ক্ষেমংকরী আবার জ্বরে পড়লেন। এবারের জ্বর অল্পের ওপর দিয়ে কেটে গেল। সকালবেলায় নলিনাক্ষ প্রণাম করে তাঁর পায়ের ধুলো নেবার সময় বলল, “মা, তোমাকে কিছুকাল রোগীর নিয়মে থাকতে হবে। দুর্বল শরীরের ওপর কঠোরতা সয় না।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “আমি রোগীর নিয়মে থাকব, আর তুমিই যোগীর নিয়মে থাকবে। নলিন, তোমার ওসব আর বেশি দিন চলবে না। আমি আদেশ করছি, তোমাকে এবার বিবাহ করতেই হবে।”
নলিনাক্ষ চুপ করে বসে রইল। ক্ষেমংকরী বললেন, “দেখো বাছা, আমার এ শরীর আর গড়বে না; এখন তোমাকে আমি সংসারী দেখে যেতে পারলে মনের সুখে মরতে পারব। আগে মনে করতাম একটি ছোটো ফুটফুটে বউ আমার ঘরে আসবে, আমি তাকে নিজের হাতে শিখিয়ে-পড়িয়ে মানুষ করে তুলব, তাকে সাজিয়ে গুজিয়ে মনের সুখে থাকব। কিন্তু এবার ব্যামোর সময় ভগবান আমাকে চৈতন্য দিয়েছেন। নিজের আয়ুর ওপর এতটা বিশ্বাস রাখা চলে না, আমি কবে আছি কবে নেই তার ঠিকানা কী। একটি ছোটো মেয়েকে তোমার ঘাড়ের ওপর ফেলে গেলে সে আরো বেশি মুশকিল হবে। তার চেয়ে তোমাদের নিজেদের মতে বড়ো বয়সের মেয়েই বিবাহ করো। জ্বরের সময় এইসব কথা ভাবতে ভাবতে আমার রাতে ঘুম হত না। আমি বেশ বুঝেছি এই আমার শেষ কাজ বাকি আছে, এইটি সম্পন্ন করার অপেক্ষাতেই আমাকে বাঁচতে হবে, নইলে আমি শান্তি পাব না।”
নলিনাক্ষ। আমাদের সঙ্গে মিশ খাবে, এমন পাত্রী পাব কোথায়?
ক্ষেমংকরী বললেন, “আচ্ছা, সে আমি ঠিক করে তোমাকে বলব এখন, সেজন্য তোমাকে ভাবতে হবে না।”
আজ পর্যন্ত ক্ষেমংকরী অন্নদাবাবুর সামনে বের হননি। সন্ধ্যার কিছু আগে প্রতিদিনের নিয়ম অনুসারে বেড়াতে বেড়াতে অন্নদাবাবু যখন নলিনাক্ষের বাসায় এসে উপস্থিত হলেন তখন ক্ষেমংকরী অন্নদাবাবুকে ডেকে পাঠালেন। তাঁকে বললেন, “আপনার মেয়েটি বড়ো লক্ষ্মী, তার ওপর আমার বড়োই স্নেহ পড়েছে। আমার নলিনকে তো আপনি জানেন, সে ছেলের কোনো দোষ কেউ দিতে পারবে না—ডাক্তারিতেও তার বেশ নাম আছে। আপনার মেয়ের জন্য এমনতরো সম্বন্ধ কি শিগগির খুঁজে পাবেন?”
অন্নদাবাবু ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “বলেন কী। এমনতরো কথা আশা করতেও আমার সাহস হয় না। নলিনাক্ষের সঙ্গে আমার মেয়ের যদি বিবাহ হয়, তবে তার চেয়ে সৌভাগ্য আমার কী হতে পারে। কিন্তু তিনি কি—”
ক্ষেমংকরী বললেন, “নলিন আপত্তি করবে না। সে এখনকার ছেলেদের মতো নয়, সে আমার কথা মানে। আর, এর মধ্যে পীড়াপীড়ির কথাই বা কী আছে। আপনার মেয়েটিকে পছন্দ না করবে কে? কিন্তু এই কাজটি আমি খুব শিগগিরই সারতে চাই। আমার শরীরের গতিক ভালো বুঝতে পারছি না।”
সে রাতে অন্নদাবাবু উৎফুল্ল হয়ে বাড়িতে গেলেন। সেই রাতেই তিনি হেমনলিনীকে ডেকে বললেন, “মা, আমার বয়স যথেষ্ট হয়েছে, আমার শরীরও এখন ভালো চলছে না। তোমার একটা স্থিতি না করে যেতে পারলে আমার মনে সুখ নেই। হেম, আমার কাছে লজ্জা করলে চলবে না; তোমার মা নেই, এখন তোমার সব ভার আমার ওপর।”
হেমনলিনী উদ্বিগ্ন হয়ে তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্নদাবাবু বললেন, “মা, তোমার জন্য এমন একটি সম্বন্ধ এসেছে যে, মনের আনন্দ আমি আর রাখতে পারছি না। আমার কেবলই ভয় হচ্ছে, পাছে কোনো বিঘ্ন ঘটে। আজ নলিনাক্ষের মা নিজে আমাকে ডেকে তাঁর পুত্রের সঙ্গে তোমার বিবাহের প্রস্তাব করেছেন।”
হেমনলিনী মুখ লাল করে খুব সংকুচিত হয়ে বলল, “বাবা, তুমি কী বল! না না, এ কখনোই হতে পারে না।”
নলিনাক্ষকে যে কখনো বিবাহ করা যেতে পারে, এ সম্ভাবনার সন্দেহমাত্র হেমনলিনীর মাথায় আসেনি। হঠাৎ বাবার মুখে এই প্রস্তাব শুনে তাকে লজ্জায়-সংকোচে অস্থির করে তুলল।
অন্নদাবাবু প্রশ্ন করলেন, “কেন হতে পারে না?”
