শৈলজা জিজ্ঞাসা করল, “ভাই, আজ কি তোমার শরীর ভালো নেই? মাথা ধরেছে?”
কমলা বলল, “না। খুড়ামশায়কে দেখছি না কেন?”
শৈল বলল, “ইস্কুলে বড়োদিনের ছুটি আছে, দিদিকে দেখার জন্য মা তাঁকে এলাহাবাদে পাঠিয়ে দিয়েছেন– কিছুদিন থেকে দিদির শরীর ভালো নেই।”
কমলা বলল, “তিনি কবে ফিরবেন?”
শৈল। তাঁর ফিরতে অন্তত সপ্তাহখানেক দেরি হওয়ার কথা। তোমাদের বাংলো সাজানো নিয়ে তুমি সমস্ত দিন বড়ো বেশি পরিশ্রম কর, আজ তোমাকে বড়ো খারাপ দেখাচ্ছে। আজ সকাল সকাল খেয়ে শুতে যাও।
শৈলকে কমলা যদি সকল কথা বলতে পারত তবে বাঁচত, কিন্তু বলার কথা নয়। “যাকে এতকাল আমার স্বামী বলে জেনেছি সে আমার স্বামী নয়”, এ কথা আর যাকে হোক, শৈলকে কোনোমতেই বলা যায় না।
কমলা শোয়ার ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে প্রদীপের আলোকে আরেকবার রমেশের সেই চিঠি নিয়ে বসল। চিঠি যাকে উদ্দেশ্য করে লেখা হচ্ছে তার নাম নেই, ঠিকানা নেই, কিন্তু সে যে স্ত্রীলোক, রমেশের সঙ্গে তার বিবাহের প্রস্তাব হয়েছিল ও কমলাকে নিয়েই তার সঙ্গে সম্বন্ধ ভেঙে গেছে, তা চিঠি থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়। যাকে চিঠি লিখছে, রমেশ যে তাকেই সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে এবং দৈবদুর্বিপাকে কোথা থেকে কমলা তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়াতেই অনাথার প্রতি দয়া করে এই ভালোবাসার বন্ধন সে অগত্যা চিরকালের মতো ছিন্ন করতে প্রবৃত্ত হয়েছে, এ কথাও চিঠিতে গোপন নেই।
সেই নদীর চরে রমেশের সঙ্গে প্রথম মিলন হওয়া থেকে শুরু করে আর এই গাজিপুরে আসা পর্যন্ত সমস্ত স্মৃতি কমলা মনে মনে আবৃত্তি করে নিল; যা অস্পষ্ট ছিল সমস্ত স্পষ্ট হল।
রমেশ যখন বরাবর তাকে পরের স্ত্রী বলে জেনেছে এবং ভেবে অস্থির হচ্ছে যে তাকে নিয়ে কী করবে, তখন যে কমলা নিশ্চিন্তমনে তাকে স্বামী জেনে অসংকোচে তার সঙ্গে চিরস্থায়ী ঘরকন্নার সম্পর্ক পাতাতে বসেছে, এর লজ্জা কমলাকে বারবার করে তপ্তশেলে বিঁধতে থাকল। প্রতিদিনের বিচিত্র ঘটনা মনে পড়ে সে যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। এ লজ্জা তার জীবনে একেবারে মেখে গেছে, এ থেকে কিছুতেই আর তার উদ্ধার নেই।
রুদ্ধঘরের দরজা খুলে ফেলে কমলা খিড়কির বাগানে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। অন্ধকার শীতের রাত্রি, কালো আকাশ কালো পাথরের মতো কনকনে ঠাণ্ডা। কোথাও বাষ্পের লেশ নেই; তারাগুলো সুস্পষ্ট জ্বলছে।
সামনে খর্বাকার কলমের আমের বন অন্ধকার বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কমলা কোনোমতেই কিছুই ভেবে পেল না। সে ঠাণ্ডা ঘাসের ওপর বসে পড়ল, কাঠের মূর্তির মতো স্থির হয়ে রইল; তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল বের হল না।
এমন কতক্ষণ সে বসে থাকত বলা যায় না; কিন্তু তীব্র শীত তার হৃৎপিণ্ডকে দোলিয়ে দিল, তার সমস্ত শরীর ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। গভীর রাত্রে কৃষ্ণপক্ষের চন্দ্রোদয় যখন নিস্তব্ধ তালবনের অন্তরালে অন্ধকারের একটা প্রান্তকে ছিন্ন করে দিল তখন কমলা ধীরে ধীরে উঠে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
সকালবেলা কমলা চোখ মেলে দেখল, শৈল তার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক বেলা হয়ে গেছে বুঝে লজ্জিত কমলা তাড়াতাড়ি বিছানার ওপর উঠে বসল।
শৈল বলল, “না ভাই, তুমি উঠো না, আর একটু ঘুমোও– নিশ্চয় তোমার শরীর ভালো নেই। তোমার মুখ বড়ো শুকনো দেখাচ্ছে, চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে। কী হয়েছে ভাই, আমাকে বলো না।” বলে শৈলজা কমলার পাশে বসে তার গলা জড়িয়ে ধরল।
কমলার বুক ফুলে উঠতে লাগল, তার অশ্রু আর বাধা মানে না। শৈলজার কাঁধের ওপর মুখ লুকিয়ে তার কান্না একেবারে ফেটে বের হল। শৈল একটা কথাও না বলে তাকে দৃঢ় করে আলিঙ্গন করে ধরল।
একটু পরেই কমলা তাড়াতাড়ি শৈলজার বাহুবন্ধন ছাড়িয়ে উঠে পড়ল, চোখ মুছে ফেলে জোর করে হাসতে লাগল। শৈল বলল, “নাও নাও, আর হাসতে হবে না। ঢের ঢের মেয়ে দেখেছি, তোমার মতো এমন চাপা মেয়ে আমি দেখিনি। কিন্তু তুমি মনে করছ আমার কাছে লুকোবে– আমাকে তেমন হাবা পাওনি। তবে বলব? রমেশবাবু এলাহাবাদে গিয়ে অবধি তোমাকে একখানি চিঠি লেখেননি তাই রাগ হয়েছে– অভিমানিনী! কিন্তু তোমারও বোঝা উচিত, তিনি সেখানে কাজে গেছেন, দু-দিন বাদেই আসবেন, এর মধ্যে যদি সময় করে উঠতে না পারেন তাই বলে কি অত রাগ করতে আছে। ছি! তাও বলি ভাই, তোমাকে আজ এত উপদেশ দিচ্ছি, আমি হলেও ঠিক ঐ কাণ্ডটি করে বসতাম। এমন মিছিমিছি কান্না মেয়েমানুষকে অনেক কাঁদতে হয়। আবার এই কান্না ঘুচে গিয়ে যখন হাসি ফুটে উঠবে তখন কিছুই মনে থাকবে না।” এই বলে কমলাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে শৈল বলল, “আজ তুমি মনে করছ, রমেশবাবুকে আর কখনো তুমি মাপ করবে না– তাই না? আচ্ছা, সত্যি বলো।”
কমলা বলল, “হ্যাঁ, সত্যিই বলছি।”
শৈল কমলার গালে করতলের আঘাত করে বলল, “ইস! তাই বৈকি! দেখা যাবে। আচ্ছা, বাজি রাখো।”
কমলার সঙ্গে কথাবার্তা হওয়ার পরেই শৈল এলাহাবাদে তার বাবাকে চিঠি পাঠাল। তাতে লিখল, “কমলা রমেশবাবুর কোনো চিঠিপত্র না পেয়ে অত্যন্ত চিন্তিত আছে। একে বেচারা নতুন বিদেশে এসেছে, তার ওপর রমেশবাবু যখন-তখন তাকে ফেলে চলে যাচ্ছেন এবং চিঠিপত্র লিখছেন না, এতে তার কী কষ্ট হচ্ছে একবার ভেবে দেখো দেখি। তাঁর এলাহাবাদের কাজ কি আর শেষ হবে না নাকি? কাজ তো ঢের লোকের থাকে, কিন্তু তাই বলে দু-ছত্র চিঠি লিখার কি অবসর পাওয়া যায় না?”
