লাপিস লাজুলি – ২
॥ দুই ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
সকাল বেলা। শ্রীরঞ্জনী বাড়ির বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছিল সঞ্জয় আর পল্লব। খুবই ভালো কফিটা কিন্তু স্বাদ পাচ্ছিল না দু’জনের কেউই। ভাদুড়িমশায় আশা দিয়েছেন বটে কিন্তু বিষয়টা নিয়ে যতই ভাবছে তত বেশি করে হতাশা গ্রাস করছে ওদের। তিতাসকে উদ্ধার করতে গেলে খুঁজে বার করতে হবে দেবী ইনান্নার দণ্ড। এমন একটা জিনিস যার অস্তিত্ব আছে শুধু উপকথায়। যেমন ড্রাগন কিংবা ইউনিকর্ন। আচমকাই কফির কাপটা ঠক করে টেবিলে নামিয়ে রাখল পল্লব। বলল, ‘খ্রিস্টের জন্মের আগে তিন হাজার আর এদিকে দু’ হাজার মানে মোট পাঁচ হাজার বছর ধরে কেউ ইনান্নার দণ্ড খুঁজে পায়নি। আর আমরা সেটা পেয়ে যাব? এটা ছেলেমানুষি হয়ে যাচ্ছে না সঞ্জয়? যত সময় যাচ্ছে আমি না আশা হারিয়ে ফেলছি। কেন আমাদের সঙ্গেই বার বার এমন হয় বলতে পারিস? এই টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে দাঁড়িয়ে তিতাস নরকে চলে গেল! কোথায়? এই নরকটা কোথায়?’
বলতে বলতেই ভেঙে পড়ল পল্লব। তার চোখ উপচে নেমে এল অশ্রু। ধরা গলায় সে বলল, ‘আমি আর পারছি না ভাই। তিতাস কী করছে? কেমন আছে? কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। স্যার বলছেন, তিতাস বেঁচে আছে। কিন্তু নরকে গেলে মানুষ বেঁচে থাকে কী করে? মরে গেলে তবে না মানুষ স্বৰ্গ বা নরকে যায়। মানে তাই তো শুনে এসেছি ছোটোবেলা থেকে।’
পল্লবের হাতের ওপর হাত রাখল সঞ্জয়, ‘স্যার তো বললেনই এটা লোকনাথের প্রয়োগ করা তন্ত্রের এফেক্ট।’
চশমা খুলে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ মুছল পল্লব। সঞ্জয় দেখল, এই ক’দিনে পল্লবের চোখ দুটো যেন কোটরে ঢুকে গেছে। রাজ্যের ক্লান্তি দু’চোখে। বোঝা যাচ্ছে, ছেলেটা একফোঁটাও ঘুমোয়নি। হঠাৎই দপ করে জ্বলে উঠল ক্লান্ত চোখ দুটো। দাঁতে দাঁত চেপে পল্লব বলল, ‘এই লোকনাথ লোকটাকে যদি একবার হাতের সামনে পেতাম না সঞ্জয়!’
নিষ্ফল আক্রোশে দেওয়ালেই ঘুসি মেরে বসল সে আর ঠিক তখনই নীল বাতি জ্বালিয়ে একটা সাদা ফরচুনার এসে দাঁড়াল শ্রীরঞ্জনীর গেটের সামনে। সামনের দরজা খুলে নেমে এল একটা লম্বা লোক। পরনে কালো কোট-প্যান্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। পেছনের দরজা খুলে দিল সে। সেই দরজা দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল একটা মাঝবয়সি ছোটোখাটো মিষ্টি মতো লোক। আচমকা একটা নীল বাতিওয়ালা গাড়ি দেখে পল্লব আর সঞ্জয় দু’জনেই একটু থতিয়ে গেছিল। অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়েছিল তারা। মিষ্টি মতো লোকটার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। অল্প হেসে লোকটা বলল, ‘ভাদুড়ি স্যার এখন বাড়িতেই আছেন আশা করি?’
