এই কয়দিন অক্ষয় দেখা দেয় নি। নলিনাক্ষ কাশী চলে যাওয়ার পর আজ সে যোগেন্দ্রের সঙ্গে অন্নদাবাবুর চায়ের টেবিলে দেখা দিয়েছে। অক্ষয় মনে মনে স্থির করেছিল যে, রমেশের স্মৃতি হেমনলিনীর মনে কতখানি জাগরূক আছে তা পরিমাপ করার সহজ উপায় হলো অক্ষয়ের প্রতি তার বিরাগ প্রকাশ। আজ দেখল, হেমনলিনীর মুখ প্রশান্ত; অক্ষয়কে দেখে তার মুখের ভাব কিছুমাত্র বিকৃত হলো না; সহজ প্রসন্নতার সঙ্গে হেমনলিনী বলল, “আপনাকে যে এতদিন দেখি নি?”
অক্ষয় বলল, “আমরা কি প্রতিদিন দেখার যোগ্য?”
হেমনলিনী হেসে বলল, “সে যোগ্যতা না থাকলে যদি দেখাশোনা বন্ধ করা উচিত বোধ করেন, তবে আমাদের অনেককেই নির্জনবাস অবলম্বন করতে হয়।”
যোগেন্দ্র। অক্ষয় মনে করেছিল একলা বিনয় করে বাহাদুরি নেবে, হেম তার ওপরেও টেক্কা দিয়ে সমস্ত মনুষ্যজাতির হয়ে বিনয় করে নিল, কিন্তু এ সম্বন্ধে আমার একটুখানি বলার কথা আছে। আমাদের মতো সাধারণ লোকই প্রতিদিন দেখাশোনার যোগ্য– আর যাঁরা অসাধারণ, তাঁদেরকে কদাচিৎ কখনো দেখাই ভালো, তার বেশি সহ্য করা শক্ত। এইজন্যই তো অরণ্যে-পর্বতে-গুহাতেই তাঁরা ঘুরে বেড়ান– লোকালয়ে তাঁরা স্থায়িভাবে বসতি শুরু করে দিলে অক্ষয়-যোগেন্দ্র প্রভৃতি নিতান্তই সামান্য লোকদের অরণ্যে-পর্বতে ছুটতে হতো।
যোগেন্দ্রের কথাটির মধ্যে যে খোঁচা ছিল, হেমনলিনীকে তা বিধল। কোনো উত্তর না দিয়ে তিন পেয়ালা চা তৈরি করে সে অন্নদা, অক্ষয় ও যোগেন্দ্রের সামনে রাখল। যোগেন্দ্র বলল, “তুমি বুঝি চা খাবে না?”
হেমনলিনী জানত, এবার যোগেন্দ্রের কাছে কঠিন কথা শুনতে হবে, তবু সে শান্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, “না, আমি চা ছেড়ে দিয়েছি।”
যোগেন্দ্র। এবারে রীতিমত তপস্যা শুরু হলো বুঝি! চায়ের পাতার মধ্যে বুঝি আধ্যাত্মিক তেজ যথেষ্ট নেই, যা-কিছু আছে, সমস্তই হরতকির মধ্যে? কী বিপদেই পড়া গেল! হেম, ও-সব রাখো। এক পেয়ালা চা খেলেই যদি তোমার যোগ-যাগ ভেঙে যায়, তবে যাক-না– এ সংসারে খুব মজবুত জিনিসও টেকে না, অমন পলকা ব্যাপার নিয়ে পাঁচ জনের মধ্যে চলা অসম্ভব।
এই বলে যোগেন্দ্র উঠে নিজের হাতে আর-এক পেয়ালা চা তৈরি করে হেমনলিনীর সামনে রাখল। সে তাতে হাত না দিয়ে অন্নদাবাবুকে বলল, “বাবা, আজ যে তুমি শুধু চা খেলে? আর কিছু খাবে না?”
অন্নদাবাবুর কণ্ঠস্বর এবং হাত কাঁপতে লাগল, “মা, আমি সত্য বলছি, এ টেবিলে কিছু খেতে আমার মুখে রোচে না। যোগেনের কথাগুলো আমি অনেকক্ষণ পর্যন্ত চুপ করে সহ্য করতে চেষ্টা করছি। জানি আমার শরীর-মনের এ অবস্থায় কথা বলতে গেলেই আমি কী বলতে কী বলে ফেলি– শেষকালে অনুতাপ করতে হবে।”
হেমনলিনী তার বাবার চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “বাবা, তুমি রাগ কোরো না। দাদা আমাকে চা খাওয়াতে চান, সেটা তো ভালোই; আমি তো কিছু তাতে মনে করি নি। না বাবা, তোমাকে খেতে হবে– খালি-পেটে চা খেলে তোমার অসুখ করে আমি জানি।”
এই বলে হেম খাবারের পাত্র তার বাবার সামনে টেনে আনল। অন্নদা ধীরে ধীরে খেতে লাগলেন।
হেমনলিনী নিজের চৌকিতে ফিরে এসে যোগেন্দ্রের তৈরি চায়ের পেয়ালা থেকে চা খেতে উদ্যত হলো। অক্ষয় তাড়াতাড়ি উঠে বলল, “মাপ করবেন, ও পেয়ালাটি আমাকে দিতে হবে, আমার পেয়ালা ফুরিয়ে গেছে।”
যোগেন্দ্র উঠে এসে হেমনলিনীর হাত থেকে পেয়ালা টেনে নিল এবং অন্নদাকে বলল, “আমার অন্যায় হয়েছে, আমাকে মাপ করো।”
অন্নদা তার কোনো উত্তর করতে পারলেন না, দেখতে দেখতে তাঁর দুই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
যোগেন্দ্র অক্ষয়কে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘর থেকে সরে গেল। অন্নদাবাবু খাবার শেষ করে উঠে হেমনলিনীর হাত ধরে কাঁপতে কাঁপতে উপরের ঘরে গেলেন।
সেই রাতেই অন্নদাবাবুর শূলবেদনার মতো হলো। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বলল, তার যকৃতের বিকার উপস্থিত হয়েছে– এখনো রোগ অগ্রসর হয় নি, এইবেলা পশ্চিমে কোনো স্বাস্থ্যকর স্থানে গিয়ে বছরখানেক কিংবা ছয় মাস বাস করে এলে শরীর নিরোগ হতে পারবে।
বেদনা উপশম হলে ও ডাক্তার চলে গেলে অন্নদাবাবু বললেন, “হেম, চলো মা, আমরা কিছুদিন নাহয় কাশীতেই গিয়ে থাকি।”
ঠিক একই সময়ে হেমনলিনীর মনেও সে কথা উদয় হয়েছিল। নলিনাক্ষ চলে যাওয়ামাত্র হেম নিজের সাধনা-সংক্রান্ত কাজে একটু দুর্বলতা অনুভব করতে শুরু করেছিল। নলিনাক্ষের উপস্থিতিই হেমনলিনীর সমস্ত দৈনিক আচার-অনুষ্ঠানকে যেন দৃঢ় অবলম্বন দিত। নলিনাক্ষের মুখশ্রীতেই যে একটা স্থির নিষ্ঠা ও প্রশান্ত প্রসন্নতার দীপ্তি ছিল তাই হেমনলিনীর বিশ্বাসকে সর্বদাই যেন বিকশিত করে রেখেছিল, নলিনাক্ষের অনুপস্থিতিতে তার উৎসাহের মধ্যে যেন একটা ম্লান ছায়া এসে পড়ল। তাই আজ সারাদিন হেমনলিনী নলিনাক্ষের উপদিষ্ট সমস্ত অনুষ্ঠান অনেক জোর করে এবং বেশি করে পালন করেছে। কিন্তু তাতে শ্রান্তি এসে এমনি নিরাশা উপস্থিত হয়েছিল যে, সে অশ্রু সংবরণ করতে পারে নি। চায়ের টেবিলে দৃঢ়তার সঙ্গে সে আতিথ্যে প্রবৃত্ত হয়েছিল, কিন্তু তার মনের মধ্যে একটা ভার চেপে ছিল। আবার তাকে তার সেই পুরোনো স্মৃতির বেদনা দ্বিগুণ বেগে আক্রমণ করেছে– আবার তার মন যেন গৃহহীন-আশ্রয়হীনের মতো হা-হুতাশ করতে উদ্যত হয়েছে। তাই যখন সে কাশী যাওয়ার প্রস্তাব শুনল তখন ব্যগ্র হয়ে বলল, “বাবা, সেটাই বেশ হবে।”
পরদিন একটা আয়োজনের তোড়জোড় দেখে যোগেন্দ্র জিজ্ঞাসা করল, “কী, ব্যাপারটা কী?”