খুড়ো রমেশের সঙ্গে দেখা করে তার কন্যার পত্রের অংশবিশেষ শুনিয়ে ভর্ৎসনা করলেন। কমলার দিকে রমেশের মন যথেষ্ট পরিমাণে আকৃষ্ট হয়েছে এ কথা সত্যি, কিন্তু আকৃষ্ট হয়েছে বলেই তার দ্বিধা আরো বেড়ে উঠল।
এই দ্বিধার মধ্যে পড়ে রমেশ কোনোমতেই এলাহাবাদ থেকে ফিরতে পারছিল না। এদিকে খুড়োর কাছ থেকে শৈলের চিঠি শুনল।
চিঠি থেকে বেশ বুঝতে পারল, কমলা রমেশের জন্য বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করছে– সে কেবল নিজে লজ্জায় লিখতে পারেনি।
এতে রমেশের দ্বিধার দু-শাখা দেখতে দেখতে একটাতে এসে মিলে গেল। এখন তো কেবলমাত্র রমেশের সুখদুঃখ নিয়ে কথা নয়, কমলাও যে রমেশকে ভালোবেসেছে। বিধাতা যে কেবল নদীর চরের ওপর তাদের দু-জনকে মিলিয়ে দিয়েছেন তা নয়, হৃদয়ের মধ্যেও এক করেছেন।
এই ভেবে রমেশ আর বিলম্বমাত্র না করে কমলাকে এক চিঠি লিখে বসল। লিখল–
প্রিয়তমাসু–
কমলা, তোমাকে এই-যে সম্ভাষণ করলাম, এটাকে চিঠি লেখার একটা প্রচলিত পদ্ধতিপালন বলে গণ্য করো না। যদি তোমাকে আজ পৃথিবীতে সকলের চেয়ে প্রিয় বলে না জানতাম তবে কখনোই আজ “প্রিয়তমা” বলে সম্ভাষণ করতে পারতাম না। যদি তোমার মনে কখনো কোনো সন্দেহ হয়ে থাকে, যদি তোমার কোমল হৃদয়ে কখনো কোনো আঘাত করে থাকি, তবে এই যে আজ সত্যি করে তোমাকে ডাকলাম “প্রিয়তমা” এতেই আজ তোমার সমস্ত সংশয়, সমস্ত বেদনা নিঃশেষে ক্ষালন করে দিক। এর চেয়ে তোমাকে আর বেশি বিস্তারিত করে কী বলব? এ পর্যন্ত আমার অনেক আচরণ তোমার কাছে নিশ্চয় ব্যথাজনক হয়েছে– সেজন্য যদি তুমি মনে মনে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে থাক তবে আমি প্রতিবাদী হয়ে তার লেশমাত্র প্রতিবাদ করব না– আমি কেবল বলব, আজ তুমি আমার প্রিয়তমা, তোমার চেয়ে প্রিয় আমার আর কেউই নেই। এতেও যদি আমার সমস্ত অপরাধের, সমস্ত অসংগত আচরণের শেষ জবাব না হয়, তবে আর কিছুতেই হবে না।
অতএব, কমলা, আজ তোমাকে এই “প্রিয়তমা” সম্বোধন করে আমাদের সংশয়াচ্ছন্ন অতীতকে দূরে সরিয়ে দিলাম, এই “প্রিয়তমা” সম্বোধন করে আমাদের ভালোবাসার ভবিষ্যৎকে শুরু করলাম। তোমার কাছে আমার একান্ত মিনতি, তুমি আজ আমার “প্রিয়তমা” এই কথাটি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করো। এটা যদি ঠিক তুমি মনে গ্রহণ করতে পার তবে কোনো সংশয় নিয়ে আমাকে আর কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন থাকবে না।
তারপর, আমি তোমার ভালোবাসা পেয়েছি কি না, সে কথা তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে আমার সাহস হয় না। আমি জিজ্ঞাসা করবও না। আমার এই অনুচ্চারিত প্রশ্নের অনুকূল উত্তর একদিন তোমার হৃদয়ের ভেতর দিয়ে আমার হৃদয়ের মধ্যে নিঃশব্দে এসে পৌঁছবে, এতে আমি সন্দেহমাত্র করি না। এটা আমি আমার ভালোবাসার জোরে বলছি। আমার যোগ্যতা নিয়ে অহংকার করি না, কিন্তু আমার সাধনা কেন সার্থক হবে না?
এসব কথার মীমাংসা ধীরে ধীরে ক্রমে ক্রমে হবে; ব্যস্ত হয়ে ফল নেই। যেদিন আমার চিঠি পাবে তার পরের দিন সকালবেলাতেই আমি গাজিপুরে পৌঁছব। তোমার কাছে আমার অনুরোধ এই, গাজিপুরে পৌঁছে আমাদের বাসাতেই যেন তোমাকে দেখতে পাই। অনেকদিন গৃহহারার মতো কেটেছে– আর আমার ধৈর্য নেই– এবারে গৃহের মধ্যে প্রবেশ করব, হৃদয়লক্ষ্মীকে গৃহলক্ষ্মীর মূর্তিতে দেখব। সেই মুহূর্তে দ্বিতীয়বার আমাদের শুভদৃষ্টি হবে। মনে আছে– আমাদের প্রথমবার সেই শুভদৃষ্টি? সেই জ্যোৎস্নারাত্রে, সেই নদীর ধারে, জনশূন্য বালুমরুর মধ্যে? সেখানে ছাদ ছিল না, প্রাচীর ছিল না, পিতামাতাভ্রাতা-আত্মীয়প্রতিবেশীর সম্বন্ধ ছিল না– সে যে গৃহের একেবারে বাইরে। সে যেন স্বপ্ন, সে যেন কিছুই সত্য নয়। সেইজন্য আরেকদিন স্নিগ্ধনির্মল প্রাতঃকালের আলোকে, গৃহের মধ্যে, সত্যের মধ্যে, সেই শুভদৃষ্টিকে সম্পূর্ণ করে নেওয়ার অপেক্ষা আছে। পুণ্যপৌষের প্রাতঃকালে আমাদের গৃহদ্বারে তোমার সরল সহাস্য মূর্তিখানি চিরজীবনের মতো আমার হৃদয়ের মধ্যে অঙ্কিত করে নেব, এইজন্য আমি আগ্রহে পরিপূর্ণ হয়ে আছি। প্রিয়তমে, আমি তোমার হৃদয়ের দ্বারে অতিথি, আমাকে ফিরিয়ো না– প্রসাদভিক্ষু রমেশ।
শৈল ম্লান কমলাকে একটুখানি উৎসাহিত করে তোলার জন্য বলল, “আজ তোমাদের বাংলোয় যাবে না।”
কমলা বলল, “না, আর দরকার নেই।”
শৈল। তোমার ঘর-সাজানো শেষ হয়ে গেল?
কমলা। হ্যাঁ ভাই, শেষ হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পরে আবার শৈল এসে বলল, “একটা জিনিস যদি দিই তো কী দেবি বল?”
কমলা বলল, “আমার কী আছে দিদি?”
শৈল। একেবারে কিছুই নেই?
কমলা। কিছুই না।
শৈল কমলার কপোলে করাঘাত করে বলল, “ইস, তাই তো! যা-কিছু ছিল সমস্ত বুঝি একজনকে সমর্পণ করে দিয়েছিস? এটা কী বল দেখি।” বলে শৈল অঞ্চলের ভেতর থেকে একটা চিঠি বার করল।
লেফাফায় রমেশের হাতের লেখা দেখে কমলার মুখ তৎক্ষণাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল– সে একটুখানি মুখ ফিরাল।
শৈল বলল, “ওগো, অভিমান দেখাতে হবে না, ঢের হয়েছে। এদিকে চিঠিখানা ছোঁ মেরে নেওয়ার জন্য মনটার ভেতরে ধড়ফড় করছে– কিন্তু মুখ ফুটে না চাইলে আমি দেব না, কখনো দেব না, দেখি কতক্ষণ পণ রাখতে পার।”
এমন সময় উমা একটা সাবানের বাক্সে দড়ি বেঁধে টেনে এনে বলল, “মাসি, গ-গ।”
কমলা তাড়াতাড়ি উমিকে কোলে তুলে বারবার চুমো খেতে খেতে শোয়ার ঘরে নিয়ে গেল। উমি তার শকটচালনায় অকস্মাৎ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে চেঁচাতে লাগল, কিন্তু কমলা কোনোমতেই ছাড়ল না– তাকে ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে নানাপ্রকার প্রলাপবাক্যে তার মনোরঞ্জন-চেষ্টায় প্রবলবেগে প্রবৃত্ত হল।
শৈল এসে বলল, “হার মানলাম, তোরই জিত– আমি তো পারতাম না। ধন্যি মেয়ে! এই নে ভাই, কেন মিছে অভিশাপ কুড়োবি?”