লোকটাকে একটু চেনা-চেনা লাগল সঞ্জয়ের। কোথায় যেন দেখেছে। ঘাড় নেড়ে সে বলল, ‘হ্যাঁ।’
কালো কোটকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকে এল মিষ্টি মতো লোকটা। দরজার সামনে জুতো খুলতে খুলতে খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘স্যার ডেকে পাঠিয়েছিলেন। স্যারকে একটু খবর দেওয়া যাবে? বলবেন, সমীরণ এসেছে।’
লাইব্রেরি ঘরে বসে অপালার সঙ্গে কথা বলছিলেন ভাদুড়িমশায়। পল্লব দরজায় টোকা দিল, ‘স্যার, সমীরণ বলে এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’
একটু যেন চমকেই উঠলেন ভাদুড়িমশায়। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন, ‘সমীরণ! এত সকালে,’ তার পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘ও কোথায়? চলো, আমি যাচ্ছি ওর কাছে।’
অপালা বলল, ‘তুমি আবার যাবে কেন দাদু? ওঁকে এখানে ডেকে নিলেই হয়।’
ইজিচেয়ার থেকে উঠতে উঠতেই ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘সমীরণ আমার ছাত্রসম ঠিকই কিন্তু চেয়ারের তো একটা ওজন আছে দিদিভাই। সমীরণ বসাক, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব। দ্য ফরেন সেক্রেটারি অব ইন্ডিয়া। ওকে সমাদর করে নিয়ে আসাই উচিত।’
ফরেন সেক্রেটারি সাতসকালে এই বাড়িতে! পল্লবের মুখটা হাঁ হয়ে গেল।
***
ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘তুমি যে আজই এবং এত সকাল-সকাল আসবে আমি বুঝতে পারিনি। তা হলে আমি সকলকে তৈরি হয়ে থাকতে বলতাম।’
হাতজোড় করে সমীরণ বললেন, ‘লজ্জা দেবেন না স্যার। আমি পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে তো আপনার কাছে আসিনি। নেহাত প্রোটোকল, নয়তো আমি এই নীল বাতিওয়ালা গাড়িটাও নিতাম না। দেহরক্ষীদেরও আনিনি। শুধু আব্বাস সবসময় আমার সঙ্গে থাকে। ওকে বাদ দিয়ে আমার কোথাও যাওয়ার হুকুম নেই। ও আমার চিফ সিকিউরিটি অফিসার।’
কালো কোট নমস্কার জানাল। প্রত্যুত্তরে হাতজোড় করল বাকিরাও। পল্লব, সঞ্জয়, অপালা তো রাতে এ বাড়িতে ছিলই। অমিয় আর দীপক পালও এসে পড়েছেন পল্লবের ফোন পেয়ে। মিতুলকে আনা হয়নি। সে এখন আগের চেয়ে একটু সুস্থ কিন্তু ট্রমাটা কাটেনি।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সমীরণ বললেন, ‘ভোর সাড়ে চারটের ফ্লাইটটা ধরলাম স্যার। আসলে বিকেল তিনটে থেকে আমার একটা মিটিং আছে। কানাডার সঙ্গে একটা কনফিউশন হয়েছে, সেটা নিয়েই। আপনার সঙ্গে কথা বলেই আমি রওনা দেব।’
ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘তোমাকে আমি খুব ব্যতিব্যস্ত করলাম তাই না? আসলে বড়ো বিপদে পড়ে আমি তোমার শরণাপন্ন হয়েছি।’
সমীরণ তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়িমশায়ের দিকে। মানুষটাকে যত দেখেন তত অবাক হন। লোকটার পাহাড়ের মতো ক্ষমতা, অথচ এমন মাটির মতো বিনয়! ভাদুড়ি স্যার বলছেন, ‘শরণাপন্ন হয়েছি!’ কার কাছে, না সমীরণ বসাকের কাছে! যে সমীরণ বসাকের অস্তিত্বই থাকত না নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি না থাকলে! মনে মনে সমীরণ বললেন, ‘আপনি জানেন না স্যার, আপনি চাইলে আমি জীবনও দিতে পারি। কারণ এ জীবন যে আপনারই দেওয়া।’
