নবীনকালীর আশ্রয়ে কমলার প্রাণটা যেন অল্পজল এঁদো-পুকুরের মাছের মতো ব্যাকুল হয়ে উঠতে লাগল। এখান থেকে বের হতে পারলে সে বাঁচে, কিন্তু বাইরে গিয়ে দাঁড়াবে কোথায়? সেদিনকার রাতে গৃহহীন বাইরের পৃথিবীকে সে জেনেছে; সেখানে অন্ধভাবে আত্মসমর্পণ করতে আর তার সাহস হয় না।
নবীনকালী যে কমলাকে ভালোবাসতেন না তা নয়, কিন্তু সে ভালোবাসার মধ্যে রস ছিল না। দুই-এক দিন অসুখ-বিসুখের সময় তিনি কমলাকে যত্নও করেছিলেন, কিন্তু সে যত্ন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করা খুব কঠিন। বরং সে কাজকর্মের মধ্যে থাকত ভালো, কিন্তু যে-সময়টা নবীনকালীর সখ্যতা-সুলভ আচরণে তাকে যাপন করতে হত সেইটেই তার পক্ষে সবচেয়ে দুঃসময়।
একদিন সকালবেলা নবীনকালী কমলাকে ডেকে বললেন, “ওগো, ও বামুন-ঠাকরুন, আজ কর্তার শরীর খুব ভালো নেই, আজ ভাত হবে না, আজ রুটি। কিন্তু তাই বলে একরাশ ঘি নিয়ো না। জানি তো তোমার রান্নার রীতি, তাতে এত ঘি কেমন করে খরচ হবে তা তো বুঝতে পারি না। এর চেয়ে সেই যে উড়ে বামুনটা ছিল ভালো, সে ঘি নিত বটে, কিন্তু রান্নায় ঘিয়ের স্বাদ একটু-আধটু পাওয়া যেত।”
কমলা এ-সব কথার কোনো জবাবই করত না; যেন শুনতে পায়নি, এমনিভাবে নিঃশব্দে সে কাজ করে যেত।
আজ অপমানের গোপনভারে আক্রান্তহৃদয় হয়ে কমলা চুপ করে তরকারি কুটছিল, সমস্ত পৃথিবী নীরস এবং জীবনটা দুঃসহ বোধ হচ্ছিল, এমন সময় গৃহিণীর ঘর থেকে একটা কথা তার কানে এসে কমলাকে একেবারে চমকে দিল। নবীনকালী তাঁর চাকরকে ডেকে বলছিলেন, “ওরে তুলসী, যা তো, শহর থেকে নলিনাক্ষ ডাক্তারকে শীঘ্র ডেকে আন। বল, কর্তার শরীর খুব খারাপ।”
নলিনাক্ষ ডাক্তার! কমলার চোখের ওপর সমস্ত আকাশের আলো আহত বীণার স্বর্ণতন্ত্রীর মতো কাঁপতে লাগল। সে তরকারি-কোটা ফেলে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তুলসী নীচে নামে আসতেই কমলা জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছিস তুলসী?” সে বলল, “নলিনাক্ষ ডাক্তারকে ডাকতে যাচ্ছি।”
কমলা বলল, “সে আবার কোন ডাক্তার?”
তুলসী বলল, “তিনি এখানকার একটি বড়ো ডাক্তার বটে।”
কমলা। তিনি থাকেন কোথায়?
তুলসী বলল, “শহরেই থাকেন, এখান থেকে আধ ক্রোশটাক হবে।”
আহারের সামগ্রী অল্পস্বল্প যা-কিছু বাঁচাতে পারত, কমলা তা বাড়ির চাকর-বাকরদের ভাগ করে দিত। এজন্য সে ভর্ৎসনা অনেক সহ্য করেছে, কিন্তু এ অভ্যাস ছাড়তে পারে নি। বিশেষত গৃহিণীর কড়া নিয়ম অনুসারে এ বাড়ির লোকজনদের খাবারের কষ্ট খুব বেশি। তা ছাড়া কর্তা-গৃহিণীর খেতে বেলা হত; ভৃত্যেরা তার পরে খেতে পেত। তারা যখন এসে কমলাকে জানাত “বামুন-ঠাকরুন, খুব ক্ষুধা পেয়েছে” তখন সে তাদের কিছু-কিছু খাইয়ে না দিয়ে কোনোমতেই থাকতে পারত না। এমনি করে বাড়ির চাকর-বাকর দুই দিনেই কমলার একান্ত বশ মানিয়েছে।
উপর থেকে রব এল, “রান্নাঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিসের পরামর্শ চলছে রে তুলসী? আমার বুঝি চোখ নেই মনে করিস? শহরে যাবার পথে এক বার বুঝি রান্নাঘর না মাড়িয়ে গেলে চলে না? এমনি করেই জিনিসপত্রগুলো সরাতে হয় বটে! বলি বামুন-ঠাকরুন, রাস্তায় পড়ে ছিলে, দয়া করে তোমাকে আশ্রয় দিলাম, এমনি করেই তার শোধ তুলতে হয় বুঝি!”
সবাই তাঁর জিনিসপত্র চুরি করছে, এই সন্দেহ নবীনকালীকে কিছুতেই ত্যাগ করে না। যখন প্রমাণের লেশমাত্রও না থাকে তখনো তিনি আন্দাজে ভর্ৎসনা করে নেন। তিনি স্থির করেছেন যে, অন্ধকারে ঢিল মারলেও অধিকাংশ ঢিল ঠিক জায়গায় গিয়ে পড়ে আর তিনি যে সর্বদা সতর্ক আছেন ও তাঁকে ফাঁকি দেওয়ার জো নেই, ভৃত্যেরা এটা বুঝতে পারে।
আজ নবীনকালীর তীব্রবাক্য কমলার মনেও বাজল না। সে আজ কেবল কলের মতো কাজ করছে, তার মনটা যে কোনখানে উধাও হয়ে গেছে তার ঠিকানা নেই।
নীচে রান্নাঘরে দরজার কাছে কমলা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। এমন সময় তুলসী ফিরে এল, কিন্তু সে একা এল। কমলা জিজ্ঞেস করল, “তুলসী, কই ডাক্তারবাবু এলেন না?”
তুলসী বলল, “না, তিনি এলেন না।”
কমলা। কেন?