অন্নদা বললেন, “আমরা পশ্চিমে যাচ্ছি।”
যোগেন্দ্র জিজ্ঞাসা করল, “পশ্চিমে কোথায়?”
অন্নদা বললেন, “ঘুরতে ঘুরতে একটা কোনো জায়গা পছন্দ করে নেব।” তিনি যে কাশীতে যাচ্ছিলেন এ কথা এক নিঃশ্বাসে যোগেন্দ্রের কাছে বলতে সংকোচ বোধ করলেন।
যোগেন্দ্র বলল, “আমি কিন্তু এবার তোমাদের সঙ্গে যেতে পারব না। আমি সেই হেডমাস্টারির জন্য দরখাস্ত পাঠিয়ে দিয়েছি, তার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছি।”
রমেশ ভোরে এলাহাবাদ থেকে গাজিপুরে ফিরে এল। তখন রাস্তায় বেশি লোক ছিল না, আর শীতের জড়তায় রাস্তার ধারের গাছগুলো যেন পাতার আড়ালে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। পাড়ার বস্তিগুলোর ওপর তখনও একটানা সাদা কুয়াশা, ডিমের ওপর নিস্তব্ধ বসে থাকা রাজহাঁসের মতো স্থির হয়ে ছিল। সেই নির্জন পথে গাড়ির ভেতর একটা বড়সড় ওভারকোটের নিচে রমেশের বুক উত্তাল হৃদয়ের আঘাতে কেবলই দুলছিল।
বাংলোর বাইরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রমেশ নামল। ভাবল, গাড়ির শব্দ নিশ্চয় কমলা শুনেছে, শব্দ শুনে সে হয়তো বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে। নিজের হাতে কমলার গলায় পরিয়ে দেবার জন্য এলাহাবাদ থেকে রমেশ একটি দামি নেকলেস কিনে এনেছে; সেটার বাক্সটাই রমেশ তার ওভারকোটের বড় পকেট থেকে বের করে নিল।
বাংলোর সামনে এসে রমেশ দেখল, বিষন-বেহারা বারান্দায় শুয়ে নির্ভার ঘুম দিচ্ছে—ঘরের দরজাগুলো বন্ধ। বিমর্ষমুখে রমেশ একটু থমকে দাঁড়াল। একটু জোরে ডাকল, “বিষন!” ভাবল, এই ডাকে ঘরের ভেতরের ঘুমও ভাঙবে। কিন্তু এমনভাবে ঘুম ভাঙানোর যে অপেক্ষা আছে, এটাই তার মনে বাজল; রমেশ তো অর্ধেক রাত ঘুমোতে পারেনি।
দুই-তিন ডাকেও বিষন উঠল না; শেষে ঠেলে তাকে উঠাতে হল। বিষন উঠে বসে ক্ষণকাল হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে রইল। রমেশ জিজ্ঞেস করল, “বৌদি ঘরে আছেন?”
বিষন প্রথমে রমেশের কথা যেন বুঝতেই পারল না; তারপর হঠাৎ চমকে উঠে কৈফিয়ত দিল, “হ্যাঁ, তিনি ঘরেই আছেন।”
এই বলে সে আবার শুয়ে পড়ে ঘুম দেবার উপক্রম করল।
রমেশ দরজা ঠেলতেই দরজা খুলে গেল। ভেতরে গিয়ে ঘরে ঘরে ঘুরে দেখল, কেউ কোথাও নেই। তবু একবার চিৎকার করে ডাকল, “কমলা!” কোথাও কোনো সাড়া পেল না। বাইরের বাগানে নিমগাছতলা পর্যন্ত ঘুরে এল; রান্নাঘরে, চাকরদের ঘরে, আস্তাবল-ঘরে খোঁজ করে এল; কোথাও কমলাকে দেখতে পেল না। তখন রোদ উঠে পড়েছে—কাকগুলো ডাকতে শুরু করেছে আর বাংলার কুয়ো থেকে জল নিতে কলসি মাথায় পাড়ার মেয়ে দুই-একজন দেখা দিচ্ছে। পথের ওপারে কুটিরপ্রাঙ্গণে কোনো গ্রাম্য নারী বিচিত্র উঁচু সুরে গান গাইতে গাইতে জাঁতায় গম ভাঙতে শুরু করেছে।
রমেশ বাংলোঘরে ফিরে এসে দেখল, বিষন আবার গভীর ঘুমে মগ্ন। তখন সে নুইয়ে দুই হাতে জোরে বিষনকে ঝাঁকানি দিতে লাগল; দেখল তার নিশ্বাসে তাড়ির তীব্র গন্ধ ছুটছে।
ঝাঁকানির তীব্র বেগে বিষন অনেকটা প্রকৃতিস্থ হয়ে ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। রমেশ আবার জিজ্ঞেস করল, “বৌদি কোথায়?”
বিষন বলল, “বৌদি তো ঘরেই আছেন।”
রমেশ। কোথায়, ঘরে কোথায়?
বিষন। কাল তো এখানেই এসেছেন।
রমেশ। তারপর কোথায় গেছেন?
বিষন হাঁ করে রমেশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এমন সময় খুব চওড়া পাড়ের এক বাহারি ধুতি পরে চাদর উড়িয়ে রক্তবর্ণ চোখ উমেশ এসে উপস্থিত হল। রমেশ তাকে জিজ্ঞেস করল, “উমেশ, তোর মা কোথায়?”
উমেশ বলল, “মা তো কাল থেকে এখানেই আছেন।”
রমেশ জিজ্ঞেস করল, “তুই কোথায় ছিলি?”
উমেশ বলল, “আমাকে মা কাল বিকেলে সিধুবাবুদের বাড়ি যাত্রা শুনতে পাঠিয়েছিলেন।”
গাড়োয়ান এসে বলল, “বাবু, আমার ভাড়া।”
রমেশ তাড়াতাড়ি সেই গাড়িতে চড়ে একেবারে খুড়োর বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হল। সেখানে গিয়ে দেখল, বাড়িসুদ্ধ সকলেই যেন চঞ্চল। রমেশের মনে হল, কমলার বুঝি কোনো অসুখ করেছে। কিন্তু তা নয়। কাল সন্ধ্যার কিছু পরেই উমি হঠাৎ খুব চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল আর তার মুখ নীল ও হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ায় সবাই খুব ভয় পেয়ে গেল। তার চিকিৎসা নিয়ে কাল বাড়িসুদ্ধ সবাইই ব্যস্ত ছিল। সারারাত কেউ ঘুমোতে পারেনি।
রমেশ মনে করল, উমির অসুখ হওয়াতে নিশ্চয়ই কাল কমলাকে এখানে আনা হয়েছিল। বিপিনকে বলল, “কমলা তাহলে উমিকে নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছে?”
কমলা কাল রাতে এখানে এসেছিল কি না বিপিন তা নিশ্চিত জানত না, তাই রমেশের কথায় একরকম সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, তিনি উমিকে যেরকম ভালোবাসেন, খুব ভাবছেন বৈকি। কিন্তু ডাক্তার বলেছে, ভাবনার কোনো কারণই নেই।”
যাই হোক, অত্যন্ত উল্লাসের মুখে কল্পনার পূর্ণ উচ্ছ্বাসে বাধা পেয়ে রমেশের মনটা বিকল হয়ে গেল। সে ভাবতে লাগল, তাদের মিলনে যেন একটা দৈবের ব্যাঘাত আছে।
এমন সময় রমেশের বাংলো থেকে উমেশ এসে উপস্থিত হল। এখানকার অন্তঃপুরে তার যাতায়াত ছিল। এই বালকটাকে শৈলজা স্নেহও করতেন। বাড়ির ভেতরে শৈলজার ঘরের মধ্যে সে ঢুকছে দেখে উমির ঘুম ভাঙার আশঙ্কায় শৈল তাড়াতাড়ি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন।
উমেশ জিজ্ঞেস করল, “মা কোথায় মাসিমা?”
