সভাভঙ্গের পর অন্নদা হেমনলিনীকে নিয়ে যখন ঘরে ফিরলেন তখনো সন্ধ্যা হয়নি। চা খেতে বসে অন্নদাবাবু বললেন, “আজ বড়ো আনন্দলাভ করেছি।”
এর অধিক আর তিনি কথা বললেন না; তার মনের ভেতরের দিকে একটা ভাবের স্রোত বইছিল।
আজ চা খাওয়ার পরেই হেমনলিনী আস্তে আস্তে ওপরে চলে গেল, অন্নদাবাবু তা লক্ষ্য করলেন না।
আজ সভাস্থলে– নলিনাক্ষ– যিনি বক্তৃতা করেছিলেন, তাঁকে দেখতে আশ্চর্য তরুণ এবং সুকুমার; যুবাবয়সেও যেন শৈশবের অম্লান লাবণ্য তার মুখশ্রীকে পরিত্যাগ করেনি; অথচ তার অন্তরাত্মা থেকে যেন একটা ধ্যানপরতার গাম্ভীর্য তার চতুর্দিকে বিকীর্ণ হচ্ছে।
তার বক্তৃতার বিষয় ছিল “ক্ষতি”। তিনি বলেছিলেন, সংসারে যে ব্যক্তি কিছু হারায়নি সে কিছু পায়নি। অমনি যা আমাদের হাতে আসে তাকে আমরা সম্পূর্ণ পাই না; ত্যাগের দ্বারা আমরা যখন তাকে পাই তখনই যথার্থ তা আমাদের অন্তরের ধন হয়ে ওঠে। যা-কিছু আমাদের প্রকৃত সম্পদ তা সম্মুখ থেকে সরে গেলেই যে ব্যক্তি হারিয়ে ফেলে সে লোক দুর্ভাগা; বরং তাকে ত্যাগ করেই তাকে বেশি করে পাওয়ার ক্ষমতা মানবচিত্তের আছে। যা আমার যায় তার সম্পর্কে যদি আমি নত হয়ে করজোড় করে বলতে পারি “আমি দিলাম, আমার ত্যাগের দান, আমার দুঃখের দান, আমার অশ্রুর দান”– তবে ক্ষুদ্র বৃহৎ হয়ে ওঠে, অনিত্য নিত্য হয় এবং যা আমাদের ব্যবহারের উপকরণমাত্র ছিল তা পূজার উপকরণ হয়ে আমাদের অন্তঃকরণের দেবমন্দিরের রত্নভাণ্ডারে চিরসঞ্চিত হয়ে থাকে।
এই কথাগুলো আজ হেমনলিনীর সমস্ত হৃদয় জুড়ে বাজছে। ছাদের ওপর নক্ষত্রদীপ্ত আকাশের তলে সে আজ স্তব্ধ হয়ে বসল। তার সমস্ত মন আজ পূর্ণ; সমস্ত আকাশ, সমস্ত জগৎসংসার তার কাছে আজ পরিপূর্ণ।
বক্তৃতাসভা থেকে ফেরার সময় যোগেন্দ্র বলল, “অক্ষয়, তুমি বেশ পাত্রটি সন্ধান করেছ যা হোক। এ তো সন্ন্যাসী! এর অর্ধেক কথা তো আমি বুঝতেই পারলাম না।”
অক্ষয় বলল, “রোগীর অবস্থা বুঝে ঔষধের ব্যবস্থা করতে হয়। হেমনলিনী রমেশের ধ্যানে মগ্ন আছেন; সে ধ্যান সন্ন্যাসী না হলে আমাদের মতো সহজ লোকে ভাঙাতে পারবে না। যখন বক্তৃতা চলছিল তখন তুমি কি হেমের মুখ লক্ষ্য করে দেখনি?”
যোগেন্দ্র। দেখেছি বৈকি। ভালো লাগছিল তা বেশ বোঝা গেল। কিন্তু বক্তৃতা ভালো লাগলেই যে বক্তাকে বরমাল্য দেওয়া সহজ হয়, তার কোনো হেতু দেখি না।
অক্ষয়। ঐ বক্তৃতা কি আমাদের মতো কারও মুখে শুনলে ভালো লাগত? তুমি জান না যোগেন্দ্র, তপস্বীর ওপর মেয়েদের একটা বিশেষ টান আছে। সন্ন্যাসীর জন্য উমা তপস্যা করেছিলেন, কালিদাস তা কাব্যে লিখে গেছেন। আমি তোমাকে বলছি, আর যেকোনো পাত্র তুমি খাড়া করবে হেমনলিনী রমেশের সঙ্গে মনে মনে তার তুলনা করবে; সে তুলনায় কেউ টিকতে পারবে না। নলিনাক্ষ মানুষটি সাধারণ লোকের মতোই নয়; এর সঙ্গে তুলনার কথা মনেই উদয় হবে না। অন্য কোনো যুবককে হেমনলিনীর সামনে এনেই তোমাদের উদ্দেশ্য সে স্পষ্ট বুঝতে পারবে এবং তার সমস্ত হৃদয় বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। কিন্তু নলিনাক্ষকে বেশ একটু কৌশল করে যদি এখানে আনতে পার তাহলে হেমের মনে কোনো সন্দেহ উঠবে না; তারপর ক্রমে শ্রদ্ধা থেকে মাল্যদান পর্যন্ত কোনোপ্রকারে চালনা করে নিয়ে যাওয়া নিতান্ত শক্ত হবে না।
যোগেন্দ্র। কৌশলটা আমার দ্বারা ভালো ঘটে ওঠে না– বলটাই আমার পক্ষে সহজ। কিন্তু যাই বল পাত্রটি আমার পছন্দ হচ্ছে না।
অক্ষয়। দেখো যোগেন, তুমি নিজের জেদ নিয়ে সমস্ত মাটি করো না। সকল সুবিধা একত্রে পাওয়া যায় না। যেমন করে হোক, রমেশের চিন্তা হেমনলিনীর মন থেকে না তাড়াতে পারলে আমি তো ভালো বুঝি না। তুমি যে গায়ের জোরে সেটা করে উঠতে পারবে, তা মনেও করো না। আমার পরামর্শ অনুসারে যদি ঠিকমতো চল তাহলে তোমাদের একটা সদ্গতি হতেও পারে।