এই বলে বিছানার ওপর চিঠিখানা ফেলে উমিকে কমলার হাত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে চলে গেল।
লেফাফাটা নিয়ে একটুখানি নাড়াচাড়া করে কমলা চিঠিখানা খুলল; প্রথম দু-চার লাইনের ওপর দৃষ্টিপাত করতেই তার মুখ লাল হয়ে উঠল। লজ্জায় সে চিঠিখানা একবার ছুড়ে ফেলে দিল। প্রথম ধাক্কার এই প্রবল বিতৃষ্ণার আক্ষেপ সামলে নিয়ে আবার সেই চিঠি মাটি থেকে তুলে সমস্তটা সে পড়ল। সমস্তটা সে ভালো করে বুঝল কি না বুঝল জানি না; কিন্তু তার মনে হল যেন সে হাতে করে একটা পঙ্কিল পদার্থ নাড়ছে। চিঠিখানা আবার সে ফেলে দিল। যে ব্যক্তি তার স্বামী নয় তারই ঘর করতে হবে, এইজন্য এই আহ্বান! রমেশ জেনে শুনে এতদিন পরে তাকে এই অপমান করল! গাজিপুরে এসে রমেশের দিকে কমলা যে তার হৃদয় অগ্রসর করে দিয়েছিল, সে কি রমেশ বলে না তার স্বামী বলে? রমেশ তাই লক্ষ্য করেছে, সেইজন্যেই অনাথার প্রতি দয়া করে তাকে আজ এই ভালোবাসার চিঠি লিখেছে। ভ্রমক্রমে রমেশের কাছে যেটুকু প্রকাশ পেয়েছিল সেটুকু কমলা আজ কেমন করে ফিরিয়ে নেবে– কেমন করে! এমন লজ্জা, এমন ঘৃণা কমলার অদৃষ্টে কেন ঘটল! সে জন্মগ্রহণ করে কার কাছে কী অপরাধ করেছে? এবারে “ঘর” বলে একটা বীভৎস জিনিস কমলাকে গ্রাস করতে আসছে, কমলা কেমন করে রক্ষা পাবে! রমেশ যে তার কাছে এতবড়ো বিভীষিকা হয়ে উঠবে, দু-দিন আগে তা কি কমলা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারত?
এদিকে দরজার কাছে উমেশ এসে একটুখানি কেশে নিল। কমলার কাছে কোনো সাড়া না পেয়ে সে আস্তে আস্তে ডাকল, “মা!” কমলা দরজার কাছে এল, উমেশ মাথা চুলকে বলল, “মা, আজ সিধুবাবুরা মেয়ের বিবাহে কলকাতা থেকে একটা যাত্রার দল এনেছেন।”
কমলা বলল, “বেশ তো উমেশ, তুই যাত্রা শুনতে যা।”
উমেশ। কাল সকালে কি ফুল তুলে এনে দিতে হবে?
কমলা। না না, ফুলের দরকার নেই।
উমেশ চলে যাওয়ার উপক্রম করলে কমলা হঠাৎ তাকে ফিরিয়ে ডেকে বলল, “ও উমেশ, তুই এই কাপড় পরে যাত্রা শুনতে যাবি নাকি, তোকে লোকে বলবে কী?”
লোকে যে উমেশের কাছে সাজসজ্জা সম্পর্কে অত্যন্ত বেশি প্রত্যাশা করে এবং ত্রুটি দেখলে আলোচনা করে থাকে, উমেশের এরকম ধারণা ছিল না– এই কারণে ধুতির শুভ্রতা ও উত্তরচ্ছদের একান্ত অভাব সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। কমলার প্রশ্ন শুনে উমেশ কিছু না বলে একটুখানি হাসল।
কমলা তার দু-জোড়া শাড়ি বার করে উমেশের কাছে ফেলে দিয়ে বলল, “এই নে, যা, পরিস।”
শাড়ির চওড়া বাহারে পাড় দেখে উমেশ অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠল, কমলার পায়ের কাছে পড়ে ঢিপ করে প্রণাম করল, এবং হাস্যদমনের বৃথা চেষ্টায় সমস্ত মুখখানাকে বিকৃত করে চলে গেল। উমেশ চলে গেলে কমলা দু-ফোঁটা চোখের জল মুছে জানালার কাছে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শৈল ঘরে ঢুকে বলল, “ভাই কমল, আমাকে তোর চিঠি দেখাবি নে?”
কমলার কাছে শৈলের তো কিছুই গোপন ছিল না, তাই শৈল এতদিন পরে সুযোগ পেয়ে এই দাবি করল।
কমলা বলল, “ওই-যে দিদি, দেখো না।” বলে, মেঝের ওপর চিঠি পড়ে ছিল, দেখিয়ে দিল। শৈল আশ্চর্য হয়ে ভাবল, “বাস রে, এখনো রাগ যায়নি!” মাটি থেকে শৈল চিঠি তুলে নিয়ে সমস্তটা পড়ল। চিঠিতে ভালোবাসার কথা যথেষ্ট আছে বটে, কিন্তু তবু এ কেমনতরো চিঠি! মানুষ নিজের স্ত্রীকে এমনি করে চিঠি লেখে! এ যেন কী-এক-রকম! শৈল জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা ভাই, তোমার স্বামী কি নভেল লেখেন?”
“স্বামী” শব্দটা শুনে চকিতের মধ্যে কমলার দেহমন যেন সংকুচিত হয়ে গেল। সে বলল, “জানি না।”
শৈল বলল, “তাহলে আজ তুমি বাংলোয়ই যাবে?”
কমলা মাথা নেড়ে জানাল যে, যাবে।
শৈল বলল, “আমিও আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত তোমার সঙ্গে থাকতে পারতাম, কিন্তু জান তো ভাই, আজ নরসিংবাবুর বউ আসবে। মা বরং তোমার সঙ্গে যান।”
কমলা ব্যস্ত হয়ে বলল, “না না, মা গিয়ে কী করবেন? সেখানে তো চাকর আছে।”
শৈল হেসে বলল, “আর তোমার বাহন উমেশ আছে, তোমার ভয় কী?”
উমা তখন কার একটা পেনসিল সংগ্রহ করে যেখানে-সেখানে আঁচড় কাটছিল এবং চেঁচিয়ে অব্যক্ত ভাষা উচ্চারণ করছিল, মনে করছিল “পড়ছি।” শৈল তার এই সাহিত্যরচনা থেকে তাকে বলপূর্বক কেড়ে নিল; সে যখন প্রবল তারস্বরে আপত্তিপ্রকাশ করল, কমলা বলল, “একটা মজার জিনিস দিচ্ছি আয়।”
এই বলে ঘরে নিয়ে গিয়ে তাকে বিছানার ওপর ফেলে আদরের দ্বারা তাকে অত্যন্ত উদ্বেলিত করে তুলল। সে যখন প্রতিশ্রুত উপহারের দাবি করল তখন কমলা তার বাক্স খুলে একজোড়া সোনার ব্রেসলেট বার করল। এই দুর্লভ খেলনা পেয়ে উমি ভারি খুশি হল। মাসি তার হাতে পরিয়ে দিতেই সে সেই ঢলঢলে গহনাজোড়া-সমেত দু-টি হাত সন্তর্পণে তুলে ধরে সগর্বে তার মাকে দেখাতে গেল। মা ব্যস্ত হয়ে যথাস্থানে প্রত্যর্পণ করার জন্য ব্রেসলেট কেড়ে নিল; বলল, “কমল, তোমার কিরকম বুদ্ধি! এসব জিনিস ওর হাতে দাও কেন?”
এই দুর্ব্যবহারে উমির আর্তনাদের নালিশ গগন ভেদ করে উঠল। কমলা কাছে এসে বলল, “দিদি, এ ব্রেসলেট-জোড়া আমি উমিকেই দিয়েছি।”
শৈল আশ্চর্য হয়ে বলল, “পাগল নাকি!”
