লাপিস লাজুলি – ৩
॥ তিন ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
শুয়ে শুয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়েছিল তারিক। রাত এখন তিনটে। শীত আজ বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। বিছানায় অঘোরে ঘুমোচ্ছে আব্বু। তার নাক ডাকার মৃদু শব্দ হচ্ছে। তারিক শুয়েছে মেঝেতে একটা কম্বল পেতে। গায়েও একটা পাতলা চাদর। মেঝে থেকে বেশ ঠান্ডা উঠছে। গায়ের চাদরেও ঠান্ডা মানছে না তেমন। কিন্তু আজকাল আর তারিকের কষ্ট হয় না। প্রথম প্রথম যখন এসব শুরু করেছিল তখন কষ্ট হত। এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। ইদানীং বরং খাটে শুলেই ঘুম আসতে চায় না। তিন বছর ধরে এই চর্চার মধ্যে আছে সে। সমস্ত রকম বিলাসব্যসন ত্যাগ করেছে। কঠোর এক কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। শুধু সেই নয়, তার আরও তিন বন্ধু। সইদুল, জুনেইদ আর ফারুক। তাদের একটা বড়ো স্বপ্ন আছে। যে স্বপ্নটাকে তারা তিন বছর ধরে খুব গোপনে লালন করছে। আজ সেই স্বপ্নটার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তারা। আর কিছুক্ষণ, তার পরেই তারা চার জন পা দেবে পবিত্র ভূমিতে। জীবন ধন্য হবে তাদের। আজ রাতে কি আর তারিকের চোখে ঘুম আসে! সে জেগে আছে একটা ফোনের অপেক্ষায়। ফোনের দিকে হাত বাড়াতে যাবে এমন সময় সেটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে, সইদুল কলিং। ফোনটা হাতে নিয়ে খুব সন্তর্পণে দরজাটা খুলে বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে এল তারিক। ততক্ষণে ফোনটা কেটে গেছে। রিং ব্যাক করার আগেই আবার ফোন এল। এবার দ্রুত ফোন ধরল সে, ‘বল।’
ও পাশ থেকে চাপা গলা ভেসে এল, ‘ফোন ধরছিস না কেন?’
‘আরে আব্বু পাশে ছিল।’
‘হুম। রেডি?’
‘হ্যাঁ।’
‘ঠিক আছে। বেরিয়ে পড়। ফার্স্ট বনগাঁ ধরব।’
‘আচ্ছা। রাখছি। স্টেশনে দেখা হচ্ছে।’
‘হুম।’
কেটে গেল ফোনটা। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল তারিক। বাড়ির সামনেই মাঠ। কিছু দিন আগেই মাঠের চারপাশে হ্যালোজেন লাইট লাগানো হয়েছে। সারারাত জ্বলে আলোগুলো। সকালবেলা কেউ-না-কেউ এসে বন্ধ করে দেয়। সামনের লাইটপোস্টে সুইচ করা আছে। বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল তারিক। হাত বাড়িয়ে লাইটপোস্টের সঙ্গে বাঁধা সুইচটা বন্ধ করে দিল। ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল চারপাশে আর তার সঙ্গেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল রাতের তারা ভরা আকাশ। তারাদের দিকে চেয়ে এক মুহূর্তের জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল তারিকের। এত দিনের চেনা বাড়ি, চেনা পাড়া, চেনা পথে কড়া নাড়া, চেনা আলো, চেনা অন্ধকার ছেড়ে চলে যেতে হবে কোন সুদূর বিদেশে। আর কোনও দিন ফিরে আসা হবে না। আম্মির হাতে ইদের বিরিয়ানি খাওয়া হবে না… আম্মির কথা ভাবতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তারিকের। যেটুকু দুর্বলতা গ্রাস করেছিল সেটুকু গুটখার থুতুর মতো ছুড়ে ফেলে দিল সে। আম্মিকে সে ঘৃণা করে। বহু বার বারণ করা সত্ত্বেও আম্মি তার কথায় কর্ণপাত করেনি। আজ চিরকালের মতো বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে সে ওই মহিলার সবচেয়ে সাধের জিনিসটা নষ্ট করে দিয়ে যাবে। পবিত্র ভূমিতে পৌঁছোনোর আগে সে একটা পবিত্র কাজ করে যাবে।
