লাপিস লাজুলি – ৪
॥ চার ॥
ফেব্রুয়ারি, ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ
পেটিকার ঢাকনাটা তুলতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল হালাকু খাঁ-র। আহ! উপঢৌকন একেই বলে। অবশ্য সন্ধি করতে এলে উপঢৌকন আনাই দস্তুর, তবু মনে মনে খলিফার রুচির প্রশংসা না করে পারলেন না হালাকু। তীক্ষ্ণ চোখে হালাকুর মুখের দিকেই তাকিয়েছিলেন আবদুল রহমান, খলিফা আল মুস্তাসিনের মেজো ছেলে। হালাকুর অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারলেন, উপহার পছন্দ হয়েছে। অবশেষে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন তিনি।
আজ প্রায় এক সপ্তাহের ওপর বাগদাদ অবরোধ করে বসে আছে হালাকু খাঁ-র বাহিনী। বাগদাদ এক বিরাট নগরী। সারা পৃথিবীর মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী। শিক্ষায়, জ্ঞানে, বৈভবে, বাণিজ্যে এর জুড়ি মেলা ভার। অগণিত এর জনসংখ্যা। শত্রু অবরোধে থাকাকালীন এমন এক নগরীর দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং নাগরিকদের ভরণপোষণ চালিয়ে যাওয়া মুখের কথা নয়। ভাঁড়ারে টান পড়তে শুরু করেছে। নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষও দেখা দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই বহু প্রাণহানি ঘটেছে, ঘটেছে সম্পদহানি। এই অবস্থায় হালাকু খাঁ-র কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনও রাস্তা খোলা নেই। দেশবাসীর রক্ত আর সইতে পারছেন না আবদুল রহমান। কিন্তু এই নীচ মোঙ্গোলটার সামনে মাথা নত করতে হচ্ছে ভেবেই অপমানে সারা শরীরটা তেতে উঠল তাঁর। কথায় আছে, বাবার ঋণ শোধ করে ছেলে। যদিও খলিফার সমালোচনা করা কোনও ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাছে নাজায়েজ, তবু এই মুহূর্তে মনে মনে খলিফা আল মুস্তাসিনের মুণ্ডপাত না করে পারলেন না আবদুল রহমান। মহামহিমান্বিত খলিফা অর্থাৎ তাঁর বাবা যদি বিলাসব্যসনে ডুবে না থেকে খিলাফতের প্রতি, বাগদাদের প্রতি আর একটু যত্নবান হতেন তা হলে আজ এই দিন দেখতে হতো না।
পারস্যের জঙ্গিগোষ্ঠী ‘হাসাসিন’-দের দমন করতে খলিফার সেনাবাহিনীর সাহায্য চেয়েছিল মোঙ্গোলরা। সে আরও বছর তিনেক আগের কথা। তখন হালাকু খাঁ-র জুজু দেখেনি বাগদাদিরা। সাহায্য করলেই হতো। কারণ হাসাসিনদের সঙ্গে এমন কিছু দহরম-মহরম ছিল না বাগদাদের। বরং হাসাসিনদের কোনও শাসকই খুব একটা নেকনজরে দেখতেন না। কিন্তু পেটোয়া এক আমাত্য, প্রধান উজির ইবন আলকামির উসকানিতে মোঙ্গোলদের মুখের ওপরে না করে দিলেন খলিফা। বলে দিলেন, ‘মোঙ্গোলরা মুসলমান নয়। তাদের সমস্যায় কেন ভাবিত হবে খিলাফৎ?’
আবদুল রহমান বুঝতে পেরেছিলেন ভুল হচ্ছে। ছুটে গেছিলেন খলিফার কাছে। সঙ্গে করে নিয়ে গেছিলেন গিয়াসুদ্দিন আল তুসি-কে। গিয়াসুদ্দিন পারস্যের মানুষ। প্রগাঢ় পণ্ডিত, গবেষক, দার্শনিক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ এবং সর্বোপরি একজন ভূয়োদর্শী মানুষ। নিরলস জ্ঞানতাপস। বাগদাদের অন্যতম গর্ব পাঠাগার ‘বাইত আল হিকমাহ’ বা বায়তুল হিকমাহ-কে আলো করে রেখেছেন। নানা দেশ থেকে দর্শন, বিজ্ঞান এবং সাহিত্যের মণিমুক্তোগুলোকে অক্লান্ত ভাবে নিয়ে আসছেন বায়তুল হিকমাহ-তে। তাঁরই হাত ধরে দিনে দিনে আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে এই বিশাল পাঠাগার। সারা পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডারকে বাগদাদের বুকে ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই সদা হাস্যময় প্রৌঢ়। খলিফাও যথেষ্ট সমাদর করেন তাঁকে। কিন্তু কী যে হয়েছিল খলিফার! গিয়াসুদ্দিন এই ব্যাপারে কথা বলতে এসেছেন দেখে বিরক্তই হয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘আপনি বুজুর্গ মানুষ। লেখাপড়া নিয়ে থাকেন। তাই থাকুন না। কেন ঢুকতে যাচ্ছেন রাজনীতির ভেতরে?’
