মুকুন্দবাবু সপরিবারে কাশী ত্যাগ করে মিরাটে যাবেন, স্থির হয়ে গেছে। জিনিসপত্র বাঁধা হয়েছে, কাল ভোরে ছাড়তে হবে। কমলা খুব আশা করছিল, ইতিমধ্যে এমন একটা কিছু ঘটনা ঘটবে যাতে তাদের যাওয়া বন্ধ হবে। এও সে একান্তমনে আশা করছিল যে, নলিনাক্ষ ডাক্তার হয়তো, আর দুই-একবার তাঁর রোগীকে দেখতে আসবেন। কিন্তু দুটোর কোনোটাই ঘটল না।
পাছে বামুন-ঠাকরুন যাত্রার প্রস্তুতির গোলমালে পালিয়ে যাবার সুযোগ পায়, এই আশঙ্কায় নবীনকালী তাকে কয়দিন সর্বদাই কাছে কাছে রেখেছেন, তাকে দিয়েই জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদার অনেক কাজ করিয়ে নিয়েছেন।
কমলা একান্তমনে কামনা করতে লাগল, আজ রাতের মধ্যে তার এমন একটা কঠিন পীড়া হয় যে, তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া নবীনকালীর পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। সেই গুরুতর পীড়ার চিকিৎসাভার কোন ডাক্তারের উপর পড়বে তাও সে মনে মনে ভাবে নি এমন নয়। এই পীড়ায় যদি অবশেষে তার মৃত্যু ঘটে, তবে আসন্ন মৃত্যুকালে সেই চিকিৎসকের পায়ের ধুলো নিয়ে সে মরতে পারবে, এও সে চোখ বুজে কল্পনা করছিল।
রাতে নবীনকালী কমলাকে নিজের ঘরে নিয়ে শুয়েছিলেন। পরদিন স্টেশনে যাবার সময় নিজের গাড়ির মধ্যে তুলে নিলেন। কর্তা মুকুন্দবাবু রেলগাড়িতে সেকেন্ড ক্লাসে উঠলেন, নবীনকালী বামুন-ঠাকরুনকে নিয়ে ইন্টারমিডিয়েটে মহিলা কামরায় আশ্রয়লাভ করলেন।
অবশেষে গাড়ি কাশী স্টেশন ছাড়ল; মত্ত হাতি যেমন করে লতা ছিঁড়ে নেয়, তেমন করে রেলগাড়ি গর্জন করতে করতে কমলাকে ছিঁড়ে নিয়ে চলে গেল। কমলা ক্ষুধিত চোখে জানালা থেকে বাইরের দিকে চেয়ে রইল। নবীনকালী বললেন, “বামুন-ঠাকরুন, পানের ডিপোটাই কোথায় রেখেছ?”
কমলা পানের ডিপোটা বের করে দিল। ডিপো খুলে নবীনকালী বললেন, “এই দেখো, যা ভেবেছিলাম, তাই হয়েছে। চুনের কৌটোটা ফেলে এসেছ? এখন আমি করি কী। যেটা আমি নিজে না দেখব সেটায় একটা-না-একটা গলদ হয়েই আছে। এ কিন্তু বামুন-ঠাকরুন, তুমি শয়তানি করে করেছ। কেবল আমাকে জব্দ করবার মতলবে। ইচ্ছা করে আমাদের হাড় জ্বালাচ্ছ। আজ তরকারিতে নুন নেই, কাল পায়েসে পোড়া গন্ধ—মনে করছ, এ-সব চালাকি আমরা বুঝি না। আচ্ছা, চলো মিরাটে, তারপর দেখা যাবে তুমিই বা কে আর আমিই বা কে।”
গাড়ি যখন পুলের উপর দিয়ে চলল, কমলা জানালা থেকে মুখ বাড়িয়ে গঙ্গাতীরবর্তী কাশী শহরটা একবার দেখে নিল। ঐ শহরের মধ্যে কোন দিকে যে নলিনাক্ষের বাড়ি তা সে কিছুই জানে না। এইজন্য রেলগাড়ির দ্রুতগতির মধ্যে ঘাট, বাড়ি, মন্দিরচূড়া যা-কিছু তার চোখে পড়ল, সবই নলিনাক্ষের আবির্ভাবের দ্বারা মণ্ডিত হয়ে তার হৃদয়কে স্পর্শ করল।
নবীনকালী বললেন, “ওগো, অত করে ঝুঁকে দেখছ কী? তুমি তো পাখি নও, তোমার ডানা নেই যে উড়ে যাবে।”
কাশী নগরীর চিত্র কোথায় ঢাকা হয়ে গেল। কমলা স্থিরনীরব হয়ে বসে আকাশের দিকে চেয়ে রইল।
অবশেষে গাড়ি মোগলসরাইয়ে থামল। কমলার কাছে স্টেশনের গোলমাল, লোকজনের ভিড়, সবই ছায়ার মতো, স্বপ্নের মতো বোধ হতে লাগল। সে কলের পুতুলের মতো এক গাড়ি থেকে অন্য গাড়ি উঠল।
গাড়ি ছাড়বার সময় হয়ে আসছে, এমন সময় কমলা হঠাৎ চমকে উঠে শুনতে পেল তাকে কে পরিচিত কণ্ঠে “মা” বলে ডাকছে। কমলা প্ল্যাটফর্মের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখল—উমেশ।
কমলার সমস্ত মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল; বলল, “কী রে উমেশ!”
উমেশ গাড়ির দরজা খুলে দিল এবং মুহূর্তের মধ্যে কমলা নেমে পড়ল। উমেশ তৎক্ষণাৎ ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে কমলার পায়ের ধুলো মাথায় তুলে নিল। তার সমস্ত মুখ কান পর্যন্ত প্রসারিত হাসিতে ভরে গেল।
পরক্ষণেই গার্ড কামরার দরজা বন্ধ করে দিল। নবীনকালী চেঁচামেচি করতে লাগলেন, “বামুন-ঠাকরুন, করছ কী! গাড়ি ছাড়বে যে! ওঠো, ওঠো!”
কমলার কানে সে কথা পৌঁছলই না। গাড়িও বাঁশি বাজিয়ে গসগস শব্দে স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেল।
কমলা জিজ্ঞেস করল, “উমেশ, তুই কোথা থেকে আসছিস?”
উমেশ বলল, “গাজিপুর থেকে।”
কমলা জিজ্ঞেস করল, “সেখানে সবাই ভালো আছেন তো? খুড়োমশায়ের কী খবর?”
উমেশ বলল, “তিনি ভালো আছেন।”
কমলা। আমার দিদি কেমন আছেন?
উমেশ। মা, তিনি তোমার জন্য কাঁদে কাঁদে অস্থির করছেন।
তৎক্ষণাৎ কমলার দুই চোখ জলে ভরে গেল। জিজ্ঞেস করল, “উমি কেমন আছে রে? সে তার মাসিকে কি মাঝে মাঝে মনে করে?”