বাড়ির দিকে পা বাড়াল তারিক। সঙ্গে নেওয়ার মতো বিশেষ কিছুই নেই একটা ফাইল ছাড়া। ওই ফাইলেই আছে যাবতীয় জরুরি কাগজপত্র। পাসপোর্ট, ভিসা, কিছু স্ট্যাম্প সাইজের ছবি আর টাকাপয়সা। পরনেরটুকু ছাড়া জামাকাপড় কিছুই নেবে না সে। যদি কিছু লাগে দিল্লি থেকে কিনে নেবে। প্লাস্টিকে মুড়ে ফাইলটা লুকিয়ে রাখা আছে জলের ট্যাঙ্কের নীচে। ফাইলটা ব্যাকপ্যাকে ভরে তারিক নেমে এল নীচে। স্নিকারটা পায়ে গলিয়ে নিল। বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে এক মূহূর্তের জন্য থমকাল। বোনকে সে খুব ভালোবাসে। বরাবরের মতো চলে যাওয়ার আগে একবার বোনের মুখটা দেখতে ইচ্ছে করল। কিন্তু না। এই সব পিছুটান রেখে লাভ নেই। তার জীবনে এখন একটাই লক্ষ্য। যে লক্ষ্যের সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে তিন বছর আগে।
সইদুল, জুনেইদ আর তারিক ছোটোবেলার বন্ধু। এইচ এস অবধি এক স্কুলে পড়েছে। তারিক আর সইদুলের কলেজটা অবধি সেম। কলেজে উঠে তিন জনেই চলে এসেছিল হস্টেলে। তিন জনেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। জুনেইদের কলেজটা একটু দূরে কিন্তু রোজ বিকেলে কলেজের পর তিন বন্ধুতে আড্ডা দিত। ফারুককে নিয়ে এসেছিল সইদুল। ফারুক ওদের থেকে একটু বড়ো। সদ্য একটা মাদ্রাসায় অ্যাসিটেন্ট টিচারের চাকরি পেয়েছে। ফারুক ওদের একটা ওয়ার্কশপে নিয়ে গেছিল মহারাষ্ট্রের মাথেরানে। তার পরেই বদলে গেছিল ওদের তিন বন্ধুর জীবন।
সেই ওয়ার্কশপে ওদের মতো আরও কিছু ছেলে ছিল। সারা ভারত থেকে তারা এসেছে। মিল একটাই, প্রত্যেকে মুসলমান। তিনদিন ধরে ওয়ার্কশপ চলেছিল আর এই তিন দিনে ওরা বুঝতে পেরেছিল, গোটা দুনিয়া জুড়েই ইসলাম আজ বিপন্ন। আশার আলো দেখিয়েছিল যে আইসিস, ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া, তাকে অবধি কোণঠাসা করে দিয়েছে শত্রুপক্ষ। প্রিয় ধর্মের এই বিপদের দিনে কারা এগিয়ে আসবে? এগিয়ে
আসতে হবে তাদের মতো নওজোয়ানদের। যাদের রক্ত গরম, যাদের চোখে আগুন। খিলাফতের আওতায় আনতে হবে বিশ্বকে। গোটা দুনিয়াকে শাসন করবেন এক জন মাত্র খলিফা। ঘুরে দাঁড়াতে হবে আইসিস-কে। ওখান থেকেই আবার নতুন খিলাফতের সূচনা হবে। ইসলামের জয়পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে আবার। তার জন্য দিতে হবে আত্মবলিদান। তাদের যৌবনের বিনিময়ে মজবুত বনিয়াদের ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে আইসিস। ইতিহাসের পাতায় রক্তে লেখা থাকবে এই বিপ্লবীদের নাম। ভবিষ্যতের সমস্ত মুসলমানের কাছে তারা প্রাতঃস্মরণীয় হবে।
ঘোর লাগা চোখে ফিরে এল তিন বন্ধু। তাদের কাঁধে এখন গুরুদায়িত্ব। নতুন খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তার জন্য যেতে হবে পবিত্র ভূমিতে। সিরিয়া। ওয়ার্কশপ থেকে প্রচুর ভিডিয়ো নিয়ে এসেছিল তারা। একসঙ্গে বসে সেইসব দেখা শুরু হল। দুনিয়া জুড়ে কী ভাবে মুসলমানের ওপরে অত্যাচার হয়েছে এবং হচ্ছে তার জ্বলন্ত সব দলিল। দেখতে-দেখতে উত্তেজিত হয়ে উঠত তারা। ভিডিয়ো দেখা শেষ হলে খোঁজ শুরু হল ইন্টারনেটে। কম্পিউটারে তারিকের মাথা খুব সাফ। ডার্ক ওয়েব ঘেঁটে সে খুঁজে আনতে শুরু করল যুদ্ধ সংক্রান্ত নানা ভিডিয়ো, ছবি, আর্টিকেল। ফারুক পাঠাতে লাগল একের পর এক ইশতেহার। সিরিয়া থেকে আসে সে সব। সেখানে লেখা থাকে আইসিসের নতুন পরিকল্পনা। নতুন শপথ। থাকে গুপ্তচরদের হত্যা করার ছবি। পড়ার পরে সে সব পুড়িয়ে ফেলতে হয়। মনের মধ্যে এঁকে নিতে হয় ঘৃণা।
