ক্ষেমংকরী কমলাকে গিয়ে বললেন, “মা, কাল হেমকে আর তার বাপকে দুপুর-বেলায় এখানে আহার করতে নিমন্ত্রণ করা গেছে। কী রকম আয়োজনটা করা যায় বলো দেখি। বেয়াইকে এমন করে খাওয়ানো দরকার যে, তিনি যেন নিশ্চিন্ত হতে পারেন যে এখানে তাঁর মেয়েটির খাওয়ার কষ্ট হবে না। কী বল মা? তা, তোমার যেরকম রান্নার হাত, অপযশ হবে না তা জানি। আমার ছেলে আজ পর্যন্ত কোনো রান্না খেয়ে কোনোদিন ভালোমন্দ কিছুই বলে নি, কাল তোমার রান্নার প্রশংসা তার মুখে ধরে না মা। কিন্তু তোমার মুখখানি আজ খুব শুকনো দেখাচ্ছে যে? শরীর কি ভালো নেই?”
মলিন মুখে একটুখানি হাসি এনে কমলা বলল, “ভালো আছি মা!”
ক্ষেমংকরী মাথা নাড়লেন, “না না, বোধ করি তোমার মন কেমন করছে। তা-তো করতেই পারে, সেজন্য লজ্জা কিসের। আমাকে পর ভাবিয়ো না মা! আমি তোমাকে নিজের মেয়ের মতোই দেখি, এখানে যদি তোমার কোনো অসুবিধা হয়, বা তুমি আপনার লোক কাকেও দেখতে চাও তো আমাকে না বললে চলবে কেন?”
কমলা ব্যগ্র হয়ে বলল, “না, মা, তোমার সেবা করতে পারলে আমি আর কিছুই চাই না।”
ক্ষেমংকরী সে কথায় কান না দিয়ে বললেন, “নাহয় কিছুদিনের জন্য তোমার খুড়োর বাড়িতে গিয়ে থাকো, তার পরে যখন ইচ্ছা হয় আবার আসবে।”
কমলা অস্থির হয়ে উঠল; বলল, “মা, আমি যতক্ষণ তোমার কাছে আছি সংসারে কারো জন্য ভাবি না। আমি যদি কখনো তোমার পায়ে অপরাধ করি আমাকে তুমি যেমন খুশি শাস্তি দিয়ো, কিন্তু একদিনের জন্যও দূরে পাঠিয়ো না।”
ক্ষেমংকরী কমলার ডান গালে ডান হাত বুলিয়ে বললেন, “তাই তো বলি মা, আর জন্মে তুমি আমার মা ছিলে। নইলে দেখবামাত্র এমন বন্ধন কী করে হয়। তা, যাও মা, সকাল-সকাল শুতে যাও। সমস্ত দিন তো এক দণ্ড বসে থাকতে জান না।”
কমলা তার শয়নঘরে গিয়ে, দরজা বন্ধ করে, দীপ নিভিয়ে, অন্ধকারে মাটির ওপর বসে রইল। অনেকক্ষণ বসে, অনেকক্ষণ ভেবে, এই কথা সে মনে বুঝল— ‘কপালের দোষে যার ওপর আমার অধিকার হারিয়েছি তাকে আমি আগলিয়ে বসে থাকব, এ কেমন করে হয়। সবই ছাড়বার জন্য মনকে প্রস্তুত করতে হবে; কেবল সেবা করার সুযোগটুকু, যেমন করে হোক, প্রাণপণে বাঁচিয়ে চলব। ভগবান করুন, সেটুকু যেন হাসিমুখে করতে পারি; তার বেশি আর-কিছুতেই যেন দৃষ্টি না দিই। অনেক দুঃখে যেটুকু পেয়েছি সেটুকুও যদি প্রসন্নমনে না নিতে পারি, যদি মুখ ভার করি, তবে সবসুদ্ধই হারাতে হবে।’
এই বুঝে একাগ্রমনে বার বার করে সে সংকল্প করতে লাগল, ‘আমি কাল থেকে যেন কোনো দুঃখকে মনে স্থান না দিই, যেন এক মুহূর্ত মুখ বিমর্ষ না করি, যা আশার অতীত, তার জন্য যেন কোনো কামনা মনের মধ্যে না থাকে। কেবল সেবা করব, যতদিন জীবন আছে কেবল সেবা করব, আর কিছু চাইব না— চাইব না— চাইব না।’
তারপর কমলা শুতে গেল। এপাশ-ওপাশ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল। রাতে দুই-তিন বার ঘুম ভেঙে গেল। ভেঙেবামাত্রই সে মন্ত্রের মতো আওড়াতে লাগল, ‘আমি কিছুই চাইব না, চাইব না, চাইব না।’ ভোরের বেলায় সে বিছানা থেকে উঠেই জোড়হাত করে বসল এবং সমস্ত চিত্ত প্রয়োগ করে বলল, ‘আমি আমরণকাল তোমার সেবা করব; আর-কিছু চাইব না, চাইব না, চাইব না।’