তুলসী। তাঁর মার অসুখ করেছে।
কমলা। মার অসুখ? ঘরে আর কি কেউ নেই?
তুলসী। না, তিনি তো বিয়ে করেন নি।
কমলা। বিয়ে করেন নি, তুই কেমন করে জানলি?
তুলসী। চাকরদের মুখে তো শুনি, তাঁর স্ত্রী নেই।
কমলা। হয়তো তাঁর স্ত্রী মারা গেছে।
তুলসী। তা হতে পারে। কিন্তু তাঁর চাকর ব্রজ বলে, তিনি যখন রংপুরে ডাক্তারি করতেন, তখনো তাঁর স্ত্রী ছিল না।
উপর থেকে ডাক পড়ল, “তুলসী!” কমলা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল এবং তুলসী উপরে চলে গেল।
নলিনাক্ষ—রংপুরে ডাক্তারি করতেন—কমলার মনে আর তো কোনো সন্দেহ নেই। তুলসী নামে আসলে পুনরায় কমলা তাকে জিজ্ঞেস করল, “দেখ তুলসী, ডাক্তারবাবুর নামে আমার একজন আত্মীয় আছেন—বল দেখি, উনি ব্রাহ্মণ তো বটেন?”
তুলসী। হ্যাঁ, ব্রাহ্মণ, চাটুজ্জে।
গৃহিণীর দৃষ্টিপাতের ভয়ে তুলসী বামুন-ঠাকরুনের সঙ্গে বেশি সময় কথাবার্তা কহতে সাহস করল না, সে চলে গেল।
কমলা নবীনকালীর কাছে গিয়ে বলল, “কাজকর্ম সব সেরে আজ আমি একবার দশাশ্বমেধঘাটে স্নান করে আসব।”
নবীনকালী। তোমার সব আপদ। কর্তার আজ অসুখ, আজ কখন কী দরকার হয়, তা বলা যায় না—আজ তুমি গেলে চলবে কেন?
কমলা বলল, “আমার একজন আপনার লোক কাশীতে আছেন খবর পেয়েছি, তাঁকে একবার দেখতে যাব।”
নবীনকালী। এ-সব ভালো কথা নয়। আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, আমি এ-সব বুঝি। খবর তোমাকে কে এনে দিল? তুলসী বুঝি? ও ছোঁড়াটাকে আর রাখা নয়। শোনো বলি বামুন-ঠাকরুন, আমার কাছে যতদিন আছ ঘাটে একলা স্নান করতে যাওয়া, আত্মীয়ের খোঁজে শহরে বের হওয়া, ও-সব চলবে না তা বলে রাখছি।
দারোয়ানের ওপর হুকুম হয়ে গেল, তুলসীকে এখনই দূর করে দেওয়া হয়, সে যেন এ বাড়িমুখো হতে না পারে।
গৃহিণীর শাসনে অন্য চাকরেরা কমলার সংস্পর্শ যথাসম্ভব পরিত্যাগ করল।
নলিনাক্ষ সম্বন্ধে যতদিন কমলা নিশ্চিত ছিল ততদিন তার ধৈর্য ছিল; এখন তার পক্ষে ধৈর্য রক্ষা করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। এই নগরেই তার স্বামী রয়েছেন অথচ সে এক মুহূর্তও যে অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়ে থাকবে, এটা তার পক্ষে অসহ্য হল। কাজকর্মে তার পদে পদে ভুল হতে লাগল।
নবীনকালী বললেন, “বলি বামুন-ঠাকরুন, তোমার গতিক তো ভালো দেখি না। তোমাকে কি ভূতে পেয়েছে? তুমি নিজে তো খাওয়াদাওয়া বন্ধ করেছ, আমাদিগকেও কি উপোস করিয়ে মারবে? আজকাল তোমার রান্না যে আর মুখে দেওয়ার জো নেই।”
কমলা বলল, “আমি এখানে আর কাজ করতে পারছি না, আমার কোনোমতেই মন টিকছে না। আমাকে বিদায় দিন।”
নবীনকালী ঝাঁকিয়ে বললেন, “বটেই তো! কলিকালে কারো ভালো করতে নেই। তোমাকে দয়া করে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে আমার এতকালের অমন ভালো বামুনটাকে ছাড়িয়ে দিলাম, একবার খবর নিলাম না তুমি সত্যি বামুনের মেয়ে কি না। আজ উনি বলেন কিনা, আমাকে বিদায় দিন। যদি পালাবার চেষ্টা কর তো পুলিসে খবর দেব না! আমার ছেলে হাকিম—তার হুকুমে কত লোক ফাঁসি গেছে, আমার কাছে তোমার চালাকি খাটবে না। শুনেছ তো—গদা কর্তার মুখের ওপর জবাব দিতে গিয়েছিল, সে বেটা এমনি জব্দ হয়েছে, আজও সে জেল খাটছে। আমাদের তুমি এমনি তেমন পাও নি।”
কথাটা মিথ্যা নয়—গদা চাকরকে ঘড়িচুরির অপবাদ দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে বটে।
কমলা কোনো উপায় খুঁজে পেল না। তার চিরজীবনের সার্থকতা যখন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়, তখন সেই হাতে বাঁধন পড়ার মতো এমন নিষ্ঠুর আর কী হতে পারে। কমলা আপনার কাজের মধ্যে, ঘরের মধ্যে কিছুতেই আর বদ্ধ হয়ে থাকতে পারে না। তার রাতের কাজ শেষ হয়ে গেলে পর সে শীতে একখানা রুপার মুড়ি দিয়ে বাগানে বেরিয়ে পড়ত। প্রাচীরের ধারে দাঁড়িয়ে, যে পথ শহরের দিকে চলে গেছে সেই পথের দিকে চেয়ে থাকত। তার যে তরুণ হৃদয়খানি সেবার জন্য ব্যাকুল, ভক্তিনিবেদনের জন্য ব্যগ্র, সেই হৃদয়কে কমলা এই রজনীর নির্জন পথ বেয়ে নগরের মধ্যে কোন এক অপরিচিত ঘরের উদ্দেশে প্রেরণ করত—তার পর অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে তার শয়নকক্ষের মধ্যে ফিরে আসত।
কিন্তু এইটুকু সুখ, এইটুকু স্বাধীনতাও কমলার বেশি দিন রইল না। রাতের সব কাজ শেষ হয়ে গেলেও একদিন কী কারণে নবীনকালী কমলাকে ডেকে পাঠালেন। বেহারা এসে খবর দিল, “বামুন-ঠাকরুনকে দেখতে পেলাম না।”
নবীনকালী ব্যস্ত হয়ে উঠে বললেন, “সে কী রে, তবে পালাল নাকি?”