গিয়াসুদ্দিন বলেছিলেন, ‘মহামহিম, লেখাপড়ার সঙ্গে রাজনীতির তো কোনও বিরোধ নেই। জ্ঞানচর্চা করতে গিয়ে নানা দেশের বহু মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয় আমার। আর সাধারণ মানুষের আন্তরিক কথোপকথনেই কিন্তু রাজনীতির হাল-হকিকত সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। আমি আপনাকে বলছি, ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে মোঙ্গোলরা। উদগ্র হচ্ছে ওদের নতুন দেশ দখলের খিদে। খুব শিগগিরই ওরা দামেস্ক, বাগদাদ আর কায়রোর দিকে হাত বাড়াবে। আজ যদি আপনি ওদের পাশে থাকেন তখন…
গিয়াসুদ্দিনের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়েছিলেন খলিফা, ‘তখন কী? ওরা আমাদের আক্রমণ করবে না? শুনুন গিয়াসুদ্দিন, ওরা যুদ্ধবাজ জাত। যুদ্ধই ওদের জীবিকা। ওরা আসবেই কিন্তু আমি আপনাকে বলে রাখছি, বাগদাদের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস ওরা করবে না। এটা দামেস্ক বা কায়রো না। এটা বাগদাদ। দুনিয়ার সব মুসলমানের রাজধানী। বাগদাদের গায়ে হাত পড়লে দুনিয়ার সব মুসলমান ছুটে আসবে। আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না।’
‘ভয় পেতে আমিও বলছি না মহামহিম। শুধু একটু সাবধান হতে বলছি। সাবধানতায় তো দোষ নেই। রোগমুক্তির চেয়ে রোগ প্রতিরোধ সর্বদা বুদ্ধিমানের কাজ। তাই নয় কি?’
খলিফা কিছু বলার আগেই খ্যাঁক করে উঠেছিল ইবন আলকামি, ‘আপনার সাহস তো কম না! আপনি আজকাল খলিফাকেও বুদ্ধি দেবেন? বইপত্তরের অনুবাদ করেন সেটাই করুন না, বুদ্ধি বা পরামর্শ দেওয়ার জন্য আমরা আছি।’
এই লোকটাকে মোটে পছন্দ করেন না আবদুল রহমান। অত্যন্ত ধূর্ত, স্বার্থপর এবং সুযোগসন্ধানী। কিন্তু ইদানীং এই খলিফার চোখের মণি হয়েছে। বলতেও খারাপ লাগে কিন্তু তার জন্য খলিফার লোভই দায়ী।
দু’টি জিনিসের প্রতি খলিফার অতিরিক্ত দুর্বলতা রয়েছে। পাখি এবং নারী। দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে বিরল প্রজাতির পাখি এবং অপূর্ব সুন্দরী সব নারী সংগ্রহ করাই খলিফার নেশা। খলিফার পক্ষীশালায় যেমন রয়েছে মাদাগাস্কারের ঐরাবত পক্ষী, মরিশাসের ডোডো, হিমালয়ের কোয়েল, ভারতের ময়ূর, বঙ্গাল মুলুকের পিউকাঁহা, দক্ষিণ আমেরিকার ঝলমলে তোতা এবং আরও কত কত নাম-না-জানা পাখি তেমনই তাঁর হারেমের অলংকার হয়ে রয়েছে রুশি দীর্ঘাঙ্গী, মেহগনি রঙের ব্রেজিলিয়ান তন্বী, আফ্রিকার গুরু নিতম্বিনী, পারস্যের সোনালি কেশবতী, ইউরোপের নীলনয়না, হিন্দুস্থানের স্বাস্থ্যবতী, জাপানের কৃশাঙ্গী। এই মুহূর্তে খলিফার পক্ষীশালায় রয়েছে পাঁচ হাজার পাখি আর হারেমে রয়েছে তিন হাজার নারী। সেই সব নারীরত্নকে পাহারা দেয় এক হাজার খোজা। ভালো পাখি আর ভালো মেয়ের সন্ধান পেলেই খলিফা সেটিকে পাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠেন। খলিফার এই ‘শওখ-শৌখিনতা’ মেটানোর পবিত্র দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন ইবন আলকামি এবং অচিরেই খলিফার প্রিয়তম বয়স্য হয়ে উঠেছেন।
আলকামিকে একেবারেই গুরুত্ব দেন না গিয়াসুদ্দিন। শিক্ষিত মানুষ অশিক্ষার ঔদ্ধত্যকে হীন চোখে দেখবেন এটাই স্বাভাবিক। আলকামিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘মহামহিম, আমি আপনার শুভানুধ্যায়ী এ ব্যাপারে আশা করি আপনার কোনও সন্দেহ নেই?’