কমলা বলল, “আমার মাথা খাও দিদি, এ ব্রেসলেট-জোড়া তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। ওটা ভেঙে উমির হার গড়িয়ে দিয়ো।”
শৈল বলল, “না, সত্যি বলছি, তোর মতো খেপা মেয়ে আমি দেখিনি।”
এই বলে কমলার গলা জড়িয়ে ধরল। কমলা বলল, “তোদের এখান থেকে আমি তো আজ চললাম দিদি– খুব সুখে ছিলাম– এমন সুখ আমার জীবনে কখনো পাইনি।” বলতে বলতে ঝরঝর করে তার চোখের জল পড়তে লাগল।
শৈলও উদগত অশ্রু দমন করে বলল, “তোর রকমটা কী বল দেখি কমল, যেন কত দূরেই যাচ্ছিস! যে সুখে ছিলি সে আর আমার বোঝতে বাকি নেই। এখন তোর সব বাধা দূর হল, সুখে নিজের ঘরে একলা রাজত্ব করবি– আমরা কখনো গিয়ে পড়লে ভাববি, আপদ বিদায় হলেই বাঁচি।”
বিদায়কালে কমলা শৈলকে প্রণাম করলে পর শৈল বলল, “কাল দুপুরবেলা আমি তোদের ওখানে যাব।”
কমলা তার উত্তরে হ্যাঁ-না কিছুই বলল না।
বাংলোয় গিয়ে কমলা দেখল উমেশ এসেছে। কমলা বলল, “তুই যে! যাত্রা শুনতে যাবি না?”
উমেশ বলল, “তুমি যে আজ এখানে থাকবে, আমি–”
কমলা। আচ্ছা আচ্ছা, সে তোর ভাবতে হবে না। তুই যাত্রা শুনতে যা, এখানে বিষণ আছে। যা, দেরি করিসনে।
উমেশ। এখনো তো যাত্রার অনেক দেরি।
কমলা। তা হোক না, বিয়েবাড়িতে কত ধুম হচ্ছে, ভালো করে দেখে আয় গে যা।
এ সম্পর্কে উমেশকে অধিক উৎসাহিত করার প্রয়োজন ছিল না। সে চলে যাওয়ার উপক্রম করলে কমলা হঠাৎ তাকে ডেকে বলল, “দেখ, খুড়োমশায় এলে তুই–”
এইটুকু বলে কথাটা কী করে শেষ করতে হবে ভেবে পেল না। উমেশ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। কমলা খানিকক্ষণ ভেবে বলল, “মনে রাখিস, খুড়োমশায় তোকে ভালোবাসেন, তোর যখন যা দরকার হবে, আমার প্রণাম জানিয়ে তুই তাঁর কাছে চাইস, তিনি দেবেন– তাঁকে আমার প্রণাম দিতে কখনো ভুলিসনে– জানিস?”
উমেশ এই অনুশাসনের কোনো অর্থ না বুঝে “যে আজ্ঞে” বলে চলে গেল।
অপরাহ্নে বিষণ জিজ্ঞাসা করল, “মাজি, কোথায় যাচ্ছ?”
কমলা বলল, “গঙ্গায় স্নান করতে চলেছি।”
বিষণ বলল “সঙ্গে যাব?”
কমলা বলল, “না, তুই ঘরে পাহারা দে।” বলে তার হাতে অনাবশ্যক একটা টাকা দিয়ে কমলা গঙ্গার দিকে চলে গেল।
শৈল ম্লান কমলাকে একটুখানি উৎসাহিত করে তোলার জন্য বলল, “আজ তোমাদের বাংলোয় যাবে না।”
কমলা বলল, “না, আর দরকার নেই।”
শৈল। তোমার ঘর-সাজানো শেষ হয়ে গেল?
কমলা। হ্যাঁ ভাই, শেষ হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পরে আবার শৈল এসে বলল, “একটা জিনিস যদি দিই তো কী দেবি বল?”
কমলা বলল, “আমার কী আছে দিদি?”
শৈল। একেবারে কিছুই নেই?
কমলা। কিছুই না।
শৈল কমলার কপোলে করাঘাত করে বলল, “ইস, তাই তো! যা-কিছু ছিল সমস্ত বুঝি একজনকে সমর্পণ করে দিয়েছিস? এটা কী বল দেখি।” বলে শৈল অঞ্চলের ভেতর থেকে একটা চিঠি বার করল।
লেফাফায় রমেশের হাতের লেখা দেখে কমলার মুখ তৎক্ষণাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল– সে একটুখানি মুখ ফিরাল।
শৈল বলল, “ওগো, অভিমান দেখাতে হবে না, ঢের হয়েছে। এদিকে চিঠিখানা ছোঁ মেরে নেওয়ার জন্য মনটার ভেতরে ধড়ফড় করছে– কিন্তু মুখ ফুটে না চাইলে আমি দেব না, কখনো দেব না, দেখি কতক্ষণ পণ রাখতে পার।”
এমন সময় উমা একটা সাবানের বাক্সে দড়ি বেঁধে টেনে এনে বলল, “মাসি, গ-গ।”
কমলা তাড়াতাড়ি উমিকে কোলে তুলে বারবার চুমো খেতে খেতে শোয়ার ঘরে নিয়ে গেল। উমি তার শকটচালনায় অকস্মাৎ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে চেঁচাতে লাগল, কিন্তু কমলা কোনোমতেই ছাড়ল না– তাকে ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে নানাপ্রকার প্রলাপবাক্যে তার মনোরঞ্জন-চেষ্টায় প্রবলবেগে প্রবৃত্ত হল।
শৈল এসে বলল, “হার মানলাম, তোরই জিত– আমি তো পারতাম না। ধন্যি মেয়ে! এই নে ভাই, কেন মিছে অভিশাপ কুড়োবি?”
এই বলে বিছানার ওপর চিঠিখানা ফেলে উমিকে কমলার হাত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে চলে গেল।
লেফাফাটা নিয়ে একটুখানি নাড়াচাড়া করে কমলা চিঠিখানা খুলল; প্রথম দু-চার লাইনের ওপর দৃষ্টিপাত করতেই তার মুখ লাল হয়ে উঠল। লজ্জায় সে চিঠিখানা একবার ছুড়ে ফেলে দিল। প্রথম ধাক্কার এই প্রবল বিতৃষ্ণার আক্ষেপ সামলে নিয়ে আবার সেই চিঠি মাটি থেকে তুলে সমস্তটা সে পড়ল। সমস্তটা সে ভালো করে বুঝল কি না বুঝল জানি না; কিন্তু তার মনে হল যেন সে হাতে করে একটা পঙ্কিল পদার্থ নাড়ছে। চিঠিখানা আবার সে ফেলে দিল। যে ব্যক্তি তার স্বামী নয় তারই ঘর করতে হবে, এইজন্য এই আহ্বান! রমেশ জেনে শুনে এতদিন পরে তাকে এই অপমান করল! গাজিপুরে এসে রমেশের দিকে কমলা যে তার হৃদয় অগ্রসর করে দিয়েছিল, সে কি রমেশ বলে না তার স্বামী বলে? রমেশ তাই লক্ষ্য করেছে, সেইজন্যেই অনাথার প্রতি দয়া করে তাকে আজ এই ভালোবাসার চিঠি লিখেছে। ভ্রমক্রমে রমেশের কাছে যেটুকু প্রকাশ পেয়েছিল সেটুকু কমলা আজ কেমন করে ফিরিয়ে নেবে– কেমন করে! এমন লজ্জা, এমন ঘৃণা কমলার অদৃষ্টে কেন ঘটল! সে জন্মগ্রহণ করে কার কাছে কী অপরাধ করেছে? এবারে “ঘর” বলে একটা বীভৎস জিনিস কমলাকে গ্রাস করতে আসছে, কমলা কেমন করে রক্ষা পাবে! রমেশ যে তার কাছে এতবড়ো বিভীষিকা হয়ে উঠবে, দু-দিন আগে তা কি কমলা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারত?