যোগেন্দ্র। আসল কথা, নলিনাক্ষ আমার পক্ষে একটু বেশি দুর্বোধ। এরকম লোকদের নিয়ে কারবার করতে আমি ভয় করি। একটা দায় থেকে উদ্ধার হতে গিয়ে ফের আরেকটা দায়ের মধ্যে জড়িয়ে পড়ব।
অক্ষয়। ভাই, তোমরা নিজের দোষে পুড়েছ, আজকে সিঁদুরে মেঘ দেখে আতঙ্ক লাগছে। রমেশ সম্পর্কে তোমরা যে গোড়াগুড়ি একেবারে অন্ধ ছিলে। এমন ছেলে আর হয় না, ছলনা কাকে বলে রমেশ তা জানে না, দর্শনশাস্ত্রে রমেশ দ্বিতীয় শংকরাচার্য বললেই হয়, আর সাহিত্যে স্বয়ং সরস্বতীর ঊনবিংশ শতাব্দীর পুরুষ-সংস্করণ! রমেশকে প্রথম থেকেই আমার ভালো লাগেনি– ঐরকম অত্যুচ্চ-আদর্শ-ওয়ালা লোক আমার বয়সে আমি ঢের-ঢের দেখেছি। কিন্তু আমার কথাটি বলার জো ছিল না; তোমরা জানতে, আমার মতো অযোগ্য অভাজন কেবল মহাত্মা-লোকদের ঈর্ষা করতেই জানে, আমাদের আর কোনো ক্ষমতা নেই। যা হোক, এতদিন পরে বুঝেছ মহাপুরুষদের দূর থেকে ভক্তি করা চলে, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে নিজের বোনের বিবাহের সম্বন্ধ করা নিরাপদ নয়। কিন্তু কণ্টকেনৈব কণ্টকম্। যখন এই একমাত্র উপায় আছে, তখন আর এ নিয়ে খুঁত খুঁত করতে বসো না।
যোগেন্দ্র। দেখো অক্ষয়, তুমি যে আমাদের সকলের আগে রমেশকে চিনতে পেরেছিলে, এ কথা হাজার বললেও আমি বিশ্বাস করব না। তখন নিতান্ত গায়ের জ্বালায় তুমি রমেশকে দু-চোখে দেখতে পারতে না; সেটা যে তোমার অসাধারণ বুদ্ধির পরিচয় তা আমি মানব না। যাই হোক, কলকৌশলের যদি প্রয়োজন থাকে তবে তুমি লাগো, আমার দ্বারা হবে না। মোটের ওপরে, নলিনাক্ষকে আমার ভালোই লাগছে না।
যোগেন্দ্র এবং অক্ষয় উভয়ে যখন অন্নদার চা খাওয়ার ঘরে এসে পৌঁছল, দেখল, হেমনলিনী ঘরের অন্য দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। অক্ষয় বুঝল, হেমনলিনী তাদের জানালা দিয়ে পথেই দেখতে পেয়েছিল। সামান্য একটু হেসে সে অন্নদার কাছে এসে বসল। চায়ের পেয়ালা ভর্তি করে নিয়ে বলল, “নলিনাক্ষবাবু যা বলেন একেবারে প্রাণের ভেতর থেকে বলেন, সেইজন্য তার কথাগুলো এত সহজে প্রাণের মধ্যে গিয়ে প্রবেশ করে।”
অন্নদাবাবু বললেন, “লোকটির ক্ষমতা আছে।”
অক্ষয় বলল, “শুধু ক্ষমতা! এমন সাধুচরিত্রের লোক দেখা যায় না।”
যোগেন্দ্র যদিও চক্রান্তের মধ্যে ছিল তবু সে থাকতে না পেরে বলে উঠল, “আঃ, সাধুচরিত্রের কথা আর বলিয়ো না; সাধুসঙ্গ থেকে ভগবান আমাদের পরিত্রাণ করুন।”
যোগেন্দ্র কাল এই নলিনাক্ষের সাধুতার অজস্র প্রশংসা করেছিল, এবং যারা নলিনাক্ষের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের নিন্দুক বলে গালি দিয়েছিল।
অন্নদা বললেন, “ছি যোগেন্দ্র, অমন কথা বলিয়ো না। বাইরে থেকে যাদের ভালো বলে মনে হয় অন্তরেও তারা ভালো, এ কথা বিশ্বাস করে বরং আমি ঠকতে রাজি আছি, তবু নিজের ক্ষুদ্র বুদ্ধিমত্তার গৌরবরক্ষার জন্য সাধুতাকে সন্দেহ করতে আমি প্রস্তুত নই। নলিনাক্ষবাবু যেসব কথা বলেছেন এসব পরের মুখের কথা নয়; তার নিজের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে তিনি যা প্রকাশ করেছেন আমার পক্ষে আজ তা নতুন লাভ বলে মনে হয়েছে। যে ব্যক্তি কপট স、他 ব্যক্তি সত্যকার জিনিস দেবে কোথা থেকে? সোনা যেমন বানানো যায় না এসব কথাও তেমনি বানানো যায় না। আমার ইচ্ছা হয়েছে নলিনাক্ষবাবুকে আমি নিজে গিয়ে সাধুবাদ দিয়ে আসব।”
অক্ষয়। আমার ভয় হয়, তার শরীর টেকে কি না।
অন্নদাবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, “কেন, তার শরীর কি ভালো নয়?”