খলিফা চুপ করে ছিলেন। গিয়াসুদ্দিন বলেছিলেন, ‘আপনার মৌনতাকে সম্মতির লক্ষণ ধরে নিলাম। তাই বলছি, মোঙ্গোলদের একেবারে না বলে দেওয়ার আগে আর এক বার ভাবুন।’
খলিফা বোধ হয় ভাবতেও যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল আলকামি। তীক্ষ্ণ গলায় বলেছিল, ‘মহামহিম, আপনি যদি এ বিষয়ে গিয়াসুদ্দিনের সঙ্গে আর কোনও আলোচনা করেন আমি স্থানত্যাগ করব। গিয়াসুদ্দিন পারস্যের মানুষ তাই পারস্যের অভ্যন্তরীণ অশান্তিতে বাগদাদকে জড়াতে চাইছেন। এই ফাঁদে পা দেবেন না।’
অপমানে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন গিয়াসুদ্দিন। আজ তিরিশ বছর ধরে তিনি বাগদাদের বাসিন্দা। বায়তুল হিকমাহ-কে উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাণপাত করেছেন। তাঁকে কি না এই অর্বাচীন বলছে বিদেশি! বলছে, এ তাঁর নিজের দেশ নয়! দেশের পরিচয় তবে শুধু জন্মসূত্রে হয়? কর্মে হয় না? আর খলিফা সেটা শুনে চুপ করে আছেন!
কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন গিয়াসুদ্দিন। পেছন পেছন ছুটে এসেছিলেন আবদুল রহমান। গিয়াসুদ্দিনের গতিরোধ করে বলেছিলেন, ‘আলমুহাল্লিম, আমি জানি আপনি দুঃখ পেয়েছেন। যে যাই বলুক আমি বিশ্বাস করি আপনি মানেই বাগদাদ, বাগদাদ মানেই আপনি। আলকামির কথায় কান দেবেন না দয়া করে। খলিফাকে বোঝান। তিনি আপনার কথা শুনবেন।’
মাথা নেড়ে গিয়াসুদ্দিন বলেছিলেন, ‘লাভ নেই আবদুল। খলিফা যে আমার কথা শুনলেন না এ তাঁর দোষ নয়। এ নিয়তি। আব্বাসীয় খিলাফত ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। প্রস্তুত হও।’
ঘাড় নুইয়ে লম্বা বারান্দা ধরে চলে যাচ্ছিলেন গিয়াসুদ্দিন আল তুসি। বাগদাদের আলো। অসহায় হয়ে দেখছিলেন আবদুল রহমান। আজ হালাকু খাঁ-র সামনে বসে সেই কথাগুলোই মনে পড়ে গেল তাঁর। শেষ চেষ্টা করতে এসেছেন তিনি। বাগদাদকে বাঁচাতে হবে। সাধের বাগদাদ। তার জন্য এই পিশাচটার পা ধরতে হলেও তিনি ধরবেন।
প্রচুর উপঢৌকন পাঠিয়েছেন খলিফা। পেটিকা ভরতি অজস্র মণিমুক্তো। পারস্যের দু’টি গালিচা, শিল্পকীর্তি হিসেবে যে দু’টি অতুলনীয়। দু’টি ময়ূর, তার মধ্যে একটি বিরল প্রজাতির, সেটির রং সাদা, তার পুচ্ছের পালকের অলংকরণগুলি গাঢ় নীল নয়, সোনালি। হারেম থেকে বাছাই করা কামকলায় পারদর্শিনী দশটি নারীরত্ন, সৌন্দর্যে এবং দেহসৌষ্ঠবে যারা অপ্সরাদেরও হার মানায়। এ ছাড়াও রয়েছে আর একটি ছোটো পেটিকা। সেটির মুখ বন্ধ নির্দেশ আছে, পেটিকাটি হালাকুর সামনেই খুলতে হবে। এই পেটিকার ভেতর কী আছে সেটা আবদুল রহমানও জানেন না। জানেন শুধু খলিফা আল মুস্তাসিন আর উজির ইবন আলকামি।
বাকি উপহারগুলো দেখার পর এই বিশেষ পেটিকার দিকে হাত বাড়ালেন হালাকু খাঁ। সকলের সামনেই পেটিকার নামমুদ্রা ভাঙা হল। প্রথমেই বেরিয়ে এল একটি গোল করে পাকানো কাগজ। খলিফা পত্র দিয়েছেন হালাকু খাঁ-কে। কাগজটা আবদুল রহমানের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন হালাকু। বললেন, ‘পড়ে বলুন এতে কী লেখা আছে।’
অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে লেখা একটা চিঠি। চিঠির বেশিরভাগটা জুড়েই হালাকু খাঁ-র বীরত্ব এবং গুণপনার বিবরণ। সে সব বাদ দিয়ে সোজা মোদ্দা কথাটা পড়ে নিলেন আবদুল রহমান। বললেন, ‘খাঁ, মহামহিম খলিফা জানিয়েছেন বাগদাদ আপনার সঙ্গে সন্ধি করতে চায়। একইসঙ্গে খলিফা আপনাকে এক বিরল সম্মান দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, এ বার থেকে প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজে বাগদাদের মসজিদে মসজিদে আপনার নাম উচ্চারিত হবে এবং তিনি আপনাকে সুলতান উপাধি দিতে চান। দয়া করে এই উপহার গ্রহণ করুন।’