শৈল বিস্মিত হয়ে বললেন, “কেন রে, তুই তো কাল তাকে সঙ্গে নিয়ে ও বাড়িতে গেলি। সন্ধ্যের পর আমাদের লছমনিয়াকে ওখানে পাঠানোর কথা ছিল, খুকির অসুখে তা পারি নি।”
উমেশ মুখ মলিন করে বলল, “ও বাড়িতে তো তাঁকে দেখলাম না।”
শৈল ব্যস্ত হয়ে বললেন, “সে কী কথা! কাল রাতে তুই কোথায় ছিলি?”
উমেশ। আমাকে তো মা থাকতে দিলেন না। ও বাড়িতে গিয়েই তিনি আমাকে সিধুবাবুদের ওখানে যাত্রা শুনতে পাঠিয়েছিলেন।
শৈল। তোরও তো বেশ আক্কেল দেখছি। বিষন কোথায় ছিল?
উমেশ। বিষন তো কিছুই বলতে পারে না। কাল সে খুব তাড়ি খেয়েছিল।
শৈল। যা যা, শিগগির বাবুকে ডেকে আন্।
বিপিন আসতেই শৈল বললেন, “ওগো, এ কী সর্বনাশ হয়ে গেছে?”
বিপিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে ব্যস্ত হয়ে বলল, “কেন, কী হয়েছে?”
শৈল। কমলা কাল ও বাংলোতে গিয়েছিল, তাকে তো সেখানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বিপিন। তিনি কি কাল রাতে এখানে আসেন নি?
শৈল। না গো। উমির অসুখে আনাব মনে করেছিলাম, লোক কোথায় ছিল? রমেশবাবু কি এসেছেন?
বিপিন। বোধ হয় ও বাংলোতে দেখতে না পেয়ে তিনি ঠিক করেছেন কমলা এখানেই আছেন। তিনি তো আমাদের এখানেই এসেছেন।
শৈল। যাও যাও, শিগগির যাও, তাঁকে নিয়ে খোঁজ করো গে। উমি এখন ঘুমোচ্ছে—সে ভালোই আছে।
বিপিন ও রমেশ আবার সেই গাড়িতে উঠে বাংলোতে ফিরে গেল আর বিষনকে নিয়ে পড়ল। অনেক চেষ্টায় জোড়াতাড়ি দিয়ে যেটুকু খবর বের হল তা এই—কাল বিকেলে কমলা একা গঙ্গার ধারের দিকে চলেছিল। বিষন তার সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাব করে, কমলা তার হাতে একটা টাকা দিয়ে তাকে নিষেধ করে ফিরিয়ে দেয়। সে পাহারা দেবার জন্য বাগানের গেটের কাছে বসেছিল, এমন সময় গাছ থেকে সদ্য সংগ্রহ করা ফেনোচ্ছল তাড়ির কলসি বাঁকে করে তাড়িওয়ালা তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল—তারপর থেকে বিশ্বসংসারে কী যে ঘটেছে তা বিষনের কাছে যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। যে পথ দিয়ে কমলাকে গঙ্গার দিকে যেতে দেখেছিল বিষন তা দেখিয়ে দিল।
সেই পথ অবলম্বন করে শিশিরসিক্ত শস্যক্ষেত্রের মাঝখান দিয়ে রমেশ বিপিন ও উমেশ কমলার খোঁজে চলল। উমেশ হারানো শাবক শিকারি জন্তুর মতো চারিদিকে তীক্ষ্ণ ব্যাকুল দৃষ্টি পাঠাতে লাগল। গঙ্গার তীরে এসে তিনজন একবার দাঁড়াল। সেখানে চারিদিক উন্মুক্ত। ধূসর বালুভূমি প্রভাতরোদে ধু-ধু করছে। কোথাও কাউকে দেখা গেল না। উমেশ উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে ডাকল, “মা, মা গো, মা কোথায়?” ওপারের সুদূর উঁচু তীর থেকে তার প্রতিধ্বনি ফিরে এল—কেউই সাড়া দিল না।
খুঁজতে খুঁজতে উমেশ হঠাৎ দূরে সাদা কী একটা দেখতে পেল। তাড়াতাড়ি কাছে এসে দেখল, জলের একেবারেই ধারে একগোছা চাবি একটা রুমালে বাঁধা পড়ে আছে। “কী রে ওটা কী?” বলে রমেশও এসে পড়ল। দেখল, কমলারই চাবির গোছা।
যেখানে চাবি পড়েছিল সেখানে বালুতটের প্রান্তভাগে পলিমাটি পড়েছে। সেই কাঁচা মাটির ওপর দিয়ে গঙ্গার জল পর্যন্ত ছোট দুটি পায়ের গভীর চিহ্ন পড়ে গেছে। খানিকটা জলের মধ্যে একটা কী ঝিক্ ঝিক্ করছিল, তা উমেশের দৃষ্টি এড়াতে পারল না; সে সেটা তাড়াতাড়ি তুলে ধরতেই দেখা গেল, সোনার ওপর এনামেল-করা একটি ছোট ব্রোচ—এটা রমেশেরই উপহার।
এইরকমে সমস্ত সংকেতই যখন গঙ্গার জলের দিকেই আঙুল নির্দেশ করল তখন উমেশ আর থাকতে পারল না—“মা, মা গো” বলে চিৎকার করে জলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। জল সেখানে বেশি ছিল না; উমেশ বারবার পাগলের মতো ডুব দিয়ে তলা হাতড়ে বেড়াতে লাগল, জল ঘোলা করে তুলল।
রমেশ হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল। বিপিন বলল, “উমেশ, তুই কী করছিস? উঠে আয়।”
উমেশ মুখ দিয়ে জল ফেলতে ফেলতে বলতে লাগল, “আমি উঠব না, আমি উঠব না। মা গো, তুমি আমাকে ফেলে যেতে পারবে না।”
বিপিন ভয়ে শিউরে উঠল। কিন্তু উমেশ জলের মাছের মতো সাঁতার দিতে পারে, তার পক্ষে জলে আত্মহত্যা করা অত্যন্ত কঠিন। সে অনেকটা হাঁপাতে-হাঁপাতে ক্লান্ত হয়ে ডাঙায় উঠে পড়ল আর বালুর ওপর লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল।
বিপিন নিস্তব্ধ রমেশকে স্পর্শ করে বলল, “রমেশবাবু, চলুন। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে! একবার পুলিশকে খবর দেওয়া যাক, তারা সমস্ত সন্ধান করে দেখুক।”
শৈলজার ঘরে সেদিন আহারনিদ্রা বন্ধ হয়ে কান্নার রোল উঠল। নদীতে জেলেরা নৌকা নিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত জাল টেনে বেড়াল। পুলিশ চারিদিকে সন্ধান করতে লাগল। স্টেশনে গিয়ে বিশেষ করে খবর নিল, কমলার সাথে বর্ণনায় মেলে এমন কোনো বাঙালি মেয়ে রাতে রেলগাড়িতে ওঠে নি।
সেই দিনই বিকেলে খুড়ো এসে পৌঁছলেন। কয়দিন থেকে কমলার ব্যবহার ও আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে তাঁর সন্দেহমাত্র রইল না যে, কমলা গঙ্গার জলে ডুবে আত্মহত্যা করে মরেছে।
লছমনিয়া বলল, “সেইজন্যই খুকি কাল রাতে অকারণে কান্না জুড়ে এমন একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল, ওকে ভালো করে ঝাড়াইলে দরকার।”
রমেশের বুকের ভেতরটা যেন শুকিয়ে গেল; তার মধ্যে অশ্রুর বাষ্পটুকুও ছিল না। সে বসে বসে ভাবতে লাগল—“একদিন এই কমলা এই গঙ্গার জল থেকে উঠে আমার পাশে এসেছিল, আবার পূজার পবিত্র ফুলটুকুর মতো আর-এক দিন এই গঙ্গার জলের মধ্যেই অন্তর্হিত হল।”
সূর্য যখন অস্ত গেল তখন রমেশ আবার সেই গঙ্গার ধারে এল; যেখানে চাবির গোছা পড়ে ছিল সেখানে দাঁড়িয়ে সেই পায়ের চিহ্ন কয়টি একদৃষ্টে দেখল; তারপর তীরে জুতা খুলে, ধুতি গুটিয়ে নিয়ে, খানিকটা জল পর্যন্ত নেমে গেল আর বাক্স থেকে সেই নতুন নেকলেসটি বের করে দূরে জলের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলল।
রমেশ কখন যে গাজিপুর থেকে চলে গেল, খুড়োর বাড়িতে তার খবর নেবার মতো অবস্থা কারও রইল না।
এখন রমেশের সামনে কোনো কাজ রইল না। তার মনে হতে লাগল, এই জীবনে সে যেন কোনো কাজ করবে না, কোথাও স্থায়ী হয়ে বসতে পারবে না। হেমনলিনীর কথা তার মনে একেবারেই যে উঠেনি তা নয়, কিন্তু সে তা সরিয়ে দিয়েছে; সে মনে মনে বলেছে, “আমার জীবনে যে নিদারুণ ঘটনা আঘাত করল তাতে আমাকে চিরদিনের জন্য সংসারের অযোগ্য করে তুলেছে। বজ্রাহত গাছ প্রফুল্ল উপবনের মধ্যে স্থান পাবার আশা কেন করবে?”