নবীনকালী নিজে সেই রাতে আলো ধরিয়ে ঘরে ঘরে খোঁজ করতে এলেন, কোথাও কমলাকে দেখতে পেলেন না। মুকুন্দবাবু অর্ধেক চোখ বন্ধ করে গুড়গুড়ি টানছিলেন; তাঁকে গিয়ে বললেন, “ওগো, শুনছ? বামুন-ঠাকরুন বোধ করি পালাল।”
এতেও মুকুন্দবাবুর শান্তিভঙ্গ করল না; তিনি কেবল আলস্যজড়িত কণ্ঠে বললেন, “তখনই তো বারণ করেছিলাম; জানাশোনা লোক নয়। কিছু সরিয়েছে নাকি?”
গৃহিণী বললেন, “সেদিন তাকে যে শীতের কাপড়খানা পরতে দিয়েছিলাম, সেটা তো ঘরে নেই, এ ছাড়া আর কী গেছে, এখনো দেখি নি।”
কর্তা অবিচলিত গম্ভীরস্বরে বললেন, “পুলিসে খবর দেওয়া যাক।”
এজন্য চাকর লণ্ঠন নিয়ে পথে বের হল। ইতিমধ্যে কমলা তার ঘরে ফিরে এসে দেখল, নবীনকালী সে ঘরের সব জিনিসপত্র তন্ন-তন্ন করে দেখছেন। কোনো জিনিস চুরি গেছে কি না তাই তিনি সন্ধান করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন। এমন সময় কমলাকে হঠাৎ দেখে নবীনকালী বলে উঠলেন, “বলি, কী কাণ্ডটাই করলে? কোথায় যাওয়া হয়েছিল?”
কমলা বলল, “কাজ শেষ করে আমি একটুখানি বাগানে বেড়াচ্ছিলাম।”
নবীনকালী মুখে যা এল তাই বলে গেলেন। বাড়ির সব চাকরবাকর দরজার কাছে এসে জড়ো হল।
কমলা কোনোদিন নবীনকালীর কোনো ভর্ৎসনায় তাঁর সামনে অশ্রুবর্ষণ করে নি। আজও সে কাঠের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নবীনকালীর বাক্যবর্ষণ একটুখানি থামবামাত্র কমলা বলল, “আমার প্রতি আপনারা অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আমাকে বিদায় করে দিন।”
নবীনকালী। বিদায় তো করবই। তোমার মতো অকৃতজ্ঞকে চিরদিন ভাত-কাপড় দিয়ে পোষব, এমন কথা মনে করিয়ো না। কিন্তু কেমন লোকের হাতে পড়েছ সেটা আগে ভালো করে জানিয়ে তবে বিদায় দেব।
এর পর থেকে কমলা বাইরে যেতে আর সাহস করত না। সে ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে মনে মনে এই কথা বলল, যে লোক এত দুঃখ সহ্য করছে ভগবান নিশ্চয় তার একটা গতি করে দেবেন।
মুকুন্দবাবু তাঁর দুটি চাকর সঙ্গে নিয়ে গাড়ি করে হাওয়া খেতে বের হয়েছেন। বাড়িতে প্রবেশের দরজায় ভিতর থেকে হুড়কা বন্ধ। সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
দরজার কাছে রব উঠল, “মুকুন্দবাবু ঘরে আছেন কি?”
নবীনকালী চমকে উঠে বললেন, “ঐ গো, নলিনাক্ষ ডাক্তার এসেছেন। বুধিয়া, বুধিয়া!”
বুধিয়া-নামধারিণীর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। তখন নবীনকালী বললেন, “বামুন-ঠাকরুন, যাও তো, শীঘ্র দরজা খুলে দাও গে। ডাক্তারবাবুকে বলো, কর্তা হাওয়া খেতে বের হয়েছেন, এখনই আসবেন; একটু অপেক্ষা করতে হবে।
কমলা লণ্ঠন নিয়ে নীচে নামে গেল—তার পা কাঁপছে, তার বুকের ভিতর গুরগুর করছে, তার করতল ঠাণ্ডা হিম হয়ে গেল। তার ভয় হতে লাগল, পাছে এই বিষম ব্যাকুলতায় সে চোখে ভালো করে দেখতে না পায়।
কমলা ভিতর থেকে হুড়কা খুলে দিয়ে ঘোমটা টেনে কপাটের আড়ালে দাঁড়াল।
নলিনাক্ষ জিজ্ঞেস করল, “কর্তা ঘরে আছেন কি?”