হাসি ফুটে উঠল হালাকুর মুখে। অনুচরদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘প্রস্তাব মন্দ নয়।’
তার পরে হাত ঢুকিয়ে পেটিকার মধ্যে থেকে বার করে আনলেন এমন একটি বস্তু যা দেখে চমকে উঠলেন আবদুল রহমান। অজানা এক আশঙ্কায় তাঁর বুক কেঁপে উঠল।
* * *
বায়তুল হিকমাহ-এর একটি কক্ষে অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন গিয়াসুদ্দিন আল তুসি। আজ সকাল থেকেই বড়ো অস্থির হয়ে আছেন তিনি। খলিফার সন্ধিপ্রস্তাব নিয়ে আবদুল রহমান গেছে হালাকু খাঁ-র কাছে। আজই নির্ধারিত হয়ে যাবে বাগদাদের ভাগ্য। খলিফা যতই একে গালভরা ‘সন্ধিপ্রস্তাব’ বলে আখ্যা দিন না কেন প্রকৃত প্রস্তাবে এটি আত্মসমর্পণ। সেদিন যদি খলিফা তাঁর কথা শুনতেন তা হলে আজ বাগদাদকে এ ভাবে অসম্মানিত হতে হতো না।
সন্ধে নেমেছে খানিক আগেই। এতক্ষণে তো আবদুলের ফিরে আসার কথা। সে আসছে না কেন? তবে কি সন্ধিপ্রস্তাবে রাজি হয়নি হালাকু খাঁ? আবদুলের কোনও ক্ষতি করে দেয়নি তো সে? যদিও দূত অবধ্য কিন্তু হালাকু খাঁ আপাদমস্তক নীতিহীন মানুষ। তার অসাধ্য কিছু নেই। মনটা বড্ড কু ডাকতে লাগল গিয়াসুদ্দিনের। তিনি জানেন, যদি মোঙ্গোলরা আক্রমণ করে, সবার আগে এই বায়তুল হিকমাহ-কে ধ্বংস করে দেবে। কারণ বিজেতা সবসময় বিজিতের ইতিহাস ধ্বংস করে দিতে চায়। সে নতুন করে ইতিহাস লিখতে চায়, লিখতে চায় নিজের বিজয়গাথা। পৃথিবীকে জানাতে চায়, সভ্যতার শুরু তার হাত ধরেই হয়েছে। এটাই হয়ে আসছে। যত বারই বিদেশি শক্তি কোনও দেশকে আক্রমণ করেছে সবার আগে সেই দেশের পাঠাগার নষ্ট করে দিয়েছে। বড়ো অসহায় লাগতে থাকে গিয়াসুদ্দিনের। কী করবেন তিনি? বছরের পর বছর ধরে তিলে তিলে দুনিয়ার নানা প্রান্তের জ্ঞান জমা করেছেন এখানে। নানা দেশের নানা ভাষার শ্রেষ্ঠ কীর্তিসমূহ, রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিদ্যা, জাদুবিদ্যা এমনকী অপরসায়নের হাজার হাজার পুঁথি রয়েছে এখানে। সন্ধে নেমে এসেছে তবুও ঘাড় গুঁজে অনুবাদের কাজ করে চলেছে তাঁর ছাত্রেরা। সব নষ্ট করে দেবে মোঙ্গোলরা? কিছুই বাঁচাতে পারবেন না? পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছোবে না এই জ্ঞানের দীপশিখা? আর শুধু পুঁথিই তো নয়, আরও এমন অনেক কিছু আছে যেগুলো অতি সন্তর্পণে এই বায়তুল হিকমাহ-র গোপন প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে রেখেছেন তিনি।
সুপ্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা মিথের আকর। লোককথায় ছড়িয়ে রয়েছে কত অদ্ভুত সব কাহিনি। ছেলেবেলা থেকেই গিয়াসুদ্দিনের পুরাণ আর লোকগাথার প্রতি তীব্র আকর্ষণ। যত বড়ো হয়েছেন মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ক্রমশ ঘাঁটি গেঁড়ে বসেছে, এইসব গল্প মিথ্যে? সব ম্যাজিক মিথ্যে? গিয়াসুদ্দিনের অনুসন্ধিৎসু মন তাঁকে চুপ করে বসে থাকতে দেয়নি। বাকিদের মতো রূপকথাকে শুধুই গল্প ভাবতে পারেননি তিনি। কাহিনির অন্তরে লুকিয়ে থাকা সংকেতের পাঠোদ্ধার করেছেন ক্লান্তিহীন অধ্যবসায়ে। তার পরে টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর ধার ধরে ছুটে বেরিয়েছেন সুমেরীয় সভ্যতার প্রাচীন মন্দিরগুলিতে। বার বার প্রাণ হাতে করে পৌঁছে গেছেন পাণ্ডববর্জিত মরুভূমির অন্দরে। আবার কখনও বাগদাদ নগরের পুরোনো কোনও সরাইখানাও তাঁকে চমৎকৃত করেছে। প্রমাণ পেয়েছেন, শুধুমাত্র কল্পনার ডানায় ভর করেই পুরাণ, লোকগাথা লেখা হয় না। হাওয়ায় হাওয়ায় ভর করে মিথ গড়ে ওঠে না। তার অন্তরালে থাকে বাস্তবের জোরালো বনিয়াদ। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