উমেশ বলল, “তুমি তাকে যে এক-জোড়া গহনা দিয়ে এসেছিলে সেইটা না পরালে তাকে কোনোমতে দুধ খাওয়ানো যায় না। সেইটা পরে সে দুই হাত ঘুরিয়ে বলতে থাকে ‘মাসি গ-গ গেছে’, আর তার মায়ের চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে।”
কমলা জিজ্ঞেস করল, “তুই এখানে কী করতে এলি?”
উমেশ বলল, “আমার গাজিপুরে ভালো লাগছিল না, তাই আমি চলে এসেছি।”
কমলা। যাবি কোথায়?
উমেশ বলল, “মা, তোমার সঙ্গে যাব।”
কমলা বলল, “আমার কাছে একটি পয়সাও নেই।”
উমেশ বলল, “আমার কাছে আছে।”
কমলা। তুই কোথায় পেলি?
উমেশ। সেই যে তুমি আমাকে পাঁচটা টাকা দিয়েছিলে, সে তো আমার খরচ হয়নি।
বলে গাঁট থেকে পাঁচটা টাকা বের করে দেখাল।
কমলা। তবে চল উমেশ, আমরা কাশী যাই, কী বলিস? তুই তো টিকিট করতে পারবি?
উমেশ বলল, “পারব।” বলে তখনই টিকিট কিনে আনল। গাড়ি প্রস্তুত ছিল, গাড়িতে কমলাকে তুলে দিল; বলল, “মা, আমি পাশের কামরাতেই রইলাম।”
কাশী স্টেশনে নেমে কমলা উমেশকে জিজ্ঞেস করল, “উমেশ, এখন কোথায় যাই বল দেখি?”
উমেশ বলল, “মা, তুমি কিছুই ভেবো না; আমি তোমাকে ঠিক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।”
কমলা। ঠিক জায়গা কী রে! তুই এখানকার কী জানিস বল দেখি।
উমেশ বলল, “সব জানি। দেখো তো কোথায় নিয়ে যাই।”
বলে কমলাকে একটা ভাড়াটে গাড়িতে তুলে দিয়ে সে কোচবাক্সে চড়ে বসল। একটা বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়ালে উমেশ বলল, “মা, এইখানে নামো।”
কমলা গাড়ি থেকে নেমে উমেশের অনুসরণ করে বাড়িতে ঢুকতেই উমেশ ডাকতে লাগল, “দাদামশায়, বাড়ি আছ তো?”
পাশের একটা ঘর থেকে সাড়া এল, “কে ও, উমেশ না কি! তুই কোথা থেকে এলি?”
পরক্ষণেই হুঁকো হাতে স্বয়ং চক্রবর্তী-খুড়োমশায় এসে উপস্থিত। উমেশ সমস্ত মুখ পরিপূর্ণ করে নীরবে হাসতে লাগল। বিস্মিত কমলা ভূমিষ্ঠ হয়ে চক্রবর্তীকে প্রণাম করল। খুড়োমশায়ের খানিকক্ষণ মুখে আর কথা সরল না; তিনি কী বলবেন, হুঁকোটা কোনখানে রাখবেন, কিছুই ভেবে পেলেন না। অবশেষে কমলার চিবুক ধরে তার লজ্জিত নত মুখ একটুখানি তুলে বললেন, “মা আমার ফিরে এল! চলো চলো, উপরে চলো।”
“ও শৈল, শৈল! দেখে যা, কে এসেছে।”
শৈলজা তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। কমলা তার পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করল। শৈল তাড়াতাড়ি তাকে বুকে চেপে ধরে তার কপাল চুম্বন করল। চোখের জলে দুই গাল ভাসিয়ে দিয়ে বলল, “মা গো মা! আমাদের এমন করেও কাঁদিয়ে যেতে হয়!”
খুড়োমশায় বললেন, “ও-সব কথা থাকুক শৈল, এখন উঁহার নাওয়া-খাওয়া সব ঠিক করে দাও।”
এমন সময় উমা ‘মাসি মাসি’ করে দুই হাত তুলে ছুটে বেরিয়ে এল। কমলা তৎক্ষণাৎ তাকে কোলে তুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরে চুম খেতে খেতে অস্থির করে দিল।
শৈলজা কমলার রুক্ষ চুল ও মলিন বস্ত্র দেখে থাকতে পারল না। তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে স্নান করাল, নিজের ভালো কাপড় একখানি বের করে তাকে পরিয়ে দিল। বলল, “কাল রাতে বুঝি ভালো করে ঘুম হয়নি। চোখ বসে গেছে যে। ততক্ষণ তুই বিছানায় একটু গড়িয়ে নে। আমি রান্না সেরে আসছি।”
কমলা বলল, “না দিদি, তোমার সঙ্গে, চলো, আমিও রান্নাঘরে যাই।”
দুই সখীতে একত্রে রাঁধতে গেল।
চক্রবর্তী-খুড়োমশায় অক্ষয়ের পরামর্শে যখন কাশীতে আসার জন্য প্রস্তুত হলেন শৈলজা ধরে পড়ল, “বাবা, আমিও তোমাদের সঙ্গে কাশী যাব।”
খুড়োমশায় বললেন, “বিপিনের তো এখন ছুটি নেই।”
শৈল বলল, “তা হোক, আমি একলাই যাব। মা আছেন, উঁহার অসুবিধা হবে না।”
স্বামীর সঙ্গে এরকম বিচ্ছেদের প্রস্তাব শৈল আগে কখনো করে নি।
খুড়োমশায়কে রাজি হতে হল। গাজিপুর থেকে যাত্রা করলেন। কাশী স্টেশনে নেমে দেখেন, উমেশও গাড়ি থেকে নামছে।—”আরে তুই এলি কেন রে!” সবাই যে কারণে এসেছেন তাঁরও সেই একই কারণ। কিন্তু উমেশ আজকাল খুড়োমশায়ের ঘরের কাজে নিযুক্ত হয়েছে; সে এরকম হঠাৎ চলে এলে গৃহিণী খুব রাগ করবেন জেনে সবাই মিলে অনেক চেষ্টা করে উমেশকে গাজিপুরে ফিরিয়ে পাঠান। তারপর কী ঘটেছে তা সবাই জানেন। সে গাজিপুরে কোনোমতেই টিকতে পারল না। গৃহিণী তাকে বাজার করতে পাঠিয়েছিলেন, সেই বাজারের পয়সা নিয়ে সে একেবারে গঙ্গা পার হয়ে স্টেশনে এসে উপস্থিত। চক্রবর্তী-গৃহিণী সেদিন এই ছোকরাটির জন্য বৃথা অপেক্ষা করেছিলেন।
দিনের মধ্যে অক্ষয় এক সময় চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। তিনি তাকে কমলার ফিরে আসা সম্বন্ধে কোনো কথাই বললেন না। রমেশের প্রতি অক্ষয়ের যে বিশেষ বন্ধুভাব নেই, তা খুড়োমশায় বুঝতে পেরেছেন।
কমলা কেন চলে গিয়েছিল, কোথায় চলে গিয়েছিল, এ সম্বন্ধে বাড়ির কেউ কোনো প্রশ্নই করল না— কমলা যেন ইঁহাদের সঙ্গেই কাশী বেড়াতে এসেছে, এমনিভাবে দিন কেটে গেল। উমির দাই লছমনিয়া স্নেহমিশ্রিত ভর্ৎসনার ছলে কিছু বলতে গিয়েছিল, খুড়োমশায় তৎক্ষণাৎ তাকে আড়ালে ডেকে শাসন করে দিয়েছিলেন।
রাতে শৈলজা কমলাকে নিজের বিছানায় নিয়ে শুইল। তার গলা জড়িয়ে ধরে তাকে বুকে টেনে নিল, এবং ডান হাত দিয়ে তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। এই কোমল হাতের স্পর্শ নীরব প্রশ্নের মতো কমলাকে তার গোপন বেদনার কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল।
কমলা বলল, “দিদি, তোমরা কী মনে করেছিলে? আমার ওপর রাগ করনি?”