এই বলে তাড়াতাড়ি মুখ-হাত ধুয়ে, বাসি কাপড় ছেড়ে, নলিনাক্ষের সেই ছোটো উপাসনা-ঘরের মধ্যে গেল; নিজের আঁচলটি দিয়ে সব ঘর মুছে পরিষ্কার করল এবং যথাস্থানে আসনটি বিছিয়ে রাখে দ্রুতপদে গঙ্গাস্নান করতে গেল। আজকাল নলিনাক্ষের একান্ত অনুরোধে ক্ষেমংকরী সূর্যোদয়ের আগে স্নান করতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তাই উমেশকেই এই অসহ্য শীতের ভোরে কমলার সঙ্গে স্নানে যেতে হল।
স্নান থেকে ফিরে এসে কমলা ক্ষেমংকরীকে প্রফুল্লমুখে প্রণাম করল। তিনি তখন স্নানে বের হওয়ার উপক্রম করছিলেন। কমলাকে বললেন, “এত ভোরে কেন নাহতে গেলে? আমার সঙ্গে গেলেই তো হত।”
কমলা বলল, “আজ যে কাজ আছে মা! কাল সন্ধ্যাবেলায় যে তরকারি আনা হয়েছে তা কুটে রাখি; আর যা-কিছু বাজার করা বাকি আছে, উমেশ সকাল-সকাল সেরে আসুক।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “বেশ বুদ্ধি ঠাওরাইয়াছ মা। বেয়াই যেমনি আসবেন অমনি খাবার প্রস্তুত পাবেন।
এমন সময় নলিনাক্ষ বেরিয়ে আসবামাত্র কমলা ভিজা চুলের ওপর তাড়াতাড়ি ঘোমটা টেনে ভিতরে ঢুকে পড়ল। নলিনাক্ষ বলল, “মা, আজই তুমি স্নান করতে চললে? সবে কাল একটু ভালো ছিলে।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “নলিন, তোর ডাক্তারি রাখ। সকালবেলায় গঙ্গাস্নান না করলেও লোক অমর হয় না। তুই এখন বেরুচ্ছিস বুঝি? একটু সকাল-সকাল ফিরিস।”
নলিনাক্ষ জিজ্ঞেস করল, “কেন মা?”
ক্ষেমংকরী। কাল তোকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, আজ অন্নদাবাবু তোকে আশীর্বাদ করতে আসবেন।
নলিনাক্ষ। আশীর্বাদ করতে আসবেন? কেন, হঠাৎ আমার ওপর এত বিশেষভাবে প্রসন্ন হলেন যে? তাঁর সঙ্গে তো রোজই আমার দেখা হয়।
ক্ষেমংকরী। আমি যে কাল হেমনলিনীকে একজোড়া বালা দিয়ে আশীর্বাদ করে এসেছি, এখন অন্নদাবাবু তোকে না করলে চলবে কেন? যা হোক, ফিরতে দেরি করিস নে, তাঁরা এখানেই খাবেন।
এই বলে ক্ষেমংকরী স্নান করতে গেলেন। নলিনাক্ষ মাথা নিচু করে ভাবতে ভাবতে রাস্তা দিয়ে চলে গেল।
হেমনলিনী রমেশের কাছে থেকে দ্রুতবেগে পালিয়ে গিয়ে ঘরে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বিছানার ওপর বসে পড়ল। প্রথম উত্তেজনা শান্ত হবার পর একটা লজ্জা তাকে আচ্ছন্ন করে দিল। ‘কেন আমি রমেশবাবুর সঙ্গে সহজভাবে দেখা করতে পারলাম না? যা আশা করি না, তা-ই হঠাৎ কেন আমার মধ্য থেকে এমন অশোভনভাবে দেখা দেয়? বিশ্বাস নেই, কিছুই বিশ্বাস নেই। এমন করে টলমল করতে আর পারি না।’
এই বলে সে জোর করে উঠে পড়ে দরজা খুলে দিল, বেরিয়ে এল; মনে মনে বলল, ‘আমি পালাব না, আমি জয় করব।’ পুনরায় রমেশবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চলল। হঠাৎ কী মনে পড়ল। আবার সে ঘরের মধ্যে গেল। তোরঙ্গ খুলে তার মধ্য থেকে ক্ষেমংকরীর দেওয়া বালাজোড়া বের করে পরল, এবং অস্ত্র পরিয়ে যুদ্ধে যাবার মতো সে নিজেকে দৃঢ় করে মাথা তুলে বাগানের দিকে চলল।
অন্নদাবাবু এসে বললেন, “হেম, তুমি কোথায় চলেছ?”
