ক্ষেমংকরীর কাছে থেকে ফিরে এসে হেমনলিনী তাদের বসবার ঘরের টেবিলের ওপর একখানা বড় ভারী চিঠি পেল। লেফাফার ওপরকার হাতের লেখা দেখেই বুঝতে পারল, চিঠিখানা রমেশের লেখা। থরথর কাঁপা বুকে চিঠিখানা হাতে করে শয়নঘরের দরজা বন্ধ করে পড়তে লাগল।
চিঠিতে রমেশ কমলা-সম্বন্ধীয় সব ব্যাপার ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিতভাবে লিখেছে। শেষে লিখেছে—
তোমার সঙ্গে আমার যে বন্ধন ঈশ্বর দৃঢ় করে দিয়েছিলেন, সংসার তা ছিন্ন করেছে। তুমি এখন অন্যের প্রতি চিত্ত
সমর্পণ করেছ— সেজন্য আমি তোমাকে কোনো দোষ দিতে পারি না, কিন্তু তুমিও আমাকে দোষ দিয়ো না। যদিও আমি এক দিনের জন্য কমলার প্রতি স্ত্রীর মতো ব্যবহার করি নি তথাপি ক্রমশ সে যে আমার হৃদয় আকর্ষণ করে নিয়েছিল,
এ কথা তোমার কাছে আমার স্বীকার করা কর্তব্য। আজ আমার হৃদয় কী অবস্থায় আছে তা আমি নিশ্চয় জানি না। তুমি
যদি আমাকে ত্যাগ না করতে তবে তোমার মধ্যে আমি আশ্রয় পেতে পারতাম। সেই আশ্বাসেই আমি আমার বিক্ষিপ্ত
চিত্ত নিয়ে তোমার কাছে ছুটে এসেছিলাম। কিন্তু আজ যখন স্পষ্ট দেখলাম তুমি আমাকে ঘৃণা করে
আমার কাছ থেকে বিমুখ হয়েছ, যখন শুনলাম অন্যের সঙ্গে বিয়ে-সম্বন্ধে তুমি সম্মতি দিয়েছ, তখন আমারও মন
আবার দুলে উঠল। দেখলাম এখনো কমলাকে সম্পূর্ণ ভুলতে পারি নি। ভুলি বা না ভুলি, তাতে সংসারে
আমি ছাড়া আর কারো কোনো ক্ষতি নেই। আমারই বা ক্ষতি কিসের! সংসারে যে দুটি রমণীকে আমি হৃদয়ের মধ্যে
গ্রহণ করতে পেরেছি তাঁদের ভুলতে পারার ক্ষমতা আমার নেই এবং তাঁদের চিরজীবন স্মরণ করাই আমার পরম
লাভ। আজ সকালে যখন তোমার সঙ্গে ক্ষণিক সাক্ষাতের বিদ্যুতের মতো আঘাত পেয়ে বাসায় ফিরে এলাম তখন
একবার মনে মনে বললাম, ‘আমি হতভাগ্য!’ কিন্তু আর আমি সে কথা স্বীকার করব না। আমি সবলচিত্তে আনন্দের
সাথে তোমার কাছে বিদায় চাইছি— আমি পরিপূর্ণ হৃদয়ে তোমার কাছ থেকে চলে যাব—তোমাদের
কল্যাণে, বিধাতার কল্যাণে, আমি অন্তরের মধ্যে এই বিদায়কালে যেন কিছুমাত্র দীনতা অনুভব না করি। তুমি সুখী হও,
তোমার মঙ্গল হোক। আমাকে তুমি ঘৃণা করিয়ো না, আমাকে ঘৃণা করার কোনো কারণ তোমার নেই।
অন্নদাবাবু চৌকিতে বসে বই পড়ছিলেন। হঠাৎ হেমনলিনীকে দেখে তিনি চমকে উঠলেন; বললেন, “হেম, তোমার কি অসুখ করেছে?”