শৈল বলল, “আমাদের কি বুদ্ধি কিছু নেই? আমরা কি এটা বুঝি নি, সংসারে তোর যদি কোনো পথ থাকত তবে তুই এই ভয়ানক পথ নিতিস না। আমরা কেবল এই বলে কেঁদেছি, ভগবান তোকে কেন এমন সংকটে ফেললেন। যে লোক কোনো অপরাধ করতে জানে না, সেও দণ্ড পায়!”
কমলা বলল, “দিদি, আমার সব কথা তুমি শুনবে?”
শৈল মিষ্টি স্বরে বলল, “শুনব না তো কি বোন?”
কমলা। তখন যে তোমাকে কেন বলতে পারি নি, তা জানি না। তখন আমার কোনো কথা ভেবে দেখবার সময় ছিল না। হঠাৎ মাথায় এমন বজ্রাঘাত হয়েছিল যে, লজ্জায় তোমার কাছে মুখ দেখাতে পারতেছিলাম না। সংসারে আমার মা-বোন কেউ নেই, দিদি, তুমি আমার মা বোন দু’ই— তাই তোমার কাছে সব কথা বলছি, নইলে আমার যে কথা তা কারো কাছে বলবার নয়।
কমলা আর শুয়ে থাকতে পারল না, উঠে বসল। শৈলও উঠে তার সামনে বসল। সেই অন্ধকার বিছানার মধ্যে বসে কমলা বিয়ে থেকে শুরু করে তার জীবনের কাহিনি বলতে লাগল।
কমলা যখন বলল, বিয়ের আগে বা বিয়ের রাতে সে তার স্বামীকে দেখে নি তখন শৈল বলল, “তোর মতো বোকা মেয়ে তো আমি দেখি নি। তোর চেয়ে কম বয়সে আমার বিয়ে হয়েছিল— তুই কি মনে করিস, লজ্জায় আমি আমার বরকে কোনো সুযোগে দেখে নিই নি!”
কমলা বলল, “লজ্জা নয় দিদি! আমার বিয়ের বয়স প্রায় পার হয়ে গিয়েছিল। এমন সময়ে হঠাৎ যখন আমার বিয়ের কথা স্থির হয়ে গেল, তখন আমার সব সঙ্গিনীরা আমাকে খুবই খেপাতে শুরু করেছিল। বেশি বয়সে বরকে পেয়ে আমি যে সাত রাজার ধন মানিক পাইনি, এটা দেখাবার জন্য আমি তাঁর দিকে তাকানো পর্যন্ত করি নি। এমনকি, তাঁর জন্য কিছু আগ্রহ মনের মধ্যে অনুভব করা আমি নিতান্ত লজ্জার বিষয়, অগৌরবের বিষয় বলে মনে করেছিলাম। আজ তারই শোধ দিচ্ছি।”
এই বলে কমলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শুরু করল, “বিয়ের পর নৌকাডুবি হয়ে আমরা কী করে রক্ষা পেলাম, সে কথা তো তোমাকে আগেই বলেছি। কিন্তু যখন বলেছিলাম তখনো জানতাম না যে, মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়ে যাঁর হাতে পড়লাম, যাঁকে স্বামী বলে জানলাম, তিনি আমার স্বামী নন।”
শৈলজা চমকে উঠল; তাড়াতাড়ি কমলার কাছে এসে তার গলা ধরে বলল, “হায় রে পোড়া কপাল— ও, তাই বটে। এতক্ষণে সব কথা বুঝলাম। এমন সর্বনাশও ঘটে!”
কমলা বলল, “বল দেখি দিদি, যখন মরলেই শেষ হয়ে যেত তখন বিধাতা এমন বিপদ ঘটালেন কেন?”
শৈলজা জিজ্ঞেস করল, “রমেশবাবুও কিছুই জানতে পারেন নি?”
কমলা বলল, “বিয়ের কিছুকাল পরে তিনি একদিন আমাকে সুশীলা বলে ডাকছিলেন, আমি তাঁকে বললাম, ‘আমার নাম কমলা, তবু তোমরা সবাই আমাকে সুশীলা বলে ডাক কেন?’ আমি এখন বুঝতে পারছি, সেইদিন তাঁর ভুল ভেঙেছে। কিন্তু দিদি, সে-সব দিনের কথা মনে করতেও আমার মাথা হেঁট হয়ে যায়।” এই বলে কমলা চুপ করে রইল।
শৈলজা একটু একটু করে কথায় কথায় সব বৃত্তান্ত আগাগোড়া বের করে নিল। সব কথা শোনা হলে সে বলল, “বোন, তোর দুঃখের কপাল, কিন্তু আমি এই কথা ভাবছি, ভাগ্যে তুই রমেশবাবুর হাতে পড়েছিলি। যাই বলিস, বেচারা রমেশবাবুর কথা মনে করলে খুব দুঃখ হয়। আজ রাত অনেক হল, কমল, তুই আজ ঘুমো। ক’দিন রাত জেগে কেঁদে মুখ কালি হয়ে গেছে। এখন কী করতে হবে, কাল সব ঠিক করা যাবে।”
রমেশের লেখা সেই চিঠি কমলার কাছে ছিল। পরদিন সেই চিঠিখানি নিয়ে শৈলজা তার বাবাকে নিভৃত ঘরে ডেকে পাঠাল এবং চিঠি তাঁর হাতে দিল। খুড়োমশায় চশমা চোখে তুলে খুব ধীরে ধীরে পড়লেন; তারপর চিঠি মুড়ে, চশমা খুলে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, “তাই তো, এখন কী কর্তব্য?”