হেমনলিনী বলল, “রমেশবাবু নাই? দাদা নাই?”
অন্নদা। না, তাঁরা চলে গেছেন।
আসন্ন আত্মপরীক্ষার সম্ভাবনা থেকে মুক্তি পেয়ে হেমনলিনী আরাম বোধ করল।
অন্নদাবাবু বললেন, “এখন তবে—”
হেমনলিনী বলল, “হ্যাঁ বাবা, আমি চললাম; আমার স্নান করে আসতে দেরি হবে না, তুমি গাড়ি ডাকতে বলে দাও।”
এইভাবে হেমনলিনী নিমন্ত্রণে যাবার জন্য হঠাৎ তার স্বভাববিরুদ্ধ খুব উৎসাহ প্রকাশ করল। এই উৎসাহের অতিশয্যে অন্নদাবাবু ভুললেন না, তাঁর মন আরো উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল।
হেমনলিনী তাড়াতাড়ি স্নান সেরে সেজেগুজে এসে বলল, ‘বাবা, গাড়ি এসেছে কি?”
অন্নদাবাবু বললেন, “না, এখনো আসে নি।”
ততক্ষণ হেমনলিনী বাগানের রাস্তায় পায়চারি করে বেড়াতে লাগল।
অন্নদাবাবু বারান্দায় বসে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন।
অন্নদাবাবু যখন নলিনাক্ষের বাড়ি গিয়ে পৌঁছলেন বেলা তখন সাড়ে দশটার বেশি হবে না। তখনো নলিনাক্ষ কাজ সেরে বাড়ি ফিরে আসে নি। কাজেই অন্নদাবাবুর অভ্যর্থনার ভার ক্ষেমংকরীকেই নিতে হল।
ক্ষেমংকরী অন্নদাবাবুর শরীর ও সংসারের নানা কথা নিয়ে প্রশ্ন ও আলোচনা উত্থাপিত করলেন; মাঝে মাঝে হেমনলিনীর মুখের দিকে তাঁর কটাক্ষ ধাবিত হল। সে মুখে কোনো উৎসাহের লক্ষণ নেই কেন? আসন্ন শুভঘটনার সম্ভাবনা সূর্যোদয়ের আগে অরুণরশ্মির মতো তার মুখে দীপ্তিবিকাশ করে নি তো! বরং হেমনলিনীর অন্যমনস্ক দৃষ্টির মধ্য থেকে একটা ভাবনার অন্ধকার যেন দেখা যাচ্ছিল।
অল্পেই ক্ষেমংকরীকে আঘাত করে। হেমনলিনীর এইরকম ম্লান ভাব লক্ষ্য করে তাঁর মন দমে গেল। ‘নলিনের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ যে-কোনো মেয়ের পক্ষেই সৌভাগ্যের বিষয়, কিন্তু এই শিক্ষামদমত্তা মেয়েটি আমার নলিনকে কি তাঁর যোগ্য বলেই মনে করছেন না? এত চিন্তা, এত দ্বিধাই বা কিসের জন্য? আমারই দোষ। বুড়ো হয়ে গেলাম, তবু ধৈর্য ধরতে পারলাম না। যেমন ইচ্ছা হল, অমনি আর সবুর সইল না। বড়ো বয়সের মেয়ের সঙ্গে নলিনের বিয়ে স্থির করলাম, অথচ তাকে ভালো করে চিনবার চেষ্টাও করলাম না। হায় হায়, চিনে দেখবার মতো সময় যে হাতে নেই, এখন সংসারের সব কাজ তাড়াতাড়ি সেরে যাবার জন্য তলব এসেছে।’
