পরদিন সকালেই কমলা খুড়ামশায়ের বাসায় গিয়ে উপস্থিত হল। যখন নির্জনে একটু অবকাশ পেল অমনি সে শৈলজাকে জড়িয়ে ধরল; শৈল কমলার চিবুক ধরে বলল, “কী বোন, এত খুশি কিসের?”
কমলা বলল, “আমি জানি না দিদি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, যেন আমার জীবনের সমস্ত ভার চলে গেছে।”
শৈল। বল্-না, সব কথা বল্-না আমাকে। এই তো কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা ছিলাম, তার পরে তোর হল কী?
কমলা। এমন কিছুই হয়নি, কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছে, আমি যেন তাঁকে পেয়েছি, ঠাকুর যেন আমার ওপর সদয় হয়েছেন।
শৈল। তাই হোক বোন, কিন্তু আমার কাছে কিছু লুকোস না।
কমলা। আমার লুকাবার কিছুই নেই দিদি, কী যে বলবার আছে, তাও খুঁজে পাই না। রাত পোহাতেই সকালে উঠে মনে হল আমার জীবনটা সার্থক— আমার সমস্ত দিনটা এমন মিষ্ট, আমার সমস্ত কাজ এমন হালকা হয়ে গেছে, তা আমি বলতে পারি না। আমি এর চেয়ে আর বেশি কিছুই চাই না— কেবল ভয় হয় পাছে এটুকু নষ্ট হয়— আমি যে প্রতিদিন এমন করে দিন কাটাতে পারব, আমার ভাগ্য যে এত প্রসন্ন হবে, তা আমি মনে করতেই পারি না।
শৈল। আমি তোকে বলছি বোন, তোর ভাগ্য তোকে এইটুকু দিয়েই ফাঁকি দেবে না, তোর যা পাওনা আছে তার সমস্তই শোধ হবে।
কমলা। না না দিদি, ও কথা বলো না— আমার সমস্ত শোধ হয়ে গেছে, আমি বিধাতাকে কোনো দোষ দিই না, আমার কোনো অভাব নেই।
এমন সময় খুড়া এসে বললেন, “মা, তোমাকে তো একবার বাইরে আসতে হচ্ছে, রমেশবাবু এসেছেন।”
খুড়া এতক্ষণ রমেশের সঙ্গেই কথা কহছিলেন। রমেশকে বলছিলেন “আপনার সঙ্গে কমলার কী সম্পর্ক, তা আমি সমস্তই জেনেছি। এখন আপনার প্রতি আমার পরামর্শ এই যে, আপনার জীবন এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে, এখন আপনি কমলার সমস্ত প্রসঙ্গ একেবারে পরিত্যাগ করুন। কমলা সম্পর্কে যদি কোনো গিঁট কোথাও মোচনের প্রয়োজন থাকে তবে বিধাতার উপর সে ভার দিন, আপনি আর হাত দেবেন না।”
রমেশ এর উত্তরে বলছিল, “কমলা সম্পর্কে সকল কথা নিঃশেষে পরিত্যাগ করার আগে নলিনাক্ষের কাছে সকল ঘটনা না জানিয়ে আমার নিষ্কৃতি হতে পারে না। এ পৃথিবীতে কমলার কথা তুলবার সমস্ত প্রয়োজন হয়তো শেষ হয়ে গেছে, হয়তো শেষ হয়নি— যদি না হয়ে থাকে তবে আমার যেটুকু বক্তব্য সেটুকু সেরে ছুটি পেতে চাই।”
খুড়া বললেন, “আচ্ছা, আপনি একটুখানি বসুন, আমি আসছি।”
রমেশ ঘুরে বসে জানলা থেকে শূন্যদৃষ্টিতে লোকপ্রবাহের দিকে চেয়ে রইল; কিছুক্ষণ পরেই পায়ের শব্দে সতর্ক হয়ে দেখল, একটি রমণী ভূমিতে মাথা ঠুকিয়ে তাকে প্রণাম করল। যখন সে প্রণাম করে উঠল তখন রমেশ আর বসে থাকতে পারল না; তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কমলা!” কমলা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