ইতিহাস আর পুরাণের খনি থেকে তুলে আনা অদ্ভুত সেই সব জিনিসপত্র নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তা গিয়াসুদ্দিনের। অনধিকারী এ সবের মর্মই বুঝবে না। তার চেয়েও বড়ো কথা, এ সব জিনিস যদি কোনও পাপাত্মার হাতে পড়ে এবং সে যদি এর মর্মোদ্ধার করতে পারে তা হলে সর্বনাশ হবে। তাঁর সংগ্রহে এমন একটি বস্তু আছে যা দৈবশক্তির আধার। যা দিয়ে অসাধ্য সাধন করা যায়। পৃথিবীর বুকের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তোলা যায়, সমুদ্রকে দু’ভাগ করে ফেলা যায় এমনকী খুলে ফেলা যায় নরকের দরজাও।
দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নিলেন গিয়াসুদ্দিন। এই বিপজ্জনক জিনিসগুলোকে আর বায়তুল হিকমাহ-তে রাখা যাবে না। যদিও যে গোপন প্রকোষ্ঠে এগুলো রাখা আছে সেখানে সহজে কারও নজর পড়বে না, তবু সাবধানের মার নেই। এগুলো সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে এমন কোনও জায়গায় যেখানে বিদেশি যুদ্ধবাজেরা হানা দেবে না। তারা ভাববেই না এখানেও মূল্যবান কিছু থাকতে পারে। যুদ্ধ শেষে যদি প্রাণে বাঁচেন তখন এগুলোর যথাযথ ব্যবস্থা করা যাবে। আলখাল্লাটা গায়ে চাপিয়ে তিনি রওনা দিলেন খলিফার মহলের উদ্দেশে।
পাখিকে দানা খাওয়াচ্ছিলেন খলিফা। পাশে দাঁড়িয়ে পাখির গুণপনার বর্ণনা করছিলেন উজির ইবন আলকামি। এই পাখিগুলো এসেছে হিন্দুস্থান থেকে। এক ধরনের তোতা। এরা না কি মানুষের গলা অবিকল নকল করতে পারে। এদের যা শেখানো হয় তাই আওড়ায় স্পষ্ট উচ্চারণে। এসব শুনে খলিফা খুবই চমৎকৃত। ঠিক করেছেন পাখিগুলিকে আজান দেওয়া শেখাবেন। আগামীকাল থেকেই পাখিরা পাঠশালায় যাবে। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক লাগবে যিনি ধৈর্য সহকারে পাখিদের আল্লাহর নামগান করা শেখাবেন। কাকে পাখিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা যায় সেই নিয়েই গম্ভীর আলোচনা চলছে, এমন সময় রক্ষী এসে জানাল, গিয়াসুদ্দিন আল তুসি দেখা করতে চাইছেন।
খুব রেগে গেলেন ইবন আলকামি। বললেন, ‘মহামহিম, আপনার কিন্তু নিজেকে এবার একটু বদলানো উচিত। এত মাটির মানুষ হলে চলে না। অনুক্রম বলে একটা বিষয় আছে। গিয়াসুদ্দিন কে? সামান্য এক গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক। তার কি যোগ্যতা আছে যখন-তখন আপনার মহলে চলে আসে? মানছি লোকটা অনেক লেখাপড়া করেছে কিন্তু তাই দিয়ে খিলাফতের কোন উপকারটা হয়? প্রতি বছর বায়তুল হিকমাহ-র পেছনে কত দিনার খরচ হয় বলুন তো? আপনি যদি ওই অর্থ আমায় দিতেন আজ আপনার হারেমে দশ হাজার নারী থাকত। কিন্তু গিয়াসুদ্দিনের প্রতি আপনার কেন এত প্রীতি আমি বুঝতে পারি না। লোকটা তো আপনার শাসন ব্যবস্থারও ভুল ধরে, তাও আপনি কিছু বলেন না। যাই হোক, আপনি মালিক। আপনার ইচ্ছাই আমার ধর্ম। কিন্তু এখন কি দেখা করবেন গিয়াসুদ্দিনের সঙ্গে না চলে যেতে বলব?’
