সারা দুনিয়ার মুসলমান এক হয়ে মোঙ্গোলদের বিরুদ্ধে লড়বে। ভারত থেকে পূর্ব আফ্রিকা এক হয়ে শাস্তি দেবে মোঙ্গোলদের।
হালাকু জানতেন তেমন কিছুই হবে না। হয়ওনি। যাতে না হয় সেইজন্যই তো আক্রমণের সময় হিসেবে এই শীতকালটা বেছে নেওয়া। শীত বড়ো মারাত্মক ঋতু। ভারত আর আফ্রিকা থেকে না কি মুসলমানেরা আসবে বাগদাদকে বাঁচাতে! আগে প্রাণ, তবে না বেরাদরি। কিন্তু কারার চিঠিটার মধ্যে এই অবান্তর আস্ফালন ছিল না। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ছিল না। যা ছিল, তার নাম প্রত্যয়। চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন হালাকু। সুলচুককে বলেছিলেন, ‘এই লোকটার মাথা চাই।’
সেলাম করে সুলচুক চলে গেছিল। মনে মনে লোকটার সাহসের তারিফ করেছিলেন হালাকু খাঁ। হালাকু বুঝেছিলেন, এই লোকটা বেগ দেবে। আর তাই হয়েছে। কারার ছুড়ে দেওয়া তলোয়ার সোজা গেঁথে গেছিল হালাকুর কাঁধে। নিজে হাতে লোকটার মাথা কেটেছেন ঠিকই কিন্তু এই ঘা আর শোকাচ্ছে না।
মোঙ্গোলরা পশ্চিমের দিকে এগিয়ে আসছে শুনেই দাওয়াতদার অর্থাৎ খলিফার সেনাপতি মুজাহিদুদ্দিন আইবক এই কারা সোঙ্কোরকে নিয়েই পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল। মোঙ্গোলদের সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল সুলতানচুক আর বোকা তেমুর। বাগদাদ থেকে তখন আর মাত্র ২৫ মাইল দূরে মোঙ্গোলরা, আচমকাই ঝড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাগদাদি সৈন্যরা। তাদের আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে কানে তালা ধরে গেছিল বোকা তেমুরের। অন্তত তেমুর তাই বলেছিল হালাকুকে। অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা মোঙ্গোলরা পিছু হটেছিল। পালাতে-পালাতে সুলতানচুক আর বোকা তেমুর পেছন ফিরে দেখেছিল একটা উঁচু পাথরের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে কারা সোঙ্কোর। হাতে খোলা তলোয়ার। টাইগ্রিস থেকে আসা হাওয়ায় উড়ছে তার অন্য হাতে ধরা খলিফার চিহ্ন দেওয়া পতাকা। চিৎকার করে কারা বলেছিল, ‘সুলতানচুক, হালাকুর পোষা ইঁদুর, হালাকুকে বলে দিস, কারা সোঙ্কোর অপেক্ষা করছে হালাকুর জন্য। আমার হাতে মরলে তবেই হালাকুর পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে।’
মাথায় আগুন উঠে গেছিল সুলতানচুকের। ফিরে যেতে চেয়েছিল আবার। হ্যাঁচকা টানে তাকে নিজের দিকে ফিরিয়েছিল বোকা তেমুর, ‘মাথা খারাপ না কি? লোকটা এখন রক্তের নেশায় পাগল হয়ে আছে। হালাকু ছাড়া ওকে কেউ আটকাতে পারবে না।’