খুড়া বললেন, “রমেশবাবু, কমলার সমুদয় দুঃখকে সৌভাগ্যে পরিণত করে ঈশ্বর তার চারি দিক থেকে সমস্ত কুয়াশা কেটে দিচ্ছেন। আপনি তাকে পরম সংকটের সময় যেমন রক্ষা করেছেন, তার জন্য যে বিষম দুঃখ আপনাকে স্বীকার করতে হয়েছে, তাতে আপনার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদনের সময় কোনো কথা না বলে কমলা বিদায় নিতে পারে না। আপনার কাছে ও আজ আশীর্বাদ নিতে এসেছে।”
রমেশ ক্ষণকাল চুপ করে থেকে সবলে রুদ্ধ কণ্ঠ পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, “তুমি সুখী হও কমলা— আমি না জেনে এবং জেনে তোমার কাছে যা-কিছু অপরাধ করেছি, সব মাপ করো।”
কমলা এর উত্তরে কিছুই বলতে পারল না, দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
রমেশ কিছুক্ষণ পরে বলল, “যদি কাউকে কিছু বলার জন্য, কোনো বাধা দূর করার জন্য, আমাকে তোমার প্রয়োজন থাকে তো বলো।”
কমলা জোড়হাত করে বলল, “আমার কথা কারো কাছে বলবেন না, আমার এই মিনতি রাখবেন।”
রমেশ বলল, “অনেক দিন তোমার কথা কারো কাছে বলি নি, খুব গোলমালে পড়লেও চুপ করে কাটিয়েছি। অল্পদিন হল, যখন মনে করেছিলাম তোমার কথা বললে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না, তখনই কেবল একটি পরিবারের কাছে তোমার কথা প্রকাশ করেছি। তাতেও বোধ হয় তোমার অনিষ্ট না হয়ে ভালোই হতে পারে। খুড়ামশায় বোধ হয় খবর পেয়ে থাকবেন— অন্নদাবাবু, যাঁর মেয়ের সঙ্গে—”
খুড়া বললেন, “হেমনলিনী, জানি বৈকি। তাঁরা সব শুনেছেন?”
রমেশ বলল, “হ্যাঁ। তাঁদের কাছে আর কিছু বলা যদি প্রয়োজন বোধ করেন তবে আমি যেতে পারি—কিন্তু আমার আর ইচ্ছা নেই— আমার অনেক সময় গেছে এবং আরো আমার অনেক গেছে, এখন আমি মুক্তি চাই— হাত-নাগাদ সমস্ত দেনা-পাওনা শোধ করে দিয়ে এখন বাইরে হতে পারলে বাঁচি!”
খুড়া রমেশের হাত ধরে সস্নেহকণ্ঠে বললেন, “না রমেশবাবু, আপনাকে আর কিছুই করতে হবে না। আপনাকে অনেক বহন করতে হয়েছে, এখন ভারমুক্ত হয়ে নিজেকে স্বাধীনভাবে চালনা করুন, সুখী হন, সার্থক হন, এই আমার আশীর্বাদ!”
যাবার সময় রমেশ কমলার দিকে চেয়ে বলল, “আমি তবে চললাম।”
কমলা কোনো কথা না বলে আর-একবার ভূতলে মাথা ঠুকিয়ে রমেশকে প্রণাম করল।
রমেশ পথে বেরিয়ে স্বপ্নাবিষ্টের মতো চলতে চলতে ভাবতে লাগল, ‘কমলার সঙ্গে দেখা হল, ভালোই হল; দেখা না হলে এ পালাটা ভালো করে শেষ হত না। যদিও ঠিক জানলাম না, কমলা কী জেনে কী বুঝে সে রাতে হঠাৎ গাজিপুরের বাংলা ছেড়ে চলে এল, কিন্তু এটা বোঝা গেছে, আমি এখন সম্পূর্ণই অনাবশ্যক। এখন আমার আবশ্যক কেবল নিজের জীবনটুকু নিয়ে, এখন তাকেই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করে পৃথিবীতে বের হলাম— আমার আর পিছনে ফিরে তাকাবার কোনো প্রয়োজন নেই।’
কমলা বাড়ি ফিরে এসে দেখল— অন্নদাবাবু ও হেমনলিনী ক্ষেমংকরীর কাছে বসে আছে। কমলাকে দেখে ক্ষেমংকরী বললেন, “এই যে হরিদাসী, তোমার বন্ধুকে তোমার ঘরে নিয়ে যাও বাছা! আমি অন্নদাবাবুকে চা খাওয়াচ্ছি।”
কমলার ঘরে প্রবেশ করেই হেমনলিনী কমলার গলা ধরে বলল, “কমলা!”