শৈল বলল, “বাবা, উমির কয়দিন থেকে সর্দিকাশি করছে, একবার নলিনাক্ষ ডাক্তারকে ডেকে আনাও-না। কাশীতে তাঁর আর তাঁর মার তো খুব নাম শোনা যায়। একবার তাঁকে দেখিই-না।”
রোগীকে দেখার জন্য ডাক্তার এল এবং ডাক্তারকে দেখার জন্য শৈল ব্যস্ত হয়ে উঠল। বলল, “কমল, আয়, শীঘ্র আয়।”
নবীনকালীর বাড়িতে যে কমলা নলিনাক্ষকে দেখার ব্যাকুলতায় প্রায় আত্মবিস্মৃত হয়ে উঠেছিল, সেই কমলা আজ লজ্জায় উঠতে চায় না।
শৈল বলল, “দেখ পোড়ারমুখী, আমি তোকে বেশিক্ষণ সাধব না, তা আমি বলে রাখছি— আমার সময় নেই— উমির ব্যামো কেবল নামমাত্র, ডাক্তার বেশিক্ষণ থাকবে না— তোকে সাধাসাধি করতে গিয়ে মাঝে থেকে আমার দেখা হবে না।”
এই বলে কমলাকে জোর করে টেনে নিয়ে শৈলজা দরজার আড়ালে এসে দাঁড়াল। নলিনাক্ষ উমার বুক-পিঠ ভালো করে পরীক্ষা করে ওষুধ লিখে দিয়ে চলে গেল।
শৈল কমলাকে বলল, “কমল, বিধাতা তোকে যতই দুঃখ দিন, তোর ভাগ্য ভালো। এখন দুই-একদিন, বোন তোকে একটু ধৈর্য ধরে থাকতে হবে— আমরা একটা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ইতিমধ্যে উমির জন্য ঘন ঘন ডাক্তারের প্রয়োজন হবে, অতএব নিতান্ত তোকে বঞ্চিত হতে হবে না।”
খুড়োমশায় একদিন এমন সময় বেছে ডাক্তার ডাকতে গেলেন যখন নলিনাক্ষ বাড়িতে থাকে না। চাকর বলল, “ডাক্তারবাবু নেই।”
খুড়োমশায় বললেন, “মা থাকেন তো আছেন, তাঁকে একবার খবর দাও। বলো একটি বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চায়।”
উপরে ডাক পড়ল। খুড়োমশায় গিয়ে বললেন, “মা আপনার নাম কাশীতে বিখ্যাত। তাই আপনাকে দেখে পুণ্যসঞ্চয় করতে এলাম। আমার আর-কোনো কামনা নেই। আমার একটি নাতনির অসুখ, আপনার ছেলেকে ডাকতে এসেছিলাম, তিনি বাড়ি নেই ; তাই মনে করলাম শুধু-শুধু ফিরব না, একবার আপনাকে দর্শন করে যাব।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “নলিন এখনি আসবে, আপনি ততক্ষণ একটু বসুন। বেলা নিতান্ত কম হয়নি, আপনার জন্য কিছু জলখাবার আনিয়ে দিই।”
খুড়োমশায় বললেন, “আমি জানতাম, আপনি আমাকে না খাওয়িয়ে ছাড়বেন না— আমার যে ভোজনে বেশ একটুখানি শখ আছে তা আমাকে দেখলেই লোক টের পায়, এবং সবাই এ বিষয়ে আমাকে একটু দয়াও করে।”
ক্ষেমংকরী খুড়োমশায়কে জল খাওয়িয়ে খুব খুশি হলেন। বললেন, “কাল আমার এখানে আপনার মধ্যাহ্নভোজনের নিমন্ত্রণ রইল; আজ প্রস্তুত ছিলাম না, আপনাকে ভালো করে খাওয়াতে পারলাম না।”
খুড়োমশায় বললেন, “যখনই প্রস্তুত হবেন এই ব্রাহ্মণকে স্মরণ করবেন। আপনাদের বাড়ি থেকে আমি বেশি দূরে থাকি না। বলেন তো আপনার চাকরটাকে নিয়ে আমার বাড়ি দেখিয়ে আসব।”
এমনি করে খুড়োমশায় দুই-চার দিনের যাতায়াতেই নলিনাক্ষের বাড়িতে বেশ একটু জমিয়ে নিলেন।
ক্ষেমংকরী নলিনাক্ষকে ডেকে বললেন, “ও নলিন, তুই চক্রবর্তীমশায়ের কাছ থেকে ফিজ নিস নে যেন।”
খুড়োমশায় হেসে বললেন, “মাতৃ-আজ্ঞা উনি পাবার আগ থেকেই পালন করে আসছেন, আমার কাছ থেকে উনি কিছুই নেন নি। যাঁরা দাতা তাঁরা গরিবকে দেখলেই চিনতে পারেন।”
দিন-দুয়েক বাবায় ও মেয়েতে পরামর্শ চলল। তারপর একদিন সকালে খুড়োমশায় কমলাকে বলল, “চলো মা, আমরা দশাশ্বমেধে স্নান করতে যাই।”
কমলা শৈলকে বলল, “দিদি, তুমিও চলো না।”
শৈল বলল, “না ভাই, উমির শরীর তেমন ভালো নেই।”
খুড়োমশায় যে পথ দিয়ে স্নানের ঘাটে গেলেন স্নান শেষে সে পথ দিয়ে না ফিরে অন্য এক রাস্তায় চললেন। কিছু দূর গিয়েই দেখলেন, একটি প্রবীণা স্নান সেরে পট্টবস্ত্র পরে ঘটিতে গঙ্গাজল নিয়ে ধীরে ধীরে আসছেন।
কমলাকে সামনে এনে খুড়োমশায় বললেন, “মা, ইঁহাকে প্রণাম করো, ইনি ডাক্তারবাবুর মা।”
কমলা শুনে চমকে উঠে, তৎক্ষণাৎ ক্ষেমংকরীকে প্রণাম করে তাঁর পায়ের ধুলো নিল।
ক্ষেমংকরী বললেন, “তুমি কে গা! দেখি দেখি, কী রূপ! যেন লক্ষ্মীটির প্রতিমা!”
বলে কমলার ঘোমটা সরিয়ে তার নতনেত্র মুখখানি ভালো করে দেখলেন। বললেন, “তোমার নাম কী বাছা?”