হেমনলিনী বলল, “অসুখ করে নি। বাবা, রমেশবাবুর একখানা চিঠি পেয়েছি। এই নাও, পড়া হলে আবার আমাকে ফেরত দিয়ো।”
এই বলে চিঠি দিয়ে হেমনলিনী চলে গেল। অন্নদাবাবু চশমা নিয়ে চিঠিখানা বার দুয়েক পড়লেন, তারপর হেমনলিনীর কাছে ফেরত পাঠিয়ে বসে ভাবতে লাগলেন। অবশেষে ভেবে স্থির করলেন, এ একরকম ভালোই হয়েছে। পাত্র হিসেবে রমেশের চেয়ে নলিনাক্ষ অনেক বেশি কাম্য। ক্ষেত্র থেকে রমেশ যে নিজেই সরে পড়ল, এ হল ভালো।
এ কথা ভাবছেন, এমন সময় নলিনাক্ষ এসে উপস্থিত হল। তাকে দেখে অন্নদাবাবু একটু আশ্চর্য হলেন। আজ সকালে নলিনাক্ষের সঙ্গে অনেকক্ষণ দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে, আবার কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই সে কী মনে করে এল? বৃদ্ধ মনে মনে একটুখানি হেসে স্থির করলেন, হেমনলিনীর প্রতি নলিনাক্ষের মন পড়েছে।
কোনো ছুতায় হেমনলিনীর সঙ্গে নলিনাক্ষের দেখা করিয়ে দিয়ে নিজে সরে যাবেন কল্পনা করছেন, এমন সময় নলিনাক্ষ বলল, “অন্নদাবাবু, আমার সঙ্গে আপনার কন্যার বিয়ের প্রস্তাব উঠেছে। কথাটা বেশি দূর এগোনোর আগে আমার যা বলার আছে, বলতে চাই।”
অন্নদাবাবু বললেন, “ঠিক কথা, সেটা তো বলাই কর্তব্য।”
নলিনাক্ষ বলল, “আপনি জানেন না, আগেই আমার বিয়ে হয়েছে।”
অন্নদাবাবু বললেন, “জানি। কিন্তু—”
নলিনাক্ষ। আপনি জানেন শুনে আশ্চর্য হলাম। কিন্তু তাঁর মৃত্যু হয়েছে, এইরকম আপনি অনুমান করছেন। নিশ্চিত করে বলা যায় না। এমনকি, তিনি বেঁচে আছেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
অন্নদাবাবু বললেন, “ঈশ্বর করুন, তাই যেন সত্য হয়। হেম, হেম।”
হেমনলিনী এসে বলল, “কী বাবা!”
অন্নদাবাবু। রমেশ তোমাকে যে চিঠি লিখেছেন, তার মধ্যে যে অংশটুকু—
হেমনলিনী সেই চিঠিখানি নলিনাক্ষের হাতে দিয়ে বলল, “এ চিঠির সবটাই উঁহার পড়ে দেখা কর্তব্য।” এই বলে হেমনলিনী চলে গেল।
চিঠিখানি পড়া শেষ করে নলিনাক্ষ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। অন্নদাবাবু বললেন, “এমন শোচনীয় ঘটনা সংসারে প্রায় ঘটে না। চিঠিখানি পড়তে দিয়ে আপনার মনে আঘাত দেওয়া হল, কিন্তু এটা আপনার কাছে গোপন করাও আমাদের পক্ষে অন্যায় হত।”
নলিনাক্ষ একটুখানি চুপ করে বসে থেকে অন্নদাবাবুর কাছে বিদায় নিয়ে উঠল। চলে যাবার সময় উত্তর দিকের বারান্দায় অদূরে হেমনলিনীকে দেখতে পেল।
হেমনলিনীকে দেখে নলিনাক্ষের মনে আঘাত লাগল। ঐ-যে নারী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে, ওর স্থির-শান্ত মূর্তিটি ওর অন্তঃকরণকে কেমন করে বহন করছে? এই মুহূর্তে ওর মন যে কী করছে তা ঠিকমতো জানবার কোনো উপায় নেই; নলিনাক্ষকে তার কোনো প্রয়োজন আছে কি না সে প্রশ্নও করা যায় না, তার উত্তর পাওয়াও কঠিন। নলিনাক্ষের পীড়িত চিত্ত ভাবতে লাগল, ওকে কোনো সান্ত্বনা দেওয়া যায় কি না। কিন্তু মানুষে মানুষে কী দুর্ভেদ্য ব্যবধান! মন জিনিসটা কী ভয়ংকর একাকী!
নলিনাক্ষ একটু ঘুরে ঐ বারান্দার সামনে দিয়ে গাড়িতে উঠবে স্থির করল, মনে করল যদি হেমনলিনী তাকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করে। বারান্দার সামনে যখন এল, দেখল হেমনলিনী বারান্দা ছেড়ে ঘরের মধ্যে সরে গেছে। হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সাক্ষাৎ সহজ নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ সরল নয়, এই কথা চিন্তা করে ভারাক্রান্ত চিত্তে নলিনাক্ষ গাড়িতে উঠল।
নলিনাক্ষ চলে গেলে যোগেন্দ্র এসে উপস্থিত হল। অন্নদাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী যোগেন, একলা যে?”
যোগেন্দ্র বলল, “দ্বিতীয় আর কোন ব্যক্তির প্রত্যাশা করছ শোনি?”
অন্নদা বললেন, “কেন? রমেশ?”