বইপত্রে ধুলো জমল। সাপ্লি আসতে লাগল একের পর এক সাবজেক্টে। কিন্তু কে কেয়ার করে তাতে? তিন বন্ধু মিলে এক দিন পুড়িয়ে ফেলল সব বইপত্র। সব ক’টা বই কাফেরদের লেখা। ও সব আর স্পর্শ করবে না তারা। শুরু হল নতুন করে আরবি শেখা। ফারুকের কাছে। শুরু হল কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন। সমস্ত রকম বিলাসব্যসন পরিত্যাগ করল তারা। তারা এক একজন যোদ্ধা। যোদ্ধাকে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে হয়। এখন থেকে সেটারই অভ্যেস শুরু। গরমকালে চলবে না পাখা, শীতে থাকবে না উষ্ণতা গান শোনা বা সিনেমা দেখার জন্য নয়, মোবাইল ব্যবহার হবে শুধুমাত্র যুদ্ধ সংক্রান্ত ভিডিয়ো দেখার জন্য। কঠিন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করতে হবে নিজেদের। তার থেকেও বড়ো কথা, পবিত্র ভূমিতে যাওয়ার আগে অন্তর পবিত্র করতে হবে। এমন কিছু করা যাবে না যা ইসলামে নাজায়েজ। নাপাক।
সেটা বলতে গিয়েই তো আম্মির সঙ্গে অশান্তি শুরু তারিকের। আম্মি বনগাঁতেই একটা বিউটি পার্লার চালায়। মেয়েদের এইসব সাজগোজ ইসলাম অনুমোদন করে না। তারিক বহু বার বলেছে পার্লারটা বন্ধ করে দিতে। কিন্তু আম্মি নাছোড়। এক দিন তো খুব ঝগড়া বেঁধে গেল। কথায় কথায় আম্মি ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল। বলল, ‘বড়ো হুজুর হয়েছ তুমি? বড়ো হুজুর? কে ঢোকাচ্ছে তোর মাথায় এসব ফালতু জিনিস? কে বলেছে মুসলমান মেয়েরা সাজতে পারবে না? ইসলাম একটা সুন্দর পৃথিবীর কথা বলে। যেখানে ছেলে-মেয়ে সবাই সমান। তোদের মতো কিছু ফালতু লোক ইসলামকে খারাপ করছিস। তোদের জন্য লোকে আমাদের গাল দেয়। সন্ত্রাসবাদী বলে। বুঝিস এগুলো? বুঝবি কী করে? লেখাপড়া তো চুকিয়ে দিয়েছিস। বেকার হয়ে বসে থাকবি বাড়িতে। আমাকেই তো গেলাতে হবে চার বেলা। তোর বাবার একার ইনকামে এই দামড়া খাসিকে টানতে পারব বলে মনে হয়? আমি পার্লার বন্ধ করব না। যা পারিস তুই করে নে।’
রাগে অন্ধ হয়ে আম্মিকে একটা ধাক্কা মেরে বসেছিল তারিক। আব্বু সেদিন রাস্তায় বার করে এনে জুতোপেটা করেছিল। সেই থেকে আম্মির সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছে সে। বাড়ি সে ফিরত না, নেহাত হস্টেল থেকে তাড়িয়ে দিল তাই। ফেল করলে কেনই-বা হস্টেলে রাখবে! ওই দিনের ঘটনার পর থেকে আরও ছটফট করতে শুরু করল তারিক। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিরিয়া যেতে হবে। ফারুককে বলল, ‘ব্যবস্থা করো।’
ফারুক তাদের থেকে এ সব ব্যাপারে অনেক বেশি জানে, কিন্তু কী ভাবে সিরিয়া গিয়ে আইসিসে যোগ দিতে হবে তা সে জানে না। যারা ওয়ার্কশপ করিয়েছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল ওরা। লাভ হল না। তারা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। বাকিরা তারিককেই দায়িত্ব দিল, একটা রাস্তা খুঁজে বার করতেই হবে। সেটা পাওয়া যাবে ইন্টারনেটেই। ইন্টারনেটের ব্যাপার তারিকই ভালো বোঝে। ডার্ক ওয়েবে যেসব অ্যাকাউন্ট থেকে যুদ্ধের ভিডিয়ো বা আইসিস সংক্রান্ত বক্তব্য পোস্ট হত, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করল তারিক। কিন্তু কেউ উত্তর দিল না। এই ভাবে কেটে গেল বছর দেড়েক। তারিক কিন্তু হাল ছাড়েনি। ক্রমাগত মেসেজ করে যাচ্ছে, ‘আমরা চার বন্ধু আইসিসে যোগ দিতে চাই। আইসিসের নতুন সূর্যোদয়ের অংশ হতে চাই।’
এমন সময় ইন্টারনেটের একটা প্রোফাইল নজর কাড়ল তারিকের। প্রোফাইলটার নাম, ‘চেরি ব্লসম’। তারিক লক্ষ করল, সে যে যে ভিডিয়োগুলো দেখে তার সব ক’টাতেই এই চেরি ব্লসম কমেন্ট করে। কমেন্টগুলোর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। আগুন আছে। এক দিন এই চেরি ব্লসমকেই ডিএম করে বসল তারিক। তারিক ভেবেছিল, কেউই উত্তর দেয় না। এও দেবে না। কিন্তু তারিককে অবাক করে উত্তর এল!