সমীরণ নিরামিষাশী। এ তাঁর গত তিরিশ বছরের অভ্যেস। এ দিকে তাঁর স্ত্রী হরমনপ্রীত পাঞ্জাবি। তিনি সাংবাদিক। এখনও বিয়ের আগের পদবি ব্যবহার করেন, কউর। কউর মানে রাজকন্যে, প্রিন্সেসও হতে পারে আবার সিংহী, লায়নেসও হতে পারে। হরমনপ্রীত পরেরটা। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রচণ্ড মাংসাশী। আঠেরো বছর বিয়ে হয়েছে তাঁদের এবং আজও রাতে খাওয়ার সময় তাঁদের এই একটা বিষয় নিয়েই ঝগড়া হয়। হরমনপ্রীত আজও বিশ্বাস করেন, এক দিন তিনি সমীরণকে মাংস খাওয়াতে পারবেন।
গতকালও খাওয়ার সময় ঝগড়া করছিলেন দু’জনে। এমন সময় ফোন বেজে উঠেছিল। মোবাইলের স্ক্রিনে ভাদুড়ি স্যারের ল্যান্ডলাইন নম্বরটা দেখে অবাক হয়েছিলেন সমীরণ। বছরে তিনটে দিন সমীরণ নিয়ম করে এই নম্বরটায় ফোন করেন। গুরুপূর্ণিমায়, শিক্ষক দিবসে আর বিজয়া দশমীতে। কিন্তু স্যার তো কখনো ফোন করেন না। তবে কি কোনও বিপদ হল? দ্রুত হাতে ফোন ধরেছিলেন, ‘বলুন স্যার। আপনি ঠিক আছেন তো?’
‘হ্যাঁ, সুস্থ আছি। তুমি এক বার আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে? একটু জরুরি।’
গলাটা শুনেই অস্বস্তি হয়েছিল সমীরণের। কেমন যেন অস্থির শোনাচ্ছিল গলাটা। কথা না বাড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমি এসাপ দেখা করছি স্যার।’
‘ভাল থেকো,’ বলে, ফোন কেটেছিলেন ভাদুড়িমশায়।
চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়েছিলেন হরমনপ্রীত। গলা শুনেই বুঝেছিলেন জরুরি ফোন। সমীরণ বলেছিলেন, ‘ভাদুড়ি স্যার দেখা করতে বলছেন। মনে হল খুব জরুরি দরকার। আমি ভাবছিলাম সকালেই যদি চলে যাই? কিন্তু কাল সকালে তো তোমারও জরুরি মিটিং। কী করি বলো তো?’
একটু আমতা-আমতা করেই কথাটা বলেছিলেন সমীরণ। কারণ সকালে মেয়ে অনন্যার স্কুলে পেরেন্ট-টিচার মিটিং আছে। মেয়ের যাবতীয় কিছু হরমনপ্রীতই সামলান। কাল সকাল থেকে হরমনপ্রীতের অফিসেও খুব জরুরি একটা বৈঠক আছে বলে এই প্রথম বার সমীরণকে যেতে বলেছেন। কিন্তু এক মুহূর্ত না ভেবে হরমনপ্রীত বলেছিলেন, ‘তুমি চলে যাও কলকাতা। আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। খুব জরুরি কিছু না হলে স্যার এভাবে তোমায় নিজে ফোন করে ডাকতেন না।’
কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠেছিল সমীরণের চোখে। পঞ্চনদের দেশের মেয়ে হরমনপ্রীত। নদীর ধারের জমি যেমন সুজলা সুফলা হয়ে থাকে হরমনপ্রীতও তাঁর জীবনটাকে তেমন ফুলে-ফলে ভালোবাসায় ভরিয়ে রেখেছেন। তখনই ফোন করে আব্বাসকে বলে দিয়েছিলেন এয়ার টিকিট বুক করতে।
নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়িকে কখনও সামনে থেকে দেখেননি হরমনপ্রীত। কিন্তু তিনি জানেন, এই মানুষটা না থাকলে সমীরণ তাঁর জীবনে আসতেন না। সমীরণকে বড়ো ভালোবাসেন তিনি। সমীরণের কাছে বহু বার শুনেছেন, কী ভাবে সেই অন্ধকার দিনগুলো থেকে তাঁকে আলোয় নিয়ে এসেছিলেন ভাদুড়িমশায়। তিনি সমীরণের অর্ধাঙ্গিনী। সেই আধাআধি ভাগের সূত্র ধরেই ভাদুড়িমশায়ের প্রতি তিনিও কৃতজ্ঞ।
খুব গরিব ঘরের ছেলে সমীরণ। বাঙাল। বসিরহাটে বাড়ি। চার ভাই এক বোন। সমীরণ বড়ো। বাবা হাঁপানির রুগি। দু’বেলা ঠিকমতো খাওয়া জুটত না কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই মাথাটা খুব সাফ ছিল সমীরণের প্রেসিডেন্সি কলেজে ভরতি হয়েছিলেন জিওগ্রাফি নিয়ে। টিউশন পড়িয়ে সংসার চালাতেন আর স্কলারশিপের টাকায় চলত পড়াশোনা। মোটামুটি সামলে নিয়েছিলেন। দিব্যি চলছিল। হঠাৎ করেই অদিতি নামে এক জুনিয়রের প্রেমে পড়লেন। যেমন-তেমন প্রেম নয়, ভয়ানক প্রেম। অদিতিকে দেখলেই গলা শুকিয়ে যায়। হাত-পা কাঁপে। রাতের পর রাত ঘুম আসে না। পাতার পর পাতা কবিতা লেখেন। লেখেন প্রেমপত্র। তাতে ছড়িয়ে দেন সুগন্ধি। কিন্তু সে সব লেখা অদিতির কাছ অবধি পৌঁছোয় না। দেরাজের এক কোণে লুকিয়ে পড়ে থাকে। মুখচোরা লাজুক ছেলে সমীরণ। সাহসই নেই অদিতির সামনে দাঁড়িয়ে মনের কথা বলার। শেষমেষ বন্ধুদের চাপাচাপিতে এক দিন প্রপোজ করে ফেললেন অদিতিকে। কোনও উত্তর না দিয়ে অদিতি চলে গেল। পরে এক বান্ধবী মারফত বলে পাঠাল, ‘অত নাটা ছেলের সঙ্গে কেউ প্রেম করে না কি!’
কষ্ট পেয়েছিলেন সমীরণ। তাঁর উচ্চতা পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। সমীরণ জানতেন তিনি বেঁটে মানুষ। কিন্তু যাকে ভালোবেসেছেন, যার কথা ভেবে রাত জেগেছেন, স্বপ্নবাসর রচনা করেছেন, হেমন্তবাবুর গান শুনে চোখের জল ফেলেছেন সে যখন শুধুমাত্র উচ্চতার কারণে প্রত্যাখ্যান করে, তখন কষ্ট হয় বই কী। খুব কষ্ট হয়। বুকটা ভেঙে যায়। তার থেকেও বেশি ভেঙে যায় আত্মবিশ্বাস।
গুটিয়ে গেছিলেন সমীরণ। কোনও মেয়ের দিকেই আর চোখ তুলে তাকাতেন না। নিজেকে বুঝিয়েছিলেন, তিনি আসলে প্রতিবন্ধী। সুন্দর, উজ্জ্বল প্রজাপতির মতো মেয়েদের দিকে তাকানোর অধিকার তাঁর নেই। পাওয়া তো দূরের কথা। এ পৃথিবীতে অসুন্দর মানুষ কারও ভালোবাসা পায় না। এ সব ভেবে আরও বেশি করে পড়াশোনায় নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে ক্ষতটা একটু একটু করে সবে সারিয়ে তুলেছেন, ঠিক সেই সময় ঝড়ের মতো এসে পড়ল আর একটা প্ৰেম।
মেয়েটির নাম প্রিয়ংবদা চ্যাটার্জি। ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী। ডাকসাইটে সুন্দরী। সবাই প্রিয়-প্রিয় বলে ডাকে। খুব বলিয়ে-কইয়ে মেয়ে। রাজনীতি করে। ডিবেট করে। কলেজের তাবড় তাবড় ছেলেরা প্রিয়র প্রেমে পাগল। সেই প্রিয়ংবদা কি না সমীরণকে প্রপোজ করে বসল! কেউ যদি এসে বলত, ‘সমীরণ, আজ থেকে তুমি প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব সামলাবে,’ তা হলেও সমীরণ এত অবাক হতো না।