প্রাণ হাতে করে টাইগ্রিসের ও’পারে হালাকুর কাছে পালিয়ে এসেছিল সুলচুকরা। তখনও টাইগ্রিস পেরোননি হালাকু। টাইগ্রিসের ও’পারেই শিবির ফেলেছিলেন। হালাকুর নির্দেশে অশ্বারোহী ছুটেছিল পুবে। কিছু দূরেই শিবির ফেলেছে হালাকুর অতি অনুগত আর এক অনুচর বাইজু নয়ান। সন্ধের আগেই সে এসে হাজির হয়েছিল হালাকুর শিবিরে। ঢক ঢক করে এক জালা মদ শেষ করে হালাকু উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। তার পরে বেরিয়ে এসেছিলেন শিবিরের বাইরে। রক্ষীর হাত থেকে ভল্লটা নিয়ে আমূল গেঁথে দিয়েছিলেন মাটিতে। সুলচুক, তেমুর আর বাইজুর বিস্ফারিত দৃষ্টির দিকে চেয়ে আত্মপ্রসাদে ভরে উঠেছিল হালাকুর মনটা। কারণ ধারালো দিকটা নয়, হালাকু মাটিতে গেঁথে দিয়েছেন ভল্লের ভোঁতা দিকটা। শরীরে মত্ত হাতির বল না থাকলে এ সম্ভব নয়। অনুচরদের দিকে তাকিয়ে হালাকু বলেছিলেন, ‘আগামীকাল সকালে আমরা খলিফার সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করব আর সন্ধের আগেই ভল্লের এই ফলায় শোভা পাবে কারা সোঙ্কোরের মাথা।’
পরের দিন ১৭ জানুয়ারি বন্যার জলের মতো, দাবানলের আগুনের মতো, পঙ্গপালের মতো মোঙ্গোল সেনা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাগদাদি সেনাদের ওপরে। ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছিল বাগদাদি সেনা। বেগতিক দেখে আগেই পালিয়েছিলেন দাওয়াতদার মুজাহিদুদ্দিন আইবক। প্রায় ১২ হাজার বাগদাদি সেনা কচুকাটা হয়েছিল সে দিন। কিন্তু হালাকুর আশঙ্কা সত্যি করে বাঘের মতো লড়াই করেছিল কারা সোঙ্কোর। হালাকুর মতো যোদ্ধাকেও শেষ মুহূর্ত অবধি জমি ছাড়েনি সে। কিন্তু হালাকু খাঁ, চেঙ্গিজ খাঁ-র দৌহিত্রর সামনে দাঁড়াতে পারে এমন যোদ্ধা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে নেই। তাই শেষ অবধি হার মানতে হয়েছিল কারাকে। ভারী তলোয়ারটা কারার বুকে হাতল অবধি গেঁথে দিয়েছিলেন হালাকু। মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়েছিল দীর্ঘ দেহটা। বিজয় গর্বে এক মুহূর্তের জন্য অসতর্ক হয়েছিলেন হালাকু আর তাতেই জাত চিনিয়ে দিয়েছিল কিপচাক যোদ্ধা। আচমকা হাঁটুর ওপরে উঠে বসে নিজের তলোয়ারটা ছুড়ে দিয়েছিল হালাকুর দিকে তার পরে আবার আছড়ে পড়েছিল মাটিতে বেড়ালের ক্ষিপ্রতা হালাকুর, শেষ মুহূর্তে একটু হলেও সরে যেতে পেরেছিলেন। তাই কাঁধে গেঁথে গেছিল তলোয়ারটা। নয়তো কারা সোঙ্কোরের পাশে তাঁর মৃতদেহটাও পড়ে থাকত টাইগ্রিসের পাড়ে।
বড্ড জ্বালাচ্ছে ঘা-টা। একটু শুতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু এখন শুলে চলবে না। খলিফা আল মুস্তাসিনের মেজো ছেলে আবদুল রহমান তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছে। অবশেষে ভয় পেয়েছেন খলিফা। হালাকুর মন বলছে, আজ ওরা সন্ধি প্রস্তাব নিয়েই আসবে। সুলচুক আর তেমুর তাকে আনতে গেছে। হালাকু এসব খাতিরদারিতে বিশ্বাস করেন না। তাঁর কাছে পৃথিবীতে দু’টি মাত্র জাত। বিজিত আর পরাজিত। বাগদাদিরা হারতে বসেছে। আত্মসমৰ্পণ ছাড়া ওদের সামনে আর কোনও রাস্তা খোলা নেই। ওদের এত সম্মান দেওয়া মোটেই উচিত না। কিন্তু কিছু করার নেই। সম্রাট মোংকে খাঁ-র নির্দেশ আছে, খলিফা এবং তাঁর অনুচরদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। যারা আত্মসমর্পণ করবে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। যুদ্ধবন্দিদের যথাযত সম্মান দিতে হবে।
