লাপিস লাজুলি – ৫
॥ পাঁচ ॥
ফেব্রুয়ারি, বর্তমান কাল
গানটা প্রথম তিতাসের গলায় শুনেছিল পল্লব।
সেটা ছিল একটা শীতকাল। প্রেসিডেন্সির ফেস্ট মিলিউ-এর আগের রাত। সারারাত জেগে কলেজ সাজাচ্ছিল পল্লব, অমিয়, সঞ্জয়, সুপ্রতিমরা। মেসে ঢপ দিয়ে চলে এসেছিল তিতাসও। রাত তিনটে নাগাদ কাজ শেষ হয়ে গেছিল। ছেলেরা ফিরে যাচ্ছিল হিন্দু হস্টেলে। মেয়েরা যাচ্ছিল গার্লস কমন রুমে। ওখানে ঘণ্টাপাঁচেক ঘুমিয়ে নেবে তারা। পরের দিন সকাল থেকেই তো যুদ্ধ শুরু। একের পরে এক ইভেন্ট। পল্লবের হাত টেনে ধরেছিল তিতাস, ‘যাস না।’
প্রেসিডেন্সির ফেস্ট বরাবর কলেজের ছেলে-মেয়েরাই সাজায়। বাইরের কোনও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে বরাত দেওয়া হয় না। গত তিন দিন ধরে হাড়ভাঙা খাটনি গেছে। ঘুমে তখন চোখ জড়িয়ে আসছে পল্লবের। হাত-পা যেন আর চলছে না। কোমর টনটন করছে খুব। সে বলেছিল, ‘একটু ঘুমিয়ে নিই তিতাস? আর পারছি না। তুইও শুয়ে পড় না। গার্লস কমন রুমে ঢালা বিছানা পেতেছে।’
তিতাস বলেছিল, ‘আজ রাতে আমার আর ঘুম আসবে না। আয় না, দু’জনে একটু গল্প করি। কাল ফেস্ট শেষে যত ইচ্ছে ঘুমোস।’
বেকার বিল্ডিং-এর চওড়া সিঁড়ির ওপর এসে বসেছিল দু’জনে। বাড়তি প্লাইয়ের টুকরো, কাগজ, দড়ি এই সব এক জায়গায় করে আগুন জ্বালিয়েছিল তিতাস। উত্তুরে হাওয়া আগুনের শিখা ছুঁয়ে উষ্ণতা বয়ে নিয়ে আসছিল ওদের দু’জনের করতলে। দু’হাতে পল্লবের গাল ধরে ঠোঁটে একটা আলতো চুমু খেয়ে তিতাস বলেছিল, ‘আই ওয়্যার দ্য প্যান্ট ইন আওয়ার রিলেশনশিপ।’
আরাম খেতে খেতে পল্লব বলেছিল, ‘বাংলায় বল।’
‘এই কাজটা একটা ছেলের করার কথা। আমাদের সম্পর্কটায় আমি ছেলে, তুই মেয়ে।’
উৎসাহিত হয়ে আরও কাছে ঘেঁষে বসেছিল পল্লব, ‘আমি তো এটাই চাই তিতাস। ছেলে হওয়া খুব ঝক্কির। আমি তোর বউ হতে চাই। বেশ সারাদিন বাড়ি থাকব, রান্নাবান্না করব। ঘর গোছাব। তুই সংসার চালাবি। কাজ থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে সোফায় বসে পড়বি ধপ করে। আমি লেবুর জল বানিয়ে আনব আর ব্লোজব দেব।’
গুম করে পল্লবের পিঠে একটা কিল মেরেছিল তিতাস, ‘অসভ্য ছেলে। খাওয়া-দাওয়া ছাড়া কিছু ভাবতে পারিস না?’
বলেই একেবারে জাপটে ধরে নিয়েছিল। পল্লবকে টেনে শুইয়ে দিয়েছিল কোলের ওপরে। চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলেছিল, ‘এইজন্য আমি তোকে এত ভালোবাসি। তোর মধ্যে একটুও মেল ইগো নেই। তুই শুধু অভিমান করতে শিখেছিস।’
পল্লব বলেছিল, ‘একটা নতুন পদ্য কানের কাছে গুনগুন করছে। দাঁড়া তো…’
উঠে বসেছিল সে। মিনিট দু’য়েক চোখ বুজে চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, ‘শুনবি?’