একটু যেন দোটানায় পড়ে গেলেন খলিফা। আলকামি তাঁর সব শখ-আহ্লাদের খেয়াল রাখে। আলকামিকে তিনি চটাতে চান না। আবার গিয়াসুদ্দিনের প্রতিও তাঁর গভীর কৃতজ্ঞতা আছে। সেটাও একেবারে ঝেড়ে ফেলতে তাঁর বিবেকে বাধে। পূর্বতন খলিফার মৃত্যুর পরে যখন তিনি খিলাফতের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তখন শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না তাঁর। সে সময় দিনের পর দিন গিয়াসুদ্দিন তাঁকে রাজনীতির পাঠ দিয়েছেন। আজ রাজনৈতিক বিষয়ে গিয়াসুদ্দিনের পরামর্শ না নিলে কী হবে পুরোনো দিনগুলো একেবারে ভুলে যাননি তিনি। গলা ঝেড়ে বললেন, ‘না থাক। চলে যেতে বলার দরকার নেই। বয়স্ক মানুষ, এতটা এসেছেন, ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। শুনেই নিই কী বলতে এসেছেন। ওঁকে ভেতরে আসতে বলো উজির।’
বিরক্ত আলকামি মাথা নেড়ে রক্ষীকে ইশারা করলেন। রক্ষী চলে গেল গিয়াসুদ্দিনকে খবর দিতে।
খলিফার অন্দরমহলে যে কেউ দেখা করতে আসতে পারে না। যারা পারে তারা প্রত্যেকেই ক্ষমতাবান, স্ব স্ব ক্ষেত্রে ভাস্বর। এমন কেউ যদি খলিফার সঙ্গে দেখা করতে আসে তখন অন্য কেউ ভেতরে থাকলে হয় সে স্থানত্যাগ করে অথবা উপস্থিত থাকার জন্য খলিফার অনুমতি প্রার্থনা করে। এটাই দস্তুর। কিন্তু আলকামি সে সব কিছুই করল না। গ্যাঁট হয়ে একটা আসনে বসে রইল। গিয়াসুদ্দিন কক্ষে প্রবেশ করে খলিফাকে সম্ভাষণ জানালেন। তিনি আলকামির দিকে ফিরেও তাকালেন না। গা জ্বলে গেল আলকামির। এই বুড়ো বেয়াদবটা তাকে মোটে পাত্তা দেয় না। না দিক, সে শুধু হালাকু খাঁ-র উত্তরের অপেক্ষা করছে। মোঙ্গোলদের সঙ্গে তার গোপন আঁতাত আছে। সেই হালাকু খাঁ-র সহচর সুলতানচুককে বাগদাদের প্রবেশ এবং নির্গমন পথগুলোর বিশদ বর্ণনা দিয়েছে। এমনকী কোন গোপন পথে বাগদাদ থেকে বেরিয়ে পারস্যের দিকে যাওয়া যায় সেই পথেরও হদিশ দিয়েছে। তবেই না মোঙ্গোলরা সব ক’টা রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে এত সুচারুভাবে বাগদাদ অবরোধ করতে পেরেছে। মোঙ্গোলরা সন্ধি করুক আর না করুক, এই আনুগত্যের দাম সে পাবে এটা আলকামি জানে। একবার মাথার ওপরে হালাকু খাঁ-র হাত পড়ুক তার পরে এই বুড়ো বেয়াদবের খবর নেবে সে। গিয়াসুদ্দিন কিছু বলার আগেই সে আগ বাড়িয়ে বলে উঠল, ‘যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন। খলিফা এখন ব্যস্ত আছেন।’