এত ‘হবে আর হবে’ শুনলেই হালাকুর মাথা গরম হয়ে যায়। ভাই হালাকুকে হাড়ে হাড়ে চেনেন মোংকে। তাই তাঁর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন বোকা তেমুরকে। তেমুর বিচক্ষণ। হঠকারিতা করে না। সে হালাকুকে কিছুটা হলেও সামলাতে পারবে।
হালাকুর সেনাবাহিনীতে বোকা তেমুর সম্রাটের সরাসরি নির্বাচন। তাই শুরু থেকেই তার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ঔদ্ধত্য ছিল। বাকি দুই অনুচর সুলতানচুক আর বাইজু নয়ানের মতো আনুগত্য ছিল না তার। ছোটো থেকে যুদ্ধ করলে কী হবে, হালাকু নিজেও তো রাজপরিবারের সন্তান। রাজমহলের অন্দরের রাজনীতি তিনি ভালোই বোঝেন। তিনি গোড়াতেই বুঝেছিলেন, বোকা তেমুরকে বশ করতে গেলে তাকে চমকে দিতে হবে। ভয় পাওয়াতে হবে। তবেই হালাকু নিজের মতো করে সেনা পরিচালনা করতে পারবেন। নয়তো সারাক্ষণই সম্রাটের এক অদৃশ্য ফতোয়া তাঁর মাথার ওপর ঝুলবে। সম্রাট মোংকে খাঁ-কে যে হালাকু অপছন্দ করেন এমন নয়। হালাকু মোঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এক যোদ্ধা। সম্রাট যেই হোন না কেন হালাকুর তাতে কিছু এসে যায় না। তিনি সিংহাসনের প্রতি দায়বদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নিজের মর্জির মালিক। সেখানে তিনিই সম্রাট। তাঁর কথাই শেষকথা। তখন ডিসেম্বরের গোড়ার দিক। কুর্দ পর্বত পেরিয়ে কিরমানশানে শিবির স্থাপন করেছেন হালাকু। বাগদাদ তখনও বেশ খানিকটা দূর। খলিফার চিঠি এল, ‘ভালো চাইলে ফিরে যাও।’
হালাকু পালটা চিঠি দিলেন, ‘এত দূর এসে আপনাকে না দেখে ফিরে যাব খলিফা? আপনি, আপনার দাওয়াতদার আর আপনার নগরপ্রধানকে নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করুন। কবে আসছেন জানান। আমি কিরমানশানে আছি। আপনি নাই আসতে পারেন, তবে যদি না আসেন জানবেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কারণ আমার আনুগত্য শুধু পরম করুণাময়ের প্রতি। আপনার দিনার বা দিরহামের প্রতি নয়।’
এই চিঠির জবাবে খলিফার সেনা আক্রমণ করল মোঙ্গোলদের। হালাকু প্রস্তুত ছিলেন। বেশির ভাগ সেনাকে আগেই সরিয়ে নিয়ে গেছিলেন কুর্দ পর্বতের গিরিখাতগুলির মধ্যে। সামনে রেখেছিলেন খুবই অল্প সংখ্যক সেনা। আর সেই ফাঁদেই পা দিয়েছিল খলিফার সেনারা। আক্রমণ করে ফেলার পরে তারা বুঝতে পারল ভুল হয়ে গেছে। কুর্দের গোপন গিরিখাত থেকে তখন পিলপিল করে বেরিয়ে আসছে মোঙ্গোলরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ। প্রায় হাজার জন বাগদাদি যুদ্ধবন্দি হল। তেমুর বলল, ‘সম্রাট বলে দিয়েছেন যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে যথাযথ ব্যবহার করতে হবে।’
হালাকু বললেন, ‘সে তো জানি কিন্তু সামনে লম্বা পথ। প্রথমে বাগদাদ, তারপর দামেস্ক তারপর কায়রো। এই যাত্রাপথে আরও অনেক লোক যুদ্ধবন্দি হবে। এত লোকের দায়িত্ব আমরা নেব কী ভাবে? এদের তো আমরা সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্তও করতে পারব না। আবার ছেড়েও দিতে পারব না। তা হলে?’