কমলা কোনোমতে বলল, “না, আপনি আসুন।”
নলিনাক্ষ বসবার ঘরে এসে বসল। ইতিমধ্যে বুধিয়া এসে বলল, “কর্তাবাবু বেড়াতে গেছেন এখনই আসবেন, আপনি একটু বসুন।”
কমলার নিশ্বাস প্রবল হয়ে তার বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছিল। যেখান থেকে নলিনাক্ষকে স্পষ্ট দেখা যাবে, অন্ধকার বারান্দার এমন একটা জায়গা সে আশ্রয় করল, কিন্তু দাঁড়াতে পারল না। বিক্ষুব্ধ বক্ষকে শান্ত করবার জন্য তাকে সেইখানে বসে পড়তে হল। তার হৃৎপিণ্ডের চাঞ্চল্যের সঙ্গে শীতের হাওয়া যোগ দিয়ে তাকে থরথর করে কাঁপিয়ে তুলল।
নলিনাক্ষ কেরোসিন-আলোর পাশে বসে স্তব্ধ হয়ে কী ভাবছিল। অন্ধকারের ভিতর থেকে কাঁপতে কাঁপতে কমলা নলিনাক্ষের মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল। চেয়ে চেয়ে তার দুই চোখে বার বার জল আসতে লাগল। তাড়াতাড়ি জল মুছে সে তার একাগ্রদৃষ্টির দ্বারা নলিনাক্ষকে যেন আপনার অন্তঃকরণের গভীরতম অভ্যন্তরদেশে আকর্ষণ করে নিল। ঐ-যে উন্নত ললাট স্তব্ধ মুখখানির ওপর দীপালোক ঝিলিক দিয়ে পড়ছে, ঐ মুখ যতই কমলার অন্তরের মধ্যে মুদ্রিত ও পরিস্ফুট হয়ে উঠতে লাগল ততই তার সমস্ত শরীর যেন ক্রমে অবশ হয়ে চারি দিকের আকাশের সঙ্গে মিলে যেতে লাগিল; বিশ্বজগতের মধ্যে আর-কিছুই রইল না, কেবল ঐ আলোকিত মুখখানি রইল—যার সামনে রইল সেও ঐ মুখের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিশে গেল।
এভাবে কিছুক্ষণ কমলা সচেতন কি অচেতন ছিল, তা বলা যায় না; এমন সময় হঠাৎ সে চমকে উঠে দেখল, নলিনাক্ষ চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে এবং মুকুন্দবাবুর সঙ্গে কথা কহছে।
এখনি পাছে উঁহারা বারান্দায় বেরিয়ে আসেন এবং কমলা ধরা পড়ে এই ভয়ে কমলা বারান্দা ছেড়ে নীচে তার রান্নাঘরে গিয়ে বসল। রান্নাঘরটি প্রাঙ্গণের এক ধারে, এবং এই প্রাঙ্গণটি বাড়ির ভিতর থেকে বাইরে যাবার পথ।
কমলা সর্বাঙ্গমনে পুলকিত হয়ে বসে ভাবতে লাগল, “আমার মতো হতভাগিনীর এমন স্বামী! দেবতার মতো এমন সৌম্য-নির্মল প্রসন্ন-সুন্দর মূর্তি! ওগো ঠাকুর, আমার সব দুঃখ সার্থক হয়ে গেছে।”
বলে বার বার করে ভগবানকে প্রণাম করল।
সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামার পায়ের শব্দ শোনা গেল। কমলা তাড়াতাড়ি অন্ধকারে দরজার পাশে দাঁড়াল। বুধিয়া আলো ধরিয়ে আগে আগে চলল, তার অনুসরণ করে নলিনাক্ষ বেরিয়ে গেল।
কমলা মনে মনে বলল, “তোমার শ্রীচরণের সেবিকা হয়ে এইখানে পরের দ্বারে দাসত্বে আবদ্ধ হয়ে আছি, সামনে দিয়ে চলে গেলে, তবু জানতেও পারলে না।”
মুকুন্দবাবু অন্তঃপুরে আহার করতে গেলে কমলা আস্তে আস্তে সেই বসবার ঘরে গেল। যে চৌকিতে নলিনাক্ষ বসেছিল তার সামনে ভূমিতে ললাট ঠেকিয়ে সেখানকার ধুলো চুম্বন করল। সেবা করবার সুযোগ না পেয়ে অবরুদ্ধ ভক্তিতে কমলার হৃদয় কাতর হয়ে উঠেছিল।
পরদিন কমলা সংবাদ পেল, বায়ুপরিবর্তনের জন্য ডাক্তারবাবু কর্তাকে সুদূর পশ্চিমে কাশীর চেয়ে স্বাস্থ্যকর স্থানে যেতে উপদেশ দিয়েছেন। তাই আজ থেকে যাত্রার আয়োজন শুরু হয়েছে।
কমলা নবীনকালীকে গিয়ে বলল, “আমি তো কাশী ছেড়ে যেতে পারব না।”
নবীনকালী। আমরা পারব, আর তুমি পারবে না! বড়ো ভক্তি দেখছি।
কমলা। আপনি যা-ই বলুন, আমি এইখানেই থাকব।
নবীনকালী। আচ্ছা, তা কেমন থাক দেখা যাবে।
কমলা বলল, “আমাকে দয়া করুন, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবেন না।”
নবীনকালী। তুমি তো বড়ো ভয়ানক লোক দেখছি। ঠিক যাবার সময় বাহানা ধরলে। আমরা এখন তাড়াতাড়ি লোক কোথায় খুঁজে পাই! আমাদের কাজ চলবে কী করে?
কমলার অনুনয়-বিনয় সব ব্যর্থ হল; কমলা তার ঘরে দরজা বন্ধ করে ভগবানকে ডেকে কাঁদতে লাগল।
যেদিন সন্ধ্যার সময় নলিনাক্ষের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে হেমনলিনীর সঙ্গে অন্নদাবাবুর আলোচনা হয়েছিল সেইদিন রাতেই অন্নদাবাবুর আবার সেই শূলবেদনা দেখা দিল।
রাতটা কষ্টে কেটে গেল। প্রাতঃকালে তাঁর বেদনার উপশম হলে তিনি তাঁর বাড়ির বাগানে রাস্তার কাছে শীতপ্রভাতের নরম সূর্যালোকে সামনে একটি টেবিল নিয়ে বসেছেন, হেমনলিনী সেইখানেই তাঁকে চা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করছে। গতরাতের কষ্টে অন্নদাবাবুর মুখ ফ্যাকাশে ও শীর্ণ হয়ে গেছে, তাঁর চোখের নিচে কালি পড়েছে, মনে হচ্ছে যেন এক রাতের মধ্যেই তাঁর বয়স অনেক বেড়ে গেছে।
যখনই অন্নদাবাবুর এই ক্লিষ্ট মুখের প্রতি হেমনলিনীর চোখ পড়ছে তখনই তার বুকের মধ্যে যেন ছুরি বিঁধছে। নলিনাক্ষের সঙ্গে বিয়েতে হেমনলিনীর অসম্মতিতেই যে বৃদ্ধ ব্যথিত হয়েছেন, আর তাঁর সেই মনোবেদনাই যে তাঁর পীড়ার অব্যবহিত কারণ, এটা হেমনলিনীর পক্ষে খুব পরিতাপের বিষয় হয়ে উঠেছে। সে যে কী করবে, কী করলে বৃদ্ধ বাবাকে সান্ত্বনা দিতে পারবে, তা বার বার করে ভেবে কোনোমতেই স্থির করতে পারছিল না।
এমন সময় হঠাৎ খুড়োমশায়কে নিয়ে অক্ষয় সেখানে এসে উপস্থিত হল। হেমনলিনী তাড়াতাড়ি চলে যাবার উপক্রম করতেই অক্ষয় বলল, “আপনি যাবেন না, ইনি গাজিপুরের চক্রবর্তীমহাশয়, ইঁহাকে পশ্চিম-অঞ্চলের সবাই জানে—আপনাদের সঙ্গে ইঁহার বিশেষ কথা আছে।”
সেই জায়গাটাতে বাঁধানো চাতালের মতো ছিল, সেইখানে খুড়োমশায় আর অক্ষয় বসলেন।
খুড়োমশায় বললেন, “শুনলাম, রমেশবাবুর সঙ্গে আপনাদের বিশেষ বন্ধুত্ব আছে, আমি তাই জিজ্ঞেস করতে এসেছি তাঁর স্ত্রীর খবর কি আপনারা কিছু পেয়েছেন?”