খলিফা যে কেমন ব্যস্ত সে গিয়াসুদ্দিন দিব্যি বুঝতে পেরেছেন। তিনি অবাক হয়ে ভাবছিলেন, বাগদাদ ডুবে যেতে বসেছে অথচ খলিফার কোনও তাপ-উত্তাপ নেই! তিনি পাখিদের দানা খাওয়াচ্ছেন! চরিত্রের দুর্বলতা মানুষকে কোথায় নামিয়ে নিয়ে যায়! আলকামির কথার উত্তর না দিয়ে তিনি বললেন, ‘কয়েকটা নতুন পুঁথি অনুবাদ হয়েছে, আপনার পাঞ্জাটা একটু দরকার মহামহিম। পুঁথিগুলোতে খিলাফতের ছাপ দিয়ে আমি কিছুক্ষণ পরেই ফিরিয়ে দিয়ে যাব।’
কথাটা শুনে একটু যেন থমকে গেলেন খলিফা। আলকামির সঙ্গে এক বার দৃষ্টি বিনিময় করলেন তার পরে সামান্য সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে বললেন, ‘ওটা তো নেই। ওটা আমি হালাকু খাঁ-কে ভেট হিসেবে পাঠিয়েছি।’
খুবই সাধারণ কয়েকটা কথা কিন্তু কথাগুলো বোমার মতো আছড়ে পড়ল গিয়াসুদ্দিনের মাথার মধ্যে। তিনি ফ্যালফ্যাল করে খলিফার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। গলায় খানিকটা সাফাইয়ের সুর নিয়ে খলিফা বললেন, ‘আসলে পাঞ্জাটা আমি দিতে চাইনি। কিন্তু আলকামি বলল, হালাকু খাঁ ওটা দেখলে খুশি হবে। খলিফার পাঞ্জা তো যে-সে জিনিস নয়। সে বুঝবে আমি সত্যিই সন্ধি করতে চাইছি। এর মধ্যে কোনও ভড়ং নেই। বুঝতেই তো পারছেন এক সপ্তাহের ওপর বাগদাদ অবরোধ করে বসে আছে ওরা। এ বার এই অশান্তি থেকে মুক্তি চাইছি।’
অসহায় ভাবটা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল গিয়াসুদ্দিনের। টের পাচ্ছিলেন শিরা-উপশিরা বেয়ে তীব্র ক্রোধ তাঁর চেতনা আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। নিজের ক্রোধকে বড়ো বেশি ভয় পান গিয়াসুদ্দিন। কিন্তু আজ ক্রোধ দমন করার দিন নয়। সোজা এগিয়ে গেলেন আলকামির দিকে। কঠিন গলায় বললেন, ‘বর্বর, খলিফার পাঞ্জা বিদেশির হাতে তুলে দেওয়ার বুদ্ধি দিচ্ছ! আবার তুমি বলতে এসেছিলে আমি পারস্যের মানুষ! দেশদ্রোহী কোথাকার! নেহাত আমার রুচিতে বাধছে নয়তো চাবুক মেরে তোমায় সিধে করে দিতাম।’
‘এই মুখ সামলে,’ সটান দাঁড়িয়ে পড়ল আলকামি। অপমানে তার মুখ লাল হয়ে গেছে, ‘ভুলে যাবেন না আপনি প্রধান উজিরের সঙ্গে কথা বলছেন। আপনি জানেন, চাইলে আমি এক্ষুনি আপনাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারি?’