অক্ষয়। ভালো থাকার তো কথা নয়; দিনরাত্রি নিজের সাধনা এবং শাস্ত্রালোচনা নিয়েই আছেন, শরীরের প্রতি তো আর দৃষ্টি নেই।
অন্নদা বললেন, “এটা ভারি অন্যায়। শরীর নষ্ট করার অধিকার আমাদের নেই; আমরা আমাদের শরীর সৃষ্টি করিনি। আমি যদি তাঁকে কাছে পেতাম তবে নিশ্চয়ই অল্পদিনেই আমি তার স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করে দিতে পারতাম। আসলে স্বাস্থ্যরক্ষার গুটিকতক সহজ নিয়ম আছে, তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে–”
যোগেন্দ্র অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “বাবা, বৃথা কেন তোমরা ভেবে মরছ? নলিনাক্ষবাবুর শরীর তো দিব্যি দেখলাম; তাঁকে দেখে আজ আমার বেশ বোধ হল, সাধুত্ব-জিনিসটা স্বাস্থ্যকর। আমার নিজেরই মনে হচ্ছে, ওটা চেষ্টা করে দেখলে হয়।”
অন্নদা বললেন, “না যোগেন্দ্র, অক্ষয় যা বলছে তা হতেও পারে। আমাদের দেশে বড়ো বড়ো লোকেরা প্রায় অল্প বয়সেই মারা যান, তারা নিজের শরীরকে উপেক্ষা করে দেশের লোকসান করে থাকেন। এটা কিছুতে ঘটতে দেওয়া উচিত নয়। যোগেন্দ্র, তুমি নলিনাক্ষবাবুকে যা মনে করছ তা নয়, তার মধ্যে আসল জিনিস আছে। তাঁকে এখন থেকেই সাবধান করে দেওয়া দরকার।”
অক্ষয়। আমি তাঁকে আপনার কাছে এনে উপস্থিত করব। আপনি যদি তাঁকে একটু ভালো করে বুঝিয়ে দেন তো ভালো হয়। আর, আমার মনে হয়, আপনি সেই-যে শিকড়ের রসটা আমাকে পরীক্ষার সময় দিয়েছিলেন সেটা আশ্চর্য বলকারক। যেকোনো লোক সর্বদা মনকে খাটাচ্ছে তার পক্ষে এমন মহৌষধ আর নেই। আপনি যদি একবার নলিনাক্ষবাবুকে–
যোগেন্দ্র একেবারে চৌকি ছেড়ে উঠে পড়ে বলল, “আঃ অক্ষয়, তুমি জ্বালালে। বড়ো বাড়াবাড়ি করছ। আমি চললাম।”
পূর্বে যখন তার শরীর ভালো ছিল তখন অন্নদাবাবু ডাক্তারি ও কবিরাজি নানাপ্রকার বটিকাদি সর্বদাই ব্যবহার করতেন– এখন আর ওষুধ খাওয়ারও উৎসাহ নেই এবং নিজের অস্বাস্থ্য নিয়ে আজকাল তিনি আর আলোচনামাত্রও করেন না, বরং তা গোপন করতেই চেষ্টা করেন।
আজ তিনি যখন অসময়ে কেদারায় ঘুমোচ্ছিলেন তখন সিঁড়িতে পদশব্দ শুনে হেমনলিনী কোল থেকে সেলাইয়ের সামগ্রী নামিয়ে তার দাদাকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য দরজার কাছে গেল। গিয়ে দেখল, তার দাদার সঙ্গে সঙ্গে নলিনাক্ষবাবু এসে উপস্থিত হয়েছেন। তাড়াতাড়ি অন্য ঘরে পালানোর উপক্রম করতেই যোগেন্দ্র তাকে ডেকে বলল, “হেম, নলিনাক্ষবাবু এসেছেন, তাঁর সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই।”
হেম থমকে দাঁড়াল এবং নলিনাক্ষ তার সামনে এলেই তার মুখের দিকে না তাকিয়ে নমস্কার করল। অন্নদাবাবু জেগে উঠে ডাকলেন, “হেম!” হেম তার কাছে এসে মৃদুস্বরে বলল, “নলিনাক্ষবাবু এসেছেন।”
যোগেন্দ্রের সঙ্গে নলিনাক্ষ ঘরে প্রবেশ করতেই অন্নদাবাবু ব্যস্তভাবে অগ্রসর হয়ে নলিনাক্ষকে অভ্যর্থনা করে আনলেন। বললেন, “আজ আমার বড়ো সৌভাগ্য, আপনি আমার বাড়িতে এসেছেন। হেম, কোথায় যাচ্ছ মা, এখানে বোসো। নলিনাক্ষবাবু, এটি আমার কন্যা হেম– আমরা দুজনেই সেদিন আপনার বক্তৃতা শুনে বড়ো আনন্দলাভ করে এসেছি। আপনি ঐ-যে একটা কথা বলেছেন– আমরা যা পেয়েছি তা কখনোই হারাতে পারি না, যা যথার্থ পাইনি তাই হারাই, এ কথাটির অর্থ বড়ো গভীর। কী বলো মা হেম? বাস্তবিক, কোন জিনিসটিকে যে আমার করতে পেরেছি আর কোনটিকে পারিনি তার পরীক্ষা হয় তখনই যখন তা আমাদের হাতের কাছ থেকে সরে যায়। নলিনাক্ষবাবু, আপনার কাছে আমাদের একটা অনুরোধ আছে। মাঝে মাঝে আপনি এসে যদি আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে যান তবে আমাদের বড়ো উপকার হয়। আমরা বড়ো কোথাও বাইরে যাই না– আপনি যখনি আসবেন আমাকে আর আমার মেয়েটিকে এই ঘরেই দেখতে পাবেন।”