অন্নদাবাবু ক্ষণকাল অবাক হয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “রমেশবাবুর স্ত্রী!”
হেমনলিনী চোখ নিচু করে রইল। চক্রবর্তী বললেন, “মা, তোমরা আমাকে বোধ করি নিতান্ত সেকেলে অসভ্য মনে করছ। একটু ধৈর্য ধরে সব কথা শুনলেই বুঝতে পারবে, আমি অকারণে গায়ে পড়ে পরের কথা নিয়ে তোমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে আসি নি। রমেশবাবু পূজার সময় তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে স্টীমারে করে যখন পশ্চিমে যাত্রা করেছিলেন, সেই সময়ে সেই স্টীমারেই তাঁদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। আপনারা তো জানেন, কমলাকে যে একবার দেখেছে, সে তাকে কখনো পর বলে মনে করতে পারে না। আমার এই বুড়োবয়সে অনেক শোকতাপ পেয়ে হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে, কিন্তু আমার সেই মা-লক্ষ্মীকে তো কিছুতেই ভুলতে পারছি না। রমেশবাবু কোথায় যাবেন, কিছুই ঠিক করেন নি—কিন্তু এই বুড়োকে দুই দিন দেখেই মা কমলার এমনি স্নেহ জন্মে গিয়েছিল যে, তিনি রমেশবাবুকে গাজিপুরে আমার বাড়িতেই উঠতে রাজি করেন। সেখানে কমলা, আমার মেজো মেয়ে শৈলের কাছে আপন বোনের চেয়ে যত্নে ছিল। কিন্তু কি যে হল, কিছুই বলতে পারি না—মা যে কেন আমাদের সবাইকে এমন করে কাঁদিয়ে হঠাৎ চলে গেলেন তা আজ পর্যন্ত ভেবে পেলাম না। সেই থেকে শৈলের চোখের জল আর কিছুতেই শুকাচ্ছে না।”
বলতে বলতে চক্রবর্তীর দুই চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল। অন্নদাবাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন; বললেন, “তাঁহার কী হল, তিনি কোথায় গেলেন?”
খুড়োমশায় বললেন, “অক্ষয়বাবু, আপনি তো সব কথা শুনেছেন, আপনিই বলুন। বলতে গেলে আমার বুক ফেটে যায়।”
অক্ষয় আগাগোড়া সব ব্যাপারটি বিস্তারিত করে বর্ণনা করল। নিজে কোনোপ্রকার মন্তব্য করল না, কিন্তু তার বর্ণনায় রমেশের চরিত্রটি আকর্ষণীয় হয়ে ফুটে উঠল না।
অন্নদাবাবু বার বার করে বলতে লাগলেন, “আমরা তো এ-সব কথা কিছুই শুনি নি। রমেশ যেদিন থেকে কলকাতার বাইরে হয়েছেন, তাঁর একখানি চিঠিও পাই নি।”
অক্ষয় সেইসঙ্গে যোগ দিল, “এমনকি, তিনি যে কমলাকে বিয়ে করেছেন এ কথাও আমরা নিশ্চিত জানতাম না। আচ্ছা চক্রবর্তীমহাশয়, আপনাকে জিজ্ঞেস করি, কমলা রমেশের স্ত্রী তো বটেন? বোন বা আর কোনো আত্মীয়া তো নন?”
চক্রবর্তী বললেন, “আপনি বলেন কী অক্ষয়বাবু? স্ত্রী নন তো কী! এমন সতীলক্ষ্মী স্ত্রী কয়জনের ভাগ্যে জোটে?”
অক্ষয় বলল, “কিন্তু আশ্চর্য এই যে, স্ত্রী যত ভালো হয় তার অনাদরও তত বেশি হয়ে থাকে। ভগবান ভালো লোকদেরই বোধ করি সব চেয়ে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেন।”
এই বলে অক্ষয় একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।
অন্নদা তাঁর কম চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, “বড়ো দুঃখের বিষয় সন্দেহ নেই, কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে, এখন আর বৃথা শোক করে ফল কী?”
অক্ষয় বলল, “আমার মনে সন্দেহ হল, যদি এমন হয়, কমলা আত্মহত্যা না করে ঘর ছেড়ে চলে এসে থাকেন। তাই চক্রবর্তীমহাশয়কে নিয়ে কাশীতে এবার খোঁজ করতে এলাম। বেশ বোঝা যাচ্ছে, আপনারা কোনো খবরই পান নি। যাই হোক, দু-চারদিন এখানে তল্লাশি করে দেখা যাক।”
অন্নদাবাবু বললেন, “রমেশ এখন কোথায় আছেন?”
খুড়োমশায় বললেন, “তিনি তো আমাদের কিছু না বলেই চলে গেছেন।”
অক্ষয় বলল, “আমার সঙ্গে দেখা হয় নি, কিন্তু লোকের মুখে শুনলাম, তিনি কলকাতাতেই গেছেন। বোধ করি আলিপুরে প্র্যাকটিস করবেন। মানুষ তো আর অনন্তকাল শোক করে কাটাতে পারে না, বিশেষত তাঁর অল্প বয়স। চক্রবর্তীমহাশয়, চলুন, শহরে একবার ভালো করে খোঁজ করে দেখা যাক।”
অন্নদাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “অক্ষয়, তুমি তো এইখানেই আসছ?”