হেমনলিনী বলল, “নলিনাক্ষবাবু! এও কি কখনো হয়!” এমন উত্তরকে ঠিক যুক্তি বলা চলে না, কিন্তু যুক্তির চেয়ে এ অনেক গুণে প্রবল।
হেম আর থাকতে পারল না, সে বারান্দায় চলে গেল।
অন্নদাবাবু খুব বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। তিনি এমন বাধার কথা কল্পনাও করেননি। বরং তাঁর ধারণা ছিল, নলিনাক্ষের সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাবে হেম মনে মনে খুশিই হবে। হতবুদ্ধি বৃদ্ধ বিষণ্ণমুখে কেরোসিনের আলোর দিকে চেয়ে স্ত্রীপ্রকৃতির অচিন্তনীয় রহস্য ও হেমনলিনীর মায়ের অভাব মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন।
হেম অনেকক্ষণ বারান্দার অন্ধকারে বসে রইল। তারপর ঘরের দিকে তাকিয়ে তার বাবার নিতান্ত হতাশ মুখের ভাব চোখে পড়তেই তার মনে বাজল। তাড়াতাড়ি তার বাবার চৌকির পেছনে দাঁড়িয়ে তাঁর মাথায় আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে বলল, “বাবা চলো, অনেকক্ষণ খাবার দিয়েছে, খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেল।”
অন্নদাবাবু যন্ত্রচালিতের মতো উঠে খাবারের জায়গায় গেলেন, কিন্তু ভালো করে খেতেই পারলেন না। হেমনলিনী সম্বন্ধে সব দুর্যোগ কেটে গেছে মনে করে তিনি খুবই আশান্বিত হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু হেমনলিনীর দিক থেকেই যে এতবড়ো ব্যাঘাত এল এতে তিনি খুব দমে গেছেন। আবার তিনি ব্যাকুল দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে মনে ভাবলেন, হেম তবে এখনো রমেশকে ভুলতে পারে নি।
অন্য দিন আহারের পরেই অন্নদাবাবু শুতে যেতেন, আজ বারান্দায় ক্যানভাসের কেদারার ওপর বসে বাড়ির বাগানের সামনের ক্যান্টনমেন্টের নির্জন রাস্তার দিকে চেয়ে ভাবতে লাগলেন। হেমনলিনী এসে মিষ্টি স্বরে বলল, “বাবা, এখানে বড়ো ঠাণ্ডা, শুতে চলো।”
অন্নদা বললেন, “তুমি শুতে যাও, আমি একটু পরেই যাচ্ছি।”
হেমনলিনী চুপ করে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রইল। আবার খানিক বাদে বলল, “বাবা, তোমার ঠাণ্ডা লাগছে, না হয় বসবার ঘরেই চলো।”
তখন অন্নদাবাবু চৌকি ছেড়ে উঠে, কিছু না বলে শুতে গেলেন।
পাছে তার কর্তব্যের ক্ষতি হয় বলে হেমনলিনী রমেশের কথা মনে মনে আন্দোলন করে নিজেকে পীড়িত হতে দেয় না। এজন্য এ পর্যন্ত সে নিজের সঙ্গে অনেক লড়াই করে আসছে। কিন্তু বাইরে থেকে যখন টান পড়ে তখন ক্ষতস্থানের সব বেদনা জেগে ওঠে। হেমনলিনীর ভবিষ্যৎ জীবনটা যে কীভাবে চলবে তা এ পর্যন্ত সে পরিষ্কার কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না, এই কারণেই একটা সুদৃঢ় কোনো অবলম্বন খুঁজে অবশেষে নলিনাক্ষকে গুরু মানে তাঁর উপদেশ অনুসারে চলতে প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু যখনই বিবাহের প্রস্তাবে তাকে তার হৃদয়ের গভীরতম দেশের আশ্রয়সূত্র থেকে টেনে আনতে চায় তখনই সে বুঝতে পারে, সে বন্ধন কত কঠিন! তাকে কেউ ছিন্ন করতে এলে হেমনলিনীর সব মন ব্যাকুল হয়ে সেই বন্ধনকে দ্বিগুণ বলে আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করে।
এ দিকে ক্ষেমংকরী নলিনাক্ষকে ডেকে বললেন, “আমি তোমার পাত্রী ঠিক করেছি।”
নলিনাক্ষ একটু হেসে বলল, “একেবারে ঠিক করে ফেলেছেন?”