ঘাড় নেড়েছিল তিতাস। না শুনে তার যাওয়ার জায়গা আছে? পল্লবের লেখাই তো তাদের প্রেমের প্রজাপতি। আস্তে আস্তে থেমে থেমে পল্লব বলেছিল, ‘সে সব কথা ফুরিয়ে যাওয়ার পরে/লাজুক লাজুক বেড়ালছানা চুমু/আগুনমাখা আটপৌরে হাওয়া/অপার্থিব ভাটিয়ালি, ঝুমুর/সে সব গান ফুরিয়ে যাওয়ার পরে/বেহায়া এক আঁধার নেমে আসে/সাহস পেয়ে বেড়ালছানা চুমু/গোল হয়ে শোয় ভালোবাসার পাশে…’
সোডিয়ামের হলুদ আলোয় ভেসে যাচ্ছিল চরাচর। ঝিকিয়ে উঠছিল ঘাসের বুকের হিম। হাওয়ার তালে নেচে উঠছিল আগুন। কেঁপে উঠছিল দেওয়াল জোড়া ছায়া। পল্লবকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলেছিল তিতাস, ‘ছেড়ে যাবি না তো কোনও দিন?’
তিতাসের হাত ধরে পল্লব বলেছিল, ‘মৃত্যুর আগের মুহূর্ত অবধি না।’
তার পরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল দু’জনে। কেউ কোনও কথা বলেনি। একটু একটু করে পুবের আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছিল। হাসিতে হাসিতে আলোক সাগরে আকাশের তারা কায়া ত্যাগ করছিল। বাতাসে ভাসছিল চন্দনগন্ধ। সেই ব্রাহ্ম মুহূর্তে তিতাস গানটা গেয়ে উঠেছিল,
‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছ/আমি শুনেছি সে দিন তুমি নোনাবালি তীর ধরে বহু দূর, বহু দূর হেঁটে এসেছ/আমি কখনো যাইনি জলে, কখনো ভাসিনি নীলে, কখনো রাখিনি চোখ ডানামেলা গাংচিলে/আবার যে দিন তুমি সমুদ্রস্নানে যাবে, আমাকেও সাথে নিয়ো, নেবে তো আমায়/বলো, নেবে তো আমায়…’
গানটা শেষ হতে ঘোর লাগা গলায় পল্লব জানতে চেয়েছিল, ‘কার গান রে?’
তিতাস বলেছিল, ‘মৌসুমী ভৌমিক।’
পল্লব বলেছিল, ‘জীবনে যত বার এই গানটা শুনব আমার এই দিনটার কথা মনে পড়বে।’
পাশের কোনও ফ্ল্যাট থেকে আলগোছে ভেসে আসছিল গানটা আর তিতাসকে দেওয়া কথা অনুসারে স্মৃতির সৌরভে হারিয়ে যাচ্ছিল পল্লব। বুঝতে পারেনি কখন চোখ ভিজে উঠেছে।
‘পল্লবদা, আপনি কাঁদছেন!’
রোশনির ডাকে চমকে তাকাল সে। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। দ্রুত চশমা খুলে চোখ মুছে বলল, ‘ও কিছু না। চা হল? দাও।’
ভাদুড়িমশায়ের বাড়ি থেকে রাগের মাথায় বেরিয়ে এসেছিল পল্লব। হু-হু করে গাড়ি ছুটিয়েছিল নিজের ফ্ল্যাটের উদ্দেশে। মাঝে বেশ কয়েক বার ফোন করেছিল অমিয়, অপালা আর সঞ্জয়। কারও ফোন ধরেনি সে। অসহায়তা, রাগ সবটা মিলেমিশে উন্মাদ করে তুলেছিল তাকে। কিন্তু ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে থমকে গেছিল। যেখানে তিতাস নেই সেখানে গিয়ে সে কী করবে? বুঝতে পারছিল, ফাঁকা ফ্ল্যাটটা তাকে গিলে খাবে। প্রতি মুহূর্তে মনে পড়াবে তিতাসের উপস্থিতি। তা হলে কোথায় যাবে সে? যাওয়ারও তো তেমন জায়গা নেই। জীবনে কাজের সঙ্গে সঙ্গে পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু বন্ধুর সংখ্যা কমে যায়। আর মন খারাপে মাথা রাখার জন্য তো একটা বন্ধু মানুষের কাঁধই লাগে। ফ্ল্যাটে না ঢুকে আবার গাড়িতে ফিরে এসেছিল পল্লব। গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাকে ক্লান্ত করে তুলেছিল ভেতর ভেতর। স্টিয়ারিং-এর ওপর মাথা রেখে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতেই পারেনি। ঘুম ভেঙেছিল ফোনের শব্দে। রোশনি ফোন করেছিল, ‘পল্লবদা, কোথায় আপনি?’
সে কথার উত্তর না দিয়ে পল্লব বলেছিল, ‘তুমি বাড়িতে আছ? তোমার বাড়ি যাওয়া যাবে?