অক্ষয় বলল, “ঠিক বলতে পারি না। আমার মনটা খুবই খারাপ হয়ে আছে অন্নদাবাবু। যত দিন কাশীতে আছি, আমাকে এই খোঁজেই থাকতে হবে। বলেন কী, ভদ্রলোকের মেয়ে, যদিই তিনি মনের দুঃখে ঘর ছেড়ে চলে এসে থাকেন, তবে আজ কী বিপদেই পড়েছেন বলুন দেখি। রমেশবাবু দিব্য নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু আমি তো পারি না।”
খুড়োমশায়কে সঙ্গে নিয়ে অক্ষয় চলে গেল।
অন্নদাবাবু খুব উদ্বিগ্ন হয়ে এবার হেমনলিনীর মুখের দিকে চেয়ে দেখলেন। হেমনলিনী প্রাণপণে নিজেকে সংযত করে বসেছিল। সে জানত, তার বাবা মনে মনে তার জন্য আশঙ্কা অনুভব করছেন।
হেমনলিনী বলল, “বাবা, আজ একবার ডাক্তার দিয়ে তোমার শরীরটা ভালো করে পরীক্ষা করাও। একটুতেই তোমার স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়, এর একটা প্রতিকার করা উচিত।”
অন্নদাবাবু মনে মনে খুব আরাম অনুভব করলেন। রমেশকে নিয়ে এতবড়ো আলোচনাটার পর হেমনলিনী যে তাঁর পীড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল, এতে তাঁর মনের মধ্য থেকে একটা ভার নামে গেল। অন্য সময় হলে তিনি নিজের পীড়ার প্রসঙ্গ উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করতেন; আজ বললেন, “সে তো ভালো কথা।” শরীরটা নাহয় পরীক্ষা করানোই যাক। তাহলে আজ নাহয় একবার নলিনাক্ষকে ডাকতে পাঠাই। কী বল?”
নলিনাক্ষ সম্বন্ধে হেমনলিনী একটুখানি সংকোচে পড়ে গেছে। বাবার সামনে তাঁর সঙ্গে আগের মতো সহজভাবে মেলা তার পক্ষে কঠিন হবে, তবু সে বলল, “সেই ভালো, তাঁকে ডাকতে লোক পাঠিয়ে দিই।”
অন্নদাবাবু হেমের অবিচলিত ভাব দেখে ক্রমে সাহস পেয়ে বললেন, “হেম, রমেশের এই সব কাণ্ড—”
হেমনলিনী তৎক্ষণাৎ তাঁকে বাধা দিয়ে বলল, “বাবা, রোদের জাঁক বেড়ে উঠেছে—চলো, এখন ঘরে চলো।” বলে তাঁকে আপত্তি করার সুযোগ না দিয়ে হাত ধরে ঘরে টেনে নিয়ে গেল। সেখানে তাঁকে আরাম-কেদারায় বসিয়ে তাঁর গায়ে ভালো করে গরম কাপড় জড়িয়ে দিয়ে তাঁর হাতে একখানা খবরের কাগজ দিল এবং চশমার খাপ থেকে চশমাটি বের করে নিজে তাঁর চোখে পরিয়ে দিয়ে বলল, “কাগজ পড়ো, আমি আসছি।”
অন্নদাবাবু সুবাধ্য বালকের মতো হেমনলিনীর আদেশ পালন করতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনোমতেই মনোনিবেশ করতে পারলেন না। হেমনলিনীর জন্য তাঁর মন উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠতে লাগল। অবশেষে এক সময় কাগজ রেখে হেমের খোঁজ করতে গেলেন; দেখলেন, সেই সকালে অসময়ে তার ঘরের দরজা বন্ধ।
কিছু না বলে অন্নদাবাবু বারান্দায় পায়চারি করে বেড়াতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পরে আবার একবার হেমনলিনীকে খুঁজতে গিয়ে দেখলেন, তখনো তার দরজা বন্ধ রইল। তখন শ্রান্ত অন্নদাবাবু ধপ্ করে তাঁর চৌকির ওপর বসে পড়ে বারবার মাথার চুলগুলোকে হাত সঞ্চালনে এলোমেলো করে তুলতে লাগলেন।
নলিনাক্ষ এসে অন্নদাবাবুকে পরীক্ষা করে দেখল এবং যথাকর্তব্য বলে দিল এবং হেমকে জিজ্ঞেস করল, “অন্নদাবাবুর মনে কি বিশেষ কোনো উদ্বেগ আছে?”
হেম বলল, “তা থাকতে পারে।”
নলিনাক্ষ বলল, “যদি সম্ভব হয়, উঁহার মনের সম্পূর্ণ বিশ্রাম আবশ্যক। আমার মার সম্বন্ধেও ঐ এক মুশকিলে পড়েছি; তিনি একটুতেই এমনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, তাঁর শরীর সুস্থ রাখা শক্ত হয়ে পড়েছে। সামান্য কী-একটা চিন্তা নিয়ে কাল বোধ হয় সারারাত তিনি ঘুমাতে পারেন নি। আমি চেষ্টা করি যাতে তিনি কিছুমাত্র বিচলিত না হন, কিন্তু সংসারে থাকতে গেলে তা কোনোমতেই সম্ভবপর হয় না।”
হেমনলিনী বলল, “আপনাকেও আজ তেমন ভালো দেখাচ্ছে না।”
নলিনাক্ষ। না, আমি বেশ ভালোই আছি। মন্দ থাকা আমার অভ্যাস নয়। তবে কাল বোধ হয় কিছু রাত জাগতে হয়েছিল বলে আজ আমাকে তেমন তাজা দেখাচ্ছে না।
হেমনলিনী। আপনার মাকে সেবা করার জন্য সর্বদা যদি একটি স্ত্রীলোক তাঁর কাছে থাকত, তবে বোধ হয় ভালো হত। আপনি একলা, আপনার কাজকর্ম আছে, কী করে আপনি উঁহার শুশ্রূষা করে উঠবেন?