ধীরে ধীরে কথা শুরু হল চেরি ব্লসমের সঙ্গে। চেরি ব্লসম জানাল, সেও যেতে চায় পবিত্র ভূমিতে। খিলাফতের নির্মাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে চায়। কিন্তু কানেকশন পাচ্ছে না। তারিকও জানাল নিজের দুঃখের কথা। চেরি ব্লসম আশ্বস্ত করল, সে যদি কোনও কানেকশন পায় তারিককেও দেবে। চেরি ব্লসমের সঙ্গে কথা বলতে, ভাবের আদানপ্রদান করতে এমনিতেই খুব ভালো লাগত তারিকের কিন্তু এই ভালো লাগাটাই প্রেমে পরিণত হল যখন তারিক জানতে পারল, চেরি ব্লসম আসলে বাংলাদেশের মেয়ে। থাকে ইরাকে আর তার আসল নাম তানজিন নূর। সারাদিন ধরে কথা হতে লাগল দু’জনের মধ্যে। কিন্তু শুধুই চ্যাট। কেউ কারও মুখ দেখাল না। তানজিন বলল, এইটুকু সাবধানতা তো নিতেই হবে। যেদিন তারা সশরীরে সাক্ষাৎ করবে সেদিন একে অপরকে দেখবে। আশ মিটিয়ে দেখবে।
তারিক তাতেই রাজি। তার এই চব্বিশ বছরের জীবনে কেউ এত ভালোবাসা দেয়নি তাকে। বাড়তে লাগল প্রেমের গভীরতা। দু’জনেই বদ্ধপরিকর, একসঙ্গে প্রাণ দেবে যুদ্ধক্ষেত্রে। তাদের মিলন চিরকালীন হয়ে যাবে জন্নতে গিয়ে। তানজিন একদিন লিখল, ‘তুমি সত্যি তৈরি তো?’
তারিক লিখল, ‘তোমার সন্দেহ আছে কোনও?’
তানজিন লিখল, ‘এত দিনের পিছুটান ছেড়ে আসা তো সহজ নয় জান।’
তারিক লিখল, ‘তোমার জন্য আমি সব করতে পারি।’
‘আমার জন্য নয়, বলো খিলাফতের জন্য।’
‘হ্যাঁ, তাই। কিন্তু তুমিও আছ তানজিন। আমার জীবনে তোমার উপস্থিতি মারাত্মক। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
‘আমিও তোমায় ভালোবাসি জান। একসঙ্গে মরব আমরা।’
‘আমি তৈরি তানজিন।’
‘বেশ, তবে দেখা হচ্ছে সিরিয়ায়।’
‘মানে,’ চমকে উঠেছিল তারিক, ‘সিরিয়ায় দেখা হবে কী করে? তুমি কি কোনও কানেকশন পেয়েছ?’
‘পেয়েছি। আমি রওনা দিচ্ছি। সে তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’ আনন্দে পাগল হয়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল তারিকের। কিন্তু একইসঙ্গে ভয়ও গ্রাস করেছিল। সে লিখেছিল, ‘সত্যি আমাদের দেখা হবে তো? তুমি তো চলে যাচ্ছ। আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলব না তো?’
তানজিন লিখেছিল, ‘ভয় নেই জান। আমি ঠিক তোমাকে খুঁজে নেব।’
ওই শেষ কথা। তার পরেই চেরি ব্লসম অ্যাকাউন্টটা ডিলিট হয়ে গেছিল। ঠিক দু’দিন পরে একটা আইএসডি কল এসেছিল তারিকের ফোনে। ফোনের ও প্রান্ত থেকে একজন বলেছিল, ‘যারা যারা যেতে চাও সবাইকে এক জায়গায় করে জানিয়ো।’
তাই করেছিল ওরা চার জন। তারিক চলে গেছিল সইদুলদের বাড়ি। ফারুক এসেছিল কলকাতা থেকে। ওদের তিন বন্ধুর মধ্যে সইদুলকেই সবচেয়ে স্মার্ট লাগে তারিকের। সে আর জুনেইদ ইতিমধ্যেই বাড়িতে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সইদুল এখনও অবধি সবটা খুব সুন্দর করে ম্যানেজ করছে। সইদুলদের ছাদে বসেছিল ওরা। একটা ভিডিয়ো কল এসেছিল। লোকটার মুখ দেখতে পায়নি। মুখের বেশিরভাগটাই ঢাকা ছিল। লোকটা নিজের নাম বলেছিল, আবু বকর। আইসিসের রিক্রুটার। মূলত ভারত, বাংলাদেশ আর পাকিস্তান থেকে নতুন ছেলে-মেয়েদের রিক্রুট করে। লোকটা সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছিল আইসিসে যোগ দেওয়ার পর্যায়গুলো। প্রথমে ‘রেকমেন্ডেশন’। খুব পোক্ত রেকমেন্ডেশন থাকলে তবেই রিক্রুটার যোগাযোগ করে। এ ক্ষেত্রে তাদের রেকমেন্ড করেছে তানজিন নূর। তার পরে ‘তাজকিয়া’। আইসিসের অভ্যন্তরে অনেক দিন ধরে আছে এমন কেউ যদি রেফারেন্স দেয় তবেই তারা আসল জায়গায় পৌঁছোতে পারবে। রিক্রুটারই তাজকিয়ার বন্দোবস্ত করে দেবে। তবে সবার আগে চলে আসতে হবে সিরিয়ায়।