রমেশ ভ্রমণ করে বেড়াবার জন্য বেরিয়ে পড়ল। এক জায়গায় কোথাও বেশি দিন রইল না। সে নৌকায় চড়ে কাশীর ঘাটের শোভা দেখল, সে দিল্লিতে কুতুবমিনারের উপরে চড়ল, আগ্রায় জ্যোৎস্নারাত্রে তাজমহল দেখে এল। অমৃতসরে গুরুদ্বার দেখে রাজপুতানায় আবুপর্বতশিখরে মন্দির দেখতে গেল—এমনি করে রমেশ নিজের শরীর-মনকে আর বিশ্রাম দিল না।
অবশেষে এই ভ্রমণক্লান্ত যুবকটির মন কেবলই ঘর চেয়ে হাহাকার করতে লাগল। তার মনে একটি শান্তিময় ঘরের অতীত স্মৃতি ও একটি সম্ভাব্য ঘরের সুখময় কল্পনা কেবলই আঘাত দিচ্ছে। অবশেষে একদিন তার শোককাল-যাপনের ভ্রমণ হঠাৎ শেষ হয়ে গেল এবং সে একটা বড় দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে কলকাতার টিকিট কিনে রেলগাড়িতে উঠে পড়ল।
কলকাতায় পৌঁছে রমেশ সেই কলুটোলার গলিটার ভিতরে হঠাৎ ঢুকতে পারল না। সেখানে গিয়ে সে কী দেখবে, কী শুনবে, তার কিছুই ঠিকানা নেই। মনের মধ্যে কেবলই একটা আশঙ্কা হতে লাগল যে, সেখানে একটা গুরুতর পরিবর্তন হয়েছে। একদিন সে গলির মোড় পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এল। পরদিন সন্ধ্যাবেলা রমেশ নিজেকে জোর করে সেই বাড়ির সামনে উপস্থিত করল। দেখল, বাড়ির সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ, ভিতরে কোনো লোক আছে এমন লক্ষণ নেই। তবু সেই সুখেন-বেহারাটা হয়তো খালি বাড়ি আগলাচ্ছে মনে করে রমেশ বেহারাকে ডাকতে দরজায় বারকয়েক আঘাত করল। কেউ সাড়া দিল না। প্রতিবেশী চন্দ্রমোহন তার ঘরের বাইরে বসে তামাক খাচ্ছিল; সে বলল, “কে ও। রমেশবাবু নাকি। ভালো আছেন তো? এ বাড়িতে অন্নদাবাবুরা তো এখন কেউ নেই।”
রমেশ। তাঁরা কোথায় গেছেন জানেন?
চন্দ্র। সে খবর তো বলতে পারি না, পশ্চিমে গেছেন এই জানি।
রমেশ। কে কে গেছেন মশায়?
চন্দ্র। অন্নদাবাবু আর তাঁর মেয়ে।
রমেশ। ঠিক জানেন, তাঁদের সঙ্গে আর কেউ যান নি?
চন্দ্র। ঠিক জানি বৈকি। যাবার সময়ও আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
তখন রমেশ ধৈর্য ধরে রাখতে অক্ষম হয়ে বলল, “আমি একজনের কাছে খবর পেয়েছি, নলিনবাবু বলে একটি বাবু তাঁদের সঙ্গে গেছেন।”
চন্দ্র। ভুল খবর পেয়েছেন। নলিনবাবু আপনার ঐ বাসাতেই দিন-কয়েক ছিলেন। ইঁরা যাত্রা করবার দিন-দুইচার আগেই তিনি কাশীতে গেছেন।
রমেশ তখন এই নলিনবাবুটির বিবরণ প্রশ্ন করে করে চন্দ্রমোহনের কাছ থেকে বের করল। ইঁহার নাম নলিনাক্ষ চট্টোপাধ্যায়। শোনা গেছে, আগে রংপুরে ডাক্তারি করতেন, এখন মাকে নিয়ে কাশীতেই আছেন। রমেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। জিজ্ঞেস করল, “যোগেন এখন কোথায় আছে বলতে পারেন?”
চন্দ্রমোহন খবর দিল, যোগেন্দ্র ময়মনসিংহের একটি জমিদারের স্থাপিত হাইস্কুলের হেডমাস্টার-পদে নিযুক্ত হয়ে বিশাইপুরে গেছে।
চন্দ্রমোহন জিজ্ঞেস করল, “রমেশবাবু, আপনাকে তো অনেকদিন দেখি নি; আপনি এতকাল কোথায় ছিলেন?”
রমেশ আর গোপন করবার কারণ দেখল না; সে বলল, “প্র্যাকটিস করতে গাজিপুরে গিয়েছিলাম।”
চন্দ্র। এখন তবে কি সেখানেই থাকা হবে?
রমেশ। না, সেখানে আমার থাকা হল না; এখন কোথায় যাব ঠিক করি নি।
রমেশ চলে যাবার অল্প সময় পরেই অক্ষয় এসে উপস্থিত হল। যোগেন্দ্র চলে যাবার সময়, মাঝে মাঝে তাদের বাড়ির তত্ত্বাবধানের জন্য অক্ষয়ের উপর ভার দিয়ে গিয়েছিল। অক্ষয় যে ভার গ্রহণ করে তা রক্ষা করতে কখনো শৈথিল্য করে না; তাই সে হঠাৎ যখন-তখন এসে দেখে যায়, বাড়ির বেহারা দুজনের মধ্যে একজনও হাজির থেকে খবরদারি করছে কি না।
চন্দ্রমোহন তাকে বলল, “রমেশবাবু এই খানিকক্ষণ হল এখান থেকে চলে গেলেন।”
অক্ষয়। বলেন কী! কী করতে এসেছিলেন?
চন্দ্র। তা তো জানি না। আমার কাছে অন্নদাবাবুদের সমস্ত খবর জেনে নিলেন। এমন রোগা হয়ে গেছেন, হঠাৎ তাঁকে চেনাই কঠিন; যদি বেহারাকে না ডাকতেন আমি চিনতে পারতাম না।
অক্ষয়। এখন কোথায় থাকেন, খবর পেলেন?