কথাটা শুনেই রোশনির বুকের মধ্যে ভ্রমর গুনগুনিয়ে উঠেছিল। গলার আওয়াজে সেই গুঞ্জন প্রকাশ না করে রোশনি বলেছিল, ‘আছি। এক্ষুনি চলে আসুন।’
পল্লব আসবে বলে দ্রুত ঘরে পরার জামা পালটে একটু সেজে নিয়েছিল সে। প্রিয়তম এলে মেয়েমানুষ তার জন্য সাজবে না তো কার জন্য সাজবে? এই ক’দিন নিজেকে খুব শাসন করেছে রোশনি। বারবার নিজেকে বুঝিয়েছে, ছি! পল্লব অন্যের। পল্লব কমিটেড। প্রায় বিবাহিতই বলা চলে। বিবাহিত পুরুষের দিকে তাকাতে নেই। নিজের মানুষকে গোটাগুটি না পাওয়া বড়ো কষ্টের। কিন্তু দুনিয়ার নিয়মে যা অপ্রাপণীয় তার প্রতি আকর্ষণ তীব্রতম হয়। অতএব এত শাসনেও কাজ হচ্ছে না। যত সময় গড়াচ্ছে রোশনি বুঝতে পারছে, সে পল্লবের প্রেমে পড়ছে। যেমন-তেমন প্রেম নয়, বুকের ভেতরটা ছিঁড়েখুঁড়ে দেওয়া মারাত্মক এক প্রেম।
পল্লবকে উসকোখুসকো দেখেই সে বুঝেছিল কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে জল এগিয়ে দিয়েছিল। পল্লব বলেছিল, ‘জল না। চা খাওয়াবে?’
চায়ের কাপ দুটো সেন্টার টেবিলে রেখে পল্লবের পাশের চেয়ারটায় বসল রোশনি। একটু ইতস্তত করে পল্লবের হাতের ওপর হাত রাখল সে। বলল, ‘আমি জানি না কী ভাবে সান্ত্বনা দেব। ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা আমি জানি। আর এখানে তো তার সাথে যোগ হয়েছে উদ্বেগ। যদি এমন হতো আমি হারিয়ে গেলে তিতাস ফিরে আসত তা হলে আমি হারিয়ে যেতাম পল্লবদা। বিশ্বাস করুন।’
রোশনির কণ্ঠস্বরের সততা পল্লবকে স্পর্শ করল। রোশনির হাতের ওপরে আলতো চাপ দিয়ে সে বলল, ‘বালাই ষাট! তুমি কেন হারিয়ে যাবে! দেখছ না কেউ হারিয়ে গেলে কাছের মানুষেরা কেমন কষ্ট পায়? তুমি হারিয়ে গেলে তোমার প্রিয়জনেরা কষ্ট পাবেন।’
মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল রোশনির ঠোঁটের কোণে। বলল, ‘আমার জন্য চোখের জল ফেলার কেউ নেই।’
চমকে উঠল পল্লব। মানুষ সাধারণতঃ যন্ত্রণা ভুলে থাকতেই চায়। হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে কেউই ভালোবাসে না। তবু যখন বুকের গভীর গোপন অন্তঃস্থল থেকে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেদনা নির্গত হয় তখন তাকে হাহাকারের মতো শোনায়। হাসতে হাসতে বললেও পল্লব বুঝতে পারল, রোশনির এই কথাটুকুর আড়ালে এক দিগন্তলীন ব্যথার সমুদ্র আছে। নিজের আচরণে লজ্জিত হল সে। এই ক’দিনে রোশনির সঙ্গে তার একটা বন্ধুত্ব হয়েছে ঠিকই কিন্তু রোশনির ব্যাপারে সে প্রায় কিছুই জানে না। খানিকটা কৌতূহলের বশবর্তী হয়েই সে বলে উঠল, ‘এ কথাটা বললে কেন তুমি? তোমার মা বাবা?’
রোশনি বলল, ‘সে সব কথা পরে বলব আপনাকে। তার আগে আপনি বলুন কী হয়েছে?’