কমলা উত্তর করার আগেই খুড়োমশায় বললেন, “ইঁহার নাম হরিদাসী। ইনি আমার দূরসম্পর্কের ভাইঝি। ইহার মা-বাপ কেউ নেই, আমার উপরেই নির্ভর।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “আসুন না চক্রবর্তীমশায়, আমার বাড়িতেই আসুন।”
বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ক্ষেমংকরী একবার নলিনাক্ষকে ডাকলেন। নলিনাক্ষ তখন বেরিয়ে গেছেন।
খুড়োমশায় আসন নিলেন, কমলা মেঝের ওপর বসল। খুড়োমশায় বললেন, “দেখুন, আমার এই ভাইঝির ভাগ্য খুব মন্দ। বিয়ের পরদিনই ইহার স্বামী সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে গেছেন, ইঁহার সঙ্গে আর দেখা-সাক্ষাৎ নেই। হরিদাসীর ইচ্ছা ধর্মকর্ম নিয়ে তীর্থবাস করে— ধর্ম ছাড়া উঁহার সান্ত্বনার সামগ্রী আর তো কিছু নেই। এখানে আমার বাড়ি নয়, আমার চাকরি আছে— উপার্জন করে আমাকে সংসার চালাতে হয়। আমি যে এখানে এসে ইঁহাকে নিয়ে থাকব, আমার এমন সুবিধা নেই। তাই আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। এটিকে আপনার মেয়ের মতো যদি কাছে রাখেন তবে আমি খুব নিশ্চিন্ত হই। যখনই অসুবিধা বোধ করবেন গাজিপুরে আমার কাছে পাঠিয়ে দিবেন। কিন্তু আমি বলছি দুদিন ইঁহাকে কাছে রাখলেই মেয়েটি কী রত্ন তা বুঝতে পারবেন, তখন মুহূর্তের জন্য ছাড়তে চাইবেন না।”
ক্ষেমংকরী খুশি হয়ে বললেন, “আহা, এ তো ভালো কথা। এমন মেয়েটিকে আপনি যে আমার কাছে রেখে যাচ্ছেন, এ তো আমার বড় লাভ। আমি কতদিন রাস্তা থেকে পরের মেয়েকে বাড়িতে এনে খাওয়াইয়েপরাইয়া আনন্দ করি, কিন্তু তাদের তো রাখতে পারি না। তা, হরিদাসী আমারই হল, আপনি ইহার জন্য কিছুমাত্র ভাববেন না। আমার ছেলের কথা অবশ্য আপনারা পাঁচজনের কাছে শুনে থাকবেন-নলিনাক্ষ— সে খুব ভালো ছেলে। সে ছাড়া বাড়িতে আর কেউ নেই।”
খুড়োমশায় বললেন, “নলিনাক্ষবাবুর নাম সবাই জানে। তিনি এখানে আপনার কাছে থাকেন জানিয়ে আমি আরো নিশ্চিন্ত। আমি শুনেছি, বিয়ের পর দুর্ঘটনায় তাঁর স্ত্রী জলে ডুবে মারা যাওয়াতে তিনি সেই থেকে একরকম ব্রহ্মচারীর মতোই আছেন।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “সে যা হয়েছিল হয়ে গেছে, ও কথা আর তুলবেন না— মনে করলেও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।”
খুড়োমশায় বললেন, “যদি অনুমতি করেন তবে মেয়েটিকে আপনার কাছে রেখে এখন বিদায় হই। মাঝে মাঝে এসে দেখে যাব। ইঁহার একটি বড়ো বোন আছে, সেও আপনাকে প্রণাম করতে আসবে।”
খুড়োমশায় চলে গেলে ক্ষেমংকরী কমলাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “এসো তো মা, দেখি। তোমার বয়স তো বেশি নয়। আহা, তোমাকে ফেলে যেতে পারে, জগতে এমন পাষাণও আছে! আমি আশীর্বাদ করছি, সে আবার ফিরে আসবে। বিধাতা এত রূপ কখনো বৃথা নষ্ট করবার জন্য গড়েন নি।”
বলে কমলার চিবুক স্পর্শ করে আঙুল দিয়ে চুম্বন গ্রহণ করলেন।
ক্ষেমংকরী বললেন, “এখানে তোমার সমবয়সী সঙ্গিনী কেউ নেই, একলা আমার কাছে থাকতে পারবে তো?”
কমলা তার দুই বড়ো বড়ো স্নিগ্ধ চোখে সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করে বলল, “পারব মা!”
ক্ষেমংকরী বললেন, “তোমার দিন কাটবে কী করে আমি তাই ভাবছি।”
কমলা বলল, “আমি তোমার কাজ করব।”
ক্ষেমংকরী। পোড়াকপাল! আমার আবার কাজ! সংসারে ঐ তো আমার একটিমাত্র ছেলে, সেও সন্ন্যাসীর মতো থাকে— কখনো যদি বলত ‘মা, এইটে আমার দরকার আছে, আমি এইটে খেতে চাই, আমি এইটে ভালোবাসি’, তবে আমি কত খুশি হতাম— তাও কখনো বলে না। রোজগার ঢের করে, হাতে কিছুই রাখে না ; কত সৎকাজে যে কত দিকে খরচ করে তা কাকেও জানাতেও দেয় না। দেখো বাছা, আমার কাছে যখন তোমাকে চব্বিশ ঘণ্টা থাকতে হবে তখন এ কথা আগে থেকেই বলে রাখছি, আমার মুখে আমার ছেলের গুণগান বার বার শুনে তোমার বিরক্ত ধরবে, কিন্তু ঐটে তোমাকে সহ্য করে যেতে হবে।
কমলা পুলকিতচিত্তে চোখ নিচু করল।
ক্ষেমংকরী বললেন, “আমি তোমাকে কী কাজ দেব, তাই ভাবছি। সেলাই করতে জান।”
কমলা বলল, “ভালো জানি না মা!”
ক্ষেমংকরী বললেন, “আচ্ছা, আমি তোমাকে সেলাই শিখিয়ে দেব।”
ক্ষেমংকরী জিজ্ঞেস করলেন, “পড়তে জান তো?”
কমলা বলল, “হ্যাঁ, জানি।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “সে হল ভালো। চোখে তো আর চশমা না হলে দেখতে পাই না, তুমি আমাকে পড়ে শোনাতে পারবে।”
কমলা বলল, “আমি রাঁধাবাড়া ঘরকন্নার কাজ সব শিখেছি।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “অমন অন্নপূর্ণার মতো চেহারা, তুমি যদি রাঁধাবাড়ার কাজ না জানিবে তো কে জানিবে। আজ পর্যন্ত নলিনকে আমি নিজে রাঁধে খাওয়াইয়েছি— আমার অসুখ হলে বরং নিজে রাঁধে খায়, তবু আর কারো হাতে খায় না। এবার থেকে তোমার কল্যাণে তার নিজে রাঁধা খাওয়া আমি ঘোচাব। আর, অক্ষম হয়ে পড়লে আমাকেও যদি চারটিখানি হবিষ্যান্ন রাঁধে খাওয়াও তো আমার তাতে অনিচ্ছা হবে না। চলো মা, তোমাকে আমার ভাঁড়ার-ঘর রান্নাঘর সব দেখিয়ে আনি।”
এই বলে ক্ষেমংকরী তাঁর ছোটো ঘরকন্নার সব নেপথ্যগৃহ কমলাকে দেখালেন। কমলা ইতিমধ্যে একটা সুযোগ বুঝে আস্তে আস্তে আপনার দরখাস্ত জারি করল। বলল, “মা, আমাকে আজ রাঁধতে দাও না।”