চন্দ্র। এতদিন গাজিপুরে ছিলেন; এখন সেখান থেকে উঠে এসেছেন, কোথায় থাকবেন ঠিক করে বলতে পারলেন না।
অক্ষয় বলল, “ও” বলে নিজের কাজে মন দিল।
রমেশ বাসায় ফিরে এসে ভাবতে লাগল, “অদৃষ্ট এ কী বিষম কৌতুকে প্রবৃত্ত হয়েছে। এক দিকে আমার সঙ্গে কমলার ও অন্য দিকে নলিনাক্ষের সঙ্গে হেমনলিনীর এই মিলন, এ যে একেবারে উপন্যাসের মতো—সেও এমন উপন্যাস যাতে সব ঠিক উল্টোপাল্টা মিলিয়ে দেওয়া হয়। এমনতরো ঠিক উল্টোপাল্টা মিলিয়ে দেওয়া অদৃষ্টেরই মতো বেপরোয়া রচয়িতার পক্ষেই সম্ভব—সংসারে সে এমন অদ্ভুত কাণ্ড ঘটায় যা ভীরু লেখক কাল্পনিক উপাখ্যানে লিখতে সাহস করে না।” কিন্তু রমেশ ভাবল, এবার সে যখন তার জীবনের সমস্যাজাল থেকে মুক্ত হয়েছে, তখন খুব সম্ভব, অদৃষ্ট এই জটিল উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে রমেশের পক্ষে নিদারুণ উপসংহার লিখবে না।
যোগেন্দ্র বিশাইপুর জমিদার-বাড়ির কাছাকাছি একটি একতলা বাড়িতে বাসা পেয়েছিল; সেখানে রবিবার সকালে খবরের কাগজ পড়ছিল এমন সময় বাজারের একটি লোক তার হাতে একখানা চিঠি দিল। খামের ওপরকার অক্ষর দেখেই সে আশ্চর্য হয়ে গেল। খুলে দেখল রমেশ লিখেছে—সে বিশাইপুরের একটি দোকানে অপেক্ষা করছে, বিশেষ কয়েকটি কথা বলার আছে।
যোগেন্দ্র একেবারে চৌকি ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। রমেশকে যদিও সে একদিন অপমান করতে বাধ্য হয়েছিল তবু সেই বাল্যবন্ধুকে এই দূরদেশে এতদিন না দেখার পর ফিরিয়ে দিতে পারল না। এমনকি, তার মনের মধ্যে একটা আনন্দই হল, কৌতূহলও কম হল না। বিশেষত হেমনলিনী যখন কাছে নেই, তখন রমেশের দ্বারা কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করা যায় না।
পত্রবাহকটিকে সঙ্গে করে যোগেন্দ্র নিজেই রমেশের খোঁজে চলল। দেখল, সে একটি মুদির দোকানে একটা খালি কেরোসিনের বাক্স সোজা করে তার ওপর চুপ করে বসে আছে; মুদি ব্রাহ্মণের হুঁকায় তাকে তামাক দিতে প্রস্তুত হয়েছিল, কিন্তু চশমাপরা বাবুটি তামাক খায় না শুনে মুদি তাকে শহরজাত কোনো অদ্ভুত শ্রেণীর পদার্থের মধ্যে গণ্য করেছিল। সেই অবধি পরস্পরের মধ্যে কোনোপ্রকার আলাপ-পরিচয়ের চেষ্টা হয়নি।
যোগেন্দ্র জোরেসোরে এসে একেবারে রমেশের হাত ধরে তাকে টেনে তুলল; বলল, “তোমার সঙ্গে পারা গেল না। তুমি তোমার দ্বিধা নিয়েই গেলে। কোথায় একেবারে সোজা আমার বাসায় এসে হাজির হবে, না, পথের মধ্যে মুদির দোকানে গুড়ের বাতাসা ও মুড়ির চাকতির মাঝখানে অটল হয়ে বসে আছ!”
রমেশ অপ্রতিভ হয়ে একটুখানি হাসল। যোগেন্দ্র পথের মধ্যে অনর্গল বকতে লাগল; বলল, “যিনিই যাই বলুন, বিধাতাকে আমরা কেউই চিনতে পারি নি। তিনি আমাকে শহরের মধ্যে মানুষ করে এতবড়ো শহুরে করে তুললেন, সে কি এই ঘোর পাড়াগাঁয়ের মধ্যে আমার জীবাত্মাটাকে একেবারে মাঠে মারবার জন্য?”
রমেশ চারি দিকে তাকিয়ে বলল, “কেন, জায়গাটি তো মন্দ নয়।”
যোগেন্দ্র। অর্থাৎ?
রমেশ। অর্থাৎ, নির্জন—
যোগেন্দ্র। এইজন্য আমার মতো আরো একটি জনকে বাদ দিয়ে এই নির্জনতা আরেকটু বাড়াবার জন্য আমি অনবরত ব্যাকুল হয়ে আছি।
রমেশ। যাই বল, মনের শান্তির পক্ষে—
যোগেন্দ্র। ও-সব কথা আমাকে বলো না—কয়দিন প্রচুর মনের শান্তি নিয়ে আমার প্রাণ একেবারে গলা পর্যন্ত এসে গেছে। আমার সাধ্যমত এই শান্তি ভাঙবার জন্য ত্রুটি করি নি। ইতিমধ্যে সেক্রেটারির সঙ্গে হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জমিদারবাবুটিকেও আমার মেজাজের যে-প্রকার পরিচয় দিয়েছি সহজে তিনি আমার ওপর আর হস্তক্ষেপ করতে আসবেন না। তিনি আমাকে দিয়ে ইংরেজি খবরের কাগজে তাঁর নকিবি করিয়ে নিতে ইচ্ছুক ছিলেন—কিন্তু আমার ইচ্ছা স্বতন্ত্র, সেটা আমি তাঁকে কিছু প্রবলভাবে বুঝিয়ে দিয়েছি। তবু যে টিকে আছি সে আমার নিজগুণে নয়। এখানকার জয়েন্ট সাহেব আমাকে অত্যন্ত পছন্দ করেছেন; জমিদারটি সেইজন্য ভয়ে আমাকে বিদায় করতে পারছেন না। যেদিন গেজেটে দেখব, জয়েন্ট বদলি হচ্ছেন সেইদিনই বুঝব, আমার হেডমাস্টারি-সূর্য বিশাইপুরের আকাশ থেকে অস্তমিত হল। ইতিমধ্যে এখানে আমার একটিমাত্র আলাপী আছে, আমার পাঞ্চকুকুরটি। আর-সকলেই আমার প্রতি যেরকম দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে তাকে কোনোমতেই শুভদৃষ্টি বলা চলে না।
যোগেন্দ্রের বাসায় এসে রমেশ একটা চৌকিতে বসল। যোগেন্দ্র বলল, “না, বসা নয়। আমি জানি প্রাতঃস্নান নামে তোমার একটা ঘোরতর কুসংস্কার আছে, সেটা সেরে এসো। ইতিমধ্যে আরেকবার গরম জলের কেতলিটা আগুনে চড়াই দিই। আতিথ্যের দোহাই দিয়ে আজ দ্বিতীয়বার চা খেয়ে নেব।”
এইরকমে আহার আলাপ ও বিশ্রামে দিন কেটে গেল। রমেশ যে বিশেষ কথাটা বলবার জন্য এখানে এসেছিল যোগেন্দ্র সমস্ত দিন তা কোনোমতেই বলবার অবকাশ দিল না। সন্ধ্যার পর আহারান্তে কেরোসিনের আলোকে দুজনে দুই কেদারা টেনে নিয়ে বসল। অদূরে শিয়াল ডাকল ও বাইরে অন্ধকার রাত্রি ঝিল্লির শব্দে স্পন্দিত হতে লাগল।
রমেশ বলল, “যোগেন, তুমি তো জানই, তোমাকে কী কথা বলতে আমি এখানে এসেছি। একদিন তুমি আমাকে যে প্রশ্ন করেছিলে সে প্রশ্নের উত্তর করবার সময় তখন উপস্থিত হয়নি। আজ আর উত্তর দেবার কোনো বাধা নেই।”
এই বলে রমেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে সে আগাগোড়া সমস্ত ঘটনা বলে গেল। মাঝে মাঝে তার স্বর রুদ্ধ হয়ে কণ্ঠ কেঁপে উঠল, মাঝে মাঝে কোনো কোনো জায়গায় সে দুই-এক মিনিট চুপ করে রইল। যোগেন্দ্র কোনো কথা না বলে স্থির হয়ে শুনল।
যখন বলা হয়ে গেল তখন যোগেন্দ্র একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, “এই-সকল কথা যদি সেদিন বলতে, আমি বিশ্বাস করতে পারতাম না।”
রমেশ। বিশ্বাস করার হেতু তখনো যেটুকু ছিল, এখনো তাই আছে। সেজন্য তোমার কাছে আমার প্রার্থনা যে, আমি যে গ্রামে বিবাহ করেছিলাম সে গ্রামে একবার তোমাকে যেতে হবে। তারপর সেখান থেকে কমলার মাতুলালয়েও নিয়ে যাব।
যোগেন্দ্র। আমি কোনোখানে এক পা নড়ব না, আমি এই কেদারাটার ওপর অটল হয়ে বসে তোমার কথার প্রত্যেক অক্ষর বিশ্বাস করব। তোমার সকল কথাই বিশ্বাস করা আমার চিরকালের অভ্যাস; জীবনে একবারমাত্র তার ব্যত্যয় হয়েছে, সেজন্য আমি তোমার কাছে মাপ চাই।