সবাই ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে উঠল। পিঠ চাপড়ে দিল তারিকের। এত দূর যে আসা গেছে সেটা তো তারিকের জন্যই। শুধু তারিকের মনটাই একটু খচখচ করতে লাগল। তার আর তানজিনের মধ্যে তো গোপনীয় কিছুই ছিল না। কিন্তু তানজিনের যে এত ভালো কানেকশন সেটা তো কোনও দিন বলেনি সে।
প্রস্তুতি শুরু হল সিরিয়া যাওয়ার। প্রথমেই তারিক আর সইদুল গেল নামকরা এক ট্রাভেল কোম্পানিতে। কিন্তু দেখা গেল, বাস্তবটা স্বপ্নের মতো সুন্দর নয়। ইরাক বা সিরিয়া যাওয়ার প্রচুর ঝামেলা। সোজা পথে যেতে গেলে ভিসার জন্য বাপ, মা, গুষ্টির পিণ্ডি সবার ঠিকুজিকুষ্ঠি, ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট সব দরকার। অতএব এ পথে হবে না। অন্য পথ খুঁজতে লাগল তারা। পথের সন্ধান দিল ফারুক। পিলগ্রিম ভিসা বা জিয়ারত ভিসা। মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দা নয় এমন মুসলমান তীর্থযাত্রীদের এই ভিসা দেওয়া হয়। এই ভিসা পেতে গেলে লাগে শুধু পাসপোর্ট আর ছবি। আবার একটা ট্রাভেল কোম্পানি, যারা জিয়ারত করায়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হল। তারা বলল, ‘কোনও ব্যাপার না। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু চার জনের জন্য প্যাকেজে চার লাখ টাকা লাগবে।’
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল তারিকদের। চার লাখ টাকা কোথায় পাবে তারা? যোগাযোগ করা হল আবু বকরের সঙ্গে। আবু বকর জানাল, সে দু’লাখ টাকা পাঠাচ্ছে। বাকি দু’লাখ নিজেদের জোগাড় করতে হবে।
অনেক কষ্টে ধারদেনা করে, বাড়ির গয়না চুরি করে বাকি দুই লক্ষ টাকা জোগাড় করে ফেলল তারিকরা। গয়না চুরির অভিযোগে জেল হয়ে গেল সইদুলদের বাড়ির কাজের লোকের।
অবশেষে এসে গেল চার জনের জিয়ারত ভিসা। ঠিক হয়ে গেল যাওয়ার দিনক্ষণ। পূর্বা এক্সপ্রেস ধরে দিল্লি। দিল্লি থেকে ফ্লাইট। আজ সেই দিন। মাহেন্দ্রক্ষণ। হাঁটতে হাঁটতে মায়ের পার্লারটার সামনে এসে দাঁড়াল তারিক। পিঠে ছোট্ট একটা ব্যাকপ্যাক। হাতে একটা বাজারের বড়ো ব্যাগ। ঠিক তখনই সইদুলের ফোন এল, ‘কোথায় তুই?’
তারিক বলল, ‘দশ মিনিটে স্টেশনে ঢুকছি। রাখ।’
ফোন কেটে দিয়ে একদৃষ্টে সে তাকিয়ে রইল মায়ের পার্লারটার দিকে। পার্লারের নাম ‘সাজগোজ’। সাইনবোর্ডে অনেকগুলো মেয়ের ছবি। ঘেন্নায় বেঁকে গেল তারিকের মুখ। হাতে ধরা বাজারের ব্যাগটার মধ্যে থেকে বড়ো একটা জার বার করে ভালো করে কেরোসিন ছিটিয়ে দিল চারপাশে। তার পরে আগুন ধরিয়ে দিল পার্লারটায়।
দিল্লি এয়ারপোর্টের ভেতরে থিওব্রোমা-র দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সঞ্জয়। থিওব্রোমা খুব নামকরা বেকারি। অপূর্ব সব কেক, কুকি বানায়। চারটে পেস্ট্রি আর জলের বোতল নিয়ে উলটো মুখে হাঁটা লাগাল সে। খানিকটা দূরে অপালা বসে আছে। খিদেয় দু’জনেরই পেট কামড়াচ্ছে। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ওরা শ্রীরঞ্জনী থেকে বেরিয়েছিল। এখন বাজে সন্ধে ছ’টা। মাঝের এই সাত-আট ঘণ্টা এত দ্রুত কেটেছে বলার নয়। সমীরণ বসাক যে চল্লিশ মিনিট সময় দিয়েছিলেন তার মধ্যে বেশিরভাগ সময়টাই গেছিল পল্লবকে বোঝাতে। যদিও শেষ অবধি তাকে বোঝানো যায়নি। পল্লবের প্রশ্ন ছিল, ‘ইরাক যদি যাওয়াই হবে তা হলে অপালা আর সঞ্জয় কেন? সে কেন নয়?’