নলিনাক্ষ আলজ্জিত হেমনলিনীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, “আমি বক্তৃতাসভায় বড়ো বড়ো কথা বলে এসেছি বলে আপনারা আমাকে মস্ত একটা গম্ভীর লোক মনে করবেন না। সেদিন ছাত্ররা নিতান্ত ধরে পড়েছিল বলে বক্তৃতা করতে গিয়েছিলাম– অনুরোধ এড়ানোর ক্ষমতা আমার একেবারেই নেই– কিন্তু এমন করে বলে এসেছি যে, দ্বিতীয়বার অনুরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা আমার নেই। ছাত্ররা স্পষ্টই বলছে, আমার বক্তৃতা বারো-আনা বোঝাই যায়নি। যোগেনবাবু, আপনিও তো সেদিন উপস্থিত ছিলেন– আপনাকে সতৃষ্ণনয়নে ঘড়ির দিকে তাকাতে দেখে আমার হৃদয় যে বিচলিত হয়নি, এ কথা মনে করবেন না।”
যোগেন্দ্র বলল, “আমি ভালো বুঝতে পারিনি সেটা আমার বুদ্ধির দোষ হতে পারে, সেজন্য আপনি কিছুমাত্র ক্ষুব্ধ হবেন না।”
অন্নদা। যোগেন, সব কথা বোঝার বয়স সব নয়।
নলিনাক্ষ। সব কথা বোঝার দরকারও সবসময়ে দেখি না।
অন্নদা। কিন্তু নলিনবাবু, আপনাকে আমার একটা কথা বলার আছে। ঈশ্বর আপনাদের কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তাই বলে শরীরকে অবহেলা করবেন না। যাঁরা দাতা তাঁদের এ কথা সর্বদাই স্মরণ করাতে হয় যে, মূলধন নষ্ট করে ফেলবেন না, তাহলে দান করার শক্তি চলে যাবে।
নলিনাক্ষ। আপনি যদি আমাকে কখনো ভালো করে জানার অবসর পান তবে দেখবেন, আমি সংসারে কোনো-কিছুকেই অবহেলা করি না। জগতে নিতান্তই ভিক্ষুকের মতো এসেছিলাম, বহুকষ্টে বহুলোকের আনুকূল্যে শরীর-মন অল্পে অল্পে প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। আমার পক্ষে এ নবাবি শোভা পায় না যে, আমি কিছুকেই অবহেলা করে নষ্ট করব। যে ব্যক্তি গড়তে পারে না সে ব্যক্তি ভাঙার অধিকারী তো নয়।
অন্নদা। বড়ো ঠিক কথা বলেছেন। আপনি কতকটা এই ভাবের কথাই সেদিনকার প্রবন্ধেও বলেছিলেন।
যোগেন্দ্র। আপনারা বসুন, আমি চললাম– একটু কাজ আছে।
নলিনাক্ষ। যোগেনবাবু, আপনি কিন্তু আমাকে মাপ করবেন। নিশ্চয় জানবেন, লোককে অতিষ্ঠ করা আমার স্বভাব নয়। আজ নাহয় আমি উঠি। চলুন, খানিকটা রাস্তা আপনার সঙ্গে যাওয়া যাক।
যোগেন্দ্র। না না, আপনি বসুন। আমার প্রতি লক্ষ করবেন না। আমি কোথাও বেশিক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে পারি না।
অন্নদা। নলিনাক্ষবাবু, যোগেনের জন্য আপনি ব্যস্ত হবেন না। যোগেন এমনি যখন খুশি আসে যখন খুশি যায়, ওকে ধরে রাখা শক্ত।
যোগেন্দ্র চলে গেলে অন্নদাবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “নলিনবাবু, আপনি এখন কোথায় আছেন?”
নলিনাক্ষ হেসে বলল, “আমি যে বিশেষ কোথাও আছি তা বলতে পারি না। আমার জানাশোনা লোক অনেক আছেন, তাঁরা আমাকে টানাটানি করে নিয়ে বেড়ান। আমার সে মন্দ লাগে না। কিন্তু মানুষের চুপ করে থাকারও প্রয়োজন আছে। তাই যোগেনবাবু আমার জন্য আপনাদের বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িতেই স্থান করে দিয়েছেন। এ গলিটি বেশ নিভৃত বটে।”
এই সংবাদে অন্নদাবাবু বিশেষ আনন্দপ্রকাশ করলেন। কিন্তু তিনি যদি লক্ষ্য করে দেখতেন তো দেখতে পেতেন যে, কথাটা শোনামাত্র হেমনলিনীর মুখ ক্ষণকালের জন্য বেদনায় বিবর্ণ হয়ে গেল। ঐ পাশের বাসাতেই রমেশ ছিল।
এদিকে চা তৈরির খবর পেয়ে সকলে মিলে নীচে চা খাওয়ার ঘরে গেলেন। অন্নদাবাবু বললেন, “মা হেম, নলিনবাবুকে এক পেয়ালা চা দাও।”
নলিনাক্ষ বলল, “না অন্নদাবাবু, আমি চা খাব না।”
অন্নদা। সে কি কথা নলিনবাবু! এক পেয়ালা চা– নাহয় তো কিছু মিষ্টি খান।
নলিনাক্ষ। আমাকে মাপ করবেন।
অন্নদা। আপনি ডাক্তার, আপনাকে আর কী বলব। মধ্যাহ্নভোজনের তিন-চার ঘণ্টা পরে চায়ের উপলক্ষে খানিকটা গরম জল খাওয়া হজমের পক্ষে যে নিতান্ত উপকারী। অভ্যাস না থাকে যদি, আপনাকে নাহয় খুব পাতলা করে চা তৈরি করে দিই।