সকাল থেকে যা যা হয়েছে পল্লব সবটা খুলে বলল রোশনিকে। তার পরে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি, হয়তো সবার ভালোর জন্যই স্যার আমাকে যেতে দিলেন না। কিন্তু আমি যে কিছুতেই শান্ত হতে পারছি না রোশনি। ওরা ইরাকে গিয়ে দেবী ইনান্নার দণ্ড খুঁজে পাবে কি না আমি জানি না। কিন্তু তিতাসকে উদ্ধার করার এই জার্নিটায় যে আমার খুব থাকতে ইচ্ছে করছে।’
কথাটা শেষ হতে-না-হতেই পল্লবের ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। অচেনা কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না এখন। পল্লব কেটে দিল ফোনটা। কাটতে-না-কাটতেই আবার ফোন। একই নম্বর থেকে। খুব বিরক্ত হল পল্লব। বলল, ‘দেখেছ কেমন ননসেন্স? কেটে দিলাম মানে যে ফোনটা ধরতে চাইছি না সেই বোধটাও নেই। বার বার ফোন করে যাচ্ছে।’
রোশনি বলল, ‘ধরেই নিন না। হয়তো কোনও আরজেন্সি আছে।’
‘না না, মোটেই ধরব না। কিচ্ছু আরজেন্সি নেই। খালি বদমায়েশি।’ এই সব কথোপকথনের মাঝেই রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল ফোনটা এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আবারও বেজে উঠল। সেই একই নম্বর। এবার একটু থমকে গেল পল্লব। সন্দিগ্ধ হয়েই ফোনটা রিসিভ করল, ‘হ্যালো।’
ও পাশ থেকে একটা লোক ধমকে উঠল, ‘ফোন ধরছেন না কেন? কত বার ফোন করতে হয় আপনাদের?’
লোকটার ঔদ্ধত্যে অবাক হল পল্লব। অচেনা লোকের সঙ্গে কে এ ভাবে কথা বলে! ঝাঁঝালো গলায় সে বলল, ‘আমার ফোন আমি কখন ধরব সে কৈফিয়ত কি আপনাকে দিতে হবে? কে আপনি?’
‘আপনি ফোন না ধরলে যে আমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে মশাই। ওপরওলারা তো আর আমাদের মানুষ বলে মনে করে না। গাঁতন দিতে পারলেই খুশি। ছেলের মাধ্যমিক পরীক্ষা। ছুটি নিয়ে পরীক্ষার হলের বাইরে বসে ছিলাম। বড়োবাবু ফোন করে হুকুম দিলেন, এখুনি থানায় এসো। বউকে ছেলের কাছে যেতে বলে গেলাম। চাকরি করি মানেই তো চাকর। হাতে একটা সিল করা খাম ধরিয়ে বললেন, এক্ষুনি পল্লব চক্রবর্তীকে দিয়ে এসো। তা আপনার ঠিকানা জোগাড় করে এসে দেখছি ফ্ল্যাট বন্ধ। সেই থেকে ফোন করে যাচ্ছি। কোথায় আপনি? আমি বাঁশদ্রোণী থানার সেকেন্ড অফিসার সবিতাব্রত রক্ষিত। বড়োবাবুর হুকুম আছে, খামটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনাকে পৌঁছে দিতে হবে।’
সিল করা খাম, বড়োবাবু, বাঁশদ্রোণী থানা, সবিতাব্রত রক্ষিত… সবটা মিলিয়ে একটু ঘেঁটেই গেল পল্লব। সবিতাব্রত বলে উঠলেন, ‘ও মশাই, মৌনব্রত নিলেন যে! তাড়াতাড়ি বলুন কোথায় আছেন? আপনাকে খামটা হ্যান্ডওভার করে আমি ছেলের কাছে যাব।’
গলা ঝেড়ে পল্লব বলল, ‘আপনি আমার ফ্ল্যাটের ওখানেই থাকুন। আমি আসছি।’
‘না না, আপনি এলে হবে না। হুকুম আছে, আমাকে আপনার কাছে গিয়ে দিয়ে আসতে হবে। কেন আমার সময় নষ্ট করছেন দাদা? বলুন না কোথায় আছেন?’
‘কাছেই আছি। এই গলফ ক্লাব রোডের দিকে। আমি আপনার নম্বরে লোকেশন পাঠাই?’
‘পাঠান।’
ফোনটা কেটে গেল। সবিতাব্রতর নম্বরে লোকেশনটা পাঠিয়ে মুখ তুলতেই রোশনি বলল, ‘এনিথিং রং?’
হতাশ মাথা নেড়ে পল্লব বলল, ‘জানি না।’
***
পাঁচ মিনিট হল সবিতাব্রত খামটা দিয়ে চলে গেছেন। খুবই সাদামাটা দেখতে খামটার ভেতর থেকে বেরিয়েছে একটা এয়ার টিকিট। কলকাতা-মুম্বই সন্ধে ছ’টার ফ্লাইট। পল্লবেরই নামে কাটা হয়েছে টিকিটটা। সঙ্গে একটা চিরকুট। তাতে একটা ফোন নম্বর লেখা। অবাক গলায় রোশনি বলল, ‘এ সব কী পল্লবদা? কে পাঠাল আপনাকে? পুলিশ এসে দিয়ে গেল! কী জানি! আমার খুব কনফিউজড লাগছে।’
মাথা নাড়ল পল্লব। বলল, ‘কনফিউশন তো আমারও হচ্ছে রোশনি। কী যে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি বরং নম্বরটায় ফোন করে দেখি। তাই না?’