যোগেন্দ্র। তার প্রথম দিনের অভ্যর্থনাটাই কি ভদ্রলোকের পক্ষে যথেষ্ট হয় নি। কাশীর গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে মরে যদি তার শিবত্বলাভ না হয়ে থাকে, তবে আর কী হয়েছে আমি নিশ্চয় জানি না। কাল থেকে এ পর্যন্ত তার আর দেখা নেই, টেবিলে একখানা কাগজে লেখা আছে— ‘পালাই— তোমার রমেশ।’ এ সব কবিত্ব আমার কোনোকালে অভ্যাস নেই। সুতরাং আমাকেও এখান থেকে পালাতে হল, আমার হেডমাস্টারিই ভালো, তাতে সবই খুব স্পষ্ট— ঝাপসা কিছুই নেই।
অন্নদাবাবু বললেন, “হেমের জন্য তো একটা-কিছু স্থির—”
যোগেন্দ্র। আর কেন? আমিই কেবল স্থির করব, আর তোমরা অস্থির করতে থাকবে, এ খেলা বেশি দিন ভালো লাগে না। আমাকে আর-কিছতে জড়িয়ো না— আমি যা ভালো বুঝতে পারি না, সেটা আমার ধাতে সয় না। হঠাৎ দুর্গম হয়ে পড়বার যে আশ্চর্য ক্ষমতা হেমের আছে, সেটা আমাকে কিছু কাবু করে। কাল সকালের গাড়িতে আমি বিদায় হব, পথে বাঁকিপুরে আমার কাজ আছে।
অন্নদাবাবু চুপ করে বসে নিজের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। সংসারের সমস্যা আবার দুরূহ হয়ে এসেছে।
সন্ন্যাসী থেকে গৃহস্থে রূপান্তর করুন।
শৈলজা ও তার পিতা নলিনাক্ষের বাড়িতে এসেছেন। শৈলজা কমলাকে নিয়ে এক কোণের ঘরে বসিয়ে ফিসফিস করছিল, চক্রবর্তী ক্ষেমংকরীর সঙ্গে আলাপ করছিলেন।
চক্রবর্তী। আমার তো ছুটি প্রায় শেষ, কালই গাজিপুরে যেতে হবে। যদি হরিদাসী আপনাদের কোনোরকমে বিরক্ত করে থাকে, বা যদি আপনার পক্ষে—
ক্ষেমংকরী। ও আবার কী রকম কথা চক্রবর্তীমশায়? আপনার মনের ভাবটা কী শুনি। আপনি কি কোনো ছুতো করে আপনাদের মেয়েটিকে ফিরিয়ে নিতে চান?
চক্রবর্তী। আমাকে তেমন লোক পেয়েছেন না। আমি দিয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার পাত্র নই, কিন্তু যদি আপনার কিছুমাত্র অসুবিধা হয়—
ক্ষেমংকরী। চক্রবর্তীমশায়, ওটা আপনার সরল কথা নয়— মনে মনে বেশ জানেন, হরিদাসীর মতো এমন লক্ষ্মী মেয়েটিকে কাছে রাখলে সুবিধার সীমা নেই, তবু—
চক্রবর্তী। না না, আর বলতে হবে না, আমি ধরা পড়ে গেছি। ওটা একটা ছলমাত্র— আপনার মুখে হরিদাসীর গুণ শোনার জন্যই কথাটা আমি পাড়া। কিন্তু একটা ভাবনা আছে— পাছে নলিনাক্ষবাবু মনে করেন যে, এ আবার একটা উপসর্গ কোথা থেকে ঘাড়ে পড়ল। আমাদের মেয়েটি অভিমানী, যদি নলিনের লেশমাত্র বিরক্তিভাবও দেখতে পায় তবে তার পক্ষে বড়ো কঠিন হবে।
ক্ষেমংকরী। হরি বলো! নলিনের আবার বিরক্তি! ওর সে ক্ষমতাই নেই।
চক্রবর্তী। সে কথা ঠিক। কিন্তু দেখুন, হরিদাসীকে আমি নাকি প্রাণের চেয়ে ভালোবাসি, তাই তার সম্বন্ধে আমি অল্পে সন্তুষ্ট হতে পারি না। নলিনাক্ষ যে ওর ওপর বিরক্ত হবেন না, উদাসীনের মতো থাকবেন, এইটুকুই আমার পক্ষে যথেষ্ট মনে হয় না। তাঁর বাড়িতে যখন হরিদাসী আছে তখন তাকে তিনি আপনার লোক বলে স্নেহ করবেন, এ না হলে মনে বড়ো সংকোচ বোধ হয়। ও তো ঘরের দেয়াল নয়, ও একটা মানুষ— ওর প্রতি বিরক্তও হবেন না, স্নেহও করবেন না, ও আছে তো আছে, এইটুকুমাত্র সম্পর্ক, সেটা যেন কেমন—