সমীরণ ছাড়া বাকিদের লাইব্রেরি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে অনুরোধ করেছিলেন ভাদুড়িমশায়। পাঁচ মিনিট পরে সমীরণ বেরিয়ে এসে বলেছিলেন, ‘তোমাদের সকলকে স্যার ভেতরে ডাকছেন।’
তিনি আর আব্বাস বাইরে থেকে গেছিলেন। বাকিরা ফের ঢুকেছিল লাইব্রেরি ঘরে। ঢুকেই পল্লব বলেছিল, ‘আমিও যেতে চাই স্যার।’
ভাদুড়িমশায় বলেছিলেন, ‘তোমাকে আমি পাঠাতে পারব না পল্লব। যদি পারতাম তা হলে প্রথমেই আমি তোমার নাম বলতাম। কারণ আমি তো জানি তিতাস হারিয়ে যাওয়ায় আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে আছ তুমিই। কিন্তু আমাদের এই দলটা হতে হবে ছোটো আর কার্যকরী। সে জন্যই বাকিদের বাদ দিয়ে আমি অপালা আর সঞ্জয়কে নির্বাচন করেছি। দেবী ইনান্নার দণ্ড খুঁজে পেতে গেলে আমাদের তিনটে সাবজেক্টের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বোঝাপড়া করতে হবে। মিথ, ইতিহাস আর বিজ্ঞান। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া বিজ্ঞানেও চরম উন্নতি করেছিল। মিথকে ডিকোড করে করে আমাদের এগোতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাস আমাদের পথ দেখাবে আর কিছু ধাঁধার উত্তর দিতে পারবে একমাত্র বিজ্ঞান। অপালা ইতিহাস আর প্রাচীন ভাষার ব্যাপারে অনেক কিছু জানে। আরবি তো বটেই, প্রয়োজনে ও সুমেরীয় লিপিরও পাঠোদ্ধার করতে পারবে। আর সঞ্জয় বিজ্ঞানটা জানে, বোঝে। তবে ওরা দু’জনেই সবটা করে ফেলবে এমন আশা আমি করি না। চলার পথে বহু মানুষের সাহায্য লাগবে ওদের। আমার বিশ্বাস, মা ভবতারিণী সেইসব মানুষগুলোকে জুটিয়ে দেবেন। এ ছাড়া সমীরণ তো আছেই। বাকি ব্যবস্থা ও করে দেবে।’
‘কিন্তু তার পরেও আমি যেতে চাই স্যার, দৃঢ় গলায় বলে উঠেছিল পল্লব, ‘আমি প্রাচীন ইতিহাস বা বিজ্ঞান কোনও ব্যাপারেই মাস্টার নই, কিন্তু আরও তো নানা কিছুর দরকার হবে। সেগুলোতে আমি সঞ্জয় আর অপালাকে সাহায্য করব। আপনি অনুমতি দিন। সমীরণবাবুকে বলুন উনি যেন আমারও যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।’
একটু চুপ থেকে ভাদুড়িমশায় বলেছিলেন, ‘তোমায় আমি অনুমতি দিতে পারব না। তোমার ওখানে যাওয়া চলবে না।’
‘কেন? কেন আপনি আমায় বাধা দিচ্ছেন?’
‘কারণ তোমার অস্থিরতা ওদের যাত্রাপথে বিঘ্ন ডেকে আনবে। ওদের গতি রোধ করবে। আমাদের হাতে সময় নেই পল্লব। যা করার খুব দ্রুত করতে হবে।’
‘আপনি বিশ্বাস করুন স্যার, আমি কোনও রকম হঠকারিতা করব না। আপনার পা ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি,’ ভাদুড়িমশায়ের পা চেপে ধরেছিল পল্লব।
একটু সময় নিয়ে বৃদ্ধ বলেছিলেন, ‘পা ছাড়ো পল্লব। এ যাত্রায় তোমার যাওয়া হবে না।’
হঠাৎ খেপে গেছিল পল্লব। ভাদুড়িমশায়ের দিকে আঙুল তুলে বলেছিল, ‘আজ তিতাস যে হারিয়ে গেছে তার জন্য কিন্তু দায়ী আপনি স্যার। আপনি যদি লোকনাথকে বাঁচিয়ে না রাখতেন তা হলে কিন্তু আমাদের কাউকে এই দিন দেখতে হতো না।’
পল্লবের হাত টেনে ধরেছিল অমিয়, ‘কী বলছিস তুই? চুপ কর।’
এক ঝটকায় অমিয়র হাত ছাড়িয়ে পল্লব বলেছিল, ‘না আমাকে বলতে দে। আপনি বলছেন তিতাস নেই বলে আমার দুঃখ আপনি বুঝতে পারছেন। না, পারছেন না। পারলে আপনি আমাকে আটকাতেন না। তিতাস না কি নরকে আছে! আবার বেঁচেও আছে! প্রথমত আমি আপনার এই কথাটাই বুঝতে পারছি না। দ্বিতীয়ত, লোকনাথ যে তন্ত্র জানে আপনি জানেন না! এখন তো আমার আপনাকেই বিশ্বাস করতে ভয় লাগছে।’
চমকে উঠেছিল সকলে। দুঃখ পেয়েছিলেন ভাদুড়িমশায়ও। অস্ফুটে বলেছিলেন, ‘পল্লব! তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না?’