ক্ষেমংকরী। তা নয় তো কী? আমি কি চিরকাল বেঁচে থাকব? তা শোনো, আমি হেমনলিনীকেই পছন্দ করেছি—অমন মেয়ে আর পাব না। রঙটা তেমন ফরসা নয় বটে, কিন্তু—
নলিনাক্ষ। দোহাই মা, আমি রঙ ফরসার কথা ভাবছি না। কিন্তু হেমনলিনীর সঙ্গে কেমন করে হবে? সে কি কখনো হয়?
ক্ষেমংকরী। ও আবার কী কথা। না হবার তো কোনো কারণ দেখি না।
নলিনাক্ষের পক্ষে এ জবাব দেওয়া খুব মুশকিল। কিন্তু হেমনলিনী—এতদিন যাকে কাছে নিয়ে অসংকোচে গুরুর মতো উপদেশ দিয়ে আসছে, হঠাৎ তার সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাবে নলিনাক্ষকে যেন লজ্জা আঘাত করল।
নলিনাক্ষকে চুপ করে থাকতে দেখে ক্ষেমংকরী বললেন, “এবারে আমি তোমার কোনো আপত্তি শুনব না। আমার জন্য তুমি যে এই বয়সে সব ছেড়ে দিয়ে কাশীবাসী হয়ে তপস্যা করতে থাকবে, সে আমি আর কিছুতেই সহ্য করব না। এইবারে যেদিন শুভদিন আসবে সেদিন ফাঁক যাবে না, এ আমি বলে রাখছি।”
নলিনাক্ষ কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বলল, “তবে একটা কথা তোমাকে বলি মা। কিন্তু আগে থেকেই বলে রাখছি, তুমি অস্থির হয়ে পড়ো না। যে ঘটনার কথা বলছি সে আজ নয়-দশ মাস হয়ে গেল, এখন তা নিয়ে উতলা হবার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু তোমার যেরকম স্বভাব মা, একটা অমঙ্গল কেটে গেলেও তার ভয় তোমাকে কিছুতেই ছাড়তে চায় না। এইজন্যই কতদিন তোমাকে বলব-বলব করেও বলতে পারি নি। আমার গ্রহশান্তির জন্য যত খুশি স্বস্ত্যয়ন করাতে চাও করাও, কিন্তু অনাবশ্যক মনকে পীড়িত করো না।”
ক্ষেমংকরী উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “কী জানি বাছা, কী বলবে, কিন্তু তোমার ভূমিকা শুনে আমার মন আরো অস্থির হয়। যতদিন পৃথিবীতে আছি নিজেকে অত করে ঢেকে রাখা চলে না। আমি তো দূরে থাকতে চাই, কিন্তু মন্দকে তো খুঁজে বের করতে হয় না; সে আপনিই ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে। তা, ভালো হোক মন্দ হোক, বলো তোমার কথাটা শুনি।”
নলিনাক্ষ বলল, “এই মাঘ মাসে আমি রংপুরে আমার সব জিনিসপত্র বিক্রি করে, আমার বাগানবাড়িটা ভাড়ার বন্দোবস্ত করে ফিরে আসছিলাম। সাঁড়ায় এসে আমার কী বাতিক গেল, মনে করলাম, রেলে না চড়ে নৌকা করে কলকাতা পর্যন্ত আসব। সাঁড়ায় একখানা বড়ো দেশি নৌকা ভাড়া করে যাত্রা করলাম। দু দিনের পথ এসে একটা চরের কাছে নৌকা বেঁধে স্নান করছি, এমন সময় হঠাৎ দেখি, আমাদের ভূপেন এক বন্দুক হাতে করে উপস্থিত। আমাকে দেখেই তো সে লাফিয়ে উঠল, বলল, ‘শিকার খুঁজতে এসে খুব বড়ো শিকারটাই মিলেছে।’ সে ঐ দিকেই কোথায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটি করছিল তাঁবুতে মফস্বল-ভ্রমণে বেরিয়েছে। অনেকদিন পরে দেখা, আমাকে তো কোনো মতেই ছাড়বে না, সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়ে বেড়াতে লাগল। ধোবাপুকুর বলে একটা জায়গায় একদিন তার তাঁবু পড়ল। বিকালে আমরা গ্রামে বেড়াতে বেরিয়েছি—নিতান্তই গণ্ডগ্রাম, একটি বড় খেতের ধারে একটা প্রাচীর-দেওয়া চালাঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ঘরের কর্তা উঠানে আমাদের বসবার জন্য দুটি মোড়া এনে দিলেন। তখন দাওয়ার ওপর স্কুল চলছে। প্রাইমারি স্কুলের পণ্ডিত একটা কাঠের চৌকিতে বসে ঘরের একটা খুঁটির গায়ে দুই পা তুলে দিয়েছে। নীচে মাটিতে বসে স্লেট-হাতে ছেলেরা মহা কোলাহল করতে করতে বিদ্যালাভ করছে। বাড়ির কর্তাটির নাম তারিণী চাটুজ্জে। ভূপেনের কাছে তিনি তন্ন তন্ন করে আমার পরিচয় নিলেন। তাঁবুতে ফিরে আসতে আসতে ভূপেন বলল, ‘ওহে, তোমার কপাল ভালো, তোমার একটা বিবাহের সম্বন্ধ আসছে।’ আমি বললাম, ‘সে কী রকম?’ ভূপেন বলল, ‘ঐ তারিণী চাটুজ্জে লোকটি মহাজনী করে, এতবড়ো কৃপণ জগতে নেই। ঐ-যে স্কুলটি বাড়িতে স্থান দিয়েছে, সেজন্য নতুন ম্যাজিস্ট্রেট আসলেই নিজের লোকহিতৈষিতা নিয়ে বিশেষ আড়ম্বর করে। কিন্তু স্কুলের পণ্ডিতটাকে কেবলমাত্র বাড়িতে খেতে দিয়ে রাত দশটা পর্যন্ত সুদের হিসাব কষায়, মাইনেটা সরকারি সাহায্য এবং স্কুলের বেতন থেকে উঠে যায়। ওর একটি বোনের স্বামীবিয়োগ হলে পর সে বেচারা কোথাও আশ্রয় না পেয়ে ওরই কাছে আসে। সে তখন গর্ভবতী ছিল। এখানে এসে একটি কন্যা প্রসব করে নিতান্ত অচিকিৎসাতেই সে মারা যায়। আর একটি বিধবা বোন ঘরকন্নার সব কাজ করে ঝি রাখার খরচ বাঁচাত, সে এই মেয়েটিকে মায়ের মতো মানুষ করে। মেয়েটি কিছু বড়ো হলেই তারও মৃত্যু হল। সেই থেকে মামা ও মামীর দাসত্ব করে অনবরত ভর্ৎসনা সহ্য করে মেয়েটি বাড়ছে। বিবাহের বয়স যথেষ্ট হয়েছে, কিন্তু এমন অনাথার পাত্র জুটবে কোথায়? বিশেষত ওর মা-বাপকে এখানকার কেউ জানত না, পিতৃহীন অবস্থায় ওর জন্ম এ নিয়ে পাড়ার ঘোঁট-কর্তারা যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করে থাকেন। তারিণী চাটুজ্জের অগাধ টাকা আছে সবাই জানে, লোকের ইচ্ছা—এই মেয়ের বিবাহ উপলক্ষে কন্যা সম্বন্ধে খোঁটা দিয়ে ওকে বেশ একটু দোহন করে নেয়। ও তো আজ চার বছর ধরে মেয়েটির বয়স দশ বলে পরিচয় দিয়ে আসছে। অতএব, হিসাবমতে তার বয়স এখন অন্তত চোদ্দ হবে। কিন্তু যাই বল, মেয়েটি নামেও কমলা, সব বিষয়েই একেবারে লক্ষ্মীর প্রতিমা। এমন সুন্দর মেয়ে আমি তো দেখি নি। এ গ্রামে বিদেশের কোনো ব্রাহ্মণ যুবক উপস্থিত হলেই তারিণী তাকে বিবাহের জন্য হাতে-পায়ে ধরে। যদি বা কেউ রাজি হয়, গ্রামের লোক ভাঁড়াতি দিয়ে তাড়ায়। অতএব এবারে নিশ্চয় তোমার পালা।’ জান তো মা, আমার মনের অবস্থাটা তখন একরকম মরিয়া গোছের ছিল; আমি কিছু চিন্তা না করেই বললাম, ‘এ মেয়েটিকে আমিই বিবাহ করব।’ এর আগে আমি স্থির করেছিলাম, একটি হিন্দুঘরের মেয়ে বিবাহ করে এনে আমি তোমাকে চমৎকৃত করে দেব; আমি জানতাম, বড়ো বয়সের ব্রাহ্মমেয়ে আমাদের এ ঘরে আনলে তাতে সব পক্ষই অসুখী হবে। ভূপেন তো একেবারে আশ্চর্য হয়ে গেল। সে বলল, ‘কী বল!’ আমি বললাম, ‘বলাবলি নয়, আমি একেবারেই মন স্থির করেছি।’ ভূপেন বলল, ‘পাকা?’ আমি বললাম, ‘পাকা’। সেই সন্ধ্যাবেলাতেই স্বয়ং তারিণী চাটুজ্জে আমাদের তাঁবুতে এসে উপস্থিত। ব্রাহ্মণ হাতে পৈতে জড়িয়ে জোড়হাত করে বললেন, ‘আমাকে উদ্ধার করতেই হবে। মেয়েটি নিজ চোখে দেখুন, যদি পছন্দ না হয় তো অন্য কথা—কিন্তু শত্রুপক্ষের কথা শুনবেন না।’ আমি বললাম, ‘দেখার দরকার নেই, দিন স্থির করুন।’ তারিণী বললেন, ‘পরশু দিন ভালো আছে, পরশুই হয়ে যাক।’ তাড়াতাড়ির দোহাই দিয়ে বিবাহে যথাসাধ্য খরচ বাঁচানোর ইচ্ছা তাঁর ছিল। বিবাহ তো হয়ে গেল।”
ক্ষেমংকরী চমকে উঠে বললেন, “বিবাহ হয়ে গেল—বল কী নলিন!”