ক্ষেমংকরী। চক্রবর্তীমশায়, আপনি বেশি ভাববেন না— কোনো লোককে আপনার লোক বলে স্নেহ করা আমার নলিনের পক্ষে শক্ত নয়। বাইরে থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই, কিন্তু এই যে হরিদাসী আমার এখানে আছে, ও কিসে স্বচ্ছন্দে থাকে, ওর কিসে ভালো হয়, সে চিন্তা নিশ্চয়ই নলিনের মনে লেগে আছে, খুব সম্ভব, সেরকম ব্যবস্থাও সে কিছু-না-কিছু করছে, আমরা তা জানতেও পারছি না।
চক্রর্তী। শুনে বড়ো নিশ্চিন্ত হলাম। তবু আমি যাবার আগে একবার বিশেষ করে নলিনাক্ষবাবুকে বলে যেতে চাই। একটি স্ত্রীলোকের সম্পূর্ণ ভার নিতে পারে, এমন পুরুষ জগতে অল্পই মেলে; ভগবান যখন নলিনাক্ষবাবুকে সেই যথার্থ পৌরুষ দিয়েছেন তখন তিনি যেন মিথ্যা সংকোচে হরিদাসীকে দূরে রেখে না চলেন, তিনি যেন যথার্থ আত্মীয়ের মতো তাকে নিতান্ত সহজভাবে গ্রহণ ও রক্ষা করেন, তাঁর কাছে এই প্রার্থনাটি জানাতে চাই।
নলিনাক্ষের প্রতি চক্রবর্তীর এই বিশ্বাস দেখে ক্ষেমংকরীর মন গলে গেল। তিনি বললেন, “পাছে আপনারা কিছু মনে করেন এই ভয়েই হরিদাসীকে আমি নলিনাক্ষের সামনে তেমন করে বের হতে দিইনি; কিন্তু আমার ছেলেকে আমি তো জানি, তাকে বিশ্বাস করে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”
চক্রবর্তী। তবে আপনার কাছে সব কথা খোলাসা করেই বলি। শুনেছি, নলিনাক্ষবাবুর বিবাহের প্রস্তাব হচ্ছে; বধূর বয়সও নাকি অল্প নয় এবং তাঁর শিক্ষাদীক্ষা আমাদের সমাজের সঙ্গে মেলে না। তাই ভাবছিলাম, হয়তো হরিদাসীর—
ক্ষেমংকরী। সে আর আমি বুঝি না? সেটা হলে ভাবনা ছিল বৈকি। কিন্তু সে বিবাহ হবে না—
চক্রবর্তী। সম্বন্ধ ভেঙে গেছে?
ক্ষেমংকরী। গড়েই নি, তার ভাঙবে কী। নলিনের একেবারেই ইচ্ছা ছিল না, আমিই জেদ করছিলাম। কিন্তু সে জেদ ছেড়েছি। যা হওয়ার নয় তা জোর করে ঘটিয়ে মঙ্গল নেই। ভগবানের কী ইচ্ছা জানি না, মরবার আগে বুঝি আর বউ দেখে যেতে পারলাম না।
চক্রবর্তী। অমন কথা বলবেন না। আমরা আছি কী করতে? ঘটক-বিদায় এবং মিষ্টান্ন-আদায় না করে ছাড়ব বুঝি?
ক্ষেমংকরী। আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক চক্রবর্তীমশায়। আমার মনে বড়ো দুঃখ আছে যে, নলিন এই বয়সে আমারই জন্য সংসারধর্মে প্রবেশ করতে পারল না। তাই আমি বড়ো ব্যস্ত হয়ে সকল দিক না ভেবে একটা সম্বন্ধ করে বসেছিলাম— সে আশা ত্যাগ করেছি, কিন্তু আপনারা একটা দেখিয়ে দিন। দেরি করবেন না— আমি বেশি দিন বাঁচব না।
চক্রর্তী। ও কথা বললে শুনব কেন। আপনাকে বাঁচতেও হবে, বউয়েরও মুখ দেখবেন। আপনার যেরকম বউটি দরকার, তা আমি ঠিক জানি; নিতান্ত কচি হলেও চলবে না, অথচ আপনাকে ভক্তিশ্রদ্ধা করবে, বাধ্য হয়ে চলবে— এ না হলে আমাদের পছন্দ হবে না। তা, সে আপনি কিছুই ভাববেন না, ঈশ্বরের কৃপায় নিশ্চয়ই সেটা ঠিক হয়েই আছে। এখন যদি অনুমতি করেন, একবার হরিদাসীকে তার কর্তব্য সম্পর্কে দু-চারটে কথা উপদেশ করে আসি, অমনি শৈলকেও এখানে পাঠিয়ে দিই— আপনাকে দেখে অবধি আপনার কথা তার মুখে আর ধরে না।
ক্ষেমংকরী বললেন, “না, আপনারা তিন জনেই এক ঘরে গিয়ে বসুন, আমার একটু কাজ আছে।”
চক্রবর্তী হেসে বললেন, “জগতে আপনাদের কাজ আছে বলেই আমাদের কল্যাণ। কাজের পরিচয় নিশ্চয় যথাসময়ে পাওয়া যাবে। নলিনাক্ষবাবুর বধূর কল্যাণে ব্রাহ্মণের ভাগ্যে মিষ্টান্নের পালা শুরু হোক।”