‘সেই ভালো। একটু লাউড স্পিকারে দিন তো। আমিও শুনি।’
‘হুম,’ নম্বরটায় ফোন করে ফোনটা লাউড স্পিকারে দিল পল্লব।
দু’বার রিং হতেই একটা ভারী গলা ফোন ধরল। চোস্ত হিন্দিতে বলল, ‘নমস্তে পল্লবজি। আপনি টিকিট পেয়ে গেছেন তো?’
পল্লব একটু আমতা-আমতা করেই বলল, ‘হ্যাঁ পেয়েছি। কিন্তু…’
কথা কেটে ভারী গলা বলল, ‘শুনুন, আমি এখন একটু ব্যস্ত আছি। আপনি ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা এয়ারপোর্টে নেমে আমাকে আবার ফোন করবেন। আমার লোক আপনাকে রিসিভ করে নেবে। রাখছি।’
‘শুনুন, শুনুন,’ প্রায় আর্তনাদ করে উঠল পল্লব।
‘বলুন।’
‘আপনি কে বলছেন? আপনার পরিচয়?’
‘অশোক হুকুমচাঁদ মিত্তল, কমিশনার অব পুলিশ, মুম্বই।’
ফোনটা কেটে গেল। অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল রোশনি আর পল্লব। কিছুক্ষণ দু’জনের মুখেই কথা সরল না। তার পরে পল্লবই প্রথমে বলে উঠল, ‘এটা কোনও স্ক্যাম নয় তো রোশনি?’
‘এক মিনিট দাঁড়ান তো,’ দ্রুত গুগল করল রোশনি।
মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে রাশভারী এক ভদ্রলোকের ছবি। অশোক হুকুমচাঁদ মিত্তল, কমিশনার অব পুলিশ, মুম্বই। পল্লব বলল, ‘নাম নিয়ে তো যে কেউই ফোন করতে পারে তাই না?’
রোশনি বলল, ‘তা পারে। তবে এটা স্ক্যাম কি না শিওর হওয়ার আর একটা উপায় আছে।’
‘কী?’
‘কুন্তক চট্টোপাধ্যায়, আমাদের কাগজের খুব বড়ো রিপোর্টার। পুলিশ মহলে ওর অনেক চেনাশোনা আছে। খুব হেল্পফুল। ওকে একটা ফোন করি।’
ফোন করল রোশনি। কুম্ভক কনফার্ম করলেন বাঁশদ্রোণী থানার সেকেন্ড অফিসারের নাম সত্যিই সবিতাব্রত রক্ষিত। হোয়াটসঅ্যাপে একটা ছবিও পাঠালেন। ছবি দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল একটু আগে এই ভদ্রলোক এসেই খামটা দিয়ে গেছেন।
এ বার যেন আরও বেশি ঘাবড়ে গেল পল্লব। বলল, ‘এখন আমার কী করা উচিত রোশনি? ওরা আমাকে মুম্বই যেতে বলছে কেন? কিছু তো খোলসা করে বলছেও না। আমি তো বেআইনি কিছু করিনি। রাষ্ট্রবিরোধী কোনও লেখাও লিখিনি। তা হলে?’
‘সেটা জানার জন্য আমাদের মুম্বই যেতে হবে পল্লবদা।’
‘আমাদের মানে?’
‘আমিও যাব আপনার সঙ্গে।’
‘তুমি?’