কমলা খুব বেশি বিস্মিত না হয়ে বলল, “তুমি কেমন করে জানলে আমার নাম কমলা।”
হেমনলিনী বলল, “একজনের কাছে আমি তোমার জীবনের ঘটনা সব শুনেছি। যেমনি শুনলাম অমনি তখনই আমার মনে সন্দেহ রইল না তুমিই কমলা। কেন যে, তা বলতে পারি না।”
কমলা বলল, “ভাই, আমার নাম যে কেউ জানে সে আমার ইচ্ছা নয়। আমার নিজের নামে একেবারে ধিক্কার জন্মে গেছে।”
হেমনলিনী বলল, “কিন্তু ঐ নামের জোরেই তো তোমাকে তোমার অধিকার পেতে হবে।”
কমলা মাথা নাড়িয়ে বলল, “ও আমি বুঝি না। আমার জোর কিছুই নেই, আমার অধিকার কিছুই নেই, আমি জোর খাটাতেই চাই না।”
হেমনলিনী বলল, “কিন্তু তোমার স্বামীকে তোমার পরিচয় থেকে বঞ্চিত করবে কী বলিয়ে। তোমার ভালোমন্দ সবই কি তাঁর কাছে নিবেদন করবে না? তাঁর কাছে কি কিছু লুকানো চলবে?”
হঠাৎ কমলার মুখ যেন বিবর্ণ হয়ে গেল— সে কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে নিরূপায়ভাবে হেমনলিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আস্তে আস্তে কমলা মেজের মাদুরের ওপর বসে পড়ল; বলল, “ভগবান তো জানেন, আমি কোনো অপরাধ করি নি, তবে তিনি কেন আমাকে এমন করে লজ্জায় ফেলবেন? যে পাপ আমার নয় তার শাস্তি আমাকে কেন দেবেন? আমি কেমন করে তাঁর কাছে আমার সব কথা প্রকাশ করব?”
হেমনলিনী কমলার হাত ধরে বলল, “শাস্তি নয় ভাই, তোমার মুক্তি হবে। যতদিন তুমি তোমার স্বামীর কাছে আপনাকে গোপন করে রাখছ ততদিন তুমি আপনাকে একটা মিথ্যার বন্ধনে জড়িত করছ— তাহা তেজের সঙ্গে ছিঁড়ে ফেলো, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করবেনই।”
কমলা বলল, “আবার পাছে সব হারাই এই ভয় যখন মনে আসে তখন সব ভুলে যাই। কিন্তু তুমি যা বলছ আমি তা বুঝেছি— অদৃষ্টে যা থাকে তা হোক, কিন্তু তাঁর কাছে আপনাকে লুকানো আর চলবে না, তিনি আমার সবই জানবেন।”
এই বলতে বলতে সে নিজের দুই হাত দৃঢ়বলে বদ্ধ করল।
হেমনলিনী সকরুণচিত্তে বলল, “তুমি কি চাও আর-কেউ তোমার কথা তাঁকে জানায়?”
কমলা সবেগে মাথা নাড়িয়ে বলল, “না না, আর-কারো মুখ থেকে তিনি শুনবেন না— আমার কথা আমিই তাঁকে বলব— আমি বলতে পারব।”
হেমনলিনী বলল, “সেই কথাই ভালো। তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে কি না, জানি না। আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি, তা তোমাদের বলতে এসেছি।”
কমলা জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাবে?”
হেমনলিনী বলল, “কলকাতায়। তোমাদের সকালে কাজকর্ম আছে, আমরা আর দেরি করব না। আমি তবে আসি ভাই! বোনকে মনে রাখিও।”
কমলা তার হাত ধরে বলল, “আমাকে চিঠি লিখবে না?”