চক্রবর্তী, শৈল ও কমলার কাছে এসে দেখলেন, কমলার দুটি চোখ চোখের জলের আভাসে এখনো ছলছল করছে! চক্রবর্তী শৈলজার পাশে বসে নীরবে তার মুখের দিকে একবার চাইলেন। শৈল বলল, “বাবা, আমি কমলকে বলছিলাম যে, নলিনাক্ষবাবুকে সব কথা খুলে বলার এখন সময় হয়েছে, তাই নিয়ে তোমার এই নির্বোধ হরিদাসী আমার সঙ্গে ঝগড়া করছে।”
কমলা বলে উঠল, “না দিদি, না, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, তুমি এমন কথা মুখে এনো না। সেটা কিছুতেই হবে না।”
শৈল বলল, “কী তোমার বুদ্ধি! তুমি চুপ করে থাকো, আর হেমনলিনীর সঙ্গে নলিনাক্ষবাবুর বিবাহ হয়ে যাক। বিবাহের পরদিন থেকে আর আজ পর্যন্ত কেবলই তো যত রাজ্যের অঘটন ঘটনার মধ্যে পাক খেয়ে মরলি, আবার আর-একটা নতুন অনাসৃষ্টির দরকার কী?”
কমলা বলল, “দিদি, আমার কথা কাউকে বলবার নয়, আমি সব সহ্য করতে পারব, সে লজ্জা সহ্য করতে পারব না। আমি যেমন আছি, বেশ আছি, আমার কোনো দুঃখ নেই, কিন্তু যদি সব কথা প্রকাশ করে দাও তবে আমি কোন মুখে আর একদণ্ড এ বাড়িতে থাকব? তবে আমি বাঁচব কেমন করে?”
শৈল এ কথার কোনো উত্তর দিতে পারল না, কিন্তু তাই বলে হেমনলিনীর সঙ্গে নলিনাক্ষের বিবাহ হয়ে যাবে সেটা চুপ করে সহ্য করা তার পক্ষে বড়ো কঠিন।
চক্রর্তী বললেন, “যে বিবাহের কথা বলছ সেটা ঘটতেই হবে, এমন কী কথা আছে!”
শৈল। বল কী বাবা, নলিনাক্ষবাবুর মা যে আশীর্বাদ করে এসেছেন!
চক্রর্তী। বিশ্বেশ্বরের আশীর্বাদে সে আশীর্বাদ ফসকে গেছে। মা কমল, তোমার কোনো ভয় নেই, ধর্ম তোমার সহায় আছেন।
কমলা সব কথা স্পষ্ট না বুঝে দুই চোখ বিস্ফারিত করে খুড়ামশায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
তিনি বললেন, “সে বিবাহের সম্বন্ধ ভেঙে গেছে। এ বিবাহে নলিনাক্ষবাবুও রাজি নন এবং তাঁর মার মাথায়ও সুবুদ্ধি এসেছে।”
শৈলজা ভারি খুশি হয়ে বলল, “বাঁচা গেল বাবা! কাল এই খবরটা শুনে রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। কিন্তু সে যাই হোক, কমল কি নিজের ঘরে চিরদিন এমনি পরের মতো কাটাবে? কবে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে?”
চক্রর্তী। ব্যস্ত হও কেন শৈল? যখন ঠিক সময় আসবে তখন সমস্ত সহজ হয়ে যাবে।
কমলা বলল, “এখন যা হয়েছে এই সহজ, এর চেয়ে সহজ আর-কিছু হতে পারে না। আমি বেশ সুখে আছি, আমাকে এর চেয়ে সুখ দিতে গিয়ে আবার আমার ভাগ্যকে ফিরিয়ে দিয়ো না খুড়ামশায়! আমি তোমাদের পায়ে ধরি, তোমরা কাউকে কিছু বলো না, আমাকে এই ঘরের একটা কোণে ফেলে আমার কথা ভুলে যাও। আমি খুব সুখে আছি।”
বলতে বলতে কমলার দুই চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল।
চক্রর্তী ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললেন, “ও কী, মা, কাঁদ কেন? তুমি যা বলছ আমি বেশ বুঝছি। তোমার এই শান্তিতে আমরা কি হাত দিতে পারি? বিধাতা আপনি যা ধীরে ধীরে করছেন, আমরা নির্বোধের মতো তার মধ্যে পড়ে কি সমস্ত ভণ্ডুল করে দেব? কোনো ভয় নেই। আমার এত বয়স হয়ে গেল, আমি কি স্থির হয়ে থাকতে জানি না?”