এ কথাটা হেমনলিনী সহজ ভাবেই বলেছিল, কথাটা যুক্তিসংগত, সে বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বলার পরেই হঠাৎ তাকে লজ্জা আক্রমণ করল, তার মুখ লাল হয়ে উঠল। তার হঠাৎ মনে হল, নলিনাক্ষবাবু যদি কিছু মনে করেন। হঠাৎ হেমনলিনীর এই লজ্জার আবির্ভাব দেখে নলিনাক্ষও তার মার প্রস্তাবের কথা মনে না করে থাকতে পারল না।
হেমনলিনী তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল, “উঁহার কাছে একজন ঝি রাখলে ভালো হয় না?”
নলিনাক্ষ বলল, “অনেকবার চেষ্টা করেছি, মা কিছুতেই রাজি হন না। তিনি শুদ্ধাচার সম্বন্ধে খুব সতর্ক বলে মাহিনা-করা লোকের কাজে তাঁর শ্রদ্ধা হয় না। তা ছাড়া, তাঁর স্বভাব এমন যে, কেউ যে দায়ে পড়ে তাঁর সেবা করছে এটা তিনি সহ্য করতে পারেন না।”
এর পরে এ সম্বন্ধে হেমনলিনীর আর কোনো কথা চলল না। সে একটুখানি চুপ করে থেকে বলল, “আপনার উপদেশমতো চলতে চলতে মাঝে মাঝে এক-একবার বাধা এসে উপস্থিত হয়, আবার আমি পিছিয়ে পড়ি। আমার ভয় হয়, আমার যেন কোনো আশা নেই। আমার কি কোনোদিন মনের একটা স্থিতি হবে না, আমাকে কি কেবলই বাইরে আঘাতে অস্থির হয়ে বেড়াতে হবে?”
হেমনলিনীর এই কাতর আবেদনে নলিনাক্ষ একটু চিন্তিত হয়ে বলল, “দেখুন, বিঘ্ন আমাদের হৃদয়ের সমস্ত শক্তিকে জাগ্রত করে দেবার জন্যই উপস্থিত হয়। আপনি হতাশ হবেন না।”
হেমনলিনী বলল, “কাল সকালে আপনি একবার আসতে পারবেন? আপনার সহায়তা পেলে আমি অনেকটা বল লাভ করি।”
নলিনাক্ষের মুখে এবং কণ্ঠস্বরে যে-একটি অবিচলিত শান্তির ভাব আছে তাতে হেমনলিনী যেন একটা আশ্রয় পায়। নলিনাক্ষ চলে গেল, কিন্তু হেমনলিনীর মনের মধ্যে একটা সান্ত্বনার স্পর্শ রেখে গেল। সে তার শয়নঘরের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একবার শীতরৌদ্রালোকিত বাইরের দিকে চাইল। তার চারি দিকে বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে সেই রমণীয় মধ্যাহ্নে কর্মের সঙ্গে বিরাম, শক্তির সঙ্গে শান্তি, উদ্যোগের সঙ্গে বৈরাগ্য একসঙ্গে বিরাজ করছিল; সেই বৃহৎ ভাবের কোলে সে আপনার ব্যথিত হৃদয়কে সমর্পণ করে দিল—তখন সূর্যালোক এবং উন্মুক্ত উজ্জ্বল নীলাকাশ তার অন্তঃকরণের মধ্যে জগতের নিত্য-উচ্চারিত সুগভীর আশীর্বচন প্রেরণ করার সুযোগ লাভ করল।
হেমনলিনী নलিনাক্ষের মার কথা ভাবতে লাগল। কী চিন্তা নিয়ে তিনি ব্যস্ত আছেন, তিনি কেন যে রাতের ঘুমাতে পারছেন না, তা হেমনলিনী বুঝতে পারল। নলিনাক্ষের সঙ্গে তাঁর বিয়ে-প্রস্তাবের প্রথম আঘাত, প্রথম সংকোচ কেটে গেছে। নলিনাক্ষের প্রতি হেমনলিনীর একান্ত নির্ভরপর ভক্তি ক্রমেই বেড়ে উঠছিল, কিন্তু এর মধ্যে ভালোবাসার বিদ্যুৎসঞ্চারময়ী বেদনা নেই—তা না থাকুক। ঐ আত্মপ্রতিষ্ঠ নলিনাক্ষ যে কোনো স্ত্রীলোকের ভালোবাসার অপেক্ষা রাখে, তা তো মনেই হয় না। তবু সেবার প্রয়োজন তো সবারই আছে। নলিনাক্ষের মাতা পীড়িত এবং প্রাচীন, নলিনাক্ষকে কে দেখবে? এ সংসারে নলিনাক্ষের জীবন তো অবহেলার সামগ্রী নয়; এমন লোকের সেবা, ভক্তির সেবাই হওয়া চাই।
আজ প্রভাতে হেমনলিনী রমেশের জীবন-ইতিবৃত্তের যে একাংশ শুনেছে তাতে তার মর্মের মাঝখানে এমন একটা প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে যে, এই নিদারুণ আঘাত থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য তার সমস্ত মনের সমস্ত শক্তি আজ উদ্যত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ এমন অবস্থা এসেছে যে, রমেশের জন্য বেদনা বোধ করা তার পক্ষে লজ্জাকর। সে রমেশকে বিচার করে অপরাধী করতেও চায় না। পৃথিবীতে কত শতসহস্র লোক ভালোমন্দ কত কী কাজে লিপ্ত রয়েছে, সংসারচক্র চলছে—হেমনলিনী তার বিচারভার নেয় নি। রমেশের কথা হেমনলিনী মনেও আনতে ইচ্ছা করে না। মাঝে মাঝে আত্মঘাতিনী কমলার কথা কল্পনা করে তার শরীর শিউরে ওঠে; তার মনে হতে থাকে, “এই হতভাগিনীর আত্মহত্যার সঙ্গে আমার কি কোনো সংস্রব আছে?” তখন লজ্জায়, ঘৃণায়, করুণায় তার সমস্ত হৃদয় মথিত হতে থাকে। সে জোড়হাত করে বলে, “হে ঈশ্বর, আমি তো অপরাধ করি নি, তবে আমি কেন এমন করে জড়িত হলাম? আমার এ বন্ধন মোচন করো, একেবারে ছিন্ন করে দাও। আমি আর কিছুই চাই না, আমাকে তোমার এই জগতে সহজভাবে বেঁচে থাকতে দাও।”