নলিনাক্ষ চকিতের মধ্যে হেমনলিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে, হেমনলিনী নলিনাক্ষের চা খেতে সংকোচ সম্পর্কে একটা কী আন্দাজ করেছে এবং তাই নিয়ে মনে মনে আন্দোলন করছে। তৎক্ষণাৎ হেমনলিনীর দিকে তাকিয়ে নলিনাক্ষ বলল, “আপনি যা মনে করছেন তা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। আপনাদের এই চায়ের টেবিলকে আমি ঘৃণা করছি বলে মনেও করবেন না। পূর্বে আমি যথেষ্ট চা খেয়েছি, চায়ের গন্ধে এখনো আমার মনটা উৎসুক হয়– আপনাদের চা খেতে দেখে আমি আনন্দবোধ করছি। কিন্তু আপনারা বোধ হয় জানেন না, আমার মা অত্যন্ত আচারপরায়ণা– আমি ছাড়া তার যথার্থ আপনার কেউ নেই– সেই মার কাছে আমি সংকুচিত হয়ে যেতে পারব না। এইজন্য আমি চা খাই না। কিন্তু আপনারা চা খেয়ে যে সুখটুকু পাচ্ছেন আমি তার ভাগ পাচ্ছি। আপনাদের আতিথ্য থেকে আমি বঞ্চিত নই।”
ইতিপূর্বে নলিনাক্ষের কথাবার্তায় হেমনলিনী মনে মনে একটু যেন আঘাত পাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, নলিনাক্ষ নিজেকে তাদের কাছে ঠিকভাবে প্রকাশ করছিল না। সে কেবলই বেশি কথা বলে নিজেকে ঢেকে রাখারই চেষ্টা করছিল। হেমনলিনী জানত না, প্রথম পরিচয়ে নলিনাক্ষ একটা একান্ত সংকোচের ভাব কিছুতেই তাড়াতে পারে না। এইজন্য নতুন লোকের কাছে অনেক স্থলেই সে নিজের স্বভাবের বিরুদ্ধে জোর করে প্রগল্ভ হয়ে ওঠে। নিজের অকৃত্রিম মনের কথা বলতে গেলেও তার মধ্যে একটা বেসুর লাগিয়ে বসে। সেটা নিজের কানেও ঠেকে। সেইজন্যই আজ যোগেন্দ্র যখন অধৈর্য হয়ে উঠে পড়ল তখন নলিনাক্ষ মনের মধ্যে একটা ধিক্কার অনুভব করে তার সঙ্গে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু নলিনাক্ষ যখন মার কথা বলল তখন হেমনলিনী শ্রদ্ধার চোখে তার মুখের দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারল না, এবং মাতার উল্লেখমাত্রে সেই মুহূর্তেই নলিনাক্ষের মুখে যে একটা সরস ভক্তির গাম্ভীর্য প্রকাশ পেল তা দেখে হেমনলিনীর মন আর্দ্র হয়ে গেল। তার ইচ্ছা করতে লাগল নলিনাক্ষের মাতার সম্পর্কে তার সঙ্গে আলোচনা করে, কিন্তু সংকোচে তা পারল না।
অন্নদাবাবু ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “বিলক্ষণ। এ কথা পূর্বে জানলে আমি কখনোই আপনাকে চা খেতে অনুরোধ করতাম না। মাপ করবেন।”
নলিনাক্ষ একটু হেসে বলল, “চা নিতে পারলাম না বলে আপনাদের স্নেহের অনুরোধ থেকে কেন বঞ্চিত হব?”
নলিনাক্ষ চলে গেলে হেমনলিনী তার পিতাকে নিয়ে দোতলার ঘরে গিয়ে বসল এবং বাংলা মাসিক পত্রিকা থেকে প্রবন্ধ বেছে তাঁকে পড়ে শোনাতে লাগল। শুনতে শুনতে অন্নদাবাবু অনতিবিলম্বে ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুদিন থেকে অন্নদাবাবুর শরীরে এরকম অবসাদের লক্ষণ নিয়মিতভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
কয়েক দিনের মধ্যেই নলিনাক্ষের সঙ্গে অন্নদাবাবুদের পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়ে এল। প্রথমে হেমনলিনী মনে করেছিল, নলিনাক্ষের মতো লোকের কাছে কেবল বড়ো বড়ো আধ্যাত্মিক বিষয়েই বুঝি উপদেশ পাওয়া যাবে; এমন মানুষের সঙ্গে যে সাধারণ বিষয়ে সহজ লোকের মতো আলাপ চলতে পারে তা মনেও করতে পারেনি। অথচ সমস্ত হাস্যালাপের মধ্যে নলিনাক্ষের একটা কেমন দূরত্বও ছিল।
একদিন অন্নদাবাবু ও হেমনলিনীর সঙ্গে নলিনাক্ষের কথাবার্তা চলছিল, এমন সময়ে যোগেন্দ্র কিছু উত্তেজিত হয়ে এসে বলল, “জান বাবা, আজকাল আমাদের সমাজের লোকে নলিনাক্ষবাবুর চেলা বলতে আরম্ভ করেছে। তাই নিয়ে এইমাত্র পরেশের সঙ্গে আমার খুব ঝগড়া হয়ে গেছে।”
অন্নদাবাবু একটু হেসে বললেন, “এতে আমি তো লজ্জার কথা কিছু দেখি না। যেখানে সকলেই গুরু, কেউই চেলা নয়, সেই দলে মিশতেই আমার লজ্জাবোধ হয়; সেখানে শিক্ষা দেওয়ার হুড়োহুড়িতে শিক্ষা পাওয়ার অবকাশ থাকে না।”
নলিনাক্ষ। অন্নদাবাবু, আমিও আপনার দলে; আমরা চেলার দল। যেখানে আমাদের কিছু শেখার সম্ভাবনা আছে সেইখানেই আমরা তলপি বহিয়ে বেড়াব।
যোগেন্দ্র অধৈর্য হয়ে বলল, “না না, কথাটা ভালো নয়। নলিনবাবু, কেউই যে আপনার বন্ধু বা আত্মীয় হতে পারবে না, যারা আপনার কাছে আসবে, তারাই আপনার চেলা বলে খ্যাত হয়ে যাবে, এমন বদনামটা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার নয়। আপনি কী সব কাণ্ড করেন, ওগুলো ছেড়ে দিন।”