‘না, পারছি না স্যার। কী করে পারব বলুন তো? আপনিই তো এক দিন বলেছিলেন, লোকনাথ আপনার প্রিয়তম ছাত্র। তার ক্ষতি করতে গেলে আপনার হাত কাঁপবে। তা হলে এখন আপনি লোকনাথের ক্ষতি করতে চাইছেন, বিশ্বাস করব কী করে? এখন তো মনে হচ্ছে, আমি ইরাক গেলে আপনার অসুবিধে হবে।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন ভাদুড়িমশায়। তাঁর কষ্ট হচ্ছিল পল্লবের জন্য। তিতাসকে বড়ো বেশি ভালোবাসে ছেলেটা। কেন তিনি পল্লবকে যেতে দিচ্ছেন না তা যে কাউকেই বলতে পারবেন না। লোকনাথ এমন এক মহাতন্ত্র প্রয়োগ করেছে যার সম্পর্কে লোকনাথেরও সম্যক ধারণা নেই। তাঁর অন্তরের বিশ্বাস বলছে, দেবী ইনান্নার দণ্ড পাওয়া যাবে। কিন্তু তার পরে? তিতাসকে
নরক থেকে বার করে আনতে গেলে যে পল্লবকে নরক গমন করতে হবে। পল্লবকে কী ভাবে সেখান থেকে বার করবেন তা তিনি জানেন না। নিশ্চয়ই তাঁর ইষ্ট তাঁকে পথ দেখাবেন। কিন্তু এখন আগেরটা আগে ভাবতে হবে। ধাপে ধাপে এগোতে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত দেবী ইনান্নার দণ্ড পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ অবধি পল্লবের গায়ে আঁচ আসতে দিলে চলবে না। যে পথে তিনি সঞ্জয় আর অপালাকে পাঠাচ্ছেন সেখানে পদে পদে বিপদ। সম্ভব হলে তিনি নিজেই যেতেন। তাঁর মন বলছে তাঁকে যেতেও হবে শেষমেশ। কিন্তু এই মুহূর্তে এই কাজের যোগ্যতম সঞ্জয় আর অপালা, তাই ওদেরকে আগে পাঠাচ্ছেন। অপালা তাঁর নিজের নাতনি, তার বিপদের কথাও ভাবছেন না তিনি। কিন্তু এত কথা বোঝার মতো মানসিক অবস্থায় পল্লব নেই। তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে পল্লব আবারও বলে উঠেছিল, ‘কী হল স্যার? চুপ করে আছেন কেন? আমি জানি আপনার কাছে উত্তর নেই। ওয়েল, আমাকে উত্তর দিতে হবে না। কিন্তু আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। আমিও যাব ওদের সঙ্গে।’
এতক্ষণ মাথাটা নামিয়ে বসেছিলেন ভাদুড়িমশায়। এবার পল্লবের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিলেন। সেই দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেছিল পল্লব। গম্ভীর গলায় বৃদ্ধ বলেছিলেন, ‘ভালোবাসা আর প্রশ্রয়ের মাঝে একটা সূক্ষ্ম ফারাক আছে। আমি তোমাকে ভালোবাসি কিন্তু তার মানে এই নয় তোমার অন্যায় কথায় প্রশ্রয় দেব। আমি যা করছি তিতাসের মঙ্গলের জন্য করছি। তুমি যদি মনে করো লোকনাথের সঙ্গে আমার আঁতাত আছে সেটা তোমার দৈন্য। আমার নয়। তুমি ইরাক যাচ্ছ না। এবার তোমার যা ভালো মনে হয় করো। অপালা আর সঞ্জয়, সময় নষ্ট না করে যা গোছানোর গুছিয়ে নাও। বাকি যা নির্দেশ দেওয়ার আমি ফোনে দেব। এসো।’
একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল পল্লব, তার পরে বেরিয়ে গেছিল বাড়ি ছেড়ে। কেউ ওকে আটকাতে পারেনি। ভাদুড়িমশায় কেন পল্লবকে যেতে দিলেন না সেটা সঞ্জয়রা কেউই বোঝেনি কারণ তখন আর এ নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় ছিল না। টুকিটাকি কিছু দরকারি জিনিস আর পাসপোর্ট নিয়ে ওরা সমীরণ বসাকের গাড়িতে উঠে বসেছিল। নীল বাতি জ্বালিয়ে গাড়ি ছুটেছিল এয়ারপোর্টের দিকে।