প্রথম তিন মাস পর্যন্ত সমীরণ ভাবতেন প্রিয়ংবদা মজা করছে। তিনি নাটা মানুষ, তাঁর সঙ্গে মজা করাই যায়। কিন্তু প্রিয়ংবদার ব্যবহারে আন্তরিকতার কোনও অভাব ছিল না। সে সমীরণকে নিজের বাড়ি নিয়ে গেছিল। বাবা-মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল প্রেমিক বলে। এসব ১৯৯০-৯১ সালের কথা। তখনও প্রেম ব্যাপারটা এত খোলামেলা ছিল না। কিন্তু প্রিয়ংবদাদের পরিবার ছিল উদার। সমীরণকে যথেষ্ট সমাদর করেছিলেন তাঁরা। প্রিয়ংবদার বাবা রাজস্ব বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী, ধর্মপ্রাণ মানুষ। আহ্নিক না করে জলগ্রহণ করেন না। লেখাপড়ার সমঝদার। মা ছবি আঁকেন। সমীরণের রেজাল্ট দেখে খুবই প্রীত হয়েছিলেন তাঁরা। সমীরণকে জামাই বলে ডাকতে শুরু করেছিলেন। ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন সমীরণও। প্রিয়ংবদাকে নিজের বাড়িতেও নিয়ে গেছিলেন। প্রিয়ংবদা অত বড়োলোকের মেয়ে কিন্তু সমীরণদের দীনের কুটিরেও তার কোনও আড়ষ্টতা ছিল না। মেঝেতে মায়ের পাশে বসে খুব আনন্দ করে শিমের ভর্তা, বাঁধাকপির পাতা বাটা আর শুঁটকি মাছ খেয়েছিল। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসটাও ফিরে আসছিল। সমীরণের মনে হচ্ছিল, উচ্চতাই তাঁর একমাত্র যোগ্যতা নয়। প্রাণ ঢেলে ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন প্রিয়ংবদাকে। শুধু একটা জায়গায় খটকা ছিল। সে সময় নর-নারীর শারীরিক সম্পর্ক সহজলভ্য ছিল না। বিয়ের আগে তো নয়ই। তবু পুরুষমানুষ আর মেয়েমানুষ কাছাকাছি এলে, তার ওপরে যদি তাদের মধ্যে প্রেম থাকে, একটা উত্তাপ তো তৈরি হয়। প্রিয়ংবদার কাছে এলে সেই উত্তাপটা টের পেতেন না সমীরণ। কীসের যেন একটা সূক্ষ্ম আবরণ তৈরি করে রাখত প্রিয়ংবদা। কিন্তু এই ব্যাপারটাকে জোর করেই মাথায় আসতে দিতেন না সমীরণ। মনকে বোঝাতেন, রুচিশীল মেয়েরা এমনই হয়। শরীর তো রইলই সারাজীবনের জন্য।
এই ভাবে দু’বছর কেটে গেল। কলেজ থেকে সমীরণ আর প্রিয়ংবদা দু’জনেই ভর্তি হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর কিছু দিন পরেই এমএসসি ফাইনাল ইয়ার। ঠিক তখনই একদিন সমীরণের বিশ্বাসের পৃথিবীটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল।
ইউনিভার্সিটি থেকেই আরও কয়েক জন ছাত্রের সঙ্গে সমীরণ বর্ধমানে গেছিলেন একটা সেমিনারে যোগ দিতে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে দিন সাতেক ধরে চলবে সেমিনার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর মারা যাওয়াতে এক দিন সেমিনার হল না। একটা দিন ছুটি পাওয়া গেছে, ছুটতে ছুটতে চলে এলেন কলকাতা। তখন এমন অবস্থা, একটা দিনও প্রিয়ংবদাকে না দেখলে ভালো লাগে না। ইউনিভার্সিটি এসে দেখলেন প্রিয়ংবদা আসেনি। খবর না দিয়েই সোজা হাজির হলেন প্রিয়ংবদাদের বাড়ি। সারপ্রাইজ দিতে এবং পেতে কার না ভালো লাগে! কিন্তু সমীরণকে দেখেই মুখ শুকিয়ে গেল দারোয়ানের। সে বলল, ‘স্যার আর ম্যাডাম বাড়ি নেই। দিদি ঘুমোচ্ছে। এখন ভেতরে যাওয়া যাবে না।’