‘এদের আমরা দাস হিসেবে দেশে পাঠিয়ে দিতে পারি।’
‘তা হয়তো পারি, কিন্তু প্রতি দশ জন দাস পিছু অন্তত দু’জন পাহারাদার দরকার। তাই না?’
‘হুম।’
‘কিন্তু আমি তো খুব হিসেব করেই সেনা নিয়ে এসেছি তেমুর। তার থেকে যদি এতগুলো লোক ফিরে যায় খুবই মুশকিল।’
‘ঠিকই, তা হলে কী করা যায় খাঁ? সম্রাট কিন্তু বার বার বলে দিয়েছেন…’
‘আরে জানি জানি। সম্রাট কী বলে দিয়েছেন সে কথা আমার মাথায় আছে। কিন্তু অবস্থা বুঝে তবে তো ব্যবস্থা। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তাতে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না।’
‘কী বুদ্ধি খাঁ,’ সোজা হয়ে বসেছিল তেমুর।
তেমুরের চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় হালাকু বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে কেউ বন্দি হলে তবেই না তার প্রতি যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে, তাই না? কিন্তু কেউ যদি বন্দি না হয়?’
‘মানে,’ অবাক হয়েছিল তেমুর।
‘এসো, দেখাচ্ছি।’
বোকা তেমুরকে নিয়ে শিবিরের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন হালাকু। হাঁক দিয়েছিলেন, ‘বাইজু, সুলচুক। যুদ্ধবন্দিদের এক জায়গায় দাঁড় করাও।’
তেমুর অবাক হয়ে গেছিল, কী করতে চাইছে লোকটা? সম্রাট আলাদা করে ডেকে বলে দিয়েছিলেন, ‘খুব সাবধান। হালাকু পাগল আছে। তাই বলে ভেবো না ওর বুদ্ধি নেই। যাদের গায়ে বেশি জোর হয় তারা মাথায় একটু খাটো হয়। হালাকু কিন্তু তা নয়। ওর মাথার জোর গায়ের জোরের থেকে কোনও অংশে কম না। যা করবে বুঝেশুনে। ও যেন বুঝতে না পারে ওর গতিবিধির ওপরে নজর রাখার জন্যই আমি তোমাকে নিযুক্ত করেছি।’
এর আগে তেমুর কখনো হালাকুর সঙ্গে যুদ্ধে যায়নি। এই প্রথম বার তেমুর ভাবছিল, ‘হালাকু কি যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেবে? কিন্তু একটু আগে নিজেই বলল, এদের ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তা হলে?’