নলিনাক্ষ। হ্যাঁ, হয়ে গেল। বধূ নিয়ে নৌকাতেই উঠলাম। যেদিন বিকালে উঠলাম, সেইদিনই ঘণ্টা-দুয়েক পরে সূর্যাস্তের এক দণ্ড পরে হঠাৎ সেই অকালে ফাল্গুন মাসে কোথা থেকে খুব গরম একটা ঘূর্ণিবাতাস এসে এক মুহূর্তে আমাদের নৌকা উল্টিয়ে কী করে দিল, কিছু যেন বোঝা গেল না।
ক্ষেমংকরী বললেন, “মধুসূদন!” তাঁর সব শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
নলিনাক্ষ। ক্ষণকাল পরে যখন বুদ্ধি ফিরে আসল তখন দেখলাম, আমি নদীতে এক জায়গায় সাঁতার দিচ্ছি, কিন্তু কাছে কোনো নৌকা বা আরোহীর কোনো চিহ্ন নেই। পুলিশে খবর দিয়ে খোঁজ অনেক করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো ফল হল না।
ক্ষেমংকরী ফ্যাকাশে মুখ করে বললেন, “যাক, যা হয়ে গেছে তা গেছে, ও কথা আমার কাছে আর কখনো বলিস না—মনে করতেই আমার বুক কেঁপে উঠছে।”
নলিনাক্ষ। এ কথা আমি কোনোদিনই তোমার কাছে বলতাম না, কিন্তু বিবাহের কথা নিয়ে তুমি নিতান্তই জেদ করছ বলে বলতে হল।
ক্ষেমংকরী বললেন, “একবার একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল বলে তুই এই জীবনে কখনো বিবাহই করবি না?”
নলিনাক্ষ বলল, “সেজন্য নয় মা, যদি সে মেয়ে বেঁচে থাকে?”
ক্ষেমংকরী। পাগল হয়েছিস? বেঁচে থাকলে তোকে খবর দিত না?
নলিনাক্ষ। আমার খবর সে কী জানে? আমার চেয়ে অপরিচিত তার কাছে কে আছে? বোধ হয় সে আমার মুখও দেখে নি। কাশীতে এসে তারিণী চাটুজ্জেকে আমার ঠিকানা জানিয়েছি; তিনিও কমলার কোনো খোঁজ পান নি বলে আমাকে চিঠি লিখেছেন।
ক্ষেমংকরী। তবে আবার কী।
নলিনাক্ষ। আমি মনে মনে ঠিক করেছি, পুরো একটি বছর অপেক্ষা করে তবে তার মৃত্যু স্থির করব।
ক্ষেমংকরী। তোমার সব বিষয়েই বাড়াবাড়ি। আবার এক বছর অপেক্ষা করা কিসের জন্য?
নলিনাক্ষ। মা, এক বছরের আর দেরিই বা কিসের। এখন অগ্রহায়ণ; পৌষে বিবাহ হতে পারবে না; তারপর মাঘটা কাটিয়ে ফাল্গুন।
ক্ষেমংকরী। আচ্ছা, বেশ। কিন্তু পাত্রী ঠিক রইল। হেমনলিনীর বাবাকে আমি কথা দিয়েছি।
নলিনাক্ষ বলল, “মা, মানুষ তো কেবল কথাটুকুমাত্রই দিতে পারে, সে কথার সফলতা দেওয়া যাঁর হাতে তাঁরই প্রতি নির্ভর করে থাকব।”
ক্ষেমংকরী। যাই হোক বাছা, তোমার এই ব্যাপারটা শুনে এখনো আমার গা কাঁপছে।
নলিনাক্ষ। সে তো আমি জানি মা, তোমার এই মন সুস্থির হতে অনেক দিন লাগবে। তোমার মনটা একবার একটু নাড়া পেলেই তার আন্দোলন কিছুতেই আর থামতে চায় না। সেইজন্যই তো মা, তোমাকে এরকম সব খবর দিতেই চাই না।
ক্ষেমংকরী। ভালোই কর বাছা—আজকাল আমার কী হয়েছে জানি না, একটা মন্দ-কিছু শুনলেই তার ভয় কিছুতেই ঘোঁচে না। আমার একটা ডাকের চিঠি খুলতে ভয় করে, পাছে তাতে কোনো কুসংবাদ থাকে। আমিও তো তোমাদের বলে রেখেছি, আমাকে কোনো খবর দেবার কোনো দরকার নেই; আমি তো মনে করি, এ সংসারে আমি মরেই গেছি, এখানকার আঘাত আমার ওপর আর কেন।
কমলা যখন গঙ্গাতীরে পৌঁছল, শীতের সূর্য তখন রশ্মিচ্ছটাহীন ম্লান পশ্চিমাকাশের প্রান্তে নামছেন। কমলা আসন্ন অন্ধকারের সম্মুখীন সেই অস্তগামী সূর্যকে প্রণাম করল। তারপর মাথায় গঙ্গাজলের ছিটে দিয়ে নদীর মধ্যে কিছু দূর নেমে গেল এবং জোড়হাতে গঙ্গায় জলগণ্ডুষ অঞ্জলি দান করে ফুল ভাসিয়ে দিল। তারপর সমস্ত গুরুজনদের উদ্দেশে প্রণাম করল। প্রণাম করে মাথা তুলতেই আর একজন প্রণম্য ব্যক্তির কথা সে মনে করল। কোনোদিন মুখ তুলে তাঁর মুখের দিকে সে চায়নি; যখন একদিন রাতে সে তাঁর পাশে বসেছিল তখন তাঁর পায়ের দিকেও তার চোখ পড়েনি, বাসরঘরে অন্য মেয়েদের সঙ্গে তিনি যে দু-চারটা কথা বলেছিলেন তাও সে যেন ঘোমটার মধ্য দিয়ে, লজ্জার মধ্য দিয়ে, তেমন স্পষ্ট করে শুনতে পায়নি। তাঁর সেই কণ্ঠস্বর স্মরণে আনবার জন্য আজ এই জলের ধারে দাঁড়িয়ে সে একান্তমনে চেষ্টা করল, কিন্তু কোনোমতেই মনে এল না।