অন্নদাবাবুর সঙ্গে কথা কহতে কহতে ক্ষেমংকরীর মনের ভিতরে ভিতরে এই সব চিন্তা ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কথাবার্তা কহা তাঁর পক্ষে কষ্টকর হয়ে উঠল। তিনি অন্নদাবাবুকে বললেন, “দেখুন, বিয়ের সম্বন্ধে বেশি তাড়াতাড়ি করে কাজ নেই। এঁদের দুজনেরই বয়স হয়েছে, এখন এঁরা নিজেরাই বিচার করে কাজ করবেন, আমাদের তাগিদ দেওয়াটা ভালো হচ্ছে না। হেমের মনের ভাব আমি অবশ্য বুঝি না— কিন্তু আমি নলিনের কথা বলতে পারি, সে এখনো মন স্থির করতে পারে নি।”
এ কথাটা ক্ষেমংকরী হেমনলিনীকে বিশেষ করে শোনাবার জন্যই বললেন। হেমনলিনী অপ্রসন্নমনে চিন্তা করছে, আর তাঁর ছেলেই যে বিয়ের প্রস্তাবে একেবারে নেচে উঠেছে, এ ধারণা তিনি অপর পক্ষের মনে জন্মাতে দিতে পারেন না।
হেমনলিনী আজ এখানে আসবার সময় খুব একটা চেষ্টাকৃত উৎসাহ নিয়ে এসেছিল; সেই জন্য তার বিপরীত ফল হল। ক্ষণিক উত্তেজনা একটা গভীর অবসাদের মধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। যখন ক্ষেমংকরীর বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করল তখন হঠাৎ তার মনকে একটা আশঙ্কা আক্রমণ করে ধরল— যে নতুন জীবনযাত্রার পথে সে পদক্ষেপ করতে প্রবৃত্ত হয়েছে তা তার সামনে অতিদূর-বিস্তৃত দুর্গম পাহাড়পথের মতো প্রত্যক্ষ হয়ে উঠল।
সমস্ত শিষ্টালাপের মধ্যে নিজের প্রতি অবিশ্বাস হেমনলিনীর মনকে আজ ভিতরে ভিতরে ব্যথিত করতে লাগল।
এই অবস্থায় যখন ক্ষেমংকরী বিয়ের প্রস্তাবটাকে কতকটা প্রত্যাখ্যান করে নিলেন, তখন হেমনলিনীর মনে দুই বিপরীত ভাবের উদয় হল। বিয়েবন্ধনের মধ্যে শীঘ্র ধরা দিয়ে নিজের সংশয়দোলায়িত দুর্বল অবস্থা থেকে শীঘ্র নিষ্কৃতি পাবার ইচ্ছা তার থাকাতে প্রস্তাবটাকে সে অল্প বিলম্বে পাকা করে ফেলতে চায়, অথচ প্রস্তাবটা চাপা পড়বার উপক্রম হচ্ছে দেখে উপস্থিতমত সে একটা আরামও পেল।
ক্ষেমংকরী কথাটা বলেই হেমনলিনীর মুখের ভাব কটাক্ষপাতের দ্বারা লক্ষ্য করে নিলেন। তাঁর মনে হল, যেন এতক্ষণ পরে হেমনলিনীর মুখের ওপর একটা শান্তির স্নিগ্ধতা অবতীর্ণ হল। তাতে তাঁর মনটা তৎক্ষণাৎ হেমনলিনীর প্রতি বিমুখ হয়ে উঠল। তিনি মনে মনে বললেন, ‘আমার নলিনকে আমি এত সস্তায় বিলিয়ে দিতে বসেছিলাম!’ নলিনাক্ষ আজ যে আসতে দেরি করছে এতে তিনি খুশি হলেন। হেমনলিনীর দিকে চেয়ে বললেন, “দেখেছ নলিনাক্ষের আক্কেল? তোমরা আজ এখানে আসবে সে জানে, তবু তার দেখা নেই। আজ নাহয় কাজ কিছু কমই করত। এই তো আমার একটু ব্যামো হলেই সে কাজকর্ম বন্ধ করে বাড়িতেই থাকে, তাতে এতই কী লোকসান হয়?”