ক্ষেমংকরী একটুখানি হাসলেন। বললেন, “গৃহিণীর রাজত্ব ভাঁড়ারে আর রান্নাঘরে— জীবনে অনেক জিনিস ছাড়তে হয়েছে, তবু ওটুকু সঙ্গে সঙ্গে লাগিয়েই আছে। তা মা, আজকের মতো তুমিই রাঁধো— দুই-চারিদিন যাক, ক্রমে সব ভার আপনিই তোমার হাতে পড়বে, আমিও ভগবানে মন দেবার সময় পাব। বন্ধন একেবারেই তো কাটে না— এখনো দুই-চারিদিন মন চঞ্চল হয়ে থাকবে, ভাঁড়ার ঘরের সিংহাসনটি কম নয়।”
এই বলে ক্ষেমংকরী, কী রাঁধতে হবে, কি করতে হবে, কমলাকে সব উপদেশ দিয়ে পূজাগৃহে চলে গেলেন। ক্ষেমংকরীর কাছে আজ কমলার ঘরকন্নার পরীক্ষা শুরু হল।
কমলা তার স্বাভাবিক তৎপরতার সঙ্গে রান্নার সব আয়োজন প্রস্তুত করে, কোমরে আঁচল জড়িয়ে, মাথায় এলোচুল ঝুঁটি করে নিয়ে রাঁধতে শুরু করল।
নলিনাক্ষ বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরলেই প্রথমে তার মাকে দেখতে যেত। তার মায়ের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে চিন্তা তাকে কখনোই ছাড়ত না। আজ বাড়িতে ঢোকামাত্র রান্নাঘরের শব্দ এবং গন্ধ তাকে আক্রমণ করল। মা এখন রান্নায় প্রবৃত্ত আছেন মনে করে নলিনাক্ষ রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে উপস্থিত হল।
পায়ের শব্দে চমকে কমলা পিছন ফিরে চাইতেই একেবারে নলিনাক্ষের সঙ্গে তার চোখে চোখে সাক্ষাৎ হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি হাতাটা রেখে ঘোমটা টেনে দেবার বৃথা চেষ্টা করল— কোমরে আঁচল জড়ানো ছিল— টানাটানি করে ঘোমটা যখন মাথার কিনারায় উঠল বিস্মিত নলিনাক্ষ তখন সেখান থেকে চলে গেছে। তারপর কমলা যখন হাতা তুলে নিল তখন তার হাত কাঁপছে।
পূজা সকাল-সকাল সেরে ক্ষেমংকরী যখন রান্নাঘরে গেলেন, দেখলেন, রান্না শেষ হয়ে গেছে। ঘর ধুয়ে কমলা পরিষ্কার করে রেখেছে; কোথাও পোড়াকাঠ বা তরকারির খোসা বা কোনোপ্রকার অপিরচ্ছন্নতা নেই। দেখে ক্ষেমংকরী মনে মনে খুশি হলেন; বললেন, “মা, তুমি ব্রাহ্মণের মেয়ে বটে।”
নলিনাক্ষ আহারে বসলে ক্ষেমংকরী তার সামনে বসলেন; আর-একটি সংকুচিত প্রাণী কান পেতে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল, উঁকি মারতে সাহস করতেছিল না— ভয়ে মরে যাচ্ছিল, পাছে তার রান্না খারাপ হয়ে থাকে।
ক্ষেমংকরী জিজ্ঞেস করলেন, “নলিন, আজ রান্নাটা কেমন হয়েছে?”
নলিনাক্ষ খাওয়ার জিনিস সম্বন্ধে সমঝদার ছিল না, তাই ক্ষেমংকরী এরকম অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন কখনো তাকে করতেন না; আজ বিশেষ কৌতূহলবশতই জিজ্ঞেস করলেন।
নলিনাক্ষ যে আজকের রান্নাঘরের নতুন রহস্যের পরিচয় পেয়েছে তা তার মা জানতেন না। ইদানীং মায়ের শরীর খারাপ হওয়াতে নলিনাক্ষ রাঁধবার জন্য লোক নিযুক্ত করতে মাকে অনেক পীড়াপীড়ি করেছে, কিন্তু কিছুতেই তাঁকে রাজি করাতে পারে নি। আজ নতুন লোককে রান্নায় নিযুক্ত দেখে সে মনে মনে খুশি হয়েছে। রান্না কিরূপ হয়েছে তা সে বিশেষ মনোযোগ করে নি, কিন্তু উৎসাহের সঙ্গে বলল, “রান্না চমৎকার হয়েছে মা!”
আড়াল থেকে এই উৎসাহবাক্য শুনে কমলা আর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে দ্রুতপদে পাশের একটা ঘরের মধ্যে ঢুকে আপনার চঞ্চল বক্ষকে দুই বাহু দিয়ে চেপে ধরে রাখল।
আহারান্তে নলিনাক্ষ আপনার মনের মধ্যে কী-একটা অস্পষ্টতাকে স্পষ্ট করবার চেষ্টা করতে করতে প্রতিদিনের অভ্যাস অনুসারে নিভৃত পড়াশোনায় চলে গেল।
বিকালে ক্ষেমংকরী কমলাকে নিয়ে নিজে তার চুল বাঁধিয়ে সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিলেন; তার মুখ একবার এ পাশে, একবার ও পাশে ফিরিয়ে ভালো করে দেখলেন— কমলা লজ্জায় চোখ নিচু করে বসে রইল। ক্ষেমংকরী মনে মনে বললেন, ‘আহা, আমি যদি এইরকমের একটি বউ পেতাম!’
সেই রাতেই ক্ষেমংকরীর আবার জ্বর এল। নলিনাক্ষ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। বলল, “মা, তোমাকে আমি কিছুদিন কাশী থেকে অন্য কোথাও নিয়ে যাব। এখানে তোমার শরীর ভালো থাকছে না।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “সেটি হবে না বাছা! দু-চারদিন বাঁচিয়ে রাখবার আশায় আমাকে যে কাশী ছেড়ে অন্য কোথাও নিয়ে মারবি, সেটি হবে না। ও কি মা, তুমি যে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছ! যাও যাও, শুতে যাও। সমস্ত রাত অমন জেগে কাটালে চলবে না। আমি যে-কয়দিন ব্যামোতে আছি তোমাকেই তো সব দেখতে শুনতে হবে। রাত জাগলে পারবে কেন? যা তো নলিন, একবার ও ঘরে যা তো।”
নলিনাক্ষ পাশের ঘরে যেতেই কমলা ক্ষেমংকরীর পায়ের কাছে বসে তাঁর পায়ে হাত বুলাতে লাগল। ক্ষেমংকরী বললেন, “আর-জন্মে নিশ্চয়ই তুমি আমার মা ছিলে মা! নইলে কোথাও কিছু নেই তোমাকে এমন করে পাব কেন? দেখো, আমার একটা অভ্যাস আছে, আমি বাজে কোনো লোকের সেবা সহ্য করতে পারি না, কিন্তু তুমি আমার গায়ে হাত দিলে আমার গা যেন জুড়িয়ে যায়। আশ্চর্য এই যে, মনে হচ্ছে, তোমাকে আমি যেন কতকাল ধরে জানি। তোমাকে তো একটুও পর মনে হয় না। তা, শোনো মা, তুমি নিশ্চিন্তমনে ঘুমাতে যাও। পাশের ঘরে নলিন রইল— মার সেবা সে আর কারো হাতে ছেড়ে দিতে পারবে না— তা, হাজার বারণ করি আর যাই করি— ওর সঙ্গে পারবে কে বলো। কিন্তু ওর একটি গুণ আছে, রাত জাগুক আর যাই করুক, ওর মুখ দেখে কিছু বোঝা যাবে না— তার কারণ, ও কখনো কিছুতে অস্থির হয় না। আমার ঠিক তার উলটা। মা, তুমি বোধ করি মনে মনে হাসছ। ভাবছ, নলিনের কথা শুরু হল, এবারে আর কথা থামবে না। তা মা, এক ছেলে থাকলে ঐরকমই হয়। আর নলিনের মতো ছেলেই বা কজন মায়ের হয়? সত্য বলছি, আমি এক-একবার ভাবি— নলিন তো আমার বাপ, ও আমার জন্যে যতটা করেছে আমি কি উহার জন্যে ততটা করতে পারি। ঐ দেখো, আবার নলিনের কথা! কিন্তু আর নয়, যাও মা, তুমি শুতে যাও। না না, সে কিছুতেই হতে পারবে না, তুমি যাও— তুমি থাকলে আমার ঘুম আসবে না। বুড়োমানুষ, লোক কাছে থাকলেই কেবল বকতে ইচ্ছা করে।”