বেশি রাতে তার বিয়ের লগ্ন ছিল; নিতান্ত শ্রান্ত শরীরে সে যে কখন কোথায় ঘুমিয়ে পড়েছিল তাও মনে নেই; সকালে জেগে দেখল, তাদের প্রতিবেশীর বাড়ির একটি বউ তাকে ঠেলে জাগিয়ে খিলখিল করে হাসছে—বিছানায় আর কেউই নেই। জীবনের এই শেষ মুহূর্তে জীবনেশ্বরকে স্মরণ করবার সম্বল তার কিছুমাত্র নেই। সে দিকে একেবারে অন্ধকার—কোনো মূর্তি নেই, কোনো বাক্য নেই, কোনো চিহ্ন নেই। যে লাল চেলির সঙ্গে তাঁর চাদরের গ্রন্থি বাঁধা হয়েছিল তারিণীচরণের দেওয়া সেই নিতান্ত কম দামের চেলির মূল্য তো কমলা জানত না; সে চেলিখানিও সে যত্ন করে রাখে নি।
রমেশ হেমনলিনীকে যে চিঠি লিখেছিল সেখানি কমলার আঁচলের প্রান্তে বাঁধা ছিল; সেই চিঠি খুলে বালুতটে বসে তার একটি অংশ গোধূলির আলোকে পড়তে লাগল। সেই অংশে তার স্বামীর পরিচয় ছিল—বেশি কথা নয়, কেবল তাঁর নাম নলিনাক্ষ চট্টোপাধ্যায়, আর তিনি যে রংপুরে ডাক্তারি করতেন ও এখন সেখানে তাঁর খোঁজ পাওয়া যায় না, এইটুকুমাত্র। চিঠির বাকি অংশ সে অনেক খোঁজ করেও পায়নি। “নলিনাক্ষ” এই নামটি তার মনের মধ্যে সুধাবর্ষণ করতে লাগল; এই নামটি তার সমস্ত বুকের ভিতরটা যেন ভরে তুলল; এই নামটি যেন এক বস্তুহীন দেহ নিয়ে তাকে আচ্ছন্ন করে ধরল; তার চোখ দিয়ে অবিশ্রাম ধারায় জল পড়ে তার হৃদয়কে স্নিগ্ধ করে দিল—মনে হল, তার অসহ্য দুঃখদাহ যেন জুড়িয়ে গেল। কমলার অন্তঃকরণ বলতে লাগল, “এ তো শূন্যতা নয়, এ তো অন্ধকার নয়—আমি দেখছি, সে যে আছে, সে আমারই আছে।” তখন কমলা প্রাণপণ বলে বলে উঠল, “আমি যদি সতী হই, তবে এই জীবনেই আমি তাঁর পায়ের ধুলো নেব, বিধাতা আমাকে কখনোই বাধা দিতে পারবেন না। আমি যখন আছি তখন তিনি কখনোই যান নি, তাঁরই সেবা করবার জন্য ভগবান আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।”
এই বলে সে তার রুমালে বাঁধা চাবির গোছা সেখানেই ফেলল এবং হঠাৎ তার মনে পড়ল, রমেশের দেওয়া একটা ব্রোচ তার কাপড়ে বাঁধা আছে। সেটা তাড়াতাড়ি খুলে জলের মধ্যে ফেলে দিল। তারপর পশ্চিমে মুখ করে সে চলতে শুরু করল—কোথায় যাবে, কী করবে, তা তার মনে স্পষ্ট ছিল না; কেবল সে জেনেছিল, তাকে চলতেই হবে, এখানে তার এক মুহূর্ত দাঁড়াবার স্থান নেই।
শীতের দিনান্তের আলোটুকু নিঃশেষ হয়ে যেতে বিলম্ব হল না। অন্ধকারের মধ্যে সাদা বালুতট অস্পষ্টভাবে ধূধূ করতে লাগল, হঠাৎ এক জায়গায় কে যেন বিচিত্র রচনাবলীর মাঝখান থেকে সৃষ্টির খানিকটা চিত্রলেখা একেবারে মুছে ফেলেছে। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার রাত্রি তার সব নির্নিমেষ তারা নিয়ে এই জনশূন্য নদীতীরের ওপর খুব ধীরে নিশ্বাস ফেলতে লাগল।
কমলা সামনে ঘরহীন অনন্ত অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না, কিন্তু সে জানল, তাকে চলতেই হবে—কোথাও পৌঁছবে কি না তা ভাবার সামর্থ্যও তার নেই।