কেমন যেন কু ডেকেছিল সমীরণের মনে। জোর করে ভেতরে ঢুকে গেছিলেন কিন্তু থমকে গেছিলেন প্রিয়ংবদার ঘরে ঢুকতে গিয়ে। দরজা বন্ধ আর ঘরের ভেতর থেকে প্রিয়ংবদার গলা পাওয়া যাচ্ছে। পাওয়া যাচ্ছে একটা ছেলের গলাও। কথা বলছে না তারা। আওয়াজ করছে। নিজে কোনও দিন সঙ্গম না করলেও একটা একুশ বছরের ছেলের সঙ্গমের শব্দ চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয়। সমীরণেরও হয়নি। পাথরের মতো ওখানেই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সম্বিৎ ফিরেছিল দরজা খোলার শব্দে। তাঁকে দেখে প্রিয়ংবদার কী অভিব্যক্তি হয়েছিল তা তিনি আজও জানেন না। কারণ তিনি দেখছিলেন প্রিয়ংবদার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটিকে। গ্রিক দেবতার মতো দেখতে ছেলেটি অন্তত ছ’ফুট লম্বা।
প্রিয়ংবদা কেন তাঁকে ঠকিয়েছে তার উত্তর সে দিনই পেয়ে গেছিলেন তিনি কিন্তু দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রিয়ংবদা কেন এত নিখুঁত অভিনয় করেছিল তার উত্তর পেতে আরও চার বছর সময় লেগেছিল।
ভেতর থেকে পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছিলেন সমীরণ। ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। ইউনিভার্সিটি ছেড়ে বাড়ি চলে এসেছিলেন। আসক্ত হয়ে গেছিলেন ড্রাগে। মায়ের চোখের জল শুকোত না। দিনরাত গালাগাল দিতেন প্রিয়ংবদাকে, ‘রাক্ষুসি, আমার জুয়ান ছেলেডারে ছিবড়ে করে দিল।’
এমনই একটা সময় সমীরণের জীবনে দেবদূত হয়ে দেখা দিয়েছিলেন নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। সমীরণদের পাড়াতে মন্ত্র দিতে এসেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। রামদাস ঠাকুরের ঋত্বিক তিনি। গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন মন্ত্র দিতে। সমীরণের মা আছড়ে পড়েছিল তাঁর পায়ের কাছে, ‘আমার ছেলেডারে বাঁচান ঠাউর। আমি শুনেছি আপনার অনেক ক্ষমতা।’
সমীরণের মায়ের কান্না দেখে বোধ হয় মায়া হয়েছিল ভাদুড়িমশায়ের। সমীরণদের বাড়িতে এসেছিলেন। সে দিনটা আজও মনে আছে সমীরণের। সবেমাত্র তখন নেশা করেছেন। নেশা ছড়িয়ে পড়ছে রক্তের মধ্যে। দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন দীর্ঘদেহী মানুষটা। এগিয়ে এসে সমীরণের মাথায় হাত রেখেছিলেন। এত দিনের সমস্ত জ্বালা, অশ্রদ্ধা, অপমান, বঞ্চনা সব যেন জুড়িয়ে জল হয়ে গেছিল। নেশা ছুটে গেছিল এক মুহূর্তে। সমীরণের মাথায় হাত রেখে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন ভাদুড়িমশায়। তার পরে চোখ খুলে বলেছিলেন, ‘তুমি উত্তর চাও তাই না? মেয়েটি কেন এমন প্ৰবঞ্চনা করল, কেন তোমায় দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহার করল না জানা অবধি শান্তি পাচ্ছ না তাই না বাবা?’