এদিকে দরজার কাছে উমেশ এসে একটুখানি কেশে নিল। কমলার কাছে কোনো সাড়া না পেয়ে সে আস্তে আস্তে ডাকল, “মা!” কমলা দরজার কাছে এল, উমেশ মাথা চুলকে বলল, “মা, আজ সিধুবাবুরা মেয়ের বিবাহে কলকাতা থেকে একটা যাত্রার দল এনেছেন।”
কমলা বলল, “বেশ তো উমেশ, তুই যাত্রা শুনতে যা।”
উমেশ। কাল সকালে কি ফুল তুলে এনে দিতে হবে?
কমলা। না না, ফুলের দরকার নেই।
উমেশ চলে যাওয়ার উপক্রম করলে কমলা হঠাৎ তাকে ফিরিয়ে ডেকে বলল, “ও উমেশ, তুই এই কাপড় পরে যাত্রা শুনতে যাবি নাকি, তোকে লোকে বলবে কী?”
লোকে যে উমেশের কাছে সাজসজ্জা সম্পর্কে অত্যন্ত বেশি প্রত্যাশা করে এবং ত্রুটি দেখলে আলোচনা করে থাকে, উমেশের এরকম ধারণা ছিল না– এই কারণে ধুতির শুভ্রতা ও উত্তরচ্ছদের একান্ত অভাব সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। কমলার প্রশ্ন শুনে উমেশ কিছু না বলে একটুখানি হাসল।
কমলা তার দু-জোড়া শাড়ি বার করে উমেশের কাছে ফেলে দিয়ে বলল, “এই নে, যা, পরিস।”
শাড়ির চওড়া বাহারে পাড় দেখে উমেশ অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠল, কমলার পায়ের কাছে পড়ে ঢিপ করে প্রণাম করল, এবং হাস্যদমনের বৃথা চেষ্টায় সমস্ত মুখখানাকে বিকৃত করে চলে গেল। উমেশ চলে গেলে কমলা দু-ফোঁটা চোখের জল মুছে জানালার কাছে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শৈল ঘরে ঢুকে বলল, “ভাই কমল, আমাকে তোর চিঠি দেখাবি নে?”
কমলার কাছে শৈলের তো কিছুই গোপন ছিল না, তাই শৈল এতদিন পরে সুযোগ পেয়ে এই দাবি করল।
কমলা বলল, “ওই-যে দিদি, দেখো না।” বলে, মেঝের ওপর চিঠি পড়ে ছিল, দেখিয়ে দিল। শৈল আশ্চর্য হয়ে ভাবল, “বাস রে, এখনো রাগ যায়নি!” মাটি থেকে শৈল চিঠি তুলে নিয়ে সমস্তটা পড়ল। চিঠিতে ভালোবাসার কথা যথেষ্ট আছে বটে, কিন্তু তবু এ কেমনতরো চিঠি! মানুষ নিজের স্ত্রীকে এমনি করে চিঠি লেখে! এ যেন কী-এক-রকম! শৈল জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা ভাই, তোমার স্বামী কি নভেল লেখেন?”
“স্বামী” শব্দটা শুনে চকিতের মধ্যে কমলার দেহমন যেন সংকুচিত হয়ে গেল। সে বলল, “জানি না।”
শৈল বলল, “তাহলে আজ তুমি বাংলোয়ই যাবে?”
কমলা মাথা নেড়ে জানাল যে, যাবে।
শৈল বলল, “আমিও আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত তোমার সঙ্গে থাকতে পারতাম, কিন্তু জান তো ভাই, আজ নরসিংবাবুর বউ আসবে। মা বরং তোমার সঙ্গে যান।”
কমলা ব্যস্ত হয়ে বলল, “না না, মা গিয়ে কী করবেন? সেখানে তো চাকর আছে।”
শৈল হেসে বলল, “আর তোমার বাহন উমেশ আছে, তোমার ভয় কী?”
উমা তখন কার একটা পেনসিল সংগ্রহ করে যেখানে-সেখানে আঁচড় কাটছিল এবং চেঁচিয়ে অব্যক্ত ভাষা উচ্চারণ করছিল, মনে করছিল “পড়ছি।” শৈল তার এই সাহিত্যরচনা থেকে তাকে বলপূর্বক কেড়ে নিল; সে যখন প্রবল তারস্বরে আপত্তিপ্রকাশ করল, কমলা বলল, “একটা মজার জিনিস দিচ্ছি আয়।”
এই বলে ঘরে নিয়ে গিয়ে তাকে বিছানার ওপর ফেলে আদরের দ্বারা তাকে অত্যন্ত উদ্বেলিত করে তুলল। সে যখন প্রতিশ্রুত উপহারের দাবি করল তখন কমলা তার বাক্স খুলে একজোড়া সোনার ব্রেসলেট বার করল। এই দুর্লভ খেলনা পেয়ে উমি ভারি খুশি হল। মাসি তার হাতে পরিয়ে দিতেই সে সেই ঢলঢলে গহনাজোড়া-সমেত দু-টি হাত সন্তর্পণে তুলে ধরে সগর্বে তার মাকে দেখাতে গেল। মা ব্যস্ত হয়ে যথাস্থানে প্রত্যর্পণ করার জন্য ব্রেসলেট কেড়ে নিল; বলল, “কমল, তোমার কিরকম বুদ্ধি! এসব জিনিস ওর হাতে দাও কেন?”
এই দুর্ব্যবহারে উমির আর্তনাদের নালিশ গগন ভেদ করে উঠল। কমলা কাছে এসে বলল, “দিদি, এ ব্রেসলেট-জোড়া আমি উমিকেই দিয়েছি।”
শৈল আশ্চর্য হয়ে বলল, “পাগল নাকি!”
কমলা বলল, “আমার মাথা খাও দিদি, এ ব্রেসলেট-জোড়া তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। ওটা ভেঙে উমির হার গড়িয়ে দিয়ো।”
শৈল বলল, “না, সত্যি বলছি, তোর মতো খেপা মেয়ে আমি দেখিনি।”
এই বলে কমলার গলা জড়িয়ে ধরল। কমলা বলল, “তোদের এখান থেকে আমি তো আজ চললাম দিদি– খুব সুখে ছিলাম– এমন সুখ আমার জীবনে কখনো পাইনি।” বলতে বলতে ঝরঝর করে তার চোখের জল পড়তে লাগল।
শৈলও উদগত অশ্রু দমন করে বলল, “তোর রকমটা কী বল দেখি কমল, যেন কত দূরেই যাচ্ছিস! যে সুখে ছিলি সে আর আমার বোঝতে বাকি নেই। এখন তোর সব বাধা দূর হল, সুখে নিজের ঘরে একলা রাজত্ব করবি– আমরা কখনো গিয়ে পড়লে ভাববি, আপদ বিদায় হলেই বাঁচি।”
বিদায়কালে কমলা শৈলকে প্রণাম করলে পর শৈল বলল, “কাল দুপুরবেলা আমি তোদের ওখানে যাব।”
কমলা তার উত্তরে হ্যাঁ-না কিছুই বলল না।
বাংলোয় গিয়ে কমলা দেখল উমেশ এসেছে। কমলা বলল, “তুই যে! যাত্রা শুনতে যাবি না?”
উমেশ বলল, “তুমি যে আজ এখানে থাকবে, আমি–”
কমলা। আচ্ছা আচ্ছা, সে তোর ভাবতে হবে না। তুই যাত্রা শুনতে যা, এখানে বিষণ আছে। যা, দেরি করিসনে।
উমেশ। এখনো তো যাত্রার অনেক দেরি।
কমলা। তা হোক না, বিয়েবাড়িতে কত ধুম হচ্ছে, ভালো করে দেখে আয় গে যা।
এ সম্পর্কে উমেশকে অধিক উৎসাহিত করার প্রয়োজন ছিল না। সে চলে যাওয়ার উপক্রম করলে কমলা হঠাৎ তাকে ডেকে বলল, “দেখ, খুড়োমশায় এলে তুই–”
এইটুকু বলে কথাটা কী করে শেষ করতে হবে ভেবে পেল না। উমেশ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। কমলা খানিকক্ষণ ভেবে বলল, “মনে রাখিস, খুড়োমশায় তোকে ভালোবাসেন, তোর যখন যা দরকার হবে, আমার প্রণাম জানিয়ে তুই তাঁর কাছে চাইস, তিনি দেবেন– তাঁকে আমার প্রণাম দিতে কখনো ভুলিসনে– জানিস?”