নলিনাক্ষ। কী করে থাকি বলুন।
যোগেন্দ্র। ঐ-যে শুনেছি প্রাণায়াম করেন, ভোরের বেলায় সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন, খাওয়াদাওয়া নিয়ে নানাপ্রকার আচার-বিচার করতে ছাড়েন না, এতে দশের মধ্যে আপনি খাপছাড়া হয়ে পড়েন।
যোগেন্দ্রের এই রূঢ়বাক্যে ব্যথিত হয়ে হেমনলিনী মাথা নিচু করল। নলিনাক্ষ হেসে বলল, “যোগেনবাবু দশের মধ্যে খাপছাড়া হওয়াটা দোষের। কিন্তু তলোয়ারই কী, আর মানুষই কী, তার সবটাই কি খাপের মধ্যে থাকে? খাপের ভেতরে তলোয়ারের যে অংশটা থাকতে বাধ্য সেটাতে সকল তলোয়ারেরই ঐক্য আছে– বাইরের হাতলটাতে শিল্পীর ইচ্ছা ও নৈপুণ্য-অনুসারে কারিগরি নানা রকমের হয়ে থাকে। মানুষেরও দশের খাপের বাইরে নিজের বিশেষ কারিগরির একটা জায়গা আছে, সেটাও কি আপনারা বেদখল করতে চান? আর, আমার কাছে এও আশ্চর্য লাগে, আমি সকলের অগোচরে ঘরে বসে যে-সকল নিরীহ অনুষ্ঠান করে থাকি তা লোকের চোখেই বা পড়ে কী করে, আর তা নিয়ে আলোচনাই বা হয় কেন?”
যোগেন্দ্র। আপনি তা জানেন না বুঝি? যারা জগতের উন্নতির ভার সম্পূর্ণ নিজের স্কন্ধে নিয়েছে তারা পরের ঘরে কোথায় কী ঘটছে তা খুঁজে বার করা কর্তব্যের মধ্যেই গণ্য করে। যেটুকু খবর না পায় সেটুকু পূরণ করে নেওয়ার শক্তিও তাদের আছে। এ না হলে বিশ্বের সংশোধনকার্য চলবে কী করে? তা ছাড়া নলিনবাবু, পাঁচজনে যা না করে তা চোখের আড়ালে করলেও চোখে পড়ে যায়, যা সকলেই করে তাতে কেউ দৃষ্টিপাত করে না। এই দেখুন না কেন, আপনি ছাদে উঠে যা খুশি করেন তা আমাদের হেমের চোখেও পড়ে গেছে– হেম সে কথা বাবাকে বলছিল– অথচ হেম তো আপনার সংশোধনের ভার গ্রহণ করেনি।
হেমনলিনীর মুখ আরক্ত হয়ে উঠল; সে ব্যথিত হয়ে একটা-কী বলার উপক্রম করবামাত্র নলিনাক্ষ বলল, “আপনি কিছুমাত্র লজ্জা পাবেন না; ছাদে বেড়াতে উঠে সকালে-সন্ধ্যায় আপনি যদি আমার আহ্নিককৃত্য দেখে থাকেন, সেজন্য আপনাকে কে দোষী করবে? আপনার দুটি চক্ষু আছে বলে আপনি লজ্জিত হবেন না; ও দোষটা আমাদেরও আছে।”
অন্নদা। তা ছাড়া হেম আপনার আহ্নিক সম্পর্কে আমার কাছে কোনো আপত্তি প্রকাশ করেনি। সে শ্রদ্ধাপূর্বক আপনার সাধনপ্রণালী সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করছিল।
যোগেন্দ্র। আমি কিন্তু ওসব কিছু বুঝি না। আমরা সাধারণে সংসারে সহজ রকমে যে ভাবে চলে যাচ্ছি তাতে কোনো বিশেষ অসুবিধা দেখছি না– গোপনে অদ্ভুত কাণ্ড করে বিশেষ কিছু যে লাভ হয় আমার তা মনে হয় না– বরং এতে মনের যেন একটা সামঞ্জস্য নষ্ট হয়ে মানুষকে একঝোঁকা করে দেয়। কিন্তু আপনি আমার কথায় রাগ করবেন না– আমি নিতান্তই সাধারণ মানুষ, পৃথিবীর মধ্যে আমি নেহাত মাঝারি রকম জায়গাটাতেই থাকি; যাঁরা কোনোপ্রকার উচ্চমঞ্চে চড়ে বসেন আমার পক্ষে ঢেলা না মেরে তাঁদের নাগাল পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমার মতো এমন অসংখ্য লোক আছে, অতএব আপনি যদি সকলকে ছেড়ে কোনো অদ্ভুতলোকে উধাও হয়ে যান তবে আপনাকে অসংখ্য ঢেলা খেতে হবে।
নলিনাক্ষ। ঢেলা যে নানা রকমের আছে। কোনোটা বা স্পর্শ করে, কোনোটা বা চিহ্নিত করে যায়। যদি কেউ বলে, লোকটা পাগলামি করছে, ছেলেমানুষি করছে, তাতে কোনো ক্ষতি করে না; কিন্তু যখন বলে, লোকটা সাধুগিরি-সাধকগিরি করছে, গুরু হয়ে উঠে চেলা-সংগ্রহের চেষ্টায় আছে, তখন সে কথাটা হেসে উড়ানোর চেষ্টা করতে গেলে যে পরিমাণ হাসির দরকার হয় সে পরিমাণ অপর্যাপ্ত হাসি জোগায় না।
যোগেন্দ্র। কিন্তু আবার বলছি, আমার ওপর রাগ করবেন না নলিনবাবু। আপনি ছাদে উঠে যা খুশি করুন, আমি তাতে আপত্তি করার কে? আমার বক্তব্য কেবল এই যে, সাধারণের সীমানার মধ্যে নিজেকে ধরে রাখলে কোনো কথা থাকে না। সকলের যেরকম চলছে আমার তেমনি চলে গেলেই যথেষ্ট; তার বেশি চলতে গেলেই লোকের ভিড় জমে যায়। তারা গালি দিক বা ভক্তি করুক, তাতে কিছু আসে যায় না; কিন্তু জীবনটা এরকম ভিড়ের মধ্যে কাটানো কি আরামের?