চমকে উঠেছিলেন সমীরণ। এ কী ভাবে সম্ভব? তাঁর মনের গোপনে, গহিনে লুকিয়ে থাকা কথাটা এই ভদ্রলোক কী ভাবে জানলেন? এ যে অলৌকিক! কাঁদতে-কাঁদতে মানুষটার পা জড়িয়ে ধরেছিলেন সমীরণ। বলেছিলেন, ‘আপনি কে আমি জানি না। কিন্তু আমায় উদ্ধার করুন। আমি ডুবে যাচ্ছি। ডুবে যাচ্ছি আমি।’
সমীরণের কান্না থামা অবধি অপেক্ষা করেছিলেন ভাদুড়িমশায়। বলেছিলেন, ‘উত্তর পেতে গেলে তো মেয়েটিকে লাগবে। আমাকে নিয়ে যেতে পারবে মেয়েটির কাছে?’
নিয়ে গেছিলেন সমীরণ। পুরোনো বন্ধুদের সাহায্যে পাঁচ মিনিটের জন্য প্রিয়ংবদার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছিলেন। প্রিয়ংবদা তত দিনে কলেজের প্রফেসর হয়ে গেছে। কফি হাউজে সমীরণকে দেখে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেছিল, ‘কী চাই?’
আগে থেকেই সমীরণের একটা হাত ধরে ছিলেন ভাদুড়িমশায়। আচমকা খপ করে প্রিয়ংবদারও একটা হাত ধরে নিয়েছিলেন। একটা ছোট্ট মানব শৃঙ্খল তৈরি হয়েছিল। মৃদু একটা কম্পন অনুভব করেছিলেন সমীরণ। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল সিনেমার মতো কিছু দৃশ্য। যেগুলোকে জুড়ে জুড়ে সব উত্তর পেয়ে গেছিলেন সে দিন। যে ছেলেটিকে প্রিয়ংবদার ঘরে দেখেছিলেন, তার নাম প্রতীক ডিসুজা। বাবা গোয়ানিজ, মা বাঙালি। দেশের বিখ্যাত তিনটে আর্ট গ্যালারির মালিক। প্রতীকের পছন্দ হয়েছিল প্রিয়ংবদাকে। প্রিয়ংবদাও প্রতীকের প্রেমে পাগল। কিন্তু বেঁকে বসেছিলেন প্রিয়ংবদার বাবা। খ্রিস্টান ছেলের সঙ্গে মেয়ের সম্পর্ক তিনি মেনে নেননি। দু’জনের দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ হতে বসেছিল। প্রতীক প্রিয়ংবদার মাকে থ্রেট দিয়েছিল, প্রিয়ংবদাকে না পেলে সে তাদের আর্ট গ্যালারি থেকে প্রিয়ংবদার মায়ের আর কোনও ছবি বিক্রি করবে না। তখন মেয়ের সঙ্গে বসে এই ষড়যন্ত্র করেছিলেন প্রিয়ংবদার মা। কলেজের কোনও ভালোমানুষ ছেলেকে শিখণ্ডী সাজিয়ে আনতে হবে বাবার সামনে। সে সামনে থাকবে, যাকে দেখে বাবা নিশ্চিন্ত হবেন আর যার আড়ালে লুকিয়ে চলবে প্রিয়ংবদা আর প্রতীকের নিষিদ্ধ প্রেম, ছবি আঁকিয়ে হিসেবে আরও নাম করবেন প্রিয়ংবদার মা। সমীরণ ছিলেন সেই শিখণ্ডী।