কয়েক মুহূর্ত আলকামির চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইলেন গিয়াসুদ্দিন তার পরে আচমকা তার গালে প্রকাণ্ড এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন।
লেখাপড়া নিয়ে থাকলে কী হবে আজও সূর্য ওঠার আগে উঠে পড়েন গিয়াসুদ্দিন। প্রতিদিন পাঁচ মাইল হাঁটেন। গায়ের জোর তাঁর নেহাত কম নয়। থাপ্পড় খেয়ে আলকামি উলটে পড়ল মাটিতে।
যতই ভাবের জগতে বাস করুন না কেন আল মুস্তাসিন দিনের শেষে তো খলিফা। তিনি বুঝতে পারলেন এক্ষুনি একটা রক্তারক্তি হতে চলেছে। আলকামি তলোয়ার কোষমুক্ত করার আগেই তাঁর ইশারায় রক্ষীরা এসে দু’জনের মাঝে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আলকামি কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই হাত তুলে তাকে থামালেন খলিফা। বললেন, ‘এখন যা বলার আমি বলব। গিয়াসুদ্দিন, উজিরের গায়ে হাত তুলে আপনি অন্যায় করেছেন। ক্ষমা চান। এই মুহূর্তে ক্ষমা চান।’
আগুন ঝলসে উঠল গিয়াসুদ্দিনের চোখে। একইসঙ্গে চোখ দু’টি জলে ভরে উঠল। সেই আগুন আর জল একপাত্রে ধারণ করে গিয়াসুদ্দিন বললেন, ‘আপনি আমায় মৃত্যুদণ্ড দিলেও আমি আলকামির কাছে ক্ষমা চাইব না মহামহিম। পাঞ্জাটা বিদেশির হাতে তুলে দেওয়া আপনার উচিত হয়নি।’
গিয়াসুদ্দিনের চোখে জল দেখে অন্তরে যেন একটু মর্মাহত হলেন খলিফা। বললেন, ‘পাঞ্জাটা নিয়ে এত ভাবছেন কেন আপনি? আর একটা পাঞ্জা বানিয়ে নিলেই হয়। আগের পাঞ্জাটা তো আপনিই বানিয়ে দিয়েছিলেন। তো আর একটা বানিয়ে দিতে বলুন।’
‘এত সোজা নয় মহামহিম। আরও হাজারটা পাঞ্জা বানানো যেতে পারে কিন্তু খলিফার পাঞ্জা বিদেশির হাতে তুলে দেওয়া মাতৃভূমিকে বিক্রি করে দেওয়ার সামিল। এই বুদ্ধিটা আলকামি আপনাকে দিয়ে যতটা অন্যায় করেছে, ওর বুদ্ধিতে সায় দিয়ে তার চেয়েও বেশি অন্যায় করেছেন আপনি। আমি আসি। আপনার মুখের ওপরে কথা বললাম। আমায় কী শাস্তি দেবেন জানাবেন। আমি মাথা পেতে নেব।’
খলিফার কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন গিয়াসুদ্দিন। লম্বা বারান্দায় এসে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন মাটিতে। দু’হাত ওপরে তুলে হাহাকার করে উঠলেন, ‘হে পরম করুণাময় আল্লাহ! এ তুমি কী করলে? কেন করলে? এই পাঞ্জা ছাড়া যে সবটা এলোমেলো হয়ে গেল।’
কান্না আটকাতে পারলেন না প্রৌঢ়। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। ঠিক তখনই পিঠে একটা হাত এসে পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, আবদুল রহমান। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন গিয়াসুদ্দিন। চোখ মুছে বললেন, ‘হালাকু খাঁ সন্ধি করতে রাজি হল কি হল না তাতে আর কিছু এসে যায় না আবদুল। আমার এত দিনের পরিশ্রমে জল ঢেলে দিয়েছেন খলিফা আর তাঁর পেয়ারের উজির। তুমি তো নিজে হাতে করেই দিয়ে এসেছ সে জিনিস। তাই না?’
আবদুল বললেন, ‘মুখ বন্ধ একটি পেটিকার মধ্যে পাঞ্জাটা ছিল আলমুহাল্লিম হালাকু খাঁ হাতে নেওয়ার আগে অবধি আমি জানতাম না খলিফা এই সর্বনাশ করে বসে আছেন।’
‘আমি জানি আবদুল। তুমি যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে তা হলে এই সর্বনাশ আটকাতে। যাই। সবটা শেষ হয়ে গেল।’
ক্লান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চললেন গিয়াসুদ্দিন। হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন আবদুল রহমান। কারণ যা ক্ষতি হয়েছে তা অবর্ণনীয়। খলিফার ওই পাঞ্জা শুধু পাঞ্জা নয়। গিয়াসুদ্দিনের গোপন সংগ্রহ যে প্রকোষ্ঠে থাকে তার চাবি। তিন বছর ধরে পাঞ্জার মতো দেখতে চাবিটি তৈরি করিয়েছিলেন গিয়াসুদ্দিন এবং এই গোটা পৃথিবীতে ওর আর কোনও জোড়া নেই। বিজ্ঞান আর জাদুবিদ্যার মিশেলে তৈরি হয়েছিল ওই আশ্চর্য বস্তুটি। গিয়াসুদ্দিন ভেবেছিলেন, আর সব চাবি হারিয়ে যেতে পারে কিন্তু খলিফার পাঞ্জা হারাবে না। তাই এই অদ্ভুত ব্যবস্থা। মাঝে মাঝে পুঁথিতে খিলাফতের ছাপ দেওয়ার জন্য তিনি পাঞ্জাটি চেয়ে আনতেন এবং গোপন প্রকোষ্ঠ খোলাপরা করতেন। কাজ মিটে গেলে আবার ফিরিয়ে দিতেন খলিফাকে। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে গিয়াসুদ্দিনের আশ্চর্য সংগ্রহ পেটের মধ্যে নিয়ে বসে থাকা গোপন প্রকোষ্ঠের একমাত্র চাবিটি আজ হালাকু খাঁ-র কাছে।