এমন সময় উমেশ ঘরে প্রবেশ করে তার আকর্ণবিস্ফারিত হাসি নিয়ে দাঁড়াল।
খুড়া জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে উমেশ, খবর কী?”
উমেশ বলল, “রমেশবাবু নীচে দাঁড়িয়ে আছেন, ডাক্তারবাবুর কথা জিজ্ঞাসা করছেন।”
কমলার মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। খুড়া তাড়াতাড়ি উঠে পড়লেন; বললেন “ভয় নেই মা, আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি।”
খুড়া নীচে এসে একেবারে রমেশের হাত ধরে বললেন, “আসুন রমেশবাবু, রাস্তায় বেড়াতে বেড়াতে আপনার সঙ্গে গোটা-দুয়েক কথা কহব।”
রমেশ আশ্চর্য হয়ে বলল, “খুড়ামশায়, আপনি এখানে কোথা থেকে?”
খুড়া বললেন, “আপনার জন্য আছি; দেখা হল, বড়ো ভালোই হল। আসুন, আর দেরি নয়, কাজের কথাটা শেষ করে ফেলা যাক!”
বলে রমেশকে রাস্তায় টেনে নিয়ে কিছুদূর গিয়ে বললেন, “রমেশবাবু, আপনি এ বাড়িতে কেন এসেছেন?”
রমেশ বলল, “নলিনাক্ষ ডাক্তারকে খুঁজতে এসেছিলাম। তাঁকে কমলার কথা আগাগোড়া সমস্ত খুলে বলা উচিত স্থির করেছি। আমার এক-একবার মনে হয়, হয়তো কমলা বেঁচে আছে।”
খুড়া বললেন, “যদি কমলা বেঁচেই থাকে এবং যদি নলিনাক্ষের সঙ্গে তার দেখা হয়, তবে আপনার মুখে নলিনাক্ষ সমস্ত ইতিহাস শুনলে কি সুবিধা হবে। তাঁর বৃদ্ধা মা আছেন, তিনি এ-সব কথা জানতে পারলে কমলার পক্ষে কি ভালো হবে?”
রমেশ বলল, “সামাজিক হিসাবে কী ফল হবে জানি না, কিন্তু কমলাকে যে কোনো অপরাধ স্পর্শ করে নি সেটা তো নলিনাক্ষের জানা চাই। কমলার যদি মৃত্যুই হয়ে থাকে, তবে নলিনাক্ষবাবু তাঁর স্মৃতিকে তো সম্মান করতে পারবেন।”
খুড়া বললেন, “আপনাদের ও-সব একেলে কথা আমি কিছু বুঝতে পারি না— কমলা যদি মরেই থাকে তবে তার এক রাতের স্বামীর কাছে তার স্মৃতিটাকে নিয়ে টানাটানি করার কোনো দরকার দেখি না। ঐযে বাড়িটা দেখছেন ঐ বাড়িতে আমার বাসা। কাল সকালে যদি একবার আসতে পারেন, তবে আপনাকে সব কথা স্পষ্ট করে বলব। কিন্তু তার আগে নলিনাক্ষবাবুর সঙ্গে দেখা করবেন না, এই আমার অনুরোধ।”
রমেশ বলল, “আচ্ছা।”
খুড়া ফিরে এসে কমলাকে বললেন, “মা, কাল সকালে তোমাকে আমাদের বাড়িতে যেতে হবে। সেখানে তুমি নিজে রমেশবাবুকে বুঝিয়ে বলবে, এই আমি স্থির করেছি।”
কমলা মাথা নিচু করে বসে রইল। খুড়া বললেন, “আমি নিশ্চয় জানি তা না হলে চলবে না— একেলে ছেলেদের কর্তব্যবুদ্ধি সেকেলে লোকের কথায় ভোলে না। মা, মন থেকে সংকোচ দূর করে ফেলো— এখন তোমার যেখানে অধিকার অন্য লোককে আর সেখানে পদার্পণ করতে দেবে না, এ তো তোমারই কাজ। এ সম্পর্কে আমাদের তো তেমন জোর খাটবে না।”
কমলা তবু মুখ নিচু করে রইল। খুড়া বললেন, “মা, অনেকটা পরিষ্কার হয়ে এসেছে, এখন এই ছোটখাটো জঞ্জালগুলো শেষবারের মতো ঝাঁটিয়ে ফেলতে সংকোচ করো না।”
এমন সময় পদশব্দ শুনে কমলা মুখ তুলেই দেখল, দরজার সম্মুখে নলিনাক্ষ। একেবারে তার চোখের ওপরেই নলিনাক্ষের দুই চোখ পড়ে গেল— অন্য দিন নলিনাক্ষ যেমন তাড়াতাড়ি দৃষ্টি ফিরিয়ে চলে যায়, আজ যেন তেমন তাড়া করল না। যদিও ক্ষণকালমাত্র কমলার দিকে সে চেয়েছিল, কিন্তু তার সেই ক্ষণকালের দৃষ্টি কমলার মুখ থেকে কী যেন আদায় করে নিল, অন্য দিনের মতো অনধিকারের সংকোচে দেখার জিনিসটিকে প্রত্যাখ্যান করল না। পরমুহূর্তেই শৈলজাকে দেখে চলে যেতে উদ্যত হলেই খুড়া বললেন, “নলিনাক্ষবাবু, পালাবেন না— আপনাকে আমরা আত্মীয় বলেই জানি। এটি আমার মেয়ে শৈল, এরই মেয়েকে আপনি চিকিৎসা করেছেন।”
শৈল নলিনাক্ষকে নমস্কার করল এবং নলিনাক্ষ প্রতিনমস্কার করে জিজ্ঞেস করল, “আপনার মেয়েটি ভালো আছে?”