সমীরণকে নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের লাইব্রেরিতে গিয়ে বসেছিলেন ভাদুড়িমশায়। বলেছিলেন, ‘যে পরিবারে মা-মেয়ে মিলে বাবাকে ঠকায় তেমন পরিবারের অংশ যে তোমাকে হতে হয়নি তার জন্য ভাগ্যকে ধন্যবাদ দাও সমীরণ। নিজের উচ্চতা নিয়ে তোমার হীনমন্যতা আছে আমি জানি। কিন্তু মানুষের আসল উচ্চতা তার কর্মে। তার সাফল্যে। আমি তোমায় স্তোক দিচ্ছি না বাবা। কর্ম করো। নিজেকে এমন ভাবে তৈরি করো যেখানে শারীরিক উচ্চতা কোনও ভূমিকাই রাখবে না। আমি গুরুকৃপায় সামান্য শক্তি অর্জন করেছি। আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি, তোমার জীবনে সাফল্য আসবে। ভালোবাসাও আসবে। শুধু লক্ষ্য স্থির রেখে পরিশ্রম করে যাও। আর কোনও দেবতা মানুষের ডাকে সাড়া যদি নাও দেন, পরিশ্রমের দেবতা মানুষকে কখনো বিমুখ করেন না। আর হ্যাঁ, নেশা করতে গিয়ে শরীরে অনেক বিষ ঢুকেছে। পারলে একটা বছর নিরামিষ খেয়ো।’
সেই যে নিরামিষ খেতে শুরু করেছিলেন, আর ছাড়েননি সমীরণ। ভাদুড়ি মশায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত যেদিন ঝুঁকে তাঁর সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন, সেদিন বাড়ি ফিরে মনে মনে খুব হেসেছিলেন। রাশিয়ান ভদ্রলোক প্রায় সাত ফুট লম্বা।
আর ভালোবাসা? তা তিনি সত্যি পেয়েছেন। হরমনপ্রীত তাঁর থেকে অন্তত তিন ইঞ্চি লম্বা। কিন্তু ভালোবাসায় এক ইঞ্চিও ঘাটতি রাখেনি কোনও দিন। তা এই ভাদুড়িমশায়ের বিপদ শুনে কি চুপ করে বসে থাকতে পারেন সমীরণ? ব্যগ্র হয়ে বললেন, ‘কী বিপদ স্যার?’
ঘরে উপস্থিত সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে ভাদুড়িমশায় বললেন, ‘আমি তো আগেই একবার আলাপ করিয়েছি। ও আমার নাতনি অপালা। আর ও সঞ্জয়। ওদের দুজনের ইরাক যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। ওরা বাগদাদ যাবে। দু’দিনের মধ্যে। পারবে?’
কথাটা শুনেই সোজা হয়ে বসল সমীরণের চিফ সিকিউরিটি অফিসার আব্বাস। এই বৃদ্ধ যে আবদার করেছেন তা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। কারণ আইসিস এসে যাওয়ার পরে ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বিশেষ করে ইরাক এবং সিরিয়া যাওয়ার ট্যুরিস্ট ভিসা পাওয়া খুব শক্তই শুধু নয় প্রায় দুঃসাধ্য। সেখানে দু’দিনের মধ্যে বাগদাদ যাওয়ার ব্যবস্থা করা অসম্ভব। সে তাকাল সমীরণের দিকে। সমীরণের ভুরু কুঁচকে আছে। আব্বাস বুঝতে পারছে, এই বৃদ্ধ স্যারের খুবই আপনজন কিন্তু এই আবদার স্যার রাখবেন কী করে! শব্দ করে নিশ্বাস ফেললেন সমীরণ আর আব্বাসকে অবাক করে বলে উঠলেন, ‘পারব স্যার।’
হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘অপালা, সঞ্জয় তোমরা প্যাকিং করে নাও। আজই তোমাদের আমার সঙ্গে দিল্লি যেতে হবে। আমার তিনটে থেকে ইন্ডিয়ান এমব্যাসিতে মিটিং আছে। আমার দশটা নাগাদ বেরোলেও চলবে। তোমাদের হাতে আর চল্লিশ মিনিট আছে।’