সোজা নদীর ধার দিয়ে সে চলবে, এই সে স্থির করেছে; তাহলে কাউকে পথ জিজ্ঞেস করতে হবে না এবং যদি বিপদ তাকে আক্রমণ করে, তবে মুহূর্তের মধ্যেই মা গঙ্গা তাকে আশ্রয় দেবেন।
আকাশে কুয়াশার লেশমাত্র ছিল না। নির্মল অন্ধকার কমলাকে আবৃত করে রাখল, কিন্তু তার দৃষ্টিকে বাধা দিল না।
রাত্রি বাড়তে লাগল। যবের খেতের প্রান্ত থেকে শিয়াল ডাকল। কমলা বহুদূর চলতে চলতে বালুর চর শেষ হয়ে মাটির ডাঙা শুরু হল। নদীর ধারেই একটা গ্রাম দেখা গেল। কমলা কাঁপতে কাঁপতে গ্রামের কাছে এসে দেখল, গ্রামটি গভীর নিদ্রায় মগ্ন। ভয়ে ভয়ে গ্রামটি পার হয়ে চলতে চলতে তার শরীরে আর শক্তি রইল না। অবশেষে এক জায়গায় এমন একটা ভাঙা তটের কাছে এসে পৌঁছল যেখানে সামনে আর কোনো পথ পেল না। নিতান্ত অশক্ত হয়ে একটা বটগাছের তলায় শুয়ে পড়ল, শুয়েবামাত্রই কখন ঘুম এল জানতেও পারল না।
ভোরে চোখ মেলে দেখল, কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের আলোয় অন্ধকার ক্ষীণ হয়ে এসেছে এবং একটি প্রৌঢ়া স্ত্রীলোক তাকে জিজ্ঞেস করছে, “তুমি কে গা? শীতের রাত্রে এই গাছের তলায় কে শুয়ে?”
কমলা চমকে উঠে বসল। দেখল, তার অদূরে ঘাটে দুখানা বজরা বাঁধা আছে—এই প্রৌঢ়াটি লোক উঠবার আগেই স্নান সেরে নেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছেন।
প্রৌঢ়া বললেন, “হাঁ গা, তোমাকে যে বাঙালির মতো দেখছি।”
কমলা বলল, “আমি বাঙালি।”
প্রৌঢ়া। এখানে পড়ে আছ যে?
কমলা। আমি কাশীতে যাব বলে বেরিয়েছি। রাত অনেক হল, ঘুম এল, এইখানেই শুয়ে পড়লাম।
প্রৌঢ়া। ওমা, সে কী কথা! হেঁটে কাশী যাচ্ছ? আচ্ছা চলো, ঐ বজরায় চলো, আমি স্নান সেরে আসছি।
স্নানের পর এই স্ত্রীলোকটির সঙ্গে কমলার পরিচয় হল।
গাজিপুরে যে সিদ্ধেশ্বরবাবুদের বাড়িতে খুব ঘটা করে বিয়ে হচ্ছিল, তাঁরা ইঁহাদের আত্মীয়। এই প্রৌঢ়াটির নাম নবীনকালী। এবং ইঁহার স্বামীর নাম মুকুন্দলাল দত্ত—কিছুকাল কাশীতেই বাস করছেন। ইঁহারা আত্মীয়ের বাড়ি নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে পারেননি, অথচ পাছে তাঁদের বাড়িতে থাকতে বা খেতে হয় এইজন্য বোটে করে গিয়েছিলেন। বিয়েবাড়ির গৃহিণী ক্ষোভ প্রকাশ করাতে নবীনকালী বলেছিলেন, “জানই তো ভাই, কর্তার শরীর ভালো নয়। আর ছেলেবেলা থেকে উঁহাদের অভ্যাসই একরকম। বাড়িতে গরু রেখে দুধ থেকে মাখন তুলে সেই মাখন-মারা ঘিয়ে উঁহার লুচি তৈরি হয়—আবার সে গরুকে যা-তা খাওয়ালে চলবে না” ইত্যাদি ইত্যাদি।
নবীনকালী জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?”
কমলা বলল, “আমার নাম কমলা।”
নবীনকালী। তোমার হাতে লোহা দেখছি, স্বামী আছে বুঝি?
কমলা বলল, “বিয়ের পরদিন থেকেই স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন।”
নবীনকালী। ওমা, সে কী কথা! তোমার বয়স তো খুব বেশি বোধ হয় না।
তাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে বললেন, “পনেরোর বেশি হবে না।”
কমলা বলল, “বয়স ঠিক জানি না, বোধ করি, পনেরোই হবে।”
নবীনকালী। তুমি ব্রাহ্মণের মেয়ে বটে?
কমলা বলল, “হ্যাঁ।”
নবীনকালী বললেন, “তোমাদের বাড়ি কোথায়?”
কমলা। কখনো শ্বশুরবাড়ি যাইনি, আমার বাপের বাড়ি বিশুখালি।
কমলার পৈতৃক ভিটা বিশুখালিতেই ছিল, তা সে জানত।
নবীনকালী। তোমার বাপ-মা—
কমলা। আমার বাপ-মা কেউই নেই।
নবীনকালী। হরি বলো! তবে তুমি কী করবে?