শৈল বলল, “ভালো আছে।”
খুড়া বললেন, “আপনাকে যে পেট ভরে দেখে নেব এমন অবসর তো আপনি দেন না— এখন, এলেন যদি তো একটু বসুন।”
নলিনাক্ষকে বসিয়ে খুড়া দেখলেন, পিছন থেকে কমলা কখন সরে পড়েছে। নলিনাক্ষের সেই এক মুহূর্তের দৃষ্টিটি নিয়ে সে পুলকিত বিস্ময়ে নিজের ঘরে মনটাকে সংবরণ করতে গেছে। ইতিমধ্যে ক্ষেমংকরী এসে বললেন, “চক্রবর্তীমশায়, কষ্ট করে একবার উঠতে হচ্ছে।”
চক্রর্তী বললেন, “যখনই আপনি কাজে গেলেন তখন থেকেই এটুকু কষ্টের জন্য আমি পথ চেয়ে বসে ছিলাম।”
আহার সমাধা হয়ে পর বসবার ঘরে এসে চক্রর্তী বললেন, “একটু বসুন, আমি আসছি।”
বলে পরক্ষণেই অন্য ঘর থেকে কমলার হাত ধরে তাকে নলিনাক্ষ ও ক্ষেমংকরীর সম্মুখে এনে উপস্থিত করলেন, তাঁর পিছনে শৈলজাও এল।
চক্রর্তী বললেন, “নলিনাক্ষবাবু, আপনি আমাদের হরিদাসীকে পর মনে করে সংকোচ করবেন না— এই দুঃখিনীকে আপনাদেরই ঘরে আমি রেখে যাচ্ছি, একে সম্পূর্ণই আপনাদের করে নেবেন। একে আর-কিছু দিতে হবে না, আপনাদের সবার সেবা করার সম্পূর্ণ অধিকার দেবেন— আপনি নিশ্চয়ই জানবেন, আপনাদের কাছে জ্ঞানপূর্বক এ একদিনের জন্যও অপরাধিনী হবে না।”
কমলা লজ্জায় মুখখানি রাঙা করে নতশিরে বসে রইল। ক্ষেমংকরী বললেন, “চক্রবর্তীমশায়, আপনি কিছুই ভাববেন না, হরিদাসী আমাদের ঘরের মেয়েই হল। ওকে আমাদের কোনো কাজ দেবার জন্য আমাদের তরফ থেকে আজ পর্যন্ত কোনো চেষ্টা করবার দরকারই হয় নি। এ বাড়ির রান্নাঘরে ভাঁড়ার-ঘরে এতদিন আমার শাসনই একমাত্র প্রবল ছিল, এখন আমি সেখানে কেউই না। চাকর-বাকররাও আমাকে আর বাড়ির গৃহিণী বলে গণ্যই করে না। কেমন করে যে আস্তে আস্তে আমার এমন অবস্থাটা হল, তা আমি টেরও পেলাম না। আমার গোটাকয়েক চাবি ছিল, সেও কৌশল করে হরিদাসী আত্মসাৎ করেছে— চক্রবর্তীমশায়, আপনার এই ডাকাত মেয়েটির জন্যে আপনি আর কী চান বলুন দেখি! এখন সব চেয়ে বড়ো ডাকাতি হয় যদি আপনি বলেন, এই মেয়েটিকে আমরা নিয়ে যাব।”
চক্রর্তী বললেন, “আমি যেন বললাম, কিন্তু মেয়েটি কি নড়বে? তা মনেও করবেন না। ওকে আপনারা এমন ভুলিয়েছেন যে, আজ আপনারা ছাড়া ও আর পৃথিবীতে কাউকে জানে না। দুঃখের জীবনে এতদিন পর ও আপনাদের কাছেই আজ শান্তি পেয়েছে— ভগবান ওর সেই শান্তি নির্বিঘ্ন করুন, আপনারা চিরদিন ওর ওপর প্রসন্ন থাকুন, ওকে সেই আশীর্বাদ করি।”
বলতে বলতে চক্রর্তীর চোখ সজল হয়ে এল। নলিনাক্ষ কিছু না বলে স্তব্ধ হয়ে চক্রর্তীর কথা শুনছিল; যখন সকলে বিদায় নিয়ে গেলেন তখন ধীরে ধীরে সে নিজের ঘরে গিয়ে প্রবেশ করল। তখন শীতের সূর্যাস্তকাল তার সমস্ত শয়নঘরটিকে নববিবাহের রক্তিমছটায় রঞ্জিত করে তুলেছিল। সেই রক্তবর্ণের আভা নলিনাক্ষের সমস্ত রোমকূপ ভেদ করে তার অন্তঃকরণকে যেন রাঙিয়ে তুলল।