পরদিন কমলাই ঘরকন্নার সব ভার গ্রহণ করল। নলিনাক্ষ পূর্ব দিকের বারান্দার এক অংশ ঘিরে নিয়ে মার্বেল দিয়ে বাঁধিয়ে একটি ছোটো ঘর করে নিয়েছিল, এটাই তার উপাসনাগৃহ ছিল, এবং মধ্যাহ্নে এইখানেই আসনের ওপর বসে পড়াশোনা করত। সেদিন ভোরে সে ঘরে নলিনাক্ষ ঢুকেই দেখল, ঘরটি ধোয়া, মোছা, পরিষ্কার; ধুনা জ্বালাবার জন্য একটি পিতলের ধুনুচি ছিল, সেটি আজ সোনার মতো ঝকঝক করছে। শেল্ফের ওপর তার কয়েকখানি বই ও পুঁথি সুসজ্জিত করে সাজানো হয়েছে। এই ঘরটির যত্নমোছা নির্মলতার ওপর মুক্তদরজা দিয়ে প্রভাতরোদের উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়েছে, দেখে স্নান থেকে সদ্যঃপ্রত্যাগত নলিনাক্ষের মনে বিশেষ একটি তৃপ্তির সঞ্চার হল।
কমলা প্রভাতে ঘটিতে গঙ্গাজল নিয়ে ক্ষেমংকরীর বিছানার পাশে এসে উপস্থিত হল। তিনি তার স্নাতমূর্তি দেখে বললেন, “একি মা, তুমি একলাই ঘাটে গিয়েছিলে? আমি আজ ভোর থেকে ভাবছিলাম, আমার অসুখ, তুমি কার সঙ্গে স্নানে যাবে। কিন্তু তোমার অল্প বয়স, এমন করে একলা—”
কমলা বলল, “মা, আমার বাপের বাড়ির একটা চাকর থাকতে পারে নি, আমাকে দেখতে কাল রাতেই এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। তাকে সঙ্গে নিয়েছিলাম।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “আহা, তোমার খুড়িমা বোধ হয় অস্থির হয়ে উঠেছেন, চাকরটাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তা, বেশ হয়েছে— সে তোমার কাছেই থাকুক না, তোমার কাজে-কর্মে সাহায্য করবে। কোথায় সে, তাকে ডাকো না।”
কমলা উমেশকে নিয়ে হাজির করল। উমেশ গড় হয়ে ক্ষেমংকরীকে প্রণাম করতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোর নাম কী রে?”
সে বলল, “আমার নাম উমেশ।”
বলে অকারণ-বিকশিত হাসিতে তার মুখ ভরে গেল।
ক্ষেমংকরী হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “উমেশ, তোর এই বাহার কাপড়খানা তোকে কে দিল রে?”
উমেশ কমলাকে দেখিয়ে বলল, “মা দিয়েছেন।”
ক্ষেমংকরী কমলার দিকে চেয়ে পরিহাস করে বললেন, “আমি বলি, উমেশ বুঝি ওর শাশুড়ির কাছ থেকে জামাইষষ্ঠী পেয়েছে।”
ক্ষেমংকরীর স্নেহ লাভ করে উমেশ এখানেই রয়ে গেল।
উমেশকে সহায় করে কমলা দিনের বেলাকার সব কাজকর্ম শেষ করে ফেলল। নিজের হাতে নলিনাক্ষের শোবার ঘর ঝাঁট দিয়ে, তার বিছানা রোদে দিয়ে, তুলে, সব পরিষ্কার করে রাখল। নলিনাক্ষের ময়লা ছাড়া-ধুতি ঘরের এক কোণে পড়ে ছিল। কমলা সেটি ধুয়ে, শুকিয়ে ভাঁজ করে আলনার ওপর ঝুলিয়ে রাখল। ঘরের যে-সব জিনিস কিছু অপরিষ্কার ছিল না তাও সে মুছবার ছলে বার বার নাড়াচাড়া করে নিল। বিছানার শিয়রের কাছে দেয়ালে একটা দেওয়াল-আলমারি ছিল; সেটা খুলে দেখল তার মধ্যে আর-কিছুই নেই, কেবল নীচের তাকে নলিনাক্ষের এক জোড়া খড়ম আছে। তাড়াতাড়ি সেই খড়ম জোড়াটি তুলে নিয়ে কমলা মাথায় ঠেকাল, এবং ছোটো শিশুটির মতো বুকে ধরে আঁচল দিয়ে বার বার তার ধুলো মুছিয়ে দিল।
বিকালে কমলা ক্ষেমংকরীর পায়ের কাছে বসে তাঁর পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, এমন সময় হেমনলিনী একটি ফুলের সাজি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল এবং ক্ষেমংকরীকে প্রণাম করল।
ক্ষেমংকরী উঠে বসলেন, বলল, “এসো এসো, হেম, এসো, বোসো। অন্নদাবাবু ভালো আছেন?”
হেমনলিনী বলল, “তাঁহার শরীর অসুস্থ ছিল বলে কাল আসতে পারি নি, আজ তিনি ভালো আছেন।”
কমলাকে দেখিয়ে ক্ষেমংকরী বললেন, “এই দেখো বাছা, শৈশবে আমার মা মারা গেছেন; তিনি আবার জন্ম নিয়ে এতদিন পরে কাল পথের মধ্যে হঠাৎ আমাকে দেখা দিয়েছেন। আমার মা’র নাম ছিল হরিভাবিনী, এবারে হরিদাসী নাম নিয়েছেন। কিন্তু হেম, এমন লক্ষ্মীর মূর্তি আর কোথাও দেখেছ? বলো তো।”
কমলা লজ্জায় মুখ নিচু করল। হেমনলিনীর সঙ্গে আস্তে আস্তে তার পরিচয় হয়ে গেল।
হেমনলিনী ক্ষেমংকরীকে জিজ্ঞেস করল, ‘মা, আপনার শরীর কেমন আছে?”
ক্ষেমংকরী বললেন, “দেখো, আমার যে বয়স হয়েছে এখন আমাকে আর শরীরের কথা জিজ্ঞেস করা চলে না। আমি যে এখনো আছি, এই ঢের। কিন্তু তাই বলে কালকে চিরদিন ফাঁকি দেওয়া তো চলবে না। তা, তুমি যখন কথাটা পাড়েছ ভালোই হয়েছে— তোমাকে কিছুদিন থেকে বলব বলব করছি, সুবিধা হচ্ছে না। কাল রাতে আবার যখন আমাকে জ্বরে ধরল তখন ঠিক করলাম, আর বিলম্ব করা ভালো হচ্ছে না। দেখো বাছা, ছেলেবয়সে আমাকে যদি কেউ বিয়ের কথা বলত তো লজ্জায় মরে যেতাম— কিন্তু তোমাদের তো সেরকম শিক্ষা নয়। তোমরা লেখাপড়া শিখেছ, বয়সও হয়েছে, তোমাদের কাছে এ-সব কথা স্পষ্ট করে বলা চলে। সেইজন্যই কথাটা পাড়ছি, তুমি আমার কাছে লজ্জা করিয়ো না। আচ্ছা, বলো তো বাছা, সেদিন তোমার বাবার কাছে যে প্রস্তাব করেছিলাম তিনি কি তোমাকে বলেন নি?”