এই বলে আহারের আয়োজন কতদূর এগিয়েছে দেখবার সুযোগে কিছুক্ষণের ছুটি নিয়ে ক্ষেমংকরী উঠে এলেন। তাঁর ইচ্ছা, হেমনলিনীকে তিনি কমলার ওপর ভিড়িয়ে দিয়ে নিরীহ বৃদ্ধটিকে নিয়েই কথাবার্তা কহবেন।
তিনি দেখলেন, প্রস্তুত অন্ন মৃদু আগুনের আঁচে বসিয়ে রেখে কমলা রান্নাঘরের এক কোণে চুপটি করে এমন গভীরভাবে কী-একটা ভাবছিল যে, ক্ষেমংকরীর হঠাৎ আবির্ভাবে সে একেবারে চমকে উঠল। পরক্ষণেই লজ্জিত হয়ে মুচকি হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ক্ষেমংকরী বললেন, “ওমা, আমি বলি, তুমি বুঝি রান্নার কাজে ভারি ব্যস্ত হয়ে আছ।”
কমলা বলল, “রান্না সব সারা হয়ে গেছে মা।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “তা, এখানে চুপ করে বসে আছ কেন মা? অন্নদাবাবু বুড়োমানুষ, তাঁর সামনে বের হতে লজ্জা কী? হেম এসেছে, তাকে তোমার ঘরে ডেকে নিয়ে একটু গল্পসল্প করো সে। আমি বুড়োমানুষ, আমার কাছে বসিয়ে রেখে তাকে দুঃখ দেব কেন?”
হেমনলিনীর কাছ থেকে প্রত্যাহত হয়ে কমলার প্রতি ক্ষেমংকরীর স্নেহ দ্বিগুণ হয়ে উঠল।
কমলা সংকুচিত হয়ে বলল, “মা, আমি তাঁর সঙ্গে কী গল্প করব! তিনি কত লেখাপড়া জানেন, আমি কিছুই জানি না।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “সে কী কথা! তুমি কারো চেয়ে কম নও মা! লেখাপড়া শিখে যিনি নিজেকে যত বড়োই মনে করুন, তোমার চেয়ে বেশি আদর পাবার যোগ্য কয়জন আছে? বই পড়লে সবাই বিদ্বান হতে পারে, কিন্তু তোমার মতো অমন লক্ষ্মীটি হওয়া কি সবার সাধ্য? এসো মা, এসো। কিন্তু তোমার এ বেশে চলবে না। তোমার উপযুক্ত সাজে তোমাকে আজ সাজাব।”
সব দিকেই ক্ষেমংকরী আজ হেমনলিনীর গর্ব খাটো করতে উদ্যত হয়েছেন। রূপেও তিনি তাকে এই অল্পশিক্ষিতা মেয়েটির কাছে ম্লান করতে চান। কমলা আপত্তি করার সুযোগ পেল না। তাকে ক্ষেমংকরী নিপুণ হাতে মনের মতো করে সাজিয়ে দিলেন, ফিরোজা রঙের রেশমি শাড়ি পরালেন, নতুন ফ্যাশানের খোঁপা রচনা করলেন, বার বার কমলার মুখ এ দিকে ফিরিয়ে ও দিকে ফিরিয়ে দেখলেন এবং মুগ্ধচিত্তে তার গাল চুম্বন করে বললেন, “আহা, এ রূপ রাজার ঘরে মানাত।”
কমলা মাঝে মাঝে বলল, “মা, উঁহারা একলা বসে আছেন, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “তা, হোক দেরি। আজ আমি তোমাকে না সাজিয়ে যাব না।”
সাজ শেষ হলে তিনি কমলাকে সঙ্গে করে চললেন, “এসো এসো মা, লজ্জা করিয়ো না। তোমাকে দেখে কলেজে-পড়া বিদুষী রূপসীরা লজ্জা পাবেন, তুমি সবার কাছে মাথা তুলে দাঁড়াতে পার।”
এই বলে যে ঘরে অন্নদাবাবুরা বসেছিলেন সেই ঘরে ক্ষেমংকরী জোর করে কমলাকে টেনে নিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, নলিনাক্ষ তাঁদের সঙ্গে আলাপ করছে। কমলা তাড়াতাড়ি ফিরে যাবার উপক্রম করল, কিন্তু ক্ষেমংকরী তাকে ধরে রাখলেন; বললেন, “লজ্জা কী মা, লজ্জা কিসের! সব আপনার লোক।”