ওদেরকে নিয়ে সোজা নিজের বাংলোয় এসে উঠেছিলেন সমীরণ। সেখানেই অপেক্ষা করছিলেন জয়দীপ রাউত বলে এক ভদ্রলোক। ওদেরকে জয়দীপের জিম্মায় দিয়ে বেরিয়ে গেছিলেন সমীরণ। কিছুক্ষণ পরে ছবি তোলার লোক নিয়ে এসেছিলেন জয়দীপ। ছবি-টবি তুলিয়ে ওদের পাসপোর্ট দুটো নিয়ে কোথায় যেন চলে গিয়েছিলেন তিনিও। ইতিমধ্যে এলাহি খাবার সাজিয়ে দিয়েছিলেন সমীরণের বাংলোর কর্মচারীরা। ফোনে ওদের খেতে অনুরোধ করেছিলেন সমীরণের স্ত্রী হরমনপ্রীত। উপস্থিত থাকতে পারছেন না বলে ক্ষমাও চেয়েছিলেন। কিন্তু খাওয়ার ইচ্ছে হয়নি ওদের। টেনশনে থাকলে কি আর খাওয়া যায়! এই ভাবেই আরও ঘণ্টাখানেক কেটেছিল। তার পরেই সবচেয়ে মজার ঘটনাটা ঘটেছিল। দু’টি ছেলে-মেয়ে এসে ওদের সঙ্গে দেখা করেছিল। সন্দীপ মিশ্র আর নিকিতা জৈন। একজন কস্টিউম ডিজাইনার, অন্যজন মেকআপ আর্টিস্ট। বলেছিল, ‘আপনাদের মেকআপে বসতে হবে।
সঞ্জয় কিছু বলার আগেই তার হাত চেপে ইশারা করেছিল অপালা। ভারত থেকে এত তাড়াতাড়ি মধ্যপ্রাচ্যের ভিসা পাওয়া যে অসম্ভব এ কথা সে গোড়াতেই জানত। সে বুঝতেই পেরেছিল যা হবে সোজা পথে হবে না। কথা না বাড়িয়ে মেকআপে বসে গেছিল দু’জনেই। মেকআপ আর কস্টিউম শেষ হওয়ার পরে দু’জনেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল আয়নার দিকে। সঞ্জয়ের বয়স অন্তত বিশ বছর বেড়ে গেছে আর অপালা নিজের মুখটা দেখতে পাচ্ছিল না। কারণ তার মুখটা ঢাকা রয়েছে বোরখার আড়ালে। ততক্ষণে ফিরে এসেছেন জয়দীপ। এসেই নতুন একজোড়া পাসপোর্ট আর একটা ফাইল ধরিয়ে দিয়েছিলেন ওদের হাতে। বলেছিলেন, ‘আপনাদের পুরোনো পাসপোর্ট দুটো আমরা পরে আপনাদের কাছে পৌঁছে দেব। সেটার সঙ্গে ট্যুরিস্ট ভিসাও থাকবে। কিন্তু সে সব জোগাড় করতে হপ্তাখানেক সময় লাগবে। আপাতত এই দুটো নতুন পাসপোর্ট। এই ফাইলের মধ্যে আপনাদের নতুন পরিচয়পত্র, ভিসার কাগজপত্র, হোটেলের রিজার্ভেশন, এয়ার টিকিট সব আছে। এখন থেকে আপনার নাম রহমত আলি আর আপনার নাম খাদিজা বেগম। আপনারা ইরাকে জিয়ারত করতে যাচ্ছেন। যে ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যাচ্ছেন তাদেরও বলা আছে। তারা এয়ারপোর্টে আপনাদের রিসিভ করে নেবে। সেখানে আমাদের লোক আছে তারা বাকি ব্যবস্থা করে দেবে। সন্ধে সাতটায় ফ্লাইট। এবার আপনারা বেরিয়ে পড়ুন। শুধু একটাই কথা, আপনারা তো হিন্দু তায় বাঙালি, ঠাকুরকে ডাকতে গিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে ফেলবেন না যেন।’
সিকিউরিটি চেক ইন হওয়ার পরে ওরা বুঝতে পেরেছিল, খিদে পেয়েছে। তাই থিওব্রোমা। বোরখার ফাঁক দিয়ে পেস্ট্রি খাওয়া খুবই জগঝম্প ব্যাপার। এর জন্য অভ্যেস থাকতে হয়। অপালা খুবই গলদঘর্ম হচ্ছে এমন সময় দেখল, চারটে কমবয়সি ছেলে ওদের উলটো দিকে এসে বসল। এই জায়গাটা শুধু জিয়ারত যাত্রীদের জন্যই নির্ধারিত। এখানে তো বাইরের কারও বসার কথা নয়। তা হলে? এরাও কি জিয়ারতে যাচ্ছে? এত কম বয়সেই ধর্মে এমন মতি! হবে হয়তো। এ দুনিয়ায় সবই সম্ভব। গতকালই তো তার নাম ছিল অপালা ভাদুড়ি। আজ সে খাদিজা বেগম। নীচু গলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলছে ছেলেগুলো। অপালার মনে হল, একটা অস্থিরতা কাজ করছে ওদের মধ্যে। একটা ছেলে উঠে দাঁড়াল। হাতে একটা খালি বোতল। বোধ হয় জল আনতে যাচ্ছে। হাঁটতে গিয়েই সামনে রাখা ব্যাগটায় তার পা জড়িয়ে গেল আর জোর আছাড় খেয়ে একেবারে অপালার সামনে এসে পড়ল। সবাই ছুটে এসে তাকে তুলল। বুকপকেট থেকে পাসপোর্টটা পড়ে গেছিল। পাসপোর্টটা তুলতে গিয়ে অপালার চোখে পড়ল ছেলেটার নাম তারিক আজিজ।