হেমনলিনী নতমুখে বলল, “হ্যাঁ, বলেছিলেন।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “কিন্তু তুমি, বাছা, সে কথায় নিশ্চয়ই রাজি হও নি। যদি রাজি হতে তবে অন্নদাবাবু তখনি আমার কাছে ছুটে আসতেন। তুমি ভাবলে, আমার নলিন সন্ন্যাসী-মানুষ, দিবারাত্রি কী-সব যোগযাগ নিয়ে আছে, উহাকে আবার বিয়ে করা কেন? হোক আমার ছেলে তবু কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। উহাকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, উহার যেন কিছুতেই কোনোদিন আসক্তি জন্মবার সম্ভবনা নেই। কিন্তু সেটা তোমাদের ভুল। আমি উহাকে জন্মকাল থেকে জানি, আমার কথাটা বিশ্বাস করিয়ো। ও এত বেশি ভালোবাসতে পারে যে, সেই ভয়েই ও আপনাকে এত করে দমন করে রাখে। উহার এই সন্ন্যাসের খোলা ভেঙে যে উহার হৃদয় পাবে সে বড়ো মধুর জিনিসটি পাবে তা আমি বলে রাখছি। মা হেম, তুমি বালিকা নও, তুমি শিক্ষিত, তুমি আমার নলিনের কাছ থেকেই দীক্ষা নিয়েছ, তোমাকে নলিনের ঘরে প্রতিষ্ঠিত করে আমি যদি মরতে পারি তবে বড়ো নিশ্চিন্ত হয়ে মরতে পারব। নইলে, আমি নিশ্চয় জানি, আমি মরলে ও আর বিয়েই করবে না। তখন ওর কী দশা হবে ভেবে দেখো দেখি। একেবারে ভেসে বেড়াবে। যাই হোক, বলো তো বাছা, তুমি তো নলিনকে শ্রদ্ধা কর আমি জানি, তবে তোমার মনে আপত্তি উঠছে কেন?”
হেমনলিনী নতনেত্রে বলল, “মা, তুমি যদি আমাকে যোগ্য মনে কর তবে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
শুনে ক্ষেমংকরী হেমনলিনীকে কাছে টেনে নিয়ে তার মাথায় চুম্বন করলেন। এ সম্বন্ধে আর কোনো কথা বললেন না।
“হরিদাসী, এ ফুলগুলো”— বলতে বলতে পাশে চেয়ে দেখলেন, হরিদাসী নেই। সে নিঃশব্দপদে কখন উঠে গেছে।
পূর্বোক্ত আলোচনার পর ক্ষেমংকরীর কাছে হেমনলিনী সংকোচ বোধ করল, ক্ষেমংকরীও বাধো-বাধো করতে লাগল। তখন হেম বলল, “মা, আজ তবে সকাল-সকাল যাই। বাবার শরীর ভালো নেই।”
বলে ক্ষেমংকরীকে প্রণাম করল। ক্ষেমংকরী তার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “এসো মা, এসো।”
হেমনলিনী চলে গেলে ক্ষেমংকরী নলিনাক্ষকে ডেকে পাঠালেন; বললেন, “নলিন, আর আমি দেরি করতে পারব না।”
নলিনাক্ষ বলল, “ব্যাপারখানা কী?”
ক্ষেমংকরী বললেন, “আমি আজ হেমকে সব কথা খুলে বললাম ; সে তো রাজি হয়েছে, এখন তোমার কোনো ওজর আমি শুনতে চাই না। আমার শরীর তো দেখতেছিস। তোদের একটা স্থিতি না করে আমি কোনোমতেই সুস্থির হতে পারছি না। অর্ধেক রাতে ঘুম ভেঙে আমি ঐ কথাই ভাবি।”
নলিনাক্ষ বলল, “আচ্ছা মা, ভাবিয়ো না, তুমি ভালো করে ঘুমাও, তুমি যেমন ইচ্ছা কর তাহাই হবে।”
নলিনাক্ষ চলে গেলে ক্ষেমংকরী ডাকলেন, “হরিদাসী!”
কমলা পাশের ঘর থেকে চলে এল। তখন বিকেলের আলো ম্লান হয়ে ঘর প্রায় অন্ধকার হয়ে আসছে। হরিদাসীর মুখ ভালো করে দেখা গেল না। ক্ষেমংকরী বললেন, “বাছা, এই ফুলগুলোতে জল দিয়ে ঘরে সাজিয়ে রাখো।”
বলে বেছে একটি গোলাপ তুলে ফুলের সাজিটি কমলার দিকে এগিয়ে দিলেন।
কমলা তার মধ্যে কতকগুলি ফুল তুলে একটি থালায় সাজিয়ে নলিনাক্ষের উপাসনাগৃহের আসনের সামনে রাখল। আর-কতকগুলি একটি বাটিতে করে নলিনাক্ষের শোবার ঘরে টেবিলের ওপর রাখে দিল। বাকি কয়েকটি ফুল নিয়ে সেই দেয়ালের গায়ের আলমারিটা খুলে এবং সেই খড়মজোড়ার ওপর ফুলগুলি রেখে তার ওপর মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতেই তার চোখ দিয়ে আজ ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল। এই খড়ম ছাড়া জগতে তার আর-কিছুই নেই— পায়ের সেবার অধিকারও হারাতে বসেছে।
এমন সময় হঠাৎ ঘরে কে প্রবেশ করতেই কমলা ধড়ফড় করে উঠে পড়ল। তাড়াতাড়ি আলমারির দরজা বন্ধ করে দিয়ে দেখল, নলিনাক্ষ। কোনো দিকে কমলা পালাবার পথ পেল না— লজ্জায় কমলা সেই আসন্ন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিশে গেল না কেন।
নলিনাক্ষ ঘরের মধ্যে কমলাকে দেখে বাইরে চলে গেল। কমলাও আর বিলম্ব না করে দ্রুতপদে অন্য ঘরে চলে গেল। তখন নলিনাক্ষ পুনরায় ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। মেয়েটি আলমারি খুলে কী করছিল, তাকে দেখে তাড়াতাড়ি বন্ধ করলই বা কেন? কৌতূহলবশত নলিনাক্ষ আলমারি খুলে দেখল, তার খড়ম-জোড়ার ওপর কতকগুলি সদ্যসিক্ত ফুল রয়েছে। তখন সে আবার আলমারির দরজা বন্ধ করে শয়নঘরের জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। বাইরে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে শীতসূর্যাস্তের ক্ষণকালীন আভা মিলিয়ে আসতে অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে উঠল।