হেমনলিনী বলল, “আচ্ছা, লিখব।”
কমলা বলল, “কখন কী করতে হবে, আমাকে তুমি উপদেশ দিয়ে লিখিও— আমি জানি তোমার চিঠি পেলে আমি বল পাব।”
হেমনলিনী একটু হেসে বলল, “আমার চেয়ে ভালো উপদেশ দেবার লোক তুমি পাবে, সেজন্য কিছুই ভাবিও না।”
আজ হেমনলিনীর জন্য কমলা মনের মধ্যে বড়ই একটা বেদনা অনুভব করতে লাগল। হেমনলিনীর প্রশান্ত মুখে কী-একটা ভাব ছিল যা দেখে কমলার চোখে যেন জল ভরে আসতে চাইত। কিন্তু হেমনলিনীর কেমন-একটা দূরত্ব আছে— তাকে কোনো কথা বলা যেন চলে না, তাকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে যেন বাধে। আজ কমলার সব কথাই হেমনলিনীর কাছে প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু সে নিজের সুগভীর নিস্তব্ধতার মধ্যে প্রচ্ছন্ন হয়ে চলে গেল, কেবল একটা-কী রেখে গেল যা বিলীয়মান গোধূলির মতো অপরিমেয় বিষাদের বৈরাগ্যে পরিপূর্ণ।
গৃহকর্মের অবকাশকালে আজ সমস্ত দিন কেবল হেমনলিনীর কথাগুলি এবং তার শান্ত-সকরুণ চোখের দৃষ্টি কমলার মনকে আঘাত দিতে লাগল। কমলা হেমনলিনীর জীবনের আর-কোনো ঘটনা জানত না— কেবল জানত, নলিনাক্ষের সঙ্গে তার বিবাহের সম্বন্ধ হয়ে ভেঙে গেছে। হেমনলিনী তাদের বাগান থেকে আজ এক সাজি ফুল এনে দিয়েছিল। বিকালে গা ধুয়ে এসে কমলা সেই ফুলগুলি নিয়ে মালা গাঁথতে বসল। মাঝে একবার ক্ষেমংকরী এসে তার পাশে বসে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, “আহা মা, আজ হেম যখন আমাকে প্রণাম করে চলে গেল, আমার মনের মধ্যে যে কী করতে লাগল বলতে পারি না। যে যাই বলুক, হেম মেয়েটি বড়ো ভালো। আমার এখন কেবলই মনে হচ্ছে, ওকে যদি আমাদের বউ করতাম তো বড়ো সুখের হত। আর-একটু হলেই তো হয়ে যেত, কিন্তু আমার ছেলেটিকে তো পারার জো নেই—ও যে কী ভেবে বাঁকিয়ে বসল তা সে ওই জানে।”
শেষকালে তিনিও যে এই বিবাহের প্রস্তাবে বিমুখ হয়েছিলেন সে কথা ক্ষেমংকরী আর মনের মধ্যে আমল দিতে চান না।
বাইরে পায়ের শব্দ শুনে ক্ষেমংকরী ডাকলেন, ‘ও নলিন, শুনে যা।”
কমলা তাড়াতাড়ি আঁচলের মধ্যে ফুল ও মালা ঢেকে ফেলে মাথায় কাপড় তুলে দিল। নলিনাক্ষ ঘরে প্রবেশ করলে ক্ষেমংকরী বললেন, “হেমরা যে আজ চলে গেল। তোর সঙ্গে কি দেখা হয়নি?”
নলিন বলল, “হ্যাঁ, আমি যে তাদের গাড়িতে তুলে দিয়ে এলাম।”
ক্ষেমংকরী বললেন, “যাই বলিস বাপু, হেমের মতো মেয়ে সচরাচর দেখা যায় না।”
যেন নলিনাক্ষ এ সম্পর্কে বরাবর তাঁর প্রতিবাদ করেই এসেছে। নলিনাক্ষ চুপ করে একটুখানি হাসল।
ক্ষেমংকরী বললেন, “হাসলি যে বড়ো! আমি তোর সঙ্গে হেমের সম্বন্ধ করলাম, আশীর্বাদ পর্যন্ত করে এলাম, আর তুই যে জেদ করে সব ভণ্ডুল করে দিলি, এখন তোর মনে কি একটু অনুতাপ হচ্ছে না?