এই বলে যোগেন্দ্র চৌকি ছেড়ে উঠে রমেশের সামনে এল; রমেশ উঠে দাঁড়াতেই দুই বাল্যবন্ধু একবার পরস্পর কোলাকুলি করল। রমেশ রুদ্ধ কণ্ঠ পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, “আমি কোথা থেকে ভাগ্যরচিত এমন একটা দুশ্ছেদ্য মিথ্যার জালে জড়িয়ে পড়েছিলাম যে, তার মধ্যেই সম্পূর্ণ ধরা দেওয়া ছাড়া আমি কোনো দিকেই কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছিলাম না। আজ যে আমি তা থেকে মুক্ত হয়েছি, আর যে আমার কারো কাছে কিছুই গোপন করবার নেই, ইহাতে আমি প্রাণ পেয়েছি। কমলা কী জেনে, কী ভেবে আত্মহত্যা করল, তা আমি আজ পর্যন্ত বুঝতে পারি নি, আর বুঝবার কোনো সম্ভাবনাও নেই—কিন্তু ইহা নিশ্চয়, মৃত্যু যদি এমন করে আমাদের দুই জীবনের এই কঠিন গ্রন্থি কাটিয়ে না দিত, তবে শেষকালে আমরা দুজনে যে কোন দুর্গতির মধ্যে গিয়ে দাঁড়াতাম তা মনে করলে এখনো আমার হৃৎকম্প হয়। মৃত্যুর গ্রাস থেকে একদিন সে সমস্যা হঠাৎ উঠে এসেছিল, মৃত্যুর গর্ভেই একদিন সেই সমস্যা তেমনি হঠাৎ বিলীন হয়ে গেল।”
যোগেন্দ্র। কমলা যে নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করেছে তা নিঃসন্দেহে স্থির করে বসো না। সে যাই হোক, তোমার এ দিকটা তো পরিষ্কার হয়ে গেল, এখন নলিনাক্ষের কথা আমি ভাবছি।
তারপর যোগেন্দ্র নলিনাক্ষকে নিয়ে পড়ল। বলল, “আমি ওরকম লোকদের ভালো বুঝি না এবং যাহা বুঝি না তা আমি পছন্দও করি না। কিন্তু অনেক লোকের অন্যরকম মতই দেখি, তারা যাহা বোঝে না তা-ই বেশি পছন্দ করে। তাই হেমের জন্য আমার যথেষ্ট ভয় আছে। যখন দেখলাম, সে চা ছেড়ে দিয়েছে, মাছ-মাংসও খায় না, এমনকি, ঠাট্টা করলে আগের মতো তার চোখ ছলছল করে আসে না, বরং মৃদুমৃদু হাসে, তখন বুঝলাম গতিক ভালো নয়। যাই হোক, তোমাকে সহায় পেলে তাকে উদ্ধার করতে কিছুমাত্র বিলম্ব হবে না তা-ও আমি নিশ্চিত জানি; অতএব প্রস্তুত হও, দুই বন্ধু মিলে সন্ন্যাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করতে হবে।”
রমেশ হেসে বলল, “আমি যদিও বীরপুরুষ বলে খ্যাত নই, তবু প্রস্তুত আছি।”
যোগেন্দ্র। রোসো, আমার ক্রিসমাসের ছুটিটা আসুক।
রমেশ। সে তো দেরি আছে, ততক্ষণ আমি একলা এগিয়ে যাই-না কেন?
যোগেন্দ্র। না না, সেটা কোনোমতেই হবে না। তোমাদের বিবাহটি আমিই ভেঙেছিলাম, আমি নিজের হাতে তার প্রতিকার করব। তুমি যে আগেভাগে গিয়ে আমার এই শুভকার্যটি চুরি করবে, সে আমি ঘটতে দেব না। ছুটির তো আর দশ দিন বাকি আছে।
রমেশ। তবে ইতিমধ্যে আমি একবার—
যোগেন্দ্র। না না, সে-সব কিছু শুনতে চাই না—এ দশ দিন তুমি আমার এখানেই আছ। এখানে ঝগড়া করবার যতগুলো লোক ছিল সব আমি একটি একটি করে শেষ করেছি; এখন মুখের তার বদলাবার জন্য একজন বন্ধুর প্রয়োজন হয়েছে, এ অবস্থায় তোমাকে ছাড়বার জো নেই। এতদিন সন্ধ্যাবেলায় কেবলই শিয়ালের ডাক শুনে আসছি; এখন, এমনকি, তোমার কণ্ঠস্বরও আমার কাছে বীণার মতো সুন্দর বলে মনে হচ্ছে, আমার অবস্থা এতই শোচনীয়।
চন্দ্রমোহনের কাছে রমেশের খবর পেয়ে অক্ষয়ের মনে অনেকগুলো চিন্তার উদয় হল। সে ভাবতে লাগল, ব্যাপারটা কী? রমেশ গাজিপুরে প্র্যাকটিস করছিল, এতদিন নিজেকে যথেষ্ট গোপনেই রেখেছিল, এর মধ্যে এমন কী ঘটল যাতে সে সেখানকার প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে আবার সাহস করে কলুটোলার গলির মধ্যে আত্মপ্রকাশ করার জন্য উপস্থিত হয়েছে। অন্নদাবাবুরা যে কাশীতে আছেন, কোন দিন রমেশ কোথা থেকে সে খবর পাবে এবং নিশ্চয়ই সেখানে গিয়ে হাজির হবে। অক্ষয় স্থির করল, এর মধ্যে গাজিপুরে গিয়ে সে সমস্ত সংবাদ জানবে এবং তারপর একবার কাশীতে অন্নদাবাবুর সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসবে।
একদিন অগ্রহায়ণের বিকেলে অক্ষয় তার ব্যাগ হাতে করে গাজিপুরে এসে উপস্থিত হল। প্রথমে বাজারে জিজ্ঞেস করল, “রমেশবাবু বলে একটি বাঙালি উকিলের বাসা কোন দিকে?” অনেককেই জিজ্ঞেস করে জানল, বাজারে রমেশবাবু-নামক কোনো ব্যক্তির উকিল বলে কোনো খ্যাতি নেই। তখন সে আদালতে গেল। আদালত তখন ভেঙে গেছে। শামলা-পরা একটি বাঙালি উকিল গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন, তাঁকে অক্ষয় জিজ্ঞেস করল, “মশায়, রমেশচন্দ্র চৌধুরী বলে একটি নতুন বাঙালি উকিল গাজিপুরে এসেছেন, তাঁর বাসা কোথায় জানেন?”
অক্ষয় ইঁহার কাছ থেকে খবর পেল যে, রমেশ তো এতদিন খুড়োমশায়ের বাড়িতেই ছিল, এখন সে সেখানে আছে কি কোথাও গেছে তা বলা যায় না। তাঁর স্ত্রীকে পাওয়া যাচ্ছে না, সম্ভবত তিনি জলে ডুবে মরেছেন।
অক্ষয় খুড়োমশায়ের বাড়িতে যাত্রা করল। পথে যেতে যেতে ভাবতে লাগল, এইবার রমেশের চালটা বোঝা যাচ্ছে। স্ত্রী মারা গেছে; এখন সে নির্দ্বিধায় হেমনলিনীর কাছে প্রমাণ করার চেষ্টা করবে যে, তাঁর স্ত্রী কোনো কালেই ছিল না। হেমনলিনীর অবস্থা যেমন, তাতে রমেশের কথা অবিশ্বাস করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে যাবে। যারা ধর্মনীতি নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে বেড়ায়, গোপনে তারা যে কেমন ভয়ানক লোক অক্ষয় তা মনে মনে আলোচনা করে নিজের প্রতি শ্রদ্ধা অনুভব করতে লাগল।
খুড়োমশায়ের কাছে গিয়ে তাঁকে রমেশের ও কমলার কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি শোক সামলাতে পারলেন না, তাঁর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। তিনি বললেন, “আপনি যখন রমেশবাবুর বিশেষ বন্ধু, তখন আমার মা কমলাকে নিশ্চয় আপনি আত্মীয়ের মতোই জানেন; কিন্তু আমি এ কথা বলছি, কয়েক দিন মাত্র তাঁকে দেখে আমি আমার নিজের কন্যার সঙ্গে তাঁর প্রভেদ ভুলে গেছি। দুদিনের জন্য মায়া বাড়িয়ে মা-লক্ষ্মী যে আমাকে এমন বজ্রাঘাত করে ছেড়ে চলে যাবেন, এ কি আমি জানতাম।”
অক্ষয় মুখ মলিন করে বলল, “এমন ঘটনাটা যে কী করে ঘটল, আমি তো কিছুই বুঝতে পারি না। নিশ্চয়ই রমেশ কমলার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে নি।”
খুড়োমশায়। আপনি রাগ করবেন না, আপনাদের রমেশটিকে আমি আজ পর্যন্ত চিনতে পারলাম না। এ দিকে বাইরে তো দিব্য লোকটি; কিন্তু মনের মধ্যে কী ভাবেন, কী করেন, বুঝবার জো নেই। নইলে কমলার মতো অমন স্ত্রীকে কী মনে করে যে অনাদর করতেন তা ভেবে পাওয়া যায় না। কমলা এমন সতীলক্ষ্মী, আমার মেয়ের সঙ্গে তাঁর আপন বোনের মতো ভাব হয়েছিল—তবু কখনো একদিনের জন্যও নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে একটি কথাও বলে নি। আমার মেয়ে মাঝে মাঝে বুঝতে পারত যে, সে মনের মধ্যে খুবই কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত একটি কথা বলাতে পারে নি। এমন স্ত্রী যে কী অসহ্য কষ্ট পেলে এমন কাজ করতে পারে তা তো আপনি বুঝতেই পারেন—সে কথা মনে করলেও বুক ফেটে যায়। আবার আমার এমনই কপাল, আমি তখন এলাহাবাদে চলে গিয়েছিলাম, নইলে কি মা কখনো আমাকে ছেড়ে যেতে পারতেন?