ততক্ষণে যুদ্ধবন্দিদের এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে ফেলেছে বাইজু, সুলচুকরা। ব্যবস্থাপনা দেখে হাসি ফুটল হালাকুর মুখে। বললেন, ‘তোমরা দাঁড়াও। আমি আসছি।’
এই বলে চলে গেছিলেন শিবিরের ভেতর দিকে চোখের আড়ালে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দাঁড়ালেন যুদ্ধবন্দিদের থেকে বেশ খানিকটা তফাতে। গলা তুলে বললেন, ‘আমি গোড়াতেই তোমাদের খলিফাকে আত্মসমর্পণ করতে বলেছিলাম। তিনি যদি বুদ্ধিমান হতেন তা হলে আমাদের এত যুদ্ধই করতে হত না। যাই হোক, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। তোমরা আমাদের হাতে বন্দি হয়েছ। আগামী দিনে আরও অনেকে আমাদের হাতে বন্দি হবে। কিন্তু এত লোকের দায়িত্ব নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমি তোমাদের মুক্তি দেব।’
কথা শেষ হওয়া মাত্রই একটা গুঞ্জন উঠল বন্দিদের মধ্যে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেই গুঞ্জন পরিণত হল জয়ধ্বনিতে, ‘জয়, হালাকু খাঁ-র জয়।’
বন্দিরা নতজানু হয়ে বসে পড়ল। হালাকুর এই হঠকারিতায় ততক্ষণে বিরক্ত তেমুর। এরা যতই জয়ধ্বনি দিক, মুক্তি পাওয়া মাত্র আবার আক্রমণ করার ষড়যন্ত্র করবে। যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেয় কোন বুরবক! সে বলতে গেল, ‘খাঁ…’
হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন হালাকু। তার পরে রণভেরির মতো গম্ভীর অথচ তীক্ষ্ণ হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘জেনারেল জুয়ো কান।’
নামটা শুনেই চোখাচোখি হয়ে গেল সুলচুক আর বাইজু নয়ানের মধ্যে। বহু বছর তারা দু’জন হালাকুর সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হালাকু কী করতে পারেন তার আন্দাজ আছে তাদের। ধনুকে শরযোজনা করল তারা আর বোকা তেমুরকে স্তম্ভিত করে দিয়ে প্রচণ্ড শব্দ করে দূরে শিবিরের পেছন দিক থেকে উড়ে এল ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র। আছড়ে পড়ল যুদ্ধবন্দিদের ওপরে। বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল বেশিরভাগ বন্দি আর যারা তৎক্ষণাৎ মরল না, সারা গায়ে জ্বলন্ত আগুন নিয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিল। যেন এটারই অপেক্ষায় ছিল বাইজু আর সুলচুক। তাক করে করে জ্বলন্ত দেহগুলোতে তির ছুঁড়তে শুরু করল তারা। সারা গায়ে আগুন নিয়ে এক বন্দি ছুটে এল হালাকুর দিকে। চোখের নিমেষে তার গলা কেটে নিলেন হালাকু আর একটু সরে দাঁড়ালেন। জ্বলন্ত স্কন্ধকাটাটি আরও কয়েক কদম এগিয়ে মাটিতে পড়ে ধড়ফড় করতে করতে স্থির হয়ে গেল। ফুরিয়ে যাওয়া কামানের গোলার মতো জ্বলন্ত মাথাটা গড়াতে গড়াতে তেমুরের পায়ের কাছে এসে পড়ল। সব মিলিয়ে মিনিট দশেক। সব যন্ত্রণা, সব কোলাহল থেমে গেল তার পরে। মাঠ জুড়ে পড়ে রইল কাতারে কাতারে দগ্ধ দেহ।
হাত কচলে হালাকুর কাছে এসে দাঁড়াল জেনারেল জুয়ো কান। সাড়ে চার ফুট লম্বা কুতকুতে চোখের এই লোকটাকে হালাকু আমদানি করেছেন চিন দেশ থেকে। এই লোকটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ক্ষেপণাস্ত্রের কৌশল। জুয়ো কানের পিঠ চাপড়ে দিলেন হালাকু, ‘শাবাশ।’
প্রভুর প্রশংসায় গলে গিয়ে যেন আরও বেঁটে হয়ে গেল লোকটা। তখনই দূর আকাশে কয়েকটা কালো বিন্দু দেখা গেল। শকুনের দল আসছে। মানুষ পোড়া গন্ধ তাদের ডেকে আনছে। তারা আসছে মহাভোজের আশায়।
থরথর করে কাঁপছিল তেমুর। সে নিজেও যুদ্ধ ব্যবসায়ী। মানুষ মারতে তারও হাত কাঁপে না। কিন্তু তা বলে একসঙ্গে এক হাজার লোককে এভাবে মেরে ফেলা যায়! তার পরেও এত নির্বিকার থাকা যায়! তেমুরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন হালাকু। কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘কী? কেমন বুদ্ধিটা করলাম বলো? এ বার থেকে আমরা আর কাউকে বন্দি করব না। সবাইকে মেরে ফেলব। সম্রাটের হুকুমের অন্যথা করার দরকার পড়বে না। শোনো বোকা তেমুর, আমি জানি সম্রাট কেন তোমাকে আমার সঙ্গে পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমার সঙ্গে থাকতে গেলে যে আমার লোক হয়েই থাকতে হবে। এখন থেকে তুমি আর সম্রাটকে আলাদা করে কোনও খবর দেবে না। যা বলার আমি বলব। বুঝেছ?’