আজ সকালে নলিনাক্ষের এক হিন্দুস্থানি বন্ধুর কাছ থেকে এক টুকরি গোলাপ এসেছিল। ঘর সাজাবার জন্য সেই গোলাপের টুকরি ক্ষেমংকরী কমলার হাতে দিয়েছিলেন। নলিনাক্ষের শয়নঘরের প্রান্তে একটি ফুলদানি থেকে সেই গোলাপের গন্ধ তার মস্তিষ্কের মধ্যে প্রবেশ করতে লাগল। সেই নিস্তব্ধ ঘরের বাতায়নের আরক্ত সন্ধ্যার সঙ্গে গোলাপের গন্ধ মিশে নলিনাক্ষের মনকে কেমন যেন উতলা করে তুলল। এতদিন তার বিশ্বে চারি দিকে সংযমের শান্তি, জ্ঞানের গম্ভীরতা ছিল, আজ সেখানে হঠাৎ এমন নানা সুরের নহবত বাজে উঠল কোথা থেকে— কোন্ অদৃশ্য নৃত্যের চরণক্ষেপে ও নূপুরঝংকারে আজ আকাশতল এমন চঞ্চল হয়ে উঠতে লাগল!
নলিনাক্ষ জানলা থেকে ফিরে ঘরের মধ্যে চেয়ে দেখল, তার বিছানার শিয়রের কাছে কুলুঙ্গির ওপর গোলাপফুলগুলি সাজানো রহিয়াছে। এই ফুলগুলি জানি না কাহার চোখের মতো তার মুখের দিকে চেয়ে রইল, নিঃশব্দ আত্মনিবেদনের মতো তার হৃদয়ের দ্বারপ্রান্তে নত হয়ে পড়ল।
নলিনাক্ষ এর মধ্যে একটি ফুল তুলে নিল— সেটি কাঁচা সোনার রঙের হলদে গোলাপ, পাপড়িগুলি ফোটে নি, কিন্তু গন্ধ লুকোতে পারছে না। সেই গোলাপটি হাতে নিতেই যেন সে কার আঙুলের মতো তার আঙুলকে স্পর্শ করল, তার শরীরের সমস্ত স্নায়ুতন্তুকে রিমিঝিমি করে বাজিয়ে তুলল। নলিনাক্ষ সেই স্নিগ্ধকোমল ফুলটিকে নিজের মুখের ওপর, চোখের পল্লবের ওপর বুলাতে লাগল!
দেখতে দেখতে সন্ধ্যাকাশ থেকে অস্তসূর্যের আভা মিলিয়ে এল। নলিনাক্ষ ঘর থেকে বের হওয়ার আগে একবার তার বিছানার কাছে গিয়ে শয্যার আচ্ছাদনটি তুলে ফেলল এবং মাথার বালিশের ওপর সেই গোলাপফুলটি রাখল। রেখে উঠে আসবে, এমন সময় খাটের ও পাশে মেঝের ওপর ও কে আঁচলে মুখ ঢেকে লজ্জায় একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিতে চাইল! হায় রে কমলা, লজ্জা রাখবার আর স্থান নেই। সে আজ কুলুঙ্গিতে গোলাপ সাজিয়ে স্বহস্তে নলিনাক্ষের বিছানা করে বেরিয়ে আসছিল, এমন সময়ে হঠাৎ নলিনাক্ষের পায়ের শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি বিছানার ও পাশে গিয়ে লুকিয়েছিল— এখন পালানোও অসম্ভব, লুকানোও কঠিন। তার রাশীকৃত-লজ্জা-সমেত এই ধুলোর ওপর সে এমন একান্তভাবে ধরা পড়ে গেল।
নলিনাক্ষ এই লজ্জিতাকে মুক্তি দেবার জন্য তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হওয়ার উপক্রম করল। দরজা পর্যন্ত গিয়ে একবার দাঁড়াল। কিছুক্ষণ কী ভেবে সে ধীরে ধীরে ফিরে এল; কমলার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি ওঠো, আমার কাছে তোমার কোনো লজ্জা নেই।”