নলিনাক্ষ একবার চকিতের মতো কমলার মুখের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল; দেখল কমলা উৎসুকনেত্রে তার দিক তাকিয়ে আছে। চারি চোখ মিলিত হওয়ামাত্র কমলা লজ্জায় মাটি হয়ে চোখ নিচু করল।
নলিনাক্ষ বলল, “মা, তোমার ছেলে কি এমনি সৎপাত্র যে, তুমি সম্বন্ধ করলেই হল? আমার মতো নিরস গম্ভীর লোককে সহজে কি কারো পছন্দ হতে পারে।”
এই কথায় কমলার চোখ আপনি আবার উপরে উঠল, উঠবামাত্র দেখল নলিনাক্ষের হাস্যোজ্জ্বল দৃষ্টি তার উপরেই পড়েছে— এবার কমলার মনে হতে লাগল ‘ঘর থেকে ছুটে পালাতে পারলে বাঁচি।’
ক্ষেমংকরী বললেন, “যা যা, আর বকিস না, তোর কথা শুনলে আমার রাগ ধরে।”
এই সভা ভঙ্গ হয়ে গেলে পর কমলা হেমনলিনীর সব ক’টি ফুল নিয়ে একটি বড়ো মালা গাঁথল। ফুলের সাজির ওপর সেই মালাটি নিয়ে জলের ছিটা দিয়ে সেটি নलিনাক্ষের উপাসনা-ঘরের এক পার্শ্বে রেখে দিল। তার মনে হতে লাগল, আজ বিদায় হয়ে যাবার দিনে এইজন্যেই হেমনলিনী সাজি ভরে ফুল এনেছিল— মনে করে তার চোখ ছলছল করে উঠল।
তার পরে নিজের ঘরে ফিরে এসে তার মুখের দিকে নলিনাক্ষের সেই দৃষ্টিপাত কমলা অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা করতে লাগল। নলিনাক্ষ কমলাকে কী মনে করছে? কমলার মনের কথা যেন নলিনাক্ষের কাছে সমস্তই প্রকাশ হয়ে পড়েছে। কমলা পূর্বে যখন নলিনাক্ষের সম্মুখে বের হত না, তখন সে একরকম ছিল ভালো। এখন প্রতিদিন কমলা তার কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছে। আপনাকে গোপন করে রাখার এই তো শাস্তি! কমলা ভাবতে লাগল, নিশ্চয়ই নলিনাক্ষ মনে মনে বলছেন, ‘এই হরিদাসী মেয়েটিকে মা কোথা থেকে আনলেন, এমন নির্লজ্জ তো দেখি নি!’ নলিনাক্ষ যদি এক মুহূর্তও এমন কথা মনে করে তবে তো সে অসহ্য।
কমলা রাতে বিছানায় শুয়ে মনে মনে খুব জোর করে প্রতিজ্ঞা করল, ‘যেমন করেই হোক, কালই নিজের পরিচয় দিতে হবে, তার পরে যা হয় তা হোক।”
পরদিন কমলা প্রত্যুষে উঠে স্নান করতে গেল। স্নানের পর প্রতিদিন সে একটি ছোটো ঘটিতে গঙ্গাজল এনে নলিনাক্ষের উপাসনা-ঘরটি ধুয়ে মুছে তবে অন্য কাজে মন দিত। আজও সে তার দিবসের প্রথম কাজটি সেরে গিয়ে দেখল, নলিনাক্ষ আজ সকাল-সকাল তার উপাসনা-ঘরে প্রবেশ করেছে— এমন তো কোনোদিন হয়নি। কমলা তার মনের মধ্যে অসমাপ্ত কাজের একটা ভার বহন করে ধীরে ধীরে চলে গেল। খানিকটা দূরে গিয়ে সে হঠাৎ থামল, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কী-একটা ভাবল। তার পরে আবার ধীরে ধীরে ফিরে এসে উপাসনা-ঘরের দরজার কাছে চুপ করে বসে রইল। তাকে যে কিসে আবিষ্ট করে ধরল তা সে জানে না; সমস্ত জগৎ তার কাছে ছায়ার মতো হয়ে এল, সময় যে কতক্ষণ চলে গেল তা তার বোধ রইল না। হঠাৎ এক সময় দেখল, নলিনাক্ষ ঘর থেকে বের হয়ে তার সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়েছে। কমলা মুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে তখনই ভূতলে হাঁটু গেড়ে একেবারে নলিনাক্ষের পায়ের ওপর মাথা ঠুকিয়ে প্রণাম করল— তার সদ্যস্নানে আর্দ্র চুলগুলি নলিনের পা ঢেকে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল। কমলা প্রণাম করে উঠে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়াল; তার মনে রইল না যে, তার মাথার ওপর থেকে কাপড় পড়ে গেছে— সে যেন দেখতেই পেল না, নলিনাক্ষ অনিমেষ স্থিরদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে চেয়ে আছে— তার বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত, সে একটি অন্তরের চৈতন্য-আভায় অপূর্বরূপে দীপ্ত হয়ে অবিচলিতকণ্ঠে বলল, “আমি কমলা।”