ঘাড় নেড়েছিল তেমুর। সে ভয় পেয়েছিল। বুঝে গেছিল, চালাকি করতে গেলে হালাকু তাকে খুন করে দেবে আর তখন কোনও সম্রাট তাকে বাঁচাতে আসবে না। হালাকু আরও বলেছিলেন, ‘তেমুর, তুমি ভেবো না সম্রাটের প্রতি আমার আনুগত্য নেই। আমি তোমার থেকে বেশি অনুগত। কিন্তু কী বলো তো, যারা মাঠে নেমে কাজ করে আর যারা সেটার তদারকি করে, এই দুই দলের মধ্যে তফাত আছে। যারা তদারকি করে তারা অনেক ক্ষেত্রে হুকুম দিয়েই খালাস। কিন্তু কাজটা তো আমাদের করতে হয় তাই না? তাই আমি আমার নিয়মে কাজ করব আর আমার দলে থাকতে গেলে তোমাকেও সেটাই মেনে চলতে হবে। সুলচুক, আমি মদ খাব।’
গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে শিবিরের ভেতরে ঢুকে গেছিলেন হালাকু। নিশ্চিন্ত লাগছিল খুব। আর কেউ বেয়াদপি করার সাহস পাবে না। হালাকু খাঁ আসলে কী সেটা সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য জয় করতে হবে। হয়ে উঠতে হবে মোংকে খাঁ-র পরে মোঙ্গোল সিংহাসনের যোগ্যতম দাবিদার।
বসে বসে এসবই ভাবছিলেন হালাকু। এমন সময় তাঁবুর দরজায় এসে দাঁড়াল তেমুর। সেলাম করে বলল, ‘খাঁ, আবদুল রহমান এসে পড়েছে। তাকে কি ভেতরে নিয়ে আসব?’
এক ঝলকে তাঁবুর ভেতরটায় চোখ বুলিয়ে নিলেন হালাকু। এলোমেলো হয়ে আছে। ক্ষতস্থান পরিষ্কার করার জন্য গরম জলের পাত্র, কাপড়ের টুকরো ছড়িয়ে আছে এদিক-সেদিক। শত্রু যতই দুর্বল হোক, তাকে ক্ষতস্থান দেখানো বুদ্ধিমানের কাজ না। বললেন, ‘না, বাইরে বসার ব্যবস্থা করো। আমি আসছি।’
মাথা নেড়ে তেমুর চলে গেল। হাতের ইশারায় রক্ষীদের ভেতরে ডাকলেন হালাকু। উঠতে-বসতে কষ্ট হচ্ছে। তাদের সাহায্যে গায়ে চাপিয়ে নিলেন আলখাল্লার মতো পোশাকটা। মাথায় চাপালেন রাজকীয় উষ্ণীষ। কঠিন মুখে বেরিয়ে এলেন বাইরে। আচমকাই একটা জোর হাওয়া দিল টাইগ্রিসের দিক থেকে। একটু যেন শীত করে উঠল হালাকু খাঁ-র।