কমলা। কাশীতে যদি কোনো ভদ্র গৃহস্থ আমাকে বাড়িতে রেখে দু-বেলা দুটি খেতে দেন, তবে আমি কাজ করব। আমি রাঁধতে পারি।
নবীনকালী বিনা-বেতনে পাচিকা ব্রাহ্মণী লাভ করে মনে মনে ভারি খুশি হলেন। বললেন, “আমাদের তো দরকার নেই—বামুন-চাকর সবই আমাদের সঙ্গে আছে। আমাদের আবার যে-সে বামুন হওয়ার জো নেই—কর্তার খাবারের একটু এদিক-ওদিক হলে আর কি রক্ষা আছে। বামুনকে মাইনে দিতে হয় চৌদ্দ টাকা, তার ওপর ভাত-কাপড় আছে। তা হোক, ব্রাহ্মণের মেয়ে, তুমি বিপদে পড়েছ—তা, চলো, আমাদের ওখানেই চলো। কত লোক খাচ্ছে-দাচ্ছে, কত ফেলা-ছড়া যায়, আর-এক জন বাড়লে কেউ জানতেও পারবে না। আমাদের কাজও তেমন বেশি নয়। এখানে কেবল কর্তা আর আমি আছি। মেয়েগুলোর সব বিয়ে দিয়েছি; তা, তারা বেশ বড়ো ঘরেই পড়েছে। আমার একটিমাত্র ছেলে, সে হাকিম, এখন সেরাজগঞ্জে আছে, লাট-সাহেবের ওখান থেকে দু-মাস অন্তর তার নামে চিঠি আসে। আমি কর্তাকে বলি, আমাদের নোটোর তো অভাব কিছুই নেই, কেন তার এই বাঁধন। এতবড়ো হাকিমি সবার ভাগ্যে জোটে না, তা জানি, কিন্তু বাছাকে তবু তো সেই বিদেশে পড়ে থাকতে হয়। কেন? দরকার কী? কর্তা বলেন, ‘ওগো সেজন্য নয়, সেজন্য নয়। তুমি মেয়েমানুষ, বোঝ না। আমি কি রোজগারের জন্য নোটোকে চাকরিতে দিয়েছি? আমার অভাব কিসের? তবে কিনা, হাতে একটা কাজ থাকা চাই, নইলে অল্প বয়স, কি জানি কখন কী মতি হয়।'”
পালে বাতাসের জোর ছিল, কাশী পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না। শহরের ঠিক বাইরেই অল্প একটু বাগানওয়ালা একটি দোতলা বাড়িতে সবাই গিয়ে উঠলেন।
সেখানে চৌদ্দ টাকা বেতনের বামুনের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না—একটা উড়ে বামুন ছিল, অল্প সময় পরেই নবীনকালী তার ওপর একদিন হঠাৎ খুব রাগ হয়ে উঠে বিনা বেতনে তাকে বিদায় করে দিলেন। ইতিমধ্যে চৌদ্দ টাকা বেতনের অতি দুর্লভ দ্বিতীয় একজন পাচক জুটবার সুযোগে কমলাকেই সব রাঁধা-বাড়ার ভার নিতে হল।
নবীনকালী কমলাকে বারবার সতর্ক করে বললেন, “দেখো বাছা, কাশী শহর ভালো জায়গা নয়। তোমার অল্প বয়স। বাড়ির বাইরে কখনো বেরিয়ো না। গঙ্গাস্নান-বিশ্বেশ্বরদর্শনে আমি যখন যাব তোমাকে সঙ্গে করে নেব।”
কমলা পাছে হঠাৎ হাতছাড়া হয়ে যায় নবীনকালী এজন্য তাকে খুব সাবধানে রাখলেন। বাঙালি মেয়েদের সঙ্গেও তাকে বড় একটা আলাপের সুযোগ দিতেন না। দিনের বেলা তো কাজের অভাব ছিল না—সন্ধ্যার পর একবার কিছুক্ষণ নবীনকালী তাঁর যে ঐশ্বর্য, যে গহনাপত্র, যে সোনারুপোর বাসন, যে মখমল-কিংখাবের ঘরসাজ চোরের ভয়ে কাশীতে আনতে পারেননি, তারই আলোচনা করতেন। “কাঁসার থালায় খাওয়া তো কর্তার কোনো কালে অভ্যাস নেই, তাই প্রথম-প্রথম এ নিয়ে তিনি অনেক বকাবকি করতেন। তিনি বলতেন, না হয় দু-চারখানা চুরি যায় সেও ভালো, আবার গড়াতে কতক্ষণ। কিন্তু টাকা আছে বলেই যে লোকসান করতে হবে সে আমি কোনোমতে সহ্য করতে পারি না। তার চেয়ে বরং কিছুকাল কষ্ট করে থাকাও ভালো। এই দেখো না, দেশে আমাদের বড় বাড়ি, সেখানে লোক-লস্কর যতই থাকুক আসে যায় না, তাই বলেই কি এখানে সাত গণ্ডা চাকর আনা চলে? কর্তা বলেন, কাছাকাছি নাহয় আরো একটা বাড়ি ভাড়া করা যাবে। আমি বললাম, না, সে আমি পারব না—কোথায় এখানে একটু আরাম করব, না কতকগুলো লোকজন-বাড়িঘর নিয়ে দিনরাত্রি ভাবনার অন্ত থাকবে না।” ইত্যাদি।