পরদিন সকালে খুড়োমশায়কে নিয়ে অক্ষয় রমেশের বাংলো ও গঙ্গার তীর ঘুরে এল। ঘরে ফিরে এসে বলল, “দেখুন মশায়, কমলা যে গঙ্গায় ডুবে আত্মহত্যা করেছে, এ সম্বন্ধে আপনি যতটা নিঃসংশয় হয়েছেন আমি ততটা হতে পারি নি।”
খুড়োমশায়। আপনি কেমন মনে করেন?
অক্ষয়। আমার মনে হয় তিনি ঘর ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁকে ভালোভাবে খোঁজ করা উচিত।
খুড়োমশায় হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন, “আপনি ঠিক বলেছেন, কথাটা একেবারেই অসম্ভব নয়।”
অক্ষয়। কাছেই কাশীতীর্থ। সেখানে আমাদের একটি পরম বন্ধু আছেন; এমনও হতে পারে, কমলা তাঁদের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
খুড়োমশায় আশান্বিত হয়ে বললেন, “কই, তাঁদের কথা তো রমেশবাবু আমাদের কখনো বলেন নি। যদি জানতাম, তবে কি খোঁজ করতে বাকি রাখতাম?”
অক্ষয়। তবে একবার চলুন না, আমরা দুজনেই কাশী যাই। পশ্চিম-অঞ্চল আপনার সমস্তই জানাশোনা আছে, আপনি ভালো করে খোঁজ করতে পারবেন।
খুড়োমশায় এ প্রস্তাবে উৎসাহের সঙ্গে সম্মত হলেন। অক্ষয় জানত তাঁর কথা হেমনলিনী সহজে বিশ্বাস করবে না, এইজন্য প্রামাণিক সাক্ষীর মতো খুড়োমশায়কে সঙ্গে করে কাশীতে গেল।
শহরের বাইরে ক্যান্টনমেন্টের অধিকারের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় অন্নদাবাবুরা একটি বাংলো ভাড়া করে বাস করছেন।
অন্নদাবাবুরা কাশীতে পৌঁছেই খবর পেলেন, নলিনাক্ষের মা ক্ষেমংকরীর সামান্য জ্বর-কাশি ক্রমে নিউমোনিয়ায় দাঁড়িয়েছে। জ্বরের ওপরেও এই শীতে তিনি নিয়মিত প্রাতঃস্নান বন্ধ করেন নি বলেই তাঁর অবস্থা এত সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।
কয়েক দিন অশ্রান্ত যত্নে হেম তাঁর সেবা করার পর ক্ষেমংকরীর সংকটের অবস্থা কেটে গেল। কিন্তু তখনো তাঁর খুব দুর্বল অবস্থা। শুচিতা নিয়ে অতিরিক্ত বিচার করাতে পথ্য-জল প্রভৃতি সম্বন্ধে হেমনলিনীর সাহায্য তাঁর কোনো কাজে লাগল না। এর আগে তিনি নিজে রান্না করে খেতেন, এখন নলিনাক্ষ নিজেই তাঁর পথ্য তৈরি করে দিতে লাগল আর আহার সম্বন্ধে মায়ের সমস্ত সেবা নলিনাক্ষকে নিজের হাতে করতে হত। এতে ক্ষেমংকরী প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতে লাগলেন, “আমি তো গেলেই হত, কেবল তোমাদের কষ্ট দেবার জন্যই আবার বিশ্বেশ্বর আমাকে বাঁচালেন।”
ক্ষেমংকরী নিজের সম্বন্ধে কঠোরতা অবলম্বন করেছিলেন, কিন্তু তাঁর চারিদিকে পরিপাটি ও সৌন্দর্যবিন্যাসের প্রতি তাঁর খুব দৃষ্টি ছিল। হেমনলিনী সে কথা নলিনাক্ষের কাছ থেকে শুনেছিল। এইজন্য সে বিশেষ যত্নে চারিদিক পরিপাটি করে আর ঘর-দুয়ার সাজিয়ে রাখত এবং নিজেও যত্ন করে সেজে ক্ষেমংকরীর কাছে আসত। অন্নদা ক্যান্টনমেন্টে যে বাগান ভাড়া করেছিলেন সেখান থেকে প্রতিদিন ফুল তুলে এনে দিতেন, হেমনলিনী ক্ষেমংকরীর রোগশয্যার কাছে সেই ফুলগুলো নানারকম করে সাজিয়ে রাখত।
নলিনাক্ষ মায়ের সেবার জন্য দাসী রাখতে অনেকবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের হাত থেকে সেবা গ্রহণ করতে কোনোমতেই তাঁর আগ্রহ হত না। অবশ্য, জল তোলা প্রভৃতির জন্য চাকর-চাকরানি ছিল বটে, কিন্তু তাঁর একান্ত নিজের কাজগুলোতে বেতনভোগী কোনো চাকরের হস্তক্ষেপ তিনি সহ্য করতে পারতেন না। যে হরির মা ছেলেবেলায় তাঁকে মানুষ করেছিল সে মারা যাওয়ার পর থেকে খুব বড় রোগের সময়েও কোনো দাসীকে তিনি পাখা করতে বা গায়ে হাত বুলাতে দেন নি।
সুন্দর ছেলে, সুন্দর মুখ তিনি বড় ভালোবাসতেন। দশাশ্বমেধঘাটে প্রাতঃস্নান সেরে পথে প্রত্যেক শিবলিঙ্গে ফুল ও গঙ্গাজল দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় এক-এক দিন কোথা থেকে হয়তো একটি সুন্দর খোট্টার ছেলেকে অথবা কোনো ফুটফুটে হিন্দুস্থানি ব্রাহ্মণকন্যাকে বাড়িতে এনে উপস্থিত করতেন। পাড়ার দুটি-একটি সুন্দর ছেলেকে তিনি খেলনা দিয়ে, পয়সা দিয়ে, খাবার দিয়ে বশ করেছিলেন; তারা যখন-তখন তাঁর বাড়ির যেখানে-সেখানে উপদ্রব করে খেলে বেড়াত, এতে তিনি বড় আনন্দ পেতেন। তাঁর আরেকটি বাতিক ছিল। ছোটখাটো কোনো একটি সুন্দর জিনিস দেখলেই তিনি না কিনে থাকতে পারতেন না। এসব তাঁর নিজের কোনো কাজেই লাগত না; কিন্তু কোন জিনিসটি কে পেলে খুশি হবে, তা মনে করে উপহার পাঠাতে তাঁর বিশেষ আনন্দ ছিল। অনেক সময় তাঁর দূর আত্মীয়-পরিচিতেরাও এরকম একটা-কোনো জিনিস ডাকযোগে পেয়ে আশ্চর্য হয়ে যেত। তাঁর একটি বড় আবলুস কাঠের কালো সিন্দুকের মধ্যে এরকম অনাবশ্যক সুন্দর শৌখিন জিনিসপত্র, রেশমের কাপড়-চোপড় অনেক সঞ্চিত ছিল। তিনি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন, নলিনের বউ যখন আসবে তখন এগুলো সব তারই হবে। নলিনের একটি পরমাসুন্দরী বালিকাবধূ তিনি মনে মনে কল্পনা করে রেখেছিলেন—সে তাঁর ঘর উজ্জ্বল করে খেলে বেড়াচ্ছে, তাকে তিনি সাজাচ্ছেন-পরাচ্ছেন, এই সুখচিন্তায় তাঁর অনেক দিনের অনেক অবসর কেটেছে।