‘হ্যাঁ, এই অবস্থায় আমি আপনাকে একা ছাড়ব না। যদি কোনও সমস্যা হয় আমি অন্তত চারটে ফোনাফুনি তো করতে পারব।’
পল্লবের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল রোশনি। হঠাৎ করেই যেন মনে অনেকটা জোর পেল পল্লব। বলল, ‘চলো তবে।’
***
কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে অশোক হুকুমচাঁদ মিত্তল বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে একটা ভিডিয়ো কল হবে। একটু পরেই শুরু হয়ে যাবে। ততক্ষণ কফি আর কুকিজ খান। ফিল ফ্রি।’
মিত্তল সাহেব বলছেন বটে ‘ফিল ফ্রি’। কিন্তু ভিন রাজ্যের পুলিশ কমিশনারের ব্যক্তিগত কক্ষে বসে এবং কেন বসে আছি সেই কারণ জানা না থাকলে ফ্রি ফিল করা যে কতটা কঠিন সেটা পল্লব আর রোশনি ভালোই টের পাচ্ছিল। খুবই ভালো মানের কফি কিন্তু তেঁতো লাগছিল জিভে। পল্লবের ইচ্ছে করছিল প্রশ্ন করে, কার সঙ্গে ভিডিয়ো কল? কিন্তু প্রশ্নটা গিলে নিল। এই কয়েক ঘণ্টায় সে বুঝে গেছে এদের কাউকে প্রশ্ন করে কোনও লাভ নেই। এয়ারপোর্টে একটা লোক হাতে পল্লবের নামের প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। পল্লব তার কাছে যেতে ভাবলেশহীন মুখে বলল, ‘চলিয়ে।’
তার পিছু পিছু পার্কিং-এ দাঁড়িয়ে থাকা একটা ইনোভা গাড়ির কাছে আসা গেল। পল্লব জানতে চাইল, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
লোকটা বলল, ‘চলিয়ে।’
হতাশ পল্লব উঠে পড়ল গাড়িটায় কিন্তু রোশনি উঠতে যেতেই বাধা দিল লোকটা। তার ওপরে হুকুম আছে শুধু পল্লবকে নিয়ে যাওয়ার। সঙ্গে কেউ যাবে এমন কোনও নির্দেশ তার কাছে নেই। প্রথমে তাকে খানিকক্ষণ বোঝানোর চেষ্টা করেছিল পল্লব তার পরে সেও বেঁকে বসেছিল। রোশনি যদি না যায় সেও যাবে না। লোকটা একটুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল পল্লবের দিকে। বলল, ‘চলিয়ে।’
গাড়িটা ওদের নিয়ে এসেছিল পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে। রীতিমতো সমাদর করেছেন মিত্তল সাহেব কিন্তু পল্লব যত বারই জানতে চেয়েছে কেন তাদের এখানে আনা হল তত বারই বলেছেন, ‘বসুন না। কফি আর কুকিজ খান। ফিল ফ্রি।’
এই এতক্ষণে নতুন একটা বিষয় বললেন, ভিডিয়ো কল হবে।
যা পারে করুক এরা। পল্লবের আর ভালো লাগছে না। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজল সে আর ঠিক তখনই মিত্তল সাহেবের ল্যাপটপটা শব্দ করে উঠল। এতক্ষণ একটু গা এলিয়েই বসেছিলেন মিত্তল সাহেব। ল্যাপটপে রিং হতেই অ্যাটেনশন হয়ে গেলেন। সজাগ ভঙ্গিতে ল্যাপটপের বোতাম টিপেই উঠে দাঁড়ালেন। স্যালুট করে ইংরেজিতে বললেন, ‘গুড ইভনিং স্যার। মিস্টার চক্রবর্তী আমার সঙ্গেই আছেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর এক মহিলা বন্ধুও আছেন। মিস্টার চক্রবর্তী বলেছেন যা কথা বলার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়েই বলবেন। ওই বন্ধুর উপস্থিতিতে কি আপনি কথা বলবেন স্যার?’
ল্যাপটপের স্ক্রিনে কে আছে তাকে দেখতে পাচ্ছে না পল্লবরা। মিত্তল সাহেবের কানে ইয়ারপ্লাগ গোঁজা। উলটো দিকের মানুষটা কী বলছে তাও শোনা যাচ্ছে না। মিত্তল সাহেব বললেন, ‘ওকে স্যার। তা হলে আমি ওঁদের কানেক্ট করছি।’
রিমোট টিপে দেওয়ালের বড়ো টিভিটা চালিয়ে দিলেন তিনি। বিস্ময়ে খাবি খেতে খেতে পল্লব দেখল টিভির পর্দা থেকে তার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন সমীরণ বসাক, ফরেন সেক্রেটারি অব ইন্ডিয়া। রোশনিও স্তম্ভিত হয়ে গেল। সাংবাদিকতা করার সূত্রে সে এই ভদ্রলোককে চেনে। ভদ্রলোকের অনেক ইন্টারভিউ দেখেছে। সরস মন্তব্য এবং সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য এই ব্যুরোক্র্যাট বেশ বিখ্যাত। পল্লব কিছু বলার আগেই সমীরণ বললেন, ‘তোমাকে এই সারপ্রাইজটা দেওয়ার জন্য দুঃখিত পল্লব। কিন্তু বিশেষ কিছু কারণে আমাকে এই গোপনীয়তা বজায় রাখতে হয়েছে। আশা করি মিস্টার মিত্তল তোমাদের যত্নে ত্রুটি রাখেননি।’
পল্লব উত্তর দেওয়ার আগেই সমীরণ আবারও বললেন, ‘আমি বেশিক্ষণ সময় নেব না। আমি এই ভিডিয়ো কনফারেন্সটা কলকাতাতেই করতে পারতাম কিন্তু আমার মনে হল, আমি এখন তোমাকে যে প্রস্তাবটা দেব আর তাতে যদি তুমি সম্মত হও তা হলে সেটা মুম্বইতে করাই সুবিধেজনক হবে। আমি এখন তোমাকে খুব গোপনীয় একটা কথা বলতে চাই। তোমার কি মনে হয় তোমার সঙ্গে যিনি আছেন তিনি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য?’