রমেশ ও কমলার ঘটনা শুনে হেমনলিনী কী মনে করছে, তা জানবার জন্য অন্নদাবাবু উৎসুক হয়ে আছেন, অথচ কথাটা স্পষ্ট করে পাড়তে তাঁর সাহস হচ্ছে না। হেমনলিনী বারান্দায় চুপ করে বসে সেলাই করছিল, সেখানে এক-একবার গিয়ে হেমনলিনীর চিন্তামগ্ন মুখের দিকে চেয়ে তিনি ফিরে এসেছেন।
সন্ধ্যার সময় ডাক্তারের উপদেশমতো অন্নদাবাবুকে জারকচূর্ণমিশ্রিত দুধ পান করিয়ে হেমনলিনী তাঁর কাছে বসল। অন্নদাবাবু বললেন, “আলোটার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দাও।”
ঘর একটু অন্ধকার হলে অন্নদাবাবু বললেন, “সকালবেলায় যে বৃদ্ধটি এসেছিলেন তাঁকে দেখে বেশ সরল বোধ হল।”
হেমনলিনী এই প্রসঙ্গ নিয়ে কোনো কথা বলল না, চুপ করে রইল। অন্নদাবাবু আর বেশি ভূমিকা বানাতে পারলেন না। তিনি বললেন, “রমেশের ব্যাপার শুনে আমি কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গেছি—লোকে তাঁর সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছে, আমি আজ পর্যন্ত তা বিশ্বাস করি নি, কিন্তু আর তো—”
হেমনলিনী কাতর কণ্ঠে বলল, “বাবা, ও-সব কথার আলোচনা থাকুক।”
অন্নদাবাবু বললেন, “মা, আলোচনা করতেও তো ইচ্ছা করেই না। কিন্তু বিধির বিপাকে হঠাৎ এক-একজন লোকের সঙ্গে আমাদের সুখদুঃখ জড়িত হয়ে যায়, তখন তাঁর কোনো আচরণকে আর উপেক্ষা করার জো থাকে না।”
হেমনলিনী জোর দিয়ে বলে উঠল, “না না, সুখদুঃখের গ্রন্থি অমন করে যেখানে সেখানে কেন জড়িত হতে দেব। বাবা, আমি ভালো আছি, আমার জন্য বৃথা উদ্বিগ্ন হয়ে আমাকে লজ্জা দিয়ো না।”
অন্নদাবাবু বললেন, “মা হেম, আমার বয়স হয়েছে, এখন তোমার একটা স্থিতি না করে তো আমার মন স্থির হতে পারে না। তোমাকে এমন তপস্বিনীর মতো কি আমি রেখে যেতে পারি?”
হেমনলিনী চুপ করে রইল। অন্নদাবাবু বললেন, “দেখো মা, পৃথিবীতে একটা আশা চূর্ণ হল বলেই যে আর-সমস্ত দামি জিনিসকে উপেক্ষা করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তোমার জীবন কিসে সুখী হবে, সার্থক হবে, আজ হয়তো মনের ক্ষোভে তা তুমি না জানতেও পার, কিন্তু আমি নিয়ত তোমার মঙ্গলচিন্তা করি—আমি জানি তোমার কিসে সুখ, কিসে মঙ্গল—আমার প্রস্তাবটাকে একেবারে উপেক্ষা করিয়ো না।”
হেমনলিনী দুই চোখ ছলছল করে বলে উঠল, “অমন কথা বলিয়ো না, আমি তোমার কোনো কথাই উপেক্ষা করি না। তুমি যা আদেশ করবে আমি নিশ্চয় তা পালন করব, কেবল একবার অন্তঃকরণটা পরিষ্কার করে একবার ভালোরকম করে প্রস্তুত হয়ে নিতে চাই।”
অন্নদাবাবু সেই অন্ধকারে একবার হেমনলিনীর অশ্রুসিক্ত মুখে হাত বুলিয়ে তার মাথা স্পর্শ করলেন। আর কোনো কথা বললেন না।
পরদিন সকালে যখন অন্নদাবাবু হেমনলিনীকে নিয়ে বাইরে গাছের তলায় চা খেতে বসেছেন, তখন অক্ষয় এসে উপস্থিত হল। অন্নদাবাবু নীরব প্রশ্নের সঙ্গে তার মুখের দিকে চাইলেন। অক্ষয় বলল, “এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।” এই বলে এক পেয়ালা চা নিয়ে সে সেখানে বসে গেল।
আস্তে আস্তে কথা তুলল, “রমেশবাবু ও কমলার জিনিসপত্র কিছু-কিছু চক্রবর্তী মহাশয়ের ওখানে থেকে গেছে, সেগুলি তিনি কোথায় কাহার কাছে পাঠাবেন, তাই ভাবছেন। রমেশবাবু নিশ্চয়ই আপনাদের ঠিকানা বের করে শীঘ্রই এখানে আসবেন, তাই আপনাদের এখানে যদি—”
অন্নদাবাবু হঠাৎ খুব রেগে উঠে বললেন, “অক্ষয়, তোমার কাণ্ডজ্ঞান কিছুমাত্র নেই। রমেশ আমার এখানেই বা কেন আসবে, আর তাঁর জিনিসপত্র আমিই বা কেন রাখতে যাইব?”
অক্ষয় বলল, “যাই হোক, অন্যায় করুন আর ভুল করুন রমেশবাবু এখন নিশ্চয়ই অনুতপ্ত হয়েছেন, এ সময়ে কি তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়া তাঁর পুরোনো বন্ধুদের কর্তব্য নয়? তাঁকে কি একেবারেই পরিত্যাগ করতে হবে?”
অন্নদাবাবু বললেন, “অক্ষয়, তুমি কেবল আমাদের পীড়ন করার জন্য এই কথাটা নিয়ে বার বার আন্দোলন করছ। আমি তোমাকে বিশেষ করে বলে দিচ্ছি, এ প্রসঙ্গ তুমি আমাদের কাছে কখনোই তুলিয়ো না।”
হেমনলিনী মিষ্টি স্বরে বলল, “বাবা, তুমি রাগ করিয়ো না, তোমার অসুখ করবে—অক্ষয়বাবু যা বলতে চান বলুন না, তাতে দোষ কী।”
অক্ষয় বলল, “না না, আমাকে মাপ করবেন, আমি ঠিক বুঝতে পারি নি।”