উমেশ এই অনুশাসনের কোনো অর্থ না বুঝে “যে আজ্ঞে” বলে চলে গেল।
অপরাহ্নে বিষণ জিজ্ঞাসা করল, “মাজি, কোথায় যাচ্ছ?”
কমলা বলল, “গঙ্গায় স্নান করতে চলেছি।”
বিষণ বলল “সঙ্গে যাব?”
কমলা বলল, “না, তুই ঘরে পাহারা দে।” বলে তার হাতে অনাবশ্যক একটা টাকা দিয়ে কমলা গঙ্গার দিকে চলে গেল।
পরদিন হেমনলিনী প্রত্যুষে উঠে যখন প্রস্তুত হয়ে বাইরে বেরোল তখন দেখল, অন্নদাবাবু তার শোয়ার ঘরের জানালার কাছে একটা ক্যাম্বিসের কেদারা টেনে চুপ করে বসে আছেন। ঘরে আসবাব অধিক নেই। একটি খাট আছে, এক কোণে একটি আলমারি, একটি দেয়ালে অন্নদাবাবুর পরলোকগতা স্ত্রীর একটি ছায়াপ্রায় বিলীয়মান বাঁধানো ফোটোগ্রাফ– এবং তারই সামনের দেয়ালে সেই তার পত্নীর স্বহস্তরচিত একখণ্ড পশমের কারুকার্য। স্ত্রীর জীবদ্দশায় আলমারিতে যে-সমস্ত টুকিটাকি শৌখিন জিনিস যেমনভাবে সজ্জিত ছিল আজও তারা তেমনি রয়েছে।
পিতার পেছনে দাঁড়িয়ে পাকা চুল তোলার ছলে মাথায় কোমল আঙুলগুলো চালনা করে হেম বলল, “বাবা, চলো আজ সকাল সকাল চা খেয়ে নেবে। তারপর তোমার ঘরে বসে তোমার সেকালের গল্প শুনব– সেসব কথা আমার কত ভালো লাগে বলতে পারি না।”
হেমনলিনী সম্পর্কে অন্নদাবাবুর বোধশক্তি আজকাল এমনি প্রখর হয়ে উঠেছে যে, এই চা খেতে তাড়া দেওয়ার কারণ বুঝতে তার কিছুমাত্র বিলম্ব হল না। আর কিছু পরেই অক্ষয় চায়ের টেবিলে এসে উপস্থিত হবে; তারই সঙ্গ এড়ানোর জন্য তাড়াতাড়ি চা খাওয়া সেরে নিয়ে হেম পিতার কক্ষে নিভৃতে আশ্রয় নিতে ইচ্ছা করেছে, এটা তিনি মুহূর্তেই বুঝতে পারলেন। ব্যাধভয়ে ভীত হরিণীর মতো তার কন্যা যে সর্বদা ত্রস্ত হয়ে আছে, এটা তার মনে অত্যন্ত বাজল।
নীচে গিয়ে দেখলেন, চাকর এখনো চায়ের জল তৈরি করেনি। তার ওপর হঠাৎ অত্যন্ত রেগে উঠলেন; সে বৃথা বোঝানোর চেষ্টা করল যে, আজ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই চায়ের তলব হয়েছে। চাকররা সব বাবু হয়ে উঠেছে, তাদের ঘুম ভাঙানোর জন্য আবার অন্য লোক রাখার দরকার হয়েছে, এরকম মত তিনি অত্যন্ত নিঃসংশয়ে প্রচার করলেন।
চাকর তো তাড়াতাড়ি চায়ের জল এনে উপস্থিত করল। অন্নদাবাবু অন্যদিন যেরকম গল্প করতে করতে ধীরে-সুস্থে আরামে চা-রস উপভোগ করতেন আজ তা না করে অনাবশ্যক সত্বরতার সঙ্গে পেয়ালা নিঃশেষ করতে প্রবৃত্ত হলেন। হেমনলিনী কিছু আশ্চর্য হয়ে বলল, “বাবা, আজ কি তোমার কোথাও বাইরে যাওয়ার তাড়া আছে?”
অন্নদাবাবু বললেন, “কিছু না, কিছু না। ঠাণ্ডার দিনে গরম চাটা এক চুমুকে খেয়ে নিলে বেশ ঘেমে শরীরটা হালকা হয়ে যায়।”
কিন্তু অন্নদাবাবুর শরীরে ঘর্ম নির্গত হওয়ার আগেই যোগেন্দ্র অক্ষয়কে নিয়ে ঘরে ঢুকল। আজ অক্ষয়ের বেশভূষায় একটু বিশেষ পারিপাট্য ছিল। হাতে রুপোবাঁধানো ছড়ি, বুকের কাছে ঘড়ির চেন ঝুলছে– বাম হাতে একটা ব্রাউন কাগজে-মোড়া বই। অন্যদিন অক্ষয় টেবিলের যে অংশে বসে আজ সেখানে না বসে হেমনলিনীর অনতিদূরে একটা চৌকি টেনে নিল; হাসিমুখে বলল, “আপনাদের ঘড়ি আজ দ্রুত চলছে।”
হেমনলিনী অক্ষয়ের মুখের দিকে তাকাল না, তার কথার উত্তরমাত্র দিল না। অন্নদাবাবু বললেন, “হেম, চলো তো মা, ওপরে। আমার গরম কাপড়গুলো একবার রোদে দেওয়া দরকার।”
যোগেন্দ্র বলল, “বাবা, রোদ তো পালাচ্ছে না, এত তাড়াতাড়ি কেন? হেম, অক্ষয়কে এক পেয়ালা চা ঢেলে দাও। আমারও চায়ের দরকার আছে, কিন্তু অতিথি আগে।”
অক্ষয় হেসে হেমনলিনীকে বলল, “কর্তব্যের খাতিরে এতবড়ো আত্মত্যাগ দেখেছেন? দ্বিতীয় সার ফিলিপ-সিডনি।”
হেমনলিনী অক্ষয়ের কথায় লেশমাত্র অবধান প্রকাশ না করে দু-পেয়ালা চা প্রস্তুত করে এক পেয়ালা যোগেন্দ্রকে দিল ও অপর পেয়ালাটি অক্ষয়ের দিকে সামান্য একটু ঠেলে দিয়ে অন্নদাবাবুর মুখের দিকে তাকাল। অন্নদাবাবু বললেন, “রোদ বাড়লে কষ্ট হবে, চলো, এইবেলা চলো।”
যোগেন্দ্র বলল, “আজ কাপড় রোদে দেওয়া থাক না। অক্ষয় এসেছে–”
অন্নদা হঠাৎ উদ্দীপ্ত হয়ে বলে উঠলেন, “তোমাদের কেবলই জবরদস্তি। তোমরা কেবল জেদ করে অন্য লোকের মর্মান্তিক বেদনার ওপর দিয়ে নিজের ইচ্ছাকে জারি করতে চাও। আমি অনেকদিন নীরবে সহ্য করেছি, কিন্তু আর এরকম চলবে না। মা হেম, কাল থেকে ওপরে আমার ঘরে তোতে-আমাতে চা খাব।”
এই বলে হেমকে নিয়ে অন্নদা চলে যাওয়ার উপক্রম করলে হেম শান্তস্বরে বলল, “বাবা, আর একটু বোসো। আজ তোমার ভালো করে চা খাওয়া হল না। অক্ষয়বাবু, কাগজে-মোড়া এই রহস্যটি কী জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?”