নলিনাক্ষ। যোগেন্দ্রবাবু, যান কোথায়? আমাকে আমার ছাদের ওপর থেকে একেবারে সর্বসাধারণের শান-বাঁধানো একতলার মেঝের ওপর সবলে হঠাৎ উত্তীর্ণ করে দিয়ে পালালে চলবে কেন?
যোগেন্দ্র। আজকের মতো আমার পক্ষে যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। একটু ঘুরে আসি গে।
যোগেন্দ্র চলে গেলে পর হেমনলিনী মুখ নত করে টেবিল-ঢাকার ঝালরগুলির প্রতি অকারণে উপদ্রব করতে লাগল। সে সময়ে অনুসন্ধান করলে তার চক্ষু-পল্লবের প্রান্তে একটা আর্দ্রতার লক্ষণও দেখা যেত।
হেমনলিনী দিনে দিনে নলিনাক্ষের সঙ্গে আলাপ করতে করতে নিজের অন্তরের দৈন্য দেখতে পেল এবং নলিনাক্ষের পথ অনুসরণ করার জন্য ব্যাকুলভাবে ব্যগ্র হয়ে উঠল। অত্যন্ত দুঃখের সময় যখন সে অন্তরে-বাহিরে কোনো অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছিল না, তখনই নলিনাক্ষ বিশ্বকে তার সামনে যেন নতুন করে উদ্ঘাটিত করল। ব্রহ্মচারিণীর মতো একটা নিয়মপালনের জন্য তার মন কিছুদিন থেকে উৎসুক ছিল– কারণ, নিয়ম মনের পক্ষে একটা দৃঢ় অবলম্বন; শুধু তাই নয়, শোক কেবলমাত্র মনের ভাব-আকারে টিকতে চায় না, সে বাইরেও একটা কোনো কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে নিজেকে সত্য করে তুলতে চেষ্টা করে। এ পর্যন্ত হেমনলিনী সেরকম কিছু করতে পারেনি, লোকচক্ষুপাতের সংকোচে বেদনাকে সে অত্যন্ত গোপনে নিজের মনের মধ্যেই পালন করে এসেছে। নলিনাক্ষের সাধনপ্রণালীর অনুসরণ করে আজ যখন সে শুচি আচার ও নিরামিষ আহার গ্রহণ করল তখন তার মন বড়ো তৃপ্তিলাভ করল। নিজের শয়নঘরের মেঝে থেকে মাদুর ও কার্পেট তুলে ফেলে বিছানাটি এক ধারে পর্দার দ্বারা আড়াল করল; সে ঘরে আর-কোনো জিনিস রাখল না। সেই মেঝে প্রত্যহ হেমনলিনী স্বহস্তে জল ঢেলে পরিষ্কার করত– একটি রেকাবিতে কয়েকটি ফুল থাকত; স্নানান্তে শুভ্রবস্ত্র পরে সেইখানে মেঝের ওপরে হেমনলিনী বসত; সমস্ত মুক্ত বাতায়ন দিয়ে ঘরের মধ্যে অবারিত আলোক প্রবেশ করত এবং সেই আলোকের দ্বারা, আকাশের দ্বারা, বায়ুর দ্বারা সে নিজের অন্তঃকরণকে অভিষিক্ত করে নিত। অন্নদাবাবু সম্পূর্ণভাবে হেমনলিনীর সঙ্গে যোগ দিতে পারতেন না; কিন্তু নিয়মপালনের দ্বারা হেমনলিনীর মুখে যে-একটা পরিতৃপ্তির দীপ্তি প্রকাশ পেত তা দেখে বৃদ্ধের মন স্নিগ্ধ হয়ে যেত। এখন থেকে নলিনাক্ষ এলে হেমনলিনীর এই ঘরেই মেঝের ওপরে বসে তাঁদের তিনজনের মধ্যে আলোচনা চলত।
যোগেন্দ্র একেবারে বিদ্রোহী হয়ে উঠল– “এসব কী হচ্ছে? তোমরা যে সকলে মিলে বাড়িটাকে ভয়ংকর পবিত্র করে তুললে– আমার মতো লোকের এখানে পা ফেলার জায়গা নেই।”
আগে হলে যোগেন্দ্রের বিদ্রূপে হেমনলিনী অত্যন্ত কুণ্ঠিত হয়ে পড়ত– এখন অন্নদাবাবু যোগেন্দ্রের কথায় মাঝে মাঝে রাগ করে ওঠেন, কিন্তু হেমনলিনী নলিনাক্ষের সঙ্গে যোগ দিয়ে শান্তস্নিগ্ধভাবে হাস্য করে। এখন সে একটা দ্বিধাহীন নিশ্চিন্ত নির্ভর অবলম্বন করেছে– এ সম্পর্কে লজ্জা করাকেও সে দুর্বলতা বলে জ্ঞান করে। লোকে তার এখনকার সমস্ত আচরণকে অদ্ভুত মনে করে পরিহাস করছে তা সে জানে; কিন্তু নলিনাক্ষের প্রতি তার ভক্তি ও বিশ্বাস সমস্ত লোককে আচ্ছন্ন করে উঠেছে– এইজন্য লোকের সামনে সে আর সংকুচিত হয় না।