তিনি নিজে তপস্বিনীর মতো ছিলেন; স্নান-আহ্নিক-পূজায় প্রায় দিন কেটে গেলে এক বেলা ফল দুধ মিষ্টি খেয়ে থাকতেন; কিন্তু নিয়ম-সংযমে নলিনাক্ষের এতটা নিষ্ঠা তাঁর ঠিক মনের মধ্যে ভালো লাগত না। তিনি বলতেন, “পুরুষমানুষের আবার অত আচার-বিচারের বাড়াবাড়ি কেন?” পুরুষমানুষদের তিনি বড় ছেলেদের মতো মনে করতেন; খাওয়াদাওয়া-চালচলনে তাদের পরিমাণবোধ বা কর্তব্যবোধ না থাকলে সেটা যেন তিনি সস্নেহ প্রশ্রয়বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গত মনে করতেন, ক্ষমার সঙ্গে বলতেন, “পুরুষমানুষ কঠোরতা করতে পারবে কেন!” অবশ্য, ধর্ম সকলকেই রক্ষা করতে হবে, কিন্তু আচার পুরুষমানুষের জন্য নয়, এটাই তিনি মনে মনে ঠিক করেছিলেন। নলিনাক্ষ যদি অন্য সাধারণ পুরুষের মতো একটু পরিমাণে অবিবেচক ও স্বেচ্ছাচারী হত, সতর্কতার মধ্যে কেবলমাত্র তাঁর পূজার ঘরে প্রবেশ এবং অসময়ে তাঁকে স্পর্শ করাটুকু বাঁচিয়ে চলত, তাহলে তিনি খুশিই হতেন।
ব্যামো থেকে যখন সেরে উঠলেন ক্ষেমংকরী দেখলেন, হেমনলিনী নলিনাক্ষের উপদেশ-অনুসারে নানাপ্রকার নিয়মপালনে প্রবৃত্ত হয়েছে, এমনকি, বৃদ্ধ অন্নদাবাবুও নলিনাক্ষের সব কথা প্রবীণ গুরুবাক্যের মতো বিশেষ শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে শুনছেন।
এতে ক্ষেমংকরীর অত্যন্ত কৌতুক বোধ হল। তিনি একদিন হেমনলিনীকে ডেকে হেসে বললেন, “মা, তোমরা দেখছি, নলিনকে আরো পাগল করে তুলবে। ওর ওসব পাগলামির কথা তোমরা শোন কেন? তোমরা সাজগোজ করে, হেসে-খেলে আমোদ-আহ্লাদে বেড়াবে; তোমাদের কি এখন সাধন করার বয়স? যদি বল ‘তুমি কেন বরাবর এইসব নিয়ে আছ’, তার একটু কথা আছে। আমার বাপ-মা বড়ো নিষ্ঠাবান ছিলেন। ছেলেবেলা থেকে আমরা ভাইবোনেরা এইসব শিক্ষার মধ্যেই মানুষ হয়ে উঠেছি। এ যদি আমরা ছাড়ি তো আমাদের দ্বিতীয় কোনো আশ্রয় থাকে না। কিন্তু তোমরা তো সেরকম নও; তোমাদের শিক্ষাদীক্ষা তো সবই আমি জানি। তোমরা এ যা-কিছু করছ এ কেবল জোর করে করছ; তাতে লাভ কী মা? যে যা পেয়েছে সে তাই ভালো করে রক্ষা করে চলুক, আমি তো এই বলি। না না, ওসব কিছু নয়, ওসব ছাড়ো। তোমাদের আবার নিরামিষ খাওয়া কী, যোগ-তপই বা কিসের! আর নলিনই বা এতবড়ো গুরু হয়ে উঠল কবে? ও এসবের কী জানে? ও তো সেদিন পর্যন্ত যা-খুশি-তাই করে বেড়িয়েছে, শাস্ত্রের কথা শুনলে একেবারে মর্মাহত হত। আমাকেই খুশি করার জন্য এইসব শুরু করল, শেষকালে দেখছি কোন্ দিন পুরো সন্ন্যাসী হয়ে বের হবে। আমি ওকে বার বার করে বলি, ‘ছেলেবেলা থেকে তোর যা বিশ্বাস ছিল তুই তাই নিয়েই থাক; সে তো মন্দ কিছু নয়, আমি তাতে সন্তুষ্ট বৈ অসন্তুষ্ট হব না।’ শুনে নলিন হাসে; ঐ ওর একটি স্বভাব, সব কথাই চুপ করে শুনে যায়, গাল দিলেও উত্তর করে না।”
বিকেলে পাঁচটার পর হেমনলিনীর চুল বাঁধতে দিতে দিয়ে এইসব আলোচনা চলত। হেমের খোঁপা-বাঁধা ক্ষেমংকরীর পছন্দ হত না। তিনি বলতেন, “তুমি বুঝি মনে কর মা, আমি নিতান্তই সেকেলে, এখনকার কালের ফ্যাশান কিছুই জানি না। কিন্তু আমি যত রকম চুল-বাঁধা জানি এত তোমরাও জান না বাছা। একটি বেশ ভালো মেম পেয়েছিলাম, সে আমাকে সেলাই শিখাতে আসত, সেইসঙ্গে কতরকম চুল-বাঁধাও শিখেছিলাম। সে চলে গেলে আবার আমাকে স্নান করে কাপড় ছাড়তে হত। কী করব মা, সংস্কার, এর ভালোমন্দ জানি না—না করে থাকতে পারি না। তোমাদের নিয়েও যে এতটা ছুঁইছুঁই করি, কিছু মনে করো না মা। ওটা মনের ঘৃণা নয়, ও কেবল একটা অভ্যাস। নলিনদের বাড়িতে যখন অন্যরকম মত হল, হিন্দুয়ানি ঘুচে গেল, তখন তো আমি অনেক সহ্য করেছি, কোনো কথাই বলি নি; আমি কেবল এই কথাই বলেছি যে, যা ভালো বোঝ করো—আমি মুর্খ মেয়েমানুষ, এতকাল যা করে এসেছি তা ছাড়তে পারব না।”
বলতে বলতে ক্ষেমংকরী চোখের এক ফোঁটা জল তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়ে মুছে ফেললেন।
এমনি করে, হেমনলিনীর খোঁপা খুলে ফেলে তার সুদীর্ঘ কেশগুচ্ছ নিয়ে প্রতিদিন নতুন-নতুন রকম বিনুনি করতে ক্ষেমংকরীর ভারি ভালো লাগত। এমনও হয়েছে, তিনি তাঁর সেই আবলুস কাঠের সিন্দুক থেকে নিজের পছন্দসই রঙের কাপড় বের করে তাকে পরিয়ে দিয়েছেন। মনের মতো করে সাজাতে তাঁর বড় আনন্দ। প্রায়ই প্রতিদিন হেমনলিনী তার সেলাই এনে ক্ষেমংকরীর কাছে দেখিয়ে নিয়ে যেত; ক্ষেমংকরী তাকে নতুন-নতুন রকমের সেলাই সম্বন্ধে শিক্ষা দিতে শুরু করলেন। এসবই তাঁর সন্ধ্যার সময়কার কাজ ছিল। বাংলা মাসিকপত্র এবং গল্পের বই পড়তেও উৎসাহ কম ছিল না। হেমনলিনীর কাছে যা-কিছু বই এবং কাগজ ছিল, সবই সে ক্ষেমংকরীর কাছে এনে দিয়েছিল। কোনো কোনো প্রবন্ধ ও বই সম্বন্ধে ক্ষেমংকরীর আলোচনা শুনে হেম আশ্চর্য হয়ে যেত; ইংরেজি না শিখে যে এমন বুদ্ধিবিচারের সঙ্গে চিন্তা করা যায় হেমের তা ধারণাই ছিল না। নলিনাক্ষের মায়ের কথাবার্তা এবং সংস্কার-আচরণ সব নিয়ে হেমনলিনীর তাঁকে বড়ই আশ্চর্য স্ত্রীলোক বলে বোধ হল। সে যা মনে করে এসেছিল তার কিছুই নয়, সবই অপ্রত্যাশিত।