অক্ষয় বলল, “শুধু জিজ্ঞাসা কেন, এ রহস্য উদ্ঘাটন করতেও পারেন।”
এই বলে মোড়কটি হেমনলিনীর দিকে অগ্রসর করে দিল।
হেম খুলে দেখল, একখানি মরক্কো-বাঁধানো টেনিসন। হঠাৎ চমকে উঠে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। ঠিক এই টেনিসন, এরকম বাঁধানো, সে পূর্বে উপহার পেয়েছে এবং সেই বইখানি আজও তার শোয়ার ঘরের দেরাজের মধ্যে গোপন সমাদরে রক্ষিত আছে।
যোগেন্দ্র সামান্য হেসে বলল, “রহস্য এখনো সম্পূর্ণ উদ্ঘাটিত হয়নি।”
এই বলে বইয়ের প্রথম শূন্য পাতাটি খুলে তার হাতে তুলে দিল। সেই পাতায় লেখা আছে: শ্রীমতী হেমনলিনীর প্রতি অক্ষয়শ্রদ্ধার উপহার।
তৎক্ষণাৎ বইখানা হেমের হাত থেকে একেবারে ভূতলে পড়ে গেল– এবং তৎপ্রতি সে লক্ষ্যমাত্র না করে বলল, “বাবা, চলো।”
উভয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে চলে গেল। যোগেন্দ্রের চোখদুটো আগুনের মতো জ্বলতে লাগল। সে বলল, “না, আমার আর এখানে থাকা পোষাল না। আমি যেখানে হোক একটা স্কুল-মাস্টারি নিয়ে এখান থেকে চলে যাব।”
অক্ষয় বলল, “ভাই, তুমি মিথ্যা রাগ করছ। আমি তো তখনই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলাম যে তুমি ভুল বুঝেছ। তুমি আমাকে বারবার আশ্বাস দেওয়াতেই আমি বিচলিত হয়েছিলাম। কিন্তু আমি নিশ্চয় বলছি আমার প্রতি হেমনলিনীর মন কোনোদিন অনুকূল হবে না। অতএব সে আশা ছাড়িয়ে দাও। কিন্তু আসল কথা এই যে, উনি যাতে রমেশকে ভুলতে পারেন সেটা তোমাদের করা কর্তব্য।”
যোগেন্দ্র বলল, “তুমি তো বললে কর্তব্য, উপায়টা কী শুনি।”
অক্ষয় বলল, “আমি ছাড়া জগতে আর বিবাহযোগ্য যুবাপুরুষ নেই নাকি? আমি দেখছি, তুমি যদি তোমার বোন হতে তবে আমার আইবুড়ো নাম ঘোচানোর জন্য পিতৃপুরুষদিগকে হতাশভাবে দিন গণনা করতে হত না। যেমন করে হোক, একটি ভালো পাত্র জোগাড় করা চাই যার প্রতি তাকাবামাত্র অবিলম্বে কাপড় রোদে দেওয়ার ইচ্ছা প্রবল হয়ে না ওঠে।”
যোগেন্দ্র। পাত্র তো ফরমাশ দিয়ে মেলে না।
অক্ষয়। তুমি একেবারে এত অল্পেই হাল ছেড়ে দিয়ে বসো কেন? পাত্রের সন্ধান আমি বলতে পারি, কিন্তু তাড়াহুড়ো যদি কর তবে সমস্তই মাটি হয়ে যাবে। প্রথমেই বিবাহের কথা পেড়ে দু-পক্ষকে সশঙ্কিত করে তুললে চলবে না। আস্তে আস্তে আলাপ-পরিচয় জমতে দাও, তারপর সময় বুঝে দিনস্থির করো।
যোগেন্দ্র। প্রণালীটি অতি উত্তম, কিন্তু লোকটি কে শুনি।
অক্ষয়। তুমি তাকে তেমন ভালো করে জান না, কিন্তু দেখেছ। নলিনাক্ষ ডাক্তার।
যোগেন্দ্র। নলিনাক্ষ!
অক্ষয়। চমকাও কেন? তাকে নিয়ে ব্রাহ্মসমাজে গোলমাল চলছে, চলুক না। তা বলে অমন পাত্রটিকে হাতছাড়া করবে?
যোগেন্দ্র। আমি হাত তুলে নিলেই অমনি পাত্র যদি হাতছাড়া হত, তাহলে ভাবনা কি ছিল? কিন্তু নলিনাক্ষ বিবাহ করতে কি রাজি হবেন?
অক্ষয়। আজই হবেন এমন কথা বলতে পারি না, কিন্তু সময়ে কী না হতে পারে। যোগেন, আমার কথা শোনো। কাল নলিনাক্ষের বক্তৃতার দিন আছে। সেই বক্তৃতায় হেমনলিনীকে নিয়ে যাও। লোকটার বলার ক্ষমতা আছে। স্ত্রীলোকের চিত্ত-আকর্ষণের পক্ষে ঐ ক্ষমতাটা অকিঞ্চিৎকর নয়। হায়, অবোধ অবলারা এ কথা বোঝে না যে, বক্তা-স্বামীর চেয়ে শ্রোতা-স্বামী ঢের ভালো।
যোগেন্দ্র। কিন্তু নলিনাক্ষের ইতিহাসটা কী ভালো করে বলো দেখি, শোনা যাক।
অক্ষয়। দেখো যোগেন, ইতিহাসে যদি কিছু খুঁত থাকে তা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ো না। অল্প একটুখানি খুঁতে দুর্লভ জিনিস সুলভ হয়, আমি তো সেটাকে লাভ মনে করি।
অক্ষয় নলিনাক্ষের ইতিহাস যা বলল, তা সংক্ষেপে এই–
নলিনাক্ষের পিতা রাজবল্লভ ফরিদপুর-অঞ্চলের একটা ছোটোখাটো জমিদার ছিলেন। তার বছর-ত্রিশ বয়সে তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। কিন্তু তার স্ত্রী কোনোমতেই স্বামীর ধর্ম গ্রহণ করলেন না এবং আচার-বিচার সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে স্বামীর সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে চলতে লাগলেন– বলা বাহুল্য, এটা রাজবল্লভের পক্ষে সুখকর হয়নি। তার ছেলে নলিনাক্ষ ধর্মপ্রচারের উৎসাহে ও বক্তৃতাশক্তিদ্বারা উপযুক্ত বয়সে ব্রাহ্মসমাজে প্রতিষ্ঠালাভ করেন। তিনি সরকারি ডাক্তারের কাজে বাংলার নানা স্থানে অবস্থিতি করে চরিত্রের নির্মলতা, চিকিৎসার নৈপুণ্য ও সৎকর্মের উদ্যোগে সর্বত্র খ্যাতি বিস্তার করতে থাকেন।
এদিকে একটা অভাবনীয় ব্যাপার ঘটল। বৃদ্ধ বয়সে রাজবল্লভ একটা বিধবাকে বিবাহ করার জন্য হঠাৎ উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। কেউই তাঁকে নিরস্ত করতে পারল না। রাজবল্লভ বলতে লাগলেন, “আমার বর্তমান স্ত্রী আমার যথার্থ সহধর্মিণী নয়; যার সঙ্গে ধর্মে মতে ব্যবহারে ও হৃদয়ে মিল হয়েছে তাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ না করলে অন্যায় হবে।” এই বলে রাজবল্লভ সর্বসাধারণের ধিক্কারের মধ্যে সেই বিধবাকে অগত্যা হিন্দুমতানুসারে বিবাহ করলেন।
এরপর নলিনাক্ষের মা গৃহত্যাগ করে কাশী যেতে প্রবৃত্ত হলে নলিনাক্ষ রংপুরের ডাক্তারি ছেড়ে এসে বলল, “মা, আমিও তোমার সঙ্গে কাশী যাব।”
মা কেঁদে বললেন, “বাছা, আমার সঙ্গে তোদের তো কিছুই মেলে না, কেন মিছিমিছি কষ্ট পাবি?”
নলিনাক্ষ বলল, “তোমার সঙ্গে আমার কিছুই অমিল হবে না।”
নলিনাক্ষ তার এই স্বামীপরিত্যক্ত অবমানিত মাতাকে সুখী করার জন্য দৃঢ়সংকল্প হল। তার সঙ্গে কাশী গেল। মা বললেন, “বাবা, ঘরে কি বউ আসবে না?”