একদিন হেমনলিনী প্রাতঃস্নানের পর উপাসনা শেষ করে তার সেই নিভৃত ঘরটিতে বাতায়নের সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, এমন সময় হঠাৎ অন্নদাবাবু নলিনাক্ষকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। হেমনলিনীর হৃদয় তখন পরিপূর্ণ ছিল। সে তৎক্ষণাৎ ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রথমে নলিনাক্ষকে ও পরে তার পিতাকে প্রণাম করে পদধূলি গ্রহণ করল। নলিনাক্ষ সংকুচিত হয়ে উঠল। অন্নদাবাবু বললেন, “ব্যস্ত হবেন না নলিনবাবু, হেম তার কর্তব্য করেছে।”
অন্যদিন এত সকালে নলিনাক্ষ এখানে আসে না। তাই বিশেষ ঔৎসুক্যের সঙ্গে হেমনলিনী তার মুখের দিকে তাকাল। নলিনাক্ষ বলল, “কাশী থেকে মার খবর পাওয়া গেল, তার শরীর তেমন ভালো নেই; তাই আজ সন্ধ্যার ট্রেনে কাশীতে যাব স্থির করেছি। দিনের বেলায় যথাসম্ভব আমার সমস্ত কাজ সেরে নিতে হবে, তাই এখন আপনাদের কাছে বিদায় নিতে এসেছি।”
অন্নদাবাবু বললেন, “কী আর বলব, আপনার মার অসুখ, ভগবান করুন তিনি শীঘ্র সুস্থ হয়ে উঠুন। এই কয়দিনে আমরা আপনার কাছে যে উপকার পেয়েছি তার ঋণ কোনোকালে শোধ করতে পারব না।”
নলিনাক্ষ বলল, “নিশ্চয় জানবেন, আপনাদের কাছ থেকে আমি অনেক উপকার পেয়েছি। প্রতিবেশীকে যেমন যত্নসাহায্য করতে হয় তা তো করেছেনই– তা ছাড়া যে-সকল গভীর কথা নিয়ে এতদিন আমি একলা মনে মনে আলোচনা করছিলাম, আপনাদের শ্রদ্ধার দ্বারা তাকে নতুন তেজ দিয়েছেন– আমার ভাবনা ও সাধনা আপনাদের জীবন অবলম্বন করে আমার পক্ষে আরো দ্বিগুণ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। অন্য মানুষের হৃদয়ের সহযোগিতায় সার্থকতালাভ যে কত সহজ হয়ে উঠতে পারে, তা আমি বেশ বুঝেছি।”
অন্নদা বললেন, “আমি আশ্চর্য এই দেখলাম, আমাদের একটা-কিছুর বড়োই প্রয়োজন হয়েছিল, কিন্তু সেটা যে কী আমরা জানতাম না; ঠিক এমন সময়েই কোথা থেকে আপনাকে পেলাম এবং দেখলাম আপনাকে না হলে আমাদের চলত না। আমরা অত্যন্ত কুনো, লোকজনের কাছে যাতায়াত আমাদের বড়ো বেশি নেই; কোনো সভায় গিয়ে বক্তৃতা শোনার বাতিক আমাদের একেবারে নেই বললেই হয়– যদি বা আমি যাই, কিন্তু হেমকে নড়াতে পারা বড়ো শক্ত। কিন্তু সেদিন এ কী আশ্চর্য বলুন দেখি– যেমনি যোগেনের কাছে শুনলাম আপনি বক্তৃতা করবেন, আমরা দুজনেই কোনো আপত্তি প্রকাশ না করে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলাম– এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। এসব কথা মনে রাখবেন নলিনবাবু। এ থেকে বুঝবেন, আপনাকে আমাদের নিঃসন্দিগ্ধ প্রয়োজন আছে, না হলে এমনটি ঘটতে পারত না। আমরা আপনার দায়স্বরূপ।”
নলিনাক্ষ বলল, “আপনারাও এ কথা মনে রাখবেন, আপনাদের কাছ ছাড়া আর কারও কাছে আমি আমার জীবনের গূঢ়কথা প্রকাশ করিনি। সত্যকে প্রকাশ করতে পারাই সত্য সম্পর্কে চরম শিক্ষা। সেই প্রকাশ করার গভীর প্রয়োজন আপনাদের দ্বারাই মেটাতে পেরেছি।”
হেমনলিনী কোনো কথা বলেনি; বাতায়নের ভেতর দিয়ে রোদ এসে মেঝের ওপর পড়েছিল, তারই দিকে তাকিয়ে সে চুপ করে বসে ছিল। নলিনাক্ষের যখন উঠার সময় হল তখন সে বলল, “আপনার মা কেমন থাকেন সে খবর আমরা যেন জানতে পাই।”
নলিনাক্ষ উঠে দাঁড়াতেই হেমনলিনী পুনর্বার তাকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করল।