পল্লব একবার রোশনির দিকে তাকিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। সমীরণ রোশনির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম, আমি আপনাকে চিনি না। পল্লবের কথায় আপনার ওপরে ভরসা করছি। আমি আশা করব এখন আমি যা বলব সেগুলো আপনি আর দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির সঙ্গে শেয়ার করবেন না। ক্লিয়ার?
ভদ্রলোকের মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব আছে। রোশনি মাথা নাড়ল, ‘ক্লিয়ার স্যার।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ। শোনো পল্লব, আগামীকাল সকালে মুম্বই বন্দর থেকে স্বর্ণ গোদাবরী নামে একটা মালবাহী জাহাজ ইরাকের উম কাসর বন্দরের উদ্দেশে রওনা দেবে। ভারত থেকে চাল আর আটা যাবে ইরাকে। তুমি যদি চাও ওই জাহাজে ইরাক চলে যেতে পারো।’
হাঁ করে সমীরণের দিকে তাকিয়ে রইল পল্লব। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না তার। পল্লবের অবস্থা দেখে সমীরণ বললেন, ‘তুমি যে ইরাক যাওয়ার জন্য কতটা মরিয়া সেটা আমি সঞ্জয় আর অপালার কাছ থেকে শুনেছি। ওরা আজ রাতে বাগদাদের ফ্লাইট ধরবে। ওরা জিয়ারত ভিসা নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি তো তোমাকে ওদের সঙ্গে পাঠাতে পারব না। স্যার অসন্তুষ্ট হবেন। তাই তোমার জন্য আমি এই আলাদা ব্যবস্থা করেছি।’
পল্লবের চোখে জল এসে গেল। সে বলল, ‘স্যার, আমি আপনার এই উপকার কোনও দিন ভুলব না। আপনাকে যে কী ভাবে ধন্যবাদ…’
‘ধন্যবাদ পরে দিয়ো’, কথা কেটে বললেন সমীরণ, ‘তার আগে কয়েকটা জরুরি কথা শুনে নাও। তোমাকে যে ভাবে পাঠানো হচ্ছে সেটা সম্পূৰ্ণ বেআইনি। ইরাকে গিয়ে তুমি যত দিন থাকবে সারভাইব করার জন্য আমরা তোমাকে সব রকম সাপোর্ট দেব। কিন্তু যদি কোনও ভাবে ধরা পড়ে যায় যে তুমি ইরাকি নও, ভারতের বাসিন্দা, তা হলে ইরাক গভর্নমেন্ট তোমাকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করবে এবং ওদের আইন অনুসারে সাজা দেবে। তখন কিন্তু আমি তোমাকে চিনতে পারব না। তুমি বুঝতে পারছ তো আমি কী বলছি? এর পরেও যদি তুমি যেতে চাও মিত্তলকে জানিয়ো। ও বাকি ব্যবস্থা করে দেবে। বাই। আমাকে এ বার যেতে হবে।’
‘স্যার’, ডেকে উঠল পল্লব, ‘একটা কথা ছিল।’
‘বলো।’
‘ভাদুড়ি স্যার তো চান না আমি যাই। তা হলে আপনি কেন…’
স্মিত হাসলেন সমীরণ, ‘দিল্লি যেতে যেতে সঞ্জয়ের কাছে তোমার আর তিতাসের প্রেমের গল্প শুনছিলাম যে। আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসা অসাধ্যসাধন করতে পারে। অল দ্য বেস্ট পল্লব।’
ভিডিয়ো কলটা সবে বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন সমীরণ তার আগেই পল্লবের পাশে বসা মেয়েটি বলে উঠল, ‘ওয়ান মোর মিনিট স্যার। আমার একটা কথা আছে।’
মেয়েটির সঙ্গে কথা না বললেও মেয়েটিকে লক্ষ করছিলেন সমীরণ। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। উজ্জ্বল চোখ। মেয়েটির মধ্যে নারীসুলভ কমনীয়তার অভাব আছে আর সেটিই যেন এর সৌন্দর্যকে আরও ধারালো করে তুলেছে। বললেন, ‘বলুন ম্যাডাম।’
‘ম্যাডাম নয় স্যার, প্লিজ কল মি রোশনি।’
‘ওকে ফাইন। বলুন কী বলতে চান রোশনি।’
‘স্যার, আমি জানি আপনি কে। আপনার কতটা ক্ষমতা তাও জানি। তাই একটা অনুরোধ করছি। পল্লবদাকে আমি একা ছাড়ব না। আপনি প্লিজ ওর সঙ্গে আমারও যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন।’
চমকে উঠল পল্লব, ‘কী পাগলের মতো কথা বলছ রোশনি? তুমি বুঝতে পারছ না ওখানে কতটা রিস্ক?’