এই কথাটি বলার পরেই তার নিজের কণ্ঠস্বরে তার যেন ধ্যানভঙ্গ হয়ে গেল, তার একাগ্র চেতনা বাইরে ব্যাপ্ত হল। তখন তার সর্বাঙ্গ কাঁপতে লাগল; মাথা নত হয়ে গেল; সেখান থেকে নড়বারও শক্তি রইল না, দাঁড়িয়ে থাকাও যেন অসাধ্য হয়ে উঠল; সে তার সমস্ত বল, সমস্ত পণ ‘আমি কমলা’ এই একটি কথায় নলিনাক্ষের পায়ের কাছে উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে— নিজের কাছে নিজের লজ্জা রক্ষা করার কোনো উপায় সে আর হাতে রাখে নি, এখন সমস্তই নলিনাক্ষের দয়ার উপর নির্ভর। নলিনাক্ষ আস্তে আস্তে তার হাতটি নিজের হাতের ওপর তুলে নিয়ে বলল, “আমি জানি, তুমি আমার কমলা। এসো, আমার ঘরে এসো।”
উপাসনা-ঘরে তাকে নিয়ে গিয়ে তার গলায় কমলার গাঁথা সেই মালাটি পরিয়ে দিল এবং বলল, “এসো, আমরা তাঁকে প্রণাম করি।”
দুই জনে পাশাপাশি যখন সেই শ্বেতপাথরের মেজের ওপর নত হল, জানালা থেকে প্রভাতের রৌদ্র দুই জনের মাথার ওপর এসে পড়ল।
প্রণাম করে উঠে আর-একবার নলিনাক্ষের পায়ের ধুলো নিয়ে যখন কমলা দাঁড়াল তখন তার দুঃসহ লজ্জা আর তাকে পীড়ন করল না। হর্ষের উল্লাস নয় কিন্তু একটি বৃহৎ মুক্তির অচঞ্চল শান্তি তার অস্তিত্বকে প্রভাতের অকুণ্ঠিত উদারনির্মল আলোর সঙ্গে ব্যাপ্ত করে দিল। একটি গভীর ভক্তি তার হৃদয়ের কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল, তার অন্তরের পূজা সমস্ত বিশ্বকে ধূপের পুণ্য গন্ধে বেষ্টন করল। দেখতে দেখতে কখন অজ্ঞাতসারে তার দুই চোখ জলে ভরে এল; বড়ো বড়ো জলের ফোঁটা তার দুই কপোল দিয়ে ঝরে পড়তে লাগল, আর থামতে চাইল না, তার অনাথ জীবনের সমস্ত দুঃখের মেঘ আজ আনন্দের জলে ঝরে পড়ল। নলিনাক্ষ তাকে আর-কোনো কথা না বলে একবার কেবল দক্ষিণ হাতে তার ললাট থেকে সিক্ত কেশ সরিয়ে দিয়ে ঘর থেকে চলে গেল।
কমলা তার পূজা এখনো শেষ করতে পারল না— তার পরিপূর্ণ হৃদয়ের ধারা এখনো সে ঢালতে চায়, তাই সে নলিনাক্ষের শোবার ঘরে গিয়ে নিজের গলার মালা দিয়ে সেই খড়ম-জোড়াকে জড়াল এবং তা নিজের মাথায় ঠুকিয়ে যত্নপূর্বক যথাস্থানে তুলে রাখল।
তার পরে সমস্ত দিন তার গৃহকর্ম যেন দেবসেবার মতো মনে হতে লাগল। প্রত্যেক কর্মই যেন আকাশে এক-একটি আনন্দের তরঙ্গের মতো উঠল পড়ল। ক্ষেমংকরী তাকে বললেন, “মা, তুমি করছ কী? এক দিনে সমস্ত বাড়িটাকে ধুয়ে মেজে মুছে একেবারে নতুন করে তুলবে না কি?”
বিকালের অবকাশের সময় আজ আর সেলাই না করে কমলা তার ঘরের মেজের ওপর স্থির হয়ে বসে আছে, এমন সময় নলিনাক্ষ একটি টুকরিতে গুটিকয়েক স্থলপদ্ম নিয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল; বলল, “কমলা, এই ফুল-ক’টি তুমি জল দিয়ে তাজা করে রাখো, আজ সন্ধ্যার পর আমরা দুজনে মাকে প্রণাম করতে যাব।”
কমলা মুখ নত করে বলল, “কিন্তু আমার সব কথা তো শোন নি।”
নলিনাক্ষ বলল, “তোমাকে কিছু বলতে হবে না, আমি সব জানি।”
কমলা দক্ষিণ করতল দিয়ে মুখ ঢেকে বলল, “মা কি—”
বলে কথা শেষ করতে পারল না।
নলিনাক্ষ তার মুখ থেকে হাত নামিয়ে ধরে বলল, “মা তাঁর জীবনে অনেক অপরাধকে ক্ষমা করে এসেছেন, যা অপরাধ নয় তাকে তিনি ক্ষমা করতে পারবেন।”