কমলার রূপে এবং সজ্জায় ক্ষেমংকরী নিজের মনে একটা গর্ব অনুভব করছিলেন; তাকে দেখে সবাই চমৎকৃত হোক, এই তাঁর ইচ্ছা। পুত্রাভিমানিনী মা তাঁর নলিনাক্ষের প্রতি হেমনলিনীর অবজ্ঞা কল্পনা করে আজ উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন, আজ নলিনাক্ষের কাছেও হেমনলিনীকে খর্ব করতে পারলে তিনি খুশি হন।
কমলাকে দেখে সবাই চমৎকৃত হল। হেমনলিনী প্রথম দিন যখন তার পরিচয় লাভ করেছিল তখন কমলার সাজসজ্জা কিছুই ছিল না; সে মলিনভাবে সংকুচিত হয়ে এক ধারে বসে ছিল, তাও বেশিক্ষণ ছিল না। তাকে সেদিন ভালো করে দেখাই হয়নি। আজ মুহূর্তকাল সে বিস্মিত হয়ে রইল, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে লজ্জিতা কমলার হাত ধরে তাকে নিজের পাশে বসাল।
ক্ষেমংকরী বুঝলেন, তিনি জয়লাভ করেছেন; উপস্থিত সভায় সবাইকেই মনে মনে স্বীকার করতে হয়েছে, এমন রূপ দৈবপ্রসাদেই দেখতে পাওয়া যায়। তখন তিনি কমলাকে বললেন, “যাও তো মা, তুমি হেমকে তোমার ঘরে নিয়ে গল্পসল্প করো গে যাও। আমি ততক্ষণ খাবারের জায়গা করি গে।”
কমলার মনের মধ্যে একটা আন্দোলন উপস্থিত হল। সে ভাবতে লাগল, “হেমনলিনীর আমাকে কেমন লাগবে কে জানে।’
এই হেমনলিনী একদিন এই ঘরের বধূ হয়ে আসবে, গৃহিণী হয়ে উঠবে— এর সুদৃষ্টিকে কমলা উপেক্ষা করতে পারে না। এ বাড়ির গৃহিণীপদ তারই ছিল, কিন্তু সে কথা সে মনেও আনতে চায় না— ঈর্ষাকে সে কোনোমতেই অন্তরে স্থান দেবে না। তার কোনো দাবি নেই। তাই হেমনলিনীর সঙ্গে যাবার সময় তার পা কাঁপতে লাগিল।
হেমনলিনী আস্তে আস্তে কমলাকে বলল, “তোমার সব কথা আমি মা’র কাছে শুনেছি। শুনে খুব কষ্ট হল। তুমি আমাকে তোমার বোনের মতো দেখিয়ো ভাই। তোমার কি বোন কেউ আছে?”
কমলা হেমনলিনীর সস্নেহ সকরুণ কণ্ঠস্বরে আশ্বস্ত হয়ে বলল, “আমার নিজের বোন কেউ নেই, আমার একটি খুড়তুতো বোন আছে।”
হেমনলিনী বলল, ‘ভাই, আমার বোন কেউ নেই। আমি যখন ছোটো ছিলাম তখন আমার মা মারা গেছেন। কতবার কত সুখদুঃখের সময় ভেবেছি, মা তো নেই, তবু যদি আমার একটি বোন থাকত! ছেলেবেলা থেকে সব কথা কেবল মনের মধ্যেই চেপে রাখতে হয়েছে, শেষকালে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে, আজ মন খুলে কোনো কথা বলতেই পারি না। লোক মনে করে, আমার ভারি দেমাক— কিন্তু তুমি ভাই, এমন কথা কখনো মনে করিয়ো না। আমার মন যে বোবা হয়ে গেছে।”
কমলার মন থেকে সব বাধা কেটে গেল; সে বলল, “দিদি, আমাকে কি তোমার ভালো লাগবে? আমাকে তো তুমি জান, আমি ভারি মুর্খ।”
হেমনলিনী হেসে বলল, “আমাকে যখন তুমি ভালো করে জানবে, দেখবে আমিও ঘোর মুর্খ। আমি কেবল গোটাকতক বই পড়ে মুখস্থ করেছি, আর কিছুই জানি না। তাই আমি তোমাকে বলি, যদি আমার এ বাড়িতে আসা হয় তুমি আমাকে কখনো ছাড়িয়ো না ভাই! কোনোদিন সংসারের ভার আমার একলার হাতে পড়েছে মনে করলে আমার ভয় হয়।”
কমলা শিশুর মতো সরলচিত্তে বলল, “ভার তুমি সমস্ত আমার ওপর দিয়ো। আমি ছেলেবেলা থেকে কাজ করে আসছি, আমি কোনো ভার নিতে ভয় করি না। আমরা দুই বোনে মিলে সংসার চালাব, তুমি তাঁকে সুখে রাখবে, আমি তোমাদের সেবা করব।”
হেমনলিনী বলল, “আচ্ছা ভাই, তোমার স্বামীকে তো তুমি ভালো করে দেখনি, তাঁকে তোমার মনে পড়ে?”