দৃঢ় গলায় রোশনি বলল, ‘বুঝতে পারছি বলেই তো সঙ্গে যেতে চাইছি। বেড়াতে যাওয়ার হলে যেতে চাইতাম না।’
রোশনির এই ব্যবহারে সমীরণের সামনে একটু অপ্রস্তুতেই পড়ে গেল পল্লব। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে বলল, ‘আপনি কতটা ব্যস্ত আমি জানি স্যার। তবু আমাকে দুটো মিনিট সময় দিন। আমি রোশনির সঙ্গে কথা বলে আসছি।’
বলেই সমীরণের উত্তরের অপেক্ষা না করেই রোশনির হাত ধরে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল সে। মিত্তল সাহেব বলে উঠলেন, ‘এ তো ভালো ঝামেলা হল। কী করব স্যার?’
হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো ঠিক করে সমীরণ বললেন, ‘দু’জনেরই যাওয়ার ব্যবস্থা করো।’
‘অ্যাঁ? দু’জনই যাবে?’
‘হুম। ছেলেটা মেয়েটাকে কনভিন্স করতে পারবে না। মেয়েটা ওকে ভালোবাসে।’
‘কী বলছেন স্যার? ছেলেটা তো অন্য কাউকে একটা ভালোবাসে বললেন?’
‘হুম। তাতে কী?’
‘তাও ঠিক। কিন্তু আপনি কী করে বুঝলেন মেয়েটা ছেলেটাকে ভালোবাসে?’
হাসলেন সমীরণ, ‘ভালোবাসার জন্য এক দিন আমি অন্ধকারে ডুবে যেতে বসেছিলাম হে মিত্তল। তখন এক যোগীপুরুষ আমাকে ভালোবেসেই আবার আলোয় ফিরিয়ে এনেছিলেন। আমি ভালোবাসা টের পাই। যাই হোক, তুমি একটু দেখে নিয়ো। দরকার হলে আমায় ফোন কোরো। বাই।’
‘ওকে স্যার,’ স্যালুট করলেন অশোক হুকুমচাঁদ মিত্তল।
টিভির স্ক্রিনটা অন্ধকার হয়ে গেল। নিজের চেয়ারে বসে এক চুমুক কফি খেলেন মিস্টার মিত্তল। সমীরণ বসাকের ওপরে তাঁর অগাধ আস্থা। লোকটার ঈশ্বরের মতো কানেকশন। আলাপ হয়েছিল বছর দশেক আগে। একটা জটিল কেস সলভ করতে একইসঙ্গে ট্রান্সফার হয়েছিল দু’জনের। সমীরণ ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে এসেছিলেন আর তিনি এসেছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অব পুলিশ হয়ে। তখনই খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন সমীরণের বুদ্ধিমত্তা, উদারতা। বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল তাঁদের। তার পরে বছর তিনেক আগে বম্বের এক মাঝারি মাপের মাফিয়া এক হিরোইনকে খুন করে গা ঢাকা দিয়েছিল। নাগরিক সমাজ খুব খেপে উঠেছিল। মিস্টার মিত্তলের চাকরি যায়-যায় অবস্থা। সে অবস্থায় সমীরণ বসাক লিড দিয়েছিলেন, লোকটা উগান্ডায় গিয়ে লুকিয়ে আছে। সমীরণই টেনে বার করে এনেছিলেন লোকটাকে। সেই থেকে সমীরণকে অন্ধের মতো মেনে চলেন মিস্টার মিত্তল। লোকটা সব ঠিক বলে। পিএ-কে ফোন করে কাছের কোনও ভালো হোটেলে দুটো রুম বুক করতে বলে দিলেন তিনি। কথা বলে সবে ফোনটা রেখেছেন পল্লব আর রোশনি ঘরে এসে ঢুকল। তারা কিছু বলার আগেই মিস্টার মিত্তল বললেন, ‘আমি আপনাদের জন্য দুটো রুম বুক করতে বলে দিয়েছি। আমার পিএ সত্যপ্রকাশ আপনাদের অ্যাটেন্ড করবে।’
রোশনি আর পল্লব অবাক হয়ে চোখাচোখি করল। পল্লব অস্ফুটে বলল, ‘পুলিশ কি মনের কথাও পড়তে পারে?’