নলিনাক্ষ বিপদে পড়ল, বলল, “কাজ কী মা, বেশ আছি।”
মা বুঝলেন, নলিন অনেকটা ত্যাগ করেছে, কিন্তু তাই বলে ব্রাহ্মপরিবারের বাইরে বিবাহ করতে প্রস্তুত নয়। ব্যথিত হয়ে তিনি বললেন, “বাছা, আমার জন্যে তুই চিরজীবন সন্ন্যাসী হয়ে থাকবি, এ তো কোনোমতেই হতে পারে না। তোর যেখানে রুচি তুই বিবাহ কর বাবা, আমি কখনো আপত্তি করব না।”
নলিন দু-একদিন একটু চিন্তা করে বলল, “তুমি যেমন চাও আমি তেমনি একটা বউ এনে তোমার দাসী করে দেব; তোমার সঙ্গে কোনো বিষয়ে অমিল হবে, তোমাকে দুঃখ দেবে, এমন মেয়ে আমি কখনোই ঘরে আনব না।”
এই বলে নলিন পাত্রীর সন্ধানে বাংলাদেশে চলে এসেছিল। তারপর মাঝখানে ইতিহাসে একটুখানি বিচ্ছেদ আছে। কেউ বলে, গোপনে সে এক পল্লীতে গিয়ে কোনো এক অনাথাকে বিবাহ করেছিল এবং বিবাহের পরেই তার স্ত্রীবিয়োগ হয়েছিল। কেউ বা তাতে সন্দেহ প্রকাশ করে। অক্ষয়ের বিশ্বাস এই যে, বিবাহ করতে এসে শেষ মুহূর্তে সে পিছিয়েছিল।
যাই হোক, অক্ষয়ের মতে, এখন নিশ্চয়ই নলিনাক্ষ যাকে পছন্দ করে বিবাহ করবে তার মা তাতে আপত্তি না করে খুশিই হবেন। হেমনলিনীর মতো অমন মেয়ে নলিনাক্ষ কোথায় পাবে? আর যাই হোক, হেমের যেরকম মধুর স্বভাব তাতে সে যে তার শাশুড়িকে যথেষ্ট ভক্তিশ্রদ্ধা করে চলবে, কোনোমতেই তাঁকে কষ্ট দেবে না, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নলিনাক্ষ দু-দিন ভালো করে হেমকে দেখলেই তা বুঝতে পারবেন। অতএব অক্ষয়ের পরামর্শ এই যে, কোনোমতে দুজনের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হোক।
অক্ষয় চলে যাওয়ামাত্র যোগেন্দ্র দোতলায় উঠে গেল। দেখল, ওপরের বসার ঘরে হেমনলিনীকে কাছে বসিয়ে অন্নদাবাবু গল্প করছেন। যোগেন্দ্রকে দেখে অন্নদা একটু লজ্জিত হলেন। আজ চায়ের টেবিলে তার স্বাভাবিক শান্তভাব নষ্ট হয়ে হঠাৎ তার রোষ প্রকাশিত হয়েছিল, এতেও তার মনে মনে ক্ষোভ ছিল। তাই তাড়াতাড়ি বিশেষ সমাদরের স্বরে বললেন, “এসো যোগেন্দ্র, বোসো।”
যোগেন্দ্র বলল, “বাবা, তোমরা যে কোনোখানে বাইরে যাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছ। দুজনে দিনরাত্রি ঘরে বসে থাকা কি ভালো?”
অন্নদা বললেন, “ঐ শোনো। আমরা তো চিরকাল এরকম কোণে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি। হেমকে তো কোথাও বাইরে করতে হলে মাথা-খোঁড়াখুঁড়ি করতে হত।”
হেম বলল, “কেন বাবা আমার দোষ দাও? তুমি কোথায় আমাকে নিয়ে যেতে চাও, চলো না।”
হেমনলিনী নিজের প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়েও সবলে প্রমাণ করতে চায় যে, সে মনের মধ্যে একটা শোক চেপে ধরে ঘরের মাটি আঁকড়ে পড়ে নেই– তার চারদিকে যেখানে যা-কিছু হচ্ছে সব বিষয়েই যেন তার ঔৎসুক্য অত্যন্ত সজীব হয়ে আছে।
যোগেন্দ্র বলল, “বাবা, কাল একটা মিটিং আছে, সেখানে হেমকে নিয়ে চলো না।”
অন্নদা জানতেন, মিটিংয়ের ভিড়ের মধ্যে প্রবেশ করতে হেমনলিনী চিরদিনই একান্ত অনিচ্ছা ও সংকোচ অনুভব করে; তাই তিনি কিছু না বলে একবার হেমের মুখের দিকে তাকালেন।
হেম হঠাৎ একটা অস্বাভাবিক উৎসাহ প্রকাশ করে বলল, “মিটিং? সেখানে কে বক্তৃতা দেবে দাদা?”
যোগেন্দ্র। নলিনাক্ষ ডাক্তার।
অন্নদা। নলিনাক্ষ!
যোগেন্দ্র। ভারি চমৎকার বলতে পারেন। তা ছাড়া, লোকটার জীবনের ইতিহাস শুনলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। এমন ত্যাগস্বীকার! এমন দৃঢ়তা! এরকম মানুষের মতো মানুষ পাওয়া দুর্লভ।
আর ঘণ্টা-দুই আগে একটা অস্পষ্ট জনশ্রুতি ছাড়া নলিনাক্ষ সম্পর্কে যোগেন্দ্র কিছুই জানত না।
হেম একটা আগ্রহ দেখিয়ে বলল, “বেশ তো বাবা, চলো না তার বক্তৃতা শুনতে যাব।”
হেমনলিনীর এরকম উৎসাহের ভাবটাকে অন্নদা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করলেন না; তথাপি তিনি মনে মনে একটু খুশি হলেন। তিনি ভাবলেন, হেম যদি জোর করে এরকম মেলামেশা যাওয়া-আসা করতে থাকে তাহলে শীঘ্র তার মন সুস্থ হবে। মানুষের সহবাসই মানুষের সর্বপ্রকার মনোবৈকল্যের প্রধান ঔষধ। তিনি বললেন, “তা বেশ তো যোগেন্দ্র, কাল যথাসময়ে আমাদের মিটিংয়ে নিয়ে যেয়ো। কিন্তু নলিনাক্ষ সম্বন্ধে কী জান, বলো তো। অনেক লোকে তো অনেক কথা বলে।”
যে অনেক লোকে অনেক কথা বলে থাকে, প্রথমত যোগেন্দ্র তাদের খুব একচোট গালি দিয়ে নিল। বলল, “ধর্ম নিয়ে যারা ভড়ং করে, তারা মনে করে, কথায় কথায় পরের প্রতি অবিচার ও পরনিন্দা করার জন্য তারা ভগবানের স্বাক্ষরিত দলিল নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে– ধর্মব্যবসায়ীদের মতো এতবড়ো সংকীর্ণচিত্ত বিশ্বনিন্দুক আর জগতে নেই।”
বলতে বলতে যোগেন্দ্র অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠল।
অন্নদা যোগেন্দ্রকে ঠাণ্ডা করার জন্য বারবার বলতে লাগলেন, “সে কথা ঠিক, সে কথা ঠিক। পরের দোষত্রুটি নিয়ে কেবলই আলোচনা করতে থাকলে মন ছোটো হয়ে যায়, স্বভাব সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠে, হৃদয়ের সরসতা থাকে না।”
যোগেন্দ্র বলল, “বাবা, তুমি কি আমাকে লক্ষ্য করে বলছ? কিন্তু ধার্মিকের মতো আমার স্বভাব নয়; আমি মন্দ বলতেও জানি, ভালো বলতেও জানি এবং মুখের ওপর স্পষ্ট করে বলে হাতে-হাতেই সব কথা চুকিয়ে ফেলি।”
অন্নদা ব্যস্ত হয়ে বললেন, “যোগেন, তুমি কি পাগল হয়েছ। তোমাকে লক্ষ্য করে বলব কেন? আমি কি তোমাকে চিনি না?”
তখন ভূরি ভূরি প্রশংসাবাদের দ্বারা পরিপূর্ণ করে যোগেন্দ্র নলিনাক্ষের বৃত্তান্ত বিবৃত করল। বলল, “মাতাকে সুখী করার জন্য নলিনাক্ষ আচার সম্পর্কে সংযত হয়ে কাশীতে বাস করছে, এইজন্যেই, বাবা, তুমি যাদের অনেক লোক বল, তারা অনেক কথা বলছে। কিন্তু আমি তো এজন্য নলিনাক্ষকে ভালোই বলি। হেম, তুমি কী বল?”
হেমনলিনী বলল, “আমিও তো তাই বলি।”
যোগেন্দ্র বলল, “হেম যে ভালোই বলবে, তা আমি নিশ্চয় জানতাম। বাবাকে সুখী করার জন্য হেম একটা-কিছু ত্যাগস্বীকার করার উপলক্ষ পেলে যেন বাঁচে, তা আমি বেশ বুঝতে পারি।”
অন্নদা স্নেহকোমলহাস্যে হেমের মুখের দিকে তাকালেন– হেমনলিনী লজ্জায় রক্তিম মুখখানি নত করল।