কমলা কথার স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে বলল, “স্বামীকে যে মনে করতে হয় তা আমি জানতাম না দিদি! খুড়োর বাড়িতে যখন এলাম তখন আমার খুড়তুতো বোন শৈলদিদির সঙ্গে আমার ভালো করে পরিচয় হল। তিনি তাঁর স্বামীকে যেরকম করে সেবা করেন তা চোখে দেখে আমার প্রথম চৈতন্য জন্মল। আমি যে-স্বামীকে কখনো দেখি নি বললেই হয় আমার সমস্ত মনের ভক্তি তাঁর উদ্দেশে যে কেমন করে গেল, তা আমি বলতে পারি না। ভগবান আমার সেই পূজার ফল দিয়েছেন, এখন আমার স্বামী আমার মনের সামনে স্পষ্ট করে জেগে উঠেছেন, তিনি আমাকে গ্রহণ না’ই করলেন— কিন্তু আমি তাঁকে এখন পেয়েছি।”
কমলার এই ভক্তিসিঞ্চিত কথা কয়টি শুনে হেমনলিনীর অন্তঃকরণ ভিজে গেল। সে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তোমার কথা আমি বেশ বুঝতে পারছি। অমনি করে পাওয়াই পাওয়া। আর সব পাওয়া লোভের পাওয়া, তা নষ্ট হয়ে যায়।”
কমলা এ কথা সম্পূর্ণ বুঝল কি না বলা যায় না— সে হেমনলিনীর দিকে চেয়ে রইল, খানিক বাদে বলল, “তুমি যা বলছ দিদি, তা সত্যই হবে। আমি মনে কোনো দুঃখ আসতে দিই না, আমি ভালোই আছি ভাই! আমি যেটুকু পেয়েছি তাই আমার লাভ।”
হেমনলিনী কমলার হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, “যখন ত্যাগ এবং লাভ একেবারে সমান হয়ে যায় তখনই তা যথার্থ লাভ, এই কথা আমার গুরু বলেন। সত্য বলছি বোন, তোমার মতো অমনি সব নিবেদন করে দিয়ে যে সার্থকতা তা-ই যদি আমার ঘটে, তবে আমি ধন্য হব।”
কমলা কিছু বিস্মিত হয়ে বলল, “কেন দিদি, তুমি তো সবই পাবে, তোমার তো কোনো অভাবই থাকবে না।”
হেননলিনী বলল, “যেটুকু পাবার মতো পাওয়া সেটুকু পেয়েই যেন সুখী হতে পারি; তার চেয়ে বেশি যতটুকুই পাওয়া যায় তার অনেক ভার, অনেক দুঃখ। আমার মুখে এ-সব কথা তোমার আশ্চর্য লাগবে, আমার নিজেরও আশ্চর্য লাগে, কিন্তু এ-সব কথা ঈশ্বর আমাকে ভাবাচ্ছেন। জান না, বোন, আজ আমার মনে কী ভার চেপে ছিল— তোমাকে পেয়ে আমার হৃদয় হালকা হল, আমি বল পেলাম, তাই আমি এত বকছি। আমি কখনো কথা কহতে পারি না, তুমি কেমন করে আমার সব কথা টেনে নিচ্ছ ভাই?”.